ফাযিল (স্নাতক) পাস প্রথম বর্ষ পরীক্ষা – ২০২২
বিষয়: উলূমুল কুরআন ওয়াল হাদীস (প্রথম পত্র) : তাফসীরুল কুরআন (বিষয় কোড: ১০১)
সময় : ৩ ঘণ্টা | পূর্ণমান : ১০০
[الملاحظة : اجب عن اثنين من مجموعة (الف) و (ج) و (د) وعن واحد من مجموعة (ب) -]
[দ্রষ্টব্য : (الف), (ج) ও (د) অংশ থেকে দুটি করে এবং (ب) অংশ থেকে একটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন অনুষ্ঠিত ফাযিল স্নাতক (পাস) প্রথম বর্ষ পরীক্ষা ২০২২-এর উলূমুল কুরআন ওয়াল হাদীস ১ম পত্র (বিষয় কোড: ১০১ – তাফসীরুল কুরআন) পরীক্ষার মূল প্রশ্নপত্রের সকল প্রশ্নের প্রামাণ্য ও বিস্তারিত সমাধান নিচে দেওয়া হলো। তাফসিরে জালালাইন, রওয়ায়েউল বায়ান ও প্রামাণ্য তাফসিরগ্রন্থের আলোকে প্রতিটি প্রশ্নের শাব্দিক বিশ্লেষণ, প্রাসঙ্গিক প্রেক্ষাপট ও তাত্ত্বিক কাঠামো বিশদভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছে।
১। هذه سورة أنزلناها وفرضناها لكثرة المفروض فيها وأنزلنا فيها آيات بينات واضحات الدلالة لعلكم تذكرون – الزانية والزاني فاجلدوا كل واحد منهما مائة جلدة ولا تأخذكم بهما رأفة في دين الله إن كنتم تؤمنون بالله واليوم الآخر وليشهد عذابهما طائفة من المؤمنين –
[সূরা আন-নূর: ১-২ আয়াতদ্বয়ের তাফসীরসহ অনুবাদ এবং যেনার দণ্ডবিধি সংক্রান্ত আলোচনা]
[মান: ২০]
ভূমিকা ও পটভূমি
মানবজাতির নৈতিক চরিত্র সংরক্ষণ এবং পারিবারিক পবিত্রতা বজায় রাখা ইসলামি শরিয়তের অন্যতম মৌলিক লক্ষ্য। সূরা আন-নূরের সূচনায় আল্লাহ তাআলা এই সূরার বিধানসমূহের সার্বজনীন অপরিহার্যতা তুলে ধরেছেন। ব্যভিচার একটি মারাত্মক অপরাধ যা সমাজের পবিত্রতাকে ধ্বংস করে, তাই ইসলামে এর জন্য সুনির্দিষ্ট ও কঠোর হদ নির্ধারণ করা হয়েছে।
মূল আয়াতাংশের বঙ্গানুবাদ
এটি একটি সূরা যা আমি নাজিল করেছি এবং এর বিধানাবলিকে অলঙ্ঘনীয় ফরজ করেছি। আর এতে সুস্পষ্ট বহু নিদর্শন অবতীর্ণ করেছি, যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর। ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী—তাদের প্রত্যেককে একশত করে বেত্রাঘাত কর। আর আল্লাহর বিধান কার্যকর করার ক্ষেত্রে তাদের প্রতি কোনো দয়া যেন তোমাদেরকে প্রভাবিত না করে, যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাক। আর তাদের শাস্তি যেন মুমিনদের একটি দল প্রত্যক্ষ করে।
শাব্দিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ
| শব্দ | রূপ ও ব্যাকরণ | আভিধানিক অর্থ | তাফসীরি তাৎপর্য |
|---|---|---|---|
| فَرَضْنَاهَا | ফে’লে মাদী (তাফঈল) | ফরজ ও অলঙ্ঘনীয় করা | সুনির্দিষ্ট দণ্ডবিধি ও হালাল-হারামের অলঙ্ঘনীয়তা নির্দেশক। |
| الزَّانِيَةُ | ইসমুল ফায়িল (মুয়ান্নাস) | ব্যভিচারিণী নারী | এখানে নারীর নাম পূর্বে আনা হয়েছে কারণ এ জাতীয় অপরাধে নারীর সম্মতি বা ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। |
| فَاجْلِدُوا | ফে’লে আমর (জামা) | তোমরা চামড়ায় আঘাত কর (বেত্রাঘাত) | হাড় বা মাংস ভাঙা নয়, বরং চামড়ার ওপর বেত্রাঘাত করার বিধান। |
| طَائِفَةٌ | ইসম | একটি দল বা জামায়াত | প্রকাশ্য জনসমক্ষে শাস্তি কার্যকর করার নির্দেশ। |
(الف) ইসলামি শরিয়তে যেনার শাস্তি ও এর শর্তাবলি
- দণ্ডের প্রকৃতি: অপরাধী যদি বিবাহিত (মুহসান) হয়, তবে তার শাস্তি হলো রজম বা পাথর নিক্ষেপে মৃত্যুদণ্ড। আর অবিবাহিত হলে তার শাস্তি প্রকাশ্যে ১০০ বেত্রাঘাত। হানাফী মাযহাব মতে বেত্রাঘাতই মূল দণ্ড, তবে বিচারক জনস্বার্থে দেশান্তর করতে পারেন।
- শাস্তি কার্যকরের অপরিহার্য শর্তাবলি:
- অপরাধীকে অবশ্যই সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন, বালেগ এবং স্বেচ্ছায় অপরাধে লিপ্ত হতে হবে (জোরপূর্বক ধর্ষিত হলে কোনো শাস্তি হবে না)।
- অপরাধ আদালতের কাঠগড়ায় চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হতে হবে—চারজন ন্যায়পরায়ণ পুরুষ প্রত্যক্ষদর্শীর প্রকাশ্য সাক্ষ্য অথবা বিচারকের কাছে অপরাধীর চারবার স্বেচ্ছায় স্পষ্ট স্বীকারোক্তি।
- সাক্ষীদের মধ্যে সামান্যতম সংশয় বা বিরোধ থাকলে শাস্তি বাতিল হয়ে যাবে এবং সাক্ষীদের ওপর অপবাদের হদ কার্যকর হবে।
(ب) আলোচ্য আয়াতসমূহের শানে নুযূল
মদিনায় ইসলামি সমাজ সুসংহত হওয়ার পর পারিবারিক বন্ধন রক্ষা ও বংশধারার বিশুদ্ধতা সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে হিজরি ষষ্ঠ বা সপ্তম সনে এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। ইসলাম-পূর্ব আরবে প্রকাশ্যে ও গোপনে ব্যভিচারের যে অবাধ প্রচলন ছিল, এই অবতীর্ণ বিধানের মাধ্যমে তার মূলোৎপাটন করা হয় এবং একে কবিরা গুনাহ ও অমার্জনীয় ফৌজদারি অপরাধ ঘোষণা করা হয়।
উপসংহার
কুরআনের এই শাস্তি কেবল দণ্ড নয়, বরং এটি সমগ্র সমাজের নৈতিক অবক্ষয় রোধে এক কার্যকর ও সুদৃঢ় প্রতিরোধ ব্যবস্থা।
২। إن الذين جاءوا بالإفك عصبة منكم لا تحسبوه شرا لكم بل هو خير لكم لكل امرئ منهم ما اكتسب من الإثم والذي تولى كبره منهم له عذاب عظيم – إذ تلقونه بألسنتكم وتقولون بأفواهكم ما ليس لكم به علم وتحسبونه هينا وهو عند الله عظيم –
[সূরা আন-নূর: ১১-১৫ আয়াতসমূহের তাফসীরসহ অনুবাদ এবং ইফকের ঐতিহাসিক ঘটনার বিশ্লেষণ]
[মান: ২০]
ভূমিকা ও পটভূমি
পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নূরের অন্যতম হৃদয়স্পর্শী ঐতিহাসিক অধ্যায় হলো উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা.)-এর ওপর মুনাফিকদের অপবাদের ঘটনা, যা ইতিহাসে ‘হাদিসুল ইফক’ (حادثة الإفك) নামে পরিচিত। এই ঘটনায় স্বয়ং আল্লাহ তাআলা দশটি আয়াত নাজিল করে হযরত আয়েশা (রা.)-এর নিষ্পাপতা ও পবিত্রতা ঘোষণা করেন এবং অপবাদ রটনাকারীদের কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারি দেন।
মূল আয়াতাংশের বঙ্গানুবাদ
নিশ্চয় যারা এই অপবাদ রচনা করেছে, তারা তোমাদেরই মধ্যকার একটি দল। তোমরা একে তোমাদের জন্য অনিষ্টকর মনে করো না; বরং এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। তাদের প্রত্যেকের জন্য রয়েছে সেই পাপের ফল যা সে অর্জন করেছে; এবং তাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এই অপবাদের প্রধান ভূমিকা পালন করেছে, তার জন্য রয়েছে মহাশাস্তি। যখন তোমরা মুখে মুখে এ কথা ছড়াচ্ছিলে এবং এমন কথা তোমাদের মুখে উচ্চারণ করছিলে যার কোনো জ্ঞান তোমাদের ছিল না, আর তোমরা একে অতি তুচ্ছ মনে করছিলে, অথচ আল্লাহর কাছে এটি ছিল এক বিরাট অপরাধ।
শাব্দিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ
| শব্দ | রূপ ও ধাতু | আভিধানিক অর্থ | তাফসীরি তাৎপর্য |
|---|---|---|---|
| الإِفْكِ | أ – ف – ك (মাসদার) | চরম মিথ্যা, ডাহা অপবাদ | সত্যকে উল্টে দিয়ে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন জঘন্য মিথ্যা রটানো। |
| عُصْبَةٌ | ইসম (জামা) | ১০ থেকে ৪০ জনের একটি শক্তিশালী দল | মুনাফিক প্রধান আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের চক্রান্তকারী চক্র। |
| تَوَلَّى كِبْرَهُ | ফে’ল ও মাফউল | ষড়যন্ত্রের মূল নেতৃত্ব দেওয়া | অপবাদের মিথ্যা জাল যে তৈরি করেছিল (আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই)। |
| تَلَقَّوْنَهُ | ل – ق – ي (তাফাউল) | মুখে মুখে গ্রহণ ও প্রচার করা | কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়া এক কান থেকে অন্য কানে ছড়িয়ে দেওয়া। |
(الف) আয়াতটির শানে নুযূল ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ষষ্ঠ হিজরিতে বনু মুস্তালিক (মুরাইসী) যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তনের পথে একটি মনযিলে উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে গলার হার হারিয়ে ফেলেন। হার খুঁজতে গিয়ে তাঁর কাফেলা ছেড়ে দেয়, কারণ তিনি অত্যন্ত হালকা থাকায় বাহকরা ভেবেছিল তিনি হাওদাজের ভেতরেই আছেন। পথ হারিয়ে তিনি সেখানে বসে পড়লে পিছন থেকে আসা সাহাবী হযরত সাফওয়ান ইবনুল মুয়াত্তাল (রা.) তাঁকে দেখে নিজের উটে চড়িয়ে মদিনায় পৌঁছে দেন। মদিনায় পৌঁছার পর মুনাফিক নেতা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এই ঘটনা নিয়ে এক জঘন্য কুৎসা রটনা শুরু করে, যাতে কিছু সরলমনা মুসলিমও (যেমন হাসসান ইবনে সাবিত, মিসতাহ ও হামনাহ বিনতে জাহশ) জড়িয়ে পড়েন। প্রায় এক মাস ওহী বন্ধ থাকার পর মহান আল্লাহ স্বয়ং এই আয়াতসমূহ নাজিল করে উম্মুল মুমিনীনের পবিত্রতা ঘোষণা করেন।
(ب) ‘الإفك’ শব্দের অর্থ এবং ইফক ও ইফতিরা (الافتراء)-এর পার্থক্য
- الإفك-এর অর্থ: সত্যকে সম্পূর্ণ উল্টে দিয়ে বিকৃত করা। আল্লামা রাগিব ইসফাহানী বলেন, এমন অসত্য কথা যা সত্যের কোনো ভিত্তি ছাড়াই সম্পূর্ণ কাল্পনিকভাবে নির্মাণ করা হয়।
- ইফক ও ইফতিরার মধ্যে পার্থক্য:
- ইফতিরা (الافتراء): জেনে-বুঝে সম্পূর্ণ নিজ থেকে কোনো মিথ্যা তৈরি করা বা বানিয়ে বলা। এটি যে কোনো সাধারণ মিথ্যার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
- ইফক (الإفك): কোনো বাস্তব ঘটনার স্বাভাবিক রূপকে সম্পূর্ণ উল্টে দিয়ে কুৎসিত ও নোংরা অপবাদে রূপান্তর করা। হাদিসুল ইফকে হযরত সাফওয়ান (রা.) কর্তৃক আয়েশা (রা.)-কে উটে চড়িয়ে ফিরিয়ে আনার মতো একটি পবিত্র পরোপকারী ঘটনাকে উল্টে দিয়ে ব্যভিচারের অপবাদে রূপান্তর করা হয়েছিল। তাই এটি সাধারণ মিথ্যার চেয়ে অনেক বেশি জঘন্য।
উপসংহার
হাদিসুল ইফকের ঘটনা মুসলিমদের শিক্ষা দেয় যে, কোনো মুসলমানের চরিত্র সম্পর্কে কোনো চাক্ষুষ চারজন সাক্ষী ছাড়া কানকথা বিশ্বাস করা বা তা প্রচার করা ইসলামি আইনে দণ্ডনীয় মহাপাপ।
৩। إذا جاء نصر الله والفتح – ورأيت الناس يدخلون في دين الله أفواجا – فسبح بحمد ربك واستغفره إنه كان توابا –
[সূরা আন-নাসর: ১-৩ আয়াতসমূহের তাফসীরসহ অনুবাদ, তাহকিক ও মক্কা বিজয়ের শিক্ষা]
[মান: ২০]
ভূমিকা ও পটভূমি
সূরা আন-নাসর পবিত্র কুরআনের ১১০তম সূরা। এই সূরায় ইসলামের চূড়ান্ত বিজয়, কাফেরদের ওপর বিজয় লাভ এবং দলে দলে মানুষের ইসলাম গ্রহণের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। একই সাথে এটি ছিল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পার্থিব জীবনের দায়িত্ব সমাপ্তি এবং ওফাতের নিকটবর্তী হওয়ার এক সূক্ষ্ম ঐশী ইঙ্গিত।
মূল আয়াতাংশের বঙ্গানুবাদ
যখন আসবে আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়; এবং আপনি মানুষকে দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করতে দেখবেন; তখন আপনি আপনার প্রতিপালকের প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করুন এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন; নিশ্চয় তিনি পরম তওবা কবুলকারী।
(الف) শাব্দিক ও ব্যাকরণিক তাহকিক (تحقيق الكلمات)
| শব্দ | মূলধাতু ও রূপ | আভিধানিক অর্থ | ব্যাকরণিক অবস্থান ও বিশ্লেষণ |
|---|---|---|---|
| جَاءَ | ج – ي – أ (মু’তাল্লুল আইন) | আবির্ভূত হলো বা আসল | ফে’লে মাদী, মুফরাদ মুযাক্কার গায়েব। শর্তের ফে’ল হিসেবে ব্যবহৃত। |
| اسْتَغْفِرْهُ | غ – ف – ر (বাব ইস্তिफ’আল) | তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন | ফে’লে আমর, জমির মুত্তাসিলসহ। বান্দার বিনম্রতা ও শোকরিয়া প্রকাশের নির্দেশ। |
| سَبِّحْ | س – ب – ح (বাব তাফঈল) | পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করুন | ফে’লে আমর। আল্লাহর যাবতীয় ত্রুটিমুক্ততা ঘোষণার আদেশ। |
(ب) মক্কা বিজয় থেকে অর্জিত ঐতিহাসিক ও চারিত্রিক শিক্ষা
অষ্টম হিজরির রমজান মাসে মক্কা বিজয়ের ঘটনা মানব ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব অধ্যায়। এ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষাসমূহ হলো:
- চূড়ান্ত বিজয়ে বিনয় ও শোকর আদায়: দশ সহস্রাধিক সাহাবীর বিশাল সেনাদল নিয়ে মক্কায় প্রবেশের সময় রাসূলুল্লাহ (সা.) কোনো অহংকার প্রদর্শন করেননি; বরং উটের পিঠে সওয়ার হয়ে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়ায় এত বেশি অবনত হয়েছিলেন যে তাঁর পবিত্র দাড়ি মুবারক উটের পিঠ স্পর্শ করছিল। বিজয়ীকে সর্বদা আল্লাহর প্রতি বিনয়ী হতে হয়।
- ক্ষমা ও উদারতার অনন্য দৃষ্টান্ত: যে কুরাইশরা নবীজীকে এবং সাহাবীদের ১৩ বছর ধরে অকথ্য নির্যাতন করেছে, দেশত্যাগে বাধ্য করেছে—বিজয়ীর বেশে তাদের সামনে দাঁড়িয়ে রাসূল (সা.) ঘোষণা করলেন: ‘লা তাসরীবা আলাইকুমুল ইয়াওম, ইযহাবূ ফাআনতুমুত তুলাকা’ (আজ তোমাদের ওপর কোনো প্রতিশোধ নেই, তোমরা সকলেই মুক্ত)। এই নিঃশর্ত ক্ষমাই কোটি কোটি মানুষের হৃদয় জয় করেছিল।
- মূর্তি ও বাতিলের বিনাশ: কা’বা গৃহের ৩৬০টি মূর্তিকে স্বহস্তে ভেঙে রাসূল (সা.) ঘোষণা করেছিলেন: ‘জা-আল হাক্কু ওয়া যাহাকাল বাতিল’ (সত্য এসেছে, মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে)।
- নবীজীর ওফাতের ইঙ্গিত: হযরত উমর ও ইবনে আব্বাস (রা.) এই সূরার মর্মার্থ অনুধাবন করেছিলেন যে, যখন দাওয়াতের মিশন পূর্ণ হয়ে গেছে, তখন নবীজীর দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার সময় সমাগত।
উপসংহার
সূরা আন-নাসর শিক্ষা দেয় যে, জাগতিক সকল সাফল্য ও বিজয়ের মালিক কেবল আল্লাহ তাআলা; সুতরাং প্রতিটি সাফল্যের চূড়ান্ত পরিণতি হওয়া উচিত আল্লাহর শোকর ও ইস্তিগফার।
৪। والعصر – إن الإنسان لفي خسر – إلا الذين آمنوا وعملوا الصالحات وتواصوا بالحق وتواصوا بالصبر –
[সূরা আল-আসর: ১-৩ আয়াতসমূহের তাফসীরসহ অনুবাদ ও সৎকাজের বিশদ রূপরেখা]
[মান: ২০]
ভূমিকা ও পটভূমি
সূরা আল-আসর পবিত্র কুরআনের অন্যতম সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীরতম তাৎপর্যবহ একটি সূরা। ইমাম শাফেঈ (রহ.) এই সূরা সম্পর্কে চমৎকার মন্তব্য করেছেন: ‘মানুষ যদি কেবল এই একটি সূরা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করত, তবে মানুষের সার্বিক হিদায়াতের জন্য কেবল এটিই যথেষ্ট হতো।’ এতে কালের শপথ করে মানবজাতির সামগ্রিক ক্ষতির হাত থেকে মুক্তির চারটি অলঙ্ঘনীয় শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
মূল আয়াতাংশের বঙ্গানুবাদ
কালের শপথ! নিশ্চয় মানুষ চরম ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত। তবে তারা ব্যতীত যারা ঈমান এনেছে, সৎকাজ করেছে, এবং পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দিয়েছে ও পরস্পরকে ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে।
শাব্দিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ
| শব্দ | ধাতু ও রূপ | আভিধানিক অর্থ | তাফসীরি তাৎপর্য |
|---|---|---|---|
| الْعَصْرِ | ع – ص – ر (ইসম) | যুগ, মহাকাল, আসরের সময় | মানব জীবনের সীমিত আয়ু ও ইতিহাসের পরিবর্তনের স্মারক। |
| خُسْرٍ | خ – س – ر (মাসদার) | চরম ক্ষতি, মূলধন হারানো | আখিরাতের স্থায়ী শান্তি ও জাহান্নাম থেকে বাঁচার মূলধনের অপচয়। |
| تَوَاصَوْا | و – ص – ي (তাফা’উল) | পরস্পরকে অসিয়ত বা নসিহত করা | ব্যক্তিগত আমলের পাশাপাশি সামাজিক দাওয়াত ও সংশোধনের অপরিহার্যতা। |
(الف) সূরা আল-আসরের শানে নুযূল
মুফাসসিরগণ উল্লেখ করেছেন যে, জাহেলী যুগের আরবরা বিকেলের দিকে (আসরের সময়) বসে অনর্থক আড্ডাবাজি, গল্পগুজব ও মানুষের গীবত-শেকায়েতে লিপ্ত হতো। দিনশেষে ব্যবসায় কোনো লাভ না হলে বা কোনো বিপদ ঘটলে তারা বলত: ‘আসর বা সময়টা বড় অশুভ ও অপয়া’। তাদের এই ভ্রান্ত ধারণার জবাবে আল্লাহ তাআলা স্বয়ং কালের শপথ করে ঘোষণা করেন যে, সময় বা যুগ কোনোভাবেই অপয়া নয়; বরং মানুষ তার সময়ের অপচয় ও অন্যায়ের কারণেই মূলত চূড়ান্ত ক্ষতির শিকার হচ্ছে।
(ب) কুরআন ও হাদিসের আলোকে ‘الأعمال الصالحات’ (সৎকাজসমূহ)-এর ব্যাখ্যা
- আমলে সালেহর সংজ্ঞা: আমলে সালেহ বা সৎকাজ হলো এমন প্রতিটি পুণ্যময় কাজ যা কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একনিষ্ঠভাবে (ইখলাস) এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী সম্পাদিত হয়। এই দুটি শর্তের কোনো একটি অনুপস্থিত থাকলে আমল সালেহ হিসেবে গণ্য হবে না।
- কুরআন ও হাদিসের আলোকে এর ক্ষেত্রসমূহ:
- ফরজ ইবাদতসমূহ: নিয়মিত সালাত কায়েম, রমজানের সিয়াম পালন, জাকাত প্রদান এবং হজ আদায়।
- বান্দার হক আদায়: পিতা-মাতার সেবা, প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা, এতিম-মিসকিনকে খাদ্যদান এবং মানুষের সাথে মধুর আচরণ।
- আত্মিক পবিত্রতা: অন্তরের অহংকার, রিয়া, হিংসা ও লোভ বর্জন করে বিনয় ও ধৈর্য ধারণ করা।
- সামাজিক দায়িত্ব: ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের প্রতিরোধ (আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার) করা। রাসূল (সা.) বলেছেন: ‘রাস্তা থেকে একটি কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলাও ঈমানের অংশ এবং সদকা।’ (সহীহ বুখারী)।
উপসংহার
সূরা আসর স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, নিছক মৌখিক ঈমান যথেষ্ট নয়; বরং ব্যক্তিগত আমলে সালেহ এবং সামষ্টিক সত্য ও ধৈর্যের আহ্বানই মানবজাতিকে মহাধ্বংস থেকে রক্ষা করার একমাত্র গ্যারান্টি।
৫। إنما الخمر والميسر والأنصاب والأزلام رجس من عمل الشيطان فاجتنبوه لعلكم تفلحون – إنما يريد الشيطان أن يوقع بينكم العداوة والبغضاء في الخمر والميسر ويصدكم عن ذكر الله وعن الصلوة فهل أنتم منتهون –
[রওয়ায়েউল বায়ান : সূরা আল-মায়েদাহ: ৯০-৯১ আয়াতের আলোকে মাদক ও জুয়ার বিধান]
[মান: ২০]
ভূমিকা ও পটভূমি
ইসলামি শরিয়তের অন্যতম মৌলিক লক্ষ্য হলো মানবজাতির বিবেক-বুদ্ধি, সম্পদ ও সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা করা। মদ ও জুয়া হলো শয়তানের এমন দুটি ফাঁদ যা মানুষের চেতনা ধ্বংস করে এবং সমাজে চিরস্থায়ী শত্রুতা সৃষ্টি করে। সূরা আল-মায়েদাহর আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা একে চূড়ান্তভাবে হারাম ঘোষণা করেছেন।
(الف) খামর, মায়সির, আনসাব ও আযলামের স্বতন্ত্র সংজ্ঞা
- ১. আল-খামর (الخمر): যা মানুষের বিবেক-বুদ্ধিকে আচ্ছন্ন ও মাতাল করে। আঙ্গুর, খেজুর, গম, যব বা আধুনিক যেকোনো রাসায়নিক উপাদান দিয়ে তৈরি মাদকই খামরের অন্তর্ভুক্ত।
- ২. আল-মায়সির (الميسر): জুয়া বা এমন যেকোনো বাজি খেলা যাতে কোনো পক্ষ বিনা পরিশ্রমে বা ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে অপরের সম্পদ আত্মসাৎ করে। এতে একদিকে লাভবান হওয়ার এবং অন্যদিকে নিঃস্ব হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
- ৩. আল-আনসাব (الأنصاب): মূর্তিপূজার উদ্দেশ্যে বা দেবদেবীর নামে পশু জবাই করার জন্য স্থাপিত বিশেষ পাথরের বেদী।
- ৪. আল-আযলাম (الأزلام): জাহেলী যুগে ভাগ্য নির্ধারণ বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য ব্যবহৃত তীর, যাতে ‘কর’ বা ‘করো না’ লেখা থাকত। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করত।
(ب) মদ্যপানের শারঈ শাস্তি (العقاب الشرعي لشرب الخمر)
- শাস্তির ধরন ও পরিমাণ: চার মাযহাবের ইমামগণের ঐকমত্য অনুযায়ী মদ্যপান একটি হদযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ। এর মূল শাস্তি হলো বেত্রাঘাত।
- হযরত আবু বকর (রা.)-এর যুগে ৪০টি বেত্রাঘাত করা হতো।
- হযরত উমর (রা.)-এর যুগে মানুষ যখন মদ্যপানে বেপরোয়া হতে শুরু করল, তখন তিনি সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করে হযরত আলী (রা.)-এর যুক্তির ভিত্তিতে শাস্তি ৮০ বেত্রাঘাতে উন্নীত করেন। হযরত আলী (রা.) যুক্তি দিয়েছিলেন: ‘মানুষ মদ পান করলে মাতাল হয়, মাতাল হলে প্রলাপ বকে এবং অপবাদ (কযফ) দেয়; আর অপবাদের শাস্তি কুরআনে ৮০ বেত্রাঘাত।’
- ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম মালেক (রহ.)-এর মতে মদ্যপানের নির্ধারিত হদ হলো ৮০ বেত্রাঘাত।
(ج) মদ হারামকরণের পর্যায়ক্রম ও সংশ্লিষ্ট আয়াতসমূহ
ইসলামের প্রজ্ঞাপূর্ণ সমাজ সংস্কারের নীতি অনুযায়ী চারটি ধাপে মদ নিষিদ্ধ করা হয়:
- প্রথম স্তর (সূরা আন-নাহল: ৬৭): ‘ওয়া মিন সামারাতির নাখীলি ওয়াল আ’নাবি তাত্তাখিযূনা মিনহু সাকারান ওয়া রিযকান হাসানা’—এতে মাতালকারী বস্তুকে উত্তম রিজিকের বিপরীতে উল্লেখ করে ইঙ্গিতপূর্ণ অপছন্দ প্রকাশ করা হয়।
- দ্বিতীয় স্তর (সূরা আল-বাকারা: ২১৯): ‘ইয়াসআলূনাকা আনিল খামরি ওয়াল মায়সির, কুল ফীহিমা ইছমুন কাবীরুন ওয়া মানাফি’উ লিন্নাস, ওয়া ইছমুহুমা আকবারু মিন নাফ’ইহিমা’—এতে বলা হলো এর ক্ষতি উপকারের চেয়ে বহুগুণ বড়।
- তৃতীয় স্তর (সূরা আন-নিসা: ৪৩): ‘লা তাকরাবুস সালাতা ওয়া আনতুম সুকারা’—সালাতের সময় মাতাল অবস্থায় মসজিদে আসা নিষিদ্ধ করা হয়।
- চতুর্থ স্তর (সূরা আল-মায়েদাহ: ৯০-৯১): ‘ইন্নামাল খামরু ওয়াল মায়সিরু… ফাজতানিভূহু’—একে অপবিত্র ও শয়তানের কাজ বলে চিরতরে পরিহার করার অকাট্য নির্দেশ দেওয়া হয়।
উপসংহার
মদের এই সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা মুসলিম সমাজের চরিত্র ও মানসিক সুস্থতার এক চিরন্তন সুরক্ষা কবচ।
৬। ما ننسخ من آية أو ننسها نأت بخير منها أو مثلها ألم تعلم أن الله على كل شيء قدير –
[রওয়ায়েউল বায়ান : সূরা আল-বাকারা: ১০৬ আয়াতের আলোকে নাসিখ-মানসূখের তাত্বিক বিশ্লেষণ]
[মান: ২০]
ভূমিকা ও পটভূমি
আল্লাহ তাআলা স্থান ও কালের প্রেক্ষাপটে বান্দার কল্যাণে পূর্ববর্তী কোনো বিধান রহিত করে নতুন বিধান প্রবর্তন করতে পারেন। ইহুদিরা কুরআনের বিধান পরিবর্তনের বিরোধিতা করে বলত যে আল্লাহ কেন আগের হুকুম বদলে দেন। তাদের বিভ্রান্তির জবাবে আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে নাসখের ঐশী বাস্তবতা ঘোষণা করেন।
(الف) সুন্নাহ দ্বারা কুরআনের বিধান রহিত (নাসখ) হওয়া জায়েজ কি না
এই বিষয়ে উসূলবিদ ও ফকীহগণের মধ্যে তিনটি প্রধান দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে:
- হানাফী ও মালেকী মাযহাবের অভিমত: সুন্নাহ যদি মুতাওয়াতির (বহু সূত্রে বর্ণিত) বা মশহুর হয়, তবে তা দ্বারা কুরআনের আম বিধান বা সাধারণ হুকুম নাসখ বা তাকসীস (নির্দিষ্টকরণ) করা সম্পূর্ণ জায়েজ। তাঁদের দলিল হলো: রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং ওহীর ব্যাখ্যাকার। যেমন কুরআনে অসিয়তের সাধারণ হুকুমকে হাদিসের মুতাওয়াতির বিধান ‘লা অসিয়্যাতা লিওয়ারিস’ (ওয়ারিশের জন্য কোনো অসিয়ত নেই) দ্বারা রহিত করা হয়েছে।
- ইমাম শাফেঈ ও আহমদ (রহ.)-এর অভিমত: কুরআন কেবল কুরআন দ্বারাই নাসখ হতে পারে; সুন্নাহ কুরআনের ব্যাখ্যা দিতে পারে কিন্তু সুন্নাহ দ্বারা কুরআনের সরাসরি আয়াত নাসখ হতে পারে না। তাঁদের দলিল হলো আলোচ্য আয়াতাংশ: ‘না’তি বিখাইরিন মিনহা আও মিছলিহা’—কুরআনের সমকক্ষ বা উত্তম কালাম কেবল আরেকটি কুরআনের আয়াতই হতে পারে, সুন্নাহ নয়।
(ب) কুরআনে কারীমে নাসখের প্রকারভেদ ও উদাহরণ
উসূলুল কুরআনের আলোকে নাসখ প্রধানত তিন প্রকার:
- ১. তেলাওয়াত ও হুকুম উভয়ই রহিত (نسخ التلاوة والحكم معا): আয়েশা (রা.) বর্ণিত দশবার স্তন্যপানের মাধ্যমে বিবাহ হারাম হওয়ার বিধান, যা পরবর্তীতে তেলাওয়াত ও হুকুম উভয় দিক থেকেই রহিত হয়ে যায়।
- ২. হুকুম রহিত কিন্তু তেলাওয়াত বহাল (نسخ الحكم وبقاء التلاوة): এটিই কুরআনে সর্বাধিক বিদ্যমান। যেমন: স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীর এক বছর ঘরে অবস্থানের নির্দেশ (সূরা বাকারা: ২৪০) রহিত হয়ে চার মাস দশ দিনের হুকুম (সূরা বাকারা: ২৩৪) প্রবর্তিত হয়েছে, কিন্তু উভয় আয়াতের তেলাওয়াত এখনো কুরআনে বহাল রয়েছে।
- ৩. তেলাওয়াত রহিত কিন্তু হুকুম বহাল (نسخ التلاوة وبقاء الحكم): বিবাহিত ব্যক্তির যেনার শাস্তি ‘রজম’ সংক্রান্ত আয়াতের শব্দাবলি কুরআনের মুসহাফ থেকে তেলাওয়াত রহিত হয়েছে, কিন্তু সুন্নাহ অনুযায়ী এর বিধান কিয়ামত পর্যন্ত বহাল রয়েছে।
(ج) নাসখের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ এবং এর শারঈ হিকমত
- সংজ্ঞা: আভিধানিক অর্থ দূর করা, পরিবর্তন করা বা স্থানান্তরিত করা। পরিভাষায় পূর্ববর্তী কোনো শারঈ বিধানকে পরবর্তী শারঈ দলীল দ্বারা প্রত্যাহার বা সমাপ্ত ঘোষণা করাকে নাসখ বলে।
- শারঈ হিকমত: মানুষের বাস্তব অবস্থার ক্রমোন্নয়ন ঘটানো, পূর্ববর্তী বিধানের চেয়ে অধিক সহজ ও কল্যাণকর বিধান দান করা এবং বান্দার আনুগত্য ও ঈমানের পরীক্ষা গ্রহণ করা।
উপসংহার
নাসিখ-মানসূখের জ্ঞান কুরআনের বিধিবিধানের ক্রমবিকাশ ও শরিয়তের গতিশীলতা অনুধাবনের এক অনন্য চাবিকাঠি।
৭। ما معنى الوحي لغة وشرعا؟ وكم طريقة لنزول الوحي؟ بين –
[ওহীর শাব্দিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা এবং ওহী নাযিলের বিভিন্ন পদ্ধতির বিশ্লেষণ]
[মান: ১০]
ভূমিকা
ওহী হলো নবুওয়াতের মূল ভিত্তি এবং আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী যোগাযোগের একমাত্র ঐশী মাধ্যম। ওহীর মাধ্যমেই আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীগণের কাছে মানবজাতির হেদায়েতের অকাট্য বাণী ও জীবনবিধান পাঠিয়েছেন।
الوحي-এর সংজ্ঞা
- আভিধানিক অর্থ: গোপনে ও দ্রুতগতিতে কোনো ইঙ্গিত বা বার্তা পৌঁছে দেওয়া।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: মহান আল্লাহ তাঁর নির্বাচিত কোনো নবীর অন্তরে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও অলৌকিক উপায়ে দ্বীনি জ্ঞান ও বিধানাবলি পৌঁছে দেওয়াকে ওহী বলে।
ওহী নাযিলের পদ্ধতি ও প্রকারভেদ (طرق نزول الوحي)
সূরা আশ-শূরার ৫১ নম্বর আয়াত এবং উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.)-এর প্রামাণ্য হাদিস অনুযায়ী ওহী প্রধানত নিম্নোক্ত পদ্ধতিতে নাযিল হতো:
- ১. ঘণ্টার ধ্বনির মতো (صلصلة الجرس): এটি ছিল ওহী নাযিলের সবচেয়ে কঠিন ও কষ্টদায়ক রূপ। প্রচণ্ড ঠাণ্ডার দিনেও রাসূল (সা.)-এর কপাল বেয়ে ঘাম ঝরে পড়ত এবং তিনি উটের পিঠে থাকলে উটটি মাটির সাথে মিশে যেত। এতে ওহীর প্রতিটি শব্দ নবীর হৃদয়ে অঙ্কিত হয়ে যেত।
- ২. মানুষের সুরতে ফেরেশতার আগমন: হযরত জিবরাঈল (আ.) মানুষের বেশে—বিশেষত বিশিষ্ট সাহাবী হযরত দিহয়াতুল কালবী (রা.)-এর আকৃতিতে—এসে কথা বলতেন। এটি ছিল সহজতর পদ্ধতি।
- ৩. জিবরাঈল (আ.)-এর আসল রূপ দর্শন: রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর জীবনে দুবার জিবরাঈল (আ.)-কে তাঁর আসল ছয়শত ডানা বিশিষ্ট দিগন্ত বিস্তৃত স্বরূপে প্রত্যক্ষ করেছেন।
- ৪. অন্তরে প্রক্ষেপণ (النفث في الروع): কোনো চাক্ষুষ আকৃতি ছাড়াই সরাসরি নবীর পবিত্র হৃদয়ে কোনো কথা ঢেলে দেওয়া।
- ৫. পর্দার অন্তরাল থেকে সরাসরি কথোপকথন: যেমন তূর পাহাড়ে মূসা (আ.) এবং মিরাজের রাতে বিশ্বনবী (সা.)-এর সাথে মহান আল্লাহ কোনো মাধ্যম ছাড়াই কথা বলেছেন।
- ৬. সত্য স্বপ্ন (الرؤيا الصادقة): নবুওয়াতের প্রারম্ভে নবীজী যে স্বপ্নই দেখতেন তা প্রভাত সূর্যের ন্যায় বাস্তবায়িত হতো।
উপসংহার
পবিত্র ওহীর এই বহুবিধ মাধ্যম প্রমাণ করে যে, আল্লাহর বাণী কোনো কল্পকাহিনী নয়, বরং এক পরম পরাক্রমশালী কুদরতি উপায়ে সংরক্ষিত ঐশী বার্তা।
৮। ما هو أسباب النزول؟ بين أهميتها في علوم التفسير –
[আসবাবে নুযূলের সংজ্ঞা এবং কুরআনের তাফসির ও বিধান অনুধাবনে এর অপরিহার্য গুরুত্ব]
[মান: ১০]
ভূমিকা
পবিত্র কুরআনের বহু আয়াত নির্দিষ্ট কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা, বিচারিক সংকট বা প্রশ্নের প্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয়েছে। এই পটভূমিকে আসবাবে নুযূল বলা হয়। ইমাম ওয়াহিদী নিসাপুরী যথার্থই বলেছেন: ‘কোনো আয়াতের শানে নুযূল না জেনে তার সঠিক তাফসীর করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।’
أسباب النزول-এর সংজ্ঞা
- সংজ্ঞা: ওহী নাযিলকালীন সময়ে যে বাস্তব ঘটনা বা প্রশ্নের প্রেক্ষিতে কুরআনের কোনো আয়াত বা অংশ নাযিল হয়েছে, তাকে ‘সববে নুযূল’ বা ‘আসবাবে নুযূল’ বলে।
- নির্ধারণের নীতি: এটি নিছক বুদ্ধি বা যুক্তির বিষয় নয়; বরং কেবল সাহাবায়ে কেরামের প্রত্যক্ষ চাক্ষুষ সহীহ বর্ণনার মাধ্যমেই আসবাবে নুযূল সাব্যস্ত হতে পারে।
علوم التفسير-এ আসবাবে নুযূলের গুরুত্ব
- ১. আয়াতের অন্তর্নিহিত প্রজ্ঞা অনুধাবন: বিধানটি কেন এবং কোন প্রেক্ষাপটে দেওয়া হয়েছে তা জানলে বিধানের ন্যায্যতা ও সৌন্দর্য ফুটে ওঠে।
- ২. ভুল ব্যাখ্যা ও বিভ্রান্তি থেকে সুরক্ষা: আয়াতের প্রেক্ষাপট না জানলে ভুল ব্যাখ্যা তৈরি হতে পারে। যেমন এক সাহাবী মনে করেছিলেন ‘লা তাকরাবুস সালাতা ওয়া আনতুম সুকারা’ সাধারণ সময়ের জন্যও প্রযোজ্য কি না, কিন্তু শানে নুযূল জানার পর স্পষ্ট হয় যে এটি মদ হারামকরণের প্রাথমিক রূপ ছিল।
- ৩. বিধানের সাধারণত্ব বনাম বিশেষত্ব নির্ধারণ: উসূলের মূলনীতি হলো: ‘আল-ইবরাতু বিউমূমিল লাফয, লা বিখুসূসিস সাবাব’—শব্দের সাধারণ অর্থই গ্রহণযোগ্য, সুনির্দিষ্ট ঘটনার মধ্যেই বিধান সীমাবদ্ধ নয়। কিন্তু শানে নুযূল না জানলে শব্দের পরিধি নির্ধারণ করা যায় না।
- ৪. জটিল আয়াতের অস্পষ্টতা দূরীকরণ: যেমন মারওয়া ও সাফা পাহাড়ে তাওয়াফ প্রসঙ্গে ‘ফালা জুনাহা আলাইহি আই ইয়াত্তাওয়াফা বিহিমা’ (কোনো দোষ নেই)-এর বাহ্যিক অর্থে মনে হতে পারে তাওয়াফ ঐচ্ছিক। কিন্তু শানে নুযূল থেকে জানা যায় যে জাহেলী যুগে সেখানে দুটি মূর্তি থাকায় সাহাবীরা তাওয়াফ করতে ইতস্তত করছিলেন; তখন আল্লাহ অভয় দিয়ে বলেন এতে কোনো পাপ নেই, বরং এটি ইসলামের আবশ্যকীয় রুকন।
উপসংহার
আসবাবে নুযূল হলো কুরআনের মূল টেক্সটের ঐতিহাসিক ও বাস্তবিক চাবিকাঠি, যা আয়াতের প্রাণশক্তিকে জীবন্ত করে তোলে।
৯। عرف التفسير – ثم بين نشأة علم التفسير وتطوره –
[তাফসিরের সংজ্ঞা এবং নবীযুগ থেকে সংকলন যুগ পর্যন্ত তাফসির শাস্ত্রের ক্রমবিকাশের ইতিহাস]
[মান: ১০]
ভূমিকা
ইসলামি জ্ঞানরাজ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ শাস্ত্র হলো ‘ইলমে তাফসীর’। স্বয়ং কালামুল্লাহর অর্থ ও মর্ম উদ্ঘাটনের সাথে সংশ্লিষ্ট হওয়ায় প্রাচীনকাল থেকেই উম্মাহর শ্রেষ্ঠ মনীষীগণ এই বিজ্ঞানের সাধনায় নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন।
التفسير-এর সংজ্ঞা
- আভিধানিক অর্থ: কোনো আবৃত বিষয়কে স্পষ্ট করা, বিশদ ব্যাখ্যা করা ও অর্থ উন্মোচন করা।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: আল্লামা যারকাশী (রহ.)-এর মতে: ‘ইলমে তাফসীর হলো এমন এক শাস্ত্র যার সাহায্যে বিশ্বজাহানের প্রতিপালকের কালামের অর্থ, এর অন্তর্নিহিত হিকমত এবং নির্দেশনাবলী পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুধাবন করা যায়।’
তাফসির শাস্ত্রের ঐতিহাসিক উদ্ভব ও ক্রমবিকাশের পর্যায়ক্রম
- প্রথম যুগ (নবীযুগ): রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন প্রথম ও শ্রেষ্ঠ মুফাসসির। তিনি সাহাবীদের আয়াত পাঠ করার সাথে সাথে এর প্রয়োগিক ব্যাখ্যা ও আমল শিক্ষা দিতেন।
- দ্বিতীয় যুগ (সাহাবী যুগ): চার খলীফা ছাড়া হযরত ইবনে আব্বাস (যাঁকে নবীজী তাফসিরের বিশেষ দোয়া দিয়েছিলেন), ইবনে মাসউদ ও উবাই ইবনে কা’ব (রা.) ছিলেন তাফসিরের মূল স্তম্ভ। তাঁরা মূলত কুরআন ও হাদিসের আলোকেই ব্যাখ্যা করতেন।
- তৃতীয় যুগ (তাবেঈ যুগ): এই যুগে তিনটি বিখ্যাত তাফসীর স্কুল গড়ে ওঠে:
- মক্কা স্কুল: ইবনে আব্বাস (রা.)-এর ছাত্র মুজাহিদ, আতা ও ইকরামা (রহ.)।
- মদিনা স্কুল: উবাই ইবনে কা’ব (রা.)-এর ছাত্র যায়েদ ইবনে আসলাম ও আবুল আলিয়া (রহ.)।
- ইরাক (কুফা) স্কুল: ইবনে মাসউদ (রা.)-এর ছাত্র আলকামা ও আসওয়াদ (রহ.)।
- চতুর্থ যুগ (গ্রন্থাকারে সংকলন যুগ): আব্বাসীয় যুগে ইমাম ইবনে জারীর আত-তাবারী (রহ.) ‘জামেউল বায়ান’ রচনার মাধ্যমে সনদভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ তাফসিরের স্বর্ণযুগ সূচনা করেন। পরবর্তীতে ইবনে কাসীর, কুরতুবী ও ফখরুদ্দীন রাযীর মতো মহান মুফাসসিরগণ এই বিজ্ঞানকে বিশ্বসাহিত্যের উচ্চতায় পৌঁছে দেন।
উপসংহার
তাফসিরের এই সমৃদ্ধ ঐতিহ্য প্রমাণ করে যে, ওহীর বাণী প্রতিটি যুগে সমকালীন চিন্তাকে পথ দেখিয়ে চিরভাস্বর হয়ে রয়েছে।
১০। اكتب مناهج جمع القرآن في عهد النبي صلى الله عليه وسلم وفي عهد الخليفة أبي بكر الصديق (رض) مفصلا –
[নবী করীম (সা.) ও খলীফা হযরত আবু বকর (রা.)-এর যুগে কুরআন সংকলনের ঐতিহাসিক পদ্ধতি]
[মান: ১০]
ভূমিকা
পবিত্র কুরআন হলো মানবজাতির জন্য আল্লাহর চূড়ান্ত আসমানী কিতাব। আল্লাহ তাআলা নিজেই এর সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন: ‘ইন্না নাহনু নায্যালনায যিকরা ওয়া ইন্না লাহু লাহাফিযূন’। এই ঐশী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়েছে নবীযুগ ও খুলাফায়ে রাশেদীনের নিখুঁত বৈজ্ঞানিক সংরক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমে।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে কুরআন সংকলন ও সংরক্ষণ পদ্ধতি
নবীযুগে কুরআন সংরক্ষণের পদ্ধতি ছিল দ্বিমুখী:
- স্মৃতিতে সংরক্ষণ (الحفظ في الصدور): আরবদের অসাধারণ স্মরণশক্তি ছিল। শত শত সাহাবী সমগ্র কুরআন মুখস্থ করে অন্তরে ধারণ করেছিলেন। প্রতি রমজানে জিবরাঈল (আ.) নবীজীর সাথে সম্পূর্ণ কুরআন পুনরাবৃত্তি (দাওর) করতেন। জীবনের শেষ রমজানে এটি দুবার সম্পন্ন হয়েছিল।
- লিপিবদ্ধকরণ (الكتابة في السطور): ওহী নাজিল হওয়ামাত্র রাসূল (সা.) ওহী লেখকদের (যেমন হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত, আলী, উবাই ইবনে কা’ব) ডেকে বলতেন: অমুক আয়াতের পাশে অমুক সূরায় এটি লিপিবদ্ধ কর। তাঁরা চামড়া, চ্যাপ্টা পাথর, খেজুরের ডাল ও পশুর হাড্ডিতে তা লিখে রাখতেন। তবে তখন তা একটি বাঁধাইকৃত খণ্ডে একত্রিত ছিল না, বরং বিভিন্ন পাতায় বিক্ষিপ্ত ছিল।
হযরত আবু বকর (রা.)-এর যুগে সুসংহত সংকলন পদ্ধতি
হযরত আবু বকর (রা.)-এর খিলাফতকালে সংকলনের পদক্ষেপ ছিল যুগান্তকারী:
- প্রেক্ষাপট: ভণ্ড নবী মুসাইলামা কাযযাবের বিরুদ্ধে পরিচালিত রক্তক্ষয়ী ইয়ামামার যুদ্ধে প্রায় ৭০ জন বিশিষ্ট হাফেজে কুরআন সাহাবী শাহাদাতবরণ করেন। এতে হযরত উমর (রা.) শঙ্কিত হয়ে খলীফা আবু বকর (রা.)-কে কুরআনকে গ্রন্থাকারে একত্রিত করার প্রস্তাব দেন।
- যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর নেতৃত্বে কমিটি: ওহীর প্রধান কাতিব এবং প্রখর স্মৃতিসম্পন্ন তরুণ সাহাবী যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-কে এই কাজের সার্বিক দায়িত্ব দেওয়া হয়।
- কঠোর বৈজ্ঞানিক নীতি: যায়েদ (রা.) কেবল নিজের স্মৃতি বা কারো মুখের কথার ওপর নির্ভর করেননি। তিনি দুটি কঠোর শর্তারোপ করেন:
- রাসূল (সা.)-এর সামনে লিখিত মূল পাণ্ডুলিপি হতে হবে।
- ন্যূনতম দুজন নির্ভরযোগ্য চাক্ষুষ সাক্ষী সাক্ষ্য দিতে হবে যে এটি নবীজীর সামনেই লিখিত হয়েছিল।
- মুসহাফের রূপদান: এই কঠোর পদ্ধতিতে সূরা ফাতিহা থেকে সূরা নাস পর্যন্ত সম্পূর্ণ কুরআনকে অত্যন্ত সুবিন্যস্তভাবে একটি মলাটবদ্ধ পূর্ণাঙ্গ পাণ্ডুলিপিতে (মুসহাফ) রূপ দেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে হযরত উমর (রা.) এবং তাঁর পর উম্মুল মুমিনীন হাফসা (রা.)-এর কাছে সংরক্ষিত ছিল।
উপসংহার
এই অতুলনীয় সততা ও ঐতিহাসিক সতর্কতার মাধ্যমেই আল্লাহর কালাম কিয়ামত পর্যন্ত এক হরফও পরিবর্তন হওয়া থেকে অলৌকিকভাবে সুরক্ষিত হয়েছে।
১১। ما هو التقوى؟ ثم بين أهمية التقوى وفضيلته مع ذكر أوصاف المتقين –
[তাকওয়ার সংজ্ঞা, ফজিলত এবং পবিত্র কুরআনের আলোকে মুত্তাকীদের বৈশিষ্ট্যাবলি]
[মান: ১০]
ভূমিকা
ইসলামি জীবনব্যবস্থায় মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার একমাত্র চূড়ান্ত মাপকাঠি হলো ‘তাকওয়া’। কোনো বংশগৌরব, ধনসম্পদ বা সামাজিক পদমর্যাদা আল্লাহর দরবারে মানুষের সম্মান নির্ধারণ করে না; বরং অন্তরের খোদাভীতি ও পাপমুক্ত জীবনই হলো মানুষের প্রকৃত সৌন্দর্য।
التقوى-এর সংজ্ঞা
- আভিধানিক অর্থ: আত্মরক্ষা করা, বেঁচে থাকা, কোনো ক্ষতিকর বস্তু থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: মহান আল্লাহর ভয় অন্তরে জাগ্রত রেখে তাঁর যাবতীয় আদেশ পালন করা এবং তাঁর সকল নিষেধ ও অপছন্দনীয় কাজ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখাকে তাকওয়া বলে।
- হযরত উমর ও উবাই ইবনে কা’ব (রা.)-এর উপমা: হযরত উমর (রা.) তাকওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে উবাই (রা.) বললেন: আপনি কি কখনো কাঁটাযুক্ত সংকীর্ণ পথে চলেছেন? উমর বললেন: হ্যাঁ। উবাই বললেন: তখন কীভাবে চলেছেন? উমর বললেন: আমি আমার কাপড় গুটিয়ে অত্যন্ত সাবধানে পা ফেলে চলেছি যাতে কাঁটা না লাগে। উবাই (রা.) বললেন: এটাই হলো তাকওয়া—পাপপঙ্কিলময় দুনিয়ায় নিজের চরিত্র বাঁচিয়ে সতর্কতার সাথে জীবন পরিচালনা করা।
তাকওয়ার গুরুত্ব ও ফজিলত
- আল্লাহর দরবারে সম্মানের মানদণ্ড: সূরা আল-হুজুরাতের ১৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেন: ‘নিশ্চয় আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত ব্যক্তি সে, যে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক মুত্তাকী।’
- আল্লাহর অভিভাবকত্ব ও সাহায্য: কুরআনে বলা হয়েছে: ‘নিশ্চয় আল্লাহ মুত্তাকীদের সঙ্গে রয়েছেন।’
- বিপদ থেকে মুক্তি ও অপ্রত্যাশিত রিজিক: সূরা তালাকের ২-৩ আয়াতে ঘোষণা করা হয়েছে: যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহ তার জন্য মুক্তির পথ বের করে দেবেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেবেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।
পবিত্র কুরআনে বর্ণিত মুত্তাকীদের গুণাবলি (أوصاف المتقين)
সূরা আল-বাকারার ২-৪ আয়াত এবং সূরা আলে ইমরানের ১৩৩-১৩৫ আয়াতে মুত্তাকীদের প্রধান গুণাবলি তুলে ধরা হয়েছে:
- তারা অদৃশ্যে (গায়েবে) বিশ্বাস স্থাপন করে।
- তারা নিয়মিত ও বিনম্রভাবে সালাত কায়েম করে।
- আল্লাহর দেওয়া রিজিক থেকে প্রকাশ্যে ও গোপনে দান করে।
- পূর্ববর্তী সকল আসমানী কিতাব ও পরকালের ওপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখে।
- তারা রাগ নিয়ন্ত্রণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে দেয়।
- কখনো কোনো ভুল বা পাপ সংঘটিত হয়ে গেলে তাৎক্ষণিকভাবে আল্লাহর স্মরণে তওবা ও ইস্তিগফার করে।
উপসংহার
তাকওয়াপূর্ণ জীবন গঠনই হলো দুনিয়াতে মানসিক শান্তি ও আখিরাতে জান্নাত লাভের একমাত্র নিশ্চিত সোপান।
১২। تحدث عن حقوق المرأة في المجتمع الإسلامي مفصلا –
[ইসলামি সমাজব্যবস্থায় নারীর মানবিক, অর্থনৈতিক, পারিবারিক ও সামাজিক অধিকারসমূহ]
[মান: ১০]
ভূমিকা
ইসলাম-পূর্ব অন্ধকার জাহেলী যুগে নারীদের মানুষ হিসেবেই গণ্য করা হতো না; কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো এবং নারীকে ভোগ্যপণ্য মনে করা হতো। ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) নারীকে পদদলিত অবস্থা থেকে তুলে এনে সম্মান ও মর্যাদার সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন।
ইসলামে নারীর প্রধান অধিকারসমূহ
- ১. মানবিক মর্যাদা ও সমতা: আত্মিক ও মানবিক মর্যাদায় নারী ও পুরুষকে সমান করা হয়েছে। সূরা আন-নিসার ১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে উভয়কে একই মূল সত্তা থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। নেক আমলের প্রতিদানে উভয়েই সমান সওয়াব লাভ করবে।
- ২. অর্থনৈতিক স্বাধিকার ও সম্পত্তির অধিকার:
- ইসলাম নারীকে নিজস্ব সম্পত্তির নিরঙ্কুশ মালিকানা দিয়েছে। পিতা, স্বামী বা ভাইয়ের সম্পত্তিতে নারীর উত্তরাধিকার কুরআনের অকাট্য নির্দেশ দ্বারা নির্ধারিত (সূরা নিসা: ৭)।
- বিবাহের সময় বাধ্যতামূলক দেনমোহর লাভ এবং বিবাহোত্তর জীবনে যাবতীয় ভরণপোষণের দায়িত্ব সম্পূর্ণ স্বামীর ওপর ন্যস্ত; নারীর উপার্জিত অর্থ তার একান্ত নিজস্ব।
- ৩. পারিবারিক মর্যাদা (মা, স্ত্রী ও কন্যা হিসেবে):
- মা হিসেবে: মায়ের মর্যাদা পিতার চেয়ে তিনগুণ বেশি ঘোষণা করে নবীজী বলেছেন: ‘মায়ের পদতলে সন্তানের জান্নাত।’
- স্ত্রী হিসেবে: স্বামীর উত্তম ব্যবহারের মাপকাঠি নির্ধারণ করে বলা হয়েছে: ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সে, যে তার স্ত্রীর কাছে সর্বোত্তম।’
- কন্যা হিসেবে: কন্যাসন্তানকে লালন-পালনকারী পিতার জন্য জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে।
- ৪. শিক্ষা ও জ্ঞানার্জনের অধিকার: রাসূল (সা.) বলেছেন: ‘ইলম অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর ওপর ফরজ।’ উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) ছিলেন তৎকালীন শ্রেষ্ঠ ফকীহ ও শিক্ষক।
- ৫. বিবাহের সম্মতি ও ব্যক্তিত্বের স্বাধীনতা: নারীর সম্মতি ছাড়া জোরপূর্বক বিবাহ দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং ক্ষেত্রবিশেষে খুলা বা বিচ্ছেদের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।
উপসংহার
ইসলাম নারীকে যে অধিকার ও সম্মান দিয়েছে, তা প্রাচ্য বা পাশ্চাত্যের কোনো মানব রচিত দর্শন আজও প্রদান করতে পারেনি।
১৩। ما هو الإرهاب وما هي أسبابه؟ اذكر الوسائل لدفعه –
[সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা, এর মূল কারণসমূহ এবং তা প্রতিরোধে কার্যকর ইসলামি রূপরেখা]
[মান: ১০]
ভূমিকা
‘ইসলাম’ শব্দের মূল অর্থই হলো শান্তি, আত্মসমর্পণ ও নিরাপত্তা। ইসলাম কোনো রূপ সহিংসতা, চরমপন্থা বা সন্ত্রাসকে সমর্থন করে না। পবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে: ‘যে ব্যক্তি কোনো মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করল, সে যেন গোটা মানবজাতিকেই হত্যা করল।’ (সূরা আল-মায়েদাহ: ৩২)। অতএব ইসলামি দর্শনে সন্ত্রাসবাদ এক মারাত্মক অমার্জনীয় অপরাধ।
الإرهاب (সন্ত্রাসবাদ)-এর সংজ্ঞা
- সংজ্ঞা: কোনো রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা গোষ্ঠীগত স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে সাধারণ নিরাপরাধ মানুষের ওপর ভীতি, ত্রাস, হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রে নৈরাজ্য সৃষ্টি করাকে সন্ত্রাসবাদ (ইরহাব) বলা হয়। ইসলামে একে ‘ফাসাদ ফিল আরদ’ (জমিনে বিপর্যয় সৃষ্টি) এবং ‘হিরাবাহ’ (ডাকাতি ও চরম বিশৃঙ্খলা) হিসেবে আখ্যায়িত করে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
সন্ত্রাসবাদের প্রধান কারণসমূহ (أسبابه)
- ১. ধর্মীয় অজ্ঞতা ও চরমপন্থা (الغلو في الدين): কুরআনের আয়াতের ভুল প্রেক্ষাপটহীন ব্যাখ্যা করে চরমপন্থী মানসিকতা গড়ে তোলা। খারেজীরা এই অজ্ঞতার কারণেই বহু সাহাবীকে কাফের আখ্যা দিয়ে হত্যা করেছিল।
- ২. সামাজিক ও রাজনৈতিক অবিচার: রাষ্ট্রে আইনের শাসন না থাকা, জুলুম, নির্যাতন এবং রাজনৈতিক অধিকার হরণের ফলে যুবসমাজ বিপথগামী হয়।
- ৩. অর্থনৈতিক দারিদ্র্য ও বেকারত্ব: কর্মসংস্থানের অভাব এবং চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য সন্ত্রাসবাদের উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করে।
- ৪. সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন: ফিলিস্তিনসহ মুসলিম ভূখণ্ডে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অবৈধ দখলদারিত্ব ও নির্যাতন প্রতিশোধস্পৃহা জাগ্রত করে।
সন্ত্রাসবাদ দমনে কার্যকর উপায়সমূহ (وسائل لدفعه)
- বিশুদ্ধ ইসলামি শিক্ষার প্রচার: মধ্যমপন্থা (ওয়াসাত্বিয়াহ) এবং ইসলামের শান্তির বাণী সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো।
- সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা: বর্ণ ও ধর্ম নির্বিশেষে সকলের মানবিক ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা।
- যুবসমাজের কর্মসংস্থান ও ক্ষমতায়ন: বেকারত্ব দূরীকরণ ও ইতিবাচক সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুবসমাজকে সম্পৃক্ত করা।
- আইনের কঠোর প্রয়োগ: সন্ত্রাসী ও নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর বিচারিক পদক্ষেপ গ্রহণ।
উপসংহার
ইসলামের মহান আদর্শ ও সার্বজনীন মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই বিশ্ব থেকে সন্ত্রাসবাদের বিষবৃক্ষ সমূলে উৎপাটন করা সম্ভব।
১৪। اذكر معنى الفساد لغة وشرعا – ثم هات الأدلة على منع الفساد في الأرض –
[ফাসাদের আভিধানিক ও পারিভাষিক তাৎপর্য এবং জমিনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির নিষেধাজ্ঞায় অকাট্য দলীলসমূহ]
[মান: ১০]
ভূমিকা
আল্লাহ তাআলা এই পৃথিবীকে এক সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও ভারসাম্যপূর্ণ নিয়মে সৃষ্টি করেছেন। এই প্রাকৃতিক, সামাজিক ও নৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করাকেই বলা হয় ‘ফাসাদ’। ইসলাম সমাজে শান্তি কায়েম রাখতে ফাসাদের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান গ্রহণ করেছে।
الفساد-এর সংজ্ঞা
- আভিধানিক অর্থ: ‘ফাসাদ’ (الفساد) অর্থ হলো ধ্বংস হওয়া, নষ্ট হওয়া, ক্ষতিকর হওয়া, কোনো জিনিসের ভারসাম্য হারিয়ে বিকৃত হয়ে যাওয়া। এটি ‘সালাহ’ (সংশোধন বা কল্যাণ)-এর বিপরীত।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: মহান আল্লাহর আনুগত্য থেকে বিচ্যুত হয়ে এমন কোনো কথা, কাজ বা নীতি অবলম্বন করা যার ফলে জমিনে অন্যায়, অবিচার, হানাহানি, পরিবেশ বিনাশ এবং সামাজিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়।
জমিনে ফাসাদ সৃষ্টির নিষেধাজ্ঞায় কুরআন ও সুন্নাহর অকাট্য দলীলসমূহ
- কুরআনের দ্ব্যর্থহীন নিষেধাজ্ঞা:
- সূরা আল-আ’রাফের ৫৬ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে: ‘ওয়ালা তুফসিদূ ফিল আরদি বা’দা ইসলাহিহা’—আর তোমরা পৃথিবীতে শান্তি ও সংস্কার সাধনের পর তাতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না।
- সূরা আল-বাকারার ২০৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: ‘ওয়াল্লাহু লা ইয়ুহিব্বুল ফাসাদ’—আর আল্লাহ কোনো রূপ ফাসাদ ও বিপর্যয় পছন্দ করেন না।
- সূরা আল-কাসাসের ৭৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা কারূণকে সতর্ক করে বলেন: ‘ওয়ালা তাবগিল ফাসাদা ফিল আরদ, ইন্নাল্লাহা লা ইয়ুহিব্বুল মুফসিদীন’—আর তুমি জমিনে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চেয়ো না; নিশ্চয় আল্লাহ ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের ভালোবাসেন না।
- সুন্নাহর আলোকপাত:
- রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: ‘লা যারা-রা ওয়ালা যিরার’—ইসলামে নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং অপরের ক্ষতি সাধন করার কোনো অবকাশ নেই। (ইবনে মাজাহ)।
- হাদিসে সমাজে ফিতনা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকে ঘুমন্ত বিষবাষ্পের সাথে তুলনা করে বলা হয়েছে: ‘ফিতনা ঘুমিয়ে থাকে; যে ব্যক্তি একে জাগ্রত করে তার ওপর আল্লাহর লানত।’
উপসংহার
পৃথিবীতে শান্তি, সুবিচার ও টেকসই কল্যাণ নিশ্চিত করতে হলে সর্বস্তরের ফাসাদ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া প্রতিটি মুমিনের পবিত্র ঈমানী দায়িত্ব।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
ফাযিল ১ম বর্ষ তাফসীরুল কুরআন ২০২২ বিষয়ের কোড কত ছিল?
বিষয় কোড ছিল ১০১ (উলূমুল কুরআন ওয়াল হাদীস ১ম পত্র)।
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.)-এর পবিত্রতা কুরআনের কোন সূরায় ঘোষিত হয়েছে?
সূরা আন-নূরের ১১ থেকে ২০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ স্বয়ং উম্মুল মুমিনীনের পবিত্রতা ঘোষণা করেছেন।
সূরা আন-নাসরে কোন ঐতিহাসিক বিজয়ের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে?
ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়ের সুসংবাদ এবং দলে দলে মানুষের ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
ইমাম শাফেঈ (রহ.) কুরআনের কোন সূরা সম্পর্কে যুগান্তকারী মন্তব্য করেছিলেন?
সূরা আল-আসর সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, মানুষ চিন্তা করলে কেবল এই একটি সূরাই সমগ্র হেদায়েতের জন্য যথেষ্ট হতো।
হযরত উমর (রা.)-এর যুগে মদ্যপানের শাস্তি কত বেত্রাঘাত নির্ধারণ করা হয়েছিল?
হযরত আলী (রা.)-এর সাথে পরামর্শের ভিত্তিতে মদ্যপানের শাস্তি ৮০ বেত্রাঘাতে উন্নীত করা হয়েছিল।
হযরত আবু বকর (রা.)-এর যুগে কুরআন সংকলন বোর্ডের প্রধান কে ছিলেন?
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রধান ওহী লেখক হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) ছিলেন এই বোর্ডের প্রধান।

