উচ্চতর আরবি ২য় পত্র (Higher Arabic 2nd Paper) – 408, উচ্চতর আরবি – ফাযিল পাস ৩য় বর্ষ পরীক্ষা ২০১৯

StudyBoi StudyBoi
September 26, 2026
৭৬ মিনিট পড়ার সময়
১ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন

ফাযিল (স্নাতক) পাস ৩য় বর্ষ পরীক্ষা – 2019
বিষয়: উচ্চতর আরবি (ঐচ্ছিক) দ্বিতীয় পত্র (বিষয় কোড: ৪০৮)
[আরবি পদ্য (الشعر العربي)]
সময়: ৩ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ১০০

ফাযিল (স্নাতক) পাস ৩য় বর্ষ পরীক্ষা 2019-এর উচ্চতর আরবি ২য় পত্র (বিষয় কোড: ৪০৮ – আরবি পদ্য) পরীক্ষার মূল প্রশ্নপত্রের প্রতিটি প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ, প্রামাণ্য ও অ্যাকাডেমিক সমাধান নিচে দেওয়া হলো। ফাযিল ডিগ্রি ও অনার্স শ্রেণির ২০ নম্বরের রচনামূলক ও ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নের উচ্চমান বজায় রেখে ভূমিকা, মূল আরবি পাঠ, প্রাঞ্জল বাংলা রূপান্তর, শাব্দিক ও ব্যাকরণিক তাহকিক, আলঙ্কারিক বিশ্লেষণ এবং শিক্ষণীয় দিকসমূহ সহযোগে প্রতিটি উত্তর প্রস্তুত করা হয়েছে।

কন্টেন্ট তালিকা / প্রশ্নসূচি

  1. ১. অনুবাদ ও কাব্যিক পাঠ বিশ্লেষণ: ترجم ثلاث قطعات باللغة البنغالية
  2. ২. আরবিতে কবিতার বিশদ ব্যাখ্যা: اشرح إحدى القطعتين بالعربية
  3. ৩ (الف). نبذة من حياة حسان بن ثابت رضى الله عنه مع بيان خدماته للإسلام بالشعر
  4. ৩ (ب). من لقب بأمير الشعراء؟ اكتب ترجمة حياته ومساهمته فى الشعر الحديث [আহমদ শাওকী]
  5. ৩ (ج). خصائص الشعر العربى الاندلسى مع ذكر أسماء خمسة من الشعراء الاندلسيين
  6. ৪. সংক্ষিপ্ত ও ঐতিহাসিক প্রশ্নমালা: المتنبي، النقائض، أبو تمام، أبو العتاهية، شاعر النيل
  7. ৫ (الف). من هم المخضرمون؟ اذكر نبذة من حياة شاعر من الشعراء المخضرمين
  8. ৫ (ب). نبذة من حياة الخليفة على بن ابى طالب (رض) ثم قدره شاعرا وخطيبا
  9. ৫ (ج). الخدمات الادبية للشاعر ابن هانئ الأندلسى بالاختصار [ইবনে হানি]
  10. ৫ (د). خصائص الشعر العربى فى العصر الجاهلى [জাহেলী কবিতার বৈশিষ্ট্যসমূহ]

প্রশ্নোত্তর ও পূর্ণাঙ্গ সমাধান

১. অনুবাদ ও কাব্যিক পাঠ বিশ্লেষণ: ترجم ثلاث قطعات باللغة البنغالية [নির্বাচিত কাব্যাংশের প্রাঞ্জল বাংলা রূপান্তর ও বিশ্লেষণ]

ভূমিকা ও কাব্যাংশের প্রেক্ষাপট

আরবি কবিতা হলো আরব জাতির ইতিহাস, মনস্তত্ত্ব, বীরত্ব ও নান্দনিক রুচির চিরন্তন দর্পণ (ديوان العرب)। ফাযিল ৩য় বর্ষের উচ্চতর আরবি ২য় পত্রের প্রথম প্রশ্নে জাহেলী যুগের বিখ্যাত মুয়াল্লাকা থেকে শুরু করে ইসলামের আবির্ভাব যুগ, খোলাফায়ে রাশেদীন, আব্বাসীয় যুগ এবং আধুনিক পুনর্জাগরণ যুগের শ্রেষ্ঠ কবিদের কাসিদা থেকে নির্বাচিত পংক্তিমালা উদ্ধৃত করা হয়েছে। নিচে নির্বাচিত কাব্যাংশসমূহের মূল আরবি পাঠ, প্রাঞ্জল বাংলা রূপান্তর, শাব্দিক ও ব্যাকরণিক তাহকিক এবং সাহিত্যিক অলঙ্কার উপস্থাপন করা হলো:

১. ইমরুল কায়েসের মুয়াল্লাকা (معلقة امرئ القيس)

«فَفَاضَتْ دُمُوعُ الْعَيْنِ مِنِّي صَبَابَةً * عَلَى النَّحْرِ حَتَّى بَلَّ دَمْعِي مَحْمَلِي
أَلَا رُبَّ يَوْمٍ لَكَ مِنْهُنَّ صَالِحٍ * وَلَا سِيَّمَا يَوْمٍ بِدَارَةِ جُلْجُلِ
وَيَوْمَ عَقَرْتُ لِلْعَذَارَى مَطِيَّتِي * فَيَا عَجَبًا مِنْ كَوْرِهَا الْمُتَحَمَّلِ
فَظَلَّ الْعَذَارَى يَرْتَمِينَ بِلَحْمِهَا * وَشَحْمٍ كَهُدَّابِ الدِّمَقْسِ الْمُفَتَّلِ»

বাংলা ভাবার্থ ও প্রাঞ্জল অর্থ: অতঃপর গভীর প্রেমাবেগ ও বিরহবেদনায় আমার চক্ষুদ্বয় থেকে অশ্রুধারা প্লাবনের মতো প্রবাহিত হয়ে আমার বক্ষদেশ বেয়ে ঝরে পড়ল, এমনকি আমার তলোয়ারের ঝুলন্ত পেটি পর্যন্ত অশ্রুতে ভিজে গেল। আহা! প্রেয়সীদের সাথে তোমার কতই না সুখময় ও স্মরণীয় দিন অতিবাহিত হয়েছে, বিশেষ করে ‘দারাতে জুলজুল’ নামক জলাশয়ের সেই অবিস্মরণীয় দিনটিতে! যেদিন আমি যুবতী নারীদের ভোজের তরে আমার প্রিয় আরোহী উষ্ট্রীকে জবেহ করেছিলাম; আর কী আশ্চর্য সুন্দর ছিল সেই কাফেলা যার ওপর উষ্ট্রীর পালান চাপানো হয়েছিল! অতঃপর কুমারী তরুণীরা তার সুস্বাদু গোশত এবং পাকানো শুভ্র রেশমের ঝালরের মতো কোমল চর্বি পরস্পর একে অপরের দিকে ছুড়ে দিয়ে আনন্দ-উৎসবে মেতে উঠেছিল।

২. হযরত আলী ইবনে আবী তালিব (রা)-এর হিকমতপূর্ণ কবিতা

«تَغَيَّرَتِ الْمَوَدَّةُ وَالْإِخَاءُ * وَقَلَّ الصِّدْقُ وَانْقَطَعَ الرَّجَاءُ
وَأَسْلَمَنِي الزَّمَانُ إِلَى صَدِيقٍ * كَثِيرِ الْعُذْرِ لَيْسَ لَهُ رِعَاءُ
وَرُبَّ أَخٍ وَفَيْتُ لَهُ بِحَقٍّ * وَلَكِنْ لَا يَدُومُ لَهُ وَفَاءُ
أَخِلَّاءٌ إِذَا اسْتَغْنَيْتُ عَنْهُمْ * وَأَعْدَاءٌ إِذَا نَزَلَ الْبَلَاءُ»

বাংলা ভাবার্থ ও প্রাঞ্জল অর্থ: মানুষের মধ্যকার খাঁটি আন্তরিকতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ বদলে গেছে; সমাজে সততার আজ চরম আকাল এবং আশার প্রদীপ নির্বাপিত হয়ে গেছে। এই নিষ্ঠুর কালচক্র আমাকে এমন এক কৃত্রিম বন্ধুর হাতে সঁপে দিয়েছে, যে অজুহাতের ফুলঝুরি সাজাতে ওস্তাদ কিন্তু যার অন্তরে বন্ধুত্বের কোনো মূল্যবোধ ও সহানুভূতি নেই। কত ভাইয়ের প্রতিই না আমি পরিপূর্ণ হক ও বিশ্বস্ততা বজায় রেখেছি, কিন্তু তার পক্ষ থেকে কোনো বিশ্বস্ততা স্থায়ী হয়নি। সমাজে এমন অনেক বন্ধু রয়েছে, যতক্ষণ তুমি প্রাচুর্যবান ও ধনী থাকবে ততক্ষণ তারা তোমার পরম অন্তরঙ্গ মিত্র সেজে থাকবে; কিন্তু যেইমাত্র তোমার ওপর কোনো বিপদ বা দারিদ্র্য নেমে আসবে, অমনি তারা প্রকাশ্য শত্রুতে রূপ নেবে!

৩. হাসসান বিন সাবিত (রা)-এর কাফিরদের জবাবে প্রতিরক্ষামূলক কাসিদা

«وَجِبْرَائِيلُ أَمِينُ اللَّهِ فِينَا * وَرُوحُ الْقُدُسِ لَيْسَ لَهُ كِفَاءُ
وَقَالَ اللَّهُ قَدْ أَرْسَلْتُ عَبْدًا * يَقُولُ الْحَقَّ إِنْ نَفَعَ الْبَلَاءُ
شَهِدْتُ بِهِ فَقَوْمُوا صَدِّقُوهُ * فَقُلْتُمْ لَا نَقُومُ وَلَا نَشَاءُ
وَقَالَ اللَّهُ قَدْ يَسَّرْتُ جُنْدًا * هُمُ الْأَنْصَارُ عُرْضَتُهَا اللِّقَاءُ»

বাংলা ভাবার্থ ও প্রাঞ্জল অর্থ: আল্লাহর বিশ্বস্ত বার্তাवाहक জিবরাঈল (আ.) স্বয়ং আমাদের মাঝে বিদ্যমান রয়েছেন; সেই পবিত্র রূহ (রূহুল কুদুস), যাঁর সমকক্ষ সমগ্র বিশ্বে কেউ নেই। আর মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন: নিশ্চয়ই আমি এমন এক বান্দাকে রাসূলরূপে প্রেরণ করেছি যিনি চিরন্তন সত্যের বাণী প্রচার করেন, যদিও এই পরীক্ষা কাফেরদের জন্য কোনো কল্যাণ আনবে না। আমি সাক্ষ্য দিয়েছি যে তিনি সত্য নবী, সুতরাং তোমরা উঠে দাঁড়াও এবং তাঁকে সত্য বলে বিশ্বাস করো; কিন্তু তোমরা অহংকার করে বলেছিলে—আমরা কখনোই দাঁড়াব না এবং বিশ্বাসও স্থাপন করব না! তখন আল্লাহ ঘোষণা করলেন: আমি এমন এক অপরাজেয় বাহিনীকে প্রস্তুত করেছি, যারা হলো ‘আনসার’—যাদের প্রধান আনন্দ ও গৌরবই হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য শত্রুর মুখোমুখি হওয়া!

শাব্দিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ

আরবি শব্দ রূপমূল ও ব্যাকরণ আভিধানিক অর্থ কাব্যিক তাৎপর্য
صَبَابَةً মফুলুন লাহু (মাসদার) প্রচণ্ড প্রেমাবেগ ও বিরহের ব্যাকুলতা হৃদয়ের উত্তাল আবেগ প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত।
دَارَةِ جُلْجُلِ মুদাফ ও মুদাফ ইলাইহি জুলজুল জলাশয়ের তীরবর্তী এলাকা জাহেলী যুগের কবিদের প্রণয়স্মৃতির ঐতিহাসিক স্থান।
أَخِلَّاءٌ মুফতাদা (খলীল-এর বহুবচন) পরম বন্ধু ও অন্তরঙ্গ মিত্রবৃন্দ সুসময়ের স্বার্থপর বন্ধুদের প্রতি তীব্র কটাক্ষ।
عُرْضَتُهَا ইসম (অভ্যাস বা স্বভাব) মুখোমুখি লড়াইয়ের তীব্র আকাঙ্ক্ষা মদিনার আনসারদের শাহাদাতমুখী বীরত্বের অনুপম রূপায়ণ।

সাহিত্যিক অলঙ্কার ও মূল্যায়ন

  • তিবাক ও মুকাবালা (الطباق والمقابلة): হযরত আলী (রা.)-এর কবিতায় ‘আখিল্লা’ (বন্ধুবর্গ) এবং ‘আ’দা’ (শত্রুবর্গ), ‘ইস্তাগনাইতু’ (ধনাঢ্যতা) এবং ‘বালা’ (বিপদ)-এর চমৎকার বিপরীতধর্মী সমান্তরাল ব্যবহার করা হয়েছে, যা মানবচরিত্রের কৃত্রিমতাকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
  • অলৌকিক প্রতিরক্ষামূলক কাব্য: হাসসান (রা.)-এর কবিতায় খোদায়ী সাহায্যে বলীয়ান আনসারদের ঈমানী তেজ ধ্বনিত হয়েছে। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন: «اهْجُهُمْ وَجِبْرِيلُ مَعَكَ» (হাসসান, তুমি কাফেরদের ব্যঙ্গ কাব্যের জবাব দাও, জিবরাঈল তোমার সাথে আছেন)।

২. আরবিতে কবিতার বিশদ ব্যাখ্যা: اشرح إحدى القطعتين بالعربية [বালাগত ও সাহিত্যের আলোকে আরবিতে ব্যাখ্যা]

المقدمة التحليلية للشرح الأدبي

يتناول هذا القسم شرح بيتين من روائع الحكمة والشعر الإسلامي بالعربية الفصحى، مع بيان المعنى الإجمالي، وفك المفردات اللغوية، واستخراج النكات البلاغية والدروس المستفادة.

أولاً: شرح قول أمير المؤمنين علي بن أبي طالب رضي الله عنه :

النَّاسُ مِنْ جِهَةِ التِّمْثَالِ أَكْفَاءُ * أَبُوهُمُ آدَمُ وَالأُمُّ حَوَّاءُ
فَإِنْ يَكُنْ لَهُمْ مِنْ أَصْلِهِمْ شَرَفٌ * يُفَاخِرُونَ بِهِ فَالطِّينُ وَالمَاءُ

المعنى الإجمالي : يُقرر الإمام علي رضي الله عنه في هذين البيتين الحكيمين أصلاً عظيماً من أصول المساواة الإنسانية ونبذ العصبية الجاهلية والتفاخر بالأنساب. فالناس جميعاً متساوون في أصل الخلقة الإنسانية والصورة الظاهرة؛ إذ يرجع نسبهم المشترك إلى أب واحد هو آدم عليه السلام، وأم واحدة هي حواء. وإذا كان أحدٌ يتكبر بحسبه ونسبه المادي، فليعلم أن أصل خلقة آدم لم تكن إلا من تراب وماء مهين (الطين اللازب)، فلا معنى إذن للتكبر بالعناصر الترابية الفانية.

التحليل البلاغي واللغوي :

  • التمثال : الصورة والهيئة الجسدية المشتركة بين بني البشر.
  • أكفاء : جمع كفء، أي متساوون ومتماثلون لا فضل لأحدهم على الآخر في أصل الطبيعة البشرية.
  • القصر والحصر البلاغي : في قوله (فالطين والماء) قصر بليغ يُحقر به دعاوى الجاهلية في التعالي بالأنساب، مذكراً الإنسان بأصله الضعيف كما قال تعالى: ﴿وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ سُلَالَةٍ مِنْ طِينٍ﴾.
  • المغزى التربوي : التفاضل الحقيقي بين البشر ليس باللون أو العرق أو النسب، بل بالتقوى والعمل الصالح والعلم النافع.

ثانياً: شرح قول الشاعر الزاهد في الاستغفار والإنابة :

أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ مِنْ ذَنْبِي وَمِنْ سَرَفِي * إِنِّي وَإِنْ كُنْتُ مَسْتُورًا لَخَطَّاءُ

المعنى الإجمالي : يُجسد هذا البيت قمة الخضوع والانكسار بين يدي الله سبحانه وتعالى والاعتراف البشري الصادق بالضعف والتقصير. الشاعر يطلب المغفرة والصفح من ربه عن ذنوبه وتجاوزه الحدود في الإسراف على نفسه، مُبيناً حقيقة هامة: أن ثناء الناس عليه وحسن ظنهم به ليس إلا بسبب ‘ستر الله الجميل’ عليه، وإلا فإنه في حقيقة أمره إنسان كثير الخطأ والزلل.

