ফাযিল (স্নাতক) পাস ৩য় বর্ষ পরীক্ষা – ২০২১
বিষয়: আদ-দাওয়া আল-ইসলামিয়্যাহ (ঐচ্ছিক) ২য় পত্র (বিষয় কোড: ৪২৯)
[ইসলামী দাওয়াহর ইতিহাস / তারিখুদ দাওয়াহ]
সময়: ৩ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ১০০
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ফাযিল (স্নাতক) পাস ৩য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২১-এর আদ-দাওয়া আল-ইসলামিয়্যাহ ২য় পত্র (বিষয় কোড: ৪২৯) পরীক্ষার মূল প্রশ্নপত্রের প্রতিটি প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ ও প্রামাণ্য অ্যাকাডেমিক সমাধান নিচে দেওয়া হলো। ফাযিল ডিগ্রি ও অনার্স শ্রেণির ২০ নম্বরের রচনামূলক প্রশ্নের উচ্চমান বজায় রেখে ভূমিকা, ঐতিহাসিক পটভূমি, কুরআন ও সুন্নাহর দলিল, বিশ্লেষণী পয়েন্ট এবং উপসংহার সহযোগে প্রতিটি উত্তর প্রস্তুত করা হয়েছে।
কন্টেন্ট তালিকা / প্রশ্নসূচি
- اكتب نشأة الدعوة الإسلامية وتطورها مفصلا. [ইসলামি দা’ওয়াহর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ বিস্তারিতভাবে লেখ।]
- تحدث عن منهج الأنبياء والمرسلين فى الدعوة إلى الله تعالى موضحا. [আল্লাহর প্রতি দা’ওয়াত প্রদানের ক্ষেত্রে নবি-রাসুলগণের পদ্ধতি বিস্তারিতভাবে আলোচনা কর।]
- تحدث عن مميزات دعوة محمد صلى الله عليه وسلم فى المدينة المنورة. [মদিনায় মহানবি হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর দা’ওয়াতের বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা কর।]
- اكتب نبذة عن حياة أبي بكر الصديق رضى الله عنه مع ذكر خطواته المتخذة حماية للإسلام والمسلمين. [ইসলাম ও মুসলমানদের রক্ষায় আবু বকর (রা) এর গৃহীত পদক্ষেপসমূহ আলোচনা পূর্বক তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনী লেখ।]
- تحدث عن انتشار الدعوة الإسلامية فى العهد الأموى موجزا. [উমাইয়া যুগে ইসলামি দাওয়াহর প্রসার সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা কর।]
- بين صور الدعوة الإسلامية فى عهد الخلافة العثمانية. [উসমানি খেলাফত আমলে ইসলামি দাওয়াহর বিভিন্ন চিত্র বর্ণনা কর।]
- تحدث عن المؤهلات اللازمة للداعى مفصلا. [একজন দা’ঈর প্রয়োজনীয় যোগ্যতা সম্পর্কে সবিস্তারে আলোচনা কর।]
- علق على اثنين من التالية: الإسلام فى بنغلاديش, النشاطات الدعوية فى عهد هارون الرشيد, صبر موسى عليه السلام فى الدعوة إلى الله, سليمان عليه السلام النبى الملك. [টীকা: বাংলাদেশে ইসলাম, হারুনুর রশীদের আমলে দাওয়াত, মূসা (আ.)-এর ধৈর্য, বাদশাহ নবী সোলায়মান (আ.)]
প্রশ্নোত্তর ও পূর্ণাঙ্গ সমাধান
১. اكتب نشأة الدعوة الإسلامية وتطورها مفصلا. [ইসলামি দা’ওয়াহর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ বিস্তারিতভাবে লেখ।]
ভূমিকা:
ইসলামি দাওয়াত কোনো আকস্মিক বিপ্লব ছিল না; বরং তা ছিল আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে ধাপে ধাপে সুবিন্যস্ত এক ঐতিহাসিক মহাবিপ্লব। মক্কার চরম বৈরি পরিবেশ থেকে শুরু করে মদিনার ইসলামি রাষ্ট্র কায়েম পর্যন্ত দাওয়াহর প্রতিটি পর্যায় ছিল বিজ্ঞানসম্মত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ কৌশল দ্বারা পরিচালিত।
১. দাওয়াহর সংজ্ঞা ও মূল চেতনা:
আল্লাহর একত্ববাদ ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রদর্শিত জীবনবিধানের দিকে মানুষকে আহ্বান জানানোর নামই দাওয়াত। এই দাওয়াহর মূল ভিত্তি ছিল তিনটি বিষয়: তাওহীদ প্রতিষ্ঠা, শিরক নির্মূল এবং উত্তম চরিত্রের বিকাশ।
২. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দাওয়াতি জীবনের মৌলিক পর্যায়সমূহ (مراحل الدعوة الإسلامية):
- ১. প্রথম পর্যায়: গোপন দাওয়াত (الدعوة السرية – প্রথম ৩ বছর):
হেরা গুহায় প্রথম অহী লাভের পর সূরা আল-মুদ্দাসসিরের নির্দেশ পেয়ে নবীজী (সা.) তাঁর নিকটতম ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের গোপনে দাওয়াত দেন। এ পর্যায়ে হযরত খাদিজা, আবু বকর, আলী ও যায়েদ বিন হারেসা (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। দারুল আরক্বাম ছিল এ যুগের মূল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। - ২. দ্বিতীয় পর্যায়: নিকটাত্মীয়দের মাঝে প্রকাশ্য দাওয়াত (دعوة العشيرة والأقربين):
আল্লাহর নির্দেশ নাজিল হলো: وَأَنذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ – “আপনি আপনার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করুন।” (সূরা আশ-শুআরা: ২১৪)। নবীজী সাফা পাহাড়ে আরোহণ করে কুরাইশদের এক আল্লাহর প্রতি ঈমানের আহ্বান জানান, যেখানে আবু লাহাব প্রকাশ্যে চরম শত্রুতা শুরু করে। - ৩. তৃতীয় পর্যায়: মক্কায় সর্বজনীন প্রকাশ্য দাওয়াত ও প্রতিরোধ (الدعوة الجهرية العامة):
আল্লাহর নির্দেশ আসল: فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ وَأَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِينَ – “আপনাকে যে আদেশ দেওয়া হয়েছে তা প্রকাশ্যে ঘোষণা করুন।” (সূরা আল-হিজর: ৯৪)। কুরাইশরা সাহাবীদের ওপর চরম নির্যাতন চালায়, শিআবে আবি তালিবে ৩ বছর বয়কট করে এবং সাহাবীদের আবিসিনিয়ায় হিজরত করতে হয়। - ৪. চতুর্থ পর্যায়: মক্কার বাইরে হজের মৌসুমে গোত্রভিত্তিক দাওয়াত:
তায়েফে রক্তঝরা দাওয়াতি সফর এবং হজের মৌসুমে আগত বিভিন্ন বহিরাগত গোত্রের সাথে যোগাযোগ। অবশেষে মদিনার খাজরাজ ও আওস গোত্রের সাথে ঐতিহাসিক আক্বাবার প্রথম ও দ্বিতীয় বাইয়াত সম্পাদিত হয়। - ৫. পঞ্চম পর্যায়: হিজরত ও মদিনায় দাওয়াহর রাষ্ট্রীয় রূপ (المرحلة المدنية):
মদিনায় হিজরতের পর মসজিদে নববী নির্মাণ, আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন, মদিনা সনদ স্বাক্ষর এবং ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। এ পর্যায়ে প্রতিরক্ষামূলক জিহাদ এবং বিশ্বের সম্রাটদের (রোম, পারস্য, মিশর) কাছে দূত মারফত দাওয়াতি পত্র প্রেরণ করে দাওয়াতকে বিশ্বজনীন রূপ দেওয়া হয়।
উপসংহার:
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর এই পর্যায়ক্রমিক দাওয়াতি কৌশল বর্তমান যুগের দাঈদের জন্য অনুপম আদর্শ। পরিস্থিতি ও পরিবেশ বুঝে ধারাবাহিক পরিকল্পনা প্রণয়নই দাওয়াহর সফলতার মূল চাবিকাঠি।
২. تحدث عن منهج الأنبياء والمرسلين فى الدعوة إلى الله تعالى موضحا. [আল্লাহর প্রতি দা’ওয়াত প্রদানের ক্ষেত্রে নবি-রাসুলগণের পদ্ধতি বিস্তারিতভাবে আলোচনা কর।]
ভূমিকা:
হযরত ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) হলেন ‘আবুল আম্বিয়া’ বা নবীদের পিতা এবং তাওহীদের মহান রূপকার। তাঁর গোটা জীবনটাই ছিল শিরক, মূর্তিপূজা এবং নমরূদের অহংকারী শাসনের বিরুদ্ধে এক আপসহীন দাওয়াতি মহাকাব্য। অত্যন্ত শান্ত, যুক্তিনির্ভর ও প্রজ্ঞাপূর্ণ উপায়ে তিনি তাঁর কওম, পিতা এবং সম্রাটের সামনে তাওহীদের সত্যতা প্রমাণ করেছিলেন।
১. হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর দাওয়াতি কৌশল ও বিভিন্ন ক্ষেত্র:
- ১. পিতার সাথে স্নেহশীল দাওয়াতি সংলাপ:
তাঁর পিতা আযর ছিল রাজকীয় মূর্তির কারিগর। ইব্রাহিম (আ.) অত্যন্ত আদবের সাথে বললেন: يَا أَبَتِ لِمَ تَعْبُدُ مَا لَا يَسْمَعُ وَلَا يُبْصِرُ وَلَا يُغْنِي عَنكَ شَيْئًا – “হে আমার পিতা! আপনি কেন এমন বস্তুর পূজা করেন যা শোনে না, দেখে না এবং আপনার কোনো উপকারে আসে না?” (সূরা মারিয়াম: ৪২)। পিতা তাঁকে পাথর মেরে হত্যার হুমকি দিলেও তিনি বললেন: “আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক, আমি আমার রবের নিকট আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব।” - ২. কওমের সামনে যুক্তি দিয়ে মূর্তিপূজার অসারতা প্রমাণ:
