ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত পরীক্ষা
ফাযিল (স্নাতক) পাস প্রথম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪
[দিরাসাতুল হাদীস] [নতুন সিলেবাস অনুযায়ী]
প্রথম পত্র : দিরাসাতুল হাদীস-১ (বিষয় কোড: ১১১০১১)
সময়: ৩ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ১০০
[الملاحظة : أجب عن خمسة من مجموعة (أ) وعن أربعة من مجموعة (ب) – والأعداد بالهامش تدل على الدرجة الكاملة -]
[দ্রষ্টব্য : (أ) অংশ থেকে পাঁচটি ও (ب) অংশ থেকে চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও। বাম পাশে উল্লিখিত সংখ্যা প্রশ্নের পূর্ণমান জ্ঞাপক।]
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন অনুষ্ঠিত ফাযিল স্নাতক (পাস) ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪-এর ‘দিরাসাতুল হাদীস ১ম পত্র’ (বিষয় কোড: ১১১০১১)-এর মূল প্রশ্নপত্রের সকল প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ, প্রামাণ্য ও গবেষণাধর্মী সমাধান নিচে উপস্থাপন করা হলো। মিশকাতুল মাসাবীহ, ফাতহুল বারী ও শরহে নববীর আলোকে প্রতিটি হাদিসের অর্থ, তাহক্বীক্ব ও আনুষঙ্গিক মাসআলা অ্যাকাডেমিক মানে সংকলিত হয়েছে।
১। عن أبي هريرة رضي الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : حق المسلم على المسلم خمس رد السلام وعيادة المريض واتباع الجنائز وإجابة الدعوة وتشميت العاطس – (متفق عليه)
[হাদিসের অনুবাদ এবং সালামের উত্তর, জানাজার ফজিলত ও ‘মুত্তাফাকুন আলাইহি’-এর ব্যাখ্যা]
[মান: ১৬ (অনুবাদ ৭ + ক ৩ + খ ৩ + গ ৩)]
ভূমিকা ও হাদিসের পটভূমি
ইসলাম কেবল একটি ব্যক্তিগত বিশ্বাসের নাম নয়; বরং এটি একটি অনুপম সামাজিক ভ্রাতৃত্বের চিরন্তন ব্যবস্থা। পারস্পরিক হৃদ্যতা, সম্মান ও মানবিক সহমর্মিতা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) মুসলিম সমাজের সদস্যদের ওপর কিছু মৌলিক অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আলোচ্য হাদিসটি সেই সামাজিক শিষ্টাচারের এক অনন্য দলিল।
মূল হাদিসের প্রামাণ্য বঙ্গানুবাদ
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
«حَقُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ خَمْسٌ: رَدُّ السَّلَامِ، وَعِيَادَةُ الْمَرِيضِ، وَاتِّبَاعُ الْجَنَائِزِ، وَإِجَابَةُ الدَّعْوَةِ، وَتَشْمِيتُ الْعَاطِسِ»
“এক মুসলমানের ওপর অপর মুসলমানের পাঁচটি সুনির্দিষ্ট হক বা অধিকার রয়েছে: (১) সালামের উত্তর দেওয়া, (২) অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাওয়া (রোগীর সেবা-শুশ্রূষা করা), (৩) জানাজার পেছনে পেছনে যাওয়া (জানাজা ও দাফনে অংশগ্রহণ করা), (৪) দাওয়াত দিলে তা গ্রহণ করা, এবং (৫) হাঁচি দিয়ে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বললে তার জবাবে ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বলা।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)।
(ক) সালামের উত্তর প্রদানের শারঈ বিধান (حكم رد السلام)
- সালাম দেওয়া বনাম উত্তর দেওয়া: ইসলামি শরিয়তের সর্বসম্মত নীতি অনুযায়ী কাউকে প্রথমে সালাম দেওয়া হলো সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ (বা সুন্নাত)। তবে একদল মানুষের মধ্য থেকে একজন সালাম দিলে তা সুন্নাতে কিফায়াহ হিসেবে আদায় হয়ে যায়।
- উত্তর প্রদানের বিধান: সালামের উত্তর প্রদান করা ওয়াজিব বা ফরজ। যদি কোনো একক ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে সালাম দেওয়া হয়, তবে তার ওপর সালামের উত্তর দেওয়া ফরজে আইন (বা ওয়াজিবে আইন)। আর যদি কোনো দলের ওপর সালাম দেওয়া হয়, তবে সেই দলের অন্তত একজন ব্যক্তির উত্তর দেওয়া ফরজে কিফায়াহ; দলের কেউ উত্তর না দিলে সকলেই গুনাহগার হবে, আর যেকোনো একজন উত্তর দিলে সকলেই দায়মুক্ত হবে। আল্লাহ বলেন: «وَإِذَا حُيِّيتُمْ بِتَحِيَّةٍ فَحَيُّوا بِأَحْسَنَ مِنْهَا أَوْ رُدُّوهَا» (সূরা আন-নিসা: ৮৬) — “যখন তোমাদেরকে সালাম দেওয়া হয়, তখন তোমরা তার চেয়ে উত্তম উত্তর দাও অথবা অনুরূপ ফিরিয়ে দাও।”
(খ) জানাজায় অংশগ্রহণের ফজিলত (فضائل اتباع الجنائز)
- বিশাল সওয়াবের ঘোষণা (ক্বীরাত অর্জন): সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের জানাজায় শরিক হয়ে সালাত আদায় করে, সে এক ‘ক্বীরাত’ পরিমাণ সওয়াব লাভ করে। আর যে ব্যক্তি দাফন সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত সাথে থাকে, সে দুই ক্বীরাত সওয়াব অর্জন করে। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! দুই ক্বীরাত কী?’ তিনি বললেন: “দুটি বিশাল পাহাড়ের সমপরিমাণ, যার ক্ষুদ্রতমটি হলো ওহুদ পাহাড়ের সমান!” (সহিহ বুখারি)।
- মৃত ব্যক্তির জন্য মাগফিরাত: জানাজায় যখন কোনো শিরকমুক্ত নেককার জামাত মৃত ব্যক্তির মাগফিরাতের জন্য আন্তরিক দোয়া করে, আল্লাহ তাদের সুপারিশ কবুল করে মৃত বান্দাকে ক্ষমা করে দেন।
- আখেরাতের বাস্তব স্মরণ: জানাজায় অংশ নিলে মানুষের হৃদয়ে মৃত্যুর স্মরণ তাজা হয়, দুনিয়ার মোহ দূর হয় এবং আখেরাতের জবাবদিহিতা জাগ্রত হয়।
(গ) ‘মুত্তাফাকুন আলাইহি’ (متفق عليه)-এর পারিভাষিক অর্থ
হাদিসশাস্ত্রের পরিভাষায় ‘মুত্তাফাকুন আলাইহি’ (বা সর্বসম্মত হাদিস) বলতে বোঝায়—যে হাদিসটির মূল মতন ও সাহাবীর সূত্রে ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল-বুখারি (রহ.) তাঁর ‘সহিহুল বুখারি’ গ্রন্থে এবং ইমাম মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ আল-কুশাইরী (রহ.) তাঁর ‘সহিহ মুসলিম’ গ্রন্থে উভয়েই যৌথভাবে সংকলন করেছেন। হাদিসের বিশুদ্ধতার স্তরবিন্যাসে ‘মুত্তাফাকুন আলাইহি’ হলো বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বোচ্চ নির্ভরযোগ্য স্তর।
উপসংহার
হাদিসটিতে বর্ণিত পাঁচটি সামাজিক অধিকার বাস্তবায়ন করলে সমাজে পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ দূরীভূত হয়ে এক নিবিড় ভ্রাতৃত্বপূর্ণ পরিবেশ কায়েম হয়।
২। عن جابر بن عتيك (رض) قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : الشهادة سبع سوى القتل في سبيل الله، المطعون شهيد والغرق شهيد، وصاحب ذات الجنب شهيد، والمبطون شهيد وصاحب الحريق شهيد، والذى يموت تحت الهدم شهيد، والمرأة تموت بجمع شهيد – (رواه مالك وابو داود)
[হাদিসের অনুবাদ এবং শহীদের পরিচয়, প্রকারভেদ, ফজিলত ও গোসল সংক্রান্ত বিধান]
[মান: ১৬ (অনুবাদ ৭ + ক ৩ + খ ৩ + গ ৩)]
ভূমিকা ও হাদিসের পটভূমি
আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনে নিজের প্রাণ বিসর্জন দেওয়া মানবজীবনের চরম পরাকাষ্ঠা। জিহাদের ময়দানে শহীদ হওয়া ছাড়াও আল্লাহর অসীম রহমতের কারণে সাধারণ মুমিনদের বিশেষ কিছু কঠিন ও পীড়াদায়ক মৃত্যুর ক্ষেত্রেও শহীদি মর্যাদা দান করা হয়েছে। আলোচ্য হাদিসে বিশ্বনবী (সা.) সেই সুসংবাদ প্রদান করেছেন।
মূল হাদিসের প্রামাণ্য বঙ্গানুবাদ
হযরত জাবির ইবনে আতীক্ব (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
«الشَّهَادَةُ سَبْعٌ سِوَى الْقَتْلِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ: الْمَطْعُونُ شَهِيدٌ، وَالْغَرِقُ شَهِيدٌ، وَصَاحِبُ ذَاتِ الْجَنْبِ شَهِيدٌ، وَالْمَبْطُونُ شَهِيدٌ، وَصَاحِبُ الْحَرِيقِ شَهِيدٌ، وَالَّذِي يَمُوتُ تَحْتَ الْهَدْمِ شَهِيدٌ، وَالْمَرْأَةُ تَمُوتُ بِجُمْعٍ شَهِيدٌ»
“আল্লাহর পথে শহীদ হওয়া ছাড়াও আরও সাত প্রকারের শাহাদাত রয়েছে: (১) মহামারীতে (প্লেগে) মৃত্যুবরণকারী শহীদ, (২) পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণকারী শহীদ, (৩) প্লুরিসি বা ফুসফুসের মারাত্মক রোগে (যাতুল জাম্ব) মৃত্যুবরণকারী শহীদ, (৪) পেটের পীড়ায় বা উদরাময়ে মৃত্যুবরণকারী শহীদ, (৫) আগুনে পুড়ে মৃত্যুবরণকারী শহীদ, (৬) ধ্বংসস্তূপ বা দেয়াল চাপা পড়ে মৃত্যুবরণকারী শহীদ, এবং (৭) সন্তান প্রসবকালে বা গর্ভবতী অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী নারী শহীদ।” (মুয়াত্তা মালিক ও সুনানে আবু দাউদ)।
(ক) শহীদের সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ (معنى الشهيد وأقسامه)
- শহীদের সংজ্ঞা: শরিয়তের পরিভাষায়—যে ব্যক্তি দ্বীনের হিফাজতে আল্লাহর পথে কাফের বা বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াই করে নিহত হয়, কিংবা বিশেষ কোনো কঠিন প্রাকৃতিক ও শারীরিক বিপদে ধৈর্যধারণ করে ঈমানের সাথে মৃত্যুবরণ করে, তাকে শহীদ বলা হয়। সত্যের পক্ষে নিজের জীবন দিয়ে সাক্ষ্য দেওয়ার কারণে তাকে ‘শহীদ’ বলা হয়।
- শহীদের তিনটি প্রধান প্রকার:
- ১. দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জাহানের শহীদ (شهيد الدنيا والآخرة): যে ব্যক্তি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে জিহাদের ময়দানে লড়াই করে কাফেরদের আঘাতে শাহাদাত বরণ করে। দুনিয়ায় তাকে গোসল দেওয়া হয় না এবং পরিহিত কাপড়ে দাফন করা হয়; আখেরাতে সে সর্বোচ্চ মর্যাদা লাভ করবে।
- ২. কেবল আখেরাতের শহীদ (شهيد الآخرة فقط): যারা আলোচ্য হাদিসে বর্ণিত সাত শ্রেণির মতো স্বাভাবিক জীবনে রোগ-ব্যাধি, পানিতে ডুবে, পুড়ে বা প্রসববেদনায় মারা যান। পার্থিব নিয়মে তাদেরকে সাধারণ মৃতের মতো গোসল ও কাফন দেওয়া হবে, কিন্তু আখেরাতে তারা শহীদের সওয়াব লাভ করবেন।
- ৩. কেবল দুনিয়ার শহীদ (شهيد الدنيا فقط): যে ব্যক্তি লোকদেখানো বীরত্ব, গনীমতের লোভ বা পার্থিব উদ্দেশ্যে জিহাদে নিহত হয়। দুনিয়ায় তাকে শহীদের মতো দাফন করা হলেও পরকালে সে কোনো সওয়াব পাবে না, বরং রিয়াকারীর শাস্তি ভোগ করবে।
(খ) আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাতের মর্যাদা ও ফজিলত (فضائل الشهادة)
- রক্তের প্রথম ফোঁটাতেই ক্ষমা: রাসুল (সা.) বলেন, রক্তের প্রথম ফোঁটা মাটিতে পড়ার সাথে সাথেই শহীদের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।
- জীবন্ত অমরত্ব লাভ: আল্লাহ তাআলা বলেন: «وَلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتًا بَلْ أَحْيَاءٌ عِنْدَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُونَ» (সূরা আলে ইমরান: ১৬৯) — “যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদেরকে মৃত মনে কর না; বরং তারা তাদের রবের নিকট চিরঞ্জীব, রিজিকপ্রাপ্ত।”
- কবরের আজাব ও হাশরের ভয় থেকে মুক্তি: শহীদ ব্যক্তি কবরের ফেতনা ও আজাব থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকে এবং কিয়ামতের মহাত্রাস তাকে স্পর্শ করবে না।
- ৭০ জন নিকটাত্মীয়ের জন্য শাফাআত: শহীদকে নিজের পরিবারের ৭০ জন দোজখী সদস্যের জন্য সুপারিশ করার অনন্য ক্ষমতা প্রদান করা হবে।
(গ) শহীদদের গোসল দেওয়ার শারঈ বিধান (غسل الشهداء)
- জিহাদের ময়দানের শহীদ: চার মাজহাবের ইমামগণের সর্বসম্মত ঐকমত্য অনুযায়ী, কাফেরদের সাথে সম্মুখ সমরে নিহত শহীদকে গোসল দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ (নাজায়েজ)। তাদের রক্তমাখা পবিত্র পোশাকেই দাফন করা হবে। কিয়ামতের দিন তাদের শরীর থেকে মৃগনাভীর সুবাসযুক্ত রক্ত প্রবাহিত হবে।
- রোগাক্রান্ত বা হুকমি শহীদ (আলোচ্য সাত শ্রেণি): পানিতে ডোবা, আগুনে পোড়া, পেটের পীড়ায় বা প্রসবকালে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তিদের সাধারণ মুসলিমদের মতোই গোসল দেওয়া এবং কাফন পরানো ওয়াজিব বা ফরজ। তাদের শহীদি মর্যাদা কেবল পরকালীন সওয়াবের ক্ষেত্রে নির্ধারিত।
উপসংহার
মুমিনের প্রতিটি কষ্ট ও রোগ-শোক আল্লাহর নিকট বৃথা যায় না; বিপদে ধৈর্য ধরলে আল্লাহ সাধারণ মৃত্যুকেও শাহাদাতের মহান মর্যাদায় রূপান্তর করে দেন।
৩। عن عبد الله بن عباس (رض) قال إن رجلا : كان مع النبي صلى الله عليه وسلم فوقصته ناقته وهو محرم فمات، فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم : اغسلوه بماء وسدر وكفنوه في ثوبيه ولا تمسوه بطيب، ولا تخمروا رأسه فإنه يبعث يوم القيامة ملبيا – (متفق عليه)
[হাদিসের অনুবাদ এবং পুরুষ ও নারীর কাফন, গোসলের পদ্ধতি ও ইহরাম অবস্থায় মৃত ব্যক্তির কাফন]
[মান: ১৬ (অনুবাদ ৭ + ক ৩ + খ ৩ + গ ৩)]
ভূমিকা ও হাদিসের পটভূমি
বিদায় হজের ঐতিহাসিক সফরে আরাফাতের ময়দানে ইহরাম পরিহিত এক সাহাবী উটের পিঠ থেকে পড়ে গিয়ে ঘাড় ভেঙে ইন্তেকাল করেন। ইহরাম অবস্থায় কোনো মুমিন মারা গেলে তার গোসল, কাফন ও দাফনের স্বতন্ত্র নিয়মাবলি কী হবে, রাসুলুল্লাহ (সা.) এই যুগান্তকারী হাদিসে তা বাস্তবভাবে শিক্ষা দিয়েছেন।
মূল হাদিসের প্রামাণ্য বঙ্গানুবাদ
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী করীম (সা.)-এর সাথে আরাফাতে অবস্থান করছিলেন। হঠাৎ তাঁর উষ্ট্রী তাঁকে নিচে ফেলে দিল এবং পদদলিত করে তাঁর ঘাড় ভেঙে দিল, ফলে তিনি মারা গেলেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন:
«اغْسِلُوهُ بِمَاءٍ وَسِدْرٍ، وَكَفِّنُوهُ فِي ثَوْبَيْهِ، وَلَا تَمَسُّوهُ بِطِيبٍ، وَلَا تُخَمِّرُوا رَأْسَهُ، فَإِنَّهُ يُبْعَثُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مُلَبِّيًا»
“তোমরা তাকে পানি ও বরই পাতা দিয়ে গোসল করাও, এবং তাকে তার ইহরামের কাপড় দুটি দিয়েই কাফন পরাও। তাকে কোনো সুগন্ধি লাগাবে না এবং তার মাথা ঢাকবে না; কেননা কিয়ামতের দিন সে ‘লাব্বাইক’ ধ্বনিতে তালবিয়া পাঠ করতে করতে পুনরুত্থিত হবে।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)।
(ক) পুরুষ ও নারীর সুন্নাত কাফনের বিবরণ (سنة الكفن للرجال والنساء)
- পুরুষের সুন্নাত কাফন (৩ খণ্ড কাপড়):
- ১. ইযার (إزار): মাথা থেকে পা পর্যন্ত দীর্ঘ চাদর।
- ২. ক্বামীস বা কুর্তা (قميص): কাঁধ থেকে হাঁটু বা পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত জামাবিশেষ (কলার ও হাতা ছাড়া)।
- ৩. লিফাফাহ বা চাদর (لفافة): মাথা ও পায়ের দিকে সামান্য অতিরিক্ত কাপড়সহ সবচেয়ে বড় চাদর, যা দিয়ে পুরো শরীর আবৃত করে দুই প্রান্তে গিট দেওয়া হয়।
- নারীর সুন্নাত কাফন (৫ খণ্ড কাপড়):
- ১. ইযার, ২. ক্বামীস, ৩. লিফাফাহ (পূর্বোক্ত তিনটি কাপড়), এবং অতিরিক্ত—
- ৪. খির্কা বা সিনাবন্দ (خرقة / لفافة الثديين): বুক থেকে পেট পর্যন্ত বাঁধার জন্য চওড়া কাপড়।
- ৫. খিমার বা ওড়না (خمار): মাথা ও চুল আবৃত করে মুখমণ্ডলের ওপর রাখার কাপড়।
(খ) মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেওয়ার সুন্নাত পদ্ধতি (كيفية غسل الميت)
- মৃত ব্যক্তিকে একটি উঁচু খাটিয়ায় বা তক্তায় শুইয়ে নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত কাপড় দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।
- গোসলকারী হাতে কাপড় পেঁচিয়ে মৃত ব্যক্তির পায়খানা ও পেশাবের রাস্তা পরিষ্কার করবে (ইস্তিনজা করাবে)।
- এরপর মৃত ব্যক্তিকে নামাজের ওজুর ন্যায় ওজু করাতে হবে; তবে মুখে বা নাকে সরাসরি পানি প্রবেশ করাবে না, বরং ভেজা আঙুল দিয়ে ঠোঁট ও দাঁত মুছে দেবে।
- অতঃপর বরই পাতা সিদ্ধ করা হালকা গরম পানি দিয়ে প্রথমে মাথা ও দাড়ি ধৌত করবে। এরপর ডান কাতে শুইয়ে ডান পাশ এবং বাম কাতে শুইয়ে বাম পাশ সুন্দরভাবে ধৌত করবে।
- সর্বশেষে কর্পূরমিশ্রিত পানি দিয়ে পুরো শরীরে ঢেলে দিয়ে পবিত্র কাপড় দিয়ে শরীর মুছে কাফন পরাবে।
(গ) ইহরাম অবস্থায় মৃত ব্যক্তির কাফনের ক্ষেত্রে ইমামদের মতপার্থক্য
- ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.): আলোচ্য হাদিসের প্রত্যক্ষ নির্দেশ অনুযায়ী ইহরাম অবস্থায় মৃত ব্যক্তির মাথা ও মুখমণ্ডল অনাবৃত রাখতে হবে এবং কোনো সুগন্ধি ব্যবহার করা যাবে না; কারণ মৃত্যুর পরও তার ইহরামের হুকুম অবশিষ্ট থাকে।
- ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মালিক (রহ.): তাঁদের মতে মৃত্যুর সাথে সাথেই মানুষের দুনিয়ার যাবতীয় তাকলীফ বা বিধান শেষ হয়ে যায়। অতএব সাধারণ মৃতের মতোই তাকে পূর্ণ তিন কাপড়ে মাথা ঢেকে কাফন পরাতে হবে। তাঁরা বলেন, আরাফাতের ওই সাহাবীর জন্য মাথা খোলা রাখার হুকুমটি ছিল রাসুল (সা.) কর্তৃক প্রদত্ত বিশেষ মর্যাদা, যা সাধারণ সবার জন্য প্রযোজ্য নয়।
উপসংহার
মৃত ব্যক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন ইসলামি শরীয়তের অন্যতম প্রতীক। বিশেষ করে আল্লাহর ঘরের মেহমান মুহরিম ব্যক্তির মর্যাদা মৃত্যুর পরও অক্ষুণ্ণ থাকে।
৪। عن أبي مالك الأشعري رضى الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : أربع في أمتي من أمر الجاهلية لا يتركونهن الفخر في الأحساب، والطعن في الأنساب، والاستسقاء بالنجوم والنياحة، و قال : النائحة إذا لم تتب قبل موتها تقام يوم القيامة وعليها سربال من قطران ودرع من جرب – (رواه مسلم)
[হাদিসের অনুবাদ এবং জাহেলি রীতিনীতি, নক্ষত্রের মাধ্যমে বৃষ্টি প্রার্থনা ও শব্দ তাহক্বীক্ব]
[মান: ১৬ (অনুবাদ ৭ + ক ৩ + খ ৩ + গ ৩)]
ভূমিকা ও হাদিসের পটভূমি
ইসলামের শুভাগমনের পূর্বে আরবের সমাজ ব্যবস্থা অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও জাহেলিয়াতের অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মানবজাতিকে তাওহীদ ও নৈতিকতার আলো দান করেছেন। তবে উম্মতের মধ্যে যেন জাহেলি কোনো পাপের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেজন্য রাসুল (সা.) বহু পূর্বেই ভবিষ্যদ্বাণী ও সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছিলেন।
মূল হাদিসের প্রামাণ্য বঙ্গানুবাদ
হযরত আবু মালিক আল-আশআরী (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
«أَرْبَعٌ فِي أُمَّتِي مِنْ أَمْرِ الْجَاهِلِيَّةِ لَا يَتْرُكُونَهُنَّ: الْفَخْرُ فِي الْأَحْسَابِ، وَالطَّعْنُ فِي الْأَنْسَابِ، وَالِاسْتِسْقَاءُ بِالنُّجُومِ، وَالنِّيَاحَةُ، وَقَالَ: النَّائِحَةُ إِذَا لَمْ تَتُبْ قَبْلَ مَوْتِهَا تُقَامُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَعَلَيْهَا سِرْبَالٌ مِنْ قَطِرَانٍ وَدِرْعٌ مِنْ جَرَبٍ»
“আমার উম্মতের মধ্যে জাহেলি যুগের চারটি এমন কুপ্রথা বিদ্যমান থাকবে, যা তারা ছাড়তে পারবে না: (১) বংশমর্যাদার বড়াই ও অহংকার করা, (২) অপরের বংশ তুলে কটূক্তি ও দোষারোপ করা, (৩) তারকার প্রভাবের মাধ্যমে বৃষ্টি প্রার্থনা করা, এবং (৪) মৃত ব্যক্তির শোকে বিলাপ করে কান্নাকাটি করা (নিয়াহাহ)। অতঃপর তিনি বলেন: বিলাপকারিনী নারী যদি মৃত্যুর পূর্বে তওবা না করে, তবে কিয়ামতের দিন তাকে এমন অবস্থায় দাঁড় করানো হবে যে তার শরীরে আলকাতরার পায়জামা এবং চুলকানিযুক্ত খোস-পাঁচড়ার বর্ম পরানো থাকবে।” (সহিহ মুসলিম)।
(ক) “أربع فى أمتى من أمر الجاهلية”-এর মর্মার্থ
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই বাণীর উদ্দেশ্য হলো—এই চারটি কাজ মূলত প্রাক-ইসলামি জাহেলি যুগের কাফেরদের ঘৃণ্য অভ্যাস। ইসলাম গ্রহণ করার পর একজন মুমিনের চরিত্র থেকে এগুলো সমূলে উৎপাটিত হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু অজ্ঞতা ও দুর্বলতার কারণে উম্মতের একটি অংশ এই অভ্যাসগুলোতে লিপ্ত থাকবে। রাসুল (সা.) এই অভ্যাসের কঠোর নিন্দা করে উম্মাহকে সতর্ক করেছেন যাতে মুমিনরা এগুলোকে ঘৃণাভরে পরিত্যাগ করে।
(খ) “والاستسقاء بالنجوم” (নক্ষত্রের মাধ্যমে বৃষ্টি প্রার্থনা)-এর বিশদ ব্যাখ্যা
- জাহেলি বিশ্বাস: প্রাচীন আরবরা বিশ্বাস করত যে অমুক নক্ষত্রের উদয় বা অস্ত যাওয়ার কারণে বৃষ্টিপাত হয়। তারা বৃষ্টির জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া না করে নক্ষত্র ও গ্রহের ক্ষমতাকে মূল কারণ মনে করত।
- শারঈ বিধান: কেউ যদি বিশ্বাস করে যে নক্ষত্রই স্বয়ং স্বাধীনভাবে বৃষ্টি বর্ষণ করে, তবে তা স্পষ্ট কুফর ও শিরকে আকবর। আর কেউ যদি বিশ্বাস করে যে বৃষ্টি দেন একমাত্র আল্লাহ, তবে নক্ষত্রের উদয়-অস্ত কেবল একটি সময়সূচক আলামত মাত্র—তবে এটি শিরক না হলেও জাহেলি পরিভাষা হওয়ার কারণে কঠোরভাবে অপছন্দনীয় ও নাজায়েজ। রাসুল (সা.) বলেন: “যে ব্যক্তি বলল নক্ষত্রের প্রভাবে বৃষ্টি হয়েছে, সে আমার প্রতি কুফরি করল এবং নক্ষত্রে ঈমান আনল।” (বুখারি)।
(গ) শব্দ বিশ্লেষণ ও ব্যাকরণিক তাহক্বীক্ব (تحقيق الألفاظ)
- ১. لَمْ تَتُبْ (লাম তাতুব):
সিগাহ: ওয়াহেদ মুয়ান্নাস গায়েব; বাহাস: নাফী জাহাদ বা লাম বাফেলে মুজারে মারূফ; বাব: নাসারা-ইয়ানসুরু; মাদাহ: তা-ওয়াও-বা (ت و ب); জিনস: আজওয়াফে ওয়াবী; অর্থ: সে তওবা করেনি।
- ২. تُقَامُ (তুক্বামু):
সিগাহ: ওয়াহেদ মুয়ান্নাস গায়েব; বাহাস: ফেলে মুজারে মাজহুল; বাব: ইফআল (الإقامة); মাদাহ: ক্বাফ-ওয়াও-মীম (ق و م); জিনস: আজওয়াফে ওয়াবী; অর্থ: তাকে দাঁড় করানো বা উত্থিত করা হবে।
- ৩. الْأَنْسَابِ (আল-আনসাব):
এটি বিশেষ্য পদ (ইসমে জামিদ), বহুবচন। এর একবচন হলো ‘নাসাব’ (نسب)। অর্থ: বংশধারা, রক্তের সম্পর্ক বা পিতৃকুল।
উপসংহার
বংশগৌরব, পরনিন্দা ও তাকদিরে অসন্তোষের মতো সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্ত থেকে নির্ভেজাল ঈমানের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকাই এই হাদিসের চূড়ান্ত শিক্ষা।
৫। عن ابن عمر رضى الله عنهما قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : لا حسد إلا على اثنين : رجل آتاه الله القرآن فهو يقوم به آناء الليل و آناء النهار و رجل آتاه الله مالا فهو ينفق منه آناء الليل و آناء النهار – (متفق عليه)
[হাদিসের অনুবাদ এবং ‘লা হাসাদা…’, কুরআনের নামকরণ ও হাসাদ বনাম গিবতাহর পার্থক্য]
[মান: ১৬ (অনুবাদ ৭ + ক ৩ + খ ৩ + গ ৩)]
ভূমিকা ও হাদিসের পটভূমি
ইসলামে হিংসা-বিদ্বেষকে অন্তরের মারাত্মক মরণব্যাধি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। হিংসুক ব্যক্তি অন্যের নিয়ামত ধ্বংস কামনা করে নিজের নেক আমল জ্বালিয়ে ভস্মীভূত করে। তবে কোনো মুমিনের নেক আমল দেখে নিজের জীবনেও অনুরূপ সৎকাজ করার প্রবল আকাঙ্ক্ষাকে ইসলাম বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছে, যা এই হাদিসে মূর্ত হয়ে উঠেছে।
মূল হাদিসের প্রামাণ্য বঙ্গানুবাদ
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
«لَا حَسَدَ إِلَّا عَلَى اثْنَتَيْنِ: رَجُلٌ آتَاهُ اللَّهُ الْقُرْآنَ فَهُوَ يَقُومُ بِهِ آنَاءَ اللَّيْلِ وَآنَاءَ النَّهَارِ، وَرَجُلٌ آتَاهُ اللَّهُ مَالًا فَهُوَ يُنْفِقُ مِنْهُ آنَاءَ اللَّيْلِ وَآنَاءَ النَّهَارِ»
“দুটি বিষয় ছাড়া আর কোনো বিষয়েই ঈর্ষা বা আকাঙ্ক্ষা করা বৈধ নয়: (১) এমন এক ব্যক্তি যাকে আল্লাহ তাআলা কুরআনের জ্ঞান ও হিফজ দান করেছেন, অতঃপর সে রাত-দিনের বিভিন্ন প্রহরে তা নিয়ে সালাতে দণ্ডায়মান থাকে ও তেলাওয়াত করে; এবং (২) এমন এক ব্যক্তি যাকে আল্লাহ তাআলা বিপুল ধনসম্পদ দান করেছেন, অতঃপর সে রাত-দিনের বিভিন্ন প্রহরে তা থেকে আল্লাহর রাস্তায় অকাতরে দান করে।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)।
(ক) “لا حسد إلا على اثنين”-এর মর্মার্থ ও ব্যাখ্যা
মুহাদ্দিসগণের সর্বসম্মত মতে, এখানে ‘হাসাদ’ শব্দটি তার প্রকৃত আভিধানিক অর্থে ব্যবহৃত হয়নি; বরং তা মাজায বা রূপক অর্থে ‘আল-গিবতাহ’ (الغبطة – শুভকামনামূলক ঈর্ষা বা সৎ আকাঙ্ক্ষা) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ অন্যের ধন বা জ্ঞান ধ্বংস হোক—এই ধরনের হিংসা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম। হাদিসের অর্থ হলো—যদি কোনো বিষয়ে মানুষের মনে ঈর্ষা বা তীব্র আকুলতা জাগ্রত হতেই হয়, তবে তা এই দুটি কল্যাণময় কাজের ক্ষেত্রেই হওয়া উচিত, অন্য কোনো পার্থিব বিষয়ে নয়।
(খ) কুরআনকে ‘আল-কুরআন’ নামকরণের তাৎপর্য (وجه تسمية القرآن)
- ১. ‘আল-ক্বিরাআত’ (القراءة – পাঠ করা) থেকে নিষ্পন্ন: ‘কুরআন’ শব্দটি ‘ক্বারাআ’ ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ পাঠ করা। যেহেতু এই মহাগ্রন্থটি বিশ্বজগতে সর্বাধিক পঠিত, লক্ষ কোটি মানুষ প্রতিনিয়ত সালাতে ও নিভৃতে এটি তেলাওয়াত করে, তাই একে ‘কুরআন’ বলা হয়েছে।
- ২. ‘আল-ক্বারন’ (القرن – একত্রিত করা) থেকে নিষ্পন্ন: এর অর্থ হলো জমা করা বা সংযুক্ত করা। যেহেতু এই কিতাবে পূর্ববর্তী সমস্ত আসমানি কিতাবের নির্যাস, বিধানাবলি, সুসংবাদ ও উপদেশমালা চমৎকারভাবে একত্র করা হয়েছে, তাই একে কুরআন বলা হয়।
(গ) হাসাদ (الحسد) ও গিবতাহ (الغبطة)-এর মৌলিক পার্থক্য
- হাসাদ (হিংসা বা ঈর্ষা): অপরের কোনো নিয়ামত, রূপ, ধন বা সম্মান দেখে অন্তরে জ্বালা অনুভব করা এবং সেই নিয়ামতটি যেন তার কাছ থেকে ধ্বংস বা বিলুপ্ত হয়ে যায়—সেই কামনা করা। এটি শরিয়তে সম্পূর্ণ হারাম ও কবিরা গুনাহ। রাসুল (সা.) বলেন: “তোমরা হিংসা থেকে বাঁচো; কেননা আগুন যেভাবে কাঠকে পুড়িয়ে ছাই করে, হিংসা সেভাবে নেক আমল ধ্বংস করে দেয়।”
- গিবতাহ (সৎ ঈর্ষা বা শুভাকাঙ্ক্ষা): অপরের কোনো ধর্মীয় জ্ঞান, তাকওয়া বা নেক আমল দেখে আনন্দিত হওয়া এবং মনে মনে কামনা করা—‘আল্লাহ যদি আমাকেও এমন তাওফিক দিতেন, তবে আমিও এমন আমল করতাম!’ কিন্তু সে ব্যক্তির নিয়ামত ধ্বংসের বিন্দুমাত্র কামনা না করা। এটি শরিয়তে সম্পূর্ণ জায়েজ এবং অত্যন্ত প্রশংসনীয় (মুস্তাহাব)।
উপসংহার
কুরআনের সাথে রাত-দিন জুড়ে থাকা এবং আল্লাহর রাস্তায় মুক্তহস্তে সম্পদ বিলিয়ে দেওয়াই মুমিনের জীবনের প্রকৃত সফলতার মাপকাঠি।
৬। عن أبي هريرة رضى الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : لكل نبي دعوة مستجابة، فتعجل كل نبى دعوته و إنى اختبأت دعوتي شفاعة لأمتي إلى يوم القيامة، فهى نائلة إن شاء الله من مات من امتى لا يشرك بالله شيئا – (رواه مسلم)
[হাদিসের অনুবাদ এবং দোয়ার শিষ্টাচার, কবুলিয়তের শর্ত ও শাফাআতের দলিল]
[মান: ১৬ (অনুবাদ ৭ + ক ৩ + খ ৩ + গ ৩)]
ভূমিকা ও হাদিসের পটভূমি
আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রেরিত প্রত্যেক নবী ও রাসুলকে একটি বিশেষ নিশ্চিত কবুলযোগ্য দোয়ার অধিকার দিয়েছিলেন। পূর্ববর্তী সকল নবী দুনিয়াতেই স্বীয় উম্মতের মুক্তি অথবা ধ্বংসের জন্য সে দোয়া করে ফেলেছিলেন। কিন্তু উম্মতের প্রতি দয়ার সাগর বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.) নিজের সেই অমূল্য সুযোগটি দুনিয়ায় ব্যবহার না করে কিয়ামতের কঠিন ময়দানে পাপী উম্মতকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করার জন্য গচ্ছিত রেখেছেন।
মূল হাদিসের প্রামাণ্য বঙ্গানুবাদ
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
«لِكُلِّ نَبِيٍّ دَعْوَةٌ مُسْتَجَابَةٌ، فَتَعَجَّلَ كُلُّ نَبِيٍّ دَعْوَتَهُ، وَإِنِّي اخْتَبَأْتُ دَعْوَتِي شَفَاعَةً لِأُمَّتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ، فَهِيَ نَائِلَةٌ إِنْ شَاءَ اللَّهُ مَنْ مَاتَ مِنْ أُمَّتِي لَا يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا»
“প্রত্যেক নবীর জন্যই একটি সুনির্দিষ্ট দোয়া রয়েছে যা নিশ্চিত কবুল করা হয়। ফলে প্রত্যেক নবীই দুনিয়াতে দ্রুত নিজের সে দোয়ার ব্যবহার করে নিয়েছেন। কিন্তু আমি আমার সেই বিশেষ দোয়াটি কিয়ামতের দিন আমার উম্মতের শাফাআত বা সুপারিশের জন্য গোপন করে সংরক্ষণ করে রেখেছি। আর আমার এই শাফাআত—ইনশাআল্লাহ—আমার উম্মতের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে বিন্দুমাত্র শিরক না করে মৃত্যুবরণ করবে, সে-ই লাভ করবে।” (সহিহ মুসলিম)।
(ক) দোয়ার অর্থ ও প্রধান প্রধান আদবসমূহ (معنى الدعاء وآدابه)
- দোয়ার অর্থ: ‘দোয়া’ শব্দের অর্থ আহ্বান করা, প্রার্থনা করা বা চাওয়া। শরিয়তের পরিভাষায়—পরম বিনয়, ভক্তি ও অসহায়ত্ব প্রকাশ করে মহান আল্লাহর দরবারে কল্যাণ প্রার্থনা ও অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়াই হলো দোয়া। দোয়া হলো ইবাদতের মূল মগজ।
- দোয়ার প্রধান আদবসমূহ:
- ১. আল্লাহর হামদ-সানা ও রাসুল (সা.)-এর ওপর দরূদ পাঠের মাধ্যমে দোয়া শুরু ও শেষ করা।
- ২. কিবলামুখী হয়ে পবিত্র শরীরে উভয় হাত বক্ষ বরাবর তুলে দোয়া করা।
- ৩. অন্তরে পূর্ণ একিন ও আশা রাখা যে আল্লাহ অবশ্যই আমার দোয়া শুনবেন ও কবুল করবেন।
- ৪. অনুনয়-বিনয়, নম্রতা ও অশ্রুসিক্ত নয়নে নিভৃতে ব্যাকুল হয়ে দোয়া করা।
- ৫. দোয়ায় কোনো গুনাহ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবি না করা এবং তাড়াহুড়া না করা।
(খ) দোয়া কবুলের আবশ্যকীয় শর্তাবলি (شروط قبول الدعاء)
- ১. শতভাগ হালাল উপার্জন ও খাদ্য গ্রহণ: হারাম ভক্ষণকারীর দোয়া আল্লাহ কবুল করেন না। রাসুল (সা.) এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেন যে দীর্ঘ সফর করে ধুলায় মলিন হয়ে দুই হাত তুলে দোয়া করে অথচ তার খাদ্য, পানীয় ও পোশাক হারাম; তার দোয়া কীভাবে কবুল হবে?
- ২. একনিষ্ঠ ইখলাস ও শিরকমুক্ত ঈমান: আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো পীর, মাযার বা সৃষ্টির কাছে কিছু চাওয়া যাবে না; একমাত্র আল্লাহর জন্য নিবেদিত হতে হবে।
- ৩. জাগ্রত ও মনোযোগী হৃদয়: অবচেতন ও অমনোযোগী অন্তরের দোয়া আল্লাহ কবুল করেন না।
(গ) আহলে সুন্নাতের মতে শাফাআত সাব্যস্তের অকাট্য দলিলসমূহ
- ১. কুরআনের সুস্পষ্ট দলিল: আল্লাহ বলেন: «مَنْ ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ» (সূরা বাক্বারা: ২৫৫) — “এমন কে আছে যে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর নিকট সুপারিশ করতে পারে?” অর্থাৎ আল্লাহর অনুমতিতে সুপারিশ হবে।
- ২. হাদিসের মুতাওয়াতির প্রমাণ: রাসুল (সা.) দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন: «شَفَاعَتِي لِأَهْلِ الْكَبَائِرِ مِنْ أُمَّتِي» (আবু দাউদ ও তিরমিযী) — “আমার শাফাআত আমার উম্মতের কবীরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিদের জন্য নির্ধারিত।” খারেজী ও মুতাযিলারা কবীরা গুনাহগারদের জন্য শাফাআত অস্বীকার করলেও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের সর্বসম্মত আকিদা হলো—আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে নবীজী (সা.)-এর শাফাআতের মাধ্যমে অগনিত জাহান্নামী মুমিনকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে।
উপসংহার
শিরকমুক্ত নির্ভেজাল ঈমান নিয়ে মৃত্যুবরণ করাই হলো বিশ্বনবী (সা.)-এর কালজয়ী শাফাআত লাভের একমাত্র শর্ত ও মহামূল্যবান চাবিকাঠি।
৭। عن أبي هريرة رضى الله عنه عن النبي صلى الله عليه وسلم قال : أنا أولى بالمؤمنين من أنفسهم، فمن مات وعليه دين ولم يترك وفاء فعلى قضاؤه، ومن ترك مالا فلورثته، وفى رواية : من ترك دينا أو ضياعا فليأتنى فأنا مولاه – وفى رواية : من ترك مالا فلورثته ومن ترك كلا فإلينا – (متفق عليه)
[হাদিসের অনুবাদ এবং ‘আনা আওলা…’, মৃতের ত্যাজ্যবিত্তের অধিকার ও শব্দ বিশ্লেষণ]
[মান: ১৬ (অনুবাদ ৭ + ক ৩ + খ ৩ + গ ৩)]
ভূমিকা ও হাদিসের পটভূমি
ইসলামি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রাসুলুল্লাহ (সা.) কীভাবে জনগণের অভিভাবকত্ব পালন করেছিলেন এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিলেন, এ হাদিস তার এক উজ্জ্বল দলিল। ইসলামের প্রাথমিক যুগে কোনো ঋণী ব্যক্তি মারা গেলে রাসুল (সা.) তার জানাজা পড়তেন না। পরবর্তীতে যখন আল্লাহ ইসলামি রাষ্ট্রকে বিজয়ী ও সম্পদশালী করলেন, তখন তিনি ঘোষণা দিলেন যে অসহায় ঋণী ও এতিমদের দেনা শোধের দায়িত্ব খোদ রাষ্ট্রপ্রধানের।
মূল হাদিসের প্রামাণ্য বঙ্গানুবাদ
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
«أَنَا أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ، فَمَنْ مَاتَ وَعَلَيْهِ دَيْنٌ وَلَمْ يَتْرُكْ وَفَاءً فَعَلَيَّ قَضَاؤُهُ، وَمَنْ تَرَكَ مَالًا فَلِوَرَثَتِهِ»
“আমি মুমিনদের কাছে তাদের নিজেদের জীবনের চেয়েও অধিক নিকটবর্তী ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত। অতএব কোনো মুমিন যদি এমন অবস্থায় মারা যায় যে তার ওপর ঋণ রয়েছে এবং তা পরিশোধের কোনো সম্পদ সে রেখে যায়নি, তবে তার সে ঋণ পরিশোধ করার দায়িত্ব আমার নিজের ওপর। আর যে ব্যক্তি ধনসম্পদ রেখে মারা যাবে, তা তার বৈধ উত্তরাধিকারীদের প্রাপ্য হবে।” অপর বর্ণনায় রয়েছে: “যে ব্যক্তি ঋণ কিংবা অসহায় পরিবার-পরিজন রেখে মারা যায়, তারা যেন আমার কাছে আসে; কেননা আমিই তাদের অভিভাবক।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)।
(ক) “أنا أولى بالمؤمنين من أنفسهم”-এর প্রাঞ্জল ব্যাখ্যা
পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আহযাবের ৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন: «النَّبِيُّ أَوْلَىٰ بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ» — “নবী মুমিনদের নিকট তাদের নিজেদের প্রাণের চেয়েও অধিক ঘনিষ্ঠ ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত।” এর অর্থ হলো:
- ১. পার্থিব ও পরকালীন প্রতিটি সিদ্ধান্তে নিজের নফস ও প্রবৃত্তির দাবির চেয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও নির্দেশকে প্রাধান্য দেওয়া ওয়াজিব।
- ২. রাসুল (সা.) মুমিনদের প্রতি নিজের পিতা-মাতার চেয়েও বেশি স্নেহশীল ও পরম হিতাকাঙ্ক্ষী।
- ৩. সামাজিক ও নাগরিক জীবনে প্রতিটি অসহায় মুমিনের দায়িত্ব গ্রহণকারী চূড়ান্ত অভিভাবক হলেন রাসুল (সা.) এবং তাঁর পরবর্তী ইসলামি রাষ্ট্রের ন্যায়পরায়ণ শাসক।
(খ) মৃত ব্যক্তির ত্যাজ্যবিত্তের সাথে সংশ্লিষ্ট চারটি অধিকার (الحقوق المتعلقة بالتركة)
কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তার রেখে যাওয়া ধনসম্পদের ওপর পর্যায়ক্রমে চারটি অধিকার কার্যকর করা শরিয়তে ফরজ:
- ১. তাজহীয ও তাকফীন (تجهيز وتكفين): মৃত ব্যক্তির কাফন, দাফন ও কবরের যাবতীয় প্রয়োজনীয় খরচ কোনো প্রকার অপচয় বা কার্পণ্য ছাড়া তার মূল সম্পদ থেকে মেটানো।
- ২. ঋণ পরিশোধ (قضاء الديون): দাফন খরচের পর অবশিষ্ট সম্পদ থেকে মৃত ব্যক্তির পাওনাদারদের সমস্ত ঋণ পরিশোধ করা। বান্দার হক্ব পরিশোধ না করে ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন সম্পূর্ণ হারাম।
- ৩. ওসীয়ত বাস্তবায়ন (تنفيذ الوصايا): ঋণ পরিশোধের পর যা অবশিষ্ট থাকবে, তার সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) থেকে মৃতের বৈধ ওসীয়ত কার্যকর করা।
- ৪. ওয়ারিশদের মধ্যে মিরাস বণ্টন (قسمة الميراث): পূর্বোক্ত তিনটি হক্ব আদায়ের পর যা অবশিষ্ট থাকবে, তা কুরআনে নির্ধারিত ফারায়িজের নিয়মানুযায়ী বৈধ ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন করা।
(গ) শব্দ বিশ্লেষণ ও ব্যাকরণিক তাহক্বীক্ব (تحليل الكلمات)
- ১. أَوْلَى (আওলা): এটি ইসমে তাফযীল (اسم تفضيل)। মূল ধাতু ‘ওয়া-লাম-ইয়া’ (و ل ي)। অর্থ: অধিক নিকটবর্তী, সর্বাধিক হকদার বা অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত।
- ২. الْمُؤْمِنِينَ (আল-মু’মিনীন): ইসমে ফায়েল (اسم فاعل), বহুবচন (জমা মুযাক্কার সালেম)। একবচন ‘মু’মিন’। বাব: ইফআল। অর্থ: বিশ্বাসীগণ বা ঈমানদারবৃন্দ।
- ৩. لِيَأْتِ (লি-ইয়া’তি): এটি ফেলে আমর গায়েব (فعل أمر غائب)। শুরুতে ‘লামে আমর’ যুক্ত হওয়ার কারণে শেষ বর্ণ ইয়া হরফে ইল্লত বিলুপ্ত হয়েছে। অর্থ: সে যেন আসে।
উপসংহার
হাদিসটি ইসলামি অর্থনীতির মানবিক রূপ এবং শরিয়তের ইনসাফভিত্তিক উত্তরাধিকার ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার অনন্য দলিল।
৮। عن ابى ذر رضى الله عنه قال سألت النبى صلى الله عليه وسلم : أى العمل افضل؟ قال : إيمان بالله وجهاد في سبيله قال : قلت فأى الرقاب أفضل؟ قال أغلاها ثمنا وأنفسها عند أهلها، قلت فإن لم أفعل؟ قال تعين صانعا او تصنع لأخرق، قلت فإن لم أفعل؟ قال تدع الناس من الشر، فإنها صدقة تصدق بها على نفسك – (متفق عليه)
[হাদিসের অনুবাদ এবং জিহাদের বিধান, দাসমুক্তির গুরুত্ব ও শব্দ বিশ্লেষণ]
[মান: ১৬ (অনুবাদ ৭ + ক ৩ + খ ৩ + গ ৩)]
ভূমিকা ও হাদিসের পটভূমি
সাহাবায়ে কেরামের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল সর্বোচ্চ সওয়াব অর্জন করে জান্নাত নিশ্চিত করা। বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আবু যর গিফারী (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট আমলের স্তরবিন্যাস ও বাস্তব সমাজসেবার সহজ উপায় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। রাসুল (সা.) সামর্থ্যের ভিন্নতা অনুযায়ী মানবকল্যাণ ও আত্মরক্ষার চমৎকার পথ বাতলে দিয়েছেন।
মূল হাদিসের প্রামাণ্য বঙ্গানুবাদ
হযরত আবু যর (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী করীম (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলাম:
«أَيُّ الْعَمَلِ أَفْضَلُ؟ قَالَ: إِيمَانٌ بِاللَّهِ وَجِهَادٌ فِي سَبِيلِهِ، قَالَ: قُلْتُ فَأَيُّ الرِّقَابِ أَفْضَلُ؟ قَالَ: أَغْلَاهَا ثَمَنًا وَأَنْفَسُهَا عِنْدَ أَهْلِهَا، قُلْتُ: فَإِنْ لَمْ أَفْعَلْ؟ قَالَ: تُعِينُ صَانِعًا أَوْ تَصْنَعُ لِأَخْرَقَ، قُلْتُ: فَإِنْ لَمْ أَفْعَلْ؟ قَالَ: تَدَعُ النَّاسَ مِنَ الشَّرِّ، فَإِنَّهَا صَدَقَةٌ تَصَدَّقُ بِهَا عَلَى نَفْسِكَ»
“কোন আমলটি সর্বোত্তম? তিনি বললেন: আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন করা এবং তাঁর রাস্তায় জিহাদ করা। আমি বললাম: কোন শ্রেণির ক্রীতদাস মুক্ত করা সর্বাধিক উত্তম? তিনি বললেন: মূল্যের দিক থেকে যা সবচেয়ে মূল্যবান এবং তার মালিকের নিকট যা সবচেয়ে বেশি প্রিয়। আমি বললাম: আমি যদি তা করতে অপারগ হই? তিনি বললেন: তবে তুমি কোনো কারিগর বা শ্রমিকের কাজে সাহায্য কর অথবা কোনো অদক্ষ ব্যক্তির কাজ নিজে করে দাও। আমি বললাম: যদি আমি তাও করতে অক্ষম হই? তিনি বললেন: তবে তুমি মানুষকে তোমার অনিষ্ট থেকে বাঁচিয়ে রাখ (কারো ক্ষতি কর না); কেননা এটিও তোমার নিজের পক্ষ থেকে তোমার নফসের জন্য একটি সদকা।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)।
(ক) জিহাদের সংজ্ঞা ও বর্তমান যুগে জিহাদের শারঈ হুকুম
- জিহাদের সংজ্ঞা: শাব্দিক অর্থে জিহাদ হলো সত্য ও ন্যায়ের জন্য নিজের সর্বোচ্চ শক্তি ও প্রচেষ্টা ব্যয় করা। পারিভাষিক অর্থে আল্লাহর দ্বীনকে সমুন্নত রাখতে সত্যবিরোধীদের বিরুদ্ধে জান, মাল ও কথা দিয়ে সর্বাত্মক সংগ্রাম করা।
- বর্তমান যুগে জিহাদের রূপ ও হুকুম:
- ১. আত্মরক্ষামূলক সশস্ত্র জিহাদ: মুসলিম ভূমি আক্রান্ত হলে আক্রান্ত অঞ্চলের অধিবাসীদের ওপর প্রতিরোধ গড়ে তোলা ফরজে আইন।
- ২. বুদ্ধিবৃত্তিক ও মিডিয়া জিহাদ (جهاد الفكر واللسان): বর্তমান যুগে ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণার জবাবে কুরআন ও সুন্নাহর পক্ষে কলম, বক্তব্য, তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরা অন্যতম প্রধান ফরজ জিহাদ।
- ৩. আর্থিক জিহাদ (الجهاد بالمال): নির্যাতিত মুসলিমদের সাহায্যার্থে সম্পদ ব্যয় করা।
- ৪. নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ (جهاد النفس): নিজের কুপ্রবৃত্তি দমন করে আল্লাহর হুকুম মান্য করা।
(খ) ‘ইতক্ব’ (العتق – দাসমুক্তি)-এর অর্থ ও প্রকারভেদ
- শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ: ‘ইতক্ব’ অর্থ মুক্ত করা বা স্বাধীনতা দান করা। শরিয়তের পরিভাষায়—দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে একজন মানুষকে পূর্ণ স্বাধীন ও মর্যাদাবান নাগরিকে পরিণত করা। ইসলাম দাসপ্রথা নির্মূলে একে শ্রেষ্ঠ পুণ্য ঘোষণা করেছে।
- দাসমুক্তির প্রকারভেদ:
- ১. ওয়াজিব মুক্তি (الإعتاق الواجب): কাফফারা আদায়ের জন্য মুক্ত করা (যেমন ভুলক্রমে হত্যার কাফফারা, যিহারের কাফফারা বা কসমের কাফফারা)।
- ২. মুস্তাহাব মুক্তি (الإعتاق المستحب): কোনো কারণ ছাড়াই কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য স্বেচ্ছায় দাস মুক্ত করা।
- ৩. মুকাতাবাত (المكاتبة): দাসের সাথে চুক্তি করে অর্থের বিনিময়ে তাকে মুক্তি প্রদান করা।
(গ) শব্দ বিশ্লেষণ ও ব্যাকরণিক তাহক্বীক্ব (تحليل الكلمات)
- ১. أَفْضَلُ (আফদালু): ইসমে তাফযীল, বাবে ফাদিলা-ইয়াফদুলু। অর্থ: সর্বাপেক্ষা উত্তম বা শ্রেষ্ঠ।
- ২. تَدَعُ (তাদা’উ): ফেলে মুজারে মারূফ, সিগাহ ওয়াহেদ মুযাক্কার হাযির। বাব ফাতাহা। আসল রূপ ‘তাওদাউ’, الواو হরফে ইল্লত বিলুপ্ত হয়েছে। অর্থ: তুমি ছেড়ে দেবে বা বিরত রাখবে।
- ৩. تُعِينُ (তুঈনু): ফেলে মুজারে মারূফ, বাব ইফআল (الإعانة), সিগাহ ওয়াহেদ মুযাক্কার হাযির। মাদাহ ‘আইন-ওয়াও-নূন’। অর্থ: তুমি সাহায্য করবে।
উপসংহার
ইসলাম মানুষকে নিষ্ক্রিয় থাকতে শেখায় না; বিশাল কুরবানি সম্ভব না হলেও অন্তত নিজের হাত ও মুখ দ্বারা মানুষের ক্ষতি না করাও এক বিরাট সদকা।
৯। عن عبد الرحمن بن سمرة قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : يا عبد الرحمن بن سمرة لا تسأل الامارة فإنك إن أوتيتها عن مسألة وكلت إليها وإن أوتيتها عن غير مسألة أعنت عليها وإذا حلفت على يمين فرأيت غيرها خيرا منها فكفر عن يمينك وأت الذى هو خير – (متفق عليه)
[হাদিসের অনুবাদ এবং ইমারতের পরিচয়, পদলিপ্সার পরিণতি ও কসমের কাফফারা]
[মান: ১৬ (অনুবাদ ৭ + ক ৩ + খ ৩ + গ ৩)]
ভূমিকা ও হাদিসের পটভূমি
ক্ষমতা ও নেতৃত্ব মানবজীবনের চরম মোহময় বস্তু। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে নেতৃত্ব কোনো ভোগের বিষয় নয়; বরং এটি দুনিয়ার কঠিন দায়িত্ব ও পরকালের চরম লাঞ্ছনার ঝুঁকি। বিশ্বনবী (সা.) প্রখ্যাত সাহাবী আব্দুর রহমান ইবনে সামুরাহ (রা.)-কে লক্ষ্য করে রাষ্ট্র পরিচালনা ও কসমের ব্যাপারে চিরন্তন দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন।
মূল হাদিসের প্রামাণ্য বঙ্গানুবাদ
হযরত আব্দুর রহমান ইবনে সামুরাহ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে বলেছেন:
«يَا عَبْدَ الرَّحْمَنِ بْنَ سَمُرَةَ، لَا تَسْأَلِ الْإِمَارَةَ، فَإِنَّكَ إِنْ أُوتِيتَهَا عَنْ مَسْأَلَةٍ وُكِلْتَ إِلَيْهَا، وَإِنْ أُوتِيتَهَا عَنْ غَيْرِ مَسْأَلَةٍ أُعِنْتَ عَلَيْهَا، وَإِذَا حَلَفْتَ عَلَى يَمِينٍ فَرَأَيْتَ غَيْرَهَا خَيْرًا مِنْهَا، فَكَفِّرْ عَنْ يَمِينِكَ وَأْتِ الَّذِي هُوَ خَيْرٌ»
“হে আব্দুর রহমান ইবনে সামুরাহ! তুমি কখনো নেতৃত্ব বা প্রশাসনিক পদ চেয়ে নিও না। কেননা তুমি যদি চেয়ে নেওয়ার কারণে তা লাভ কর, তবে তোমাকে তার ওপর একাকী ছেড়ে দেওয়া হবে (আল্লাহর ঐশী মদদ প্রত্যাহার করা হবে)। আর যদি চাওয়ার আবেদন ছাড়া স্বতঃস্ফূর্তভাবে তোমাকে সে দায়িত্ব অর্পণ করা হয়, তবে তার ওপর তোমাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ সাহায্য করা হবে। আর যখন তুমি কোনো বিষয়ে কসম বা শপথ কর, অতঃপর তার চেয়ে উত্তম কোনো কাজ দেখতে পাও, তবে তুমি তোমার কসমের কাফফারা দিয়ে দাও এবং যা উত্তম সে কাজটিই সম্পাদন কর।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)।
(ক) ইমারতের আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা (تعريف الإمارة)
- আভিধানিক অর্থ: ‘আল-ইমারাহ’ (الإمارة) শব্দের অর্থ নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব, শাসনভার, পদমর্যাদা বা রাজত্ব।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়—রাষ্ট্র, সমাজ বা কোনো সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক অঞ্চলের দ্বীনি ও পার্থিব শৃঙ্খলা রক্ষা এবং শরিয়তের বিধান বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কোনো যোগ্য ব্যক্তির ওপর কর্তৃত্ব ও নেতৃত্বের গুরুদায়িত্ব অর্পণ করাই হলো ইমারত বা রাষ্ট্র পরিচালনা।
(খ) “وإن أوتيتها عن غير مسألة أعنت عليها”-এর তাৎপর্য ও ব্যাখ্যা
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই বাণীর মর্মার্থ অতীব গভীর:
- যে ব্যক্তি নিজ থেকে পদের জন্য তদবির করে, অর্থ ব্যয় করে বা উচ্চাকাঙ্ক্ষাবশত চেয়ে নেতৃত্ব লাভ করে, আল্লাহ তাআলা তার ওপর থেকে রহমত উঠিয়ে নেন এবং তার দুর্বল মেধার ওপর তাকে ছেড়ে দেন, যার ফলে সে দ্রুত ধ্বংস ও পথভ্রষ্টতায় পতিত হয়।
- পক্ষান্তরে, একজন যোগ্য ও তাকওয়াবান ব্যক্তি পদ চায়নি, কিন্তু জনগণ বা কর্তৃপক্ষ তার সততা দেখে জোরপূর্বক তার ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে—আল্লাহ তাআলা স্বয়ং গায়েবি সাহায্য দ্বারা তাকে সঠিক পথ দেখান এবং কঠিন পরিস্থিতিতে তাকে সফলতার তৌফিক দান করেন। যেমন হযরত আবু বকর ও উমর (রা.)-এর খেলাফত।
(গ) কসম ভঙ্গের কাফফারা (كفارة اليمين)-এর পূর্ণাঙ্গ বিবরণ
সূরা আল-মায়েদার ৮৯ নম্বর আয়াত অনুযায়ী কসম ভঙ্গের কাফফারা সুনির্দিষ্ট নিয়মে আদায় করতে হবে:
- প্রাথমিক ঐচ্ছিক তিনটি দায়িত্ব (যেকোনো একটি পালনীয়):
- ১. দশজন মিসকিনকে মধ্যম মানের খাদ্য খাওয়ানো: নিজের পরিবারকে সচরাচর যে মানের খাবার খাওয়ানো হয়, সেই মানের খাবার দশজন দরিদ্রকে দুই বেলা তৃপ্তি সহকারে খাওয়ানো (অথবা প্রত্যেককে পৌনে দুই সের গম বা তার মূল্য সদকায়ে ফিতরের ন্যায় দেওয়া)।
- ২. দশজন মিসকিনকে পোশাক দান করা: এমন পোশাক যা দিয়ে সালাত আদায় করা যায়।
- ৩. একজন দাস বা বন্দীকে মুক্ত করা।
- বিকল্প দায়িত্ব (পূর্বের তিনটিতে অপারগ হলে):
- ৪. টানা তিন দিন রোজা রাখা (صيام ثلاثة أيام): যদি কোনো ব্যক্তি অর্থ বা খাদ্যের দিক থেকে একেবারেই নিঃস্ব হয় এবং দশজনকে খাওয়ানোর সামর্থ্য না থাকে, কেবল তখনই সে লাগাতার তিন দিন রোজা রেখে কাফফারা আদায় করবে। সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য সরাসরি রোজা রাখা বৈধ নয়।
উপসংহার
পদলিপ্সা পরিহার করা এবং অনর্থক জেদ না ধরে সবসময় কল্যাণকর বিষয়ের দিকে ফিরে যাওয়াই প্রকৃত মুমিনের চারিত্রিক ভূষণ।
১০। علق على أبي بكر الصديق (رض) –
[হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও হাদিস বর্ণনায় তাঁর ভূমিকা]
[মান: ৫]
ভূমিকা ও পরিচিতি
নবী-রাসুলগণের পর বিশ্বমানবতার সর্বশ্রেষ্ঠ ও মহানতম ব্যক্তিত্ব হলেন ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)। তাঁর মূল নাম আব্দুল্লাহ, উপাধি ‘সিদ্দিক’ (সত্যনিষ্ঠ) ও ‘আতীক্ব’ (জাহান্নাম থেকে মুক্ত)। পিতার নাম উসমান আবু কুহাফাহ এবং মাতার নাম সালমা উম্মুল খায়ের। তিনি ছিলেন রাসুল (সা.)-এর আজীবনের পরম বিশ্বস্ত সঙ্গী এবং হিজরতের ঐতিহাসিক গুহাসাথী (সানিয়াস নাইন)।
ইসলাম গ্রহণ ও অনুপম কুরবানি
প্রাপ্তবয়স্ক স্বাধীন পুরুষদের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম বিনা দ্বিধায় ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর দাওয়াতেই উসমান, যুবায়ের ও আব্দুর রহমান ইবনে আউফের মতো প্রখ্যাত সাহাবীগণ ইসলাম গ্রহণ করেন। মক্কার নির্যাতিত বেলাল, খাব্বাবসহ বহু ক্রীতদাসকে তিনি নিজের অর্থ দিয়ে কিনে মুক্ত করেছিলেন। তাবুক যুদ্ধের ঐতিহাসিক মুহূর্তে তিনি নিজ গৃহের সমুদয় ধনসম্পদ রাসুল (সা.)-এর পদতলে সঁপে দিয়ে বলেছিলেন: “আমার পরিবারের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকেই রেখে এসেছি।” মিরাজের ঘটনা কাফেররা উপহাস করলে তিনি নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করায় রাসুল (সা.) তাঁকে ‘আস-সিদ্দিক’ খেতাবে ভূষিত করেন।
খেলাফত পরিচালনা ও হাদিস বর্ণনায় ভূমিকা
রাসুল (সা.)-এর ওফাতের পর মুসলিম উম্মাহ যখন শোকে মুহ্যমান এবং ধর্মত্যাগী (মুরতাদ) ও ভণ্ড নবীদের ফেতনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল, তখন তিনি একাই লৌহকঠিন দৃঢ়তায় ইসলামের অস্তিত্ব রক্ষা করেন। তিনিই সর্বপ্রথম পবিত্র কুরআনকে গ্রন্থাকারে সংকলনের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন। খলিফা হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যস্ততা এবং রাসুল (সা.)-এর ওফাতের মাত্র দুই বছর তিন মাস পর ১৩ হিজরিতে ইন্তেকাল করার কারণে তাঁর থেকে বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম (প্রায় ১৪২টি)। কিন্তু হাদিস বর্ণনায় তিনি ছিলেন ইতিহাসের কঠোরতম সতর্ক ব্যক্তি; কোনো বর্ণনাকারীর দাবি তিনি সাক্ষ্য ছাড়া গ্রহণ করতেন না।
উপসংহার
হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ছিলেন ইসলামের অবিসংবাদিত কাণ্ডারি, যাঁর অটল ঈমানের ওপর দাঁড়িয়ে আছে ইসলামি খেলাফতের ভিত্তি।
১১। علق على أنس بن مالك (رض) –
[হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.)-এর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও হাদিস বর্ণনায় তাঁর অবদান]
[মান: ৫]
ভূমিকা ও বংশ পরিচিতি
হযরত আনাস ইবনে মালিক আল-আনসারী আল-খাযরাজী (রা.) ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একনিষ্ঠ খাদেম এবং হাদিস বর্ণনাকারী শীর্ষ সাহাবাদের (মুকছিরীন) অন্যতম শ্রেষ্ঠ নক্ষত্র। তাঁর কুনিয়াত ছিল ‘আবু হামযাহ’। তাঁর মাতা ছিলেন প্রখ্যাত সাহাবী হযরত উম্মে সুলাইম (রা.)।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর খেদমত ও বরকতময় জীবন
রাসুল (সা.) যখন মদিনায় হিজরত করেন, তখন আনাস (রা.)-এর বয়স ছিল মাত্র দশ বছর। তাঁর মা উম্মে সুলাইম তাঁকে রাসুল (সা.)-এর পবিত্র দরবারে এনে উৎসর্গ করে বলেন: “হে আল্লাহর রাসুল! আনাস আপনার খাদেম হিসেবে থাকবে।” তিনি একটানা দীর্ঘ দশ বছর পরম নিষ্ঠার সাথে রাসুল (সা.)-এর ব্যক্তিগত খেদমত আঞ্জাম দেন। আনাস (রা.) গর্ব করে বলতেন: “আমি দশ বছর নবীজীর খেদমত করেছি; আল্লাহর শপথ! তিনি কখনো আমার কোনো কাজে বিরক্ত হয়ে ‘উহ’ শব্দটি পর্যন্ত বলেননি, কিংবা বলেননি—কেন তুমি একাজ করলে বা কেন একাজ করলে না!” রাসুল (সা.) তাঁর জন্য বিশেষ দোয়া করেছিলেন: «اللَّهُمَّ أَكْثِرْ مَالَهُ وَوَلَدَهُ وَبَارِكْ لَهُ فِيمَا أَعْطَيْتَهُ» — “হে আল্লাহ! আপনি তার ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে প্রাচুর্য দিন এবং তাকে যা দিয়েছেন তাতে বরকত দান করুন।” এই দোয়ার বরকতে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হন এবং তাঁর জীবদ্দশাতেই তাঁর শতাধিক সন্তান-সন্ততি জন্মগ্রহণ করেছিল।
হাদিসশাস্ত্রে অবিস্মরণীয় অবদান
সুদীর্ঘ দশ বছর রাত-দিন রাসুল (সা.)-এর সাথে সার্বক্ষণিক অবস্থানের কারণে তিনি নবীজীর পারিবারিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি খুঁটিনাটি আমল সরাসরি অবলোকন করেছিলেন। হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবাদের মধ্যে তিনি হলেন তৃতীয় সর্বোচ্চ বর্ণনাকারী। তাঁর বর্ণিত মোট হাদিসের সংখ্যা ২,২৮৬টি। ইমাম বুখারি ও মুসলিম যৌথভাবে তাঁর ১৬৮টি হাদিস সংকলন করেছেন। তিনি বসরায় বসবাস করতেন এবং সেখানেই ৯৩ হিজরিতে ১০৩ বছর বয়সে শেষ সাহাবী হিসেবে ইন্তেকাল করেন।
উপসংহার
হযরত আনাস (রা.)-এর বর্ণিত হাদিসসমূহ বিশ্বজুড়ে উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য সুন্নাহর এক প্রকাণ্ড জীবন্ত বিশ্বকোষ।
১২। علق على أسماء بنت أبي بكر (رض) –
[হযরত আসমা বিনতে আবু বকর (রা.)-এর পরিচিতি ও ইসলামের ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা]
[মান: ৫]
ভূমিকা ও বংশ পরিচয়
হযরত আসমা বিনতে আবু বকর (রা.) ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহীয়সী নারী, বীর সেনানী ও আত্মত্যাগের মূর্ত প্রতীক। তিনি ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর জ্যেষ্ঠ কন্যা, উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.)-এর বৈমাত্রেয় বোন এবং বিশিষ্ট সাহাবী হযরত যুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রা.)-এর সহধর্মিণী। তিনি ছিলেন ইসলামের অন্যতম খলিফা হযরত আব্দুল্লাহ ইবনুয যুবায়ের (রা.)-এর গর্বিত রত্নগর্ভা মাতা।
‘যাতুন নিতাক্বাইন’ উপাধি ও হিজরতের ঐতিহাসিক ভূমিকা
ইসলাম গ্রহণের প্রাথমিক যুগেই তিনি ইসলাম গ্রহণকারী ১৮তম ব্যক্তি ছিলেন। হিজরতের চরম সংকটময় মুহূর্তে যখন রাসুল (সা.) ও আবু বকর (রা.) সাওর গুহায় আত্মগোপন করেছিলেন, তখন তরুণী আসমা (রা.) প্রতি রাতে একাকী অন্ধকার পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে গুহাবাসীদের জন্য খাদ্য ও পানি পৌঁছে দিতেন। হিজরতের যাত্রার সময় খাবারের থলে বাঁধার জন্য কোনো রশি খুঁজে না পেয়ে তিনি নিজের কোমরের বন্ধনী (নিতাক্ব) ছিঁড়ে দুই টুকরো করে একটি দিয়ে থলে বাঁধেন এবং অপরটি কোমরে বাঁধেন। তাঁর এই অসাধারণ প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব দেখে রাসুল (সা.) সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে ‘যাতুন নিতাক্বাইন’ (দুই কোমরবন্ধনীওয়ালী) উপাধিতে ভূষিত করেন এবং জান্নাতে দুটি নূরের বন্ধনীর সুসংবাদ দেন। কাফের নেতা আবু জাহেল তাঁর মুখে সজোরে থাপ্পড় মেরে কানের দুল ছিঁড়ে ফেললেও তিনি গুহার কোনো গোপন তথ্য ফাঁস করেননি।
হাদিস বর্ণনা ও শাহাদাতের ঐতিহাসিক মুহূর্ত
হযরত আসমা (রা.) ছিলেন অত্যন্ত প্রজ্ঞাবান ও হাদিসের নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী। তাঁর সূত্রে ৫৬টি হাদিস বর্ণিত হয়েছে যার বহু হাদিস বুখারি ও মুসলিমে সংকলিত। জীবনের শেষভাগে যখন জালিম শাসক হাজ্জাজ বিন ইউসুফ তাঁর পুত্র আব্দুল্লাহ ইবনুয যুবায়ের (রা.)-কে কাবা প্রাঙ্গণে অবরুদ্ধ করে, তখন বৃদ্ধা ও দৃষ্টিহীন আসমা (রা.) নিজ পুত্রকে বলেছিলেন: “বাছা! যদি তুমি সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাক, তবে বীরের মতো যুদ্ধ করে শহীদ হও; বাতিলের সামনে মাথা নত কর না!” পুত্রের শাহাদাতের মাত্র কয়েকদিন পর ৭৩ হিজরিতে ১০০ বছর বয়সে তিনি মক্কায় ইন্তেকাল করেন। শতবর্ষেও তাঁর একটি দাঁতও পড়েনি এবং স্মৃতিশক্তি অক্ষুণ্ণ ছিল।
উপসংহার
হযরত আসমা (রা.)-এর আপসহীন চরিত্র বিশ্বজুড়ে মুসলিম নারীদের ঈমানী দৃঢ়তার এক অমর বাতিঘর।
১৩। علق على زيد بن ثابت (رض) –
[হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর পরিচিতি ও কুরআন-হাদিস সংকলনে ভূমিকা]
[মান: ৫]
ভূমিকা ও পরিচিতি
হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত আল-আনসারী (রা.) ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রধান ওহী লেখক, কুরআনের প্রধান সংকলক এবং শরিয়তের ফারায়িজ (উত্তরাধিকার আইন) বিষয়ের শ্রেষ্ঠতম বিশেষজ্ঞ সাহাবী। তাঁর কুনিয়াত ছিল ‘আবু সাঈদ’। রাসুল (সা.) মদিনায় হিজরতকালে তিনি ছিলেন ১১ বছরের এক অসামান্য মেধাবী কিশোর।
অসাধারণ মেধা ও বহুভাষিক দক্ষতা
বদর যুদ্ধে অল্প বয়সের কারণে তাঁকে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। কিন্তু তাঁর প্রখর স্মৃতিশক্তি দেখে রাসুল (সা.) অত্যন্ত মুগ্ধ হন। রাসুল (সা.) তাঁকে ইহুদিদের সুরিয়ানি ও হিব্রু ভাষা শেখার নির্দেশ দিলে তিনি মাত্র ১৫ থেকে ১৭ দিনের মধ্যে হিব্রু ভাষা সম্পূর্ণ আয়ত্ত করে ফেলেন! ফলে রাসুল (সা.)-এর পক্ষ থেকে বিদেশি রাজন্যবর্গের পত্র লেখা ও অনুবাদের প্রধান কূটনৈতিক দায়িত্ব তিনি বিশ্বস্ততার সাথে আঞ্জাম দিতেন। তিনি ছিলেন রাসুল (সা.)-এর সার্বক্ষণিক কাতিবে ওহী (ওহী লিপিকার)।
কুরআন সংকলন ও ফারায়িজে অবিস্মরণীয় অবদান
- প্রথম মুসহাফ সংকলন (আবু বকর রা.-এর যুগ): ইয়ামামার যুদ্ধে বহু হাফেজ সাহাবীর শাহাদাতের পর হযরত আবু বকর ও উমর (রা.) যায়েদ ইবনে সাবিতের ওপরই কুরআন সংকলনের একক দায়িত্ব অর্পণ করেন। যায়েদ (রা.) কঠোর যাচাই-বাছাই ও দুই সাক্ষীর উপস্থিতির ভিত্তিতে পুরো কুরআনকে একক মুসহাফে লিপিবদ্ধ করেন।
- উসমানী মুসহাফের প্রধান রূপকার: হযরত উসমান (রা.)-এর খেলাফতকালে যখন আঞ্চলিক কিরাআতের বিরোধ দেখা দেয়, তখন যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর নেতৃত্বেই চার সদস্যের কমিটি গঠন করে প্রামাণ্য ‘মুসহাফে উসমানী’ নকল করা হয়।
- ফারায়িজ ও ফিক্বহের সম্রাট: রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছিলেন: «أَفْرَضُ أُمَّتِي زَيْدُ بْنُ ثَابِتٍ» — “আমার উম্মতের মধ্যে ফারায়িজ বা মিরাস বণ্টনে সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী হলেন যায়েদ ইবনে সাবিত।” চার খলিফাই ফারায়িজ ও ফতোয়ার ক্ষেত্রে তাঁর মতকে চূড়ান্ত মানদণ্ড মনে করতেন। ৪৫ হিজরিতে ৫৬ বছর বয়সে এই মহান জ্ঞানতাপস ইন্তেকাল করেন।
উপসংহার
হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) ছিলেন কুরআন ও সুন্নাহর প্রাতিষ্ঠানিক সংরক্ষণের অন্যতম প্রধান স্থপতি।
১৪। علق على حسان بن ثابت (رض) –
[হযরত হাসসান ইবনে সাবিত (রা.)-এর পরিচিতি ও রাসুল (সা.)-এর কবি হিসেবে অবদান]
[মান: ৫]
ভূমিকা ও পরিচিতি
হযরত হাসসান ইবনে সাবিত আল-আনসারী (রা.) ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের সর্বাধিক প্রখ্যাত ও মর্যাদাবান কবি, যাঁকে রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং ‘শায়েরুর রাসুল’ (রাসুলুল্লাহর কবি) উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। মদিনার সম্ভ্রান্ত খাযরাজ গোত্রে হিজরতের প্রায় ৬০ বছর পূর্বে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জাহেলি যুগ ও ইসলামি যুগ উভয় যুগে সমান ৬০ বছর করে মোট ১২০ বছর দীর্ঘ জীবন লাভ করেছিলেন বিধায় তাঁকে ‘মুখাযরাম’ কবি বলা হয়।
কবিতার মাধ্যমে ইসলামের প্রতিরক্ষা ও জিহাদ
মক্কার মুশরিক কবিরা (যেমন আমর ইবনুল আস ও আব্দুল্লাহ ইবনুয যিবআরী) যখন রাসুল (সা.) ও ইসলামের বিরুদ্ধে কুৎসাপূর্ণ ব্যঙ্গকবিতা রচনা করে কুৎসা ছড়াত, তখন রাসুল (সা.) হাসসান ইবনে সাবিতকে তাদের দাঁতভাঙা জবাব দেওয়ার নির্দেশ দেন। হাসসান (রা.) তৎকালীন আরবের প্রখ্যাত বংশলতিকা বিশেষজ্ঞ হযরত আবু বকর (রা.)-এর নিকট থেকে কুরাইশদের দুর্বল দিকগুলো জেনে নিয়ে এমন জ্বালাময়ী ও অলংকারপূর্ণ কবিতা রচনা করতেন, যা কাফেরদের হৃদয়ে তীরের চেয়েও বেশি আঘাত হানত। রাসুল (সা.) তাঁর জন্য মসজিদে নববীতে একটি স্বতন্ত্র মিম্বর স্থাপন করে দিয়েছিলেন, যেখান থেকে দাঁড়িয়ে তিনি কবিতা আবৃত্তি করতেন। রাসুল (সা.) তাঁর জন্য দোয়া করে বলেছিলেন:
«اللَّهُمَّ أَيِّدْهُ بِرُوحِ الْقُدُسِ»
“হে আল্লাহ! আপনি জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে হাসসানকে শক্তিশালী ও সাহায্য করুন।” (সহিহ বুখারি)।
হাদিস বর্ণনা ও সাহিত্যিক মর্যাদা
রাসুল (সা.)-এর স্তুতি ও প্রশংসায় রচিত তাঁর ‘ক্বাসিদাহ’সমূহ আরবি সাহিত্যের চিরন্তন মাস্টারপিস। তিনি রাসুল (সা.)-এর সৌন্দর্য বর্ণনা করে বলেছিলেন: «وَأَحْسَنُ مِنْكَ لَمْ تَرَ قَطُّ عَيْنِي وَأَجْمَلُ مِنْكَ لَمْ تَلِدِ النِّسَاءُ» — “আপনার চেয়ে সুন্দর কোনো মানুষ আমার চোখ কখনো দেখেনি; এবং আপনার চেয়ে নিখুঁত সুন্দর মানুষ কোনো নারী কখনো জন্ম দেয়নি!” তিনি রাসুল (সা.) থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ হাদিসও বর্ণনা করেছেন। ৫৪ হিজরিতে তিনি মদিনায় ইন্তেকাল করেন।
উপসংহার
হযরত হাসসান (রা.) প্রমাণ করেছেন যে সাহিত্য, কবিতা ও শিল্পমাধ্যমকে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও দ্বীনের প্রতিরক্ষায় জিহাদের এক অপরাজেয় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
১৫। علق على تميم الداري (رض) –
[হযরত তামীম আদ-দারী (রা.)-এর পরিচিতি ও তাঁর বর্ণিত বিখ্যাত হাদিস]
[মান: ৫]
ভূমিকা ও পরিচিতি
হযরত তামীম ইবনে আউস আদ-দারী (রা.) ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একজন বিশিষ্ট সাহাবী, যিনি পূর্বে ফিলিস্তিনের এক প্রখ্যাত খ্রিস্টান ধর্মযাজক ও পণ্ডিত ছিলেন। ৯ম হিজরিতে তিনি একটি প্রতিনিধি দলসহ মদিনায় এসে রাসুল (সা.)-এর পবিত্র হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর গোত্রের নাম ছিল ‘দার’, তাই তাঁকে ‘আদ-দারী’ বলা হয়।
ইসলামের ইতিহাসে তাঁর অনন্য ঐতিহাসিক কীর্তিসমূহ
- ১. মসজিদে নববীতে সর্বপ্রথম প্রদীপ প্রজ্বলন: তৎকালীন সময়ে মসজিদে নববীতে খেজুরের ডাল জ্বালিয়ে আলো করা হতো। ৯ম হিজরিতে তামীম আদ-দারী (রা.) সিরিয়া থেকে তেল ও প্রদীপ (ফানুস) এনে মসজিদে নববীতে ঝুলিয়ে দেন। রাসুল (সা.) মসজিদে প্রবেশ করে এমন সুন্দর আলোর ব্যবস্থা দেখে অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে দোয়া করেন: “তুমি ইসলামকে আলোকিত করেছ, আল্লাহ দুনিয়া ও আখেরাতে তোমার জীবন আলোকিত করুন!”
- ২. মিম্বর নির্মাণের প্রস্তাব: রাসুল (সা.) যখন জুমার খুতবা দিতেন, তখন দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হতো বিধায় তামীম আদ-দারী সর্বপ্রথম রাসুল (সা.)-এর জন্য একটি কাঠের মিম্বর তৈরির পরামর্শ দেন, যা সর্বসম্মতিক্রমে মসজিদে নববীতে স্থাপিত হয়।
- ৩. তাহাজ্জুদ ও কুরআন তিলাওয়াতে অনন্য নিষ্ঠা: তিনি ছিলেন অতীব খোদাভীরু সাধক। এক রাকাতে পুরো কুরআন খতম করার দুর্লভ কৃতিত্ব তাঁর ছিল।
হাদিসশাস্ত্রে অনন্য মর্যাদা ও দাজ্জাল সংক্রান্ত হাদিস
হযরত তামীম আদ-দারী (রা.)-এর সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য হলো—স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর নিকট থেকে একটি দীর্ঘ হাদিস শুনে সাহাবাদের সামনে মিম্বরে দাঁড়িয়ে তা বর্ণনা করেছিলেন! এটি হাদিসশাস্ত্রের ‘রিওয়ায়াতুল আকাবির আনিল আসাগির’ (বড়দের পক্ষ থেকে ছোটদের থেকে হাদিস বর্ণনা)-এর এক অনন্য দৃষ্টান্ত। সহিহ মুসলিমের কিতাবুল ফিতানে বর্ণিত বিখ্যাত ‘হাদিসে জাস্সাসাহ’ (দাজ্জাল সংক্রান্ত হাদিস)-এ তামীম আদ-দারী বর্ণনা করেন যে, ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তিনি সমুদ্রে ঝড়ের কবলে পড়ে এক দ্বীপে উপস্থিত হয়ে সেখানে ‘জাস্সাসাহ’ নামক পশমযুক্ত অদ্ভুত প্রাণী এবং এক বিশাল মানবরূপী দাজ্জালকে শৃঙ্খলিত অবস্থায় প্রত্যক্ষ করেছিলেন এবং তার সাথে কথা বলেছিলেন। রাসুল (সা.) সাহাবাদের বলেন, “তামীম আমাকে যা বলেছে, তা হুবহু আমার বক্তব্যের সাথে মিলে গেছে যা আমি পূর্বে তোমাদের দাজ্জাল সম্পর্কে বলেছিলাম।” ৪০ হিজরিতে ফিলিস্তিনের বাইতুল জিবরিনে এই মহান সাহাবী ইন্তেকাল করেন।
উপসংহার
হযরত তামীম আদ-দারী (রা.) ছিলেন সত্যের একনিষ্ঠ অনুসারী, যাঁর জীবন ও হাদিস উম্মতের জন্য এক চিরন্তন সম্পদ।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
ফাযিল ১ম বর্ষ দিরাসাতুল হাদীস ১ম পত্র ২০২৪ পরীক্ষার বিষয় কোড কত ছিল?
বিষয় কোড ছিল ১১১০১১ এবং পরীক্ষার পূর্ণমান ছিল ১০০ নম্বর। পরীক্ষার সময় ৩ ঘণ্টা।
সালামের উত্তর প্রদান করার শারঈ হুকুম কী?
একক ব্যক্তির জন্য উত্তর দেওয়া ফরজে আইন এবং দলের ক্ষেত্রে অন্তত একজনের উত্তর দেওয়া ফরজে কিফায়াহ।
হাদিসশাস্ত্রের পরিভাষায় ‘মুত্তাফাকুন আলাইহি’ বলতে কী বোঝায়?
যে হাদিস ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম উভয়েই নিজ নিজ সহিহ গ্রন্থে যৌথভাবে সংকলন করেছেন তাকে মুত্তাফাকুন আলাইহি বলে।
যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত শহীদকে কি গোসল দেওয়া ওয়াজিব?
না, সর্বসম্মত ফতোয়া অনুযায়ী যুদ্ধের ময়দানে কাফেরদের আঘাতে নিহত শহীদকে গোসল দেওয়া নাজায়েজ; পরিহিত পোশাকেই দাফন করা সুন্নাত।
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর বিশেষ নিশ্চিত দোয়াটি দুনিয়ায় না করে কোথায় গচ্ছিত রেখেছেন?
তিনি কিয়ামতের কঠিন ময়দানে নিজের উম্মতের কবীরা গুনাহগারদের জাহান্নাম থেকে মুক্ত করার শাফাআতের জন্য দোয়াটি গচ্ছিত রেখেছেন।
মসজিদে নববীতে সর্বপ্রথম তেল ও প্রদীপের মাধ্যমে আলোর ব্যবস্থা করেছিলেন কে?
বিশিষ্ট সাহাবী হযরত তামীম আদ-দারী (রা.) সিরিয়া থেকে প্রদীপ এনে মসজিদে নববীতে সর্বপ্রথম আলোর সূচনা করেছিলেন।

