ফাযিল (স্নাতক) পাস ৩য় বর্ষ পরীক্ষা – 2022
বিষয়: উচ্চতর আরবি (ঐচ্ছিক) প্রথম পত্র (বিষয় কোড: ৪০৭)
[আরবি গদ্য (النثر العربي)]
সময়: ৩ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ১০০
ফাযিল (স্নাতক) পাস ৩য় বর্ষ পরীক্ষা 2022-এর উচ্চতর আরবি ১ম পত্র (বিষয় কোড: ৪০৭ – আরবি গদ্য) পরীক্ষার মূল প্রশ্নপত্রের প্রতিটি প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ, প্রামাণ্য ও অ্যাকাডেমিক সমাধান নিচে দেওয়া হলো। ফাযিল ডিগ্রি ও অনার্স শ্রেণির ২০ নম্বরের রচনামূলক ও ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নের উচ্চমান বজায় রেখে ভূমিকা, মূল আরবি পাঠ, প্রাঞ্জল বাংলা রূপান্তর, শাব্দিক ও ব্যাকরণিক তাহকিক, আলঙ্কারিক বিশ্লেষণ এবং শিক্ষণীয় দিকসমূহ সহযোগে প্রতিটি উত্তর প্রস্তুত করা হয়েছে।
কন্টেন্ট তালিকা / প্রশ্নসূচি
- ১. অনুবাদ ও সাহিত্যিক পাঠ বিশ্লেষণ: ترجم ثلاثا من القطعات الاتية
- ২. আরবিতে ব্যাখ্যা: اشرح قطعة من القطعات الاتية بالعربية
- ৩ (الف). اكتب خلاصة قصة ‘اليتيم’ للمنفلوطى [আল-ইয়াতীম গল্পের সারসংক্ষেপ]
- ৩ (ب). اكتب خصائص خطبة على بن ابى طالب (رض) [হযরত আলী (রা)-এর ভাষণের বৈশিষ্ট্য]
- ৩ (ج). عرف المقامة ثم تحدث عن نشأتها وتطورها [মাকামার সংজ্ঞা ও ক্রমবিকাশ]
- ৩ (د). الخلفية التاريخية لتأليف ‘كليلة ودمنة’ [কালিলা ওয়া দিমনা রচনার পটভূমি]
- ৪. সংক্ষিপ্ত ও প্রায়োগিক প্রশ্নমালা: الخطبة، العقد الفريد، الأصفهاني، جزاء سنمار، صقر قريش
- ৫ (الف). اكتب حياة طه حسين مع بيان مساهمته فى الأدب العربي [ত্বহা হুসাইনের সাহিত্যিক অবদান]
- ৫ (ب). الحقوق الإنسانية في خطبة حجة الوداع [বিদায় হজের ভাষণে ঘোষিত মানবাধিকার]
- ৫ (ج). حياة ابن المقفع ودوره فى الأدب العربي [ইবনে আল-মুক্বাফ্ফার জীবন ও অবদান]
- ৫ (د). بين خصائص الأدب العربي في العصر العباسي [আব্বাসীয় গদ্য সাহিত্যের বৈশিষ্ট্যসমূহ]
প্রশ্নোত্তর ও পূর্ণাঙ্গ সমাধান
১. অনুবাদ ও সাহিত্যিক পাঠ বিশ্লেষণ: ترجم ثلاثا من القطعات الاتية [নির্ধারিত গদ্যাংশের বাংলা ভাবার্থ ও পাঠ-বিশ্লেষণ]
ভূমিকা ও মাকামার পটভূমি
আরবি সাহিত্যের অমর কথাসাহিত্যিক বদিউজ্জামান আল-হামাদানী (Badi’ al-Zaman al-Hamadhani, মৃত্যু ৩৯৮ হি.) আরবি গদ্যে ‘মাকামা’ (المقامة) নামক অভিনব সাহিত্যিক রীতির জনক। তাঁর রচিত মোট চারশত মাকামার মধ্যে প্রায় বাহান্নটি বিদ্যমান রয়েছে। তাঁর বিখ্যাত সৃষ্টিগুলোর অন্যতম হলো ‘আল-মাকামাতুল জুর্জানিয়া’ (المقامة الجرجانية)। এতে প্রধান কথক ‘ঈসা ইবনে হিশাম’ (عيسى بن هشام) এবং প্রধান চতুর ও প্রজ্ঞাবান চরিত্র ‘আবু ফাতহ আল-ইসকান্দারী’ (أبو الفتح الإسكندري)-এর মাধ্যমে বাগ্মীতা, ভাষার কারুকার্য এবং মানবজীবনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
মূল আরবি পাঠ
«حَدَّثَنَا عِيسَى بْنُ هِشَامٍ قَالَ : طَرَحَتْنِي النَّوَى مَطَارِحَهَا حَتَّى إِذَا وَطِئْتُ جُرْجَانَ الْأَقْصَى، فَاسْتَظْهَرْتُ عَلَى الْأَيَّامِ بِضِيَاعٍ أَجَلْتُ فِيهَا يَدَ الْعِمَارَةِ، وَأَمْوَالٍ وَقَفْتُهَا عَلَى التِّجَارَةِ، وَحَانُوتٍ جَعَلْتُهُ مَثَابَةً، وَرِفْقَةٍ اتَّخَذْتُهَا صَحَابَةً، وَجَعَلْتُ لِلدَّارِ حَاشِيَتَيِ النَّهَارِ، وَلِلْحَانُوتِ مَا بَيْنَهُمَا، فَجَلَسْنَا يَوْمًا نَتَذَاكَرُ الْقَرِيضَ وَأَهْلَهُ، وَتِلْقَاءَنَا شَابٌّ قَدْ جَلَسَ غَيْرَ بَعِيدٍ يَنْصِتُ وَكَأَنَّهُ يَفْهَمُ وَيَسْكُتُ وَكَأَنَّهُ لَا يَعْلَمُ…»
বাংলা ভাবার্থ ও প্রাঞ্জল অর্থ
কথক ঈসা ইবনে হিশাম আমাদের বর্ণনা করে বলেন: ভাগ্য ও দূরদূরান্তের স্থানান্তর আমাকে বিভিন্ন স্থানে আছড়ে ফেলল, অবশেষে আমি দূরবর্তী জুরজান শহরে পদার্পণ করলাম। সেখানে জীবনের প্রতিকূলতার বিপরীতে আমি কিছু স্থাবর সম্পত্তি অর্জন করলাম, যার ওপর কৃষিকাজ ও উন্নয়নের হাত প্রসারিত করলাম; কিছু অর্থ বিনিয়োগ করলাম ব্যবসায়ের তরে, একটি দোকানকে বসার আশ্রয়স্থল বানালাম এবং কিছু লোককে পরম সঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করলাম। আমি দিনের উভয় প্রান্ত (সকাল ও সন্ধ্যা) নির্ধারিত করলাম ঘরের জন্য এবং উভয়ের মধ্যবর্তী সময় বরাদ্দ করলাম দোকানের জন্য। একদিন আমরা কাব্য ও কবিদের আলোচনা নিয়ে মেতে উঠলাম; ঠিক তখনই আমাদের সম্মুখভাগে অনতিদূরে এক যুবক এসে বসল—সে এমনভাবে কান পেতে শুনছিল যেন সবকিছুই সে বোঝে, আবার এমনভাবে নীরবতা পালন করছিল যেন সে কিছুই জানে না!
শাব্দিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ
| আরবি শব্দ | ব্যাকরণিক অবস্থান | আভিধানিক অর্থ | সাহিত্যের নিরিখে তাৎপর্য |
|---|---|---|---|
| طَرَحَتْنِي النَّوَى | ফেল ও ফায়েল (রূপক) | দূরত্ব বা ভাগ্য আমাকে নিক্ষেপ করল | জীবিকার তাগিদে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাযাবর ভ্রমণের চমৎকার রূপক। |
| ضِيَاعٍ | ইসম (মুজরুর), বহুবচন | জমিজমা, বাগান ও কৃষি সম্পত্তি | তৎকালীন সমাজে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ও স্থায়িত্বের প্রতীক। |
| حَانُوتٍ | ইসম (দোকান) | ব্যবসা প্রতিষ্ঠান / দোকান | আব্বাসীয় যুগে বুদ্ধিজীবী ও ব্যবসায়ীদের আড্ডার কেন্দ্র। |
| الْقَرِيضَ | মাফউলুন বিহি | ছন্দোবদ্ধ কবিতা / পদ্যকাব্য | আরব সাহিত্যের সর্বোত্তম শিল্পমাধ্যম নিয়ে সাহিত্যিক আড্ডা। |
সাহিত্যিক অলঙ্কার ও মূল্যায়ন
- অনুপম ছন্দময় গদ্য (السجع): মাকামাহটির প্রতিটি বাক্যখণ্ড সুষম ছন্দে গ্রথিত (যেমন: مطارحها – الأقصى, العمارة – التجارة, مثابة – صحابة)। এটি আব্বাসীয় গদ্যের সর্বোত্তম নিদর্শন।
- চরিত্রচিত্রণের গভীরতা: আবু ফাতহ ইসকান্দারীর প্রথম আবির্ভাব অত্যন্ত নাটকীয়—’ইয়ানসিতু ওয়া কাআন্নাহু ইয়াফহামু, ওয়া ইয়াসকুতু ওয়া কাআন্নাহু লা ইয়া’লামু’—যা পরবর্তীতে তার চমকপ্রদ বাগ্মীতা ও পাণ্ডিত্যের নাটকীয় প্রকাশকে অনিবার্য করে তোলে।
- ভাষার সম্পদ: এই পাঠটি শিক্ষার্থীদের আরবি ক্লাসিক্যাল গদ্যশৈলী, শব্দচয়ন এবং অলঙ্কারশাস্ত্রের বাস্তব প্রয়োগ শেখার এক অপরিহার্য দলিল।
২. আরবিতে ব্যাখ্যা: اشرح قطعة من القطعات الاتية بالعربية [বালাগত ও সাহিত্যের আলোকে আরবিতে বিশদ ব্যাখ্যা]
المقدمة التحليلية للشرح
تشتمل هذه العبارات النبوية والقرآنية الجليلة على أسرار بلاغية عميقة وحقائق تشريعية وتربوية خالدة. إن إيضاح هذه العبارات بالعربية يقتضي تبيين المعنى الإجمالي، وفك المفردات اللغوية، واستخراج النكات البلاغية والدروس التربوية المستفادة منها للأمة الإسلامية.
أولاً: شرح قوله ﷺ : «إِنَّ مِنَ الْبَيَانِ لَسِحْرًا»
المعنى الإجمالي : يُبين النبي الكريم ﷺ في هذا الحديث الشريف الأثر البالغ والقوة الخارقة التي يمتلكها اللسان الفصيح والكلام البليغ في جذب القلوب واستمﺎلة العقول. فالبيان الرائع والأسلوب المتقن يستطيع أن يُقلب الحقائق في نظر السامع حتى يكاد يفعل في النفس فعل السحر الخارق للعادة.
التحليل البلاغي واللغوي :
- التوكيد بـ (إنّ) و (اللام المزحلقة) : يُفيد تقرير الحقيقة وتثبيتها في ذهن المخاطب تأكيداً جازماً.
- التشبيه البليغ / الاستعارة : شبّه البلاغة وقوة التعبير بالسحر بجامع التأثير الخفي والسريع في النفوس وسلب الإرادة.
- المغزى والتوجيه النبوي : يوجهنا الحديث الشريف إلى تسخير هذه النعمة البيانية العظيمة في نصرة الحق، والدعوة إلى الله تعالى، ومحاربة الباطل، والتحذير من استخدام البلاغة في تزيين المنكر والدفاع عن الظلم.
ثانياً: شرح قوله ﷺ : «وَإِنَّكُمْ سَتَلْقَوْنَ رَبَّكُمْ فَيَسْأَلُكُمْ عَنْ أَعْمَالِكُمْ»
المعنى الإجمالي : هذه فقرة جليلة من خطبة حجة الوداع يُقرر فيها الرسول ﷺ عقيدة البعث والجزاء والحساب الأخروي، ويُنبه البشرية جمعاء إلى حتمية الوقوف بين يدي الله تعالى في يوم القيامة، حيث لا ينفع مال ولا بنون إلا من أتى الله بقلب سليم.
التحليل البلاغي واللغوي :
- السين في (ستلقون) : تدل على تحقق الوقوع في المستقبل القريب؛ إذ إن كل ما هو آتٍ قريب.
- فاء العاطفة والسببية في (فيسألكم) : تفيد الترتيب والتعقيب المباشر، فاللقاء يعقبه الحساب والمساءلة الدقيقة عن كل صغيرة وكبيرة.
- الأثر الإيماني والتربوي : غرس روح المراقبة الذاتية والمسؤولية الفردية في قلب المؤمن، مما يجعله مستقيماً في سلوكه وأماناته ومعاملاته مع سائر العباد.
ثالثاً: شرح قوله ﷺ : «وَإِنَّ الزَّمَانَ قَدِ اسْتَدَارَ كَهَيْئَتِهِ يَوْمَ خَلَقَ اللَّهُ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضَ»
المعنى الإجمالي : يُعلن النبي ﷺ في هذا المقطع التاريخي العظيم إبطال بدعة ‘النسيء’ التي كان يمارسها أهل الجاهلية بالتلاعب في الشهور الحرم تقديماً وتأخيراً وفق أهوائهم، مؤكداً أن الحساب الزمني الكوني قد عاد إلى وضعه الفطري الأصلي المستقيم كما خلقه الله عز وجل أول مرة.
التحليل البلاغي واللغوي :
- التشبيه التمثيلي البديع : شبه دورة الزمان في عام حجة الوداع بالهيئة الأولى التي بدأ الله بها خلق الكون، وهو تصوير لعودة الحق إلى نصابه ونقاء الشريعة من أدران التغيير والتبديل الجاهلي.
- استخدام الفعل الماضي الدال على الاستقرار (استدار) : إشعارٌ بأن أحكام الشريعة الإسلامية ومواقيتها قد بلغت الكمال والتمام الأبدي الذي لا يقبل نسخاً ولا تحريفاً إلى يوم الدين.
বাংলা তাৎপর্য ও শিক্ষা
এই তিনটি হাদিসাংশে ভাষার প্রাঞ্জলতা ও আলঙ্কারিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি ইসলামের তিনটি মৌলিক ভিত্তি উপস্থাপিত হয়েছে: প্রথমত, সত্যের প্রসারে সুন্দর ও যুক্তিনিষ্ঠ ভাষার অপরিহার্যতা; দ্বিতীয়ত, আখিরাতে জবাবদিহিতা ও আল্লাহর দরবারে কৃতকর্মের বিচারের অনুভূতি; এবং তৃতীয়ত, ধর্মীয় বিধান ও সময়গণনায় জাহেলী বিকৃতি রদ করে আল্লাহ প্রদত্ত ফিতরাত ও নিখুঁত ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ পুনঃপ্রতিষ্ঠা।
৩ (الف). اكتب خلاصة قصة ‘اليتيم’ للمنفلوطى. [মুস্তফা লুৎফী আল-মানফালূতির ‘আল-ইয়াতীম’ গল্পের পূর্ণাঙ্গ সারসংক্ষেপ ও বিশ্লেষণ]
ভূমিকা ও লেখক পরিচিতি
আধুনিক আরবি সাহিত্যের রোমান্টিক ও বাস্তববাদী ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থপতি হলেন মিসরের প্রখ্যাত সাহিত্যিক মুস্তফা লুৎফী আল-মানফালূতি (Mustafa Lutfi al-Manfaluti, ১৮৭৬-১৯২৪ খ্রি.)। তাঁর রচিত বিশ্বখ্যাত প্রবন্ধ ও ছোটগল্প সংকলন ‘আল-ইবারাত’ (العبرات – অশ্রুমালা)-এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও হৃদয়স্পর্শী গল্প হলো ‘আল-ইয়াতীম’ (اليتيم – এতিম)। এতে তিনি পিতৃহীন এক এতিম যুবকের বঞ্চনা, নিঃশব্দ প্রেম, আত্মত্যাগ এবং তৎকালীন প্রাচ্য সমাজের সুবিধাবাদী শোষক মানসিকতার এক অনন্য বাস্তববাদী চিত্র অঙ্কন করেছেন।
গল্পের পটভূমি ও মূল কাহিনী সংক্ষেপ
- এতিম জীবনের সূচনা ও আশ্রয়: গল্পের মূল চরিত্র এক দরিদ্র এতিম বালক, যার পিতা শৈশবেই মৃত্যুবরণ করেন। বালকটির পিতৃদায়িত্ব গ্রহণ করেন তার ধনী চাচা। চাচার সুরম্য প্রাসাদে এতিম বালকটি বড় হতে থাকে এবং চাচার অপরূপা কন্যা ‘ইফফাত’ (عفت)-এর সাথে তার শৈশবের নিষ্পাপ বন্ধুত্ব ও নিবিড় ভালোবাসার বন্ধন গড়ে ওঠে।
- প্রেম ও শ্রেণীগত বৈষম্যের সংঘাত: বয়োবৃদ্ধির সাথে সাথে তাদের মধ্যকার এই অনুরাগ পবিত্র ভালোবাসায় রূপ নেয়। কিন্তু চাচার পরিবারে সম্পদ ও আভিজাত্যের প্রাচীর তাদের সম্পর্কের মাঝে কাল হয়ে দাঁড়ায়। এতিম যুবকের মনে কোনো অহংকার বা স্বার্থপরতা ছিল না; সে ইফফাতকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসত।
- নির্মম বহিষ্কার ও বিচ্ছেদ: যখন চাচা জানতে পারেন যে এই নিঃস্ব এতিম ভাইপো তাঁর কন্যার প্রতি অনুরাগী, তখন তিনি চরম ক্রোধে অন্ধ হয়ে যান। তিনি এতিম যুবককে অকৃতজ্ঞ আখ্যা দিয়ে গৃহ থেকে নির্মমভাবে তাড়িয়ে দেন এবং ইফফাতকে এক ধনবান উচ্চাভিলাষী ব্যক্তির সাথে বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
- ইফফাতের ট্র্যাজেডি ও মৃত্যু: ইফফাত এই অমিল ও জোরপূর্বক বিয়ে মেনে নিতে পারেনি। সে গভীর মানসিক শোকে আক্রান্ত হয় এবং দিন দিন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে থাকে। অন্তিম মুহূর্তে সে তার শৈশবের প্রিয় এতিম সঙ্গীকে এক নজর দেখার ব্যাকুল প্রার্থনা জানায়।
- কবরস্থানের মিলন: এতিম যুবক যখন জানতে পারে তার প্রিয়তমা ইফফাত গুরুতর অসুস্থ, তখন সে ব্যাকুল হয়ে ছুটে আসে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে—ইফফাত শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে। গল্পটির সমাপ্তি ঘটে ইফফাতের নির্জন কবরের পাশে এতিম যুবকের অশ্রুসিক্ত বিলাপ এবং মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।
চরিত্রায়ন ও প্রধান চরিত্রসমূহের দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক
| চরিত্রের নাম | সামাজিক অবস্থান | চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও তাৎপর্য |
|---|---|---|
| এতিম যুবক (اليتيم) | নিঃস্ব, আশ্রয়হীন ভাইপো | পবিত্র প্রেম, অসীম ধৈর্য, নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ ও সমাজের নির্মম অবিচারের শিকার। |
| ইফফাত (عفت) | ধনী চাচার একমাত্র কন্যা | কোমলহৃদয়, বিশ্বস্ত প্রেমিকা ও পুরুষতান্ত্রিক ধনলোভী ব্যবস্থার অসহায় শিকার। |
| চাচা (العم) | ধনাঢ্য অভিজাত ব্যক্তি | বস্তুবাদী, অহংকারী ও আত্মীয়তার চেয়ে সামাজিক পদমর্যাদাকে প্রাধান্য দেওয়া নিষ্ঠুর পিতা। |
গল্পের সামাজিক বার্তা ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন
- এতিমদের প্রতি সহানুভূতি: পবিত্র কুরআনে এতিমদের অধিকার সুরক্ষার যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তৎকালীন মুসলিম সমাজে তার চরম অবক্ষয় মানফালূতি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন।
- আল-মানফালূতির ভাষা ও শৈলী: তাঁর বাক্যরীতি অত্যন্ত মেলোড্রামাটিক, হৃদয়স্পর্শী এবং করুণ রসে সমৃদ্ধ। আরবি শব্দচয়ন এত জীবন্ত যে পাঠক প্রতিটি লাইনে বেদনার অশ্রু অনুভব করে। এই গল্পটি আধুনিক আরবি ছোটগল্প ধারার ক্লাসিক মাইলফলক।
৩ (ب). اكتب خصائص خطبة على بن ابى طالب (رض) بالإيضاح. [হযরত আলী (রা)-এর ভাষণের আলঙ্কারিক ও সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্যসমূহ]
ভূমিকা ও পটভূমি
আমিরুল মুমিনীন হযরত আলী ইবনে আবী طالب (রা.) (মৃ. ৪০ হি.) ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাগ্মী, প্রজ্ঞাবান রাষ্ট্রনায়ক এবং আরবি সাহিত্যের অনন্য দিকপাল। তাঁর প্রদত্ত ঐতিহাসিক ভাষণসমূহ, পত্রাবলী এবং জ্ঞানগর্ভ বাণীসমূহ চতুর্থ হিজরিতে শরীফ আর-রাজী (الشريف الرضي) কর্তৃক ‘নাহজুল বালাগা’ (نهج البلاغة – বাগ্মীতার রাজপথ) নামে সংকলিত হয়। হযরত আলী (রা.)-এর ভাষণসমূহে কুরআনী প্রজ্ঞার নূর, আরব্য ক্লাসিক্যাল সাহিত্যের গাম্ভীর্য এবং গভীর দার্শনিক চিন্তার এক অভূতপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে।
হযরত আলী (রা)-এর ভাষণের প্রধান সাহিত্যিক ও আলঙ্কারিক বৈশিষ্ট্যসমূহ
- ১. অনুপম শব্দচয়ন ও ভাষার গাম্ভীর্য (جزالة الألفاظ وفخامتها): হযরত আলী (রা.)-এর ভাষণের ভাষা ছিল অত্যন্ত গম্ভীর, তেজস্বী ও হৃদয়গ্রাহী। তাঁর একেকটি শব্দ যেন তীরের ফলার মতো শ্রোতার হৃদয়ে বিদ্ধ হতো। কৃত্রিম অলঙ্কারের ধার না ধেরেও তাঁর বাক্যরীতি ছিল স্বতঃস্ফূর্ত ও ওজস্বী।
- ২. কুরআনী উপমা ও প্রভাব (التأثر البالغ بالقرآن الكريم): তিনি বাল্যকাল থেকেই রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রত্যক্ষ সান্নিধ্যে লালিত-পালিত হয়েছিলেন। ফলে তাঁর ভাষণের প্রতিটি রন্ধ্রে পবিত্র কুরআনের আয়াত, কিয়ামত, মৃত্যু ও তাওহিদের ধারণার প্রতিফলন ঘটেছে। যেমন তিনি বলেন: «أَيُّهَا النَّاسُ! إِنَّمَا الدُّنْيَا دَارُ مَجَازٍ، وَالْآخِرَةُ دَارُ قَرَارٍ…» (হে লোকসকল! এই পৃথিবী তো কেবল এক ক্ষণস্থায়ী পারাপারের পথ, আর আখিরাতই হলো চিরস্থায়ী আবাসস্থল)।
- ৩. অন্ত্যমিল ও ভারসাম্যপূর্ণ বাক্যবিন্যাস (السجع غير المتكلف والموازنة): তাঁর ভাষণে কোনো প্রকার জোরপূর্বক ছন্দের অনুকরণ ছিল না; বরং তাঁর বাক্যগুলো প্রাকৃতিকভাবেই ছন্দোবদ্ধ ও সুষম সমান্তরালে প্রবাহিত হতো। শ্রোতার কান জুড়িয়ে যেত তাঁর ধ্বনিমাধুর্যে।
- ৪. উপমা ও রূপকের নিখুঁত ব্যবহার (روعة التشبيه والاستعارة): তিনি বিমূর্ত আত্মিক সত্যকে মূর্ত রূপকের মাধ্যমে প্রকাশে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। দুনিয়ার ক্ষণস্থায়িত্বকে তিনি বাতাসের দোলাচলে উড়ে যাওয়া ধূলিকণা বা বিষধর মসৃণ সাপের সাথে তুলনা করতেন—যা স্পর্শে নরম কিন্তু ভেতরে প্রাণঘাতী বিষে পূর্ণ।
- ৫. মনস্তাত্ত্বিক আলোড়ন ও তাওহীদী চেতনা: তাঁর ভাষণ মানুষকে রণক্ষেত্রে যেমন অপরাজেয় বীরে পরিণত করত, তেমনি নির্জন রাতে আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দনরত সাধকে রূপান্তরিত করত। তাঁর একেকটি খুতবা সমাজসংস্কার, ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের জীবন্ত ঘোষণাপত্র ছিল।
ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক গুরুত্ব
আরবি সাহিত্যের শীর্ষস্থানীয় গবেষক ও পণ্ডিতদের মতে, হযরত আলী (রা.)-এর বক্তব্য সম্পর্কে বলা হয়: «كَلَامُهُ دُونَ كَلَامِ الْخَالِقِ وَفَوْقَ كَلَامِ الْمَخْلُوقِ» অর্থাৎ—‘তাঁর বাণী মহান স্রষ্টার বাণীর নিচে কিন্তু সমগ্র সৃষ্টির বাণীর ওপরে অবস্থান করে।’ নাহজুল বালাগায় সংরক্ষিত তাঁর ভাষণসমূহ আজ পর্যন্ত আরবি ভাষা, সাহিত্য ও রাষ্ট্রনীতির গবেষকদের জন্য এক চিরন্তন আলোকবর্তিকা।
৩ (ج). عرف المقامة ثم تحدث عن نشأتها وتطورها. [মাকামার পরিচয়, উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ]
ভূমিকা ও মাকামার সংজ্ঞা
আরবি সাহিত্যের ক্লাসিক্যাল যুগে আবির্ভূত সর্বাধিক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত, অভিনব ও অলঙ্কারবহুল গদ্যধারা হলো ‘মাকামা’ (المقامة), যার বহুবচন হলো ‘মাকামাত’ (مقامات)। এটি আরবি কথাসাহিত্যের এক অনুপম রূপ যা পরবর্তীতে পশ্চিমা সাহিত্যের ‘পিকারেস্ক উপন্যাস’ (Picaresque Novel)-এর জন্মলগ্নে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল।
শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ
- আভিধানিক অর্থ: ‘মাকামা’ শব্দটি আরবি ‘ক্বামা’ (قام – দাঁড়ানো) ধাতু থেকে ‘মাফ’আল’ (مفعل) ওজনে স্থানবাচক বিশেষ্য (ইসমুল মাকান)। এর মূল অর্থ বসার স্থান, অধিবেশন, মজলিস বা সমাবেশ। জাহেলী যুগে গোত্রপ্রধানদের মজলিস বা বৈঠককে মাকামা বলা হতো।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: সাহিত্য পরিভাষায় মাকামা হলো—“সাজ’ বা অন্ত্যমিলযুক্ত ছন্দোময় গদ্যে রচিত এবং আলঙ্কারিক কবিতায় অলঙ্কৃত একটি সংক্ষিপ্ত নাটকীয় গল্প, যার কেন্দ্রে থাকেন একজন নির্দিষ্ট কথক (راوٍ) এবং একজন ছদ্মবেশী, বাগ্মী ও চতুর ভবঘুরে নায়ক (بطل), যিনি তাঁর অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা ও ভাষার কারুকার্য প্রদর্শন করে মানুষের কাছ থেকে অর্থোপার্জন করেন।”
মাকামার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস
| বিকাশের স্তর | কালখণ্ড ও প্রধান রূপকার | প্রধান বৈশিষ্ট্য ও অবদান |
|---|---|---|
| ১. আদি স্তর ও ভিত্তি | ইবনে দুরাইদ (م. ৩২১ হি.) ও আবু বকর আল-খাওয়ারিজমি | মজলিসে মজার মজার গল্প ও আরবি শব্দকোষের ব্যবহারিক আলোচনা দিয়ে এর গোড়াপত্তন হয়। |
| ২. সৃষ্টির স্বর্ণযুগ (উদ্ভাবক) | বদিউজ্জামান আল-হামাদানী (ম. ৩৯৮ হি.) | তিনিই সর্বপ্রথম ‘ঈসা ইবনে হিশাম’কে কথক এবং ‘আবু ফাতহ আল-ইসকান্দারী’কে নায়ক বানিয়ে ৪০০ মাকামা রচনা করে এই শিল্পের ভিত্তি স্থাপন করেন। |
| ৩. চরম উৎকর্ষ ও পরাকাষ্ঠা | আল-কাসিম ইবনে আলী আল-হারীরি (ম. ৫১৬ হি.) | তিনি ‘আল-হারিস ইবনে হাম্মাম’ ও ‘আবু যায়েদ আস-সারুজী’র মাধ্যমে ৫০টি মাকামা রচনা করেন যা ভাষাতাত্ত্বিক জটিলতা ও অলঙ্কারের চূড়ান্তে পৌঁছায়। |
| ৪. পরবর্তী বিস্তার ও আধুনিকায়ন | জালালুদ্দিন সুয়ূতী (ম. ৯১১ হি.) ও নাসিফ আল-ইয়াযিজী (আধুনিক যুগ) | সুয়ূতী ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক বিষয়ে মাকামা লেখেন; আর আধুনিক যুগে ইয়াযিজী ‘মাজমাউল বাহরাইন’ রচনা করে ক্লাসিক ধারার পুনরুজ্জীবন ঘটান। |
মাকামা সাহিত্যের মৌলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ
- নির্দিষ্ট কথক ও নায়কের উপস্থিতি: প্রতিটি মাকামায় একজন বিশ্বস্ত কথক থাকেন যিনি ঘটনা বর্ণনা করেন এবং একজন ছদ্মবেশী পণ্ডিত নায়ক থাকেন যিনি বিভিন্ন বেশ ধারণ করে উপস্থিত হন।
- সাজ’ ও বাদি’রীতির প্রাচুর্য: মাকামার প্রধান প্রাণ হলো ছন্দোময় গদ্য (السجع), শব্দালঙ্কার (الجناس) এবং বিরল আরবি শব্দের সমাবেশ।
- সামাজিক চিত্রায়ণ: বাহ্যত এটি চাতুর্য মনে হলেও এর গভীরে ছিল তৎকালীন আব্বাসীয় সমাজের রাজনৈতিক অস্থিরতা, বুদ্ধিজীবীদের বেকারত্ব ও সামাজিক অবক্ষয়ের তীব্র রূপক প্রতিবাদ।
৩ (د). اكتب الخلفية التاريخية لتأليف ‘كليلة ودمنة’. [কালিলা ওয়া দিমনা রচনার ঐতিহাসিক পটভূমি ও দর্শন]
ভূমিকা ও পটভূমি
বিখ্যাত পারস্য-আরব পণ্ডিত আব্দুল্লাহ ইবনে আল-মুক্বাফ্ফা (মৃত্যু ১৪২ হি.) কর্তৃক সংস্কৃত পঞ্চতন্ত্র থেকে পাহলভী ও পরবর্তীতে আরবিতে রূপান্তরিত গ্রন্থ ‘কালিলা ওয়া দিমনা’ (كليلة ودمنة) প্রাচ্য সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কালজয়ী নীতিশাস্ত্রীয় গল্পগ্রন্থ। এটি রূপক ও পশুপাখির কথোপকথনের আবরণে মূলত শাসক, রাষ্ট্রনায়ক এবং সাধারণ প্রজাদের জন্য রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, নৈতিক প্রজ্ঞা ও সামাজিক সুরক্ষার অমূল্য দিকনির্দেশনা প্রদান করে। উদ্ধৃত অংশটিতে কারখ এলাকার এক নিষ্ঠাবান আবেদ ও তার অতিথির কথোপকথনের মাধ্যমে প্রজ্ঞাপূর্ণ আত্মতুষ্টি ও লোভের অসারতা তুলে ধরা হয়েছে।
মূল আরবি পাঠ
«قَالَ الْفَيْلَسُوفُ : زَعَمُوا أَنَّهُ كَانَ بِأَرْضِ الْكَرْخِ نَاسِكٌ عَابِدٌ مُجْتَهِدٌ، فَنَزَلَ بِهِ ضَيْفٌ ذَاتَ يَوْمٍ، فَدَعَا النَّاسِكُ لِضَيْفِهِ بِتَمْرٍ لِيَطْرُفَهُ بِهِ، فَأَكَلَا مِنْهُ جَمِيعًا، ثُمَّ قَالَ الضَّيْفُ : مَا أَحْلَى هَذَا التَّمْرَ وَأَطْيَبَهُ! فَلَيْسَ هُوَ فِي بِلَادِي الَّتِي أَسْكُنُهَا وَلَيْتَهُ كَانَ فِيهَا! ثُمَّ قَالَ : أَرَى أَنْ تُسَاعِدَنِي عَلَى أَنْ آخُذَ مِنْهُ مَا أَغْرِسُهُ فِي أَرْضِنَا؟ فَإِنِّي لَسْتُ عَارِفًا بِثِمَارِ أَرْضِكُمْ هَذِهِ وَلَا بِمَوَاضِعِهَا…»
বাংলা ভাবার্থ ও প্রাঞ্জল অর্থ
দার্শনিক বিদ্বা রাজা দেবশলীমকে লক্ষ্য করে বললেন: পণ্ডিতগণ উল্লেখ করেছেন যে, কারখ নামক অঞ্চলে একজন চরম সাধক, পরম ভক্ত ও নিষ্ঠাবান আবেদ ব্যক্তি বাস করতেন। একদিন তাঁর ঘরে এক সম্মানিত অতিথি উপস্থিত হলেন। আবেদ ব্যক্তি তাঁর অতিথিকে উত্তম আপ্যায়ন করানোর নিমিত্তে কিছু সুমিষ্ট খেজুর পেশ করলেন এবং তাঁরা উভয়েই তা তৃপ্তিসহকারে ভক্ষণ করলেন। অতঃপর অতিথি মুগ্ধ হয়ে বললেন: এই খেজুর কতই না মিষ্টি এবং কতই না সুস্বাদু! যে দেশে আমি বসবাস করি সেখানে এমন খেজুর পাওয়া যায় না; আহা, যদি আমাদের দেশেও এটি থাকত! অতঃপর তিনি বললেন: আপনি কি আমাকে এমন কিছু চারা সংগ্রহে সাহায্য করবেন যা আমি আমাদের ভূমিতে গিয়ে রোপণ করতে পারি? কারণ আমি আপনাদের এই দেশের ফলমূল সম্পর্কে সম্যক অবগত নই এবং এর উৎপাদনস্থলগুলোও আমার জানা নেই…
শাব্দিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ
| আরবি শব্দ | শব্দমূল ও অবস্থান | আভিধানিক অর্থ | প্রাসঙ্গিক তাৎপর্য |
|---|---|---|---|
| زَعَمُوا | فعل ماض للغائبين | তারা ধারণা করে / লোকমুখে প্রচলিত | প্রাচীন রূপকথার ঐতিহ্যবাহী প্রারম্ভিক সূচনা বাক্য। |
| نَاسِكٌ | اسم فاعل (ن – س – ك) | দুনিয়াত্যাগী তপস্বী, সংসারবিরাগী | পার্থিব নির্লিপ্ততা ও আধ্যাত্মিক সাধনার প্রতীক চরিত্র। |
| لِيَطْرُفَهُ | لام التعليل + مضارع منصوب | উত্তম উপঢৌকন বা আপ্যায়ন দেওয়া | আরব আতিথেয়তার মহান আদর্শের প্রতিফলন। |
| مَا أَحْلَى | فعل التعجب | কতই না সুমিষ্ট ও মনোরম! | আশ্চর্যান্বিত মুগ্ধতা প্রকাশের ব্যাকরণিক রূপ। |
শিক্ষা ও অন্তর্নিহিত তাৎপর্য
- উপযুক্ততার প্রাকৃতিক বিধান: প্রতিটি অঞ্চলের মাটি, জলবায়ু এবং পরিবেশের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এক ভূখণ্ডের ফল জোরপূর্বক অন্য ভূখণ্ডে রূপান্তর করতে চাওয়া কেবল অযৌক্তিক নয়, বরং প্রকৃতিবিরুদ্ধ কর্ম।
- তৃপ্তি ও অল্পেতুষ্টির শিক্ষা (القناعة): গল্পটির পরবর্তী অংশে আবেদ অতিথিকে উপদেশ দেন যে, আল্লাহ যে অঞ্চলে যা সহজলভ্য করেছেন তাতেই সন্তুষ্ট থাকা হলো বুদ্ধিমত্তার লক্ষণ; অপ্রাপ্য বিষয়ের পেছনে ছুটে শান্তি বিনষ্ট করা নির্বুদ্ধিতা।
- ইবনে আল-মুক্বাফ্ফার সরল গদ্যরীতি (السهل الممتنع): কোনো প্রকার কৃত্রিম জটিলতা ছাড়া অতি প্রাঞ্জল ভাষায় গভীর দার্শনিক তত্ত্ব প্রকাশ করা ছিল ইবনে মুক্বাফ্ফার রচনার কালজয়ী বৈভব।
৪. সংক্ষিপ্ত ও প্রায়োগিক প্রশ্নমালা: أجب عن الاسئلة التالية (الخطبة، العقد الفريد، الأصفهاني، جزاء سنمار، صقر قريش)
ভূমিকা ও পটভূমি
আরব জাতির ইতিহাস, মনস্তত্ত্ব ও প্রজ্ঞা সবচেয়ে নিখুঁতভাবে সংরক্ষিত হয়েছে তাদের কালজয়ী প্রবাদ-প্রবচনে (الأمثال العربية) এবং ঐতিহাসিক উপাধিসমূহে। ফাযিল পরীক্ষায় প্রায়শই ‘জাযাউ সিনেম্মার’ এবং ‘সাকরে কুরাইশ’ সম্পর্কিত প্রশ্ন এসে থাকে। নিচে এদের বিশদ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও শিক্ষা বিশ্লেষণ করা হলো:
১. প্রবাদ: «جَزَاءُ سِنِمَّارَ» (সিনেম্মারের প্রতিদান)
- ঐতিহাসিক পটভূমি (المورد): প্রাচীন হীরা রাজ্যের লাখমি রাজা নু’মান ইবনে ইমরুল কায়েস পারস্য সম্রাটের জন্য এমন এক অতুলনীয় রাজপ্রাসাদ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন যা পৃথিবীর কোথাও নেই। এই কাজের জন্য তিনি তৎকালীন বাইজেন্টাইন অঞ্চলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থপতি ও প্রকৌশলী ‘সিনেম্মার’ (Sinimmar)-কে দায়িত্ব দেন। সিনেম্মার দীর্ঘ বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে মরুভূমির বুকে বিশ্ববিস্ময়কর সুরম্য প্রাসাদ ‘আল-খাওয়ারনাক’ (قصر الخورنق) নির্মাণ করেন।
- বিশ্বাসঘাতকতা ও মর্মান্তিক পরিণতি: প্রাসাদ নির্মাণ শেষে রাজা অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে সিনেমারকে সঙ্গে নিয়ে প্রাসাদের সর্বোচ্চ ছাদে ওঠেন। সিনেমার গর্বভরে রাজাকে বললেন: “মহামান্য সম্রাট! এই প্রাসাদে একটি গোপন নির্দিষ্ট পাথর রয়েছে, যা সরিয়ে ফেললে সম্পূর্ণ প্রাসাদ ধসে পড়বে, আর সেই পাথরের সন্ধান কেবল আমি একাই জানি!” নিষ্ঠুর ও কুচক্রী রাজা ভাবলেন, সিনেমার ভবিষ্যতে অন্য কোনো রাজার জন্য এর চেয়েও সুন্দর প্রাসাদ বানাতে পারে অথবা সে এই গোপন পাথর সরিয়ে প্রাসাদ ধসিয়ে দিতে পারে। তাই রাজা তখনই নির্দেশ দিয়ে বিশ্বস্ত সিনেমারকে প্রাসাদের সর্বোচ্চ চূড়া থেকে নিচে ফেলে দিয়ে হত্যা করেন।