কওমের লোকেরা যখন মেলায় চলে গেল, তখন তিনি মন্দিরে ঢুকে প্রধান মূর্তিটি ছাড়া বাকি সব মূর্তি ভেঙে ফেললেন। লোকেরা তাঁকে ডেকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বুদ্ধিমত্তার সাথে বললেন: “বরং এদের এই বড় মূর্তিটিই হয়তো একাজ করেছে, তাকেই জিজ্ঞেস কর যদি সে কথা বলতে পারে!” কাফিররা লজ্জিত হয়ে মাথা নিচু করে বলল: “তুমি তো জান এরা কথা বলে না।” তখন তিনি বললেন: “তবে কি তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুর পূজা কর যা তোমাদের উপকারও করতে পারে না, ক্ষতিও করতে পারে না?” - ৩. নক্ষত্রপূজারীদের সাথে যুক্তিভিত্তিক দাওয়াত:
তিনি নক্ষত্র, চাঁদ ও সূর্যকে দেখে কওমকে দেখালেন যে, এগুলো উদিত হয় এবং অস্ত যায়। তিনি ঘোষণা করলেন: لَا أُحِبُّ الْآفِلِينَ – “যা অস্ত যায় আমি তা পছন্দ করি না।” অবশেষে বললেন: إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ حَنِيفًا – “নিশ্চয় আমি একনিষ্ঠ হয়ে নিজের মুখ সেই সত্তার দিকে ফেরালাম যিনি আকাশমণ্ডল ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা আল-আন’আম: ৭৯)। - ৪. নমরূদের দরবারে অকাট্য যুক্তির জয়:
নমরূদ দাবি করল সে-ও জীবন ও মৃত্যু দেয়। ইব্রাহিম (আ.) বললেন: “নিশ্চয় আল্লাহ পূর্ব দিক থেকে সূর্য উদিত করেন, তুমি পারলে পশ্চিম দিক থেকে উদিত করে দেখাও!” এতে কাফির সম্রাট হতভম্ব হয়ে নিশ্চুপ হয়ে গেল।
উপসংহার:
হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর দাওয়াত আমাদের শেখায় যে, চরম প্রতিকূল পরিবেশেও সত্যের দাঈকে হতে হবে যুক্তিবাদী, পরম ধৈর্যশীল এবং একমাত্র আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থাশীল।
৩. تحدث عن مميزات دعوة محمد صلى الله عليه وسلم فى المدينة المنورة. [মদিনায় মহানবি হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর দা’ওয়াতের বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা কর।]
ভূমিকা:
মদিনা মুনাওয়ারায় ইসলামি দাওয়াহর সূচনা ও বিস্তার ছিল ইসলামি ইতিহাসের সবচেয়ে যুগান্তকারী মোড় পরিবর্তন। মক্কার দীর্ঘ ১৩ বছরের চরম নির্যাতন ও অবরোধের পর মদিনা নগরী বিশ্ববাসীর জন্য তাওহীদের সুশীতল কেন্দ্র এবং প্রথম ইসলামি রাষ্ট্রের রাজধানীতে রূপান্তরিত হয়েছিল।
১. মদিনায় দাওয়াহর শুভ সূচনা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
মদিনার পূর্ব নাম ছিল ‘ইয়াসরিব’। সেখানে পৌত্তলিক আরবদের দুটি প্রধান গোত্র—আওস ও খাজরাজ বসবাস করত। দীর্ঘদিনের বুআস যুদ্ধের কারণে তারা চরম ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে ক্ষতবিক্ষত ছিল এবং একজন যোগ্য নেতৃত্বের সন্ধান করছিল। তদুপরি মদিনার ইহুদিদের মুখে তারা একজন শেষ নবীর আগমনের বার্তা শুনত।
২. আক্বাবার ঐতিহাসিক বাইয়াতসমূহ:
১. প্রাথমিক যোগাযোগ (নবুওয়তের ১১শ বর্ষ): হজের মৌসুমে আক্বাবা নামক স্থানে খাজরাজ গোত্রের ৬ জন যুবকের সাথে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মোলাকাত হয়। তাঁরা রাসূলের মুখে পবিত্র কুরআনের তিলাওয়াত শুনে সাথে সাথে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মদিনায় ফিরে গিয়ে ইসলামের দাওয়াত প্রচার শুরু করেন।
২. আক্বাবার প্রথম বাইয়াত (১২শ বর্ষ): মদিনা থেকে ১২ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি এসে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাতে আনুগত্যের শপথ নেন।
৩. প্রথম ইসলামি রাষ্ট্রদূত প্রেরণ: রাসূলুল্লাহ (সা.) তরুণ সাহাবী হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের (রা.)-কে মদিনায় শিক্ষক হিসেবে পাঠান। মুসআবের প্রজ্ঞাপূর্ণ দাওয়াতে মদিনার অন্যতম প্রভাবশালী নেতা সাআদ ইবনে মুআজ ও উসাইদ ইবনে হুজাইর ইসলাম গ্রহণ করেন, যার ফলে মদিনার প্রায় প্রতিটি ঘরে ঘরে ইসলামের আলো পৌঁছে যায়।
৪. আক্বাবার দ্বিতীয় বাইয়াত (১৩শ বর্ষ): মদিনা থেকে ৭৩ জন পুরুষ ও ২ জন নারী সাহাবী মক্কায় এসে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জানমাল দিয়ে রক্ষার ঐতিহাসিক শপথ নেন এবং তাঁকে মদিনায় হিজরতের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান।
