ইসলামি অর্থনীতি ৩য় পত্র (Islamic Economics 3rd Paper) – 439, ইসলামি অর্থনীতি – ফাযিল পাস ৩য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২১

StudyBoi StudyBoi
September 26, 2026
আপডেট: September 27, 2026
৫২ মিনিট পড়ার সময়
১ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন

ফাযিল (স্নাতক) পাস ৩য় বর্ষ পরীক্ষা – ২০২১
ইসলামি অর্থনীতি (ঐচ্ছিক) তৃতীয় পত্র
বিষয় কোড: ৪৩৯
সময় : ৩ ঘণ্টা | পূর্ণমান : ১০০
[দ্রষ্টব্য : ডান পাশের সংখ্যা প্রশ্নের পূর্ণমান জ্ঞাপক। যে-কোনো পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ফাযিল (স্নাতক) পাস ৩য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২১-এর ইসলামি অর্থনীতি ৩য় পত্র (বিষয় কোড: ৪৩৯) [ইসলামি ব্যাংকিং, বিমা ও মুদ্রা ব্যবস্থা] পরীক্ষার মূল প্রশ্নপত্রের প্রতিটি প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ ও প্রামাণ্য অ্যাকাডেমিক সমাধান নিচে দেওয়া হলো। ফাযিল ডিগ্রি ও অনার্স শ্রেণির ২০ নম্বরের রচনামূলক প্রশ্নের উচ্চমান বজায় রেখে ভূমিকা, ব্যাংকিং ও আর্থিক তত্ত্ব, কুরআন ও সুন্নাহর দলিল, বিশ্লেষণী তুলনামূলক ছক/পয়েন্ট এবং উপসংহার সহযোগে প্রতিটি উত্তর প্রস্তুত করা হয়েছে।

১। ব্যবসার সংজ্ঞা দাও। কোন কোন দ্রব্য ও সেবার ক্রয়-বিক্রয় ইসলামে নিষিদ্ধ? কেন? ব্যাখ্যা কর।

[মান: ৫ + ১৫ = ২০]

ভূমিকা:
ব্যবসা-বাণিজ্য মানবজাতির আর্থিক জীবনের প্রধান স্তম্ভ। ইসলাম ব্যবসাকে সর্বোচ্চ সম্মান ও হালাল ঘোষণা করেছে। তবে পুঁজিবাদী মুক্তবাজারের মতো ইসলাম যা খুশি তা-ই কেনাবেচার অবাধ লাইসেন্স দেয়নি। সমাজকে শারীরিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অবক্ষয় থেকে রক্ষা করতে ইসলাম নির্দিষ্ট কিছু পণ্য ও সেবার ক্রয়-বিক্রয়কে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ (হারাম) করেছে।

১. ব্যবসার সংজ্ঞা:
মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে পারস্পরিক সন্তুষ্টির ভিত্তিতে হালাল পণ্য ও সেবার উৎপাদন, বণ্টন ও লেনদেন সংক্রান্ত সমুদয় মানবিক অর্থনৈতিক প্রচেষ্টাকে ইসলামে ব্যবসা (আল-বাই) বলে।

২. যেসব দ্রব্য ও সেবার ক্রয়-বিক্রয় ইসলামে নিষিদ্ধ এবং তার কারণসমূহ:
১. মদ ও সকল প্রকার মাদকদ্রব্য: মদ, গাঁজা, হেরোইন, ইয়াবাসহ সকল নেশাজাতীয় পণ্যের উৎপাদন, পরিবহন, বিপণন ও বিক্রয় সম্পূর্ণ হারাম। কারণ এগুলো মানুষের বিবেক-বুদ্ধি বিনষ্ট করে এবং সমাজে অপরাধের বিস্তার ঘটায়।
২. শূকর, মৃত প্রাণী ও রক্ত: কুরআনে এগুলোকে স্বভাবগত অপবিত্র (রিজস) ঘোষণা করা হয়েছে। যে জিনিস খাওয়া হারাম, তার ব্যবসায়িক বেচাকেনাও হারাম।
৩. মূর্তি, ভাস্কর্য ও পর্নোগ্রাফিক সামগ্রী: যা কিছু শিরক ও অশ্লীলতাকে উৎসাহিত করে এবং পারিবারিক মূল্যবোধ ধ্বংস করে, তার বাণিজ্য ইসলামে অমার্জনীয় অপরাধ।
৪. জুয়া, লটারি ও বাজি ধরার সরঞ্জাম: অপরের অর্থ বিনা পরিশ্রমে অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করার সকল মাধ্যম ইসলামে নিষিদ্ধ।
৫. অনৈসলামিক সেবা (দেহব্যবসা ও জ্যোতিষবিদ্যা): দেহব্যবসা, গণকগিরি বা ভাগ্যগণনার মাধ্যমে পারিশ্রমিক গ্রহণ সম্পূর্ণ হারাম।
৬. চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইকৃত মাল: ছিনতাইকৃত বা চোরাই মাল জেনেবুঝে ক্রয়-বিক্রয় করা গুনাহে অংশীদার হওয়ার নামান্তর।
৭. অনিশ্চিত ও অদৃশ্য পণ্য (গারার): বিক্রেতার দখলে নেই এমন জিনিস বা পানিতে ভাসমান মাছ বিক্রি করা নিষেধ; কারণ এতে বিরোধের সৃষ্টি হয়।

উপসংহার:
ইসলামে ক্ষতিকর দ্রব্য ও সেবার নিষেধাজ্ঞা কোনো সংকীর্ণতা নয়; এটি সমগ্র মানবজাতিকে শারীরিক রোগ, মানসিক বিকৃতি ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষা করার ঐশী দুর্গ।

২। রিবা কী? রিবার আর্থ-সামাজিক কুফলসমূহ আলোচনা কর।

[মান: ৫ + ১৫ = ২০]

ভূমিকা:
ইসলামি অর্থনীতিতে সর্বাপেক্ষা ঘৃণিত ও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ বিষয় হলো সুদ বা রিবা (Riba)। এটি এমন এক মারাত্মক সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যাধি যা মানব সভ্যতার নীতি-নৈতিকতা, দয়া ও মানবিকতাকে ধ্বংস করে দেয় এবং মুষ্টিমেয় পুঁজিপতির হাতে সমগ্র জাতির সম্পদ কুক্ষিগত করে। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে সুদের মতো এত কঠোর ভাষা অন্য কোনো পাপের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়নি।

১. রিবার কোরআন ও সুন্নাহর ঘোষণা:
আল্লাহ তাআলা সুদখোরদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধের ঘোষণা দিয়ে ইরশাদ করেছেন:
فَإِن لَّمْ تَفْعَلُوا فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ
“যদি তোমরা সুদ বর্জন না করো, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা জেনে নাও।” (সূরা আল-বাকারা: ২৭৯)। রাসূলুল্লাহ (সা.) সুদ গ্রহণকারী, সুদ প্রদানকারী, সুদের হিসাব লেখক এবং সুদের দুই সাক্ষীর ওপর সমানভাবে অভিশাপ দিয়েছেন।

২. রিবার মারাত্মক আর্থ-সামাজিক কুফলসমূহ:
১. সম্পদের চরম বৈষম্য ও পুঞ্জীভবন: সুদের কারণে সমাজের খেটে খাওয়া মানুষের কষ্টার্জিত সঞ্চয় ধনাঢ্য পুঁজিপতিদের ভল্টে চলে যায়। ফলে ধনীরা আরও ধনী হয় এবং গরিব আরও নিঃস্ব হয়ে পড়ে।
২. মুদ্রাস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি: উৎপাদক ব্যাংক থেকে চড়া সুদে ঋণ নিলে সুদের খরচ পণ্যের উৎপাদন খরচের সাথে যোগ করে। ফলে পণ্যের খুচরা মূল্য বৃদ্ধি পায় এবং সাধারণ ভোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
৩. অর্থনৈতিক মন্দা ও বেকারত্ব: সুদের বোঝা বহন করতে না পেরে কলকারখানা বন্ধ হয়ে যায় এবং উদ্যোক্তারা দেউলিয়া হয়, ফলে লাখ লাখ শ্রমিক চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে পড়ে।
৪. কৃত্রিম ঋণ ফাঁদ ও দাসত্ব: তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের চড়া সুদের ঋণ শোধ করতে গিয়ে জাতীয় বাজেটের সিংহভাগ হারিয়ে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়।
৫. মানবিক সহমর্মিতা ধ্বংস: সুদের মানসিকতা মানুষের অন্তর থেকে পারস্পরিক দানশীলতা, করযে হাসানা ও দরদমাখা মানবিক অনুভূতিকে হত্যা করে চরম স্বার্থপর পশুর রূপ দেয়।
৬. সামাজিক অস্থিরতা ও আত্মহত্যা: মহাজনি সুদ বা চড়া সুদের ঋণের কিস্তি দিতে না পেরে অসংখ্য কৃষক ও পরিবারের আত্মহত্যার খবর প্রায়শই সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়।

উপসংহার:
সুদ একটি বিষাক্ত অর্থনৈতিক ক্যান্সার। এই অভিশাপ থেকে মানবজাতিকে রক্ষা করতে সুদমুক্ত ইসলামি ব্যাংকিং ও আর্থিক ব্যবস্থার বিকল্প নেই।

৩। ইসলামি ব্যাংকের সংজ্ঞা দাও। দারিদ্র্য দূরীকরণে ইসলামি ব্যাংকের ভূমিকা আলোচনা কর।

[মান: ৫ + ১৫ = ২০]

ভূমিকা:
একটি কল্যাণকামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো সমাজের প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের দারিদ্র্যের করাল গ্রাস থেকে মুক্ত করা। গতানুগতিক ব্যাংকগুলো গরিবের কাছে ঋণ দেয় না কারণ গরিবের জামানত (Collateral) থাকে না। এই অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থা মানবতা ও ইনসাফের ভিত্তিতে দারিদ্র্য বিমোচনের কার্যকর মডেল বাস্তবায়ন করেছে।

১. ইসলামি ব্যাংকের প্রামাণ্য সংজ্ঞা:
যে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামি শরীয়তের অনুশাসন অনুযায়ী পরিচালিত হয়ে সকল প্রকার সুদ বর্জন করে এবং সমাজের সার্বিক সামাজিক সুবিচার ও অর্থনৈতিক কল্যাণের লক্ষ্যে অংশীদারিত্ব ও সম্পদভিত্তিক লেনদেনের মাধ্যমে সেবা দেয়, তাকে ইসলামি ব্যাংক বলে।