التحليل البلاغي واللغوي :

  • صيغة المبالغة (خطّاء) : على وزن ‘فَعَّال’، للدلالة على كثرة وقوع المعاصي والزلات من الإنسان بطبيعته البشرية الضعيفة، تصديقاً للحديث النبوي: «كُلُّ ابْنِ آدَمَ خَطَّاءٌ، وَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ».
  • الاستدراك والتوكيد : بـ (إنّ) و (اللام المزحلقة) في قوله (لخطاء) مقابل كونه (مستوراً) وهو طباق معنوي رائع بين خفاء العيب بستر الله وبين حقيقة الوقوع في الخطأ.
  • الدرس الإيماني : الواجب على العبد ألا يغتر بستر الله وعافيته، بل يُلازم التوبة والاستغفار في كل آن وحين.

বাংলা তাৎপর্য ও শিক্ষা

উক্ত পদ্যদ্বয় আত্মশুদ্ধি ও সমাজদর্শনের এক অতুলনীয় রূপরেখা প্রদান করে। ১ম কবিতায় মানুষের সৃষ্টিগত সমতা ও বর্ণবাদের মূলে কুঠারাঘাত করা হয়েছে—যেখানে মানুষের একমাত্র মাপকাঠি তাকওয়া; এবং ২য় কবিতায় মানুষের দুর্বলতা ও মহান আল্লাহর চিরন্তন ক্ষমার দরবারে অবিরাম তাওবা ও বিনয়ের শিক্ষা তুলে ধরা হয়েছে।


৩ (الف). نبذة من حياة حسان بن ثابت رضى الله عنه مع بيان خدماته للإسلام بالشعر. [হাসসান বিন সাবিত (রা) ও কাব্যিক জিহাদ]

ভূমিকা ও পরিচিতি

ইসলামের ইতিহাসের সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব এবং স্বয়ং বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) কর্তৃক মনোনীত ‘রাসূলের কবি’ হলেন হযরত হাসসান ইবনে সাবিত আল-আনসারী (রা.) (Hassan bin Thabit, মৃ. ৫৪ হি.)। তিনি ছিলেন মদিনার বিখ্যাত খাজরাজ গোত্রের সন্তান। জাহেলী যুগে তিনি মদিনা ও গাসসানি রাজদরবারের শীর্ষস্থানীয় কবি ছিলেন। কিন্তু ৬০ বছর বয়সে ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর কাব্যশক্তি এক বৈপ্লবিক রূপ ধারণ করে এবং তিনি আজীবন ইসলামের প্রতিরক্ষা ও কাফেরদের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদে নিজের কলমকে উৎসর্গ করেন।

ইসলামের প্রতিরক্ষা ও কাব্যিক জিহাদে হাসসান (রা)-এর ঐতিহাসিক প্রতিভা

  • ১. স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) কর্তৃক মিম্বারে আসনদান: মসজিদে নববীতে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) হাসসান (রা.)-এর জন্য একটি বিশেষ কাঠের মিম্বার স্থাপন করেছিলেন, যার ওপর দাঁড়িয়ে তিনি কাফেরদের বিরুদ্ধে ওজস্বী কবিতা আবৃত্তি করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) দোয়া করতেন: «اللَّهُمَّ أَيِّدْهُ بِرُوحِ الْقُدُسِ» (হে আল্লাহ! আপনি জিবরাঈলের মাধ্যমে হাসসানকে শক্তিশালী ও সাহায্য করুন)।
  • ২. মক্কার কুরাইশদের ব্যঙ্গ কবিতার দাঁতভাঙা জবাব: বদর ও ওহুদ যুদ্ধের সময় কুরাইশ কবিরা (যেমন আমর ইবনুল আস, আব্দুল্লাহ ইবনুয যিবআরা) মহানবী (সা.) ও মুসলিম নারীদের ব্যঙ্গ করে কুৎসিত কবিতা লিখত। হাসসান (রা.) হযরত আবু বকর (রা.)-এর কাছ থেকে কুরাইশদের বংশলতিকা ও পারিবারিক ত্রুটি জেনে নিয়ে এমন ধারালো ব্যঙ্গ কবিতা (হিজা) রচনা করতেন যা কুরাইশদের তীরের চেয়েও মারাত্মকভাবে আহত করত।
  • ৩. আনসারদের ত্যাগ ও বীরত্বের অমর বন্দনা: মদিনার আনসারদের আতিথেয়তা, বদর ও হুনাইনের ময়দানে তাদের শাহাদাত এবং মুহাজিরদের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসাকে তিনি অমর কাসিদায় রূপ দিয়েছেন।
  • ৪. ভাষা ও শৈলীর রূপান্তর: ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর কাব্যভাষা থেকে জাহেলী যুগের স্থূল প্রেম ও অহমিকা দূর হয়ে কুরআনী নূর, তাকওয়া, ঈমানী তেজ এবং মার্জিত শব্দচয়ন স্থান পায়। তাঁকে আরবি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ‘মুখাদরাম কবি’ (شاعر مخضرم) বলা হয়।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতে তাঁর ঐতিহাসিক শোকগাথা (রসা)

মহানবী (সা.)-এর ওফাতের পর মদিনা যখন শোকের সাগরে নিমজ্জিত হয়েছিল, তখন হাসসান (রা.)-এর চোখ দিয়ে রক্তের অশ্রু ঝরেছিল। তিনি যে অমর শোকগাঁথা রচনা করেছিলেন, তা আজ পর্যন্ত বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ক্রন্দনধ্বনি:

«مَا وَارَتِ الْأَرْضُ مَيْتًا خَيْرَ وَاطِئِهَا * وَلَا سَمِيعًا لِصَوْتِ الْحَقِّ إِذْ نَادَى
بَلَى رَسُولُ الْهُدَى كَانَتْ لَنَا يَدُهُ * نُورًا يُضِيءُ لَنَا فِي كُلِّ مَا انْقَادَا»

উপসংহার

হযরত হাসসান ইবনে সাবিত (রা.) প্রমাণ করেছেন যে কবিতা কেবল বিলাসিতা বা প্রণয়চর্চার মাধ্যম নয়, বরং ঈমানি শক্তিতে শাণিত হলে সাহিত্যই বাতিলের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যূহ হতে পারে।


৩ (ب). من لقب بأمير الشعراء؟ اكتب ترجمة حياته ومساهمته فى الشعر الحديث. [আমীরুশ শুআরা আহমদ শাওকী ও আধুনিক কবিতা]

ভূমিকা ও পরিচিতি

মামলুক ও উসমানীয় যুগের দীর্ঘ চার শতাব্দীর নিস্তেজ, কৃত্রিম ও নিষ্প্রাণ অন্ধকার থেকে আরবি কবিতাকে মুক্ত করে ক্লাসিক্যাল যুগের তেজস্বী ধারায় পুনরুজ্জীবিত করার মহান নায়ক হলেন মিসরের সেনাপতি, প্রধানমন্ত্রী ও কবি মাহমুদ সামী আল-বারূদী (Mahmoud Sami al-Baroudi, ১৮৩৯-১৯০৪ খ্রি.)। আরবি সাহিত্যে তাঁকে শ্রদ্ধার সাথে ‘আমীরুস সাইফি ওয়াল কালাম’ (أَمِيرُ السَّيْفِ وَالْقَلَمِ – তলোয়ার ও কলমের সম্রাট) এবং ‘মাদরাসাতুল ইহয়া ওয়াল বা’স’ (مدرسة الإحياء والبعث – পুনরুজ্জীবন ও নবজাগরণ স্কুল)-এর জনক আখ্যা দেওয়া হয়।

আধুনিক আরবি কবিতার বিকাশে আল-বারূদীর ঐতিহাসিক অবদানসমূহ

  • ১. ক্লাসিক্যাল আরবি কাসিদার ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার (العودة إلى الأصالة): মামলুক যুগে কবিতা পরিণত হয়েছিল অলঙ্কারসর্বস্ব শব্দের ধাঁধায় (যেমন শব্দ উল্টে পড়া, নির্দিষ্ট বর্ণ বর্জন ইত্যাদি)। বারূদী জাহেলী যুগের ইমরুল কায়েস এবং আব্বাসীয় যুগের মুতানাব্বী, বুহতরী ও আবু তাম্মামের বলিষ্ঠ ও গম্ভীর ক্লাসিক্যাল শৈলীকে পুনরায় আধুনিক কাব্যে প্রতিষ্ঠিত করেন।
  • ২. দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদী কবিতার সূচনা: তিনি ১৮৮১ সালের ‘উরাবী বিপ্লব’ (الثورة العرابية)-এর সক্রিয় সামরিক নেতা ছিলেন। মাতৃভূমি মিসরকে ব্রিটিশদের দাসত্ব থেকে মুক্ত করার জন্য তিনি উদাত্ত কণ্ঠে কবিতা রচনা করেন, যা সৈন্যদের রক্তে আগুন ধরিয়ে দিত।
  • ৩. নির্বাসনের নিঃসঙ্গ বেদনা ও কারাকাব্য (المنفيات): উরাবী বিপ্লবের ব্যর্থতার পর ব্রিটিশরা তাঁকে সুদূর ভারত মহাসাগরের সিলন (বর্তমান শ্রীলঙ্কা) দ্বীপে দীর্ঘ সতেরো বছর নির্বাসনে পাঠায়। সেখানে বসে তিনি স্বদেশপ্রেম, প্রিয়জনদের বিরহ এবং বার্ধক্যের বেদনা নিয়ে যে মর্মস্পর্শী কাসিদাসমূহ রচনা করেন, তা বিশ্বসাহিত্যের এক অমর সম্পদ।
  • ৪. পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা: বারূদীর প্রতিষ্ঠিত এই পুনর্জাগরণের রাজপথ ধরেই পরবর্তীতে আহমদ শাওকী, হাফেয ইবরাহীম এবং মারুফ আর-রুসাফীর মতো মহাকবিদের অবির্ভাব ঘটেছিল।

উপসংহার

মাহমুদ সামী আল-বারূদী যদি আরবি কবিতার সেই মৃতপ্রায় শরীরে নতুন রক্ত সঞ্চালন না করতেন, তবে আধুনিক যুগে আরবি কবিতা তার স্বকীয় রূপ হারিয়ে বিলীন হয়ে যেত। তিনি ছিলেন আধুনিক আরবি সাহিত্যের অবিসংবাদিত পুনর্জন্মদাতা।


৩ (ج). خصائص الشعر العربى الاندلسى مع ذكر أسماء خمسة من الشعراء الاندلسيين. [আন্দালুসি কবিতার বৈশিষ্ট্য ও প্রধান কবিগণ]

সংক্ষিপ্ত ও বিশ্লেষণাত্মক প্রশ্নমালা (أجب عن الأسئلة التالية)

ফাযিল ৩য় বর্ষ উচ্চতর আরবি ২য় পত্রের ৪র্থ প্রশ্নে আরবি কাব্যের ইতিহাস, যুগভিত্তিক ধারা ও শীর্ষস্থানীয় কবিদের অমর পংক্তিমালা বিশ্লেষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিচে প্রতিটি প্রশ্নের প্রামাণ্য সমাধান তুলে ধরা হলো:

(ক) بين أغراض الشعر الجاهلى بالأمثلة [জাহেলী কবিতার বিভিন্ন উদ্দেশ্য]

জাহেলী যুগের কবিরা নির্দিষ্ট কিছু মূল উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে কাব্য রচনা করতেন: (১) ফখর ও হামাসা (الفخر والحماسة – আত্মগৌরব ও বীরত্ব): নিজ গোত্রের বীরত্ব ও তলোয়ারের শক্তির বন্দনা (যেমন আমর ইবনে কুলসুমের মুয়াল্লাকা); (২) মাদহ (المدح – প্রশংসা): রাজা-বাদশাহ ও দানশীল ব্যক্তিদের বন্দনা (যেমন যুহাইর বিন আবী সুলমার কাসিদা); (৩) হিজা (الهجاء – ব্যঙ্গ ও নিন্দা): শত্রু গোত্রের কাপুরুষতা ও কৃপণতার তীব্র নিন্দা; (৪) রসা (الرثاء – শোকগাথা): মৃত বীরদের স্মরণে বিলাপ (যেমন কবি আল-খানসার শোককাব্য); (৫) ওয়াসফ (الوصف – প্রকৃতি ও প্রাণীর বর্ণনা): মরুভূমি, উট, ঘোড়া, শিকার ও মেঘ-বৃষ্টির নিপুণ রূপায়ণ; এবং (৬) গজল (الغزل – প্রেমকাব্য): প্রেয়সীর রূপসৌন্দর্য ও বিরহবেদনার চিত্রায়ণ।

(খ) بين موضوعات الشعر فى صدر الإسلام ممثلا [ইসলামের আবির্ভাব যুগের কবিতার বিষয়বস্তু]

ইসলামের আগমনে কবিতার উদ্দেশ্যে বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটে: (১) তাওহিদ ও আখেরাত চেতনা: শিরক বর্জন করে একমাত্র আল্লাহর প্রশংসা ও পরকালের জবাবদিহিতা; (২) ইসলামের প্রতিরক্ষা ও জিহাদের উদ্দীপনা: কাফেরদের ব্যঙ্গের জবাবে কবিতার মাধ্যমে মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ (যেমন হাসসান ও কা’ব বিন মালিকের কবিতা); (৩) রাসূলপ্রেম ও নাত: মহানবী (সা.)-এর পবিত্র চরিত্র ও শাফায়াতের বন্দনা (যেমন কা’ব বিন যুহাইরের বিখ্যাত কাসিদা বুরদাহ—«إِنَّ الرَّسُولَ لَنُورٌ يُسْتَضَاءُ بِهِ»); এবং (৪) নৈতিকতা ও তাকওয়ার শিক্ষা: জাহেলী যুগের অশ্লীলতা, মদ ও জুয়ার বিবরণ সম্পূর্ণ বর্জন।

(গ) تحدث عن محاسن الشعر الأندلسي [আন্দালুসি কবিতার অনুপম সৌন্দর্য]

স্পেনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতির ছায়ায় আন্দালুসি কবিতায় অভূতপূর্ব বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়: (১) অনুপম প্রকৃতি বর্ণনা (شعر الطبيعة): স্পেনের নদী, পাহাড়ি ঝর্ণা, ফুল ও বাগিচার চিত্রায়ণে তারা বিশ্বসাহিত্যে শীর্ষে ছিল; (২) মুওয়াশশাহ ও আজযাল উদ্ভাবন: প্রাচীন কাসিদার বাইরে স্বাধীন স্তবক ও সঙ্গীতের উপযোগী নতুন ধারার সৃষ্টি; (৩) হারানো মাতৃভূমির জন্য বিলাপ (رثاء المدن والممالك): খ্রিস্টানদের আক্রমণে মুসলিম শহর পতনের শোকগাঁথা (যেমন আবু বকর আল-রুন্দীর অমর রসা); এবং (৪) কোমল ও সুরেলা শব্দচয়ন: কর্কশ বেদুইন শব্দের বদলে মার্জিত ও গীতিধর্মী সুরের প্রাধান্য।

(ঘ) من كان أبو العتاهية؟ بين مساهمته فى العصر العباسى [আবু আতাহিয়াহ ও বৈরাগ্যমূলক কবিতা]

আবু ইসহাক ইসমাইল ইবনে কাসিম ‘আবু আল-আতাহিয়াহ’ (Abu al-Atahiya, ১৩০-২১১ হি.) ছিলেন আব্বাসীয় যুগের শীর্ষস্থানীয় কবি। যৌবনে প্রেমকাব্য লিখলেও পরবর্তী জীবনে তিনি সংসারত্যাগী বৈরাগী সাধকে পরিণত হন এবং আরবি সাহিত্যে ‘যুহদিয়াত’ (الزهديات – বৈরাগ্য ও পারলৌকিক কবিতা) ধারার একচ্ছত্র অধিপতি হন। তিনি অত্যন্ত সহজ ও প্রাত্যহিক ভাষায় দুনিয়ার নশ্বরতা, কবরের অন্ধকার, মৃত্যুর অনিবার্যতা এবং আল্লাহর ভয়ের গান শুনিয়ে তৎকালীন আব্বাসীয় সমাজের ভোগবিলাস ও পাপাচারে নিমগ্ন মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছিলেন।

(ঙ) ثلاثة أبيات ذات حكم للمتنبي [আল-মুতানাব্বীর তিনটি প্রজ্ঞাপূর্ণ চরণ]

১. «إِذَا أَنْتَ أَكْرَمْتَ الْكَرِيمَ مَلَكْتَهُ * وَإِنْ أَنْتَ أَكْرَمْتَ اللَّئِيمَ تَمَرَّدَا»
(ভদ্র মানুষকে সম্মান দিলে তুমি তাকে চিরতরে আপন করে নেবে; কিন্তু কোনো নিকৃষ্ট ছোটলোককে অতিরিক্ত সম্মান দিলে সে অহংকারী ও উদ্ধত হয়ে বিদ্রোহ করবে)।

২. «مَنْ يَهُنْ يَسْهُلِ الْهَوَانُ عَلَيْهِ * مَا لِجُرْحٍ بِمَيِّتٍ إِيلَامُ»
(যে ব্যক্তি আত্মসম্মান হারিয়ে অপমান সহ্য করতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, অপমানের যন্ত্রণা তার কাছে সহজ হয়ে পড়ে; কেননা মৃতদেহে আঘাত করলে সে কোনো ব্যথা অনুভব করে না)।

৩. «عَلَى قَدْرِ أَهْلِ الْعَزْمِ تَأْتِي الْعَزَائِمُ * وَتَأْتِي عَلَى قَدْرِ الْكِرَامِ الْمَكَارِمُ»
(উচ্চাকাঙ্ক্ষী মানুষের সংকল্পের পরিমাপ অনুসারেই মহা অর্জনের আগমন ঘটে; আর মহানুভব ব্যক্তিদের মর্যাদা অনুযায়ীই মহত্ত্ব ও আত্মত্যাগের প্রকাশ ঘটে)।

(চ) عناصر ازدهار الشعر العربى الحديث [আধুনিক আরবি কবিতার পুনর্জাগরণের উপাদানসমূহ]

আধুনিক যুগে আরবি কবিতার রেনেসাঁসের পেছনে প্রধান চারটি উপাদান ভূমিকা রাখে: (১) মুদ্রণশিল্প ও প্রাচীন পাণ্ডুলিপির প্রকাশ: প্রাচীন ক্লাসিক্যাল কবিদের দেওয়ান প্রকাশের ফলে তরুণ কবিরা আসল সাহিত্যের সংস্পর্শ পায়; (২) পাশ্চাত্য সাহিত্যের তর্জমা ও রূপান্তর: রোমান্টিকতাবাদ, মুক্তছন্দ ও প্রতীকী ধারার সংযোজন; (৩) জাতীয় মুক্তি আন্দোলন: উপনিবেশবাদবিরোধী বিপ্লব কবিদের মনে দেশপ্রেমের অগ্নি প্রজ্বলিত করে; এবং (৪) প্রেস ও সাময়িকী: খবরের কাগজ ও সাহিত্যের পাতার মাধ্যমে কবিতা সাধারণ মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেয়।

(ছ) ثلاثة أبيات من قصيدة “العلم” لأحمد شوقى [আহমদ শাওকীর ‘আল-ইলম’ কবিতার তিনটি চরণ]

১. «قُمْ لِلْمُعَلِّمِ وَفِّهِ التَّبْجِيلَا * كَادَ الْمُعَلِّمُ أَنْ يَكُونَ رَسُولَا»
(শিক্ষকের প্রতি সম্মান জানাতে উঠে দাঁড়াও এবং তাঁকে পূর্ণ মর্যাদা দাও; নিশ্চয়ই একজন শিক্ষক মর্যাদায় প্রায় নবীদের সমপর্যায়ে পৌঁছে যান!)

২. «أَعَلِمْتَ أَشْرَفَ أَوْ أَجَلَّ مِنَ الَّذِي * يَبْنِي وَيُنْشِئُ أَنْفُسًا وَعُقُولَا؟»
(তুমি কি জগতে এমন কোনো মানুষকে জানো যে তাঁর চেয়ে অধিক সম্মানিত ও মহান, যিনি মানুষের আত্মা ও বিবেককে নির্মাণ ও পরিচর্যা করেন?)

৩. «سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ خَيْرَ مُعَلِّمٍ * عَلَّمْتَ بِالْقَلَمِ الْقُرُونَ الْأُولَى»
(হে মহাপবিত্র আল্লাহ! আপনিই সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক, যিনি কলমের সাহায্যে মানবজাতির প্রথম আদিম প্রজন্মসমূহকে জ্ঞানের আলো দান করেছিলেন)।


৪. সংক্ষিপ্ত ও ঐতিহাসিক প্রশ্নমালা: أجب عن الاسئلة التالية (المتنبي، النقائض، أبو تمام، أبو العتاهية، شاعر النيل)

ভূমিকা ও পরিচিতি

আরবি কাব্যাকাশের অপরাজেয় সম্রাট, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ আরব্য কবি এবং যাঁর কবিতা নিয়ে বিশ্বের পণ্ডিতগণ শতাব্দীর পর শতাব্দী গবেষণা করে যাচ্ছেন, তিনি হলেন কুফায় জন্মগ্রহণকারী মহাকবি আহমদ ইবনে আল-হুসাইন ‘আবু আল-তাইয়্যিব আল-মুতানাব্বী’ (Al-Mutanabbi, ৩০৩-৩৫৪ হি. / ৯১৫-৯৬৫ খ্রি.)। বাল্যকালে তাঁর অস্বাভাবিক মেধা, তেজস্বিতা এবং রাজনৈতিক বিপ্লব প্রচেষ্টার কারণে বিরোধীরা তাঁর ওপর নবুওয়াতের দাবির মিথ্যা অপবাদ দিয়ে তাঁকে ‘মুতানাব্বী’ (নবুওয়াত দাবিদার) আখ্যা দেয়। তিনি আলেপ্পোর হামদানী শাসক সাইফুদ্দৌলা আল-হামদানী-এর রাজদরবারে নয় বছর অবস্থান করে বাইজেন্টাইনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের এক অমর মহাকাব্য রচনা করেন।

মুতানাব্বীর কাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ

  • ১. চরম আত্মমর্যাদা ও অহমিকা (الفخر وعلو الهمة): মুতানাব্বী পৃথিবীর কোনো রাজার সামনে মাথা নত করেননি। সাইফুদ্দৌলার শর্ত ছিল কবিরা দাঁড়িয়ে কবিতা পড়বে, কিন্তু মুতানাব্বী শর্ত দিয়েছিলেন তিনি বসে রাজার পাশে সমমর্যাদায় কবিতা পড়বেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি: «أَنَا الَّذِي نَظَرَ الْأَعْمَى إِلَى أَدَبِي * وَأَسْمَعَتْ كَلِمَاتِي مَنْ بِهِ صَمَمُ» (আমিই সেই কবি, যাঁর কাব্যপ্রতিভা অন্ধও দেখতে পায়, আর বধিরও যাঁর কবিতার সুর উপভোগ করে!)।
  • ২. অতুলনীয় দার্শনিক প্রজ্ঞা (شعر الحكمة): মানবচরিত্রের দুর্বলতা, সময়ের গতিপ্রকৃতি, বীরত্ব এবং জীবনের অমোঘ নিয়তি নিয়ে তিনি যে শত শত হিকমতপূর্ণ শ্লোক রচনা করেছেন, তা আজ আরবি সাহিত্যের প্রবাদে পরিণত হয়েছে।
  • ৩. বীরত্ব ও যুদ্ধের জীবন্ত চিত্রায়ণ (الوصف الحربي): বাইজেন্টাইন সীমান্তে সাইফুদ্দৌলার রক্তক্ষয়ী ক্রুসেডপূর্ব যুদ্ধের নিখুঁত ও রোমাঞ্চকর বিবরণ তাঁর কবিতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
  • ৪. যে কবিতা তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়েছিল: কবি বাগদাদ থেকে কুফা ফেরার পথে ফাতাক আল-আসাদী নামক এক ব্যক্তি তাঁর পথরোধ করে আক্রমণ করে। মুতানাব্বী যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে চলে যেতে চাইলে তাঁর ভৃত্য স্মরণ করিয়ে দেয়: “আপনিই না লিখেছিলেন—«الْخَيْلُ وَاللَّيْلُ وَالْبَيْدَاءُ تَعْرِفُنِي * وَالسَّيْفُ وَالرُّمْحُ وَالْقِرْطَاسُ وَالْقَلَمُ» (রণাশ্ব, অন্ধকার রজনী এবং ধূ-ধূ মরুভূমি আমাকে চেনে; আর চেনে তলোয়ার, বর্শা, কাগজ ও কলম!)—তাহলে আজ কেন পিছপা হচ্ছেন?” এই কথা শুনে আত্মমর্যাদাবান মুতানাব্বী তলোয়ার নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং বীরের মতো যুদ্ধ করে মৃত্যুবরণ করেন।

উপসংহার

সাহিত্যিকগণ বলেন: «مَلَأَ الدُّنْيَا وَشَغَلَ النَّاسَ» (তিনি সমগ্র পৃথিবীকে তাঁর কাব্যের সুর দিয়ে পূর্ণ করেছিলেন এবং মানুষকে তাঁর প্রশংসায় ব্যস্ত রেখেছিলেন)। মুতানাব্বী আরবি কাব্যের এক চিরন্তন বিস্ময়।


৫ (الف). من هم المخضرمون؟ اذكر نبذة من حياة شاعر من الشعراء المخضرمين. [মুখাদরাম কবিদের পরিচয় ও জীবন]

ভূমিকা ও মুখাদরামের সংজ্ঞা

আরবি কাব্যসাহিত্যের কালানুক্রমিক ইতিহাসে একটি বিশেষ ও মর্যাদাপূর্ণ শ্রেণি হলো ‘শুআরায়ে মুখাদরামীন’ (الشعراء المخضرمون – যুগসন্ধিক্ষণের কবিগণ)।

  • আভিধানিক অর্থ: ‘খাদরামা’ (خضرمة) শব্দের অর্থ মিশ্রণ করা বা দুই অর্ধের মাঝখানে অবস্থান করা। কান কেটে অর্ধেক ঝুলিয়ে রাখা উটকে প্রাচীন আরবে ‘মুখাদরাম’ বলা হতো।
  • পারিভাষিক সংজ্ঞা: সাহিত্য পরিভাষায়—“যে সকল কবি তাদের জীবনের এক অংশ ইসলামপূর্ব জাহেলী যুগে কাটিয়েছেন এবং পরবর্তীতে ইসলামের আবির্ভাবের যুগ পেয়ে জীবিত অবস্থায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন, তাঁদের ‘কবি মুখাদরাম’ বলা হয়।”

শীর্ষস্থানীয় তিনজন মুখাদরাম কবির বিশদ পরিচয়

কবির নাম জাহেলী জীবনের বৈশিষ্ট্য ইসলামি জীবনের অবদান ও রূপান্তর
১. হাসসান ইবনে সাবিত (রা.) মদিনার খাজরাজ গোত্র ও গাসসানি রাজদরবারের শীর্ষ কবি ছিলেন। ইসলাম গ্রহণের পর ‘রাসূলের কবি’ উপাধি পান এবং কাফেরদের ব্যঙ্গ কবিতার বিরুদ্ধে কাব্যের জিহাদ পরিচালনা করেন।
২. কা’ব ইবনে যুহাইর (রা.) বিখ্যাত কবি যুহাইর বিন আবী সুলমার পুত্র; শুরুতে ইসলামের বিরুদ্ধে চরম বিদ্বেষমূলক কবিতা লিখতেন। মক্কা বিজয়ের পর অনুতপ্ত হয়ে মদিনায় এসে ঐতিহাসিক ‘বানাত সুয়াদ’ (কাসিদা বুরদাহ) পাঠ করেন এবং রাসূল (সা.) খুশি হয়ে তাঁকে নিজের চাদর (বুরদাহ) উপহার দেন।
৩. লাবীদ ইবনে রাবিয়া (রা.) সপ্ত মুয়াল্লাকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচয়িতা এবং বনু আমিরের প্রধান ছিলেন। ইসলাম গ্রহণের পর পবিত্র কুরআনের অলৌকিকত্বে মুগ্ধ হয়ে আজীবনের জন্য কবিতা ত্যাগ করে একমাত্র কুরআন সাধনায় নিমগ্ন হন।

এছাড়াও অন্যান্য বিশিষ্ট মুখাদরাম কবিগণ

আরবি সাহিত্যের শোকগাঁথার অবিসংবাদিত সম্রাজ্ঞী তুমাযির বিনতে আমর ‘আল-খানসা’ (الخنساء) ছিলেন অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুখাদরাম নারী কবি। জাহেলী যুগে ভাই সাখরের মৃত্যুতে পাগলিনী হয়ে বিলাপকারী সেই খানসাই ইসলাম গ্রহণের পর কাদিসিয়ার ঐতিহাসিক যুদ্ধে নিজের চার পুত্রকে আল্লাহর রাহে শাহাদাতের জন্য হাসিমুখে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন এবং তাঁদের শাহাদাতের সংবাদ শুনে আল্লাহর দরবারে শোকরিয়া আদায় করেছিলেন।

উপসংহার

মুখাদরাম কবিদের মাধ্যমেই আরবি কবিতা জাহেলিয়াতের অন্ধকার থেকে ইসলামের নূর ও নৈতিকতার আলোকোজ্জ্বল মহাসমুদ্রে প্রবেশ করেছিল।


৫ (ب). نبذة من حياة الخليفة على بن ابى طالب (رض) ثم قدره شاعرا وخطيبا. [হযরত আলী (রা)-এর সাহিত্যিক মহত্ত্ব]

ভূমিকা ও পটভূমি

আমিরুল মুমিনীন হযরত আলী ইবনে আবী طالب (রা.) (মৃ. ৪০ হি.) ইসলামের ইতিহাসের কেবল অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেনাপতি, দূরদর্শী খলিফা ও শ্রেষ্ঠ বাগ্মীই ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন আরব্য হিকমত ও নৈতিক কবিতার এক অনন্য বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী। তাঁর রচিত কবিতাসমূহ ‘দেওয়ানে আলী’ (ديوان الإمام علي) নামে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত ও পঠিত হয়ে থাকে।

হযরত আলী (রা)-এর কবিতার মূল সুর ও সাহিত্যিক মহত্ত্ব

  • ১. গভীর আধ্যাত্মিক প্রজ্ঞা ও হিকমত (شعر الحكمة والموعظة): তাঁর কবিতার মূল ভিত্তি ছিল আল্লাহর ভয়, তাওহিদ, দুনিয়ার নশ্বরতা এবং আখিরাতের অনন্ত জীবনের প্রস্তুতি। তিনি মানুষের লোভ ও অহংকারকে পদদলিত করে আত্মিক প্রশান্তি ও অল্পেতুষ্টির অমিয় বাণী শুনিয়েছেন। যেমন তিনি বলেন:

    «رَضِينَا قِسْمَةَ الْجَبَّارِ فِينَا * لَنَا عِلْمٌ وَلِلْجُهَّالِ مَالُ
    فَإِنَّ الْمَالَ يَفْنَى عَنْ قَرِيبٍ * وَإِنَّ الْعِلْمَ بَاقٍ لَا يَزَالُ»

    (আমরা আমাদের ব্যাপারে মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর বণ্টনে পরম সন্তুষ্ট; তিনি আমাদের জ্ঞান দান করেছেন আর অজ্ঞদের সম্পদ দিয়েছেন। কেননা পার্থিব ধন-সম্পদ দ্রুতই নিঃশেষ হয়ে যায়, আর জ্ঞানের আলো চিরকাল অবিনাশী হয়ে থাকে!)

  • ২. জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব ও আলেমদের মর্যাদা: তিনি জ্ঞানের মর্যাদাকে পৃথিবীর সমস্ত স্বর্ণ-সম্পদের ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছেন। তাঁর বিখ্যাত পংক্তি: «مَا الْفَضْلُ إِلَّا لِأَهْلِ الْعِلْمِ إِنَّهُمْ * عَلَى الْهُدَى لِمَنِ اسْتَهْدَى أَدِلَّاءُ» (জ্ঞানী সম্প্রদায় ব্যতীত জগতে কারো কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; পথহারা মানুষের জন্য সঠিক পথের দিশারী তো একমাত্র তারাই)।
  • ৩. রণক্ষেত্রের বীরত্বগাথা ও তেজস্বিতা: খায়বার ও সিফফিনের যুদ্ধে তিনি যখন তলোয়ার হাতে রণহুঙ্কার দিয়ে কবিতা আবৃত্তি করতেন, তখন শত্রুপক্ষের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠত। যেমন তিনি বলেছিলেন: «أَنَا الَّذِي سَمَّتْنِي أُمِّي حَيْدَرَهْ * كَلَيْثِ غَابَاتٍ كَرِيهِ الْمَنْظَرَهْ» (আমিই সেই বীর, যার মা জন্মের দিন নাম রেখেছিলেন হায়দার—বনের হিংস্র বাঘের মতো যার ভয়াল রূপ!)।
  • ৪. ভাষার প্রাঞ্জলতা ও আলঙ্কারিক নিপুণতা: তাঁর কবিতায় জটিল কোনো কৃত্রিম ছন্দ ছিল না; বরং অত্যন্ত সাবলীল, প্রাঞ্জল ও গতিশীল ভাষায় পরম সত্য ব্যক্ত হয়েছে।

