পরীক্ষা কোড: ২০১ | প্রশ্নপত্র কোড: ০০১
اختبار السنة الأولى للفاضل البكالوريوس (الشرف)، لعام ٢٠٢٠
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষ পরীক্ষা, ২০২০]
القرآن والدراسات الإسلامية [আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
المدخل إلى علوم القرآن
[আল-মাদখাল ইলা উলূমিল কুরআন]
বিষয় কোড: ২০ ১১ ০১
الزمن—٤ ساعات [সময়—৪ ঘণ্টা] | الدرجات الكاملة—٨٠ [পূর্ণমান—৮০]
الملاحظة : أجب عن أربعة من مجموعة (أ) وعن أربعة من مجموعة (ب)-
[দ্রষ্টব্য : (ক) অংশ থেকে চারটি এবং (খ) অংশ থেকে চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
مجموعة (أ) [ক অংশ]
الدرجات—١٥ × ٤ = ٦٠ [মান—১৫ × ৪ = ৬০]
১- عرّف القرآن الكريم- ثم اكتب أسمائه وأوصافه فى ضوء القرآن والسنة-
[কুরআন কারীমের পরিচয় দাও। অতঃপর কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এর নাম ও বিশেষণসমূহ আলোচনা কর।] (মান ১৫)
১. কুরআন কারীমের পরিচয় (تعريف القرآن الكريم):
(ক) শাব্দিক অর্থ (المعنى اللغوي):
‘কুরআন’ (القرآن) শব্দটি আরবি। এর মূলধাতু ও ব্যুৎপত্তি নিয়ে ভাষাবিদ ও মুফাসসিরগণের মধ্যে একাধিক অভিমত রয়েছে:
- ইমাম লিসানুল আরব ও জাজ্জাজের মত: এটি قرأ (ক্বারাআ) ধাতু হতে ‘ফু’লান’ (فُعْلَان) ওজনে গঠিত একটি মাসদার বা ক্রিয়ামূল, যার অর্থ ‘পঠিতব্য’ বা ‘যা বারবার পাঠ করা হয়’ (المقروء)। যেহেতু পৃথিবীতে পবিত্র কুরআনই সর্বাধিক পঠিত গ্রন্থ, তাই একে কুরআন বলা হয়।
- ইমাম আশ’আরী ও ফাররা-এর মত: এটি قرن (ক্বারনা) ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ মিলিয়ে দেওয়া বা একত্রিত করা। যেহেতু এর একটি আয়াত অপর আয়াত এবং এক সূরা অপর সূরার সাথে সুবিন্যস্তভাবে যুক্ত, তাই একে কুরআন বলা হয়।
- ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর মত: ‘কুরআন’ কোনো ধাতু থেকে নিষ্পন্ন নয়; বরং এটি কোনো ধাতুহীন বিশেষ বিশেষ্য (اسم علم غير مشتق), যা তাওরাত বা ইঞ্জিলের মতো সরাসরি আল্লাহর শেষ কিতাবের নিজস্ব নাম হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে।
(খ) পারিভাষিক সংজ্ঞা (المعنى الاصطلاحي):
উসূলে ফিকহ ও উলূমুল কুরআনের আলিমগণের ঐকমত্যে কুরআন মাজীদের সার্বিক ও সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা হলো:
«هُوَ كَلَامُ اللَّهِ الْمُعْجِزُ، الْمُنَزَّلُ عَلَىٰ قَلْبِ سَيِّدِنَا مُحَمَّدٍ ﷺ، بِلِسَانٍ عَرَبِيٍّ مُبِينٍ، الْمَنْقُولُ إِلَيْنَا بِالتَّوَاتُرِ، الْمَكْتُوبُ فِي الْمَصَاحِفِ، الْمُتَعَبَّدُ بِتِلَاوَتِهِ، الْمَبْدُوءُ بِسُورَةِ الْفَاتِحَةِ وَالْمَخْتُومُ بِسُورَةِ النَّاسِ.»
সরলার্থ: “পবিত্র কুরআন হলো আল্লাহর সেই অলৌকিক কালাম, যা আরবি সুস্পষ্ট ভাষায় শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ-এর ওপর জিবরীল (আ.)-এর মাধ্যমে অবতীর্ণ হয়েছে, যা মুসহাফসমূহে লিপিবদ্ধ, যা তিলাওয়াত করা স্বতন্ত্র ইবাদত, যা তাওয়াতুর বা অকাট্য সনদে আমাদের কাছে পৌঁছেছে এবং যা সূরা আল-ফাতিহা দিয়ে শুরু হয়ে সূরা আন-নাস দিয়ে সমাপ্ত হয়েছে।”
২. কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে পবিত্র কুরআনের নাম ও বিশেষণসমূহ (أسماء القرآن وأوصافه):
ইমাম বদরুদ্দীন যারকাশী তাঁর ‘আল-বুরহান’ গ্রন্থে এবং ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী তাঁর ‘আল-ইতকান’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, পবিত্র কুরআনে এই মহাগ্রন্থের ৫৫টিরও বেশি নাম ও মহিমান্বিত উপাধি বর্ণিত হয়েছে। নিচে প্রধান নাম ও বিশেষণসমূহ উল্লেখ করা হলো:
(ক) প্রধান নামসমূহ (الأسماء المشهورة):
- আল-কুরআন (القرآن – সর্বাধিক পঠিত কিতাব): সর্বাধিক প্রসিদ্ধ নাম। আল্লাহ তাআলা বলেন: «إِنَّ هَٰذَا الْقُرْآنَ يَهْدِي لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ» (নিশ্চয় এই কুরআন এমন পথ প্রদর্শন করে যা সর্বাধিক সঠিক ও সরল – সূরা বনি ইসরাঈল: ৯)।
- আল-কিতাব (الكتاب – লিখিত গ্রন্থ): আল্লাহ তাআলা বলেন: «ذَٰلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ ۛ فِيهِ» (এটি সেই ঐশী কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই – সূরা বাকারা: ২)।
- আল-ফুরকান (الفرقان – সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী): আল্লাহ তাআলা বলেন: «تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَىٰ عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَالَمِينَ نَذِيرًا» (পরম বরকতময় তিনি, যিনি স্বীয় বান্দার ওপর ফুরকান অবতীর্ণ করেছেন যাতে সে বিশ্বজগতের জন্য সতর্ককারী হতে পারে – সূরা ফুরকান: ১)।
- আয-যিকর (الذكر – উপদেশ ও স্মারক): আল্লাহ তাআলা বলেন: «إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ» (নিশ্চয় আমিই এই যিকর বা উপদেশবাণী অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষক – সূরা হিজর: ৯)।
- আত-তানযীল (التنزيل – অবতীর্ণ কিতাব): আল্লাহ তাআলা বলেন: «وَإِنَّهُ لَتَنزِيلُ رَبِّ الْعَالَمِينَ» (আর নিশ্চয় এটি বিশ্বজাহানের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে অবতীর্ণকৃত – সূরা শুআরা: ১৯২)।
(খ) প্রধান গুণবাচক বিশেষণসমূহ (الأوصاف الجليلة):
- আন-নূর (النور – জ্যোতি): «وَأَنزَلْنَا إِلَيْكُمْ نُورًا مُّبِينًا» (আর আমি তোমাদের প্রতি সুস্পষ্ট জ্যোতি অবতীর্ণ করেছি – সূরা নিসা: ১৭৪)।
- হুদা ও রহমত (هدى ورحمة – হিদায়াত ও করুণা): «هُدًى وَرَحْمَةً لِّلْمُحْسِنِينَ» (সৎকর্মপরায়ণদের জন্য পথপ্রদর্শক ও বিশেষ রহমত – সূরা লুকমান: ৩)।
- শিফা (شفاء – আরোগ্য): «وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِينَ» (আর আমি কুরআনে এমন বিষয় নাযিল করি যা মুমিনদের জন্য আরোগ্য ও রহমত – সূরা বনি ইসরাঈল: ৮২)।
- আল-মাজীদ (المجيد – মহিমান্বিত): «بَلْ هُوَ قُرْآنٌ مَّجِيدٌ» (বরং এটি এক পরম মহিমান্বিত কুরআন – সূরা বুরুজ: ২১)।
- আল-কারীম (الكريم – সম্মানিত): «إِنَّهُ لَقُرْآنٌ كَرِيمٌ» (নিশ্চয় এটি এক মহাসম্মানিত কুরআন – সূরা ওয়াকিয়া: ৭৭)।
- মুবারাক (مبارك – বরকতময়): «كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ» (এটি এক বরকতময় কিতাব যা আমি আপনার প্রতি অবতীর্ণ করেছি – সূরা সোয়াদ: ২৯)।
- আযীয ও হাকীম (عزيز وحكيم – পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়): «وَإِنَّهُ لَكِتَابٌ عَزِيزٌ» (নিশ্চয় এটি এক অপরাজেয় সম্মানিত কিতাব – সূরা ফুসসিলাত: ৪১)।
২- ما معنى الوحى؟ ولم يحتاج إليه الإنسان؟ بين شبهات الجاحدين للوحى مع الرد عليهم-
[ওহী অর্থ কী? মানুষের জন্য কেন ওহীর প্রয়োজন? ওহী অস্বীকারকারীদের কতিপয় সন্দেহ উত্তরসহ বর্ণনা কর।] (মান ১৫)
১. ওহীর অর্থ ও তাৎপর্য (معنى الوحي):
(ক) শাব্দিক অর্থ (المعنى اللغوي):
‘ওহী’ (الوحي) একটি আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ হলো: অতি গোপনে ইশারা করা, সংকেত দেওয়া, দ্রুত বার্তা পৌঁছে দেওয়া, অন্তরে কোনো ভাব বা জ্ঞান প্রবিষ্ট করিয়ে দেওয়া (الإعلام السريع الخفي)।
(খ) পারিভাষিক সংজ্ঞা (المعنى الاصطلاحي):
শরিয়তের পরিভাষায়: «إِعْلَامُ اللَّهِ تَعَالَىٰ مَنْ اصْطَفَاهُ مِنْ عِبَادِهِ كُلَّ مَا أَرَادَ إِطْلَاعَهُ عَلَيْهِ مِنْ أَلْوَانِ الْهِدَايَةِ وَالْعِلْمِ بِطَرِيقَةٍ سَرِيعَةٍ خَفِيَّةٍ خَارِقَةٍ لِلْعَادَةِ.»
অর্থাৎ মহান আল্লাহ কর্তৃক তাঁর মনোনীত কোনো নবী বা রাসূলের ওপর বিশেষ খোদায়ী বার্তাসমূহ (জ্ঞান, হিদায়াত ও বিধান) অতি গোপনীয়, দ্রুত ও অলৌকিক পন্থায় পৌঁছে দেওয়াকে ‘ওহী’ বলে।
২. মানুষের জন্য ওহীর প্রয়োজনীয়তা (حاجة الإنسان إلى الوحي):
মানুষের জ্ঞান অর্জনের তিনটি প্রধান মাধ্যম রয়েছে: পঞ্চইন্দ্রিয়, বিবেক-বুদ্ধি এবং ঐশী ওহী। কিন্তু মানুষের ইন্দ্রিয় ও মানবীয় বুদ্ধি সীমাবদ্ধ। মানুষের জীবনে ওহী অপরিহার্য হওয়ার কারণসমূহ:
- বুদ্ধিবৃত্তিক সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করা: মানুষের চোখ একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত দেখে, কান নির্দিষ্ট তরঙ্গ পর্যন্ত শোনে। তেমনি মানবীয় বিবেক নির্দিষ্ট বস্তুজগতের বাইরে অদৃশ্য জগত (গায়েব—যেমন আল্লাহ, ফেরেশতা, রূহ, জান্নাত, জাহান্নাম, হাশর-নশর) সম্পর্কে কিছুই জানতে পারে না। ওহী ব্যতীত এই অতিন্দ্রীয় সত্য জানা অসম্ভব।
- জীবনের লক্ষ্য ও স্রষ্টার পরিচয় নির্ধারণ: মানুষ কেন সৃষ্টি হয়েছে, সৃষ্টির উদ্দেশ্য কী এবং মৃত্যুর পর মানুষের পরিণতি কী হবে—এসব পরম প্রশ্নের উত্তর কেবল ওহীই নির্ভুলভাবে দিতে পারে।
- শাশ্বত নৈতিক মূল্যবোধ ও বিধান রচনা: মানবীয় বুদ্ধি দেশ, কাল ও ব্যক্তিগত স্বার্থের দ্বারা প্রভাবিত হয়। ফলে মানুষ যখন আইন তৈরি করে, তাতে ভুল, পক্ষপাতিত্ব ও বৈষম্য দেখা দেয়। একমাত্র ওহীর অভ্রান্ত বিধানই সমগ্র মানবজাতির জন্য সর্বজনীন সুবিচার ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
- ইবাদতের সঠিক পদ্ধতি শিক্ষাদান: মানুষ স্রষ্টাকে ভালোবাসতে চাইলেও কীভাবে তাঁর সন্তুষ্টি লাভ করবে এবং কীভাবে ইবাদত করবে, তা ওহীর প্রত্যক্ষ নির্দেশনা ছাড়া জানা সম্ভব নয়।
৩. ওহী অস্বীকারকারীদের সন্দেহ ও তার দাঁতভাঙা জবাব (شبهات الجاحدين والرد عليها):
প্রাচ্যবিদ (Orientalists), নাস্তিক ও সংশয়বাদীরা ওহীর ব্যাপারে বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর সন্দেহ উত্থাপন করে থাকে:
- সন্দেহ ১: “ওহী কোনো ঐশী বার্তা নয়, বরং এটি নবীজীর মৃগীরোগ বা মানসিক ভ্রমের (Hallucination) বহিঃপ্রকাশ।”
দাঁতভাঙা জবাব: এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অবৈজ্ঞানিক দাবি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে মৃগীরোগী বা মানসিক বিকারগ্রস্ত ব্যক্তির চিন্তা এলোমেলো ও অসংলগ্ন হয়। পক্ষান্তরে কুরআনের ভাষা পৃথিবীর সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক বিস্ময়, এর আইন ও দর্শন সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও বিশ্বসভ্যতাকে আমূল বদলে দিয়েছে। একজন মানসিক রোগী এমন সুউচ্চ প্রজ্ঞাময় সংবিধান রচনা করতে পারে—এমন দাবি চরম বাতুলতা। তদুপরি রাসূলুল্লাহ ﷺ ছিলেন চরম সুস্থ, ভারসাম্যপূর্ণ ও পূর্ণ মানসিক সুস্থতার অনন্য প্রতীক। - সন্দেহ ২: “মুহাম্মদ ﷺ একজন প্রতিভাবান জিনিয়াস ছিলেন, নিজের ভেতরের অন্তর্দৃষ্টি ও অবচেতন মন থেকেই তিনি কুরআন রচনা করেছেন।”
দাঁতভাঙা জবাব: স্বীয় অবচেতন মন থেকে হলে তিনি বহু বিষয়ে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত দিতে পারতেন। কিন্তু ওহীর জন্য তিনি মাসের পর মাস অপেক্ষা করেছেন (যেমন: ইফকের মিথ্যা অপবাদের ঘটনায় প্রায় এক মাস এবং কিবলা পরিবর্তনের অপেক্ষায় ১৬-১৭ মাস ওহীর জন্য ব্যাকুল প্রতীক্ষা)। ওহী তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল না; ওহী ছিল সম্পূর্ণ আল্লাহর ইচ্ছাধীন বহির্জাগতিক বার্তা। - সন্দেহ ৩: “মুহাম্মদ ﷺ আহলে কিতাবদের (ইহুদি-খ্রিস্টান পাদ্রি, যেমন বুহাইরা বা ওয়ারাকা ইবনে নাওফাল) কাছ থেকে ইতিহাস শুনে কুরআন তৈরি করেছেন।”
দাঁতভাঙা জবাব: ঐতিহাসিক সত্য হলো তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ উম্মী (নিরক্ষর)। শৈশবে বুহাইরার সাথে তাঁর দেখা হয়েছিল মাত্র কয়েক মুহূর্তের জন্য এবং ওয়ারাকা ইবনে নাওফাল ওহী শুরুর কয়েকদিনের মধ্যেই মৃত্যুবরণ করেন। তদুপরি তাওরাত ও ইঞ্জিলে নবীদের চরিত্রে যে সব বিকৃত ও কলঙ্কজনক অপবাদ আরোপ করা হয়েছে, কুরআন সেগুলোকে সংশোধন করে নবীদের নির্দোষ চরিত্রকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছে। যা কোনো মানবীয় অনুকরণের দ্বারা কখনোই সম্ভব নয়।
৩- عرّف القرآن الكريم والحديث القدسى والحديث النبوى بين الفرق بين هذه الثلاثة مع ذكر الأمثال-
[القرآن الكريم, الحديث القدسى ও الحديث النبوى এর সংজ্ঞা দাও। অতঃপর উদাহরণসহ এ তিনটির মধ্যকার পার্থক্য বর্ণনা কর।] (মান ১৫)
১. তিনটির প্রামাণ্য সংজ্ঞা (التعريفات الثلاثة):
- (ক) কুরআন কারীম (القرآن الكريم): আল্লাহ তাআলার সেই শাশ্বত বাণী যা শব্দ ও অর্থ (لفظًا ومعنىً) উভয় দিক দিয়েই আল্লাহর পক্ষ থেকে জিবরীল (আ.)-এর মাধ্যমে নবী করীম ﷺ-এর ওপর অবতীর্ণ, যা মুসহাফে লিখিত, যা তিলাওয়াত করা ইবাদত এবং যার একটি সূরার মতো সূরাও রচনা করতে সমগ্র সৃষ্টি অপারগ। যেমন— «قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ»।
- (খ) হাদীসে কুদসী (الحديث القدسي): যে হাদীসের অর্থ ও ভাব মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ইলহাম বা ওহীর মাধ্যমে নবী করীম ﷺ-এর অন্তরে ঢেলে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু নবীজী ﷺ তা নিজের ভাষায় আল্লাহর প্রতি সম্পৃক্ত করে বর্ণনা করেছেন (معناه من الله ولفظه من النبي ﷺ)। যেমন— নবীজী ﷺ বলেন: «قَالَ اللَّهُ تَعَالَىٰ: يَا عِبَادِي إِنِّي حَرَّمْتُ الظُّلْمَ عَلَىٰ نَفْسِي وَجَعَلْتُهُ بَيْنَكُمْ مُحَرَّمًا فَلَا تَظَالَمُوا» (আল্লাহ তাআলা বলেন: হে আমার বান্দাগণ! আমি আমার নিজের ওপর জুলুমকে হারাম করেছি এবং তোমাদের পরস্পরের মধ্যেও তা হারাম করেছি, অতএব তোমরা পরস্পর জুলুম করো না – সহীহ মুসলিম)।
- (গ) হাদীসে নববী (الحديث النبوي): নবী করীম ﷺ-এর নিজস্ব কথা, কাজ, মৌনসম্মতি কিংবা দৈহিক ও চারিত্রিক গুণাবলি, যার ভাব আল্লাহর ওহীপ্রসূত হলেও শব্দ ও ভাষা একান্তই রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিজস্ব। যেমন— «إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ» (নিশ্চয় সকল কাজের ফলাফল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল – সহীহ বুখারী)।
২. উদাহরণসহ তিনটির তুলনামূলক পার্থক্য (فروق جوهرية بالأمثلة):
| পার্থক্যের ক্ষেত্র | পবিত্র কুরআন (القرآن الكريم) | হাদীসে কুদসী (الحديث القدسي) | হাদীসে নববী (الحديث النبوي) |
|---|---|---|---|
| ১. শব্দ ও অর্থ (اللفظ والمعنى) | শব্দ ও অর্থ উভয়টিই শতভাগ আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। | অর্থ আল্লাহর পক্ষ থেকে, কিন্তু শব্দ ও বাক্যগঠন রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর। | ভাব ও তত্ত্ব ওহীভিত্তিক, কিন্তু শব্দ ও প্রয়োগ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর। |
| ২. মু’জিযা ও চ্যালেঞ্জ (الإعجاز والتحدي) | এটি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মু’জিযা; এর মতো একটি সূরা তৈরির চ্যালেঞ্জ মানবজাতির জন্য বলবৎ রয়েছে। | এর কোনো ই’জাজ বা ভাষাগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়নি। | এর দ্বারা কোনো অলৌকিক চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়নি। |
| ৩. সনদের অকাট্যতা (التواتر) | কুরআনের প্রতিটি হরফ ও বাক্য শতভাগ তাওয়াতুর বা মুতাওয়াতির সনদে সংরক্ষিত; এক বিন্দু অস্বীকার করলে কাফের হয়। | এটি মুতাওয়াতির বা খবরে ওয়াহেদ হতে পারে; সহীহ, হাসান এমনকি যয়ীফও হতে পারে। | এটি মুতাওয়াতির, মাশহুর ও খবরে ওয়াহেদ হতে পারে; সহীহ, হাসান বা যয়ীফ হতে পারে। |
| ৪. সালাতে তিলাওয়াত (الصلاة والتعبد) | নামাজে এর তিলাওয়াত করা ফরজ ইবাদত এবং প্রতি হরফে ১০টি করে নেকি রয়েছে। | নামাজে হাদীসে কুদসী পাঠ করা জায়েয নেই এবং নামাজ বাতিল হয়ে যাবে। | নামাজে হাদীসে নববী তিলাওয়াত করা বৈধ নয়। |
| ৫. স্পর্শ করার বিধান (المس والطهارة) | পবিত্রতা (অজু) ব্যতীত কুরআনুল কারীম স্পর্শ করা নাজায়েজ। | অজু ছাড়াও হাদীসে কুদসী ও হাদীসের কিতাব স্পর্শ করা ও পড়া জায়েজ। | অজু ছাড়াও হাদীসের কিতাব স্পর্শ করা জায়েজ। |
| ৬. ভাবার্থ বর্ণনা (الرواية بالمعنى) | কুরআনের মূল শব্দের পরিবর্তন করে কেবল ভাবার্থ বর্ণনা করা সম্পূর্ণ হারাম। | অর্থ অক্ষুণ্ণ রেখে গ্রহণযোগ্য শর্তে ভাবার্থ বর্ণনা (রেওয়ায়েত বিল মা’না) বৈধ। | শর্তসাপেক্ষে ভাবার্থ বর্ণনা বৈধ। |
৪- اكتب حكمة وفوائد نزول القرآن الكريم منجّمًا ومفرّقًا-
[ধীরে ধীরে ও বিক্ষিপ্তভাবে কুরআন নাযিল হওয়ার হিকমত ও উপকারিতা লিপিবদ্ধ কর।] (মান ১৫)
ভূমিকা:
পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহ (যেমন তাওরাত, ইঞ্জিল, যাবুর) তাঁদের নবীদের ওপর এককালীন ফলক বা সহীফা আকারে অবতীর্ণ হয়েছিল। কিন্তু পবিত্র কুরআনুল কারীম শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ-এর ওপর সুদীর্ঘ তেইশ বছর (২৩ বছর) ধরে অল্প অল্প করে প্রয়োজনানুযায়ী অবতীর্ণ হয়েছে। কাফেররা এ নিয়ে আপত্তি তুলে বলেছিল: «لَوْلَا نُزِّلَ عَلَيْهِ الْقُرْآنُ جُمْلَةً وَاحِدَةً» (তাঁর ওপর সম্পূর্ণ কুরআন একবারে কেন অবতীর্ণ হলো না? – সূরা ফুরকান: ৩২)। আল্লাহ তাআলা তাদের জবাব দিয়ে ধীরে ধীরে নাযিল হওয়ার গভীর প্রজ্ঞা ও হিকমত স্পষ্ট করেছেন।
ধীরে ধীরে ও কিস্তিতে কুরআন নাযিল হওয়ার প্রধান হিকমত ও উপকারিতাসমূহ:
- রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পবিত্র হৃদয়কে সুদৃঢ় রাখা (تثبيت فؤاد النبي ﷺ):
কাফেরদের বিদ্রূপ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং দ্বীনের কঠিন দায়িত্ব পালনে রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রায়ই ব্যথিত হতেন। বারবার জিবরীল (আ.)-এর আগমন এবং প্রাসঙ্গিক সান্ত্বনামূলক আয়াত নাযিল হওয়ার মাধ্যমে নবীজীর হৃদয় শান্ত ও সুদৃঢ় হতো। আল্লাহ বলেন: «كَذَٰلِكَ لِنُثَبِّتَ بِهِ فُؤَادَكَ ۖ وَرَتَّلْنَاهُ تَرْتِيلًا» (এভাবেই আমি অবতীর্ণ করেছি যাতে আপনার অন্তরকে এর দ্বারা সুদৃঢ় রাখতে পারি – সূরা ফুরকান: ৩২)। - সহজে মুখস্থকরণ ও হৃদয়ে ধারণ করা (تيسير حفظه وفهمه):
তৎকালীন আরবরা ছিল প্রধানত নিরক্ষর (উম্মী)। একসাথে একটি সুবিশাল গ্রন্থ অবতীর্ণ হলে তা মুখস্থ রাখা ও বোঝা অত্যন্ত দুরূহ হতো। অল্প অল্প আয়াত অবতীর্ণ হওয়ায় সাহাবায়ে কেরাম সহজেই তা মুখস্থ করতেন, অর্থ অনুধাবন করতেন এবং আমল করতেন। হযরত আবু আব্দুর রহমান আস-সুলামী বলেন: সাহাবীগণ একবারে দশটি আয়াত শিখতেন, যতক্ষণ না এর ইলম ও আমল পূর্ণ হতো ততক্ষণ পরবর্তী দশ আয়াতে যেতেন না। - ইসলামি বিধান প্রণয়নে ধারাবাহিকতা রক্ষা (التدرج في التشريع):
জাহেলি সমাজের মানুষ যুগ যুগ ধরে মদ, জুয়া, ব্যভিচার ও কুসংস্কারে নিমজ্জিত ছিল। এক দিনে সকল বিধিনিষেধ জারি করলে সমাজ তা সহ্য করতে পারত না। কুরআন অত্যন্ত মনোস্তাত্ত্বিক ধারাবাহিকতায় বিধান জারি করেছে। যেমন—মদ নিষিদ্ধকরণে তিনটি পর্যায় গ্রহণ করা হয়েছে। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) যথার্থই বলেছেন: “কুরআনের শুরুতে জান্নাত ও জাহান্নামের বিবরণ নাযিল হয়েছে। যখন মানুষ ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হলো, তখন হালাল-হারামের বিধান এলো। যদি শুরুতেই বলা হতো তোমরা মদ খেয়ো না, তবে তারা বলত: আমরা কখনো মদ ছাড়ব না।” - ঘটনাক্রম ও প্রশ্নের তাত্ক্ষণিক উত্তর প্রদান (مسايرة الحوادث والإجابة عن الأسئلة):
নবুওয়াতের তেইশ বছরে সাহাবী বা কাফেররা যখন কোনো জটিল বিষয়ে প্রশ্ন করত (যেমন রূহ সম্পর্কে, আসহাবে কাহাফ সম্পর্কে, জুলকারনাইন সম্পর্কে), তখন তাৎক্ষণিক ওহী নাযিল হয়ে সমাধান প্রদান করত («وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ…»)। বিভিন্ন যুদ্ধ-বিগ্রহ ও সামাজিক ঘটনার তাৎক্ষণিক দিকনির্দেশনা কুরআন দিয়েছে। - কুরআনের অলৌকিকত্ব ও ই’জাজ প্রমাণ (الإعجاز والتحدي):
দীর্ঘ তেইশ বছর ধরে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপট ও সময়ের ব্যবধানে অবতীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও সমগ্র কুরআনের ভাষা, শৈলী ও বক্তব্যের মধ্যে বিন্দুমাত্র বৈপরীত্য বা অসঙ্গতি ঘটেনি। এটি প্রমাণ করে যে এটি কোনো মানবরচিত গ্রন্থ নয়; বরং পরম প্রজ্ঞাময় আল্লাহর বাণী। আল্লাহ বলেন: «وَلَوْ كَانَ مِنْ عِندِ غَيْرِ اللَّهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا» (যদি এটি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও পক্ষ থেকে হতো, তবে তারা এতে বহু অসঙ্গতি পেত – সূরা নিসা: ৮২)। - তাহরীফ বা বিকৃতি রোধ এবং লিপিবদ্ধকরণে সুবিধা:
অল্প অল্প করে নাযিল হওয়ায় অহী লেখকদের (কাতিবানে ওহী) পক্ষে তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে লিপিবদ্ধ করা এবং সাহাবীদের পক্ষে তা বিশুদ্ধভাবে চর্চা করা সহজতর হয়েছে।
৫- ما معنى إعجاز القرآن الكريم؟ تحدث عن وجوه إعجازه بالإيضاح-
[إعجاز القرآن বলতে কী বোঝায়? কুরআন কারীমের ই’জাজের বিভিন্ন দিক বিশদভাবে আলোচনা কর।] (মান ১৫)
১. ই’জাজুল কুরআন এর অর্থ ও সংজ্ঞা (معنى إعجاز القرآن):
‘ই’জাজ’ (الإعجاز) শব্দটি বাবে ইফ’আল-এর মাসদার, যার মূলধাতু হলো ع-ج-ز (আজয)। এর আভিধানিক অর্থ হলো: অক্ষম বা পরাভূত করা, অপারগ করে দেওয়া।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: উলূমুল কুরআনের পরিভাষায়: «هُوَ إِثْبَاتُ عَجْزِ الْخَلْقِ جَمِيعًا عَنِ الْإِتْيَانِ بِمِثْلِ الْقُرْآنِ أَوْ بِسُورَةٍ مِنْ مِثْلِهِ مَعَ تَوَفُّرِ دَوَاعِيهِمْ وَتَحَدِّي اللَّهِ لَهُمْ.»
অর্থাৎ সমগ্র সৃষ্টিকে কুরআনের সমকক্ষ কোনো গ্রন্থ বা তার কোনো একটি সূরার অনুরূপ কিছু রচনা করতে চিরতরে অক্ষম ও ব্যর্থ প্রমাণ করাই হলো ‘ই’জাজুল কুরআন’। আল্লামা যুরকানী বলেন: ই’জাজ হলো নবুওয়াতের দাবির সত্যতা প্রমাণে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রকাশিত এমন এক অলৌকিকত্ব, যার মোকাবেলা করতে মানবজাতি চিরকাল ব্যর্থ।
২. কুরআন কারীমের ই’জাজের বিভিন্ন দিকসমূহ (وجوه إعجاز القرآن الكريم):
মুফাসসির ও গবেষকগণ কুরআনের অলৌকিকত্বের প্রধান দিকগুলোকে নিম্নোক্ত ভাগে বিন্যস্ত করেছেন:
- ভাষাগত ও সাহিত্যিক অলৌকিকত্ব (الإعجاز البياني واللغوي):
কুরআন নাযিল হয়েছিল আরবের চরম সাহিত্যিক উৎকর্ষের যুগে, যখন আরবরা নিজেদের ‘আহলে ফাসাহাত’ এবং অন্যদের বোবা (আজমী) মনে করত। কুরআন সেই শীর্ষস্থানীয় কবি ও সাহিত্যিকদের সামনে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিল: «فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِّن مِّثْلِهِ» (এর অনুরূপ একটি মাত্র সূরা তৈরি করে আনো – সূরা বাকারা: ২৩)। কিন্তু আরবের বিখ্যাত কবি লাবীদ, ইমরুল কায়সের অনুসারীরা মাথা নত করে হার মানতে বাধ্য হয়েছিল। এর অপূর্ব শব্দচয়ন, সুরের মূর্ছনা, অলংকারশাস্ত্র (বালাগাত ও ফাসাহাত) মানবক্ষমতার সম্পূর্ণ অতীত। - অদৃষ্টের নির্ভুল সংবাদ (الإعجاز الغيبي বা الأخبار بالغيب):
কুরআন মানব ইতিহাসের তিনটি অদৃশ্য কালখণ্ড সম্পর্কে এমন তথ্য দিয়েছে যা কোনো মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না:- অতীতের অদৃশ্য: প্রাচীন ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিসমূহ—আদ, সামুদ, লূত, আসহাবে কাহাফ এবং মূসা ও ফিরাউনের এমন নিখুঁত ইতিহাস কুরআন দিয়েছে যা তৎকালীন আরবে কারোরই জানা ছিল না। এমনকি ফিরাউনের লাশ সংরক্ষণের ভবিষ্যদ্বাণী (সূরা ইউনুস: ৯২) আধুনিক প্রত্নতত্ত্বে অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছে।
- ভবিষ্যতের অদৃশ্য: রোম ও পারস্যের যুদ্ধে রোমানদের ঐতিহাসিক বিজয়ের পূর্বঘোষণা (সূরা রূম: ১-৪) এবং মক্কা বিজয়ের সুসংবাদ হুবহু বাস্তবে প্রতিফলিত হয়েছে।
- আইন ও বিধানের ভারসাম্যমূলক অলৌকিকত্ব (الإعجاز التشريعي):
কুরআন এমন এক বৈপ্লবিক জীবনব্যবস্থা উপহার দিয়েছে যা মানুষের ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে পরম ন্যায়বিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছে। আধুনিক বিশ্বের কোনো সংবিধানই কুরআনের সুবিচার, অপরাধ দমন ও উত্তরাধিকার আইনের সমকক্ষ হতে পারেনি। - আধুনিক বৈজ্ঞানিক তথ্যের নির্ভুলতা (الإعجاز العلمي):
চৌদ্দশত বছর পূর্বে যখন আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কোনো অস্তিত্ব ছিল না, তখন কুরআন এমন বহু বৈজ্ঞানিক সত্যের বিবরণ দিয়েছে যা বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে:- মহাবিশ্ব সৃষ্টির মহাবিস্ফোরণ বা বিগ ব্যাং (সূরা আম্বিয়া: ৩০)।
- মহাবিশ্বের ক্রমাগত সম্প্রসারণশীলতা (সূরা যারিয়াত: ৪৭)।
- মাতৃগর্ভে মানবভ্রূণের স্তরভিত্তিক সৃষ্টিপ্রক্রিয়া (সূরা মুমিনুন: ১২-১৪)।
- পর্বতমালাকে পৃথিবীর পেরেকরূপে ভারসাম্য রক্ষার ভূমিকা (সূরা নাবা: ৬-৭)।
- পানির দুই বিপরীত প্রবাহের মাঝে অদৃশ্য অন্তরায় (সূরা আর-রহমান: ১৯-২০)।
- বৈপরীত্য ও অসঙ্গতিহীনতা (عدم التناقض):
৬ হাজারেরও বেশি আয়াত দীর্ঘ তেইশ বছরে অবতীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও বক্তব্যের মধ্যে বিন্দুমাত্র বৈপরীত্য বা মতদ্বৈধতা নেই। এটিও কুরআনের অনন্য অলৌকিকত্ব।
৬- عرّف التفسير والتأويل مع ذكر الفرق بينهما-
[পার্থক্য উল্লেখসহ التفسير ও التأويل এর সংজ্ঞা বর্ণনা কর।] (মান ১৫)
১. তাফসীরের সংজ্ঞা (تعريف التفسير):
(ক) শাব্দিক অর্থ: ‘তাফসীর’ (التفسير) শব্দটি বাবে তাফঈলের মাসদার, যার মূলধাতু হলো ف-س-ر (ফাসর)। এর অর্থ হলো: কোনো কিছু উন্মোচন করা, সুস্পষ্ট করা, ব্যাখ্যা করা ও স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেওয়া (الكشف والبيان والإيضاح)।
(খ) পারিভাষিক সংজ্ঞা: ইমাম যারকাশী বলেন: «التَّفْسِيرُ عِلْمٌ يُفْهَمُ بِهِ كِتَابُ اللَّهِ الْمُنَزَّلُ عَلَىٰ نَبِيِّهِ مُحَمَّدٍ ﷺ وَبَيَانُ مَعَانِيهِ وَاسْتِخْرَاجُ أَحْكَامِهِ وَحِكَمِهِ.»
অর্থাৎ তাফসীর হলো এমন এক শাস্ত্র যার সাহায্যে আল্লাহর কালামের সঠিক মর্ম অনুধাবন করা যায়, এর বিধান ও হিকমতসমূহ আবিষ্কার করা যায় এবং অস্পষ্ট বিষয় স্পষ্ট করা যায়।
২. তাবীল-এর সংজ্ঞা (تعريف التأويل):
(ক) শাব্দিক অর্থ: ‘তাবীল’ (التأويل) শব্দটি বাবে তাফঈলের মাসদার, যার মূলধাতু হলো أ-و-ل (আওল)। এর অর্থ হলো: কোনো কিছুকে তার মূল উৎস বা পরিণতির দিকে ফিরিয়ে নেওয়া (الرجوع إلى الأصل أو العاقبة)।
(খ) পারিভাষিক সংজ্ঞা: উসূলে ফিকহের পরিভাষায়: «صَرْفُ اللَّفْظِ عَنْ ظَاهِرِهِ الْمُتَبَادَرِ مِنْهُ إِلَىٰ مَعْنًى آخَرَ يَحْتَمِلُهُ لِدَلِيلٍ يُعَضِّدُهُ.»
অর্থাৎ কোনো শব্দকে তার আপাত ও প্রকাশ্য আভিধানিক অর্থ থেকে ফিরিয়ে কোনো শক্তিশালী দলিলের ভিত্তিতে এমন একটি সম্ভাব্য গূঢ় অর্থে গ্রহণ করা যা প্রসঙ্গের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যেমন: «يُخْرِجُ الْحَيَّ مِنَ الْمَيِّتِ» আয়াতটির তাফসীর হলো মৃত ডিম থেকে জীবিত বাচ্চা বের করা, কিন্তু এর তাবীল হলো অজ্ঞ ও কাফেরের অন্তর থেকে জীবন্ত ঈমানদার সৃষ্টি করা।
৩. তাফসীর ও তাবীল-এর মধ্যে প্রধান পার্থক্যসমূহ (الفروق بين التفسير والتأويل):
| পার্থক্যের ক্ষেত্র | তাফসীর (التفسير) | তাবীল (التأويل) |
|---|---|---|
| ১. অর্থের ব্যাপকতা | শব্দের প্রকাশ্য, স্পষ্ট ও বহিরাঙ্গ অর্থ উন্মোচন করার নাম তাফসীর। | শব্দের অন্তর্নিহিত, গভীর ও গূঢ় মর্মোদঘাটনের নাম তাবীল। |
| ২. উৎসের নির্ভরতা | তাফসীর প্রধানত রেওয়ায়েত বা বিশুদ্ধ বর্ণনানির্ভর (কুরআন, হাদীস ও সাহাবীদের বাণী)। | তাবীল প্রধানত গভীর পাণ্ডিত্য, সূক্ষ্ম বোধশক্তি ও দরায়াত (যুক্তি ও ভাষাজ্ঞান) নির্ভর। |
| ৩. প্রয়োগক্ষেত্র | কুরআনের দ্ব্যর্থহীন ও সুস্পষ্ট আয়াতসমূহের (মুহকামাত) ক্ষেত্রে বেশি প্রযুক্ত হয়। | কুরআনের রূপক, অস্পষ্ট ও গভীর অর্থবোধক আয়াতসমূহের (মুতাশাবিহাত) ক্ষেত্রে প্রযুক্ত হয়। |
| ৪. নিশ্চিত ও সম্ভাবনা | মুফাসসির এখানে নিশ্চিতভাবে বলেন যে এটিই আল্লাহর উদ্দেশ্য (القطع بأن هذا مراد الله)। | মুফাসসির এখানে সম্ভাব্য সর্বোত্তম অর্থটির প্রাধান্য দেন (الترجيح دون قطع)। |
| ৫. ব্যাপকতা | তাফসীর কেবল ঐশী কিতাবের ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়। | তাবীল ঐশী কিতাব ছাড়াও সাধারণ কথা, ভবিষ্যৎবাণী ও স্বপ্নের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়। |
| ৬. প্রাচীন আলিমদের মত | ইমাম মাতুরিদী (রহ.) বলেন: তাফসীর হলো সাহাবীদের কাজ, কারণ তাঁরা ওহী নাযিলের প্রেক্ষাপট স্বচক্ষে দেখেছেন। | ইমাম মাতুরিদী বলেন: তাবীল হলো পরবর্তী যুগের ফকীহ ও বিজ্ঞ আলিমদের ইজতিহাদী গবেষণার ফল। |
مجموعة (ب) [খ অংশ]
الدرجات—٥ × ٤ = ٢٠ [মান—৫ × ৪ = ২০]
৭- بين الفرق بين الآية والسورة-
[آية ও سورة এর মধ্যকার পার্থক্য বর্ণনা কর।] (মান ৫)
১. আয়াতের পরিচয় (الآية):
‘আয়াত’ শব্দের আভিধানিক অর্থ নিদর্শন, অলৌকিক প্রমাণ, দল বা শিক্ষা। পারিভাষিক অর্থে—কুরআন মাজীদের সূরার অন্তর্গত এমন একটি বা একাধিক বাক্য বা বাক্যসমষ্টি, যার একটি সুনির্দিষ্ট সূচনা ও সমাপ্তি রয়েছে এবং যা ওহীর নির্দেশনায় (তাওকীফীভাবে) একটি আয়াত হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে। কুরআনে মোট আয়াত সংখ্যা ৬২৩৬টি (কুফী গণনা অনুযায়ী)।
২. সূরার পরিচয় (السورة):
‘সূরা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ মর্যাদা, উচ্চস্থান, প্রাচীর বা সীমানা। পারিভাষিক অর্থে—কুরআনের আয়াতসমূহের এমন একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় বা মঞ্জিল, যার একটি সুনির্দিষ্ট প্রারম্ভ ও সমাপ্তি রয়েছে, যার একটি স্বতন্ত্র নাম রয়েছে এবং যাতে কমপক্ষে তিনটি আয়াত সন্নিবেশিত রয়েছে। কুরআনে মোট সূরা সংখ্যা ১১৪টি।
প্রধান পার্থক্যসমূহ:
- অংশ ও সমগ্রের সম্পর্ক: আয়াত হলো সূরার ক্ষুদ্রতম একক বা উপাদান (Component); পক্ষান্তরে একাধিক আয়াতের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা গঠিত হয়।
- ন্যূনতম পরিমাণ: আয়াত একটি মাত্র শব্দ বা কয়েকটি অক্ষরও হতে পারে (যেমন: «الم», «مُدْهَامَّتَانِ»); কিন্তু সূরা হতে হলে কমপক্ষে পূর্ণাঙ্গ তিনটি আয়াত থাকা আবশ্যক (যেমন: সূরা আল-কাওসার বা সূরা আল-আসর)।
- নামকরণ: প্রতিটি সূরার এক বা একাধিক সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক নাম রয়েছে (যেমন: বাকারা, আলে ইমরান); কিন্তু সব আয়াতের স্বতন্ত্র নাম নেই, কেবল কয়েকটি বিশেষ আয়াত ব্যতীত (যেমন: আয়াতুল কুরসী, আয়াতুল মুদাহানা)।
৮- تحدث عن الكتاب “الفوز الكبير فى أصول التفسير”-
[الفوز الكبير في أصول التفسير সম্পর্কে আলোচনা কর।] (মান ৫)
১. গ্রন্থ ও গ্রন্থকারের পরিচয়:
‘আল-ফাওযুল কাবীর ফি উসূলিত তাফসীর’ (الفوز الكبير في أصول التفسير) ভারতীয় উপমহাদেশের মুজাদ্দিদ ও শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.) (১৭১১-১৭৬২ খ্রি.) কর্তৃক ফারসি ভাষায় রচিত উসূলে তাফসীরের এক কালজয়ী ও অনন্য গ্রন্থ। পরবর্তীতে এটি আরবিসহ বহু ভাষায় অনূদিত হয়ে বিশ্বব্যাপী পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়।
২. গ্রন্থের মূল বিষয়বস্তু ও পাঁচটি অধ্যায় (الأبواب الخمسة):
শাহ ওয়ালীউল্লাহ এই গ্রন্থে সমগ্র পবিত্র কুরআনের বিষয়বস্তুকে পাঁচটি প্রধান জ্ঞানে (خمسة علوم) বিভক্ত করে ব্যাখ্যা করেছেন:
- ইলমুল আহকাম (علم الأحكام): শরিয়তের ফরজ, ওয়াজিব, হালাল ও হারাম বিষয়ক বিধানাবলি।
- ইলমুল মুখাসামা বা মুনাযারা (علم المخاصمة): চার ভ্রান্ত দল—ইহুদি, খ্রিস্টান, মুশরিক ও মুনাফিকদের ভ্রান্ত মতবাদের যুক্তিপূর্ণ খণ্ডন।
- ইলমু তাযকীরি বি আলায়িল্লাহ (علم التذكير بآلاء الله): আসমান, জমিন ও মানবসৃষ্টিতে আল্লাহর কুদরত ও নিয়ামতসমূহের বিবরণ।
- ইলমু তাযকীরি বি আইয়ামিল্লাহ (علم التذكير بأيام الله): আনুগত্যশীলদের প্রতি আল্লাহর রহমত এবং অবাধ্য পূর্ববর্তী জাতিসমূহের ওপর গজব নাযিলের ঐতিহাসিক ঘটনাবলি।
- ইলমু তাযকীরি বিল মাওতি ওয়া মা বা’দাহু (علم التذكير بالموت وما بعده): মৃত্যু, কবর, হাশর, মীযান, পুলসিরাত, জান্নাত ও জাহান্নামের বিবরণ।
এছাড়াও তিনি শানে নুযূলের সঠিক মূল্যায়ন, মুতাশাবিহাতের তাবীল এবং নাসখ বা রহিতকরণের ক্ষেত্রে মাত্র ৫টি আয়াতকে মানসূখ গণ্য করে এক বৈপ্লবিক ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছেন।
৯- ما النسخ؟ وما أركانه؟
[নাসখ কাকে বলে? এর রুকনসমূহ কী কী?] (মান ৫)
১. নাসখ-এর সংজ্ঞা (تعريف النسخ):
‘নাসখ’ (النسخ) শব্দের আভিধানিক অর্থ বিলুপ্ত করা, দূর করা, স্থানান্তর বা রূপান্তর করা (الإزالة والنقل)।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: উসূলে ফিকহের পরিভাষায়: «رَفْعُ الْحُكْمِ الشَّرْعِيِّ بِدَلِيلٍ شَرْعِيٍّ مُتَرَاخٍ عَنْهُ.»
অর্থাৎ পরবর্তী কোনো শরিয়তি প্রমাণের মাধ্যমে পূর্ববর্তী কোনো প্রতিষ্ঠিত শরিয়তি বিধানকে কার্যকরভাবে রহিত বা প্রত্যাহার করে নেওয়ার নামই হলো ‘নাসখ’। যেমন: বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে সালাত আদায়ের বিধানকে রহিত করে কা’বামুখী হওয়ার বিধান জারি করা।
২. নাসখের রুকনসমূহ (أركان النسخ):
নাসখ কার্যকর হতে হলে চারটি মৌলিক রুকন বা শর্ত বিদ্যমান থাকতে হয়:
- নাসেখ (الناسخ – রহিতকারী দলিল): যে পরবর্তী দলিলের (আয়াত বা হাদিস) মাধ্যমে পূর্বের বিধান রহিত করা হয়। যেমন: কা’বার দিকে ফেরার নির্দেশ সম্বলিত আয়াত।
- মানসূখ (المنسوخ – রহিত বিধান): যে পূর্ববর্তী শরিয়তি হুকুমটি বা তিলাওয়াতটি প্রত্যাহার করা হলো। যেমন: বায়তুল মুকাদ্দাসমুখী হয়ে সালাত আদায় করার বিধান।
- মানসূখ আনহু (المنسوخ عنه – যাদের ওপর হুকুমটি ছিল): যে উম্মত বা বান্দাদের ওপর পূর্বে হুকুমটি কার্যকর ছিল এবং বর্তমানে তা প্রত্যাহার করা হলো (মুকাল্লাফ ব্যক্তিবর্গ)।
- নাসেখ সত্তা (الناسخ الحقيقي): যিনি বিধান রহিত করার একমাত্র মালিক, অর্থাৎ স্বয়ং মহান আল্লাহ তাআলা।
১০- اكتب مميزات “الإتقان في علوم القرآن”-
[الإتقان في علوم القرآن কিতাবের বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা কর।] (মান ৫)
গ্রন্থের পরিচয়:
‘আল-ইতকান ফি উলূমিল কুরআন’ (الإتقان في علوم القرآن) হলো দশম হিজরী শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বহুবিদ্যাবিশারদ আলিম ইমাম জালালুদ্দীন আব্দুর রহমান আস-সুয়ূতী (রহ.) (৮৪৯-৯১১ হি.) কর্তৃক রচিত উলূমুল কুরআনের এক সুবিশাল বিশ্বকোষতুল্য আকর গ্রন্থ।
প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ (أبرز المميزات):
- উলূমুল কুরআনের বিশ্বকোষ: ইমাম সুয়ূতী এই মহাগ্রন্থে উলূমুল কুরআনের প্রায় ৮০টি মৌলিক অধ্যায় বা শাস্ত্র (نوعاً) সন্নিবেশিত করেছেন, যা অন্য কোনো একক গ্রন্থে পাওয়া যায় না।
- পূর্ববর্তী শাস্ত্রীয় গবেষণার সারনির্যাস: তিনি ইমাম যারকাশীর ‘আল-বুরহান’ এবং আবু বকর ইবনুল আরাবীর রচনাবলীসহ শত শত প্রাচীন দুর্লভ পাণ্ডুলিপির সারাংশ অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সংকলন করেছেন।
- মাক্কী ও মাদানী সূরার নিখুঁত শ্রেণিবিন্যাস: ওহী নাযিলের স্থান, কাল, প্রেক্ষাপট, ক্রমধারা ও বৈশিষ্ট্যসমূহ অত্যন্ত সূক্ষ্ম প্রমাণের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করেছেন।
- কেরাত ও তাফসীর পদ্ধতির গভীর পর্যালোচনা: মুতাওয়াতির কেরাতসমূহ, বিরল কেরাত (শায), তাফসীর বিল মা’সুর এবং বিখ্যাত সাহাবী ও তাবেয়ী মুফাসসিরগণের মতামত উদ্ধৃত করেছেন।
- সহজ ও প্রাঞ্জল উপস্থাপনা: জটিল শাস্ত্রীয় বিতর্কগুলোকে অত্যন্ত প্রাঞ্জল আরবি ভাষা ও যুক্তিপূর্ণ উপস্থাপনার মাধ্যমে সাধারণ ও উচ্চতর গবেষকদের জন্য সহজবোধ্য করে তুলেছেন। ফলে এটি শতাব্দী ধরে গোটা মুসলিম বিশ্বে উচ্চশিক্ষার প্রধান আকর পাঠ্যগ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
১১- بين الإعجاز العلمي في القرآن الكريم-
[কুরআন কারীমে ‘ই’জাযুল ইলমী’ বর্ণনা কর।] (মান ৫)
ই’জাযুল ইলমীর অর্থ:
আধুনিক যুগে প্রতিষ্ঠিত ও পরীক্ষিত কোনো বৈজ্ঞানিক সত্যের সাথে চৌদ্দশত বছর পূর্বে নাযিলকৃত পবিত্র কুরআনের বক্তব্যের বিস্ময়কর হুবহু মিল খুঁজে পাওয়া এবং কুরআন যে সম্পূর্ণ ঐশী গ্রন্থ তা বিজ্ঞানের মাধ্যমে প্রমাণিত হওয়াকেই ‘ই’জাযুল ইলমী’ (الإعجاز العلمي) বলে।
কুরআনের কয়েকটি সুস্পষ্ট বৈজ্ঞানিক অলৌকিকত্ব:
- মহাবিশ্ব সৃষ্টি (বিগ ব্যাং ও নীহারিকা): আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে মহাবিশ্ব পূর্বে একটি একক বিন্দুতে পুঞ্জীভূত ছিল এবং পরবর্তীতে এক মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে বিস্তৃত হয়েছে। কুরআন ১৪০০ বছর আগে বলেছে: «أَوَلَمْ يَرَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنَّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ كَانَتَا رَتْقًا فَفَتَقْنَاهُمَا» (কাফেররা কি দেখে না যে নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল একসাথে মিলিত ছিল, অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম? – সূরা আম্বিয়া: ৩০)।
- মহাবিশ্বের সম্প্রসারণশীলতা (Expanding Universe): এডউইন হাবল ১৯২৯ সালে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ আবিষ্কার করেন। কুরআনে বলা হয়েছে: «وَالسَّمَاءَ بَنَيْنَاهَا بِأَيْدٍ وَإِنَّا لَمُوسِعُونَ» (আমি নিজ ক্ষমতাবলে আকাশ নির্মাণ করেছি এবং নিশ্চয় আমি একে ক্রমাগত সম্প্রসারিত করছি – সূরা যারিয়াত: ৪৭)।
- মানবভ্রূণের পর্যায়ক্রমিক বিকাশ (Embryology): কানাডার বিশ্বখ্যাত এম্ব্রায়োলজিস্ট ড. কিথ মুর কুরআনের ভ্রূণবিদ্যা সংক্রান্ত আয়াত গবেষণা করে ইসলাম গ্রহণ করেন। কুরআন ভ্রূণের স্তরগুলোকে বলেছে: নুফা (বীর্যবিন্দু), আলাকা (ঝুলে থাকা রক্তপিণ্ড), মুদগাহ (চিবানো মাংসপিণ্ড) এবং অস্থিপঞ্জরে মাংসের আবরণ (সূরা মুমিনুন: ১২-১৪)।
- পর্বতমালার ভূমিকা: ভূতত্ত্ববিজ্ঞান প্রমাণ করেছে পর্বতের শিকড় মাটির গভীরে প্রোথিত থেকে প্লেট টেকটনিকসের ভারসাম্য রক্ষা করে। কুরআনে পর্বতকে ‘আওতাদ’ (পেরেক) বলা হয়েছে (সূরা নাবা: ৬-৭)।
১২- اكتب آدب المفسر- [أدب المفسر]
[মুফাসসিরের আদাবগুলো লিখ।] (মান ৫)
পবিত্র কুরআনের তাফসীর করা এক অতি সংবেদনশীল ও মহান দায়িত্ব। ইমাম সুয়ূতী ও আল্লামা যারকাশীর মতে একজন আদর্শ মুফাসসিরকে নিম্নোক্ত অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক আদবসমূহ কঠোরভাবে রক্ষা করতে হবে:
- খালেস নিয়ত ও ইখলাস (صحة العقيدة وحسن النية): সহীহ আকিদা পোষণ করা এবং কেবল মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও দ্বীনের খিদমতের উদ্দেশ্যে তাফসীর করা; দুনিয়াবী খ্যাতি, অর্থ বা দলীয় স্বার্থের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা।
- প্রবৃত্তি ও কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ বর্জন (التجرد عن الهوى): ব্যক্তিগত খেয়ালখুশি, ভ্রান্ত দার্শনিক মতবাদ বা রাজনৈতিক মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে কুরআনের অপব্যাখ্যা (তাফসীর বির রায়িল মাযমুম) থেকে সম্পূর্ণরূপে বেঁচে থাকা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «مَنْ قَالَ فِي الْقُرْآنِ بِرَأْيِهِ فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ»।
- প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও শাস্ত্রসমূহে গভীর পাণ্ডিত্য: তাফসীরকারককে আরবি ব্যাকরণ (নাহু, সরফ), অভিধান, অলংকারশাস্ত্র (মা’আনী, বায়ান, বাদী), উসূলে ফিকহ, হাদীসের সনদ ও মতন, নাসেখ-মানসূখ এবং শানে নুযূলের জ্ঞানে পূর্ণ পারদর্শী হতে হবে।
- মর্যাদাপূর্ণ আচরণ ও নম্রতা (التواضع والوقار): অহংকার বর্জন করে বিনয়ী হওয়া এবং কোনো জটিল আয়াতে জ্ঞান না থাকলে ‘আল্লাহু আ’লাম’ (আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত) বলে নিজের অপারগতা স্বীকার করা।
- আমল ও তাকওয়া (العمل بما يعلم): মুফাসসির যা বলবেন নিজে তাঁর পূর্ণ অনুসারী ও খোদাভীরু হবেন; কারণ আমলহীন ইলম অন্তরে হেদায়েতের নূর প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. উলূমুল কুরআন (علوم القرآن) অধ্যয়নের প্রধান লক্ষ্য কী?
ইসলামিক অ্যারাবিক ইউনিভার্সিটির অধীনে উলূমুল কুরআন কোর্সের মূল লক্ষ্য হলো পবিত্র কালামুল্লাহর নাযিলের প্রেক্ষাপট, সংকলনের ইতিহাস, ই’জাজ এবং তাফসীরের বিশুদ্ধ মূলনীতি সম্পর্কে প্রামাণ্য জ্ঞান অর্জন করা।
২. পবিত্র কুরআন দীর্ঘ ২৩ বছরে ধীরে ধীরে নাযিল হওয়ার প্রধান কারণ কী?
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হৃদয়কে সুদৃঢ় রাখা, সাহাবায়ে কেরামের জন্য মুখস্থকরণ ও অনুধাবন সহজ করা এবং ইসলামি বিধানসমূহকে পর্যায়ক্রমে সমাজে কার্যকর করার জন্যই কুরআন ধীরে ধীরে নাযিল হয়।
৩. কুরআন ও হাদীসে কুদসীর মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?
কুরআনের শব্দ ও অর্থ উভয়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং তা নামাজে পাঠ করা ফরজ; পক্ষান্তরে হাদীসে কুদসীর ভাব আল্লাহর কিন্তু ভাষা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর এবং তা নামাজে তিলাওয়াত করা যায় না।
৪. তাফসীর ও তাবীলের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কী?
তাফসীর হলো আয়াতের প্রকাশ্য শব্দার্থ ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট উন্মোচন করা যা বর্ণনানির্ভর, আর তাবীল হলো আয়াতের অন্তর্নিহিত গভীর মর্মোদঘাটন যা যুক্তি ও ভাষাজ্ঞাননির্ভর।
৫. ‘আল-ফাওযুল কাবীর’ কিতাবটির রচয়িতা কে এবং এর মূল বিষয় কী?
গ্রন্থটির রচয়িতা শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী (রহ.)। এতে তিনি উসূলে তাফসীর এবং পবিত্র কুরআনের সমগ্র বিষয়বস্তুকে পাঁচটি প্রধান জ্ঞানে (ইলম) বিন্যস্ত করে আলোচনা করেছেন।
৬. কুরআনের বৈজ্ঞানিক অলৌকিকত্ব (ই’জাযুল ইলমী) বলতে কী বোঝায়?
চৌদ্দশত বছর পূর্বে নাযিলকৃত কুরআনে মহাবিশ্ব সৃষ্টি, ভ্রূণতত্ত্ব ও পর্বতমালার মতো বহু বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার নির্ভুল তথ্য থাকা, যা আধুনিক বিজ্ঞান সত্য বলে প্রমাণ করেছে।