ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়
ফাযিল (স্নাতক) পাস ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪
বিষয়: ইলমুল ফিরাক্ব — ২য় পত্র (আল-ফিরক্বাতুল বাত্বিলাহ)
বিষয় কোড: ১১১০২১ | পূর্ণমান: ১০০ | সময়: ৩ ঘণ্টা
[দ্রষ্টব্য: ক-অংশ থেকে যেকোনো ৫টি এবং খ-অংশ থেকে যেকোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
ক-অংশ (মান: ১৬ × ৫ = ৮০)
১। ما المقصود بالافتراق في اصطلاح العلماء؟ ومتى بدأ الافتراق بين المسلمين؟ بين أثر الافتراق على وحدة الأمة الإسلامية في ضوء القرآن والسنة –
[আলেমদের পরিভাষায় ‘ইফতিরাক্ব’ বলতে কী বোঝায়? মুসলিমদের মধ্যে বিভক্তি কখন শুরু হয়েছিল? কুরআন ও হাদিসের আলোকে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের উপর বিভক্তির প্রভাব বর্ণনা কর।]
[মান: ১৬]
ভূমিকা ও ইফতিরাক্বের পারিভাষিক সংজ্ঞা
ইসলামি শরিয়তে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখা ফরজ এবং বিভক্তি ও অনৈক্য সৃষ্টি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আরবি ‘ইফতিরাক্ব’ (الافتراق) শব্দমূলের আভিধানিক অর্থ হলো—বিচ্ছিন্ন হওয়া, বিভক্ত হওয়া বা দলত্যাগ করা। ইসলামি আলেম ও কালামশাস্ত্রবিদগণের পরিভাষায় ‘ইফতিরাক্ব’ বলা হয়:
«الْخُرُوجُ عَنْ جَمَاعَةِ الْمُسْلِمِينَ وَمَا كَانَ عَلَيْهِ السَّلَفُ الصَّالِحُ فِي أُصُولِ الدِّينِ وَالْعَقِيدَةِ»
“ইসলামের মৌলিক আকিদা ও দ্বীনি উসূলে সালাফে সালেহীন এবং মুসলিম উম্মাহর মূলধারা বা বৃহত্তর জামাত থেকে বিচ্যুত হয়ে নতুন কোনো বিভ্রান্তিকর দল বা উপদল গঠন করাকে ইফতিরাক্ব বলা হয়।” এটি সাধারণ ফিক্বহী ইজতিহাদী মতভেদ নয়; বরং দ্বীনের মৌলিক স্তম্ভ ও আকিদায় ফাটল ধরানো।
মুসলিম সমাজে ইফতিরাক্ব বা বিভক্তির সূচনা কখন হয়েছিল?
ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় দেখা যায়—রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং খলিফা আবু বকর (রা.) ও উমর (রা.)-এর যুগ পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহ সম্পূর্ণ অখণ্ড ও একক জামাতবদ্ধ ছিল। কিন্তু ৩৫ হিজরিতে তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান (রা.)-এর মর্মান্তিক শাহাদাতের পর চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়। অতঃপর ৩৭ হিজরিতে হযরত আলী (রা.) ও হযরত মুআবিয়া (রা.)-এর মধ্যকার সিফফিনের যুদ্ধে যখন উভয় পক্ষের রক্তপাত বন্ধে ‘তাহকীম’ (সালিশি ব্যবস্থা) গৃহীত হয়, তখন হযরত আলীর সৈন্যদল থেকে একদল চরমপন্থী উগ্রবাদী আলাদা হয়ে ‘হারূরা’ নামক স্থানে সমবেত হয়। এরাই ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম আত্মপ্রকাশকারী বিভক্ত দল ‘আল-খাওয়ারিজ’ (খারেজী সম্প্রদায়)। এর সাথে সাথেই বিপরীতে ইবনে সাবার গোপন তৎপরতায় শিয়াদের উগ্র প্রকাশ ঘটে।
কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের ওপর বিভক্তির বিধ্বংসী প্রভাব
- ১. শক্তি ও প্রতিপত্তি বিনাশ: পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সতর্ক করেছেন:
﴿وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلاَ تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ﴾
“আর তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য কর এবং নিজেদের মধ্যে বিবাদে লিপ্ত হয়ো না; অন্যথায় তোমরা সাহস হারিয়ে ফেলবে এবং তোমাদের শক্তি ও প্রভাব বিলুপ্ত হবে।” (সূরা আল-আনফাল: ৪৬)। দলাদলি ও বিভক্তির ফলেই বিশ্বমঞ্চে মুসলমানদের পরাক্রমশালী অবস্থান ধূলিসাৎ হয়েছিল।
- ২. পারস্পরিক তাকফির ও রক্তপাত: বিভক্তির সবচেয়ে জঘন্য পরিণতি হলো—এক দল অন্য দলকে কাফের ফতোয়া দিয়ে মুসলমানদের রক্ত ও সম্পদকে হালাল মনে করতে শুরু করে, যেমন খারেজীরা করেছিল।
- ৩. নবুওয়তি সম্পর্কচ্ছেদ: আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন:
﴿إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا لَسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ﴾ (নিশ্চয় যারা দ্বীনকে খণ্ড-বিখণ্ড করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে, তাদের কোনো ব্যাপারেই আপনার দায়িত্ব নেই—সূরা আল-আনআম: ১৫৯)। - ৪. উম্মাহর আধ্যাত্মিক পতন: রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন:
«إِيَّاكُمْ وَالْفُرْقَةَ، فَإِنَّ الشَّيْطَانَ مَعَ الْوَاحِدِ وَهُوَ مِنَ الاِثْنَيْنِ أَبْعَدُ» (তোমরা বিভক্তি থেকে বেঁচে থাক; কেননা শয়তান একাকী ব্যক্তির সাথে থাকে আর দুজনের কাছ থেকে দূরে থাকে—তিরমিযী)।
উপসংহার
ইফতিরাক্ব হলো মুসলিম উম্মাহর দেহের এক মরণব্যাধি। কুরআনের রজ্জুকে সম্মিলিতভাবে আঁকড়ে ধরাই এই মরণঘাতী রোগ থেকে মুক্তির একমাত্র প্রতিষেধক।
২। عرف فرقة المعتزلة ثم تحدث عن خلفية نشأتها وعقائدهم الأساسية موضحا –
[মুতাজিলা সম্প্রদায়ের পরিচয় দাও। অতঃপর তাদের উৎপত্তির প্রেক্ষাপট ও মৌলিক আকিদাসমূহ সুস্পষ্টরূপে আলোচনা কর।]
[মান: ১৬]
মুতাযিলা সম্প্রদায়ের পরিচয়
ইসলামের ইতিহাসে মানবীয় যুক্তি ও বুদ্ধিকে অহির সমকক্ষ বা অগ্রাধিকার দিয়ে যে চরম যুক্তিবাদী দলের উদ্ভব হয়েছিল, তাদেরকে ‘আল-মু’তাযিলাহ’ (المعتزلة) বলা হয়। আরবি ‘ই’তিযাল’ (الاعتزال) অর্থ বিচ্ছিন্ন হওয়া বা পৃথক হয়ে যাওয়া। হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দীর সূচনায় বসরার প্রখ্যাত তাবেঈ ইমাম হাসান বসরি (রহ.)-এর দরস থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে এদের নাম মুতাযিলা রাখা হয়।
উৎপত্তির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
হিজরি ১০০ থেকে ১১০ সনের দিকে বসরার জামে মসজিদে ইমাম হাসান বসরি (রহ.)-এর ইলমী হালাক্বায় কবিরা গুনাহকারীর বিধান নিয়ে প্রশ্ন করা হলে, তাঁর অন্যতম ছাত্র ওয়াসিল ইবনে আতা (واصل بن عطاء) উদ্ধত হয়ে শিক্ষকের আগেই নিজস্ব মত প্রকাশ করে বলে—কবিরা গুনাহকারী মুমিনও নয় কাফেরও নয়, সে মধ্যবর্তী এক স্বতন্ত্র স্তরে থাকবে। এই কথা বলেই সে হালাক্বা ত্যাগ করে মসজিদের অন্য এক পিলারের পাশে পৃথক দল গঠন করে। তখন ইমাম হাসান বসরি দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিলেন: «اعْتَزَلَ عَنَّا وَاصِلٌ» (ওয়াসিল আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল)। এই ওয়াসিল ইবনে আতা এবং তার সহযোগী আমর ইবনে উবাইদের নেতৃত্বেই মুতাযিলা সম্প্রদায়ের জন্ম হয়।
মুতাযিলাদের মৌলিক পাঁচটি আকিদাগত মূলনীতি (الأصول الخمسة)
মুতাযিলাদের সমগ্র ধর্মীয় দর্শন পাঁচটি মৌলিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত:
- ১. আত-তাওহিদ (التوحيد): তাওহিদ প্রমাণের নামে তারা আল্লাহর সমস্ত সনাতন সিফাতকে (যেমন কালাম, ইলম, কুদরত) অস্বীকার করে (তা’তীল)। তাদের দাবি সিফাত মানলে বহু অনাদি সত্তা প্রমাণিত হবে। এই যুক্তি দিয়ে তারা দাবি করে যে ‘কুরআন আল্লাহর সৃষ্টি’ (খালক্বুল কুরআন)।
- ২. আল-আদল (العدل – ঐশী ন্যায়বিচার): আদলের নামে তারা তাকদির সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। তাদের দাবি—মানুষ নিজেই তার ভালো ও মন্দ কাজের একমাত্র স্বাধীন সৃষ্টিকর্তা (খাল্লিক্ব); মানুষের কাজে আল্লাহর কোনো কুদরত বা ইচ্ছা নেই।
- ৩. আল-ওয়াদ ওয়াল ওয়াইদ (الوعد والوعيد – প্রতিদান ও শাস্তি): আল্লাহ তাআলা নেককারকে জান্নাত দিতে এবং তওবা ছাড়া মারা যাওয়া কবিরা গুনাহগারকে চিরকাল জাহান্নামে শাস্তি দিতে বাধ্য। তাঁর কোনো ক্ষমা বা রাসুলের শাফাআত করার সুযোগ নেই।
- ৪. আল-মানযিলাতু বাইনাল মানযিলাতাইন (المنزلة بين المنزلتين): দুনিয়াতে কবিরা গুনাহকারী ঈমান ও কুফরের মাঝামাঝি একটি স্বতন্ত্র মর্যাদায় থাকবে; তবে তওবা ছাড়া মারা গেলে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে।
- ৫. আল-আমর বিল মারুফ ওয়ান নাহইউ আনিল মুনকার (الأمر بالمعروف والنهي عن المنكر): তাদের মতে অন্যায় দূর করতে মুসলিম শাসকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে তলোয়ার নিয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করা ওয়াজিব।
উপসংহার
মুতাযিলারা তাদের যুক্তিভিত্তিক দর্শনের মাধ্যমে তৎকালীন আব্বাসীয় খেলাফতের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিল এবং বহু আলিমের ওপর জুলুম করেছিল; কিন্তু শেষ পর্যন্ত সালাফে সালেহীন ও আহলুস সুন্নাহর অকাট্য দলিলে তাদের মতবাদ বিলুপ্ত হয়ে যায়।
৩। كيف نشأت فرقة الخوارج؟ وما أثرها على الأمة الإسلامية؟ بين مفصلا –
[খারেজি সম্প্রদায় কীভাবে জন্মলাভ করে? মুসলিম উম্মাহর উপর এর প্রভাব কী ছিল? বিস্তারিতভাবে বর্ণনা কর।]
[মান: ১৬]
খারেজী সম্প্রদায়ের উৎপত্তির ঐতিহাসিক পটভূমি
ইসলামের ইতিহাসে ‘আল-খাওয়ারিজ’ (الخوارج) হলো আত্মপ্রকাশকারী সর্বপ্রথম উগ্রবাদী ও চরমপন্থী বিদ্রোহী দল। আরবি ‘খুরূজ’ (الخروج) শব্দের অর্থ বের হয়ে যাওয়া বা বিদ্রোহ করা। বৈধ মুসলিম শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার কারণেই এদের খারেজী বলা হয়।
উৎপত্তির পুঙ্খানুপুঙ্খ ঘটনা: ৩৭ হিজরিতে জঙ্গে সিফফিনে যখন খলিফাতুল মুসলিমীন হযরত আলী (রা.) ও হযরত মুআবিয়া (রা.)-এর বাহিনীর মধ্যে লড়াই চূড়ান্ত রূপ নেয়, তখন মুআবিয়া (রা.)-এর পক্ষের সৈন্যদল তলোয়ারের মাথায় কুরআন ঝুলিয়ে আল্লাহর কিতাবের মাধ্যমে মীমাংসার আহ্বান জানায়। রক্তক্ষয় বন্ধ করতে হযরত আলী (রা.) সালিশি ব্যবস্থা (তাহকীম) অনুমোদন করেন। কিন্তু হযরত আলীর সেনাদলের অন্তর্ভুক্ত তামিম গোত্রের একদল চরমপন্থী লোক হঠকারী হয়ে ঘোষণা দেয়: «لاَ حُكْمَ إِلاَّ لِلَّهِ» (আল্লাহ ছাড়া কারো ফয়সালা দেওয়ার অধিকার নেই)। তারা দাবি করে মানুষ দিয়ে সালিশ করানো কুফরি। প্রায় বারো হাজার উগ্র সেনা হযরত আলীর আনুগত্য ত্যাগ করে কুফার নিকটবর্তী ‘হারূরা’ নামক স্থানে জড়ো হয়। তারা আব্দুল্লাহ ইবনে ওহাব আর-রাসেবী ও হরকুস ইবনে জুহাইরকে তাদের আমির নিযুক্ত করে এবং বৈধ খলিফা হযরত আলী (রা.)-কে কাফের ঘোষণা করে।
মুসলিম উম্মাহর ওপর খারেজীদের ধ্বংসাত্মক ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব
- ১. চরম তাকফিরি মতবাদের প্রবর্তন: খারেজীরাই সর্বপ্রথম এই বিষাক্ত আকিদা চালু করে যে—কবিরা গুনাহ করলেই মানুষ কাফের হয়ে যায় এবং তারা চিরস্থায়ী জাহান্নামী। এই মূলনীতি দিয়ে তারা হযরত উসমান, আলী, আয়েশা, মুআবিয়া (রা.)-সহ সমস্ত সাহাবায়ে কেরামকে কাফের আখ্যা দেয়।
- ২. রক্তক্ষয়ী সন্ত্রাস ও মুসলিম নিধন: খারেজীরা কাফের-মুশরিকদের কিছু না বললেও সাধারণ নিরীহ মুসলমানদের কাফের ও মুরতাদ ঘোষণা করে নৃশংসভাবে হত্যাযজ্ঞ চালায়। তারা প্রখ্যাত সাহাবী হযরত খাব্বাব ইবনুল আরাত (রা.)-এর গর্ভবতী স্ত্রী ও পুত্রকে চরম নিষ্ঠুরতায় জবাই করে।
- ৩. খুলাফায়ে রাশেদীনের অবসান ও আলী (রা.)-এর শাহাদাত: খারেজীদের হঠকারিতা দমন করতে হযরত আলী (রা.) ৩৮ হিজরিতে নাহরাওয়ানের যুদ্ধে তাদের চরমভাবে পরাস্ত করেন। এর প্রতিশোধ হিসেবে ৪০ হিজরির ১৭ রমজান কুফার মসজিদে ফজরের সালাতে খারেজী ঘাতক আব্দুর রহমান ইবনে মুলজিম হযরত আলী (রা.)-কে বিষাক্ত তলোয়ার দিয়ে আঘাত করে শহীদ করে।
- ৪. উম্মাহর অখণ্ড শক্তির অপচয়: উমাইয়া ও আব্বাসীয় যুগে খারেজীদের দফায় দফায় বিদ্রোহ দমন করতে মুসলিম খেলাফতকে শত শত যুদ্ধ পরিচালনা করতে হয়েছিল, যার ফলে মুসলিমদের সামরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রযাত্রা বহুলাংশে বাধাগ্রস্ত হয়।
উপসংহার
রাসুলুল্লাহ (সা.) এই খারেজীদের সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেছিলেন:
«يَمْرُقُونَ مِنَ الدِّينِ كَمَا يَمْرُقُ السَّهْمُ مِنَ الرَّمِيَّةِ» (তারা দ্বীন থেকে এমনভাবে ছিটকে বের হয়ে যাবে যেমন ধনুক থেকে তীর বের হয়ে যায়)। তারা কুরআন পড়ত কিন্তু তাদের কণ্ঠনালীর নিচে তা নামত না।
৪। ما الأسباب السياسية والدينية التي ساعدت على نشأة التشيع؟ وما موقف الشيعة من الخلفاء الراشدين؟ بين –
[শিয়াদের উত্থানে কোন কোন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কারণ ভূমিকা রেখেছে? খোলাফায়ে রাশেদীনের ব্যাপারে শিয়াদের অবস্থান কী? বর্ণনা কর।]
[মান: ১৬]
ভূমিকা ও শিয়াদের পরিচয়
আরবি ভাষায় ‘শিয়া’ (الشيعة) শব্দের অর্থ হলো—দল, সমর্থক বা অনুসারী। পরিভাষায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র আহলে বাইত এবং বিশেষ করে হযরত আলী (রা.)-এর প্রতি মাত্রাতিরিক্ত ভালোবাসা ও সমর্থনের নামে যারা প্রথম তিন খলিফাসহ জমহুর সাহাবায়ে কেরামকে অস্বীকার করেছে, তাদেরকে শিয়া সম্প্রদায় বলা হয়।
শিয়া মতবাদের উত্থানে সহায়ক রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কারণসমূহ
- ১. রাজনৈতিক কারণসমূহ:
- খিলাফত নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা: রাসুল (সা.)-এর ওফাতের পর সাকীফায়ে বনি সায়েদায় যখন আনসার ও মুহাজিরদের মাঝে খলিফা নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল, তখন কুরাইশদের বনু হাশিম গোত্রের কেউ কেউ মনে করেছিলেন খেলাফতের দায়িত্ব আলী (রা.)-এর পাওয়া উচিত ছিল। এটি প্রথমে কেবল একটি ব্যক্তিগত মত হলেও পরে রাজনৈতিক রূপ ধারণ করে।
- সিফফিন ও কারবালার ট্র্যাজেডি: সিফফিনের যুদ্ধ এবং বিশেষ করে ৬১ হিজরিতে কারবালার প্রান্তরে হযরত ইমাম হুসাইন (রা.)-এর মর্মান্তিক শাহাদাত মুসলিম বিশ্বের মানুষের অন্তরে উমাইয়াদের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা এবং আহলে বাইতের প্রতি এক আবেগাপ্লুত রাজনৈতিক সহমর্মিতা তৈরি করে, যাকে সুবিধাবাদীরা শিয়া আকিদায় রূপ দেয়।
- পারস্যের জাতীয়তাবাদী প্রভাব: প্রাচীন পারস্য সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়েছিলেন খলিফা উমর (রা.)। ফলে পারসিকরা প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য শিয়া মতবাদকে বর্ম হিসেবে ব্যবহার করে এবং ইমাম হুসাইনের সাথে পারস্য রাজকন্যার বিবাহের সূত্রে পারসিক রক্তের পবিত্রতা আবিষ্কার করে শিয়া মতবাদকে রাজতান্ত্রিক রূপ দেয়।
- ২. ধর্মীয় কারণসমূহ:
- আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার চক্রান্ত: ইয়েমেনের কপট ইহুদি আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা ইসলামে বিভ্রান্তি ছড়াতে ইহুদি ধর্মের ‘ওয়াসী’ তত্ত্ব এনে দাবি করে—মুসা (আ.)-এর স্থলাভিষিক্ত যেমন হারুন ছিলেন, তেমনি মুহাম্মদ (সা.)-এর একমাত্র ঐশী স্থলাভিষিক্ত হলেন আলী (রা.)।
- গোপন বাতেনি দর্শনের সংমিশ্রণ: শিয়ারা শরিয়তের প্রকাশ্য আয়াতের পেছনে ‘বাতেনী গোপন ইলম’ দাবি করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে।
খোলাফায়ে রাশেদীনের ব্যাপারে শিয়াদের জঘন্য অবস্থান
শিয়াদের সংখ্যাগরিষ্ঠ চরমপন্থী দল (রাফেজী ও ইসনা আশারিয়্যাদের) অবস্থান খোলাফায়ে রাশেদীনের ব্যাপারে অত্যন্ত কলঙ্কিত ও চরম কুফরিযুক্ত:
- ১. আবু বকর, উমর ও উসমান (রা.)-কে অপবাদ ও লানত: তারা দাবি করে যে রাসুল (সা.)-এর ওফাতের পর প্রথম তিন খলিফা হযরত আলীর ঐশী অধিকার জোরপূর্বক ছিনতাই করেছিলেন (নাউযুবিল্লাহ)। তারা এই তিন মহান খলিফাকে ‘সনামাই কুরাইশ’ (কুরাইশের দুই মূর্তি) ও ‘তাগুত’ বলে গালিগালাজ করে এবং তাঁদের ওপর লানত বর্ষণ করাকে সওয়াবের কাজ মনে করে।
- ২. সাহাবায়ে কেরামকে মুরতাদ আখ্যা: তারা বলে মাত্র চার-পাঁচজন ব্যতীত সমস্ত সাহাবী মুরতাদ হয়ে গিয়েছিলেন।
- ৩. একমাত্র আলী (রা.)-কে নিঃশর্ত মান্য: তারা কেবল হযরত আলী (রা.)-কেই প্রকৃত খলিফা মনে করে এবং তাঁকে নবুওয়তের সমকক্ষ বা ঊর্ধ্বে নিষ্পাপ ইমামের আসনে বসায়।
উপসংহার
তবে শিয়াদের মধ্যে ‘যাইদিয়া’ উপদলটি প্রথম দুই খলিফার খেলাফতকে বৈধ মনে করত এবং তাঁদের গালিগালাজ করত না; কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ রাফেজীদের আকিদা ইসলামের মৌলিক ভিত্তির ওপর এক মারাত্মক কুঠারাঘাত।
৫। تحدث عن المعارك التاريخية التي حدثت بين الخوارج وأهل السنة والجماعة –
[আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত এবং খারিজিদের মধ্যে সংঘটিত ঐতিহাসিক যুদ্ধসমূহ সম্পর্কে আলোচনা কর।]
[মান: ১৬]
ভূমিকা ও সংঘাতের অনিবার্যতা
খারেজীরা যখন নিজেদের ভ্রান্ত মতবাদকে কেন্দ্র করে সাধারণ মুসলমানদের রক্ত হালাল মনে করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু করে, তখন উম্মাহর জান-মাল ও খেলাফতের নিরাপত্তা রক্ষার্থে আহলুস সুন্নাহ ও মুসলিম শাসকদের জন্য তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করা অনিবার্য হয়ে ওঠে। ইতিহাসে খারেজীদের বিরুদ্ধে সংঘটিত প্রধান প্রধান ঐতিহাসিক যুদ্ধসমূহ নিম্নরূপ:
১. জঙ্গে নাহরাওয়ান (معركة النهروان – ৩৮ হিজরি)
খারেজীদের বিরুদ্ধে ইসলামের ইতিহাসের সর্বপ্রথম ও সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ছিল ‘জঙ্গে নাহরাওয়ান’।
- প্রেক্ষাপট: সিফফিনের পর খারেজীরা কুফা ছেড়ে নাহরাওয়ানে জমা হয়ে মুসলিম নারী ও শিশুদের হত্যা করতে শুরু করে। হযরত আলী (রা.) প্রথমে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-কে পাঠিয়ে তাঁদের সাথে বিতর্ক করান, যার ফলে চার হাজার খারেজী তওবা করে ফিরে আসে। কিন্তু অবশিষ্ট চরমপন্থীরা যুদ্ধ ঘোষণা করে।
- যুদ্ধের ফলাফল: ৩৮ হিজরির ৯ সফর হযরত আলী (রা.) চৌদ্দ হাজার সৈন্য নিয়ে নাহরাওয়ানে খারেজীদের ওপর আক্রমণ চালান। যুদ্ধে খারেজী নেতা আব্দুল্লাহ ইবনে ওহাব আর-রাসেবী ও হরকুস ইবনে জুহাইরসহ প্রায় সমস্ত খারেজী নিহত হয়। হযরত আলীর মাত্র সাত থেকে আটজন সৈন্য শহীদ হন। এ যুদ্ধে খারেজীদের কোমর ভেঙে যায়।
২. হযরত মুআবিয়া (রা.)-এর খেলাফতকালে খারেজী বিদ্রোহ দমন (৪১–৬০ হি.)
হযরত মুআবিয়া (রা.)-এর আমলে কুফা ও বসরার গভর্নর মুগিরা ইবনে শু’বা এবং যিয়াদ ইবনে আবিহি খারেজীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করেন। মুসতাওরিদ ইবনে আলক্বামার নেতৃত্বে খারেজীরা কুফায় বিদ্রোহ করলে মুসলিম সেনাদল তাদের নির্মমভাবে প্রতিহত করে তাদের সমস্ত চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেয়।
৩. জঙ্গে আজারিক্বা ও মুহাল্লাব ইবনে আবি সুফরার যুদ্ধসমূহ (৬৫–৭৫ হি.)
উমাইয়া যুগে খারেজীদের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ ও রক্তপিপাসু দল ছিল নাফে ইবনুল আজরাক্ব-এর অনুসারী ‘আল-আজারিক্বা’। তারা নারী ও শিশুদের হত্যা করত।
- মুহাল্লাবের বীরত্ব: মুসলিম সেনাপতি মুহাল্লাব ইবনে আবি সুফরা দীর্ঘ উনিশ বছর ধরে পারস্য, খুরাসান ও আহওয়ায অঞ্চলে আজারিক্বা খারেজীদের বিরুদ্ধে এক ডজনেরও বেশি রক্তক্ষয়ী লড়াই পরিচালনা করেন এবং অবশেষে তাদের সমূলে ধ্বংস করেন।
৪. শাবীব ইবনে ইয়াযীদ আশ-শায়বানীর বিরুদ্ধে হাজ্জাজের যুদ্ধ (৭৬–৭৭ হি.)
খারেজী নেতা শাবীব ও তার মা গাযালা কুফা আক্রমণ করে খেলাফতকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। উমাইয়া খলিফা আব্দুল মালিকের নির্দেশে সেনাপতি সুফিয়ান ইবনুল আবরাদ বিশাল সুন্নি বাহিনী নিয়ে শাবীবের বাহিনীকে পরাজিত করেন এবং শাবীব দুজাইল নদীতে ডুবে মারা যায়।
উপসংহার
খারেজীদের বিরুদ্ধে আহলুস সুন্নাহর এই ঐতিহাসিক যুদ্ধগুলো কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের লড়াই ছিল না; বরং তা ছিল নিরপরাধ মুসলিমদের জীবন রক্ষা এবং ইসলামি শরিয়তের বিকৃতি রোধের এক ঐতিহাসিক প্রতিরোধ সংগ্রাম।
৬। ما أهم فروع الشيعة؟ وما الفروق الرئيسية بين الشيعة الإمامية الإثنى عشرية والزيدية؟ بين –
[শিয়াদের প্রধান উপদলসমূহ কী? ‘ইমামিয়া ইসনা আশারিয়া’ ও ‘জাইদিয়া’ শিয়াদের প্রধান পার্থক্যগুলো কী? বর্ণনা কর।]
[মান: ১৬]
১. শিয়াদের প্রধান প্রধান উপদলসমূহ
শিয়া সম্প্রদায় তাদের ইমামত ও মতবাদের চরমপন্থার বিচারে ইতিহাসে প্রধানত তিনটি মূল ধারায় বিভক্ত হয়েছে:
- ১. আল-ইমামিয়্যাহ আল-ইস্না আশারিয়্যাহ (الإمامية الاثنا عشرية): যারা বারো জন সুনির্দিষ্ট ইমামে বিশ্বাসী এবং বর্তমান শিয়া বিশ্বের সর্ববৃহৎ দল।
- ২. আয-যাইদিয়্যাহ (الزيدية): ইমাম হুসাইন (রা.)-এর পৌত্র ইমাম যায়েদ ইবনে আলীর অনুসারী। শিয়াদের মধ্যে এরা সর্বাধিক পরিমিত ও আহলুস সুন্নাহর নিকটবর্তী দল। বর্তমানে ইয়েমেনে এদের অবস্থান রয়েছে।
- ৩. আল-ইসমাঈলিয়্যাহ বা বাতেনিয়্যাহ (الإسماعيلية): যারা জাফর সাদিকের পর ইসমাইলকে ইমাম মানে এবং শরিয়তের জাহেরি বিধান অস্বীকার করে চরম কুফরিতে লিপ্ত হয়েছে।
২. ‘ইমামিয়্যা ইসনা আশারিয়া’ ও ‘যাইদিয়া’-এর মধ্যকার প্রধান প্রধান পার্থক্য
শিয়াদের এই দুই বৃহৎ দলের মধ্যে আকিদা ও ফিক্বহের ক্ষেত্রে মৌলিক ও সুস্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান:
| ইমামিয়্যা ইসনা আশারিয়া (الاثنا عشرية) | যাইদিয়া সম্প্রদায় (الزيدية) |
|---|---|
| ১. ইমামতের সংখ্যা ও ঐশী নির্ধারণ: তাদের মতে ইমামত কেবল ১২ জন সুনির্দিষ্ট ইমামের জন্য আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত (নাস্সিয়্যা)। ১২তম ইমাম গুহায় লুকায়িত আছেন। | ১. ইমামতের শর্ত: তারা নির্দিষ্ট সংখ্যায় বিশ্বাসী নয়। ফাতিমী বংশের যেকোনো সাহসী, পরহেজগার আলেম যিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে তলোয়ার নিয়ে দাঁড়াবেন, তিনিই ইমাম হতে পারেন। কোনো লুকায়িত ইমামে তারা বিশ্বাস করে না। |
| ২. সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারে অবস্থান: তারা হযরত আবু বকর, উমর ও উসমান (রা.)-কে কাফের ও মুরতাদ ঘোষণা করে লানত দেয়। | ২. প্রথম দুই খলিফার প্রতি শ্রদ্ধা: তারা আবু বকর ও উমর (রা.)-এর খেলাফতকে বৈধ মনে করে এবং তাঁদের গালি দেয় না। তারা ‘ইমামাতুল মাফদূল মাআ উজূদিল আফদাল’ (উত্তম ব্যক্তি থাকা সত্ত্বেও অনুত্তমের ইমামত বৈধ) নীতিতে বিশ্বাসী। |
| ৩. ইমামদের ইসমত (নিষ্পাপত্ব): তারা তাদের ১২ জন ইমামকে নবীদের মতোই সর্বপ্রকার ভুল ও পাপ থেকে নিষ্পাপ (মা’সুম) মনে করে। | ৩. ইসমত অস্বীকার: তারা নবী ছাড়া কোনো ইমামকে নিষ্পাপ মনে করে না; ইমামের ভুল হতে পারে বলে বিশ্বাস করে। |
| ৪. তাক্বিয়্যা (মিথ্যা কপটতা): তারা নিজেদের আকিদা গোপন রেখে মিথ্যা বলাকে (তাক্বিয়্যা) দ্বীনের ৯/১০ ভাগ সওয়াবের কাজ মনে করে। | ৪. তাক্বিয়্যা বর্জন: তারা বীরত্বের সাথে সত্য প্রকাশে বিশ্বাস করে এবং তাক্বিয়্যাকে সম্পূর্ণ বর্জন করে। |
| ৫. মুতআ বিবাহ: তারা অর্থের বিনিময়ে সাময়িক মুতআ বিবাহকে অত্যন্ত পুণ্যময় ইবাদত মনে করে। | ৫. মুতআ বিবাহ হারাম: তারা আহলুস সুন্নাহর মতোই মুতআ বিবাহকে চিরতরে হারাম মনে করে। |
উপসংহার
ইমামিয়্যারা হলো চরমপন্থী রাফেজী, আর যাইদিয়ারা হলো সুন্নাহর নিকটবর্তী শিয়া। এজন্য আলিমগণ বলেছেন: ‘যাইদিয়া শিয়ারা বিদআতি হলেও রাফেজীদের মতো চরম গোমরাহ নয়।’
৭। ما أبرز أوجه الخلاف بين المعتزلة والخوارج وأهل السنة والجماعة؟ بين موضحا –
[মুতাজিলা, খারিজি ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের মধ্যে প্রধান বিরোধপূর্ণ দিকগুলো কী? বিশদভাবে বর্ণনা কর।]
[মান: ১৬]
ভূমিকা ও তুলনামূলক প্রেক্ষাপট
ইসলামি আকিদার ইতিহাসে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আহ হলো ভারসাম্যপূর্ণ মধ্যপন্থী মূলধারা। এর বিপরীতে ‘আল-খাওয়ারিজ’ হলো চরম ভাবাবেগপ্রসূত উগ্র তাকফিরি দল এবং ‘আল-মু’তাযিলাহ’ হলো মানবীয় বুদ্ধিকে চরম প্রাধান্য দেওয়া যুক্তিবাদী দল। প্রধান প্রধান আক্বিদাগত বিষয়ে এদের মধ্যকার বৈপরীত্য অত্যন্ত স্পষ্ট।
প্রধান বিরোধপূর্ণ দিকসমূহের তুলনামূলক পর্যালোচনা
- ১. কবিরা গুনাহকারীর শারঈ বিধান (مرتكب الكبيرة):
- খারেজী: কবিরা গুনাহকারী সরাসরি কাফের ও মুরতাদ; দুনিয়াতে তাকে হত্যা করা জায়েজ এবং আখেরাতে সে চিরকাল জাহান্নামে জ্বলবে।
- মুতাযিলা: সে দুনিয়াতে মুমিনও নয় কাফেরও নয়, বরং মধ্যবর্তী স্তরে (আল-মানযিলাতু বাইনাল মানযিলাতাইন) থাকবে; তবে তওবা ছাড়া মারা গেলে চিরকাল জাহান্নামে থাকবে।
- আহলুস সুন্নাহ: সে কাফের নয়; বরং সে ফাসিক্ব মুমিন। দুনিয়াতে সে মুসলিমদের সমস্ত অধিকার পাবে এবং আখেরাতে তওবা ছাড়া মারা গেলেও ঈমানের উসিলায় আল্লাহর রহমতে পরিশেষে জান্নাত লাভ করবে।
- ২. তাকদির ও মানুষের কাজের সৃষ্টি (القدر وأفعال العباد):
- খারেজী: প্রাচীন খারেজীরা তাকদিরে বিশ্বাস করত, তবে জাবরিয়্যা চরমপন্থা পোষণ করত।
- মুতাযিলা: তাকদির সম্পূর্ণ অস্বীকার করে; মানুষ নিজেই তার কাজের একমাত্র সৃষ্টিকর্তা (খাল্লিক্ব)।
- আহলুস সুন্নাহ: সমস্ত কাজের একমাত্র সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলা, আর মানুষ তার স্বাধীন ইচ্ছায় সেই কাজের উপার্জনকারী (কাসিব)।
- ৩. আল্লাহর সিফাত ও কুরআন (الصفات الإلهية والقرآن):
- মুতাযিলা: আল্লাহর সিফাত অস্বীকার করে এবং কুরআনকে আল্লাহর ‘সৃষ্ট’ (মাখলুক্ব) বস্তু বলে।
- খারেজী: বেশিরভাগ খারেজী পরবর্তীকালে মুতাযিলাদের এই বাতিল আকিদা গ্রহণ করেছিল।
- আহলুস সুন্নাহ: আল্লাহর সমস্ত সিফাত সত্য ও সনাতন; আর কুরআন আল্লাহর চিরন্তন বাণী এবং তা ‘অসৃষ্ট’ (গায়রু মাখলুক্ব)।
- ৪. আখেরাতে আল্লাহর দিদার বা দর্শন (رؤية الله تعالى):
- মুতাযিলা ও খারেজী: উভয়েই আখেরাতে মুমিনদের আল্লাহ দর্শনকে অসম্ভব বলে অস্বীকার করে।
- আহলুস সুন্নাহ: কিয়ামতের দিন ও জান্নাতে মুমিনগণ নিজ চর্মচক্ষু দিয়ে আল্লাহকে সরাসরি দর্শন করবেন—এটি সত্য ও প্রমাণিত।
- ৫. মুসলিম শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ (الخروج على الحاكم):
- খারেজী ও মুতাযিলা: শাসকের কোনো অন্যায় দেখলেই অস্ত্র হাতে বিদ্রোহ করা ও যুদ্ধ করা তাদের দ্বীনি রুকন।
- আহলুস সুন্নাহ: মুসলিম শাসকের প্রকাশ্য কুফরি ছাড়া সাধারণ পাপাচারের কারণে রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহ হারাম; বরং ধৈর্য ধারণ ও সদুপদেশ দেওয়া সুন্নাহ।
উপসংহার
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতই হলো কুরআন ও সুন্নাহর প্রদর্শিত ভারসাম্যপূর্ণ চিরন্তন নাজাতের রাজপথ।
৮। اكتب ترجمة الإمام عبد القاهر البغدادي ثم تحدث عن أهمية كتابه “الفرق بين الفرق” في دراسة الفرق الإسلامية –
[ইমাম আব্দুল কাহের বাগদাদীর জীবনী লেখ। অতঃপর ইসলামি ফেরকা বিষয়ে অধ্যয়নের ক্ষেত্রে তাঁর গ্রন্থ ‘আল-ফারকু বাইনাল ফিরাক’ এর গুরুত্ব আলোচনা কর।]
[মান: ১৬]
ইমাম আবু মনসুর আব্দুল কাহের আল-বাগদাদী (রহ.)-এর জীবনচরিত
ইসলামি ফেরকা ও কালামশাস্ত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক গবেষক হলেন ইমাম আবু মনসুর আব্দুল কাহের ইবনে তাহির ইবনে মুহাম্মদ আল-বাগদাদী আত-তামীমী আশ-শাফেঈ (রহ.)। তিনি বাগদাদে এক অভিজাত ও বিদ্যানুরাগী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পরবর্তীতে নিশাপুরে হিজরত করেন এবং সেখানে দীর্ঘ সতেরো বছর বিভিন্ন মসজিদে সতেরোটি আলাদা আলাদা বিষয়ে পাঠদান করতেন। তিনি ছিলেন একাধারে উসূলে কালাম, ফিক্বহ, হাদিস, আরবি ব্যাকরণ এবং পাটিগণিত ও জ্যামিতিশাস্ত্রে অনন্য বিস্ময়কর প্রতিভা। তিনি ইমাম আবুল হাসান আল-বাহিলী ও ইমাম ইসমাঈলীর কাছে জ্ঞানার্জন করেন। ৪২৯ হিজরিতে তিনি এসফারায়িনে ইন্তেকাল করেন এবং প্রখ্যাত ইমাম আবু ইসহাক আল-এসফারায়িনীর কবরের পাশে সমাহিত হন।
তাঁর অমর গ্রন্থ ‘আল-ফারক্বু বাইনাল ফিরাক্ব’ (الفرق بين الفرق)
ইসলামি ফেরকা এবং তুলনামূলক ধর্মীয় মতবাদ (মাকালাতুল ফিরাক্ব) অধ্যয়নের ইতিহাসে ইমাম বাগদাদীর এই গ্রন্থটি একটি অতুলনীয় মৌলিক ক্লাসিক গ্রন্থ হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। কিতাবটির পূর্ণ নাম হলো:
«الْفَرْقُ بَيْنَ الْفِرَقِ وَبَيَانُ الْفِرْقَةِ النَّاجِيَةِ مِنْهُمْ» (বিভিন্ন দলের পারস্পরিক বিভক্তি এবং তাদের মধ্য থেকে নাজাতপ্রাপ্ত দলের বিবরণ)।
ফেরকা অধ্যয়নে কিতাবটির অসামান্য গুরুত্ব ও অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ
- ১. ৭৩ ফেরকার হাদিসের নিখুঁত কাঠামোগত বিন্যাস: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর তেহাত্তর ফেরকার ভবিষ্যদ্বাণীর ওপর ভিত্তি করে তিনি চমৎকারভাবে দেখিয়েছেন কীভাবে মূল বিভ্রান্ত দলগুলো (যেমন রাফেজী, খারেজী, কাদারিয়্যা, মুতাযিলা, জাহমিয়া, মুজাসসিমা ইত্যাদি) থেকে শাখা-প্রশাখা হয়ে ৭২টি বাতিল ফেরকার উদ্ভব ঘটেছিল।
- ২. প্রতিটি ফেরকার আকিদার বস্তুনিষ্ঠ ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ: তিনি কোনো পক্ষপাতদুষ্ট কাল্পনিক অভিযোগ না এনে প্রতিটি দলের নিজস্ব নেতা, তাদের উদ্ভবস্থান, তাদের মূল বই এবং তাদের বিপজ্জনক আকিদাগুলোকে গভীর প্রজ্ঞার সাথে উন্মোচন করেছেন।
- ৩. বাতেনিয়া ও চরমপন্থী মুরতাদদের স্বরূপ উন্মোচন: বাতেনিয়া কারামিতা, সাবাঈয়্যাহ ও খুররামীয়ারা কীভাবে বাহ্যিক ইসলামের লেবাস পরে ভেতর থেকে ইসলামকে ধ্বংস করার ইহুদি-পারসিক ষড়যন্ত্র করেছিল, তা তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে ফাঁস করেছেন।
- ৪. আল-ফিরক্বাতুন নাজিয়াহর পরিচয় ও বিজয় প্রতিষ্ঠা: গ্রন্থের শেষাংশে তিনি অকাট্য কুরআনী ও যৌক্তিক দলিলের সাহায্যে প্রমাণ করেছেন যে—ইমাম আবুল হাসান আল-আশআরী ও ইমাম আবু মনসুর আল-মাতুরিদীর সুন্নি কালামের অনুসারী আহলুস সুন্নাহর আলিমগণই হলেন একমাত্র মুক্তিপ্রাপ্ত সত্য কাফেলা।
উপসংহার
ইসলামের ইতিহাসের সূচনালগ্নের বুদ্ধিবৃত্তিক সংঘাত এবং বিভ্রান্তিকর চিন্তাধারা থেকে আত্মরক্ষায় ‘আল-ফারক্বু বাইনাল ফিরাক্ব’ আজও সমগ্র মুসলিম বিশ্বের গবেষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য এক অপরিহার্য বিশ্বকোষ।
খ-অংশ (মান: ৫ × ৪ = ২০)
৯। ما عقيدة الشيعة في الإمامة؟ بين –
[ইমামত সম্পর্কে শিয়াদের আকিদা কী? বর্ণনা কর।]
[মান: ৫]
ভূমিকা ও শিয়াদের নিকট ইমামতের মর্যাদা
ইসলামি আকিদা ও ইতিহাসের পর্যালোচনায় শিয়া সম্প্রদায়ের সর্বাধিক স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত ও কেন্দ্রীয় বিশ্বাসের নাম হলো ‘আল-ইমামাহ’ (الإمامة)। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের নিকট খিলাফত বা ইমামত হলো ফিক্বহী শরিয়তের একটি সাধারণ শাখা-প্রশাখার বিষয় (মাসয়ালাহ ফারঈয়্যাহ বা ফরযে কিফায়া)। কিন্তু শিয়াদের দৃষ্টিতে ‘ইমামত’ হলো তাওহিদ ও নবুওয়তের মতোই ঈমানের প্রধানতম মৌলিক রুকন বা ভিত্তি। যে ব্যক্তি তাদের নির্দিষ্ট বারো ইমামের প্রতি ঈমান আনবে না, সে তাদের দৃষ্টিতে ঈমানহীন, পথভ্রষ্ট ও চিরজাহান্নামী।
ইমামত সম্পর্কে শিয়াদের মৌলিক ভ্রান্ত আকিদাসমূহ
- ১. ঐশী মনোনয়ন ও নাস্সিয়্যা (النص الإلهي والتعيين): শিয়াদের চরম বিশ্বাস হলো, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর উম্মতের পারস্পরিক পরামর্শ, বায়আত বা গণতান্ত্রিক নির্বাচনের কোনো শারঈ অধিকার নেই। স্বয়ং আল্লাহ তাআলা হযরত আলী (রা.) এবং তাঁর নির্দিষ্ট বংশধরদের আসমানী ওহির মাধ্যমে ইমাম হিসেবে মনোনীত করেছেন। তাদের দাবি, রাসুল (সা.) বিদায় হজের পর ‘গাদিরে খুম’ নামক স্থানে লক্ষ সাহাবার সামনে হযরত আলী (রা.)-এর খেলাফত ও অভিভাবকত্বের স্পষ্ট ঘোষণা দিয়ে গিয়েছিলেন, যা অন্যান্য সাহাবায়ে কেরাম গোপন করে অন্যায় করেছেন (নাউযুবিল্লাহ)।
- ২. ইমামদের জন্মগত নিষ্পাপত্ব (العصمة المطلقة): শিয়াদের বিশ্বাস অনুসারে, তাদের বারোজন ইমাম জন্মগতভাবে জীবনের প্রথম লগ্ন থেকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সর্বপ্রকার ছোট-বড় কবিরা ও সগিরা গুনাহ, পদস্খলন, ভুলভ্রান্তি ও বিস্মৃতি থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত ও নিষ্পাপ (মা‘সুম)। এই বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে তারা ইমামদের নবী-রাসুলগণের সমকক্ষ বা তাঁদের চেয়েও উচ্চতর মর্যাদা দিয়ে থাকে।
- ৩. গায়েবের সার্বিক জ্ঞান ও সৃষ্টিজগতে অলৌকিক কর্তৃত্ব: শিয়াদের সর্বপ্রধান প্রামাণ্য গ্রন্থ ‘আল-কাফী’-তে ইমামদের সম্পর্কে অধ্যায় রচিত হয়েছে যে, ‘ইমামগণ কখন মৃত্যুবরণ করবেন তা নিজেরাই জানেন এবং তাঁদের ইচ্ছামাফিক মৃত্যুবরণ করেন।’ তারা বিশ্বাস করে, মহাবিশ্বের প্রতিটি অণু-পরমাণুর অদৃশ্য ইলম ইমামদের কাছে উন্মুক্ত এবং তাঁরা সৃষ্টিজগতের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ (বিলায়াত তাকবীনী) পরিচালনা করার ক্ষমতাপ্রাপ্ত।
- ৪. ঐশী প্রত্যাদেশ ও মুসহাফে ফাতিমার দাবি: শিয়াদের আকিদা অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পরও ইমামদের কাছে জিবরাঈল (আ.) নিয়মিত আসতেন এবং তাঁদের ওপর ওহিসদৃশ নির্দেশ জারি হতো। তারা দাবি করে, তাঁদের কাছে ‘মুসহাফে ফাতিমাহ’ ও ‘আল-জাফর’ নামক বিশেষ গোপন কিতাব রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের নিকট রক্ষিত কুরআনের চেয়ে তিনগুণ বড়।
উপসংহার ও আহলুস সুন্নাহর দৃষ্টিভঙ্গি
আহলুস সুন্নাহর আলিমগণ ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, শিয়াদের এই কল্পিত ইমামত আকিদা মূলত নবুওয়তের সমাপ্তি (খাতমে নবুওয়ত)-কে পরোক্ষভাবে অস্বীকার করার এক অপকৌশল। কুরআন ও সুন্নাহর সহিহ দলিলে ইমামতের কোনো বংশানুক্রমিক বা নিষ্পাপ ঐশী বিধান সাব্যস্ত হয়নি; বরং খেলাফত ছিল উম্মতের পরামর্শভিত্তিক এক সুমহান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব।
১০। ما موقف المعتزلة عن الصفات الإلهية؟ اشرح –
[আল্লাহর গুণাবলি সম্পর্কে মু’তাযিলাদের অবস্থান কী? ব্যাখ্যা কর।]
[মান: ৫]
ভূমিকা ও মুতাযিলাদের মূল দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামি কালামশাস্ত্রের ইতিহাসে আল্লাহর সিফাত বা পবিত্র গুণাবলি প্রমাণের ক্ষেত্রে মুতাযিলা সম্প্রদায়ের অবস্থান হলো চরম অস্বীকৃতি, বর্জন ও নিস্ক্রিয়করণ, যাকে পরিভাষায় ‘তা’তীলুস সিফাত’ (تعطيل الصفات) বলা হয়। এ কারণে মুহাদ্দিসীন ও আহলুস সুন্নাহর ইমামগণ মুতাযিলাদের তীব্র নিন্দা করে ‘মু‘আত্তিলাহ’ (গুণাবলি অস্বীকারকারী দল) নামে অভিহিত করেছেন। তারা নিজেদের ‘আহলুত তাওহিদ’ দাবি করলেও মানবীয় যুক্তির ফাঁদে পড়ে মহান আল্লাহর চিরন্তন গুণাবলিকে সম্পূর্ণ শূন্য করে ফেলেছিল।
মুতাযিলাদের ভ্রান্ত যুক্তি ও তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা
- ১. ‘তাআদ্দুদে কুদামাহ’ (একাধিক অনাদি সত্তার ভীতি): মুতাযিলারা চরম যুক্তিবাদের অনুসারী হয়ে দাবি করে—আল্লাহ তাআলার সত্তা (জাত) হলো কাদীম বা অনাদি। এখন যদি আল্লাহর সত্তার সাথে তাঁর জ্ঞান (ইলম), জীবন (হায়াত), ক্ষমতা (কুদরত), ইচ্ছা (ইরাদা) এবং বাণী (কালাম)-কে চিরন্তন ও অনাদি সিফাত বলে স্বীকার করা হয়, তবে একটি নয় বরং বহু অনাদি সত্তার অস্তিত্ব সাব্যস্ত হবে (تعدد القدماء والآلهة)। আর একাধিক চিরন্তন সত্তা স্বীকার করা মানে সরাসরি খ্রিস্টানদের ত্রিত্ববাদের মতো শিরকে লিপ্ত হওয়া। এই কাল্পনিক ভয় থেকে বাঁচতে তারা সিফাতকেই অস্বীকার করে বসে।
- ২. সিফাতহীন সত্তার কাল্পনিক দর্শন (نفي الصفات الزائدة): এই দার্শনিক ভ্রান্তির কারণে তারা বলে—আল্লাহর সত্তা থেকে অতিরিক্ত কোনো সিফাতের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নেই। তারা অদ্ভুতভাবে ব্যাখ্যা করে: ‘আল্লাহ তাঁর সত্তা দিয়েই সর্বজ্ঞাতা, তবে তাঁর ইলম নামক কোনো সিফাত নেই; আল্লাহ সত্তাগতভাবেই ক্ষমতাবান, তবে কুদরত নামক কোনো গুণ নেই।’ অর্থাৎ সত্তাই সব, গুণের কোনো অস্তিত্ব নেই—যা বাস্তবে এক শূন্য ও নিষ্ক্রিয় সত্তার কল্পনা।
- ৩. কালামুল্লাহ অস্বীকার ও কুরআনকে ‘সৃষ্ট’ দাবি (خلق القرآن): মুতাযিলাদের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক পরিণতি ছিল আল্লাহর কালামকে অস্বীকার করা। তারা দাবি করে, কথা বলা যেহেতু একটি কাজ, তাই কুরআন আল্লাহর শাশ্বত গুণ নয়; বরং তা সাধারণ বৃক্ষ বা পাথরের মতো আল্লাহর তৈরি এক নশ্বর সৃষ্টি (মাখলুক্ব)। এ কারণেই আব্বাসীয় যুগে তাদের দ্বারা ‘ফিতনাতু খালক্বিল কুরআন’ এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর ওপর নির্মম কারানির্যাতন সংঘটিত হয়েছিল।
- ৪. আখেরাতে আল্লাহর দিদার অস্বীকার (نفي الرؤية): তারা যুক্তি দেয়, আল্লাহকে চোখ দিয়ে দেখতে হলে আল্লাহর দিক, স্থান ও দূরত্ব প্রয়োজন, যা অসম্ভব। ফলে তারা সহিহ হাদিসে বর্ণিত কিয়ামতের দিন মুমিনদের জন্য আল্লাহর নূরে নূরান্বিত দিদারের শাশ্বত নিয়ামতকে সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রতিপন্ন করে।
আহলুস সুন্নাহর প্রাজ্ঞ খণ্ডন ও উপসংহার
ইমাম আবুল হাসান আল-আশআরী ও ইমাম আবু মনসুর আল-মাতুরিদী (রহ.) মুতাযিলাদের এই ভ্রান্তি খণ্ডন করে প্রমাণ করেছেন যে—আল্লাহর সিফাত আল্লাহর সত্তার অন্তর্ভুক্ত এক সনাতন বাস্তবতা; তা সত্তা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা কোনো দ্বিতীয় উপাস্য নয়। যেমন সূর্যের আলো ও উত্তাপ থাকলে সূর্যের একাধিক অস্তিত্ব বোঝায় না। অতএব আল্লাহর পবিত্র সিফাত স্বীকার করলে কখনোই বহু ঈশ্বরবাদ হয় না; বরং সিফাত অস্বীকার করাই আল্লাহর পরম মহিমাকে ক্ষুণ্ণ করার নামান্তর।
১১। متى ظهرت فرقة الجهمية؟ ومن مؤسسها؟
[জাহমিয়্যা সম্প্রদায়ের অভ্যুদয় কখন ঘটে? এ সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা কে?]
[মান: ৫]
জাহমিয়্যা সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা ও নেপথ্য ব্যক্তিত্ব
ইসলামের ইতিহাসে আকিদাগত বিভ্রান্তি ছড়ানোর ক্ষেত্রে সর্বাপেক্ষা মারাত্মক ও ঘৃণিত বাতিল দল ‘আল-জাহমিয়্যা’ (الجهمية)-এর প্রতিষ্ঠাতা ছিল জাহম ইবনে সাফওয়ান আবু মিহরায আত-তিরমিযী আস-সামারক্বান্দী। সে ছিল তৎকালীন কুখ্যাত পারসিক ও গ্রিক দর্শনপ্রভাবিত ভ্রান্ত তাত্ত্বিক জা‘দ ইবনে দিরহামের প্রধান ভাবশিষ্য। কুফার অধিবাসী জা‘দ ইবনে দিরহাম যখন সর্বপ্রথম আল্লাহর সিফাত অস্বীকার করে ঘোষণা দিয়েছিল যে ‘আল্লাহ ইবরাহিমকে খলিল হিসেবে গ্রহণ করেননি এবং মুসার সাথে সরাসরি কথাও বলেননি’, তখন ইরাকের সুন্নি গভর্নর খালিদ ইবনে আব্দুল্লাহ আল-কাসরী তাকে ঈদুল আজহার দিনে কুরবানির পশু জবাইয়ের পূর্বে প্রকাশ্যে হত্যা করেন। জা‘দের মৃত্যুদণ্ডের পর তার প্রধান ছাত্র জাহম ইবনে সাফওয়ান খুরাসান ও বলখের বিস্তৃত অঞ্চলে পালিয়ে গিয়ে নতুন উদ্যমে এই বিষাক্ত মতবাদের বিস্তার ঘটায়।
জাহমিয়্যার অভ্যুদয়ের সময়কাল ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
জাহমিয়্যা সম্প্রদায়ের অভ্যুদয় ও সক্রিয় বিস্তার ঘটেছিল উমাইয়া খেলাফতের শেষভাগে, হিজরি প্রথম শতাব্দীর শেষ দশক থেকে দ্বিতীয় শতাব্দীর প্রথমার্ধে (আনুমানিক ১০০ হিজরি থেকে ১২৮ হিজরির মধ্যবর্তী সময়ে)।
- আবির্ভাবের ভৌগোলিক অঞ্চল: মধ্য এশিয়ার খুরাসান, তিরমিয, মার্ভ এবং পারস্যের সীমান্তবর্তী অঞ্চল ছিল এদের প্রধান সূতিকাগার। তৎকালীন পারসিক দার্শনিক ও নব্য মুসলিমদের কাঁচা বুদ্ধির সুযোগ নিয়ে জাহম এই দার্শনিক বিভ্রান্তির বীজ বপন করে।
- রাজনৈতিক বিদ্রোহ ও পতন: জাহম কেবল তাত্ত্বিক বিভ্রান্তিই ছড়ায়নি, বরং উমাইয়া খলিফা হিশাম ইবনে আব্দুল মালিক ও মারওয়ান ইবনে মুহাম্মদের শাসনামলে সে হারিছ ইবনে সুরাইজের সাথে হাত মিলিয়ে উমাইয়া খেলাফতের বিরুদ্ধে সশস্ত্র রাজনৈতিক বিদ্রোহ পরিচালনা করে। অবশেষে হিজরি ১২৮ সনে খুরাসানের মার্ভ নগরীতে উমাইয়া বীর সেনাপতি নাসর ইবনে সাইয়্যারের সেনাবাহিনীর সাথে এক তুমুল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জাহম ইবনে সাফওয়ান শোচনীয়ভাবে পরাজিত ও ধৃত হয়ে নিহত হয়।
জাহমিয়্যাদের প্রধান চারটি ধ্বংসাত্মক আকিদা
- ১. আল্লাহর সমস্ত আসমা ও সিফাত অস্বীকার: জাহম দাবি করত আল্লাহকে কোনো সিফাত দ্বারা গুণান্বিত করা যাবে না, কারণ বান্দারও সেসব গুণ থাকতে পারে। ফলে সে আল্লাহর অস্তিত্বকে এক শূন্য সত্তায় পরিণত করে।
- ২. চরম জাবরবাদ (الجبر الخالص): মানুষের কোনো প্রকার ইচ্ছা বা ক্ষমতা নেই; মানুষ বাতাসের মুখের শুকনো পাতার মতো বা জড়বস্তুর মতো সম্পূর্ণরূপে বাধ্য পুতুল মাত্র।
- ৩. চরম ইরজা বা ঈমান বিষয়ক ভ্রান্তি: অন্তরে কেবল আল্লাহকে চিনে রাখা বা জানা-ই হলো পূর্ণ ঈমান; এর জন্য মুখে উচ্চারণ বা কোনো আমল করার আদৌ প্রয়োজন নেই। এমনকি সে বলত ইবলিসেরও অন্তরে আল্লাহর পরিচয় ছিল।
- ৪. জান্নাত ও জাহান্নামের নশ্বরতা: সে কুরআন অবমাননা করে দাবি করত জান্নাত ও জাহান্নাম একসময় সম্পূর্ণ ধ্বংস ও লয় হয়ে যাবে।
উপসংহার
সালাফে সালেহীন, চার মাজহাবের ইমামগণ এবং মুহাদ্দিসীন একবাক্যে রায় দিয়েছেন যে, জাহমিয়্যাদের মূল নেতৃত্ব ইসলামের গণ্ডির বাইরে ছিল। ইমাম বুখারি (রহ.) তাদের খণ্ডনে ‘খালকু আফআলিল ইবাদ’ নামক অমর গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।
১২। كيف ينظر الخوارج إلى الإمامة والخلافة؟
[খারিজিরা ইমামত ও খিলাফতের ব্যাপারে কী দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে?]
[মান: ৫]
ভূমিকা ও খারেজীদের স্বতন্ত্র রাজনীতি দর্শন
ইসলামের ইতিহাসে খারেজী সম্প্রদায় খেলাফত ও রাষ্ট্রশাসনের ক্ষেত্রে কুরআন ও সুন্নাহর প্রতিষ্ঠিত সর্বজনীন ঐতিহ্য ভঙ্গ করে এক চরম বিশৃঙ্খল ও বিতর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছিল। তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি ছিল তৎকালীন আরব সমাজের প্রচলিত সমাজব্যবস্থার পরিপন্থী এক চরমপন্থী বিপ্লবী দর্শন।
ইমামত ও খেলাফত সম্পর্কে খারেজীদের মূল দৃষ্টিভঙ্গিসমূহ
- ১. কুরাইশ বংশের শর্ত সম্পূর্ণ অস্বীকার: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুপ্রসিদ্ধ সহিহ হাদিস—«الأَئِمَّةُ مِنْ قُرَيْشٍ» (খলিফাগণ কুরাইশ বংশ থেকে হবেন)—খারেজীরা এই হাদিস সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে। তাদের মতে, কোনো হাবশী কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাসও যদি দ্বীনদার ও সৎ হয়, তবে সেও সমগ্র মুসলিম উম্মাহর সর্বোচ্চ খলিফা হতে পারবে।
- ২. জনগণের অবাধ নির্বাচনের দাবি: খারেজীদের মতে খলিফা নির্বাচন কোনো বংশ বা নির্দিষ্ট পরিবারের একচেটিয়া অধিকার নয়; এটি সম্পূর্ণ সাধারণ মুসলমানদের স্বাধীন ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল।
- ৩. শাসকের সামান্যতম পাপে বিদ্রোহ ও হত্যা জায়েজ: তাদের সবচেয়ে বিপজ্জনক নীতি হলো—খলিফা যদি সামান্যতম কোনো কবিরা গুনাহে লিপ্ত হন বা ইনসাফ থেকে এক চুল বিচ্যুত হন, তবে তিনি সাথে সাথে কাফের ও মুরতাদ হয়ে যাবেন। তখন তাঁর বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘোষণা করে তাঁকে হত্যা করা সমস্ত মুসলিমের ওপর ফরজ হয়ে যাবে। এই নীতির কারণেই তারা হযরত উসমান (রা.) ও হযরত আলী (রা.)-এর মতো শ্রেষ্ঠ খলিফাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল এবং আলী (রা.)-কে নির্মমভাবে শহীদ করেছিল।
- ৪. ইমামতকে আবশ্যকীয় রুকন মনে না করা: তাদের চরমপন্থী উপদল ‘নাজদাত’ বলে—সমাজে যদি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত থাকে, তবে কোনো কেন্দ্রীয় খলিফা বা রাষ্ট্রপ্রধান থাকারই কোনো প্রয়োজন নেই।
উপসংহার
খারেজীদের এই নৈরাজ্যবাদী দর্শন মুসলিম সমাজে স্থায়ী যুদ্ধ, রক্তপাত ও চরম অস্থিতিশীলতার বীজ বপন করেছিল।
১৩। كيف تعامل السلف الصالح مع أهل الفرق الباطلة؟
[বাতিল ফিরকার অনুসারীদের সাথে সালফে সালেহীনরা কীভাবে আচরণ করেছেন?]
[মান: ৫]
ভূমিকা ও সালাফদের মূলনীতি
সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন এবং তাবে-তাবেঈনদের সোনালী কাফেলা ‘সালাফে সালেহীন’ বাতিল ও বিভ্রান্ত ফেরকাগুলোর বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর, আপসহীন ও প্রজ্ঞাপূর্ণ নীতি অবলম্বন করেছিলেন। দ্বীনের মৌলিক আকিদার সুরক্ষায় তাঁরা বিন্দুমাত্র শিথিলতা প্রদর্শন করেননি।
বাতিল ফেরকার সাথে সালাফদের আচরণের পাঁচটি প্রধান ধারা
- ১. সর্বপ্রকার বয়কট ও সামাজিক বর্জন (الهجران والتحذير): সালাফে সালেহীন বিদআতি ও বাতিল ফেরকার লোকদের সাথে ওঠা-বসা, সালাম দেওয়া, তাদের জানাজায় অংশ নেওয়া এবং তাদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া সম্পূর্ণ বর্জন করতেন। ইমাম হাসান বসরি ও ইবনে সিরীন (রহ.) বিদআতিদের সাথে বসে হাদিসের একটি শব্দ শুনতেও অস্বীকৃতি জানাতেন।
- ২. কোনো প্রকার ইলমী বৈঠক বা বন্ধুত্ব না রাখা: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) তাকদির অস্বীকারকারী কাদারিয়্যাদের কথা শুনে বলেছিলেন: ‘তাদের জানিয়ে দাও তাদের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই এবং আমার সাথেও তাদের সম্পর্ক নেই।’
- ৩. বিতর্ক ও যুক্তি দিয়ে সত্য উন্মোচন (المناظرة لإقامة الحجة): যখন কোনো পথভ্রষ্ট দল সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করত, তখন প্রাজ্ঞ সালাফগণ তাদের সাথে প্রকাশ্যে বিতর্কে লিপ্ত হয়ে তাদের যুক্তি খণ্ডন করতেন। যেমন হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) খারেজীদের সাথে এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল মুতাযিলাদের সাথে রাজকীয় দরবারে মুনাজারা করেছিলেন।
- ৪. গ্রন্থ রচনা করে বিভ্রান্তি ফাঁস করা: ইমাম বুখারি ‘খালকু আফআলিল ইবাদ’, ইমাম আহমদ ‘আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ’ এবং ইমাম আবু হানিফা ‘আল-ফিক্বহুল আকবার’ রচনা করে তাদের মুখোশ উন্মোচন করেছিলেন।
- ৫. রাষ্ট্রীয়ভাবে উগ্র সন্ত্রাসীদের দমন: যখন খারেজীদের মতো দল অস্ত্র তুলে নিরীহ মানুষ হত্যা শুরু করত, তখন সালাফগণ রাষ্ট্রীয় শক্তির সাহায্যে যুদ্ধ করে সমাজকে তাদের সন্ত্রাস থেকে মুক্ত করতেন।
উপসংহার
সালাফে সালেহীনের এই আপসহীন দৃঢ়তার কারণেই শত শত ঝঞ্ঝা-বিক্ষোভের মধ্যেও ইসলামের খাঁটি সুন্নাহ আজও অবিকৃত অবস্থায় সুরক্ষিত রয়েছে।
১৪। علق على واحد مما يلي : كتب الخوارج، فرقة الجبرية، فرقة المشبهة –
[নিচের যেকোনো একটি বিষয়ে টীকা লেখ: খারিজিদের কিতাবসমূহ, ফিরকা জাবারিয়া, ফিরকায়ে মুশাব্বিহা।]
[মান: ৫]
ফিরক্বায়ে জাবারিয়া (فرقة الجبرية – চরম নিয়তিবাদী সম্প্রদায়)
পরিচিতি ও অর্থ: ইসলামি কালামশাস্ত্রের ইতিহাসে ‘আল-জাবরিয়্যাহ’ হলো সেই বিভ্রান্ত দল, যারা বিশ্বাস করে—মানুষ তার ভালো ও মন্দ কোনো কাজের ক্ষেত্রেই কোনো ক্ষমতা, শক্তি বা ইচ্ছার অধিকারী নয়; বরং মানুষ জড়বস্তু বা বাতাসের মুখে শুকনো পাতার মতো সম্পূর্ণ নিরুপায় ও বাধ্য (মাজবুর – مجبور)।
উৎপত্তি ও প্রবক্তা
উমাইয়া খেলাফতের শেষভাগে জা’দ ইবনে দিরহাম এবং বিশেষ করে জাহম ইবনে সাফওয়ান (নিহত ১২৮ হি.) এই চরম জাবরবাদের প্রবর্তন করে। তাই এদের ‘জাবরিয়্যা খালিসা’ বা ‘জাহমিয়্যা জাবরিয়্যা’ বলা হয়।
জাবারিয়াদের মৌলিক বিভ্রান্তিকর দর্শনের কুফল
- ১. মানুষের সমস্ত দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা অস্বীকার: তাদের দাবি—যে ব্যক্তি নামাজ পড়ে বা চুরি করে, সে নিজের ইচ্ছায় করে না; আল্লাহই তাকে দিয়ে বাধ্য করিয়ে করান। ফলে তারা চোর, খুনি ও পাপাচারীকে নির্দোষ দাবি করে শরিয়তের বিচারব্যবস্থাকে অর্থহীন করে তোলে।
- ২. আল্লাহর ন্যায়বিচারের ওপর জুলুম আরোপ: জাবারিয়াদের যুক্তি গ্রহণ করলে চরম জঘন্য পরিণতি দেখা দেয়: আল্লাহ মানুষকে পাপ করতে বাধ্য করলেন, আবার সেই পাপের কারণে তাকে জাহান্নামে শাস্তি দিলেন—এটি আল্লাহর শানে চরম জুলুম ও অবিচারের শামিল (নাউযুবিল্লাহ)। অথচ পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট এসেছে:
﴿وَمَا رَبُّكَ بِظَلَّامٍ لِلْعَبِيدِ﴾ (আর আপনার রব বান্দাদের প্রতি বিন্দুমাত্র জুলুমকারী নন—সূরা ফুসসিলাত: ৪৬)। - ৩. শরিয়তের আদেশ ও নিষেধ নিরর্থক হওয়া: জান্নাত ও জাহান্নামের ওয়াদা, নবীদের ওহি এবং সৎকাজের আদেশ সবকিছুই অর্থহীন পুতুলখেলায় পরিণত হয়।
আহলুস সুন্নাহর ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত জাবারিয়াদের এই মারাত্মক গোমরাহি খণ্ডন করে বলেন: আল্লাহ তাআলা প্রতিটি কাজের একমাত্র সৃষ্টিকর্তা (খাল্লিক্ব), আর মানুষকে তিনি বিবেক ও স্বাধীন ইচ্ছা (ইখতিয়ার) দিয়েছেন যাতে সে কাজটি বেছে নিয়ে নিজের জন্য উপার্জন (কাসব) করতে পারে। অতএব মানুষ তার স্বাধীন উপার্জনের জন্যই পরকালে পুরস্কৃত বা তিরস্কৃত হবে।
উপসংহার
জাবারিয়া মতবাদ হলো অলস ও পাপাচারীদের নিজেদের পাপকে বৈধতা দেওয়ার এক শয়তানী দার্শনিক অপকৌশল।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
ফাযিল ১ম বর্ষ ইলমুল ফিরাক্ব ২য় পত্রের বিষয় কোড কত ছিল?
বিষয় কোড ছিল ১১১০২১ এবং পরীক্ষার পূর্ণমান ছিল ১০০ নম্বর। পরীক্ষার সময় ৩ ঘণ্টা।
ইসলামের ইতিহাসে প্রথম আত্মপ্রকাশকারী বিভ্রান্ত দলের নাম কী?
সিফফিনের যুদ্ধের তাহকীমকে কেন্দ্র করে ৩৭ হিজরিতে আবির্ভূত খারেজী সম্প্রদায়।
মুতাযিলা সম্প্রদায়ের ‘আল-আদল’ মূলনীতির প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল?
আল্লাহর তাকদির অস্বীকার করে মানুষকে তার কাজের একমাত্র স্রষ্টা দাবি করা।
খারেজীদের বিরুদ্ধে হযরত আলী (রা.)-এর ঐতিহাসিক যুদ্ধের নাম কী?
৩৮ হিজরিতে সংঘটিত ঐতিহাসিক ‘জঙ্গে নাহরাওয়ান’ (معركة النهروان)।
ইমাম আব্দুল কাহের বাগদাদীর বিশ্বখ্যাত ফেরকা বিষয়ক কিতাবের নাম কী?
ইসলামি ফেরকা বিষয়ক বিখ্যাত বিশ্বকোষ ‘আল-ফারক্বু বাইনাল ফিরাক্ব’ (الفرق بين الفرق)।
জাবারিয়া সম্প্রদায়ের মূল বিভ্রান্তিকর আকিদা কী ছিল?
মানুষের কোনো ইচ্ছা বা স্বাধীনতা নেই, মানুষ জড়বস্তুর মতো বাধ্য (মাজবুর)।

