اختبار السنة الأولى للفاضل البكالوريوس (الشرف)، لعام ٢٠٢٢م
ফাযিল (স্নাতক) সম্মান প্রথম বর্ষ পরীক্ষা, ২০২২
القرآن والدراسات الإسلامية [আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
المدخل إلى علوم القرآن [আল-মাদখাল ইলা উলূমিল কুরআন]
বিষয় কোড: ২ ০ ১ ১ ০ ১
الوقت—٤ ساعات [সময়— ৪ ঘণ্টা] | الدرجات الكاملة—٨٠ [পূর্ণমান— ৮০]
الملاحظة : أجب عن أربعة من مجموعة (الف) وعن أربعة من مجموعة (ب) –
[দ্রষ্টব্য: (الف) অংশ থেকে চারটি এবং (ب) অংশ থেকে চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
مجموعة (الف) [(الف) অংশ] – রচনামূলক প্রশ্ন
الدرجات—٦٠ = ٤ × ١٥ [মান— ১৫ × ৪ = ৬০]
১- عرف القرآن الكريم ثم بين أسماءه وأوصافه مثلا-
[القرآن الكريم এর সংজ্ঞা দাও। আল-কুরআনের নাম ও বিশেষণসমূহ উদাহরণসহ বর্ণনা কর।] মান: ১৫
উত্তর:
ভূমিকা: মহাগ্রন্থ আল-কুরআন বিশ্বজগতের প্রতিপালক মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর ওপর অবতীর্ণ সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানি কিতাব। এটি মানবজাতির সার্বিক হেদায়েত, আলোকবর্তিকা ও মুক্তির চিরন্তন সনদ।
১. আল-কুরআনুল কারীমের সংজ্ঞা (Definition of Al-Quran):
(ক) আভিধানিক অর্থ: ‘কুরআন’ (القرآن) শব্দটি ‘কার’উন’ (قرء) ধাতু থেকে নিষ্পন্ন, যার অর্থ পাঠ করা, তিলাওয়াত করা বা একত্রিত করা। যেহেতু এই কিতাবটি বিশ্বে সর্বাধিক পঠিত এবং এতে পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবসমূহের সারনির্যাস ও যাবতীয় হেদায়েতের বিধান একত্রিত করা হয়েছে, তাই একে কুরআন বলা হয়।
(খ) পারিভাষিক সংজ্ঞা: উসূলে ফিকাহ ও উলূমুল কুরআনের ইমামগণের মতে:
“هو كلام الله تعالى، المنزل على نبيه محمد صلى الله عليه وسلم باللفظ العربي، المعجز بسورة منه، المتعبد بتلاوته، المنقول إلينا بالتواتر، المكتوب في المصاحف، المبدوء بسورة الفاتحة والمختوم بسورة الناس”
অর্থাৎ “আল-কুরআন হলো মহান আল্লাহর কালাম, যা তাঁর প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর ওপর আরবি ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে, যার একটিমাত্র সূরাও অলৌকিক মুজিজা, যা তেলাওয়াত করা ইবাদত, যা তাওয়াতুরের সাথে আমাদের নিকট পৌঁছেছে, যা মুসহাফে লিপিবদ্ধ এবং যা সূরা আল-ফাতিহা দিয়ে শুরু হয়ে সূরা আন-নাস দিয়ে সমাপ্ত হয়েছে।”
২. আল-কুরআনের প্রসিদ্ধ নামসমূহ (Names of the Holy Quran):
ইমাম যারকাশী ও ইমাম সুয়ূতী (রহ.) উল্লেখ করেছেন যে, পবিত্র কুরআনে এই ঐশী গ্রন্থের ৫৫টিরও বেশি নাম ও বিশেষণের উল্লেখ রয়েছে। তন্মধ্যে প্রধান চারটি মূল নাম হলো:
- আল-কুরআন (القرآن – সর্বাধিক পঠিত): এটিই প্রধান নাম। ইরশাদ হয়েছে: “নিশ্চয় এটি এক মহাসম্মানিত কুরআন, যা সুরক্ষিত ফলকে লিপিবদ্ধ।” (সূরা আল-ওয়াকিয়াহ: ৭৭)।
- আল-কিতাব (الكتاب – লিখিত গ্রন্থ): ইরশাদ হয়েছে: “এটি সেই কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই; মুত্তাকিদের জন্য হেদায়েত।” (সূরা আল-বাকারা: ২)।
- আল-ফুরকান (الفرقان – সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী): ইরশাদ হয়েছে: “পরম বরকতময় তিনি, যিনি স্বীয় বান্দার ওপর ফুরকান নাজিল করেছেন, যাতে সে বিশ্বজগতের জন্য সতর্ককারী হতে পারে।” (সূরা আল-ফুরকান: ১)।
- আয-যিকর (الذكر – উপদেশ বা স্মারক): ইরশাদ হয়েছে: “নিশ্চয় আমিই যিকর (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি এবং অবশ্যই আমি নিজেই এর সংরক্ষক।” (সূরা আল-হিজর: ৯)।
- আত-তানযীল (التنزيل – অবতারিত বাণী): ইরশাদ হয়েছে: “এবং নিশ্চয় এটি বিশ্বজগতের রবের পক্ষ থেকে অবতারিত।” (সূরা আশ-শুয়ারা: ১৯২)।
৩. আল-কুরআনের মহিমান্বিত বিশেষণসমূহ (Attributes/Descriptions of the Quran):
- আন-নূর (النور – আলো): “আমি তোমাদের নিকট সুস্পষ্ট আলো নাজিল করেছি।” (সূরা আন-নিসা: ১৭৪)। এটি অন্ধকারের বুক চিরে সত্যের আলো বিকিরণ করে।
- আশ-শিফা (الشفاء – আরোগ্য): “আর আমি কুরআন নাজিল করি যা মুমিনদের জন্য আরোগ্য ও রহমত।” (সূরা বনি ইসরাইল: ৮২)। এটি অন্তরের শিরক, কুফর ও নৈতিক ব্যাধির মহৌষধ।
- আল-হুদা (الهدى – হেদায়েত): “রমজান মাস, যাতে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে মানবজাতির পথপ্রদর্শক হিসেবে।” (সূরা আল-বাকারা: ১৮৫)।
- আল-হাকীম (الحكيم – প্রজ্ঞাময়): “শপথ প্রজ্ঞাময় কুরআনের।” (সূরা ইয়াসীন: ২)। এর প্রতিটি আইন ও বিধান বিজ্ঞানসম্মত ও হেকমতপূর্ণ।
- আল-মাজীদ (المجيد – মহিমান্বিত): “বরং এটি মহাসম্মানিত ও মহিমান্বিত কুরআন।” (সূরা আল-বুরুজ: ২১)।
- আল-মুবারাক (المبارك – বরকতময়): “এটি এক বরকতময় কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি নাজিল করেছি।” (সূরা সাদ: ২৯)।
উপসংহার: পবিত্র কুরআনের এই বহুমাত্রিক নাম ও বিশেষণ এর অলৌকিক মর্যাদা, অনন্য মাহাত্ম্য এবং মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এর অপরিহার্যতার সাক্ষ্য বহন করে।
২- ما معنى الوحى لغة واصطلاحا؟ تحدث عن كيفية الوحى إلى الملائكة والأنبياء موضحا-
[الوحى এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ কী? ফেরেশতা ও নবিগণের প্রতি ওহি প্রেরণের পদ্ধতি বিশদভাবে আলোচনা কর।] মান: ১৫
উত্তর:
ভূমিকা: মানবজাতিকে সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যকার একমাত্র আধ্যাত্মিক যোগাযোগের মাধ্যম হলো ওহী। ওহীর মাধ্যমেই আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী ও রাসুলদের ওপর আসমানি কিতাব ও জীবনবিধান অবতীর্ণ করেছেন।
১. ওহীর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ (Meaning of Wahy):
আভিধানিক অর্থ: ‘ওহী’ (الوحي) শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো—ইশারা করা, গোপনে কথা বলা, সংকেত দেওয়া, দ্রুত বার্তা পাঠানো বা মনের ভেতর কোনো কথা অলক্ষ্যে প্রবিষ্ট করানো।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: ইসলামি শরীয়তের পরিভাষায়, মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর নির্বাচিত নবী-রাসুলগণের নিকট দ্রুত, গোপন ও অলৌকিক উপায়ে যে ঐশী বাণী বা প্রত্যাদেশ প্রেরণ করেন, তাকে ওহী (Divine Revelation) বলা হয়।
২. ফেরেশতাদের প্রতি ওহী প্রেরণের পদ্ধতি (Wahy to the Angels):
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন: “স্মরণ কর, যখন তোমার রব ফেরেশতাদের প্রতি ওহী পাঠালেন যে, নিশ্চয় আমি তোমাদের সাথে আছি…” (সূরা আল-আনফাল: ১২)।
- হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ তাআলা যখন আসমানে কোনো বিষয়ে নির্দেশ বা কালাম করেন, তখন তাঁর ভয়ে আসমান প্রকম্পিত হয় এবং ফেরেশতারা বজ্রপাতের বিকট শব্দের ন্যায় শৃঙ্খলের ঝনঝনানি শুনে ভয়ে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে।
- এরপর তাদের অন্তর থেকে ভয় দূর হলে তারা হযরত জিবরাইল (আ.)-কে জিজ্ঞেস করে: “তোমাদের রব কী বলেছেন?” জিবরাইল (আ.) বলেন: “তিনি পরম সত্য বলেছেন; তিনি সর্বোচ্চ, মহান।” (সহিহ বুখারী)। জিবরাইল (আ.) সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে সেই বাণী শ্রবণ করে তা নির্ধারিত নবী বা ফেরেশতার নিকট পৌঁছে দেন।
৩. নবীগণের প্রতি ওহী প্রেরণের বিভিন্ন পদ্ধতি (Wahy to the Prophets):
পবিত্র কুরআনের সূরা আশ-শূরার ৫১ নম্বর আয়াতে নবীগণের প্রতি ওহীর তিনটি মৌলিক মাধ্যম উল্লেখ করা হয়েছে:
“কোনো মানুষের পক্ষে এমন হওয়ার সুযোগ নেই যে আল্লাহ তার সাথে সরাসরি কথা বলবেন, ওহীর মাধ্যম ব্যতীত, অথবা পর্দার অন্তরাল ব্যতীত, অথবা এমন দূত (ফেরেশতা) প্রেরণ ব্যতীত যে তাঁর অনুমতিক্রমে তিনি যা চান তা প্রকাশ করে।” (সূরা আশ-শূরা: ৫১)।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর মূলত নিম্নোক্ত পদ্ধতিতে ওহী নাজিল হতো (সহিহ বুখারীর ১ম হাদিস):
- ঘণ্টাধ্বনির ন্যায় অবতরণ (مثل صلصلة الجرس):
এটি ছিল ওহীর সবচেয়ে ভারী ও কঠিন রূপ। রাসুল (সা.) ঘণ্টার টুংটাং শব্দের মতো তীব্র ঝনঝনানি অনুভব করতেন। এই সময় প্রচণ্ড শীতের দিনেও নবীজির কপাল থেকে ঘাম ঝরে পড়ত এবং তিনি উটের পিঠে থাকলে উট ভার সহ্য করতে না পেরে মাটিতে বসে পড়ত। ওহী সমাপ্ত হলে সেই বাণী নবীজির অন্তরে গেঁথে যেত।
- ফেরেশতার মানব রূপ ধারণ:
হযরত জিবরাইল (আ.) মানুষের আকৃতি ধারণ করে (বিশেষত সাহাবী হযরত দাহিয়াতুল কালবী (রা.)-এর আকৃতিতে) আগমন করতেন এবং নবীজিকে ওহী শুনিয়ে যেতেন। এটি ছিল অপেক্ষাকৃত সহজ পদ্ধতি।
- স্বপ্নের মাধ্যমে ওহী (الرؤيا الصالحة):
নবুওয়তের সূচনালগ্নে ছয় মাস রাসুল (সা.) সত্য স্বপ্ন দেখতেন, যা ভোরের শুভ্র আলোর ন্যায় অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হতো। নবীদের স্বপ্নও ওহী (যেমন ইব্রাহিম (আ.)-এর স্বপ্নের মাধ্যমে কোরবানি)।
- সরাসরি অন্তরে প্রবিষ্ট করানো (النفث في الروع):
জিবরাইল (আ.) না এসেও সরাসরি নবীজির পবিত্র অন্তরে কোনো নির্দেশ ঢেলে দেওয়া হতো। রাসুল (সা.) বলেন: “পবিত্র রুহ (জিবরাইল) আমার অন্তরে ফুঁকে দিয়েছেন যে, কোনো প্রাণী তার নির্ধারিত রিজিক পূর্ণ না করে মরবে না।”
- পর্দার অন্তরাল থেকে সরাসরি কথা বলা:
যেমন তুর পাহাড়ে হযরত মুসা (আ.)-এর সাথে আল্লাহ সরাসরি কথা বলেছিলেন (কালিমুল্লাহ) এবং মেরাজের রজনীতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের বিধান নিয়ে কথোপকথন হয়েছিল।
- জিবরাইল (আ.)-কে আসল ফেরেশতা আকৃতিতে দর্শন:
রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বচক্ষে জিবরাইল (আ.)-কে তাঁর আসল ছয়শত ডানাবিশিষ্ট দিগন্তজোড়া নূরের আকৃতিতে দুইবার প্রত্যক্ষ করেছেন—একবার হেরা গুহার নিকটে এবং দ্বিতীয়বার সিদরাতুল মুনতাহার নিকটে।
উপসংহার: ওহীর এই ঐশী প্রক্রিয়া সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে আল-কুরআনের প্রতিটি শব্দ মানুষের কল্পনাপ্রসূত কোনো ভাব নয়, বরং সরাসরি রব্বুল আলামীনের সংরক্ষিত বাণী।
৩- زعم الجاحدون للوحى “أن القرآن الكريم من عند محمد صلى الله عليه وسلم ابتكر معانيه وصاغ أسلوبه” فند شبهتهم هذه بالحجة الدافعة-
[ওহি অস্বীকারকারীরা বলে যে, “কুরআন মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এঁর নিজের রচনা। কুরআনের অর্থ ও শৈলীর তিনিই উদ্ভাবক”—অকাট্য দলিল দ্বারা তাদের এই সন্দেহ অপনোদন কর।] মান: ১৫
উত্তর:
ভূমিকা: আল-কুরআনের অলৌকিক সাহিত্যসৌকর্য, অভ্রান্ত ঐতিহাসিক তথ্য এবং নিখুঁত জীবনবিধান দেখে হতবাক হয়ে নাস্তিক, প্রাচ্যবিদ ও ইসলামবিরোধীরা দাবি করে যে—মুহাম্মদ (সা.) নিজেই ছিলেন এক প্রতিভাবান কবি বা দার্শনিক, তিনি নিজেই কুরআনের ভাব কল্পনা করেছেন এবং অনুপম শৈলীতে তা রূপ দিয়েছেন। এটি একটি চরম অবান্তর ও ঐতিহাসিক সত্যবিরোধী কুযুক্তি।
অকাট্য দলিলের আলোকে এই সন্দেহের অপনোদন:
- উম্মি নবীর নিরক্ষরতার বাস্তবতা:
রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো শিক্ষকের কাছে পড়েননি, লিখতে বা পড়তে জানতেন না। চল্লিশ বছর তিনি মক্কাবাসীর সামনে অতি সাধারণ জীবন কাটিয়েছেন। কোনো দিন কোনো কবিতা বা কাব্যচর্চায় অংশ নেননি। আল্লাহ বলেন: “এর পূর্বে আপনি কোনো কিতাব পাঠ করেননি এবং নিজ হাতে কোনো কিতাব লেখেননি; তা হলে মিথ্যাবাদীরা সন্দেহ পোষণ করত।” (সূরা আল-আনকাবুত: ৪৮)। চল্লিশ বছর পর হঠাৎ একা কোনো মানুষের পক্ষে মানবজাতির শ্রেষ্ঠ সাহিত্য ও আইনের বিশ্বকোষ রচনা করা যুক্তিবিরুদ্ধ।
- কুরআনের ভাষা বনাম হাদিসের ভাষার বিস্তর ফারাক:
যদি কুরআন রাসুল (সা.)-এর নিজের রচিত হতো, তবে কুরআনের ভাষা এবং রাসুল (সা.)-এর মুখের সাধারণ কথা বা হাদিসের ভাষা একই রকম হতো। কিন্তু আরবি সাহিত্যের যে কেউ জানেন—হাদিসের ভাষা চরম মার্জিত হলেও কুরআনের যে অলৌকিক ছন্দ, সুরের মূর্ছনা ও শব্দবিন্যাস রয়েছে, হাদিসের সাথে তার কোনো মিল নেই। একই মানুষের পক্ষে একই সাথে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী সাহিত্যধারা ২৩ বছর ধরে তৈরি করা অসম্ভব।
- তৎকালীন আরবের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকদের প্রতি কুরআনের অপরাজেয় চ্যালেঞ্জ:
তৎকালীন আরবে উকাজ মেলায় সাহিত্যের প্রতিযোগিতা হতো। ইমরুল কায়েস, লাবিদ, যুহাইরের মতো কবিরা ছিলেন ভাষার জাদুকর। কুরআন তাদের চ্যালেঞ্জ করেছে: “তোমরা যদি সন্দেহ কর, তবে এর অনুরূপ একটিমাত্র সূরা রচনা করে নিয়ে আসো এবং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের সকল সহযোগীকে ডাকো!” (সূরা আল-বাকারা: ২৩)। গোটা আরব জাতি সর্বশক্তি দিয়েও তিন লাইনের একটি সূরার সমকক্ষ রচনা করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। মুহাম্মদ (সা.) যদি মানুষ হয়ে তা রচনা করতে পারতেন, তবে আরবের অন্যান্য পণ্ডিত কবিরাও তা করতে পারত।
- নবীজির প্রতি কুরআনের মৃদু তিরস্কার ও সংশোধন:
কোনো রচয়িতা কি নিজের বইয়ে নিজের ভুল ধরে নিজেকে তিরস্কার করে? পবিত্র কুরআনে বিভিন্ন ঘটনায় নবীজির ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ওপর মৃদু ঐশী আপত্তি এসেছে। যেমন: অন্ধ সাহাবী ইবনে উম্মে মাকতুমের ঘটনায় সূরা আবাসা নাজিল হওয়া (“সে ভ্রুকুটি করল ও মুখ ফিরিয়ে নিল, কারণ তার কাছে এক অন্ধ আগমন করল”), বদরের যুদ্ধবন্দিদের মুক্তিপণ বিষয়ে, কিংবা সূরা আত-তাহরীমে নিজের জন্য কোনো হালাল বস্তু নিষিদ্ধ করার বিষয়ে। এটিই প্রমাণ করে যে মুহাম্মদ (সা.) এর রচয়িতা নন, তিনি কেবল বিশ্বস্ত বাহক।
- ওহী বিলম্বিত হওয়ার আকুলতা:
যদি কুরআন নবীজির স্বরচিত হতো, তবে যখন উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.)-এর ওপর মুনাফিকরা অপবাদ (ইফক) দিল, কিংবা মক্কার কাফেররা আসহাবে কাহাফ ও জুলকারনাইন সম্পর্কে প্রশ্ন করল—তখন তিনি দীর্ঘ এক মাস ওহীর জন্য ব্যাকুল হয়ে কাঁদতেন না। তিনি তাৎক্ষণিক স্বরচিত আয়াত বলে দিতে পারতেন। ওহী সম্পূর্ণ আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল বলেই তিনি অপেক্ষা করেছিলেন।
- অজ্ঞাত ঐতিহাসিক সত্য ও ভবিষ্যৎবাণী:
কুরআনে ফেরাউনের লাশ অক্ষত থাকার ঘোষণা (সূরা ইউনুস: ৯২), রোমানদের পুনর্জয় (সূরা রুম), ভ্রূণের বিকাশধারা—এসব তথ্য সপ্তম শতকের আরবের কোনো মানুষের পক্ষে উদ্ভাবন করা কস্মিনকালেও সম্ভব ছিল না।
উপসংহার: অতএব অকাট্য যুক্তি ও ঐতিহাসিক প্রমাণের আলোকে দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, আল-কুরআন মুহাম্মাদ (সা.)-এর নিজের কোনো উদ্ভাবন নয়; বরং এটি নিখাদ ঐশী প্রত্যাদেশ।
৪- تحدث عن أول ما نزل من القرآن مع بيان فوائد معرفة أوله وآخره مفصلا-
[কুরআনের প্রথম ও শেষ অবতীর্ণ সম্পর্কে জানার উপকারিতা বর্ণনাসহ কুরআনের প্রথম অবতীর্ণ সম্পর্কে আলোচনা কর।] মান: ১৫
উত্তর:
ভূমিকা: উলূমুল কুরআনের অন্যতম মৌলিক অধ্যায় হলো ‘আউয়ালু মা নাযালা ওয়া আখিরু মা নাযালা’ (সর্বপ্রথম ও সর্বশেষ অবতীর্ণ আয়াত)। এটি আসমানি বিধানের সূচনা ও পূর্ণতার ইতিহাস স্পষ্ট করে।
১. কুরআনের প্রথম অবতীর্ণ আয়াত (First Revelation):
সহিহ বুখারী ও মুসলিমের সর্বসম্মত বিশুদ্ধ হাদিস অনুসারে, নবুওয়তের সূচনায় ৬১০ খ্রিষ্টাব্দের রমজান মাসের কদরের রাতে হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর হযরত জিবরাইল (আ.) সর্বপ্রথম যে বাণী নিয়ে আগমন করেন, তা হলো সূরা আল-আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত:
اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ (1) خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ (2) اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ (3) الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ (4) عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ (5)
“পাঠ করুন আপনার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জমাট রক্তপিণ্ড থেকে। পাঠ করুন, আর আপনার রব পরম সম্মানিত; যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন যা সে জানত না।” (সূরা আল-আলাক: ১-৫)।
- অন্যান্য মতের পর্যালোচনা: কেউ কেউ সূরা আল-মুদ্দাসসিরের প্রাথমিক আয়াত অথবা সূরা আল-ফাতিহাকে প্রথম অবতীর্ণ বলেছেন। কিন্তু তাহকীক মতে, পূর্ণাঙ্গ সূরা হিসেবে প্রথম নাজিল হয়েছে ফাতিহা, এবং ওহী সাময়িক বন্ধ (ফাতরাতুল ওহী) থাকার পর প্রথম নাজিল হয়েছে মুদ্দাসসির। কিন্তু নিঃশর্তভাবে সর্বপ্রথম ওহী হলো সূরা আলাকের প্রথম পাঁচ আয়াত।
২. প্রথম ও শেষ অবতীর্ণ আয়াত জানার বহুমুখী উপকারিতা:
- নাসিখ ও মানসুখ (রহিত ও বহাল বিধান) নির্ধারণ: যদি দুটি আয়াতে পরস্পরবিরোধী কোনো বিধানের আপাত রূপ দেখা যায়, তবে প্রথম অবতীর্ণ আয়াতটি মানসুখ (রহিত) এবং শেষ অবতীর্ণ আয়াতটি নাসিখ (কার্যকর) হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। প্রথম ও শেষ না জানলে শরীয়তের সঠিক আমল অসম্ভব হতো।
- ইসলামি শরীয়তের পর্যায়ক্রমিক নীতি অনুধাবন: জাহেলি সমাজের বর্বরতাকে দূর করতে ইসলাম কীভাবে ধাপে ধাপে বিধান জারি করেছে (যেমন: মদ্যপানের ক্রমান্বয়িক নিষেধ, জিহাদের হুকুম), তার মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক বিজ্ঞান জানা যায়।
- কুরআনের ঐতিহাসিক অবিকৃতি ও সুরক্ষার প্রমাণ: কোন আয়াত কখন, কোথায় ও কোন পরিস্থিতিতে নাজিল হয়েছে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ দিনক্ষণ সংরক্ষিত থাকা প্রমাণ করে যে কুরআন সম্পূর্ণ অক্ষত রয়েছে।
- দাওয়াতি কাজের পদ্ধতি শিক্ষা: একজন ইসলামি প্রচারক বা দায়ীকে জানতে হবে মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিতে হলে প্রথমে তাওহিদ ও শিক্ষার কথা বলতে হয়, এরপর আমলি আহকাম।
- নবীজির জীবনের মোড় পরিবর্তন বোঝা: নবুওয়তের সূচনা থেকে বিদায় হজের পূর্ণতা পর্যন্ত রাসুল (সা.)-এর সুদীর্ঘ ২৩ বছরের বিপ্লব ও সাধনার স্তর বোঝা যায়।
উপসংহার: কুরআন গবেষণায় প্রথম ও শেষ অবতীর্ণের জ্ঞান মুফাসসিরদের জন্য এক অপরিহার্য দিকনির্দেশক চাবিকাঠি।
৫- ما المراد بجمع القرآن الكريم؟ بين صوره في عهد رسول الله صلى الله عليه وسلم مفصلا-
[جمع القرآن الكريم দ্বারা উদ্দেশ্য কী? রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এঁর যুগের جمع القرآن এর বিচিত্ররূপ বিস্তারিত বর্ণনা কর।] মান: ১৫
উত্তর:
ভূমিকা: আসমানি কিতাবসমূহের মধ্যে একমাত্র আল-কুরআনই সংরক্ষিত ঐশী কিতাব। আল্লাহ নিজেই এর সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন (সূরা হিজর: ৯)। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশাতেই কুরআনের পরিপূর্ণ সংকলন ও হিফজ নিশ্চিত করা হয়েছিল।
১. ‘জমউল কুরআন’ (جمع القرآن الكريم)-এর অর্থ ও তাৎপর্য:
উলূমুল কুরআনের পরিভাষায় ‘জমউল কুরআন’ তিনটি ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়:
- কুরআন অন্তরে মুখস্থ রাখা (الحفظ في الصدور): সাহাবাদের স্মৃতিপটে সম্পূর্ণ কুরআন নির্ভুলভাবে ধারণ করা।
- লিখিতভাবে লিপিবদ্ধ করা (الكتابة والتدوين): চামড়া, তক্তা ও পাথরে আয়াতগুলো লিখে একত্র রাখা।
- একটি একক মুসহাফে বাঁধাই করা (الجمع بين الدفتين): যা পরবর্তীতে খলিফা আবু বকর ও উসমান (রা.)-এর যুগে সম্পন্ন হয়।
২. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে জমউল কুরআনের বিচিত্র রূপসমূহ:
নবীজির পবিত্র জীবদ্দশায় কুরআন সংকলনের কাজ যুগপৎ দুটি শক্তিশালী ধারায় সম্পন্ন হয়েছিল:
(ক) স্মৃতিতে ধারণ ও মুখস্থ সংরক্ষণ (الجمع في القلوب):
- তৎকালীন আরবরা ছিল চরম স্মৃতিধর জাতি। লিখিত কাগজের চেয়ে স্মৃতিশক্তিই ছিল তাদের প্রধান অহংকার।
- রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে মুখস্থ করতেন এবং প্রতিটি আয়াত নাজিল হওয়ার পর সাহাবীদের সমবেত করে মুখস্থ করাতেন। নামাজে পাঁচ ওয়াক্ত ফরজে উচ্চৈঃস্বরে ও নীরবে এই আয়াতগুলো পঠিত হতো।
- হাজার হাজার সাহাবী কুরআনের হাফেজ ছিলেন। বিশেষত চার খলিফা, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, উবাই ইবনে কাব, যায়েদ ইবনে সাবিত, মুয়াজ ইবনে জাবাল, আবু দারদা এবং বহু নারী সাহাবী সম্পূর্ণ কুরআন হিফজ করেছিলেন।
- প্রতি রমজানে জিবরাইল (আ.) রাসুল (সা.)-এর সাথে নাজিলকৃত পূর্ণ কুরআন পুনরাবৃত্তি (দাওর) করতেন, এবং ওফাতের বছর রমজানে দু’বার তা সম্পন্ন করেন।
(খ) ওহী লেখক সাহাবাদের মাধ্যমে লিখিত রূপ (الجمع في السطور):
- রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো আয়াত অবতীর্ণ হলেই ওহী লেখক সাহাবীদের ডেকে নিতেন। ওহী লেখকদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৪০ থেকে ৪২ জন। তন্মধ্যে প্রধান ছিলেন হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত, হযরত আলী, হযরত মুয়াবিয়া, হযরত উবাই ইবনে কাব (রা.)।
- তৎকালীন আধুনিক প্রেস বা কাগজের অনুপস্থিতিতে লিখিত উপকরণ ছিল:
- আর-রিকা’ (الرقاع): প্রক্রিয়াজাত পশুর চামড়ার টুকরো।
- আল-লিক্বাফ (اللخاف): মসৃণ পাতলা সাদা পাথরখণ্ড।
- আল-উসুব (العسب): খেজুর গাছের পাতার মধ্যবর্তী চওড়া ডাল।
- আল-আকতাফ ওয়াল আদলা’ (الأكتاف والأضلاع): উট ও পশুর কাঁধ ও পাঁজরের চওড়া হাড়।
- আল-আকতাব (الأقتاب): উটের জিন তৈরির কাঠের তক্তা।
- রাসুল (সা.) নিজ মুখে বলে দিতেন কোন আয়াতের পর কোন আয়াত বসবে। ফলে সুরার অভ্যন্তরীণ প্রতিটি আয়াতের ধারাবাহিকতা রাসুল (সা.)-এর নির্দেশেই সম্পন্ন হয়।
উপসংহার: সুতরাং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পূর্বেই সমগ্র কুরআনের প্রতিটি আয়াত ও সুরা পূর্ণাঙ্গভাবে মুখস্থ ছিল এবং সম্পূর্ণ লিখিত অবস্থায় সংরক্ষিত ছিল।
৬- تحدث عن القواعد التي يحتاج إليها المفسر موجزا-
[মুফাসসিরকে যে সব নিয়মাবলি জানতে হয় সংক্ষেপে তা আলোচনা কর।] মান: ১৫
উত্তর:
ভূমিকা: মহান আল্লাহর বাণী আল-কুরআনের ব্যাখ্যা প্রদান করা কোনো সাধারণ কাজ নয়। এর জন্য গভীর প্রজ্ঞা, আরবি ভাষা ও শরীয়তের মৌলিক উসূলে পূর্ণ দক্ষতা অপরিহার্য। ইমাম সুয়ূতী ও আল-আলূসী (রহ.) একজন যোগ্য মুফাসসিরের জন্য ১৫টি মৌলিক শাস্ত্রের জ্ঞানকে আবশ্যক করেছেন।
মুফাসসিরের জন্য আবশ্যকীয় প্রধান নিয়মাবলি ও শাস্ত্রসমূহ:
- আরবি শব্দতত্ত্ব ও ভাষাতত্ত্বের জ্ঞান (علم اللغة): আরবি প্রতিটি শব্দের মূল অর্থ, ধাতু এবং উপযোগিতা জানতে হবে, যাতে শব্দের অপব্যাখ্যা না হয়।
- নাহু শাস্ত্রের জ্ঞান (علم النحو): বাক্যের গঠনরীতি ও ইরাব (যবর, যের, পেশ)-এর জ্ঞান। কারণ ইরাবের একটি হরকতের পরিবর্তনে ফায়েল মাফউল হয়ে অর্থের আকাশ-পাতাল পরিবর্তন হতে পারে।
- সরফ শাস্ত্রের জ্ঞান (علم الصرف): শব্দরূপ রূপান্তর ও সীগাহ চেনার জ্ঞান। দুর্বল হরফ, তালিল ও বাব বোঝার জন্য সরফ অপরিহার্য।
- বালাগাত শাস্ত্রের তিন শাখা (معاني، بيان، بديع):
- ইলমুল মা’আনি: বাক্যের অন্তর্নিহিত ভাব ও প্রাসঙ্গিকতা বোঝা।
- ইলমুল বায়ান: রূপক, উপমা, ইশারা ও কেনায়া বোঝা।
- ইলমুল বাদী: অলঙ্কার ও সাহিত্যিক সৌন্দর্য অনুধাবন।
- উসূলে তাফসির ও আসবাবুন নুযুল (أسباب النزول): কোন প্রেক্ষাপটে, কোন ঘটনার কারণে আয়াতটি নাজিল হয়েছিল তা জানা। শানে নুযুল না জানলে আয়াতের সঠিক অর্থ বোঝা অসম্ভব।
- নাসিখ ও মানসুখের জ্ঞান (علم الناسخ والمنسوخ): কোন বিধান রহিত হয়েছে এবং কোনটি কার্যকর রয়েছে তা জানা।
- উসূলে ফিকাহ ও আহকামুল কুরআন: কুরআনের আয়াত থেকে শরীয়তের ব্যবহারিক হালাল-হারাম আইন নিষ্কাশনের পদ্ধতি জানা।
- হাদিস ও রিজাল শাস্ত্রের জ্ঞান (علم الحديث ورجاله): সহিহ, জয়িফ ও জাল হাদিসের পার্থক্য বোঝার জ্ঞান; যাতে ইসরাঈলি ও মিথ্যা বর্ণনা থেকে তাফসির মুক্ত থাকে।
- ইলমুল কিরাত (علم القراءات): বিভিন্ন বিশুদ্ধ কিরাতের উচ্চারণ বৈচিত্র্য ও তার অর্থের সূক্ষ্মতা জানা।
- ইলমুল মাওহিবাহ (علم الموهبة): এটি অর্জিত বিদ্যা নয়; বরং তাকওয়া ও খোদাভীতির কারণে মহান আল্লাহ মুফাসসিরের অন্তরে যে প্রজ্ঞার নূর দান করেন।
উপসংহার: এসব নিয়মনীতি ও উসূল মেনে তাফসির করলেই কেবল তাফসির গ্রহণযোগ্য হয় এবং মনগড়া তাফসিরের ভয়াবহ কবিরা গুনাহ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
৭- ما معنى النسخ؟ وما شروطه؟ بين أهميته وكيفية معرفته موضحا-
[النسخ অর্থ কী? এর শর্ত কী কী? নাসখ এর গুরুত্ব ও নসখ জানার পদ্ধতি বিশদভাবে বর্ণনা কর।] মান: ১৫
উত্তর:
ভূমিকা: ইসলামি শরীয়তের গতিশীলতা ও পর্যায়ক্রমিক বিধিমালার সঠিক জ্ঞান অর্জনে ‘নাসখ’ শাস্ত্রের স্থান অনন্য।
১. নাসখের অর্থ (Meaning of Naskh):
আভিধানিক অর্থ: বিলোপ সাধন করা (الإزالة), পরিবর্তন করা বা স্থানান্তর করা।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: পরবর্তী কোনো শরীয়াহ দলিলের মাধ্যমে পূর্ববর্তী কোনো শরীয়াহ হুকুম বা বিধান রহিত বা বাতিল করাকে নাসখ বলে।
২. নাসখ কার্যকর হওয়ার শর্তসমূহ (Conditions of Naskh):
- রহিতকৃত বিধানটি কোনো চিরন্তন আকিদা বা ঐতিহাসিক সত্য না হয়ে শরীয়তের ব্যবহারিক আমলি হুকুম (আদেশ-নিষেধ) হতে হবে।
- নাসিখ দলিলটি মানসুখ দলিলের চেয়ে সময়কালে সুস্পষ্টভাবে পরবর্তী হতে হবে।
- উভয় দলিলের মধ্যে এমন স্পষ্ট বৈপরীত্য থাকতে হবে যার কোনো প্রকার সমন্বয় (তাতবীক্ব) সম্ভব নয়।
- নাসিখ দলিলটি প্রামাণিক শক্তিতে মানসুখের সমান বা শক্তিশালী হতে হবে (যেমন: কুরআনের বিধান কুরআন বা মুতাওয়াতির হাদিস দ্বারা নাসখ হওয়া)।
৩. নাসখ শাস্ত্রের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা:
- কোনো মুজতাহিদ বা মুফাসসিরের জন্য নাসখের জ্ঞান না থাকলে সে একটি বাতিলকৃত বিধান দিয়ে ফতোয়া দিয়ে বসবে, যা মারাত্মক অপরাধ। হযরত আলী (রা.) এক বক্তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন: “তুমি কি নাসিখ ও মানসুখ জানো?” সে বলল: “না।” আলী (রা.) বললেন: “তবে তুমি নিজে ধ্বংস হয়েছ এবং অন্যকেও ধ্বংস করছ।”
- ইসলামি আইনের বিবর্তন ও সহজীকরণের সৌন্দর্য উপলব্ধি করা যায়।
৪. নাসখ জানার পদ্ধতি (Ways to Identify Naskh):
- কুরআন বা হাদিসের স্পষ্ট বক্তব্য (النص الصريح): যেখানে আল্লাহ বা রাসুল নিজেই স্পষ্ট করে দেন যে পূর্বের বিধান রহিত হয়েছে। যেমন রাসুল (সা.) বলেছেন: “আমি তোমাদের কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম, এখন তোমরা কবর জিয়ারত কর।” (সহিহ মুসলিম)।
- ঐতিহাসিক সন-তারিখের প্রামাণ্য জ্ঞান (التاريخ المؤكد): সাহাবাদের বর্ণনা থেকে জানা যে কোন আয়াতটি মক্কায় এবং কোনটি মদিনায় হিজরতের শেষভাগে নাজিল হয়েছে।
- সাহাবায়ে কেরামের সর্বসম্মত ইজমা (الإجماع): কোনো একটি বিধানের ব্যাপারে সমগ্র সাহাবাদের সর্বসম্মত ঐকমত্য থাকা যে এটি পরবর্তী বিধান দ্বারা পরিবর্তিত হয়েছে।
৮- عرف الإعجاز لغة واصطلاحا- ثم بين موقف أهل السنة والمعتزلة من إعجاز القرآن الكريم-
[الإعجاز এর আভিধানিক ও পারিভাষিক পরিচয় দাও। ইজাজুল কুরআন বিষয়ে আহলুস সুন্নাহ ও মুতাযিলার দৃষ্টিভঙ্গি বর্ণনা কর।] মান: ১৫
উত্তর:
ভূমিকা: আল-কুরআনের অলৌকিকত্ব বা মুজিজা হওয়া ইসলামি আকিদার অন্যতম মূল স্তম্ভ। এটি এমন এক গ্রন্থ যার সমকক্ষ কিছু রচনা করতে সমগ্র সৃষ্টি অপারগ।
১. ইজাযের আভিধানিক ও পারিভাষিক পরিচয়:
আভিধানিক অর্থ: ‘আজয’ (অক্ষমতা) থেকে ইজায, যার অর্থ অপরকে অক্ষম, পরাভূত বা পর্যুদস্ত করা।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: নবুওয়তের সত্যতা প্রমাণের জন্য সাধারণ প্রাকৃতিক নিয়মের বাইরে এমন এক অলৌকিক বিষয় উপস্থাপন করা, যা প্রতিপক্ষকে তার মোকাবিলা করতে সম্পূর্ণ অক্ষম করে দেয়।
২. আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের দৃষ্টিভঙ্গি (Mawqif Ahlus Sunnah):
আহলুস সুন্নাহর সর্বসম্মত অভিমত হলো—আল-কুরআন তার নিজস্ব সত্তা, অভ্যন্তরীণ ভাষাশৈলী, শব্দচয়ন, ব্যাকরণিক অনন্যতা ও ভাবগাম্ভীর্যের দিক থেকেই প্রত্যক্ষ মুজিজা। মানুষ স্বভাবগতভাবেই কুরআনের মতো এমন ঐশী গ্রন্থ রচনা করতে অক্ষম। কুরআনের অনুপম বাক্যগঠন, ধ্বনিমাধুর্য, অদৃশ্য জগতের নির্ভুল সংবাদ, বৈজ্ঞানিক সত্যতা এবং চিরন্তন আইনি ভারসাম্য—সবকিছু মিলিয়ে এটি সৃষ্টির মেধার চরমতম সীমার বাইরে এক অলৌকিক সত্তা।
৩. মুতাযিলা সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গি ও ‘সারফাহ’ তত্ত্ব (The Theory of Sarfah):
মুতাযিলাদের প্রখ্যাত নেতা ইব্রাহিম আন-নাজ্জাম এবং কিছু মুতাযিলা চিন্তাবিদ কুরআনের অলৌকিকত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ‘সারফাহ’ (الصرفة – ফিরিয়ে রাখা) নামক একটি বিভ্রান্তিকর মতবাদ উপস্থাপন করেন।
- সারফাহ তত্ত্বের মূল দাবি: তাদের মতে, মানুষ নিজস্ব ভাষাজ্ঞান দিয়ে কুরআনের মতো ভাষা রচনা করতে সক্ষম ছিল; কিন্তু যখনই কেউ কুরআনের মতো কিছু লিখতে চেয়েছে, আল্লাহ অলৌকিকভাবে তাদের মেধা ও চিন্তাশক্তিকে সেখান থেকে ‘ফিরিয়ে রেখেছেন’ (সারফাহ করেছেন) বা সাময়িকভাবে ছিনিয়ে নিয়েছেন। অর্থাৎ কুরআন নিজে মুজিজা নয়, বরং আল্লাহর মানুষকে বাধা দেওয়াটাই মুজিজা।
- আহলুস সুন্নাহ কর্তৃক সারফাহ মতবাদের খণ্ডন:
ইমাম বাকিল্লানী, ইমাম খাত্তাবী ও ইমাম সুয়ূতীসহ সকল সুন্নি ইমামগণ সারফাহ তত্ত্বকে বাতিল ও ভিত্তিহীন ঘোষণা করেছেন। কারণ:
- যদি সারফাহ সত্য হতো, তবে কুরআনের ভাষাশৈলী কোনো অনন্য মুজিজা হতো না; সাধারণ যেকোনো মানুষের লেখার ক্ষেত্রেও আল্লাহ বাধা দিলে তা মুজিজা হয়ে যেত।
- পবিত্র কুরআনে আল্লাহ মানুষকে চ্যালেঞ্জ করেছেন তাদের স্বাভাবিক মেধা দিয়ে চেষ্টা করার জন্য: “বলুন, যদি মানব ও জিন জাতি সবাই মিলে এই কুরআনের অনুরূপ আনার চেষ্টা করে, তবে তারা এর অনুরূপ আনতে পারবে না।” (সূরা বনি ইসরাইল: ৮৮)। এখানে মানুষের ভাষার অক্ষমতাই প্রমাণিত।
- আরবের সেরা সাহিত্যিকরা কুরআন শুনেই এর অলৌকিক ভাষা ও সাহিত্যের শ্রেষ্ঠত্বের কাছে মাথানত করেছিলেন, কোনো বুদ্ধিহীনতার কারণে নয়।
উপসংহার: আহলুস সুন্নাহর মতই সত্য ও বিশুদ্ধ; কুরআন তার অন্তর্নিহিত ভাষা, সাহিত্য ও তত্ত্বের দিক থেকেই চিরন্তন ও স্বতঃসিদ্ধ মুজিজা।
مجموعة (ب) [(ب) অংশ] – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন
الدرجات—٢٠ = ٤ × ٥ [মান— ৫ × ৪ = ২০] (যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও)
৯- ترتيب سور القرآن الكريم-
[কুরআনের সূরাসমূহের বিন্যাস।] মান: ৫
উত্তর:
সূরাসমূহের তারতীব বা বিন্যাস:
আল-কুরআনের ১১৪টি সূরার বর্তমান ধারাবাহিকতা (সূরা আল-ফাতিহা থেকে সূরা আন-নাস পর্যন্ত) জমহুর সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমগণের মতে সম্পূর্ণভাবে তাওকীফী (توقيفي) বা ওহীনির্ভর। জিবরাইল (আ.)-এর নির্দেশে রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতি রমজানে যেভাবে কুরআন পুনরাবৃত্তি করতেন, হুবহু সেই ক্রমে সূরাগুলো বিন্যস্ত হয়েছে। হযরত উসমান (রা.) সাহাবাদের সর্বসম্মত ইজমার ভিত্তিতে এই ক্রমানুসারেই একক মুসহাফ নকল করিয়ে মুসলিম বিশ্বে বিতরণ করেছিলেন।
১০- عرف الحديث القدسى بالمثال-
[উদাহরণসহ হাদিসে কুদসির সংজ্ঞা দাও।] মান: ৫
উত্তর:
হাদিসে কুদসির সংজ্ঞা (Hadith Qudsi):
‘কুদসি’ অর্থ পবিত্র। যে হাদিসের মূল বক্তব্য বা অর্থ সরাসরি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অন্তরে ওহী বা ইলহামের মাধ্যমে অবতীর্ণ হয়েছে, কিন্তু তার প্রকাশের শব্দ ও ভাষা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিজস্ব মানবীয় মুখনিঃসৃত, তাকে হাদিসে কুদসি বলে। এতে রাসুল (সা.) বলেন: “قَالَ اللهُ تَعَالَى” (আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন)।
উদাহরণ: রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন: “يَا عِبَادِي إِنِّي حَرَّمْتُ الظُّلْمَ عَلَى نَفْسِي وَجَعَلْتُهُ بَيْنَكُمْ مُحَرَّمًا فَلَا تَظَالَمُوا” অর্থাৎ “হে আমার বান্দারা! আমি জুলুমকে নিজের জন্য হারাম করেছি এবং তোমাদের পরস্পরের মধ্যেও একে হারাম করেছি; অতএব তোমরা একে অপরের ওপর জুলুম করো না।” (সহিহ মুসলিম)।
১১- أوضح تأويل قوله تعالى : إنا أنزلناه في ليلة مباركة، إنا كنا منذرين-
[إنا أنزلناه في ليلة مباركة، إنا كنا منذرين আয়াতের মর্ম স্পষ্ট কর।] মান: ৫
উত্তর:
আয়াতটির তাফসির ও মর্মার্থ (সূরা আদ-দুখান: ৩):
১. বরকতময় রাত (ليلة مباركة): জমহুর মুফাসসিরিনের (ইবনে আব্বাস, মুজাহিদ, কাতাদাহ প্রমুখ) সর্বসম্মত মতে, এই বরকতময় রাত হলো পবিত্র রমজান মাসের ‘লাইলাতুল কদর’ বা শবে কদর। কারণ আল্লাহ অন্য আয়াতে স্পষ্ট করেছেন: “নিশ্চয় আমি একে নাজিল করেছি লাইলাতুল কদরে” (সূরা কদর: ১) এবং “রমজান মাসে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে” (সূরা বাকারা: ১৮৫)। (ইকরিমা প্রমুখ থেকে এ রাতকে শবে বরাত বলা হলেও জমহুরের মতে এটি নিশ্চিতভাবে শবে কদর)।
২. অবতরণের মর্ম: লাওহে মাহফুজ থেকে প্রথম আসমানের ‘বায়তুল ইজ্জাহ’-তে সমগ্র কুরআন এককালীন অবতীর্ণ হওয়াকে বোঝানো হয়েছে।
৩. ‘ইন্না কুন্না মুনযিরীন’: আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে অন্ধকার, কুফর ও চিরন্তন জাহান্নামের আজাব থেকে সতর্ক করার জন্যই এই পরম বরকতময় ঐশী কুরআন নাজিল করেছেন।
১২- بين حكمة نزول القرآن الكريم بالتدريج-
[কুরআন কারীম ধীরে ধীরে অবতীর্ণ হওয়ার হিকমত বর্ণনা কর।] মান: ৫
উত্তর:
দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে পর্যায়ক্রমে কিস্তিতে কিস্তিতে (মুনাজ্জামান) কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার প্রধান ৪টি হেকমত:
- নবীজির অন্তরের দৃঢ়তা: কাফেরদের নিত্যনতুন বিরোধিতা ও সংকটে ওহী এসে রাসুল (সা.)-এর হৃদয়কে সান্ত্বনা ও অবিচলতা দান করত (সূরা ফুরকান: ৩২)।
- মুখস্থ ও অনুধাবনে সহজতা: উম্মি আরবদের পক্ষে এককালীন সম্পূর্ণ কিতাব মুখস্থ করা অসম্ভব ছিল; অল্প অল্প করে নাজিল হওয়ায় তা সহজে মুখস্থ ও আত্মস্থ হতো।
- বিধান প্রণয়নে পর্যায়ক্রমিক নীতি: মদ্যপান, জুয়া, ব্যভিচারের মতো দীর্ঘদিনের অভ্যাস ধাপে ধাপে সংস্কার করা এবং পর্যায়ক্রমে কঠিন বিধান চালু করা।
- তাৎক্ষণিক সমস্যার সমাধান: সাহাবা ও বিরোধীদের বিভিন্ন প্রশ্ন ও সমসাময়িক প্রেক্ষাপটের ঐশী মীমাংসা প্রদান।
১৩- مواقع النسخ-
[النسخ এর স্থানসমূহ।] মান: ৫
উত্তর:
ইসলামি শরীয়তের নীতি অনুসারে নাসখ বা বিধান প্রত্যাহার কেবল নির্দিষ্ট বিষয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য:
- আমলি শরীয়াহ আহকাম (الأحكام العملية): নামাজ, রোজা, কেবলা পরিবর্তন, ইদ্দত, বিবাহ, যুদ্ধ ও লেনদেন সংক্রান্ত পরিবর্তনশীল নির্দেশনাসমূহ।
- যেখানে নাসখ অসম্ভব:
- তাওহিদ, রিসালাত ও আখিরাতের মৌলিক আকিদা।
- অতীতের সত্য ঐতিহাসিক ঘটনাবলি ও ভবিষ্যৎবাণী (সংবাদ বা আখবার)।
- চিরন্তন শাশ্বত নৈতিক মূল্যবোধ (যেমন ইনসাফ, সত্যবাদিতা, মাতা-পিতার হক)।
১৪- أقسام التفسير-
[তাফসির এর প্রকারসমূহ।] মান: ৫
উত্তর:
ব্যাখ্যার পদ্ধতি ও উৎসের ওপর ভিত্তি করে তাফসির শাস্ত্রকে প্রধানত তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়:
- ১. তাফসির বিল-মাছুর (التفسير بالمأثور – রেওয়ায়েতভিত্তিক): যে তাফসির কুরআন দিয়ে কুরআন, রাসুল (সা.)-এর সহিহ হাদিস এবং সাহাবা ও তাবেয়ীদের বর্ণনার ভিত্তিতে করা হয়। (যেমন: তাফসিরে ইবনে কাসির, তাফসিরে তাবারী)। এটিই সর্বাধিক বিশুদ্ধ।
- ২. তাফসির বির-রায় (التفسير بالرأي – যুক্তিনির্ভর): শরীয়তের মূলনীতির আলোকে ভাষা, সাহিত্য ও গভীর ইজতিহাদের ভিত্তিতে প্রণীত তাফসির। (যেমন: তাফসিরে বায়যাবী, তাফসিরে কাবীর)। তবে মনগড়া রায়ভিত্তিক হলে তা সম্পূর্ণ হারাম।
- ৩. তাফসির বিল-ইশারাহ (التفسير الإشاري – আত্মিক সংকেতভিত্তিক): বাহ্যিক অর্থ অক্ষত রেখে সুফি সাধকগণের অন্তর্দৃষ্টি ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধির আলোকে সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা। (যেমন: তাফসিরে রুহুল মা’আনি)।
১৫- ما المراد بالإعجاز اللغوى؟
[الإعجاز اللغوى দ্বারা উদ্দেশ্য কী?] মান: ৫
উত্তর:
ভাষাগত বা অলঙ্কারশাস্ত্রীয় ইজায (Linguistic Inimitability):
আল-কুরআনের অনুপম শব্দচয়ন, ব্যাকরণিক নিখুঁত শৃঙ্খলা, অসাধারণ ধ্বনিমাধুর্য এবং গভীর অর্থদ্যোতকতার এমন এক অলৌকিক শৈলী, যার মোকাবিলা করতে তৎকালীন সমগ্র আরবের শীর্ষস্থানীয় কবি, সাহিত্যিক ও বাগ্মীরা চরমভাবে ব্যর্থ ও স্তব্ধ হয়েছিল—তাকেই আল-ইজায আল-লুগাবী ওয়াল বায়ানী বলে। পবিত্র কুরআন মানবীয় সাহিত্যের সকল সীমাবদ্ধতা ও ক্লান্তি থেকে মুক্ত এক চিরন্তন ঐশী সাহিত্যিক মুজিজা।
১৬- اكتب أسماء خمس مؤلفات في علوم القرآن-
[علوم القرآن বিষয়ে রচিত পাঁচটি গ্রন্থের নাম লেখ।] মান: ৫
উত্তর:
উলূমুল কুরআন বিষয়ে রচিত বিশ্বখ্যাত পাঁচটি প্রামাণ্য গ্রন্থ ও লেখকদের নাম:
- আল-বুরহান ফি উলূমিল কুরআন (البرهان في علوم القرآن): ইমাম বদরুদ্দীন মুহাম্মদ ইবনে বাহাদির যারকাশী (রহ.) [মৃ. ৭৯৪ হি.]।
- আল-ইতকান ফি উলূমিল কুরআন (الإتقان في علوم القرآن): ইমাম জালালুদ্দীন আব্দুর রহমান আস-সুয়ূতী (রহ.) [মৃ. ৯১১ হি.]।
- মাবাহিস ফি উলূমিল কুরআন (مباحث في علوم القرآن): শায়খ মান্না আল-কাত্তান (রহ.)।
- আল-তিবয়ান ফি উলূমিল কুরআন (التبيان في علوم القرآن): শায়খ মুহাম্মদ আলী আস-সাবূনী (রহ.)।
- মানাহিলুল ইরফান ফি উলূমিল কুরআন (مناهل العرفان في علوم القرآن): শায়খ মুহাম্মদ আব্দুল আজিম আজ-যুরক্বানী (রহ.)।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: ফাযিল ১ম বর্ষের আল মাদখালু ইলা উলূমিল কুরআন পরীক্ষার বিষয় কোড কত?
উত্তর: আল মাদখালু ইলা উলূমিল কুরআন বিষয়ের অফিসিয়াল বিষয় কোড হলো ২০১১০১ (201101)।
প্রশ্ন ২: ২০২২ সালের পরীক্ষায় কয়টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছিল?
উত্তর: ২০২২ সালের প্রশ্নপত্রে (الف) অংশ থেকে ৪টি এবং (ب) অংশ থেকে ৪টি—মোট ৮টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়।
প্রশ্ন ৩: আল-কুরআনের প্রথম অবতীর্ণ বাণী কোনটি?
উত্তর: সহিহ হাদিসের বিশুদ্ধতম বর্ণনানুসারে হেরা গুহায় অবতীর্ণ সূরা আল-আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াতই কুরআনের সর্বপ্রথম অবতীর্ণ ওহী।
প্রশ্ন ৪: ‘সারফাহ’ তত্ত্ব কী এবং এর ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহর অবস্থান কী?
উত্তর: মুতাযিলাদের দাবি ছিল মানুষ কুরআন রচনা করতে সক্ষম ছিল কিন্তু আল্লাহ তাদের বাধা দিয়েছেন; আহলুস সুন্নাহ একে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ঘোষণা করে প্রমাণ করেছেন যে কুরআন নিজস্ব সত্তায় অলৌকিক মুজিজা।
প্রশ্ন ৫: কুরআনের তাফসিরের প্রধান তিনটি ধারা কী কী?
উত্তর: কুরআনের তাফসির প্রধানত তিনটি ধারায় বিভক্ত: রেওয়ায়েতভিত্তিক তাফসির বিল-মাছুর, যুক্তিভিত্তিক তাফসির বির-রায় এবং আধ্যাত্মিক সংকেতভিত্তিক তাফসির বিল-ইশারাহ।
প্রশ্ন ৬: ২০২২ সালের এই প্রশ্ন সমাধানের বিশেষত্ব কী?
উত্তর: এতে ২০২২ সালের অফিসিয়াল প্রশ্নপত্রের প্রতিটি আরবি ইবারত ও বাংলা প্রশ্ন হুবহু অক্ষত রেখে প্রতিটি রচনামূলক ও সংক্ষিপ্ত প্রশ্নের প্রামাণ্য একাডেমিক উত্তর প্রদান করা হয়েছে।