২. দারিদ্র্য দূরীকরণে ইসলামি ব্যাংকের ভূমিকা ও কৌশল:
১. পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প (Rural Development Scheme – RDS): ইসলামি ব্যাংকগুলো জামানতবিহীন ক্ষুদ্র বিনিয়োগের মাধ্যমে গ্রামীণ কৃষকদের ও দরিদ্র নারীদের ছাগল পালন, হাঁস-মুরগি খামার, হস্তশিল্প ও শাকসবজি চাষে মূলধন দেয়। এতে লাখ লাখ পরিবার ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে স্বাবলম্বী হয়েছে।
২. ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও প্রশিক্ষণ: ব্যাংক কেবল টাকাই দেয় না; বরং দরিদ্র বেকারদের কারিগরি প্রশিক্ষণ ও বিপণন পরামর্শ দিয়ে দক্ষ উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলে।
৩. করযে হাসানা ও সামাজিক অনুদান: চিকিৎসায় অক্ষম, বন্যায় নিঃস্ব বা আকস্মিক বিপদে পড়া দরিদ্র ব্যক্তিদের সম্পূর্ণ সুদমুক্ত ঋণ (করযে হাসানা) ও এককালীন অনুদান দিয়ে সাহায্য করা হয়।
৪. যাকাত ফান্ডের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহার: প্রতি বছর ব্যাংকের কোটি কোটি টাকার নিজস্ব যাকাত তহবিল দিয়ে ছিন্নমূল মানুষদের ঘরবাড়ি নির্মাণ, নলকূপ স্থাপন, ভ্যানগাড়ি ও রিকশা কিনে দিয়ে স্থায়ী পুনর্বাসন করা হয়।
৫. শিক্ষা বৃত্তি ও ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ: দরিদ্র মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়মিত বৃত্তি প্রদান করে তাদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেওয়া হয়, যা একটি পরিবারের চিরস্থায়ী দারিদ্র্য দূরীকরণে সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার।

উপসংহার:
ইসলামি ব্যাংক কোনো একক পুঁজিপতির ব্যাংক নয়; এটি সর্বস্তরের মানুষের অর্থনৈতিক আশার প্রতীক। দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গঠনে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের ভূমিকা অনন্য।

৪। ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক কী? ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকের উদ্দেশ্য ও কার্যাবলি আলোচনা কর।

[মান: ৫ + ১৫ = ২০]

ভূমিকা:
মুসলিম বিশ্বের সার্বিক অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জন এবং পশ্চিমাদের চড়া সুদের ঋণজাল থেকে মুসলিম দেশগুলোকে মুক্ত করার ঐতিহাসিক প্রয়োজনে ১৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংক (IDB)। এটি ওআইসিভুক্ত ৫৭টি মুসলিম দেশের সমন্বয়ে গঠিত একটি শীর্ষ বহুপাক্ষিক সুদমুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান। বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর অর্থনৈতিক সংহতির এটি একটি জীবন্ত প্রতীক।

১. ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংকের মূল উদ্দেশ্যসমূহ:
১. মুসলিম উম্মাহর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি: সদস্য দেশগুলোর সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক অগ্রগতিকে শরিয়তের নীতি অনুযায়ী ত্বরান্বিত করা।
২. সদস্য দেশসমূহের পারস্পরিক বাণিজ্য বৃদ্ধি: মুসলিম দেশগুলো যাতে নিজেদের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য বৃদ্ধি করে অর্থনৈতিক ঐক্য গড়ে তুলতে পারে।
৩. দারিদ্র্য বিমোচন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি: সদস্য দেশগুলোর প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মৌলিক মানবিক প্রয়োজন পূরণ ও আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।
৪. ইসলামি ব্যাংকিং ও গবেষণার প্রসার: বিশ্বব্যাপী সুদমুক্ত ইসলামি ব্যাংকিং ও অর্থনৈতিক গবেষণার সার্বিক বিস্তার ও প্রাতিষ্ঠানিক মানদণ্ড নির্ধারণ করা।

২. ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংকের প্রধান প্রধান কার্যাবলি:
১. অবকাঠামো নির্মাণে দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়ন: সদস্য দেশসমূহে সেতু, হাইওয়ে, গভীর সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও বাঁধ নির্মাণে সুদমুক্ত ইজারা ও কিস্তিতে অর্থায়ন করা।
২. বাণিজ্য অর্থায়ন (ITFC): তেল, খাদ্যশস্য ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানির জন্য সদস্য দেশসমূহকে সহজ শর্তে স্বল্পমেয়াদী ট্রেড ফাইন্যান্স প্রদান।
৩. কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা: অনুন্নত মুসলিম দেশগুলোতে প্রযুক্তি হস্তান্তর, বিশেষজ্ঞ পরামর্শক নিয়োগ এবং গবেষণা প্রকল্প পরিচালনা করা।
৪. শিক্ষা বৃত্তি ও মানবসম্পদ উন্নয়ন: বিশ্বব্যাপী মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষা ও পিএইচডি বৃত্তি প্রদান এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিজ্ঞান গবেষণাগার স্থাপন।
৫. বিশেষ ত্রাণ তহবিল ও জরুরি সহায়তা: যুদ্ধ, ভূমিকম্প, খরা ও মহামারীতে ক্ষতিগ্রস্ত সদস্য দেশে এবং অমুসলিম দেশের সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠীর কল্যাণে বিশেষ অনুদান প্রদান।

উপসংহার:
আইডিবি বিশ্ব মুসলিম জাহানের এক অমূল্য আর্থিক সম্পদ। এই ব্যাংকের কর্মপরিধি যত শক্তিশালী হবে, মুসলিম বিশ্বের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা তত বেশি সুদৃঢ় হবে।

৫। প্রচলিত ব্যাংকিং কী? বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকের প্রতিষ্ঠা ও ক্রমোন্নতির ইতিহাস বর্ণনা কর।

[মান: ৫ + ১৫ = ২০]

ভূমিকা:
একটি আধুনিক রাষ্ট্রের অর্থপ্রবাহ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি হলো ব্যাংকিং ব্যবস্থা। বিশ্বে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত বাণিজ্যিক ব্যাংকিং একচ্ছত্র রাজত্ব করলেও তা সুদের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকায় সামাজিক বৈষম্যের জন্ম দেয়। এর বিপরীতে বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠা এক যুগান্তকারী অর্থনৈতিক বিপ্লবের সূচনা করেছে।

১. প্রচলিত ব্যাংকিং কী?
যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা পূর্বনির্ধারিত সুদের ভিত্তিতে জনসাধারণের নিকট থেকে উদ্বৃত্ত অর্থ আমানত হিসেবে গ্রহণ করে এবং অধিক সুদের হারে ব্যবসায়ী ও ঋণগ্রহীতাদের ঋণ প্রদান করে মধ্যবর্তী সুদের ব্যবধানকে (Interest Spread) নিজের প্রধান মুনাফা হিসেবে গ্রহণ করে, তাকে প্রচলিত বা সুদি বাণিজ্যিক ব্যাংকিং (Conventional Banking) বলে।

২. বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকের প্রতিষ্ঠা ও ক্রমোন্নতির ইতিহাস:
১. প্রাথমিক পটভূমি (১৯৭৪–১৯৮২): ১৯৭৪ সালে ওআইসি সম্মেলনে বাংলাদেশের যোগদান এবং ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংকের সনদ স্বাক্ষরের মাধ্যমে বাংলাদেশে সুদমুক্ত ব্যাংকিংয়ের বীজ রোপিত হয়। দেশের বিশিষ্ট আলেম, অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী সমাজ এ বিষয়ে জনমত গঠন করেন।
২. প্রথম ইসলামি ব্যাংকের শুভ সূচনা (১৯৮৩): ১৯৮৩ সালের ৩০ মার্চ মধ্যপ্রাচ্যের আইডিবিসহ অন্যান্য ইসলামিক ব্যাংক এবং দেশীয় উদ্যোক্তাদের যৌথ উদ্যোগে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড (IBBL) প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ছিল দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংক।
৩. দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের ব্যাপ্তি: পরবর্তীতে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক এবং ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকসহ একে একে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়।
৪. জাতীয় অর্থনীতিতে আধিপত্য: বর্তমানে বাংলাদেশের সমগ্র ব্যাংকিং খাতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (৩০%+) আমানত ও বিনিয়োগ সরাসরি ইসলামি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। রেমিট্যান্স সংগ্রহ এবং আমদানি-রপ্তানি অর্থায়নে এটি শীর্ষে অবস্থান করছে।
৫. নীতিমালা ও সুকুক বন্ড: ২০০৯ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক পৃথক ‘ইসলামিক ব্যাংকিং গাইডলাইন’ প্রণয়ন করে এবং ২০২০ সালে সরকারি সুকুক বন্ড চালু করে এ খাতকে আধুনিক রূপ দেয়।

উপসংহার:
বাংলাদেশে প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের প্রবল উপস্থিতির মধ্যেও ইসলামি ব্যাংকিং গণমানুষের অকুণ্ঠ সমর্থনে জাতীয় অর্থনীতির মূল মেরুদণ্ডে পরিণত হয়েছে।

৬। মুশারাকা বলতে কী বুঝ? মুশারাকার কর্মপদ্ধতি আলোচনা কর।

[মান: ৫ + ১৫ = ২০]

ভূমিকা:
ইসলামি ব্যাংকিং ও আর্থিক ব্যবস্থার অন্যতম আদর্শ ও শ্রেষ্ঠ অর্থায়ন পদ্ধতি হলো মুশারাকা (Musharaka)। পুঁজিবাদী ব্যাংক যেখানে উদ্যোক্তাকে ঋণ দিয়ে নিজে সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত থেকে নির্দিষ্ট হারে সুদ গ্রহণ করে, ইসলামি ব্যাংক সেখানে প্রকৃত অংশীদার হিসেবে ব্যবসায় নেমে লাভ ও লোকসান উভয়ের ঝুঁকি বহন করে। মুশারাকা হলো ইসলামি অর্থনৈতিক ইনসাফের সর্বোত্তম প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিফলন।

১. মুশারাকা বলতে কী বুঝ?
মুশারাকা শব্দটি আরবি ‘শারিকাহ’ (شَرِكَة) শব্দ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ অংশীদারিত্ব বা যৌথ উদ্যোগ। ইসলামি শরীয়তের পরিভাষায় দুই বা ততোধিক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে এমন একটি ব্যবসায়িক চুক্তি সম্পাদন করা, যেখানে সকল পক্ষই মূলধন সরবরাহ করে, যৌথভাবে বা সম্মতিক্রমে ব্যবসা পরিচালনা করে এবং ব্যবসায় অর্জিত লাভ পূর্বনির্ধারিত অনুপাতে বণ্টন করে এবং লোকসান হলে তা মূলধনের অনুপাতে বহন করে, তাকে মুশারাকা বলে।

২. মুশারাকার মৌলিক নীতিমালা ও শর্তাবলি:
১. মূলধন সরবরাহ: চুক্তিবদ্ধ সকল অংশীদারকে নগদ অর্থ বা মূল্যায়িত সম্পদের মাধ্যমে মূলধন সরবরাহ করতে হবে।
২. মুনাফা বণ্টন: ব্যবসায় অর্জিত নিট মুনাফা পক্ষসমূহের মধ্যে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে যেকোনো যৌক্তিক অনুপাতে (যেমন ৫০:৫০ বা ৬০:৪০) ভাগ হতে পারে। তবে কোনো পক্ষকে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা মুনাফা হিসেবে দেওয়ার চুক্তি করা হারাম।
৩. লোকসান বহন: লোকসান হলে তা কোনো পূর্বচুক্তি অনুযায়ী নয়; বরং মূলধনের শতকরা অনুপাত অনুযায়ী (In proportion to capital) সকল অংশীদারকে বাধ্যতামূলকভাবে বহন করতে হবে। শরীয়তের মূলনীতি: “লাভ হবে চুক্তির শর্তে, আর ক্ষতি হবে মূলধনের অনুপাতে।”

৩. ইসলামি ব্যাংকে মুশারাকার প্রায়োগিক কর্মপদ্ধতি:
১. স্থায়ী মুশারাকা (Permanent Musharaka): ব্যাংক ও গ্রাহক যৌথ মূলধনে একটি স্থায়ী শিল্প বা প্রকল্প স্থাপন করে এবং যতদিন প্রতিষ্ঠান চলে ততদিন মুনাফার অংশ লাভ করে।
২. হ্রাসমান মুশারাকা (Diminishing Musharaka): বাড়ি নির্মাণ, যানবাহন বা ভারী যন্ত্রপাতি ক্রয়ে এই পদ্ধতি সর্বাধিক জনপ্রিয়:
– যৌথ মালিকানা: ব্যাংক ও গ্রাহক যৌথ টাকায় সম্পত্তি ক্রয় করে।
– ভাড়া প্রদান: গ্রাহক ব্যাংকের অংশের জন্য নিয়মিত ভাড়া (Ijara) প্রদান করে।
– শেয়ার ক্রয়: গ্রাহক কিস্তির মাধ্যমে ধীরে ধীরে ব্যাংকের অংশের মালিকানা কিনে নেয়। একসময় গ্রাহক শতভাগ মালিক হয়ে যায় এবং ব্যাংকের অংশীদারিত্ব সমাপ্ত হয়।

উপসংহার:
মুশারাকা অর্থায়ন পুঁজিপতি ও মেধার মিলন ঘটিয়ে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে এবং সমাজ থেকে সুদের অভিশাপ চিরতরে দূর করে।

৭। হালাল-হারাম বলতে কী বুঝ? মানবজীবনে হালাল উপার্জনের গুরুত্ব এবং হারাম উপার্জনের কুফল সম্পর্কে আলোচনা কর।

[মান: ৫ + ৮ + ৭ = ২০]

ভূমিকা:
মানবজীবনের প্রতিটি কর্মকাণ্ডে শৃঙ্খলা ও পবিত্রতা বজায় রাখতে ইসলাম ‘হালাল’ (বৈধ) এবং ‘হারাম’ (নিষিদ্ধ)-এর স্পষ্ট সীমারেখা অঙ্কন করেছে। অর্থনীতি ও উপার্জনের ক্ষেত্রে হালাল-হারামের এই মানদণ্ড কেবল একটি আইনি বিষয় নয়; এটি একজন মুমিনের ঈমান, আমল ও পরকালীন মুক্তির পূর্বশর্ত। হারাম উপার্জনের বিষাক্ত প্রভাব মানুষের ব্যক্তি ও সমাজ জীবনকে জাহান্নামে পরিণত করে।

১. হালাল ও হারাম বলতে কী বুঝ?
– হালাল (Halal): আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর রাসূল (সা.) কুরআন ও সুন্নাহর অকাট্য প্রমাণের মাধ্যমে যেসব কর্ম, খাদ্য, পানীয় ও উপার্জনের মাধ্যমকে মানবজাতির জন্য বৈধ, কল্যাণকর ও পবিত্র ঘোষণা করেছেন, তাকে হালাল বলে।
– হারাম (Haram): যেসব বস্তু, আচরণ ও উপার্জনের পথ মানবজাতির শারীরিক, আত্মিক ও সামাজিক শান্তির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এবং যা থেকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.) কঠোরভাবে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন, তাকে হারাম বলে।

২. মানবজীবনে হালাল উপার্জনের অপরিহার্য গুরুত্ব:
১. ইবাদত কবুলের পূর্বশর্ত: পেটে এক লোকমা হারাম খাবার থাকলে ৪০ দিনের কোনো নফল ইবাদত বা ফরজ দোয়া আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। রাসূলুল্লাহ (সা.) এক ব্যক্তির উদাহরণ দিয়ে বলেন যে দীর্ঘ সফর করে ধুলায় ধূসরিত হয়ে আল্লাহর কাছে হাত তোলে, কিন্তু তার খাদ্য হারাম, পোশাক হারাম—তার দোয়া কীভাবে কবুল হতে পারে? (সহীহ মুসলিম)।
২. ফরজ দায়িত্বের সমতুল্য: হাদিসে এসেছে: “মৌলিক ফরজ ইবাদতের পর হালাল জীবিকা অন্বেষণ করা অন্যতম প্রধান ফরজ।” (বায়হাকী)।
৩. পারিবারিক জীবনে বরকত: হালাল উপার্জনে অর্থ কম হলেও পরিবারে শান্তি, সুস্থতা ও সন্তানদের নেককার চরিত্র নিশ্চিত হয়।

৩. হারাম উপার্জনের মারাত্মক কুফলসমূহ:
১. জাহান্নামের আগুন নিশ্চিতকরণ: রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: “যে দেহ হারাম খাদ্যে গঠিত হয়েছে, জাহান্নামের আগুনই তার সর্বাধিক উপযুক্ত স্থান।” (বায়হাকী)।
২. আত্মিক অন্ধত্ব ও চরিত্র ধ্বংস: হারাম খাদ্য মানুষের অন্তরে অন্ধকার সৃষ্টি করে, পাপের প্রতি আকর্ষণ বাড়ায় এবং ন্যায়বোধ ধ্বংস করে।
৩. সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও অপরাধ বৃদ্ধি: সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি, ওজনে কম দেওয়া ও চোরাচালানের মাধ্যমে সমাজে অর্থনৈতিক নৈরাজ্য ও বৈষম্য সৃষ্টি হয়।

উপসংহার:
হালাল উপার্জন আত্মিক শান্তি ও সমাজের ইনসাফ রক্ষা করে, পক্ষান্তরে হারাম উপার্জন মানুষের ইহকাল ও পরকাল উভয় জগতকেই ধ্বংসের মুখে পতিত করে।

৮। বায়-মুয়াজ্জাল-এর সংজ্ঞা দাও। বায়-মুয়াজ্জাল-এর শর্ত ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনা কর।

[মান: ৫ + ৮ + ৭ = ২০]

ভূমিকা:
ইসলামি ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ কার্যক্রমের মধ্যে ক্রয়-বিক্রয়ভিত্তিক অর্থায়ন পদ্ধতি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও কার্যকর। ইসলামে সুদের বিনিময়ে নগদ টাকা ঋণ দেওয়া নিষিদ্ধ হলেও পণ্য বাকিতে বেশি মূল্যে বিক্রি করার পূর্ণ অনুমতি রয়েছে। এই বৈধ বাণিজ্যিক নীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে ‘বায়-মুয়াজ্জাল’ (Bai Mu’ajjal) বিনিয়োগ পদ্ধতি।

১. বায়-মুয়াজ্জাল-এর পারিভাষিক সংজ্ঞা:
বায় (البيع) অর্থ বিক্রয় এবং মুয়াজ্জাল (المؤجل) অর্থ নির্ধারিত সময় বা বাকিতে। শরিয়তের পরিভাষায় এমন কোনো চুক্তি যার মাধ্যমে বিক্রেতা ক্রেতার কাছে অবিলম্বে পণ্য হস্তান্তর করে কিন্তু ক্রেতা পণ্যের নির্ধারিত মূল্য ভবিষ্যতে কোনো নির্দিষ্ট তারিখে এককালীন অথবা কয়েকটি নির্দিষ্ট কিস্তিতে পরিশোধ করার প্রতিশ্রুতি দেয়, তাকে বায়-মুয়াজ্জাল বলে। এটিকে সাধারণ ভাষায় বাকিতে বিক্রয় (Deferred Payment Sale) বলা হয়।

২. বায়-মুয়াজ্জালের পালনীয় অপরিহার্য শর্তাবলি:
১. পণ্য ও মূল্যের নির্দিষ্টতা: চুক্তির সময় পণ্যের বিবরণ, গুণগত মান এবং বিক্রয়মূল্য শতভাগ নিশ্চিতভাবে নির্ধারিত থাকতে হবে।
২. মূল্য পরিশোধের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা: কিস্তির তারিখ ও মেয়াদ স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হতে হবে; কোনো অস্পষ্টতা (যেমন ‘সুবিধাজনক সময়ে দেবে’) থাকলে চুক্তি বাতিল হবে।
৩. বিক্রেতার মালিকানা ও দখল: পণ্য বিক্রির পূর্বেই তা ব্যাংকের বা বিক্রেতার প্রত্যক্ষ দখলে ও ঝুঁকিতে থাকতে হবে।
৪. বিলম্বের কারণে জরিমানা সুদে রূপান্তর না হওয়া: গ্রাহক কিস্তি পরিশোধে দেরি করলে কোনো চক্রবৃদ্ধি সুদ বা বাড়তি টাকা ব্যাংকের আয় হিসেবে নেওয়া সম্পূর্ণ হারাম। তবে ইচ্ছাকৃত খেলাপির শাস্তি হিসেবে জরিমানা নিয়ে তা সরাসরি চ্যারিটি বা দান ফান্ডে দিতে হয়।

৩. বায়-মুয়াজ্জালের মুখ্য বৈশিষ্ট্যাবলি:
১. বাস্তব পণ্যের ক্রয়-বিক্রয়: এটি কোনো কাগুজে ঋণ নয়; বাস্তব মালামাল কেনাবেচা হয়।
২. নগদ ও বাকির মূল্যের বৈধ ব্যবধান: নগদ বিক্রির চেয়ে বাকিতে বিক্রির ক্ষেত্রে বিক্রেতা কিছুটা বেশি মূল্য নির্ধারণ করতে পারে, যা শরীয়তসম্মতভাবে বৈধ।
৩. জামানত গ্রহণ: কিস্তির অর্থ পরিশোধের নিরাপত্তার স্বার্থে ব্যাংক গ্রাহকের স্থাবর সম্পত্তি বা দলিল মর্টগেজ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।

উপসংহার:
বায়-মুয়াজ্জাল পদ্ধতি আধুনিক ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যবসায়ীদের নগদ অর্থের সংকট কাটিয়ে উৎপাদন ও সরবরাহ অক্ষুণ্ণ রাখতে এক অনন্য হালাল সমাধান প্রদান করে।

৯। বিমার সংজ্ঞা দাও। বিমার শ্রেণিবিভাগ কর। গতানুগতিক বিমা ইসলামে নিষিদ্ধ কেন? ব্যাখ্যা কর।

[মান: ৫ + ৫ + ১০ = ২০]

ভূমিকা:
আধুনিক যুগে মানুষের জীবন ও ব্যবসায়িক সম্পদকে আকস্মিক দুর্যোগ ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে বিমা (Insurance) ব্যবস্থার ব্যাপক প্রচলন ঘটেছে। কিন্তু আধুনিক সমাজে প্রচলিত বাণিজ্যিক বিমা ব্যবস্থাটির চুক্তি ও পরিচালনা পদ্ধতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে আধুনিক বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ফিকহ একাডেমি ও আলেম সমাজ একে ইসলামি শরীয়তবিরোধী বলে ঘোষণা করেছেন।

১. বিমার প্রামাণ্য সংজ্ঞা ও আধুনিক শ্রেণিবিভাগ:
– সংজ্ঞা: যে আইনগত চুক্তির মাধ্যমে এক পক্ষ (বিমাকারী) নির্দিষ্ট প্রিমিয়ামের বিনিময়ে অপর পক্ষকে (বিমাগ্রহীতা) কোনো নির্দিষ্ট দুর্ঘটনা বা আর্থিক ক্ষতির ক্ষেত্রে পূর্বনির্ধারিত পরিমাণ ক্ষতিপূরণ প্রদানের নিশ্চয়তা দেয়, তাকে বিমা বলে।
– শ্রেণিবিভাগ: বিমা প্রধানত দুই প্রকার:
১. জীবন বিমা (Life Insurance): মানুষের জীবন, বার্ধক্য বা মৃত্যুর ঝুঁকি সংক্রান্ত বিমা।
২. সাধারণ বিমা (General Insurance): সম্পদের ক্ষতি সংক্রান্ত বিমা (যেমন অগ্নি বিমা, নৌ বিমা, দুর্ঘটনা বিমা ও মোটরযান বিমা)।

২. গতানুগতিক বাণিজ্যিক বিমা ইসলামে নিষিদ্ধ হওয়ার মৌলিক কারণসমূহ:
বিশ্বের সর্বসম্মত ফকীহগণের মতে প্রচলিত বিমায় তিনটি মারাত্মক শরীয়াহ নিষিদ্ধ উপাদান বিদ্যমান:
১. রিবা বা সুদ (Riba): বিমা কোম্পানি সংগৃহীত প্রিমিয়ামের অর্থ সুদি ব্যাংকে ও সরকারি সুদি ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করে মুনাফা অর্জন করে। এছাড়া বিমাগ্রহীতা কম প্রিমিয়াম জমা দিয়ে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত যে টাকা ক্ষতিপূরণ পায়, তা অর্থের বিনিময়ে অতিরিক্ত অর্থ হওয়ায় তা রিবা আল ফদলের অন্তর্ভুক্ত।
২. গারার বা চরম অনিশ্চয়তা (Gharar): বিমা চুক্তির সময় নিশ্চিত জানা থাকে না যে দুর্ঘটনা আদৌ ঘটবে কিনা এবং ঘটলেও ক্ষতিপূরণ কত পাওয়া যাবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ বিক্রয় (বাইউল গারার) নিষেধ করেছেন (সহীহ মুসলিম)।
৩. মাইসির বা জুয়া (Maysir): জুয়ার মতোই বিমাগ্রহীতা ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে সামান্য প্রিমিয়াম দিয়ে বড় অংকের টাকা পাওয়ার আশায় থাকে। দুর্ঘটনা ঘটলে অনেক বেশি অর্থ পায়, আর দুর্ঘটনা না ঘটলে জমাকৃত প্রিমিয়ামের টাকা বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়।

উপসংহার:
প্রচলিত বিমা জুয়া ও সুদের সংমিশ্রণ হওয়ায় ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম। তবে এর বিপরীতে ইসলামি ‘তাকাফুল’ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ হালাল ও পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়ায় তা গ্রহণ করা আবশ্যক।

১০। টীকা লিখ (যে কোনো দুটি): (ক) মুরাবাহা; (খ) মুযারা; (গ) মুনাফা; (ঘ) তাকাফুল।

[মান: ১০ × ২ = ২০]

ভূমিকা:
ফাযিল ৩য় বর্ষ ইসলামি অর্থনীতি ৩য় পত্রের (২০২১) সিলেবাসের ৪টি মৌলিক বিষয়ের সারগর্ভ সংক্ষেপিত অ্যাকাডেমিক বিশ্লেষণ নিচে উপস্থাপন করা হলো:

(ক) মুরাবাহা (Murabaha):
মুরাবাহা হলো একটি ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি যেখানে বিক্রেতা ক্রেতাকে পণ্যের আসল ক্রয়মূল্য বা সংগ্রহ খরচ জানিয়ে তার ওপর উভয় পক্ষের সর্বসম্মত মুনাফা যোগ করে পণ্য বিক্রি করে। ইসলামি ব্যাংকে এটি সর্বাধিক প্রচলিত বিনিয়োগ পদ্ধতি। গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী ব্যাংক নিজ দায়িত্বে পণ্য ক্রয় করে নিজস্ব গোডাউনে বা দখলে নেয় এবং পরবর্তীতে গ্রাহকের নিকট চুক্তিবদ্ধ মূল্যে কিস্তিতে বিক্রি করে।

(খ) মুযারা (Muzara’ah):
মুযারাআ হলো কৃষিজমি চাষাবাদের একটি বিশেষ ইসলামি অংশীদারিত্বমূলক চুক্তি। এতে এক পক্ষ কৃষিজমি দেয় এবং অপর পক্ষ শারীরিক শ্রম ও চাষাবাদ পরিচালনা করে। উৎপাদিত ফসল পূর্বনির্ধারিত সুনির্দিষ্ট অনুপাতে (যেমন অর্ধেক-অর্ধেক) উভয় পক্ষের মধ্যে বণ্টিত হয়। এটি গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতিতে ভুমিহীন কৃষকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অসাধারণ ভূমিকা রাখে।

(গ) মুনাফা (Profit):
কোনো ব্যবসা বা উৎপাদনশীল প্রক্রিয়ায় মূলধন, সময় ও মেধা নিয়োজিত করে সমস্ত আনুষঙ্গিক খরচ মেটানোর পর যে উদ্বৃত্ত আয় অর্জিত হয়, তাকে মুনাফা বলে। মুনাফায় লাভ ও ক্ষতির দ্বিমুখী ঝুঁকি থাকে যা একে সুদের শোষণ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক ও হালাল করেছে। ইসলাম ন্যায়সংগত মুনাফা অর্জনকে উৎসাহিত করে।

(ঘ) তাকাফুল (Takaful):
তাকাফুল হলো ইসলামি জীবনবিধানের আলোকে পরিচালিত সুদমুক্ত সমবায় বিমা ব্যবস্থা। আরবি কাফালাহ থেকে উদ্ভূত তাকাফুলের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক জামিনদার হওয়া ও সহযোগিতা করা। অংশগ্রহণকারীরা কোনো বাণিজ্যিক বিমা কোম্পানির গ্রাহক নয়; বরং তারা একটি যৌথ কল্যাণ তহবিলের অংশীদার, যা থেকে কোনো সদস্য বিপদে পড়লে তাকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়।

উপসংহার:
এই শাস্ত্রীয় ধারণাগুলো ইসলামি আর্থিক কাঠামো, ব্যাংকিং ও বিমা ব্যবস্থার বাস্তব রূপায়ণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

ফাযিল ৩য় বর্ষ ইসলামি অর্থনীতি ৩য় পত্রের মূল পাঠ্য বিষয় কী?

ইসলামি অর্থনীতি ৩য় পত্রের (বিষয় কোড: ৪৩৯) মূল সিলেবাস হলো ইসলামি ব্যাংকিং, বিমা (তাকাফুল) ও মুদ্রা ব্যবস্থা। এতে ব্যবসার ইসলামি বিধান, সুদ বনাম মুনাফা, ইসলামি ব্যাংকের কার্যাবলি ও বিনিয়োগ পদ্ধতি (মুরাবাহা, মুদারাবা, মুশারাকা), আইডিবি এবং প্রচলিত বিমার বিপরীতে তাকাফুল অন্তর্ভুক্ত।

ফাযিল পরীক্ষায় ২০ নম্বরের প্রশ্নের জন্য কত বড় উত্তর লিখতে হবে?

ডিগ্রি ও অনার্স মানবণ্টন অনুযায়ী প্রতিটি প্রশ্নের জন্য ভূমিকা, পারিভাষিক সংজ্ঞা, কুরআন ও সুন্নাহর আরবি দলিল ও অর্থ, প্রয়োজনীয় ছক/পয়েন্ট এবং উপসংহার সহযোগে কমপক্ষে ৩৫০ থেকে ৫০০+ শব্দে পূর্ণাঙ্গ উত্তর লেখা আবশ্যক।

ইসলামি ব্যাংক কীভাবে প্রচলিত সুদি ব্যাংকের চেয়ে পৃথক?

প্রচলিত ব্যাংক সুদের বিনিময়ে অর্থ ধার দিয়ে ঝুঁকিহীন মুনাফা লোটে, পক্ষান্তরে ইসলামি ব্যাংক সুদের বদলে লাভ-লোকসান অংশীদারিত্ব (মুদারাবা-মুশারাকা) এবং বাস্তব পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করে।

ইসলামে প্রচলিত বাণিজ্যিক বিমা কেন নিষিদ্ধ করা হয়েছে?

প্রচলিত বাণিজ্যিক বিমায় তিনটি শরীয়াহ নিষিদ্ধ উপাদান বিদ্যমান: ১. রিবা (সুদি বন্ডে বিনিয়োগ ও অতিরিক্ত অর্থ লেনদেন), ২. গারার (মারাত্মক অনিশ্চয়তা) এবং ৩. মাইসির (ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল জুয়া)।

তাকাফুল ব্যবস্থার মূল দর্শন কী?

তাকাফুলের মূল দর্শন হলো ইসলামি ভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতা। অংশগ্রহণকারীগণ যৌথ তহবিলে স্বেচ্ছায় দান (তাবাররু) জমা করে এবং কোনো সদস্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেই ফান্ড থেকে তাকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে পুনর্বাসিত করা হয়।

মুসলিম বিশ্বে ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংকের (IDB) ভূমিকা কী?

আইডিবি ওআইসিভুক্ত ৫৭টি মুসলিম দেশের সমন্বয়ে গঠিত একটি শীর্ষ বহুপাক্ষিক সুদমুক্ত ব্যাংক, যা মুসলিম দেশগুলোর মেগা অবকাঠামো নির্মাণ, আন্তঃবাণিজ্য অর্থায়ন, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং জরুরি মানবিক ত্রাণে প্রধান ভূমিকা পালন করে।