- প্রবাদের প্রয়োগ ও শিক্ষা (المضرب): এরপর থেকেই যখন কেউ কারও চরম উপকার করে বা নিঃস্বার্থ সেবা প্রদান করে, কিন্তু বিনিময়ে উপকারের পরিবর্তে চরম জুলুম, বিশ্বাসঘাতকতা ও নিষ্ঠুরতা লাভ করে, তখন আরব সমাজে বলা হয়: «جَزَانِي جَزَاءَ سِنِمَّارَ» (সে আমাকে সিনেম্মারের মতো প্রতিদান দিল!)। এটি অকৃতজ্ঞতা ও বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে তীব্র ধিক্কারের প্রতীক।
২. ঐতিহাসিক উপাধি: ‘সাকরে কুরাইশ’ (صقر قريش – কুরাইশদের বাজপাখি)
- ব্যক্তিত্বের পরিচয়: ‘সাকরে কুরাইশ’ হলেন স্পেনে স্বাধীন উমাইয়া খেলাফতের প্রতিষ্ঠাতা ১ম আব্দুর রহমান আদ-দাখিল (Abdur Rahman I, ৭৩১-৭৮৮ খ্রি.)।
- নামকরণের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ১৩২ হিজরিতে আব্বাসীয়রা উমাইয়াদের ক্ষমতাচ্যুত করে নির্মমভাবে হত্যাযজ্ঞ চালায়। তরুণ রাজপুত্র আব্দুর রহমান চরম বুদ্ধিমত্তা ও সাহসিকতায় ফোরাত নদী সাঁতরে পার হয়ে এক কাপড়ে পালিয়ে যান। তিনি সুদীর্ঘ পাঁচ বছর যাযাবরের মতো উত্তর আফ্রিকার সাহারা মরুভূমি অতিক্রম করে স্পেনে প্রবেশ করেন। কোনো সৈন্য বা অর্থ না থাকা সত্ত্বেও কেবল ব্যক্তিগত ক্যারিশমা ও রণকৌশলে স্পেনের বিবদমান আরব গোত্রগুলোকে পদানত করে ৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে কর্ডোবায় স্বাধীন উমাইয়া সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেন।
- আব্বাসীয় খলিফা মনসুরের মূল্যায়ন: উমাইয়াদের ঘোর শত্রু আব্বাসীয় খলিফা আবু জাফর আল-মনসুর একদিন তাঁর সভাসদদের জিজ্ঞেস করলেন: “কুরাইশদের মধ্যে প্রকৃত বাজপাখি (صقر قريش) কে?” সবাই একে একে মুয়াবিয়া, আব্দুল মালিক বা মনসুরের নাম নিল। মনসুর বললেন: “না, কারও উত্তর সঠিক হয়নি। কুরাইশদের আসল বাজপাখি হলেন আব্দুর রহমান বিন মুআবিয়া! যে একা মরুভূমি পাড়ি দিয়ে সমুদ্র অতিক্রম করে কোনো সাহায্য ছাড়াই তলোয়ারের জোরে একটি সাম্রাজ্য ছিনিয়ে নিয়েছে এবং নিজের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে।” এই ঐতিহাসিক স্বীকৃতি থেকেই তিনি ইতিহাসে ‘সাকরে কুরাইশ’ নামে খ্যাত হন।
৫ (الف). اكتب حياة طه حسين مع بيان مساهمته فى الأدب العربي. [ত্বহা হুসাইনের জীবন ও আধুনিক আরবি সাহিত্যে তাঁর অবদান]
ভূমিকা ও লেখক পরিচিতি
আধুনিক আরবি সাহিত্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী, বিতর্কিত ও আলোকোজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব হলেন মিসরের জ্ঞানতাপস ড. ত্বহা হুসাইন (Taha Hussein, ১৮৮৯-১৯৭৩ খ্রি.)। আরবি সাহিত্যে তাঁর অতুলনীয় পাণ্ডিত্য, আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বৈপ্লবিক সমালোচনার কারণে তাঁকে সমগ্র আরব বিশ্ব শ্রদ্ধার সাথে ‘আমীদুল আদাবিল আরাবী’ (عميد الأدب العربي – আরবি সাহিত্যের ডিন) উপাধিতে ভূষিত করেছে। শৈশবে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েও তিনি কায়রোর আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় এবং পরবর্তীতে ফ্রান্সের বিখ্যাত সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে মিসরের শিক্ষামন্ত্রী নিযুক্ত হন।
আধুনিক আরবি সাহিত্যে ত্বহা হুসাইনের ঐতিহাসিক অবদান
- ১. বৈজ্ঞানিক সাহিত্য সমালোচনা ও কার্তেসিয়ান পদ্ধতির প্রবর্তন: তিনি ডেকার্টের সন্দেহবাদী যুক্তিপদ্ধতি প্রয়োগ করে প্রাক-ইসলামি কবিতার ওপর তাঁর আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ ‘ফিল আদাবিল জাহেলী’ (في الأدب الجاهلي) রচনা করেন। এতে তিনি অন্ধ অন্ধবিশ্বাস বর্জন করে বস্তুনিষ্ঠ তথ্যপ্রমাণের ওপর সাহিত্য বিচারের ধারা তৈরি করেন।
- ২. ইসলামি ইতিহাসের নবমূল্যায়ন: ইসলামের ইতিহাসের প্রথম গৃহযুদ্ধ ও খলিফাদের সংকট নিয়ে তিনি রচনা করেন সুবিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-ফিতনাতুল কুবরা’ (الفِتْنَةُ الْكُبْرَى), যাতে তিনি নিরপেক্ষ ও গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন।
- ৩. প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সেতুবন্ধন: ফরাসি ও গ্রিক ক্লাসিক্যাল সাহিত্যের দর্শন তিনি আরবিতে সফলভাবে আত্মীকরণ করেন এবং মিসরের শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক রূপ দান করেন।
আত্মজীবনী ‘আল-আইয়্যাম’ (الأيام) ও এর সাহিত্যিক মূল্য
ত্বহা হুসাইনের কালজয়ী মাস্টারপিস রচনা হলো তাঁর তিন খণ্ডে বিভক্ত আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘আল-আইয়্যাম’ (The Days – দিনগুলি)। এটি আধুনিক আরবি সাহিত্যের প্রথম শিল্পোত্তীর্ণ আত্মজীবনী হিসেবে বিশ্বসাহিত্যে স্বীকৃত।
- অনুপম বর্ণনাভঙ্গি (ضمير الغائب): ত্বহা হুসাইন এই গ্রন্থে নিজেকে ‘আমি’ বলে অহমিকা প্রকাশ করেননি; বরং তৃতীয় পুরুষের সর্বনাম ব্যবহার করে নিজেকে ‘সাহেবুনাহ’ (صَاحِبُنَا – আমাদের বন্ধু) বা ‘আল-ফাতা’ (الْفَتَى – তরুণটি) হিসেবে নির্লিপ্ত ও নিরপেক্ষ ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছেন।
- অন্ধ জীবনের মর্মস্পর্শী সংগ্রাম: মাত্র তিন বছর বয়সে গ্রামীণ হাতুড়ে চিকিৎসার কারণে চোখের দৃষ্টি চিরতরে হারিয়ে ফেলার গভীর বেদনা, পল্লী সমাজের অজ্ঞতা, এবং আল-আজহারের রক্ষণশীল শিক্ষকদের একঘেয়ে পাঠদানের চিত্র তিনি নিপুণ ব্যঙ্গ ও কৌতুকের সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন।
