পরীক্ষা কোড: ২০১ | প্রশ্নপত্র কোড: ০৩২
ফাজিল (স্নাতক) সম্মান প্রথম বর্ষ পরীক্ষা, ২০২১
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
ভারতীয় মুসলমানদের ইতিহাস (১৫২৬—১৮৫৭)
[History of the Indian Muslims (1526—1857)]
বিষয় কোড: ২০৫১০৪
সময়—৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান—৮০
[দ্রষ্টব্য: ক বিভাগ থেকে ৪টি এবং খ বিভাগ থেকে ২টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।]
ক বিভাগ (রচনামূলক প্রশ্ন)
১। পানিপথের প্রথম যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল বর্ণনা কর।
[Describe the causes and effects of the first battle of Panipath.]
ভূমিকা
২১ এপ্রিল ১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লির ঐতিহাসিক পানিপথ প্রান্তরে কাবুলের অধিপতি জহিরুদ্দীন মুহাম্মদ বাবর এবং দিল্লির শেষ সুলতান ইব্রাহিম লোদীর মধ্যে পানিপথের প্রথম যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধের ফলে প্রায় সোয়া তিনশত বছরের দিল্লি সালতানাতের চির অবসান ঘটে এবং ভারতীয় উপমহাদেশে গৌরবোজ্জ্বল মুঘল সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন হয়।
যুদ্ধের কারণসমূহ
- ১. বাবুরের ভারত জয়ের উচ্চাকাঙ্ক্ষা: পিতৃভূমি সমরকন্দ হারিয়ে বাবর ভারতে এক নতুন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখছিলেন। তিনি তৈমুর লঙের বংশধর হিসেবে পাঞ্জাব ও উত্তর ভারতের ওপর পৈতৃক দাবিদার মনে করতেন।
- ২. ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা: লোদী সালতানাতে আমির-ওমরাহদের বিদ্রোহ ও পারস্পরিক দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছেছিল। ইব্রাহিম লোদীর উদ্ধত আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে পাঞ্জাবের সুবেদার দৌলত খান লোদী এবং সুলতানের চাচা আলম খান লোদী বাবরকে ভারত আক্রমণের গোপন আমন্ত্রণ জানান।
- ৩. রানা সাঙ্গার আমন্ত্রণ: মেওয়ারের রাজপুত বীর রানা সাঙ্গাও ভেবেছিলেন বাবর তৈমুর লঙের মতো লুণ্ঠন করে ফিরে যাবেন, ফলে তিনি দিল্লিতে হিন্দু সাম্রাজ্য কায়েম করতে পারবেন। তাই তিনিও বাবরকে দিল্লি আক্রমণের প্ররোচনা দেন।
- ৪. ভারতের বিপুল ধনসম্পদ: কাবুলের সীমিত আয়ে বাবুরের বিশাল সৈন্যবাহিনী পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছিল। হিন্দুস্তানের অফুরন্ত অর্থনৈতিক সম্পদ বাবুরের আগমনকে ত্বরান্বিত করে।
যুদ্ধের বিবরণ ও রণকৌশল
ইব্রাহিম লোদীর পক্ষে ছিল ১,০০,০০০ সৈন্য এবং ১,০০০ যুদ্ধহস্তী। বিপরীতে বাবুরের পক্ষে ছিল মাত্র ১২,০০০ সুপ্রশিক্ষিত অশ্বারোহী সৈন্য। কিন্তু বাবর ঐতিহাসিক ‘রুমী পদ্ধতি’ বা অটোমান কৌশল ব্যবহার করেন। তিনি শত শত গরুর গাড়িকে চামড়ার রশি দিয়ে বেঁধে প্রতিরক্ষামূলক ব্যূহ তৈরি করেন এবং তার ফাঁকে ওস্তাদ আলী ও মোস্তফার অধীনে কামান ও গোলন্দাজ বাহিনী মোতায়েন করেন। দ্রুতগামী অশ্বারোহী বাহিনী দিয়ে তিনি শত্রুকে তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলেন (তুলঘুমা পদ্ধতি)। কামানের বিকট শব্দে লোদীর হস্তিবাহিনী আতঙ্কিত হয়ে পেছনের পদাতিক বাহিনীকে পদদলিত করে। কয়েক ঘণ্টার যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদীসহ ১৫,০০০ সৈন্য নিহত হয়।
যুদ্ধের ফলাফল ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব
- সালতানাতের অবসান ও মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা: দিল্লি ও আগ্রা বাবুরের অধিকারে আসে। দিল্লি সালতানাতের পতন ঘটে এবং ভারতে মুঘল বংশের প্রতিষ্ঠা হয়।
- সামরিক বিপ্লব: ভারতে প্রথমবারের মতো আগ্নেয়াস্ত্র ও কামানের সফল ব্যবহারের ফলে যুদ্ধকৌশলে মৌলিক রূপান্তর আসে।
- বাবুরের ভাগ্যের পরিবর্তন: বাবর দিল্লির রাজকোষের বিপুল ধনসম্পদ হস্তগত করেন। তিনি নিজেকে ‘কালান্দার’ বা মুক্তহস্ত দানকারী উপাধি দেন এবং কাবুলের প্রতিটি নাগরিককে রৌপ্যমুদ্রা উপহার পাঠান।
উপসংহার
পানিপথের প্রথম যুদ্ধ ছিল ইতিহাসের অন্যতম নির্ণায়ক যুদ্ধ। তবে এ যুদ্ধের ফলে বাবর কেবল দিল্লি দখল করেছিলেন; সমগ্র ভারতে সাম্রাজ্যকে সুসংহত করতে তাঁকে পরবর্তীতে খানুয়া ও চান্দেরির যুদ্ধে রাজপুত ও আফগানদের রক্তক্ষয়ী মোকাবিলা করতে হয়েছিল।
২। শেরশাহের চরিত্র ও কৃতিত্ব বিচার কর।
[Justify the character and achievements of Sher Shah.]
ভূমিকা
ফরিদ খান থেকে ‘শের খান’ এবং পরবর্তীতে সম্রাট ‘শেরশাহ সূরী’ (শাসনকাল: ১৫৪০—১৫৪৫ খ্রি.) ছিলেন মধ্যযুগীয় ভারতের সর্বাপেক্ষা বিস্ময়কর প্রশাসনিক প্রতিভা। মাত্র পাঁচ বছরের সংক্ষিপ্ত শাসনামলে তিনি মুঘল সম্রাট হুমায়ুনকে দেশছাড়া করে দ্বিতীয় আফগান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং এমন এক আধুনিক শাসনকাঠামো উপহার দেন, যা পরবর্তীকালে সম্রাট আকবর ও ব্রিটিশরা অনুসরণ করতে বাধ্য হয়।
শেরশাহের চরিত্র
শেরশাহ ছিলেন একাধারে অকুতোভয় সেনাপতি, ক্লান্তিহীন পরিশ্রমী রাষ্ট্রনায়ক এবং সুবিচারক। তিনি বিশ্বাস করতেন, শাসকের ব্যক্তিগত বিশ্রাম বলে কিছু নেই; প্রজার কল্যাণেই শাসকের জীবন উৎসর্গীকৃত হওয়া উচিত। ধর্মীয়ভাবে তিনি ছিলেন নিষ্ঠাবান মুসলিম, তবে সকল ধর্মের প্রজাদের প্রতি তিনি সমান সহানুভূতিশীল ছিলেন। সামান্য অপরাধেও তিনি কোনো অভিজাত বা সেনাপতিকে ছাড় দিতেন না।
শেরশাহের ঐতিহাসিক কৃতিত্ব ও সংস্কারসমূহ
- ১. ভূমিরাজস্ব সংস্কার (কবুলিয়ত ও পাট্টা প্রথা): তিনি জমি জরিপ করিয়ে উর্বরতা অনুযায়ী জমিকে তিন শ্রেণিতে বিভক্ত করেন এবং উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ কর ধার্য করেন। কৃষকদের অধিকারের নিশ্চয়তা দিয়ে ‘পাট্টা’ (দলিল) প্রদান করতেন এবং কৃষকরা কর প্রদানের অঙ্গীকার হিসেবে ‘কবুলিয়ত’ দিত। রায়তওয়ারি ব্যবস্থার তিনিই ছিলেন আদি প্রবক্তা।
- ২. গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড ও যোগাযোগ বিপ্লব: ব্যবসা-বাণিজ্য ও সৈন্য চলাচলের সুবিধার জন্য তিনি সোনারগাঁও (বাংলা) থেকে শুরু করে পেশোয়ার ও সিন্ধু পর্যন্ত প্রায় ১,৫০০ ক্রোশ দীর্ঘ ঐতিহাসিক ‘সড়ক-ই-আজম’ বা ‘গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড’ (GT Road) নির্মাণ করেন। এছাড়া আগ্রা-যোধপুর এবং লাহোর-মুলতান সড়ক নির্মাণ করেন। রাস্তার দুই পাশে ছায়াদানকারী বৃক্ষ রোপণ করা হয়।
- ৩. সরাইখানা ও ডাক বিভাগ (ঘোড়ার ডাক): প্রতি দুই ক্রোশ অন্তর তিনি ১,৭০০টি সরাইখানা (ডাকবাংলো) স্থাপন করেন, যেখানে হিন্দু ও মুসলিম মুসাফিরদের জন্য পৃথক খাদ্য ও পানীয়ের ব্যবস্থা ছিল। এই সরাইখানাগুলো ডাক চৌকি হিসেবে ব্যবহৃত হতো এবং দ্রুতগামী ঘোড়ার সাহায্যে ডাক আদান-প্রদান করা হতো।
- ৪. মুদ্রা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ (রুপিয়া প্রবর্তন): পূর্বে প্রচলিত মুদ্রার বিশৃঙ্খলা দূর করে শেরশাহ ১৭৮ গ্রেইন ওজনের বিশুদ্ধ রৌপ্যমুদ্রা চালু করেন, যার নাম ছিল ‘রুপিয়া’ (Rupiya)। এটিই আজকের আধুনিক ভারতীয়, পাকিস্তানি ও নেপালি মুদ্রার পূর্বসূরি। তিনি তাম্রমুদ্রা ‘দাম’ চালু করেন।
- ৫. বিচারব্যবস্থা ও কঠোর আইন-শৃঙ্খলা: তাঁর আমলে চোর-ডাকাতের উপদ্রব সম্পূর্ণ বন্ধ হয়। স্থানীয় গ্রামের প্রধানদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে তাদের এলাকায় চুরি হলে চোরকে হাজির করতে হবে, অন্যথায় গ্রামপ্রধানকেই ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
উপসংহার
ঐতিহাসিক কিন (Keene) যথার্থই মন্তব্য করেছেন, “কোনো সরকারই শেরশাহের চেয়ে বেশি প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে পারেনি।” শেরশাহ যদি কালিঞ্জর দুর্গে বারুদ বিস্ফোরণে অকালে মৃত্যুবরণ না করতেন, তবে ভারতীয় ইতিহাসের গতি হয়তো অন্যরকম হতো।
৩। সম্রাট আকবরের ধর্মনীতি বিশ্লেষণ কর।
[Analyze the religious policy of Emperor Akbar.]
ভূমিকা
মুঘল সম্রাট জালালুদ্দীন মুহাম্মদ আকবরের (শাসনকাল: ১৫৫৬—১৬০৫ খ্রি.) ধর্মনীতি ভারতীয় ইতিহাসের এক সর্বাধিক আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায়। ধর্মান্ধতা পরিহার করে বহুজাতি, বহুভাষা ও বহুধর্মাবলম্বী ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি মজবুত করার উদ্দেশ্যে তিনি ‘সুলহ-ই-কুল’ (সর্বজনীন সহনশীলতা ও শান্তি) নীতির প্রবর্তন করেন।
আকবরের ধর্মনীতির বিবর্তন ও পর্যায়সমূহ
- ১. উদারনীতির সূচনা (১৫৫৬—১৫৭৫ খ্রি.): রাজপুত রাজকন্যাদের বিবাহ, ১৫৬৩ সালে হিন্দু তীর্থকর বাতিল এবং ১৫৬৪ সালে জিজিয়া কর প্রত্যাহারের মাধ্যমে আকবর অমুসলিমদের মন জয় করেন। রাজা মানসিংহ ও বীরবলকে উচ্চ সামরিক ও প্রশাসনিক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়।
- ২. ইবাদতখানা প্রতিষ্ঠা (১৫৭৫ খ্রি.): ফতেহপুর সিক্রিতে তিনি ‘ইবাদতখানা’ স্থাপন করেন। প্রথমে কেবল সুন্নি আলেমদের ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্কের সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু আলেমদের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ও ব্যক্তিগত কোন্দলে বিরক্ত হয়ে ১৫৭৮ সালে তিনি শিয়া, হিন্দু, জৈন, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও পারসি পণ্ডিতদেরও বিতর্কে অংশগ্রহণের অনুমতি দেন।
- ৩. মাহজার বা অভ্রান্ততার সনদ (১৫৭৯ খ্রি.): শেখ মুবারকের সহায়তায় আকবর আলেমদের দ্বারা স্বাক্ষরিত ‘মাহজার’ (Infallibility Decree) জারি করেন। এর মাধ্যমে কুরআন-হাদিসের বিপরীতে নয় এমন কোনো ধর্মীয় মতপার্থক্য দেখা দিলে আকবরকে সর্বময় চূড়ান্ত বিচারক (ইমাম-ই-আদিল) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
- ৪. দীন-ই-ইলাহী প্রবর্তন (১৫৮২ খ্রি.): বিভিন্ন ধর্মের সারবস্তু নিয়ে আকবর ‘তৌহিদ-ই-ইলাহী’ বা ‘দীন-ই-ইলাহী’ নামে এক সমন্বয়বাদী আধ্যাত্মিক সুফি মতাদর্শ প্রচার করেন। এতে কোনো বাধ্যতামূলক বিশ্বাস, ধর্মগ্রন্থ বা উপাসনালয় ছিল না। একেশ্বরবাদ, অহিংসা, সূর্য বন্দনা, নিরামিষভোজন এবং আত্মশুদ্ধি ছিল এর মূল শিক্ষা। আকবরের জীবদ্দশায় মাত্র ১৮ জন প্রধান অমাত্য (একমাত্র হিন্দু বীরবলসহ) এতে দীক্ষা নিয়েছিলেন।
সমালোচনা ও মূল্যায়ন
সমসাময়িক ইতিহাসবিদ আব্দুল কাদির বাদাউনী তাঁর ‘মুনতাখাবুত তাওয়ারিখ’ গ্রন্থে অভিযোগ করেছেন যে আকবর ইসলামি শরিয়তের মৌলিক বিধিবিধানকে লঙ্ঘন করে স্বধর্ম ত্যাগ করেছিলেন। সমসাময়িক সুফি মুজাদ্দিদে আলফে সানি (রহ.) আকবরের ধর্মীয় সংস্কারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। পক্ষান্তরে আবুল ফজল তাঁর ‘আকবরনামা’-য় একে রাজনৈতিক সংহতির যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখিয়েছেন।
উপসংহার
আকবরের ধর্মনীতি কোনো নতুন ধর্ম প্রতিষ্ঠার ধর্মীয় প্রচেষ্টা ছিল না, বরং এটি ছিল একটি বহুধর্মীয় বিশাল দেশকে অখণ্ড রাজনৈতিক ঐক্যে বাঁধার কৌশলগত উদ্যোগ। ধর্মীয় ক্ষেত্রে তাঁর কিছু বিভ্রান্তিকর বাড়াবাড়ি থাকলেও রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তাঁর ধর্মীয় পরমতসহিষ্ণুতা মুঘল সাম্রাজ্যকে সুদৃঢ় স্থায়িত্ব দিয়েছিল।
৪। নুরজাহান কে ছিলেন? সম্রাট জাহাঙ্গীরের ওপর তাঁর প্রভাব বর্ণনা কর।
[Who was Nurjahan? Discuss her influence on Emperor Jahangir.]
ভূমিকা
মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে যে মহীয়সী নারী অসাধারণ সৌন্দর্য, প্রখর রাজনৈতিক মেধা এবং বুদ্ধিমত্তার বলে রাজসিংহাসনের পেছনে প্রকৃত সর্বময় কর্তৃত্ব প্রয়োগ করেছিলেন, তিনি হলেন নূরজাহান। ১৬১১ সালে সম্রাট জাহাঙ্গীরের সাথে বিবাহের পর থেকে ১৬২৭ সালে সম্রাটের মৃত্যু পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় দেড় দশককাল মুঘল সাম্রাজ্য কার্যত তাঁর রাজনৈতিক অঙ্গুলিহেলনে পরিচালিত হয়েছিল।
নূরজাহানের পরিচয়
নূরজাহানের প্রকৃত নাম ছিল মেহেরুন্নেসা। তিনি পারস্যের এক অভিজাত পরিবারের সন্তান মীর্জা গিয়াস বেগের কন্যা ছিলেন। ভাগ্যের অন্বেষণে ভারতে আসার পথে কান্দাহারের মরুভূমিতে তাঁর জন্ম হয়। প্রথমে বর্ধমানের জায়গিরদার শের আফগান আলীকুলী ইস্তাজলুর সাথে তাঁর বিয়ে হয়। শের আফগানের মৃত্যুর পর ১৬১১ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট জাহাঙ্গীর মেহেরুন্নেসার রূপ ও বুদ্ধিতে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে বিবাহ করেন এবং প্রথমে ‘নূর মহল’ (প্রাসাদের জ্যোতি) ও পরে ‘নূরজাহান’ (জগতের জ্যোতি) উপাধিতে ভূষিত করেন।
সম্রাট জাহাঙ্গীরের ওপর তাঁর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব
- ১. নূরজাহান জান্তা (The Nurjahan Junta): নূরজাহান দরবারে একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক চক্র গড়ে তোলেন, যা ইতিহাসে ‘নূরজাহান জান্তা’ নামে পরিচিত। এতে ছিলেন তাঁর পিতা ইতিমাদ-উদ-দৌলা (মীর্জা গিয়াস বেগ), ভাই আসফ খান এবং যুবরাজ খুররম (পরবর্তী শাহজাহান)। এই চক্রের অনুমোদন ছাড়া কোনো গুরুত্বপূর্ণ রাজকীয় সিদ্ধান্ত বা পদোন্নতি হতো না।
- ২. সম্রাটের আসক্তি ও সম্পূর্ণ নির্ভরতা: জাহাঙ্গীর ছিলেন শিল্পপ্রেমী কিন্তু মদ ও আফিমে আসক্ত। তিনি নিজেই আত্মজীবনী ‘তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরী’-তে অকপটে স্বীকার করেছেন: “আমি নূরজাহানের হাতে সাম্রাজ্যের শাসনভার সমর্পণ করেছি; আমার কেবল এক সের মাংস আর এক পেয়ালা মদের প্রয়োজন।”
- ৩. সার্বভৌম ক্ষমতার প্রয়োগ: নূরজাহান রাজদরবারে ‘ঝরোখা দর্শন’ দিতেন, যা কেবল মুঘল সম্রাটদের একক অধিকার ছিল। সম্রাটের সাথে তাঁর নামেও রৌপ্যমুদ্রা উৎকীর্ণ করা হতো। তিনি নিজ নামে রাজকীয় ফরমান (হুকুম) জারি করতেন এবং তাতে সম্রাটের মোহরের পাশে নূরজাহানের স্বাক্ষর থাকত।
- ৪. যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক নেতৃত্ব: ১৬২৬ খ্রিষ্টাব্দে রাজপুত সেনাপতি মহব্বত খান সম্রাট জাহাঙ্গীর ও আসফ খানকে বিতস্তা (ঝিলাম) নদীর তীরে বন্দি করলে নূরজাহান স্বয়ং যুদ্ধহস্তীর পিঠে চড়ে তীরন্দাজি করে সৈন্যদের নেতৃত্ব দেন এবং বীরত্ব ও কূটনীতির সমন্বয়ে সম্রাটকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করেন।
- ৫. সংস্কৃতি, ফ্যাশন ও স্থাপত্যে অবদান: নূরজাহান ছিলেন ভারতীয় ফ্যাশনের পথপ্রদর্শক। তিনি নতুন পোশাকের ডিজাইন, গোলাপের সুগন্ধি (আতর-ই-জাহাঙ্গীরী) এবং চমৎকার গালিচা আবিষ্কার করেন। পিতা ইতিমাদ-উদ-দৌলার স্মরণে আগ্রায় তিনি যে শ্বেতপাথরের সমাধি নির্মাণ করেন, তা পরবর্তীকালে তাজমহলের স্থাপত্য প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল।
উপসংহার
নূরজাহানের অতিরিক্ত রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং জামাতা শাহরিয়ারকে সিংহাসনে বসানোর ষড়যন্ত্রের কারণে শেষ জীবনে যুবরাজ খুররমের সাথে রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহ বাঁধে। তবে পুরুষতান্ত্রিক মধ্যযুগে একজন নারীর এমন অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও দূরদর্শী রাষ্ট্র পরিচালনা বিশ্ব ইতিহাসে সত্যিই এক বিরল বিস্ময়।
৫। পলাশি যুদ্ধের পটভূমি ও গুরুত্ব বর্ণনা কর।
[Describe the background and importance of the battle of Palassey.]
ভূমিকা
২৩ জুন ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর আম্রকাননে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভের মধ্যে যে নাটকীয় যুদ্ধ সংঘটিত হয়, তা পলাশীর যুদ্ধ নামে পরিচিত। মীর জাফরের চরম বিশ্বাসঘাতকতায় এই যুদ্ধে নবাবের পরাজয়ের ফলে বাংলায় কোম্পানি শাসনের সূচনা হয় এবং ভারত উপমহাদেশের স্বাধীনতা সূর্য প্রায় দুইশত বছরের জন্য অস্তমিত হয়।
যুদ্ধের পটভূমি ও প্রধান কারণসমূহ
- ১. নবাবের প্রতি ইংরেজদের অসৌজন্যতা: ১৭৫৬ সালে আলীবর্দী খানের মৃত্যুর পর তাঁর ২৩ বছর বয়সী তরুণ দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌলা বাংলার মসনদে বসেন। অন্যান্য ইউরোপীয় বণিকরা নজরানা পাঠালেও ইংরেজরা নবাবকে কোনো উপঢৌকন দেয়নি এবং নতুন নবাবকে অবজ্ঞা প্রদর্শন করে।
- ২. দস্তকের অপব্যবহার ও শুল্ক ফাঁকি: ১৭১৭ সালে মুঘল সম্রাট ফাররুখশিয়ারের দেওয়া বাণিজ্যিক ফরমান (দস্তক)-এর চরম অপব্যবহার করে ইংরেজ কর্মচারীরা ব্যক্তিগত অবৈধ বাণিজ্য চালাত এবং বাংলার রাজস্ব ফাঁকি দিত।
- ৩. দুর্গ নির্মাণ ও কৃষ্ণদাসকে আশ্রয় দান: নবাবের নির্দেশ অমান্য করে ইংরেজরা কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ সংস্কার করে এবং নবাবের রাজকোষের বিপুল অর্থ আত্মসাৎকারী কৃষ্ণদাসকে আশ্রয় দেয়। নবাব দূত পাঠালে তাকে অপমান করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।
- ৪. অন্ধকূপ হত্যার মিথ্যা রটনা (Black Hole Tragedy): নবাব কলকাতা আক্রমণ করে তা দখল করেন এবং এর নাম দেন আলীনগর। ইংরেজ কর্মচারী হলওয়েল প্রচার করে যে নবাব একটি ছোট কক্ষে ১৪৬ জন ইংরেজকে আটকে রেখে ১২৩ জনকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছেন। আধুনিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে এই গল্পটি ছিল ইংরেজদের যুদ্ধ বাঁধানোর মনগড়া প্রচার।
- ৫. উমিচাঁদ ও মীর জাফরের কুখ্যাত ষড়যন্ত্র: ক্লাইভ নবাবের প্রধান সেনাপতি মীর জাফর, রাজকোষের ধনী ব্যবসায়ী জগৎ শেঠ, রায় দুর্লভ, ইয়ার লতিফ ও উমিচাঁদের সাথে গোপন চুক্তি করেন যে নবাবকে উৎখাত করে মীর জাফরকে মসনদে বসানো হবে।
যুদ্ধের বিবরণ ও মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতা
পলাশীর ময়দানে নবাবের ৫০,০০০ সৈন্যের বিশাল বাহিনী ছিল, যার মধ্যে সেনাপতি মীর মদন ও মোহনলালের অধীনে মাত্র কয়েক হাজার সৈন্য জীবন বাজি রেখে ইংরেজ বাহিনীকে প্রায় পর্যুদস্ত করে ফেলেছিল। হঠাৎ বৃষ্টিতে নবাবের বারুদ ভিজে যায়। মীর মদন কামানের গোলার আঘাতে শাহাদাতবরণ করলে নবাব হতাশ হয়ে প্রধান সেনাপতি মীর জাফরের কাছে সাহায্য চান। মীর জাফর কোরআন স্পর্শ করে রক্ষার শপথ নিয়েও যুদ্ধ স্থগিত রাখার পরামর্শ দেন এবং ইংরেজদের আক্রমণের সুযোগ করে দেন। অপ্রস্তুত নবাব বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে এবং নবাব রাজধানী মুর্শিদাবাদে ফিরে যান।
যুদ্ধের গুরুত্ব ও সুদূরপ্রসারী ফলাফল
- বাংলার স্বাধীনতার অবসান: বাংলা তার রাজনৈতিক স্বাধীনতা হারায় এবং মীর জাফর ইংরেজদের হাতের পুতুলে পরিণত হন।
- পলাশী লুণ্ঠন (Plassy Plunder): ক্লাইভ ও কোম্পানির কর্মচারীরা নবাবের রাজকোষ থেকে প্রায় পৌনে তিন কোটি টাকা অবাধে লুট করে লন্ডনে পাচার করে, যা ব্রিটেনে শিল্প বিপ্লবের মূলধন হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
- ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন: একটি বাণিজ্যিক কোম্পানি হিসেবে আসা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রাজনৈতিক শাসকে রূপান্তরিত হয় এবং সমগ্র ভারত গ্রাস করার ভিত্তি অর্জন করে।
৬। মুঘল আমলে ভারতের আর্থ-সামাজিক অবস্থা পর্যালোচনা কর।
[Review the socio-economic conditions of India during the reign of the Mughal Empire.]
ভূমিকা
ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে মুঘল শাসনামলে ভারত বিশ্বের অন্যতম ধনী, উৎপাদনশীল ও সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ ভূখণ্ডে পরিণত হয়েছিল। এই সময়কালকে প্রাচুর্য ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার যুগ বলা হলেও সমাজের উচ্চশ্রেণি ও নিম্নবিত্ত কৃষকদের জীবনের মধ্যে আকাশ-পাতাল বৈষম্য বিদ্যমান ছিল।
সামাজিক অবস্থা
- সামাজিক শ্রেণিবিভাজন:
- উচ্চশ্রেণি: সম্রাট, রাজপরিবার, মনসবদার ও সুবেদাররা অগাধ ধনসম্পদ ও চরম বিলাসিতায় জীবনযাপন করতেন।
- মধ্যবিত্ত শ্রেণি: ব্যবসায়ী, সওদাগর, আলেম, কাজী ও বুদ্ধিজীবীরা মধ্যবিত্ত স্তর গঠন করেছিলেন।
- নিম্নশ্রেণি: সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষক, শ্রমিক, তাঁতি ও দাসরা অত্যন্ত সাদামাটা ও দারিদ্র্যের মধ্যে দিনাতিপাত করত।
- হিন্দু-মুসলিম সামাজিক সম্প্রীতি: রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্তরে দুই প্রধান সম্প্রদায়ের মধ্যে এক অভিন্ন ইন্দো-ইসলামিক সংস্কৃতির (গঙ্গা-যমুনি তহজিব) জন্ম হয়। পোশাকে কামিজ, পাজামা, আচকান এবং সংগীতে সেতার, তবলা ও খেয়াল উভয় সম্প্রদায়ের মিলনের মাধ্যম হয়।
- নারীর অবস্থান: সমাজে পর্দা প্রথা কঠোরভাবে পালিত হতো। সম্ভ্রান্ত নারীরা রাজনীতি ও শিল্পকলায় প্রভাব বিস্তার করলেও (যেমন: নূরজাহান, মমতাজ মহল, জাহানারা) সাধারণ সমাজে সতীদাহ, বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের মতো সামাজিক ব্যাধি বিদ্যমান ছিল।
অর্থনৈতিক অবস্থা
- কৃষি ও ভূমিনির্ভর অর্থনীতি: কৃষিকাজ ছিল প্রধান অর্থনৈতিক ভিত্তি। ধান, গম, তুলা, রেশম, নীল, আফিম ও মসলা প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত হতো। সম্রাট আকবরের যবতি ও রায়তওয়ারি ব্যবস্থা কৃষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
- বিশ্ববিখ্যাত শিল্প ও হস্তশিল্প: ভারতের তৈরি সুতি ও রেশম বস্ত্র বিশ্ববিখ্যাত ছিল। বিশেষ করে বাংলার বিশ্বখ্যাত ‘মসলিন’ ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজপ্রাসাদে সমাদৃত হতো। এছাড়া ধাতুশিল্প, জাহাজ নির্মাণ, অস্ত্র তৈরি ও চামড়াশিল্পে ভারত ছিল স্বয়ম্ভর।
- আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অনুকূল বাণিজ্য ভারসাম্য: ভারত থেকে ইউরোপ, পারস্য ও চীনে বিপুল পরিমাণ বস্ত্র, মসলা ও শোরা রপ্তানি হতো। এর বিনিময়ে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ ও রৌপ্য ভারতে প্রবেশ করত। ফরাসি পর্যটক বার্নিয়ার যথার্থই মন্তব্য করেছিলেন: “বিশ্বের সমস্ত স্বর্ণ ও রৌপ্য বিভিন্ন পথ ধরে শেষ পর্যন্ত হিন্দুস্তানের অতল গহ্বরে এসে জমা হয়।”
উপসংহার
মুঘল আমলের ভারত সামগ্রিকভাবে এক অর্থনৈতিক মহাপরাক্রমশালী দেশ ছিল, যা সমসাময়িক সমগ্র ইউরোপের সম্মিলিত অর্থনীতির চেয়েও বৃহৎ ছিল। তবে সম্পদের সুষম বণ্টনের অভাব এবং কৃষক শ্রেণির ওপর অতিরিক্ত করের চাপ পরবর্তীকালে সাম্রাজ্যের অবক্ষয়ের সামাজিক কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
খ বিভাগ (সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন)
৭। বক্সারের যুদ্ধ সম্পর্কে আলোচনা কর।
[Discuss the battle of Buxar.]
পটভূমি ও যুদ্ধের বিবরণ
২২ অক্টোবর ১৭৬৪ খ্রিষ্টাব্দে বিহারের বক্সার নামক স্থানে ইংরেজ কোম্পানির সেনাপতি মেজর হেক্টর মনরোর বাহিনীর বিরুদ্ধে বাংলার সাবেক নবাব মীর কাশিম, অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলা এবং মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের সম্মিলিত বাহিনীর মধ্যে রক্তক্ষয়ী বক্সারের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ইংরেজদের বাণিজ্যিক শোষণ ও সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপের প্রতিবাদ করায় নবাব মীর কাশিমকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল।
ফলাফল ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য
যৌথ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতার সুযোগ নিয়ে হেক্টর মনরো তাদের শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। মীর কাশিম পালিয়ে যান এবং নিঃস্ব অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। এই বিজয়ের পর ১৭৬৫ সালে রবার্ট ক্লাইভ সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের সাথে ‘এলাহাবাদের চুক্তি’ সম্পাদন করেন এবং বার্ষিক ২৬ লাখ টাকার বিনিময়ে বাংলা, বিহার ও ওড়িশার ‘দেওয়ানি’ (রাজস্ব আদায়ের অধিকার) লাভ করেন। বক্সারের যুদ্ধ পলাশীর অসম্পূর্ণ কাজকে চূড়ান্তভাবে সম্পূর্ণ করে এবং সমগ্র উত্তর ভারতে কোম্পানির রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে।
৮। সূর্যাস্ত আইন কী?
[What is sunset law?]
সংজ্ঞা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিস বাংলায় প্রবর্তিত ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ (Permanent Settlement)-এর আওতায় যে কঠোর ও নির্মম রাজস্ব আদায় সংক্রান্ত আইন জারি করেন, তা ইতিহাসে ‘সূর্যাস্ত আইন’ (Sunset Law) নামে পরিচিত।
আইনের মূল বিধান ও প্রভাব
এই আইনের শর্তানুযায়ী, নির্ধারিত বছরের নির্দিষ্ট দিনের ঠিক সূর্যাস্তের পূর্বমুহূর্তের মধ্যে জমিদারকে তাঁর সমস্ত সরকারি রাজস্বের কিস্তি সরকারি কোষাগারে বাধ্যতামূলকভাবে জমা দিতে হতো। যদি সূর্যাস্তের এক মিনিট পরেও কোনো জমিদার রাজস্ব জমা দিতে ব্যর্থ হতেন, তবে কোনো প্রকার অজুহাত গ্রহণ না করে পরদিনই তাঁর সমগ্র জমিদারি প্রকাশ্য নিলামে বিক্রি করে দেওয়া হতো। এই আইনের নির্মম শিকার হয়ে বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী বহু বনেদি জমিদার তাদের বংশানুক্রমিক জমিদারি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন এবং তাদের স্থান দখল করে কলকাতার সুযোগসন্ধানী বেনিয়া ও নতুন ধনিক শ্রেণি।
৯। মমতাজ মহল কে ছিলেন?
[Who was Mumtaz Mahal?]
পরিচয় ও জীবনবৃত্তান্ত
মমতাজ মহল ছিলেন মুঘল ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা প্রভাবশালী ও প্রিয়তমা সম্রাজ্ঞী। তিনি ছিলেন পঞ্চম মুঘল সম্রাট শাহজাহানের প্রধান স্ত্রী। তাঁর মূল নাম ছিল আরজুমান্দ বানু বেগম। তিনি সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রধানমন্ত্রী ইতিমাদ-উদ-দৌলার পৌত্রী এবং আসফ খানের কন্যা ছিলেন (অর্থাৎ নূরজাহান ছিলেন তাঁর ফুফু)।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও তাজমহল
১৬১২ সালে শাহজাহানের সাথে তাঁর বিবাহ হয়। তিনি কেবল অপরূপ রূপসীই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন শাহজাহানের সবচেয়ে বিশ্বস্ত রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও সঙ্গী। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শুরু করে রাজদরবার—সর্বত্র তিনি সম্রাটের পাশে ছায়ার মতো থাকতেন। সম্রাট তাঁকে ‘মমতাজ মহল’ (প্রাসাদের শ্রেষ্ঠ রত্ন) উপাধিতে ভূষিত করেন এবং তাঁর হাতে রাজকীয় সিলমোহর ‘মুহর উজুক’ সংরক্ষণের দায়িত্ব দেন। ১৬৩১ খ্রিষ্টাব্দে দক্ষিণ ভারতের বুরহানপুরে ১৪তম সন্তান প্রসবকালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর এই অমর ভালোবাসার স্মৃতি চিরভাস্বর করে রাখতে সম্রাট শাহজাহান যমুনা নদীর তীরে বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের অন্যতম স্থাপত্য বিস্ময় ‘তাজমহল’ নির্মাণ করেন।
১০। ‘বাবুরনামা’-এর ওপর একটি টীকা লেখ।
[Write a short note on ‘The Memories of Babur’.]
গ্রন্থ পরিচিতি ও বৈশিষ্ট্য
মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহিরুদ্দীন মুহাম্মদ বাবরের স্বরচিত বিশ্ববিখ্যাত আত্মজীবনীটির প্রকৃত নাম ‘ওয়াকায়াত-ই-বাবুরী’ বা ‘তুজুক-ই-বাবুরী’, যা সাধারণত ‘বাবুরনামা’ (The Memories of Babur) নামে পরিচিত। এটি মূল তুর্কি ভাষার চাঘাতাই উপভাষায় রচিত এবং পরবর্তীতে সম্রাট আকবরের আমলে আব্দুল রহিম খান-ই-খানান কর্তৃক ফারসি ভাষায় অনূদিত হয়।
গ্রন্থের মূল বিষয়বস্তু ও মূল্যায়ন
বাবুরনামা বিশ্বসাহিত্যের আত্মজীবনীমূলক ধারায় এক অমূল্য মাস্টারপিস। বাবর কোনো কিছু গোপন না করে অত্যন্ত সততা ও অকপটতার সাথে নিজের গুণাবলী, ভুলভ্রান্তি, মদ্যপান এবং দুর্বলতার কথা লিপিবদ্ধ করেছেন। এতে কেবল রাজনৈতিক অভিযান নয়, বরং মধ্য এশিয়া ও উত্তর ভারতের ভূগোল, নদীনালা, ফুল-ফল, পশুপাখি, মানুষের চরিত্র ও সামাজিক রীতিনীতির নিখুঁত বৈজ্ঞানিক চিত্র ফুটে উঠেছে। ব্রিটিশ ঐতিহাসিক লেনপুল মন্তব্য করেছেন, “বাবুরনামার মতো জীবন্ত ও প্রামাণ্য আত্মজীবনী বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া বিরল।”
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ‘ভারতীয় মুসলমানদের ইতিহাস (১৫২৬—১৮৫৭)’ পেপারে কোন কোন শাসক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?
এ পেপারে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবর, আফগান সংস্কারক শেরশাহ সূরী, মহান সম্রাট আকবর, জাহাঙ্গীরের আমলে নূরজাহানের ভূমিকা, শাহজাহানের স্বর্ণযুগ ও স্থাপত্য, আওরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীতি এবং ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
২. পানিপথের প্রথম যুদ্ধ ও দ্বিতীয় যুদ্ধের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কী?
প্রথম পানিপথের যুদ্ধ (১৫২৬ খ্রি.) বাবরের সাথে ইব্রাহিম লোদীর মধ্যে হয় যা মুঘল বংশ প্রতিষ্ঠা করে; আর দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধ (১৫৫৬ খ্রি.) কিশোর আকবরের পক্ষে বৈরাম খাঁ হিমুর আফগান বাহিনীকে হারিয়ে মুঘল শাসনকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।
৩. শেরশাহ সূরীকে কেন আধুনিক ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রশাসনিক স্থপতি বলা হয়?
তিনি ভূমিরাজস্বে কবুলিয়ত ও পাট্টা প্রথা, দেড় হাজার ক্রোশ দীর্ঘ গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড, ডাক চৌকি ও সরাইখানা এবং আধুনিক মুদ্রা ‘রুপিয়া’ প্রবর্তন করেন, যা পরবর্তীকালে মুঘল ও ব্রিটিশ প্রশাসনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
৪. আকবরের ‘দীন-ই-ইলাহী’ কি সম্পূর্ণ নতুন কোনো ধর্ম ছিল?
ঐতিহাসিকদের মতে, দীন-ই-ইলাহী কোনো সাংগঠনিক নতুন ধর্ম ছিল না; বরং এটি ছিল সর্বজনীন সহনশীলতা (সুলহ-ই-কুল) প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন ধর্মের ইতিবাচক নৈতিক শিক্ষার সমন্বয়ে গঠিত একটি রাজকীয় আধ্যাত্মিক সুফি মতাদর্শ।
৫. পলাশী যুদ্ধের চেয়ে বক্সারের যুদ্ধের গুরুত্ব কেন বেশি মনে করা হয়?
পলাশী ছিল কূটকৌশল ও বিশ্বাসঘাতকতায় অর্জিত খণ্ড যুদ্ধ, কিন্তু বক্সার ছিল তিনটি প্রধান শক্তির (মুঘল সম্রাট, অযোধ্যার নবাব ও বাংলার নবাব) বিরুদ্ধে ব্রিটিশদের সরাসরি সামরিক বিজয়, যার ফলেই কোম্পানি দেওয়ানি লাভ করে স্থায়ী রাজনৈতিক শাসকে পরিণত হয়।
৬. ২০৫১০৪ বিষয়ের পরীক্ষার খাতায় ভালো উত্তরের বৈশিষ্ট্য কী?
মুঘল আমলের সঠিক প্রশাসনিক পরিভাষা (মনসবদার, জায়গিরদার, সুবা, দিওয়ানি, দস্তক), ঐতিহাসিক সন-তারিখ এবং বিখ্যাত ইতিহাসবিদদের (আবুল ফজল, বাদাউনী, বার্নিয়ার) বিশ্লেষণাত্মক মূল্যায়ন সমন্বয় করা আবশ্যক।

