ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়
ফাযিল (স্নাতক) পাস ১ম বর্ষ পরীক্ষা—২০২৪
বিষয়: ইলমুল ফিরাক্ব — ৩য় পত্র (আল-ফিরক্বুল মু‘আসিরাহ বা সমকালীন ফেরকাসমূহ)
বিষয় কোড: ১১১০২২
পূর্ণমান: ১০০ | সময়: ৩ ঘণ্টা
[দ্রষ্টব্য: ‘ক’ বিভাগ হতে যেকোনো ৫টি এবং ‘খ’ বিভাগ হতে যেকোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
ক-অংশ (মান: ১৬ × ৫ = ৮০)
১। من هم الإباضية؟ بين عقيدتهم في صفات الله تعالى –
[ইবাদিয়া কারা? আল্লাহর গুণাবলির ব্যাপারে তাদের আকিদা বর্ণনা কর।]
[মান: ১৬]
ভূমিকা ও পরিচিতি
ইসলামের ইতিহাসের সূচনালগ্নে সিফফিনের যুদ্ধের তাহকীমের জের ধরে যে চরমপন্থী খারেজী সম্প্রদায়ের জন্ম হয়েছিল, তাদের একটি অত্যন্ত সুসংগঠিত, তুলনামূলক মধ্যপন্থী এবং বর্তমান কাল পর্যন্ত টিকে থাকা একমাত্র শাখা হলো ‘আল-ইবাযিয়্যাহ’ (الإباضية)। অন্যান্য উগ্র খারেজী উপদল যেমন আযারেকা বা নাজদাত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেলেও ইবাযিয়্যারা তাদের রাজনৈতিক নমনীয়তার কারণে আজও ওমান সালতানাত, উত্তর আফ্রিকার আলজেরিয়ার মযাব উপত্যকা, তিউনিসিয়ার জারবা দ্বীপ এবং লিবিয়ার জুফরা অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বিদ্যমান রয়েছে।
ইবাযিয়্যা সম্প্রদায়ের নামকরণ ও প্রতিষ্ঠাতা
- নামকরণ: এই দলের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল্লাহ ইবনে ইবায আল-মুক্বাঈসী আল-মুররী আত-তামীমী (রহ.)-এর নামানুসারে এদের ‘ইবাযিয়্যাহ’ বলা হয়। তিনি প্রথম হিজরি শতকের শেষভাগে বসরার রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অঙ্গনে আত্মপ্রকাশ করেন।
- প্রকৃত ইলমী ইমাম: ঐতিহাসিকদের মতে আব্দুল্লাহ ইবনে ইবায ছিলেন এই দলের রাজনৈতিক মুখপাত্র; তবে তাদের প্রকৃত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠাতা ও ইলমী ব্যক্তিত্ব ছিলেন তাবেঈ ইমাম জাবির ইবনে যায়েদ আল-আযদী (রহ.)। যদিও আহলুস সুন্নাহর গবেষকগণ প্রমাণ করেছেন যে ইমাম জাবির ইবনে যায়েদ খারেজীদের উগ্র আক্বিদা থেকে মুক্ত ও সালাফের অনুসারী ছিলেন, কিন্তু ইবাযিয়্যারা তাঁকে তাদের প্রধান ফক্বীহ দাবি করে।
আহলুস সুন্নাহ ও অন্যান্য খারেজীদের সাথে ইবাযিয়্যাদের পার্থক্য
চরমপন্থী খারেজীদের নেতা নাফে ইবনে আল-আযরাক্ব সাধারণ মুসলমানদের মুশরিক দাবি করে তাদের নারী-শিশুদের হত্যা বৈধ মনে করত। কিন্তু আব্দুল্লাহ ইবনে ইবায এর তীব্র বিরোধিতা করে ঘোষণা করেন: ‘যারা আমাদের বিরোধী তারা মুশরিক নয়; বরং তারা কুফরে নি‘মতের অন্তর্ভুক্ত কাফের (ক্বওমুন কুফফারুন বি নি‘মাহ, লা কুফফারা শিরক)।’ ফলে তারা অ-ইবাযী মুসলমানদের রক্ত ও সম্পদকে হারাম ঘোষণা করে এবং তাদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক ও মিরাস বণ্টন বৈধ মনে করে।
আল্লাহর সিফাত (গুণাবলি) সম্পর্কে ইবাযিয়্যাদের আকিদা
আকিদাগতভাবে ইবাযিয়্যারা খারেজী হলেও পরবর্তীকালে তারা কালামশাস্ত্র ও সিফাতের ক্ষেত্রে হুবহু মু‘তাযিলাদের নীতি গ্রহণ করেছে। আল্লাহর সিফাতের ক্ষেত্রে তাদের প্রধান আকিদাসমূহ নিম্নরূপ:
- ১. সিফাতে জাতী অস্বীকার ও তা’তীল: ইবাযিয়্যারা আল্লাহর সত্তাতিরিক্ত কোনো সিফাত স্বীকার করে না। তারা বলে: ‘আল্লাহর সত্তাই জ্ঞান, সত্তাই ক্ষমতা; অতিরিক্ত কোনো ইলম বা কুদরত নেই।’ এটি মূলত মুতাযিলাদের মতোই আল্লাহর গুণাবলিকে অর্থহীন ও বাতিল করার শামিল।
- ২. কুরআন মাজিদ সৃষ্ট (خلق القرآن) বলে বিশ্বাস: আহলুস সুন্নাহর সর্বসম্মত আকিদা হলো কুরআন আল্লাহর শাশ্বত ও অসৃষ্ট বাণী (কালামুল্লাহ গায়রু মাখলুক্ব)। কিন্তু ইবাযিয়্যারা কুরআনকে আল্লাহর সৃষ্টি (মাখলুক্ব) বলে বিশ্বাস করে।
- ৩. আখেরাতে আল্লাহর দিদার অস্বীকার (نفي رؤية الله): আহলুস সুন্নাহর অকাট্য আকিদা হলো জান্নাতে মুমিনরা স্বচক্ষে আল্লাহকে দেখতে পাবেন। কিন্তু ইবাযিয়্যারা মুতাযিলাদের মতো দাবি করে—আল্লাহকে দুনিয়া ও আখেরাত কোথাও দেখা সম্ভব নয়। তারা সূরা আল-কিয়ামাহর ﴿وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ نَاضِرَةٌ إِلَى رَبِّهَا نَاظِرَةٌ﴾ আয়াতের মনগড়া তা’বীল বা অপব্যাখ্যা করে বলে এখানে ‘নাযিরাহ’ অর্থ আল্লাহর সওয়াবের প্রতীক্ষা করা।
- ৪. আল্লাহর খবরী সিফাতের তা’বীল: কুরআনে উল্লেখিত আল্লাহর হাত (ইয়্যাদ), চেহারা (ওয়াজহ), আরশে সমাসীন হওয়া (ইস্তিমা) ইত্যাদিকে তারা রূপক অর্থে ব্যাখ্যা করে কুদরত, রহমত বা কর্তৃত্ব অর্থ করে থাকে।
উপসংহার
ইবাযিয়্যারা রক্তপাতের দিক থেকে প্রাচীন খারেজীদের চেয়ে অনেক নমনীয় হলেও আকিদাগতভাবে তারা আল্লাহর সিফাতের অপব্যাখ্যা ও অস্বীকারে মুতাযিলাদেরই প্রতিচ্ছবি।
২। ما المراد بالقرآنيين؟ وما موقفهم من السنة النبوية؟ بين –
[কুরআনি বা আহলে কুরআন দ্বারা কী উদ্দেশ্য? সুন্নাহর প্রতি তাদের মনোভাব কী? বর্ণনা কর।]
[মান: ১৬]
‘আল-কুরআনিয়্যূন’ বা আহলে কুরআনের পরিচয় ও উদ্ভব
সমকালীন ইসলামি বিশ্বে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ ও প্রাচ্যবিদদের (ওরিয়েন্টালিস্ট) বুদ্ধিবৃত্তিক ষড়যন্ত্রের ফলে উদ্ভূত এক চরম বিভ্রান্ত আধুনিকতাবাদী গোষ্ঠীর নাম হলো ‘আল-কুরআনিয়্যূন’ (القرآنيون) বা তথাকথিত ‘আহলে কুরআন’ (সুন্নাহ অস্বীকারকারী দল)। তারা বাহ্যিকভাবে নিজেদের কুরআনপ্রেমিক সাজিয়ে দাবি করে—‘ইসলামের একমাত্র উৎস হলো কুরআন; রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস ও সুন্নাহ দ্বীনের কোনো দলিল নয়।’ অথচ এটি মূলত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রিসালাতকে অস্বীকার করে ইসলামি শরিয়তের প্রাসাদকে সমূলে ধসিয়ে দেওয়ার এক গোপন চক্রান্ত।
ঐতিহাসিক পটভূমি
উনিশ শতকের শেষভাগে ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে ও মিশরে এই ফেতনার আত্মপ্রকাশ ঘটে। ভারতে মৌলভি আব্দুল্লাহ চকড়ালবী, আহমদ দীন অমৃতসরী, আসলাম জিরাজপুরী এবং পরবর্তীকালে গোলাম আহমদ পারভেজ ‘তুলু-ই ইসলাম’ পত্রিকার মাধ্যমে এই মতবাদ ছড়িয়ে দেয়। মিশরে মুহাম্মদ তাওফিক সিদকী ‘আল-ইসলাম হুয়াল কুরআন ওয়াহদাহু’ নামক প্রবন্ধ লিখে এই বিষবাষ্প ছড়ায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) ১৪০০ বছর পূর্বেই এই ফেতনার ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেছিলেন:
«يُوشِكُ الرَّجُلُ مُتَّكِئًا عَلَى أَرِيكَتِهِ يُحَدَّثُ بِحَدِيثٍ مِنْ حَدِيثِي فَيَقُولُ: بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ كِتَابُ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ، فَمَا وَجَدْنَا فِيهِ مِنْ حَلَالٍ اسْتَحْلَلْنَاهُ، وَمَا وَجَدْنَا فِيهِ مِنْ حَرَامٍ حَرَّمْنَاهُ، أَلَا وَإِنَّ مَا حَرَّمَ رَسُولُ اللَّهِ مِثْلُ مَا حَرَّمَ اللَّهُ»
(অচিরেই এমন এক সময় আসবে যখন কোনো ব্যক্তি নিজের মসনদে হেলান দিয়ে বসে থাকবে, তার কাছে আমার কোনো হাদিস পৌঁছলে সে বলবে: আমাদের ও তোমাদের মাঝে আল্লাহর কিতাবই যথেষ্ট; তাতে যা হালাল পাব তা হালাল মানব, যা হারাম পাব তা হারাম মানব। সাবধান! নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসুল যা হারাম করেছেন, তা আল্লাহ যা হারাম করেছেন তারই অনুরূপ—মুসনাদে আহমদ ও সুনানে আবু দাউদ)।
সুন্নাহর প্রতি কুরআনিদের চরম বিভ্রান্ত মনোভাবসমূহ
- ১. সুন্নাহকে শারঈ দলিল হিসেবে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান: তারা দাবি করে হাদিস হলো মানুষের লেখা ঐতিহাসিক বর্ণনা, যা সংরক্ষিত নয়। তাই আকিদা ও ফিক্বহ কোনো ক্ষেত্রেই হাদিস গ্রহণীয় নয়।
- ২. রাসুলের দায়িত্বকে কেবল ডাকপিয়নের মতো সীমিত করা: তাদের চরম গোমরাহী হলো—তারা মনে করে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একমাত্র কাজ ছিল শুধু কুরআনের বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া (ডাকপিয়নের মতো); কুরআন ব্যাখ্যা করার বা নতুন কোনো বিধিবিধান দেওয়ার কোনো এখতিয়ার তাঁর ছিল না।
- ৩. ইবাদতের কাঠামো ও পদ্ধতি ধ্বংস করা: কুরআন অস্বীকারকারীদের যুক্তি গ্রহণ করলে ইসলামের কোনো মৌলিক আমলই পালন করা যায় না। কারণ কুরআনে সালাত কায়েমের নির্দেশ আছে, কিন্তু পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের রাকাত সংখ্যা, রুকু-সিজদার তাসবীহ, আযান ও জানাজার নিয়ম কুরআনে বিস্তারিত বলা হয়নি; এগুলো হাদিস দ্বারাই সুনির্দিষ্ট। কুরআনিরা হাদিস অস্বীকার করে সালাতকে নিছক আত্মিক দোয়া বা সমাজকল্যাণমূলক বৈঠকে রূপান্তর করে ফেলেছে।
- ৪. যাকাত, হজ ও হালাল-হারামের সীমা লঙ্ঘন: যাকাতের নিসাব ও শতকরা আড়াই শতাংশের নিয়ম হাদিসেই বর্ণিত। তারা হাদিস অস্বীকার করে মনগড়া যাকাত নির্ধারণ করে এবং কুরআনে সরাসরি উল্লেখ নেই এমন বহু হারাম খাদ্য (যেমন গাধার গোশত, নখযুক্ত হিংস্র প্রাণী) ভক্ষণকে হালাল বলে দাবি করে।
আহলুস সুন্নাহর খণ্ডন ও শারঈ রায়
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা সুন্নাহর অপরিহার্যতা প্রমাণ করে ঘোষণা করেছেন:
﴿وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا﴾ (রাসুল তোমাদের যা দেন তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাক—সূরা আল-হাশর: ৭)।
﴿فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ﴾ (আপনার রবের শপথ! তারা কিছুতেই মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যকার বিবাদে আপনাকে বিচারক মানবে—সূরা আন-নিসা: ৬৫)।
অতএব, জমহুর উলামায়ে কেরামের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো: ইচ্ছাকৃতভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সহিহ সুন্নাহকে শরিয়তের উৎস হিসেবে সার্বিকভাবে অস্বীকারকারী ব্যক্তি মুসলিম নয়; বরং সে সরাসরি কাফের ও মুরতাদ।
উপসংহার
সুন্নাহ অস্বীকারকারীরা মূলত কুরআনের নির্দেশকেই অস্বীকার করে। কারণ স্বয়ং কুরআনই রাসুলের আনুগত্যকে দ্বীনের ভিত্তি ঘোষণা করেছে।
৩। من المؤسس لفرقة القاديانية؟ اذكر نشاطاتهم في بنغلاديش –
[কাদিয়ানি সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা কে? বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম উল্লেখ কর।]
[মান: ১৬]
কাদিয়ানি সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা ও তার সংক্ষিপ্ত পরিচয়
সমকালীন বিশ্বের সর্বাপেক্ষা বিপজ্জনক ভণ্ড ও কুফরি ফেরকা হলো কাদিয়ানিয়াত (বা তথাকথিত আহমদিয়া জামাত)। এই সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা হলো ব্রিটিশদের সৃষ্ট ভণ্ড নবী মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানি (১৮৩৯–১৯০৮ খ্রি.)। সে তৎকালীন অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের গুরুদাসপুর জেলার ‘কাদিয়ান’ নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করে। তার জন্মস্থানের নামানুসারেই এই গোষ্ঠীকে ‘কাদিয়ানি’ বলা হয়।
মির্জা গোলাম আহমদের বিভ্রান্তিকর রূপান্তরের ধাপসমূহ
- ১ম ধাপ (ইসলামের সেবক দাবি): সূচনালগ্নে সে হিন্দু ও খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকদের বিরুদ্ধে ‘বারাহীনে আহমদিয়া’ নামক বই লিখে নিজেকে ইসলামের খাদেম ও গবেষক হিসেবে জাহির করে।
- ২য় ধাপ (মুজাদ্দিদ ও ইলহামের দাবি): এরপর সে দাবি করে সে চতুর্দশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ (সংস্কারক) এবং তার ওপর আল্লাহর ওহি ও ইলহাম অবতীর্ণ হয়।
- ৩য় ধাপ (প্রতিশ্রুত মসীহ ও মাহদী দাবি): ১৮৯১ সালে সে ঘোষণা করে যে হযরত ঈসা (আ.) কাশ্মীরের শ্রীনগরে মৃত্যুবরণ করেছেন এবং সে নিজেই হলো প্রতিশ্রুত মসীহ ও ইমাম মাহদী।
- ৪র্থ ধাপ (স্বঘোষিত নবুওয়তের দাবি): অবশেষে ১৯০১ সালে সে নিজেকে সরাসরি ‘জিল্লিল্লাহী ও বুরুজী নবী’ (ছায়ানবী) দাবি করে। সে বলে: ‘যে ব্যক্তি আমাকে নবী মানবে না সে জাহান্নামী কাফের।’ সে ব্রিটিশ শাসকদের আনুগত্যকে জিহাদের চেয়েও বড় ফরজ ঘোষণা করে এবং সাম্রাজ্যবাদীদের খুশি করতে মুসলমানদের সশস্ত্র জিহাদকে চিরতরে হারাম ফতোয়া দেয়।
বাংলাদেশে কাদিয়ানিদের বিভিন্ন ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম
বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়ায় কাদিয়ানিরা অত্যন্ত চতুরতার সাথে বাহ্যিক ‘আহমদিয়া মুসলিম জামাত’ নাম ধারণ করে সরলপ্রাণ মুসলমানদের ঈমান হরণ করতে নানাবিধ অপতৎপরতা চালিয়ে আসছে। তাদের প্রধান প্রধান কার্যক্রম নিম্নরূপ:
- ১. কেন্দ্রীয় ঘাঁটি ও সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক: ঢাকায় বকশীবাজার ও মিরপুরে কাদিয়ানিদের প্রধান কেন্দ্র রয়েছে। এছাড়া পঞ্চগড়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, খুলনা ও সুন্দরবন অঞ্চলে তাদের শাখা অফিস ও উপাসনালয় রয়েছে। পঞ্চগড়ের আহমদনগরে তারা প্রতি বছর বার্ষিক সালানা জলসার আয়োজন করে সারা দেশ থেকে সাধারণ মানুষদের ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করে।
- ২. ছদ্মবেশী লিটারেচার ও ফ্রি বই বিতরণ: তারা বাংলা ভাষায় কুরআন মাজিদের বিকৃত অনুবাদ ও তাফসির প্রকাশ করে বিনামূল্যে মাদ্রাসা ও কলেজপড়ুয়া ছাত্রদের মাঝে বিতরণ করে। এসব বইয়ে খতমে নবুওয়তের আয়াতের চরম বিকৃত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়।
- ৩. আর্থিক প্রলোভন ও ধর্মান্তরকরণ: পঞ্চগড় ও চরাঞ্চলের দারিদ্র্যপীড়িত গৃহহীন মানুষদের আর্থিক ঋণ প্রদান, বাসস্থান নির্মাণ, টিউবওয়েল স্থাপন এবং ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পের নাম করে কাদিয়ানি ধর্মে দীক্ষিত করার জঘন্য ষড়যন্ত্র চালায়।
- ৪. মিডিয়া ও ডিজিটাল অপপ্রচার: তারা নিজস্ব আন্তর্জাতিক টিভি চ্যানেল ‘এমটিএ’ (MTA), বাংলা ওয়েবসাইট এবং ইউটিউব-ফেসবুকের মাধ্যমে সুপরিকল্পিতভাবে মিথ্যা প্রচারণা চালায়।
- ৫. সরকারি চাকরিতে অনুপ্রবেশ: প্রভাবশালী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদে নিজেদের অনুসারীদের বসিয়ে সাধারণ মুসলিমদের দাবিকে ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টা করে।
মুসলিম উম্মাহর ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ ও দাবি
১৯৭৪ সালে মক্কায় রাবেতা আল-আলম আল-ইসলামী এবং পাকিস্তানের পার্লামেন্টে কাদিয়ানিদের সর্বসম্মতভাবে অমুসলিম ও কাফের ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশেও তৌহিদী জনতা ও ওলামায়ে কেরাম কাদিয়ানিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম সংখ্যালঘু ঘোষণার জন্য নিয়মতান্ত্রিক তীব্র আন্দোলন পরিচালনা করে আসছেন।
উপসংহার
খাতমে নবুওয়তের আক্বিদা অস্বীকার করার কারণে কাদিয়ানিরা ইসলামের গণ্ডির বাইরে এক চরম পথভ্রষ্ট বাতিল ধর্মগোষ্ঠী।
৪। تحدث عن فرقة الباطنية مع بيان أفكارهم ومعتقداتهم –
[বাতেনিয়া সম্প্রদায় সম্পর্কে আলোচনা কর এবং তাদের ধ্যান-ধারণা ও আকিদা বর্ণনা কর।]
[মান: ১৬]
বাতেনিয়া সম্প্রদায়ের পরিচয় ও ঐতিহাসিক পটভূমি
ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত, ধ্বংসাত্মক ও চরমপন্থী গুপ্ত ধর্মদ্রোহী আন্দোলনের নাম হলো ‘আল-বাতেনিয়্যাহ’ (الباطنية)। তারা মূলত চরমপন্থী রাফেজী শিয়া (বিশেষ করে ইসমাইলিয়্যা ও কারামিতা)-দের ভেতর থেকে উদ্ভূত এক বিষাক্ত ধারা। তাদের বাহ্যিক স্লোগান ছিল আহলে বাইতের প্রতি মহব্বত, কিন্তু তাদের অন্তর্নিহিত আসল উদ্দেশ্য ছিল অগ্নিপূজক মাজুসী ও ইহুদি দর্শনের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে ইসলামি শরিয়তের সমস্ত বিধিবিধানকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে ফেলা। ইমাম গাযালী (রহ.) তাঁর বিশ্বখ্যাত ‘ফাযাইহুল বাতেনিয়্যাহ’ গ্রন্থে লিখেছেন: ‘বাতেনিয়্যাদের মূল কথা হলো—বাহ্যত তারা রাফেজী শিয়া, কিন্তু বাতেন বা গোপনে তারা চরম নাস্তিক ও কাফের (ظاهرهم الرفض وباطنهم الكفر المحض)।’
নামকরণের রহস্য
এদের ‘বাতেনিয়া’ বলার প্রধান কারণ হলো—তাদের মৌলিক দর্শন হলো পবিত্র কুরআনের প্রতিটি আয়াত, হাদিস এবং শরিয়তের প্রতিটি বিধানের একটি প্রকাশ্য জাহিরি রূপ (ظاهر) আছে এবং একটি অভ্যন্তরীণ গোপন বাতেনি রূপ (باطن) আছে। জাহিরি রূপ হলো সাধারণ মূর্খদের জন্য খোসা মাত্র, আর বাতেনি রূপ হলো মূল শাঁস। তাদের গুপ্ত ইমাম ছাড়া এই বাতেনি রহস্য কেউ জানে না।
বাতেনিয়াদের প্রধান প্রধান ধ্যান-ধারণা ও কুফরি আকিদাসমূহ
- ১. শরিয়তের সমস্ত ফরজ ও ইবাদত বাতিলকরণ (إسقاط التكاليف): বাতেনিয়ারা দাবি করে যে ব্যক্তি তাদের বাতেনি জ্ঞানের স্তরে পৌঁছে যাবে, তার ওপর থেকে সালাত, সিয়াম, হজ, যাকাত সবকিছুই মাফ হয়ে যাবে। তাদের বিকৃত ব্যাখ্যা অনুযায়ী:
- সালাত: সালাত মানে নির্দিষ্ট রুকু-সিজদা নয়; বরং গোপন ইমামের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করাই আসল সালাত।
- সিয়াম (রোজা): সিয়াম মানে পানাহার বর্জন নয়; বরং দলের গোপন রহস্য সাধারণ মানুষের কাছে প্রকাশ না করাই হলো সিয়াম।
- হজ: মক্কার কাবা তাওয়াফ করা পাথর পূজা; গোপন ইমামের কাছে গিয়ে বায়আত হওয়াই হলো আসল হজ।
- ২. সমস্ত হারাম বস্তুকে হালাল ঘোষণা (الاستحلال والإباحية): চরম বাতেনিয়ারা মদ পান, ব্যভিচার, এমনকি মা-বোন ও মাহরাম নারীদের সাথে বিবাহ বন্ধনকেও নিজেদের উচ্চমার্গীয় অনুসারীদের জন্য হালাল ঘোষণা করে এক চরম অনাচারী সমাজে রূপ নিয়েছিল।
- ৩. কুরআনের চরম মনগড়া বাতেনি তা’বীল: তারা কুরআনের সুস্পষ্ট ভাষাকে ধ্বংস করে নিজেদের শয়তানী মনগড়া ব্যাখ্যা আরোপ করত। জান্নাত মানে তাদের দলের গোপন আনন্দ, আর জাহান্নাম মানে সাধারণ অজ্ঞ মানুষদের সাথে থাকা।
- ৪. পুনরুত্থান ও কিয়ামত অস্বীকার: তারা কিয়ামতের দিন সশরীরে পুনরুত্থান, হাশর-নশর, মিজান ও পুলসিরাতকে রূপক গল্প দাবি করে সরাসরি অস্বীকার করত।
- ৫. গুপ্তহত্যা ও সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড (হাশাশিন গোষ্ঠী): বাতেনিয়া ইসমাইলীদের একটি সশস্ত্র খুনি দল হাসান বিন সাবাহ-এর নেতৃত্বে ‘হাশাশিন’ (Assassins) নামে কুখ্যাত হয়। তারা আলমুত দুর্গে বসে ইসলামি খেলাফতের বড় বড় সুন্নি আলেম, কাজী ও সুলতানদের (যেমন প্রখ্যাত মন্ত্রী নিযামুল মুলক) নির্মমভাবে বিষাক্ত ছুরি দিয়ে হত্যা করত।
উপসংহার
ইমাম নববী, ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ এবং ইমাম গাযালী (রহ.) দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছেন যে, বাতেনিয়ারা ইহুদি ও অগ্নিপূজকদের চেয়েও ইসলামের জন্য অধিক ক্ষতিকর চরম মুরতাদ দল।
৫। عرف البهائية بين نشأتهم وأصول عقائدهم –
[বাহাইদের পরিচয় দাও, তাদের উৎপত্তি ও মৌলিক আকিদাসমূহ বর্ণনা কর।]
[মান: ১৬]
বাহাই সম্প্রদায়ের সংজ্ঞা ও পরিচয়
ঊনবিংশ শতাব্দীতে শিয়া অধ্যুষিত ইরানে আত্মপ্রকাশকারী একটি স্বঘোষিত স্বাধীন ও ইসলামবিরোধী ধর্মের নাম হলো ‘আল-বাহাইয়্যাহ’ (البهائية)। বাহ্যিকভাবে এরা বিশ্বশান্তি, মানবতার ঐক্য, নারী-পুরুষের সমতা এবং সর্বধর্মের সমন্বয়ের মিষ্টি ও আকর্ষণীয় স্লোগান তুলে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ ও জায়নবাদী শক্তির পূর্ণ পৃষ্ঠপোষকতায় সারা বিশ্বে তাদের বিষাক্ত জাল বিস্তার করেছে। প্রকৃতপক্ষে এটি ইসলামি শরিয়ত ও তাওহিদকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে এক নতুন কৃত্রিম ধর্ম আবিষ্কারের অপপ্রয়াস।
বাহাই ধর্মের উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশ
বাহাই মতবাদের জন্ম মূলত শিয়াদের চরমপন্থী শেখীয়া মতবাদ এবং তৎপরবর্তী ‘বাবী’ আন্দোলন থেকে। এর ঐতিহাসিক বিকাশ তিনটি ধাপে সংঘটিত হয়েছিল:
- ১ম ধাপ (আল-বাবিয়্যাতের উন্মেষ): ১৮৪৪ সালে ইরানের শিরাজ শহরের মির্জা আলী মুহাম্মদ রেজা নিজেকে শিয়াদের দ্বাদশ ইমামের কাছে পৌঁছার একমাত্র গোপন দরজা বা ‘বাব’ (باب) দাবি করে। পরবর্তীতে সে নিজেকে ইমাম মাহদী এবং পরিশেষে নতুন শরিয়তধারী স্বাধীন রাসুল দাবি করে। ১৮৫০ সালে ইরানি কাজার সরকার ধর্মদ্রোহিতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির দায়ে তাবরিজে তাকে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
- ২য় ধাপ (বাহাউল্লাহর আবির্ভাব): বাবের মৃত্যুর পর তার প্রধান দুই শিষ্যের একজন মির্জা হুসাইন আলী নূরী (১৮১৭–১৮৯২ খ্রি.)—যে ‘বাহাউল্লাহ’ (আল্লাহর জ্যোতি) উপাধি গ্রহণ করে—এই আন্দোলনের হাল ধরে। ১৮৬৩ সালে বাগদাদে সে ঘোষণা করে যে সে-ই বাবের প্রতিশ্রুত স্বয়ং ঈশ্বরের পূর্ণাঙ্গ অবতার বা সর্বশেষ রাসুল। সে তার অনুসারীদের ‘বাহাই’ নাম দেয়।
- ৩য় ধাপ (আন্তর্জাতিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা): অটোমান সাম্রাজ্য তাকে গ্রেফতার করে ফিলিস্তিনের এক্কা (Akka) দুর্গে নির্বাসনে পাঠায়। সেখানে ১৮৯২ সালে তার মৃত্যু হয়। বর্তমানে ইসরাইলের হাইফা নগরীর কারমেল পাহাড়ে অবস্থিত ‘বাহাই বিশ্ব কেন্দ্র’ ও সুবিশাল বাহাই মন্দির হলো সমগ্র বিশ্বের বাহাইদের প্রধান তীর্থস্থান।
বাহাই সম্প্রদায়ের মৌলিক কুফরি আকিদাসমূহ
- ১. ‘হুলুল’ ও ‘ইত্তিহাদ’ (আল্লাহর অবতারত্বে বিশ্বাস): বাহাউল্লাহ দাবি করত আল্লাহ নিরাকার নন, বরং স্বয়ং আল্লাহ মানুষের রূপ ধরে বাহাউল্লাহর দেহে আবির্ভূত হয়েছেন (নাউযুবিল্লাহ)।
- ২. খতমে নবুওয়ত অস্বীকার ও নতুন কিতাব: তারা বিশ্বাস করে নবুওয়ত কখনোই শেষ হবে না এবং বাহাউল্লাহ সমস্ত নবীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ। বাহাউল্লাহ ‘আল-কিতাবুল আকদাস’ (الأقدس) এবং ‘কিতাবুল ইক্বান’ নামক বই লিখে দাবি করে যে কুরআনের সমস্ত বিধান রহিত হয়ে গেছে এবং এখন থেকে তার কিতাবই অনুসরণীয়।
- ৩. নিজস্ব স্বতন্ত্র কিবলা ও হজ: তারা মক্কার কাবাঘরের কিবলা পরিবর্তন করে ইসরাইলের এক্কায় অবস্থিত বাহাউল্লাহর কবরকে তাদের কিবলা বানিয়েছে এবং সেখানেই তাদের হজ পালন করে থাকে।
- ৪. ইবাদতের সম্পূর্ণ বিকৃতি: তাদের শরিয়তে সালাত হলো দিনে মাত্র তিনবার এবং প্রত্যেক সালাতে মাত্র তিনটি করে সিজদা। তাদের বছরে ১৯টি মাস এবং প্রতি মাসে ১৯টি দিন (মোট ৩৬১ দিন)। তারা প্রতি বছর কেবল ১৯ দিন রোজা রাখে।
- ৫. জিহাদ ও ইসলামি শরিয়তের উচ্ছেদ: পশ্চিমাদের তুষ্ট করার জন্য তারা সর্বপ্রকার আত্মরক্ষা ও জিহাদকে সম্পূর্ণ হারাম ঘোষণা করেছে।
উপসংহার
আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, মক্কার রাবেতাতুল আলম আল-ইসলামীসহ বিশ্বের সমস্ত ইসলামি সংস্থা ফতোয়া জারি করেছে যে—বাহাইরা কোনোভাবেই মুসলিম নয়; এটি একটি সম্পূর্ণ অমুসলিম, মুরতাদ ও ইসলামবিদ্বেষী ধর্মগোষ্ঠী।
৬। ما الحشوية؟ وما سبب تسميتها بها؟ فند عقائدهم الباطلة بالأدلة –
[হাশাবিয়া কারা? তাদের এই নামকরণের কারণ কী? দলিলের সাহায্যে তাদের বাতিল আকিদা খণ্ডন কর।]
[মান: ১৬]
‘আল-হাশবিয়্যাহ’ (الحشوية)-এর পরিচয়
ইসলামি কালামশাস্ত্র ও ফেরকার ইতিহাসে ‘আল-হাশবিয়্যাহ’ একটি নিন্দাসূচক পারিভাষিক নাম। মূলত যারা ধর্মীয় কোনো বিষয়ের গভীর তত্ত্ব, কোরআনী হিকমত বা যৌক্তিক তাৎপর্য না বুঝে কেবল অন্ধভাবে অপ্রমাণিত বর্ণনা, ইসরাঈলি কিচ্ছা-কাহিনী, দুর্বল ও জাল রেওয়ায়েত গ্রহণ করত এবং আল্লাহর পবিত্র সিফাতকে হুবহু সৃষ্টির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সাথে তুলনা করে ‘মুজাসসিমা’ (সৃষ্টবস্তুর দেহধারী) বা ‘মুশাব্বিহা’ (সাদৃশ্যবাদী)-তে পরিণত হয়েছিল, তাদের প্রাচীন উলামায়ে কেরাম ‘হাশবিয়্যাহ’ বলে অভিহিত করতেন।
হাশাবিয়া নামকরণের ঐতিহাসিক কারণসমূহ
- ১. হাসান বসরীর মজলিসের ঐতিহাসিক ঘটনা: প্রখ্যাত তাবেঈ ইমাম হাসান বসরী (রহ.)-এর ইলমী দরসে একদল লোক অপ্রাসঙ্গিক, অগভীর ও অর্থহীন কথা বলত। একদিন এক ব্যক্তি অনর্থক কথা বললে তিনি তার দিকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন: «رُدُّوا هَؤُلَاءِ إِلَى حَشْوِ الْحَلْقَةِ» (এদেরকে মজলিসের পেছনের অনর্থক ভিড়ের মধ্যে ঠেলে দাও)। সেই থেকে অবজ্ঞার্থে তাদের ‘হাশবিয়্যাহ’ বা অসার ভিড়কারী বলা হতে থাকে।
- ২. আভিধানিক অর্থ (খড়কুটো ও অসারতা): আরবি ভাষায় ‘হাশও’ (حشو) শব্দের অর্থ বালিশের ভেতরে ভরা তুলা বা খড়কুটো, অথবা কোনো বাক্যের অপ্রয়োজনীয় অসার অতিরিক্ত অংশ। এরা দ্বীনের মধ্যে জাল কিচ্ছা-কাহিনী ও খড়কুটো ঢুকিয়ে দিত বলে এই নামকরণ।
- ৩. মুতাযিলাদের বিদ্বেষপ্রসূত ব্যবহার: পরবর্তীতে মুতাযিলারা চরম ধৃষ্টতা দেখিয়ে যারা আল্লাহর সহিহ সিফাত ও সুন্নাহর হাদিস মেনে চলত—সেই আহলুল হাদিস ও সুন্নি আলেমদেরও গালি হিসেবে ‘হাশবিয়া’ নাম দিতে শুরু করে।
হাশাবিয়াদের ভ্রান্ত আকিদাসমূহ ও দলিলের সাহায্যে তা খণ্ডন
- ১. চরম তাশবীহ ও তাজসীম (আল্লাহর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কল্পনা): হাশাবিয়্যারা দাবি করত আল্লাহর মানুষের মতোই রক্ত-মাংসের চোখ, কান, হাত, পা ও অবয়ব রয়েছে। তিনি নাকি আরশের ওপর বসে নড়াচড়া করেন এবং তাঁর ভারে আরশ কিঁচকিঁচ শব্দ করে (নাউযুবিল্লাহ)।
খণ্ডন: পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন:
﴿لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ﴾ (কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়; আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা—সূরা আশ-শূরা: ১১)। অতএব আল্লাহর কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সৃষ্টির মতো হতে পারে না। - ২. ইসরাঈলি বানোয়াট কিচ্ছা-কাহিনীর অন্ধ অনুকরণ: তারা ইহুদিদের তালমুদ ও তাওরাতের মনগড়া বিকৃত রেওয়ায়েত দিয়ে কুরআন ও নবীদের পবিত্র চরিত্রকে কলুষিত করত।
খণ্ডন: রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট নিষেধ করেছেন জাল ও অপ্রমাণিত বর্ণনা অন্ধভাবে গ্রহণ করতে:
«كَفَى بِالْمَرْءِ كَذِبًا أَنْ يُحَدِّثَ بِكُلِّ مَا سَمِعَ» (মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে সে যা শোনে তাই যাচাই ছাড়া প্রচার করে—সহিহ মুসলিম)। - ৩. স্ববিরোধী অন্ধ যুক্তিহীনতা: তারা কুরআন ও হাদিস বোঝার ক্ষেত্রে সুস্থ বিবেক, সুস্থ আরবি ব্যাকরণ ও উসূলে ফিক্বহের প্রয়োজনকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করত।
আহলুস সুন্নাহর ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত মুতাযিলাদের মতো সিফাত অস্বীকারও (তা’তীল) করেন না, আবার হাশাবিয়াদের মতো সৃষ্টির সাথে তুলনাও (তাশবীহ) করেন না। ইমাম মালিক (রহ.)-এর চিরন্তন মূলনীতি হলো:
«الْإِسْتِوَاءُ مَعْلُومٌ، وَالْكَيْفُ مَجْهُولٌ، وَالإِيمَانُ بِهِ وَاجِبٌ، وَالسُّؤَالُ عَنْهُ بِدْعَةٌ»
(আরশে সমাসীন হওয়ার অর্থ জানা, কিন্তু এর পদ্ধতি মানুষের অজ্ঞাত, এর ওপর ঈমান আনা ফরজ এবং এর রূপরেখা নিয়ে বাড়াবাড়ি প্রশ্ন করা বিদআত)।
উপসংহার
হাশাবিয়াদের জাহালাত ইসলামি আকিদাকে বহু বছর সাধারণ মানুষের কাছে বিকৃত ও হাস্যকর করে তুলেছিল।
৭। بين أهمية التمسك بالعقيدة الصحيحة في مواجهة الفرق المنحرفة –
[ভ্রষ্ট ফেরকাসমূহের মোকাবিলায় সহিহ আকিদা আঁকড়ে ধরার গুরুত্ব বর্ণনা কর।]
[মান: ১৬]
ভূমিকা ও সহিহ আকিদার মৌলিকত্ব
মানবজাতির ইহকালীন শান্তি এবং পরকালীন চিরমুক্তির একমাত্র চাবিকাঠি হলো ‘আল-আক্বিদাতুস সাহীহাহ’ বা সহিহ খাঁটি ইসলামি বিশ্বাস। ইসলামি শরিয়তের সমস্ত সৎ আমল, ইবাদত-বন্দেগি ও নৈতিকতা একটি সুউচ্চ প্রাসাদের মতো, আর আকিদা হলো সেই প্রাসাদের মজবুত ভিত্তিপ্রস্তর। ভিত্তি যদি নড়বড়ে বা বিষাক্ত হয়, তবে পুরো প্রাসাদ ধসে পড়তে বাধ্য। সমকালীন বিশ্বে যখন চারদিক থেকে নানা বিভ্রান্ত, বিদআতি ও চরমপন্থী ফেরকার আগ্রাসন চলছে, তখন সহিহ আকিদাকে সুদৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা প্রতিটি মুসলিমের জন্য জীবন-মরণের প্রশ্ন।
ভ্রষ্ট ফেরকাগুলোর বহুমুখী আধুনিক চ্যালেঞ্জসমূহ
বর্তমান যুগে বাতিল ফেরকাগুলো সনাতনী রূপ বদলে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ডিজিটাল মোড়কে হাজির হয়েছে:
- ১. আধুনিকতাবাদী ও সুন্নাহ অস্বীকারকারী দল (আহলে কুরআন): তারা যুক্তিবাদের নামে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র হাদিস ভাণ্ডারকে অস্বীকার করে ইসলামকে বিকৃত করার চেষ্টা করছে।
- ২. তাকফিরি ও উগ্র চরমপন্থা (নব্য খারেজী গোষ্ঠী): সামান্য ভুলের কারণে মুসলিম সমাজ ও রাষ্ট্রকে কাফের ফতোয়া দিয়ে রক্তপাত ও বিশৃঙ্খলা ছড়াচ্ছে।
- ৩. কাদিয়ানি ও বাতেনি ফেতনা: মিষ্টি সমাজসেবার আড়ালে নবুওয়তের অবসানকে ধ্বংস করার এবং গোপনে ঈমান হরণের চক্রান্ত করছে।
- ৪. ধর্মহীন সেক্যুলারিজম ও লিবারেলিজম: ইসলামকে কেবল মসজিদের চার দেয়ালে বন্দি করে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবন থেকে আল্লাহর বিধানকে নির্বাসনে পাঠানোর বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসন চালাচ্ছে।
সহিহ আকিদা আঁকড়ে ধরার সুদূরপ্রসারী গুরুত্বসমূহ
- ১. আমল কবুল হওয়ার একমাত্র পূর্বশর্ত: আকিদায় যদি শিরক, কুফর বা বাতিল ফেরকার বিশ্বাস থাকে, তবে সারা জীবনের কোনো আমলই আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন:
﴿وَلَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ﴾ (যদি আপনি শিরক করেন, তবে আপনার সমস্ত আমল অবশ্যই বরবাদ হয়ে যাবে এবং আপনি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবেন—সূরা আয-যুমার: ৬৫)। - ২. তেহাত্তর ফেরকার ধ্বংস থেকে নাজাত লাভ: রাসুলুল্লাহ (সা.) উম্মতের ৭৩ ফেরকায় বিভক্ত হওয়ার সতর্কবাণী দিয়ে একমাত্র মুক্তিপ্রাপ্ত দলের পরিচয় দিয়ে বলেছেন:
«مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِي» (আজ আমি এবং আমার সাহাবায়ে কেরাম যার ওপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছি—জামে তিরমিযী)। এই সুন্নাহ ও সাহাবিদের আকিদা আঁকড়ে ধরাই নাজাতের একমাত্র পথ। - ৩. বুদ্ধিবৃত্তিক ও আদর্শিক সুরক্ষা: সহিহ ইলম ও আকিদা থাকলে আধুনিক নাস্তিক্যবাদ ও পশ্চিমা সংশয়বাদের বিষাক্ত তীর মুসলিম যুবসমাজের হৃদয়ে দাগ কাটতে পারে না।
- ৪. উম্মাহর প্রকৃত ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠা: বাতিল মতবাদের ওপর কখনও মুসলিম উম্মাহর টেকসই ঐক্য সম্ভব নয়। কুরআন ও সুন্নাহর খাঁটি তাওহিদের পতাকা তলেই কেবল সকল ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে বৈশ্বিক ভ্রাতৃত্ব গড়ে উঠতে পারে।
সহিহ আকিদা সংরক্ষণে আমাদের করণীয়
- সালাফে সালেহীন ও আহলুস সুন্নাহর প্রামাণ্য গ্রন্থাবলি (যেমন ইমাম তাহাবীর আক্বিদাতুত তাহাবিয়্যাহ) পাঠ ও চর্চা করা।
- দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইলমুল ফিরাক্ব ও কালামশাস্ত্রের গভীর ও বিশ্লেষণধর্মী পাঠদান নিশ্চিত করা।
- সোশ্যাল মিডিয়া ও আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে বাতিল মতবাদের যুক্তিগুলো অকাট্য দলিলে খণ্ডন করা।
উপসংহার
সহিহ আকিদাহীন মুসলিম সমাজ হলো কাণ্ডারিহীন নৌকার মতো, যা যে কোনো বিভ্রান্তির ঝড়ে চিরতরে তলিয়ে যেতে পারে।
৮। ما هي العلمانية؟ ومتى نشأت؟ بين قضاياها الخلافية مع الإسلام –
[ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ কী এবং কখন এর উদ্ভব হয়? ইসলামের সাথে এর বিরোধপূর্ণ দিকগুলো বর্ণনা কর।]
[মান: ১৬]
ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ (Secularism)-এর সংজ্ঞা ও তাৎপর্য
‘ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ’ বা সেক্যুলারিজম (العلمانية – আল-ইলমানিয়্যাহ বা লা-দ্বীনিয়্যাহ) হলো একটি আধুনিক বস্তুবাদী ও মানবকেন্দ্রিক রাজনৈতিক দর্শন, যার মূল নীতি হলো—‘ধর্মকে রাষ্ট্রপরিচালনা, আইন-কানুন, বিচারব্যবস্থা, অর্থনীতি ও জনশিক্ষা থেকে সম্পূর্ণ পৃথক ও নির্বাসিত করা।’ ১৮৫১ সালে ব্রিটিশ লেখক জর্জ জ্যাকব হলিওক (George Jacob Holyoake) সর্বপ্রথম ‘Secularism’ পরিভাষাটি প্রবর্তন করেন। এটি এমন এক জীবনদর্শন যেখানে মানুষের ইহলৌকিক স্বার্থ ও পার্থিব যুক্তিকেই সমস্ত কিছুর চূড়ান্ত মানদণ্ড ধরা হয় এবং আসমানী ওহির কোনো কর্তৃত্ব স্বীকার করা হয় না।
ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের উদ্ভবকাল ও ঐতিহাসিক পটভূমি
ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের উদ্ভব ঘটেছে মধ্যযুগীয় ইউরোপে, বিশেষ করে ষোড়শ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর রেনেসাঁ, বৈজ্ঞানিক বিপ্লব ও ফরাসি বিপ্লবের (১৭৮৯ খ্রি.) প্রেক্ষাপটে।
- চার্চের সীমাহীন জুলুম ও শোষণ: ইউরোপের অন্ধকার যুগে রোমান ক্যাথলিক চার্চ এবং দুর্নীতিগ্রস্ত পোপরা ধর্মের নামে বিজ্ঞানীদের পুড়িয়ে হত্যা করত, সাধারণ মানুষের ওপর চড়া কর আরোপ করত এবং স্বঘোষিত পাপমোচন সনদ (Indulgence) বিক্রি করত।
- বুদ্ধিজীবীদের ক্ষোভ ও বিদ্রোহ: চার্চের এই চরম নির্যাতন ও অজ্ঞতার বিরুদ্ধে ইউরোপীয় দার্শনিক ও বিজ্ঞানীরা তীব্র বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন যে প্রগতি ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতি চাইলে রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে খ্রিস্টধর্মের সমস্ত কর্তৃত্ব সম্পূর্ণ ছুঁড়ে ফেলতে হবে। এই ঐতিহাসিক সংঘাত থেকেই ইউরোপের মাটিতে সেক্যুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদের জন্ম হয়।
ইসলামের সাথে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের প্রধান বিরোধপূর্ণ দিকসমূহ
ইউরোপে চার্চের বিরুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের সৃষ্টি হলেও, ইসলামি সমাজের ক্ষেত্রে এটি সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক এবং সরাসরি ইসলামবিধ্বংসী এক দর্শন। ইসলামের সাথে এর মৌলিক সংঘাতগুলো নিম্নরূপ:
- ১. আল্লাহর সার্বভৌত্ব বনাম মানব রচিত সার্বভৌমত্ব (الحاكمية لله):
- ইসলাম: বিশ্বজগতের একমাত্র সার্বভৌম শাসক ও আইনপ্রণেতা হলেন মহান আল্লাহ তাআলা। কুরআনুল কারিমে স্পষ্ট বলা হয়েছে:
﴿إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ﴾ (বিধান দেওয়ার চূড়ান্ত কর্তৃত্ব কেবলই আল্লাহর—সূরা ইউসুফ: ৪০)। - ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ: মানুষের পার্লামেন্ট বা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণই হলো চূড়ান্ত সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক। মানুষ চাইলে আল্লাহর হালালকে হারাম এবং হারামকে (যেমন সমকামিতা, সুদ, মদ) আইন বানিয়ে হালাল করতে পারে।
- ইসলাম: বিশ্বজগতের একমাত্র সার্বভৌম শাসক ও আইনপ্রণেতা হলেন মহান আল্লাহ তাআলা। কুরআনুল কারিমে স্পষ্ট বলা হয়েছে:
- ২. দ্বীনের সর্বজনীন পূর্ণাঙ্গতা অস্বীকার: ইসলাম কোনো নিছক ব্যক্তিগত পূজা-অর্চনার নাম নয়; বরং ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবনব্যবস্থা (কামিল নিযামুল হায়াত)। এতে রাষ্ট্র পরিচালনা, ফৌজদারি বিচার, ব্যাংকিং ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির বিস্তারিত বিধান রয়েছে। সেক্যুলারিজম দাবি করে ধর্ম কেবল ব্যক্তির একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার, যা রাষ্ট্র বা অর্থনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না—এটি মূলত কুরআনের মৌলিক বিধানকে অকেজো করে দেওয়ার শামিল।
- ৩. আনুগত্যের দ্বিমুখী বিভাজন বনাম তাওহিদ: খ্রিস্টধর্মে বলা হয়: ‘সিজারের পাওনা সিজারকে দাও, আর ঈশ্বরের পাওনা ঈশ্বরকে দাও।’ কিন্তু ইসলামে এই দ্বিমুখী বিভাজন শিরক। এখানে সিজার এবং তার সমস্ত রাজত্ব স্বয়ং আল্লাহর নির্দেশের অধীন।
- ৪. আইন প্রণয়নের স্বাধীনতা বনাম কুফর: আল্লাহ তাআলার নাযিলকৃত আইন ছাড়া অন্য কোনো মানব রচিত মতবাদকে সর্বোত্তম মনে করে দেশ পরিচালনা করাকে কুরআন স্পষ্ট কুফর ঘোষণা করেছে:
﴿وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ﴾ (যারা আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তদানুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই কাফের—সূরা আল-মায়েদা: ৪৪)।
উপসংহার
ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ইসলামি খেলাফত ও শরিয়তের সার্বভৌমত্বকে হরণ করার জন্য পশ্চিমাদের এক মারাত্মক আদর্শিক অস্ত্র। মুসলিম উম্মাহর মুক্তি ধর্মনিরপেক্ষতায় নয়, বরং কুরআনের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণের মধ্যেই নিহিত।
খ-অংশ (মান: ৫ × ৪ = ২০)
৯। اكتب نبذة من حياة محمد بن عبد الوهاب –
[মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাবের জীবনী সংক্ষেপে লেখ।]
[মান: ৫]
জন্ম ও বংশপরিচয়
আরব উপদ্বীপে তাওহিদ পুনরুজ্জীবন এবং শিরক ও বিদআত উচ্ছেদের প্রখ্যাত সংস্কারক হলেন শায়খুল ইসলাম মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব ইবনে সুলাইমান আত-তামীমী (রহ.)। তিনি ১১১৫ হিজরি মোতাবেক ১৭০৩ খ্রিস্টাব্দে আরবের নজদ অঞ্চলের উয়ায়না নামক শহরে এক সম্ভ্রান্ত ও উচ্চ মর্যাদাশীল আলেম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আব্দুল ওয়াহহাব ছিলেন একজন বিজ্ঞ হাম্বলী কাজী ও ফক্বীহ এবং তাঁর পিতামহ সুলাইমান ইবনে আলী ছিলেন সমগ্র নজদের প্রধান মুফতি ও হাম্বলী মাযহাবের প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব।
শিক্ষা ও ইলমী সফরসমূহ
শৈশবেই তিনি অতি অল্প বয়সে তাঁর বিজ্ঞ পিতার তত্ত্বাবধানে পবিত্র কুরআন মাজিদ হিফজ সম্পন্ন করেন এবং হাম্বলী ফিক্বহের মৌলিক কিতাবাদি অধ্যয়ন করেন। এরপর উচ্চতর দ্বীনি জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে তিনি আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন বিখ্যাত ইলমী মারকাজ সফর করেন। তিনি মক্কা মুকাররমা, মদিনা মুনাওয়ারা, বসরা ও বাগদাদসহ বিভিন্ন ইলমী কেন্দ্র সফর করে হাদিস, তাফসির ও কালামশাস্ত্রে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। মদিনায় তিনি বিশ্ববিখ্যাত মুহাদ্দিস শায়খ আব্দুল্লাহ ইবনে ইব্রাহিম ইবনে সাইফ এবং সিন্ধু বংশোদ্ভূত প্রখ্যাত মুহাদ্দিস শায়খ মুহাম্মদ হায়াত আস-সিন্ধি (রহ.)-এর সান্নিধ্যে দীর্ঘকাল সহিহ হাদিসগ্রন্থসমূহ অধ্যয়ন করেন। এ সময় তিনি ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ ও ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.)-এর সংস্কারমূলক রচনাবলী দ্বারা গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন।
সংস্কারমূলক দাওয়াত ও ঐতিহাসিক দিরইয়াহ চুক্তি
তৎকালীন নজদ ও আরব ভূখণ্ডের সাধারণ মানুষের মাঝে দ্বীনি অজ্ঞতার কারণে কবরপূজা, গাছ-পাথর পূজা, তাযিয়া, মানত এবং চরম শিরক ও বিদআতের সয়লাব ছড়িয়ে পড়েছিল। তিনি সালাফের বিশুদ্ধ তাওহিদের দাওয়াত নিয়ে ময়দানে নামেন। শুরুতে স্থানীয় গোত্রপতিদের তীব্র বাধার মুখে ১১৪৪ হিজরিতে তিনি দিরইয়াহ শহরে হিজরত করেন। সেখানে দিরইয়াহর তৎকালীন ন্যায়পরায়ণ আমির মুহাম্মদ ইবনে সউদ (প্রথম সৌদি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা)-এর সাথে এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ও আদর্শিক চুক্তিতে আবদ্ধ হন। এই চুক্তির ফলে রাষ্ট্রীয় শক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় শিরক ও বিদআতের সমস্ত আখড়া সমূলে গুঁড়িয়ে দিয়ে সমগ্র আরব উপদ্বীপে কুরআনের খাঁটি তাওহিদ ও ইসলামি শরিয়তের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়।
অমর রচনাবলী ও ওফাত
তিনি তাওহিদের দাওয়াতকে সহজবোধ্য করতে বহু অমূল্য কিতাব রচনা করেন, যার মধ্যে বিশ্বখ্যাত ‘কিতাবুত তাওহিদ’ (كتاب التوحيد), ‘কাশফুশ শুবুহাত’, ‘আল-উসূলুস সালাসাহ’, ‘কিতাবুল কাবায়ের’ এবং ‘মুখতাসারু সীরাতির রাসুল’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের অক্লান্ত দ্বীনি সংস্কারের পর ১২০৬ হিজরি মোতাবেক ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দে নব্বই বছর বয়সে এই মহান মুজাদ্দিদ ইন্তেকাল করেন।
১০। اكتب أسماء خمسة كتب ألفت في الفرق المعاصرة –
[সমকালীন ফেরকা বিষয়ে রচিত পাঁচটি কিতাবের নাম লেখ।]
[মান: ৫]
ভূমিকা ও কিতাবসমূহের গুরুত্ব
আধুনিক বিশ্বে বাতিল মতবাদ ও বিভ্রান্তিকর রাজনৈতিক-ধর্মীয় দলগুলোর মুখোশ উন্মোচনে সমকালীন প্রাজ্ঞ উলামায়ে কেরাম কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে বহু অমূল্য বিশ্বকোষীয় গ্রন্থ রচনা করেছেন। এর মধ্যে সর্বাধিক প্রামাণ্য পাঁচটি গ্রন্থের বিশদ পরিচয় নিচে তুলে ধরা হলো:
- ১. ‘আল-মাওসূ‘আতুল মুয়াসসারাহ ফিল আদইয়ান ওয়াল মাযাহিব ওয়াল আহযাবিল মু‘আসিরাহ’ (الموسوعة الميسرة في الأديان والمذاهب والأحزاب المعاصرة):
বিশ্বখ্যাত আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘আল-মানদাওয়াতুল আলামিয়্যাহ লিশ-শাবাব আল-ইসলামী’ (WAMY) কর্তৃক প্রকাশিত দুই খণ্ডের এক সুবিশাল বিশ্বকোষ। এতে সমকালীন সমস্ত দল, ফেরকা, নাস্তিক্যবাদ ও ধর্মীয় সংগঠনের নিখুঁত বস্তুনিষ্ঠ বিবরণ রয়েছে। - ২. ‘আল-ফিরাকুল মু‘আসিরাহ তানসাবুল ইসলাম’ (الفرق المعاصرة المنتسبة للإسلام):
প্রখ্যাত আকিদা বিশেষজ্ঞ ড. গালিব ইবনে আলী আওয়াজী রচিত তিন খণ্ডের এক অমর গবেষণামূলক গ্রন্থ। এতে কাদিয়ানি, বাহাই, বাতেনিয়া ও সমকালীন বিদআতি দলগুলোর আকিদা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দলিলসহ খণ্ডন করা হয়েছে। - ৩. ‘দিরাসাতুন ফিল আদইয়ান ওয়াল ফিরাকিল মু‘আসিরাহ’ (دراسات في الأديان والفرق المعاصرة):
মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত উস্তাদ ড. মুহাম্মদ সাউদ আল-বাসিরী রচিত একটি প্রামাণ্য পাঠ্যবই। - ৪. ‘আল-ফিকরুল ইসলামী আল-হাদীস ওয়া সিলাতুহু বিল ইসতিমারিল গারবী’ (الفكر الإسلامي الحديث وصلته بالاستعمار الغربي):
প্রখ্যাত গবেষক ড. মুহাম্মদ আল-বাহিয়্যাহ রচিত মাস্টারপিস গ্রন্থ, যাতে দেখানো হয়েছে কীভাবে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ আধুনিক ফেরকাগুলোকে মদদ দিয়েছিল। - ৫. ‘আল-কাদিয়ানিয়্যাহ: দিরাসাতুন ওয়া তাহলীল’ (القاديانية: دراسة وتحليل):
বিশ্ববিখ্যাত দায়ী ইমাম সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী আন-নাদভী (রহ.) রচিত এক যুগান্তকারী গ্রন্থ, যা কাদিয়ানিয়াতের আসল স্বরূপ বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচন করেছে।
উপসংহার
এই গ্রন্থগুলো আধুনিক বিশ্বের মুসলিম গবেষক ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য বিভ্রান্তিকর মতবাদের ঝড় থেকে ঈমান বাঁচানোর অমূল্য দিকনির্দেশনা প্রদান করে।
১১। عرف التوسل ثم بين رأى العلماء في هذا الباب –
[তাওয়াসসুল-এর পরিচয় দাও এবং এ বিষয়ে আলিমদের অভিমত বর্ণনা কর।]
[মান: ৫]
তাওয়াসসুল (التوسل)-এর শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ
‘তাওয়াসসুল’ শব্দটি আরবি ‘ওয়াসীলাহ’ (وسيلة) ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার আভিধানিক অর্থ হলো নৈকট্য লাভ করা, মাধ্যম বা উসিলা গ্রহণ করা। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়: মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ এবং তাঁর দরবারে দোয়া কবুল করানোর জন্য কোনো শারঈ বৈধ মাধ্যম বা উসিলা গ্রহণ করাকে ‘তাওয়াসসুল’ বলা হয়।
তাওয়াসসুলের সর্বসম্মত বৈধ রূপসমূহ
কুরআন ও সুন্নাহর অকাট্য দলিলের ভিত্তিতে সকল উলামায়ে কেরামের ঐকমত্যে তিন প্রকার তাওয়াসসুল সর্বসম্মতভাবে জায়েজ ও মুস্তাহাব:
- ১. আল্লাহর পবিত্র নাম ও সিফাতের উসিলা: যেমন বলা—‘হে আল্লাহ! তোমার অনন্ত রহমতের উসিলায় আমাকে ক্ষমা কর।’
- ২. নিজের নেক আমলের উসিলা: যেমন ইতিপূর্বে করা কোনো বড় ইখলাসপূর্ণ আমলের কথা স্মরণ করে দোয়া করা (যেমন গুহায় আটকে পড়া তিন যুবকের ঘটনা)।
- ৩. জীবিত নেককার মানুষের দোয়ার উসিলা: কোনো জীবিত বুজুর্গ বা আলেমের কাছে গিয়ে বলা—‘হুজুর, আমার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন।’
মৃত ব্যক্তি বা নবীর জাত ও সম্মানের উসিলা নিয়ে আলিমদের মতভেদ
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর তাঁর ব্যক্তিত্ব, মর্যাদা (জাহ) বা কোনো ওলির উসিলা দিয়ে দোয়া করা (যেমন বলা: ‘হে আল্লাহ! তোমার নবীর সম্মানের উসিলায় আমাকে রিজিক দাও’)—এ বিষয়ে আলিমদের মধ্যে দুটি মত রয়েছে:
- প্রথম মত (জমহুর চার মাজহাবের ফক্বীহগণ): ইমাম আবু হানিফা, মালেক, শাফেঈ ও হাম্বলীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ জমহুর উলামায়ে কেরামের মতে রাসুল (সা.)-এর সম্মানের উসিলা দিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করা জায়েজ। তাঁদের দলিল হলো অন্ধ সাহাবির হাদিস, যেখানে রাসুল (সা.) তাঁকে নিজের উসিলা দিয়ে আল্লাহর দরবারে দোয়ার তালিম দিয়েছিলেন। তবে দোয়া অবশ্যই সরাসরি আল্লাহর কাছে করতে হবে; কবরের মৃত ব্যক্তির কাছে চাওয়া যাবে না।
- দ্বিতীয় মত (ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ ও নজদী উলামাগণ): শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ ও আধুনিক সালাফী আলেমদের মতে এটি বিদআত ও নিষিদ্ধ। তাঁদের যুক্তি হলো সাহাবায়ে কেরাম দুর্ভিক্ষের সময় মৃত নবীর উসিলা না নিয়ে জীবিত হযরত আব্বাস (রা.)-এর দোয়ার উসিলা নিয়েছিলেন।
হারাম ও শিরকী উসিলা
আল্লাহর কাছে না চেয়ে সরাসরি কবরের মৃত বুজুর্গের কাছে সাহায্য চাওয়া বা বলা—‘হে অমুক খাজা, আমাকে ছেলে দাও’—এটি উসিলা নয়; বরং এটি স্পষ্ট শিরকে আকবর।
১২। تحدث عن السلفية مختصرا –
[সালাফিয়্যাত সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা কর।]
[মান: ৫]
‘আস-সালাফিয়্যাহ’ (السلفية)-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ
আরবি ভাষায় ‘সালাফ’ (سلف) শব্দের আভিধানিক অর্থ পূর্বসূরী, অগ্রবর্তী বা অতীত ব্যক্তিবর্গ। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় ‘সালাফ’ বলতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র হাদিসে উম্মতের শ্রেষ্ঠ যুগ হিসেবে ঘোষিত সোনালী তিন প্রজন্মের পূত-পবিত্র মহান ব্যক্তিবর্গকে বোঝায়—অর্থাৎ সাহাবায়ে কেরাম (রা.), তাবেঈন (রহ.) এবং তাবে-তাবেঈনগণ (রহ.)। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
«خَيْرُ النَّاسِ قَرْنِي، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ»
(সর্বোত্তম মানুষ হলো আমার যুগের মানুষ অর্থাৎ আমার সাহাবীগণ, অতঃপর তাদের পরবর্তী যুগ অর্থাৎ তাবেঈগণ, অতঃপর তাদের পরবর্তী যুগ অর্থাৎ তাবে-তাবেঈগণ—সহিহ বুখারি)। অতএব, ইসলামি আকিদা, ফিক্বহ, তাফসির ও চরিত্র গঠনে এই সালাফে সালেহীনের বিশুদ্ধ আদর্শ ও বুঝকে চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে মেনে চলার সামগ্রিক পদ্ধতিকেই ‘সালাফিয়্যাত’ বা সালাফী মানহাজ বলা হয়।
সালাফী মানহাজের মৌলিক মূলনীতি ও বৈশিষ্ট্যসমূহ
- ১. কিতাব ও সুন্নাহর নিঃশর্ত অনুসরণ: দ্বীনের প্রতিটি বিষয়ের ফয়সালায় কুরআন ও সহিহ সুন্নাহকে সকল প্রকার অন্ধ তাকলীদ, মাজহাবী গোঁড়ামি এবং মানুষের রায় ও দর্শনের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া।
- ২. সালাফদের পদ্ধতিতে আকিদার বিশুদ্ধিকরণ (التصفية والتربية): আল্লাহর আসমা ও সিফাতের ক্ষেত্রে কোনো রূপক ব্যাখ্যা (তা’বীল), সাদৃশ্য কল্পনা (তাশবীহ) বা নিষ্ক্রিয়করণ (তা’তীল) না করে সাহাবি ও তাবেঈদের মতো অকাট্য ঈমান পোষণ করা এবং দ্বীনকে সর্বপ্রকার শিরক ও বিদআত থেকে মুক্ত করা।
- ৩. মানবীয় যুক্তির ওপর আসমানী ওহির অগ্রাধিকার: মুতাযিলা, দার্শনিক বা আধুনিকতাবাদীদের মতো আকল বা যুক্তিকে ওহির ওপর প্রাধান্য না দিয়ে ওহিকে একমাত্র অভ্রান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণ করা।
- ৪. ইসলামি তাহযীব ও সুন্নাহর পুনরুজ্জীবন: সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করা কুসংস্কার, অনৈসলামিক কালচার ও বিদআতী প্রথা উচ্ছেদ করে সুন্নাহভিত্তিক জীবনব্যবস্থা গড়ে তোলা।
ইতিহাসের অগ্রগণ্য ধারক ও বাহকগণ
ইসলামের ইতিহাসে ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেঈ, বিশেষ করে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল, পরবর্তীতে ইমাম বুখারি, শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ, ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম এবং সমকালীন যুগে শায়খ মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব, শায়খ ইবনে বায ও আল্লামা আলবানী (রহ.) এই বিশুদ্ধ সালাফী ধারার প্রধান সংস্কারক ছিলেন।
উপসংহার
সালাফিয়্যাত কোনো নতুন দল, উপদল বা বিচ্ছিন্ন ফেরকা নয়; বরং এটি হলো সাহাবায়ে কেরামের অনুসৃত মূলধারা তথা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের চিরন্তন নাজাতপ্রাপ্ত কাফেলার অপর নাম।
১৩। اكتب خطورة إنكار الحديث النبوى في ضوء القرآن والسنة مفصلا –
[কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে হাদিস অস্বীকারের ভয়াবহতা বিস্তারিত লেখ।]
[মান: ৫]
ভূমিকা ও হাদিসের শারঈ মর্যাদা
ইসলামি শরিয়তের ভিত্তিপ্রস্তর দুটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত: মহান আল্লাহর কিতাব পবিত্র কুরআনুল কারিম এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও সহিহ হাদিস। হাদিস হলো কুরআনের বাস্তব রূপ, ব্যাখ্যা ও অকাট্য পরিপূরক। আধুনিক যুগে একদল পথভ্রষ্ট লোক ‘আহলে কুরআন’ সেজে হাদিস অস্বীকারের যে ফিতনা ছড়াচ্ছে, তা মূলত গোটা ইসলাম ধর্মকে ভেতর থেকে নিশ্চিহ্ন করার এক ভয়ানক চক্রান্ত।
কুরআনের আলোকে হাদিস অস্বীকারের ভয়াবহ পরিণতি
- ১. স্বয়ং কুরআনের নির্দেশ অমান্য করা: আল্লাহ তাআলা কুরআনে নির্দেশ দিয়েছেন:
﴿وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا﴾ (রাসুল তোমাদের যা দেন তা গ্রহণ কর এবং যা থেকে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাক—সূরা হাশর: ৭)। হাদিস অস্বীকার করা মানে কুরআনের এই অকাট্য নির্দেশকে সরাসরি পদদলিত করা। - ২. ঈমানহারা ও কাফের হওয়ার ঘোষণা: আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন:
﴿فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا﴾ (আপনার রবের শপথ! তারা কখনই মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না তারা তাদের পারস্পরিক বিবাদে আপনাকে বিচারক হিসেবে মেনে নেয় এবং আপনার ফয়সালা সম্পর্কে অন্তরে কোনো দ্বিধা না রেখে দ্বিধাহীন চিত্তে তা মেনে নেয়—সূরা আন-নিসা: ৬৫)। হাদিস অস্বীকারকারী রাসুলের ফয়সালা অমান্য করার কারণে সরাসরি ঈমানের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যায়। - ৩. বিভ্রান্তি ও জাহান্নামের পথ উন্মুক্ত হওয়া: কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
﴿فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ﴾ (অতএব যারা রাসুলের নির্দেশের বিরোধিতা করে তারা যেন ভয় করে যে তাদের ওপর কোনো বড় ফিতনা বা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি এসে পড়বে—সূরা আন-নূর: ৬৩)।
সুন্নাহর আলোকে হাদিস অস্বীকারের ধ্বংসাত্মক কুফল
- রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: «أَلَا إِنِّي أُوتِيتُ الْقُرْآنَ وَمِثْلَهُ مَعَهُ» (সাবধান! নিশ্চয়ই আমাকে কুরআন দেওয়া হয়েছে এবং তার সাথে কুরআনের অনুরূপ সুন্নাহও দেওয়া হয়েছে—মুসনাদে আহমদ)।
- হাদিস অস্বীকার করলে সালাতের রাকাত, যাকাতের পরিমাণ, হজের তওয়াফ ও জানাজার মতো ইসলামের কোনো ফরজিয়তই আমল করা সম্ভব হয় না।
উপসংহার
উম্মতের সকল মুহাদ্দিস ও ফক্বীহ একমত যে, সহিহ হাদিসকে শরিয়তের হুজ্জত হিসেবে সামগ্রিকভাবে অস্বীকারকারী ব্যক্তি সুস্পষ্ট মুরতাদ ও দ্বীনত্যাগী।
১৪। قيم الصوفية في ضوء القرآن والسنة بالإختصار –
[কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সুফিবাদের মূল্যায়ন সংক্ষেপে কর।]
[মান: ৫]
সুফিবাদ বা তাসাউফের সংজ্ঞা ও উদ্দেশ্য
ইসলামের পরিভাষায় আত্মার পরিশুদ্ধি (তাযকিয়াতুন নাফস), পার্থিব মোহ বর্জন (যুহদ) এবং নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর ইবাদত করার আধ্যাত্মিক সাধনাকে ‘তাসাউফ’ বা সুফিবাদ বলা হয়। এটি মূলত হাদিসে জিবরাঈলে বর্ণিত ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ ‘ইহসান’ (الإحسان)-এর বাস্তব রূপ। রাসুল (সা.) বলেছেন: ‘ইহসান হলো তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে যেন তুমি তাঁকে দেখছ।’
কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সুফিবাদের সঠিক ধারা (মকবুল তাসাউফ)
ইসলামের সোনালী যুগে প্রখ্যাত সালাফ ও হক্কানী বুজুর্গগণ—যেমন ফুযাইল ইবনে ইয়াজ, জুনাইদ বাগদাদী, হাসান বসরি ও আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.)—যে তাসাউফের চর্চা করেছেন, তা ছিল সম্পূর্ণ কুরআন ও সুন্নাহর অনুগত।
- ইমাম জুনাইদ বাগদাদী (রহ.) স্পষ্টভাবে বলেছিলেন: «عِلْمُنَا هَذَا مَشِيدٌ بِالْكِتَابِ وَالسُّنَّةِ، فَمَنْ لَمْ يَحْفَظِ الْقُرْآنَ وَلَمْ يَكْتُبِ الْحَدِيثَ لَا يُقْتَدَى بِهِ فِي عِلْمِنَا» (আমাদের এই ইলমে তাসাউফ কুরআন ও সুন্নাহর শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত; যে ব্যক্তি কুরআন হিফজ করেনি এবং হাদিস চর্চা করেনি, আমাদের এই পথে তার কোনো অনুসরণ করা যাবে না)।
- এই ধারার সুফিবাদ প্রশংসনীয় এবং তা মানুষের অন্তরকে অহংকার, রিয়া ও হিংসা থেকে পবিত্র করে আল্লাহর খাঁটি ওলিতে পরিণত করে।
সুফিবাদের ভ্রান্ত ও বিদআতি ধারা (মারদুদ তাসাউফ)
পরবর্তী যুগে গ্রিক ও হিন্দু দর্শনের সংমিশ্রণে সুফিবাদের মধ্যে মারাত্মক কিছু কুফরি ও বিদআতি বিষয় প্রবেশ করে, যা কুরআন ও সুন্নাহর স্পষ্ট বিরোধী:
- ১. ওয়াহদাতুল ওজুদ ও হুলুল: সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টির একাত্মতা দাবি করা, যা সরাসরি শিরক।
- ২. শরিয়ত ও মারেফতের কৃত্রিম বিভাজন: দাবি করা যে ‘পীর সাহেব মারেফতে পৌঁছে গেছেন, তাই তাঁর জন্য সালাত পড়া বা পর্দা করা লাগে না’—এটি সুস্পষ্ট কুফর ও দ্বীনত্যাগ।
- ৩. কবরপূজা, সেজদা ও গান-বাজনা: মাজারে সিজদা করা, মৃত অলিদের কাছে সন্তান চাওয়া এবং সামা বা কাওয়ালির নামে নাচ-গান করা স্পষ্ট হারাম।
উপসংহার
কুরআন ও সুন্নাহর অনুগত তাসাউফ হলো ইসলামের আত্মা (ইহসান); আর শরিয়তহীন তথাকথিত সুফিবাদ হলো চরম শয়তানী বিভ্রান্তি।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
ফাযিল ১ম বর্ষ ইলমুল ফিরাক্ব ৩য় পত্রের বিষয় কোড কত?
বিষয় কোড হলো ১১১০২২ এবং পরীক্ষার পূর্ণমান ১০০ নম্বর। সময় ৩ ঘণ্টা।
কাদিয়ানি সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতার নাম কী?
ভারতের পাঞ্জাবের ভণ্ড নবুওয়তের দাবিদার মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানি (১৮৩৯–১৯০৮ খ্রি.)।
আধুনিক বিভ্রান্ত গোষ্ঠী আহলে কুরআনের মূল ভ্রান্তি কী?
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও হাদিসকে শরিয়তের দলীল হিসেবে সার্বিকভাবে অস্বীকার করা।
ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের সাথে ইসলামের মূল দ্বন্দ্ব কোথায়?
আল্লাহর সার্বভৌম আইন ও শরিয়তকে রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করার দাবিতে।
তাওয়াসসুল বা উসিলা গ্রহণের গ্রহণযোগ্য নিয়ম কী?
আল্লাহর সুন্দর নাম, নিজের নেক আমল এবং জীবিত নেককার ব্যক্তির দোয়ার মাধ্যমে উসিলা নেওয়া।
বাহাই সম্প্রদায়ের বর্তমান আন্তর্জাতিক প্রধান তীর্থকেন্দ্র কোথায় অবস্থিত?
ইসরাইলের হাইফা নগরীর কারমেল পাহাড়ে অবস্থিত বাহাই বিশ্ব কেন্দ্র ও মন্দির।