উপসংহার

হযরত আলী (রা.)-এর কবিতা কোনো কল্পনাবিলাসী রোমান্টিকতা ছিল না; তা ছিল একটি পরিপূর্ণ নৈতিক চরিত্র গঠন ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের শাশ্বত গাইডলাইন।


৫ (ج). الخدمات الادبية للشاعر ابن هانئ الأندلسى بالاختصار. [আন্দালুসের মুতানাব্বী ইবনে হানি]

ভূমিকা ও পরিচিতি

আন্দালুসের (মুসলিম স্পেন) অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিপ্লবী ও শক্তিশালী কবি হলেন সেভিলে (ইশবিলিয়াহ) জন্মগ্রহণকারী মনীষী মুহাম্মদ ইবনে হানি আল-আন্দালুসী (Ibn Hani al-Andalusi, ৩২০-৩৬২ হি. / ৯৩৩-৯৭৩ খ্রি.)। প্রাচ্যের কবি মুতানাব্বীর মতো তাঁর কবিতায় প্রচণ্ড তেজস্বিতা, আত্মমর্যাদা ও দর্শন ফুটে উঠেছিল বলেই সমগ্র আরব বিশ্ব তাঁকে পরম শ্রদ্ধার সাথে ‘মুতানাব্বিয়ুল গারব’ (مُتَنَبِّي الْغَرْبِ – পাশ্চাত্যের মুতানাব্বী) উপাধিতে ভূষিত করেছে।

সাহিত্যকর্ম ও ফাতেমীয় খলিফা আল-মুইয্যের সাথে সম্পর্ক

  • ১. স্পেনের নিপীড়ন ও উত্তর আফ্রিকায় হিজরত: তাঁর স্বাধীনচেতা দর্শন ও শিয়া মতাদর্শের প্রতি সহানুভূতির কারণে উমাইয়া শাসকরা তাঁকে স্পেন থেকে নির্বাসিত করে। তিনি উত্তর আফ্রিকায় গিয়ে ফাতেমীয় খলিফা আল-মুইয্য লিদীনিল্লাহ-এর সাথে যুক্ত হন।
  • ২. মিসর বিজয় ও কায়রো প্রতিষ্ঠার কাব্যিক মহাকাব্য: সেনাপতি জওহর আস-সিকিল্লীর নেতৃত্বে ফাতেমীয়রা যখন মিসর জয় করে নতুন রাজধানী ‘কায়রো’ (আল-কাহিরাহ) এবং ‘আল-আজহার’ মসজিদ প্রতিষ্ঠা করে, তখন ইবনে হানি খলিফার বিজয়ের উদ্দেশ্যে এমন আকাশচুম্বী প্রশংসামূলক ও ওজস্বী কাসিদা রচনা করেন যা সমকালে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
  • ৩. কাব্যশৈলীর অনন্য বৈশিষ্ট্য: তাঁর ভাষায় ছিল মরুভূমির ক্লাসিক্যাল তেজ এবং স্পেনের প্রকৃতির রূপময় মেলবন্ধন। উপমা ও রূপকের গভীরতায় তিনি তৎকালীন আন্দালুসি কবিদের বহু যোজন পেছনে ফেলে দিয়েছিলেন।

রহস্যজনক মৃত্যু

মাত্র ৪২ বছর বয়সে মিসর যাওয়ার পথে লিবিয়ার বারকা নামক স্থানে তাঁকে অত্যন্ত রহস্যজনকভাবে হত্যা করা হয়। খলিফা আল-মুইয্য তাঁর মৃত্যুর সংবাদ শুনে চরম শোকাহত হয়ে বলেছিলেন: “আমরা এই মানুষটিকে দিয়ে প্রাচ্যের কবিদের ওপর গৌরব করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু নিয়তি আমাদের সেই স্বপ্ন কেড়ে নিল!”

ইবনে হানির কাব্যের আলঙ্কারিক ও বৈপ্লবিক মূল্যায়ন

আন্দালুসি কাব্যের ইতিহাসে ইবনে হানি ছিলেন এক অনন্য ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব। স্পেনের অন্যান্য কবিরা যেখানে ফুল, পাখি, বাগান ও মৃদু প্রেমের সংগীতে নিমগ্ন ছিলেন, ইবনে হানি সেখানে যুদ্ধ, নৌবহর, তলোয়ারের ঝংকার এবং রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার বজ্রকণ্ঠ তুলে ধরেছিলেন। তাঁর কাসিদাগুলোতে ব্যবহৃত ছন্দ ও অন্ত্যমিল ছিল অত্যন্ত গম্ভীর ও ওজস্বী। তিনি ফাতেমীয় নৌবাহিনীর শক্তি এবং ভূমধ্যসাগরে বাইজেন্টাইন নৌবহরের বিরুদ্ধে বিজয়ের যে জীবন্ত সামরিক চিত্র এঁকেছেন, তা তৎকালীন রণকৌশল ও ইতিহাসের এক অনন্য প্রামাণ্য দলিল হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁর এই বৈপ্লবিক সুরই তাঁকে আন্দালুসের শ্রেষ্ঠ কবির মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে।

উপসংহার

ইবনে হানি প্রমাণ করেছিলেন যে আন্দালুসের মাটি কেবল মৃদু প্রেমের মুওয়াশশাহই জন্ম দেয় না, বরং তা মুতানাব্বীর সমকক্ষ বীরত্বগাথার গর্জনও তুলতে সক্ষম।


৫ (د). خصائص الشعر العربى فى العصر الجاهلى. [জাহেলী কবিতার রূপতত্ত্ব ও মূল উদ্দেশ্যসমূহ]

সংক্ষিপ্ত ও বিশ্লেষণাত্মক প্রশ্নমালা (أجب عن الأسئلة التالية)

ফাযিল ৩য় বর্ষ উচ্চতর আরবি ২য় পত্রের ৪র্থ প্রশ্নে আরবি কাব্যের ইতিহাস, যুগভিত্তিক ধারা ও শীর্ষস্থানীয় কবিদের অমর পংক্তিমালা বিশ্লেষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিচে প্রতিটি প্রশ্নের প্রামাণ্য সমাধান তুলে ধরা হলো:

(ক) بين أغراض الشعر الجاهلى بالأمثلة [জাহেলী কবিতার বিভিন্ন উদ্দেশ্য]

জাহেলী যুগের কবিরা নির্দিষ্ট কিছু মূল উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে কাব্য রচনা করতেন: (১) ফখর ও হামাসা (الفخر والحماسة – আত্মগৌরব ও বীরত্ব): নিজ গোত্রের বীরত্ব ও তলোয়ারের শক্তির বন্দনা (যেমন আমর ইবনে কুলসুমের মুয়াল্লাকা); (২) মাদহ (المدح – প্রশংসা): রাজা-বাদশাহ ও দানশীল ব্যক্তিদের বন্দনা (যেমন যুহাইর বিন আবী সুলমার কাসিদা); (৩) হিজা (الهجاء – ব্যঙ্গ ও নিন্দা): শত্রু গোত্রের কাপুরুষতা ও কৃপণতার তীব্র নিন্দা; (৪) রসা (الرثاء – শোকগাথা): মৃত বীরদের স্মরণে বিলাপ (যেমন কবি আল-খানসার শোককাব্য); (৫) ওয়াসফ (الوصف – প্রকৃতি ও প্রাণীর বর্ণনা): মরুভূমি, উট, ঘোড়া, শিকার ও মেঘ-বৃষ্টির নিপুণ রূপায়ণ; এবং (৬) গজল (الغزل – প্রেমকাব্য): প্রেয়সীর রূপসৌন্দর্য ও বিরহবেদনার চিত্রায়ণ।

(খ) بين موضوعات الشعر فى صدر الإسلام ممثلا [ইসলামের আবির্ভাব যুগের কবিতার বিষয়বস্তু]

ইসলামের আগমনে কবিতার উদ্দেশ্যে বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটে: (১) তাওহিদ ও আখেরাত চেতনা: শিরক বর্জন করে একমাত্র আল্লাহর প্রশংসা ও পরকালের জবাবদিহিতা; (২) ইসলামের প্রতিরক্ষা ও জিহাদের উদ্দীপনা: কাফেরদের ব্যঙ্গের জবাবে কবিতার মাধ্যমে মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ (যেমন হাসসান ও কা’ব বিন মালিকের কবিতা); (৩) রাসূলপ্রেম ও নাত: মহানবী (সা.)-এর পবিত্র চরিত্র ও শাফায়াতের বন্দনা (যেমন কা’ব বিন যুহাইরের বিখ্যাত কাসিদা বুরদাহ—«إِنَّ الرَّسُولَ لَنُورٌ يُسْتَضَاءُ بِهِ»); এবং (৪) নৈতিকতা ও তাকওয়ার শিক্ষা: জাহেলী যুগের অশ্লীলতা, মদ ও জুয়ার বিবরণ সম্পূর্ণ বর্জন।

(গ) تحدث عن محاسن الشعر الأندلسي [আন্দালুসি কবিতার অনুপম সৌন্দর্য]

স্পেনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতির ছায়ায় আন্দালুসি কবিতায় অভূতপূর্ব বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়: (১) অনুপম প্রকৃতি বর্ণনা (شعر الطبيعة): স্পেনের নদী, পাহাড়ি ঝর্ণা, ফুল ও বাগিচার চিত্রায়ণে তারা বিশ্বসাহিত্যে শীর্ষে ছিল; (২) মুওয়াশশাহ ও আজযাল উদ্ভাবন: প্রাচীন কাসিদার বাইরে স্বাধীন স্তবক ও সঙ্গীতের উপযোগী নতুন ধারার সৃষ্টি; (৩) হারানো মাতৃভূমির জন্য বিলাপ (رثاء المدن والممالك): খ্রিস্টানদের আক্রমণে মুসলিম শহর পতনের শোকগাঁথা (যেমন আবু বকর আল-রুন্দীর অমর রসা); এবং (৪) কোমল ও সুরেলা শব্দচয়ন: কর্কশ বেদুইন শব্দের বদলে মার্জিত ও গীতিধর্মী সুরের প্রাধান্য।

(ঘ) من كان أبو العتاهية؟ بين مساهمته فى العصر العباسى [আবু আতাহিয়াহ ও বৈরাগ্যমূলক কবিতা]

আবু ইসহাক ইসমাইল ইবনে কাসিম ‘আবু আল-আতাহিয়াহ’ (Abu al-Atahiya, ১৩০-২১১ হি.) ছিলেন আব্বাসীয় যুগের শীর্ষস্থানীয় কবি। যৌবনে প্রেমকাব্য লিখলেও পরবর্তী জীবনে তিনি সংসারত্যাগী বৈরাগী সাধকে পরিণত হন এবং আরবি সাহিত্যে ‘যুহদিয়াত’ (الزهديات – বৈরাগ্য ও পারলৌকিক কবিতা) ধারার একচ্ছত্র অধিপতি হন। তিনি অত্যন্ত সহজ ও প্রাত্যহিক ভাষায় দুনিয়ার নশ্বরতা, কবরের অন্ধকার, মৃত্যুর অনিবার্যতা এবং আল্লাহর ভয়ের গান শুনিয়ে তৎকালীন আব্বাসীয় সমাজের ভোগবিলাস ও পাপাচারে নিমগ্ন মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছিলেন।

(ঙ) ثلاثة أبيات ذات حكم للمتنبي [আল-মুতানাব্বীর তিনটি প্রজ্ঞাপূর্ণ চরণ]

১. «إِذَا أَنْتَ أَكْرَمْتَ الْكَرِيمَ مَلَكْتَهُ * وَإِنْ أَنْتَ أَكْرَمْتَ اللَّئِيمَ تَمَرَّدَا»
(ভদ্র মানুষকে সম্মান দিলে তুমি তাকে চিরতরে আপন করে নেবে; কিন্তু কোনো নিকৃষ্ট ছোটলোককে অতিরিক্ত সম্মান দিলে সে অহংকারী ও উদ্ধত হয়ে বিদ্রোহ করবে)।

২. «مَنْ يَهُنْ يَسْهُلِ الْهَوَانُ عَلَيْهِ * مَا لِجُرْحٍ بِمَيِّتٍ إِيلَامُ»
(যে ব্যক্তি আত্মসম্মান হারিয়ে অপমান সহ্য করতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, অপমানের যন্ত্রণা তার কাছে সহজ হয়ে পড়ে; কেননা মৃতদেহে আঘাত করলে সে কোনো ব্যথা অনুভব করে না)।

৩. «عَلَى قَدْرِ أَهْلِ الْعَزْمِ تَأْتِي الْعَزَائِمُ * وَتَأْتِي عَلَى قَدْرِ الْكِرَامِ الْمَكَارِمُ»
(উচ্চাকাঙ্ক্ষী মানুষের সংকল্পের পরিমাপ অনুসারেই মহা অর্জনের আগমন ঘটে; আর মহানুভব ব্যক্তিদের মর্যাদা অনুযায়ীই মহত্ত্ব ও আত্মত্যাগের প্রকাশ ঘটে)।

(চ) عناصر ازدهار الشعر العربى الحديث [আধুনিক আরবি কবিতার পুনর্জাগরণের উপাদানসমূহ]

আধুনিক যুগে আরবি কবিতার রেনেসাঁসের পেছনে প্রধান চারটি উপাদান ভূমিকা রাখে: (১) মুদ্রণশিল্প ও প্রাচীন পাণ্ডুলিপির প্রকাশ: প্রাচীন ক্লাসিক্যাল কবিদের দেওয়ান প্রকাশের ফলে তরুণ কবিরা আসল সাহিত্যের সংস্পর্শ পায়; (২) পাশ্চাত্য সাহিত্যের তর্জমা ও রূপান্তর: রোমান্টিকতাবাদ, মুক্তছন্দ ও প্রতীকী ধারার সংযোজন; (৩) জাতীয় মুক্তি আন্দোলন: উপনিবেশবাদবিরোধী বিপ্লব কবিদের মনে দেশপ্রেমের অগ্নি প্রজ্বলিত করে; এবং (৪) প্রেস ও সাময়িকী: খবরের কাগজ ও সাহিত্যের পাতার মাধ্যমে কবিতা সাধারণ মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেয়।

(ছ) ثلاثة أبيات من قصيدة “العلم” لأحمد شوقى [আহমদ শাওকীর ‘আল-ইলম’ কবিতার তিনটি চরণ]

১. «قُمْ لِلْمُعَلِّمِ وَفِّهِ التَّبْجِيلَا * كَادَ الْمُعَلِّمُ أَنْ يَكُونَ رَسُولَا»
(শিক্ষকের প্রতি সম্মান জানাতে উঠে দাঁড়াও এবং তাঁকে পূর্ণ মর্যাদা দাও; নিশ্চয়ই একজন শিক্ষক মর্যাদায় প্রায় নবীদের সমপর্যায়ে পৌঁছে যান!)

২. «أَعَلِمْتَ أَشْرَفَ أَوْ أَجَلَّ مِنَ الَّذِي * يَبْنِي وَيُنْشِئُ أَنْفُسًا وَعُقُولَا؟»
(তুমি কি জগতে এমন কোনো মানুষকে জানো যে তাঁর চেয়ে অধিক সম্মানিত ও মহান, যিনি মানুষের আত্মা ও বিবেককে নির্মাণ ও পরিচর্যা করেন?)

৩. «سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ خَيْرَ مُعَلِّمٍ * عَلَّمْتَ بِالْقَلَمِ الْقُرُونَ الْأُولَى»
(হে মহাপবিত্র আল্লাহ! আপনিই সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক, যিনি কলমের সাহায্যে মানবজাতির প্রথম আদিম প্রজন্মসমূহকে জ্ঞানের আলো দান করেছিলেন)।


সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

আমীরুশ শুআরা আহমদ শাওকীর শ্রেষ্ঠ অবদান কোনটি?

আধুনিক আরবি কবিতার পুনরুজ্জীবন এবং আরবি সাহিত্যের প্রথম সফল কাব্যনাট্য রচনা।

আন্দালুসি কবিতার ৫ জন বিখ্যাত কবি কারা?

ইবনে হাযম, ইবনে যাইদুন, ইবনে হানি, ইবনে আব্দে রাব্বিহী এবং লিসানুদ্দীন ইবনুল খতিব।

আল-মুতানাব্বীর কোন চরণটি তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়েছিল?

ঘোড়া, রজনী ও মরুভূমি আমাকে চেনে; চেনে তলোয়ার, বর্শা, কাগজ ও কলম।

হাসসান বিন সাবিত (রা) কোন যুদ্ধে রাসূল (সা)-এর প্রতিরক্ষায় বীরোচিত কবিতা লেখেন?

বদর, ওহুদ ও খন্দকের যুদ্ধে।

আবু তাম্মামের আসল নাম কী?

হাবীব ইবনে আওস আত-তাঈ।

জাহেলী কবিতার প্রধান রূপ কোনটি ছিল?

দ্বিপদী কাসিদা কাঠামো (আল-কাসিদাহ)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *