বাংলা (Bangla) – 201104, আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২১

StudyBoi StudyBoi
2026-09-22
৯১ মিনিট পড়ার সময়
১ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন

পরীক্ষা কোড: ২০১ | প্রশ্নপত্র কোড: ০০৪
ফাজিল (স্নাতক) সম্মান প্রথম বর্ষ পরীক্ষা, ২০২১
আল কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বাংলা
বিষয় কোড: ২০ ১১ ০৪
সময়—৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান—৮০

[দ্রষ্টব্য: ডান পাশের সংখ্যা প্রশ্নের পূর্ণমান জ্ঞাপক।]


ক বিভাগ

মান—১০ × ২ = ২০


১। (ক) বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগের একমাত্র নিদর্শন চর্যাপদের গুরুত্ব আলোচনা কর। (নম্বর ১০)

ভূমিকা:
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আদিমতম প্রামাণ্য নিদর্শন হলো ‘চর্যাপদ’। মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯০৭ সালে নেপালের রাজদরবারের রাজকীয় গ্রন্থাগার (‘রয়েল লাইব্রেরি’) থেকে এটি আবিষ্কার করেন এবং ১৯১৬ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় রচিত বৌদ্ধ গান ও দোহা’ শিরোনামে সম্পাদনা করে প্রকাশ করেন। চর্যাপদ কেবল একটি ধর্মীয় গান বা সাধন সঙ্গীতের সংকলন নয়; এটি বাংলা ভাষার আদি রূপতাত্ত্বিক উৎস, সমাজবাস্তবতা এবং মধ্যযুগপূর্ব বাঙালির জীবনযাত্রার এক প্রামাণ্য দলিল।

১. ভাষাতাত্ত্বিক গুরুত্ব:
চর্যাপদের সবচেয়ে বড় গুরুত্ব হলো এর ভাষাতাত্ত্বিক মূল্য। এটি রচিত হওয়ার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয় যে বাংলা ভাষার একটি প্রাচীন স্তর বিদ্যমান ছিল।

  • ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের প্রমাণ: ১৯২৬ সালে প্রকাশিত তাঁর বিশ্বখ্যাত গবেষণা গ্রন্থ ‘ODBL’ (The Origin and Development of the Bengali Language)-এ তিনি ধ্বনিতত্ত্ব, রূপতত্ত্ব, ব্যাকরণিক কাঠামো এবং ছন্দ বিশ্লেষণ করে দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করেন যে চর্যাপদের ভাষা প্রাচীন বাংলা।
  • বাংলা ভাষার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য: চর্যাপদের পদগুলোতে আধুনিক বাংলায় ব্যবহৃত বহু বিভক্তি, কারকীয় সম্পর্ক, অসমাপিকা ক্রিয়া (যেমন: করিয়া, দেখিয়া), সর্বনাম (মো, তো, মোর, তোর) এবং বহু তদ্ভব শব্দের আদি নিদর্শন বিদ্যমান।
  • সন্ধ্যা ভাষা (সান্ধ্য ভাষা): চর্যাপদের ভাষাকে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ‘সান্ধ্য ভাষা’ বা ‘আলো-আঁধারি ভাষা’ আখ্যা দিয়েছেন। এর একটি বহিরাঙ্গ সাধারণ অর্থ এবং অপরটি গূঢ় আধ্যাত্মিক সাধনামূলক অর্থ বহন করে।

২. সাহিত্যিক ও কাব্যমূল্য:
তাত্ত্বিক ও সাধনসঙ্গীত হওয়া সত্ত্বেও চর্যাপদের কবিরা খাঁটি কবিপ্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন।

  • প্রকৃতির রূপ ও চিত্রকল্প: বাংলার নদী, নৌকা, ডোম-শবরদের জীবনযাত্রা, বনের হরিণ, পদ্মফুল, আকাশ ইত্যাদি উপাদান অপূর্ব রূপক ও উপমায় তুলে ধরা হয়েছে। যেমন— «আপনা মাংসেঁ হরিণা বৈরী» (নিজের মাংসের জন্যই হরিণ সবার শত্রু)।
  • ছন্দ-শৈলী: চর্যাপদ মূলত মাত্রাবৃত্ত বা পাদাকুলক ছন্দে রচিত। এতে সংগীতধর্মিতা ও অন্ত্যমিলের নিপুণ ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।

৩. সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গুরুত্ব:
চর্যাপদ সমকালীন সমাজচিত্রের এক জীবন্ত আয়না। উচ্চবর্গের সামন্ত সমাজের বদলে চর্যাপদে প্রান্তিক খেটে খাওয়া মানুষের জীবন প্রধান হয়ে উঠেছে।

  • প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন: ডোম, শবর, চণ্ডাল, ব্যাধ, তাঁতি, জেলে প্রবৃত্তি অন্ত্যজ মানুষের জীবনধারা ও তাদের জীবিকা এখানে ফুটে উঠেছে। যেমন— নগর বা পল্লীর বাইরে টিলার ওপর শবরীদের বাস, নদীতে নৌকা বাওয়ার চিত্র ইত্যাদি।
  • দারিদ্র্যপীড়িত জীবনের হাহাকার: সাধারণ মানুষের দুঃখ-দারিদ্র্য কীভাবে তাদের পিষ্ট করত, তা ফুটে উঠেছে ঢেঁধণ পা-এর পদে: «টালত মোর ঘর নাহি পড়বেষী। হাড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেশী॥» (টিলার ওপর আমার ঘর, কোনো প্রতিবেশী নেই; হাঁড়িতে ভাত নেই, অথচ প্রতিদিন নিত্য অতিথি আসে)।
  • কুসংস্কার ও ধর্মাচার: বৌদ্ধ সহজিয়া সাধনার পাশাপাশি সমকালীন সাধারণ মানুষের বিবাহরীতি, বাদ্যযন্ত্র (মাদল, একতারা), নৌকা পারাপারে কড়ির ব্যবহার ইত্যাদির চমৎকার বিবরণ চর্যাপদে মেলে।

উপসংহার:
চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যের ভিত্তিপ্রস্তর। বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতির জন্মলগ্নের আত্মপরিচয় অনুধাবন করতে চর্যাপদের পাঠ ও গুরুত্ব অপরিসীম।


অথবা, (খ) চণ্ডীদাস সমস্যা সম্পর্কে সমালোচকদের মতামত উল্লেখ করে এ সমস্যার সমাধান কর। (নম্বর ১০)

ভূমিকা:
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের বৈষ্ণব পদাবলীতে ‘চণ্ডীদাস’ এক অনন্য ও অমর নাম। তাঁর সহজ, অকৃত্রিম ও হৃদয়স্পর্শী পদাবলি বাঙালি পাঠকহৃদয়কে যুগে যুগে আপ্লুত করেছে। কিন্তু মধ্যযুগের পুথি ও পদাবলীতে ‘চণ্ডীদাস’ ভণিতাযুক্ত বহু সহস্র পদ এবং বিচিত্র ভণিতা (যেমন: বড়ু চণ্ডীদাস, দীন চণ্ডীদাস, দ্বিজ চণ্ডীদাস ইত্যাদি) পাওয়ার কারণে সাহিত্যের ইতিহাসে যে তীব্র জটিলতা ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে, তা পণ্ডিত মহলে ‘চণ্ডীদাস সমস্যা’ নামে অভিহিত।

১. চণ্ডীদাস সমস্যার স্বরূপ:
বাংলা সাহিত্যে চণ্ডীদাস নামে রচিত পদের সংখ্যা সহস্রাধিক। কিন্তু এই পদগুলোর রচয়িতা কি একজনই চণ্ডীদাস, নাকি একাধিক ব্যক্তি? বিশেষ করে ১৯০৯ সালে বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ কর্তৃক বাঁকুড়ার কাঁকিল্যা গ্রাম থেকে ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্য আবিষ্কারের পর এ সমস্যা চরম রূপ ধারণ করে। কারণ ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’-এর ভাষা, ভাব ও রুচি বৈষ্ণব পদাবলীর মধুর প্রেমভাবাপন্ন চণ্ডীদাসের পদ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির।

২. পণ্ডিত ও সমালোচকদের মতামত:

  • বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ: তাঁর মতে, ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’-এর রচয়িতা ‘বড়ু চণ্ডীদাস’-ই হলেন আদি চণ্ডীদাস এবং চৈতন্যপূর্ব যুগের কবি। আর বৈষ্ণব পদাবলীর অন্যান্য চণ্ডীদাস পরবর্তী যুগের ভিন্ন ব্যক্তি।
  • ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ও ড. সুকুমার সেন: তাঁদের মতে, চণ্ডীদাস নামে অন্তত তিন বা চারজন পৃথক কবির অস্তিত্ব ছিল। তাঁদের মধ্যে একজন ‘বড়ু চণ্ডীদাস’ (শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের প্রণেতা), একজন ‘দ্বিজ চণ্ডীদাস’ এবং অন্যজন ‘দীন চণ্ডীদাস’ (চৈতন্য-পরবর্তী যুগের বিস্তৃত পালাকার)।
  • ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর অভিমত: ড. শহীদুল্লাহ মনে করেন, পদাবলীর আদি চণ্ডীদাস চতুর্দশ শতকের শেষার্ধের কবি। তাঁর উপাধি ছিল ‘দ্বিজ চণ্ডীদাস’ এবং তিনি পদাবলীর শ্রেষ্ঠ পদগুলোর রচয়িতা। তবে ‘বড়ু চণ্ডীদাস’ নামেও একজন পৃথক কবি ছিলেন।
  • শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ও হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়: তাঁরা পদগুলোর ভাবগত তারতম্য লক্ষ্য করে একাধিক চণ্ডীদাসের অস্তিত্বকে স্বীকার করেছেন এবং ভক্তমনের ভক্তিপ্রবণ আরোপকে এ সমস্যার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

৩. চণ্ডীদাস সমস্যার সমাধান ও আধুনিক সিদ্ধান্ত:
ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণা, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং কাব্যরীতির সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের ভিত্তিতে আধুনিক গবেষকগণ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে বাংলা সাহিত্যে অন্তত তিনজন প্রধান চণ্ডীদাস ছিলেন:

