ফাযিল (স্নাতক) সম্মান প্রথম বর্ষ পরীক্ষা, ২০২৩
আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বাংলা
বিষয় কোড: ২০ ১১ ০৪
সময়: ৪ ঘণ্টা | মান: ৮০
[দ্রষ্টব্য : ডান পাশের সংখ্যা প্রশ্নের পূর্ণমান জ্ঞাপক।]
ক বিভাগ
মান— ১০ × ২ = ২০
১। (ক) চর্যাপদের কবিদের সামাজিক ও ধর্মীয় অবস্থা বর্ণনা করো। মান: ১০
উত্তর:
ভূমিকা: বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আদিমতম প্রামাণ্য নিদর্শন হলো ‘চর্যাপদ’। মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯০৭ সালে নেপালের রাজদরবারের রয়েল লাইব্রেরি থেকে ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় রচিত বৌদ্ধ গান ও দোহা’ শিরোনামে এটি আবিষ্কার করেন। চর্যাপদের পদগুলো মূলত বৌদ্ধ সহজিয়া সিদ্ধাচার্যদের সাধন-সংগীত হলেও এর রূপকের অন্তরালে প্রাচীন বাংলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বাস্তব সমাজচিত্র ও ধর্মীয় জীবনাচরণ নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে।
১. চর্যাপদের কবিদের ধর্মীয় অবস্থা:
- সহজিয়া বৌদ্ধ দর্শন: চর্যাপদের রচয়িতা চব্বিশজন (মতান্তরে তেইশজন) সিদ্ধাচার্য মূলত সহজযান বা তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের অনুসারী ছিলেন। তাঁদের প্রধান লক্ষ্য ছিল শূন্যতা ও করুণার মিলনে ‘মহাসুখ’ (Great Bliss) বা পরম মোক্ষ লাভ করা।
- গুরুবাদ ও রূপক সাধনা: এঁদের সাধনা ছিল অত্যন্ত গোপনীয় ও গুরুমুখী। বাইরের মানুষের নিকট ধর্মতত্ত্ব গোপন রাখার জন্য তাঁরা ‘সান্ধ্য ভাষা’ বা আলো-আঁধারির প্রতীকী ভাষা ব্যবহার করতেন। যেমন—দেহের নাড়িগুলোকে গঙ্গা, যমুনা ও সরস্বতী নদীর সাথে এবং চিত্তকে নৌকার সাথে তুলনা করা হয়েছে।
- শাস্ত্রীয় আচার ও ব্রাহ্মণবাদের বিরোধিতা: চর্যাপদের কবিরা যাগযজ্ঞ, মূর্তি পূজা, জাতপাত ও অন্ধ আচার-অনুষ্ঠানের ঘোর বিরোধী ছিলেন। সরহপা তাঁর দোহায় ব্রাহ্মণদের যাগযজ্ঞ ও তীর্থযাত্রার তীব্র সমালোচনা করেছেন।
২. চর্যাপদের কবি ও সমকালের সামাজিক অবস্থা:
- প্রান্তিক ও অন্ত্যজ সমাজের প্রাধান্য: চর্যাপদের পদকর্তাগণ সমাজচ্যুত ও অবহেলিত অন্ত্যজ শ্রেণি—শবর, নিষাদ, ডোম, চণ্ডাল, কোল ও ব্যাধ সম্প্রদায়ের রূপকের মাধ্যমে নিজেদের প্রকাশ করেছেন। নগর জীবনের চেয়ে নদীমাতৃক বাংলার জঙ্গল, নদী ও পাহাড়ের প্রান্তবর্তী জীবনই এতে প্রধান। পদকর্তা ভুসুকুপা গর্ব করে বলেছেন: “আজি ভুসুকু বাঙ্গালী ভইলী” (আজ ভুসুকু খাঁটি বাঙালি হলো)।
- দারিদ্র্যপীড়িত সাধারণ মানুষের চিত্র: সাধারণ মানুষের চরম অভাব-অনটন ও খাদ্যাভাব চর্যার পদে অত্যন্ত করুণভাবে ধরা পড়েছে। কবি ঢেনঢনপা লিখেছেন: “টালত মোর ঘর নাহি পড়বেসী। হাঁড়িত ভাত নাহি নিতি আবেশী॥” (টিলার ওপর আমার ঘর, কোনো প্রতিবেশী নেই; হাঁড়িতে ভাত নেই, অথচ প্রতিদিন উপবাস বা অতিথি সমাগম)।
- পেশা ও জীবিকা: শিকার করা, নৌকায় যাত্রী পারাপার, তাঁত বোনা, বাঁশের ডালা ও চাটাই তৈরি, মদ তৈরি ও বিক্রি এবং মাছ ধরাই ছিল তৎকালীন মানুষের প্রধান পেশা। নৌকার বিভিন্ন অঙ্গ—গুণ, হাল, দাঁড় ও মাস্তুলের নিখুঁত বর্ণনা নদীকেন্দ্রিক পেশার সাক্ষ্য দেয়।
- বিবাহ ও সামাজিক উৎসব: ডোম ও শবর তরুণ-তরুণীদের প্রেম, যৌতুকহীন বিবাহ এবং ঢাক-ঢোল ও সানাই বাজিয়ে বিয়ের শোভাযাত্রার সুন্দর বর্ণনা রয়েছে (যেমন কাহ্নপার পদে)। নারীরা ময়ূরপুচ্ছ ও গুঞ্জাফলের মালা পরে সাজগোজ করত।
- আইন-শৃঙ্খলা ও চোর-ডাকাতের ভয়: রাতের অন্ধকারে চোরের উপদ্রব, গৃহস্থের অলংকার চুরি এবং রাজপুরুষ বা কোতোয়ালের ভয়ের উল্লেখ রয়েছে (“সসু ঘরে ঘালি কাঞ্চন চোড়ী”)।
উপসংহার: সংক্ষেপে বলা যায়, চর্যাপদ কেবল ধর্মীয় সাধনসঙ্গীত নয়; বরং এটি প্রাচীন বাংলার অবহেলিত, শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ ও জীবনসংগ্রামের প্রথম প্রামাণ্য সমাজ-ইতিহাস।
অথবা, (খ) টীকা লেখো : মান: ৫ + ৫ = ১০
(i) চণ্ডীদাস:
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের এক কালজয়ী ও রহস্যময় কবি হলেন চণ্ডীদাস। ‘চণ্ডীদাস সমস্যা’ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অত্যন্ত জটিল একটি বিতর্ক; কারণ বাংলা সাহিত্যে বড়ু চণ্ডীদাস, দ্বিজ চণ্ডীদাস ও দীন চণ্ডীদাস নামে অন্তত তিন বা ততোধিক কবির সন্ধান মেলে। এর মধ্যে পঞ্চদশ শতকে রচিত “শ্রীকৃষ্ণকীর্তন” কাব্যের রচয়িতা ‘বড়ু চণ্ডীদাস’ হলেন প্রাচীনতম ও প্রামাণ্য কবি। অন্যদিকে পদাবলী সাহিত্যের চণ্ডীদাস তাঁর গভীর মানবপ্রেম, আধ্যাত্মিক আর্তি ও রাধাকৃষ্ণের বিরহ বর্ণনায় বাংলা সাহিত্যকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন। তিনি সামাজিক বর্ণবাদের ঊর্ধ্বে উঠে মানবতার যে শাশ্বত বাণী ঘোষণা করেছেন, তা বিশ্বসাহিত্যে বিরল: “শুনহ মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।” রজকিনী রামীর সাথে তাঁর পবিত্র প্রেমও পদাবলীর অন্যতম প্রধান ভাববস্তু।
(ii) হানিফা-কায়রাপরাী:
মধ্যযুগের মুসলিম প্রণীত রোমান্টিক ও জঙ্গনামা ধারার অন্যতম প্রধান কাব্য হলো ‘হানিফা-কায়রাপরাী’। কবি শাহ বারিদ খান অথবা মধ্যযুগের পুঁথিকারদের দ্বারা রচিত এই কাব্যে ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রা.)-এর পুত্র মুহাম্মদ বিন হানাফিয়ার বীরত্বগাথা এবং পরীরাজ্যের কন্যা কায়রাপরাীর কাল্পনিক প্রেমের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটানো হয়েছে। মধ্যযুগে যুদ্ধবিগ্রহ ও রোমান্টিকতার সমন্বয়ে সাধারণ মানুষের চিত্তবিনোদনের জন্য এই জাতীয় আখ্যানকাব্য অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। এতে আরব-পারস্যের লোককাহিনির সাথে দেশীয় লোকসংস্কৃতি, ভৌগোলিক উপাদান এবং ইসলামি নীতিচেতনার চমৎকার সংমিশ্রণ ঘটেছে।
২। (ক) ‘কাজী নজরুল ইসলামের হাত ধরেই ধর্ম, দর্শন ও আধ্যাত্মিকতার মহামিলন ঘটেছে’—যুক্তিসহ বিশ্লেষণ করো। মান: ১০
উত্তর:
ভূমিকা: আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) বাংলা সাহিত্যের এমন এক বিরল মহীরুহ, যাঁর সৃষ্টিশীলতায় ধর্ম, দর্শন, সুফিবাদ ও মানবপ্রেমের অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। তিনি সংকীর্ণ ধর্মান্ধতার দেয়াল ভেঙে সাম্য ও আধ্যাত্মিকতার এক মহামিলনতীর্থ রচনা করেছেন।
১. ইসলামি রেনেসাঁ ও নবজাগরণ:
নজরুলই প্রথম আধুনিক বাংলা কবিতার রাজকীয় দরবারে ইসলামি ইতিহাস, ঐতিহ্য, কুরআন-হাদিসের পরিভাষা এবং সুফি দর্শনের সফল অনুপ্রবেশ ঘটান। তাঁর বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’, ‘শাত-ইল-আরব’, ‘খেয়াপারের তরণী’, ‘মোহররম’, ‘কোরবানী’ ও ‘খালেদ’ কবিতায় ইসলামের ত্যাগের দর্শন ও বিপ্লবী চেতনা ভাস্বর হয়ে উঠেছে। তিনি দেখিয়েছেন ইসলাম কোনো অলস ধর্মাচার নয়, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক চিরন্তন বিপ্লব।
২. ভক্তিগীতি ও আধ্যাত্মিকতার মহাসমন্বয়:
নজরুল একাধারে রচনা করেছেন কালজয়ী ইসলামি গান ও না’ত-ই-রাসুল, আবার অন্যদিকে রচনা করেছেন শ্যামাসংগীত ও ভজন। তিনি লিখেছেন:
- “ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ এলো রে দুনিয়ায়, আয় রে সাগর আকাশ বাতাস দেখবি যদি আয়।”
- “তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে, মধু পূর্ণিমারই সেথা চাঁদ দোলে।”
একই সাথে তিনি যখন হিন্দু দেব-দেবী ও অধ্যাত্ম দর্শনের মর্মবাণী গভীর শ্রদ্ধার সাথে রূপায়ণ করেন, তখন স্পষ্ট হয় যে তাঁর কাছে ঈশ্বর বা স্রষ্টা কোনো নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নন; তিনি অসীম ও প্রেমময়।
৩. মানবতাবাদী দর্শন ও সাম্যবাদ:
নজরুলের আধ্যাত্মিক দর্শনের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল ‘মানুষ’। মানুষের মাঝে তিনি স্রষ্টার নূর ও সত্তা প্রত্যক্ষ করেছেন। তিনি উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেন: “গাহি সাম্যের গান—মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।” ধর্মের নামে রক্তপাত ও মানুষে মানুষে বিভেদের বিরুদ্ধে তিনি লিখেছেন: “জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াত খেলছ জুয়া।”
৪. সুফিবাদ ও তাসাউউফ:
নজরুলের গজলগুলোতে পারস্যের সুফি কবি হাফিজ, রুমী ও ওমর খৈয়ামের মারেফাতি দর্শনের গভীর ছাপ বিদ্যমান। আত্মবিলুপ্তি (ফানা) ও পরম সত্যের সাথে মিলন (বাকা)-এর আকুলতা তাঁর বহু গজলে ফুটে উঠেছে।
উপসংহার: সুতরাং এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, কাজী নজরুল ইসলামের কাব্য ও সংগীতে ধর্মের সাম্প্রদায়িক রূপ মুছে গিয়ে তা সার্বজনীন মানবকল্যাণ, দার্শনিক উদারতা ও স্বর্গীয় আধ্যাত্মিকতায় রূপান্তরিত হয়েছে।
অথবা, (খ) বাংলা গদ্য বিকাশে সমসাময়িক মুসলিম সাহিত্যিকগণের সম্পাদিত পত্রিকার ভূমিকা মূল্যায়ন করো। মান: ১০
উত্তর:
ভূমিকা: উনিশ ও বিশ শতকে বাংলা গদ্যের আধুনিকায়ন এবং মুসলিম সমাজে নবজাগরণ, সাহিত্যচর্চা ও জাতীয় চেতনা বিকাশে মুসলিম সাহিত্যিকদের সম্পাদিত সাময়িকপত্র ও পত্র-পত্রিকাগুলোর ভূমিকা ছিল অপরিসীম ও ঐতিহাসিক।
প্রধান প্রধান সাময়িকপত্র ও গদ্য বিকাশে ভূমিকা:
- মীর মশাররফ হোসেন ও ‘হিতকরী’ (১৮৯০): কুষ্টিয়ার লাহিনীপাড়া থেকে প্রকাশিত এই পাক্ষিক পত্রিকায় মীর মশাররফ হোসেন প্রাঞ্জল, মার্জিত ও প্রমিত বাংলা গদ্যের চমৎকার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। লালন শাহের ওপর প্রথম প্রামাণ্য রচনা এই পত্রিকাতেই ছাপা হয়।
- মুজাম্মেল হক ও ‘মোসলেম ভারত’ (১৯২০): মোজাম্মেল হক এবং আফজালুল হকের যৌথ সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘মোসলেম ভারত’ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। কাজী নজরুল ইসলামের অমর সৃষ্টি ‘বিদ্রোহী’ কবিতা এবং বহু রোমান্টিক উপন্যাস ও চিন্তাশীল গদ্য প্রথম এই পত্রিকাতেই আত্মপ্রকাশ করে।
- মুহাম্মদ আকরম খাঁ ও ‘দৈনিক মোহাম্মদী’ / ‘মাসিক মোহাম্মদী’ (১৯২৭): মাওলানা মুহাম্মদ আকরম খাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত মোহাম্মদী পত্রিকা ছিল মুসলিম রেনেসাঁর প্রধান বাতিঘর। এতে ইসলামি সংস্কৃতি, কুরআন-হাদিসের বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা, ইতিহাস এবং যুক্তিনির্ভর গদ্যরীতির অসাধারণ চর্চা হতো।
- আবুল হোসেন, কাজী আব্দুল ওদুদ ও ‘শিখা’ (১৯২৭): ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর মুখপত্র ‘শিখা’ পত্রিকার মূলমন্ত্র ছিল—“জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।” এর মাধ্যমে ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’-এর সূচনা হয় এবং বিজ্ঞানমনস্ক, সংস্কারমুক্ত ও যুক্তিনির্ভর আধুনিক বাংলা মননশীল গদ্যের বিকাশ ঘটে।
- মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ও ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’ (১৯১৮): ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ও মোহাম্মদ মোজাম্মেল হকের এই পত্রিকা মুসলিম লেখকদের আধুনিক বাংলা সাহিত্যের মূলধারায় প্রতিষ্ঠিত করতে সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম জুগিয়েছিল।
উপসংহার: এসব পত্রিকার মাধ্যমেই মুসলিম সমাজে আরবি-ফারসি মিশ্রিত দো-ভাষী রীতির বদলে বিশুদ্ধ প্রমিত ও মননশীল বাংলা গদ্যের এক শক্তিশালী ঐতিহ্য গড়ে ওঠে।
খ বিভাগ
মান— ১০ × ২ = ২০
৩। (ক) “সত্যের তরে খোঁজ সব ঠাঁই
পূর্ব পশ্চিম কোনো ভেদ নেই।”
— লেখকের উক্ত ভাবনার তাৎপর্য তুলে ধরো। মান: ১০
উত্তর:
ভূমিকা: উদ্ধৃত চরণ দুটি প্রখ্যাত বহুভাষাবিদ ও জ্ঞানতাপস ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ রচিত চিন্তাশীল প্রবন্ধের এক শাশ্বত জ্ঞানদর্শন। এখানে লেখক জ্ঞান ও সত্যের সার্বজনীনতা এবং ভৌগোলিক সীমারেখার ঊর্ধ্বে উঠে সত্যকে গ্রহণের উদার মানবীয় আহ্বান জানিয়েছেন।
উক্ত ভাবনার তাৎপর্য বিশ্লেষণ:
- জ্ঞান ও সত্যের বিশ্বজনীনতা: সত্য কোনো নির্দিষ্ট ভূগোল, বর্ণ, জাতি বা ধর্মের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। জ্ঞান হলো সমগ্র মানবজাতির যৌথ উত্তরাধিকার। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: “الْحِكْمَةُ ضَالَّةُ الْمُؤْمِنِ فَحَيْثُ وَجَدَهَا فَهُوَ أَحَقُّ بِهَا” অর্থাৎ “জ্ঞান মুমিনের হারানো সম্পদ, যেখানেই সে তা পায়, সে-ই তার সর্বাধিক হকদার।” (তিরমিযী)।
- প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের প্রাচীর ভাঙা: লেখক বুঝিয়েছেন যে, প্রাচ্য যেমন আধ্যাত্মিকতা ও নৈতিকতার আলোকবর্তিকা বহন করে, পাশ্চাত্য তেমনি বিজ্ঞান, যুক্তি ও প্রযুক্তির নব নব দিগন্ত উন্মোচন করেছে। সত্য যদি পাশ্চাত্য থেকেও আসে তবে কেবল অন্ধ বিদ্বেষবশত তা বর্জন করা মূর্খতা।
- গোঁড়ামি ও অন্ধ কুসংস্কারের বিরোধিতা: মানব ইতিহাসের বিভিন্ন যুগে মানুষ যখনই সত্যের আগমনকে কেবল নিজ সমাজ বা ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চেয়েছে, তখনই সমাজ স্থবির ও অন্ধকারের অতলে তলিয়ে গেছে। মুক্তবুদ্ধির চর্চা করতে হলে সব ধরনের মানসিক সংকীর্ণতা ত্যাগ করতে হবে।
উপসংহার: লেখক এই চরণের মাধ্যমে প্রতিটি সত্যান্বেষী মানুষকে উন্মুক্ত হৃদয়ে পূর্ব ও পশ্চিমের শ্রেষ্ঠ সত্য ও কল্যাণকর জ্ঞান আহরণ করে আত্মিক ও জাতীয় অগ্রগতি সাধনের উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।
অথবা, (খ) “যে তৈল দিতে পারিবে তাহার বিদ্যা না থাকিলেও সে প্রফেসর হইতে পারে”— লেখকের এ উক্তির আলোকে আমাদের সমাজ বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরো। মান: ১০
উত্তর:
ভূমিকা: হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর বিখ্যাত ব্যঙ্গাত্মক ও সমাজসচেতন প্রবন্ধ “তৈল” থেকে উদ্ধৃত এই বাক্যটি আমাদের সমাজের চিরন্তন তোষামোদি সংস্কৃতি, অযোগ্যতার দাপট এবং মেধার অবমূল্যায়নের এক নির্মম ও তীক্ষ্ণ রূপ প্রকাশ করে।
সমাজ বাস্তবতার প্রেক্ষিতে উক্তির যথার্থতা:
- তোষামোদির অপ্রতিরোধ্য শক্তি: হরপ্রসাদ শাস্ত্রী অত্যন্ত রসাত্মক অথচ রূঢ় ভাষায় দেখিয়েছেন যে, সমাজে জ্ঞান, মেধা, শ্রম বা চরিত্রের চেয়েও শক্তিশালী অস্ত্র হলো ‘তৈল প্রদান’ বা চাটুকারিতা। তৈল হলো সর্বশক্তিমান—যা কঠিন হৃদয়কে নরম করে এবং অসাধ্য সাধন করে।
- মেধাশূন্য উচ্চপদ লাভ: বর্তমান বাস্তবতায়ও দেখা যায়, প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে যোগ্য, চরিত্রবান ও প্রকৃত গবেষক ব্যক্তিরা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হন; পক্ষান্তরে ক্ষমতাবানদের পা চাটা ও তৈলমর্দনকারী চাটুকাররা অতি দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশাসন ও করপোরেট জগতের শীর্ষ পদে আসীন হয়ে যায়।
- শিক্ষা ব্যবস্থার অবক্ষয়: শিক্ষা ও মেধার সর্বোচ্চ প্রতীক হলো অধ্যাপনা (প্রফেসর)। কিন্তু লেখক চরম শ্লেষের সাথে বলেছেন, যেখানে তৈল দিতে জানলে বিদ্যা না থাকলেও প্রফেসর হওয়া যায়, সেখানে জাতির মেরুদণ্ড যে কতটা নড়বড়ে হয়ে পড়েছে তা সহজেই অনুমেয়।
- সামাজিক ন্যায়ের বিনাশ: তেলবাজির সংস্কৃতির কারণে সমাজে সততা, আত্মমর্যাদাবোধ ও পেশাদারিত্বের চরম সংকট তৈরি হয়। সৎ মানুষেরা কোণঠাসা হয়ে পড়ে এবং অযোগ্যদের জয়জয়কার সমাজে নৈরাজ্য ডেকে আনে।
উপসংহার: হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর এই কালজয়ী উক্তিটি আজও আমাদের জাতীয় বিবেককে চাবুক মারে। চাটুকারিতার এই তৈলমর্দন বন্ধ করে মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে না পারলে কোনো জাতির পক্ষেই সভ্য হওয়া সম্ভব নয়।
৪। (ক) ‘সমাপ্তি’ গল্পের নায়িকা মৃন্ময়ী চরিত্র বিকাশে প্রকৃতির ভূমিকা তুলে ধরো। মান: ১০
উত্তর:
ভূমিকা: বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মনস্তাত্ত্বিক ছোটগল্প হলো ‘সমাপ্তি’। এ গল্পের প্রাণ ও কেন্দ্রীয় চরিত্র চঞ্চলমতি কিশোরী ‘মৃন্ময়ী’। নদীমাতৃক বাংলার অবাধ উন্মুক্ত প্রকৃতি কীভাবে মৃন্ময়ীর মনোজগৎকে গড়ে তুলেছে এবং পরবর্তীতে দাম্পত্যের বন্ধনে তার রূপান্তর ঘটিয়েছে, তা এ গল্পে অপূর্ব শৈল্পিক মহিমায় মূর্ত হয়েছে।
১. উন্মুক্ত প্রকৃতির সাথে মৃন্ময়ীর একাত্মতা:
মৃন্ময়ী গ্রামের চিরাচরিত শান্ত, গৃহকোণে আবদ্ধ বাঙালি মেয়েদের মতো নয়। সে ছিল বাধনহারা, বুনো ঝড়ের মতো উদ্দাম। গ্রামের বনবাদাড়, নদী, গাছগাছালি আর কাদামাটিই ছিল তার খেলার সঙ্গী। প্রকৃতি তাকে শিখিয়েছিল অবাধ স্বাধীনতা। ছেলেদের সাথে গাছে চড়া, নৌকায় চড়ে ঘুরে বেড়ানো এবং অবাধে ছুটে চলাই ছিল তার স্বভাব। লেখক তাকে প্রকৃতির কন্যা হিসেবেই চিত্রিত করেছেন।
২. কৃত্রিম সামাজিক অনুশাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ:
অপূর্বর সাথে যখন তার বিয়ে হয়, তখন বুনো হরিণীর মতো মৃন্ময়ীকে জোর করে শাড়ি পরিয়ে, গৃহবধূর গুরুগম্ভীর কর্তব্যের শৃঙ্খলে বাঁধার চেষ্টা করা হয়। এই কৃত্রিম পরিবেশ তার মুক্ত প্রকৃতির সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে। সে বিদ্রোহ করে, অলংকার ছুড়ে ফেলে, এমনকি গভীর রাতে জানালা দিয়ে পালিয়ে বাবার কাছে চলে যেতেও দ্বিধা করে না। প্রকৃতির সন্তান কখনো কৃত্রিম খাঁচায় পোষ মানতে চায় না।
৩. অন্তর্জগতের বিকাশ ও প্রেমের জাগরণ:
বিদ্রোহের পর যখন তাকে নির্জন ঘরে বন্দি করা হয় এবং অপূর্ব কলকাতায় চলে যায়, তখন মৃন্ময়ীর চঞ্চল মনের ভেতর এক নীরব বেদনা ও অনুভূতির জন্ম হয়। প্রকৃতির মতো তার মনও যেন ঝড়ের পর শান্ত হয়। সে বুঝতে পারে অপূর্ব তাকে কতটা নিঃশর্তভাবে ভালোবাসে। এই উপলব্ধির পর বুনো কিশোরী মৃন্ময়ী এক পরিণত, প্রেমময়ী ও আত্মনিবেদিত নারীতে রূপান্তরিত হয়।
উপসংহার: প্রকৃতির অবাধ মুক্তিই ছিল মৃন্ময়ীর প্রাথমিক সত্তা; আর সেই প্রকৃতির মতোই তার অন্তরের ভালোবাসাও ছিল খাঁটি, অকৃত্রিম ও নির্মল।
অথবা, (খ) “‘পাদটীকা’ গল্পের পণ্ডিত মশাই বর্তমান শিক্ষক সমাজের যোগ্য প্রতিনিধি” — তোমার মতামতসহ বিশ্লেষণ করো। মান: ১০
উত্তর:
ভূমিকা: কথাশিল্পী বনফুল (বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়) রচিত ‘পাদটীকা’ একটি ক্ষুদ্র অথচ অত্যন্ত গভীর সামাজিক তাৎপর্যপূর্ণ ছোটগল্প। গল্পে প্রতিফলিত পণ্ডিত মশাইয়ের চরিত্রটি আবহমান বাংলার স্বল্পবেতনের আদর্শবাদী, অথচ সমাজে চরম অবহেলিত ও কোণঠাসা শিক্ষক সমাজের এক জীবন্ত ও করুণ প্রতিচ্ছবি।
১. পণ্ডিত মশাইয়ের ত্যাগ ও আদর্শ:
পণ্ডিত মশাই ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান সংস্কৃত ও বাংলা শিক্ষক। স্বল্প বেতনে সারা জীবন তিনি শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের আলো বিতরণ করেছেন। কোনো পার্থিব লোভ-লালসা তাঁকে স্পর্শ করেনি। ছাত্রদের সাফল্যেই ছিল তাঁর একমাত্র তৃপ্তি ও গর্ব।
২. আত্মমর্যাদাবোধ ও চরম অবহেলা:
গল্পে দেখা যায়, পণ্ডিত মশাইয়ের এক প্রাক্তন ছাত্র সমাজে উচ্চপদস্থ রাজপুরুষ ও বিত্তবান হয়ে ওঠে। পণ্ডিত মশাই চরম অভাবের দিনেও কোনো আর্থিক সাহায্য চাইতে যাননি; গিয়েছিলেন কেবল নিজের রচিত একটি বইয়ের ভূমিকা বা পাদটীকায় ছাত্রের নামটি দেখার পরম স্নেহের টানে। কিন্তু আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজের চাকচিক্যে অন্ধ ছাত্রের কাছে শিক্ষকের কোনো কদর ছিল না। ছাত্রটি তাঁকে করুণা বা উপেক্ষা প্রদর্শন করে।
৩. বর্তমান শিক্ষক সমাজের সাথে সাদৃশ্য:
বর্তমান বাংলাদেশেও শিক্ষক সমাজের চিত্রটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক:
- বেসরকারি ও মাদ্রাসার শিক্ষকরা নামমাত্র বেতনে দিনাতিপাত করেন এবং দ্রব্যমূল্যের কষাঘাতে চরম আর্থিক অনিশ্চয়তায় ভোগেন।
- যে ছাত্ররা শিক্ষকদের হাত ধরে সুউচ্চ পদে আসীন হয়, ক্ষমতার দাপটে তারাই অনেক সময় শিক্ষকদের অসম্মান ও লাঞ্ছিত করতে দ্বিধা করে না।
- সমাজ শিক্ষকদের নিকট থেকে সর্বোচ্চ ত্যাগ ও সততা আশা করে, কিন্তু তাঁদের পরিবার ও মর্যাদার কোনো নিশ্চয়তা দেয় না।
উপসংহার: অতএব নিঃসন্দেহে বলা যায়, ‘পাদটীকা’ গল্পের পণ্ডিত মশাই কেবল একটি কাল্পনিক চরিত্র নন; বরং তিনি আমাদের অতীত ও বর্তমান অবহেলিত শিক্ষক সমাজের বাস্তব ও যোগ্য প্রতিনিধি।
গ বিভাগ
মান— ১০ × ২ = ২০
৫। (ক) শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতার আলোকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বরূপ বিশ্লেষণ করো। মান: ১০
উত্তর:
ভূমিকা: নাগরিক কবি শামসুর রাহমানের কালজয়ী কবিতা ‘স্বাধীনতা তুমি’। ১৯৭১ সালের অবরুদ্ধ স্বদেশভূমিতে রচিত এই কবিতায় স্বাধীনতা কেবল কোনো রাজনৈতিক ভৌগোলিক সীমারেখায় আবদ্ধ থাকেনি; বরং তা বাঙালির হাজার বছরের সাংস্কৃতিক আবেগ, দৈনন্দিন জীবনসংগ্রাম, প্রেম ও আত্মত্যাগের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে চিত্রিত হয়েছে।
স্বাধীনতার বহুমাত্রিক স্বরূপ:
- ঐতিহাসিক আত্মত্যাগের প্রতীক: কবি স্বাধীনতাকে দেখেছেন শহীদের রক্তের পবিত্র ফল্গুধারা হিসেবে। স্বাধীনতা হলো—“রবিঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান”, “কাজী নজরুলের ঝাঁকড়া চুলের দোদুল দোলনা” এবং “শহীদ মিনারে অমর একুশে ফেব্রুয়ারির উজ্জ্বল ভোর”।
- ধর্মীয় ও লোকজ সংস্কৃতির রূপায়ণ: স্বাধীনতাকে কবি অত্যন্ত পরম মমতায় গ্রামীণ ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের সাথে যুক্ত করেছেন। তিনি লিখেছেন: স্বাধীনতা হলো—“মক্তবের ছাত্রের সুন্দর কোরআন তেলাওয়াত”, “আন্ধা খঞ্জনের মিষ্টি গান”, “পুকুরঘাটে রমনীর এলোকেশে শীতল স্নান”। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের ধর্মবিশ্বাস ও লোকায়ত সংস্কৃতি স্বাধীনতায় পূর্ণতা পেয়েছে।
- কৃষক ও মেহনতি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা: স্বাধীনতা কেবল ধনীদের জন্য নয়। এটি হলো—“ফসলের মাঠে কৃষকের হাসিমুখ”, “রোদেলা দুপুরে মাঝির উদাস ভাটিয়ালি তান” এবং “রোদে পুড়ে ঘরে ফেরা শ্রমিকের তৃপ্তির নিঃশ্বাস”।
- যৌবনের দ্রোহ ও আগামীর সম্ভাবনা: স্বাধীনতা হলো তারুণ্যের বুক চিতিয়ে বুলেট বরণ করে নেওয়া এবং নতুন দিনের নতুন পতাকার জন্য অবিরাম সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া।
উপসংহার: কবির দৃষ্টিতে স্বাধীনতা কোনো অলীক স্বপ্ন নয়; স্বাধীনতা হলো প্রতিটি বাঙালির নিশ্বাস-প্রশ্বাস, ভালোবাসা, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সম্মানের সাথে বেঁচে থাকার চিরন্তন প্রেরণা।
অথবা, (খ) “কবি জীবনানন্দ দাশ প্রেম ও প্রকৃতির কবি”— ‘বনলতা সেন’ কবিতার আলোকে আলোচনা করো। মান: ১০
উত্তর:
ভূমিকা: আধুনিক বাংলা কবিতার বরপুত্র রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪)। তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ‘বনলতা সেন’ কবিতায় ইতিহাস-চেতনা, নিসর্গপ্রীতি এবং অতৃপ্ত মানবপ্রেমের যে অপার্থিব সমন্বয় ঘটেছে, তা বিশ্বকবিতার এক অনন্য সম্পদ।
১. প্রকৃতির রূপময় চিত্রায়ণ:
জীবনানন্দ দাশের কাব্যে প্রকৃতি কোনো জড় পদার্থ নয়, তা সজীব ও রক্তমাংসের সৌন্দর্যে ভরপুর। ‘বনলতা সেন’ কবিতায় প্রকৃতির উপমাগুলো অসাধারণ ও অভূতপূর্ব:
- “চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,” — নারীর কেশরাশির গভীরতাকে তিনি প্রাচীন ইতিহাসের অন্ধকারের সাথে তুলনা করেছেন।
- “মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য;” — প্রাচীন বৌদ্ধ সভ্যতার নান্দনিক ভাস্কর্যের রূপ ফুটে উঠেছে প্রিয়তমার মুখে।
- “সব পাখি ঘরে আসে—সব নদী—ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন;” — সন্ধ্যার নিঃশব্দ আগমনকে পাখিদের নীড়ে ফেরা ও নদীর মোহনায় মিলনের চিত্রকল্পে জীবন্ত করেছেন।
২. অনন্ত প্রেম ও পরম আশ্রয়ের অনুভূতি:
কবি হাজার বছর ধরে পৃথিবীর পথে পথে একা পরিভ্রান্ত পথিক হিসেবে ঘুরেছেন—সিংহল সমুদ্র থেকে মালয় সাগরের অন্ধকার পর্যন্ত। জীবনের এই ক্লান্তি, একাকীত্ব ও ধূসরতা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তিনি পরম আশ্রয়ের সন্ধান করেছেন। সেই পরম আশ্রয়ই হলেন ‘নাটোরের বনলতা সেন’। যিনি পাখির নীড়ের মতো প্রশান্ত দুটি চোখ তুলে কবিকে পরম মমতায় জিজ্ঞেস করেছিলেন: “এতদিন কোথায় ছিলেন?”
উপসংহার: বনলতা সেন কেবল একটি রক্তমাংসের মানবী নন; তিনি প্রকৃতি, প্রেম ও অনন্তকালের নিঃসঙ্গ মানুষের একমাত্র শান্তির নীড়। এভাবেই প্রেম ও প্রকৃতির অবিভাজ্য রূপায়ণে জীবনানন্দ দাশ বাংলা সাহিত্যে চিরভাস্বর হয়ে আছেন।
৬। (ক) “‘বলাকা’ কবিতায় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মিক ও দার্শনিক তত্ত্বের চমকপ্রদ সংযোগ ঘটেছে”—যুক্তিসহ বিশ্লেষণ করো। মান: ১০
উত্তর:
ভূমিকা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী কাব্যগ্রন্থ ‘বলাকা’ (১৯১৬)। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে রচিত এই কাব্যে কবির দৃষ্টি শান্ত নিস্তরঙ্গ ভক্তিবাদের গণ্ডি পেরিয়ে জগতের চিরন্তন গতিশীলতা ও বিবর্তনবাদী দর্শনে রূপান্তরিত হয়। ‘বলাকা’ কবিতায় একঝাঁক উড়ন্ত হাঁসের ডানার শব্দ কবির অন্তরে মহাজাগতিক গতির বিস্ময় জাগিয়ে তোলে।
১. হেনরি বার্গসোর ‘গতিবাদ’ ও রবীন্দ্রদর্শন:
ফরাসি দার্শনিক হেনরি বার্গসোর (Henri Bergson) প্রাণশক্তি ও গতিবাদের (Élan Vital) প্রভাব এ কবিতায় লক্ষণীয়। কবি অনুভব করেছেন সমগ্র সৃষ্টি এক অবিরাম বহমান স্রোত। স্থির পাহাড়, স্তব্ধ গাছপালা বা আকাশের তারা—বাইরে থেকে স্থির মনে হলেও তাদের ভেতরে ভেতরে চলছে অসীমের পানে এক অনন্ত যাত্রা।
২. বলাকার ডানায় মহাজাগতিক ডাক:
ঝিলম নদীর সন্ধ্যায় যখন বুনো হাঁসের দল আকাশে ডানা মেলে উড়ে যায়, তখন তাদের পাখার শব্দ কবির কাছে মনে হয় সৃষ্টির শাশ্বত বাণী: “হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে।” পাখিগুলোর ওড়া যেন নিখিল সৃষ্টির অন্তর্নিহিত আকুলতাকে প্রকাশ করে।
৩. আত্মিক রূপান্তর ও বৈজয়ন্তী পাখা:
বাইরের প্রকৃতির এই গতিবেগ কবির নিজের আত্মিক সত্তাকে নাড়া দেয়। কবি নিজের অন্তরের ভেতর লক্ষ লক্ষ ডানার স্পন্দন শুনতে পান: “শুনিতেছি আমি এই নিস্তব্ধের তলে / শূন্যে জলে স্থলে / বুনো হাঁসের পাখা… আকাশে পাখার সুর যেন বলে— / ‘হেথা নয়, হেথা নয়, আর কোনোখানে’।”
উপসংহার: জড়তা ও স্থবিরতার অবসান ঘটিয়ে চিরনতুনের অভিযাত্রী হওয়াই বলাকা কবিতার মূল আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক শিক্ষা।
অথবা, (খ) ‘উমর ফারুক’ কবিতা অবলম্বনে হযরত উমরের সাম্য ও মানবতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরো। মান: ১০
উত্তর:
ভূমিকা: জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ‘উমর ফারুক’ বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য মহাকাব্যিক কবিতা। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ফারুক (রা.)-এর আপসহীন ন্যায়বিচার, প্রজাবাৎসল্য এবং চরম আত্মত্যাগের মাধ্যমে যে সাম্য ও মানবতার অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছিল, কবি তা গভীর ভক্তিতে এঁকেছেন।
হযরত উমর (রা.)-এর সাম্য ও মানবতার দিকসমূহ:
- জেরুজালেম সফরের ঐতিহাসিক সাম্য: জেরুজালেমের চাবি গ্রহণের দীর্ঘ সফরে হযরত উমর (রা.) ও তাঁর ভৃত্য একটিমাত্র উটের পিঠে পালাক্রমে চড়েছিলেন। যখন শহরের প্রবেশদ্বারে পৌঁছালেন, তখন ছিল ভৃত্যের চড়ার পালা। খলিফা উটের রশি ধরে হেঁটে শহরে ঢুকলেন আর ভৃত্য রইল উটের পিঠে। সাম্যের এমন দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে দ্বিতীয়টি নেই। কবি লিখেছেন: “উটের পিঠেতে চড়িয়া উমর চালিছে একা সে প্রান্তর ধরি… ভৃত্যেরে বলে, উঠ উটে ভাই, রশি ধরি আমি হাঁটি।”
- রাতের আঁধারে প্রজার খোঁজ: অর্ধ-পৃথিবীর শাসক হয়েও তিনি রাতে ছদ্মবেশে মদিনার অলিতে-গলিতে ঘুরে অনাহারী মানুষের খোঁজ নিতেন। ক্ষুধার্ত এতিম শিশুদের কান্নার শব্দ শুনে তিনি বায়তুল মাল থেকে আটার বস্তা নিজের পিঠে বহন করে এনে নিজ হাতে রুটি বানিয়ে খাইয়েছিলেন।
- আইনের দৃষ্টিতে আমির ও ফকিরে সমতা: বিচারে তিনি ছিলেন বজ্রের মতো কঠোর। নিজ পুত্র যদি অপরাধ করত তবে তার শাস্তি বিধানেও তিনি দ্বিধা করতেন না। নিজের জন্য সাধারণ সৈনিকের চেয়ে এক ইঞ্চি বেশি কাপড়ও বায়তুল মাল থেকে গ্রহণ করতেন না।
উপসংহার: উমর ফারুক (রা.)-এর আদর্শ ছিল শোষণহীন ও সাম্যবাদী সমাজের মূর্ত প্রতীক, যা আধুনিক বিশ্বের রাষ্ট্রনায়কদের জন্য এক অনুকরণীয় বাতিঘর।
ঘ বিভাগ – ব্যবহারিক ব্যাকরণ ও নির্মিতি
মান— ৫ × ৪ = ২০ (যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও)
৭। (ক) বাংলা ভাষা কাকে বলে? ইসলামের দৃষ্টিতে ভাষার গুরুত্ব ও তাৎপর্য বর্ণনা করো। মান: ৫
উত্তর:
বাংলা ভাষার সংজ্ঞা: মনের ভাব প্রকাশের জন্য মানুষ বাকযন্ত্রের সাহায্যে যে অর্থপূর্ণ ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টি উচ্চারণ করে, তাকে ভাষা বলে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, যে ভাষা অঞ্চলভেদে বাংলা ভূখণ্ডের জনগণের মাতৃভাষা এবং যা মাগধী প্রাকৃত ও অপভ্রংশের মধ্য দিয়ে আজকের আধুনিক রূপ লাভ করেছে, তাকে বাংলা ভাষা বলে।
ইসলামের দৃষ্টিতে ভাষার গুরুত্ব ও তাৎপর্য:
- ভাষা মহান আল্লাহর কুদরত: আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্যকে তাঁর শ্রেষ্ঠ নিদর্শন ঘোষণা করেছেন: “আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য।” (সূরা আর-রূম: ২২)।
- মাতৃভাষার মর্যাদা: আল্লাহ যুগে যুগে সকল নবীকে তাঁদের নিজ নিজ কওমের মাতৃভাষায় আসমানি কিতাব পাঠিয়েছেন (সূরা ইব্রাহিম: ৪)। অতএব মাতৃভাষা চর্চা করা ও তার মর্যাদা রক্ষা করা ঈমানি দায়িত্বের অংশ।
(খ) ভাষার রূপতাত্ত্বিক শ্রেণিভিন্যাস বলতে কী বুঝ? উদাহরণসহ বর্ণনা করো। মান: ৫
উত্তর:
ভাষার রূপতাত্ত্বিক শ্রেণিভিন্যাস (Morphological Classification of Languages):
শব্দের অভ্যন্তরীণ গঠন, প্রত্যয়, বিভক্তি ও রূপমূলের সংযোগরীতির ভিত্তিতে পৃথিবীর ভাষাগুলোকে যে বৈজ্ঞানিক শ্রেণিতে ভাগ করা হয়, তাকে রূপতাত্ত্বিক শ্রেণিবিভাগ বলে। এটি মূলত দুই প্রধান ধারায় বিভক্ত:
- ১. অবিভক্তিক বা একাক্ষর ভাষা (Isolating / Monosyllabic Languages): যে ভাষায় শব্দের সাথে কোনো প্রত্যয় বা বিভক্তি যুক্ত হয় না; শব্দগুলো অপরিবর্তিত থাকে এবং বাক্যে অবস্থানের মাধ্যমে অর্থ প্রকাশ পায়। যেমন: চীনা ভাষা, তিব্বতি ভাষা।
- ২. বিভক্তিক বা সংশ্লেষাত্মক ভাষা (Affixing Languages): যে ভাষায় মূল ধাতুর সাথে প্রত্যয় ও বিভক্তি যুক্ত হয়ে নতুন রূপ তৈরি হয়। এর মধ্যে রয়েছে:
- সংযোগমূলক বা সংশ্লিষ্ট (Agglutinative): তুর্কি ও জাপানি ভাষা।
- বিভক্তিমূলক (Inflectional): যেখানে ধাতু ও বিভক্তি অবিভাজ্যভাবে মিশে যায়। যেমন: সংস্কৃত, আরবি ও বাংলা ভাষা (যেমন: কর + ছিল + াম = করছিলাম)।
(গ) প্রমিত বাংলা বানানে অতৎসম শব্দের ৪টি নিয়ম উদাহরণসহ লেখো। মান: ৫
উত্তর:
বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম অনুসারে তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি (অতৎসম) শব্দের ৪টি প্রধান নিয়ম:
- ই-কারের ব্যবহার: সকল অতৎসম শব্দে সর্বদা হ্রস্ব-ই (ি) কার হবে; দীর্ঘ-ঈ (ী) কার হবে না। যেমন: বাড়ি, শাড়ি, গাড়ি, চাবি, দিঘি, কেরানি, সরকারি।
- উ-কারের ব্যবহার: সকল অতৎসম শব্দে সর্বদা হ্রস্ব-উ (ু) কার ব্যবহৃত হবে; দীর্ঘ-ঊ (ূ) কার হবে না। যেমন: চুন, ধুলো, মুলো, টুপি, আলু।
- ণ-ত্ব বিধান বর্জন: অতৎসম শব্দে কখনো মূর্ধন্য-ণ (ণ) হবে না, সর্বদা দন্ত্য-ন (ন) হবে। যেমন: কান, কোরআন, ইরান, কেরানি, গ্যারান্টি।
- ষ-ত্ব বিধান বর্জন: অতৎসম শব্দে মূর্ধন্য-ষ (ষ) লেখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ; কেবল তালব্য-শ (শ) বা দন্ত্য-স (স) হবে। যেমন: স্টেশন, মাস্টার, পুলিশ, জিনিস, নাশতা।
(ঘ) বিরামচিহ্নের যথাযথ প্রয়োগ না ঘটলে কীভাবে বাক্যের অর্থ বদলে যায় দেখাও। মান: ৫
উত্তর:
বিরামচিহ্নের গুরুত্ব: বিরামচিহ্ন হলো বাক্যের অর্থকে সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন করার প্রধান সংকেত। একটি সাধারণ কমা (,) বা বিরামচিহ্নের স্থান পরিবর্তনের কারণে বাক্যের অর্থ সম্পূর্ণ বিপরীত ও ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে।
বাস্তব দৃষ্টান্ত:
- বাক্য ১: “এখানে প্রস্রাব করিবেন, না করিলে পঞ্চাশ টাকা জরিমানা।” (কমা ‘করিবেন’-এর পরে থাকায় অর্থ দাঁড়ায় প্রস্রাব করতে বলা হচ্ছে এবং না করলে জরিমানা হবে!)
- বাক্য ২: “এখানে প্রস্রাব করিবেন না, করিলে পঞ্চাশ টাকা জরিমানা।” (কমা ‘না’-এর পরে দেওয়ায় সঠিক আইনানুগ অর্থ প্রকাশ পেল যে প্রস্রাব করা নিষেধ)।
একইভাবে: “তাকে ধরো, মেরো না।” (দয়া প্রদর্শন) বনাম “তাকে ধরো না, মেরো।” (হত্যা করার নির্দেশ!)। সুতরাং বিরামচিহ্নের ভুল প্রয়োগে রক্ষক ভক্ষকে পরিণত হয়।
(ঙ) নিচের শব্দগুলোর সঠিক সন্ধিবিচ্ছেদ করো। (পাঁচটি) মান: ৫
উত্তর:
| প্রদত্ত শব্দ | সঠিক সন্ধিবিচ্ছেদ | সন্ধির প্রকার |
|---|---|---|
| মরূদ্যান | মরু + উদ্যান | স্বরসন্ধি (উ + উ = ঊ) |
| দুর্ঘটনা | দুঃ + ঘটনা | বিসর্গসন্ধি |
| প্রত্যূষ | প্রতি + ঊষ | স্বরসন্ধি (ই + ঊ = য-ফলা + ঊ) |
| দর্শক | দৃশ্ + অক | কৃৎপ্রত্যয়সাধিত সন্ধি |
| অন্বেষণ | অনু + এষণ | স্বরসন্ধি (উ + এ = ব-ফলা + এ) |
| মনোরম | মনঃ + রম | বিসর্গসন্ধি (ও-কার রূপ) |
| কুলটা | কুল + অটা | নিপাতনে সিদ্ধ স্বরসন্ধি |
(চ) নিচের শব্দগুলো ভুল হলে শুদ্ধরূপ লেখো : মান: ৫
উত্তর:
| অশুদ্ধ রূপ | বিশুদ্ধ প্রমিত রূপ | সংশোধনের কারণ |
|---|---|---|
| পৈত্রিক | পৈতৃক | ঋ-কার হবে (পিতৃ + ষ্ণিক) |
| মরীচীকা | মরীচিকা | প্রথমটি দীর্ঘ-ঈ, দ্বিতীয়টি হ্রস্ব-ই কার |
| নূন্যতম | ন্যূনতম | য-ফলায় দীর্ঘ-ঊ কার হবে |
| মনিষ্তি | মনীষী / মনীষা | দীর্ঘ-ঈ কার এবং মূর্ধন্য-ষ |
| অহোরাত্রি | অহোরাত্র | সমাজবদ্ধ পদে ‘রাত্র’ হয় |
| বিভিষিকা | বিভীষিকা | প্রথমটি হ্রস্ব-ই, দ্বিতীয়টি দীর্ঘ-ঈ কার |
| মুহুর্ত | মুহূর্ত | দ্বিতীয়টি দীর্ঘ-ঊ কার |
| প্রাণীবিদ্যা | প্রাণিবিদ্যা | সমাসবদ্ধ হলে ‘প্রাণী’র দীর্ঘ-ঈ হ্রস্ব-ই হয় |
| সত্ত্বা | সত্তা | ব-ফলা হবে না (অস্তিত্ব অর্থে সত্তা) |
| ইতিমধ্যে | ইতোমধ্যে | ও-কার যোগে শুদ্ধ রূপ ইতোমধ্যে |
(ছ) ভাবসম্প্রসারণ করো : মান: ৫
“স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন।”
উত্তর:
মূলভাব: রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও প্রাণের বিনিময়ে একটি জাতি দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে; কিন্তু সেই স্বাধীনতার সুফল ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া এবং অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের হাত থেকে স্বাধীনতাকে চিরকাল সুরক্ষিত রাখা বহুগুণ কঠিন ও দায়িত্বপূর্ণ কাজ।
ভাবসম্প্রসারণ: স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার। কোনো স্বৈরাচারী বা বিদেশি শাসক যখন একটি জাতির ওপর নির্যাতন চালায়, তখন সমগ্র জাতি ক্ষোভে ফেটে পড়ে। ঐক্যবদ্ধ জনতা অস্ত্র তুলে নিয়ে বীরদর্পে যুদ্ধ করে এবং চরম আত্মত্যাগের বিনিময়ে মাতৃভূমিকে স্বাধীন করে। এটি এককালীন বীরত্বপূর্ণ অধ্যায়।
কিন্তু স্বাধীনতা অর্জিত হলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; বরং আসল কঠিন সংগ্রাম শুরু হয় এর পর থেকে। যুদ্ধোত্তর দেশে খাদ্যাভাব, অর্থনৈতিক সংকট, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দলীয় সংকীর্ণতা স্বাধীনতার মূল চেতনাকে ধ্বংসের মুখে ফেলে দিতে পারে। অধিকন্তু পরাজিত শত্রু ও বহিঃশত্রুরা স্বাধীনতা নস্যাৎ করতে সর্বদা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকে। তাই স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে হলে প্রয়োজন—কঠোর জাতীয় ঐক্য, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, দুর্নীতির মূলোৎপাটন, সুবিচার কায়েম এবং সদা জাগ্রত দেশপ্রেম। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেছিলেন—”সাম্রাজ্য জয় করা সহজ, কিন্তু তা রক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন।” ঠিক তেমনি উদাসীনতা ও অসততার কারণে বহু জাতি স্বাধীনতা হারিয়ে পুনরায় পরাধীনতার গ্লানিতে নিমজ্জিত হয়েছে।
মন্তব্য: অতএব, স্বাধীনতাকে চিরস্থায়ী ও অর্থবহ করতে হলে আত্মতুষ্টির অবকাশ নেই; প্রতিটি নাগরিককে অতন্দ্র প্রহরীর মতো সততা ও শৃঙ্খলার সাথে দেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করতে হবে।
(জ) তোমার মাদ্রাসায় আরবি ভাষা শিক্ষা কোর্স চালু করার জন্য কর্তৃপক্ষের অনুমতি চেয়ে একটি আবেদনপত্র লেখো। মান: ৫
উত্তর:
তারিখ: ২০ অক্টোবর ২০২৩
বরাবর,
অধ্যক্ষ মহোদয়
দারুসসালাম কামিল মাদ্রাসা, ঢাকা।
বিষয়: আধুনিক স্পোকেন অ্যারাবিক (আরবি ভাষা শিক্ষা) কোর্স চালুর অনুমতি প্রার্থনা।
জনাব,
সবিনয় বিনীত নিবেদন এই যে, আমরা আপনার মাদ্রাসার ফাযিল (স্নাতক) প্রথম বর্ষের সাধারণ শিক্ষার্থীবৃন্দ। আপনি অবগত আছেন যে, আমাদের মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা কুরআন, হাদিস ও ফিকাহ শাস্ত্রে অত্যন্ত ভালো ফলাফল অর্জন করলেও ব্যবহারিক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের প্রাঞ্জল আরবি ভাষায় কথা বলা (المحادثة) ও আধুনিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে।
বর্তমান বিশ্বে মধ্যপ্রাচ্যসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহে দক্ষ আরবি ভাষা জানা গ্র্যাজুয়েটদের বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এমতাবস্থায়, নিয়মিত ক্লাসের পাশাপাশি সপ্তাহে দুই দিন ক্লাসোত্তর সময়ে অভিজ্ঞ শিক্ষক ও ল্যাঙ্গুয়েজ ল্যাবের সহায়তায় একটি বিশেষ “আধুনিক আরবি ভাষা শিক্ষা কোর্স” চালু করা হলে আমাদের শিক্ষার্থীরা একাডেমিক ও আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত উপকৃত হবে।
অতএব, মহোদয়ের নিকট আকুল প্রার্থনা, শিক্ষার্থীদের সার্বিক ভবিষ্যৎ ও ভাষাগত দক্ষতা বৃদ্ধির স্বার্থে মাদ্রাসায় উক্ত কোর্সটি অবিলম্বে চালুর অনুমতি ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করে বাধিত করবেন।
বিনীত নিবেদক,
ফাযিল ১ম বর্ষের শিক্ষার্থীবৃন্দের পক্ষে—
আব্দুল্লাহ আল-মামুন
রোল নম্বর: ১০১
দারুসসালাম কামিল মাদ্রাসা, ঢাকা।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: ফাযিল ১ম বর্ষের বাংলা পরীক্ষার বিষয় কোড কত?
উত্তর: বাংলা বিষয়ের অফিসিয়াল বিষয় কোড হলো ২০১১০৪ (201104)।
প্রশ্ন ২: ২০২৩ সালের প্রশ্নপত্রের ঘ বিভাগে ব্যাকরণের কোন কোন অংশ ছিল?
উত্তর: ঘ বিভাগে ভাষার সংজ্ঞা ও গুরুত্ব, রূপতাত্ত্বিক শ্রেণিবিভাগ, প্রমিত বানানের নিয়ম, বিরামচিহ্নের প্রয়োগ, সন্ধিবিচ্ছেদ, শব্দশুদ্ধি, ভাবসম্প্রসারণ ও আবেদনপত্র লিখন অন্তর্ভুক্ত ছিল।
প্রশ্ন ৩: চর্যাপদ কোন ছন্দে রচিত এবং এর প্রধান সুর কী?
উত্তর: চর্যাপদ মূলত মাত্রাবৃত্ত ছন্দের আদি রূপ পজঝটিকা ছন্দে রচিত এবং এর অন্তরালে বৌদ্ধ সহজিয়া সাধনার পাশাপাশি প্রাচীন বাংলার অন্ত্যজ মানুষের সমাজচিত্র ফুটে উঠেছে।
প্রশ্ন ৪: ‘স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা কঠিন’ ভাবসম্প্রসারণের মূল বাণী কী?
উত্তর: কেবল যুদ্ধের মাধ্যমে ভূখণ্ড স্বাধীন করাই যথেষ্ট নয়, বরং আইনের শাসন, অর্থনৈতিক মুক্তি ও ঐক্য ধরে রাখাই স্বাধীনতার স্থায়ী সুরক্ষার শর্ত।
প্রশ্ন ৫: প্রমিত বানানে অতৎসম শব্দে কোন ‘ন’ এবং ‘স’ ব্যবহৃত হয়?
উত্তর: অতৎসম শব্দে সর্বদা দন্ত্য-ন (ন) ব্যবহৃত হয় এবং মূর্ধন্য-ষ সম্পূর্ণ বর্জন করে কেবল তালব্য-শ বা দন্ত্য-স লেখা হয়।
প্রশ্ন ৬: এই প্রশ্নোত্তরে কি সব ঐচ্ছিক (অথবা) প্রশ্নের সমাধান রয়েছে?
উত্তর: হ্যাঁ, এতে ২০২৩ সালের প্রশ্নপত্রের প্রতিটি মূল ও অথবা (বিকল্প) প্রশ্ন এবং ব্যাকরণের সবগুলো শব্দের শতভাগ প্রামাণ্য উত্তর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।