৩. মদিনায় দাওয়াহর প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপন:
১. মসজিদে নববী নির্মাণ: এটি ছিল একাধারে উপাসনালয়, দাওয়াতি কেন্দ্র ও রাষ্ট্রের সংসদ ভবন।
২. মুয়াখাত বা ঐতিহাসিক ভ্রাতৃত্ব চুক্তি: আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে রক্তের চেয়েও গভীর আত্মিক ভ্রাতৃত্ব কায়েম করা হয়।
৩. মদিনা সনদ (The Charter of Madinah): মুসলিম, ইহুদি ও পৌত্তলিকদের সমন্বয়ে পৃথিবীর প্রথম লিখিত সংবিধান প্রণয়ন করে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও যৌথ নাগরিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়।
উপসংহার:
মদিনার এই দাওয়াতি বিপ্লব প্রমাণ করে যে, দাওয়াত যখন রাষ্ট্র ও শরিয়তের সুরক্ষার সাথে সমন্বিত হয়, তখন তা সমগ্র বিশ্ব জয় করার অপরাজেয় শক্তিতে পরিণত হয়।
৪. اكتب نبذة عن حياة أبي بكر الصديق رضى الله عنه مع ذكر خطواته المتخذة حماية للإسلام والمسلمين. [ইসলাম ও মুসলমানদের রক্ষায় আবু বকর (রা) এর গৃহীত পদক্ষেপসমূহ আলোচনা পূর্বক তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনী লেখ।]
ভূমিকা:
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পর মুসলিম উম্মাহর ক্রান্তিলগ্নে ইসলামের প্রথম খলিফা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন সিদ্দীকে আকবর হযরত আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)। তাঁর সংক্ষিপ্ত অথচ মহিমান্বিত খেলাফতকাল (১১ – ১৩ হি.) ছিল ইসলামের অস্তিত্ব রক্ষা এবং বিশ্বব্যাপী দাওয়াত প্রসারের এক স্বর্ণালী ভিত্তিপ্রস্তর।
১. খোলাফায়ে রাশেদীনের পরিচয়:
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত সঠিক পথের অনুসারী চারজন বিশিষ্ট খলিফাকে ‘খোলাফায়ে রাশেদীন’ বলা হয়। তাঁরা হলেন: হযরত আবু বকর, হযরত উমর, হযরত উসমান এবং হযরত আলী (রা.)। নবীজী (সা.) ইরশাদ করেছেন: عَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ – “তোমরা আমার সুন্নাত এবং হেদায়েতপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধর।” (আবু দাউদ)।
২. হযরত আবু বকর (রা.)-এর খেলাফতকালে দাওয়াহ ও ইসলাম রক্ষার ঐতিহাসিক পদক্ষেপসমূহ:
- ১. রিদ্দার যুদ্ধ ও ইসলামত্যাগীদের দমন (حروب الردة):
রাসূলের ওফাতের পর আরবের বহু গোত্র ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যায়। হযরত আবু বকর (রা.) কোনো আপস না করে দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করলেন: “আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে তারা যে ছাগলের রশি যাকাত দিত, তা দিতে অস্বীকার করলেও আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব।” তিনি ১১টি সেনাদল পাঠিয়ে মুরতাদদের দমন করে ইসলামি দাওয়াহর ভিত্তি পুনরুজ্জীবিত করেন। - ২. ভণ্ড নবীদের সমূলে নির্মূল:
মুসায়লামা কাযযাব, তুলাইহা আসাদী ও সাজাহর মতো মিথ্যা নবুওয়তের দাবিদারদের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক ইয়ামামার যুদ্ধ পরিচালনা করে খতমে নবুওয়তের বিশুদ্ধ আকিদা চিরতরে সুরক্ষিত করেন। - ৩. পবিত্র কুরআন সংকলন:
ইয়ামামার যুদ্ধে বহু হাফেজে কুরআন সাহাবীর শাহাদাতের পর হযরত উমর (রা.)-এর পরামর্শে যায়েদ বিন সাবিত (রা.)-এর নেতৃত্বে পবিত্র কুরআনকে প্রথম গ্রন্থাকারে (মুসহাফ) সংকলন করেন, যা দাওয়াহর চিরন্তন উৎসকে কিয়ামত পর্যন্ত অবিকৃত রেখেছে। - ৪. আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দাওয়াহ ও অভিযানের সূচনা:
আরব উপদ্বীপকে সংকটমুক্ত করে তিনি পারস্য সীমান্তে খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) এবং সিরিয়া সীমান্তে আবু উবাইদাহ (রা.)-কে পাঠিয়ে বিশ্বমঞ্চে ইসলামি দাওয়াত পৌঁছানোর দ্বার উন্মোচন করেন।
উপসংহার:
হযরত আবু বকর (রা.) না থাকলে ইসলামের ইতিহাস হয়তো ভিন্ন হতে পারত। তাঁর ইস্পাতকঠিন ঈমান ও বিচক্ষণতা ইসলামি দাওয়াতকে সংকটের অতল গহ্বর থেকে উদ্ধার করে এক অপরাজেয় বিশ্বশক্তিতে পরিণত করেছিল।
৫. تحدث عن انتشار الدعوة الإسلامية فى العهد الأموى موجزا. [উমাইয়া যুগে ইসলামি দাওয়াহর প্রসার সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা কর।]
ভূমিকা:
হিজরী ৪১ সনে হযরত মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর মাধ্যমে উমাইয়া খেলাফত প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তা হিজরী ১৩২ সন পর্যন্ত সুদীর্ঘ প্রায় এক শতাব্দীকাল স্থায়ী ছিল। উমাইয়া খেলাফতকালে মুসলিম খেলাফত দামেস্ককে রাজধানী করে পশ্চিমে স্পেন (আন্দালুসিয়া) ও আটলান্টিক মহাসাগর থেকে পূর্বে সিন্ধু ও মধ্য এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে বিশ্বের সর্ববৃহৎ একক সাম্রাজ্যে রূপ নেয়। এ যুগে ভৌগোলিক বিজয়ের সাথে সাথে ইসলামি দাওয়াহ বিশ্বজনীন বিস্তৃতি লাভ করে।
১. উমাইয়া খেলাফতের দাওয়াতি অগ্রযাত্রার প্রধান ক্ষেত্রসমূহ:
১. ইউরোপের স্পেনে ইসলামের প্রবেশ (৭১১ খ্রি.): উমাইয়া সেনাপতি তারিক বিন যিয়াদ জিব্রাল্টার প্রণালী অতিক্রম করে ইউরোপের স্পেনে ইসলামি শরিয়তের ইনসাফ কায়েম করেন। এর ফলে অন্ধকারাচ্ছন্ন ইউরোপে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতার নবজাগরণ সূচিত হয়।
২. মধ্য এশিয়ায় দাওয়াত ও বিজয়: অপরাজেয় সেনাপতি কুতাইবা বিন মুসলিম সমরকন্দ, বুখারা ও খোয়ারিজম জয় করে সেখানে ইসলামি দাওয়াহর সুদৃঢ় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন, যেখান থেকে পরবর্তীতে ইমাম বুখারী ও ইমাম তিরমিযীর মতো মহামনীষীদের জন্ম হয়।
৩. সিন্ধু ও ভারতীয় উপমহাদেশে আগমন (৭১২ খ্রি.): মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের মাধ্যমে ভারতে ইসলামের আলোকবর্তিকা প্রবেশ করে।
৪. হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয (র.)-এর মুজাদ্দিদসুলভ দাওয়াতি বিপ্লব: তিনি খলিফা হয়ে অমুসলিমদের ওপর থেকে অন্যায় জিজিয়া প্রত্যাহার করেন এবং সীমান্ত অতিক্রম করে প্রতিবেশী অমুসলিম রাজাদের কাছে দাওয়াতি চিঠি পাঠান। তাঁর ইনসাফ দেখে মাত্র আড়াই বছরের শাসনামলে ভারত, উত্তর আফ্রিকা ও মধ্য এশিয়ার লাখ লাখ অমুসলিম স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করে।
৫. আরবি ভাষার আন্তর্জাতিকীকরণ: খলিফা আবদুল মালিক বিন মারওয়ান রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে আরবি বাধ্যতামূলক করেন, ফলে কুরআন ও হাদিসের ভাষা সমগ্র সাম্রাজ্যে সাধারণ জনতার ভাষায় পরিণত হয়।
২. উমাইয়া যুগের দাওয়াতি সীমাবদ্ধতা ও সংকটসমূহ:
১. রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের পরোক্ষ শুরা ব্যবস্থা বিলোপ।
২. কোনো কোনো উমাইয়া শাসকের মধ্যে অনারব মুসলমানদের (মাওয়ালী) ওপর আরবদের জাত্যাভিমান প্রকাশের দুর্বলতা।
৩. রাজনৈতিক সংঘাতের ফলে কিছু চরমপন্থী ফিরকা (শিয়া ও খারেজী)-এর উত্থান ও বিভ্রান্তি ছড়ানো।
উপসংহার:
উমাইয়া খেলাফতের কিছু রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ভৌগোলিক বিস্তার এবং বিশ্বব্যাপী ইসলামের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে এ যুগের ঐতিহাসিক অবদান মানব সভ্যতায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
৬. بين صور الدعوة الإسلامية فى عهد الخلافة العثمانية. [উসমানি খেলাফত আমলে ইসলামি দাওয়াহর বিভিন্ন চিত্র বর্ণনা কর।]
ভূমিকা:
আমিরুল মুমিনীন হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ছিলেন মুসলিম ইতিহাসের এক অপরাজেয় ও দূরদর্শী খলিফা। তাঁর খেলাফতকালে (১৩ – ২৩ হিজরী) ইসলামি দাওয়াহ আরব উপদ্বীপের ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে তৎকালীন বিশ্বের দুই পরাশক্তি রোমান (বাইজেন্টাইন) ও পারস্য (সাসানীয়) সাম্রাজ্যের কেন্দ্রস্থলে পৌঁছে যায় এবং অনারব বিশ্বে দাওয়াহর এক অভূতপূর্ব জাগরণ সূচিত হয়।
১. অনারব বিশ্বে ইসলাম প্রসারে উমর (রা.)-এর দাওয়াতি পদক্ষেপের বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- ১. ইনসাফ ও সুবিচারের মাধ্যমে মন জয়:
হযরত উমর (রা.) সেনাপতিদের কঠোর নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, কোনো নিরস্ত্র নাগরিক, কৃষক, নারী, শিশু বা ধর্মীয় পুরোহিতকে হত্যা করা যাবে না। সিরিয়া ও মিশরের খ্রিস্টান নাগরিকরা রোমান শাসকদের কর ও ধর্মীয় নির্যাতনের চেয়ে মুসলিম শাসকদের ইনসাফপূর্ণ শাসনকে স্বাগত জানিয়েছিল। সেনাপতি আবু উবাইদাহ যখন হিমসের অমুসলিম প্রজাদের নিরাপত্তা দিতে পারলেন না, তখন তিনি তাদের থেকে গৃহীত জিজিয়া করের সমস্ত অর্থ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন—যা দেখে শত শত অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করে। - ২. জোরপূর্বক ধর্মান্তর নিষিদ্ধকরণ:
কুরআনের নির্দেশ لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ (“দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই”) হুবহু কার্যকর করা হয়। জেরুজালেমের খ্রিস্টানদের সাথে সম্পাদিত ‘আহদে উমরিয়া’ (উমরের সন্ধিপত্র) ধর্মীয় স্বাধীনতার এক ঐতিহাসিক সনদ, যার ফলে কোনো গির্জা ভাঙা হয়নি। - ৩. বিজিত অঞ্চলে সাহাবীদের শিক্ষক হিসেবে প্রেরণ:
হযরত উমর কেবল ভূখণ্ড জয় করেই ক্ষান্ত হননি; বরং কুফা, বসরা, দামেস্ক ও মিশরে মানুষকে কুরআন ও হাদিস শিক্ষার জন্য হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, মুআজ ইবনে জাবাল ও আবু দারদা (রা.)-এর মতো প্রখ্যাত সাহাবীদের শিক্ষক হিসেবে স্থায়ীভাবে পাঠিয়েছিলেন। - ৪. নতুন সেনানগরী ও মসজিদ নির্মাণ:
বিজিত এলাকায় ইসলামের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে কুফা, বসরা ও ফুসতাত (কায়রো) নগরী প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রতিটি সেনানিবাসে জামে মসজিদ নির্মাণ করে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র গড়ে তোলেন। - ৫. দাস ও অনারবদের সামাজিক মর্যাদা দান:
হযরত উমর ঘোষণা করেছিলেন: “তোমরা কবে থেকে মানুষকে দাসে পরিণত করলে, অথচ তাদের মায়েরা তাদের স্বাধীন হিসেবে জন্ম দিয়েছিল!” অনারবদের সাথে বৈষম্যহীন আচরণ তাদের দলে দলে ইসলামের ছায়াতলে টেনে এনেছিল।
উপসংহার:
হযরত উমর (রা.)-এর খেলাফতকালে ইসলামের যে বিস্তার ঘটেছিল, তা কোনো তলোয়ারের শক্তিতে নয়; বরং শরিয়তের ইনসাফ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও চারিত্রিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রভাবেই অনারব জাতিগুলো ইসলামকে পরম আগ্রহে আলিঙ্গন করেছিল।
৭. تحدث عن المؤهلات اللازمة للداعى مفصلا. [একজন দা’ঈর প্রয়োজনীয় যোগ্যতা সম্পর্কে সবিস্তারে আলোচনা কর।]
ভূমিকা:
ইসলামি দাওয়াত কোনো আকস্মিক বিপ্লব ছিল না; বরং তা ছিল আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে ধাপে ধাপে সুবিন্যস্ত এক ঐতিহাসিক মহাবিপ্লব। মক্কার চরম বৈরি পরিবেশ থেকে শুরু করে মদিনার ইসলামি রাষ্ট্র কায়েম পর্যন্ত দাওয়াহর প্রতিটি পর্যায় ছিল বিজ্ঞানসম্মত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ কৌশল দ্বারা পরিচালিত।
১. দাওয়াহর সংজ্ঞা ও মূল চেতনা:
আল্লাহর একত্ববাদ ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রদর্শিত জীবনবিধানের দিকে মানুষকে আহ্বান জানানোর নামই দাওয়াত। এই দাওয়াহর মূল ভিত্তি ছিল তিনটি বিষয়: তাওহীদ প্রতিষ্ঠা, শিরক নির্মূল এবং উত্তম চরিত্রের বিকাশ।
২. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দাওয়াতি জীবনের মৌলিক পর্যায়সমূহ (مراحل الدعوة الإسلامية):
- ১. প্রথম পর্যায়: গোপন দাওয়াত (الدعوة السرية – প্রথম ৩ বছর):
হেরা গুহায় প্রথম অহী লাভের পর সূরা আল-মুদ্দাসসিরের নির্দেশ পেয়ে নবীজী (সা.) তাঁর নিকটতম ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের গোপনে দাওয়াত দেন। এ পর্যায়ে হযরত খাদিজা, আবু বকর, আলী ও যায়েদ বিন হারেসা (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। দারুল আরক্বাম ছিল এ যুগের মূল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। - ২. দ্বিতীয় পর্যায়: নিকটাত্মীয়দের মাঝে প্রকাশ্য দাওয়াত (دعوة العشيرة والأقربين):
আল্লাহর নির্দেশ নাজিল হলো: وَأَنذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ – “আপনি আপনার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করুন।” (সূরা আশ-শুআরা: ২১৪)। নবীজী সাফা পাহাড়ে আরোহণ করে কুরাইশদের এক আল্লাহর প্রতি ঈমানের আহ্বান জানান, যেখানে আবু লাহাব প্রকাশ্যে চরম শত্রুতা শুরু করে। - ৩. তৃতীয় পর্যায়: মক্কায় সর্বজনীন প্রকাশ্য দাওয়াত ও প্রতিরোধ (الدعوة الجهرية العامة):
আল্লাহর নির্দেশ আসল: فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ وَأَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِينَ – “আপনাকে যে আদেশ দেওয়া হয়েছে তা প্রকাশ্যে ঘোষণা করুন।” (সূরা আল-হিজর: ৯৪)। কুরাইশরা সাহাবীদের ওপর চরম নির্যাতন চালায়, শিআবে আবি তালিবে ৩ বছর বয়কট করে এবং সাহাবীদের আবিসিনিয়ায় হিজরত করতে হয়। - ৪. চতুর্থ পর্যায়: মক্কার বাইরে হজের মৌসুমে গোত্রভিত্তিক দাওয়াত:
তায়েফে রক্তঝরা দাওয়াতি সফর এবং হজের মৌসুমে আগত বিভিন্ন বহিরাগত গোত্রের সাথে যোগাযোগ। অবশেষে মদিনার খাজরাজ ও আওস গোত্রের সাথে ঐতিহাসিক আক্বাবার প্রথম ও দ্বিতীয় বাইয়াত সম্পাদিত হয়। - ৫. পঞ্চম পর্যায়: হিজরত ও মদিনায় দাওয়াহর রাষ্ট্রীয় রূপ (المرحلة المدنية):
মদিনায় হিজরতের পর মসজিদে নববী নির্মাণ, আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন, মদিনা সনদ স্বাক্ষর এবং ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। এ পর্যায়ে প্রতিরক্ষামূলক জিহাদ এবং বিশ্বের সম্রাটদের (রোম, পারস্য, মিশর) কাছে দূত মারফত দাওয়াতি পত্র প্রেরণ করে দাওয়াতকে বিশ্বজনীন রূপ দেওয়া হয়।
উপসংহার:
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর এই পর্যায়ক্রমিক দাওয়াতি কৌশল বর্তমান যুগের দাঈদের জন্য অনুপম আদর্শ। পরিস্থিতি ও পরিবেশ বুঝে ধারাবাহিক পরিকল্পনা প্রণয়নই দাওয়াহর সফলতার মূল চাবিকাঠি।
৮. علق على اثنين من التالية: الإسلام فى بنغلاديش, النشاطات الدعوية فى عهد هارون الرشيد, صبر موسى عليه السلام فى الدعوة إلى الله, سليمان عليه السلام النبى الملك. [টীকা: বাংলাদেশে ইসলাম, হারুনুর রশীদের আমলে দাওয়াত, মূসা (আ.)-এর ধৈর্য, বাদশাহ নবী সোলায়মান (আ.)]
ভূমিকা:
ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামি দাওয়াহর ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও প্রাচীন। এখানে ইসলামের আগমন কোনো একক সামরিক বিজয়ের ফসল ছিল না; বরং তা ছিল আরব মুসলিম বণিকদের সততা, সুফী-সাধকদের আত্মত্যাগ এবং পরবর্তীতে মুসলিম শাসকদের ইনসাফপূর্ণ রাষ্ট্র পরিচালনার এক সমন্বিত ঐতিহাসিক ফসল।
১. ভারতবর্ষে ইসলাম আগমনের বিভিন্ন পর্যায়:
- ১. আরব বণিকদের মাধ্যমে প্রাথমিক উপকূলীয় দাওয়াত (সপ্তম শতাব্দী):
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশাতেই আরব নাবিক ও বণিকরা ভারতের মালাবার, গুজরাট ও সিংহল উপকূলে বাণিজ্য পরিচালনা করতেন। তাদের সততা, উন্নত চরিত্র ও ওজন-পরিমাপে নিখুঁত ইনসাফ দেখে মালাবারের রাজা চেরামন পেরুমল ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং ভারতে প্রথম মসজিদ ‘চেরামন জুমুআ মসজিদ’ প্রতিষ্ঠিত হয়। - ২. মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয় (৭১২ খ্রি.):
উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিকের আমলে জলদস্যুদের হাতে নির্যাতিত মুসলিম নারী ও এতিমদের উদ্ধারে তরুণ সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধু আক্রমণ করেন। রাজা দাহিরকে পরাজিত করে তিনি হিন্দু ও বৌদ্ধ প্রজাদের পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করেন। তাঁর উদারতায় মুগ্ধ হয়ে সিন্ধুর মানুষ তাঁর মূর্তি তৈরি করতে চেয়েছিল, কিন্তু তিনি তাদের এক আল্লাহর ইবাদতের দাওয়াত দেন। - ৩. সুফী-সাধক ও আউলিয়ায়ে কেরামের দাওয়াতি বিপ্লব (একাদশ-চতুর্দশ শতাব্দী):
উপমহাদেশে ইসলামের প্রকৃত বিস্তার ঘটিয়েছিলেন দরবেশ ও সুফীগণ। বর্ণপ্রথা ও ব্রাহ্মণ্যবাদের চরম নির্যাতনে পিষ্ট নিম্নবর্ণের অস্পৃশ্য হিন্দুরা সুফীদের খানকায়ে সাম্য, ভালোবাসা ও বিনামূল্যে আহারের (লঙ্গরখানা) সন্ধান পায়।
– খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতী (র.): আজমীরে অবস্থান করে লাখ লাখ মানুষকে ইসলামের আলোয় আনেন।
– হযরত নিজামুদ্দীন আউলিয়া (র.): দিল্লিতে সাধারণ জনতার আত্মিক সংস্কার করেন।
– হযরত শাহ জালাল (র.): সিলেটে গৌরগোবিন্দের অত্যাচারের অবসান ঘটিয়ে সমগ্র পূর্ববঙ্গে দাওয়াহ ছড়িয়ে দেন। - ৪. সুলতানী ও মুঘল আমল:
সুলতান মাহমুদ গজনভী, মুহাম্মদ ঘুরী এবং পরবর্তীতে মুঘল বাদশাহদের আমলে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার ফলে ইসলামি দাওয়াত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।
উপসংহার:
ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলাম কোনো চাপিয়ে দেওয়া ধর্ম নয়; এটি ছিল কোটি কোটি শোষিত মানুষের সামাজিক মুক্তি ও সাম্যের আশ্রয়স্থল।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
ফাযিল ৩য় বর্ষ আদ-দাওয়া আল-ইসলামিয়্যাহ ২য় পত্রের মূল বিষয়বস্তু কী?
আদ-দাওয়া আল-ইসলামিয়্যাহ ২য় পত্রের (বিষয় কোড: ৪২৯) সিলেবাস মূলত দাওয়াহর ইতিহাস (তারিখুদ দাওয়াহ)-এর ওপর রচিত। এতে আম্বিয়ায়ে কেরামের দাওয়াতি কৌশল, রাসূলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবাদের দাওয়াত, খোলাফায়ে রাশেদীন, উমাইয়া-আব্বাসী যুগ এবং ভারতীয় উপমহাদেশ ও বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত।
ফাযিল পরীক্ষায় ২০ নম্বরের প্রশ্নের আদর্শ উত্তরের পরিধি কতটুকু হওয়া উচিত?
ডিগ্রি ও অনার্স মানবণ্টন অনুযায়ী প্রতিটি ২০ নম্বরের প্রশ্নের জন্য ভূমিকা, ঐতিহাসিক পটভূমি, কুরআন ও সুন্নাহর প্রামাণ্য দলিল, ৫-৮টি সুনির্দিষ্ট পয়েন্ট, সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা এবং উপসংহার সহযোগে কমপক্ষে ৩৫০ থেকে ৫০০+ শব্দে উত্তর লেখা কাম্য।
হযরত নূহ (আ.) কত বছর তাঁর কওমকে দাওয়াত দিয়েছিলেন?
পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আনকাবূতের ১৪ নম্বর আয়াত অনুযায়ী হযরত নূহ (আ.) তাঁর অবাধ্য জাতিকে সুদীর্ঘ সাড়ে নয়শত (৯৫০) বছর ধরে অবিরাম তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছিলেন।
অনারব বিশ্বে ইসলাম প্রসারে হযরত উমর (রা.)-এর মূল নীতি কী ছিল?
হযরত উমর (রা.) সেনাপতিদের কঠোর নির্দেশ দিয়েছিলেন কোনো নিরস্ত্র নাগরিক ও ধর্মগুরুকে আঘাত না করতে, জোরপূর্বক ধর্মান্তর নিষিদ্ধ করেছিলেন, এবং ইনসাফ ও সুবিচারের মাধ্যমে অমুসলিমদের মন জয় করে শিক্ষক সাহাবীদের মাধ্যমে দ্বীন শিক্ষা নিশ্চিত করেছিলেন।
বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারে কোন সুফী-সাধকের ভূমিকা প্রধান ছিল?
হযরত শাহ জালাল (র.) ৩৬০ জন আউলিয়া নিয়ে সিলেটে এবং হযরত খান জাহান আলী (র.) দক্ষিণাঞ্চলে সমাজসেবা ও মসজিদভিত্তিক দাওয়াহর মাধ্যমে বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের প্রধান পথিকৃৎ ছিলেন।
মক্কী জীবনে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দাওয়াহর কয়টি পর্যায় ছিল?
মক্কী জীবনে দাওয়াহর প্রধানত তিনটি পর্যায় ছিল: ১. প্রথম ৩ বছর সম্পূর্ণ গোপন দাওয়াত, ২. নিকটাত্মীয়দের মাঝে প্রকাশ্য দাওয়াত এবং ৩. সাফা পাহাড়ে ঘোষণার মাধ্যমে মক্কায় সর্বজনীন প্রকাশ্য দাওয়াত ও প্রতিরোধ মোকাবেলা।

