ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত পরীক্ষা
ফাযিল (স্নাতক) পাস প্রথম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪ [নতুন সিলেবাস অনুযায়ী]
উলূমুল কুরআন ওয়াল হাদীস (দ্বিতীয় পত্র) : হাদীস ও উসূলুল হাদীস (বিষয় কোড: ১১১০০২)
সময়: ৩ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ১০০
[الملاحظة : أجب عن خمسة من مجموعة (أ) وعن اثنين من مجموعة (ب) وعن اثنين من مجموعة (ج) والاعداد بالهامش تدل على الدرجة الكاملة -]
[দ্রষ্টব্য : (أ) অংশ হতে পাঁচটি, (ب) অংশ হতে দুটি এবং (ج) অংশ হতে দুটি প্রশ্নের উত্তর দাও। বাম পাশে উল্লিখিত সংখ্যা প্রশ্নের পূর্ণমান জ্ঞাপক।]
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন অনুষ্ঠিত ফাযিল স্নাতক (পাস) প্রথম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪-এর উলূমুল কুরআন ওয়াল হাদীস ২য় পত্র (বিষয় কোড: ১১১০০২ – হাদীস ও উসূলুল হাদীস) পরীক্ষার মূল প্রশ্নপত্রের সকল প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ, প্রামাণ্য ও গবেষণাধর্মী সমাধান নিচে দেওয়া হলো। সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, সুনান গ্রন্থসমূহ এবং উসূলুল হাদীসের প্রামাণ্য শাস্ত্রগ্রন্থ মুকাদ্দিমায়ে ইবনুস সালাহ ও নুখবাতুল ফিকারের আলোকে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর সুবিন্যস্তভাবে সংকলিত হয়েছে।
১। عن أبي هريرة رضي الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم من آتاه الله مالا فلم يؤد زكاته مثل له ماله يوم القيامة شجاعا أقرع له زبيبتان يطوقه يوم القيامة ثم يأخذ بلهزمتيه يعني بشدقيه ثم يقول أنا مالك أنا كنزك – (رواه البخاري)
[সহীহ বুখারী : যাকাত প্রদান না করার ভয়াবহ শাস্তি এবং যাকাত ফরয হওয়ার হিকমতের বিশদ পর্যালোচনা]
[মান: ১৪ (অনুবাদ ৬ + ক ৪ + খ ৪)]
ভূমিকা ও পটভূমি
যাকাত হলো ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম অর্থনৈতিক ভিত্তি। সম্পদ কেবল ধনীদের হাতে পুঞ্জীভূত না রেখে সমাজের নিঃস্ব, অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিত মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা ধনীদের ওপর ফরয করা হয়েছে। যারা কৃপণতা করে যাকাত প্রদানে অস্বীকৃতি জানায়, তাদের কঠিন ও লোমহর্ষক শাস্তির ব্যাপারে বিশ্বনবী (সা.) এই হাদীসে এক জীবন্ত সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন।
হাদীসটির প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: ‘আল্লাহ যাকে ধনসম্পদ দান করেছেন, কিন্তু সে তার যাকাত প্রদান করেনি; কিয়ামতের দিন তার সেই সম্পদকে এক বিষাক্ত টেকো সাপের রূপ দান করা হবে, যার চোখের ওপর দুটি কালো তিল বা বিষাক্ত ফোঁটা থাকবে। কিয়ামতের দিন তা তার গলায় বেড়ি বা কণ্ঠহারের মতো পেঁচিয়ে দেওয়া হবে। অতঃপর সাপটি তার উভয় চোয়াল (বা গালের দুই পাশ) কামড়ে ধরবে এবং বলবে: আমি তোমার সঞ্চিত সম্পদ, আমিই তোমার পুঞ্জীভূত ধনভাণ্ডার।’ (সহীহ বুখারী: ১৪০৩)।
শাব্দিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ
| শব্দ | শব্দার্থ | ব্যাকরণিক রূপ | তাফসীর ও হাদীসের তাৎপর্য |
|---|---|---|---|
| مُثِّلَ لَهُ | তার জন্য রূপান্তর করা হবে | ফে’লে মাযী মাজহূল (তাকভীন) | অদৃশ্য আত্মিক অপরাধকে কিয়ামতে দৃশ্যমান বিষধর সাপে পরিণত করা। |
| شُجَاعًا أَقْرَعَ | টেকো বিষধর সাপ | মউসূফ ও সিফাত | অতিরিক্ত বিষের তীব্রতায় যার মাথার চুল বা চামড়া উঠে মসৃণ হয়ে গেছে। |
| لَهُ زَبِيبَتَانِ | তার দুটি কালো চিহ্ন রয়েছে | জুমলায়ে সিফাতিয়্যাহ | চোখের ওপর অবস্থিত দুটি অতি বিষাক্ত গ্রন্থি বা ফোঁটা। |
| بِلِهْزَمَتَيْهِ | তার চোয়ালের দুই পাশে | তাসনিয়াহ (দ্বিবচন), জার-মাজরুর | মুখের দুই পাশের নরম মাংসপিণ্ড বা গালের চোয়ালে দংশন করা। |
(الف) ইসলামে যাকাত ফরয হওয়ার হিকমত ও তাৎপর্য
- আত্মিক পবিত্রতা অর্জন (তাযকিয়াতুন নাফস): যাকাত মানুষের অন্তর থেকে ধনলিপ্সা, কৃপণতা ও পার্থিব মোহের কালিমা দূর করে আত্মাকে পবিত্র করে (সূরা আত-তাওবাহ: ১০৩)।
- সম্পদের বরকত ও নিরাপত্তা: যাকাত দিলে সম্পদ কমে না; বরং আল্লাহ তাতে প্রভূত বরকত দান করেন এবং যাবতীয় বালা-মুসিবত ও অপচয় থেকে সম্পদকে সুরক্ষিত রাখেন।
- অর্থনৈতিক ভারসাম্য ও দারিদ্র্য বিমোচন: যাকাতের মাধ্যমে সমাজের সম্পদ ধনীদের কাছ থেকে দরিদ্রদের মাঝে আবর্তিত হয়, ফলে সমাজে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য হ্রাস পায় এবং শোষণহীন সমাজ গড়ে ওঠে।
- সামাজিক নিরাপত্তা ও ভ্রাতৃত্ববোধ: যাকাত বঞ্চিত শ্রেণির মনে ধনীদের প্রতি ক্ষোভ ও হিংসা দূর করে পারস্পরিক ভালোবাসা ও মমত্ববোধের পরিবেশ তৈরি করে।
(ب) কিয়ামতের ময়দানের এই শাস্তি কি জাহান্নামে প্রবেশের পূর্বে নাকি পরে?
মুহাদ্দিসীন ও ফকীহগণের ঐকমত্য অনুযায়ী:
- হাদীসে বর্ণিত বিষাক্ত সাপের এই অবর্ণনীয় শাস্তি কার্যকর হবে জাহান্নামে প্রবেশের পূর্বে অর্থাৎ হাশরের ময়দানে পঞ্চাশ হাজার বছর দীর্ঘ হিসাব-নিকাশের কঠিন সময়ে।
- ইমাম কুরতুবী (রহ.) ও হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) বলেন, সহীহ মুসলিমের দীর্ঘ হাদীসে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, হাশরের মাঠে মানুষ যখন চরম পিপাসা ও উত্তাপে হিসাবের প্রতীক্ষায় থাকবে, তখন যাকাত অনাদায়কারীর সম্পদকে উত্তপ্ত পাত এবং অজগর সাপে পরিণত করে শাস্তি দেওয়া হবে। এরপর আল্লাহর আদালত তার ব্যাপারে জান্নাত বা জাহান্নামের চূড়ান্ত ফয়সালা ঘোষণা করবে।
উপসংহার
যাকাত কেবল কোনো দান-খয়রাত নয়, বরং এটি ধনীর সম্পদে দরিদ্রের অলঙ্ঘনীয় অধিকার। এই অধিকার হরণ করলে পরকালে সঞ্চিত সম্পদই ভয়াবহ বিষাক্ত আজাব হয়ে আবির্ভূত হবে।
২। عن قبيصة بن مخارق الهلالي رضي الله عنه قال تحملت حمالة فأتيت رسول الله صلى الله عليه وسلم أسأله فيها فقال أقم حتى تأتينا الصدقة فنأمر لك بها ثم قال يا قبيصة إن المسألة لا تحل إلا لأحد ثلاثة رجل تحمل حمالة فحلت له المسألة حتى يصيبها ثم يمسك، ورجل أصابته جائحة اجتاحت فحلّت له المسألة حتى يصيب قواما من عيش أو قال سدادا من عيش، ورجل أصابته فاقة حتى يقوم ثلاثة من ذوي الحجى من قومه لقد أصابت فلانا فاقة فحلت له المسألة حتى يصيب قواما من عيش أو قال سدادا من عيش فما سواهن من المسألة يا قبيصة سحت يأكلها صاحبها سحتا – (رواه مسلم)
[সহীহ মুসলিম : সাহায্য চাওয়ার শারঈ নীতিমালা, ভিক্ষাবৃত্তির নিন্দা এবং সমাজে আর্থিক ভারসাম্য]
[মান: ১৪ (অনুবাদ ৬ + ক ৪ + খ ৪)]
ভূমিকা ও পটভূমি
ইসলাম মানুষের আত্মমর্যাদা ও শ্রমের মর্যাদাকে সমুন্নত রেখেছে এবং বিনা প্রয়োজনে মানুষের কাছে হাত পাতা ও ভিক্ষাবৃত্তিকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করেছে। তবে সমাজের কিছু বিশেষ মানবিক দুর্যোগ ও মহৎ কাজের প্রেক্ষাপটে শরিয়ত সাহায্য গ্রহণের অনুমতি দিয়েছে। এই হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহায্য প্রার্থনার সুনির্দিষ্ট তিনটি ক্ষেত্র নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
হাদীসটির প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ
হযরত ক্বাবীসাহ ইবনে মুখারিক্ব আল-হিলালী (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি দুটি গোত্রের রক্তক্ষয়ী বিবাদ মেটাতে গিয়ে আর্থিক জামিনদারী (হামালাহ) গ্রহণ করেছিলাম। অতঃপর এই সাহায্য চাইতে আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর খেদমতে উপস্থিত হলাম। তিনি বললেন: ‘তুমি অপেক্ষা কর যতক্ষণ না আমাদের কাছে সাদাকার মাল আসে, যাতে আমি তা থেকে তোমাকে প্রদানের নির্দেশ দিতে পারি।’ অতঃপর তিনি বললেন: ‘হে ক্বাবীসাহ! তিন শ্রেণির মানুষ ব্যতীত আর কারও জন্য সাহায্য চাওয়া হালাল নয়: প্রথমত, যে ব্যক্তি দুই পক্ষের রক্তক্ষয়ী বিরোধ মেটাতে গিয়ে আর্থিক জামিনদার হয়েছে, তার জন্য সাহায্য চাওয়া বৈধ যতক্ষণ না সে সেই নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পায়, অতঃপর সে ক্ষান্ত হবে। দ্বিতীয়ত, যে ব্যক্তি এমন কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে নিপতিত হয়েছে যা তার যাবতীয় ধনসম্পদ ধ্বংস করে দিয়েছে, তার জন্য জীবনধারণের ন্যূনতম অবলম্বন বা প্রয়োজনীয় সামর্থ্য লাভ করা পর্যন্ত সাহায্য চাওয়া বৈধ। তৃতীয়ত, যে ব্যক্তি চরম দারিদ্র্যের শিকার হয়েছে, এমনকি তার নিজ সম্প্রদায়ের তিনজন বিবেকবান ও বুদ্ধিমান ব্যক্তি সাক্ষ্য দিয়ে বলে যে, অমুক ব্যক্তি বাস্তবিকই চরম অভাবগ্রস্ত হয়ে পড়েছে; তবে তার জন্যও জীবনধারণের উপযোগী ন্যূনতম সংস্থান হওয়া পর্যন্ত সাহায্য চাওয়া বৈধ। হে ক্বাবীসাহ! এই তিনটি অবস্থা ব্যতীত যে কোনো সাহায্য চাওয়া হলো হারাম (সুহ্ত), যা গ্রহণকারী অবৈধ হারাম ভক্ষণকারী হিসেবে ভোগ করে।’ (সহীহ মুসলিম: ১০৪৪)।
(الف) নববী হাদীসের আলোকে অহেতুক ভিক্ষাবৃত্তির কঠোর নিন্দা
- চেহারায় মাংসহীন কঙ্কাল হয়ে উঠা: রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: ‘যে ব্যক্তি অহেতুক মানুষের কাছে হাত পাতে, কিয়ামতের দিন সে এমন অবস্থায় উঠবে যে তার মুখমণ্ডলে এক টুকরো মাংসও থাকবে না।’ (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)।
- জাহান্নামের আগুন বৃদ্ধি করা: অপর হাদীসে নবীজী বলেন: ‘যে ব্যক্তি নিজের সম্পদ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে মানুষের কাছে হাত পাতে, সে মূলত জাহান্নামের জ্বলন্ত অঙ্গার ভিক্ষা করছে; এখন তার ইচ্ছা সে তা কম গ্রহণ করুক কিংবা বেশি।’ (সহীহ মুসলিম)।
- আত্মমর্যাদাহানি: ইসলামে উপরের হাত (দাতাহস্ত) নিচের হাতের (গ্রহীতার হাত) চেয়ে বহুগুণে শ্রেষ্ঠ বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
(ب) “حتى يقوم ثلاثة من ذوي الحجى”-এর ব্যাখ্যা
- ‘যাবিল হিযা’ (ذوي الحجى)-এর অর্থ: যারা প্রজ্ঞাবান, বিচক্ষণ, ন্যায়পরায়ণ এবং সত্য-মিথ্যা পরখ করার সূক্ষ্ম বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি।
- তিনজন সাক্ষীর শর্তের তাৎপর্য: কেউ মুখে নিজেকে নিঃস্ব দাবি করলেই যেন তাকে সাদাকা দেওয়া না হয়। সমাজে অনেকেই প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে অলসভাবে ভিক্ষাবৃত্তি করে। তাই তার সমাজের তিনজন বুদ্ধিমান ও বিশ্বস্ত প্রতিবেশীর নিরপেক্ষ সাক্ষ্যের মাধ্যমে তার চরম অভাবের সত্যতা নিশ্চিত হতে হবে। এর মাধ্যমে সত্যিকার অভাবী মানুষের হক নিশ্চিত হয় এবং ভণ্ড প্রতারকদের পথ রুদ্ধ হয়।
উপসংহার
এই হাদীস প্রমাণ করে যে, ইসলাম কর্মবিমুখ পরজীবী ভিক্ষাবৃত্তিকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে কেবল প্রকৃত অভাবগ্রস্ত ও সমাজসংস্কারকদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ মানবিক সহায়তার দ্বার উন্মুক্ত রেখেছে।
৩। عن عائشة رضي الله عنها قالت أن حمزة بن عمرو الأسلمي قال للنبي صلى الله عليه وسلم أصوم في السفر وكان كثير الصيام فقال ان شئت فصم وان شئت فافطر – (متفق عليه) وعن عبد الرحمن بن عوف رضي الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم صائم رمضان في السفر كالمفطر في الحضر – (رواه ابن ماجة)
[মুত্তাফাক আলাইহ ও ইবনে মাজাহ : সফরে সিয়াম পালন ও ভঙ্গের বিধান এবং হাদীসদ্বয়ের সমন্বয়]
[মান: ১৪ (অনুবাদ ৬ + ক ৪ + খ ৪)]
ভূমিকা ও পটভূমি
সফর মানুষের জীবনে এক অনন্য সাধারণ ও কষ্টসাধ্য অবস্থা। আল্লাহ তাআলা শরিয়তে মুসাফিরের জন্য বিশেষ ছাড় (রুখসত) প্রদান করেছেন। সফরে রোযা রাখা যাবে কি না, নাকি রোযা ভাঙাই উত্তম—এ বিষয়ে বিভিন্ন হাদীসে বাহ্যিক ভিন্নতা পরিলক্ষিত হওয়ায় ফকীহ ও মুহাদ্দিসগণের মাঝে গভীর শাস্ত্রীয় বিশ্লেষণ পরিচালিত হয়েছে।
হাদীসদ্বয়ের প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ
প্রথম হাদীস: হযরত আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: হযরত হামযাহ ইবনে আমর আল-আসলামী (রা.) নবীজী (সা.)-কে বললেন: আমি কি সফরে রোযা রাখব? (তিনি প্রচুর নফল রোযা রাখতেন)। তখন নবীজী (সা.) বললেন: ‘তুমি ইচ্ছা করলে রোযা রাখতে পার, আর ইচ্ছা করলে রোযা ভাঙতেও পার।’ (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)।
দ্বিতীয় হাদীস: হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: ‘সফরে রমযানের রোযা পালনকারী ব্যক্তি মুকীম অবস্থায় রোযা ভঙ্গকারীর সমতুল্য।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৬৬৬)।
(الف) হাদীসদ্বয়ের মধ্যকার বাহ্যিক বৈপরীত্য ও শাস্ত্রীয় সমন্বয় (তাতবীক্ব)
প্রথম হাদীসে সফরে রোযা রাখা বা না রাখার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে, পক্ষান্তরে দ্বিতীয় হাদীসে সফরে রোযা রাখাকে চরমভাবে ভর্ৎসনা করা হয়েছে। মুহাদ্দিসগণ চমৎকারভাবে এই দুই হাদীসের সমাধান দিয়েছেন:
- অবস্থাভেদে প্রয়োগ: দ্বিতীয় হাদীসটি সেই ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যার জন্য সফরে রোযা রাখা চরম কষ্টদায়ক ও প্রাণসংশয়ী হয়ে দাঁড়ায়, কিংবা যে ব্যক্তি আল্লাহর দেওয়া রুখসত বা ছাড়কে অবজ্ঞা করে অহংকারবশত রোযা রাখে। অপর হাদীসে নবীজী স্পষ্ট বলেছেন: ‘সফরে চরম কৃচ্ছ্রসাধন করে রোযা রাখা কোনো নেক আমল নয়।’
- সুস্থ ও সামর্থ্যবানের ক্ষেত্রে প্রথম হাদীস: যে ব্যক্তি কোনো কষ্ট ছাড়াই সহজে রোযা রাখতে সক্ষম এবং আল্লাহর ছাড়কে অন্তরে স্বীকার করেও রমযানের রোযা দ্রুত আদায়ের উদ্দেশ্যে রোযা রাখে, তার ক্ষেত্রে প্রথম হাদীসের ইখতিয়ার প্রযোজ্য।
- সনদগত পর্যালোচনা: ইমাম বুখারী ও অন্যান্য ইমামগণের মতে হামযাহ (রা.)-এর প্রথম হাদীসটি মুত্তাফাক আলাইহ (সর্বোচ্চ সহীহ), পক্ষান্তরে ইবনে মাজাহ বর্ণিত আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রা.)-এর হাদীসের সনদে কিছু দুর্বলতা রয়েছে। সুতরাং মুত্তাফাক আলাইহ হাদীসটিই মূল ভিত্তি।
(ب) সফরে রোযা রাখা বনাম ভঙ্গ করার শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে ইমামগণের অভিমত
| মাযহাব / ইমামগণ | অভিমত | প্রধান দলীল ও যুক্তি |
|---|---|---|
| ইমাম আবু হানিফা, শাফেঈ ও মালেক (রহ.) | কষ্ট না হলে রোযা রাখাই উত্তম (الصوم أفضل) | সূরা বাকারার ১৮৪ আয়াত: ‘ওয়া আন তাসূমূ খাইরুল লাকুম’ (তোমাদের রোযা রাখাই শ্রেয়)। তাছাড়া রমযানের পবিত্র মাসে ফরয আদায় হয়ে যাওয়া অধিক নিরাপদ। |
| ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.) | সফরে রোযা ভাঙাই উত্তম (الفطر أفضل) | নবীজীর বাণী: ‘আল্লাহ তাঁর দেওয়া ছাড় বা সুযোগ গ্রহণ করাকে ভালোবাসেন, যেমন তিনি তাঁর অবাধ্যতা অপছন্দ করেন।’ (মুসনাদে আহমাদ)। |
| ইমাম উমর ইবনে আব্দুল আযীয (রহ.) | যা সহজতর তা-ই উত্তম | যার জন্য রোযা রাখা সহজ তার জন্য রোযা উত্তম, আর যার জন্য রোযা ভাঙা সহজ তার জন্য ভাঙাই উত্তম। |
উপসংহার
ইসলামের প্রতিটি বিধান মানব কল্যাণে প্রতিষ্ঠিত। সফরে রোযা রাখার শক্তি থাকলে আদায় করাই উত্তম, তবে শারীরিক দুর্বলতা বা ক্লান্তি দেখা দিলে রোযা ভাঙাই শরীয়াহসম্মত কর্তব্য।
৪। عن أبي هريرة رضي الله عنه قال خطبنا رسول الله صلى الله عليه وسلم فقال يا أيها الناس قد فرض الله عليكم الحج فحجوا – فقال رجل أكل عام يا رسول الله فسكت حتى قالها ثلاثا فقال لو قلت نعم لوجبت ولما استطعتم ثم قال ذروني ما تركتكم فإنما هلك من كان قبلكم بكثرة سؤالهم واختلافهم على أنبيائهم فإذا أمرتكم بشيء فأتوا منه ما استطعتم وإذا نهيتكم عن شيء فدعوه – (رواه مسلم)
[সহীহ মুসলিম : হজের ফরযিয়াত, প্রশ্নের শিষ্টাচার এবং হজ অবিলম্বে নাকি দেরিতে আদায়ের বিধান]
[মান: ১৪ (অনুবাদ ৬ + ক ৪ + খ ৪)]
ভূমিকা ও পটভূমি
হজ হলো ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম একটি সার্বজনীন ইবাদত যা জীবনে একবারই ফরয। রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবায়ে কেরামকে হজের আদেশ প্রদানকালে এক সাহাবীর প্রশ্নের প্রেক্ষিতে শরীয়াহর বিধানের সূক্ষ্ম ভারসাম্য ও অতিরিক্ত অনর্থক প্রশ্ন করার ভয়াবহ পরিণতি তুলে ধরেছেন।
হাদীসটির প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের মাঝে খুতবা দিয়ে বললেন: ‘হে মানবসকল! নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ওপর হজ ফরয করেছেন, অতএব তোমরা হজ আদায় কর।’ তখন এক ব্যক্তি (আক্বরা ইবনে হাবিস) বলল: হে আল্লাহর রাসূল! প্রতি বছরই কি? রাসূলুল্লাহ (সা.) নীরব থাকলেন, এমনকি লোকটি তিনবার একই প্রশ্ন করল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: ‘আমি যদি ‘হ্যাঁ’ বলতাম তবে তা প্রতি বছর ফরয হয়ে যেত, আর তোমরা তা পালন করতে সক্ষম হতে না।’ অতঃপর তিনি বললেন: ‘আমি যতক্ষণ তোমাদেরকে কোনো নির্দেশ ছাড়া ছেড়ে রাখি তোমরাও আমাকে ছেড়ে রাখ (অনর্থক প্রশ্ন করো না)। কেননা তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিসমূহ কেবল তাদের অতিরিক্ত প্রশ্নবাণ এবং নবীদের সাথে মতবিরোধের কারণেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। অতএব আমি যখন তোমাদেরকে কোনো কাজের নির্দেশ দিই তখন তোমরা সাধ্যমতো তা পালন কর, আর যখন কোনো কাজ থেকে নিষেধ করি তখন তা সম্পূর্ণ বর্জন কর।’ (সহীহ মুসলিম: ১৩৩৭)।
(الف) “لو قلت نعم لوجبت”-এর ব্যাখ্যা ও শারঈ তাৎপর্য
- নবীজীর ইজতিহাদ ও ঐশী কর্তৃত্ব: এই হাদীস প্রমাণ করে যে আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র জবানে শরীয়তের বিধান নির্ধারণের বিশেষ কর্তৃত্ব প্রদান করেছিলেন। নবীজী যদি সম্মতিসূচক জবাব দিতেন, তবে আল্লাহর নিকট তা ফরয হিসেবে পরিগণিত হতো।
- উম্মতের প্রতি নববীর রহমত: প্রতি বছর হজ ফরয হলে সাধারণ মুসলিমদের জন্য অর্থনৈতিক ও শারীরিকভাবে তা পালন করা অসম্ভব হয়ে যেত এবং উম্মাহ চরম গুনাহগার হতো। রাসূলুল্লাহ (সা.) নীরব থেকে উম্মতকে এক বিশাল ভার থেকে রক্ষা করেছেন।
- অপ্রয়োজনীয় জটিলতা সৃষ্টির পথ রুদ্ধ করা: বনি ইসরাঈল যেমন গাভী যবাইয়ের নির্দেশ পেয়ে অতিরিক্ত প্রশ্ন করে নিজেদের ওপর বিধান কঠিন করে নিয়েছিল, মুসলিম উম্মাহ যেন অযথা প্রশ্ন করে নিজেদের জীবন দুর্বিষহ না করে তোলে।
(ب) সামর্থ্যবান ব্যক্তির ওপর হজ কি তাৎক্ষণিক ফরয (على الفور) নাকি বিলম্বের অবকাশ রয়েছে (على التراخي)?
| মাযহাবের দৃষ্টিভঙ্গি | মূল বিধান | দলীল ও যুক্তি |
|---|---|---|
| ইমাম আবু হানিফা, মালেক ও আহমাদ (রহ.) | তাৎক্ষণিক ফরয (على الفور) — সামর্থ্য অর্জনের প্রথম বছরেই হজ আদায় করা ফরয। বিলম্ব করলে ফাসেক ও গুনাহগার হবে। | হাদীসে ইরশাদ হয়েছে: ‘যে ব্যক্তি হজের ইচ্ছা করে সে যেন দ্রুত আদায় করে নেয়; কেননা মানুষ অসুস্থ হতে পারে, বাহন হারিয়ে যেতে পারে এবং প্রয়োজন উপস্থিত হতে পারে।’ (আবু দাউদ ও আহমাদ)। |
| ইমাম শাফেঈ ও মুহাম্মদ (রহ.) | বিলম্বের অবকাশ রয়েছে (على التراخي) — তবে জীবনের যেকোনো অংশে মৃত্যুর পূর্বে অবশ্যই আদায় করে যেতে হবে। | হজ ৬ষ্ঠ হিজরিতে ফরয হলেও রাসূলুল্লাহ (সা.) কোনো ওজর ছাড়াই ১০ম হিজরিতে হজ পালন করেছিলেন। তবে বিনা কারণে অযথা দেরি করে মারা গেলে গুনাহগার হিসেবে মৃত্যুবরণ করবে। |
উপসংহার
হজ সামর্থ্যবানের ওপর জীবনে মাত্র একবার ফরয। জীবন ও সম্পদের অনিশ্চয়তার কথা বিবেচনা করে সামর্থ্য হওয়ার সাথে সাথেই বিলম্ব না করে এই পবিত্র ফরয আদায় করে নেওয়া প্রতিটি মুমিনের জন্য আবশ্যক।
৫। عن عبد الله بن عمر رضي الله عنه أن رجلا سأل رسول الله صلى الله عليه وسلم ما يلبس المحرم من الثياب فقال لا تلبسوا القميص ولا العمائم ولا السراويل ولا البرانس ولا الخفاف إلا أحد لا يجد نعلين فيلبس خفين وليقطعهما أسفل من الكعبين ولا تلبسوا من الثياب شيئا مسه زعفران ولا ورس – (متفق عليه)
[মুত্তাফাক আলাইহ : ইহরাম অবস্থার পোশাকের বিধিনিষেধ, হজের ফরযিয়াত এবং সুগন্ধি ব্যবহারের বিধান]
[মান: ১৪ (অনুবাদ ৬ + ক ৪ + খ ৪)]
ভূমিকা ও পটভূমি
ইহরাম হলো হজ ও ওমরার মূল প্রবেশদ্বার। ইহরাম গ্রহণের মাধ্যমে বান্দা পার্থিব আভিজাত্য, পদমর্যাদা ও অহংকার বিসর্জন দিয়ে মহান আল্লাহর দরবারে এক বিনম্র কাফনসদৃশ বেশভূষা ধারণ করে। এই হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) ইহরাম অবস্থায় পুরুষদের জন্য পোশাকের অলঙ্ঘনীয় বিধিনিষেধ ঘোষণা করেছেন।
হাদীসটির প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) হতে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করল: ইহরামকারী ব্যক্তি কী ধরনের পোশাক পরিধান করবে? রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: ‘তোমরা জামা, পাগড়ি, পায়জামা, টুপিযুক্ত চোগা (বারানিস) এবং মোজা পরিধান করবে না। তবে কোনো ব্যক্তি যদি জুতা না পায়, তবে সে যেন চামড়ার মোজা পরিধান করে এবং তা উভয় গোড়ালির নিচ থেকে কেটে ফেলে। আর কাপড়ের মধ্যে এমন কোনো কাপড় পরিধান করবে না যাতে জাফরান বা ওয়ারস (সুগন্ধিযুক্ত উদ্ভিদ) স্পর্শ করেছে।’ (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)।
(الف) হজের ফরযিয়াতের শর্তসমূহ এবং আদায়ের সময়সীমা
- ফরয হওয়ার শর্তসমূহ (শুরুতে ওজূব):
- ১. মুসলিম হওয়া।
- ২. বালেগ বা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া।
- ৩. সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন হওয়া।
- ৪. স্বাধীন হওয়া (ক্রীতদাস না হওয়া)।
- ৫. শারীরিক সামর্থ্য থাকা এবং পথের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া।
- ৬. আর্থিক সামর্থ্য (যাতায়াত খরচ এবং পরিবারের অনুপস্থিতকালীন ভরণপোষণের পর হজের ব্যয়ভার বহনে সক্ষম হওয়া)। নারীদের ক্ষেত্রে মাহরাম থাকা আবশ্যক।
- আদায়ের সময়সীমা (শুরুতে আদাহ): হজের মূল আমলসমূহ শাওয়াল, যিলকদ এবং যিলহজের প্রথম দশ দিন (আশহুরে হজ্জ)—বিশেষত ৮ থেকে ১২ই যিলহজের মধ্যে নির্দিষ্ট সময়ে সম্পন্ন করতে হয়।
(ب) ইহরামের পূর্বে ও ইহরাম অবস্থায় সুগন্ধি (তাতায়্যুব) ব্যবহারের বিধান
| অবস্থা | শারঈ বিধান | ইমামগণের দৃষ্টিভঙ্গি ও দলীল |
|---|---|---|
| ১. ইহরাম বাঁধার পূর্বে শরীরে সুগন্ধি লাগানো | সুন্নাত ও মুস্তাহাব | জমহুর উলামা ও ইমামগণের মতে এটি অত্যন্ত পছন্দনীয়। হযরত আয়েশা (রা.) বলেন: ‘আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে ইহরাম বাঁধার প্রাক্কালে এমনভাবে সুগন্ধি লাগিয়ে দিতাম যে তাঁর সিঁথিতে সুগন্ধির উজ্জ্বলতা চকচক করত।’ (সহীহ বুখারী)। |
| ২. ইহরাম বাঁধার পর সুগন্ধির অবশিষ্টাংশ বহাল থাকা | সম্পূর্ণ বৈধ | আয়েশা (রা.)-এর হাদীসের আলোকে ইহরাম অবস্থায় ইতিপূর্বে লাগানো সুগন্ধির ঘ্রাণ অবশিষ্ট থাকলেও কোনো ক্ষতি নেই। তবে নতুন করে সুগন্ধি লাগানো সম্পূর্ণ হারাম। |
| ৩. ইহরাম অবস্থায় সরাসরি কাপড়ে বা শরীরে সুগন্ধি ব্যবহার | হারাম ও নিষিদ্ধ | ইহরামের কাপড়ে বা শরীরে সুগন্ধি লাগালে দম (পশু কোরবানি) বা কাফফারা ওয়াজিব হবে। কারণ ইহরামকারীর জন্য ভোগ-বিলাসিতা ও সুগন্ধি বর্জন করা জরুরি। |
উপসংহার
ইহরামের বেশভূষা মানুষকে পরকালের কাফনের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। এই পবিত্র অবস্থায় শরীরের পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখেও কৃত্রিম সাজসজ্জা বর্জন করাই হজের প্রকৃত রুহ ও উদ্দেশ্য।
৬। عن ابن عمر رضي الله عنهما قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم المتبايعان كل واحد منهما بالخيار على صاحبه ما لم يتفرقا إلا بيع الخيار – (متفق عليه) وفي رواية لمسلم إذا تبايع المتبايعان فكل واحد منهما بالخيار من بيعه ما لم يتفرقا أو يكون بيعهما عن خيار فإذا كان بيعهما عن خيار فقد وجب وفي رواية للترمذي البيعان بالخيار ما لم يتفرقا أو يختارا وفي المتفق عليه أو يقول أحدهما لصاحبه اختر بدل أو يختارا –
[মুত্তাফাক আলাইহ : খিয়ারুল মজলিস ও খিয়ারুশ শর্তের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং ফকীহগণের মতপার্থক্য]
[মান: ১৪ (অনুবাদ ৬ + ক ৪ + খ ৪)]
ভূমিকা ও পটভূমি
ইসলাম অর্থনৈতিক লেনদেনে পারস্পরিক সন্তুষ্টি ও স্বচ্ছতাকে মৌলিক শর্ত হিসেবে নির্ধারণ করেছে। ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে উভয় পক্ষ যাতে কোনো প্রকার চাপ, তাড়াহুড়ো বা প্রতারণার শিকার না হয়, সেজন্য শরিয়ত ‘খিয়ার’ বা চুক্তি বাতিলের অধিকার প্রদান করেছে। এই হাদীসটি খিয়ারুল মজলিস সংক্রান্ত একটি মৌলিক সনদ।
হাদীসটির প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: ‘ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের প্রত্যেকেরই চুক্তি প্রত্যাহার বা বহাল রাখার অধিকার থাকবে যতক্ষণ না তারা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়; তবে শর্তযুক্ত চুক্তি (বায়উল খিয়ার) এর ব্যতিক্রম।’ সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে: ‘যখন দুই ব্যক্তি কেনাবেচা করে, তখন তাদের প্রত্যেকের জন্য চুক্তি বাতিলের অধিকার থাকবে যতক্ষণ না তারা পরস্পর পৃথক হয় কিংবা তাদের চুক্তিটি শর্তভিত্তিক হয়; অতএব যদি চুক্তিটি শর্তভিত্তিক হয় তবে কেনাবেচা চূড়ান্ত হয়ে যাবে।’ তিরমিযীর বর্ণনায় রয়েছে: ‘যতক্ষণ না তারা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয় কিংবা উভয়ই চুক্তি বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।’ (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)।
(الف) “ما لم يتفرقا”-এর তাফসীর এবং ফকীহগণের মতপার্থক্য
হাদীসের ‘যতক্ষণ না তারা পৃথক হয়’ বাক্যাংশে কী ধরনের পৃথকীকরণ বোঝানো হয়েছে—এ বিষয়ে প্রধান দুই মাযহাবের চমৎকার তাত্ত্বিক মতপার্থক্য রয়েছে:
- ১. ইমাম শাফেঈ ও ইমাম আহমাদ (রহ.)-এর অভিমত (শারীরিক বিচ্ছেদ):
- তাঁদের মতে ‘তাফাররুক্ব’ দ্বারা শারীরিক বা দৈহিক বিচ্ছিন্নতা (التفرق بالأبدان) বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ ক্রেতা ও বিক্রেতা মৌখিকভাবে ‘ইজাব ও কবুল’ সম্পন্ন করার পরও যতক্ষণ পর্যন্ত একই বৈঠকে বসে থাকবে, ততক্ষণ উভয়ের চুক্তি ভেঙে দেওয়ার পূর্ণ অধিকার বহাল থাকবে। একজন উঠে চলে গেলেই কেবল চুক্তি বাধ্যতামূলক হবে।
- দলীল: ইবনে উমর (রা.) নিজে যখন কোনো কেনাবেচা পাকা করতে চাইতেন, তখন চুক্তি শেষেই মজলিস থেকে কয়েক কদম হেঁটে গিয়ে আবার ফিরে আসতেন।
- ২. ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মালেক (রহ.)-এর অভিমত (মৌখিক কথার সমাপ্তি):
- হানাফী ও মালেকীদের মতে ‘তাফাররুক্ব’ দ্বারা কথার বিচ্ছিন্নতা বা চুক্তির নিষ্পত্তি (التفرق بالأقوال) বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ যখন বিক্রেতা প্রস্তাব দেয় এবং ক্রেতা তা গ্রহণ করে (ইজাব ও কবুল সম্পন্ন হয়), তখনই সাথে সাথে কেনাবেচা চূড়ান্ত ও বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। এরপর মজলিসে বসে থাকলেও একতরফাভাবে চুক্তি বাতিল করা জায়েজ নয়।
- যুক্তি: আল্লাহ কুরআনে বলেছেন: ‘হে মুমিনগণ! তোমরা চুক্তিসমূহ পূর্ণ কর’ (সূরা মায়েদাহ: ১)। চুক্তি হওয়ার পরও একতরফা বাতিলের সুযোগ রাখলে ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা ও ক্ষতি তৈরি হয়।
(ب) খিয়ারুশ শর্ত (خيار الشرط)-এর পরিচয়, বিধান ও মেয়াদকাল
- সংজ্ঞা: কেনাবেচার সময় ক্রেতা বা বিক্রেতা নিজের জন্য বা উভয়ের জন্য নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে পণ্যটি ভেবে দেখার বা চুক্তি বাতিলের যে শর্ত সংরক্ষণ করে, তাকে খিয়ারুশ শর্ত বলে।
- শারঈ বিধান: এটি সর্বসম্মতভাবে জায়েজ ও বৈধ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বিশিষ্ট সাহাবী হযরত হিব্বান ইবনে মুনযির (রা.)-কে বলেছিলেন: ‘যখন তুমি কেনাবেচা করবে তখন বলবে: কোনো প্রতারণা নেই এবং আমার জন্য তিন দিনের খিয়ারের অধিকার থাকবে।’ (সহীহ বুখারী)।
- মেয়াদকাল:
- ইমাম আবু হানিফা ও যুফার (রহ.): সর্বোচ্চ সীমা তিন দিন বা তার কম। তিন দিনের বেশি শর্তযুক্ত করলে চুক্তি ফাসিদ হয়ে যাবে।
- ইমাম আবু ইউসুফ, মুহাম্মদ ও শাফেঈ (রহ.): ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের সম্মতিক্রমে যেকোনো সুনির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য (যেমন এক সপ্তাহ বা এক মাস) খিয়ার রাখা জায়েজ। আধুনিক বাণিজ্যিক ওয়ারেন্টি ও গ্যারান্টির ক্ষেত্রে এই মতটি অধিক ফলপ্রসূ।
উপসংহার
ইসলামি বাণিজ্য আইনে খিয়ারের বিধান ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়কে অর্থনৈতিক ক্ষতি ও অনুশোচনা থেকে রক্ষা করে ব্যবসা-বাণিজ্যকে ইনসাফপূর্ণ করে তোলে।
৭। عن ابن مسعود رضي الله عنه قال كنا نغزو مع رسول الله صلى الله عليه وسلم ليس معنا نساء فقلنا ألا نختصي فنهانا عن ذلك، ثم رخص لنا أن نستمتع فكان أحدنا ينكح المرأة بالثوب إلى أجل ثم قرأ عبد الله يا أيها الذين آمنوا لا تحرموا طيبات ما أحل الله لكم – (متفق عليه)
[মুত্তাফাক আলাইহ : মুত’আ বিবাহের ইতিহাস ও চূড়ান্ত নিষেধাজ্ঞা এবং জন্মনিয়ন্ত্রণের বিধান]
[মান: ১৪ (অনুবাদ ৬ + ক ৪ + খ ৪)]
ভূমিকা ও পটভূমি
ইসলাম একটি নিষ্কলুষ ও চিরন্তন পরিবার ব্যবস্থার প্রবক্তা। ইসলাম-পূর্ব জাহেলী সমাজে সাময়িক ভোগলিপ্সার জন্য ‘নিকাহে মুতআ’ বা চুক্তিভিত্তিক সাময়িক বিবাহের প্রচলন ছিল। শরিয়তের প্রাথমিক যুগে বিশেষ যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে চরম সংকটে এর সাময়িক অনুমতি দেওয়া হলেও পরবর্তীতে তা চিরতরে হারাম ঘোষণা করা হয়।
হাদীসটির প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতাম এবং আমাদের সাথে কোনো নারী থাকত না। ফলে আমরা বললাম: আমরা কি খাসি বা খোজা হয়ে যাব না? নবীজী (সা.) আমাদেরকে তা করতে কঠোরভাবে নিষেধ করলেন। অতঃপর তিনি আমাদেরকে কাপড়ের বিনিময়ে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য নারী সম্ভোগ করার (নিকাহে মুতআ করার) সাময়িক অনুমতি প্রদান করলেন। এরপর হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) এই আয়াত তেলাওয়াত করলেন: ‘হে মুমিনগণ! আল্লাহ তোমাদের জন্য যা হালাল ও পবিত্র করেছেন তা তোমরা নিজেদের জন্য হারাম করো না।’ (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)।
(الف) মুতআ বিবাহ বিষয়ে এই হাদীস এবং উম্মাহর সর্বসম্মত ঐকমত্যের (ইজমা) জবাব
এই হাদীস বাহ্যিকভাবে মুতআ বিবাহের বৈধতা নির্দেশ করলেও উম্মাহর সর্বসম্মত ইজমা হলো এটি সম্পূর্ণ হারাম ও চিরতরে নিষিদ্ধ। এর পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ হলো:
- নাসিখ ও মানসূখ (রহিতকরণ): ইসলামে মদ যেমন ধাপে ধাপে নিষিদ্ধ হয়েছিল, মুতআ বিবাহও তেমনি ইসলামের প্রারম্ভে কেবল চরম যুদ্ধকালীন উত্তেজনায় ব্যভিচার থেকে রক্ষার জন্য সাময়িক ছাড় ছিল। পরবর্তীতে রাসূলুল্লাহ (সা.) তা চিরতরে হারাম করে দেন।
- খায়বার ও মক্কা বিজয়ের অকাট্য হাদীস: হযরত আলী (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) খায়বার যুদ্ধের দিন নিকাহে মুতআ এবং গৃহপালিত গাধার গোশত খাওয়া চিরতরে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন।’ (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)। অপর সহীহ বর্ণনায় সাবুরা আল-জুহানী (রা.) বলেন, মক্কা বিজয়ের বছর বিদায় হজের প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেন: ‘হে লোকসকল! আমি তোমাদেরকে নারীদের সাথে মুতআ করার অনুমতি দিয়েছিলাম; জেনে রেখো, কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা তা চিরতরে হারাম ঘোষণা করেছেন।’ (সহীহ মুসলিম: ১৪০৬)।
- উম্মাহর সর্বসম্মত ইজমা: সাহাবা, তাবেঈন ও চার মাযহাবের সকল ইমাম একমত যে মুতআ বিবাহ হারাম এবং তা জিনার সমতুল্য। ইবনে মাসউদ (রা.)-এর রেওয়ায়েতটি ছিল প্রাথমিক যুগের এবং তা পরবর্তীতে রহিত হয়ে গেছে।
(ব) ‘খিসা’ (الخصى)-এর অর্থ এবং আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ (ضبط التوليد)-এর শারঈ বিধান
- ‘খিসা’ (الخصى)-এর পরিচয় ও বিধান: খিসা অর্থ হলো অণ্ডকোষ কেটে ফেলা বা নপুংসক করা। মানুষের প্রজনন ক্ষমতা স্থায়ীভাবে ধ্বংস করে খাসি বা খোজা হওয়া ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম ও কবিরা গুনাহ। কারণ এটি আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে বিকৃতি ঘটানো (তাগয়ীরু খালক্বিল্লাহ)।
- আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণের শারঈ বিধান:
- ১. স্থায়ী বন্ধ্যাকরণ (Vasectomy / Tubectomy): কোনো ওজর ছাড়া স্থায়ীভাবে সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা ধ্বংস করে দেওয়া খিসা করার সমতুল্য এবং সম্পূর্ণ হারাম ও নাজায়েজ।
- ২. সামাজিক চাপ বা রিযিকের ভয়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ: দারিদ্র্যের ভয়ে বা জনসংখ্যার ভীতির অজুহাতে জন্মনিয়ন্ত্রণ করা হারাম (সূরা বনি ইসরাঈল: ৩১—‘তোমরা দারিদ্র্যের ভয়ে সন্তানদের হত্যা করো না’)।
- ৩. স্বাস্থ্যগত ওজর বা সন্তানদের সুস্থ লালন-পালনের স্বার্থে সাময়িক বিরতি: মায়ের চরম স্বাস্থ্যহানি, রোগব্যাধি কিংবা পূর্ববর্তী শিশুর দুধপান ও লালন-পালনের সুবিধার্থে সাময়িক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি (যেমন আযল, বড়ি, কনডম ইত্যাদি) গ্রহণ করা সর্বসম্মত ফতোয়া অনুযায়ী জায়েজ। সাহাবী জাবের (রা.) বলেন: ‘কুরআন নাজিল হওয়ার যুগে আমরা আযল (সাময়িক বীর্যপাত বাইরে ফেলা) করতাম এবং নবীজী তা জানতে পেরেও নিষেধ করেননি।’ (সহীহ বুখারী)।
উপসংহার
নিকাহে মুতআ বাতিল করে ইসলাম দাম্পত্য সম্পর্ককে আজীবন স্থায়িত্ব ও পবিত্রতার বন্ধনে আবদ্ধ করেছে এবং সন্তান লালন-পালনের ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত ভারসাম্য বজায় রাখার অনুমতি দিয়েছে।
৮। عن عائشة رضي الله عنها أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال أيما امرأة نكحت نفسها بغير إذن وليها فنكاحها باطل فنكاحها باطل فنكاحها باطل فإن دخل بها فلها المهر بما استحل من فرجها فإن اشتجروا فالسلطان ولي من لا ولي له – (رواه الترمذي)
[জামে তিরমিযী : অভিভাবকহীন বিবাহের শারঈ বিধান, মাযহাবগত বিতর্ক এবং সুলতানের অভিভাবকত্ব]
[মান: ১৪ (অনুবাদ ৬ + ক ৪ + খ ৪)]
ভূমিকা ও পটভূমি
বিবাহ একটি সামাজিক, পারিবারিক ও ধর্মীয় পবিত্র বন্ধন। নারীর মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং পারিবারিক বংশমর্যাদা রক্ষার স্বার্থে শরিয়তে অভিভাবকের (ওয়ালীর) ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ বিবেকসম্পন্ন নারী অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া নিজে নিজে বিবাহ করতে পারে কি না—এ বিষয়ে ফকীহগণের মধ্যে এক ঐতিহাসিক শাস্ত্রীয় গবেষণা রয়েছে।
হাদীসটির প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত, নিশ্চয়ই রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: ‘যে কোনো নারী তার অভিভাবকের অনুমতি ব্যতীত বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হবে, তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল! অতঃপর যদি পুরুষ তার সাথে সঙ্গম করে থাকে, তবে নারী মোহরানা পাওয়ার অধিকারী হবে—যেহেতু পুরুষ তার লজ্জাস্থানকে হালাল করেছে। আর যদি তাদের অভিভাবকত্ব নিয়ে বিরোধ বা সংকট তৈরি হয়, তবে শাসক বা বিচারক (সুলতান) হবে তার অভিভাবক—যার কোনো অভিভাবক নেই।’ (জামে তিরমিযী: ১১০২, আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ)।
(الف) অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া নারীর বিবাহের বিধান: ইমামগণের পর্যালোচনা
এই বিষয়ে ইসলামি আইনশাস্ত্রে দুটি প্রধান দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান:
| মাযহাব / ইমামগণ | বিধানের প্রকৃতি | প্রধান দলীল ও যুক্তি |
|---|---|---|
| ১. জমহুর ফকীহ (ইমাম শাফেঈ, মালেক ও আহমাদ রহ.) | অভিভাবক ছাড়া বিবাহ সম্পূর্ণ বাতিল ও অবৈধ (لا نكاح إلا بولي) |
|
| ২. ইমাম আবু হানিফা ও আবু ইউসুফ (রহ.) | প্রাপ্তবয়স্ক বিবেকসম্পন্ন নারী অভিভাবক ছাড়া বিবাহ করলে বিবাহ সহীহ ও কার্যকর হবে |
|
(ب) “فإن اشتجروا فالسلطان ولي من لا ولي له”-এর তাৎপর্য
- ‘ইশতাজারূ’ (اشتجروا)-এর অর্থ: বিরোধে লিপ্ত হওয়া, মতানৈক্য সৃষ্টি হওয়া কিংবা জোরপূর্বক বাধা দেওয়া। অভিভাবক যদি ব্যক্তিগত জিদ বা অহংকারবশত কোনো ন্যায়সঙ্গত ও উপযুক্ত পাত্রের সাথে মেয়ের বিয়েতে অযথা বাধা সৃষ্টি করে (যাকে শরিয়তে ‘আযল’ বলা হয়), কিংবা মেয়ের কোনো বংশীয় অভিভাবকই জীবিত না থাকে।
- সুলতানের ভূমিকা: এ অবস্থায় ইসলামি রাষ্ট্রের শাসক, কাজী বা মনোনীত আদালত সেই মেয়ের অভিভাবক হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করবে এবং বিয়ে সম্পন্ন করবে।
- শারঈ প্রজ্ঞা: ইসলাম কোনো নারীকে অভিভাবকের অন্যায় স্বেচ্ছাচারিতার শিকার হতে দেয় না। অভিভাবক জুলুম করলে আদালত হস্তক্ষেপ করে মজলুম নারীর বিয়ের ব্যবস্থা করবে।
উপসংহার
ইসলাম নারীর ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং পারিবারিক সম্মান—উভয়ের চমৎকার মেলবন্ধন ঘটিয়েছে। সামাজিকভাবে অভিভাবকের মাধ্যমে বিবাহ হওয়াই পরম শালীনতা ও সর্বোত্তম সুন্নাত।
৯। عرف التدليس مع ذكر حكمه – هل تقبل رواية المدلس؟ بين بالاختلاف –
[মুসতালাহুল হাদীস : তাদলীসের স্বরূপ, প্রকারভেদ, শারঈ হুকুম এবং মুদাল্লিসের হাদীস গ্রহণযোগ্যতার শর্তাবলি]
[মান: ১০]
ভূমিকা ও পটভূমি
হাদীস সংরক্ষণে সনদের বিশুদ্ধতা রক্ষা করা মুহাদ্দিসগণের সর্বপ্রধান মূলনীতি। সনদের ধারাবাহিকতা লুকানো বা কোনো ত্রুটিকে কৃত্রিমভাবে সৌন্দর্যমণ্ডিত করার নাম ‘তাদলীস’। উলূমুল হাদীসে তাদলীস সংক্রান্ত জ্ঞান অর্জন ছাড়া কোনো রাবীর হাদীসের সঠিক মান নিরূপণ করা অসম্ভব।
التدليس-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা
- আভিধানিক অর্থ: ‘তাদলীস’ (التدليس) শব্দটি মূলত আরবি ‘দাল্লাস’ বা ‘দুলাসাহ’ (الدلسة) থেকে নিষ্পন্ন, যার অর্থ হলো অন্ধকারের সাথে আলোর সংমিশ্রণ ঘটানো, কোনো ত্রুটি গোপন করে বিক্রেতার ক্রেতাকে ধোঁকা দেওয়া।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: উলূমুল হাদীসের পরিভাষায়:
«هو إخفاء عيب في الإسناد وتحسين لظاهره.»
অর্থাৎ, ‘সনদের ভেতরের কোনো লুকায়িত ত্রুটিকে গোপন করে তার বাহ্যিক রূপকে সুন্দর ও ত্রুটিমুক্ত করে উপস্থাপন করাকে তাদলীস বলে।’
তাদলীসের প্রধান প্রকারভেদ
- ১. তাদলীসুল ইসনাদ (تدليس الإسناد): রাবী তাঁর সমকালীন এমন কোনো শায়খের কাছ থেকে হাদীস বর্ণনা করেন যার সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছে, কিন্তু তিনি এই নির্দিষ্ট হাদীসটি তাঁর কাছ থেকে সরাসরি শোনেননি; বরং মধ্যবর্তী দুর্বল রাবীকে বাদ দিয়ে ‘আন’ (عن) বা ‘ক্বালা’ (قال) শব্দ ব্যবহার করে এমনভাবে বর্ণনা করেন যেন তিনি নিজেই সরাসরি শুনেছেন।
- ২. তাদলীসুশ শুয়ূখ (تدليس الشيوخ): রাবী তাঁর শায়খের আসল নাম গোপন করে এমন কোনো অপরিচিত নাম, উপনাম, বংশমর্যাদা বা উপাধি দিয়ে উল্লেখ করেন যাতে সাধারণ মানুষ শায়খের আসল পরিচয় ও দুর্বলতা বুঝতে না পারে।
- ৩. তাদলীসুত তাসভিয়াহ (تدليس التسوية): অত্যন্ত মারাত্মক প্রকার—যেখানে মূল রাবী তাঁর শায়খ ও শায়খের শায়খের মধ্যবর্তী কোনো দুর্বল রাবীকে বাদ দিয়ে কেবল দুই বিশ্বস্ত রাবীর নাম রেখে সনদকে পুরোপুরি সহীহ বানিয়ে দেয়।
তাদলীসের শারঈ হুকুম ও মুদাল্লিসের বর্ণনা কি গ্রহণযোগ্য?
তাদলীস করা মুহাদ্দিসীনদের নিকট অত্যন্ত মাকরূহ ও নিন্দনীয় কাজ। ইমাম শু’বা ইবনুল হাজ্জাজ (রহ.) কঠোর ভাষায় বলতেন: ‘তাদলীস করা যেন ব্যভিচার করার চেয়েও জঘন্য।’ তবে মুদাল্লিস রাবীর হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রে ইমামগণের গবেষণাভিত্তিক মতামত নিম্নরূপ:
- জমহুর মুহাদ্দিসীনের রাজেহ ফয়সালা:
- যদি কোনো বিশ্বস্ত (সিক্বাহ) রাবী কদাচিৎ তাদলীসকারী হিসেবে পরিচিত হন, তবে তিনি যখন স্পষ্টভাবে সরাসরি শোনার শব্দ যেমন: ‘সামি’তু’ (سمعتُ – আমি শুনেছি), ‘হাদ্দাসানী’ (حدثني) বা ‘আখবারানী’ (أخبرني) ব্যবহার করে বর্ণনা করবেন—তখন তাঁর হাদীস সর্বসম্মতভাবে গ্রহণযোগ্য ও সহীহ।
- কিন্তু তিনি যখন সংশয়যুক্ত শব্দ যেমন: ‘আন’ (عن – অমুক হতে) বা ‘ক্বালা’ (قال) ব্যবহার করবেন, তখন তাঁর সেই বর্ণনা অগ্রহণযোগ্য ও স্থগিত (তাওয়াক্কুফ) থাকবে যতক্ষণ না অন্য সনদে তা সরাসরি শোনার প্রমাণ মিলে।
- ইমামগণের স্তরবিন্যাস: হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) মুদাল্লিস রাবীদের পাঁচটি স্তরে ভাগ করেছেন। প্রথম ও দ্বিতীয় স্তরের রাবীদের (যেমন হাসান বসরী বা সুফিয়ান সাওরী রহ.) বর্ণনা সাধারণত গ্রহণযোগ্য।
উপসংহার
তাদলীসের এই সূক্ষ্ম যাচাই-বাছাই প্রমাণ করে যে মুসলিম উম্মাহ আল্লাহর রাসূলের হাদীস সংরক্ষণে ইতিহাসের সর্বাধিক নিখুঁত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করেছিল।
১০। عرف الحديث الصحيح مع بيان أقسامه وشروطه –
[সহীহ হাদীসের প্রামাণ্য সংজ্ঞা, পঞ্চশর্ত এবং সহীহ লিযাতিহী ও সহীহ লিগায়রিহীর তুলনামূলক বিশ্লেষণ]
[মান: ১০]
ভূমিকা ও পটভূমি
শরিয়তের দ্বিতীয় অলঙ্ঘনীয় উৎস হলো সহীহ হাদীস। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র মুখনিঃসৃত বাণীর বিশুদ্ধতা নিরূপণে মুহাদ্দিসীন কেরাম হাদীস যাচাইয়ের যে অতুলনীয় নীতিমালা প্রণয়ন করেছেন, তার শীর্ষস্থান দখল করে আছে ‘হাদীসে সহীহ’। এটি এমন এক সুদৃঢ় ভিত্তি যার ওপর সমগ্র ইসলামি শরিয়তের হালাল ও হারামের অকাট্য বিধিবিধান প্রতিষ্ঠিত।
الحديث الصحيح-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা
- আভিধানিক অর্থ: ‘সহীহ’ (الصحيح) শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো রোগমুক্ত, সুস্থ, নিখুঁত, বিশুদ্ধ ও ত্রুটিহীন বস্তু। অসুস্থের বিপরীতে সুস্থকে সহীহ বলা হয়।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: ইমাম ইবনুস সালাহ (রহ.) স্বীয় মুকাদ্দিমায় এবং আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.) চমৎকারভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন:
«هو الحديث المسند الذي يتصل إسناده بنقل العدل الضابط عن مثله إلى منتهاه من غير شذوذ ولا علة.»
অর্থাৎ, ‘সহীহ হাদীস হলো এমন মুসনাদ হাদীস, যার সনদ প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত অবিচ্ছিন্ন সূত্রে একজন ন্যায়পরায়ণ ও পূর্ণ স্মৃতিশক্তিসম্পন্ন রাবী কর্তৃক তাঁরই মতো অপর বিশ্বস্ত রাবীর মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে এবং তা যাবতীয় শায (অন্য প্রামাণ্য হাদীসের সাথে সংঘাত) ও ক্ষতিকর সূক্ষ্ম ত্রুটি (ইল্লাত) থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।’
সহীহ হাদীসের পঞ্চশর্ত (شروط الحديث الصحيح)
কোনো হাদীস ‘সহীহ’ হওয়ার জন্য সর্বসম্মতভাবে পাঁচটি মৌলিক শর্ত একসাথে পূরণ হওয়া আবশ্যক:
- ১. সনদের অবিচ্ছিন্নতা (اتصال السند): সনদের প্রথম রাবী থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি রাবী তাঁর ঊর্ধ্বমুখী প্রত্যক্ষ শায়খের কাছ থেকে সরাসরি হাদীসটি শুনেছেন বলে প্রমাণিত হতে হবে। সনদের কোথাও কোনো বিচ্ছিন্নতা (ইনক্বিতা) থাকা চলবে না।
- ২. রাবীর ন্যায়পরায়ণতা (عدالة الرواة): সনদের প্রতিটি রাবীকে প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম, সুস্থ বিবেকবান, খোদাভীরু (তাকওয়াবান), ফাসেকী কর্মকাণ্ড থেকে মুক্ত এবং মানবিক আত্মমর্যাদা ও শালীনতার (মুরূয়াত) অধিকারী হতে হবে।
- ৩. রাবীর পূর্ণ স্মৃতিশক্তি ও ধারণক্ষমতা (ضبط الرواة): রাবীর মুখস্থ শক্তি বা লিখিত পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণের ক্ষমতা এত নিখুঁত ও মজবুত হতে হবে যে তিনি যা শুনেছেন তা অবিকল স্মৃতিতে ধারণ করে প্রকাশ করতে পূর্ণ সক্ষম।
- ৪. বৈপরীত্য বা অসঙ্গতিহীন হওয়া (عدم الشذوذ): কোনো সিক্বাহ (নির্ভরযোগ্য) রাবীর এই বর্ণনা যেন তাঁর চেয়ে অধিকতর গ্রহণযোগ্য কোনো বড় জামাআতের নির্ভরযোগ্য রাবীর বিপরীত না হয়।
- ৫. গোপন সূক্ষ্ম ত্রুটিমুক্ত হওয়া (عدم العلة القادحة): হাদীসটি বাহ্যিকভাবে সহীহ দেখালেও তার ভেতরে এমন কোনো গোপন মারাত্মক ত্রুটি (ইল্লাত) থাকা যাবে না যা কেবল শীর্ষস্থানীয় মুহাদ্দিসগণ সনদের গভীরে প্রবেশ করে উদ্ঘাটন করতে পারেন।
সহীহ হাদীসের প্রধান প্রকারভেদ (أقسام الحديث الصحيح)
- ১. সহীহ লি-যাতিহী (صحيح لذاته): যে হাদীসে উপরোক্ত পাঁচটি শর্তই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজস্ব সনদের মাধ্যমেই শতভাগ নিখুঁতভাবে পূর্ণ হয়েছে। এর জন্য কোনো বিকল্প সহায়ক সনদের মুখাপেক্ষী হতে হয় না। যেমন: ইমাম বুখারী ও মুসলিমের অধিকাংশ হাদীস।
- ২. সহীহ লি-গাইরিহী (صحيح لغيره): মূলত হাদীসটি ছিল ‘হাসান লি-যাতিহী’ (অর্থাৎ রাবীর স্মৃতিশক্তি বা যাবতের ক্ষেত্রে সামান্যতম ঘাটতি ছিল); কিন্তু পরবর্তীতে এক বা একাধিক সমমানের ভিন্ন সনদে বর্ণিত হয়ে তা শক্তিশালী রূপ ধারণ করে সহীহের মানে উন্নীত হয়েছে।
উপসংহার
সহীহ হাদীসের ওপর আমল করা এবং তার ভিত্তিতে আকিদা ও শরিয়তের মাসায়েল নির্ধারণ করা সমগ্র মুসলিম উম্মাহর ওপর সর্বসম্মতভাবে ওয়াজিব।
১১। اكتب مراتب رواة الحديث ثم بين أسماء المكثرين مع بيان عدد روايتهم –
[মুহাদ্দিসীনদের জারহ-তা’দীলের স্তরবিন্যাস এবং সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী শীর্ষ সাহাবীদের পরিচিতি]
[মান: ১০]
ভূমিকা ও পটভূমি
হাদীসের রাবীদের যোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করার জন্য মুহাদ্দিসীন কেরাম ‘ইলমুল জারহ ওয়াত তা’দীল’ নামক এক অনন্য শাস্ত্র উদ্ভাবন করেছেন। রাবীদের স্মৃতিশক্তি, সততা ও বিশ্বস্ততার ওপর ভিত্তি করে তাদের বিভিন্ন মর্যাদাক্রমে বিন্যস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি যে সকল মহান সাহাবী নবীজী (সা.)-এর কাছ থেকে সর্বাধিক হাদীস বর্ণনা করে উম্মাহর কাছে পৌঁছে দিয়েছেন, তাঁদেরকে ‘আল-মুকছিরূন’ বলা হয়।
হাদীসের রাবীদের মর্যাদার স্তরসমূহ (مراتب رواة الحديث)
ইমাম ইবনে আবী হাতিম এবং হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.)-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী রাবীদের গুণাবলী ও তা’দীলের প্রধান স্তরসমূহ নিম্নরূপ:
- ১. সর্বোচ্চ স্তর (মারাতাবু তা’দীল আল-উলয়া): যে রাবীর ব্যাপারে তাগিদমূলক শব্দাবলি পুনরাবৃত্তি করা হয়। যেমন: ‘সিক্বাতুন সিক্বাহ’ (ثقة ثقة – চরম বিশ্বস্ত), ‘আওসাকুন নাস’ (সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মানুষ)।
- ২. দ্বিতীয় স্তর: একক দৃঢ় প্রশংসাসূচক শব্দ। যেমন: ‘সিক্বাহ’ (ثقة), ‘মুতক্বিন’ (متفن – সুদক্ষ), ‘হুজ্জাহ’ (حجة – প্রমাণস্বরূপ)।
- ৩. তৃতীয় স্তর: কিছুটা সাধারণ গ্রহণযোগ্যতা। যেমন: ‘সাদূক্ব’ (صدوق – সত্যবাদী), ‘লা বা’সা বিহী’ (কোনো সমস্যা নেই)।
- ৪. চতুর্থ স্তর (মাকবূল): যার সত্যবাদিতা আছে কিন্তু স্মৃতিশক্তি কিছুটা দুর্বল; একক সনদে গ্রহণযোগ্য নয়, মুতাবাআত পেলে হাসান হয়।
- ৫. পঞ্চম ও ষষ্ঠ স্তর (জারহ ও অগ্রহণযোগ্য): ‘দঈফ’ (দুর্বল), ‘মাতরূক’ (পরিত্যক্ত), ‘কাযযাব’ বা ‘ওয়াদ্বা’ (মিথ্যাবাদী ও হাদীস জালকারী)।
সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীগণ (المكثرون في الرواية)
যে সকল সাহাবী এক হাজারেরও বেশি হাদীস বর্ণনা করেছেন তাঁদেরকে ‘মুকছিরূন’ বলা হয়। আল্লামা সুয়ূতী (রহ.) তাঁর আলফিয়্যাহতে এই সাতজন শীর্ষ সাহাবীর তালিকা সংকলন করেছেন:
| ক্রম | সাহাবীর নাম | ওফাত সন | বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা | সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|---|---|
| ১ | হযরত আবু হুরায়রা (রা.) | ৫৯ হিজরি | ৫,৩৭৪ টি | আসহাবে সুফফার শীর্ষ সাহাবী; নবীজীর বিশেষ দোয়ার বরকতে তিনি যা শুনতেন তা কখনো ভুলতেন না। |
| ২ | হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) | ৭৩ হিজরি | ২,৬৩০ টি | আমিরুল মুমিনীন উমর (রা.)-এর সুযোগ্য পুত্র; নবীজীর প্রতিটি সুন্নাহর হুবহু অনুসরণে অতুলনীয় ছিলেন। |
| ৩ | হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) | ৯৩ হিজরি | ২,২৮৬ টি | খাদেমুর রাসূল; একটানা দশ বছর নবীজীর সার্বক্ষণিক খেদমতে নিয়োজিত থেকে ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক দৃশ্যপট প্রত্যক্ষ করেছেন। |
| ৪ | উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) | ৫৮ হিজরি | ২,২১০ টি | নবীজীর প্রাণপ্রিয় বিদুষী সহধর্মিণী; পারিবারিক, দাম্পত্য ও নারীদের মাসায়েল এবং ফিকহের সর্বোচ্চ শিক্ষক। |
| ৫ | হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) | ৬৮ হিজরি | ১,৬৬০ টি | রইসুল মুফাসসিরীন ও হিবরুল উম্মাহ; নবীজী তাঁর জন্য দ্বীনের গভীর প্রজ্ঞা লাভের বিশেষ দোয়া করেছিলেন। |
| ৬ | হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) | ৭৪ হিজরি | ১,৫৪০ টি | আনসারদের বিশিষ্ট সাহাবী; মদিনা মুনাওয়ারার মসজিদে নববীতে তাঁর নিয়মিত ইলমী হালাকা অনুষ্ঠিত হতো। |
| ৭ | হযরত আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা.) | ৭৪ হিজরি | ১,১৭০ টি | মদিনার তরুণ প্রজ্ঞাবান সাহাবী; বহু যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ও ফতোয়া প্রদানকারী শীর্ষ আলেম। |
উপসংহার
এই মহান সাহাবীবৃন্দ নিজেদের পার্থিব আরাম-আয়েশ বিসর্জন দিয়ে নবীজীর প্রতিটি বাণী ও কর্মকে নিখুঁতভাবে সংরক্ষণ করে উম্মাহর জন্য চিরন্তন আলোকবর্তিকা রেখে গেছেন।
১২। عرف السند والمتن ثم تحدث عن أهمية الإسناد في الحديث النبوي –
[সনদ ও মতনের পারিভাষিক স্বরূপ এবং ইসলামি শরিয়তে সনদের অপরিহার্য ঐতিহাসিক গুরুত্ব]
[মান: ১০]
ভূমিকা ও পটভূমি
ইসলাম ধর্মের একটি অদ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হলো এর ঐতিহাসিক প্রামাণিকতা। পৃথিবীর কোনো ধর্মে তাদের ধর্মীয় বাণী বা ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য ‘সনদ’ বা বর্ণনাকারী পরম্পরার কোনো বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থা ছিল না। সনদের কারণেই আজ চৌদ্দশত বছর পরও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতিটি কথার শতভাগ প্রামাণ্য রূপ সংরক্ষিত রয়েছে।
السند এবং المتن-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক পরিচয়
- ১. আস-সনদ (السند):
- আভিধানিক অর্থ: ‘সনদ’ শব্দের অর্থ হলো অবলম্বন, হেলান দেওয়ার বস্তু বা যার ওপর নির্ভর করা হয় (ما يستند إليه)। পাহাড়ে ওঠার সুদৃঢ় পথকেও আরবীতে সনদ বলা হয়।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষায়:
«هو سلسلة الرجال الموصلة إلى المتن.»
অর্থাৎ, ‘যে বর্ণনাকারী ব্যক্তিবর্গের পরম্পরাগত ধারাবাহিক সূত্রটি হাদীসের মূল পাঠ (মতন) পর্যন্ত পৌঁছে দেয়, তাকে সনদ বলে।’ একে ‘তারীক্ব’ (طريق) বা ‘ওয়াজহ’ (وجه)-ও বলা হয়।
- ২. আল-মতন (المتن):
- আভিধানিক অর্থ: শক্ত ও উঁচুজমি, পিঠ বা দেহের মূল কাঠামো।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: মুহাদ্দিসদের পরিভাষায়:
«هو ما ينتهي إليه الإسناد من الكلام.»
অর্থাৎ, ‘সনদের পরম্পরা যেখানে গিয়ে সমাপ্ত হয় এবং মূল যে বক্তব্য, কাজ বা বিবরণের অংশটি শুরু হয়, তাকে মতন বা হাদীসের মূল পাঠ বলে।’
হাদীসশাস্ত্রে সনদের অপরিসীম গুরুত্ব (أهمية الإسناد في الحديث النبوي)
- ১. সনদ হলো দ্বীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ: প্রখ্যাত তাবেঈ ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহ.) তাঁর ঐতিহাসিক অমর উক্তিতে ঘোষণা করেছেন:
«الْإِسْنَادُ مِنَ الدِّينِ، وَلَوْلَا الْإِسْنَادُ لَقَالَ مَنْ شَاءَ مَا شَاءَ»
অর্থাৎ, ‘সনদ হলো দ্বীনেরই অংশ; যদি সনদের ব্যবস্থা না থাকত, তবে যার যা ইচ্ছা সে তা-ই ধর্মের নামে বলে বেড়াত।’ (সহীহ মুসলিমের মুকাদ্দিমাহ)।
- ২. সত্য-মিথ্যা ও জাল হাদীস শনাক্তকরণ: উমাইয়া ও আব্বাসীয় যুগে যখন শিয়া, খারেজী ও বাতিল রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের হীন স্বার্থে কোটি কোটি বানোয়াট হাদীস তৈরির চেষ্টা করেছিল, তখন মুহাদ্দিসগণ সনদের মাধ্যমে জাল হাদীস রচয়িতাদের চিহ্নিত করে উম্মাহর ঈমান রক্ষা করেছেন।
- ৩. সহীহ ও যঈফের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ: সনদের ধারাবাহিকতা যাচাইয়ের মাধ্যমেই কেবল জানা যায় কোন হাদীসটি সহীহ, কোনটি হাসান আর কোনটি দুর্বল বা বাতিল।
- ৪. উম্মতে মুহাম্মাদীর অনন্য বৈশিষ্ট্য: ইমাম ইবনে হাযম (রহ.) লিখেছেন: সনদ হলো এমন এক ঐশী মুজিযা ও নিয়ামত যা মহান আল্লাহ কেবল উম্মতে মুহাম্মাদীকে দান করেছেন; ইয়াহুদি, খ্রিস্টান বা কোনো পূর্ববর্তী ধর্মের কাছে এমন সনদ পরম্পরা নেই।
উপসংহার
সনদ হলো ইসলামি শরিয়তের প্রবেশদ্বার। সনদের যথাযথ মূল্যায়ন ব্যতীত দ্বীনের বিশুদ্ধতা ও রাসূল (সা.)-এর পবিত্র সুন্নাহর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব।
১৩। عرف الحديث ثم بين أقسام الحديث المرفوع ممثلا –
[হাদীসের সংজ্ঞা এবং হাদীসে মারফূ’-এর কওলী, ফে’লী, তাকরীরী ও ওয়াসফী প্রকারভেদের প্রামাণ্য বিশ্লেষণ]
[মান: ৫]
ভূমিকা ও পটভূমি
ইসলামি শরিয়তে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতিটি দিকনির্দেশনা ও জীবনচরিত হলো ওহীয়ে গায়ের মাতলুর উজ্জ্বল প্রকাশ। এই ঐশী বাণীর মূল আধারকে ‘হাদীস’ বলা হয় এবং এর উৎস সরাসরি বিশ্বনবী (সা.)-এর সাথে সম্পৃক্ত হলে তাকে ‘মারফূ’ বলা হয়।
الحديث-এর সংজ্ঞা
- আভিধানিক অর্থ: ‘হাদীস’ (الحديث) অর্থ নতুন (الجديد), কথা, বাণী বা সংবাদ। প্রাচীন (কাদীম)-এর বিপরীতে নতুনকে হাদীস বলা হয়।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: উসূলুল হাদীসের ইমামগণের মতে:
«ما أضيف إلى النبي صلى الله عليه وسلم من قول أو فعل أو تقرير أو صفة خَلقية أو خُلقية.»
অর্থাৎ, ‘রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কথা, কাজ, মৌনসম্মতি কিংবা তাঁর জন্মগত শারীরিক গঠন বা নৈতিক চরিত্রের বৈশিষ্ট্যের দিকে যা কিছু সম্পৃক্ত করা হয়, তাকে হাদীস বলে।’
হাদীসে মারফূ’-এর প্রধান প্রকারভেদ ও উদাহরণ (أقسام الحديث المرفوع)
মারফূ’ হাদীস মূলত চার ভাগে বিভক্ত:
- ১. মারফূ’ কওলী (مرفوع قولي – বাচনিক): রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র জবানে সরাসরি উচ্চারিত বাণী। যেমন: ‘ইন্নামাল আ’মালু বিন নিয়্যাত’—নিশ্চয় যাবতীয় কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল (সহীহ বুখারী)।
- ২. মারফূ’ ফে’লী (مرفوع فعلي – কর্মগত): রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং যা করেছেন বলে সাহাবী বর্ণনা করেছেন। যেমন: ‘নবীজী (সা.) দাঁড়িয়ে দুই রাকাত সালাত আদায় করলেন’ কিংবা সাহাবীর উক্তি: ‘আমি নবীজীকে এভাবে ওযু করতে দেখেছি।’
- ৩. মারফূ’ তাকরীরী (مرفوع تقريري – মৌনসম্মতি): সাহাবীগণের কোনো কথা বা কাজ রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রত্যক্ষ করেছেন কিংবা অবগত হয়েছেন, কিন্তু তিনি তা নিষেধ বা বারণ না করে মৌন সম্মতি দিয়েছেন। যেমন: খালিদ ইবনে ওয়ালীদ (রা.) কর্তৃক নবীজীর সামনে দব্ব (মরুভূমির গুইসাপ জাতীয় হালাল প্রাণী) খাওয়া এবং নবীজী তা দেখে বারণ না করা।
- ৪. মারফূ’ ওয়াসফী (مرفوع وصفي – চারিত্রিক বা দৈহিক): নবীজীর শারীরিক গঠন ও উন্নত আখলাকের বর্ণনা। যেমন হযরত আনাস (রা.)-এর বর্ণনা: ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) মানুষের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর চেহারার অধিকারী এবং সর্বাধিক দানশীল ছিলেন।’
উপসংহার
মারফূ’ হাদীসের এই প্রকারভেদ প্রমাণ করে যে নবীজীর সমগ্র পবিত্র জীবনই ছিল মুমিনদের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ এক বাস্তব কুরআন।
১৪। عرف الحديث المتواتر ثم بين شروطه موجزا –
[মুতাওয়াতির হাদীসের সংজ্ঞা, প্রকারভেদ এবং এর অকাট্য চার শর্তের সংক্ষিপ্ত বিবরণ]
[মান: ৫]
ভূমিকা ও পটভূমি
বর্ণনাকারীদের সংখ্যার ভিত্তিতে হাদীসকে প্রধানত মুতাওয়াতির এবং আহাদ—এই দুই ভাগে ভাগ করা হয়। মুতাওয়াতির হাদীস হলো এমন এক স্তরের বর্ণনা যা মানুষের মনে চাক্ষুষ প্রত্যয় ও পরম নিশ্চিত জ্ঞান (ইলমে ইয়াক্বীন) তৈরি করে।
الحديث المتواتر-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক পরিচয়
- আভিধানিক অর্থ: ‘মুতাওয়াতির’ (المتواتر) শব্দটি ‘তাওয়াতুর’ থেকে নিষ্পন্ন, যার অর্থ একের পর এক ধারাবাহিকভাবে আসা, নিরবচ্ছিন্ন আগমন (التتابع)।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: উসূলুল হাদীসের ইমামগণের ভাষায়:
«هو ما رواه جمع غفير تحيل العادة تواطؤهم على الكذب عن مثلهم من ابتداء السند إلى منتهاه وكان مستند حسهم.»
অর্থাৎ, ‘মুতাওয়াতির হলো এমন হাদীস যা সনদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি যুগে এমন বিপুল সংখ্যক বর্ণনাকারী বর্ণনা করেছেন, যাদের সবার পক্ষে একত্রিত হয়ে মিথ্যা রটনা করা সাধারণ অভ্যাসের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অসম্ভব; এবং তাদের এই বর্ণনার ভিত্তি ছিল প্রত্যক্ষ ইন্দ্রিয়লব্ধ অনুভূতি।’
মুতাওয়াতির হাদীসের আবশ্যকীয় চারটি শর্ত (شروط المتواتر)
- ১. বর্ণনাকারীদের বিপুল সংখ্যাধিক্য (كثرة الرواة): প্রতিটি যুগে বর্ণনাকারীর সংখ্যা এত বিশাল হতে হবে যা সন্দেহের ঊর্ধ্বে (অধিকাংশের মতে ন্যূনতম ১০ জন, মতান্তরে ২০ বা ৪০ জন)।
- ২. মিথ্যার ওপর একমত হওয়ার অসম্ভবতা (إحالة العادة تواطؤهم على الكذب): বর্ণনাকারীগণ বিভিন্ন দেশ, বর্ণ ও পরিবেশের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় তারা গোপনে শলাপরামর্শ করে মিথ্যা তৈরি করা যুক্তির বিচারে অসম্ভব হতে হবে।
- ৩. সনদের সকল স্তরে এই সংখ্যার স্থায়িত্ব (استمرار الكثرة في جميع الطبقات): সাহাবী, তাবেঈন এবং তাবে-তাবেঈন—সনদের প্রতিটি স্তরেই এই বিপুল সংখ্যা বিদ্যমান থাকতে হবে। কোনো এক স্তরে সংখ্যা কমে গেলে তা মুতাওয়াতির থাকবে না।
- ৪. সংবাদের ভিত্তি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হওয়া (أن يكون مستند خبرهم الحس): বর্ণনাকারীদের তথ্য কোনো মনগড়া বিচারবুদ্ধি বা অনুমানের ওপর নয়; বরং সরাসরি চোখ দিয়ে দেখা (যেমন ‘আমরা দেখেছি’) অথবা কান দিয়ে শোনা (যেমন ‘আমরা শুনেছি’) হতে হবে।
উপসংহার
মুতাওয়াতির হাদীস মানুষকে সন্দেহাতীত নিশ্চিত জ্ঞান দান করে এবং তা অস্বীকারকারী ব্যক্তি কাফের হিসেবে পরিগণিত হয়।
১৫। ما المتابع والشاهد؟ وما الفرق بينهما؟
[উলূমুল হাদীসে মুতাবা’আত ও শাহেদ-এর পরিচয়, শ্রেণিবিভাগ এবং এদের মধ্যকার সূক্ষ্ম পার্থক্য]
[মান: ৫]
ভূমিকা ও পটভূমি
একটি হাদীস যখন একক কোনো সনদে বর্ণিত হয়ে দুর্বলতার সন্দেহে পড়ে, তখন মুহাদ্দিসগণ সেই হাদীসের সমর্থনে অন্য কোনো সনদ বা সাহাবীর বর্ণনা আছে কি না তা অনুসন্ধান করেন। এই শাস্ত্রীয় অনুসন্ধানকে ‘ই’তিবার’ (الاعتبار) বলা হয় এবং এর মাধ্যমে যে সহায়ক বর্ণনাগুলো পাওয়া যায় তাকে ‘মুতাবি” ও ‘শাহীদ’ বলা হয়।
المتابع এবং الشاهد-এর সংজ্ঞা
- ১. আল-মুতাবি’ (المتابع – সহায়ক সনদ): কোনো রাবী যখন একটি হাদীস বর্ণনা করেন এবং অন্য কোনো সনদে অপর একজন রাবী তাঁর সমপর্যায়ে এসে হুবহু একই মূল সাহাবীর সূত্রে সেই হাদীসটি বর্ণনা করেন, তখন দ্বিতীয় বর্ণনাটিকে প্রথম বর্ণনার ‘মুতাবি” বলা হয়।
- মুতাবা’আতে তাম্মাহ (পূর্ণাঙ্গ): যদি সরাসরি বর্ণনাকারী রাবীর স্তরেই সহায়ক রাবী পাওয়া যায়।
- মুতাবা’আতে ক্বাসিরাহ (আংশিক): যদি শায়খের শায়খ বা সনদের উপরের স্তরে গিয়ে সমর্থন পাওয়া যায়।
- ২. আশ-শাহীদ (الشاهد – সাক্ষী বর্ণনা): যে হাদীসটি মূল হাদীসের বক্তব্যের সমার্থক বা নিকটবর্তী ভাব প্রকাশ করে, তবে তা বর্ণিত হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন একজন সাহাবীর সূত্রে। অর্থাৎ বিষয়বস্তু এক হলেও মূল সাহাবী আলাদা।
المتابع এবং الشاهد-এর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য
| পার্থক্যমূলক দিক | মুতাবি’ (المتابع) | শাহীদ (الشاهد) |
|---|---|---|
| ১. সাহাবীর ঐক্যের দিক | মূল হাদীস এবং সহায়ক হাদীসের সাহাবী একই ব্যক্তি হন। | মূল হাদীস এবং সহায়ক হাদীসের সাহাবী সম্পূর্ণ ভিন্ন হন। |
| ২. সনদের সমর্থনের ক্ষেত্র | এটি মূলত সনদের ভেতরের রাবীর একাকিত্ব বা দুর্বলতা দূর করতে সনদের সমর্থনে আসে। | এটি মূলত হাদীসের মূল বিষয়ের সত্যতা প্রমাণে অপর সাহাবীর সাক্ষ্য হিসেবে আসে। |
| ৩. শব্দের মিল | মুতাবি’তে সাধারণত হাদীসের শব্দ ও ভাষা হুবহু অভিন্ন হয়ে থাকে। | শাহীদে শব্দ হুবহু না হয়ে কেবল মূল ভাবার্থের সামঞ্জস্য থাকতে পারে। |
উপসংহার
মুতাবি’ ও শাহীদের সমন্বয়ে একটি দুর্বল (দঈফ) হাদীস শক্তি অর্জন করে ‘হাসান লি-গাইরিহী’ স্তরে উন্নীত হয়ে গ্রহণযোগ্য আমলযোগ্য হাদীসে পরিণত হয়।
১৬। عرف المنكر والمعلل والمعلق والمنقطع –
[মুনকার, মু’আল্লাল, মু’আল্লাক্ব ও মুনক্বাতি’ হাদীসের প্রামাণ্য শাস্ত্রীয় সংজ্ঞা ও উদাহরণ]
[মান: ৫]
ভূমিকা ও পটভূমি
হাদীসশাস্ত্রে সহীহ হাদীসের বিপরীতে দঈফ বা প্রত্যাখ্যাত হাদীসের বহুবিধ প্রকারভেদ রয়েছে। সনদের ত্রুটি বা বর্ণনার বৈপরীত্যের ওপর ভিত্তি করে এই পরিভাষাগুলো নির্ধারিত হয়েছে। নিম্নে প্রশ্নোক্ত চারটি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষার বিশ্লেষণ দেওয়া হলো:
১. হাদীসে মুনকার (الحديث المنكر)
- সংজ্ঞা: ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.)-এর সর্বসম্মত সংজ্ঞানুযায়ী:
«هو ما رواه الضعيف مخالفا للثقة.»
অর্থাৎ, ‘কোনো দুর্বল রাবী যখন তার চেয়ে অধিক নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত (সিক্বাহ) রাবীর বর্ণনার বিপরীতে কোনো হাদীস বর্ণনা করে, তখন দুর্বল রাবীর সেই একক বর্ণনাকে ‘মুনকার’ বলা হয়।’ আর বিপরীতে থাকা নির্ভরযোগ্য রাবীর হাদীসটিকে ‘মারূফ’ (المعروف) বলা হয়। এটি দঈফের অত্যন্ত নিকৃষ্টতম প্রকার।
২. হাদীসে মু’আল্লাল বা মা’লূল (الحديث المعلل أو المعلول)
- সংজ্ঞা: যে হাদীসের বাহ্যিক সনদ ও গঠন পুরোপুরি সহীহ ও ত্রুটিমুক্ত প্রতীয়মান হয়, কিন্তু গভীর অনুসন্ধানের পর তার ভেতরে এমন কোনো সূক্ষ্ম ও গোপন মারাত্মক ত্রুটি (ইল্লাত) ধরা পড়ে যা হাদীসের গ্রহণযোগ্যতাকে সম্পূর্ণ বিনষ্ট করে দেয়।
- গুরুত্ব: এই ইল্লাত উদ্ঘাটন করা হাদীসশাস্ত্রের সবচেয়ে জটিল ও সূক্ষ্মতম বিদ্যা—যা কেবল ইমাম বুখারী, আলী ইবনুল মাদীনী ও আহমাদ ইবনে হাম্বলের মতো শীর্ষ মুজতাহিদ ইমামগণের পক্ষেই সম্ভব হতো।
৩. হাদীসে মু’আল্লাক্ব (الحديث المعلق)
- সংজ্ঞা: সনদের প্রারম্ভিক দিক থেকে (অর্থাৎ গ্রন্থকারের নিজস্ব দিক থেকে) একজন বা একাধিক রাবীকে ক্রমান্বয়ে কিংবা সনদের সমস্ত রাবীকে সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে সরাসরি নবীজী বা সাহাবীর দিকে সম্পৃক্ত করে যে হাদীস উল্লেখ করা হয়, তাকে ‘মু’আল্লাক্ব’ বলে। যেমন ইমাম বুখারী অনেক সময় সনদ বাদ দিয়ে বলেন: ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন…’। এটি মূলত মুনক্বাতি’র একটি শাখা।
৪. হাদীসে মুনক্বাতি’ (الحديث المنقطع)
- সংজ্ঞা: যে হাদীসের সনদের মাঝখান থেকে যেকোনো স্থানে একজন রাবী বিলুপ্ত হয়ে যায় (তবে তা যেন সনদের শুরুতে না হয়, কারণ শুরুতে হলে তা মু’আল্লাক্ব এবং শেষে তাবেঈর পরে হলে তা মুরসাল)। সনদের এই সংযোগহীনতার কারণে মুনক্বাতি’ হাদীস সর্বসম্মতভাবে দুর্বল (দঈফ) এবং অগ্রহণযোগ্য।
উপসংহার
উলূমুল হাদীসের এই পরিভাষাগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ জ্ঞান অর্জন করার মাধ্যমেই হাদীসের গ্রহণযোগ্যতা ও দুর্বলতা সঠিকভাবে নিরূপণ করা সম্ভব হয়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
ফাযিল ১ম বর্ষ হাদীস ও উসূলুল হাদীস ২০২৪ পরীক্ষার বিষয় কোড কত ছিল?
পরীক্ষার বিষয় কোড ছিল ১১১০০২ এবং পূর্ণমান ১০০ নম্বর। সময় ৩ ঘণ্টা।
যাকাত অনাদায়কারীর সম্পদকে কিয়ামতে কী রূপ দেওয়া হবে?
তার সঞ্চিত সম্পদকে অতি বিষাক্ত টেকো অজগর সাপের রূপ দিয়ে তার গলায় পেঁচিয়ে শাস্তি দেওয়া হবে।
সাহায্য চাওয়া বা ভিক্ষাবৃত্তি শরিয়তে কয় শ্রেণির জন্য জায়েজ?
সুনির্দিষ্ট তিন শ্রেণির জন্য: আর্থিক বিবাদ মীমাংসাকারী জামিনদার, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত এবং প্রমাণিত চরম নিঃস্ব ব্যক্তি।
সাহাবীদের মধ্যে সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী কে ছিলেন?
হযরত আবু হুরায়রা (রা.), তিনি সর্বমোট ৫,৩৭৪ টি হাদীস বর্ণনা করেছেন।
হাদীসের পঞ্চশর্ত বলতে কী কী বোঝায়?
সনদের অবিচ্ছিন্নতা, রাবীর আদল (ন্যায়পরায়ণতা), পূর্ণ স্মৃতিশক্তি (যাবত), শায না হওয়া এবং গোপন ইল্লাত না থাকা।
‘খিয়ারুল মজলিস’ নিয়ে হানাফী ও শাফেঈদের মূল পার্থক্য কী?
শাফেঈদের মতে শারীরিক বিচ্ছেদ না হওয়া পর্যন্ত খিয়ার বহাল থাকে, আর হানাফীদের মতে ইজাব-কবুল সম্পন্ন হওয়ামাত্র চুক্তি বাধ্যতামূলক হয়ে যায়।