- সাফল্যের অনুপ্রেরণা: চরম প্রতিকূলতা ও দারিদ্র্যকে জয় করে কীভাবে একজন দৃষ্টিহীন তরুণ বিশ্বের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ জয় করতে পারে, ‘আল-আইয়্যাম’ মানব ইতিহাসের সেই অপরাজেয় ইচ্ছাশক্তির এক অমর মহাকাব্য। এটি বিশ্বের বহু আন্তর্জাতিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
উপসংহার
ড. ত্বহা হুসাইন আরবি সাহিত্যকে মধ্যযুগীয় জড়তা থেকে মুক্ত করে একবিংশ শতাব্দীর বৈজ্ঞানিক যুগে প্রবেশ করিয়েছিলেন। অন্ধত্ব তাঁর চোখের দৃষ্টি কেড়ে নিলেও তিনি সমগ্র আরব জাতিকে দূরদৃষ্টি ও মুক্তচিন্তার আলো উপহার দিয়ে গেছেন।
৫ (ب). تحدث عن الحقوق الإنسانية التي ذكرها رسول الله صلى الله عليه وسلم في خطبة حجة الوداع. [বিদায় হজের ভাষণে ঘোষিত সার্বজনীন মানবাধিকার]
ভূমিকা ও প্রেক্ষাপট
দশম হিজরিতে অনুষ্ঠিত বিদায় হজের ভাষণ কেবল ধর্মীয় বিধানের সারসংক্ষেপ ছিল না, বরং আধুনিক জাতিসংঘের ১৯৪৮ সালের মানবাধিকার ঘোষণার ১৪০০ বছর পূর্বেই বিশ্বমানবতার জন্য প্রথম ও শ্রেষ্ঠতম ‘সার্বজনীন মানবাধিকারের ম্যাগনাকার্টা’ (Universal Charter of Human Rights)। জাহেলী আরবের দাসত্ব, বর্ণবাদ, নারীর অবমাননা এবং রক্তের প্রতিশোধের ঘনঘোর অন্ধকারে দাঁড়িয়ে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) যে যুগান্তকারী অধিকারের ঘোষণা দিয়েছিলেন, তা নিচে বিশদভাবে আলোচিত হলো:
বিদায় হজের ভাষণে ঘোষিত প্রধান মানবাধিকারসমূহ
- ১. জীবনের অধিকার ও রক্তের পবিত্রতা (حق الحياة وحرمة الدماء):
মহানবী (সা.) ঘোষণা করেন: «إِنَّ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ وَأَعْرَاضَكُمْ عَلَيْكُمْ حَرَامٌ، كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا، فِي شَهْرِكُمْ هَذَا، فِي بَلَدِكُمْ هَذَا» (নিশ্চয়ই তোমাদের রক্ত, তোমাদের ধন-সম্পদ এবং তোমাদের ইজ্জত-সম্মান তোমাদের পরস্পরের জন্য তেমনি পবিত্র ও অলঙ্ঘনীয়, যেমন আজকের এই দিন, এই মাস এবং এই পবিত্র মক্কা নগরী পবিত্র)। জাহেলী যুগের বংশপরম্পরায় চলে আসা সমস্ত রক্তের বদলা (কিসাস) তিনি চিরতরে রদ ঘোষণা করেন এবং নিজের চাচাতো ভাই ইবনে রাবিয়া ইবনুল হারিসের রক্তের দাবি ত্যাগের মাধ্যমে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
- ২. সম্পত্তির অধিকার ও অর্থনৈতিক শোষণমুক্তির ঘোষণা:
কারও সম্পদ তার সন্তুষ্ট চিত্তের অনুমতি ব্যতীত জোরপূর্বক হরণ করা হারাম ঘোষণা করা হয়। পুঁজিবাদী ও সুদের সমস্ত শোষণের অবসান ঘটিয়ে তিনি ঘোষণা করেন: «وَإِنَّ كُلَّ رِبًا مَوْضُوعٌ» (জাহেলী যুগের সমস্ত সুদ চিরতরে রহিত করা হলো)। তিনি নিজের চাচা আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের সমস্ত অনাদায়ী সুদ বাতিলের মাধ্যমে বাস্তবায়ন শুরু করেন।
- ৩. নারীজাতির মর্যাদা ও অধিকারের যুগান্তকারী সনদ:
নারীদের ভোগ্যপণ্য ও অপমানজনক অবস্থান থেকে মুক্ত করে সমমর্যাদা প্রদান করে তিনি বলেন: «فَاتَّقُوا اللَّهَ فِي النِّسَاءِ، فَإِنَّكُمْ أَخَذْتُمُوهُنَّ بِأَمَانِ اللَّهِ» (নারীদের অধিকারের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো; কেননা তোমরা আল্লাহর আমানত ও প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে তাদের গ্রহণ করেছ। তাদের ওপর যেমন তোমাদের অধিকার আছে, তোমাদের ওপরও তাদের তেমনি ন্যায্য অধিকার রয়েছে)।
- ৪. বর্ণবাদ ও জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের চিরতরে বিলোপ:
তিনি সাম্যের ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন: «لَا فَضْلَ لِعَرَبِيٍّ عَلَى أَعْجَمِيٍّ، وَلَا لِعَجَمِيٍّ عَلَى عَرَبِيٍّ، وَلَا لِأَحْمَرَ عَلَى أَسْوَدَ، وَلَا لِأَسْوَدَ عَلَى أَحْمَرَ إِلَّا بِالتَّقْوَى» (কোনো আরবের ওপর অনারবের, কিংবা অনারবের ওপর আরবের, কোনো শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের, কিংবা কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হলো তাকওয়া বা খোদাভীতি)।
- ৫. দাস-দাসী ও শ্রমজীবী মানুষের অধিকার:
অধীনস্থদের সম্পর্কে তিনি নির্দেশ দেন: তোমরা যা আহার করবে তাদেরও তা খাওয়াবে, তোমরা যা পরিধান করবে তাদেরও তা পরাবে। তারা তোমাদেরই ভাই।
উপসংহার
বিদায় হজের এই মানবিক ঘোষণা কোনো পরাশক্তির চাপিয়ে দেওয়া সনদ ছিল না; বরং আল্লাহর তাওহিদ ও আখিরাতের জবাবদিহিতার ওপর প্রতিষ্ঠিত এক শাশ্বত জীবনব্যবস্থা। এটি কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির ইনসাফ ও শান্তির দিশারী হয়ে থাকবে।
৫ (ج). اكتب نبذة عن حياة ابن المقفع ودوره فى الأدب العربي. [আব্দুল্লাহ ইবনে আল-মুক্বাফ্ফার জীবন ও আরবি গদ্যে তাঁর ভূমিকা]
ভূমিকা ও পরিচিতি
আরবি শৈল্পিক ও মননশীল গদ্যের (النثر الفني) প্রকৃত স্থপতি এবং অনুবাদ সাহিত্যের মহান জনক হলেন পারস্য বংশোদ্ভূত মনীষী আবু মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ ইবনে আল-মুক্বাফ্ফা (Ibn al-Muqaffa, ১০৬-১৪২ হি. / ৭২৪-৭৫৯ খ্রি.)। তিনি উমাইয়া যুগের শেষভাগে ও আব্বাসীয় খেলাফতের সূচনাপর্বে বসরায় সরকারি সচিব ও বুদ্ধিজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আরবি গদ্যকে প্রশাসনিক দলিলের গণ্ডি থেকে মুক্ত করে দর্শন, নীতিশাস্ত্র ও নান্দনিক কথাসাহিত্যের স্তরে উন্নীত করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়।
আরবি সাহিত্যে ইবনে আল-মুক্বাফ্ফার ঐতিহাসিক অবদানসমূহ
- ১. অনুপম সরল গদ্যরীতির প্রবর্তন (السهل الممتنع): ইবনে মুক্বাফ্ফার পূর্বে আরবি গদ্য ছিল কৃত্রিম, দুর্বোধ্য ও বেদুইন শব্দের ভারে ভারাক্রান্ত। তিনি এমন এক প্রাঞ্জল, সুসংহত ও সহজবোধ্য ভাষারীতি উপহার দেন যা শুনতে সহজ মনে হয় কিন্তু অনুকরণ করা অত্যন্ত কঠিন। একে আরবিতে ‘আস-সাহলুল মুমতানি’ বলা হয়।
- ২. কালজয়ী গ্রন্থ ‘কালিলা ওয়া দিমনা’ (كليلة ودمنة): সংস্কৃত পঞ্চতন্ত্রের কাহিনি পাহলভী থেকে আরবিতে রূপান্তর করে তিনি প্রাচ্যের রাজনীতি, শাসনব্যবস্থা ও নৈতিকতার যে রূপক উপস্থাপন করেন, তা আজ পর্যন্ত আরবি ক্লাসিক গদ্যের শিখর হিসেবে বিবেচিত।
- ৩. মৌলিক নৈতিক ও রাজনৈতিক গ্রন্থাবলি: তিনি কেবল অনুবাদক ছিলেন না; বরং তাঁর মৌলিক রচনা ‘আল-আদাবুল কাবীর’ (الأدب الكبير) হলো রাষ্ট্রনায়ক ও প্রশাসকদের আচরণবিধি; ‘আল-আদাবুস্ সাগীর’ (الأدب الصغير) হলো ব্যক্তির আত্মশুদ্ধি ও সামাজিক সদাচরণের সংকলন; এবং ‘রিসালাতুস সাহাবাহ’ (رسالة الصحابة) হলো আব্বাসীয় খলিফা মনসুরের নিকট প্রেরিত বিচার ও সেনা সংস্কারের এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সুপারিশমালা।
- ৪. ফারসি প্রজ্ঞা ও আরবি ভাষার সমন্বয়: তিনি পারস্যের প্রাচীন রাজকীয় দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞাকে আরবি ভাষার অলঙ্কারশাস্ত্রের সাথে মিশ্রিত করে এক অনন্য সংকর বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের জন্ম দেন।
মর্মান্তিক সমাপ্তি ও শাহাদাত
তাঁর প্রচণ্ড মেধা, সততা এবং স্বাধীনচেতা মনোভাব তৎকালীন বসরার গভর্নর সুফিয়ান ইবনে মুআবিয়ার চরম শত্রুতার কারণ হয়। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে খলিফা মনসুরের ইঙ্গিতে তাঁকে জিন্দিক (ধর্মদ্রোহী)-এর মিথ্যা অপবাদ দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
উপসংহার
ইবনে আল-মুক্বাফ্ফা ক্ষণজন্মা মনীষী ছিলেন। আরবি গদ্যের ইতিহাসে তিনি যে পরিশীলিত ধারার সূচনা করেছিলেন, পরবর্তীতে আল-জাহিজ, বদিউজ্জামান এবং আধুনিক যুগের মানফালূতি সেই ধারাকেই আরও প্রস্ফুটিত করেছেন।
৫ (د). بين خصائص الأدب العربي في العصر العباسي. [আব্বাসীয় যুগে আরবি গদ্য সাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ]
ভূমিকা ও পটভূমি
আব্বাসীয় খিলাফতের শাসনকাল (১৩২-৬৫৬ হি. / ৭৫০-১২৫৮ খ্রি.) কেবল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নয়, বরং জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ছিল ‘আরবি সাহিত্যের স্বর্ণযুগ’ (العصر الذهبي للأدب العربي)। খলিফা মনসুর, হারুনুর রশীদ এবং আল-মামুনের আমলে প্রতিষ্ঠিত ‘বায়তুল হিকমাহ’-কে কেন্দ্র করে বিশ্বজ্ঞানভাণ্ডার আরবিতে অনূদিত হয়। এই যুগে আরবি গদ্য কবিতাকেও ছাড়িয়ে চিন্তা ও দর্শনের প্রধান মাধ্যমে পরিণত হয়।
আব্বাসীয় যুগের আরবি গদ্যের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ
- ১. জ্ঞান-বিজ্ঞান ও দর্শনের ব্যাপক প্রভাব (التأثر بالعلوم والفلسفة): গ্রিক দর্শন, ভারতীয় গণিত ও পারস্যের ইতিহাস আরবিতে অনূদিত হওয়ার ফলে গদ্যের ভাষা যুক্তিনিষ্ঠ, দার্শনিক ও বিশ্লেষণধর্মী রূপ পরিগ্রহ করে। শব্দের চেয়ে তথ্যের গভীরতা প্রাধান্য পায়।
- ২. বৈচিত্র্যময় গদ্যরীতির উন্মেষ: আব্বাসীয় যুগে প্রধান তিনটি গদ্যধারার বিকাশ ঘটে:
- ইবনে মুক্বাফ্ফার ধারা (مذهب ابن المقفع): প্রাঞ্জল, সুসংহত ও সহজবোধ্য নীতিগর্ভ গদ্য।
- আল-জাহিজের ধারা (مذهب الجاحظ): তথ্যের সমুদ্র, যুক্তিবাদ, সূক্ষ্ম রসিকতা ও মানবচরিত্রের বাস্তববাদী রূপায়ণ (কিতাবুল বায়ান ওয়াত তাবয়ীন, কিতাবুল হায়ওয়ান)।
- কাজী আল-ফাদিল ও কাতেবদের ধারা: অলঙ্কারবহুল, ছন্দোময় ও ক্লাসিক্যাল সাজ’যুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক গদ্য।
- ৩. সম্পূর্ণ নতুন সাহিত্যিক রূপ ‘মাকামা’র জন্ম: বদিউজ্জামান আল-হামাদানী এবং আল-হারীরির হাত ধরে অলঙ্কারসমৃদ্ধ ও নাটকীয় আখ্যান ‘মাকামা’ ধারার সূচনা ঘটে, যা আরবি গদ্যে যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটায়।
- ৪. পত্রসাহিত্য ও বিশ্বকোষের বিস্তার: সরকারি দপ্তরের ‘রিসালাহ দিওয়ানিয়্যাহ’ এবং ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের ‘রিসালাহ ইখওয়ানিয়্যাহ’-র ব্যাপক প্রচলন ঘটে। ইবনে আব্দে রাব্বিহীর ‘আল-ইকদুল ফারীদ’ এবং ইসফাহানীর ‘কিতাবুল আগানী’-র মতো বিশাল বিশ্বকোষ এই যুগেই সংকলিত হয়।
- ৫. বিদেশি ও পারিভাষিক শব্দের আত্মীকরণ: বৈজ্ঞানিক পরিভাষা, চিকিৎসাবিদ্যা ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের নতুন নতুন শব্দ আরবি ভাষার কাঠামোর সাথে সমন্বয় করে গদ্যের শব্দভাণ্ডারকে বহুগুণ সমৃদ্ধ করা হয়।
উপসংহার
ঐতিহাসিক পি. কে. হিট্টির মতে, আব্বাসীয় যুগের গদ্য কেবল আরব বিশ্বের নয়, তৎকালীন সমগ্র সভ্য পৃথিবীর বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রযাত্রাকে নেতৃত্ব দিয়েছিল এবং মধ্যযুগীয় ইউরোপের রেনেসাঁসের পথ প্রশস্ত করেছিল।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
কালিলা ওয়া দিমনা গ্রন্থটির মূল উৎস কী ছিল?
সংস্কৃত পঞ্চতন্ত্রের কাহিনি, যা পাহলভী থেকে আব্দুল্লাহ ইবনে আল-মুক্বাফ্ফা আরবিতে রূপান্তর করেন।
‘সাকরে কুরাইশ’ কার ঐতিহাসিক উপাধি এবং কেন দেওয়া হয়েছিল?
স্পেনের উমাইয়া খিলাফতের প্রতিষ্ঠাতা ১ম আব্দুর রহমান আদ-দাখিলকে তাঁর অসীম সাহসিকতা ও একা একটি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার কারণে আব্বাসীয় খলিফা মনসুর এই উপাধি দেন।
ত্বহা হুসাইনের বিখ্যাত আত্মজীবনীর নাম কী?
‘আল-আইয়্যাম’ (الأيام – দিনগুলি)।
‘জাযাউ সিনেম্মার’ প্রবাদটি কী অর্থে ব্যবহৃত হয়?
কারও চরম উপকারের বিনিময়ে উপকারের পরিবর্তে চরম জুলুম, বিশ্বাসঘাতকতা ও নিষ্ঠুরতা লাভ করার ক্ষেত্রে এই প্রবাদ বলা হয়।
বিদায় হজের ভাষণে বংশীয় আভিজাত্যের ব্যাপারে কী ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল?
কোনো আরবের ওপর অনারবের এবং অনারবের ওপর আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই; শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি তাকওয়া।
আব্বাসীয় যুগের অন্যতম প্রধান গদ্যরীতি কোনটি?
আল-জাহিজের যুক্তিনিষ্ঠ ও বাস্তববাদী ধারা এবং মাকামা সাহিত্যের অলঙ্কারবহুল ধারা।

