اختبار السنة الأولى للفاضل البكالوريوس (الشرف)، لعام ٢٠٢٤م
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষ পরীক্ষা, ২০২৪]
القسم: القرآن والدراسات الإسلامية [বিভাগ: আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
المادة: اللغة البنغالية وآدابها [বিষয়: বাংলা / Bangla]
كود المادة [বিষয় কোড]: ২০১১০৪ | كود الامتحان [পরীক্ষা কোড]: ২০১ | كود ورقة الأسئلة [প্রশ্নপত্র কোড]: ০০৪
الوقت [সময়]: ৪ ঘণ্টা | الدرجة الكاملة [পূর্ণমান]: ৮০
[দ্রষ্টব্য : ডান পাশের সংখ্যা প্রশ্নের পূর্ণমান জ্ঞাপক।]
ক বিভাগ
মান— ১০ × ২ = ২০
১। (ক) বাংলা সাহিত্যের যুগ বিভাগ সম্পর্কে পণ্ডিতদের মতামত বিশ্লেষণ কর।
উত্তর:
ভূমিকা: সাহিত্যের যুগবিভাগ একটি চলমান সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার কালানুক্রমিক রূপরেখা। সমাজ, রাজনীতি, ধর্ম ও ভাষার বিবর্তনের ওপর ভিত্তি করে গবেষক পণ্ডিতগণ বাংলা সাহিত্যের বিকাশধারাকে বিভিন্ন যুগে বিভক্ত করেছেন।
১. সাধারণ সর্বজনগ্রাহ্য যুগবিভাগ:
- প্রাচীন যুগ (আদি যুগ): আনুমানিক ৬৫০/৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১২০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। এ যুগের একমাত্র প্রামাণ্য নিদর্শন ‘চর্যাপদ’।
- মধ্যযুগ: ১২০১ থেকে ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত।
- অন্ধকার যুগ বা বন্ধ্যা যুগ: ১২০১ থেকে ১৩৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়কে অনেকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ক্রান্তিকাল হিসেবে অন্ধকার যুগ আখ্যা দিয়েছেন।
- চৈতন্যপূর্ব যুগ: ১৩৫০ থেকে ১৫০০ খ্রিষ্টাব্দ (শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি ও মঙ্গলকাব্যের উন্মেষ)।
- চৈতন্য ও চৈতন্য-পরবর্তী যুগ: ১৫০০ থেকে ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ (বৈষ্ণব পদাবলী, জীবনীকাব্য, অনুবাদ সাহিত্য, আরাকান রাজসভার প্রণয়কাব্য এবং রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান)।
- আধুনিক যুগ: ১৮০১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত (ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, সাময়িকপত্র, গদ্যের উন্মেষ, মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও আধুনিক সাহিত্য)।
২. বিশিষ্ট পণ্ডিত গবেষকদের দৃষ্টিভঙ্গি ও মতামত:
- ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর অভিমত: ড. শহীদুল্লাহ বাংলা সাহিত্যের সূচনাকালকে প্রাচীনতম বলে মনে করেন। তাঁর মতে, প্রাচীন যুগ হলো ৬৫০ থেকে ১২০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। তিনি বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য শবরপা ও লুইপাকে সপ্তম শতাব্দীর মনীষী বিবেচনা করে চর্যার ভাষাকে এ যুগের নিদর্শন বলেন। মধ্যযুগকে তিনি ১২০১ থেকে ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ এবং ১৮০১ থেকে বর্তমান পর্যন্ত আধুনিক যুগ হিসেবে গণ্য করেন।
- ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের অভিমত: ভাষাতাত্ত্বিক মানদণ্ডে ড. চট্টোপাধ্যায় প্রাচীন যুগের ব্যাপ্তিকাল নির্ধারণ করেছেন ৯৫০ থেকে ১২০০ খ্রিষ্টাব্দ। তিনি মনে করেন, অপভ্রংশ ও অবহট্ঠের স্তর পেরিয়ে স্বতন্ত্র বাংলা ভাষা হিসেবে রূপ নিতে দশম শতক লেগেছিল। তিনি ১২০০-১৮০০ খ্রিষ্টাব্দকে মধ্যযুগ এবং ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে আধুনিক যুগ চিহ্নিত করেছেন।
- গোপাল হালদার ও অন্যান্য আধুনিক গবেষকদের মত: আধুনিক গবেষকগণ মধ্যযুগকে তুর্কি বিজয়, সুলতানি আমল ও মোঘল সুবাদারির আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে মিলিয়ে বিশ্লেষণ করেন এবং সামাজিক রূপান্তরের ভিত্তিতে সাহিত্যধারাকে মূল্যায়ন করেন।
উপসংহার: সূচনাকালের সামান্য মতপার্থক্য সত্ত্বেও সমস্ত পণ্ডিত একমত যে, চর্যাপদ প্রাচীন যুগের ভিত্তি, মধ্যযুগ ছিল ধর্ম ও দেবদেবী-কেন্দ্রিক কাব্যের যুগ, আর আধুনিক যুগ হলো মানবতাবাদী, যুক্তিভিত্তিক ও গদ্যপ্রধান সাহিত্য যুগ।
অথবা, (খ) টীকা লেখ : (i) ভোরের পাখি; (ii) পদ্মাবতী
উত্তর:
(i) ভোরের পাখি:
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে রোমান্টিক গীতি-কবিতার ধারক ও বাহক কবি বিহারীলাল চক্রবর্তী (১৮৩৫-১৮৯৪)-কে ‘ভোরের পাখি’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিহারীলাল সম্পর্কে শ্রদ্ধাভরে এ উপাধি প্রদান করেন। আধুনিক বাংলা কাব্যে যখন মহাকাব্যের যুগ চলছিল (মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও হেমচন্দ্রের যুগ), তখন বিহারীলাল বহির্মুখী সুর ত্যাগ করে অন্তর্মুখী আত্মনিবেদন ও সূক্ষ্ম ভাবাবেগঘন গীতি-কবিতার সূচনা করেন। যেমন ভোরের পাখির প্রথম মধুর গানে প্রভাতের আগমন সূচিত হয়, তেমনি বিহারীলালের ‘সারদামঙ্গল’ ও ‘সঙ্গীত তরঙ্গ’ কাব্যের মধ্য দিয়ে আধুনিক বাংলা রোমান্টিক লিরিকের উজ্জ্বল ভোর রচিত হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ তাঁকেই বাংলা গীতি-কবিতার অগ্রদূত এবং নিজের কাব্যগুরু হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।
(ii) পদ্মাবতী:
মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ মুসলিম কবি সৈয়দ আলাওল রচিত একটি কালজয়ী রোমান্টিক আখ্যানকাব্য হলো ‘পদ্মাবতী’ (রচনাকাল আনুমানিক ১৬৪৬-১৬৫২ খ্রি.)। এটি মূলত হিন্দি কবি মালিক মুহম্মদ জায়সীর ‘পদুমাবত’ কাব্যের ভাবানুবাদ হলেও আলাওলের অসাধারণ কাব্যপ্রতিভা, পাণ্ডিত্য ও স্বকীয় কল্পনায় এটি এক অনুপম মৌলিক কাব্যের মর্যাদা লাভ করেছে। সিংহল রাজকন্যা পদ্মাবতী, চিতোরের রানা রত্নসেন এবং দিল্লির সুলতান আলাউদ্দীন খিলজীর ঐতিহাসিক-কাল্পনিক ত্রিভুজ প্রেম ও বীরত্বগাথা এই কাব্যের মূল উপজীব্য। আলাওল মধ্যযুগের দেব-দেবী নির্ভর কাব্যরীতির বাইরে এসে রক্ত-মাংসের মানুষের মানবিক প্রেম ও রূপসৌন্দর্যকে প্রধান করে তুলেছেন। সংস্কৃত অলঙ্কার, সংগীত শাস্ত্র এবং বিশুদ্ধ কাব্যরীতির ব্যবহারে ‘পদ্মাবতী’ মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য মাইলফলক।
২। (ক) বাংলা গদ্যের জনক হিসেবে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান মূল্যায়ন কর।
উত্তর:
ভূমিকা: আধুনিক বাংলা গদ্যের সুদৃঢ় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী এবং বাংলা গদ্যরীতির সার্থক রূপকার হলেন পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১)। তাঁর অক্লান্ত সাধনাতেই বাংলা গদ্য বিশৃঙ্খলা ও জড়তামুক্ত হয়ে এক ছন্দোময়, গতিশীল ও প্রাঞ্জল সাহিত্যিক রূপ লাভ করে। এ কারণেই তাঁকে বাংলা গদ্যের অন্যতম প্রধান জনক বা প্রথম শিল্পীরূপে গণ্য করা হয়।
১. বিদ্যাসাগর-পূর্ব বাংলা গদ্যের রূপ: বিদ্যাসাগরের পূর্বে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতদের গদ্য ছিল দুর্বোধ্য তৎসম শব্দবহুল এবং ব্যাকরণের কঠোর বাঁধনে আড়ষ্ট; অন্যদিকে মিশনারি ও হ্যালহেডদের গদ্য ছিল ইংরেজি ধাঁচের অদ্ভুত বাক্যগঠনে দুষ্ট। ফলে সাধারণ পাঠকের কাছে গদ্য ছিল নীরস ও কৃত্রিম।
২. বাংলা গদ্যে বিদ্যাসাগরের বৈপ্লবিক অবদানসমূহ:
- যতিচিহ্নের সার্থক প্রবর্তন: বিদ্যাসাগরের সবচেয়ে বড় অবদান হলো বাংলা ভাষায় ইংরেজি যতিচিহ্ন বা বিরামচিহ্নের (কমা, সেমিকোলন, দাঁড়ি ইত্যাদি) সুশৃঙ্খল ব্যবহার। তিনিই প্রথম বাক্যের অর্থ ও ভাব প্রকাশের স্পষ্টতার জন্য বিরামচিহ্ন বসিয়ে গদ্যকে ছন্দ ও যতির নিয়ন্ত্রণ দান করেন।
- বাক্যের পদবিন্যাসে শৃঙ্খলা ও ধ্বনিমাধুর্য: তিনি সংস্কৃতের শ্রুতিমধুর শব্দাবলীর সাথে বাংলা তদ্ভব শব্দের অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়ে এক প্রাঞ্জল ও গতিশীল গদ্যশৈলী নির্মাণ করেন। তাঁর বাক্যগঠন ছিল সুস্পষ্ট, সুরময় ও সুষম।
- পাঠ্যপুস্তক ও অনুবাদ সাহিত্যের মাধ্যমে বিকাশ: তিনি ‘বর্ণপরিচয়’ (১ম ও ২য় ভাগ) রচনা করে শিশুদের ভাষা শিক্ষার ভিত্তি গড়ে তোলেন। এছাড়া ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’ (১৮৪৭), ‘শকুন্তলা’ (১৮৫৪), ‘সীতার বনবাস’ (১৮৬০) এবং ‘ভ্রান্তিবিলাস’ (১৮৬৯)-এর মাধ্যমে তিনি অনুপম সাহিত্যিক গদ্যের রূপ নির্মাণ করেন।
রবীন্দ্রনাথের মূল্যায়ন: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যথার্থই বলেছেন: “বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যভাষার উচ্ছেদসাধন করিয়া তাহাকে নূতন মূর্তি প্রদান করিয়াছেন… তিনি বাংলা গদ্যের প্রথম যথার্থ শিল্পী ছিলেন।”
উপসংহার: বিদ্যাসাগর কেবল বাংলা গদ্যকে রূপই দেননি, বরং তাকে আধুনিক চিন্তা, মননশীলতা ও সাহিত্যের উপযোগী এক অপরাজেয় বাহনে পরিণত করেছেন।
অথবা, (খ) কাজী নজরুল ইসলামের কাব্যচর্চার উপর সংক্ষেপে আলোকপাত কর।
উত্তর:
ভূমিকা: কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য ধূমকেতু ও জাতীয় কবি। পরাধীন ভারতে অন্যায়, অবিচার, শোষণ এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তাঁর কাব্য ছিল জ্বলন্ত অগ্নিশিখার মতো। বিদ্রোহ ও প্রেমের সুষম সমন্বয় তাঁর কাব্যচর্চার মূল বৈভব।
১. বিদ্রোহী চেতনা ও সাম্যবাদ: ১৯২১ সালে রচিত কালজয়ী ‘বিদ্রোহী’ কবিতা তাঁকে বাংলা সাহিত্যের শীর্ষাসনে অধিষ্ঠিত করে। ‘অগ্নি-বীণা’ (১৯২২) কাব্যের মাধ্যমে তিনি পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে ফেলার উদাত্ত আহ্বান জানান। ‘সাম্যবাদী’ ও ‘সর্বহারা’ কাব্যে তিনি কৃষক, মজুর, কুলি ও বারাঙ্গনাদের মানবিক অধিকারের কথা বলেছেন। তিনি গেয়েছেন: “গাহি সাম্যের গান— / মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।”
২. প্রেম ও মানবতার কবি: নজরুল শুধু সংহারের কবি নন, তিনি প্রেমেরও সুকোমল রূপকার। ‘দোলন-চাঁপা’, ‘ছায়ানট’, ‘সিন্ধু-হিন্দোল’ কাব্যে ফুটে উঠেছে প্রেমের চিরন্তন আকুলতা, বিরহ ও সৌন্দর্যবোধ। তিনি নিজেকে ঘোষণা করেছেন: “মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণতূর্য।”
৩. শব্দ ব্যবহারে নবজাগরণ: তিনি বাংলা কাব্যে আরবি, ফারসি ও দেশীয় লোকজ শব্দের এমন অপূর্ব মিশ্রণ ঘটিয়েছেন, যা বাংলা ভাষার প্রকাশক্ষমতাকে বহুগুণে সমৃদ্ধ করেছে।
উপসংহার: অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন বিদ্রোহ এবং মানবপ্রেমের অমিয় বাণী কাজী নজরুল ইসলামের কাব্যকে বিশ্বসাহিত্যের অমর সম্পদে পরিণত করেছে।
খ বিভাগ
মান— ১০ × ২ = ২০
৩। (ক) “ভাষার গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য ভাষা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে” — ‘আমাদের ভাষা সমস্যা’ প্রবন্ধের আলোকে মূল্যায়ন কর।
উত্তর:
ভূমিকা: প্রখ্যাত ভাষাতাত্ত্বিক ও পণ্ডিত ড. মুহম্মদ এনামুল হক তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘আমাদের ভাষা সমস্যা’-তে বাংলা ভাষার ঐতিহাসিক সংকট, বিকাশ এবং সর্বস্তরের মানুষের অধিকারের দিকটি তুলে ধরেছেন। ভাষার গণতান্ত্রিক চরিত্র কীভাবে তার প্রাণশক্তি রক্ষা করে, তা এ প্রবন্ধে সুস্পষ্ট হয়েছে।
১. ভাষার গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যের স্বরূপ:
ভাষার গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য বলতে বোঝায়—ভাষা কোনো নির্দিষ্ট অভিজাত শ্রেণী, পণ্ডিত বা রাজদরবারের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়; বরং তা সমগ্র জনগোষ্ঠীর ভাব প্রকাশের স্বতঃস্ফূর্ত মাধ্যম। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুখের ভাষাই ভাষার আসল প্রাণ।
২. ‘আমাদের ভাষা সমস্যা’ প্রবন্ধের আলোকে বিশ্লেষণ:
- জনগণের ভাষার বিজয়: প্রবন্ধে লেখক দেখিয়েছেন যে, প্রাচীন যুগে সংস্কৃত যখন সাধারণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তখন তা অপভ্রংশ ও প্রাকৃতের মুখে টিকতে পারেনি। যুগে যুগে সাধারণ মানুষ যে ভাষাকে গ্রহণ করেছে, শেষ পর্যন্ত সাহিত্যের মূলধারা হিসেবে সেটাই টিকে গেছে।
- কৃত্রিম ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার ব্যর্থতা: পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর যখন উর্দু বা আরবি হরফে বাংলা লেখার মতো অবাস্তব ও অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত চাপানোর চেষ্টা হয়েছিল, তখন এ দেশের আপামর ছাত্র-জনতা তা রুখে দিয়েছিল। লেখক যুক্তি দেখান যে, কোটি কোটি সাধারণ বাঙালি শ্রমজীবীর ভাষাই হলো আসল বাংলা।
- সহজ ও প্রাঞ্জল রূপের বিকাশ: সাহিত্যিক ভাষা যদি সাধারণ মানুষের জীবনাচরণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তবে তা মৃতভাষায় পরিণত হয়। ড. এনামুল হক জোর দিয়েছেন যে, ভাষার গণতান্ত্রিক বিকাশের জন্য আঞ্চলিক ও লোকজ ভাষার অন্তর্নিহিত শক্তিকে ধারণ করতে হবে।
উপসংহার: ভাষা বাঁচবে জনগণের নিঃশ্বাসে। সুতরাং জনস্বার্থ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ধারণ করেই বাংলা ভাষাকে আধুনিক যুগে বিশ্বমানের জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভাষা হিসেবে রূপ দিতে হবে।
অথবা, (খ) হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘তৈল’ প্রবন্ধের মূল বক্তব্য লেখ।
উত্তর:
ভূমিকা: মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘তৈল’ বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য ব্যঙ্গাত্মক ও সমাজ-সচেতনতামূলক রম্যপ্রবন্ধ। রূপকধর্মী এই প্রবন্ধে লেখক মানব চরিত্রের এক নগ্ন সত্য—’তোষামোদি’ বা তোয়াজ করার মনোবৃত্তিকে রসাত্মক অথচ গভীর তীক্ষ্ণতার সাথে উন্মোচন করেছেন।
মূল বক্তব্যসমূহ:
- তৈলের সর্বব্যাপী মহিমা: লেখক কৌতুকের ছলে তৈলকে জগতের মহাশক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তৈল যেমন পিচ্ছিল করে যন্ত্রকে ঘর্ষণমুক্ত রাখে, তেমনি মানবসমাজে সামাজিক সম্পর্কের জটিলতা দূর করতে তৈল অর্থাৎ তোষামোদ সবচেয়ে কার্যকর ঔষধ।
- তোষামোদের সর্বজনীনতা: সংসারে যে যত বেশি চাটুকারিতা ও তৈলমর্দনে পারদর্শী, তার জাগতিক উন্নতির পথ তত বেশি মসৃণ। পদোন্নতি, ক্ষমতা লাভ এবং সামাজিক প্রভাব অর্জনে মেধা ও যোগ্যতার চেয়ে তৈলের মূল্যই অধিক গণ্য হচ্ছে।
- তৈল প্রয়োগের নিয়ম ও ক্ষেত্র: লেখক রসিকতার সাথে বলেন, সর্বত্র ঢাললে তৈল নষ্ট হয়; উপযুক্ত পাত্রে এবং সময়মতো তৈল ঢালা এক বিশেষ কৌশল। রাজদরবার, সামাজিক সম্পর্ক এবং স্বার্থসিদ্ধির প্রতিটি ক্ষেত্রে তৈল অপরিহার্য চালিকাশক্তি।
- সামাজিক অবক্ষয়ের প্রতি তীব্র কটাক্ষ: হাসির আবরণে লেখক আসলে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের দাসসুলভ মানসিকতা এবং সমকালীন সমাজের সুবিধাবাদ ও অযোগ্যতার রাজত্বকে চাবুক মেরেছেন।
উপসংহার: ‘তৈল’ প্রবন্ধটি একদিকে হাস্যরসাত্মক রচনা, অন্যদিকে চাটুকারবৃত্তির বিরুদ্ধে এক নির্মম দার্শনিক ব্যঙ্গচিত্র।
৪। (ক) ছোটগল্প কাকে বলে? ছোটগল্প হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সমাপ্তি’ গল্পের সার্থকতা আলোচনা কর।
উত্তর:
ভূমিকা: আধুনিক কথাসাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সূক্ষ্মতম শিল্পরূপ হলো ছোটগল্প। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ছোটগল্পের প্রকৃত জনক ও শ্রেষ্ঠ রূপকার। তাঁর ‘সমাপ্তি’ একটি মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরের অনুপম সার্থক ছোটগল্প।
১. ছোটগল্পের সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য:
এডগার অ্যালান পো-র মতে, যে গল্প আধা ঘণ্টা থেকে এক-দুই ঘণ্টায় এক নিঃশ্বাসে পড়ে শেষ করা যায়, তাই ছোটগল্প। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমর পঙক্তিতে ছোটগল্পের শ্রেষ্ঠ পরিচয়:
“ছোট প্রাণ, ছোট কথা, ছোট ছোট দুঃখ ব্যথা / নিতান্তই সহজ সরল… / নাহি বর্ণনার ছটা ঘটনার ঘনঘটা / নাহি তত্ত্ব নাহি উপদেশ। / অন্তরে অতৃপ্তি রবে সাঙ্গ করি মনে হবে / শেষ হয়ে হইল না শেষ।”
ছোটগল্পের মূল বৈশিষ্ট্য: ঘটনার একমুখীনতা, স্বল্প চরিত্র, বাহুল্যবর্জিত বিস্তার এবং একটি অতৃপ্তিকর ব্যঞ্জনাপূর্ণ সমাপ্তি।
২. ‘সমাপ্তি’ গল্পের সার্থকতা বিচার:
- কাহিনী সংক্ষেপ: কলকাতার কলেজপড়ুয়া তরুণ অপূর্ব গ্রামে এসে নিজের পছন্দে গ্রামের চঞ্চল, দুরন্ত ও ডানপিটে বালিকা মৃন্ময়ীকে বিয়ে করে। কিন্তু মৃন্ময়ীর স্বাধীন বন্য সত্তা গৃহবন্দিত্বের নিয়মকানুন মানতে চায় না। অপূর্ব কলকাতায় চলে যাওয়ার পর তার অনুপস্থিতিতে মৃন্ময়ীর হৃদয়ে প্রেমের নীরব বিকাশ ঘটে। অবশেষে এক ঝড়ের রাতে অপূর্ব গ্রামে ফিরে এলে কিশোরী মৃন্ময়ীর পূর্ণাঙ্গ প্রেমময়ী নারীতে রূপান্তর ঘটে।
- চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ: গল্পের মূল আকর্ষণ মৃন্ময়ীর মনস্তাত্ত্বিক বিবর্তন। বন্ধনহীন হরিণীর মতো কিশোরী কীভাবে পরাধীনতার বিদ্রোহ পেরিয়ে গভীর ভালোবাসায় আত্মনিবেদন করে, তা অপূর্ব মমতায় রূপায়িত হয়েছে।
- ছোটগল্পের রস ও সমাপ্তি: গল্পটিতে কোনো অনাবশ্যক দীর্ঘ বর্ণনা নেই। মৃন্ময়ীর দ্বিধাহীন প্রেমসমর্পণে গল্পের সমাপ্তি ঘটে, যা পাঠককে এক মধুর অতৃপ্তিতে ভরিয়ে দেয়।
উপসংহার: রূপক, নাটকীয়তা ও মনস্তত্ত্বের অপূর্ব সমন্বয়ে ‘সমাপ্তি’ বাংলা সাহিত্যের একটি প্রথম শ্রেণীর সার্থক ছোটগল্প।
অথবা, (খ) ‘শিউলিমালা’ গল্পের আলোকে শিউলির চরিত্র অঙ্কন কর।
উত্তর:
ভূমিকা: বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের রচিত শ্রেষ্ঠ মনস্তাত্ত্বিক ও ভাবাবেগঘন রোমান্টিক গল্প ‘শিউলিমালা’। গল্পের কেন্দ্রীয় নারী চরিত্র ‘শিউলি’ এক অপূর্ব আত্মত্যাগী, সংবেদনশীল ও বিরহী ভারতীয় নারীর প্রতিমূর্তি।
শিউলির চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- অনুপম রূপ ও সারল্য: শিউলি রূপবতী, কোমলমতি এবং অকৃত্রিম সরল মনের অধিকারী। তার নামের মতোই সে যেন শিউলি ফুলের মতো পবিত্র, স্নিগ্ধ ও সুরভিত।
- গভীর ও নিঃশব্দ ভালোবাসা: সংগীতশিল্পী নাদির হোসেনের প্রতি শিউলির ভালোবাসা ছিল অন্তহীন, আত্মিক ও নিঃশব্দ। সে কোনো প্রদর্শনীর প্রেম করেনি, বরং অন্তরের গভীর থেকে নাদিরের সুর ও ব্যক্তিত্বকে ধারণ করেছিল।
- পারিবারিক মর্যাদা ও আত্মত্যাগ: পারিবারিক সামাজিক বাস্তবতার কারণে নাদির হোসেনের সাথে তার বিবাহ সম্ভব হয়নি। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে অন্যত্র বিয়ে হলেও সে সমাজের বিরুদ্ধে উগ্র বিদ্রোহ করেনি; বরং নিজের অন্তর্জ্বালা ও প্রেমকে আত্মত্যাগের মহিমায় গোপনে লালন করেছে।
- চিরন্তন বিরহ ও স্মৃতির মালা: শিউলিমালা গেঁথে সে যেভাবে নাদিরের স্মৃতিকে বুকে জড়িয়ে রেখেছিল, তা প্রমাণ করে তার প্রেম ছিল শারীরিক কামনার ঊর্ধ্বে এক শাশ্বত আধ্যাত্মিক মিলন।
উপসংহার: কাজী নজরুল ইসলাম শিউলি চরিত্রের মধ্য দিয়ে প্রাচ্য নারীর সহনশীলতা, ত্যাগ ও বেদনাময় আত্মনিবেদনকে পরম মমতায় রূপ দিয়েছেন।
গ বিভাগ
মান— ১০ × ২ = ২০
৫। (ক) “তত্ত্ব ও অনুভূতির সম্মিলনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বলাকা’ কবিতা অসাধারণ সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়েছে” — উক্তিটির আলোকে ‘বলাকা’ কবিতাটি মূল্যায়ন কর।
উত্তর:
ভূমিকা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যসাধনার এক বৈপ্লবিক বাঁক হলো ‘বলাকা’ (১৯১৬)। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে রচিত এই কাব্যের নাম-কবিতা ‘বলাকা’-তে ফরাসি দার্শনিক অঁরি বের্গসোঁর গতিবাদ (Élan Vital) এবং উপনিষদের চিরন্তন গতির দর্শন কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির সাথে মিশে এক অপূর্ব শিল্পরূপ লাভ করেছে।
১. অনুভূতির পটভূমি:
সন্ধ্যার শান্ত প্রহরে কবি ঝিলম নদীর তীরে বসে প্রকৃতির স্থির প্রশান্তি দেখছিলেন। হঠাৎ একঝাঁক বুনো হাঁসের ডানার শব্দে চরাচর কেঁপে ওঠে। এই ডানার ধ্বনি কবির অন্তরে জাগিয়ে তোলে মহাবিশ্বের অনন্ত গতির স্পন্দন। অনুভূতির এই আকস্মিক স্ফুরণ কবিতায় সুর হয়ে উঠেছে: “সন্ধ্যারাগে ঝিলিমিলি ঝিলমের স্রোতখানি বাঁকা / আঁধারে মলিন হল যেন খাপে-ঢাকা বাঁকা তলোয়ার।”
২. তত্ত্বের সম্মিলন (গতির দর্শন):
- স্থবিরতার মাঝে রূপান্তরের গান: কবি উপলব্ধি করলেন যে বিশ্ব চরাচরের কোনো কিছুই স্থির নয়। পর্বত, অরণ্য, নদী, গ্রহ-নক্ষত্র—সবকিছুই এক অদৃশ্যের পানে উড়ে চলেছে। বের্গসোঁর মতো রবীন্দ্রনাথও বিশ্বাস করলেন, প্রাণ মানেই নিরন্তর প্রবাহ।
- উপনিষদের চরেইবেতি তত্ত্ব: উপনিষদের ‘চরৈবেতি’ (এগিয়ে চলো) মন্ত্র বলাকার ডানার ঝাপটায় ধ্বনিত হয়েছে: “হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে।”
- জীবনের নবায়ন: মৃত্যু কোনো শেষ নয়, তা কেবল অনন্ত যাত্রার রূপান্তর মাত্র। সৃষ্টির প্রতিটি পরমাণু অসীমের আহ্বানে নিরন্তর ধাবমান।
উপসংহার: গভীর দার্শনিক তত্ত্ব যখন ব্যক্তিগত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য রূপকের মধ্য দিয়ে এভাবে আবেগময় কাব্যে রূপ নেয়, তখনই তা মহাকাব্যের গভীরতা লাভ করে। তত্ত্ব ও অনুভূতির এই সুষম সমন্বয়ই ‘বলাকা’-কে বাংলা কাব্যের মুকুটমণি করেছে।
অথবা, (খ) ‘মুসাফির’ কবিতায় মুসাফিরের নিরন্তর চলার মাধ্যমে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন? আলোচনা কর।
উত্তর:
ভূমিকা: মুসলিম নবজাগরণের কবি গোলাম মোস্তফা রচিত ‘মুসাফির’ কবিতা মানবজীবনের অনন্ত কর্মসাধনা ও আধ্যাত্মিক অভিযাত্রার এক অনন্য রূপক। মুসাফির মূলত পার্থিব জীবনের প্রতিটি সত্যসন্ধানী মানুষের প্রতীক।
মুসাফিরের নিরন্তর চলার মূল তাৎপর্য:
- জীবন এক চলমান সরাইখানা: কবি দেখিয়েছেন যে, এই ধূলির পৃথিবী মানুষের চিরস্থায়ী বাসস্থান নয়। মানুষ এখানে ক্ষণিকের মুসাফির বা পথিক মাত্র। সরাইখানায় যেমন পথিক এক রাতের বিশ্রামের পর ভোরে আবার পথচলা শুরু করে, মানবজীবনের লক্ষ্যও তেমনি আখেরাতের অনন্ত গন্তব্য।
- ক্লান্তিহীন কর্মপ্রেরণা: পথে শত বাধা, কণ্টকাকীর্ণ মরুভূমি কিংবা ঝড়-ঝঞ্ঝা আসলেও সত্যের সৈনিককে থেমে থাকলে চলবে না। আরাম-আয়েশ ও মোহের মায়াজালে আটকে পড়া মুসাফিরের ধর্ম নয়। কবি বলেন: “চল মুসাফির বাঁধ রে গাঠরি, অনেক পথ যে বাকি।”
- আধ্যাত্মিক জাগরণ ও ঈমানের দীপ্তি: কবি নিরাশার অন্ধকারে নিমজ্জিত মুসলিম সমাজকে এই কবিতার মাধ্যমে জাগরণের বাণী শুনিয়েছেন। আলস্য ও জড়তা ঝেড়ে ফেলে জাতির হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারে অবিরাম সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়াই হলো মুসাফিরের আদর্শ।
উপসংহার: ‘মুসাফির’ কবিতা মানুষকে সংকীর্ণ স্বার্থপরতা ভুলে এক বৃহত্তর মহৎ লক্ষ্যের পানে আমৃত্যু পথ চলার আত্মিক শক্তি জোগায়।
৬। (ক) কবি জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ কবিতার কাব্য সৌন্দর্য বিশ্লেষণ কর।
উত্তর:
ভূমিকা: বাংলা সাহিত্যের শুদ্ধতম ও তিমিরবিনাশী কবি জীবনানন্দ দাশের কালজয়ী সৃষ্টি ‘বনলতা সেন’ (১৯৪২)। এটি কেবল একটি প্রেমের কবিতা নয়, বরং হাজার বছরের মানব সভ্যতার ক্লান্তি, নিঃসঙ্গতা এবং এক পরম আশ্রয়ের শাশ্বত অনুভূতির সুরভিত প্রকাশ।
১. কবিতার কাব্য সৌন্দর্যের মূল উপাদানসমূহ:
- ঐতিহাসিক পটভূমি ও দূরপাহাড়ী কল্পনা: কবিতার শুরুতেই সময় ও স্থানের এক সুবিশাল ব্যাপ্তি ফুটে উঠেছে: “হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে / সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে / অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে।” প্রাচীন ইতিহাস ও ভৌগোলিক দূরত্বের এই মেলবন্ধন কবিতাকে এক মহাকাব্যিক আবহ দিয়েছে।
- ক্লান্তির বৈশ্বিক বেদনা: জীবনযুদ্ধের চরম ক্লান্তি ও হাহাকার থেকে কবি মুক্তি খুঁজেছেন। জীবনের চারিদিকে যখন শুধু সমুদ্রের ফেনিল গর্জন, তখনই নাটোরের বনলতা সেন এনে দেয় শান্তি।
- অনুপম রূপকল্প ও উপমা নির্মাণ: রূপের বর্ণনায় কবি যেসকল উপমা ব্যবহার করেছেন, তা বিশ্বসাহিত্যে দুর্লভ: “চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা / মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের ‘পর / হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা… / তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’ / পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।” পাখির নীড়ের মতো পরম আশ্রয়দাত্রী চোখ বাংলা কবিতায় এক চিরন্তন বিস্ময়।
- সন্ধ্যা ও নিঃসঙ্গতার মায়াবী চিত্র: দিনের শেষে যখন সব পাখি ঘরে ফেরে, নদী ফুরায়, তখন অন্ধকারের নির্জনতায় একমাত্র বনলতা সেনই কবির মুখোমুখি বসার প্রেরণা।
উপসংহার: শব্দের জাদুকরী বিন্যাস, রোমান্টিক আবহ এবং গভীর বিষাদের সুরে ‘বনলতা সেন’ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ লিরিক কবিতার মর্যাদা লাভ করেছে।
অথবা, (খ) ‘আমার পূর্ব বাংলা’ কবিতা অনুসরণে বাংলাদেশের রূপময় চিত্র অঙ্কন কর।
উত্তর:
ভূমিকা: আধুনিক বাংলা সাহিত্যের শক্তিমান কবি সৈয়দ আলী আহসানের রচিত ‘আমার পূর্ব বাংলা’ স্বদেশপ্রেম ও প্রকৃতির নিবিড় সৌন্দর্যে উদ্ভাসিত এক অনবদ্য কবিতা। বাংলাদেশের শ্যামল নিসর্গ, নদীমাতৃক রূপ এবং মাটির সোঁদা গন্ধ এই কবিতার ছত্রে ছত্রে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের রূপময় চিত্রের বর্ণনা:
- সবুজের সমারোহ ও নিসর্গের রূপ: কবি তাঁর প্রিয় মাতৃভূমিকে এক কোমল, লাবণ্যময়ী ও স্নেহময়ী নারীরূপে দেখেছেন। দিগন্তজোড়া ফসলের ক্ষেত, ধানসিঁড়ি ও রূপসী বাংলার সবুজ ঘাস কবিকে মুগ্ধ করে।
- নদী ও জলের কলতান: কবি পূর্ব বাংলাকে বর্ণনা করেছেন বহমান নদী, শীতল জলের স্পর্শ এবং মেঘের ছায়ায় ঢাকা এক স্বপ্নভূমি হিসেবে। পদ্মার ঢেউ, ভাটায় ভেসে যাওয়া নৌকা এবং মাঝির ভাটিয়ালি গানের সুর এই দেশের আত্মাকে ধারণ করে।
- মাটির গন্ধ ও ঐতিহ্যের সুরভী: এ দেশের বাতাস শিউলি, কদম ও হাসনাহেনার গন্ধে মাতোয়ারা। কবি বাংলাদেশের মাটির মাটির স্পর্শে এক অনাবিল শান্তি ও শীতলতা খুঁজে পান।
- মমতাময়ী জননীর রূপ: পূর্ব বাংলা কেবল একটি ভূখণ্ড নয়, তা কবির কাছে সন্তানের প্রতি পরম স্নেহে ঝুঁকে থাকা এক মমতাময়ী মা।
উপসংহার: নিখাদ স্বদেশপ্রেম এবং রূপসী প্রকৃতির চিত্রণে ‘আমার পূর্ব বাংলা’ কবিতাটি বাংলাদেশের এক অমর কাব্যিক মানচিত্র।
ঘ বিভাগ
মান— ৫ × ৪ = ২০
(যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও)
৭। (ক) সাধু ও চলিত রীতি বলতে কী বুঝ? সাধু ও চলিত রীতির পাঁচটি করে বৈশিষ্ট্য লেখ।
উত্তর:
১. সাধু ও চলিত রীতির পরিচয়:
- সাধু রীতি: যে ভাষা রীতি গুরুগম্ভীর, তৎসম শব্দবহুল এবং ব্যাকরণের সুনির্দিষ্ট নিয়মানুযায়ী সর্বনাম ও ক্রিয়াপদের পূর্ণাঙ্গ রূপ ধারণ করে কেবল লেখ্য রূপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাকে সাধু রীতি বলে।
- চলিত রীতি: যে ভাষা রীতি চটুল, পরিবর্তনশীল, সহজবোধ্য, মানুষের মৌখিক কথ্য ভাষার ওপর ভিত্তি করে তদ্ভব ও দেশি শব্দের প্রাধান্য নিয়ে গড়ে উঠেছে, তাকে চলিত রীতি বলে।
২. সাধু ও চলিত রীতির পাঁচটি করে বৈশিষ্ট্য:
| সাধু রীতির ৫টি বৈশিষ্ট্য | চলিত রীতির ৫টি বৈশিষ্ট্য |
|---|---|
| ১. তৎসম (সংস্কৃত) শব্দের প্রাধান্য থাকে। | ১. তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি শব্দের প্রাধান্য থাকে। |
| ২. সর্বনাম পদের দীর্ঘ রূপ ব্যবহৃত হয় (যেমন: তাহার, কাহাকে)। | ২. সর্বনাম পদের সংক্ষিপ্ত রূপ ব্যবহৃত হয় (যেমন: তার, কাকে)। |
| ৩. ক্রিয়াপদের পূর্ণাঙ্গ রূপ ব্যবহৃত হয় (যেমন: করিয়াছিল, যাইব)। | ৩. ক্রিয়াপদের সংক্ষিপ্ত রূপ ব্যবহৃত হয় (যেমন: করেছিল, যাব)। |
| ৪. অপরিবর্তনশীল ও ব্যাকরণের কঠোর নিয়ম মেনে চলে। | ৪. পরিবর্তনশীল ও জীবন্ত মুখের ভাষার নিকটবর্তী। |
| ৫. নাটকীয় সংলাপ ও বক্তৃতার জন্য অনুপযোগী। | ৫. নাটকীয় সংলাপ, আলাপচারিতা ও বক্তৃতার জন্য অত্যন্ত উপযোগী। |
৭। (খ) ব্যাসবাক্যসহ সমাস নির্ণয় কর (যে কোনো পাঁচটি) :
উত্তর:
| প্রদত্ত শব্দ | ব্যাসবাক্য | সমাসের নাম |
|---|---|---|
| আমরা | আমি, তুমি ও সে | একশেষ দ্বন্দ্ব সমাস |
| মহানবি | মহান যে নবি | কর্মধারয় সমাস |
| গণতন্ত্র | গণের তন্ত্র | ৬ষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস |
| বহুব্রীহি | বহু ব্রীহি (ধান) আছে যার | সমানাধিকরণ বহুব্রীহি সমাস |
| প্রতিদিন | দিনে দিনে | অব্যয়ীভাব সমাস |
| সাতমাথা | সাত মাথার সমাহার | দ্বিগু সমাস |
| বিষাদসিন্ধু | বিষাদ রূপ সিন্ধু | রূপক কর্মধারয় সমাস |
৭। (গ) প্রকৃতি ও প্রত্যয় নির্ণয় কর (যে কোনো পাঁচটি) :
উত্তর:
| প্রদত্ত শব্দ | প্রকৃতি ও প্রত্যয় | প্রত্যয়ের নাম |
|---|---|---|
| পড়ন্ত | √পড়্ + অন্ত | কৃৎ প্রত্যয় |
| ঢাকাই | ঢাকা + আই | তদ্ধিত প্রত্যয় |
| পাঠক | √পঠ্ + অক (ণ্বুল্) | কৃৎ প্রত্যয় |
| কর্তব্য | √কৃ + তব্য | কৃৎ প্রত্যয় |
| দোলনা | √দুল্ + না (অনা) | কৃৎ প্রত্যয় |
| একুশে | একুশ + এ | তদ্ধিত প্রত্যয় |
| কাব্য | কবি + য (ষ্ণ্য) | তদ্ধিত প্রত্যয় |
৭। (ঘ) ‘উপসর্গের অর্থবাচকতা নেই, কিন্তু অর্থদ্যোতকতা আছে’— আলোচনা কর।
উত্তর:
১. ধারণা ও তাৎপর্য:
বাংলা ব্যাকরণে উপসর্গ হলো এমন কিছু অর্থহীন অব্যয়সূচক শব্দাংশ, যা স্বাধীনভাবে ব্যবহৃত হয়ে কোনো অর্থ প্রকাশ করতে পারে না (অর্থবাচকতা নেই); কিন্তু অন্য কোনো শব্দের পূর্বে যুক্ত হয়ে সেই শব্দের অর্থের সংকোচন, প্রসারণ, পরিবর্তন বা নতুন অর্থ সৃষ্টি করার অনন্য ক্ষমতা রাখে (অর্থদ্যোতকতা আছে)।
২. উদাহরণের সাহায্যে প্রমাণ:
একটি মূল শব্দ ‘হার’ (যার অর্থ গলার মালা বা পরাজয়)-এর পূর্বে বিভিন্ন উপসর্গ যুক্ত করে অর্থের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাক:
- ‘প্র’ উপসর্গ যোগে: প্র + হার = প্রহার (অর্থ: মারধর করা)।
- ‘আ’ উপসর্গ যোগে: আ + হার = আহার (অর্থ: খাওয়া বা ভোজন)।
- ‘উপ’ উপসর্গ যোগে: উপ + হার = উপহার (অর্থ: ভেট বা নজরানা)।
- ‘বি’ উপসর্গ যোগে: বি + হার = বিহার (অর্থ: ভ্রমণ বা প্রমোদ)।
- ‘সং’ উপসর্গ যোগে: সং + হার = সংহার (অর্থ: বিনাশ বা ধ্বংস)।
- ‘পরি’ উপসর্গ যোগে: পরি + হার = পরিহার (অর্থ: বর্জন করা)।
উপরিউক্ত উদাহরণে ‘প্র’, ‘আ’, ‘উপ’, ‘বি’, ‘সং’ বা ‘পরি’-এর কোনো নিজস্ব অর্থ ছিল না; কিন্তু ‘হার’ শব্দের পূর্বে বসে এরা সম্পূর্ণ নতুন নতুন অর্থ তৈরি করেছে। অতএব ব্যাকরণবিদদের উক্তিটি যথার্থ যে—”উপসর্গের নিজস্ব অর্থবাচকতা নেই, কিন্তু অর্থদ্যোতকতা আছে।”
৭। (ঙ) আধুনিক বাংলা বানানের পাঁচটি নিয়ম উদাহরণসহ লেখ।
উত্তর:
বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের ৫টি নিয়ম নিচে উল্লেখ করা হলো:
- অতৎসম শব্দে কেবল ‘ই’ ও ‘উ’ ধ্বনি: সকল অতৎসম (তদ্ভব, দেশি, বিদেশি ও মিশ্র) শব্দে সর্বদা হ্রস্ব-ই এবং হ্রস্ব-উ কার হবে; কোনো দীর্ঘ-ঈ বা দীর্ঘ-ঊ কার হবে না। যেমন: পাখি, হাতি, শাড়ি, চুন, চুনকাম, সরকারি, ইংরেজি।
- স্ত্রীবাচক অতৎসম শব্দেও ‘ই’ কার: অতৎসম স্ত্রীবাচক শব্দের শেষে সর্বদা হ্রস্ব-ই কার হবে। যেমন: নানি, দাদি, চাচি, মাসি, মেথরানি।
- শব্দের শেষে বিসর্গ (ঃ) বর্জন: শব্দের শেষে বিসর্গ বসবে না। যেমন: মূলত, বস্তুত, প্রধানত, প্রায়শ, ফলত (পূর্বে লেখা হতো মূলত: ইত্যাদি)।
- সন্ধিহীন শব্দে ঙ/ং-এর ব্যবহার: সন্ধিবদ্ধ শব্দ ছাড়া প্রত্যয়হীন শব্দের শেষে অনুস্বর (ং) হবে। যেমন: রং, ঢং, পালং, গাং। তবে স্বরবর্ণ যুক্ত হলে ‘ঙ’ হবে, যেমন: রঙে, রঙিন।
- যুক্তবর্ণে ‘ক্ষ্ম’-এর ক্ষ-এর বর্জন: তৎসম শব্দে রেফের পর ব্যঞ্জনবর্ণের দ্বিত্ব হবে না। যেমন: কর্ম (কর্ম্ম নয়), সূর্য (সূর্য্য নয়), ধর্ম (ধর্ম্ম নয়), অর্জন (অর্জ্জন নয়)।
৭। (চ) বিরামচিহ্ন কাকে বলে? এগুলোর প্রয়োজনীয়তা বর্ণনা করে নামসহ চিহ্নগুলো উল্লেখ কর।
উত্তর:
১. বিরামচিহ্নের সংজ্ঞা: বাক্যের ভাব ও অর্থ সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করার জন্য এবং বাক্য পাঠকালে কোথায় কতটুকু থামতে হবে তা বোঝানোর জন্য যেসকল সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহৃত হয়, তাদেরকে বিরামচিহ্ন বা যতিচিহ্ন বলা হয়।
২. প্রয়োজনীয়তা: বিরামচিহ্ন ব্যতীত বাক্যের অর্থ বিকৃত হতে পারে। যেমন: “এখানে প্রস্রাব করিবেন না, করিলে পঞ্চাশ টাকা জরিমানা।” কিন্তু কমা স্থান পরিবর্তন করে লিখলে: “এখানে প্রস্রাব করিবেন, না করিলে পঞ্চাশ টাকা জরিমানা।” এতে সম্পূর্ণ বিপরীত অর্থ প্রকাশ পায়। অতএব সঠিক ভাব ও অর্থ প্রকাশের জন্য যতিচিহ্ন অপরিহার্য।
৩. প্রধান বিরামচিহ্নসমূহের তালিকা:
- ১. কমা ( , ) — থামার সময়: ১ গণনা করতে যে সময় লাগে।
- ২. সেমিকোলন ( ; ) — থামার সময়: ১ বলার দ্বিগুণ সময়।
- ৩. দাঁড়ি বা পূর্ণচ্ছেদ ( । ) — থামার সময়: এক সেকেন্ড।
- ৪. প্রশ্নবোধক চিহ্ন ( ? ) — থামার সময়: এক সেকেন্ড।
- ৫. বিস্ময়সূচক চিহ্ন ( ! ) — থামার সময়: এক সেকেন্ড।
- ৬. কোলন ( : ) — থামার সময়: এক সেকেন্ড।
- ৭. ড্যাশ ( — ) — থামার সময়: এক সেকেন্ড।
- ৮. হাইফেন ( – ) — থামার প্রয়োজন নেই।
- ৯. উদ্ধরণ চিহ্ন ( ” ” ) — থামার সময়: ১ বলতে যে সময় লাগে।
৭। (ছ) ভাব-সম্প্রসারণ কর :
“শৈবাল দিঘিরে বলে উচ্চ করি শির, / লিখে রাখ এক ফোঁটা দিলাম শিশির।”
উত্তর:
মূলভাব: সমাজে ক্ষুদ্র ও স্বার্থপর ব্যক্তিরা অন্যের অপরিমেয় অনুগ্রহে লালিত হয়েও আত্মমর্যাদা ও কৃতজ্ঞতা ভুলে যায়; বরং সামান্যতম অবদানের জন্য নিজের ঢাকঢোল পিটিয়ে গর্ববোধ করে।
সম্প্রসারিত ভাব: বিশাল দিঘি তার অপার জলরাশি দিয়ে শৈবালকে বক্ষে ধারণ করে বাঁচিয়ে রাখে। দিঘির অসীম স্নেহে লালিত শৈবালটি বেঁচে থাকার সমস্ত পুষ্টি ও আশ্রয় দিঘি থেকেই লাভ করে। অথচ সকালে শৈবালের মাথায় যখন ভোরের সামান্য এক ফোঁটা শিশির জমে, তখন সে অহংকারে উন্মত্ত হয়ে দিঘির অসীম দানকে অস্বীকার করে বলে—”লিখে রাখ, আমি তোমাকে এক ফোঁটা শিশির দান করলাম!”
মানবসমাজেও এমন অনেক দাম্ভিক, অকৃতজ্ঞ ও কপট মানুষের বাস। মা-বাবা, সমাজ বা রাষ্ট্রের পর্বতপ্রমাণ অনুগ্রহে বড় হয়েও তারা সমাজে নিজেকে স্বয়ম্ভূ মনে করে। সমাজের সার্বিক কল্যাণে তারা হয়তো সামান্য কিছু কাজ করে, কিন্তু সেই নগণ্য কাজের প্রচার করে তারা আত্মতৃপ্তি লাভ করে। তাদের এই ক্ষুদ্র মানসিকতা মূলত তাদের অন্তঃসারশূন্যতা ও চরম অকৃতজ্ঞতারই পরিচায়ক। অন্যদিকে মহৎ ব্যক্তিত্বরা নীরবে সূর্যের মতো নিঃস্বার্থভাবে দান করে যান, কোনো প্রতিদানের আশা করেন না।
মন্তব্য: অকৃতজ্ঞতা ও আত্মম্ভরিতা নীচ মনের পরিচয়। অন্যের উপকারের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা এবং অহংকার ত্যাগ করাই খাঁটি মনুষ্যত্বের লক্ষণ।
৭। (জ) তোমার মাদ্রাসায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য মহোদয়ের আগমন উপলক্ষে একটি মানপত্র রচনা কর।
উত্তর:
মানপত্র
হে জ্ঞানের আলোকবর্তিকা, স্বাগত হে বরেণ্য অতিথি!
শ্রদ্ধাস্পদেষু উপাচার্য মহোদয়,
আজকের এই শুভলগ্নে আমাদের ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসার পবিত্র প্রাঙ্গণে আপনার মতো একজন প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, গবেষক ও সুযোগ্য অভিভাবককে কাছে পেয়ে আমরা পরম আনন্দিত ও গর্বিত। আপনার শুভাগমনে আমাদের প্রতিষ্ঠান আজ নতুন প্রাণচাঞ্চল্যে মুখরিত। আমরা আপনাকে অন্তরের অন্তস্থল থেকে জানাই উষ্ণ অভিনন্দন ও লাল গোলাপের শুভেচ্ছা। স্বাগতম, সুস্বাগতম!
হে জ্ঞানতাপস কাণ্ডারি,
ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি বিশ্বমানের আধুনিক গবেষণা ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের জন্য আপনার নিরলস সাধনা ও দূরদর্শী নেতৃত্ব আজ সর্বজনবিদিত। মাদ্রাসার শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি এবং যুগের চাহিদার সাথে সমন্বয় করে আপনি যে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন, তা জাতির ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে। আপনার নেতৃত্বে আজ ফাজিল ও কামিল স্তরের শিক্ষার্থীরা নৈতিক ও আধুনিক জ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়ে দেশ গড়ার প্রত্যয়ে এগিয়ে চলেছে।
হে মহান অভিভাবক,
আমাদের এই দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘকাল ধরে কুরআন-সুন্নাহ ও আধুনিক শিক্ষার আলো বিস্তারে কাজ করে যাচ্ছে। তবে একটি সমৃদ্ধ ডিজিটাল লাইব্রেরি, আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব এবং শ্রেণিকক্ষ সংকটের কারণে আমাদের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার পূর্ণ সুযোগ থেকে কিছুটা বঞ্চিত হচ্ছে। আমরা বিশ্বাস করি, আপনার সস্নেহ সুদৃষ্টি ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আমাদের প্রতিষ্ঠানটি এতদঞ্চলের এক আদর্শ বিদ্যা নিকেতনে পরিণত হবে।
উপসংহার:
পরিশেষে, মহান রাব্বুল আলামীনের দরবারে আপনার দীর্ঘায়ু, সুস্বাস্থ্য ও সর্বাঙ্গীন সাফল্য কামনা করি। আপনার দিকনির্দেশনামূলক পথচলায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় আরও এগিয়ে যাক—এই আমাদের আন্তরিক প্রার্থনা।
বিনীত,
শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীবৃন্দ
দারুসসালাম ফাজিল মাদ্রাসা, ঢাকা।
তারিখ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: ফাজিল ১ম বর্ষের বাংলা প্রশ্নপত্রের মানবণ্টন কেমন?
উত্তর: বাংলা (বিষয় কোড: ২০১১০৪) পরীক্ষায় মোট ৪টি বিভাগ থাকে: ‘ক’ বিভাগে সাহিত্য ইতিহাস (২০ নম্বর), ‘খ’ বিভাগে গদ্য ও ছোটগল্প (২০ নম্বর), ‘গ’ বিভাগে কবিতা (২০ নম্বর) এবং ‘ঘ’ বিভাগে ব্যবহারিক বাংলা ব্যাকরণ ও নির্মিতি (২০ নম্বর)। সর্বমোট ৮০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
প্রশ্ন ২: বাংলা গদ্যের জনক হিসেবে বিদ্যাসাগরের সবচেয়ে বড় অবদান কী?
উত্তর: বাংলা গদ্যে যতিচিহ্ন বা বিরামচিহ্নের সুশৃঙ্খল ব্যবহার প্রবর্তন এবং সংস্কৃত ও তদ্ভব শব্দের অপূর্ব মেলবন্ধনে ছন্দোময় ও প্রাঞ্জল গদ্যরীতি সৃষ্টি করাই বিদ্যাসাগরের সবচেয়ে বড় অবদান।
প্রশ্ন ৩: ‘উপসর্গের অর্থবাচকতা নেই কিন্তু অর্থদ্যোতকতা আছে’ কথাটির মূল অর্থ কী?
উত্তর: উপসর্গের নিজস্ব কোনো পৃথক অর্থ নেই (অর্থবাচকতা নেই), কিন্তু অন্য কোনো শব্দের পূর্বে যুক্ত হয়ে সেই শব্দের অর্থকে পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা নতুন রূপ দেওয়ার অনন্য ক্ষমতা রয়েছে (অর্থদ্যোতকতা আছে)।
প্রশ্ন ৪: প্রমিত বাংলা বানানে অতৎসম শব্দের প্রধান নিয়ম কোনটি?
উত্তর: সকল অতৎসম (তদ্ভব, দেশি, বিদেশি ও মিশ্র) শব্দ এবং অতৎসম স্ত্রীবাচক শব্দের শেষে সর্বদা হ্রস্ব-ই (ি) এবং হ্রস্ব-উ (ু) কার ব্যবহৃত হবে; কোনো দীর্ঘ-ঈ (ী) কার হবে না।
প্রশ্ন ৫: ‘বনলতা সেন’ কবিতায় বনলতা সেন মূলত কিসের প্রতীক?
উত্তর: নাটোরের বনলতা সেন মূলত হাজার বছরের মানব ইতিহাসের ক্লান্তি, একাকীত্ব ও অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি লাভের পর এক পরম শান্তি, নির্ভরতা ও শাশ্বত প্রেমের প্রতীক।
প্রশ্ন ৬: এই প্রশ্নোত্তরে কি ২০২৪ সালের বাংলা মডেল টেস্টের সব বিকল্প প্রশ্ন অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে?
উত্তর: হ্যাঁ, এতে ২০২৪ সালের মূল ও অথবা (বিকল্প) সহ প্রতিটি রচনামূলক প্রশ্ন, ব্যাকরণ ও নির্মিতির পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক সমাধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।