বাংলাদেশ স্টাডিজ (Bangladesh Studies) – 205107, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি – ফাজিল অনার্স ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২১

StudyBoi StudyBoi
September 26, 2026
৪৭ মিনিট পড়ার সময়
৩ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন

পরীক্ষা কোড: ২০১ | প্রশ্নপত্র কোড: ০৩৫
ফাজিল (স্নাতক) সম্মান প্রথম বর্ষ পরীক্ষা, ২০২১
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
বাংলাদেশ স্টাডিজ (Bangladesh Studies)
বিষয় কোড: ২০৫১০৭
সময়—৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান—৮০
[দ্রষ্টব্য: ক বিভাগ থেকে ৪টি এবং খ বিভাগ থেকে ৪টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।]


ক বিভাগ (রচনামূলক প্রশ্ন)

১। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের রাজনৈতিক পটভূমি বর্ণনা কর।

[Describe the political background of the liberation war of Bangladesh of 1971.]

ভূমিকা

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘ চব্বিশ বছরের (১৯৪৭—১৯৭১ খ্রি.) পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শোষণ, বৈষম্য, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন এবং রাজনৈতিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির ধারাবাহিক স্বাধিকার ও মুক্তি সংগ্রামের চূড়ান্ত পরিণতি। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব পাকিস্তানের ওপর জাতিগত নিপীড়ন চাপিয়ে দেয়।

স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল রাজনৈতিক পটভূমি ও ধারাবাহিক ঘটনাবলি

  • ১. ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলন: পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৬% মানুষের মুখের ভাষা বাংলাকে বাদ দিয়ে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে বাঙালি রক্ত দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ২১ ফেব্রুয়ারির রক্তদান বাঙালির মধ্যে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের বদলে ভাষাভিত্তিক ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-এর জন্ম দেয়।
  • ২. ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন: মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত যুক্তফ্রন্ট একুশ দফার ভিত্তিতে নির্বাচনে বিপুল বিজয় অর্জন করে। কিন্তু মাত্র দুই মাসের মাথায় কেন্দ্রীয় সরকার ৯২(ক) ধারা জারি করে গণতান্ত্রিক সরকারকে বরখাস্ত করে।
  • ৩. আইয়ুব খানের সামরিক শাসন ও বৈষম্য: ১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে রাজনীতি নিষিদ্ধ করেন। সামরিক বাহিনী, সিভিল প্রশাসন এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পূর্ব বাংলাকে একচেটিয়া শোষণের উপনিবেশে পরিণত করা হয়। পাটের সিংহভাগ বৈদেশিক মুদ্রা আয় হলেও তা পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে ব্যয় হতো।
  • ৪. ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলন: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লাহোরে বাঙালি জাতির মুক্তিসনদ ঐতিহাসিক ‘ছয় দফা’ দাবি পেশ করেন। এতে পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন, পৃথক মুদ্রা ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং নিজস্ব আধা-সামরিক বাহিনী গঠনের দাবি জানানো হয়। ছয় দফা আন্দোলন বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের ম্যাগনাকার্টায় পরিণত হয়।
  • ৫. আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ও ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান: ছয় দফাকে স্তব্ধ করতে সরকার বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য’ (আগরতলা মামলা) দায়ের করে ফাঁসি দেওয়ার ষড়যন্ত্র করে। ছাত্রসমাজের ১১ দফার ভিত্তিতে দেশব্যাপী তীব্র গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি হয়। আসাদ, সার্জেন্ট জহুরুল হক ও ড. শামসুজ্জোহার আত্মত্যাগের মুখে আইয়ুব খানের পতন ঘটে এবং মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিবকে মুক্তি দেওয়া হয়। সেখানেই তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
  • ৬. ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন: ইয়াহিয়া খানের অধীনে অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে ১৬৭টি আসন (১৬৯টির মধ্যে) পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তর করতে অস্বীকার করে।
  • ৭. ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের অসহযোগ ও ৭ মার্চের ভাষণ: ৩ মার্চের জাতীয় সংসদ অধিবেশন স্থগিত করায় বঙ্গবন্ধু দেশব্যাপী সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে তিনি বিশ্বখ্যাত ভাষণ দেন: “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”
  • ৮. ২৫ মার্চের কালরাত ও স্বাধীনতার ঘোষণা: ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিরীহ বাঙালির ওপর বর্বর ‘অপারেশন সার্চলাইট’ চালিয়ে গণহত্যা শুরু করে। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন এবং দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করে।

উপসংহার

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালির আত্মপরিচয় রক্ষার অস্তিত্বের সংগ্রাম। রাজনৈতিক নেতৃত্বের অটল মনোবল এবং সমগ্র জনগণের ঐক্যবদ্ধ আত্মত্যাগের ফলেই বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় সম্ভব হয়েছিল।


২। বাংলাদেশের জনসংখ্যা সমস্যা সমাধানের উপায়গুলো আলোচনা কর।

[Discuss the ways of remedies of population problem of Bangladesh.]

ভূমিকা

সীমিত ভূখণ্ড ও বিপুল জনসংখ্যার দেশ বাংলাদেশ। প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দেশে বর্তমানে প্রায় ১৭ কোটিরও বেশি মানুষ বসবাস করে, যা পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। অনিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যা বৃদ্ধি দেশের খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে। তবে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপের মাধ্যমে এই জনসংখ্যাকে অভিশাপের পরিবর্তে জাতীয় সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব।

জনসংখ্যা সমস্যা সমাধানের কার্যকর উপায়সমূহ

  • ১. পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা জোরদার:
    • গ্রামাঞ্চলে মাঠপর্যায়ে পরিবার পরিকল্পনা কর্মীদের তৎপরতা বৃদ্ধি এবং বিনামূল্যে আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ও পরামর্শ পৌঁছানো।
    • মাতৃ ও শিশুকেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং বাল্যবিবাহ রোধে কঠোর আইনি প্রয়োগ করা।
  • ২. নারী শিক্ষার বিস্তার ও নারীর ক্ষমতায়ন: নারী শিক্ষার প্রসার জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। শিক্ষিত নারীরা স্বাস্থ্যসচেতন হন এবং তাঁদের সন্তান গ্রহণের হার তুলনামূলকভাবে অনেক কম হয়। নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা গেলে জন্মহার দ্রুত হ্রাস পায়।
  • ৩. কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে মানবসম্পদে রূপান্তর: কেবল সাধারণ গ্র্যাজুয়েট তৈরির পরিবর্তে তরুণদের আইসিটি, ফ্রিল্যান্সিং, ইঞ্জিনিয়ারিং, পলিটেকনিক ও বিভিন্ন কারিগরি ট্রেডে দক্ষ মানবসম্পদে (Human Capital) রূপান্তর করা। দক্ষ জনসংখ্যা দেশের বোঝা নয়, অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি।
  • ৪. বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও দক্ষ শ্রমশক্তি রপ্তানি: মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, জাপান ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে ভাষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ শ্রমিক ও পেশাজীবী প্রেরণ করা, যা জাতীয় রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে সরাসরি ভূমিকা রাখে।
  • ৫. কৃষি ও শিল্পক্ষেত্রে কর্মসংস্থান সৃষ্টি: কৃষির আধুনিকীকরণ, বহুমুখীকরণ এবং এসএমই (SME) ও কুটির শিল্পের প্রসারের মাধ্যমে গ্রামীণ পর্যায়ে বিপুল কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা।
  • ৬. সামাজিক সচেতনতা ও ধর্মীয় অনুশাসনের সঠিক প্রচার: মসজিদের সম্মানিত খতিব ও আলেমদের মাধ্যমে পরিকল্পিত পরিবার, সন্তানের গুণগত শিক্ষা ও লালন-পালনের দায়িত্ব সম্পর্কে ইসলামি শিক্ষার সঠিক ব্যাখ্যা প্রচার করা।

উপসংহার

জনসংখ্যা কোনো স্থায়ী সংকট নয়; পরিকল্পিত শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সুষ্ঠু অর্থনৈতিক নীতিমালার মাধ্যমে এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে পারলে বাংলাদেশ দ্রুত এক সমৃদ্ধ ও উন্নত দেশে পরিণত হবে।


৩। বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচিতি বর্ণনা কর।

[Describe the cultural identity of Bangalee.]

ভূমিকা

বাঙালির সংস্কৃতি হাজার বছরের বিবর্তন, ভৌগোলিক পরিবেশ এবং বহু জাতি ও ধর্মের মিলনে গড়ে ওঠা এক সমন্বয়ধর্মী, উদার ও মানবিক সংস্কৃতি। নদীমাতৃক বাংলার ভৌগোলিক রূপ, জলবায়ু এবং কৃষিভিত্তিক জীবনধারা বাঙালির মানসজগৎ ও সংস্কৃতিকে এক অনন্য স্বকীয়তা দান করেছে।

বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচিতির প্রধান উপাদানসমূহ

  • ১. ভাষা ও সাহিত্য: বাঙালির প্রধান সাংস্কৃতিক ভিত্তি হলো বাংলা ভাষা। চর্যাপদ থেকে শুরু করে মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলী, পুথি সাহিত্য, রবীন্দ্র-নজরুলের সৃষ্টিসম্ভার এবং ৫২-এর রক্তঝরা ভাষা আন্দোলনের চেতনা বাঙালির সাংস্কৃতিক অহংকার।
  • ২. লোকসংস্কৃতি ও সঙ্গীত: নদী ও প্রকৃতির সাথে বাঙালির মন একাকার। ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, বাউল, জারি, সারি ও লালনগীতি বাঙালির আধ্যাত্মিক ও ভাবুক মনের পরিচয় বহন করে। বাউল সম্রাট লালন শাহ ও হাসন রাজার গান বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
  • ৩. খাদ্যাভ্যাস ও ঐতিহ্যবাহী পোশাক: ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ চিরন্তন ঐতিহ্য। ভাত, ডাল, নানা পদের মাছ, শাকসবজি এবং ক্ষীর-পায়েস বাঙালির প্রিয় খাদ্য। পুরুষদের লুঙ্গি, ফতুয়া ও পাঞ্জাবি এবং নারীদের সুতি ও জামদানি শাড়ি বাঙালির আবহমান ঐতিহ্যের স্মারক।
  • ৪. লোকমেলা ও উৎসবের মেলবন্ধন: পহেলা বৈশাখ (বাংলা নববর্ষ), নবান্ন উৎসব, পৌষ মেলা বাঙালির ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বজনীন উৎসব। এর পাশাপাশি ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, দুর্গাপূজা ও বৌদ্ধ পূর্ণিমার পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ উদযাপন বাঙালি সংস্কৃতির অনন্য সহনশীলতার প্রমাণ।
  • ৫. ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সমন্বয়বাদ: সুফি-সাধক এবং শ্রীচৈতন্যের ভাবধারার প্রভাবে এ অঞ্চলের সংস্কৃতিতে কোনো উগ্রতার স্থান নেই। বিভিন্ন ধর্মের মানুষ যুগে যুগে পাশাপাশি শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে এক অভিন্ন সামাজিক মূল্যবোধ গড়ে তুলেছে।

উপসংহার

বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় কোনো সংকীর্ণ ভৌগোলিক বা ধর্মীয় গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়; এটি একাধারে উদার, সৃষ্টিশীল, প্রকৃতির সাথে একাত্ম এবং আত্মমর্যাদাবোধে বলীয়ান এক মানবিক সংস্কৃতি।


৪। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব আলোচনা কর।

[Discuss the importance of agricultural economy of Bangladesh.]

ভূমিকা

বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবেই একটি কৃষিনির্ভর দেশ। যদিও সাম্প্রতিককালে শিল্প ও সেবা খাতের অবদান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, তবুও দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, বিপুল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান এবং সার্বিক দারিদ্র্য বিমোচনে কৃষি খাত আজও বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি বা মেরুদণ্ড হিসেবে কার্যকর রয়েছে।

অর্থনীতিতে কৃষির বহুমাত্রিক গুরুত্ব

  • ১. জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: ১৭ কোটির বিশাল জনসংখ্যার মৌলিক চাহিদা হলো অন্ন। প্রতিকূল প্রাকৃতিক দুর্যোগ সত্ত্বেও ধান, গম, ভুট্টা, আলু ও সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশে পরিণত হয়েছে, যা দেশকে পরনির্ভরশীলতা থেকে রক্ষা করে খাদ্য নিরাপত্তা এনে দিয়েছে।
  • ২. বিপুল কর্মসংস্থান ও জীবিকা: বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪০% প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির সাথে জড়িত। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষের প্রধান বা সম্পূরক আয়ের উৎস কৃষি।
  • ৩. জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান: জাতীয় আয়ে বা মোট দেশজ উৎপাদনে (GDP) কৃষি খাতের (শস্য, প্রাণিসম্পদ, বনজ ও মৎস্য) অবদান প্রায় ১২-১৩ শতাংশ।
  • ৪. শিল্পকারখানার কাঁচামাল সরবরাহ: দেশের প্রধান প্রধান প্রক্রিয়াকরণ শিল্প—যেমন: পাটকল, টেক্সটাইল, চিনি কল, চামড়া শিল্প, বেকারি ও পোল্ট্রি ফিড শিল্পের শতভাগ কাঁচামাল কৃষি খাত থেকেই আসে।
  • ৫. রপ্তানি আয় বৃদ্ধি: হিমায়িত মৎস্য (চিংড়ি), কাঁচা পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া, সুগন্ধি চাল এবং প্রক্রিয়াজাত শাকসবজি রপ্তানি করে বাংলাদেশ প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে।
  • ৬. মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের বিপ্লব: মিষ্টি পানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয় এবং ইলিশ উৎপাদনে বিশ্বে প্রথম। পোল্ট্রি ও ডেইরি শিল্পের বিকাশ প্রোটিনের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি গ্রামীণ যুবকদের বেকারত্ব দূর করছে।

উপসংহার

কৃষি কেবল একটি পেশা নয়, এটি বাংলাদেশের অস্তিত্বের ভিত্তি। কৃষি খাতের যান্ত্রিকীকরণ, উচ্চফলনশীল বীজের ব্যবহার এবং কৃষকের জন্য ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে পারলে জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও গতিশীল হবে।


৫। “একটি স্বাধীন বিচার বিভাগ গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য অপরিহার্য।”—উক্তিটি ব্যাখ্যা কর।

[“An independent judiciary is essential for a democratic government.”—Explain the statement.]

ভূমিকা

গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ (Separation of Powers) এবং আইনের শাসন (Rule of Law)। একটি রাষ্ট্রের তিনটি প্রধান অঙ্গের (আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ) মধ্যে বিচার বিভাগ যদি সম্পূর্ণ স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও শাসন বিভাগের প্রভাবমুক্ত না হয়, তবে গণতন্ত্র অর্থহীন হয়ে স্বৈরতন্ত্রে রূপ নেয়। এ কারণেই একটি স্বাধীন বিচার বিভাগকে গণতান্ত্রিক সরকারের ‘প্রাণভোমরা’ বলা হয়।

স্বাধীন বিচার বিভাগের অপরিহার্যতা ও তাৎপর্য

  • ১. মৌলিক অধিকারের অতন্দ্র প্রহরী: সংবিধান নাগরিকদের যে মৌলিক অধিকার (বাকস্বাধীনতা, চলাফেরার স্বাধীনতা, জীবনের নিরাপত্তা) প্রদান করে, তা লঙ্ঘন হলে নাগরিকরা বিচার বিভাগের শরণাপন্ন হন। উচ্চ আদালত ‘রিট’ (Writ) জারির মাধ্যমে শাসন বিভাগের স্বেচ্ছাচারিতা রুখে দিয়ে নাগরিকের অধিকার সংরক্ষণ করে।
  • ২. সংবিধানের অভিভাবকত্ব ও ব্যাখ্যা: সংবিধান রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। আইনসভা যদি সংবিধানবিরোধী কোনো আইন পাস করে, তবে বিচার বিভাগ ‘বিচারিক পর্যালোচনা’ (Judicial Review)-এর মাধ্যমে সেই আইনকে অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করতে পারে।
  • ৩. আইনের শাসন ও ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা: স্বাধীন বিচার বিভাগ নিশ্চিত করে যে “আইনের চোখে সবাই সমান এবং কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।” রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সাধারণ রিকশাচালক পর্যন্ত সবার জন্য একই আইন কার্যকর থাকে।
  • ৪. ঐতিহাসিক মাসদার হোসেন মামলা ও বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ (২০০৭ খ্রি.): বাংলাদেশের সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মূলনীতি হিসেবে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের অঙ্গীকার ছিল। ঐতিহাসিক মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পর ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক করা হয়, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক মাইলফলক।

উপসংহার

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ছাড়া কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। বিচারকদের নিরাপত্তা, নিরপেক্ষ নিয়োগ এবং আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল সমাজে ন্যায়বিচার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব।


৬। বাংলাদেশে ইসলামের আবির্ভাব ও ক্রমবিকাশ আলোচনা কর।

[Discuss the advent and development of Islam in Bangladesh.]

ভূমিকা

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। এ অঞ্চলে ইসলামের আগমন কোনো রাজকীয় তরবারির মাধ্যমে ঘটেনি; বরং আরব বণিকদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং পরবর্তীতে মহান সুফি-দরবেশ ও ওলিয়া-কেরামদের আত্মত্যাগ, ভালোবাসা ও মানবসেবার মাধ্যমেই সাধারণ মানুষের অন্তরে ইসলামের চিরন্তন আলো প্রজ্বলিত হয়েছিল।

ইসলামের আবির্ভাব ও ক্রমবিকাশের প্রধান পর্যায়সমূহ

  • ১. আরব বণিকদের মাধ্যমে প্রাথমিক আগমন (খ্রিস্টীয় ৮ম-৯ম শতক): ইসলামের প্রারম্ভিক যুগেই আরব বণিকরা চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রাম উপকূলকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করতেন। কুমিল্লার ময়নামতি ও পাহাড়পুরে আব্বাসীয় যুগের রৌপ্যমুদ্রা আবিষ্কার এর ঐতিহাসিক প্রমাণ বহন করে।
  • ২. মহান সুফি-সাধক ও আউলিয়াদের ভূমিকা:
    • বাবা আদম শহীদ (রহ.): বিক্রমপুরে একাদশ শতকে ইসলাম প্রচার করতে এসে সেন রাজার সাথে যুদ্ধে শহীদ হন।
    • শাহ সুলতান কমরউদ্দিন রুমি ও বলখী (রহ.): ময়মনসিংহ ও বগুড়ার মহাস্থানগড়ে ইসলাম প্রচার করেন।
    • হযরত শাহজালাল (রহ.): ১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দে ৩৬০ জন আউলিয়া সঙ্গীসহ সিলেটে আগমন করেন এবং অত্যাচারী রাজা গৌরগোবিন্দকে পরাস্ত করে বৃহত্তর সুরমা উপত্যকায় ইসলামের পতাকা উড্ডীন করেন।
    • খান জাহান আলী (রহ.): দক্ষিণ বাংলায় (বাগেরহাট, খুলনা ও যশোর) সুন্দরবন কেটে রাস্তাঘাট, অসংখ্য মিষ্টি পানির দীঘি এবং বিখ্যাত ষাটগম্বুজ মসজিদ নির্মাণ করে ইসলাম ও সভ্যতার বিস্তার ঘটান।
    • শাহ মাখদুম রূপোশ (রহ.): রাজশাহী ও বরেন্দ্র অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করেন।
  • ৩. রাজনৈতিক বিজয় ও মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা: ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজি মাত্র ১৮ জন অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে রাজা লক্ষণ সেনকে পরাজিত করে নদীয়া ও গৌড় জয় করেন। এর ফলে বাংলায় সাড়ে পাঁচশত বছরের মুসলিম শাসনের সূচনা হয়, যা ইসলাম প্রচারকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দান করে।
  • ৪. দলিত ও নির্যাতিত হিন্দু-বৌদ্ধদের ধর্মান্তর: সেন রাজাদের আমলে হিন্দু বর্ণপ্রথার চরম নিষ্পেষণ ও অস্পৃশ্যতায় জর্জরিত নিম্নবর্ণের মানুষ ইসলামের সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও মানবিক মর্যাদার আদর্শে দলে দলে আকৃষ্ট হয়ে স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করে।

উপসংহার

বাংলায় ইসলামের প্রসার ছিল মানবকল্যাণ ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের এক স্বতঃস্ফূর্ত বিজয়। সুফিবাদের এই উদার সহনশীল ঐতিহ্যের ফলেই এদেশের ইসলাম এক অনন্য মানবিক ও সম্প্রীতিময় চরিত্র লাভ করেছে।


খ বিভাগ (সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন)

৭। অপারেশন সার্চলাইট কী?

[What is the operation searchlight?]

সংজ্ঞা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক জান্তা জেনারেল টিক্কা খান ও রাও ফরমান আলীর পরিকল্পনায় পূর্ব পাকিস্তানের নিরস্ত্র ও নিরীহ বাঙালি জনগোষ্ঠীর ওপর যে বর্বরোচিত, সুপরিকল্পিত এবং আকস্মিক সামরিক গণহত্যা অভিযান পরিচালনা করে, তার সামরিক গোপন কোডনাম ছিল ‘অপারেশন সার্চলাইট’ (Operation Searchlight)।

বর্বরতার বিবরণ ও ফলাফল

এর মূল উদ্দেশ্য ছিল আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব নিশ্চিহ্ন করা, ছাত্র-শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা এবং সামরিক শক্তির ভয় দেখিয়ে বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া। ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, পিলখানা ইপিআর সদর দফতর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল (বর্তমান জহুরুল হক হল), জগন্নাথ হল এবং শহরের অলিগলিতে ট্যাংক ও মেশিনগান দিয়ে হাজার হাজার মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। কিন্তু এই বর্বরতার মুখে বাঙালি নতজানু না হয়ে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।


৮। গারো উপজাতির পরিচয় দাও।

[Discuss the identity of Garo Tribe.]

ভৌগোলিক অবস্থান ও নৃতাত্ত্বিক পরিচয়

বাংলাদেশের বৃহত্তর ময়মনসিংহ (হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া), নেত্রকোনা (সুসং দুর্গাপুর), শেরপুর এবং মধুপুর অঞ্চলে বসবাসকারী অন্যতম প্রধান ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী হলো ‘গারো’ সম্প্রদায়। তারা মূলত মঙ্গলীয় (Mongoloid) নৃ-গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত এবং তিব্বতি-বর্মি ভাষা পরিবারের ‘আচিক’ (Achik) ভাষায় কথা বলে।

সমাজ ও সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য

গারো সমাজের সবচেয়ে প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা (Matrilineal Society)। পরিবারের সমস্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয় কনিষ্ঠ কন্যা (নকনা)। বিবাহের পর স্বামী স্ত্রীর বাড়িতে গিয়ে বসবাস করে। গারোদের সনাতন ধর্মের নাম ‘সাংসারেক’, তবে বর্তমানে তাদের শতকরা ৯০ জনেরও বেশি খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছেন। তাদের প্রধান সামাজিক ও ধর্মীয় ফসল কাটার উৎসবের নাম ‘ওয়ানগালা’ (Wangala), যেখানে তারা তাদের দেবতা সালজং-এর উদ্দেশ্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।


৯। তমুদ্দুন মজলিস কী? কেন গঠিত হয়েছিল?

[What is Tamuddun Majlish? Why was it formed?]

পরিচয় ও গঠন

‘তমুদ্দুন মজলিস’ ছিল পাকিস্তান সৃষ্টির পর পর ভাষা ও সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষার উদ্দেশ্যে গঠিত প্রথম সাংস্কৃতিক সংগঠন। ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাসেমের নেতৃত্বে এবং কয়েকজন শিক্ষক-বুদ্ধিজীবীর উদ্যোগে এটি ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়।

গঠনের উদ্দেশ্য ও ভূমিকা

এর মূল উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানের নবগঠিত রাষ্ট্রে বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং বাঙালির স্বকীয় সাংস্কৃতিক চেতনাকে জাগ্রত করা। ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর এই সংগঠনটি ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু?’ শীর্ষক একটি ঐতিহাসিক পুস্তিকা প্রকাশ করে, যাতে সর্বপ্রথম বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার মাধ্যম, আদালতের ভাষা এবং পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার সুনির্দিষ্ট দাবি ও প্রস্তাবনা উত্থাপন করা হয়। এটিই পরবর্তীতে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের প্রাথমিক বৌদ্ধিক ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিল।


১০। কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর অবদান পর্যালোচনা কর।

[Review the female contributions of agriculture and rural economics.]

অবদানের স্বরূপ

বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির প্রায় অর্ধেক শক্তি হলো নারী সমাজ। যদিও তাদের কাজকে জিডিপিতে আনুষ্ঠানিকভাবে সর্বদা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয় না, তবুও কৃষির উৎপাদন চক্রের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ কাজ নারীদের পরিশ্রমেই সম্পন্ন হয়।

প্রধান কর্মকাণ্ডসমূহ

  • ফসল সংগ্রহোত্তর কার্যক্রম: ধান সিদ্ধ করা, শুকানো, মাড়াই, ঝাড়াই এবং বীজ সংরক্ষণ ও গুদামজাতকরণের শতভাগ কাজ গ্রামীণ নারীরা সম্পাদন করেন।
  • পারিবারিক খামার ও শাকসবজি চাষ: বাড়ির আঙিনায় বসতবাড়িভিত্তিক শাকসবজি উৎপাদন করে তারা পারিবারিক পুষ্টির জোগান দেন এবং উদ্বৃত্ত পণ্য বাজারে বিক্রি করে বাড়তি আয় করেন।
  • হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু পালন: গ্রামীণ নারীরা ক্ষুদ্র ঋণের সহায়তায় গাভী পালন, ছাগল ও হাঁস-মুরগির খামার পরিচালনা করে দুধ ও ডিম উৎপাদনের মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণে বিশাল ভূমিকা রাখছেন।

১১। মৌলিক অধিকার বলতে কী বোঝ?

[What do you mean by the fundamental right?]

সংজ্ঞা ও সাংবিধানিক ভিত্তি

মানুষ হিসেবে মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য রাষ্ট্রীয় সংবিধান কর্তৃক স্বীকৃত, সংরক্ষিত ও সুরক্ষিত নাগরিক অধিকারসমূহকে ‘মৌলিক অধিকার’ (Fundamental Rights) বলা হয়। এগুলো কোনো সাধারণ আইনগত অধিকার নয়, বরং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানে এগুলোকে অলঙ্ঘনীয় সুরক্ষা দেওয়া হয়।

বাংলাদেশের সংবিধানে মৌলিক অধিকার

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে (অনুচ্ছেদ ২৭ থেকে ৪৪ পর্যন্ত) মোট ১৮টি মৌলিক অধিকার সন্নিবেশিত হয়েছে। এর মধ্যে প্রধান হলো: আইনের দৃষ্টিতে সমতা (২৭ অনুচ্ছেদ), ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বৈষম্যহীনতা (২৮), জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার সুরক্ষা (৩২), গ্রেপ্তার ও আটক সম্পর্কিত সুরক্ষা (৩৩), চলাফেরার স্বাধীনতা (৩৬), সমাবেশের স্বাধীনতা (৩৭), সংগঠনের স্বাধীনতা (৩৮), চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাকস্বাধীনতা (৩৯) এবং নিজ নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা (৪১)। অনুচ্ছেদ ৪৪ ও ১০২ অনুযায়ী মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হলে যে কোনো নাগরিক সরাসরি সুপ্রিম কোর্টে রিট আবেদন করে প্রতিকার পেতে পারেন।


১২। মেঘনা নদীর ইতিহাস আলোচনা কর।

[Discuss the history of the river of Meghna.]

উৎপত্তি ও গতিপথ

মেঘনা বাংলাদেশের অন্যতম গভীরতম, প্রশস্ততম ও খরস্রোতা প্রধান নদী। এটি ভারতের আসাম রাজ্যের লুসাই পাহাড়ে ‘বরাক’ নদী নামে উৎপন্ন হয়ে সিলেটের অমলসিদে এসে দুটি শাখায় বিভক্ত হয়—সুরমা ও কুশিয়ারা। পরবর্তীতে এই দুই নদী পুনরায় মিলিত হয়ে কালনী এবং ভৈরবের কাছে এসে পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের সাথে মিলিত হয়ে ‘মেঘনা’ নাম ধারণ করে।

ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব

চাঁদপুরের কাছে এসে মেঘনা পদ্মা নদীর সুবিশাল জলরাশির সাথে একীভূত হয় এবং এক প্রলয়ঙ্করী মোহনার সৃষ্টি করে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়। মেঘনার মোহনা পৃথিবীর সর্ববৃহৎ বদ্বীপ সৃষ্টির মূল কারিগর। মেঘনা নদী বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশের সর্বপ্রধান প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র। প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুর ও চট্টগ্রামের মধ্যে পণ্য ও যাত্রী পরিবহনের প্রধান অভ্যন্তরীণ নৌপথ হিসেবে মেঘনা নদী জাতীয় অর্থনীতিতে অপরিসীম অবদান রেখে আসছে।


সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. ‘বাংলাদেশ স্টাডিজ’ বিষয়ের প্রস্তুতির জন্য কোন অধ্যায়গুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস (১৯৪৭—১৯৭১), সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় মূলনীতি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, জনসংখ্যা সমস্যা ও সমাধান, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও সুফিবাদের ইতিহাস সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

২. ছয় দফা আন্দোলনকে কেন বাঙালির ‘ম্যাগনাকার্টা’ বলা হয়?

১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ছয় দফায় পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন ও অর্থনৈতিক শোষণের অবসানের সুস্পষ্ট রূপরেখা ছিল, যা বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনকে স্বাধীনতার চূড়ান্ত মোহনায় পৌঁছে দিয়েছিল।

৩. তমুদ্দুন মজলিসের ঐতিহাসিক অবদান কী ছিল?

১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত এই সাংস্কৃতিক সংগঠনটি ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু?’ পুস্তিকা প্রকাশের মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনের প্রথম আনুষ্ঠানিক বুদ্ধিবৃত্তিক বীজ বপন করেছিল।

৪. সংবিধানে মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হলে প্রতিকার পাওয়ার উপায় কী?

সংবিধানের ৪৪ এবং ১০২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংক্ষুব্ধ যে কোনো নাগরিক মৌলিক অধিকার পুনর্বহালের জন্য সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করতে পারেন।

৫. বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারে সুফিদের অবদানের প্রধান দিক কোনটি?

সুফি ও ওলিয়াগণ কোনো বলপ্রয়োগ না করে নিঃস্বার্থ মানবসেবা, নৈতিক পবিত্রতা, জাতিভেদহীন মানবিক আচরণ এবং সুফি খানকার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের হৃদয় জয় করে ইসলাম প্রচার করেছিলেন।

৬. ২০৫১০৭ বিষয়ের পরীক্ষায় উচ্চ নম্বর অর্জনের কৌশল কী?

উত্তরে সুনির্দিষ্ট সাংবিধানিক অনুচ্ছেদ উল্লেখ করা, সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ও আদমশুমারির পরিসংখ্যান যুক্ত করা এবং পয়েন্টভিত্তিক গুছিয়ে লেখা বেশি নম্বর নিশ্চিত করে।