  1. বড়ু চণ্ডীদাস: তিনি চৈতন্যপূর্ব চতুর্দশ শতাব্দীর শেষভাগ বা পঞ্চদশ শতাব্দীর সূচনাকালের কবি। তিনি ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ নামক নাট্যগীতিকাব্যের রচয়িতা। তাঁর ভণিতায় দেবীবন্দনা (বাসলী বন্দনা) ও রুক্ষ-নাটকীয় বাস্তবতা পরিলক্ষিত হয়।
  2. দ্বিজ চণ্ডীদাস (পদাবলীর শ্রেষ্ঠ চণ্ডীদাস): চৈতন্যপূর্ব বা চৈতন্যের সমসাময়িক যুগের পদকর্তা। তিনি রাধাকৃষ্ণের অমর প্রেমলীলা বিষয়ক আত্মনিবেদিত শ্রেষ্ঠ পদগুলোর রচয়িতা (যেমন: «সই কেবা শুনাইল শ্যামনাম»)। রবীন্দ্রনাথ যাঁর কাব্যের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
  3. দীন চণ্ডীদাস: তিনি চৈতন্যোত্তর সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতাব্দীর কবি। তিনি মূলত সুবিশাল কৃষ্ণের লীলাবিষয়ক পাঁচালী বা আখ্যানমূলক পদ রচনা করেছেন, যার সাহিত্যিক মান তুলনামূলকভাবে শিথিল।

উপসংহার:
অতএব, ‘চণ্ডীদাস’ একজন ব্যক্তি নন, বরং ভিন্ন ভিন্ন যুগের একাধিক স্বতন্ত্র প্রতিভার সমন্বিত নাম। তবে এ সমস্যার মধ্য দিয়েই বাংলা সাহিত্যের বহুত্ববাদী বিকাশ ও বৈচিত্র্যপূর্ণ ঐতিহ্যের মহিমা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।


২। (ক) বাংলা গদ্যের জনক হিসেবে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান মূল্যায়ন কর। (নম্বর ১০)

ভূমিকা:
উনিশ শতকের রেনেসাঁস বা নবজাগরণের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পুরুষ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১)। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ এবং শ্রীরামপুরের মিশনারিদের হাতে বাংলা গদ্যের প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা হলেও তা ছিল নীরস, আড়ষ্ট ও কৃত্রিম ব্যাকরণের শৃঙ্খলে আবদ্ধ। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সেই আড়ষ্ট ও গতিহীন গদ্যে প্রথম প্রাণসঞ্চার করেন, শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেন এবং তাকে শিল্পসম্মত সুষম রূপ দান করেন। এ কারণেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে যথার্থই ‘বাংলা গদ্যের প্রথম শিল্পী’ এবং সামগ্রিক অর্থে বাংলা গদ্যের জনক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

১. যতিচিহ্ন বা বিরামচিহ্নের প্রবর্তন:
বিদ্যাসাগরের পূর্বে বাংলা গদ্যে কোনো সুনির্দিষ্ট যতিচিহ্ন ছিল না; একমাত্র দাঁড়ি (।) ব্যতীত শ্বাসগ্রহণের কোনো চিহ্ন ছিল না, ফলে বাক্যপাঠ ছিল অত্যন্ত দুরূহ। ১৮৪৭ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’ গ্রন্থে বিদ্যাসাগর সর্বপ্রথম আধুনিক বিরামচিহ্ন (কমা, সেমিকোলন, দাঁড়ি ইত্যাদি) সুশৃঙ্খলভাবে প্রয়োগ করেন। এর ফলে বাংলা গদ্য সুস্পষ্ট, অর্থবহ এবং পাঠোপযোগী হয়ে ওঠে।

২. বাক্যের ছন্দ ও ধ্বনিমাধুর্য সৃষ্টি:
বিদ্যাসাগর বাংলা বাক্যের পদবিন্যাসকে এক অপূর্ব সুরেলা ছন্দে বেঁধে দেন। সংস্কৃত তৎসম শব্দের গম্ভীর সৌন্দর্যের সাথে খাঁটি বাংলা শব্দের চমৎকার মেলবন্ধন ঘটিয়ে তিনি এক সাবলীল গদ্যরীতি নির্মাণ করেন। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়— «বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যভাষার উচ্ছেদ-উচ্ছৃঙ্খল জনতাকে সুসংযত করিয়া তাহার মধ্যে একটা শৃঙ্খলা স্থাপন করিয়াছিলেন… তিনিই সর্বপ্রথম বাংলা গদ্যে শিল্পকলা প্রবর্তন করেন।’

৩. অনুবাদ ও মৌলিক সাহিত্যকর্মের মধ্য দিয়ে বিকাশ:
বিদ্যাসাগর সংস্কৃত ও ইংরেজি সাহিত্যের বহু উৎকৃষ্ট গ্রন্থকে প্রাঞ্জল বাংলা গদ্যে রূপান্তর করেন:

  • বেতাল পঞ্চবিংশতি (১৮৪৭): হিন্দি বৈতাল পচ্চীসী থেকে অনূদিত, যেখানে গদ্যের আধুনিক সৌন্দর্য প্রথম আত্মপ্রকাশ করে।
  • শকুন্তলা (১৮৫৪): কালিদাসের অভিজ্ঞান শকুন্তলম্ অবলম্বনে রচিত, যা বর্ণনামূলক লালিত্যে সমৃদ্ধ।
  • সীতার বনবাস (১৮৬০): ভবভূতির উত্তররামচরিত অবলম্বনে রচিত করুণ রসের এক অনন্য গদ্যকাব্য।
  • ভ্রান্তিবিলাস (১৮৬৯): শেক্সপিয়রের ‘The Comedy of Errors’ নাটকের চমৎকার গদ্যানুবাদ।

৪. শিক্ষাবিস্তার ও শিশুপাঠ্য গ্রন্থ প্রণয়ন:
বাংলা ভাষার ভিত্তি প্রাথমিক স্তর থেকে মজবুত করার জন্য তিনি রচনা করেন কালজয়ী শিশুপাঠ্য গ্রন্থ ‘বর্ণপরিচয়’ (১ম ও ২য় ভাগ, ১৮৫৫), ‘বোধোদয়’ (১৮৫১), ‘কথামালা’ (১৮৫৬) এবং ‘আখ্যানমঞ্জরী’ (১৮৬৮)। তাঁর এই গ্রন্থগুলোর মাধ্যমে বাংলার শত শত প্রজন্মের বর্ণশিক্ষা ও ভাষা শিক্ষা সম্পন্ন হয়েছে।

৫. সমাজসংস্কারমূলক বিতর্কমূলক গদ্য:
বিদ্যাসাগর কেবল লালিত্যময় গদ্যই লেখেননি; বিধবাবিবাহ প্রবর্তন এবং বহুবিবাহ নিবারণের দাবিতে তিনি যুক্তিপূর্ণ, শাণিত ও আক্রমণাত্মক বিতর্কমূলক গদ্য রচনা করেছেন (যেমন: ‘কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য’ ছদ্মনামে রচিত পুস্তিকাসমূহ)। এতে বাংলা গদ্যের যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্য বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।

উপসংহার:
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যের কাঠামো, সুর, গতি ও শৃঙ্খলা নির্মাণ করে দিয়েছিলেন বলেই পরবর্তীতে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যের সৌধ নির্মাণ করতে পেরেছিলেন। তাই বাংলা গদ্যের জনক হিসেবে বিদ্যাসাগরের অবদান চিরস্মরণীয়।


অথবা, (খ) নজরুল শুধু বিদ্রোহের নন, প্রেমেরও কবি—এ কথার যৌক্তিকতা বিশ্লেষণ কর। (নম্বর ১০)

ভূমিকা:
বাঙালি মানসে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে সর্বজনবিদিত। অন্যায়, অত্যাচার, পরাধীনতা ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তাঁর বজ্রকণ্ঠ বাংলা সাহিত্যকে দিয়েছে নতুন তেজ ও উদ্যম। কিন্তু নজরুলের কবিসত্তার গভীরতম সত্যটি কেবল বিদ্রোহে সীমাবদ্ধ নয়; তিনি সমান্তরালভাবে পরম প্রেমিক ও সৌন্দর্যের পূজারী। নজরুল নিজেই বলেছেন: «মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণতূর্য।’ একদিকে প্রেমের বাঁশি এবং অন্যদিকে সংগ্রামের রণতূর্য—এই দ্বৈত সুরেই তাঁর সমগ্র সৃষ্টির সার্থকতা।

১. প্রেম ও বিদ্রোহের অবিচ্ছেদ্য যুগলবন্দী:
নজরুলের বিদ্রোহের মূল উৎসই ছিল গভীর মানবপ্রেম। তিনি মানুষকে ভালোবেসেছিলেন বলেই মানুষের লাঞ্ছনা, পরাধীনতা ও শোষণ সহ্য করতে পারেননি; প্রেমের দাবি থেকেই জন্ম নিয়েছে তাঁর রুদ্র বিদ্রোহ। তাঁর বিশ্ববিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতাতেই একাধারে রণনিনাদ ও কোমল প্রেমের অপূর্ব প্রকাশ ঘটেছে:

«আমি কভু প্রশান্ত, কভু অশান্ত দারুণ স্বেচ্ছাচারী,
আমি অরুণ-প্রাতে তরুণ-হাসি, আমি বিধবার বুকে ক্রন্দন-শ্বাস, হা-হুতাশ আমি হুতাশী!
আমি বঞ্চিত ব্যথা পথবাসী চির-গৃহহারা যত সর্বহারা,
আমি অবমানিতের মরম-বেদনা, বিষ-জ্বালা যত বঞ্চিত বুকে দারুণ অভিমানী!»

২. রোমান্টিক প্রেম ও বিরহের কবি:
বাংলা গীতিকবিতায় নজরুলের প্রেমের কবিতা এক স্বতন্ত্র ভাবলোক সৃষ্টি করেছে। তাঁর ‘দোলন-চাঁপা’,‘ছায়ানট’, ‘পূবের হাওয়া’, ‘সিন্ধু-হিন্দোল’, ‘চক্রবাক’ কাব্যগ্রন্থে প্রেমের বৈচিত্র্যময় রূপ ধরা পড়েছে:

  • মিলনের উচ্ছ্বাস: প্রেমের সান্নিধ্যে তিনি আনন্দ-উদ্বেল হয়েছেন, প্রেয়সীকে দেখেছেন প্রকৃতির অপূর্ব রূপে।
  • বিরহের অন্তর্দাহ: নজরুলের প্রেমে বিরহের সুরটি অত্যন্ত গভীর ও হাহাকারময়। ‘অভিশাপ’ কবিতায় তাঁর আর্তি:
    «যেদিন আমি হারিয়ে যাব, সেদিন কাঁদবে তুমি,
    স্মৃতির পাতায় খুঁজবে আমায় লুটিয়ে আঁখিজল…»
  • ‘বিজয়িনী’ ও ‘পূজারিণী’ কবিতা: নারীর সৌন্দর্য ও ভালোবাসার প্রতি নিঃশর্ত আত্মনিবেদন এবং অভিমানের নিখুঁত চিত্রায়ন ঘটেছে এসব কবিতায়।

৩. অমর সঙ্গীতসম্ভারে প্রেমের প্লাবন:
নজরুল বাংলা গানের জগতে সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুরস্রষ্টা ও গীতরচয়িতা। তাঁর প্রায় তিন সহস্রাধিক গানের সিংহভাগই প্রেম ও বিরহের সুরসাধনায় উজ্জ্বল। রাগপ্রধান গান, গজল ও আধুনিক গানে প্রেমের যে সূক্ষ্ম অনুভূতি তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন, তা অতুলনীয়। যেমন—
«মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী, দেব খোঁপায় তারার ফুল…»
কিংবা বিরহের চিরন্তন গান:
«আমারে চোখ-ইশারায় ডাক দিলে হায় কে গো দরদী…»

৪. ভক্তিমূলক ও আধ্যাত্মিক প্রেম:
পার্থিব প্রেমের গণ্ডি পেরিয়ে নজরুলের প্রেম রূপ নিয়েছে আধ্যাত্মিক প্রেমে। একদিকে শ্যামাসঙ্গীত ও কীর্তনে পরমাত্মার সাধনা, অন্যদিকে কালজয়ী হামদ, নাত ও গজলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ-এর প্রতি অপরিসীম প্রেমের প্রকাশ ঘটিয়েছেন। যেমন:
«ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ এলোরে দুনিয়ায়,
আয়রে সাগর আকাশ বাতাস দেখবি যদি আয়!»

উপসংহার:
নজরুলের এক সত্তা যদি হয় রুদ্র ভৈরব, তবে অন্য সত্তাটি নিশ্চয়ই প্রেমময় সুন্দর। বিদ্রোহ তাঁর ক্ষণিকের সামাজিক প্রয়োজন হলেও প্রেম তাঁর শাশ্বত স্বভাব। তাই তিনি কেবল বিদ্রোহের নন, তিনি বাংলা সাহিত্যের চিরন্তন ও গভীর প্রেমেরও অমর কবি।


খ বিভাগ

মান—১০ × ২ = ২০


৩। (ক) ‘ভাষার গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য ভাষা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে’— ‘আমাদের ভাষা সমস্যা’ প্রবন্ধের আলোকে ব্যাখ্যা কর। (নম্বর ১০)

ভূমিকা:
মননশীল প্রাবন্ধিক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ রচিত ‘আমাদের ভাষা সমস্যা’ একটি দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও দিকনির্দেশনামূলক প্রবন্ধ। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর যখন নবগঠিত পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা এবং পূর্ব বাংলার শিক্ষামাধ্যম নিয়ে ষড়যন্ত্র ও বিতর্ক শুরু হয়, তখন ড. শহীদুল্লাহ ভাষার প্রকৃতি, অধিকার ও জনস্বার্থকে সামনে রেখে এই তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্যটি উপস্থাপন করেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, ভাষা কোনো চাপিয়ে দেওয়া কৃত্রিম বিষয় নয়; এর অন্তর্নিহিত গণতান্ত্রিক চরিত্রই তার প্রাণশক্তি ও স্বাভাবিক বিকাশের চালিকাশক্তি।

১. ভাষার গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যের তাৎপর্য:
ভাষার ‘গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য’ বলতে বোঝায়—যেকোনো ভাষার অস্তিত্ব ও বিকাশ নির্ভর করে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ব্যবহারের ওপর। রাষ্ট্রের বা কোনো বিশেষ শাসকগোষ্ঠীর স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্তে কোনো কৃত্রিম ভাষাকে জনসাধারণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। ভাষা জনগণের সৃষ্টি, জনগণই তার মালিক এবং জনগণের কণ্ঠেই তার টিকে থাকা নির্ধারিত হয়।

২. ‘আমাদের ভাষা সমস্যা’ প্রবন্ধের প্রেক্ষিতে বিশ্লেষণ:

  • পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা: ড. শহীদুল্লাহ ঐতিহাসিক ও বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে প্রমাণ করেন যে সমগ্র পাকিস্তানের শতকরা ৫৬ ভাগেরও বেশি মানুষের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। ফলে গণতান্ত্রিক নীতি অনুযায়ী পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হওয়ার প্রথম ও প্রধান দাবিদার ছিল বাংলা ভাষা।
  • উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার অগণতান্ত্রিক চক্রান্তের বিরোধিতা: পাকিস্তানের কায়েমী স্বার্থবাদী মহল যখন উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করার অপচেষ্টা করছিল, তখন প্রাবন্ধিক দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এর তীব্র প্রতিবাদ জানান। কারণ উর্দু কোনো প্রদেশের মাতৃভাষা ছিল না, তা ছিল এক ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু অভিজাত শ্রেণির কৃত্রিম ভাষা।
  • শিক্ষামাধ্যমে মাতৃভাষার শ্রেষ্ঠত্ব: ভাষার গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো শিক্ষায় গণঅধিকার প্রতিষ্ঠা। তিনি সুস্পষ্টভাবে বলেন, শিক্ষার মাধ্যম হওয়া উচিত শিক্ষার্থীর নিজের মাতৃভাষা। মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষালাভ না ঘটলে জ্ঞান কখনো জনসাধারণের দ্বারে পৌঁছাতে পারে না।
  • আঞ্চলিক ভাষা ও সর্বজনীন ভাষার সমন্বয়: প্রাবন্ধিক উল্লেখ করেন, একটি জীবন্ত ভাষা সর্বদা সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা ও উপভাষা থেকে প্রাণরস গ্রহণ করে। আভিজাত্যবাদী পণ্ডিতরা যদি ভাষাকে কেবল সংস্কৃত বা আরবি-ফারসির কঠিন শৃঙ্খলে বন্দি রাখতে চান, তবে সে ভাষা স্থবির হয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষের নিত্যব্যবহার্য সহজ-সরল শব্দ ধারণ করেই ভাষা বেগবান হয়।

৩. ভাষা বিকাশে গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যের ঐতিহাসিক অনিবার্যতা:
ইতিহাস সাক্ষী, যে ভাষা জনসাধারণের জীবনস্পন্দনকে ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছে, তা কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে (যেমন প্রাচীন ল্যাটিন বা সংস্কৃত)। পক্ষান্তরে ইংরেজি বা বাংলার মতো জীবন্ত ভাষাগুলো জনগণের নিত্যব্যবহার, সাহিত্যচর্চা ও সামাজিক যোগাযোগের মধ্য দিয়েই বিশ্বমানের ঐশ্বর্য অর্জন করেছে।

উপসংহার:
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ‘আমাদের ভাষা সমস্যা’ প্রবন্ধের মূল সুরটি ছিল জনগণের গণতান্ত্রিক ভাষাগত অধিকারের বিজয় ঘোষণা। ভাষার গণতান্ত্রিক অধিকার স্বীকৃত না হলে ভাষার বিকাশ রুদ্ধ হয় এবং জাতীয় সংকট অনিবার্য হয়ে ওঠে, যা ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ঐতিহাসিকভাবে সত্য প্রমাণিত হয়েছে।


অথবা, (খ) “লঘু ভঙ্গিতে রচিত হলেও হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘তৈল’ প্রবন্ধের বিষয়বস্তু গুরুতর”—উক্তিটির যথার্থতা লিপিবদ্ধ কর। (নম্বর ১০)

ভূমিকা:
বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যের পথিকৃৎ মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী রচিত ‘তৈল’ একটি অনন্যসাধারণ ব্যঙ্গাত্মক ও রম্যরচনা। আপাতদৃষ্টিতে রচনার ভাষা অত্যন্ত লঘু, কৌতুকপূর্ণ ও পরিহাসপ্রধান হলেও এর অন্তর্নিহিত বক্তব্য মানবসমাজ ও রাষ্ট্রযন্ত্রের এক চরম নির্মম সত্য এবং সর্বগ্রাসী অধঃপতনের প্রতি তীক্ষ্ণ অঙ্গুলিনির্দেশ। তাই সমালোচকদের মন্তব্য—“লঘু ভঙ্গিতে রচিত হলেও হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘তৈল’ প্রবন্ধের বিষয়বস্তু গুরুতর”—যথার্থ ও তাৎপর্যপূর্ণ।

১. লঘু ও ব্যঙ্গাত্মক বহিরাঙ্গ:
প্রাবন্ধিক শুরুতেই ভেষজ বা বাস্তবিক তৈলের গুণের কথা উল্লেখ করে পাঠককে হাস্যকৌতুকের আবহে প্রবেশ করান। তিনি তৈলকে ‘সর্বশক্তিমান’, ‘পদার্থবিদ্যার মূল উপাদান’ ইত্যাদি রূপক হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি কৌতুকচ্ছলে বলেন—তৈল এমন এক পদার্থ যা দ্বারা অসাধ্য সাধন সম্ভব। তৈল ব্যবহারে মাথা ঠাণ্ডা হয়, শরীর স্নিগ্ধ হয় এবং সবচেয়ে বড় কথা—কর্কশ হৃদয়েও প্রবেশ করা যায়। এই আপাত লঘু উপস্থাপনা পাঠকের মুখে হাসি ফোটালেও নিবিড় ভাবনার উদ্রেক করে।

২. গভীর ও গুরুতর বিষয়বস্তু (সামাজিক তোষামোদি সংস্কৃতি):
লঘু বর্ণনার আড়ালে প্রাবন্ধিক আসলে সমাজের এক মরণঘাতী ব্যাধি—‘তোষামোদ’ (Flattery বা তৈলমর্দন)-কে নির্মমভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছেন:

  • যোগ্যতার চেয়ে তৈলের আধিপত্য: শাস্ত্রী মহাশয় দেখিয়েছেন যে, সমাজে মেধা, শ্রম, বিদ্যাবত্তা ও সততার চেয়েও তোষামোদের ক্ষমতা অনেক বেশি ফলপ্রসূ। বহু অযোগ্য ব্যক্তি কেবল উপরওয়ালাকে সন্তুষ্ট করে বা ‘তৈল প্রদান’ করে উচ্চপদে আসীন হয়, অন্যদিকে প্রকৃত প্রতিভাবানরা অবহেলিত ও কোণঠাসা হয়ে পড়ে।
  • কর্মক্ষেত্রে অনৈতিক পদোন্নতি: রাজদরবার থেকে শুরু করে ব্রিটিশ আমলের সরকারি দপ্তর, শিক্ষাঙ্গন ও সামাজিক পরিমণ্ডলে সর্বত্রই ‘তৈলবাজি’ একটি অপরিহার্য যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হতো। তোষামোদ না জানলে পদোন্নতি বা প্রতিপত্তি লাভ অসম্ভব হয়ে দাঁড়াত।
  • সমাজব্যবস্থার অধঃপতন ও চরম অবক্ষয়: যখন একটি জাতির মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন তৈলমর্দনের ওপর নির্ভর করে, তখন সেই সমাজ নৈতিকভাবে পঙ্গু ও ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এই গভীর জাতীয় অবক্ষয়টিকে কৌতুকের আবরণে তীব্র ব্যঙ্গবাণে বিদ্ধ করেছেন।

৩. বিশ্বজনীন ও শাশ্বত প্রাসঙ্গিকতা:
‘তৈল’ প্রবন্ধটি কেবল উনিশ শতকের প্রেক্ষাপটেই সত্য ছিল না; একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক করপোরেট ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও এর আবেদন সমানভাবে বিদ্যমান। ক্ষমতার চাটুকারিতা কীভাবে সত্য ও ন্যায়কে পদদলিত করে, তা প্রাবন্ধিক অত্যন্ত দক্ষতার সাথে উন্মোচিত করেছেন।

উপসংহার:
হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তিক্ত সত্যকে মিষ্টির মোড়কে পরিবেশন করেছেন। তাঁর উদ্দেশ্য কেবল হাস্যরস সৃষ্টি নয়, বরং সমাজের নীতিভ্রষ্টতাকে পরিহাসের চাবুকে সংশোধন করা। অতএব, উক্তিটি নিঃসন্দেহে শতভাগ যথার্থ ও কালজয়ী।


৪। (ক) “ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্য বিচারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সমাপ্তি’ একটি আদর্শ গল্প”—আলোচনা কর। (নম্বর ১০)

ভূমিকা:
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ছোটগল্পের জনক এবং সর্বকালের শ্রেষ্ঠ রূপকার। পাশ্চাত্য সাহিত্যের সংজ্ঞানুযায়ী ছোটগল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো—আকারে সংক্ষিপ্ততা, একটিমাত্র মূল ঘটনা বা ভাবের প্রাধান্য, চরিত্রসংখ্যার সীমাবদ্ধতা, সূচনা ও সমাপ্তির ক্ষিপ্রতা, বাহুল্যহীনতা এবং অতৃপ্তিকর সমাপ্তি। এই সকল শিল্পবৈশিষ্ট্যের বিচারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সমাপ্তি’ ছোটগল্পটি বাংলা সাহিত্যের একটি অনন্য ও স্বার্থক ছোটগল্প হিসেবে পরিগণিত।

১. একক ভাব ও কেন্দ্রবিন্দু:
ছোটগল্পের প্রধান শর্ত হলো একমুখী প্রবাহ ও একটিমাত্র মূল সুর। ‘সমাপ্তি’ গল্পের কেন্দ্রবিন্দু হলো চঞ্চল, বাঁধনহারা ও বুনো প্রকৃতির কিশোরী ‘মৃন্ময়ী’র দাম্পত্য জীবনের ভেতর দিয়ে পরিণত নারী ও প্রেমময়ী বধূতে রূপান্তরিত হওয়ার মানসিক বিবর্তন। গল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই একটিমাত্র মনস্তাত্ত্বিক বিবর্তনকে কেন্দ্র করেই কাহিনী আবর্তিত হয়েছে।

২. বাহুল্যবর্জিত সংক্ষিপ্ততা ও চরিত্রসংকোচ:
উপন্যাসের মতো ছোটগল্পে কোনো দীর্ঘ উপকাহিনী বা অনাবশ্যক ঘটনার স্থান থাকে না। ‘সমাপ্তি’ গল্পে পাত্রপাত্রীর সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত—অপূর্ব, মৃন্ময়ী এবং অপূর্বের মা। সামান্য সময়ের জন্য মৃন্ময়ীর অন্ধ পিতা ও রাখাল বালকের উপস্থিতি মূল প্লটকে ক্ষুণ্ণ না করে বরং গল্পের মূল ভাবকে আরও স্পষ্ট করেছে।

৩. চমকপ্রদ সূচনা:
ছোটগল্পের একটি চিরায়ত লক্ষণ হলো কোনো ভূমিকা ছাড়াই সরাসরি মূল ঘটনার ভেতরে প্রবেশ করা। ‘সমাপ্তি’ গল্পেও রবীন্দ্রনাথ অপূর্বের কলকাতা থেকে গ্রামে আগমন এবং নদীর ঘাটে দুরন্ত কিশোরী মৃন্ময়ীর সাথে আকস্মিক সংঘর্ষের চমৎকার দৃশ্য দিয়ে গল্প শুরু করেছেন, যা শুরুতেই পাঠককে কাহিনীর ভেতর টেনে নেয়।

৪. মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর ও ক্লাইম্যাক্স:
মৃন্ময়ীর চরিত্রের যে স্বাধীনতা ও চঞ্চলতা ছিল, বিবাহের সামাজিক বন্ধন তাকে প্রথমে বিদ্রোহিনী করে তোলে। সে শ্বশুরবাড়ির কৃত্রিম নিয়মকানুন মানতে চায় না, ফলে দাম্পত্য কলহ তৈরি হয় এবং অপূর্ব কলকাতায় ফিরে যায়। বিরহের গভীর বেদনায় এবং সমাজ-সংসারের নিঃসঙ্গতায় অবাধ্য মৃন্ময়ীর অন্তরে সুপ্ত প্রেমের বিকাশ ঘটে। অপূর্বের অনুপস্থিতিই তাকে অপূর্বের ভালোবাসার মূল্য উপলব্ধি করায়। এটিই গল্পের মূল মনস্তাত্ত্বিক মোড় (Climax)।

৫. গল্পের সার্থক সমাপ্তি:
ছোটগল্পের সংজ্ঞায় রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছিলেন: «শেষ হইয়াও হইল না শেষ।’ ‘সমাপ্তি’ গল্পের শেষ দৃশ্যে অপূর্বের ঘরে ফিরে আসা এবং অন্ধকারে অশ্রুসিক্ত মৃন্ময়ীর নিঃশব্দ আত্মসমর্পণ ও প্রেমময় আলিঙ্গনে গল্পের পরিসমাপ্তি ঘটে। গল্পের শিরোনাম ‘সমাপ্তি’ হলেও তা প্রকৃতপক্ষে দাম্পত্য জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের শুভ সূচনাকে দ্যোতিত করে। এখানে বহু কথা অপ্রকাশিত রেখেই এক অপূর্ব ভাবাবেশে গল্পের ইতি টানা হয়েছে।

উপসংহার:
আঙ্গিক সৌকর্য, আবেগের পরিমিতিবোধ, মনস্তাত্ত্বিক সূক্ষ্মতা এবং আকস্মিক পরিসমাপ্তি—সকল দিক দিয়েই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সমাপ্তি’ ছোটগল্পের সকল শর্তকে নিখুঁতভাবে ধারণ করেছে। তাই এটি বাংলা ছোটগল্পের ইতিহাসে একটি স্বার্থক ও আদর্শ সৃষ্টি।


অথবা, (খ) ‘শিউলীমালা’ গল্পের আলোকে শিউলী চরিত্র অঙ্কন কর। (নম্বর ১০)

ভূমিকা:
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত অমর প্রেমরসাত্মক ছোটগল্প ‘শিউলীমালা’। তাঁর ‘শিউলীমালা’ গল্পগ্রন্থের নামগল্পটিতে প্রেমের আত্মত্যাগ, সামাজিক বিধিনিষেধ এবং হৃদয়ের নিভৃত বেদনার এক করুণ আলেখ্য অঙ্কিত হয়েছে। এই গল্পের কেন্দ্রীয় নারী চরিত্র হলো ‘শিউলী’। সে শরৎকালের শিউলী ফুলের মতোই কোমল, শুভ্র, সুবাসিত অথচ ক্ষণস্থায়ী বিরহের অশ্রুভেজা এক অনন্য চরিত্র।

১. রূপ ও স্বভাবের কমনীয়তা:
শিউলী পল্লীবাংলার এক নিষ্পাপ, শান্ত ও আত্মসংযমী তরুণী। তার চোখের দৃষ্টিতে ছিল লজ্জাবতীর মতো এক গভীর স্নিগ্ধতা এবং হৃদয়ে ছিল সঙ্গীতের প্রতি এক অদম্য অনুরাগ। গল্পের নায়ক সুরসাধক নাজমুলের কণ্ঠের সুর ও গানে শিউলী প্রথম মুগ্ধ হয় এবং অজান্তেই তার হৃদয়ে প্রেমের প্রদীপ প্রজ্বলিত হয়।

২. নীরব ও আত্মত্যাগী প্রেম:
শিউলীর প্রেম ছিল সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থ ও নীরব। সে মুখে কখনো তার ভালোবাসার কথা প্রকাশ করেনি, কিন্তু তার প্রতিটি আচরণে, তার মালা গাঁথুনিতে এবং অশ্রুভেজা ব্যাকুল দৃষ্টিতে নাজমুলের প্রতি তার গভীর অনুরাগ প্রকাশ পেয়েছে। প্রেমের আত্মমর্যাদা এবং পরিবারের সামাজিক সম্মান রক্ষার জন্য সে নিজের ব্যক্তিগত ইচ্ছাকে হাসিমুখে বিসর্জন দিয়েছে।

৩. অদৃষ্ট ও সামাজিক শৃঙ্খলের নির্মম শিকার:
তৎকালীন সমাজে নারীর ব্যক্তিগত ইচ্ছার কোনো মূল্য ছিল না। শিউলী নাজমুলকে প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসলেও পরিবারের চাপে ও সামাজিক সংস্কারের কারণে তাকে অন্যত্র বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে হয়। এই নির্মম বাস্তবতাকে শিউলী কোনো চটুল বিদ্রোহ দিয়ে নয়, বরং গভীর বেদনার নীরব অশ্রু দিয়ে বরণ করে নিয়েছে।

৪. শিউলীমালার রূপক তাৎপর্য:
শিউলী ভোরের শিউলী ফুল কুড়িয়ে এনে যে মালা গাঁথত, তা ছিল নাজমুলের প্রতি তার হৃদয়ের অকৃত্রিম অর্ঘ্য। ভোরের শিউলী ফুল যেমন সকালে ঝরে পড়ে ধূলিমলিন হয়, ঠিক তেমনি শিউলীর কুমারী জীবনের স্বপ্ন ও ভালোবাসা বাস্তবতার রুক্ষ আঘাতে ঝরে গেছে। নাজমুলকে শেষ বিদায় জানানোর সময় সেই শিউলীমালার স্পর্শ তার চিরকালীন বিরহবেদনার প্রতীক হয়ে ওঠে।

উপসংহার:
কাজী নজরুল ইসলাম ‘শিউলী’ চরিত্রের মাধ্যমে বাঙালি নারীর শাশ্বত ত্যাগ, সহনশীলতা ও গভীর প্রেমের রূপকে অপূর্ব মমতায় রূপায়িত করেছেন। শিউলী চরিত্রটি বাংলা সাহিত্যের এক চিরভাস্বর ও ব্যথাতুর প্রেমপ্রতিমা।


গ বিভাগ

মান—১০ × ২ = ২০


৫। (ক) ‘বলাকা’ কবিতা অবলম্বনে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গতিতত্ত্বের পরিচয় দাও। (নম্বর ১০)

ভূমিকা:
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যসাধনার এক নতুন ও বৈপ্লবিক বাঁক ‘বলাকা’ (১৯১৬) কাব্যগ্রন্থ। গীতাঞ্জলি পর্বের শান্ত, সমাহিত আত্মনিবেদন থেকে বেরিয়ে এসে কবি এখানে বিশ্বপ্রকৃতি ও মানবচৈতন্যের অন্তর্নিহিত এক অদম্য গতিশীলতার সন্ধান পেয়েছেন। কাশ্মীরের শ্রীনগরে বিতস্তা (ঝিলাম) নদীর তীরে বসে সূর্যাস্তের সময় আকাশে এক ঝাঁক উড়ন্ত বলাকা বা হাঁসের পাখা ঝাপটানো দেখে কবির হৃদয়ে যে বিশ্বচেতনার উদ্বোধন ঘটেছিল, তা-ই তাঁর বিখ্যাত ‘বলাকা’ কবিতার অমর ‘গতিতত্ত্ব’ (Philosophy of Motion)।

১. গতিতত্ত্বের দার্শনিক ভিত্তি:
রবীন্দ্রনাথের গতিতত্ত্ব মূলত উপনিষদের চরৈবেতি মন্ত্র এবং আধুনিক দার্শনিক আঁরি বার্গসোঁর (Henri Bergson) ‘Elan Vital’ বা জীবনীশক্তির প্রবাহতত্ত্বের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। স্থবিরতা বা নিশ্চলতা হলো মৃত্যুর প্রতীক, আর গতিময়তাই হলো সৃষ্টির শাশ্বত লক্ষণ। বিশ্বের কোনো কিছুই স্থির নয়; অণু-পরমাণু, নদী-পর্বত, চন্দ্র-সূর্য-তারকা সবকিছুই এক অনন্ত অদৃশ্যের পানে অবিরাম ধাবমান।

২. কবিতায় প্রকৃতির গতিময় রূপায়ণ:
কবিতার প্রথমাংশে বিতস্তা নদীর শান্ত, বাঁকা জলধারাকে কবি খাপের মধ্যে লুকানো বাঁকা তলোয়ারের সাথে তুলনা করেছেন। সন্ধ্যাকাশে নিস্তব্ধতার মধ্যে হঠাৎ এক ঝাঁক বুনো হাঁসের ডানার শব্দ কবির অন্তরে স্পন্দন জাগিয়ে তোলে:

«শব্দহীন শব্দময় সেই ক্ষণকাল
বায়ুস্তর ভেদ করি উড়ে গেল এক ঝাঁক বলাকা।
পাখার চঞ্চল শব্দ শুনি সেই উড়ন্ত পাখায়
ধ্বনি উঠিল বিশ্বমাঝে—হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে!»

৩. স্থবির জড়প্রকৃতির ভেতর গতির অনুরণন:
বলাকার ডানার শব্দে কবির মনে হয় যেন কেবল পাখিরাই উড়ছে না, বরং পৃথিবীর পর্বতশ্রেণী, অরণ্যানী, মাটি ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সবই ডানা মেলে অসীমের পানে ছুটে চলেছে:

«পর্বত চাহিল হতে বৈশাখের নিরুদ্দেশ মেঘ;
বৃক্ষসার ডানা ঝাপটিয়া
উড়িয়া চলিতে চায় কোথা কোন্ দূর আকাশের খোঁজে…»

৪. মানবচেতনায় চিরন্তন ব্যাকুলতা:
এই গতি কেবল বাইরের প্রকৃতির নয়, মানবাত্মার অন্তর্নিহিত মুক্তির সাধনা। মানুষ বর্তমানের ক্ষুদ্র গণ্ডিতে তৃপ্ত থাকতে পারে না। তার আত্মা প্রতিনিয়ত অপূর্ণতা থেকে পূর্ণতার দিকে, ক্ষুদ্রতা থেকে ভূমার দিকে ছুটে চলেছে। মানুষের আত্মার চিরন্তন বাণী হলো: «হেথা নয়, হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে!»

উপসংহার:
‘বলাকা’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ জড় ও চেতনাবিশ্বকে গতির এক মহামিলনসূত্রে আবদ্ধ করেছেন। জীবনের পরম সার্থকতা অনন্ত যাত্রায়, স্থিতিতে নয়। এই গতিবাদের প্রকাশই ‘বলাকা’ কবিতাকে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক কবিতার মর্যাদা দান করেছে।


অথবা, (খ) ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতায় কবি শামসুর রাহমান স্বদেশের স্বাধীনতার যে বন্দনা করেছেন তা ব্যাখ্যা কর। (নম্বর ১০)

ভূমিকা:
আধুনিক বাংলা কবিতার প্রধান পুরুষ কবি শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬)। ১৯৭১ সালের অবরুদ্ধ বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে রচিত তাঁর কালজয়ী কবিতা ‘স্বাধীনতা তুমি’। কবি এই কবিতায় কোনো তাত্ত্বিক বা বিমূর্ত সংজ্ঞায় স্বাধীনতার পরিচয় দেননি; বরং বাঙালির সহস্র বছরের লোকায়ত জীবন, সংস্কৃতি, প্রাত্যহিক সুখ-দুঃখ, সংগ্রাম এবং স্বপ্নময় আবেগের প্রতিটি অনুষঙ্গের সাথে স্বাধীনতাকে একাত্ম করে এক অনন্য মহাকাব্যিক বন্দনা রচনা করেছেন।

১. লোকায়ত প্রকৃতি ও সংস্কৃতির পটভূমিতে স্বাধীনতা:
কবি স্বাধীনতাকে সাধারণ বাঙালির চিরায়ত পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গে রূপায়িত করেছেন। তাঁর কাছে স্বাধীনতা কোনো দূরবর্তী রাজনৈতিক স্লোগান নয়, তা ঘরের অতি চেনা আনন্দময় মুহূর্ত:

«স্বাধীনতা তুমি
রবিঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান।
স্বাধীনতা তুমি
কাজী নজরুলের ঝাঁকড়া চুলের জটলা-পাকানো বাবরি দোলানো
মহান পুরুষ, সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে কাঁপা…»

২. গ্রামীণ জীবন ও মেহনতি মানুষের সুখ-শান্তি:
বাংলার কৃষক, জেলে, মাঝি ও গৃহিণীর প্রতিদিনের স্বাভাবিক জীবনের নিরাপত্তার নামই স্বাধীনতা:

  • «স্বাধীনতা তুমি
    ফসলের মাঠে কৃষকের হাসি।»
  • «স্বাধীনতা তুমি
    রোদেলা দুপুরে মধ্যপুকুরে গ্রাম্য মেয়ের অবগাহন স্নান।»
  • «স্বাধীনতা তুমি
    খাঁ খাঁ রোদে তৃষ্ণার্ত মাঝির কোমল ডাবের জল।’

৩. শহুরে আধুনিক মধ্যবিত্তের দাম্পত্য ও ব্যক্তিগত স্বপ্ন:
কবি মধ্যবিত্ত নাগরিক জীবনের চাওয়া-পাওয়া ও রোমান্টিক অনুভূতির মাঝেও স্বাধীনতাকে প্রত্যক্ষ করেছেন:

  • «স্বাধীনতা তুমি
    গৃহিণীর ঘন খোলা কালো চুল, হাওয়ায় হাওয়ায় দোলে…»
  • «স্বাধীনতা তুমি
    বটবৃক্ষের ছায়ায় বসে কোনো প্রেমিকের নিভৃত চোখের দৃষ্টি।’
  • «স্বাধীনতা তুমি
    ছোটো ভাইটির নতুন শার্টে বোতামের মতো আলো।’

৪. মুক্তিসংগ্রাম ও আত্মত্যাগের রক্তিম চেতনা:
স্বাধীনতা কেবল শান্তিময় আনন্দ নয়, এটি লাখো শহীদের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ফসল। কবি স্বাধীনতাকে প্রত্যক্ষ করেছেন শহীদদের স্মৃতিসৌধ এবং শহীদের রক্তের অক্ষরে লেখা পোস্টারের মাঝে:

«স্বাধীনতা তুমি
শহীদ মিনারে অমর একুশে ফেব্রুয়ারির উজ্জ্বল প্রভাতফেরি…
স্বাধীনতা তুমি
পতপত ওড়া লাল-সবুজের রক্তিম উজ্জ্বল পতাকা।’

উপসংহার:
শামসুর রাহমান ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতায় স্বাধীনতাকে বাঙালির অস্তিত্ব, ভালোবাসা, ঐতিহ্য ও আত্মমর্যাদার সমার্থক করে তুলেছেন। প্রতিটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের নিবিড় অনুভূতি দিয়েই কবি স্বদেশের স্বাধীনতার এই শাশ্বত বন্দনাগীত রচনা করেছেন।


৬। (ক) ‘আমার পূর্ববাংলা’ কবিতায় কবি উপমা, রূপক, শব্দালংকার ও চিত্রকল্পের যে সুনিপুণ ব্যবহার করেছেন তা আলোচনা কর। (নম্বর ১০)

ভূমিকা:
কবি সৈয়দ আলী আহসান রচিত ‘আমার পূর্ববাংলা’ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ দেশপ্রেমমূলক ও নান্দনিক কবিতা। পঞ্চাশের দশকের রাজনৈতিক আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত হলেও এ কবিতায় কোনো সস্তা স্লোগান নেই; বরং এক গভীর সৌন্দর্যচেতনা, স্মৃতিমেদুরতা ও অতুলনীয় চিত্রকল্পের সমাহারে কবি তাঁর জন্মভূমি বাংলাকে এঁকেছেন। উপমা, রূপক, শব্দালংকার ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য চিত্রকল্পের সুনিপুণ প্রয়োগে কবিতাটি এক অনন্য শিল্পরূপ লাভ করেছে।

১. ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জীবন্ত চিত্রকল্পের ব্যবহার (Imagery):
কবিতাটিতে কবি এমন সব চিত্রকল্প নির্মাণ করেছেন যা পাঠকের চোখ, কান, ঘ্রাণ ও স্পর্শের অনুভূতিকে তীব্রভাবে নাড়া দেয়। যেমন—

  • দৃষ্টিগ্রাহ্য চিত্রকল্প: নদীর তীরে শান্ত বিকেল, সোনালী ধানের বিস্তার, মেঘলা আকাশের ছায়া এবং বুনোফুলের দোলা।
  • ঘ্রাণ ও অনুভূতির চিত্রকল্প: বৃষ্টির পরে ভিজে মাটির সোঁদা গন্ধ, চালধোয়া জলের সুবাস এবং বাঁশবাগানের ছায়ায় বাতাসের আর্দ্র পরশ। কবি বলেছেন— «আমার পূর্ববাংলা এক পরম স্নিগ্ধ রূপসী, যার আঁচলে জড়িয়ে থাকে ভিজে মাটির সুবাস…»।

২. অভিনব ও সার্থক উপমার প্রয়োগ (Simile):
সৈয়দ আলী আহসান প্রচলিত উপমার বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ নতুন ও আধুনিক উপমা সৃষ্টি করেছেন। তিনি পূর্ব বাংলাকে কোনো ভৌগোলিক সীমানায় বন্দি না রেখে তাকে তুলনা করেছেন ভালোবাসার প্রিয়তমা নারীর গভীর আবেগের সাথে:

  • পূর্ব বাংলার শান্ত নদীগুলোকে তিনি তুলনা করেছেন পরম মমতায় শুয়ে থাকা মায়ের ক্লান্ত বাহুর সাথে।
  • নীল আকাশ ও শরতের শুভ্র মেঘকে রূপকের আদলে তিনি উপস্থাপন করেছেন শুভ্র শান্তির প্রতীক হিসেবে।

৩. গভীর রূপক ও প্রতীকের দ্যোতনা (Metaphor & Symbolism):
‘আমার পূর্ববাংলা’ কেবল একটি ভূখণ্ড নয়; এটি কবির সমগ্র অস্তিত্ব, আত্মপরিচয় এবং আধ্যাত্মিক আশ্রয়। কবিতার প্রতিটি উপাদান এক গভীর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের রূপক হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানি শাসনামলের রুক্ষ পশ্চিম পাকিস্তানের বিপরীতে তিনি পূর্ব বাংলার শ্যামলিমাময় রূপকে বাঙালির হাজার বছরের শাশ্বত মুক্তির প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

৪. শব্দালংকার ও ধ্বনিমাধুর্য:
কবিতাটির চরণবিন্যাস গদ্যছন্দে হলেও এর প্রতিটি বাক্যে রয়েছে আশ্চর্য এক সঙ্গীতধর্মিতা। কবি কোমলকান্ত পদাবলী এবং তৎসম ও তদ্ভব শব্দের অপূর্ব মিশ্রণ ঘটিয়েছেন। অনুপ্রাস ও ধ্বনিসাম্যের ব্যবহারের ফলে আবৃত্তির সময় এক গভীর সুরের অনুরণন সৃষ্টি হয়।

উপসংহার:
উপমা, রূপক ও চিত্রকল্পের সার্থক সমন্বয়ে ‘আমার পূর্ববাংলা’ কবিতাটি দেশপ্রেমের সীমানা ছাড়িয়ে বিশুদ্ধ কবিতার এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। এটি বাংলা সাহিত্যের এক কালোত্তীর্ণ নান্দনিক সৃষ্টি।


অথবা, (খ) কবি জসিম উদ্দীনের ‘মুসাফির’ কবিতায় মুসাফিরের স্বরূপ বিশ্লেষণ কর। (নম্বর ১০)

ভূমিকা:
পল্লীকবি জসিম উদ্দীন (১৯০৩-১৯৭৬) রচিত ‘মুসাফির’ একটি আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক চেতনায় সমৃদ্ধ অনন্যসাধারণ কবিতা। গ্রামীণ জীবনের সুখ-দুঃখের রূপকার হিসেবে খ্যাত হলেও এই কবিতায় তিনি বিশ্বমানবতার এক শাশ্বত সত্য—মানুষের নশ্বরতা ও জীবনের ক্ষণস্থায়ী রূপকে গভীর উপলব্ধির মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। কবিতার মূল চরিত্র ‘মুসাফির’ প্রকৃতপক্ষে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি নয়; বরং সে এই মর্ত্যধামের প্রতিটি পথচারী মানুষের চিরন্তন প্রতীক।

১. পথ ও পথিকের রূপক (Life as a Journey):
আরবি ‘মুসাফির’ শব্দের অর্থ পর্যটক, পথচারী বা ভবঘুরে। কবি দেখিয়েছেন এই পৃথিবী হলো একটি সরাইখানা, আর প্রতিটি মানুষই এখানে ক্ষণকালের জন্য আসা এক মুসাফির। তার কোনো স্থায়ী নিবাস নেই, কোনো নির্দিষ্ট ঘর নেই। অনন্তকাল থেকে সে পথ চলছে এবং মৃত্যুর ডাক এলে তাকে সব মায়া ত্যাগ করে আবার অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাতে হবে:

«হেথা নয়, হেথা নয়, কোথা কোন্ সুদূরে
পথিক চলেছে তার বাঁশীখানি পুরে…»

২. মায়া ও নিঃসঙ্গতার দ্বন্দ্ব:
মুসাফিরের চলার পথে পথের পাশে কত মায়ার বাঁধন তাকে ডাকে—নদীর কূল, স্নিগ্ধ ছায়াঘেরা গ্রাম, কোনো নারীর করুণ আঁখি কিংবা স্বজনদের স্নেহময় আলিঙ্গন। মানুষ এই ক্ষণিক মায়ায় জড়িয়ে ঘর বাঁধতে চায়, সংসার সাজায়। কিন্তু মুসাফিরের অন্তর জানে, এ বন্ধন চিরস্থায়ী নয়। পথের তীব্র ডাক তাকে বারবার মায়ার শৃঙ্খল ছিঁড়ে এগিয়ে যেতে বাধ্য করে।

৩. বৈরাগ্য ও নির্লিপ্তির সাধনা:
মুসাফিরের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সে পথের ধূলিকে বরণ করে নেয়। পার্থিব লোভ-লালসা, ধনদৌলত বা মোহের প্রতি তার কোনো মোহ থাকে না। দুঃখ ও বেদনাকে সে তার চলার সাথী করে নেয়। সুফি দর্শনের রেশ টেনে কবি দেখিয়েছেন যে, এই বৈরাগ্যই মানুষকে পরম সত্য বা স্রষ্টার সান্নিধ্যে নিয়ে যায়।

৪. সর্বজনীন মানবিক আবেদন:
জসিম উদ্দীন গ্রামীণ উপমার মাধ্যমে মুসাফিরকে অতি আপন করে তুলেছেন। মাঠের রাখাল, নদীর মাঝি, বাউলের একতারা—সবার ভেতরই সেই চিরন্তন মুসাফিরের আর্তি ধ্বনিত হয়। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের যে একাকী যাত্রা, মুসাফির সেই একাকীত্বের মূর্ত প্রতীক।

উপসংহার:
জসিম উদ্দীনের ‘মুসাফির’ কবিতাটি মানুষের অন্তরের অন্তস্তলের এক শাশ্বত বেদনাবোধের প্রতিচ্ছবি। মুসাফিরের এই স্বরূপ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, পৃথিবী আমাদের স্থায়ী ঠিকানা নয়; আমরা সবাই পরম পিতার কাছে ফিরে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা এক একজন অতৃপ্ত পথিক।


ঘ বিভাগ

মান—৫ × ৪ = ২০


৭। যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও: (মান: ৫ × ৪ = ২০)

(ক) বাংলা ব্যাকরণের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ আলোচনা কর। (৫)

ভূমিকা: বাংলা ব্যাকরণ রচনার ইতিহাস প্রায় তিনশত বছরের প্রাচীন। দেশীয় পণ্ডিতদের দ্বারা নয়, বরং ইউরোপীয় মিশনারি ও কর্মকর্তাদের হাত ধরেই বাংলা ব্যাকরণ চর্চার সূচনা হয়েছিল। কালক্রমে তা আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।

ক্রমবিকাশের প্রধান পর্যায়সমূহ:

  1. পর্তুগিজ পাদ্রির প্রথম প্রয়াস (১৭৪৩): বাংলা ভাষার প্রথম ব্যাকরণ রচনা করেন পর্তুগিজ পাদ্রি ম্যানোয়েল দ্য আসসুম্পসাঁও। তাঁর রচিত ‘Vocabolario em idioma Bengalla e Portuguez’ (বাংলা-পর্তুগিজ ব্যাকরণ ও অভিধান) ১৭৪৩ সালে পর্তুগালের লিসবন থেকে রোমান হরফে প্রকাশিত হয়।
  2. এন. বি. হ্যালহেডের অবদান (১৭৭৮): ব্রিটিশ পণ্ডিত নাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড ১৭৭৮ সালে হুগলি থেকে প্রকাশ করেন ‘A Grammar of the Bengal Language’। এটিই বাংলা হরফে মুদ্রিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাংলা ব্যাকরণ গ্রন্থ। এতে চার্লস উইলকিন্সের তৈরি বাংলা মুদ্রাক্ষর প্রথম ব্যবহৃত হয়।
  3. উইলিয়াম কেরীর ব্যাকরণ (১৮০১): ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের অধ্যাপক উইলিয়াম কেরী ১৮০১ সালে সিভিলিয়ানদের বাংলা শেখানোর উদ্দেশ্যে ইংরেজি ভাষায় ‘A Grammar of the Bengali Language’ রচনা করেন।
  4. বাঙালির রচিত প্রথম ব্যাকরণ (১৮২৬ ও ১৮৩৩): কোনো বাঙালি পণ্ডিত কর্তৃক রচিত প্রথম বাংলা ব্যাকরণ হলো রাজা রামমোহন রায়ের ‘Bengali Grammar in the English Language’ (১৮২৬)। পরবর্তীতে ১৮৩৩ সালে কলকাতা স্কুল বুক সোসাইটি থেকে তাঁরই রচিত এবং বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রথম বিশুদ্ধ বাংলা ব্যাকরণ ‘গৌড়ীয় ব্যাকরণ’ প্রকাশিত হয়।
  5. পণ্ডিতদের বিকাশ পর্ব: উনিশ শতকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রচনা করেন ‘ব্যাকরণ কৌমুদী’ ও ‘উপক্রমণিকা’। বিশ শতকে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (‘বাঙ্গালা ব্যাকরণ’), ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় (‘সরল ভাষা প্রকাশ বাঙ্গালা ব্যাকরণ’), ড. সুকুমার সেন এবং পরবর্তীতে ড. আনিসুজ্জামান প্রমুখের গবেষণায় বাংলা ব্যাকরণ আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত রূপ লাভ করে।

(খ) ব্যাসবাক্যসহ সমাস নির্ণয় কর (যে কোনো পাঁচটি) : (৫)

  1. গরমিল: মিলের অভাব = অব্যয়ীভাব সমাস
  2. নদীমাতৃক: নদী মাতা যার = বহুব্রীহি সমাস
  3. ছেলেধরা: ছেলে ধরে যে = উপপদ তৎপুরুষ সমাস
  4. গৃহান্তর: অন্য গৃহ = নিত্য সমাস
  5. সেতার: সে (তিন) তারের সমাহার = দ্বিগু সমাস
  6. গণতন্ত্র: গণের তন্ত্র = ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস
  7. বিষাদসিন্ধু: বিষাদ রূপ সিন্ধু = রূপক কর্মধারয় সমাস

(গ) প্রকৃতি ও প্রত্যয় নির্ণয় কর (যে কোনো পাঁচটি) : (৫)

  1. কর্তব্য: √কৃ + তব্য = কৃৎপ্রত্যয়
  2. রান্না: √রাঁধ্ + না = কৃৎপ্রত্যয়
  3. ঘটকালি: ঘটক + আলি = তদ্ধিত প্রত্যয়
  4. হলদে: হলুদ + ইয়া (এ) = তদ্ধিত প্রত্যয়
  5. মেছো: মাছ + উয়া (ও) = তদ্ধিত প্রত্যয়
  6. মানব: মনু + ষ্ণ (অ) = তদ্ধিত প্রত্যয়
  7. সাংবাদিক: সংবাদ + ষ্ণিক (ইক) = তদ্ধিত প্রত্যয়

(ঘ) ‘উপসর্গের অর্থবাচকতা নেই, কিন্তু অর্থদ্যোতকতা আছে’—আলোচনা কর। (৫)

উপসর্গের পরিচয়:
বাংলা ব্যাকরণে যেসব অর্থহীন অব্যয়সূচক শব্দাংশ ধাতু বা শব্দের পূর্বে যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠন করে এবং অর্থের পরিবর্তন, সংকোচন বা সম্প্রসারণ ঘটায়, সেগুলোকে উপসর্গ বলে। যেমন: প্র, পরা, অপ, পরি, অতি ইত্যাদি।

উক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ:

  • অর্থবাচকতা নেই (স্বতন্ত্র অর্থহীনতা): উপসর্গের নিজস্ব কোনো স্বাধীন অর্থ প্রকাশ করার ক্ষমতা নেই। যদি এককভাবে ‘প্র’, ‘বি’, ‘উপ’, ‘অপ’ বলা হয়, তবে তা কোনো বিশেষ বস্তু, ভাব বা ধারণার অর্থ প্রকাশ করতে পারে না। ফলে অভিধানে এদের কোনো একক অর্থবাচকতা নেই।
  • অর্থদ্যোতকতা আছে (অর্থদ্যোতনা সৃষ্টির ক্ষমতা): নিজস্ব অর্থ না থাকলেও উপসর্গ যখন কোনো মূল শব্দ বা ধাতুর পূর্বে বসে, তখন তা বিস্ময়করভাবে নতুন নতুন অর্থের দ্যোতনা বা তাৎপর্য তৈরি করে। একেই বলে অর্থদ্যোতকতা (ক্ষমতা বা দ্যোতনা সৃষ্টি করা)।

উদাহরণস্বরূপ ‘হার’ শব্দের প্রয়োগ:
‘হার’ একটি মূল শব্দ যার সাধারণ অর্থ গলার অলংকার কিংবা পরাজয়। এই শব্দের পূর্বে বিভিন্ন উপসর্গ যুক্ত হয়ে কীভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ সৃষ্টি করে তা নিচে দেখানো হলো:

  1. প্র + হার = প্রহার (আঘাত করা বা মারধর)
  2. আ + হার = আহার (ভোজন বা খাওয়া)
  3. বি + হার = বিহার (ভ্রমণ বা আনন্দ ভ্রমণ)
  4. উপ + হার = উপহার (উপঢৌকন বা উপঢৌকনস্বরূপ প্রদান)
  5. পরি + হার = পরিহার (বর্জন করা বা ত্যাগ করা)
  6. সং (সম্) + হার = সংহার (বিনাশ বা ধ্বংস করা)

অতএব প্রমাণিত হলো যে, উপসর্গের নিজস্ব কোনো অর্থবাচকতা নেই, কিন্তু নতুন অর্থ সৃজনের অনন্য অর্থদ্যোতকতা রয়েছে।


(ঙ) ণ-ত্ব ও ষ-ত্ব বিধান কী? ণ-ত্ব বিধানের তিনটি নিয়ম লেখ। (৫)

১. ণ-ত্ব বিধানের সংজ্ঞা:
বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত তৎসম (সংস্কৃত) শব্দের বানানে মূর্ধন্য-ণ (ণ)-এর সঠিক ও বিধিবদ্ধ ব্যবহারের নিয়মাবলিকে ণ-ত্ব বিধান বলে।

২. ষ-ত্ব বিধানের সংজ্ঞা:
বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত তৎসম (সংস্কৃত) শব্দের বানানে মূর্ধন্য-ষ (ষ)-এর সঠিক ও প্রামাণ্য ব্যবহারের নিয়মাবলিকে ষ-ত্ব বিধান বলে।

৩. ণ-ত্ব বিধানের তিনটি প্রধান নিয়ম:

  1. ট-বর্গীয় বর্ণের পূর্বে: তৎসম শব্দে ট-বর্গীয় বর্ণের (ট, ঠ, ড, ঢ) পূর্বে যুক্ত ব্যঞ্জনে সর্বদা মূর্ধন্য-ণ যুক্ত হয়। যেমন: ঘণ্টা, বণ্টন, লুণ্ঠন, কাণ্ড, দণ্ড ইত্যাদি।
  2. ঋ, র, ষ-এর পর: তৎসম শব্দে ঋ-কার (বা ঋ), র (বা র-ফলা, রেফ) এবং মূর্ধন্য-ষ-এর পর সর্বদা মূর্ধন্য-ণ হয়। যেমন: ঋণ, কারণ, বর্ণ, স্বর্ণ, ভীষণ, কৃষ্ণ ইত্যাদি।
  3. ব্যবধায়ক ধ্বনির পরবর্তী নিয়ম: ঋ, র, ষ-এর পর যদি স্বরবর্ণ, ক-বর্গ (ক, খ, গ, ঘ, ঙ), প-বর্গ (প, ফ, ব, ভ, ম) কিংবা য, ৱ, হ এবং অনুস্বার (ং) থাকে, তবে তার পরবর্তী দন্ত্য-ন পরিবর্তিত হয়ে মূর্ধন্য-ণ হয়। যেমন: কৃপণ (ঋ + প + ণ), অগ্রহায়ণ (অ + গ + র-ফলা + হ + া + য় + ণ), লক্ষণ (ল + ক + ষ + ণ) ইত্যাদি।

(চ) ভাব-সম্প্রসারণ কর : (৫)

মূল পঙ্‌ক্তি:
«অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে,
তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে।»

মূলভাব:
অন্যায়কারী সমাজ ও মানবতার শত্রু, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু যে ব্যক্তি অন্যায় প্রত্যক্ষ করেও প্রতিবাদ না করে তা নীরবে সহ্য করে, অপরাধের বিচারে সে অন্যায়কারীর সমান অপরাধী। তাই উভয়ের প্রতিই সমাজ ও বিধাতার অভিশাপ ও ঘৃণা বর্ষিত হওয়া উচিত।

ভাব-সম্প্রসারণ:
মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রা এবং সমাজের শান্তি নির্ভর করে ন্যায়নীতি ও সত্যের ওপর। কিন্তু স্বার্থপরতা, লোভ ও ক্ষমতার মোহে একশ্রেণির মানুষ সমাজে অন্যায়, অবিচার, জুলুম ও নিপীড়ন চালায়। তারা মানবতার চরম শত্রু। কিন্তু তাদের চেয়েও মারাত্মক ক্ষতিকর হলো সেই নিষ্ক্রিয় সমাজ, যারা অন্যায় দেখেও চোখ বুজে থাকে, অন্যায়কারীর ভয়ে বা ক্ষুদ্র স্বার্থে অন্যায়কে মুখ বুজে সহ্য করে।

অন্যায় সহ্য করা ভীরুতা ও কাপুরুষতার লক্ষণ। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না করলে অপরাধীর দুঃসাহস বহুগুণ বেড়ে যায়। প্রতিবাদহীন সমাজই স্বৈরাচার, শোষণ ও পাপাচারের উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করে। যে ব্যক্তি অন্যায়কে বিনা প্রতিরোধে মেনে নেয়, সে পরোক্ষভাবে অপরাধকে উৎসাহিত করে এবং অপরাধের অংশীদারে পরিণত হয়। নীরব দর্শকের কাপুরুষতা প্রকৃতপক্ষে অন্যায়ের বিস্তারকে ত্বরান্বিত করে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাই স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, অন্যায়কারী যেমন ঘৃণার পাত্র, অন্যায়কে বিনা প্রতিবাদে সহ্যকারীও ঠিক তেমনি সমান ঘৃণার্হ। বিধাতার ন্যায়বিচারের অগ্নিশিখায় উভয়েরই অহংকার ও অস্তিত্ব খড়কুটোর মতো ভস্মীভূত হওয়া উচিত।

মন্তব্য:
সমাজ থেকে শোষণ ও বৈষম্য দূর করতে হলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। অন্যায়কারীকে রুখে দাঁড়ানো এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করাই প্রতিটি সচেতন ও বিবেকবান মানুষের পবিত্র নৈতিক দায়িত্ব।


(ছ) প্রভাষক পদে চাকুরীর জন্য একটি আবেদনপত্র লেখ। (৫)

তারিখ: ২৫ অক্টোবর, ২০২১ খ্রিষ্টাব্দ

বরাবর,
অধ্যক্ষ / সভাপতি,
দারুন্নাজাত সিদ্দিকিয়া কামিল মাদ্রাসা,
ডেমরা, ঢাকা-১৩৬০।

বিষয়: প্রভাষক (বাংলা) পদে নিয়োগের জন্য আবেদন।

মহোদয়,
বিনীত নিবেদন এই যে, গত ১৫ অক্টোবর ২০২১ খ্রিষ্টাব্দ তারিখে দৈনিক ‘প্রথম আলো’ পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানতে পারলাম যে, আপনার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শূন্যপদে একজন ‘প্রভাষক (বাংলা)’ নিয়োগ করা হবে। আমি উক্ত পদের একজন আগ্রহী প্রার্থী হিসেবে আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্যাবলি আপনার সদয় বিবেচনার জন্য নিচে উপস্থাপন করছি:

ব্যক্তিগত তথ্যাবলি:

  1. প্রার্থীর নাম: মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন
  2. পিতার নাম: মো. রফিকুল ইসলাম
  3. মাতার নাম: মোছা. খাদিজা বেগম
  4. স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: সোনাতলা, ডাকঘর: রামপুর, উপজেলা: রায়পুরা, জেলা: নরসিংদী।
  5. বর্তমান/যোগাযোগের ঠিকানা: বাসা নং-১২, রোড নং-০৩, শান্তিবাগ, ডেমরা, ঢাকা।
  6. জন্ম তারিখ: ১০ জানুয়ারি, ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দ
  7. জাতীয়তা: বাংলাদেশী (জন্মসূত্রে)
  8. ধর্ম: ইসলাম (সুন্নি)
  9. মোবাইল নম্বর: ০১৭XXXXXXXX

শিক্ষাগত যোগ্যতার বিবরণ:

পরীক্ষার নাম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান/বোর্ড/বিশ্ববিদ্যালয় পাসের সন বিভাগ/সিজিপিএ
এসএসসি / দাখিল মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা ২০১১ জিপিএ ৫.০০
এইচএসসি / আলিম মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা ২০১৩ জিপিএ ৫.০০
বি.এ (সম্মান) – বাংলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ২০১৭ সিজিপিএ ৩.৬৫ (প্রথম শ্রেণি)
এম.এ – বাংলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ২০১৮ সিজিপিএ ৩.৭০ (প্রথম শ্রেণি)
এনটিআরসিএ (NTRCA) বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ ২০১৯ উত্তীর্ণ (মেধা তালিকায় ১ম)

অভিজ্ঞতা ও অতিরিক্ত যোগ্যতা: একটি স্বনামধন্য কলেজে বিগত দুই বছর ধরে খণ্ডকালীন প্রভাষক হিসেবে পাঠদানের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং কম্পিউটার ও অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমে বিশেষ দক্ষতা রয়েছে।

অতএব, মহোদয়ের নিকট বিনীত প্রার্থনা, উপরোক্ত তথ্যাবলি ও যোগ্যতার আলোকে আমাকে উক্ত ‘প্রভাষক (বাংলা)’ পদের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দানে বাধিত করবেন।

নিবেদক,
(মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন)
সংযুক্তি: সকল শিক্ষাগত যোগ্যতার সত্যায়িত সনদপত্র, এনটিআরসিএ সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্রের অনুলিপি, নাগরিকত্ব সনদ এবং সদ্যতোলা ৩ কপি পাসপোর্ট সাইজের সত্যায়িত ছবি।


সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. ফাজিল ১ম বর্ষের বাংলা আবশ্যিক কোর্সের পূর্ণমান ও সময় কত?

ইসলামিক অ্যারাবিক ইউনিভার্সিটির অধীনে ফাজিল ১ম বর্ষের বাংলা (বিষয় কোড: ২০১১০৪) পরীক্ষার পূর্ণমান ৮০ নম্বর এবং নির্ধারিত সময় ৪ ঘণ্টা।

২. বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগের একমাত্র প্রামাণ্য নিদর্শন কোনটি?

বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগের একমাত্র নির্ভরযোগ্য ও প্রামাণ্য নিদর্শন হলো হরপ্রসাদ শাস্ত্রী কর্তৃক নেপাল থেকে আবিষ্কৃত বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকদের রচিত ‘চর্যাপদ’।

৩. বাংলা গদ্যের জনক হিসেবে কাকে গণ্য করা হয় এবং কেন?

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে বাংলা গদ্যের জনক ও প্রথম শিল্পী বলা হয়, কারণ তিনিই প্রথম বাংলা গদ্যে বিরামচিহ্ন প্রবর্তন করেন এবং গদ্যভাষাকে সুশৃঙ্খল, গতিশীল ও শিল্পসম্মত রূপ দান করেন।

৪. চণ্ডীদাস সমস্যা বলতে বাংলা সাহিত্যে কী বোঝায়?

মধ্যযুগে একই নামে একাধিক কবির ভণিতা (যেমন: বড়ু চণ্ডীদাস, দ্বিজ চণ্ডীদাস, দীন চণ্ডীদাস) পাওয়া এবং শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ও পদাবলীর ভাবগত পার্থক্যের ফলে সৃষ্ট বিভ্রান্তিকেই চণ্ডীদাস সমস্যা বলা হয়।

৫. ‘উপসর্গের অর্থবাচকতা নেই, কিন্তু অর্থদ্যোতকতা আছে’ কথাটির তাৎপর্য কী?

উপসর্গের নিজস্ব কোনো স্বাধীন অর্থ প্রকাশ করার ক্ষমতা নেই, কিন্তু অন্য কোনো শব্দ বা ধাতুর পূর্বে যুক্ত হয়ে নতুন অর্থ সৃষ্টি করার অতুলনীয় ক্ষমতা রয়েছে।

৬. ফাজিল বাংলা পরীক্ষায় ব্যাকরণ অংশে পূর্ণ নম্বর পাওয়ার উপায় কী?

সমাস, প্রকৃতি-প্রত্যয় ও বানানের নিয়মগুলো ব্যাসবাক্য ও মূলধাতুসহ নির্ভুলভাবে উপস্থাপন করলে ব্যাকরণ অংশে শতভাগ নম্বর পাওয়া যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *