দিরাসাতুল হাদীস ৩য় পত্র (Dirasatul Hadith 3rd Paper) – 111013, উলূমুল হাদীস – ফাযিল পাস ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪

StudyBoi StudyBoi
September 27, 2026
১১০ মিনিট পড়ার সময়
২ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত পরীক্ষা
ফাযিল (স্নাতক) পাস প্রথম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪
[দিরাসাতুল হাদীস] [নতুন সিলেবাস অনুযায়ী]
তৃতীয় পত্র : দিরাসাতুল হাদীস-৩ (বিষয় কোড: ১১১০১৩)
সময়: ৩ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ১০০
[الملاحظة : أجب عن خمسة من مجموعة (أ) وعن أربعة من مجموعة (ب) – والأعداد بالهامش تدل على الدرجة الكاملة -]
[দ্রষ্টব্য : (أ) অংশ থেকে পাঁচটি ও (ب) অংশ থেকে চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও। বাম পাশে উল্লিখিত সংখ্যা প্রশ্নের পূর্ণমান জ্ঞাপক।]

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন অনুষ্ঠিত ফাযিল স্নাতক (পাস) প্রথম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪-এর ‘দিরাসাতুল হাদীস ৩য় পত্র’ (বিষয় কোড: ১১১০১৩)-এর মূল প্রশ্নপত্রের সকল প্রশ্নের প্রামাণ্য, বিশুদ্ধ ও পূর্ণাঙ্গ সমাধান নিচে ধারাবাহিকভাবে প্রদান করা হলো। ফাতহুল বারী, শরহে নববী, মিরকাতুল মাফাতিহ এবং জামেউত তিরমিযীর প্রখ্যাত ব্যাখ্যার আলোকে প্রতিটি হাদিসের অর্থ, তাহক্বীক্ব ও আনুষঙ্গিক মাসআলা অ্যাকাডেমিক মানে সংকলিত হয়েছে।

১। عن أبي سعيد الخدري رضى الله عنه قال : جاء رجل إلى النبي صلى الله عليه وسلم فقال : أخى استطلق بطنه فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم : اسقه عسلا فسقاه ثم جاء، فقال سقيته فلم يزده الا استطلاقا فقال له : ثلاث مرات ثم جاء الرابعة فقال : لقد سقيته فلم يزده الا استطلاقا – فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم : صدق الله وكذب بطن أخيك فسقاه فبرأ – (متفق عليه)

[হাদিসের অনুবাদ এবং ‘সাদাক্বাল্লাহু…’, মধুর ঔষধি গুণাগুণ ও শব্দ তাহক্বীক্ব]

[মান: ১৬ (অনুবাদ ৭ + ক ৩ + খ ৩ + গ ৩)]

ভূমিকা ও হাদিসের পটভূমি

ইসলাম কেবল আধ্যাত্মিক রোগের ব্যবস্থাপনাই দেয় না; বরং মানবদেহের শারীরিক সুস্থতা ও রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রেও বাস্তবমুখী প্রাকৃতিক চিকিৎসার চমৎকার দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে (তিব্বে নববী)। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে মধু যে এক অনুপম মহৌষধ, রাসুলুল্লাহ (সা.) এই অনন্য হাদিসে তা নিশ্চিত করেছেন এবং ওহীর ওপর অটল আস্থার বাস্তব দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন।

মূল হাদিসের প্রামাণ্য বঙ্গানুবাদ

হযরত আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী করীম (সা.)-এর পবিত্র দরবারে এসে নিবেদন করল: ‘আমার ভাইয়ের পেটে তীব্র অসুখ (পেটের পীড়া বা ডায়রিয়া) দেখা দিয়েছে।’ তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন: “তাকে মধু পান করাও।” লোকটি গিয়ে তাকে মধু পান করাল। অতঃপর সে পুনরায় এসে বলল: ‘আমি তাকে মধু পান করিয়েছি, কিন্তু এতে তার পেটের অসুখ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে!’ রাসুল (সা.) তাকে বললেন: “তাকে মধু পান করাও।” এভাবে লোকটি তিনবার এলো। অতঃপর চতুর্থবার এসে বলল: ‘আমি তো তাকে মধু পান করালাম, কিন্তু এতে তো রোগ কেবল বেড়েই চলেছে!’ তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করলেন:

«صَدَقَ اللَّهُ وَكَذَبَ بَطْنُ أَخِيكَ، اسْقِهِ عَسَلًا، فَسَقَاهُ فَبَرَأَ»

“আল্লাহ সত্য বলেছেন, আর তোমার ভাইয়ের পেট মিথ্যাবাদী! যাও, তাকে আবারও মধু পান করাও! অতঃপর সে তাকে আবার মধু পান করাল এবং সে সম্পূর্ণ সুস্থ ও আরোগ্য লাভ করল।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)।

(ক) “صدق الله وكذب بطن أخيك”-এর তাৎপর্য ও ব্যাখ্যা

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই উক্তিটি ওহীর অলৌকিক সত্যতা ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক গভীর রহস্য উন্মোচন করে:

  • ‘আল্লাহ সত্য বলেছেন’ (صدق الله): আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নাহলের ৬৯ নম্বর আয়াতে মধুর মহিমার কথা ঘোষণা করে বলেছেন: «فِيهِ شِفَاءٌ لِلنَّاسِ» — “এর মধ্যে মানুষের জন্য নিরাময় রয়েছে।” আল্লাহর এই বাণী চিরন্তন ও অভ্রান্ত সত্য, এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।
  • ‘তোমার ভাইয়ের পেট মিথ্যাবাদী’ (كذب بطن أخيك): রোগীর পেটে অতিরিক্ত দূষিত পদার্থ ও শ্লেষ্মা জমে ছিল। মধু পান করানোর ফলে প্রথম দিকে পেটের সেই বিষাক্ত বর্জ্য দ্রুত নির্গত হতে শুরু করে, যা বাহ্যত রোগ বেড়ে যাওয়ার মতো মনে হয়েছিল। রাসুল (সা.) জানতেন যে পূর্ণ মাত্রায় মধু সেবনের মাধ্যমেই পেট থেকে যাবতীয় রোগজীবাণু সমূলে অপসারিত হবে। তাই তিনি আল্লাহর কালামের ওপর অবিচল আস্থা রেখে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন এবং পরিশেষে রোগী শতভাগ সুস্থ হয়ে ওঠে।

(খ) মধু পানের বৈজ্ঞানিক ও তিব্বী উপকারিতাসমূহ (فوائد شرب العسل)

  • ১. পেটের শোধক ও হজমকারক: মধু পাকস্থলীর অম্লতা দূর করে, অন্ত্রের ঘা শুকায় এবং পেটের অতিরিক্ত দূষিত পদার্থ দ্রুত বের করে দিয়ে হজমশক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি করে।
  • ২. শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক ও রোগপ্রতিরোধক: মধুতে রয়েছে প্রাকৃতিক অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টি-ফাঙ্গাল উপাদান, যা শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে শীর্ষস্থানে নিয়ে যায়।
  • ৩. হৃদযন্ত্র ও রক্ত সঞ্চালন: মধু রক্তনালীর প্রাচীর পরিষ্কার করে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং হৃদপিণ্ডকে সতেজ রাখে।
  • ৪. সর্দি, কাশি ও ফুসফুসের নিরাময়: গরম পানিতে মধু মিশিয়ে পান করলে সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্ট ও গলার সংক্রমণ দ্রুত দূর হয়। রাসুল (সা.) বলেন: “তোমরা দুটি শেফাদানকারী বস্তুকে আবশ্যক করে নাও—মধু ও আল-কুরআন।” (ইবনে মাজাহ)।

(গ) শব্দ বিশ্লেষণ ও ব্যাকরণিক তাহক্বীক্ব (تحليل الكلمات)

  • ১. اسْتَطْلَقَ (ইসতাতলাক্বা): ফেলে মাজী মারূফ, সিগাহ ওয়াহেদ মুযাক্কার গায়েব। বাব ইসতিফআল (الاستفعال)। মাদাহ ‘ত্বা-লাম-ক্বাফ’ (ط ل ق)। অর্থ: শিথিল হলো বা পেটের অসুখ দেখা দিল।
  • ২. اسْقِهِ (ইসক্বিহি): ফেলে আমর হাযির মারূফ, সিগাহ ওয়াহেদ মুযাক্কার হাযির। বাব ইফআল (الإسقاء)। মাদাহ ‘সীন-ক্বাফ-ইয়া’ (س ق ي), নাক্বিসে ইয়ায়ী। শেষ বর্ণ ইয়া বিলুপ্ত হয়েছে। সাথে ‘হি’ দমীরে মাফউলে বিহী যুক্ত। অর্থ: তাকে পান করাও।
  • ৩. بَرَأَ (বারাআ): ফেলে মাজী মারূফ, সিগাহ ওয়াহেদ মুযাক্কার গায়েব। বাব ফাতাহা-ইয়াফতাহু। মাদাহ ‘বা-রা-হামযা’ (ب ر أ), মাহমূযুল লাম। অর্থ: সে রোগমুক্ত বা আরোগ্য লাভ করল।

উপসংহার

হাদিসটি প্রমাণ করে যে আল্লাহর ওহী মানবজীবনের সকল ক্ষেত্রে সত্য এবং ওহী ও প্রাকৃতিক সুচিকিৎসার সমন্বয়ই পূর্ণাঙ্গ আরোগ্যের রাজপথ।

২। عن جابر رضى الله عنه قال : نهى رسول الله صلى الله عليه وسلم عن الرقى، فجاء آل عمرو ابن حزم فقالوا : يا رسول الله! إنه كانت عندنا رقية نرقى بها من العقرب، وأنت نهيت عن الرقى، فعرضوها عليه فقال : ما أرى بها بأسا – من استطاع منكم أن ينفع أخاه فلينفعه – (رواه مسلم) وعن عوف بن مالك الأشجعي قال : كنا نرقى في الجاهلية فقلنا : يا رسول الله كيف ترى في ذلك؟ فقال : اعرضوا على رقاكم لا بأس بالرقى ما لم يكن فيه شرك – (رواه مسلم)

[হাদিসের অনুবাদ এবং ঝাড়ফুঁকের অর্থ, রুকইয়াহর শারঈ হুকুম ও শব্দ তাহক্বীক্ব]

[মান: ১৬ (অনুবাদ ৭ + ক ৩ + খ ৩ + গ ৩)]

ভূমিকা ও হাদিসের পটভূমি

রোগ-ব্যাধি, বিষাক্ত প্রাণীর দংশন কিংবা বদনজরের প্রভাবে মানুষ যখন আক্রান্ত হয়, তখন ইসলামি শরিয়তে ঝাড়ফুঁক বা ওহীর বাণীর মাধ্যমে চিকিৎসার বিধান রয়েছে। তবে জাহেলি যুগে ঝাড়ফুঁকের নামে শিরক, কুফর ও জিন-ভূতের দোহাই দেওয়ার কুপ্রথা বিদ্যমান ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) শিরকি রীতিনীতিকে সমূলে নিষিদ্ধ করে নির্ভেজাল তাওহীদি রুকইয়াহর অনুমতি দান করেছেন।

মূল হাদিসদ্বয়ের প্রামাণ্য বঙ্গানুবাদ

হযরত জাবির (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রথমে যাবতীয় ঝাড়ফুঁক (রুকইয়াহ) করতে নিষেধ করেছিলেন। অতঃপর আমর ইবনে হাযম পরিবারের লোকেরা এসে নিবেদন করল: ‘হে আল্লাহর রাসুল! বিচ্ছুর দংশন নিরাময়ের জন্য আমাদের একটি ঝাড়ফুঁকের মন্ত্র ছিল, যা দিয়ে আমরা ঝাড়তাম; কিন্তু আপনি তো সব ঝাড়ফুঁক নিষেধ করে দিয়েছেন!’ অতঃপর তারা সেই ঝাড়ফুঁকের বাক্যগুলো রাসুল (সা.)-এর সামনে পেশ করল। তা শুনে রাসুল (সা.) বললেন: “আমি এতে কোনো দোষ বা সমস্যা দেখছি না; তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি স্বীয় ভাইয়ের উপকার করতে সক্ষম, সে যেন তার উপকার করে।” (সহিহ মুসলিম)।

অপর এক বর্ণনায় হযরত আউফ ইবনে মালিক আল-আশজাঈ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা জাহেলি যুগে বিভিন্ন তন্ত্র-মন্ত্র দ্বারা ঝাড়ফুঁক করতাম। তাই আমরা নিবেদন করলাম: ‘হে আল্লাহর রাসুল! এ বিষয়ে আপনার অভিমত কী?’ তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করলেন:

«اعْرِضُوا عَلَيَّ رُقَاكُمْ، لَا بَأْسَ بِالرُّقَى مَا لَمْ يَكُنْ فِيهِ شِرْكٌ»

“তোমাদের ঝাড়ফুঁকের বাক্যগুলো আমার সামনে উপস্থাপন কর। যে ঝাড়ফুঁকের মধ্যে শিরকের কোনো লেশমাত্র নেই, সে ঝাড়ফুঁক করাতে কোনো অসুবিধা বা দোষ নেই।” (সহিহ মুসলিম)।

(ক) ‘রুকইয়াহ’ (الرقية)-এর সংজ্ঞা এবং ইসলামে শারঈ রুকইয়াহর হুকুম

  • রুকইয়াহর সংজ্ঞা: রোগ নিরাময়, বিষাক্ত প্রাণীর দংশন, বদনজর বা জিন-জাদুর প্রভাব দূর করার উদ্দেশ্যে দোয়া, কুরআনের আয়াত বা আল্লাহর নাম পড়ে রোগীর গায়ে ফুঁ দেওয়া বা পানি ইত্যাদিতে ফুঁ দিয়ে ব্যবহার করাকে ‘রুকইয়াহ’ বা ঝাড়ফুঁক বলা হয়।
  • ইসলামে রুকইয়াহর শারঈ হুকুম:
    • ১. জায়েজ ও মুস্তাহাব রুকইয়াহ (الرقية الشرعية): যা কুরআনের আয়াত, আল্লাহর সুন্দর নাম ও গুণাবলি এবং হাদিসে বর্ণিত মাসনুন দোয়ার মাধ্যমে করা হয়। এটি সর্বসম্মতভাবে জায়েজ ও সুন্নত।
    • ২. হারাম ও শিরকি রুকইয়াহ (الرقية الشركية): যাতে কোনো দেব-দেবী, জিন-শয়তান, তারকা বা অস্পষ্ট কুফরি মন্ত্রের সাহায্যে সাহায্য চাওয়া হয়। এটি সম্পূর্ণ হারাম ও শিরকে আকবর।

(খ) “اعرضوا على رقاكم لا بأس بالرقى ما لم يكن فيه شرك”-এর বিশদ ব্যাখ্যা

হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী ও ইমাম নববী (রহ.) বলেন, এই হাদিসটি রুকইয়াহ জায়েজ হওয়ার ক্ষেত্রে তিনটি সুনির্দিষ্ট মৌলিক শর্ত নির্ধারণ করে দিয়েছে:

  • ১. আল্লাহর কালাম ও নামের ব্যবহার: ঝাড়ফুঁকের বাক্যসমূহ অবশ্যই কুরআনের আয়াত, আল্লাহর গুণবাচক নাম বা হাদিসের দোয়ার মধ্য থেকে হতে হবে।
  • ২. স্পষ্ট আরবি বা বোধগম্য অর্থ হওয়া: কোনো দুর্বোধ্য, অর্থহীন কিংবা অদ্ভুত সংকেতের বাক্য হওয়া যাবে না, যাতে কুফরির সন্দেহ থাকে।
  • ৩. একমাত্র আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল: এই দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে হবে যে ঝাড়ফুঁকের নিজের কোনো স্বাধীন ক্ষমতা নেই; আরোগ্য দানকারী একমাত্র মহান আল্লাহ। ঝাড়ফুঁক কেবল একটি সাধারণ উসিলা বা মাধ্যম মাত্র।

(গ) শব্দ বিশ্লেষণ ও ব্যাকরণিক তাহক্বীক্ব (تحليل الكلمات)

  • ১. نُهِيتَ (নুহীতা): ফেলে মাজী মাজহুল, সিগাহ ওয়াহেদ মুযাক্কার হাযির। বাব ফাতাহা-ইয়াফতাহু বা বাবে সামিআ। মাদাহ ‘নূন-হা-ইয়া’ (ن ه ي), নাক্বিসে ইয়ায়ী। অর্থ: আপনাকে নিষেধ করা হয়েছিল।
  • ২. اسْتَطَاعَ (ইসতাতা’আ): ফেলে মাজী মারূফ, সিগাহ ওয়াহেদ মুযাক্কার গায়েব। বাব ইসতিফআল (الاستفعال)। মাদাহ ‘ত্বা-ওয়াও-আইন’ (ط و ع), আজওয়াফে ওয়াবী। অর্থ: সে সক্ষম হলো।
  • ৩. كُنَّا نَرْقِي (কুন্না নারক্বী): ফেলে মাজী এস্তেমরারী (ধারাবাহিক অতীতকাল)। ‘নারক্বী’ ফেলে মুজারে মারূফ, সিগাহ জমা মুতাকাল্লিম, বাব যারাবা (رَقَى يَرْقِي)। অর্থ: আমরা ঝাড়ফুঁক করতাম।

উপসংহার

শিরকমুক্ত হয়ে একমাত্র আল্লাহর কালামের উসিলায় চিকিৎসা গ্রহণ করাই হলো ইসলামি রুকইয়াহর মূল শিক্ষা।

৩। عن أبي موسى رضى الله عنه عن النبي صلى الله عليه وسلم قال : رأيت في المنام أني أهاجر من مكة إلى أرض بها نخل فذهب وهلي إلى أنها اليمامة أو هجر فإذا هي المدينة يثرب ورأيت في رؤياي هذه : أني هززت سيفا فانقطع صدره فإذا هو ما أصيب من المؤمنين يوم أحد ثم هززته أخرى فعاد أحسن ما كان فإذا هو جاء الله به من الفتح واجتماع المؤمنين – (متفق عليه)

[হাদিসের অনুবাদ এবং নবীদের স্বপ্নের স্বরূপ, ওহুদ যুদ্ধের সময়কাল ও কারণ এবং শব্দ তাহক্বীক্ব]

[মান: ১৬ (অনুবাদ ৭ + ক ৩ + খ ৩ + গ ৩)]

ভূমিকা ও হাদিসের পটভূমি

আম্বিয়ায়ে কেরামের স্বপ্ন সাধারণ মানুষের স্বপ্নের মতো নয়; নবীদের স্বপ্ন হলো ওহীর অন্যতম বিশুদ্ধ মাধ্যম। হিজরতের পূর্বে এবং ওহুদ যুদ্ধের মতো মহা পরীক্ষার পূর্বে আল্লাহ তাআলা বিশ্বনবী (সা.)-কে স্বপ্নের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ বিজয় ও শাহাদাতের চিত্র অবলোকন করিয়েছিলেন, যা এই ঐতিহাসিক হাদিসে ফুটে উঠেছে।

মূল হাদিসের প্রামাণ্য বঙ্গানুবাদ

হযরত আবু মূসা আশয়ারী (রা.) হতে বর্ণিত, নবী করীম (সা.) ইরশاد করেছেন:

«رَأَيْتُ فِي الْمَنَامِ أَنِّي أُهَاجِرُ مِنْ مَكَّةَ إِلَى أَرْضٍ بِهَا نَخْلٌ، فَذَهَبَ وَهَلِي إِلَى أَنَّهَا الْيَمَامَةُ أَوْ هَجَرُ، فَإِذَا هِيَ الْمَدِينَةُ يَثْرِبُ، وَرَأَيْتُ فِي رُؤْيَايَ هَذِهِ أَنِّي هَزَزْتُ سَيْفًا فَانْقَطَعَ صَدْرُهُ، فَإِذَا هُوَ مَا أُصِيبَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ أُحُدٍ، ثُمَّ هَزَزْتُهُ أُخْرَى فَعَادَ أَحْسَنَ مَا كَانَ، فَإِذَا هُوَ مَا جَاءَ اللَّهُ بِهِ مِنَ الْفَتْحِ وَاجْتِمَاعِ الْمُؤْمِنِينَ»

“আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, আমি মক্কা হতে এমন এক ভূখণ্ডের দিকে হিজরত করছি যেখানে প্রচুর খেজুর বাগান রয়েছে। আমার ধারণা হয়েছিল যে স্থানটি হয়তো ইয়ামামাহ কিংবা হাজার অঞ্চল হবে; কিন্তু বাস্তবে তা ছিল মদিনা—ইয়াসরিব নগরী। আর আমি এই স্বপ্নে আরও দেখলাম যে, আমি একটি তলোয়ার আন্দোলিত করে নাড়া দিলাম, অমনি তার সম্মুখভাগ ভেঙে টুকরো হয়ে গেল; বাস্তবে তা ছিল ওহুদ যুদ্ধের দিন মুমিনদের যে ক্ষয়ক্ষতি ও শাহাদাত হয়েছিল তার রূপক। অতঃপর আমি তলোয়ারটিকে দ্বিতীয়বার নাড়া দিলাম, অমনি তা পূর্বের চেয়েও সুন্দর ও নিখুঁত রূপ ধারণ করল; বাস্তবে তা ছিল আল্লাহ তাআলা যে মক্কা বিজয় দান করেছিলেন এবং মুমিনদের ঐক্য ও সংহতি কায়েম করেছিলেন তার বহিঃপ্রকাশ।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)।

(ক) স্বপ্নের অর্থ এবং নবীদের স্বপ্ন কি ওহী? (رؤيا الأنبياء وحي)

  • স্বপ্নের অর্থ (الرؤيا في المنام): নিদ্রিত অবস্থায় মানুষের আত্মার সামনে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো সত্য বার্তা বা রূপক দৃশ্য উদ্ভাসিত হওয়াকে ‘রূ’ইয়া’ বা সত্য স্বপ্ন বলা হয়।
  • নবীদের স্বপ্ন ওহী কি না? চার মাজহাবের ইমাম ও সমস্ত উম্মাহর সর্বসম্মত আকিদা হলো—আম্বিয়ায়ে কেরামের নিদ্রাকালীন সত্য স্বপ্ন শতভাগ ওহী (وحي إلهي)। শয়তান কখনো নবীদের সুরত ধারণ করতে পারে না বা তাঁদের স্বপ্নে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে না। যেমন হযরত ইব্রাহিম (আ.) স্বপ্নে পুত্র ইসমাইলকে কুরবানির নির্দেশ পেয়েছিলেন এবং তাকে ওহী হিসেবে পালন করতে উদ্যত হয়েছিলেন: «يَا بُنَيَّ إِنِّي أَرَىٰ فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ» (সূরা আস-সাফফাত: ১০২)।

(খ) ওহুদ যুদ্ধের সময়কাল ও প্রধান কারণসমূহ (غزوة أحد)

  • সময়কাল: হিজরি তৃতীয় সনের ৭ই শাওয়াল (মার্চ ৬২৫ খ্রিস্টাব্দ)।
  • প্রধান কারণসমূহ:
    • ১. বদর যুদ্ধের শোচনীয় পরাজয়ের প্রতিশোধ: দ্বিতীয় হিজরিতে বদর যুদ্ধে মক্কার শীর্ষ সত্তরজন কাফের নেতা নিহত হয়েছিল। এই অপমানের প্রতিশোধ নিতে আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে তিন হাজার সুসজ্জিত কাফের সৈন্য মদিনা আক্রমণ করতে ওহুদে সমবেত হয়।
    • ২. বাণিজ্যিক পথের নিরাপত্তা পুনরুদ্ধার: মুসলমানদের কারণে মক্কার সিরিয়াগামী বাণিজ্য পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অর্থনৈতিকভাবে কুরাইশরা দেউলিয়া হয়ে পড়েছিল, যা পুনরুদ্ধারে তারা মরিয়া ছিল।
    • ৩. ইসলামের উত্থানকে অঙ্কুরে বিনাশের অপচেষ্টা।

(গ) শব্দ বিশ্লেষণ ও ব্যাকরণিক তাহক্বীক্ব (تحليل الكلمات)

  • ১. أُهَاجِرُ (উহাজিরু): ফেলে মুজারে মারূফ, সিগাহ ওয়াহেদ মুতাকাল্লিম। বাব মুফা’আলাহ (المفاجرة)। মাদাহ ‘হা-জীম-রা’ (ه ج ر)। অর্থ: আমি হিজরত করছি।
  • ২. هَزَزْتُ (হাযাযতু): ফেলে মাজী মারূফ, সিগাহ ওয়াহেদ মুতাকাল্লিম। বাব নাসারা-ইয়ানসুরু। মাদাহ ‘হা-যা-যা’ (ه ز ز), মুযাআফে সুলাসী। অর্থ: আমি ঝাঁকালাম বা নাড়া দিলাম।
  • ৩. أَحْسَنَ (আহসানা): ইসমে তাফযীল, মূল ধাতু ‘হা-সীন-নূন’ (ح س ن)। অর্থ: সর্বাপেক্ষা উত্তম বা সুন্দরতম।

উপসংহার

কঠিন পরীক্ষার পর মুমিনদের জন্য চূড়ান্ত বিজয় অবধারিত—স্বপ্নের এই রূপক বাস্তবায়ন ওহুদের বিপর্যয়ের পরও মুসলমানদের মক্কা বিজয়ের পরম সত্যে উজ্জীবিত করেছিল।

৪। عن أبي هريرة رضى الله عنه قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : من يأخذ عنى هؤلاء الكلمات فيعمل بهن أو يعلم من يعمل بهن قلت – أنا يا رسول الله! فأخذ بيدي فعد خمسا، فقال – اتق المحارم تكن أعبد الناس، وارض بما قسم الله لك تكن أغنى الناس، وأحسن إلى جارك تكن مؤمنا، وأحب للناس ما تحب لنفسك تكن مسلما، ولا تكثر الضحك فإن كثرة الضحك تميت القلب (رواه احمد والترمذى)

[হাদিসের অনুবাদ এবং তাকওয়ার পরিচয়, ঈমান বনাম ইসলামের পার্থক্য ও শব্দ তাহক্বীক্ব]

[মান: ১৬ (অনুবাদ ৭ + ক ৩ + খ ৩ + গ ৩)]

ভূমিকা ও হাদিসের পটভূমি

মানবজীবনের আত্মশুদ্ধি, নীতিশাস্ত্র ও প্রকৃত সুখের চাবিকাঠি নিহিত রয়েছে বিশ্বনবী (সা.)-এর পবিত্র উপদেশমালায়। হযরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর হাত ধরে রাসুল (সা.) পাঁচটি স্বর্ণালী জীবনদর্শন শিক্ষা দিয়েছিলেন, যা কোনো ব্যক্তি নিজের জীবনে ধারণ করলে দুনিয়া ও আখেরাতের উভয় জাহানে সর্বোচ্চ মর্যাদাবান মানুষে পরিণত হতে পারে।

মূল হাদিসের প্রামাণ্য বঙ্গানুবাদ

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) একদিন বললেন: “কে আমার কাছ থেকে এই বাক্যগুলো গ্রহণ করবে, অতঃপর সে অনুযায়ী আমল করবে কিংবা এমন ব্যক্তিকে শিক্ষা দেবে যে এর ওপর আমল করবে?” আমি বললাম: ‘আমি গ্রহণ করব, হে আল্লাহর রাসুল!’ অতঃপর তিনি আমার হাত ধরলেন এবং পাঁচটি অমূল্য নসিহত গণনা করলেন:

«اتَّقِ الْمَحَارِمَ تَكُنْ أَعْبَدَ النَّاسِ، وَارْضَ بِمَا قَسَمَ اللَّهُ لَكَ تَكُنْ أَغْنَى النَّاسِ، وَأَحْسِنْ إِلَى جَارِكَ تَكُنْ مُؤْمِنًا، وَأَحِبَّ لِلنَّاسِ مَا تُحِبُّ لِنَفْسِكَ تَكُنْ مُسْلِمًا، وَلَا تُكْثِرِ الضَّحِكَ فَإِنَّ كَثْرَةَ الضَّحِكِ تُمِيتُ الْقَلْبَ»

“(১) আল্লাহর যাবতীয় হারাম ও নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ থেকে বেঁচে থাক, তবে তুমি মানুষের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদতগুজার হতে পারবে; (২) আল্লাহ তোমার তাকদিরে যা বণ্টন করে দিয়েছেন তাতে সন্তুষ্ট থাক, তবে তুমি মানুষের মধ্যে সবচেয়ে ধনী ও প্রাচুর্যময় ব্যক্তি হতে পারবে; (৩) তোমার প্রতিবেশীর সাথে উত্তম ও সদয় আচরণ কর, তবে তুমি খাঁটি মুমিন হতে পারবে; (৪) নিজের জন্য যা পছন্দ কর, সকল মানুষের জন্যও তা-ই পছন্দ কর, তবে তুমি প্রকৃত মুসলমান হতে পারবে; এবং (৫) অতিরিক্ত ও অহেতুক হাসাহাসি পরিহার কর; কেননা অতিরিক্ত হাসি আত্মাকে মৃত করে দেয়।” (মুসনাদে আহমদ ও সুনানে তিরমিযী)।

(ক) “اتق المحارم تكن أعبد الناس”-এর চমৎকার ব্যাখ্যা

সাধারণ মানুষের ধারণা হলো—কেবল প্রচুর নফল সালাত, নফল রোজা ও তসবিহ পাঠ করাই হলো বড় ইবাদত। কিন্তু রাসুল (সা.) এক যুগান্তকারী বাস্তবতা উন্মোচন করে বললেন: হারাম থেকে বেঁচে থাকাই হলো সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত। কারণ নফল আমল করা মানুষের মনের ইচ্ছার সাথে মেলে, কিন্তু হারাম ও গুনাহ থেকে নিজের চোখ, কান, জবান ও প্রবৃত্তি দমন রাখা চরম আত্মত্যাগের বিষয়। যে ব্যক্তি মিথ্যা, সুদ, গিবত, দৃষ্টির খেয়ানত ও জুলুম থেকে নিজেকে কঠোরভাবে বাঁচিয়ে রাখে, সে নফল আমলকারীর চেয়েও আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদাবান ‘আবেদ’ হিসেবে গণ্য হয়।

(খ) হাদিসের আলোকে ঈমান ও ইসলামের সূক্ষ্ম পার্থক্য

  • ঈমান (الإيمان): হাদিসে বলা হয়েছে “প্রতিবেশীর সাথে সদাচার কর তবে মুমিন হতে পারবে।” ঈমানের মূল স্থান হলো অন্তর। অন্তরের গভীর বিশ্বাস, আল্লাহর প্রতি নিখাদ ভালোবাসা, মানবকল্যাণ ও প্রতিবেশীর প্রতি দয়া হলো ঈমানের পূর্ণতার বহিঃপ্রকাশ।
  • ইসলাম (الإسلام): হাদিসে বলা হয়েছে “সকল মানুষের জন্য নিজের পছন্দের জিনিস কামনা কর তবে মুসলিম হতে পারবে।” ইসলামের সম্পর্ক হলো বাহ্যিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও সামাজিক আচরণের সাথে। অপরের কল্যাণ কামনা ও বাহ্যিক ক্ষতি থেকে মানুষকে নিরাপদ রাখাই হলো প্রকৃত ইসলামের দাবি। যখন দুটি শব্দ একসাথে ব্যবহৃত হয়, তখন ঈমান দ্বারা অন্তরের বিশ্বাস এবং ইসলাম দ্বারা বাহ্যিক বাস্তব আমলকে বোঝানো হয়।

(গ) শব্দ বিশ্লেষণ ও ব্যাকরণিক তাহক্বীক্ব (تحليل الكلمات)

  • ১. أَغْنَى (আগনা): ইসমে তাফযীল, মূল ধাতু ‘গাইন-নূন-ইয়া’ (غ ن ي)। অর্থ: সর্বাপেক্ষা ধনী, প্রাচুর্যময় বা অমুখাপেক্ষী।
  • ২. أَحْسِنْ (আহসিন): ফেলে আমর হাযির মারূফ, সিগাহ ওয়াহেদ মুযাক্কার হাযির। বাব ইফআল (الإحسان)। মাদাহ ‘হা-সীন-নূন’ (ح س ن)। অর্থ: তুমি সদাচরণ বা ইহসান কর।
  • ৩. تُمِيتُ (তূমীতু): ফেলে মুজারে মারূফ, সিগাহ ওয়াহেদ মুয়ান্নাস গায়েব। বাব ইফআল (الإماتة)। মাদাহ ‘মীম-ওয়াও-তা’ (م و ت), আজওয়াফে ওয়াবী। অর্থ: তা মেরে ফেলে বা ধ্বংস করে।

উপসংহার

এই পাঁচটি গুণ মানবসমাজকে অহংকার, পরশ্রীকাতরতা ও স্বার্থপরতা থেকে মুক্ত করে এক আলোকিত জান্নাতী সমাজে রূপান্তর করতে সক্ষম।

৫। عن جابر رضى الله عنه قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : أعطيت خمسا لم يعطهن أحد قبلي : نصرت بالرعب مسيرة شهر وجعلت لي الأرض مسجدا وطهورا فأيما رجل من أمتي أدركته الصلاة فليصل وأحلت لي المغانم ولم تحل لأحد قبلي وأعطيت الشفاعة وكان النبي يبعث إلى قومه خاصة وبعثت إلى الناس عامة – (متفق عليه)

[হাদিসের অনুবাদ এবং তাকওয়াবানদের শাফাআত, গনীমত বনাম ফাই এবং জাবিরের জীবনী]

[মান: ১৬ (অনুবাদ ৭ + ক ৩ + খ ৩ + গ ৩)]

ভূমিকা ও হাদিসের পটভূমি

সাইয়্যিদুল মুরসালীন হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে মহান আল্লাহ পূর্ববর্তী সমস্ত নবী-রাসুলগণের ওপর অনন্য শ্রেষ্ঠত্ব ও কিছু বিশেষ ঐশী বিশেষাধিকার দান করেছিলেন। আলোচ্য হাদিসে বিশ্বনবী (সা.) উম্মতের প্রতি আল্লাহর সেই অপূর্ব নিয়ামতসমূহের কৃতজ্ঞতা প্রকাশার্থে পাঁচটি বিশেষ অনন্য বৈশিষ্ট্যের কথা তুলে ধরেছেন।

मूल হাদিসের প্রামাণ্য বঙ্গানুবাদ

হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:

«أُعْطِيتُ خَمْسًا لَمْ يُعْطَهُنَّ أَحَدٌ قَبْلِي: نُصِرْتُ بِالرُّعْبِ مَسِيرَةَ شَهْرٍ، وَجُعِلَتْ لِيَ الْأَرْضُ مَسْجِدًا وَطَهُورًا، فَأَيُّمَا رَجُلٍ مِنْ أُمَّتِي أَدْرَكَتْهُ الصَّلَاةُ فَلْيُصَلِّ، وَأُحِلَّتْ لِيَ الْمَغَانِمُ وَلَمْ تَحِلَّ لِأَحَدٍ قَبْلِي، وَأُعْطِيتُ الشَّفَاعَةَ، وَكَانَ النَّبِيُّ يُبْعَثُ إِلَى قَوْمِهِ خَاصَّةً، وَبُعِثْتُ إِلَى النَّاسِ عَامَّةً»

“আমাকে এমন পাঁচটি বিশেষ মর্যাদা দান করা হয়েছে, যা আমার পূর্বে আর কোনো নবীকে দান করা হয়নি: (১) এক মাসের দূরত্বের পথ থেকেই শত্রুর অন্তরে ভীতির সঞ্চার করে আমাকে ঐশী সাহায্য দান করা হয়েছে; (২) সমগ্র ভূখণ্ডকে আমার জন্য সিজদার স্থান (মসজিদ) এবং পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যম (তায়াম্মুমের মাটি) বানিয়ে দেওয়া হয়েছে, অতএব আমার উম্মতের যে কোনো ব্যক্তির যেখানেই নামাজের সময় হবে সে সেখানেই নামাজ আদায় করে নিতে পারবে; (৩) আমার জন্য গনীমতের (যুদ্ধলব্ধ) সম্পদ হালাল করা হয়েছে, যা আমার পূর্ববর্তী কোনো নবীর জন্য হালাল ছিল না; (৪) আমাকে সর্বজনীন শাফাআতের (সুপারিশের) অধিকার দান করা হয়েছে; এবং (৫) পূর্ববর্তী প্রত্যেক নবীকে কেবল তাঁর নিজস্ব নির্দিষ্ট জাতির নিকট প্রেরণ করা হতো, আর আমাকে সমগ্র মানবজাতির জন্য সার্বজনীন রাসুল হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)।

(ক) কিয়ামতের দিন মুত্তাকীদের জন্যও কি শাফাআত প্রযোজ্য হবে?

হ্যাঁ, কিয়ামতের দিন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শাফাআত কেবল পাপীদের জন্যই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং মুত্তাকী ও পরহেজগার নেককার বান্দাগণের জন্যও শাফাআত কার্যকর হবে। শাফাআতের বিভিন্ন স্তর রয়েছে:

  • ১. শাফাআতে কুবরা বা উজমা: হাশরের ময়দানে বিচারকার্য দ্রুত শুরু করার জন্য সমগ্র মানবজাতির জন্য সুপারিশ (এটি সকল মুত্তাকীর জন্যও রহমত)।
  • ২. বিনা হিসাবে জান্নাত প্রবেশ: ৭০ হাজার বা ততোধিক মুত্তাকীকে কোনো প্রকার হিসাব ও আজাব ছাড়া সরাসরি জান্নাতে নেওয়ার সুপারিশ।
  • ৩. মর্যাদা বৃদ্ধি (رفع الدرجات): জান্নাতবাসী মুত্তাকীগণের জান্নাতের উচ্চতর স্তর ও সুউচ্চ মাক্বাম দান করার জন্য রাসুল (সা.) বিশেষ শাফাআত করবেন।

(খ) ‘গনীমত’ (الغنيمة)-এর সংজ্ঞা এবং গনীমত ও ফাই (الفيء)-এর মৌলিক পার্থক্য

  • গনীমতের সংজ্ঞা: কাফেরদের সাথে প্রত্যক্ষ সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে লড়াই করে বিজয়ী হওয়ার পর তাদের ফেলে যাওয়া যেসব ধনসম্পদ মুসলমানদের হস্তগত হয়, তাকে ‘গনীমত’ বলা হয়। এটি পাঁচ ভাগে ভাগ করে এক ভাগ আল্লাহর রাসুল, এতিম ও দরিদ্রদের জন্য এবং বাকি চার ভাগ মুজাহিদদের মাঝে বণ্টন করা হয়।
  • ফাই (الفيء)-এর সংজ্ঞা ও পার্থক্য: কোনো প্রকার সরাসরি যুদ্ধ বা রক্তপাত ছাড়া কাফেররা মুসলমানদের ভয়ে ভীত হয়ে যে সম্পদ সমর্পণ করে বা ছেড়ে পালিয়ে যায় (যেমন সন্ধির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ বা জিজিয়া), তাকে ‘ফাই’ বলা হয়।
    • মৌলিক পার্থক্য: গনীমতের ৪/৫ অংশ মুজাহিদ সৈন্যদের মাঝে বণ্টন করা ফরজ; কিন্তু ‘ফাই’-এর সম্পদে সাধারণ মুজাহিদদের কোনো সরাসরি ব্যক্তিগত হিস্যা থাকে না। এই সম্পদ সম্পূর্ণভাবে বায়তুলমালে জমা হবে এবং রাষ্ট্রপ্রধান তা সাধারণ জনকল্যাণ, সামরিক প্রতিরক্ষা ও দরিদ্রদের পুনর্বাসনে ব্যয় করবেন (সূরা হাশর: ৭)।

(গ) প্রখ্যাত সাহাবী হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.)-এর প্রামাণ্য জীবনী

হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ আল-আনসারী আস-সালামী (রা.) ছিলেন আক্বাবার দ্বিতীয় বাইয়াতে অংশগ্রহণকারী সর্বকনিষ্ঠ সাহাবী। ওহুদ যুদ্ধে তাঁর পিতা আব্দুল্লাহ (রা.) শহীদ হন এবং তাঁর ওপর ছয়টি অবিবাহিত বোন ও বিপুল ঋণের বোঝা রেখে যান। রাসুল (সা.) তাঁর বাড়িতে গিয়ে বরকতময় দোয়ার মাধ্যমে সমস্ত ঋণ পরিশোধ করিয়ে দিয়েছিলেন। জাবির (রা.) রাসুল (সা.)-এর সাথে ১৯টি সামরিক অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। তিনি মসজিদে নববীতে হাদিসের সুবিশাল দরস দিতেন। তিনি ১,৫৪০টি হাদিস বর্ণনা করেছেন। ৭৪ বা ৭৮ হিজরিতে ৯৪ বছর বয়সে মদিনায় শেষ সাহাবী হিসেবে তিনি ইন্তেকাল করেন।

উপসংহার

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই বিশেষ মর্যাদাগুলো প্রমাণ করে যে ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ, সার্বজনীন ও কেয়ামত পর্যন্ত অপরিবর্তনীয় ঐশী বিধান।

৬। عن أبي ذر رضى الله عنه أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال : إني لأعلم آية لو أخذ الناس بها لكفتهم : (ومن يتق الله يجعل له مخرجا ويرزقه من حيث لا يحتسب) – (رواه أحمد وابن ماجه والدرامي) وعن ابن مسعود رضى الله عنه قال : أقرأني رسول الله صلى الله عليه وسلم : إني انا الرزاق ذو القوة المتين – (رواه أبو داود والترمذي)

[হাদিসের অনুবাদ এবং তাকওয়ার পরিচয় ও সুফল, ‘লাও আখাযান নাসু…’ ও শব্দ তাহক্বীক্ব]

[মান: ১৬ (অনুবাদ ৭ + ক ৩ + খ ৩ + গ ৩)]

ভূমিকা ও হাদিসের পটভূমি

মানুষের যাবতীয় পার্থিব উৎকণ্ঠা, হতাশা ও ভয়ের মূল কারণ হলো রিযিকের অনিশ্চয়তা এবং বিপদাপদের শঙ্কা। পবিত্র কুরআন ও হাদিস ঘোষণা করেছে যে, যার অন্তরে আল্লাহর খাঁটি ভয় ও তাকওয়া রয়েছে, আসমান ও যমীনের সমস্ত বন্ধ দুয়ার আল্লাহ তার জন্য উন্মুক্ত করে দেন। আলোচ্য হাদিসে বিশ্বনবী (সা.) তাকওয়ার এই অলৌকিক শক্তির অভ্রান্ত নিশ্চয়তা প্রদান করেছেন।

মূল হাদিসদ্বয়ের প্রামাণ্য বঙ্গানুবাদ

হযরত আবু যর (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:

«إِنِّي لَأَعْلَمُ آيَةً لَوْ أَخَذَ النَّاسُ بِهَا لَكَفَتْهُمْ: ﴿وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا ۝ وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ﴾»

“নিশ্চয়ই আমি এমন একটি আয়াত সম্পর্কে জানি, সমস্ত মানুষ যদি কেবল সেই একটি আয়াতকে আঁকড়ে ধরত, তবে তাদের দুনিয়া ও আখেরাতের যাবতীয় প্রয়োজন মেটানোর জন্য তা-ই যথেষ্ট হতো; আর তা হলো: ‘যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করবে (তাকওয়া অবলম্বন করবে), আল্লাহ তার জন্য সংকট থেকে বের হওয়ার পথ তৈরি করে দেবেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করবেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।’” (মুসনাদে আহমদ, ইবনে মাজাহ ও দারেমী)।

অপর এক বর্ণনায় হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে এভাবে কিরাত পড়িয়েছেন:

«إِنِّي أَنَا الرَّزَّاقُ ذُو الْقُوَّةِ الْمَتِينُ»

“নিশ্চয়ই আমিই একমাত্র রিজিকদাতা, মহাশক্তিধর ও চির পরাক্রমশালী।” (সুনানে আবু দাউদ ও তিরমিযী)।

(ক) তাকওয়ার সংজ্ঞা এবং মুমিনের বাস্তব জীবনে তাকওয়ার সুফলসমূহ

  • তাকওয়ার সংজ্ঞা (معنى التقوى): শাব্দিক অর্থে তাকওয়া হলো বেঁচে থাকা বা নিজেকে রক্ষা করা। শরিয়তের পরিভাষায়—আল্লাহর শাস্তির ভয়ে এবং তাঁর ভালোবাসায় যাবতীয় শিরক, কবিরা ও সগিরা গুনাহ এবং হারাম কাজ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রেখে তাঁর আদেশসমূহ একনিষ্ঠভাবে পালন করাই হলো তাকওয়া। হযরত আলী (রা.) বলেন: “তাকওয়া হলো পরাক্রমশালী আল্লাহকে ভয় করা, ওহী অনুযায়ী আমল করা, অল্প রিযিকে সন্তুষ্ট থাকা এবং পরকালের যাত্রার প্রস্তুতি নেওয়া।”
  • মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রধান সুফলসমূহ:
    • ১. সংকট থেকে অলৌকিক মুক্তি: জীবনের প্রতিটি জটিল পারিবারিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিক সংকটে আল্লাহ অপ্রত্যাশিত সমাধান দেন।
    • ২. অভাবনীয় রিযিকের দুয়ার উন্মোচন: মুত্তাকী ব্যক্তির রিযিকের জন্য হীনমন্য হতে হয় না; আল্লাহ গায়েবিভাবে তার প্রয়োজন মিটিয়ে দেন।
    • ৩. সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী প্রজ্ঞা লাভ: আল্লাহ বলেন: «إِنْ تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَلْ لَكُمْ فُرْقَانًا» — “তোমরা যদি তাকওয়া অবলম্বন কর, আল্লাহ তোমাদের অন্তরে সত্য-মিথ্যা চেনার আলো দান করবেন।”
    • ৪. গুনাহ মাফ ও জান্নাতের নিশ্চয়তা।

(খ) “لو أخذ الناس بها لكفتهم”-এর গভীর তাৎপর্য ও মর্মার্থ

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই বাণীর উদ্দেশ্য হলো—মানুষ দুনিয়াতে সুখ, শান্তি, রিযিক ও মুক্তির জন্য হাজারো অবৈধ পথ খোঁজে, মিথ্যা বলে, সুদ খায় ও দুর্নীতি করে। কিন্তু তারা যদি একমাত্র আল্লাহর তাকওয়াকে জীবনের মূল চালিকাশক্তি বানিয়ে নিত, তবে তাদের পার্থিব জীবিকা ও পরকালীন মুক্তির জন্য আর কোনো চিন্তার প্রয়োজন হতো না। তাকওয়াই মানুষের প্রতিটি সমস্যার এক মহৌষধ ও মহা সমাধান।

(গ) শব্দ বিশ্লেষণ ও ব্যাকরণিক তাহক্বীক্ব (تحليل الكلمات)

  • ১. لَا يَحْتَسِبُ (লা ইয়াহতাসিবু): ফেলে মুজারে নাফী মারূফ, সিগাহ ওয়াহেদ মুযাক্কার গায়েব। বাব ইফতিআল (الاحتساب)। মাদাহ ‘হা-সীন-বা’ (ح س ب)। অর্থ: সে গণনা করে না বা কল্পনাও করতে পারে না।
  • ২. أَقْرَأَنِي (আক্বরা’আনী): ফেলে মাজী মারূফ, সিগাহ ওয়াহেদ মুযাক্কার গায়েব। বাব ইফআল (الإقراء)। সাথে ‘নূন’ বিক্বায়াহ এবং ‘ইয়া’ মুতাকাল্লিম মাফউলে বিহী যুক্ত। অর্থ: তিনি আমাকে পাঠ করিয়েছেন বা পড়িয়েছেন।
  • ৩. الرَّزَّاقُ (আর-রায্যাক্ব): সিগাতুল মুবালাগাহ (অতিশয় অর্থবোধক বিশেষ্য)। ওজন ‘ফা’আল’ (فَعَّال)। মূল ধাতু ‘রা-যা-ক্বাফ’ (ر ز ق)। অর্থ: মহান রিযিকদাতা, যিনি অগণিত সৃষ্টিকে অফুরন্ত রিযিক প্রদান করেন।

উপসংহার

তাকওয়াই হলো বান্দার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত শ্রেষ্ঠ পাথেয়, যা মানুষের সকল দুশ্চিন্তা দূর করে পরম নিশ্চিন্ততার জীবন উপহার দেয়।

৭। عن ثوبان رضى الله عنه قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : إذا وضع السيف في أمتي لم يرفع عنها إلى يوم القيامة ولا تقوم الساعة حتى تلحق قبائل من أمتي بالمشركين وحتى تعبد قبائل من أمتي الأوثان وإنه سيكون في أمتي كذابون ثلاثون كلهم يزعم أنه نبي الله وأنا خاتم النبيين لا نبي بعدي ولا تزال طائفة من أمتي على الحق ظاهرين لا يضرهم من خالفهم حتى يأتي أمر الله – (رواه أبو داود)

[হাদিসের অনুবাদ এবং ত্রিশজন ভণ্ড নবীর আবির্ভাব, বিজয়ী সত্যপন্থী দল ও শব্দ তাহক্বীক্ব]

[মান: ১৬ (অনুবাদ ৭ + ক ৩ + খ ৩ + গ ৩)]

ভূমিকা ও হাদিসের পটভূমি

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) হলেন নবুওয়তের সিলসিলার সর্বশেষ চূড়ান্ত রত্ন, তাঁর মাধ্যমে ওহী ও নবুওয়তের দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। তবে কিয়ামতের পূর্বে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে যেসকল বিপর্যয়, গৃহযুদ্ধ, রক্তপাত এবং মিথ্যা নবুওয়তের দাবিদার দাজ্জালদের আবির্ভাব ঘটবে—রাসুল (সা.) এই যুগান্তকারী হাদিসে সেই ঐতিহাসিক ভবিষ্যদ্বাণী প্রদান করেছেন এবং একটি বিজয়ী সত্যপন্থী দলের অবিচল থাকার সুসংবাদ দিয়েছেন।

মূল হাদিসের প্রামাণ্য বঙ্গানুবাদ

হযরত সাওবান (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:

«إِذَا وُضِعَ السَّيْفُ فِي أُمَّتِي لَمْ يُرْفَعْ عَنْهَا إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ، وَلَا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى تَلْحَقَ قَبَائِلُ مِنْ أُمَّتِي بِالْمُشْرِكِينَ، وَحَتَّى تَعْبُدَ قَبَائِلُ مِنْ أُمَّتِي الْأَوْثَانَ، وَإِنَّهُ سَيَكُونُ فِي أُمَّتِي كَذَّابُونَ ثَلَاثُونَ كُلُّهُمْ يَزْعُمُ أَنَّهُ نَبِيُّ اللَّهِ، وَأَنَا خَاتَمُ النَّبِيِّينَ لَا نَبِيَّ بَعْدِي، وَلَا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي عَلَى الْحَقِّ ظَاهِرِينَ لَا يَضُرُّهُمْ مَنْ خَالَفَهُمْ حَتَّى يَأْتِيَ أَمْرُ اللَّهِ»

“যখন আমার উম্মতের মাঝে একবার অভ্যন্তরীণ তলোয়ার কোষমুক্ত হবে (গৃহযুদ্ধ ও রক্তপাত শুরু হবে), তখন কিয়ামত পর্যন্ত আর তা উঠিয়ে নেওয়া হবে না। আর ততক্ষণ পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে না, যতক্ষণ না আমার উম্মতের বহু গোত্র মুশরিকদের সাথে গিয়ে মিলিত হয় এবং আমার উম্মতের বহু গোত্র মূর্তিপূজায় লিপ্ত হয়। আর নিশ্চয়ই অচিরেই আমার উম্মতের মধ্যে ত্রিশজন চরম মিথ্যাবাদী ভণ্ডের (কাযযাব) আবির্ভাব ঘটবে, যাদের প্রত্যেকেই দাবি করবে যে সে আল্লাহর নবী; অথচ আমিই হলাম সর্বশেষ নবী (খাতামুন নাবিয়্যীন), আমার পর আর কোনো নবী নেই। আর আমার উম্মতের মধ্য থেকে একটি দল সর্বদা হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত ও বিজয়ী থাকবে; কোনো বিরোধিতাকারীর বিরোধিতা তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, যতক্ষণ না আল্লাহর নির্দেশ (কিয়ামত) এসে উপস্থিত হয়।” (সুনানে আবু দাউদ)।

(ক) “কذابون ثلاثون” (ত্রিশজন মিথ্যাবাদী ভণ্ড)-এর বিশদ বিবরণ

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতলগ্নে এবং পরবর্তীতে ইতিহাসে এমন বহু চরম মিথ্যাবাদীর আবির্ভাব ঘটেছে যারা নিজেদের নবী বলে দাবি করেছে। তন্মধ্যে প্রধান কতিপয় কুখ্যাত ভণ্ড হলো:

  • ১. মুসায়লামাতুল কাযযাব: ইয়ামামার ভণ্ড নবী, যাকে প্রথম খলিফা আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর যুগে ওয়াহশী (রা.) হত্যা করেন।
  • ২. আসওয়াদ আনাসী: ইয়েমেনের ভণ্ড নবী, যাকে রাসুল (সা.)-এর ওফাতের পূর্বেই সাহাবী ফাইরোজ দাইলামী হত্যা করেন।
  • ৩. তুলাইহা ইবনে খুওয়াইলিদ ও সাজাহ বিনতে হারিস: যারা পরবর্তীতে তওবা করে পুনরায় ইসলামে ফিরে আসেন।
  • ৪. মুখতার সাক্বাফী: যে দাবি করেছিল তার ওপর জিবরাঈল ওহী নিয়ে আসেন।
  • ৫. মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী: আধুনিক যুগে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অনুগত ভণ্ড নবী, যার অনুসারীদের ইসলামি শরিয়ত অমুসলিম ও কাফের ঘোষণা করেছে।

(খ) “طائفة من أمتي على الحق ظاهرين” (সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত বিজয়ী দল)-এর পরিচয়

মুহাদ্দিস ও ওলামায়ে কেরামের মতে এই ‘ত্বায়িফায়ে মানসূরাহ’ বা বিজয়ী দল হলেন:

  • ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল ও আলী ইবনুল মাদীনী (রহ.): “যদি এই বিজয়ী দলটি হাদিসের অনুসারী ‘আসহাবুল হাদিস’ (মুহাদ্দিস ও সুন্নাহর অনুসারী আলেমসমাজ) না হন, তবে দুনিয়ায় আর কে হতে পারে তা আমার জানা নেই!”
  • সার্বিক পরিচয়: যুগে যুগে কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর ওপর অবিচল থাকা, বিদআত ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আপসহীন লড়াই করা এবং জালিম শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সত্য প্রচারকারী সালাফে সালেহীনের অনুসারী নিষ্ঠাবান আলেম ও মুজাহিদগণই হলেন এই মহান দল।

(গ) শব্দ বিশ্লেষণ ও ব্যাকরণিক তাহক্বীক্ব (تحليل الكلمات)

  • ১. وُضِعَ (উদিআ): ফেলে মাজী মাজহুল, সিগাহ ওয়াহেদ মুযাক্কার গায়েব। বাব যারাবা-ইয়াযরিবু। মাদাহ ‘ওয়াও-দাদ-আইন’ (و ض ع), মিসালে ওয়াবী। অর্থ: রাখা হলো বা কোষমুক্ত করা হলো।
  • ২. قَبَائِلُ (ক্বাবাঈল): বিশেষ্য পদ, জমা তাকসীর (বহুবচন)। একবচন ‘ক্বাবীলাহ’ (قبيلة)। অর্থ: বিভিন্ন গোত্র বা বংশসমূহ।
  • ৩. خَالَفَهُمْ (খালাফাহুম): ফেলে মাজী মারূফ, সিগাহ ওয়াহেদ মুযাক্কার গায়েব, বাব মুফা’আলাহ। মাদাহ ‘খা-লাম-ফা’। সাথে ‘হুম’ মাফউলে বিহীর দমীর। অর্থ: তাদের বিরুদ্ধাচরণ করল।

উপসংহার

বিশ্বনবী (সা.)-এর খতমে নবুওয়তের আকিদা ঈমানের অন্যতম মেরুদণ্ড; এবং ফেতনার যুগেও একটি হক্কানী দল সর্বদা বিজয়ী থাকবে—এই হাদিস মুমিনের হৃদয়ে অসীম সাহসের সঞ্চার করে।

৮। عن جرير بن عبد الله رضى الله عنه قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : إنكم سترون ربكم عيانا – وفي رواية : قال : كنا جلوسا عند رسول الله صلى الله عليه وسلم فنظر إلى القمر ليلة البدر فقال : إنكم سترون ربكم كما ترون هذا القمر لا تضامون في رؤيته فإن استطعتم أن لا تغلبوا على صلاة قبل طلوع الشمس وقبل غروبها فافعلوا ثم قرأ وسبح بحمد ربك قبل طلوع الشمس وقبل غروبها – (متفق عليه)

[হাদিসের অনুবাদ এবং আখেরাতে আল্লাহ দর্শন, পূর্ণিমার চাঁদের উপমা ও শব্দ তাহক্বীক্ব]

[মান: ১৬ (অনুবাদ ৭ + ক ৩ + খ ৩ + গ ৩)]

ভূমিকা ও হাদিসের পটভূমি

জান্নাতি মুমিনদের জন্য পরকালের সর্বশ্রেষ্ঠ, অতুলনীয় ও পরম পাওয়া হলো স্বয়ং আল্লাহ রব্বুল আলামীনকে স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করা (রূ’ইয়াতুল্লাহ)। জান্নাতের সমস্ত অফুরন্ত নিয়ামত আল্লাহর দীদারের আনন্দের সামনে ম্লান হয়ে যাবে। বিশ্বনবী (সা.) এই অনন্য হাদিসে পূর্ণিমার চাঁদের উপমা দিয়ে মুমিনদের এই পরম সৌভাগ্যের সুসংবাদ দিয়েছেন।

মূল হাদিসের প্রামাণ্য বঙ্গানুবাদ

হযরত জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ আল-বাজালী (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: “নিশ্চয়ই অচিরেই তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে চাক্ষুষ দেখতে পাবে।” অপর বর্ণনায় তিনি বলেন: আমরা এক রাতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট উপবিষ্ট ছিলাম। তিনি চৌদ্দ তারিখের পূর্ণিমার চাঁদের দিকে দৃষ্টিপাত করে বললেন:

«إِنَّكُمْ سَتَرَوْنَ رَبَّكُمْ كَمَا تَرَوْنَ هَذَا الْقَمَرَ، لَا تُضَامُونَ فِي رُؤْيَتِهِ، فَإِنِ اسْتَطَعْتُمْ أَنْ لَا تُغْلَبُوا عَلَى صَلَاةٍ قَبْلَ طُلُوعِ الشَّمْسِ وَقَبْلَ غُرُوبِهَا فَافْعَلُوا، ثُمَّ قَرَأَ: ﴿وَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ قَبْلَ طُلُوعِ الشَّمْسِ وَقَبْلَ غُرُوبِهَا﴾»

“নিশ্চয়ই তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে অতি স্পষ্টভাবে দেখতে পাবে, যেমন তোমরা ওই পূর্ণিমার চাঁদটিকে দেখছ; তাঁকে দেখতে তোমাদের কোনো ভিড় বা ধাক্কাধাক্কি করতে হবে না এবং কোনো সন্দেহ থাকবে না। অতএব তোমরা যদি সূর্যোদয়ের পূর্বের নামাজ (ফজর) এবং সূর্যাস্তের পূর্বের নামাজ (আসর)-এর ব্যাপারে অলসতায় পরাজিত না হয়ে তা আদায় করতে সক্ষম হও, তবে অবশ্যই তা আদায় কর। অতঃপর তিনি কুরআনের এই আয়াত পাঠ করলেন: ‘এবং আপনার প্রতিপালকের প্রশংসার তাসবিহ পাঠ করুন সূর্যোদয়ের পূর্বে এবং সূর্যাস্তের পূর্বে।’” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)।

(ক) আখেরাতে আল্লাহ দর্শন কি প্রমাণিত? এ বিষয়ে আহলে সুন্নাতের সর্বসম্মত আকিদা

  • আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের সর্বসম্মত আকিদা: কিয়ামতের দিন এবং জান্নাতের ভেতরে জান্নাতি মুমিনগণ স্বয়ং আল্লাহ তাআলাকে তাঁদের রক্তমাংসের চোখ দিয়ে কোনো প্রকার দিক, রূপ, সীমাবদ্ধতা বা সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য ছাড়া (بلا كيف ولا تشبيه ولا جهة) সরাসরি প্রত্যক্ষ করবে। এটি কুরআন ও মুতাওয়াতির হাদিস দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত।
  • কুরআনের সুস্পষ্ট প্রমাণ:

    «وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ نَاضِرَةٌ ۝ إِلَىٰ رَبِّهَا نَاظِرَةٌ»

    “সেদিন বহু মুখমণ্ডল আনন্দে উজ্জ্বল হবে; তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে।” (সূরা আল-ক্বিয়ামাহ: ২২-২৩)। আরও বলেন: «لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا الْحُسْنَىٰ وَزِيَادَةٌ» (সূরা ইউনুস: ২৬) — এখানে ‘যিয়াদাহ’ বা অতিরিক্ত নিয়ামত দ্বারা রাসুল (সা.) স্বয়ং আল্লাহর দর্শনকে ব্যাখ্যা করেছেন।

  • মুতাযিলা ও বাতিল দলের ভ্রান্তি: মুতাযিলা ও জাহমিয়া সম্প্রদায় মানবীয় সীমিত বুদ্ধির যুক্তি দেখিয়ে আল্লাহর এই মহিমান্বিত দর্শনকে অস্বীকার করেছে, যা সহিহ সুন্নাহ ও ইজমার সরাসরি বিরোধী।

(খ) “كما ترون هذا القمر لا تضامون في رؤيته”-এর চমৎকার ব্যাখ্যা

হাদিসে পূর্ণিমার চাঁদের সাথে আল্লাহর সত্তার তুলনা করা হয়নি (تشبيه المرئي بالمرئي নয়); বরং দেখার স্পষ্টতার সাথে দেখার তুলনা করা হয়েছে (تشبيه الرؤية بالرؤية)। অর্থাৎ আকাশে পূর্ণিমার মেঘমুক্ত চাঁদ যেমন পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ কোনো বাধা বা ধাক্কাধাক্কি ছাড়া যার যার স্থান থেকে একই সাথে স্পষ্ট দেখতে পায়—তেমনি জান্নাতে সমস্ত মুমিন কোনো ভিড় বা বাধা ছাড়াই যার যার স্থান থেকে মহান রবকে অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে প্রত্যক্ষ করতে পারবে।

(গ) শব্দ বিশ্লেষণ ও ব্যাকরণিক তাহক্বীক্ব (تحليل الكلمات)

  • ১. سَتَرَوْنَ (সাতারওনা): ফেলে মুজারে মারূফ, শুরুতে ‘সীন’ তানফীস যুক্ত। সিগাহ জমা মুযাক্কার হাযির। বাব ফাতাহা। মাদাহ ‘রা-হামযা-ইয়া’ (ر أ ي)। অর্থ: অচিরেই তোমরা দেখতে পাবে।
  • ২. اسْتَطَعْتُمْ (ইসতাতা’তুম): ফেলে মাজী মারূফ, সিগাহ জমা মুযাক্কার হাযির। বাব ইসতিফআল। মাদাহ ‘ত্বা-ওয়াও-আইন’। অর্থ: তোমরা সক্ষম হলে বা সামর্থ্য রাখলে।
  • ৩. سَبِّحْ (সাব্বিহ): ফেলে আমর হাযির মারূফ, সিগাহ ওয়াহেদ মুযাক্কার হাযির। বাব তাফঈল (التسبيح)। মাদাহ ‘সীন-বা-হা’ (س ب ح)। অর্থ: আপনি তাসবিহ বা পবিত্রতা ঘোষণা করুন।

উপসংহার

ফজর ও আসরের সালাতের নিয়মিত পাবন্দি জান্নাতে মহান আল্লাহর পবিত্র দীদার লাভের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শর্ত ও অলৌকিক চাবিকাঠি।

৯। عن أبي هريرة رضى الله عنه قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : أنا سيد ولد آدم يوم القيامة وأول من ينشق عنه القبر وأول شافع وأول مشفع – (رواه مسلم) وعن أنس رضى الله عنه قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : أنا أكثر الأنبياء تبعا يوم القيامة، وأنا أول من يقرع باب الجنة – (رواه مسلم)

[হাদিসের অনুবাদ এবং কবীরা গুনাহগারদের শাফাআত, জান্নাতের দ্বারে প্রথম করাঘাত ও শব্দ তাহক্বীক্ব]

[মান: ১৬ (অনুবাদ ৭ + ক ৩ + খ ৩ + গ ৩)]

ভূমিকা ও হাদিসের পটভূমি

মহান আল্লাহ তাআলা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে সমস্ত সৃষ্টির ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করে ‘সাইয়্যিদুশ শুহাদা’ ও ‘সাইয়্যিদুল বাশার’ মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছেন। কিয়ামতের চরম বিভীষিকাময় দিনে যখন সমস্ত মানবজাতি থরথর করে কাঁপতে থাকবে এবং সমস্ত নবী-রাসুলগণ ‘নাফসী নাফসী’ করবেন, তখন একমাত্র বিশ্বনবী (সা.) ‘উম্মাতি উম্মাতি’ বলে মাক্বামে মাহমুদে সিজদায় অবনত হয়ে উম্মতের জন্য শাফাআত করবেন।

মূল হাদিসদ্বয়ের প্রামাণ্য বঙ্গানুবাদ

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:

«أَنَا سَيِّدُ وَلَدِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَأَوَّلُ مَنْ يَنْشَقُّ عَنْهُ الْقَبْرُ، وَأَوَّلُ شَافِعٍ، وَأَوَّلُ مُشَفَّعٍ»

“আমি কিয়ামতের দিন আদম সন্তানদের নেতা বা সরদার হব; এবং আমিই সর্বপ্রথম ব্যক্তি যার জন্য কবর বিদীর্ণ হবে (সর্বপ্রথম পুনরুত্থিত হবেন); এবং আমিই হব সর্বপ্রথম সুপারিশকারী এবং আমিই সর্বপ্রথম ব্যক্তি যার সুপারিশ আল্লাহর দরবারে কবুল করা হবে।” (সহিহ মুসলিম)।

অপর এক বর্ণনায় হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:

«أَنَا أَكْثَرُ الْأَنْبِيَاءِ تَبَعًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَأَنَا أَوَّلُ مَنْ يَقْرَعُ بَابَ الْجَنَّةِ»

“কিয়ামতের দিন সমস্ত নবীদের মধ্যে আমার অনুসারীর সংখ্যাই হবে সর্বাধিক; এবং আমিই সর্বপ্রথম ব্যক্তি যে জান্নাতের দরজায় করাঘাত করবে।” (সহিহ মুসলিম)।

(ক) কবীরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিদের জন্য রাসুল (সা.)-এর শাফাআত এবং মতভেদ

  • আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের সর্বসম্মত আকিদা: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শাফাআত উম্মতের কবিরা গুনাহগারদের জন্য সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত। তিরমিযী শরীফে রাসুল (সা.) বলেন: «شَفَاعَتِي لِأَهْلِ الْكَبَائِرِ مِنْ أُمَّتِي» — “আমার শাফাআত আমার উম্মতের কবিরা গুনাহগারদের জন্য।” মুমিন অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী যেসকল ব্যক্তি তওবা ছাড়া কবিরা গুনাহ নিয়ে মারা যাবে, তারা অনন্তকাল জাহান্নামে থাকবে না; বরং নবীজী (সা.)-এর শাফাআতের মাধ্যমে তাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্ত করে জান্নাতে নেওয়া হবে।
  • উভয় দলের বিপরীত মত ও খণ্ডন: খারেজী ও মুতাযিলারা দাবি করে যে কবিরা গুনাহগার চিরকাল জাহান্নামে থাকবে এবং তাদের জন্য কোনো শাফাআত হবে না। তাদের এই দাবি মুতাওয়াতির সহিহ হাদিসের সম্পূর্ণ পরিপন্থী হওয়ায় আহলে সুন্নাত কর্তৃক কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যাত।

(খ) “أنا أول من يقرع باب الجنة”-এর তাৎপর্য ও ব্যাখ্যা

সহিহ মুসলিমের অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা.) বলেন: “আমি কিয়ামতের দিন জান্নাতের দরজায় এসে তা খোলার নির্দেশ দেব। তখন জান্নাতের প্রধান প্রহরী ফেরেশতা রিজওয়ান জিজ্ঞাসা করবেন: ‘আপনি কে?’ আমি বলব: ‘আমি মুহাম্মদ।’ তখন ফেরেশতা বলবেন: ‘আপনার জন্যই আমি আদিষ্ট ছিলাম, আপনার প্রবেশের পূর্বে আর কারও জন্য আমি জান্নাতের দরজা খুলিনি এবং খুলব না!’” এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে বিশ্বনবী (সা.)-এর পূর্বে অন্য কোনো মানব বা নবীর জন্য জান্নাত উন্মুক্ত হবে না; তিনিই হবেন জান্নাতে সর্বপ্রথম প্রবেশকারী মহামানব।

(গ) শব্দ বিশ্লেষণ ও ব্যাকরণিক তাহক্বীক্ব (تحليل الكلمات)

  • ১. يَنْشَقُّ (ইয়ানশাক্বক্বু): ফেলে মুজারে মারূফ, সিগাহ ওয়াহেদ মুযাক্কার গায়েব। বাব ইনফিআল (الانشقاق)। মাদাহ ‘শীন-ক্বাফ-ক্বাফ’ (ش ق ق), মুযাআফে সুলাসী। অর্থ: বিদীর্ণ বা ফেটে উন্মুক্ত হবে।
  • ২. مُشَفَّعٌ (মুশাফফা’উন): ইসমে মাফউল, বাব তাফঈল (التشفيع)। মাদাহ ‘শীন-ফা-আইন’ (ش ف ع)। অর্থ: যাঁর সুপারিশ সাদরে কবুল বা মঞ্জুর করা হয়েছে।
  • ৩. يَقْرَعُ (ইয়াক্বরা’উ): ফেলে মুজারে মারূফ, সিগাহ ওয়াহেদ মুযাক্কার গায়েব। বাব ফাতাহা-ইয়াফতাহু। মাদাহ ‘ক্বাফ-রা-আইন’ (ق ر ع)। অর্থ: সে করাঘাত করবে বা কড়া নাড়বে।

উপসংহার

বিশ্বনবী (সা.)-এর এই আকাশচুম্বী মর্যাদা উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য পরম গর্ব ও পরম আশার আলোকবর্তিকা, যা সুন্নাহর অনুসরণে জীবন পরিচালনা করতে উদ্বুদ্ধ করে।

১০। علق على عبادة بن الصامت (رض) –

[হযরত উবাদাহ ইবনুস সামিত (রা.)-এর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও হাদিস বর্ণনায় তাঁর ভূমিকা]

[মান: ৫]

ভূমিকা ও পরিচিতি

হযরত উবাদাহ ইবনুস সামিত আল-আনসারী আল-খাযরাজী (রা.) ছিলেন ইসলামের প্রথম যুগের অন্যতম অগ্রণী সাহাবী এবং মদিনার আনসারদের শ্রেষ্ঠ নকীব বা দলপতি। তাঁর কুনিয়াত ছিল ‘আবু আল-ওয়ালীদ’। তিনি প্রথম ও দ্বিতীয় উভয় আক্বাবার ঐতিহাসিক বাইয়াতে অংশগ্রহণ করেন এবং রাসুল (সা.)-এর পবিত্র হাতে সরাসরি বায়আত গ্রহণকারী বারোজন আনসার প্রতিনিধির অন্যতম ছিলেন।

বীরত্ব ও শাসন পরিচালনায় অনন্য ভূমিকা

তিনি বদর, ওহুদ, খন্দকসহ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় সংঘটিত সমস্ত ঐতিহাসিক যুদ্ধে বীরত্বের সাথে লড়াই করেছেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত নির্ভীক, স্পষ্টভাষী এবং সত্যের ওপর পাহাড়ের মতো অটল। হযরত উমর (রা.)-এর খেলাফতকালে যখন সিরিয়া বিজিত হলো, তখন সিরিয়াবাসীকে কুরআন ও সুন্নাহ শিক্ষা দেওয়ার জন্য উমর (রা.) তিনজন শীর্ষ সাহাবীকে প্রেরণ করেন—উবাদাহ ইবনুস সামিত, মুআজ ইবনে জাবাল ও আবু দারদা (রা.)। উবাদাহ (রা.) ফিলিস্তিনের শাসনকর্তা ও প্রধান কাজী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সিরিয়ার গভর্নর মুআবিয়া (রা.)-এর কোনো কোনো সিদ্ধান্তের সাথে শরিয়তের অমিল দেখলে তিনি প্রকাশ্য রাজদরবারে দাঁড়িয়ে সত্য ফতোয়া ঘোষণা করতেন এবং অন্যায়ের সাথে বিন্দুমাত্র আপস করতেন না।

হাদিসশাস্ত্রে অবিস্মরণীয় অবদান

হযরত উবাদাহ ইবনুস সামিত (রা.) ছিলেন সুন্নাহর একনিষ্ঠ অনুসারী এবং নির্ভরযোগ্য হাদিস বর্ণনাকারী। তাঁর থেকে বর্ণিত মোট হাদিসের সংখ্যা ১৮১টি। নামাজের প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করার আবশ্যকতা সংক্রান্ত বিখ্যাত হাদিস («لَا صَلَاةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ») তিনিই বর্ণনা করেছেন। ৩৪ হিজরিতে ৭২ বছর বয়সে ফিলিস্তিনের রামাল্লায় এই মহান মুজাহিদ সাহাবী ইন্তেকাল করেন।

উপসংহার

হযরত উবাদাহ ইবনুস সামিত (রা.) ছিলেন সততা, ইনসাফ ও নির্ভীকতার মূর্ত প্রতীক, যাঁর জীবন কিয়ামত পর্যন্ত ওলামায়ে কেরামের জন্য আদর্শ।

১১। علق على عرباض بن سارية (رض) –

[হযরত ইরবায ইবনে সারিয়াহ (রা.)-এর পরিচিতি ও বিদায়ি নসিহতের ঐতিহাসিক হাদিস]

[মান: ৫]

ভূমিকা ও বংশ পরিচয়

হযরত ইরবায ইবনে সারিয়াহ আস-সুলামী (রা.) ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একনিষ্ঠ ও প্রবীণ সাহাবী। তাঁর কুনিয়াত ছিল ‘আবু নাজীহ’। তিনি ইসলামের একেবারে প্রাথমিক যুগে মক্কায় ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন আহলে সুফফার (মসজিদে নববীর চত্বরে অবস্থানকারী নিঃস্ব জ্ঞানপিপাসু দল) অন্যতম শীর্ষ সদস্য।

তাকওয়া ও জিহাদের আকুলতা

তিনি ছিলেন চরম খোদাভীরু ও ক্রন্দনকারী সাহাবী। তাবুক যুদ্ধের চরম সংকটকালে যেসকল সাহাবী চরম দরিদ্রতার কারণে কোনো বাহন না পেয়ে যুদ্ধে যেতে না পেরে অঝোর নয়নে কেঁদেছিলেন এবং যাদের কথা স্বয়ং কুরআনুল কারীমে উল্লেখিত হয়েছে («تَوَلَّوْا وَأَعْيُنُهُمْ تَفِيضُ مِنَ الدَّمْعِ» — সূরা আত-তাওবাহ: ৯২)—হযরত ইরবায ইবনে সারিয়াহ ছিলেন সেই ঐতিহাসিক ‘বুক্কাঈন’ (ক্রন্দনকারী) দলের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি।

বিদায়ি নসিহতের কালজয়ী হাদিস বর্ণনা

হযরত ইরবায ইবনে সারিয়াহ (রা.) হাদিসশাস্ত্রে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন তাঁর বর্ণিত একটি ঐতিহাসিক দীর্ঘ হাদিসের কারণে। তিনি বর্ণনা করেন:

«وَعَظَنَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مَوْعِظَةً بَلِيغَةً، وَجِلَتْ مِنْهَا الْقُلُوبُ، وَذَرَفَتْ مِنْهَا الْعُيُونُ…»

“একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদেরকে এমন এক হৃদয়গ্রাহী ও মর্মস্পর্শী নসিহত করলেন, যাতে আমাদের অন্তরসমূহ কেঁপে উঠল এবং চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হতে লাগল। আমরা বললাম: ‘হে আল্লাহর রাসুল! মনে হচ্ছে এটি যেন কোনো বিদায়ি নসিহত; অতএব আপনি আমাদের বিশেষ উপদেশ দিন!’ তখন রাসুল (সা.) বললেন: ‘আমি তোমাদেরকে তাকওয়া অবলম্বন করার এবং আনুগত্য করার নির্দেশ দিচ্ছি, যদি তোমাদের ওপর কোনো হাবশী ক্রীতদাসকেও আমীর বানানো হয়। আর নিশ্চয়ই আমার পর তোমাদের মধ্যে যে বেঁচে থাকবে, সে বহুবিধ মতভেদ ও বিভেদ প্রত্যক্ষ করবে; এমতাবস্থায় তোমরা আমার সুন্নাত এবং হেদায়েতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতকে চোয়ালের দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে রাখবে; আর দ্বীনের মধ্যে নতুন আবিষ্কৃত বিষয় (বিদআত) থেকে বেঁচে থাকবে…!’” (তিরমিযী ও আবু দাউদ)। ৭৫ হিজরিতে তিনি শাম বা হিমসে ইন্তেকাল করেন।

উপসংহার

হযরত ইরবায (রা.)-এর বর্ণিত এই হাদিসটি মুসলিম উম্মাহকে ফেতনার যুগে সুন্নাহর ওপর অটল থাকার চিরন্তন দিকনির্দেশনা প্রদান করে।

১২। علق على عدي بن حاتم (رض) –

[হযরত আদী ইবনে হাতিম (রা.)-এর পরিচিতি ও তাঁর ইসলাম গ্রহণের ইতিহাস]

[মান: ৫]

ভূমিকা ও বংশ পরিচয়

হযরত আদী ইবনে হাতিম আত-ত্বাঈ (রা.) ছিলেন তৎকালীন আরবের সর্বশ্রেষ্ঠ কিংবদন্তি দানবীর হাতিম তাঈ-এর সুযোগ্য পুত্র। পিতার মৃত্যুর পর তিনি সমগ্র তাঈ গোত্রের প্রধান নেতা ও শাসক নির্বাচিত হন। তাঁর কুনিয়াত ছিল ‘আবু তারীফ’। তিনি প্রথমে খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারী ছিলেন।

ইসলাম গ্রহণ ও রাসুল (সা.)-এর সাথে ঐতিহাসিক মোলাকাত

৯ম হিজরিতে যখন মুসলমানদের অভিযান তাঈ গোত্রে পৌঁছে, তখন আদী সিরিয়ায় পালিয়ে যান। কিন্তু তাঁর বোন সাফানা বিনতে হাতিম বন্দি হয়ে মদিনায় আসেন। রাসুল (সা.) তাঁর পিতার দানশীলতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে সাফানাকে মুক্ত করে দেন। বোন সিরিয়ায় গিয়ে ভাইকে বললেন: “তুমি অবিলম্বে মুহাম্মদ (সা.)-এর দরবারে যাও; তিনি যদি নবী হন তবে তাঁর কাছে যাওয়াই তোমার জন্য পরম সৌভাগ্য।” আদী মদিনায় রাসুল (সা.)-এর দরবারে হাজির হলেন। রাসুল (সা.) তাঁকে নিজ গৃহে নিয়ে একটি খেজুর পাতার গদিতে বসতে দিলেন এবং নিজে মাটিতে বসে পরম বিনম্রতার সাথে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। রাসুল (সা.)-এর এই নির্লোভ ও বিনম্র আচরণ দেখে আদী বুঝতে পারলেন যে ইনি কোনো সাধারণ পার্থিব রাজা নন; বরং স্বয়ং আল্লাহর সত্য রাসুল। তিনি তৎক্ষণাৎ কালেমা পাঠ করে ইসলাম গ্রহণ করেন।

হাদিস বর্ণনা ও বীরত্ব

ইসলাম গ্রহণের পর তিনি মুরতাদদের বিরুদ্ধে এবং পারস্য বিজয়ের প্রতিটি যুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব প্রদর্শন করেন। শিকার ও জবাই সংক্রান্ত বহু মৌলিক হাদিস তাঁর সূত্রেই বর্ণিত হয়েছে (যেমন শিকারী কুকুরের হাদিস)। তিনি রাসুল (সা.) থেকে ৬৬টি হাদিস বর্ণনা করেছেন। ৬৮ হিজরিতে কুফায় ১২০ বছর দীর্ঘ বরকতময় জীবন শেষে এই মহান সাহাবী ইন্তেকাল করেন।

উপসংহার

হযরত আদী ইবনে হাতিম (রা.) ছিলেন আভিজাত্য, নেতৃত্ব ও সত্যের কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

১৩। علق على عكرمة بن أبي جهل (رض) –

[হযরত ইকরামা ইবনে আবি জাহাল (রা.)-এর পরিচিতি ও শাহাদাতের বীরত্ব]

[মান: ৫]

ভূমিকা ও বংশ পরিচয়

হযরত ইকরামা ইবনে আবি জাহাল আমর ইবনে হিশাম আল-মাখযূমী (রা.) ছিলেন ইসলামের চরমতম শত্রু ও ‘উম্মতের ফেরাউন’ খ্যাত আবু জাহেলের পুত্র। জাহেলি যুগে তিনি কুরাইশদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অশ্বারোহী বীর ও সেনাপতি ছিলেন। বদর ও ওহুদ যুদ্ধে তিনি মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড শত্রুতা প্রদর্শন করেছিলেন।

মক্কা বিজয়ের পর ইসলাম গ্রহণ ও নবজীবন

৮ম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের দিন রাসুল (সা.) যে কতিপয় চরম অপরাধীকে ক্ষমার বাইরে রেখেছিলেন, ইকরামা ছিলেন তাদের অন্যতম। তিনি ভয়ে নৌকায় করে ইয়েমেনের দিকে পালিয়ে যাচ্ছিলেন। মাঝসমুদ্রে প্রচণ্ড ঝড়ের কবলে পড়ে নৌকার কাফেররা যখন বলল: “এখানে লাত ও উযযা কোনো কাজে আসবে না, একমাত্র এক আল্লাহকে ডাক!” তখন ইকরামার বিবেক জেগে উঠল। তিনি বললেন: “যদি সমুদ্রে আল্লাহ ছাড়া কেউ বাঁচাতে না পারে, তবে স্থলেও আল্লাহ ছাড়া কেউ বাঁচাতে পারবে না! হে আল্লাহ! আমি অঙ্গীকার করছি, আমি যদি বেঁচে যাই তবে আমি সরাসরি মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে গিয়ে তাঁর হাতে হাত রেখে তওবা করব।” এদিকে তাঁর স্ত্রী উম্মে হাকীম রাসুল (সা.)-এর কাছ থেকে তাঁর জন্য সাধারণ ক্ষমা নিয়ে ইয়েমেনের তীরে গিয়ে তাঁকে ফিরিয়ে আনেন। তিনি যখন রাসুল (সা.)-এর দরবারে পৌঁছালেন, নবীজী অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে চাদর বিছিয়ে দিয়ে বললেন: «مَرْحَبًا بِالرَّاكِبِ الْمُهَاجِرِ» — “স্বাগতম হে হিজরতকারী বীর আরোহী!” ইকরামা কেঁদে ফেলে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং প্রতিজ্ঞা করেন: “ইসলামের ক্ষতিতে আমি যা ব্যয় করেছি, তার দ্বিগুণ সম্পদ ও শক্তি আমি আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করব!”

ইয়ারমুকের ময়দানে ঐতিহাসিক বীরত্ব ও শাহাদাত

১৩ হিজরিতে রোমানদের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক ইয়ারমুকের যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী যখন একপর্যায়ে চরম চাপের মুখে পড়ে, তখন ইকরামা চিৎকার করে ঘোষণা করলেন: “আমি কি আল্লাহর রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি, আর আজ রোমানদের সামনে পালিয়ে যাব? কে আছ আমার সাথে মৃত্যুর শপথ করবে?” তাঁর আহ্বানে চারশত বীর মুজাহিদ মৃত্যুর শপথ নিয়ে রোমান ব্যূহ ভেদ করে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং শত্রুকে ছত্রভঙ্গ করে দেন। যুদ্ধশেষে দেখা গেল ইকরামা, তাঁর চাচাতো ভাই হারেস ইবনে হিশাম ও আইয়াশ ইবনে আবি রাবীআ মারাত্মকভাবে জখম হয়ে মাটিতে পড়ে আছেন। পানি আনা হলে প্রত্যেকেই নিজের পিপাসা চেপে ধরে পাশের মুমূর্ষু ভাইকে পানি দিতে ইঙ্গিত করেন। এভাবে পানি কারও মুখ পর্যন্ত পৌঁছার পূর্বেই একে একে তিনজনই শাহাদাত বরণ করেন।

উপসংহার

হযরত ইকরামা (রা.) প্রমাণ করেছেন যে ঈমানের ছোঁয়া পেলে কুফরের অন্ধকার থেকে উঠে এসেও আত্মত্যাগের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানো সম্ভব।

১৪। علق على عمرو بن العاص (رض) –

[হযরত আমর ইবনুল আস (রা.)-এর পরিচিতি ও মিশর বিজয়ের ইতিহাস]

[মান: ৫]

ভূমিকা ও বংশ পরিচয়

হযরত আমর ইবনুল আস আল-কুরাশী আস-সাহমী (রা.) ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রণনীতিবিদ, সফল কূটনীতিবিদ এবং বিজ্ঞ সেনানায়ক। তাঁর কুনিয়াত ছিল ‘আবু আব্দুল্লাহ’। আরবের প্রখ্যাত চারজন শ্রেষ্ঠ কূটনীতিক ও প্রতিভাধর ব্যক্তিত্বের (দুহাতুল আরব) মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম।

ইসলাম গ্রহণ ও রাসুল (সা.)-এর আস্থা

হুদাইবিয়ার সন্ধির পর ৮ম হিজরির শূন্যলগ্নে তিনি মহাবীর খালিদ বিন ওয়ালিদ ও উসমান ইবনে তালহার সাথে মদিনায় এসে রাসুল (সা.)-এর পবিত্র হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের সময় তিনি নিজের পূর্ববর্তী সমস্ত গুনাহ মাফের শর্ত দিলে রাসুল (সা.) মুচকি হেসে বললেন: “হে আমর! তুমি কি জান না যে ইসলাম গ্রহণ এবং হিজরত মানুষের পূর্ববর্তী সমস্ত পাপকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে দেয়?” ইসলাম গ্রহণের অল্প কিছুদিন পরেই ৮ম হিজরিতে রাসুল (সা.) তাঁকে ‘জাতুস সালাসিল’ নামক গুরুত্বপূর্ণ অভিযানের প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করেন। রাসুল (সা.) বলতেন: “মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে, আর আমর ঈমান এনেছে!”

মিশর বিজয় ও হাদিস বর্ণনা

ইসলামের ইতিহাসে তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ গৌরবময় কীর্তি হলো মিশর বিজয়। হযরত উমর (রা.)-এর খেলাফতকালে ২০ হিজরিতে তিনি অত্যন্ত নিখুঁত রণকৌশলে রোমান বাহিনীকে পরাস্ত করে সমগ্র মিশর ভূখণ্ডকে বাইজান্টাইনদের হাত থেকে মুক্ত করে ইসলামের ছায়াতলে আনেন। তিনি মিশরে নতুন রাজধানী ‘ফুসতাত’ এবং আফ্রিকার সর্বপ্রথম ঐতিহাসিক জামে মসজিদ ‘মসজিদে আমর ইবনুল আস’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি দীর্ঘকাল মিশরের সফল গভর্নর হিসেবে ইনসাফের সাথে শাসন পরিচালনা করেন। তিনি রাসুল (সা.) থেকে ৩৯টি হাদিস বর্ণনা করেছেন। ৪৩ হিজরিতে প্রায় ৯০ বছর বয়সে মিশরে এই মহান সেনানায়ক ইন্তেকাল করেন।

উপসংহার

হযরত আমর ইবনুল আস (রা.) ছিলেন ইসলামের এক অনন্য রাজনৈতিক ও সামরিক স্তম্ভ, যাঁর মাধ্যমে আফ্রিকা মহাদেশে ইসলামের বিজয়ের দ্বার উন্মোচিত হয়েছিল।

১৫। علق على أبو عبيدة بن الجراح (رض) –

[হযরত আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ (রা.)-এর পরিচিতি ও ‘আমীনুল উম্মাহ’ উপাধি]

[মান: ৫]

ভূমিকা ও বংশ পরিচয়

হযরত আবু উবাইদাহ আমের ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনুল জাররাহ আল-ফিহরী আল-কুরাশী (রা.) ছিলেন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন বিশিষ্ট সাহাবীর (আশারায়ে মুবাশশারাহ) অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। তাঁর কুনিয়াত ছিল ‘আবু উবাইদাহ’। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর দাওয়াতে ইসলামের প্রথম দিনেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

‘আমীনুল উম্মাহ’ (উম্মতের পরম বিশ্বস্ত কাণ্ডারি) উপাধি

তাঁর আমানতদারী, সততা ও একনিষ্ঠতা ছিল সমগ্র আরবে সুবিখ্যাত। নাজরানের খ্রিস্টান প্রতিনিধি দল যখন রাসুল (সা.)-এর নিকট একজন বিশ্বস্ত বিচারক চাইল, তখন রাসুল (সা.) হযরত আবু উবাইদাহর হাত ধরে ইরশাদ করেছিলেন:

«إِنَّ لِكُلِّ أُمَّةٍ أَمِينًا، وَإِنَّ أَمِينَ هَذِهِ الأُمَّةِ أَبُو عُبَيْدَةَ بْنُ الجَرَّاحِ»

“নিশ্চয়ই প্রত্যেক উম্মতের একজন পরম বিশ্বস্ত আমানতদার ব্যক্তি থাকে; আর এই উম্মতে মুহাম্মদীর পরম বিশ্বস্ত আমানতদার হলেন আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ!” (সহিহ বুখারি)। সাকীফায়ে বনু সাঈদায় খলিফা নির্বাচনের মুহূর্তে হযরত আবু বকর (রা.) হযরত উমর ও আবু উবাইদাহর হাত তুলে ধরে যে কোনো একজনকে খলিফা হিসেবে গ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

সিরিয়া বিজয়ের সর্বাধিনায়ক ও অনাড়ম্বর জীবন

বদর যুদ্ধে নিজের কাফের পিতার আক্রমণের মুখে পড়ে দ্বীনের স্বার্থে তিনি লড়াই করেছিলেন। ওহুদ যুদ্ধে রাসুল (সা.)-এর পবিত্র মুখমণ্ডলে লোহার শিরস্ত্রাণের দুটি কড়া বিঁধে গেলে আবু উবাইদাহ স্বীয় দাঁত দিয়ে তা কামড়ে টেনে বের করেন, যার ফলে তাঁর দুটি সামনের দাঁত ভেঙে যায়। হযরত উমর (রা.)-এর খেলাফতকালে তিনি ছিলেন সমগ্র সিরিয়া বিজয়ের প্রধান সিপাহসালার (আমিরুল উমারা)। ইয়ারমুকের যুদ্ধসহ সিরিয়ার সমস্ত বিজয় তাঁর নেতৃত্বেই সম্পন্ন হয়। খলিফা উমর (রা.) যখন দামেস্কে তাঁর ঘরে গেলেন, তখন দেখলেন সেখানে একটি তলোয়ার, একটি ঢাল আর এক টুকরো পুরানো কম্বল ছাড়া আর কিছুই নেই! উমর (রা.) কেঁদে ফেলে বললেন: “দুনিয়া আমাদের সবাইকে পরিবর্তন করে দিয়েছে, কিন্তু হে আবু উবাইদাহ! দুনিয়া তোমাকে বিন্দুমাত্র স্পর্শ করতে পারেনি!” ১৮ হিজরিতে সিরিয়ার প্রলয়ঙ্করী ‘আমওয়াস’ প্লেগ মহামারীতে ৫৮ বছর বয়সে এই মহান ‘আমীনুল উম্মাহ’ শাহাদাত বরণ করেন।

উপসংহার

হযরত আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ (রা.) ছিলেন আত্মত্যাগ, বিশ্বস্ততা ও দুনিয়াবিমুখতার এক চিরন্তন আলোকবর্তিকা।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

ফাযিল ১ম বর্ষ দিরাসাতুল হাদীস ৩য় পত্র ২০২৪ পরীক্ষার বিষয় কোড কত ছিল?

বিষয় কোড ছিল ১১১০১৩ এবং পরীক্ষার পূর্ণমান ছিল ১০০ নম্বর। পরীক্ষার সময় ৩ ঘণ্টা।

পেটের অসুখে মধু পান করানো সংক্রান্ত হাদিসটির মূল শিক্ষা কী?

পবিত্র কুরআনে বর্ণিত মধুর নিরাময় ক্ষমতা অভ্রান্ত সত্য এবং সাময়িক অবস্থা দেখে হতাশ না হয়ে ওহীর নির্দেশনার ওপর অবিচল আস্থা রাখা উচিত।

ইসলামে ঝাড়ফুঁক (রুকইয়াহ) করার প্রধান শারঈ শর্ত কী?

ঝাড়ফুঁকের বাক্য অবশ্যই আল্লাহর কালাম বা হাদিসের মাসনুন দোয়া হতে হবে এবং তাতে কোনো প্রকার শিরক বা কুফরি বাক্য থাকা যাবে না।

‘খাতামুন নাবিয়্যীন’ হাদিসের আলোকে মিথ্যা নবুওয়তের দাবিদার কতজন হবে?

হাদিস অনুযায়ী কিয়ামতের পূর্বে উম্মতের মধ্যে ত্রিশজন চরম মিথ্যাবাদী ভণ্ডের আবির্ভাব ঘটবে, যারা প্রত্যেকেই নিজেকে নবী বলে দাবি করবে।

জান্নাতে সর্বপ্রথম কোন মহামানব প্রবেশ করবেন ও দ্বারে করাঘাত করবেন?

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম জান্নাতের দ্বারে করাঘাত করবেন এবং তাঁর পূর্বে অন্য কারো জন্য তা খোলা হবে না।

উম্মতে মুহাম্মদীর ‘আমীনুল উম্মাহ’ (পরম বিশ্বস্ত আমানতদার) খেতাবে কে ভূষিত হয়েছিলেন?

আশারায়ে মুবাশশারাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহাবী হযরত আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ (রা.)-কে রাসুলুল্লাহ (সা.) ‘আমীনুল উম্মাহ’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *