অর্থনীতি ও ইসলামি অর্থনীতি (Economics and Islamic Economics) – 201106, আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪

StudyBoi StudyBoi
2026-09-22
৭৩ মিনিট পড়ার সময়
১ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন

ফাযিল (স্নাতক) সম্মান প্রথম বর্ষ পরীক্ষা, ২০২৪
আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
অর্থনীতি ও ইসলামি অর্থনীতি
বিষয় কোড: ২০ ১১ ০৬
সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০

[দ্রষ্টব্য : ডান পাশে উল্লিখিত সংখ্যা প্রশ্নের পূর্ণমান জ্ঞাপক। প্রত্যেক বিভাগ থেকে চারটি করে প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।]


ক বিভাগ – রচনামূলক প্রশ্ন

(যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও) | মান—১৫ × ৪ = ৬০


১। অর্থনীতির সংজ্ঞা দাও। অর্থনীতি পাঠের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা কর। ৫+১০=১৫

[Define the economics. Discuss the necessity of reading economics.]

উত্তর:

ভূমিকা: মানবজীবনের মূল চালিকাশক্তি হলো তার বহুমুখী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। অসীম অভাব এবং সীমিত সম্পদের মাঝে ভারসাম্য বিধান ও সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার বিজ্ঞানই হলো অর্থনীতি। মানবকল্যাণ ও সামাজিক অগ্রগতি সাধনে অর্থনীতির ভূমিকা অপরিসীম।

১. অর্থনীতির সংজ্ঞা (Definition of Economics):

অর্থনীতি শব্দটি ইংরেজি ‘Economics’ শব্দের প্রতিশব্দ, যা গ্রিক শব্দ ‘Oikonomia’ (Oikos অর্থ গৃহ এবং Nemein অর্থ পরিচালনা বা ব্যবস্থাপনা) থেকে উদ্ভূত হয়েছে। অর্থাৎ ব্যুৎপত্তিগত অর্থে অর্থনীতি হলো গার্হস্থ্য বা পারিবারিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিজ্ঞান।

বিভিন্ন যুগে প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদগণ অর্থনীতির বিভিন্ন সংজ্ঞা প্রদান করেছেন:

  • ক্লাসিক্যাল মতবাদ (অ্যাডাম স্মিথ): অর্থনীতির জনক অ্যাডাম স্মিথ (Adam Smith) ১৭৭৬ সালে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “An Inquiry into the Nature and Causes of the Wealth of Nations”-এ বলেছেন, “অর্থনীতি হলো এমন একটি বিজ্ঞান, যা জাতিসমূহের সম্পদের প্রকৃতি ও কারণ অনুসন্ধান করে।” অর্থাৎ তাঁর মতে অর্থনীতি হলো সম্পদের বিজ্ঞান (Science of Wealth)।
  • নব্য-ক্লাসিক্যাল মতবাদ (আলফ্রেড মার্শাল): ১৮৯০ সালে অধ্যাপক আলফ্রেড মার্শাল (Alfred Marshall) তাঁর “Principles of Economics” গ্রন্থে বলেন, “অর্থনীতি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ কার্যাবলি নিয়ে আলোচনা করে।” তাঁর মতে, এটি একদিকে সম্পদের অধ্যয়ন এবং অন্যদিকে মানবকল্যাণের অধ্যয়ন (Science of Material Welfare)।
  • আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত মতবাদ (লায়নল রবিন্স): ১৯৩২ সালে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের অধ্যাপক লায়নল রবিন্স (Lionel Robbins) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “An Essay on the Nature and Significance of Economic Science”-এ সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ও যুক্তিযুক্ত সংজ্ঞা দেন: “অর্থনীতি এমন একটি বিজ্ঞান যা মানুষের অসীম অভাব এবং বিকল্প ব্যবহারযোগ্য সীমিত সম্পদের মধ্যকার সম্পর্কযুক্ত মানবীয় আচরণ বিশ্লেষণ করে।” (Economics is the science which studies human behaviour as a relationship between ends and scarce means which have alternative uses.)

২. অর্থনীতি পাঠের প্রয়োজনীয়তা (Necessity of Reading Economics):

ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিটি ক্ষেত্রে অর্থনীতি পাঠের গুরুত্ব অপরিসীম। নিম্নে তা বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

  • অসীম অভাব ও সীমিত সম্পদের সমন্বয়সাধন: মানুষের অভাবের কোনো শেষ নেই, অথচ অভাব পূরণের উপকরণ বা সম্পদ সীমিত। সীমিত সম্পদ দ্বারা কীভাবে সর্বাধিক গুরুত্বসম্পন্ন অভাব আগে পূরণ করা যায়, তা অর্থনীতি পাঠের মাধ্যমে জানা যায়।
  • উৎপাদন ও সম্পদের দক্ষ বণ্টন: কী উৎপাদন করতে হবে, কীভাবে উৎপাদন করতে হবে এবং কার জন্য উৎপাদন করতে হবে—এসব মৌলিক অর্থনৈতিক সমস্যার বিজ্ঞানসম্মত সমাধান অর্থনীতি প্রদান করে।
  • পারিবারিক বাজেট প্রণয়ন ও সঞ্চয় বৃদ্ধি: পরিবারের আয়ের সাথে ব্যয়ের সামঞ্জস্য বজায় রেখে উপযুক্ত বাজেট প্রণয়ন, মিতব্যয়িতা অর্জন এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য সঞ্চয় ও বিনিয়োগের সঠিক দিকনির্দেশনা অর্থনীতি থেকে পাওয়া যায়।
  • বাজার ও মূল্য ব্যবস্থা সম্পর্কে জ্ঞান: বাজারে চাহিদা ও জোগানের পারস্পরিক ঘাত-প্রতিঘাতের মাধ্যমে কীভাবে পণ্যের দাম নির্ধারিত হয় এবং ক্রেতা ও বিক্রেতা কীভাবে পারস্পরিক সন্তুষ্টি অর্জন করে, তা বোঝা যায়।
  • সরকারের রাজস্ব ও বাজেট প্রণয়ন: সরকারের রাজস্ব আয় (কর ও কর-বহির্ভূত উৎস) এবং উন্নয়নমূলক ও অনুন্নয়নমূলক ব্যয় নির্ধারণ, করের হার নিরূপণ এবং জাতীয় বাজেট প্রণয়নে অর্থনীতি পাঠ অপরিহার্য।
  • মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্ব নিয়ন্ত্রণ: দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন বৃদ্ধি (মুদ্রাস্ফীতি) রোধ এবং দেশের যুবসমাজের বেকারত্ব দূরীকরণে উপযুক্ত আর্থিক ও রাজস্ব নীতি গ্রহণে অর্থনীতি পথ দেখায়।
  • আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা: আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য পরিচালনা, বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস, শুল্ক নির্ধারণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সুরক্ষায় অর্থনীতির গভীর জ্ঞান প্রয়োজন।
  • সামাজিক কল্যাণ ও বৈষম্য দূরীকরণ: সমাজে ধনী-দরিদ্রের মধ্যকার আয়বৈষম্য কমিয়ে ন্যায়ভিত্তিক সুষম সমাজ গঠনে অর্থনৈতিক সংস্কারের নীতি ও কলাকৌশল জানা যায়।

উপসংহার: সংক্ষেপে বলা যায়, কেবল আর্থিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা নয়, বরং যেকোনো দেশের সার্বিক টেকসই উন্নয়ন ও সুশাসন নিশ্চিত করতে প্রতিটি সচেতন নাগরিক ও নীতিনির্ধারকের জন্য অর্থনীতি অধ্যয়ন অপরিহার্য।


২। উপযোগ বলতে কী বুঝায়? ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধিটি সমালোচনাসহ ব্যাখ্যা কর। ৫+১০=১৫

[What do you mean by utility? Explain law of diminishing marginal utility with criticism.]

উত্তর:

ভূমিকা: ভোগ তত্ত্ব ও ভোক্তার আচরণ বিশ্লেষণের অন্যতম মৌলিক ধারণা হলো ‘উপযোগ’। কোনো দ্রব্য মানুষের অভাব পূরণ করতে পারলে তার মধ্যে উপযোগ সৃষ্টি হয়। একজন ভোক্তা একই দ্রব্য ক্রমাগত ভোগ করতে থাকলে তার অতিরিক্ত তৃপ্তি বা উপযোগ কীভাবে পরিবর্তিত হয়, তা ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধির মাধ্যমে বর্ণিত হয়।

১. উপযোগের ধারণা (Concept of Utility):

সাধারণ অর্থে উপযোগ বলতে কোনো দ্রব্যের উপকারিতা বা উপযোগিতাকে বোঝায়। কিন্তু অর্থনীতিতে উপযোগ একটি বিশেষ অর্থ বহন করে। অর্থনীতিতে কোনো দ্রব্য বা সেবার মানুষের অভাব মোচনের ক্ষমতাকেই উপযোগ (Utility) বলা হয়।

  • অধ্যাপক মার্শালের মতে, কোনো দ্রব্যের উপযোগ হলো সেই অভাব পূরণের ক্ষমতা যা ভোক্তা ওই দ্রব্য ভোগের মাধ্যমে অনুভব করে।
  • উপযোগ একটি মনস্তাত্ত্বিক ও আপেক্ষিক ধারণা। স্থান, কাল ও পাত্রভেদে একই দ্রব্যের উপযোগ ভিন্ন হতে পারে (যেমন: শীতপ্রধান দেশে গরম কাপড়ের উপযোগ গ্রীষ্মপ্রধান দেশের চেয়ে বহুগুণ বেশি)।
  • অর্থনীতিতে উপযোগের সাথে নীতি বা নৈতিকতার কোনো সম্পর্ক নেই। ক্ষতিকর দ্রব্য হলেও (যেমন ধূমপায়ীর কাছে সিগারেট) যদি তা ভোক্তার বিশেষ অভাব মেটায়, তবে অর্থনীতিতে তার উপযোগ বিদ্যমান হিসেবে গণ্য হবে।

২. ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধি (Law of Diminishing Marginal Utility):

জার্মান অর্থনীতিবিদ এইচ. এইচ. গসেন (H. H. Gossen) ১৮৫৪ সালে সর্বপ্রথম এই বিধিটির ধারণা দেন বলে একে ‘গসেনের প্রথম বিধি’ বলা হয়। পরবর্তীতে ১৮৯০ সালে অধ্যাপক আলফ্রেড মার্শাল বিধিটিকে পূর্ণাঙ্গ ও বিজ্ঞানসম্মত রূপ দেন।

বিধির মূল বক্তব্য: অন্যান্য অবস্থা স্থির থেকে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে একজন ভোক্তা যখন একটি নির্দিষ্ট দ্রব্যের বিভিন্ন একক ক্রমাগত ভোগ করতে থাকে, তখন ওই দ্রব্যের মোট উপযোগ (Total Utility – TU) বাড়লেও প্রতিটি অতিরিক্ত একক থেকে প্রাপ্ত প্রান্তিক উপযোগ (Marginal Utility – MU) ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে থাকে। একেই ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধি বলে।

প্রান্তিক উপযোগের সূত্র:
প্রান্তিক উপযোগ (MU) = মোট উপযোগের পরিবর্তন / ভোগের পরিমাণের পরিবর্তন = ΔTU / ΔQ

অনুমানসমূহ (Assumptions): বিধিটি কার্যকর হওয়ার জন্য নিম্নের শর্তগুলো বহাল থাকা আবশ্যক:

  1. ভোক্তার রুচি, পছন্দ, অভ্যাস ও আয় স্থির থাকবে।
  2. একটি নির্দিষ্ট সময় বিবেচ্য (সময়ের কোনো ব্যবধান ঘটবে না)।
  3. দ্রব্যের প্রতিটি একক সমজাতীয় ও অভিন্ন আকারের হতে হবে।
  4. দ্রব্যের প্রতিটি এককের দাম ও অর্থের প্রান্তিক উপযোগ স্থির থাকবে।
  5. ভোক্তা যুক্তিশীল (Rational) আচরণ করবে।
  6. উপযোগ সংখ্যাগতভাবে পরিমাপযোগ্য (১, ২, ৩ বা ইউটিলে)।

সূচির সাহায্যে ব্যাখ্যা (Tabular Presentation):

ভোগের একক (আপেল) মোট উপযোগ (TU) [টাকায়] প্রান্তিক উপযোগ (MU) [টাকায়] মন্তব্য
১ম একক ১০ ১০ ভোগ শুরু
২য় একক ১৮ ৮ MU হ্রাস পাচ্ছে
৩য় একক ২৪ ৬ MU আরও কমছে
৪র্থ একক ২৮ ৪ MU ইতিবাচক কিন্তু কম
৫ম একক ৩০ ২ তৃপ্তির প্রান্তসীমা
৬ষ্ঠ একক ৩০ ০ সর্বোচ্চ তৃপ্তি (পূর্ণ তৃপ্তির বিন্দু)
৭ম একক ২৮ -২ ঋণাত্মক উপযোগ (বিরক্তি)

সূচি বিশ্লেষণ ও জ্যামিতিক রেখাচিত্রের বর্ণনা: সূচি থেকে দেখা যায়, ভোক্তা যখন প্রথম আপেল ভোগ করে তখন তার উপযোগ ১০ টাকা। দ্বিতীয় ও তৃতীয় আপেল ভোগের সাথে সাথে তীব্রতা কমতে থাকায় প্রান্তিক উপযোগ যথাক্রমে ৮ ও ৬ টাকায় নেমে আসে। ষষ্ঠ এককে মোট উপযোগ যখন সর্বোচ্চ (৩০ টাকা), প্রান্তিক উপযোগ তখন শূন্য (০)। এরপরও জোর করে সপ্তম একক ভোগ করানো হলে তা উপযোগের পরিবর্তে বিরক্তি বা ঋণাত্মক উপযোগ (-২) সৃষ্টি করে। যদি ভূমি অক্ষে ভোগের পরিমাণ এবং লম্ব অক্ষে প্রান্তিক উপযোগ স্থাপন করে রেখা অঙ্কন করা হয়, তবে প্রান্তিক উপযোগ রেখাটি (MU Curve) বাম দিক থেকে ডান দিকে নিম্নগামী হয় এবং একপর্যায়ে ভূমি অক্ষ ছেদ করে নিচে নেমে যায়।

৩. বিধিটির সমালোচনা বা সীমাবদ্ধতা (Criticisms and Exceptions):

বাস্তব জীবনে বহু ক্ষেত্রে বিধিটি হুবহু কার্যকর হয় না। সমালোচকগণ এর নিম্নলিখিত সীমাবদ্ধতা নির্দেশ করেছেন:

  • এককের অপর্যাপ্ততা: ভোগের একক যদি অতি ক্ষুদ্র হয় (যেমন: তৃষ্ণার্ত ব্যক্তিকে পুরো গ্লাস পানির বদলে চামচ দিয়ে পানি পান করালে), তবে প্রান্তিক উপযোগ না কমে বরং বৃদ্ধি পায়।
  • সময়ের ব্যবধান: একই দিনে বিভিন্ন সময়ে ভোগ করলে উপযোগ কমে না। সকালে একটি চা খাওয়ার পর বিকেলে আরেকটি চা খেলে দ্বিতীয় চায়ের উপযোগ কম নাও হতে পারে।
  • শৌখিন ও দুর্লভ বস্তু: ডাকটিকিট, প্রাচীন মুদ্রা, দুর্লভ চিত্রকর্ম সংগ্রহের ক্ষেত্রে দ্রব্যের পরিমাণ যত বাড়ে, সংগ্রাহকের আগ্রহ বা প্রান্তিক উপযোগ তত বৃদ্ধি পায়।
  • অর্থের লিপ্সা ও কৃপণের আচরণ: অর্থের ক্ষেত্রে লোভের শেষ নেই। কৃপণ ব্যক্তির ধন-সম্পদ বৃদ্ধির সাথে সাথে অর্থের প্রতি তার আকর্ষণ বা প্রান্তিক উপযোগ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পায়।
  • অনুকরণপ্রিয়তা ও ফ্যাশন: সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তি বা বন্ধুবান্ধবের অনুকরণের ফলে কোনো দ্রব্যের ভোগের আগ্রহ সময়ের সাথে সাথে বেড়ে যেতে পারে।
  • মাদকাসক্তি: মদ বা নেশাজাতীয় দ্রব্যের ক্ষেত্রে পানকারী প্রতিবার অতিরিক্ত পানে আরও বেশি তৃপ্তি লাভ করে, ফলে প্রান্তিক উপযোগ হ্রাস পায় না।

উপসংহার: কতিপয় সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আধুনিক অর্থনীতিতে মূল্য তত্ত্ব, কর নির্ধারণ, ভোক্তার উদ্বৃত্ত এবং চাহিদা বিধি ব্যাখ্যায় ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধির তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক গুরুত্ব অনস্বীকার্য।


৩। ইসলামি অর্থনীতির সংজ্ঞা দাও। “ইসলামি অর্থনীতির উৎস যেখানে কুরআন ও হাদিস, আধুনিক অর্থনীতি সেখানে মানবপ্রসূত”— উক্তিটি ব্যাখ্যা কর। ৫+১০=১৫

[Give a definition of Islami Economics. “The sources of Islami Economics are the Quran and Hadith, where the modern economics in manmade”.—Explain the quote.]

উত্তর:

ভূমিকা: ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান (পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা)। মানবজীবনের অন্যান্য দিকের মতো অর্থনৈতিক জীবনকেও ইসলাম সুস্পষ্ট নির্দেশনা ও ঐশী কাঠামোর আওতায় পরিচালনা করেছে। আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ অর্থনীতির বিপরীতে ইসলামি অর্থব্যবস্থা নৈতিকতা, মানবকল্যাণ ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সমন্বয়ে গঠিত।

১. ইসলামি অর্থনীতির সংজ্ঞা (Definition of Islamic Economics):

ইসলামি অর্থনীতি হলো এমন একটি অর্থব্যবস্থা যা আল-কুরআন ও সুন্নাহর মৌলিক নীতিমালার আলোকে মানবজাতির ইহকালীন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং পরকালীন জবাবদিহিতা ও মুক্তির পথ নির্দেশ করে।

  • ড. মুহাম্মদ আব্দুল মান্নান-এর মতে: “ইসলামি অর্থনীতি হলো এমন একটি সামাজিক বিজ্ঞান, যা ইসলামের মূল্যবোধের আলোকে জনগণের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান ও কল্যাণ সাধন নিয়ে আলোচনা করে।” (Islamic economics is a social science which studies the economic problems of a people imbued with the values of Islam.)
  • অধ্যাপক খুরশীদ আহমদ-এর মতে: “ইসলামি অর্থনীতি মানবজাতির অর্থনৈতিক সমস্যাবলি এবং মানুষের অর্থনৈতিক আচরণকে ইসলামি মূল্যবোধ ও নীতিমালার আলোকে পদ্ধতিগতভাবে অধ্যয়নের প্রয়াস।”
  • এম. আকরাম খান-এর মতে: “ইসলামি অর্থনীতির মূল লক্ষ্য হলো মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ফালাহ (ইহকালীন ও পরকালীন সার্বিক কল্যাণ) অর্জনের উদ্দেশ্যে মানবীয় সম্পদের সুষ্ঠু বিন্যাস ও সদ্ব্যবহার বিশ্লেষণ করা।”

২. “ইসলামি অর্থনীতির উৎস যেখানে কুরআন ও হাদিস, আধুনিক অর্থনীতি সেখানে মানবপ্রসূত”—উক্তিটির বিশ্লেষণ:

উক্তিটি ইসলামি অর্থনীতি এবং আধুনিক প্রচলিত (পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক) অর্থনীতির মৌলিক দার্শনিক পার্থক্যের সারনির্যাস প্রকাশ করে। নিম্নে তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে উক্তিটির যথার্থতা নিরূপণ করা হলো:

(ক) মূল উৎসের তুলনামূলক বৈসাদৃশ্য:

  • ইসলামি অর্থনীতির ঐশী উৎস: ইসলামি অর্থনীতির প্রধান এবং অপরিবর্তনীয় উৎস হলো মহান আল্লাহর কালাম আল-কুরআন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ (হাদিস)। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: “আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।” (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)। কুরআন ও হাদিসের সাধারণ নীতিমালার ওপর ভিত্তি করে ইজমা ও কিয়াসের মাধ্যমে যুগোপযোগী সমকালীন সমস্যার সমাধান করা হয়। এটি নিখুঁত, চিরন্তন এবং মানবজাতির স্রষ্টার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।
  • আধুনিক অর্থনীতির মানবপ্রসূত উৎস: আধুনিক প্রচলিত পুঁজিবাদ বা সমাজতন্ত্র কোনো ঐশী প্রত্যাদেশের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়; বরং এগুলো মানুষের সীমিত বুদ্ধি, অনুমান, ব্যক্তিগত স্বার্থ ও ঐতিহাসিক বিবর্তনের ফসল। অ্যাডাম স্মিথ, ডেভিড রিকার্ডো, কার্ল মার্ক্স, জন মেনার্ড কেইনসের মতো মানবচিন্তাবিদদের ধ্যান-ধারণা থেকে আধুনিক অর্থনীতির উৎপত্তি। যেহেতু মানববুদ্ধি পরিবর্তনশীল ও ত্রুটিপূর্ণ, তাই তাদের প্রণীত তত্ত্বগুলোও কালে কালে পরিবর্তিত ও ত্রুটিযুক্ত প্রমাণিত হয়েছে।

(খ) মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি ও দর্শনের পার্থক্য:

  • সম্পদের মালিকানার ধারণা: ইসলামি বিশ্বাস মতে আসমান ও জমিনের যাবতীয় সম্পদের প্রকৃত ও একচ্ছত্র মালিক মহান আল্লাহ তাআলা (সূরা আল-মায়িদাহ: ১২০)। মানুষ কেবল আল্লাহর প্রতিনিধি (খলিফা) হিসেবে ওই সম্পদের আমানতদার। তাই সে যথেচ্ছভাবে সম্পদ অপচয় বা ক্ষতিকর কাজে ব্যবহার করতে পারে না। পক্ষান্তরে আধুনিক পুঁজিবাদ ব্যক্তিমালিকানাকে অবাধ ও স্বেচ্ছাচারী মনে করে এবং সমাজতন্ত্র ব্যক্তি স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে রাষ্ট্রকে একনায়কতান্ত্রিক মালিক বানায়।
  • নৈতিকতা ও অর্থনীতির সম্পর্ক: আধুনিক অর্থনীতি ধর্মনিরপেক্ষ ও মূল্যবোধহীন (Value-neutral)। সেখানে ন্যায়-অন্যায় বা হালাল-হারামের বাছবিচার নেই; মুনাফা অর্জন ও উপযোগ লাভই একমাত্র লক্ষ্য। কিন্তু ইসলামি অর্থনীতি সম্পূর্ণভাবে আখলাক ও শরীয়তের অনুশাসনের সাথে অবিচ্ছেদ্য। এখানে শোষণ, মজুতদারি, ধোঁকাবাজি, কালোবাজারি ও সুদের লেনদেন চিরতরে নিষিদ্ধ।
  • লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের বিশালতা: আধুনিক অর্থনীতির লক্ষ্য কেবল মানুষের বস্তুগত ও জাগতিক কামনার পরিতৃপ্তি। বিপরীতে ইসলামি অর্থনীতির পরম লক্ষ্য হলো ‘ফালাহ’ (Falah)—ইহকালীন শান্তি, ভারসাম্যপূর্ণ রিজিক এবং পরকালীন মুক্তি ও জান্নাত লাভ।
  • শোষণমুক্ত সামাজিক নিরাপত্তা বিধান: আধুনিক পুঁজিবাদ অবাধ প্রতিযোগিতার নামে দুর্বলকে পিষে ফেলে ধনীদের হাতে সম্পদ পুঞ্জীভূত করে। অন্যদিকে ইসলামি অর্থনীতি কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশে যাকাত, ওশর, সাদাকাহ ও সুদমুক্ত অর্থব্যবস্থার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করে। আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন: “যাতে ধন-সম্পদ কেবল তোমাদের ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না থাকে।” (সূরা আল-হাশর: ৭)।

উপসংহার: উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে এটি সুস্পষ্ট যে, মানবপ্রসূত আধুনিক অর্থব্যবস্থা মানবজাতির লোভ ও অবিচারের স্থায়ী সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়েছে; পক্ষান্তরে কুরআন ও সুন্নাহভিত্তিক ইসলামি অর্থব্যবস্থাই কেবল শোষণমুক্ত, ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।


৪। যাকাত কী? যাকাত বণ্টনের খাতসমূহ বিস্তারিত আলোচনা কর। ৫+১০=১৫

[What is Zakat? Discuss the sector of Zakat allocation in details.]

উত্তর:

ভূমিকা: ইসলামি অর্থব্যবস্থার মূল স্তম্ভ এবং সামাজিক নিরাপত্তার প্রধান হাতিয়ার হলো যাকাত। এটি ইসলামের পাঁচটি মৌলিক রুকনের অন্যতম। সমাজের বিত্তবানদের ধন-সম্পদ থেকে নির্দিষ্ট অংশ গ্রহণ করে অসহায় ও দুঃস্থদের মাঝে বিতরণের মাধ্যমে যাকাত অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে এবং সম্পদের পবিত্রতা নিশ্চিত করে।

১. যাকাতের পরিচয় ও সংজ্ঞা (Meaning and Definition of Zakat):

আভিধানিক অর্থ: যাকাত (الزكاة) একটি আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ হলো পবিত্রতা অর্জন করা, বৃদ্ধি পাওয়া, বরকত লাভ এবং পরিশুদ্ধ হওয়া। যাকাত প্রদানের ফলে দাতার অবশিষ্ট মাল পবিত্র হয় এবং অন্তরের কৃপণতা ও লোভ দূর হয়ে আত্মিক পরিশুদ্ধি ঘটে।

পারিভাষিক সংজ্ঞা: শরীয়তের পরিভাষায়, নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক কোনো সুস্থ, প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিমের পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হওয়ার পর তার উদ্বৃত্ত সম্পদের মধ্য থেকে নির্দিষ্ট হারে (সাধারণত শতকরা আড়াই ভাগ বা ২.৫%) আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত নির্দিষ্ট আটটি খাতে হকদারদের নিঃশর্ত মালিকানা প্রদান করাকে যাকাত বলে।

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বিরাশিবার সালাতের সাথে যাকাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন: “তোমরা সালাত কায়েম কর এবং যাকাত প্রদান কর।” (সূরা আল-বাকারা: ৪৩)।

২. যাকাত বণ্টনের খাতসমূহ (Sectors of Zakat Allocation):

যাকাতের অর্থ যেকোনো জনকল্যাণমূলক কাজে ইচ্ছামতো ব্যয় করা যায় না। মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের সূরা আত-তাওবার ৬০ নম্বর আয়াতে যাকাত বণ্টনের আটটি সুনির্দিষ্ট খাত ঘোষণা করেছেন:

পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ ۖ فَرِيضَةً مِّنَ اللَّهِ ۗ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ

“নিশ্চয় সাদাকাহ (যাকাত) কেবল অভাবগ্রস্ত (ফকির), নিঃস্ব (মিসকিন), যাকাত আদায়ের কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারী, যাদের মন জয় করা প্রয়োজন, দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি, আল্লাহর পথে (জিহাদে) এবং মুসাফিরদের জন্য। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত বিধান; আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।” (সূরা আত-তাওবা: ৬০)।

খাতগুলোর বিস্তারিত বিবরণ নিম্নে প্রদান করা হলো:

  1. ফকির বা অভাবগ্রস্ত (Al-Fuqara): যাদের সামান্য পরিমাণ সম্পদ বা জীবিকা আছে কিন্তু তা তাদের মৌলিক ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয় এবং তারা নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক নয়, তাদেরকে ফকির বলা হয়।
  2. মিসকিন বা চরম নিঃস্ব (Al-Masakin): যারা অত্যন্ত শোচনীয় দরিদ্র এবং যাদের নিজেদের জীবন ধারণের কোনো সম্বলই নেই, অথচ আত্মমর্যাদাবোধের কারণে মানুষের দ্বারে দ্বারে হাত পাততে পারে না, তারা মিসকিন। রাসুলুল্লাহ (সা.) এদেরকে প্রকৃত অভাবী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
  3. যাকাত আদায় ও ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত কর্মচারী (Al-Amilina Alayha): ইসলামি রাষ্ট্রে যাকাত সংগ্রহ, সংরক্ষণ, হিসাব রক্ষা ও বিতরণের সরকারি দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যাকাতের তহবিল থেকে পারিশ্রমিক বা বেতন প্রদান করা যাবে।
  4. চিত্তাকর্ষণের জন্য বা নওমুসলিম (Al-Mu’allafati Qulubuhum): ইসলামে সদ্য দীক্ষিত ব্যক্তিদের ঈমানের ওপর সুদৃঢ় রাখার জন্য অথবা অমুসলিমদের শত্রুতা প্রশমিত করতে ও ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য যাকাতের অর্থ প্রদান করা যায়।
  5. দাসমুক্তি বা বন্দিমুক্তি (Fi ar-Riqab): প্রাচীনকালে ক্রীতদাসদের মুক্ত করার জন্য এবং আধুনিক প্রেক্ষাপটে অন্যায়ভাবে বন্দি কোনো অসহায় মুসলিমকে মুক্ত করার কাজে এই খাত ব্যবহৃত হয়।
  6. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি (Al-Gharimin): যারা পারিবারিক জরুরি প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে বা কোনো দুর্ঘটনা ও সৎ ব্যবসায় লোকসান গুনে ঋণের বোঝায় জর্জরিত এবং নিজস্ব সম্পদ দিয়ে ঋণ পরিশোধে সম্পূর্ণ অক্ষম, তাদেরকে ঋণমুক্ত করার জন্য যাকাত দেওয়া যাবে।
  7. আল্লাহর পথে (Fi Sabilillah): আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা ও রক্ষার জন্য আত্মনিয়োগকারী মুজাহিদ, ইসলামি জ্ঞান অর্জনকারী ছাত্র-গবেষক এবং দাওয়াতি কাজের প্রসারে নিয়োজিত নিঃস্ব কর্মীদের সহায়তা প্রদান এই খাতের আওতাভুক্ত।
  8. মুসাফির বা অসহায় পথিক (Ibn as-Sabil): কোনো ব্যক্তি নিজ বাড়িতে বিত্তবান হলেও সফরের অবস্থায় যদি অর্থহীন বা বিপন্ন হয়ে পড়ে, তবে তাকে নিরাপদে বাড়ি ফিরে যাওয়ার উপযোগী অর্থ যাকাত থেকে সাহায্য করা ওয়াজিব।

উপসংহার: যাকাতের এই আটটি খাত বাস্তবায়নের মাধ্যমে ইসলামি অর্থব্যবস্থা সমাজে কোনো প্রকার বেকারত্ব, নিঃস্বতা ও শ্রেণি-সংঘাতের অবকাশ রাখে না; বরং ধনী ও দরিদ্রের মাঝে অটুট ভ্রাতৃত্ববোধ ও অর্থনৈতিক ইনসাফ কায়েম করে।


৫। ইসলামি ব্যাংক কী? ইসলামি ব্যাংকের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহ বর্ণনা কর। ৫+১০=১৫

[What is Islami Bank? Describe the aim and objectives of Islami Bank.]

উত্তর:

ভূমিকা: আধুনিক পুঁজিবাদী ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভিত্তি হলো শোষণমূলক সুদ (Riba)। এর বিকল্প হিসেবে বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে সুদমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক এবং কল্যাণধর্মী যে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের উন্মেষ ঘটে, তাকে ইসলামি ব্যাংক বলা হয়। ইসলামি ব্যাংক কেবল মুনাফা অর্জনের মাধ্যম নয়, বরং সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবকল্যাণ প্রতিষ্ঠার এক কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।

১. ইসলামি ব্যাংকের সংজ্ঞা (Definition of Islamic Bank):

ইসলামি ব্যাংক হলো এমন একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যার গঠনতন্ত্র, কর্মপদ্ধতি, তহবিল সংগ্রহ ও বিনিয়োগসহ যাবতীয় ব্যাংকিং কার্যক্রম ইসলামি শরীয়তের অনুশাসন অনুসারে পরিচালিত হয় এবং যা সম্পূর্ণভাবে সুদ পরিহার করে লাভ-লোকসানের অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে আমানত গ্রহণ ও বিনিয়োগ করে।

  • ইসলামি সম্মেলন সংস্থা (OIC)-এর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে: “ইসলামি ব্যাংক এমন একটি আর্থিক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, যা তার সমস্ত কার্যক্রম, সংবিধি এবং নিয়মাবলিতে স্পষ্টভাবে শরীয়াহ নীতি অনুসরণের বাধ্যবাধকতা স্বীকার করে এবং যেকোনো ধরনের লেনদেনে সুদের আদান-প্রদান কঠোরভাবে নিষিদ্ধ রাখে।”
  • সাধারণ ব্যাংকে ঋণগ্রহীতা ও ঋণদাতার সম্পর্ক সৃষ্টি হয়; কিন্তু ইসলামি ব্যাংকে ক্রেতা-বিক্রেতা বা মূলধনের অংশীদারিত্বের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়।

২. ইসলামি ব্যাংকের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহ (Aims and Objectives of Islamic Bank):

ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহ অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও মানবিক। নিম্নে তা বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

  • সুদ ও শোষণের মূলোৎপাটন: ইসলামি ব্যাংকের প্রধান লক্ষ্য হলো কুরআন ও হাদিস কর্তৃক ঘোষিত সর্বনাশা সুদের অভিশাপ থেকে সমাজ ও অর্থনীতিকে মুক্ত করা। নিশ্চিত ও নির্দিষ্ট সুদের পরিবর্তে লাভ-লোকসানের ঝুঁকি ভাগাভাগি করার মাধ্যমে আর্থিক ন্যায়বিচার কায়েম করা।
  • শরীয়তসম্মত হালাল বিনিয়োগ পরিচালনা: কেবল অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হলেই চলবে না, বরং বিনিয়োগকৃত ব্যবসা শরীয়তের দৃষ্টিতে হালাল ও নৈতিক হতে হবে। মদ, জুয়া, তামাক, পর্নোগ্রাফি বা অনৈতিক কোনো খাতে ইসলামি ব্যাংক কখনোই অর্থায়ন করে না।
  • সম্পদের সুষম বণ্টন ও সামাজিক ভারসাম্য: সমাজের কতিপয় ধনকুবেরের হাতে জাতীয় সম্পদ পুঞ্জীভূত হওয়ার প্রক্রিয়া ভেঙে দিয়ে সাধারণ মানুষ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও মেহনতি মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নে পুঁজি সরবরাহ করা।
  • মাকাসিদ আশ-শরীয়াহ (শরীয়তের উদ্দেশ্য) বাস্তবায়ন: ইসলামি শরীয়তের প্রধান পাঁচটি উদ্দেশ্য—দীন, জীবন, বুদ্ধি, বংশ এবং সম্পদের সুরক্ষা ও সমৃদ্ধি সাধন করা।
  • উৎপাদনশীল ও কর্মসংস্থানমূলক প্রকল্পে অর্থায়ন: অনুৎপাদনশীল খাত বা কৃত্রিম মুদ্রা বেচাকেনার বদলে বাস্তব অর্থনৈতিক পণ্য উৎপাদন, কৃষি ও শিল্প কারখানা সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।
  • মুদারাবা ও মুশারাকা পদ্ধতির প্রসার: ব্যাংকিং কার্যক্রমে অংশীদারিত্বমূলক পদ্ধতি—যেমন মুদারাবা (শ্রম ও মূলধনের অংশীদারিত্ব), মুশারাকা (যৌথ মূলধনী অংশীদারিত্ব), মুরাবাহা (লাভযুক্ত বিক্রয়) এবং ইজারা (ভাড়াভিত্তিক অর্থায়ন) পদ্ধতির মাধ্যমে বাস্তবভিত্তিক আর্থিক লেনদেন পরিচালনা করা।
  • যাকাত তহবিল ব্যবস্থাপনা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR): ব্যাংক নিজস্ব আয়ের ওপর যাকাত প্রদান করে এবং দরিদ্র কল্যাণ তহবিল (Sadakah/CSR Fund) গঠন করে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও দুর্যোগকালীন পুনর্বাসনে প্রত্যক্ষ অবদান রাখে।
  • উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও ক্ষুদ্র ঋণ সুবিধা: ইসলামি ব্যাংক দেশের দরিদ্র কিন্তু পরিশ্রমী তরুণ ও মহিলাদেরকে বিনা সুদে ক্ষুদ্র বিনিয়োগ (Micro-finance) এবং প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ দিয়ে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলে।

উপসংহার: মোটকথা, প্রচলিত বাণিজ্যিক ব্যাংকের মতো কেবল অর্থলিপ্সা নয়; বরং নৈতিক চেতনা ও পরকালীন জবাবদিহিতার মাধ্যমে জাতীয় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও জনগণের সার্বিক কল্যাণ অর্জনই ইসলামি ব্যাংকের চূড়ান্ত লক্ষ্য।


৬। বিমা কাকে বলে? প্রচলিত বিমা ইসলামসম্মত না হওয়ার কারণসমূহ আলোচনা কর। ৫+১০=১৫

[What is Insurance? Discuss why the Conventional Insurance is not acceptable to Islam.]

উত্তর:

ভূমিকা: মানবজীবন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে আকস্মিক ক্ষয়ক্ষতি, ঝুঁকি এবং অনিশ্চয়তা স্বাভাবিক ঘটনা। ভবিষ্যৎ দুর্যোগ মোকাবিলায় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার আধুনিক মাধ্যম হলো বিমা। তবে বর্তমান প্রচলিত বাণিজ্যিক বিমা ব্যবস্থা তার পরিচালন পদ্ধতি ও আর্থিক কাঠামোর কারণে ইসলামি শরীয়াহ নীতিমালার সাথে সাংঘর্ষিক।

১. বিমার সংজ্ঞা (Definition of Insurance):

বিমা হলো দুটি পক্ষের মধ্যে সম্পাদিত এমন একটি আইনগত চুক্তি, যেখানে এক পক্ষ (বিমা গ্রহীতা) নির্দিষ্ট পরিমাণ প্রিমিয়াম প্রদানের বিনিময়ে অপর পক্ষ (বিমা কোম্পানি) কোনো নির্দিষ্ট দুর্ঘটনা, ক্ষতি বা মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে নির্ধারিত পরিমাণ আর্থিক ক্ষতিপূরণ বা দাবি পরিশোধের লিখিত অঙ্গীকার প্রদান করে।

প্রচলিত বিমা মূলত দুই প্রকার: সাধারণ বিমা (অগ্নি, নৌ, দুর্ঘটনা ইত্যাদি) এবং জীবন বিমা।

২. প্রচলিত বিমা ইসলামসম্মত না হওয়ার কারণসমূহ (Why Conventional Insurance is Not Acceptable to Islam):

বিশ্ববিখ্যাত ইসলামিক ফিকহ একাডেমি (জেদ্দা, মক্কা ও আল-আজহার)-এর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুসারে প্রচলিত বাণিজ্যিক বিমা সম্পূর্ণভাবে ইসলামি শরীয়াহ পরিপন্থী ও হারাম। এর প্রধান কারণগুলো নিম্নে বিশদভাবে উল্লেখ করা হলো:

  1. আল-গারার (অনিশ্চয়তা বা ধোঁকা):

    ইসলামে এমন যেকোনো চুক্তি নিষিদ্ধ যেখানে লেনদেনের ফলাফল সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। বিমা চুক্তিতে গ্রাহক জানে না সে আদৌ কোনো ক্ষতিপূরণ পাবে কি না এবং কোম্পানিও জানে না কত টাকা দিতে হবে। যদি দুর্ঘটনা ঘটে তবে অল্প প্রিমিয়াম দিয়েই বিশাল অর্থ পাওয়া যায়, আর কোনো দুর্ঘটনা না ঘটলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিমা গ্রহীতার জমা দেওয়া অর্থ কোম্পানি গ্রাস করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) সুস্পষ্টভাবে প্রতারণাপূর্ণ বা অনিশ্চিত ক্রয়-বিক্রয় (বায় আল-গারার) নিষেধ করেছেন (সহিহ মুসলিম)।

  2. আল-মাইসির বা কিমার (জুয়া):

    প্রচলিত বিমার কাঠামো সম্পূর্ণভাবে জুয়ার সাদৃশ্যপূর্ণ। জুয়া খেলায় যেমন ভাগ্য অনুকূলে থাকলে অল্প ব্যয়ে প্রচুর অর্থ লাভ হয় এবং ভাগ্য প্রতিকূলে থাকলে পুরো অর্থ হারাতে হয়; প্রচলিত বিমাতেও ঠিক তেমনি দুর্ঘটনা ঘটলে অভাবনীয় লাভ এবং দুর্ঘটনা না ঘটলে জমাকৃত অর্থ বা অধিকার নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। কুরআন মাজিদে জুয়াকে শয়তানের অপবিত্র কাজ বলে ঘোষণা করা হয়েছে (সূরা আল-মায়িদাহ: ৯০)।

  3. আর-রিবা (সুদ):

    প্রচলিত বিমা ব্যবস্থায় তিন দিক থেকে সুদের অনুপ্রবেশ ঘটে:

    • রিবা আল-ফদল (অতিরিক্তের সুদ): গ্রাহক যে পরিমাণ অর্থ কিস্তিতে জমা দিল, ক্ষতিপূরণ বা মেয়াদান্তে তার চেয়ে বহু গুণ বেশি অথবা কম অর্থ গ্রহণ করল। সমজাতীয় আর্থিক মূল্যের অসম বিনিময় ইসলামে সুদ হিসেবে গণ্য।
    • রিবা আন-নাসিয়াহ (বিলম্বের সুদ): সময়ের ব্যবধানে অতিরিক্ত মুনাফা বা ক্ষতিপূরণ প্রদান করা সুদের স্পষ্ট রূপ।
    • সুদি বিনিয়োগ: বিমা কোম্পানিগুলো গ্রাহকদের নিকট থেকে সংগৃহীত প্রিমিয়ামের কোটি কোটি টাকা সুদি বন্ড, ট্রেজারি বিল ও সুদি বাণিজ্যিক ব্যাংকে খাটিয়ে সুদ অর্জন করে, যা সরাসরি হারাম।
  4. অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ (অযৌক্তিক শর্তাবলী):

    অনেক প্রচলিত জীবন বিমায় শর্ত থাকে যে নির্দিষ্ট সময়ের আগে প্রিমিয়াম দেওয়া বন্ধ করলে পলিসি বাতিল (Lapse) হয়ে যায় এবং গ্রাহক তার কষ্টার্জিত মূল টাকাও ফেরত পায় না। ইসলামে কারও সম্পদ স্বেচ্ছায় দান ব্যতীত বিনা ক্ষতিপূরণে বাজেয়াপ্ত করা সম্পূর্ণ অবৈধ (সূরা আন-নিসা: ২৯)।

  5. তাকাফুল—ইসলামি বিকল্প ব্যবস্থা:

    ইসলাম পারস্পরিক সহযোগিতা ও ক্ষতি ভাগাভাগির বিরোধী নয়; বরং ইসলাম ‘তাকাফুল’ (Takaful) নামে সম্পূর্ণ শরীয়তসম্মত বিকল্প উপহার দিয়েছে। তাকাফুল ব্যবস্থায় বিমা গ্রহীতাদের প্রিমিয়াম কোনো কোম্পানির লাভ নয়, বরং তা পারস্পরিক ‘তাবাররু’ (দান বা অনুদান তহবিল) হিসেবে গণ্য হয় এবং মুদারাবা বা ওয়াকালাহ পদ্ধতিতে সুদমুক্ত হালাল খাতে বিনিয়োগ করা হয়।

উপসংহার: সংক্ষেপে বলা যায়, প্রচলিত বাণিজ্যিক বিমায় সুদ, জুয়া ও তীব্র অনিশ্চয়তা বিদ্যমান থাকায় তা ইসলামে অগ্রহণযোগ্য। তবে মুসলিমানদের জন্য এই ঝুঁকির নিরাপত্তা অর্জনে তাকাফুল ব্যবস্থাপনাই শরীয়তসম্মত একমাত্র পথ।


খ বিভাগ – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন

(যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও) | মান—৫ × ৪ = ২০


৭। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা কাকে বলে? ৫

[What is capitalist economic system?]

উত্তর:

পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার সংজ্ঞা:

যে অর্থব্যবস্থায় উৎপাদনের উপাদানসমূহের ওপর ব্যক্তিগত মালিকানা প্রতিষ্ঠিত থাকে, সরকারি নিয়ন্ত্রণ ব্যতিরেকে স্বয়ংক্রিয় দাম ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় এবং অবাধ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জনই প্রধান লক্ষ্য হিসেবে কাজ করে, তাকে পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা (Capitalist Economic System) বা মুক্তবাজার অর্থনীতি বলে।

১৭৭৬ সালে অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথের লেসেজ ফেয়ার (Laissez-faire) বা ‘অবাধ বাণিজ্য’ নীতির ওপর ভিত্তি করে এই ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটে।

পুঁজিবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:

  • সম্পদ ও উৎপাদনের উপাদানের ওপর অবাধ ব্যক্তিমালিকানা।
  • সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জনের নিরঙ্কুশ প্রচেষ্টা।
  • স্বয়ংক্রিয় দাম ব্যবস্থা (চাহিদা ও জোগানের ঘাত-প্রতিঘাতে দাম নির্ধারণ)।
  • ভোক্তার সার্বভৌমত্ব ও অবাধ প্রতিযোগিতা।
  • অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে রাষ্ট্রের নূন্যতম বা শূন্য হস্তক্ষেপ।

৮। বাজেট রেখা কাকে বলে? ৫

[What is budget line?]

উত্তর:

বাজেট রেখার সংজ্ঞা:

বাজেট রেখা (Budget Line) বা সমব্যয় রেখা হলো এমন একটি রেখা, যার প্রতিটি বিন্দু একজন ভোক্তার নির্দিষ্ট আয় বা বাজেট এবং দুটি দ্রব্যের নির্দিষ্ট বাজার মূল্যের ভিত্তিতে ওই দুটি দ্রব্যের বিভিন্ন সম্ভাব্য সংমিশ্রণ নির্দেশ করে, যা ভোক্তা তার সম্পূর্ণ আয় ব্যয় করে ক্রয় করতে সক্ষম।

বাজেট সমীকরণ (Budget Equation):
ভোক্তার মোট বাজেট যদি M হয় এবং দুটি দ্রব্য X ও Y-এর দাম যথাক্রমে Px ও Py হয়, তবে বাজেট সমীকরণটি হবে:
Px × X + Py × Y = M

সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা: বাজেট রেখার অভ্যন্তরীণ যেকোনো বিন্দু ভোক্তার আয়ের মধ্যে ক্রয়ের সামর্থ্য নির্দেশ করে (অর্জনে সক্ষম অঞ্চল), কিন্তু রেখার বাইরের কোনো বিন্দু বর্তমান আয়ে কেনা সম্ভব নয়। বাজেট রেখার ঢাল হলো দুই দ্রব্যের মূল্যের অনুপাত (-Px / Py)।


৯। মুনাফা ও সুদের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ কর। ৫

[point the difference between profit and interest.]

উত্তর:

অর্থনীতি ও ইসলামি শরীয়তে মুনাফা (Profit) এবং সুদ (Interest/Riba)-এর মাঝে আকাশ-পাতাল মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান। নিম্নে ছকের মাধ্যমে তাদের প্রধান পার্থক্যগুলো দেখানো হলো:

পার্থক্যসূচক বিষয় মুনাফা (Profit) সুদ (Interest / Riba)
সংজ্ঞা ব্যবসা-বাণিজ্যে মূলধন ও শ্রম খাটিয়ে ঝুঁকি গ্রহণের পর প্রাপ্ত উদ্বৃত্ত বা অতিরিক্ত মূল্য। আসল ঋণের অতিরিক্ত সময়কালের ওপর ভিত্তি করে নিশ্চিত আদায়কৃত পূর্বনির্ধারিত অর্থ।
শরীয়তের বিধান ইসলামি শরীয়তে সম্পূর্ণ হালাল, পবিত্র ও প্রশংসিত (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)। কুরআন ও হাদিসে সম্পূর্ণ হারাম, কবিরা গুনাহ এবং আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধের শামিল।
ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা ব্যবসায় লাভ হতে পারে, আবার লোকসানও হতে পারে—উভয় ঝুঁকি বিদ্যমান। ঋণগ্রহীতার লাভ বা ক্ষতি যাই হোক, ঋণদাতা নিশ্চিত সুদের অর্থ গ্রহণ করে (ঝুঁকিমুক্ত)।
নির্ধারণের সময় ব্যবসা শেষ হওয়ার পর হিসাব-নিকাশ শেষে মুনাফার পরিমাণ নির্ধারিত হয়। ঋণ দেওয়ার মুহূর্তেই নির্দিষ্ট সুদের হার পূর্বনির্ধারিত থাকে।
সামাজিক প্রভাব উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করে ধনী-দরিদ্রের মাঝে সুসম্পর্ক গড়ে তোলে। ধনীকে আরও ধনী এবং দরিদ্রকে নিঃস্ব করে মারাত্মক শোষণ সৃষ্টি করে।

১০। ইসলামি ভোক্তা বলতে কী বুঝায়? ৫

[What do you mean by Islami consumer?]

উত্তর:

ইসলামি ভোক্তার পরিচয়:

ইসলামি অর্থনীতিতে যে ব্যক্তি কেবল নিজের পাশবিক তৃপ্তি বা ইন্দ্রিয়সুখের দাস না হয়ে, মহান আল্লাহর নির্দেশিত হালাল-হারামের সীমারেখা মেনে এবং আখিরাতের জবাবদিহিতার অনুভূতি নিয়ে ভোগকার্য পরিচালনা করে, তাকে ইসলামি ভোক্তা (Islamic Consumer) বলা হয়।

ইসলামি ভোক্তার মৌলিক বৈশিষ্ট্য:

  • তৈয়্যিবাত ও হালাল দ্রব্য ভোগ: ইসলামি ভোক্তা কেবল বৈধ ও পবিত্র (হালাল ও তৈয়্যিব) দ্রব্য ভোগ করে; কোনো অপবিত্র বা ক্ষতিকর জিনিস ভোগ করে না।
  • ইসরাফ ও অপব্যয় বর্জন: ইসলামে অপচয়কারীকে শয়তানের ভাই বলা হয়েছে (সূরা বনি ইসরাইল: ২৭)। তাই ইসলামি ভোক্তা বিলাসবহুল প্রদর্শন ও অপব্যয় বর্জন করে।
  • মিতব্যয়িতা ও ভারসাম্য: সে কৃপণতাও করে না, আবার অতিরিক্ত ব্যয়ও করে না; বরং মধ্যপন্থা অবলম্বন করে (সূরা আল-ফুরকান: ৬৭)।
  • ইনফাক বা দানশীলতা: ইসলামি ভোক্তা কেবল নিজের জন্যই ভোগ করে না, বরং নিজের আয়ের ভেতর সমাজের অভাবী মানুষের হক পরিশোধ করে।

১১। বাইয়ে মুয়াজ্জাল কী? ৫

[What is Bai-e-Muazzal?]

উত্তর:

বাইয়ে মুয়াজ্জালের পরিচয়:

‘বাই’ (بیع) শব্দের অর্থ ক্রয়-বিক্রয় এবং ‘মুয়াজ্জাল’ (مؤجل) অর্থ বিলম্বিত বা মেয়াদি। শরীয়তের পরিভাষায়, যে কেনাবেচায় পণ্য তাৎক্ষণিকভাবে ক্রেতার কাছে হস্তান্তর করা হয় কিন্তু পণ্যের মূল্য ভবিষ্যতে কোনো নির্দিষ্ট তারিখে এককালীন বা কিস্তিতে পরিশোধের শর্ত থাকে, তাকে বাইয়ে মুয়াজ্জাল (Bai-e-Muazzal) বা বাকিতে বিক্রয় বলা হয়।

ইসলামি ব্যাংকিংয়ে এর প্রয়োগ ও শর্তাবলী:

  • ইসলামি ব্যাংকগুলো গ্রাহকের চাহিদামতো কোনো পণ্য বা যন্ত্রপাতি নিজেরা কিনে মালিকানা অর্জন করে এবং তা গ্রাহকের কাছে ভবিষ্যৎ মূল্য পরিশোধের শর্তে নির্দিষ্ট লাভে বাকিতে বিক্রি করে।
  • বিক্রয়ের সময় পণ্যের আসল মূল্য, ব্যাংকের মুনাফা এবং পরিশোধের চূড়ান্ত সময়সূচি স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হতে হয়।
  • নির্দিষ্ট মেয়াদের পর অর্থ পরিশোধে দেরি হলে জরিমানা হিসেবে অতিরিক্ত অর্থ ধার্য করে তা ব্যাংকের আয়ে নেওয়া যায় না (জরিমানা নিলে তা সাদাকাহ তহবিলে দান করতে হয়, নচেৎ তা সুদ হয়ে যাবে)।

১২। জীবন বিমা কাকে বলে? ৫

[What is Life Insurance?]

উত্তর:

জীবন বিমার সংজ্ঞা:

জীবন বিমা (Life Insurance) হলো বিমাকারী প্রতিষ্ঠান ও বিমা গ্রহীতার মধ্যে সম্পাদিত এমন একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি, যার অধীনে বিমা গ্রহীতা নির্দিষ্ট হারে সাময়িক বা নিয়মিত প্রিমিয়াম প্রদান করে এবং এর বিনিময়ে বিমাকারী প্রতিষ্ঠান বিমা গ্রহীতার নির্দিষ্ট বয়স পূর্তিতে অথবা মেয়াদকালের মধ্যে তার মৃত্যু ঘটলে বিমাকৃত সম্পূর্ণ অর্থ গ্রাহক নিজে অথবা তার মনোনীত উত্তরাধিকারী (নমিনি)-কে পরিশোধ করার নিশ্চয়তা প্রদান করে।

প্রধান উপাদান ও উদ্দেশ্য:

  • উদ্দেশ্য: পরিবারপ্রধানের অকাল মৃত্যুতে পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বার্ধক্যের জন্য সঞ্চয় সৃষ্টি করা।
  • শরীয়তের দৃষ্টিভঙ্গি: প্রচলিত বাণিজ্যিক জীবন বিমায় ভবিষ্যৎ মৃত্যু ও সময়ের ওপর ভিত্তি করে আর্থিক সুবিধা নির্ধারিত হয় এবং এতে সুদ ও জুয়ার উপাদান থাকায় তা শরীয়ত পরিপন্থী। তবে পারস্পরিক সহযোগিতানির্ভর তাকাফুল ভিত্তিক জীবন বিমা শরীয়তসম্মত।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন ১: ফাযিল ১ম বর্ষের অর্থনীতি ও ইসলামি অর্থনীতি পরীক্ষার বিষয় কোড কত?

উত্তর: ফাযিল (স্নাতক) প্রথম বর্ষের অর্থনীতি ও ইসলামি অর্থনীতি বিষয়ের অফিসিয়াল বিষয় কোড হলো ২০১১০৬ (201106)।

প্রশ্ন ২: ২০২৪ সালের পরীক্ষায় ক বিভাগ থেকে কয়টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়?

উত্তর: ক বিভাগ (রচনামূলক প্রশ্ন) থেকে মোট ৬টি প্রশ্নের মধ্যে যেকোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। প্রতিটি প্রশ্নের মান ১৫ করে মোট ৬০ নম্বর।

প্রশ্ন ৩: অর্থনীতি পাঠে অধ্যাপক লায়নল রবিন্সের সংজ্ঞাটি এত জনপ্রিয় কেন?

উত্তর: অধ্যাপক রবিন্সের সংজ্ঞাটি মানবজীবনের বাস্তব মৌলিক সমস্যা—অসীম অভাব, সম্পদের অপ্রতুলতা এবং সম্পদের বিকল্প ব্যবহারকে বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করেছে, যা সার্বজনীনভাবে প্রযোজ্য।

প্রশ্ন ৪: ইসলামি অর্থনীতিতে যাকাত বণ্টন কি যেকোনো সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে করা যায়?

উত্তর: না, যাকাতের অর্থ কেবল পবিত্র কুরআনের সূরা আত-তাওবার ৬০ নম্বর আয়াতে নির্ধারিত ৮টি সুনির্দিষ্ট খাতের প্রকৃত হকদার ব্যক্তি বা ক্ষেত্রে প্রদান করতে হবে।

প্রশ্ন ৫: প্রচলিত বাণিজ্যিক বিমা ও ইসলামি তাকাফুলের মধ্যে মূল পার্থক্য কী?

উত্তর: প্রচলিত বিমা সুদ, জুয়া ও চরম অনিশ্চয়তার ওপর প্রতিষ্ঠিত; পক্ষান্তরে ইসলামি তাকাফুল পারস্পরিক আর্থিক সহযোগিতা, দান (তাবাররু) এবং মুদারাবাভিত্তিক লাভ-লোকসানের অংশীদারিত্বে পরিচালিত হয়।

প্রশ্ন ৬: পরীক্ষার ভালো ফলাফলের জন্য প্রশ্নোত্তরে কী কী উপাদান থাকা জরুরি?

উত্তর: অর্থনৈতিক সংজ্ঞাগুলোতে প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদদের মূল উক্তি, প্রাসঙ্গিক সমীকরণ ও সূচি এবং ইসলামি অর্থনীতি অংশে কুরআন ও হাদিসের প্রামাণ্য উদ্ধৃতি উল্লেখ করা আবশ্যক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *