দিরাসাতুল হাদীস ২য় পত্র (Dirasatul Hadith 2nd Paper) – 111012, উলূমুল হাদীস – ফাযিল পাস ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪

StudyBoi StudyBoi
September 27, 2026
১১৪ মিনিট পড়ার সময়
২ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত পরীক্ষা
ফাযিল (স্নাতক) পাস প্রথম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪
[দিরাসাতুল হাদীস] [নতুন সিলেবাস অনুযায়ী]
দ্বিতীয় পত্র : দিরাসাতুল হাদীস-২ (বিষয় কোড: ১১১০১২)
সময়: ৩ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ১০০
[الملاحظة : أجب عن خمسة من مجموعة (أ) وعن أربعة من مجموعة (ب) – والأعداد بالهامش تدل على الدرجة الكاملة -]
[দ্রষ্টব্য : (أ) অংশ থেকে পাঁচটি ও (ب) অংশ থেকে চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও। বাম পাশে উল্লিখিত সংখ্যা প্রশ্নের পূর্ণমান জ্ঞাপক।]

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন অনুষ্ঠিত ফাযিল স্নাতক (পাস) প্রথম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪-এর ‘দিরাসাতুল হাদীস ২য় পত্র’ (বিষয় কোড: ১১১০১২)-এর মূল প্রশ্নপত্রের সকল প্রশ্নের প্রামাণ্য, বিশুদ্ধ ও পূর্ণাঙ্গ সমাধান নিচে ধারাবাহিকভাবে প্রদান করা হলো। ফাতহুল বারী, শরহে নববী, মিরকাতুল মাফাতিহ এবং হিদায়ার আলোকে প্রতিটি হাদিসের বিশদ ব্যাখ্যা সুবিন্যস্ত করা হয়েছে।

১। عن عبد الله بن مسعود قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : لا يحل دم امرئ مسلم يشهد أن لا إله إلا الله وأنى رسول الله إلا بإحدى ثلاث : النفس بالنفس والثيب الزانى والمارق لدينه التارك للجماعة – (متفق عليه) وعن عبد الله بن مسعود قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : أول ما يقضى بين الناس يوم القيامة فى الدماء –

[হাদিসের অনুবাদ এবং হত্যার সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ, মুসলিম ঐক্যের গুরুত্ব এবং মুরতাদের হুকুম]

[মান: ১৬ (অনুবাদ ৭ + ক ৩ + খ ৩ + গ ৩)]

ভূমিকা ও হাদিসের পটভূমি

মানবজীবনের নিরাপত্তা ও রক্তের পবিত্রতা রক্ষা করা ইসলামি শরিয়তের অন্যতম মৌলিক মাক্বাসিদ (মাক্বাসীদুশ শারীয়াহ)। কোনো মুমিনের রক্তপাত ঘটানো বা অন্যায়ভাবে হত্যা করা কবিরা গুনাহ ও কুফরির সমতুল্য অপরাধ। আলোচ্য হাদিসে বিশ্বনবী (সা.) মানবপ্রাণের অলঙ্ঘনীয় পবিত্রতা এবং যে তিনটি চরম অপরাধে ইসলামি রাষ্ট্রের আদালতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা জায়েজ, তা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন।

মূল হাদিসদ্বয়ের প্রামাণ্য বঙ্গানুবাদ

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:

«لَا يَحِلُّ دَمُ امْرِئٍ مُسْلِمٍ يَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَّا بِإِحْدَى ثَلَاثٍ: النَّفْسُ بِالنَّفْسِ، وَالثَّيِّبُ الزَّانِي، وَالْمَارِقُ لِدِينِهِ التَّارِكُ لِلْجَمَاعَةِ»

“যে মুসলমান ব্যক্তি সাক্ষ্য দেয় যে আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই এবং আমি আল্লাহর রাসুল—তার রক্তপাত ঘটানো বা তাকে হত্যা করা তিনটি কারণ ছাড়া কখনো হালাল বা বৈধ নয়: (১) প্রাণের বদলে প্রাণ (অন্যায় হত্যাকাণ্ডের ক্বিসাস বা মৃত্যুদণ্ড), (২) বিবাহিত ব্যক্তি ব্যভিচারে লিপ্ত হলে (রজম বা পাথর নিক্ষেপে মৃত্যুদণ্ড), এবং (৩) যে ব্যক্তি স্বীয় দ্বীন পরিত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে মুসলিম জামাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)।

অপর এক বর্ণনায় হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:

«أَوَّلُ مَا يُقْضَى بَيْنَ النَّاسِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فِي الدِّمَاءِ»

“কিয়ামতের দিন মানুষের পারস্পরিক অধিকারের মধ্যে সর্বপ্রথম রক্তপাতের (হত্যাকাণ্ডের) বিচার ও ফায়সালা করা হবে।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)।

(ক) হত্যার সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ (معنى القتل وأقسامه)

  • হত্যার সংজ্ঞা: শরিয়তের পরিভাষায়—কোনো নিরপরাধ জীবিত মানুষের দেহে এমন কোনো আঘাত বা আক্রমণ করা, যার ফলে তার রূহ দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তার স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটে, তাকে ‘ক্বাতল’ বা হত্যা বলা হয়।
  • হত্যার প্রকারভেদ (হানাফী মাজহাব অনুযায়ী ৫ প্রকার):
    • ১. ক্বাতলে আমদ বা ইচ্ছাকৃত হত্যা (قتل عمد): ধারালো অস্ত্র (লোহা, ছুরি, তলোয়ার) দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে হত্যা করা। এর শাস্তি ক্বিসাস (মৃত্যুদণ্ড), যদি না নিহতের অভিভাবক ক্ষমা করে বা দিয়াত গ্রহণে রাজি হয়। এতে কোনো কাফফারা নেই এবং হত্যাকারী মিরাস থেকে বঞ্চিত হবে।
    • ২. ক্বাতলে শিবহে আমদ বা ইচ্ছাসদৃশ হত্যা (قتل شبه عمد): এমন ভারী বস্তু (যেমন বড় লাঠি বা পাথর) দিয়ে ইচ্ছাকৃত আঘাত করা যা সাধারণত মানুষের প্রাণনাশের হাতিয়ার নয়, কিন্তু তাতেই সে মারা যায়। এর শাস্তি হলো দিয়াতে মুগাল্লাজাহ (কঠিন দিয়াত) ও কাফফারা; এতে ক্বিসাস নেই।
    • ৩. ক্বাতলে খাতা বা অনিচ্ছাকৃত ভুল হত্যা (قتل خطأ): শিকারে লক্ষ্যভেদ করতে গিয়ে ভুলে কোনো মানুষ নিহত হওয়া। এতে দিয়াত ও কাফফারা ওয়াজিব হয়।
    • ৪. ক্বাতলে জারী মাজরাল খাতা বা ভুলের সদৃশ হত্যা: ঘুমন্ত অবস্থায় অসাবধানতাবশত পাশ ফিরে নিজের শিশুকে পিষ্ট করে হত্যা করা। এর হুকুম ভুল হত্যার অনুরূপ।
    • ৫. ক্বাতলে বি-সাবাব বা কারণসৃষ্ট হত্যা: অন্যের চলাচলের রাস্তায় অবৈধভাবে গর্ত খনন করা বা পাথর রেখে দেওয়া, যাতে হোঁচট খেয়ে কোনো মানুষ মারা যাওয়া। এতে দিয়াত আবশ্যক হয়, তবে কাফফারা নেই।

(খ) কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের গুরুত্ব

  • কুরআনের নির্দেশ: আল্লাহ বলেন: «وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا» (সূরা আলে ইমরান: ১০৩) — “তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।” আরও বলেন: «إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ» (সূরা হুজুরাত: ১০) — “নিশ্চয়ই মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই।”
  • সুন্নাহর ঘোষণা: রাসুল (সা.) বলেন: “মুমিনরা পারস্পরিক সম্প্রীতি ও মায়ামমতায় একটি দেহের মতো; দেহের একটি অঙ্গ আক্রান্ত হলে সমগ্র শরীর ব্যথায় অনিদ্রা ও জ্বরে ভোগে।” (বুখারি)। জামাত থেকে এক বিঘত দূরে সরে যাওয়া জাহেলিয়াতের মৃত্যুর শামিল।

(গ) মুরতাদ (المرتد)-এর অর্থ ও মুরতাদের শারঈ হুকুম

  • মুরতাদের সংজ্ঞা: কোনো সুস্থ মস্তিষ্কপ্রাপ্ত প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম ব্যক্তি যদি ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে স্বেচ্ছায় কুফর গ্রহণ করে—তা মুখের স্পষ্ট কুফরি কথার দ্বারা হোক, শিরকি বিশ্বাসের দ্বারা হোক কিংবা কুরআন অবমাননার মতো কাজের দ্বারা হোক—তাকে ‘মুরতাদ’ বলা হয়।
  • মুরতাদের শারঈ হুকুম: চার মাজহাবের ইমামগণের সর্বসম্মত ফতোয়া অনুযায়ী মুরতাদের শাস্তি হলো মৃত্যুদণ্ড। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন: «مَنْ بَدَّلَ دِينَهُ فَاقْتُلُوهُ» (সহিহ বুখারি) — “যে ব্যক্তি স্বীয় দ্বীন পরিবর্তন করে, তাকে হত্যা কর।” তবে কোনো ব্যক্তি মুরতাদ হলে সাথে সাথে তাকে হত্যা করা যাবে না; বরং ইসলামি রাষ্ট্রের শাসক বা আদালত তাকে বন্দি করে তিন দিন সময় দেবে এবং তার যাবতীয় সংশয় নিরসন করে সত্যের পথে তওবা করার সুযোগ দেবে। তওবা না করলে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে তাকে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে।

উপসংহার

রক্তপাত বন্ধ করা এবং ইসলামি বিশ্বাসের অখণ্ডতা রক্ষা করাই এই হাদিসের মূল সুর, যা মুসলিম সমাজের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার মূলভিত্তি।

২। عن طاؤوس عن ابن عباس عن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال : من قتل فى عمية فى رمى يكون بينهم بالحجارة أو جلد بالسياط أو ضرب بعضا فهو خطأ عقله الخطأ و من قتل عمدا فهو قود و من حال دونه فعليه لعنة الله و غضبه لا يقبل منه صرف ولا عدل – (رواه أبو داود والنسائي)

[হাদিসের অনুবাদ এবং আকল ও দিয়াতের পরিচয়, দিয়াত-ক্বিসাস-আকলের পার্থক্য ও ইবনে আব্বাসের জীবনী]

[মান: ১৬ (অনুবাদ ৭ + ক ৩ + খ ৩ + গ ৩)]

ভূমিকা ও হাদিসের পটভূমি

দাঙ্গা-হাঙ্গামা, উচ্ছৃঙ্খল জনতার সংঘর্ষ বা অন্ধকারাচ্ছন্ন গোলযোগের মাঝে যখন কোনো ব্যক্তি নিহত হয় এবং সুনির্দিষ্ট ঘাতক শনাক্ত করা যায় না, তখন রক্তপণ ও ক্বিসাসের বিধান কী হবে—তা এই হাদিসে চমৎকারভাবে সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে।

মূল হাদিসের প্রামাণ্য বঙ্গানুবাদ

হযরত তাউস হতে বর্ণিত, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:

«مَنْ قُتِلَ فِي عِمِّيَّا فِي رَمْيٍ يَكُونُ بَيْنَهُمْ بِالْحِجَارَةِ أَوْ جَلْدٍ بِالسِّيَاطِ أَوْ ضَرْبٍ بِعَصًا فَهُوَ خَطَأٌ عَقْلُهُ عَقْلُ الْخَطَإِ، وَمَنْ قُتِلَ عَمْدًا فَهُوَ قَوَدٌ، وَمَنْ حَالَ دُونَهُ فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَغَضَبُهُ لَا يُقْبَلُ مِنْهُ صَرْفٌ وَلَا عَدْلٌ»

“যে ব্যক্তি কোনো অন্ধ গোলযোগ বা দাঙ্গায় নিহত হয়—যেখানে জনতার মাঝে পাথর ছোঁড়াছুড়ি, চাবুক মারা বা লাঠালাঠির ঘটনা ঘটে (এবং ঘাতক নির্দিষ্ট জানা যায় না)—তবে তা ‘ভুল হত্যা’ (খাতা) হিসেবে গণ্য হবে এবং তার রক্তপণ হবে ভুল হত্যার রক্তপণ। আর যে ব্যক্তিকে সুস্পষ্টভাবে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করা হবে, তার শাস্তি হলো ‘ক্বাওয়াদ’ (ক্বিসাস বা মৃত্যুদণ্ড)। আর যে ব্যক্তি ক্বিসাস কার্যকর করার মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়াবে (অন্যায় তদবির বা সুপারিশ করবে), তার ওপর আল্লাহর অভিসম্পাত ও ক্রোধ বর্ষিত হবে; তার কোনো নফল বা ফরজ ইবাদত কবুল করা হবে না।” (সুনানে আবু দাউদ ও নাসায়ী)।

(ক) ‘আকল’ (العقل)-এর অর্থ, দিয়াতের সমার্থক কি না এবং দিয়াতের প্রকারভেদ

  • ‘আকল’-এর অর্থ: আভিধানিক অর্থে ‘আকল’ হলো রশি দিয়ে উটের পা বাঁধা। প্রাচীন আরবে যখন কোনো হত্যার কারণে রক্তপণ হিসেবে একশত উট পরিশোধ করা হতো, তখন সেই উটগুলোকে নিহতের উঠানে রশি দিয়ে বেঁধে রাখা হতো। এ কারণেই রক্তপণ বা দিয়াতকে রূপকভাবে ‘আকল’ বলা হয়। হ্যাঁ, পরিভাষায় ‘আকল’ ও ‘দিয়াত’ সম্পূর্ণ সমার্থবোধক।
  • দিয়াতের প্রকারভেদ (اقسام الدية): দিয়াত প্রধানত দুই প্রকার:
    • ১. দিয়াতে মুখাফফাফাহ (সহজ বা হালকা দিয়াত): ভুল হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে এটি ওয়াজিব হয়। এর পরিমাণ হলো পাঁচটি বয়সের শ্রেণিতে বিভক্ত মোট ১০০টি উট (অথবা ১,০০০ দিনার স্বর্ণ বা ১০,০০০ দিরহাম রূপা), যা ঘাতকের জ্ঞাতিগোষ্ঠী (আক্বিলাহ) তিন বছরের কিস্তিতে পরিশোধ করবে।
    • ২. দিয়াতে মুগাল্লাজাহ (কঠিন বা ভারী দিয়াত): ইচ্ছাসদৃশ হত্যা (শিবহে আমদ)-এর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এর পরিমাণ হলো চারটি বয়সের শ্রেণিতে বিভক্ত মোট ১০০টি উট, যার মধ্যে ৪০টি গর্ভবতী উট হওয়া বাধ্যতামূলক।

(খ) দিয়াত, ক্বিসাস ও আকলের মধ্যকার সুস্পষ্ট পার্থক্য

  • ১. ক্বিসাস (القصاص) বনাম দিয়াত (الدية): ক্বিসাস হলো দৈহিক প্রতিবিধান; অর্থাৎ খুনের বদলে খুন বা অঙ্গহানির বদলে সমপরিমাণ অঙ্গচ্ছেদ করা। এটি ইচ্ছাকৃত হত্যার মূল শারঈ সাজা। পক্ষান্তরে দিয়াত হলো ক্বিসাসের বিকল্প আর্থিক ক্ষতিপূরণ বা রক্তপণ, যা অনিচ্ছাকৃত হত্যায় অথবা বাদীর সম্মতিতে ইচ্ছাকৃত হত্যায় ক্বিসাসের পরিবর্তে ধার্য করা হয়।
  • ২. আকল (العقل) ও দিয়াত (الدية): যদিও উভয়ে একই আর্থিক ক্ষতিপূরণ বোঝায়, তবে ঐতিহাসিকভাবে ‘আকল’ শব্দটি ঘাতকের আত্মীয়দের (আক্বিলাহ) ওপর রক্তপণের দায় চাপানো বোঝাতে ব্যবহৃত হতো, আর ‘দিয়াত’ শব্দটি ক্ষতিপূরণের সাধারণ ও আইনি পরিভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

(গ) রইসুল মুফাসসিরীন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) ছিলেন বিশ্বনবী (সা.)-এর চাচাতো ভাই। হিজরতের তিন বছর পূর্বে শিআবে আবি তালিবে জন্মগ্রহণ করেন। রাসুল (সা.) তাঁর জন্য দোয়া করেছিলেন: «اللَّهُمَّ فَقِّهْهُ فِي الدِّينِ وَعَلِّمْهُ التَّأْوِيلَ»। তিনি ছিলেন উম্মতের শ্রেষ্ঠ মুফাসসির (‘তুরজুমানুল কুরআন’)। তিনি মক্কার তাফসীর স্কুল গড়ে তোলেন। ৬৮ হিজরিতে ৭০ বছর বয়সে তায়েফে তিনি ইন্তেকাল করেন।

উপসংহার

হাদিসটি প্রমাণ করে যে ইসলামে কোনো মানুষের রক্তই ক্ষতিপূরণ ছাড়া বৃথা যেতে পারে না এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় অন্যায় হস্তক্ষেপ আল্লাহর চরম অসন্তোষ ডেকে আনে।

৩। عن عبد الله بن عمر قال : سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول : من حالت شفاعته دون حد من حدود الله فقد ضاد الله ومن خاصم في باطل وهو يعلمه لم يزل في سخط الله تعالى حتى ينزع ومن قال فى مؤمن ما ليس فيه اسكنه الله ردغة الخبال حتى يخرج مما قال – (رواه أحمد وأبو داود وفى رواية للبيهقى فى شعب الإيمان)

[হাদিসের অনুবাদ এবং হুদূদের পরিচয়, হদে সুপারিশের বিধান ও বিচারকের কর্তব্য]

[মান: ১৬ (অনুবাদ ৭ + ক ৩ + খ ৩ + গ ৩)]

ভূমিকা ও হাদিসের পটভূমি

ইনসাফ ও ন্যায়বিচার ইসলামি বিচারব্যবস্থার মেরুদণ্ড। আল্লাহর নির্ধারিত দণ্ডবিধি (হুদূদ) কার্যকর করার ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব বা পক্ষপাতিত্বের কোনো সুযোগ নেই। আলোচ্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) হুদূদ রদ করার জন্য সুপারিশ করা এবং অন্যায় মামলায় সমর্থন দেওয়ার বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।

মূল হাদিসের প্রামাণ্য বঙ্গানুবাদ

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি:

«مَنْ حَالَتْ شَفَاعَتُهُ دُونَ حَدٍّ مِنْ حُدُودِ اللَّهِ فَقَدْ ضَادَّ اللَّهَ، وَمَنْ خَاصَمَ فِي بَاطِلٍ وَهُوَ يَعْلَمُهُ لَمْ يَزَلْ فِي سَخَطِ اللَّهِ تَعَالَى حَتَّى يَنْزِعَ، وَمَنْ قَالَ فِي مُؤْمِنٍ مَا لَيْسَ فِيهِ أَسْكَنَهُ اللَّهُ رَدْغَةَ الْخَبَالِ حَتَّى يَخْرُجَ مِمَّا قَالَ»

“যে ব্যক্তির সুপারিশ আল্লাহর নির্ধারিত কোনো দণ্ড (হদ) বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করে, সে যেন সরাসরি আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ করল। আর যে ব্যক্তি জেনে-শুনে কোনো অন্যায় ও বাতিল মামলার পক্ষে বিতর্ক বা ওকালতি করে, সে মামলা থেকে ফিরে না আসা পর্যন্ত আল্লাহর চরম ক্রোধের মাঝে নিমজ্জিত থাকে। আর যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের প্রতি অপবাদ দিয়ে এমন অপপ্রচার করে যা তার মধ্যে নেই, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তাকে ‘রাদগাতুল খাবাল’ (জাহান্নামীদের গলিত রক্ত ও পুঁজ)-এর জলাশয়ে বাসস্থান দান করবেন, যতক্ষণ না সে তার কুৎসা প্রত্যাহার করে দায়মুক্ত হয়।” (মুসনাদে আহমদ ও সুনানে আবু দাউদ)।

(ক) ‘হদ’ (الحد)-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা এবং এর মূল লক্ষ্য

  • আভিধানিক অর্থ: ‘হদ’ শব্দের অর্থ সীমা, প্রতিরোধক, বাধা বা প্রান্তরেখা।
  • পারিভাষিক সংজ্ঞা: শরিয়তের পরিভাষায়—কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত সেই বাধ্যতামূলক শাস্তি, যা আল্লাহর হক্ব হিসেবে সমাজকে পাপমুক্ত রাখার জন্য রাষ্ট্র কর্তৃক কার্যকর করা হয় (যেমন চুরির শাস্তি হাত কাটা, ব্যভিচারের শাস্তি একশত বেত্রাঘাত বা রজম, অপবাদের শাস্তি আশি বেত্রাঘাত ইত্যাদি)।
  • হদ প্রবর্তনের মূল লক্ষ্য (المقصد الأصلي):
    • ১. সমাজে অন্যায়, ব্যভিচার, মাদক ও সন্ত্রাস প্রতিরোধ করা (الزجر والردع)।
    • ২. মানুষের জান, মাল, ইজ্জত ও বংশমর্যাদা সুরক্ষিত রাখা।
    • ৩. অপরাধীকে উপযুক্ত শাস্তি দিয়ে আখেরাতের আজাব থেকে পরিশুদ্ধ করা।

(খ) হুদূদের ক্ষেত্রে সুপারিশের শারঈ বিধান (الشفاعة في الحدود)

  • মামলা আদালতে ওঠার পর: কোনো অপরাধী ধরা পড়ার পর বিষয়টি যখন রাষ্ট্রপ্রধান বা কাজীর (বিচারক) আদালত পর্যন্ত পৌঁছে যায় এবং অপরাধ প্রমাণিত হয়ে যায়, তখন সেই হদ মাফ করানোর জন্য কোনো ধরনের সুপারিশ বা তদবির করা সম্পূর্ণ হারাম ও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রাসুল (সা.) উসামা ইবনে যায়েদের সুপারিশের জবাবে রাগান্বিত হয়ে বলেছিলেন: “তুমি কি আল্লাহর নির্ধারিত হদ বাতিলের জন্য সুপারিশ করছ? আল্লাহর শপথ! যদি মুহাম্মদের কন্যা ফাতেমাও চুরি করত, তবে আমি তার হাতও কেটে দিতাম!”
  • মামলা আদালতে যাওয়ার পূর্বে: বিষয়টি আদালতে ওঠার আগে ব্যক্তিগত পর্যায়ে ভুক্তভোগী ব্যক্তি যদি কোনো সাধারণ অপরাধীকে ক্ষমা করে দেয় বা সংশোধনের স্বার্থে মিটমাট করে নেয়, তবে তা জায়েজ রয়েছে।

(গ) ‘ইখতিসাম’ (الاختصام)-এর অর্থ এবং বিচারপ্রার্থী উপস্থিত হলে বিচারকের দায়িত্ব

  • ইখতিসামের অর্থ: বিচারকের সামনে উভয় পক্ষের বাদানুবাদ, মামলা-মোকদ্দমা এবং নিজ নিজ দাবির পক্ষে যুক্তি ও দলিল উপস্থাপন করাকে ইখতিসাম বলা হয়।
  • বিচারকের (কাজী) ওপর অপরিহার্য দায়িত্বসমূহ:
    • ১. উভয় বিচারপ্রার্থীকে সমদৃষ্টিতে দেখা; বসার স্থান, দৃষ্টিপাত ও কথা বলার ক্ষেত্রে কোনো একজনের প্রতি পক্ষপাতিত্ব না করা।
    • ২. বাদীর বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং প্রমাণের (বাইয়্যিনাহ) দাবি করা, আর বিবাদীর ওপর শপথ (কসম) ন্যস্ত করা: «الْبَيِّنَةُ عَلَى الْمُدَّعِي وَالْيَمِينُ عَلَى مَنْ أَنْكَرَ»।
    • ৩. প্রচণ্ড ক্রোধ, ক্ষুধা বা মানসিক অস্থিরতার সময় বিচার না করা।
    • ৪. কুরআন, সুন্নাহ ও অকাট্য দলিলের ভিত্তিতে পূর্ণ ইনসাফের সাথে রায় প্রদান করা।

উপসংহার

বিচারহীনতা ও পক্ষপাতিত্ব সমাজকে ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করে। এই হাদিস ইনসাফ ও আইনের শাসন কায়েমের এক চিরন্তন ঐশী দিকনির্দেশনা।

৪। عن أبي هريرة رضى الله عنه قال : سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول : من خرج من الطاعة و فارق الجماعة فمات ميتة جاهلية ومن قاتل تحت راية عمية يغضب لعصبية او يدعو لعصبية او ينصر عصبية فقتل فقتلة جاهلية و من خرج على أمتي بسيفه يضرب برها و فاجرها ولا يتحاشى من مؤمنها ولا يفي لذى عهد عهده فليس منى و لست منه – (رواه مسلم)

[হাদিসের অনুবাদ এবং শাসকের আনুগত্য, গোত্রবাদের কুফল ও হত্যা এবং তার প্রকারভেদ]

[মান: ১৬ (অনুবাদ ৭ + ক ৩ + খ ৩ + গ ৩)]

ভূমিকা ও হাদিসের পটভূমি

রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা, মুসলিম সমাজের সংহতি এবং সামাজিক শান্তি রক্ষা করা ইসলামি শরিয়তের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। বিদ্রোহ, অন্ধ জাতীয়তাবাদ এবং নিরীহ মানুষের ওপর রক্তক্ষয়ী সন্ত্রাস সমাজকে জাহেলিয়াতের যুগে ফিরিয়ে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই হাদিসে উম্মাহর ঐক্য বিনষ্টকারী সকল ধ্বংসাত্মক প্রবণতার বিরুদ্ধে চরম সাবধানবাণী ঘোষণা করেছেন।

মূল হাদিসের প্রামাণ্য বঙ্গানুবাদ

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি:

«مَنْ خَرَجَ مِنَ الطَّاعَةِ، وَفَارَقَ الْجَمَاعَةَ فَمَاتَ، مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةً، وَمَنْ قَاتَلَ تَحْتَ رَايَةٍ عِمِّيَّةٍ يَغْضَبُ لِعَصَبِيَّةٍ، أَوْ يَدْعُو إِلَى عَصَبِيَّةٍ، أَوْ يَنْصُرُ عَصَبِيَّةً فَقُتِلَ، فَقِتْلَةٌ جَاهِلِيَّةٌ، وَمَنْ خَرَجَ عَلَى أُمَّتِي بِسَيْفِهِ يَضْرِبُ بَرَّهَا وَفَاجِرَهَا، وَلَا يَتَحَاشَى مِنْ مُؤْمِنِهَا، وَلَا يَفِي لِذِي عَهْدٍ عَهْدَهُ، فَلَيْسَ مِنِّي وَلَسْتُ مِنْهُ»

“যে ব্যক্তি ইসলামি রাষ্ট্রের বৈধ আমীরের আনুগত্য থেকে বের হয়ে গেল এবং মুসলিম জামাত ত্যাগ করল, অতঃপর মৃত্যুবরণ করল—তার মৃত্যু জাহেলিয়াতের মৃত্যু হিসেবে গণ্য হবে। আর যে ব্যক্তি কোনো অন্ধ পতাকার (উচ্ছৃঙ্খল লক্ষ্যহীন দলের) অধীনে লড়াই করল—যেখানে সে গোত্রীয় পক্ষপাতিত্বের (অন্ধ জাতীয়তাবাদের) কারণে ক্ষুব্ধ হয়, গোত্রবাদের দিকে আহ্বান জানায় কিংবা গোত্রবাদকে বিজয়ী করতে লড়াই করে, অতঃপর নিহত হয়—তার নিহত হওয়া জাহেলিয়াতের মৃত্যু হিসেবে গণ্য হবে। আর যে ব্যক্তি আমার উম্মতের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে বেরিয়ে পড়ে ভালো-মন্দ নির্বিচারে সকলকে আঘাত করতে থাকে, কোনো মুমিনকে রেহাই দেয় না এবং কোনো চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমের চুক্তিও রক্ষা করে না—সে আমার দলের অন্তর্ভুক্ত নয় এবং আমিও তার অন্তর্ভুক্ত নই।” (সহিহ মুসলিম)।

(ক) গুনাহ বা নাফরমানির কাজে শাসকের আনুগত্যের বিধান (طاعة الأمير في معصية)

ইসলামি শরিয়তের সর্বসম্মত অকাট্য মূলনীতি হলো—আল্লাহর নাফরমানি বা পাপকাজে কোনো সৃষ্টির আনুগত্য করা সম্পূর্ণ নাজায়েজ ও হারাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন:

«لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ»

“স্রষ্টার অবাধ্য হয়ে কোনো সৃষ্টির আনুগত্য করা যাবে না।” (মুসনাদে আহমদ)। অতএব শাসক বা আমীর যদি নামাজ ত্যাগ, মদ্যপান, সুদ গ্রহণ বা অন্যায়ভাবে কোনো নিরপরাধ মানুষকে হত্যার নির্দেশ দেয়, তবে সেই গুনাহর নির্দেশের আনুগত্য করা কোনো মুসলিমের জন্য বৈধ নয়।

(খ) কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ন্যায়সঙ্গত কাজে আমীরের আনুগত্যের হুকুম

  • কুরআনের নির্দেশ: আল্লাহ বলেন: «يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ» (সূরা আন-নিসা: ৫৯) — “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসুলের আনুগত্য কর এবং তোমাদের মধ্য থেকে দায়িত্বশীলদের (উলিল আমরের) আনুগত্য কর।”
  • সুন্নাহর তাগিদ: যতক্ষণ পর্যন্ত শাসক প্রকাশ্য কুফরি না করে, ততক্ষণ পর্যন্ত নাগরিক শান্তি বজায় রাখতে এবং ফেতনা প্রতিরোধ করতে তার ন্যায়সঙ্গত আদেশ মান্য করা ওয়াজিব। রাসুল (সা.) বলেন: “তোমাদের ওপর যদি নাক-কান কাটা কোনো হাবশী ক্রীতদাসকেও শাসক নিযুক্ত করা হয়, তবুও তার কথা শোন ও মান্য কর, যতক্ষণ সে তোমাদের মাঝে আল্লাহর কিতাব কায়েম রাখে।” (সহিহ মুসলিম)।

(গ) হত্যার সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ (تعريف القتل وأقسامه)

  • সংজ্ঞা: কোনো জীবিত মানুষের প্রাণ সংহার করাকে হত্যা বলা হয়।
  • সংক্ষিপ্ত প্রকারভেদ: হত্যা প্রধানত তিন প্রকার (জমহুরের মতে) বা পাঁচ প্রকার (হানাফীদের মতে):
    • ১. ইচ্ছাকৃত হত্যা (قتل عمد): ধারালো অস্ত্র দিয়ে সজ্ঞানে হত্যা। শাস্তি: ক্বিসাস।
    • ২. ইচ্ছাসদৃশ হত্যা (قتل شبه عمد): ভারী লাঠি ইত্যাদি দিয়ে আঘাত করে হত্যা। শাস্তি: দিয়াতে মুগাল্লাজাহ ও কাফফারা।
    • ৩. ভুল হত্যা (قتل خطأ): নিশানা ভুলের কারণে মানুষ মারা যাওয়া। শাস্তি: দিয়াতে মুখাফফাফাহ ও কাফফারা।

উপসংহার

উম্মাহর অভ্যন্তরীণ ঐক্য বজায় রাখা এবং অন্ধ গোত্রবাদ ও সন্ত্রাস পরিহার করে শরিয়তের সুশৃঙ্খল আনুগত্যের ছায়াতলে বাস করাই জান্নাতী জীবনের নিশ্চয়তা।

৫। عن عبد الله بن عمر قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : ألا كلكم راع وكلكم مسئول عن رعيته فالإمام الذى على الناس راع وهو مسئول عن رعيته والرجل راع على اهل بيته وهو مسئول عن رعيته والمرأة راعية على بيت زوجها وولده وهى مسئولة عنهم و عبد الرجل راع على مال سيده وهو مسئول عنه، ألا كلكم راع و كلكم مسئول عن رعيته – (متفق عليه)

[হাদিসের অনুবাদ এবং দায়িত্ববোধের ক্ষেত্রসমূহ, ‘কুল্লুকুম রা’ইন…’ ও সংসারে নারীর দায়িত্ব]

[মান: ১৬ (অনুবাদ ৭ + ক ৩ + খ ৩ + গ ৩)]

ভূমিকা ও হাদিসের পটভূমি

ইসলাম সামাজিক জীবনের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা ও আমানতদারির এক অতুলনীয় প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা প্রণয়ন করেছে। সমাজে কেউই অধিকারহীন বা লাগামহীন নয়; রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে একজন সাধারণ গৃহিণী কিংবা কর্মচারী পর্যন্ত প্রত্যেকেই স্ব স্ব অবস্থানে এক একজন দায়িত্বশীল রাখাল। কিয়ামতের দিন প্রত্যেককে তার অধীনস্তদের বিষয়ে আল্লাহর দরবারে হিসাব দিতে হবে।

মূল হাদিসের প্রামাণ্য বঙ্গানুবাদ

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:

«أَلَا كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، فَالْإِمَامُ الَّذِي عَلَى النَّاسِ رَاعٍ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، وَالرَّجُلُ رَاعٍ عَلَى أَهْلِ بَيْتِهِ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، وَالْمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ عَلَى بَيْتِ زَوْجِهَا وَوَلَدِهِ وَهِيَ مَسْئُولَةٌ عَنْهُمْ، وَعَبْدُ الرَّجُلِ رَاعٍ عَلَى مَالِ سَيِّدِهِ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْهُ، أَلَا فَكُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ»

“সাবধান! তোমাদের প্রত্যেকেই একজন দায়িত্বশীল রাখাল বা তত্ত্বাবধায়ক এবং তোমাদের প্রত্যেককেই স্ব স্ব অধীনস্তদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। অতএব জনগণের শাসক বা রাষ্ট্রপ্রধান হলেন একজন রাখাল, তিনি তাঁর প্রজাসাধারণের ব্যাপারে জওয়াবদিহি করবেন। পুরুষ বা পিতা হলেন তাঁর পরিবারের তত্ত্বাবধায়ক, তিনি তাঁর পরিবার-পরিজনের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবেন। নারী বা স্ত্রী হলেন তাঁর স্বামীর গৃহ ও সন্তানদের তত্ত্বাবধায়ক, তিনি তাঁদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবেন। এবং গোলাম বা কর্মচারী হলো তার মনিবের ধনসম্পদের তত্ত্বাবধায়ক, সে তার বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। সাবধান! অতএব তোমাদের প্রত্যেকেই একজন রাখাল এবং তোমাদের প্রত্যেককেই স্ব স্ব দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)।

(ক) দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা (المسئوليات) এবং এর বহুমুখী ক্ষেত্রসমূহ

  • দায়িত্বের সংজ্ঞা: শরিয়তের দৃষ্টিতে দায়িত্বশীলতা হলো এমন এক আমানত, যার সুষ্ঠু ব্যবহারের ওপর মানুষের দুনিয়ার শান্তি ও পরকালীন মুক্তি নির্ভর করে।
  • প্রধান ক্ষেত্রসমূহ:
    • ১. রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্র: বিচার প্রতিষ্ঠা, নিরাপত্তা বিধান এবং জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র পরিচালনা।
    • ২. পারিবারিক ক্ষেত্র: হালাল রিযিকের ব্যবস্থা, দ্বীনি শিক্ষা ও নৈতিক শাসন নিশ্চিত করা।
    • ৩. অর্থনৈতিক ও কর্মক্ষেত্র: অর্পিত সম্পদের বিশ্বস্ত পাহারা ও মালিকের আমানত রক্ষা।
    • ৪. ব্যক্তিগত ক্ষেত্র: নিজের চোখ, কান, অন্তর ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে আল্লাহর আনুগত্যে পরিচালনা করা।

(খ) “ألا كلكم راع وكلكم مسئول عن رعيته”-এর চমৎকার বিশ্লেষণ

হাদিসে ‘রা’ঈ’ (الراعي – রাখাল) রূপকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একজন রাখাল যেমন তার ভেড়ার পালকে রোদ, বৃষ্টি, হিংস্র নেকড়ের আক্রমণ ও খাদ্যাভাব থেকে রক্ষা করে নিরাপদে গোয়ালে ফিরিয়ে আনে—তেমনি সমাজের প্রতিটি স্তরের অভিভাবককে তার অধীনস্তদের শারীরিক, মানসিক ও ঈমানী সুরক্ষার জন্য রাত-দিন সতর্ক থাকতে হবে। কোনো নেতা বা পিতা যদি অধীনস্তদের ব্যাপারে উদাসীন থাকে এবং তারা জাহান্নামের পথে চলে যায়, তবে সেই দায়িত্বশীল ব্যক্তি জান্নাতের সুঘ্রাণ থেকেও বঞ্চিত হবে।

(গ) স্বামীর গৃহে ও সন্তানদের লালন-পালনে স্ত্রীর মৌলিক দায়িত্বসমূহ

  • ১. স্বামীর গৃহ ও সম্পদের বিশ্বস্ত সংরক্ষণ: স্বামীর অনুমতি ছাড়া কোনো পরপুরুষকে ঘরে প্রবেশ করতে না দেওয়া এবং স্বামীর অর্থ ও সম্পদের অপচয় না করে আমানতের সাথে সংরক্ষণ করা।
  • ২. সন্তানদের ইসলামিক তরবিয়ত দান: সন্তান হলো মায়ের আঁচলে তৈরি হওয়া এক একটি মানবসম্পদ। তাদের মুখে হালাল খাদ্য তুলে দেওয়া, নামাজ শিক্ষা দেওয়া এবং শিষ্টাচার ও আদব শিক্ষা দেওয়ার মূল দায়িত্ব মায়ের।
  • ৩. পারিবারিক শান্তি ও প্রশান্তি বজায় রাখা: স্বামীর আনুগত্য করা এবং এমন মধুর ব্যবহার প্রদর্শন করা যাতে ঘরটি একটি শান্তিময় জান্নাতে পরিণত হয়। রাসুল (সা.) বলেন: “উত্তম স্ত্রী সে, যার দিকে তাকালে স্বামীর মন আনন্দে ভরে ওঠে।”

উপসংহার

হাদিসটি প্রতিটি মানুষের ভেতর আত্মিক জবাবদিহিতা তৈরি করে, যার মাধ্যমে সমাজে স্বৈরশাসন, পারিবারিক বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি সমূলে দূর হতে পারে।

৬। عن معاذ بن جبل : أن رسول الله صلى الله عليه وسلم : لما بعثه إلى اليمن قال : كيف تقضى إذا عرض لك قضاء؟ قال : أقضى بكتاب الله – قال : فإن لم تجد في كتاب الله؟ قال فبسنة رسول الله صلى الله عليه وسلم- قال : فإن لم تجد فى سنة رسول الله؟ قال : اجتهد رأيى – قال : فضرب رسول الله صلى الله عليه وسلم على صدره وقال : الحمد لله الذى وفق رسول رسول الله صلى الله عليه وسلم لما يرضى به رسول الله – (رواه الترمذى وأبو داؤد والدارمي)

[হাদিসের অনুবাদ এবং মুআজের ইয়েমেন প্রেরণের প্রেক্ষাপট, কিয়াসের প্রামাণ্যতা ও তাঁর জীবনী]

[মান: ১৬ (অনুবাদ ৭ + ক ৩ + খ ৩ + গ ৩)]

ভূমিকা ও হাদিসের পটভূমি

ইসলামি বিচারব্যবস্থা ও ফিক্বহের মূল উৎসসমূহের ক্রমবিন্যাস নির্ধারণের ক্ষেত্রে হযরত মুআজ ইবনে জাবাল (রা.)-এর এই হাদিসটি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মৌলিক সনদ। বিচার ও ইজতিহাদের স্বর্ণালী মূলনীতি বিশ্বনবী (সা.) স্বয়ং নিজ সাহাবীকে জিজ্ঞাসা করে অনুমোদন করেছেন।

মূল হাদিসের প্রামাণ্য বঙ্গানুবাদ

হযরত মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন তাঁকে ইয়েমেনের শাসনকর্তা ও প্রধান বিচারপতি হিসেবে প্রেরণ করার ইচ্ছা করলেন, তখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন:

«كَيْفَ تَقْضِي إِذَا عَرَضَ لَكَ قَضَاءٌ؟ قَالَ: أَقْضِي بِكِتَابِ اللَّهِ، قَالَ: فَإِنْ لَمْ تَجِدْ فِي كِتَابِ اللَّهِ؟ قَالَ: فَبِسُنَّةِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم، قَالَ: فَإِنْ لَمْ تَجِدْ فِي سُنَّةِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم؟ قَالَ: أَجْتَهِدُ رَأْيِي وَلَا آلُو، قَالَ: فَضَرَبَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم صَدْرَهُ، وَقَالَ: الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي وَفَّقَ رَسُولَ رَسُولِ اللَّهِ لِمَا يُرْضِي رَسُولَ اللَّهِ»

“যখন তোমার সামনে কোনো বিচার বা মামলা উপস্থাপিত হবে, তখন তুমি কীভাবে ফায়সালা করবে? তিনি বললেন: আমি আল্লাহর কিতাবের (কুরআনের) বিধান অনুযায়ী ফায়সালা করব। রাসুল (সা.) বললেন: যদি আল্লাহর কিতাবে সেটির স্পষ্ট সমাধান না পাও? তিনি বললেন: তবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও হাদিস দ্বারা ফায়সালা করব। রাসুল (সা.) বললেন: যদি রাসুলুল্লাহর সুন্নাতেও তা না পাও? তিনি বললেন: তবে আমি আমার নিজস্ব রায় ও প্রজ্ঞা দ্বারা পূর্ণ ইজতিহাদ করব এবং সত্য উদ্ঘাটনে কোনো ত্রুটি করব না। মুআজ (রা.) বলেন: অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে স্বহস্তে আমার বক্ষে মৃদু আঘাত করলেন এবং বললেন: ‘সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি তাঁর রাসুলের দূতকে এমন তৌফিক দান করেছেন যাতে তাঁর রাসুল সন্তুষ্ট হয়েছেন!’” (সুনানে তিরমিযী, আবু দাউদ ও দারেমী)।

(ক) মুআজ (রা.)-কে ইয়েমেনে প্রেরণের সময়কাল এবং তাঁর পদের প্রকৃতি

  • প্রেরণের সময়কাল: রাসুলুল্লাহ (সা.) দশম হিজরির রবিউল আউয়াল মাসে বিদায় হজের পূর্বে হযরত মুআজ ইবনে জাবাল (রা.)-কে ইয়েমেনে প্রেরণ করেন।
  • পদের প্রকৃতি: রাসুল (সা.) তাঁকে ইয়েমেনে একই সাথে ওয়ালী (প্রশাসনিক গভর্নর) এবং কাজী (প্রধান বিচারপতি) হিসেবে প্রেরণ করেছিলেন। পাশাপাশি তিনি ছিলেন প্রধান দ্বীনি শিক্ষক ও যাকাত সংগ্রাহক।

(খ) এই হাদিসের মাধ্যমে কিয়াস ও ইজতিহাদের প্রামাণ্যতা সাব্যস্তকরণ

ইসলামি উসূলুল ফিক্বহের দৃষ্টিতে আলোচ্য হাদিসটি ‘কিয়াস’ (القياس الشرعي) ও ‘ইজতিহাদ’-এর অকাট্য প্রামাণ্য দলিল:

  • মুআজ (রা.) যখন বললেন “আমি আমার বুদ্ধি ও রায় দিয়ে ইজতিহাদ করব” এবং রাসুল (সা.) তা শুনে বিন্দুমাত্র নিষেধ করেননি; বরং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে বক্ষে হাত রেখে বরকতময় স্বীকৃতি দিয়েছেন—এটাই প্রমাণ করে যে নতুন সমস্যার ক্ষেত্রে কুরআন ও সুন্নাহর মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে কিয়াস করা শরিয়তসম্মত ফরজ কর্তব্য।
  • এ হাদিস শরীয়তের চারটি উৎসের ধারাবাহিক অগ্রাধিকার প্রমাণ করে: ১. কুরআন, ২. সুন্নাহ, ৩. ইজমা, এবং ৪. কিয়াস।

(গ) ইমামুল ফুক্বাহা হযরত মুআজ ইবনে জাবাল (রা.)-এর প্রামাণ্য জীবনী

  • নাম ও পরিচয়: মুআজ ইবনে জাবাল আল-আনসারী আল-খাযরাজী। কুনিয়াত ‘আবু আব্দুর রহমান’। ১৮ বছর বয়সে আক্বাবার দ্বিতীয় বাইয়াতে ইসলাম গ্রহণ করেন। বদরসহ সকল যুদ্ধে বীরত্ব প্রদর্শন করেন।
  • মর্যাদা ও পাণ্ডিত্য: রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন: «أَعْلَمُهُمْ بِالْحَلَالِ وَالْحَرَامِ مُعَاذُ بْنُ جَبَلٍ» — “আমার উম্মতের মধ্যে হালাল ও হারাম বিষয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী হলেন মুআজ ইবনে জাবাল।” নবীজী আরও বলেন: “কিয়ামতের দিন মুআজ ওলামায়ে কেরামের এক তীর পরিমাণ অগ্রভাগে নেতৃত্ব দেবে।” রাসুল (সা.) তাঁর হাত ধরে বলেছিলেন: “হে মুআজ! আল্লাহর শপথ, আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
  • ইন্তেকাল: ১৮ হিজরিতে হযরত উমর (রা.)-এর খেলাফতকালে সিরিয়ার ‘আমওয়াস’ মহামারীতে মাত্র ৩৩ বা ৩৮ বছর বয়সে এই মহান ফকীহ সাহাবী শাহাদাত বরণ করেন।

উপসংহার

হযরত মুআজ (রা.)-এর গৃহীত এই পদ্ধতিই ইসলামের আইনশাস্ত্রকে যুগে যুগে গতিশীল ও আধুনিক সমস্যার সমাধানকারী চিরন্তন জীবনব্যবস্থা হিসেবে টিকিয়ে রেখেছে।

৭। عن البراء بن عازب قال : صالح النبى صلى الله عليه وسلم المشركين يوم الحديبية على ثلاثة أشياء : على أن من أتاه من المشركين رده إليهم ومن أتاهم من المسلمين لم يردوه وعلى ان يدخلها من قابل ويقيم بها ثلاثة ايام ولا يدخلها إلا بجلبان السلاح والسيف والقوس ونحوه، فجاء أبو جندل يحجل فى قيوده فرده إليهم – (متفق عليه)

[হাদিসের অনুবাদ এবং হুদাইবিয়ার সন্ধির প্রেক্ষাপট, গুরুত্ব, শর্তাবলি ও সাহাবাদের সংখ্যা]

[মান: ১৬ (অনুবাদ ৭ + ক ৩ + খ ৩ + গ ৩)]

ভূমিকা ও হাদিসের পটভূমি

ষষ্ঠ হিজরির জিলকদ মাসে মক্কার অদূরে হুদাইবিয়া নামক স্থানে কুরাইশ মুশরিকদের সাথে মুসলমানদের যে ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তা ছিল ইসলামের ইতিহাসের এক চূড়ান্ত বাঁক ও বিজয়ের মহাসড়ক। বাহ্যিকভাবে সন্ধির শর্তগুলো মুসলমানদের প্রতিকূলে মনে হলেও এটি ছিল আল্লাহর এক দূরদর্শী কৌশল, যাকে স্বয়ং কুরআন ‘ফাতহুম মুবীন’ (সুস্পষ্ট বিজয়) আখ্যায়িত করেছে।

মূল হাদিসের প্রামাণ্য বঙ্গানুবাদ

হযরত বারা ইবনে আযিব (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন:

«صَالَحَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم الْمُشْرِكِينَ يَوْمَ الْحُدَيْبِيَةِ عَلَى ثَلَاثَةِ أَشْيَاءَ: عَلَى أَنَّ مَنْ أَتَاهُ مِنَ الْمُشْرِكِينَ رَدَّهُ إِلَيْهِمْ، وَمَنْ أَتَاهُمْ مِنَ الْمُسْلِمِينَ لَمْ يَرُدُّوهُ، وَعَلَى أَنْ يَدْخُلَهَا مِنْ قَابِلٍ فَيُقِيمَ بِهَا ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ، وَلَا يَدْخُلَهَا إِلَّا بِجُلُبَّانِ السِّلَاحِ: السَّيْفِ فِي الْقِرَابِ، وَالْقَوْسِ وَنَحْوِهِ، فَجَاءَ أَبُو جَنْدَلٍ يَحْجُلُ فِي قُيُودِهِ فَرَدَّهُ إِلَيْهِمْ»

“হুদাইবিয়ার দিন নবী করীম (সা.) মক্কার মুশরিকদের সাথে প্রধানত তিনটি বিষয়ের ওপর সন্ধিচুক্তি সম্পাদন করেছিলেন: (১) মুশরিকদের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করে রাসুল (সা.)-এর নিকট আসবে, তাকে মুশরিকদের কাছে ফেরত দিতে হবে; কিন্তু মুসলমানদের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি দলত্যাগ করে মুশরিকদের কাছে যাবে, তারা তাকে ফেরত দেবে না। (২) পরবর্তী বছর মুসলমানরা মক্কায় আগমন করে উমরা আদায় করতে পারবে এবং মাত্র তিন দিন অবস্থান করবে। (৩) কোষবদ্ধ তলোয়ার ও সাধারণ পথচলার অস্ত্র ব্যতীত অন্য কোনো প্রকাশ্য যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করতে পারবে না। ঠিক সেই মুহূর্তে হযরত আবু জান্দাল (রা.) পায়ে শৃঙ্খল বাঁধা অবস্থায় লাফিয়ে লাফিয়ে মুসলমানদের তাঁবুতে এসে আশ্রয় চাইলেন, কিন্তু রাসুল (সা.) চুক্তির মর্যাদা রক্ষার্থে তাঁকে মুশরিকদের কাছেই ফেরত দিলেন।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)।

(ক) হুদাইবিয়ার সন্ধির সময়কাল এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব (أهمية صلح الحديبية)

  • সময়কাল: হিজরি ৬ষ্ঠ সনের জিলকদ মাস (মার্চ ৬২৮ খ্রিস্টাব্দ)।
  • ঐতিহাসিক গুরুত্ব:
    • ১. মুসলিম রাষ্ট্রের স্বীকৃতি: মক্কার কুরাইশরা এতদিন মুসলমানদের অস্তিত্ব অস্বীকার করত; এই চুক্তির মাধ্যমে তারা ইসলামি রাষ্ট্রকে একটি সমমর্যাদাপূর্ণ পক্ষ হিসেবে লিখিত স্বীকৃতি দেয়।
    • ২. শান্তিপূর্ণ দাওয়াতের সুবর্ণ সুযোগ: যুদ্ধ বন্ধ থাকায় আরবের সর্বত্র ইসলাম প্রচারের অবারিত সুযোগ তৈরি হয়। সন্ধির পরবর্তী মাত্র দুই বছরে যত মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে, পূর্বের ১৯ বছরেও তত মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেনি। খালেদ বিন ওয়ালিদ ও আমর ইবনুল আসের মতো মহাবীররা এ সময়েই ইসলামে দীক্ষিত হন।
    • ৩. মক্কা বিজয়ের প্রবেশদ্বার: সূরা আল-ফাতহের শুরুতে আল্লাহ বলেন: «إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُبِينًا» — “নিশ্চয়ই আমি আপনাকে এক সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি।” এই সন্ধিই মক্কা বিজয়ের পটভূমি তৈরি করেছিল।

(খ) হুদাইবিয়ার সন্ধির প্রধান প্রধান শর্তাবলি (شروط صلح الحديبية)

  • ১. আগামী দশ বছর উভয় পক্ষের মধ্যে সমস্ত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও সংঘাত বন্ধ থাকবে।
  • ২. এ বছর মুসলমানরা উমরা না করেই মদিনায় ফিরে যাবে এবং পরবর্তী বছর মাত্র তিন দিনের জন্য নিরস্ত্র অবস্থায় উমরা পালন করতে পারবে।
  • ৩. কুরাইশদের কোনো ব্যক্তি অভিভাবকদের অনুমতি ছাড়া মদিনায় পালালে তাকে ফেরত দিতে হবে; কিন্তু কোনো মুসলিম মক্কায় আশ্রয় নিলে তাকে ফেরত দেওয়া হবে না।
  • ৪. আরবের অন্যান্য যে কোনো গোত্র চাইলে মুসলমানদের সাথে কিংবা কুরাইশদের সাথে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারবে (যেমন বনু খুযাআ মুসলিমদের সাথে এবং বনু বকর কুরাইশদের সাথে মিত্রতায় জড়ায়)।

(গ) হুদাইবিয়ার ঐতিহাসিক সফরে অংশগ্রহণকারী সাহাবাদের সংখ্যা

বিশুদ্ধ ঐতিহাসিক রেওয়ায়েত ও সহিহ বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী হুদাইবিয়ার সফরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে ১,৪০০ (এক হাজার চারশত) জন সাহাবায়ে কেরাম উপস্থিত ছিলেন। কোনো কোনো বর্ণনায় ১,৫০০ জনের কথাও উল্লেখিত হয়েছে। এই সাহাবীদের উপস্থিতিতেই বাবলা গাছের নিচে ঐতিহাসিক ‘বাইয়াতে রিদওয়ান’ অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ ঘোষণা করেছিলেন: «لَقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ» — “আল্লাহ সেই মুমিনদের ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন যখন তারা গাছের নিচে আপনার হাতে আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করছিল।”

উপসংহার

হুদাইবিয়ার সন্ধি বিশ্ববাসীকে শিখিয়েছে যে কূটনীতি ও ধৈর্যের বিজয় অনেক সময় তলোয়ারের বিজয়ের চেয়েও বহুগুণ শক্তিশালী ও সুদূরপ্রসারী হতে পারে।

৮। عن عدى بن حاتم قال : قال لى رسول الله صلى الله عليه وسلم : إذا أرسلت كلبك فاذكر اسم الله – فإن أمسك عليك فأدركته حيا فاذبحه وإن أدركته قد قتل ولم يأكل منه فكله – وإن أكل فلا تأكل فإنما أمسك على نفسه فإن وجدت مع كلبك كلبا غيره و قد قتل فلا تأكل فإنك لا تدرى أيهما قتل – وإذا رميت بسهمك فاذكر اسم الله فإن غاب عنك يوما فلم تجد فيه إلا أثر سهمك فكل إن شئت و إن وجدته غريقا في الماء فلا تأكل – (متفق عليه)

[হাদিসের অনুবাদ এবং শিকারের পরিচয়, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিকারী কুকুরের শর্তাবলি ও শব্দ তাহক্বীক্ব]

[মান: ১৬ (অনুবাদ ৭ + ক ৩ + খ ৩ + গ ৩)]

ভূমিকা ও হাদিসের পটভূমি

ইসলাম একটি বাস্তবসম্মত জীবনব্যবস্থা। বন্য পশুপাখি শিকার করে জীবিকা নির্বাহ ও হালাল খাদ্য গ্রহণের পদ্ধতি ইসলামে সুনির্দিষ্ট আইনের অধীন করা হয়েছে। শিকারের জন্য তীর-ধনুক বা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর ব্যবহার করা যাবে কি না এবং শিকার করা প্রাণী কীভাবে হালাল হবে—বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আদী ইবনে হাতিম (রা.)-এর এই হাদিসে তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বর্ণিত হয়েছে।

মূল হাদিসের প্রামাণ্য বঙ্গানুবাদ

হযরত আদী ইবনে হাতিম (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে বলেছেন:

«إِذَا أَرْسَلْتَ كَلْبَكَ فَاذْكُرِ اسْمَ اللَّهِ، فَإِنْ أَمْسَكَ عَلَيْكَ فَأَدْرَكْتَهُ حَيًّا فَاذْبَحْهُ، وَإِنْ أَدْرَكْتَهُ قَدْ قَتَلَ وَلَمْ يَأْكُلْ مِنْهُ فَكُلْهُ، وَإِنْ أَكَلَ فَلَا تَأْكُلْ فَإِنَّمَا أَمْسَكَ عَلَى نَفْسِهِ، فَإِنْ وَجَدْتَ مَعَ كَلْبِكَ كَلْبًا غَيْرَهُ وَقَدْ قَتَلَ فَلَا تَأْكُلْ فَإِنَّكَ لَا تَدْرِي أَيُّهُمَا قَتَلَ، وَإِذَا رَمَيْتَ بِسَهْمِكَ فَاذْكُرِ اسْمَ اللَّهِ، فَإِنْ غَابَ عَنْكَ يَوْمًا فَلَمْ تَجِدْ فِيهِ إِلَّا أَثَرَ سَهْمِكَ فَكُلْ إِنْ شِئْتَ، وَإِنْ وَجَدْتَهُ غَرِيقًا فِي الْمَاءِ فَلَا تَأْكُلْ»

“যখন তুমি শিকারের জন্য তোমার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুরকে ছেড়ে দেবে, তখন ‘বিসমিল্লাহ’ পাঠ করবে। অতঃপর যদি সে শিকারটিকে তোমার জন্য ধরে রাখে এবং তুমি তাকে জীবিত অবস্থায় পাও, তবে নিজ হাতে জবাই করবে। আর যদি কুকুর শিকারটিকে হত্যা করে ফেলে কিন্তু তার কোনো অংশ ভক্ষণ না করে, তবে তুমি তা খেতে পার। কিন্তু যদি কুকুরটি তার কিছু অংশ খেয়ে ফেলে, তবে তুমি তা খেয়ো না; কেননা সে তা নিজের জন্য শিকার করেছে। আর যদি তোমার কুকুরের সাথে অন্য কোনো অপরিচিত কুকুর দেখতে পাও এবং শিকারটি মৃত পাও, তবে তা খেয়ো না; কেননা তুমি জান না যে উভয়ের মধ্যে কোনটি শিকারটিকে হত্যা করেছে। আর যখন তুমি তীর নিক্ষেপ করবে, তখন আল্লাহর নাম (বিসমিল্লাহ) পাঠ করবে। যদি শিকারটি তোমার চোখের আড়াল হয়ে একদিন নিখোঁজ থাকে এবং পরবর্তীতে তাতে কেবল তোমার তীরের আঘাত ছাড়া অন্য কোনো জখম না পাও, তবে চাইলে তা খেতে পার। কিন্তু যদি শিকারটিকে পানিতে ডুবে থাকা অবস্থায় মৃত পাও, তবে তা খেয়ো না (কারণ পানিতে ডুবে নাকি তীরের আঘাতে মারা গেছে তা নিশ্চিত নয়)।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)।

(ক) ‘সায়িদ’ বা শিকারের সংজ্ঞা এবং শিকার কি কেবল কুকুরের মাঝেই সীমাবদ্ধ?

  • শিকারের সংজ্ঞা (معنى الصيد): শরিয়তের পরিভাষায়—যেসব হালাল বন্য ও অপ্রশিক্ষিত পশু বা পাখি মানুষের স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণে থাকে না, তাদেরকে অস্ত্র নিক্ষেপ করে কিংবা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হিংস্র শিকারী প্রাণী লেলিয়ে দিয়ে আয়ত্তে আনা ও হত্যা করাকে শিকার বলা হয়।
  • শিকার কি কেবল কুকুরের মাঝেই সীমাবদ্ধ? না, শিকার কেবল কুকুরের জন্য নির্দিষ্ট নয়। সূরা আল-মায়েদার ৪ নম্বর আয়াত অনুযায়ী—যেকোনো প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হিংস্র পশু (যেমন চিতা বা চিতাবাঘ) এবং শিকারী পাখি (যেমন বাজপাখি, শিকরা, ঈগল) দ্বারা শিকার করা সম্পূর্ণ বৈধ ও হালাল। আল্লাহ বলেন: «وَمَا عَلَّمْتُمْ مِنَ الْجَوَارِحِ مُكَلِّبِينَ» — “এবং শিকারী পশু-পাখি যাদেরকে তোমরা শিকারের প্রশিক্ষণ দিয়েছ…”।

(খ) ‘কালবে মু’আল্লাম’ (প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর)-এর সংজ্ঞা ও শিকার হালাল হওয়ার শর্তাবলি

  • প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুরের সংজ্ঞা: যে শিকারী প্রাণীকে সুনির্দিষ্ট নিয়মে আদেশ পালন, শিকার ধরে রাখা এবং মালিকের নির্দেশ মানার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
  • প্রশিক্ষণের আবশ্যকীয় প্রধান তিনটি শর্ত (শর্তে তা’লীম):
    • ১. মালিক যখন তাকে শিকারের দিকে পাঠাবে সে তৎক্ষণাৎ দৌড়ে যাবে (إذا أرسلته استرسل)।
    • ২. মালিক যখন তাকে থামতে নির্দেশ দেবে সে তৎক্ষণাৎ থেমে যাবে (إذا زجرته انزجر)।
    • ৩. শিকার ধরে ফেলার পর সে নিজে তা খাবে না; বরং অক্ষত অবস্থায় মালিকের জন্য আটকে রাখবে (إذا أمسك لم يأكل)। পরপর তিনবার যদি কুকুর শিকার না খেয়ে মালিকের জন্য রেখে দেয়, তবে সে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বলে গণ্য হবে।

(গ) শব্দ বিশ্লেষণ ও ব্যাকরণিক তাহক্বীক্ব (تحليل الكلمات)

  • ১. أَمْسَكَ (আমসাকা): ফেলে মাজী মারূফ, সিগাহ ওয়াহেদ মুযাক্কার গায়েব। বাব ইফআল (الإمساك)। মাদাহ ‘মীম-সীন-কাফ’ (م س ك)। অর্থ: সে আঁকড়ে ধরল বা আটকে রাখল।
  • ২. قَتَلَ (ক্বাতালা): ফেলে মাজী মারূফ, সিগাহ ওয়াহেদ মুযাক্কার গায়েব। বাব নাসারা-ইয়ানসুরু। মাদাহ ‘ক্বাফ-তা-লাম’ (ق ت ل)। অর্থ: সে হত্যা করল।
  • ৩. لَمْ تَجِدْ (লাম তাজিদ): ফেলে মুজারে নাফী জাহাদ বা লাম, সিগাহ ওয়াহেদ মুযাক্কার হাযির। বাব যারাবা-ইয়াযরিবু। মাদাহ ‘ওয়াও-জীম-দাল’ (و ج د), মিসালে ওয়াবী। অর্থ: তুমি পাওনি।

উপসংহার

জীবজন্তু শিকারের ক্ষেত্রেও আল্লাহর নাম স্মরণ রাখা এবং সন্দেহের বস্তু পরিহার করার এই বিধান ইসলামের পবিত্র খাদ্যব্যবস্থার শ্রেষ্ঠতম নিদর্শন।

৯। عن حذيفة قال : نهانا رسول الله صلى الله عليه وسلم أن نشرب فى آنية الفضة والذهب وأن نأكل فيها و عن لبس الحرير والديباج وأن نجلس عليه – (متفق) وعن سالم عن أبيه عن النبى صلى الله عليه وسلم قال : الإسبال في الإزار والقميص والعمامة من جر منها شيئا خيلاء لم ينظر الله إليه يوم القيامة –

[হাদিসের অনুবাদ এবং স্বর্ণ-রৌপ্যের পাত্র, রেশম ব্যবহারের হুকুম ও কাপড়ে ইসবাদের বিধান]

[মান: ১৬ (অনুবাদ ৭ + ক ৩ + খ ৩ + গ ৩)]

ভূমিকা ও হাদিসের পটভূমি

ইসলাম মুমিনের জীবনে পবিত্রতা, শালীনতা ও বিনম্রতা নিশ্চিত করতে চায়। অহংকার, বিলাসিতা ও অপচয় আত্মাকে কলুষিত করে। তাই সোনা-রূপার পাত্রে পানাহার, পুরুষের জন্য রেশমি পোশাক এবং অহংকারবশত পায়ের গোড়ালির নিচে কাপড় ঝুলিয়ে পরার মতো কাজকে ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

মূল হাদিসদ্বয়ের প্রামাণ্য বঙ্গানুবাদ

হযরত হুযায়ফা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন:

«نَهَانَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَنْ نَشْرَبَ فِي آنِيَةِ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ، وَأَنْ نَأْكُلَ فِيهَا، وَعَنْ لُبْسِ الْحَرِيرِ وَالدِّيبَاجِ، وَأَنْ نَجْلِسَ عَلَيْهِ»

“রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদেরকে সোনা ও রূপার পাত্রে পান করতে এবং তাতে আহার করতে নিষেধ করেছেন; এবং তিনি আমাদেরকে রেশম ও খাঁটি রেশমি পোশাক (দীবাজ) পরিধান করতে এবং তার ওপর বসতে নিষেধ করেছেন।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)।

অপর এক বর্ণনায় হযরত সালেম তাঁর পিতা হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) হতে বর্ণনা করেন, নবী করীম (সা.) ইরশাদ করেছেন:

«الْإِسْبَالُ فِي الْإِزَارِ وَالْقَمِيصِ وَالْعَمَامَةِ، مَنْ جَرَّ مِنْهَا شَيْئًا خُيَلَاءَ لَمْ يَنْظُرِ اللَّهُ إِلَيْهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ»

“ইসবাল (ঝুলিয়ে পরা) হলো লুঙ্গি, জামা ও পাগড়ির ক্ষেত্রে। যে ব্যক্তি অহংকারবশত এর কোনো অংশ মাটির ওপর ঝুলিয়ে টেনে নিয়ে বেড়াবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তার দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন না।” (সুনানে আবু দাউদ ও নাসায়ী)।

(ক) নারী ও পুরুষের জন্য সোনা-রূপার পাত্র ব্যবহারের শারঈ হুকুম

  • পানাহার করা: চার মাজহাবের ইমামগণের সর্বসম্মত ঐকমত্য অনুযায়ী, পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্যই সোনা ও রূপার পাত্রে পানাহার করা সম্পূর্ণ হারাম ও কবিরা গুনাহ। রাসুল (সা.) বলেন: “যে ব্যক্তি সোনা বা রূপার পাত্রে পানাহার করে, সে মূলত নিজের পেটে জাহান্নামের আগুন ঢালে।” (বুখারি ও মুসলিম)।
  • তেল মাখা, সুগন্ধি রাখা ও অন্যান্য ব্যবহার: অধিকাংশ ফকীহের মতে পানাহারের মতো সুগন্ধি মাখা বা সাধারণ কাজেও খাঁটি সোনা-রূপার পাত্র ব্যবহার করা হারাম। তবে নারীদের জন্য ব্যক্তিগত অলংকার হিসেবে সোনা ও রূপা পরিধান করা সর্বসম্মতভাবে হালাল।

(খ) যুদ্ধে ও বিশেষ প্রয়োজনে পুরুষের রেশম পরিধানে ইমামদের মতভেদ

  • সাধারণ অবস্থায়: পুরুষদের জন্য রেশম পরিধান করা সম্পূর্ণ হারাম। রাসুল (সা.) এক হাতে রেশম ও অন্য হাতে সোনা নিয়ে বলেছিলেন: “এই দুটি বস্তু আমার উম্মতের পুরুষদের জন্য হারাম এবং নারীদের জন্য হালাল।” (আবু দাউদ)।
  • চুলকানি বা চর্মরোগের কারণে (للحكة): চর্মরোগ বা খোস-পাঁচড়ার চিকিৎসার জন্য পুরুষদের রেশম পরা জায়েজ। রাসুল (সা.) হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ ও যুবায়ের (রা.)-কে তাঁদের শরীরের চুলকানির কারণে রেশমি জামা পরার অনুমতি দিয়েছিলেন।
  • যুদ্ধের ময়দানে: ইমাম শাফেয়ী, মালেক ও আহমদের মতে যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুকে পরাভূত করতে বা অস্ত্রের আঘাত প্রতিহত করতে রেশম পরা জায়েজ। তবে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে যুদ্ধের ময়দানেও সম্পূর্ণ খাঁটি রেশম পরা মাকরুহে তাহরীমি; কেবল তলোয়ারের বাঁধন বা চার আঙুল পরিমাণ রেশমের পাড় ব্যবহারে অনুমতি রয়েছে।

(গ) ‘ইসবাল’ (الإسبال)-এর অর্থ এবং অহংকার ছাড়া ঝুলিয়ে পরার বিধান

  • ইসবালের অর্থ: পুরুষদের লুঙ্গি, পায়জামা বা প্যান্ট পায়ের টাখনু বা গোড়ালির নিচে ঝুলিয়ে পরাকে ‘ইসবাল’ বলা হয়।
  • অহংকার ছাড়া ঝুলিয়ে পরার বিধান:
    • ১. যদি অহংকারবশত ঝুলিয়ে পরা হয়: তবে তা সর্বসম্মতভাবে হারাম ও কবিরা গুনাহ। আল্লাহ তার দিকে তাকাবেন না।
    • ২. যদি অহংকার ছাড়া নিছক অভ্যাসবশত ঝুলানো হয়: ইমাম বুখারি ও জমহুর মুহাদ্দিসদের মতে এটিও মাকরুহে তাহরীমি বা হারামতুল্য অপরাধ। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন: «مَا أَسْفَلَ مِنَ الْكَعْبَيْنِ مِنَ الْإِزَارِ فَفِي النَّارِ» (সহিহ বুখারি) — “লুঙ্গি বা কাপড়ের যে অংশ টাখনুর নিচে যাবে, সে অংশ জাহান্নামের আগুনে জ্বলবে।” অতএব পুরুষের জন্য সর্বদা টাখনুর উপরে কাপড় রাখা ওয়াজিব বা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ।

উপসংহার

ইসলাম পোশাকের মাধ্যমে মানুষের অহংকার দূর করে বিনয়ী হতে শেখায় এবং পরকালীন জীবনে চিরস্থায়ী রেশম ও সোনার নিয়ামত লাভের পথ সুগম করে।

১০। علق على سعد بن أبي وقاص رضي الله عنه –

[হযরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর পরিচিতি ও ইসলামের ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা]

[মান: ৫]

ভূমিকা ও বংশ পরিচয়

হযরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস মালিক ইবনে উহাইব আল-কুরাশী আয-যুহরী (রা.) ছিলেন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন বিশিষ্ট সাহাবীর (আশারায়ে মুবাশশারাহ) অন্যতম। তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নানার বংশের (বনু যুহরাহ) আত্মীয়, ফলে রাসুল (সা.) গর্ব করে বলতেন: “ইনি আমার মামা! কার এমন মামা আছে আমাকে দেখাও তো!” তাঁর কুনিয়াত ছিল ‘আবু ইসহাক্ব’।

ইসলাম গ্রহণ ও ইসলামে প্রথম তীর নিক্ষেপকারী বীর

হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর দাওয়াতে মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম সপ্তমের একজন হন। তাঁর মা ইসলাম ত্যাগের জন্য অনশন শুরু করলে সাদ (রা.) দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেছিলেন: “মা! তোমার যদি একশতটি প্রাণ থাকত এবং একটি একটি করে বের হতো, তবুও আমি মুহাম্মদ (সা.)-এর দ্বীন ছাড়ব না!” ওহুদ যুদ্ধের চরম সংকটময় মুহূর্তে রাসুল (সা.) নিজের ধনুক সাদ (রা.)-এর হাতে তুলে দিয়ে বলেছিলেন:

«ارْمِ فِدَاكَ أَبِي وَأُمِّي»

“হে সাদ! তীর নিক্ষেপ কর; তোমার জন্য আমার পিতা-মাতা উৎসর্গ হোক!” রাসুল (সা.) সাদ ছাড়া আর কোনো সাহাবীর ক্ষেত্রে পিতা-মাতা উভয়কে একত্র করে কুরবানির কথা বলেননি। তিনিই ছিলেন আল্লাহর রাস্তায় প্রথম রক্তপাতকারী এবং প্রথম তীর নিক্ষেপকারী অকুতোভয় বীর মুজাহিদ।

মুস্তাজাবুদ দাওয়াহ ও পারস্য বিজয়ের মহাবীর

রাসুল (সা.) তাঁর জন্য বিশেষ দোয়া করেছিলেন: “হে আল্লাহ! সাদ যখনই দোয়া করে আপনি তার দোয়া কবুল করুন এবং তার তীরের নিশানা সঠিক রাখুন।” ফলে তিনি ছিলেন চিরন্তন ‘মুস্তাজাবুদ দাওয়াহ’ (যার দোয়া তৎক্ষণাৎ কবুল হতো)। হযরত উমর (রা.)-এর খেলাফতকালে তিনি ছিলেন ঐতিহাসিক ক্বাদিসিয়ার যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, যার মাধ্যমে শতাব্দীর প্রাচীন প্রতাপশালী পারস্যের কিসরা সাম্রাজ্যের পতন ঘটে এবং ইরাক ও পারস্যে ইসলামের বিজয় নিশান উড্ডীন হয়। তিনি কুফা নগরীর পত্তন করেন। তিনি রাসুল (সা.) থেকে ২৭১টি হাদিস বর্ণনা করেছেন। ৫৫ হিজরিতে ৮০ বছর বয়সে মদিনার আক্বীক্বে আশারায়ে মুবাশশারার সর্বশেষ জীবিত সদস্য হিসেবে তিনি ইন্তেকাল করেন।

উপসংহার

হযরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) ছিলেন মুসলিম উম্মাহর শৌর্যবীর্য ও দোয়ার শক্তির এক চিরন্তন অনুপ্রেরণা।

১১। علق على عبد الله بن عمر رضى الله عنهما –

[হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)-এর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও হাদিস বর্ণনায় তাঁর অবদান]

[মান: ৫]

ভূমিকা ও বংশ পরিচয়

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর ইবনুল খাত্তাব আল-কুরাশী আল-আদাবী (রা.) ছিলেন আমিরুল মুমিনীন হযরত উমর (রা.)-এর সুযোগ্য জ্যেষ্ঠ পুত্র। তাঁর কুনিয়াত ছিল ‘আবু আব্দুর রহমান’। বাল্যকালেই পিতার সাথে তিনি মক্কায় ইসলাম গ্রহণ করেন এবং পিতার সাথেই মদিনায় হিজরত করেন।

সুন্নাহর অনুসরণে অনন্য পরাকাষ্ঠা

ইসলামের ইতিহাসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও প্রতিটি পদচিহ্ন অক্ষরে অক্ষরে হুবহু অনুসরণ করার ক্ষেত্রে হযরত ইবনে উমর (রা.) ছিলেন একক ও তুলনাহীন আদর্শ। রাসুল (সা.) যে গাছের নিচে বিশ্রাম নিয়েছিলেন, যে কূপে পানি পান করেছিলেন কিংবা রাস্তায় যেখানে উট থামিয়েছিলেন—ইবনে উমর পরবর্তী জীবনে হুবহু সেখানেই যেতেন এবং ঠিক একইভাবে আমল করতেন। সাহাবায়ে কেরাম বলতেন: “রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর তাঁর সুন্নাহ অনুসরণে ইবনে উমরের চেয়ে বেশি অটল আর কাউকে দেখা যায়নি।” তিনি ছিলেন অত্যন্ত খোদাভীরু, রাত জেগে তাহাজ্জুদ আদায়কারী এবং প্রচুর দানশীল ব্যক্তি। কোনো দাসের নামাজ ও তাকওয়া পছন্দ হলে তিনি তৎক্ষণাৎ তাকে মুক্ত করে দিতেন।

হাদিসশাস্ত্রে অবিস্মরণীয় অবদান ও ফেতনা পরিহার

হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবাদের মধ্যে হযরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর পরই তাঁর স্থান। তাঁর বর্ণিত মোট হাদিসের সংখ্যা ২,৬৩০টি। ইমাম বুখারি ও মুসলিম যৌথভাবে তাঁর ১৬৮টি হাদিস সংকলন করেছেন। হাদিসের সনদের মধ্যে ‘মালিক আন নাফে আন ইবনে উমর’ সনদটিকে ইমাম বুখারি ‘সিলসিলাতুয যাহাব’ বা স্বর্ণালী সনদ আখ্যা দিয়েছেন। হযরত উসমান (রা.)-এর শাহাদাতের পর মুসলিম জাহানে যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে রক্তক্ষয়ী ফেতনা এড়িয়ে নিরপেক্ষ থাকেন এবং কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতার পদ গ্রহণ করেননি। ৭৩ হিজরিতে ৮৪ বছর বয়সে মক্কায় তিনি ইন্তেকাল করেন।

উপসংহার

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) ছিলেন সুন্নাহর একনিষ্ঠ সাধক ও হাদিস সাহিত্যের অন্যতম প্রধান বাতিঘর।

১২। علق على عبد الرحمن بن عوف رضى الله عنه –

[হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)-এর পরিচিতি ও দানশীলতার ইতিহাস]

[মান: ৫]

ভূমিকা ও বংশ পরিচয়

হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ আল-কুরাশী আয-যুহরী (রা.) ছিলেন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন বিশিষ্ট সাহাবীর (আশারায়ে মুবাশশারাহ) অন্যতম শীর্ষ ব্যক্তিত্ব। জাহেলি যুগে তাঁর নাম ছিল ‘আবদু আমর’ বা ‘আবদুল কাবা’; ইসলাম গ্রহণের পর রাসুল (সা.) তাঁর নাম রাখেন ‘আব্দুর রহমান’। তাঁর কুনিয়াত ছিল ‘আবু মুহাম্মদ’।

ইসলাম গ্রহণ ও আত্মমর্যাদাবোধের অনন্য দৃষ্টান্ত

হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর দাওয়াতে তিনি ইসলামের একদম সূচনা লগ্নে ইসলাম গ্রহণ করেন। মক্কার মুশরিকদের নির্যাতনে তিনি আবিসিনিয়ায় এবং পরবর্তীতে মদিনায় হিজরত করেন। মদিনায় হিজরতের পর রাসুল (সা.) আনসার সাহাবী সাদ ইবনুর রাবী (রা.)-এর সাথে তাঁর ভ্রাতৃত্ব বন্ধন তৈরি করে দেন। সাদ (রা.) নিজের অর্ধেক ধনসম্পদ ও একটি বাড়ি তাঁকে দিয়ে দিতে চাইলে আত্মমর্যাদাসম্পন্ন আব্দুর রহমান ইবনে আউফ বিনয়ের সাথে তা ফিরিয়ে দিয়ে বললেন: “আল্লাহ তোমার পরিবার ও সম্পদে বরকত দিন; আমাকে শুধু মদিনার বাজারের পথটি দেখিয়ে দাও!” তিনি বাজারে গিয়ে পনির ও ঘিয়ের ব্যবসা শুরু করেন এবং অল্প দিনেই বিপুল সম্পদের মালিক হন। তিনি বলতেন: “আমার মনে হতো আমি মাটিতে হাত দিলেও তা সোনা হয়ে যেত!”

অকাতরে দান ও শরিয়তে অনন্য মর্যাদা

তিনি ছিলেন উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ দানবীরদের অন্যতম। একবার তাঁর সাতশত উটের বিশাল বাণিজ্যিক কাফেলা মদিনায় প্রবেশ করলে পুরো মদিনা প্রকম্পিত হয়ে ওঠে; তিনি খাদ্য ও পণ্যবোঝাই সেই সম্পূর্ণ কাফেলা আল্লাহর রাস্তায় মদিনার দরিদ্রদের মাঝে অকাতরে দান করে দেন। তিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বেঁচে থাকা সকল সাহাবীকে চারশত দিনার করে ওসীয়ত করেছিলেন। আব্দুর রহমান ইবনে আউফের বিশেষ মর্যাদা হলো—তাবুক যুদ্ধের সফরে রাসুল (সা.) স্বয়ং তাঁর ইমামতিতে এক রাকাত ফজরের সালাত আদায় করেছিলেন। হযরত উমর (রা.) তাঁর গঠিত ছয় সদস্যের খলিফা নির্বাচন কমিটির অন্যতম প্রধান সদস্য ছিলেন তিনি। ৩২ হিজরিতে ৭৫ বছর বয়সে মদিনায় তিনি ইন্তেকাল করেন এবং জান্নাতুল বাক্বীতে সমাহিত হন।

উপসংহার

হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) প্রমাণ করেছেন কীভাবে হালাল ব্যবসা ও আল্লাহর রাস্তায় মুক্তহস্তে দান করে জান্নাতের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করা যায়।

১৩। علق على عثمان بن مظعون رضى الله عنه –

[হযরত উসমান ইবনে মাযউন (রা.)-এর পরিচিতি ও যুহদ-সাধনার জীবন]

[মান: ৫]

ভূমিকা ও বংশ পরিচয়

হযরত উসমান ইবনে মাযউন আল-জুমাহী (রা.) ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দুধভাই (উভয়ে সুয়াইবার দুধ পান করেছিলেন) এবং প্রথম যুগের অন্যতম বিশিষ্ট ও খোদাভীরু সাহাবী। তাঁর কুনিয়াত ছিল ‘আবুস সায়িব’। জাহেলি যুগেই তিনি মদ ও অশ্লীলতা নিজের ওপর চিরতরে হারাম ঘোষণা করেছিলেন।

ইসলাম গ্রহণ ও আবিসিনিয়ার হিজরত

হযরত আবু বকর (রা.)-এর পর তিনি মাত্র ১৩ বা ১৪তম ব্যক্তি হিসেবে ইসলাম গ্রহণ করেন। কাফেরদের অমানবিক নির্যাতনে তিনি সপরিবারে আবিসিনিয়ায় প্রথম হিজরতকারীদের নেতৃত্ব দেন। পরবর্তীতে মক্কায় ফিরে এসে তিনি কাফের নেতা ওয়ালীদ ইবনুল মুগীরার আশ্রয়ে প্রবেশ করেন। কিন্তু সাধারণ দরিদ্র মুসলমানদের ওপর অকথ্য নির্যাতন দেখে তাঁর আত্মমর্যাদাবোধে আঘাত লাগে। তিনি ওয়ালীদকে গিয়ে বললেন: “আমি কোনো কাফেরের আশ্রয়ে নিরাপদ থাকতে চাই না, আমি আল্লাহর আশ্রয়ে আমার ভাইদের মতো নির্যাতিত হতে চাই!” তিনি প্রকাশ্যে ওয়ালীদকে তার আশ্রয় ফিরিয়ে দেন এবং মুশরিকদের দ্বারা প্রহৃত হয়ে এক চোখ হারিয়ে আনন্দ প্রকাশ করে বলেন: “আমার এই চোখটি আল্লাহর রাস্তায় আমার অপর চোখের মতোই আঘাত পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে!”

সংসারত্যাগ ও বৈরাগ্যবাদ বনাম সুন্নাহর ভারসাম্য

তিনি ছিলেন চরম ইবাদতগুজার ও দুনিয়াবিমুখ সাধক। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে আজীবন রোজা রাখবেন, সারা রাত দাঁড়িয়ে তাহাজ্জুদ পড়বেন, নিজের পৌরুষত্ব বিনষ্ট করে ফেলবেন এবং স্ত্রীর সাথে শারীরিক সম্পর্ক রাখবেন না। তাঁর স্ত্রী বিষয়টি রাসুল (সা.)-কে জানালে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে ডেকে এনে কঠোরভাবে ভারসাম্যপূর্ণ জীবনের নির্দেশ দিয়ে বলেন:

«يَا عُثْمَانُ، إِنِّي لَمْ أُومَرْ بِالرَّهْبَانِيَّةِ… فَإِنَّ لِعَيْنِكَ عَلَيْكَ حَقًّا، وَلِأَهْلِكَ عَلَيْكَ حَقًّا، فَصُمْ وَأَفْطِرْ، وَقُمْ وَنَمْ»

“হে উসমান! আমাকে বৈরাগ্যবাদ বা সংসারত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়নি… নিশ্চয়ই তোমার ওপর তোমার চোখের হক রয়েছে, তোমার ওপর তোমার স্ত্রীর হক রয়েছে; অতএব তুমি রোজা রাখ এবং রোজা ভঙ্গ কর, রাতে সালাত আদায় কর এবং ঘুমাও।”

ইন্তেকাল ও প্রথম বাক্বী কবরবাসী

বদর যুদ্ধে বীরত্ব প্রদর্শনের পর ৩য় হিজরিতে তিনি মদিনায় ইন্তেকাল করেন। মুহাজির সাহাবাদের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম মদিনায় ইন্তেকালকারী সাহাবী এবং জান্নাতুল বাক্বীতে সমাহিত হওয়া সর্বপ্রথম ব্যক্তি। রাসুল (সা.) অশ্রুসিক্ত নয়নে তাঁর কপালে চুম্বন করে জানাজা পড়িয়েছিলেন এবং কবরের মাথার কাছে একটি পাথর রেখে বলেছিলেন: “এটি দিয়ে আমি আমার ভাইয়ের কবর চিহ্নিত রাখলাম।”

উপসংহার

হযরত উসমান ইবনে মাযউন (রা.) ছিলেন আত্মত্যাগ, ইখলাস ও ঐশী প্রেমের এক জ্বলন্ত প্রদীপ।

১৪। علق على عبد الله بن عمرو بن عاص رضى الله عنهما –

[হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.)-এর হাদিস সংকলন ও অবদান]

[মান: ৫]

ভূমিকা ও বংশ পরিচয়

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস আল-কুরাশী আস-সাহমী (রা.) ছিলেন প্রখ্যাত সেনানায়ক হযরত আমর ইবনুল আস (রা.)-এর সুযোগ্য পুত্র। পিতার চেয়ে তিনি মাত্র এগারো বা বারো বছরের ছোট ছিলেন। পিতা ইসলাম গ্রহণের পূর্বেই তিনি স্বেচ্ছায় মক্কায় ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর কুনিয়াত ছিল ‘আবু মুহাম্মদ’ বা ‘আবু আব্দুর রহমান’।

হাদিস লিপিবদ্ধকরণ ও ‘আস-সহীফাতুস সাদিক্বাহ’

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশাতেই স্বহস্তে হাদিস লিখে সংরক্ষণ করার ক্ষেত্রে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) ছিলেন একক পথিকৃৎ। তৎকালীন যুগে আরবরা মুখস্থের ওপর নির্ভর করত, কিন্তু তিনি রাসুল (সা.)-এর অনুমতি নিয়ে প্রতিটি বাণী লিখে রাখতেন। কুরাইশরা তাঁকে বলেছিল: “তুমি রাসুলুল্লাহর সব কথা লিখে রাখছ অথচ তিনি তো একজন মানুষ, কখনো ক্রোধে বা খুশিতে কথা বলেন!” তখন তিনি রাসুল (সা.)-এর নিকট বিষয়টি জানালে নবীজী নিজের পবিত্র মুখের দিকে ইঙ্গিত করে ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন:

«اكْتُبْ، فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا يَخْرُجُ مِنْهُ إِلَّا حَقٌّ»

“তুমি লিখে রাখ! সেই মহান সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ, এই মুখ দিয়ে সত্য ছাড়া আর কিছুই বের হয় না!” (সুনানে আবু দাউদ)। অতঃপর তিনি এক হাজারেরও বেশি হাদিস স্বহস্তে সংকলন করে একটি ঐতিহাসিক পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করেন, যার নাম দেন ‘আস-সহীফাতুস সাদিক্বাহ’ (الصحيفة الصادقة)। তিনি গর্ব করে বলতেন: “আমার এই সহীফায় আমার ও রাসুল (সা.)-এর মাঝে কোনো তৃতীয় ব্যক্তি নেই।”

জ্ঞান ও ইবাদতে অনন্য সাধনা

তিনি ছিলেন বহুভাষাবিদ; তিনি সুরিয়ানি ভাষাতেও পণ্ডিত ছিলেন এবং তওরাত অধ্যয়ন করেছিলেন। তিনি ছিলেন তীব্র ইবাদতগুজার সাহাবী; প্রতিদিন পুরো কুরআন খতম করতেন এবং প্রতিদিন রোজা রাখতেন। পরবর্তীতে রাসুল (সা.) তাঁকে মাসে তিন দিন রোজা রাখা এবং এক মাসে কুরআন খতমের পরামর্শ দিয়ে সংযমী হতে বলেন। তাঁর বর্ণিত মোট হাদিসের সংখ্যা প্রায় ৭০০টি। ৬৫ হিজরিতে ৭২ বছর বয়সে মিশরের ফুসতাতে তিনি ইন্তেকাল করেন।

উপসংহার

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.)-এর ‘আস-সহীফাতুস সাদিক্বাহ’ হলো হাদিস সংকলন যে নবুওয়তের যুগেই শুরু হয়েছিল—তার এক অবিসংবাদিত ঐতিহাসিক দলিল।

১৫। علق على طلحة بن عبيد الله رضى الله عنه –

[হযরত তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রা.)-এর পরিচিতি ও ‘জীবন্ত শহীদ’ খেতাব]

[মান: ৫]

ভূমিকা ও বংশ পরিচয়

হযরত তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ আল-কুরাশী আত-তায়মী (রা.) ছিলেন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন বিশিষ্ট সাহাবীর (আশারায়ে মুবাশশারাহ) অন্যতম মহাবীর। তাঁর কুনিয়াত ছিল ‘আবু মুহাম্মদ’। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর দাওয়াতে ইসলামের একেবারে সূচনাতেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।

ওহুদ যুদ্ধের বীরত্ব ও ‘জীবন্ত শহীদ’ (الشهيد الحي) উপাধি

ওহুদ যুদ্ধের ভয়াবহ মুহূর্তে যখন মুসলিম বাহিনী বিপর্যয়ের মুখে পড়ে এবং কাফেররা চতুর্দিক থেকে রাসুল (সা.)-কে হত্যার উন্মাদনায় ঘিরে ফেলেছিল, তখন যে মুষ্টিমেয় সাহাবী নিজেদের দেহকে ঢাল বানিয়ে রাসুল (সা.)-কে রক্ষা করেছিলেন—হযরত তালহা (রা.) ছিলেন তাঁদের অগ্রনায়ক। তিনি একাই কাফেরদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে থাকেন। রাসুল (সা.)-এর দিকে নিক্ষিপ্ত প্রতিটি তীর ও তরবারির আঘাত তিনি নিজের বুক, পিঠ ও হাত দিয়ে প্রতিহত করেন। এ যুদ্ধে তাঁর পবিত্র শরীরে ৭০টিরও বেশি তীর, বর্শা ও তরবারির জখম লেগেছিল এবং রাসুল (সা.)-কে বাঁচাতে গিয়ে তাঁর একটি হাত চিরতরে অবশ হয়ে যায়। রাসুল (সা.) তাঁর এই অবিশ্বাস্য আত্মত্যাগ দেখে ইরশাদ করেছিলেন:

«مَنْ سَرَّهُ أَنْ يَنْظُرَ إِلَى شَهِيدٍ يَمْشِي عَلَى وَجْهِ الأَرْضِ فَلْيَنْظُرْ إِلَى طَلْحَةَ بْنِ عُبَيْدِ اللَّهِ»

“যে ব্যক্তি ভূখণ্ডের ওপর কোনো ‘জীবন্ত শহীদ’ হেঁটে বেড়াতে দেখে আনন্দিত হতে চায়, সে যেন তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহর দিকে তাকায়!” (সুনানে তিরমিযী)। হযরত আবু বকর (রা.) ওহুদ যুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলতেন: “ওহুদের পুরো দিনটিই ছিল একমাত্র তালহার দিন!”

দানশীলতা ও শাহাদাত

তিনি ছিলেন বিশাল ধনী ব্যবসায়ী এবং মুক্তহস্তে দানকারী। রাসুল (সা.) তাঁর বদান্যতা দেখে তাঁকে ‘তালহাতুল খায়ের’ (উত্তম তালহা), ‘তালহাতুল জুদ’ (দানশীল তালহা) এবং ‘তালহাতুল ফায়্যাদ’ (উদার তালহা) খেতাবে ভূষিত করেছিলেন। হযরত উমর (রা.)-এর খেলাফত কমিটির ছয় সদস্যের অন্যতম ছিলেন তিনি। ৩৬ হিজরিতে ঐতিহাসিক জঙ্গে জামালের দিন ৬২ বা ৬৪ বছর বয়সে এই মহান ‘জীবন্ত শহীদ’ শাহাদাত বরণ করেন।

উপসংহার

হযরত তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রা.) ছিলেন রাসুলপ্রেম ও আত্মত্যাগের এক অনন্য চূড়া, যাঁর বীরত্ব ইসলামের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

ফাযিল ১ম বর্ষ দিরাসাতুল হাদীস ২য় পত্র ২০২৪ পরীক্ষার বিষয় কোড কত ছিল?

বিষয় কোড ছিল ১১১০১২ এবং পরীক্ষার পূর্ণমান ছিল ১০০ নম্বর। পরীক্ষার সময় ৩ ঘণ্টা।

ইসলামে কোনো মুসলমানকে হত্যা করা কোন তিনটি কারণে বৈধ?

অন্যায় হত্যার ক্বিসাস হিসেবে, বিবাহিত ব্যক্তির ব্যভিচারের রজম হিসেবে এবং ইসলাম ত্যাগকারী মুরতাদের শাস্তি হিসেবে।

আদালতে মামলা ওঠার পর হুদূদের শাস্তি মাফ করাতে সুপারিশ করার শারঈ হুকুম কী?

আদালতে মামলা ওঠার পর অপরাধ প্রমাণিত হলে হদ রদ করার জন্য সুপারিশ করা সম্পূর্ণ হারাম ও আল্লাহর সাথে শত্রুতার শামিল।

হুদাইবিয়ার সন্ধিকে পবিত্র কুরআনে কী আখ্যায়িত করা হয়েছে?

সূরা আল-ফাতহে হুদাইবিয়ার সন্ধিকে ‘ফাতহুম মুবীন’ বা এক প্রকাশ্য ও সুস্পষ্ট মহান বিজয় হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

পুরুষদের জন্য স্বর্ণ-রৌপ্যের পাত্র ও রেশমি পোশাকের বিধান কী?

সোনা-রূপার পাত্রে পানাহার করা পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্য হারাম; এবং পুরুষদের জন্য রেশম পরা হারাম, তবে চর্মরোগের প্রয়োজনে পরা জায়েজ।

ওহুদ যুদ্ধের বীরত্বের কারণে রাসুলুল্লাহ (সা.) কাকে ‘জীবন্ত শহীদ’ উপাধি দিয়েছিলেন?

বিশিষ্ট সাহাবী হযরত তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রা.)-কে রাসুলুল্লাহ (সা.) ‘জীবন্ত শহীদ’ (আশ-শহীদুল হাই) উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *