আত তাফসীর ও উসূলুত তাফসীর ১ম পত্র (At-Tafsir wa Usulut-Tafsir 1st Paper) – 111001, উলূমুল কুরআন ওয়াল হাদীস – ফাযিল পাস ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪

StudyBoi StudyBoi
September 27, 2026
৮৮ মিনিট পড়ার সময়
৩ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন

ফাযিল (স্নাতক) পাস প্রথম বর্ষ পরীক্ষা – ২০২৪
বিষয়: উলূমুল কুরআন ওয়াল হাদীস (প্রথম পত্র) : আত তাফসীর ও উসূলুত তাফসীর (বিষয় কোড: ১১১০০১)
সময় : ৩ ঘণ্টা | পূর্ণমান : ১০০
[الملاحظة : اجب عن خمسة من مجموعة (أ) وعن اثنين من الاسئلة المفصلة واثنين من الاسئلة الموجزة من مجموعة (ب) – والاعداد بالهامش تدل على الدرجة الكاملة.]
[দ্রষ্টব্য : مجموعة (أ) হতে পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দাও। مجموعة (ب) হতে বড় প্রশ্ন দুটি এবং ছোট প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও। বাম পাশে উল্লিখিত সংখ্যা প্রশ্নের পূর্ণমান জ্ঞাপক।]

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন অনুষ্ঠিত ফাযিল স্নাতক (পাস) প্রথম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪-এর উলূমুল কুরআন ওয়াল হাদীস ১ম পত্র (বিষয় কোড: ১১১০০১ – আত তাফসীর ও উসূলুত তাফসীর) বিষয়ের মূল প্রশ্নপত্রের প্রতিটি প্রশ্নের প্রামাণ্য, গভীর ও অ্যাকাডেমিক সমাধান নিচে উপস্থাপিত হলো। তাফসিরে জালালাইন, তাফসিরে ইবনে কাসীর ও তাফসির শাস্ত্রের মূল নীতিমালার আলোকে প্রতিটি আয়াতাংশের ব্যাখ্যা, শাব্দিক ও ব্যাকরণিক তাহকিক এবং তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ বিস্তারিতভাবে সন্নিবেশিত হয়েছে।

১। هذه سورة أنزلناها وفرضناها مخففا ومشددا لكثرة المفروض فيها وأنزلنا فيها آيات بينات واضحات الدلالة لعلكم تذكرون بإدغام التاء الثانية في الذال تتعظون – الزانية والزاني أي غير المحصنين لرجمهما بالسنة و”ال” فيما ذكر موصولة وهو مبتدأ ولشبهه بالشرط دخلت الفاء في خبره وهو فاجلدوا كل واحد منهما مائة جلدة أي ضربة يقال جلده ضرب جلده ويزاد على ذلك بالسنة تغريب عام، والرقيق على النصف مما ذكر ولا تأخذكم بهما رأفة في دين الله أي حكمه بأن تتركوا شيئا من حدهما إن كنتم تؤمنون بالله واليوم الآخر أي يوم البعث في هذا تحريض على ما قبل الشرط وهو جوابه أو دال على جوابه – وليشهد عذابهما أي الجلد طائفة من المؤمنين قيل ثلاثة وقيل أربعة عدد شهود الزنا –

[সূরা আন-নূর: ১-২ আয়াতদ্বয়ের তাফসীরসহ অনুবাদ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশ্নাবলির সমাধান]

[মান: ১৪]

ভূমিকা ও পটভূমি

পবিত্র কুরআনের ২৪তম সূরা ‘আন-নূর’ একটি মাদানী সূরা, যাতে মুসলিম সমাজের পারিবারিক পবিত্রতা, নৈতিক সুরক্ষা, পর্দার বিধান এবং যৌন অনাচার প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট দণ্ডবিধি প্রবর্তন করা হয়েছে। আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা এই সূরার বিধানসমূহের অপরিহার্যতা ঘোষণা করে অবিবাহিত যেনাকারীদের শাস্তি নির্ধারণ করেছেন এবং বিচারিক দৃঢ়তার নির্দেশ দিয়েছেন।

মূল আয়াতাংশের প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ

এটি একটি সূরা যা আমি অবতীর্ণ করেছি এবং এর বিধানসমূহ পালন করাকে অলঙ্ঘনীয় ফরজ করেছি। আর এতে সুস্পষ্ট তাৎপর্যবহ বহু আয়াত নাজিল করেছি, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ করতে পার। ব্যভিচারিণী নারী ও ব্যভিচারী পুরুষ—তাদের প্রত্যেককে একশত করে বেত্রাঘাত কর। আর যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাক, তবে আল্লাহর বিধান কার্যকর করার ক্ষেত্রে তাদের প্রতি কোনোরূপ দয়া ও কোমলতা যেন তোমাদেরকে প্রভাবিত না করে। আর মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।

শাব্দিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ (التحقيق اللغوي والنحوي)

শব্দ (الكلمة) মূলধাতু ও রূপ আভিধানিক অর্থ ব্যাকরণিক অবস্থান ও ব্যাখ্যা
فَرَضْنَاهَا ف – ر – ض (বাব তাফঈল/ফা’আলা) ফরজ ও আবশ্যক করা ফে’লে মাদী, তাশদীদসহ ‘ফাররাদনা-হা’ অধিক তাকীদের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।
الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي ز – ن – ي (ইসমুল ফায়িল) ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী এখানে ‘আলিফ-লাম’ মাওসূলাহ। শর্তের অর্থের সাথে সাদৃশ্যের কারণে খবরে ‘ফা’ যুক্ত হয়েছে।
فَاجْلِدُوا ج – ل – د (আমর/আদেশসূচক) বেত্রাঘাত করো চামড়ায় আঘাত করা অর্থে ফে’লে আমর, যা হুকুমের ওয়াজিবাত নির্দেশ করে।
رَأْفَةٌ ر – أ – ف (মাসদার) কোমলতা, অতিরিক্ত দয়া আল্লাহর হদ কায়েমের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অনুকম্পা প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
طَائِفَةٌ ط – و – ف (ইসম) একটি দল বা জামায়াত ন্যূনতম তিনজন বা চারজন মুমিনের উপস্থিতিকে মুফাসসিরগণ সাব্যস্ত করেছেন।

(أ) শরিয়তে যেনার হদ বাস্তবায়নের বিধান ও শর্তাবলি

ইসলামি শরিয়তে মানব বংশধারার বিশুদ্ধতা রক্ষা ও সমাজকে অশ্লীলতামুক্ত রাখতে ব্যভিচারের ক্ষেত্রে কঠোর দণ্ডবিধি (হদ) নির্ধারণ করা হয়েছে:

  • অপরাধীর প্রকারভেদ ও দণ্ড: অপরাধী যদি ‘মুহসান’ (স্বাধীন, বালেগ, বিবেকবান এবং বৈধভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে দাম্পত্য মিলন উপভোগকারী) হয়, তবে সহীহ সুন্নাহ ও ইজমা অনুযায়ী তার শাস্তি হলো পাথর নিক্ষেপে মৃত্যুদণ্ড (রজম)। আর অপরাধী যদি ‘গাইরে মুহসান’ (অবিবাহিত) হয়, তবে কুরআনের অকাট্য নির্দেশ অনুযায়ী তার শাস্তি হলো প্রকাশ্যে ১০০ বেত্রাঘাত। ইমাম শাফেঈ ও আহমদ (রহ.)-এর মতে এর সাথে এক বছরের দেশান্তর (তাগবীব) যুক্ত হবে, তবে ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে বিচারক প্রয়োজন মনে করলে তাাজীর হিসেবে দেশান্তর করতে পারেন।
  • প্রমাণীকরণ পদ্ধতি: যেনা প্রমাণের জন্য শর্ত অত্যন্ত কঠোর—চারজন নির্ভরযোগ্য, ন্যায়পরায়ণ পুরুষ সাক্ষীর চাক্ষুষ সাক্ষ্য প্রদান করতে হবে। সাক্ষীদের বর্ণনায় চুল পরিমাণ অসঙ্গতি থাকলে সাক্ষীদের ওপরই অপবাদের হদ (কযফ) কার্যকর হবে। দ্বিতীয় মাধ্যম হলো অপরাধীর স্বেচ্ছায় চারবার বিচারকের সামনে অপরাধ স্বীকার করা।
  • দণ্ড মওকুফের নিষেধাজ্ঞা: অপরাধ আদালতে যথাযথভাবে প্রমাণিত হওয়ার পর কোনো ধরনের সুপারিশ বা বিচারকের ব্যক্তিগত অনুকম্পা গ্রহণযোগ্য নয়। আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে আল্লাহর দণ্ড কার্যকর করতে যেন কোনো দয়া বা শিথিলতা বাধা না হয়।

(ب) হদ বাস্তবায়নের সময় মুমিনদের উপস্থিতির সংখ্যায় আলেমদের অভিমত

আয়াতের নির্দেশ হলো ‘ওয়ালাইয়াশহাদ আজাবাহুমা তাইফাতুম মিনাল মুমিনীন’। এই ‘তাইফা’ বা দলের সংখ্যা সম্পর্কে ফকীহ ও মুফাসসিরদের মাঝে একাধিক মতামত বিদ্যমান:

  • ইমাম হাসান বসরী ও কাতাদা (রহ.): ন্যূনতম একজন বা দুজন মুমিন উপস্থিত থাকলেই তাইফা হিসেবে গণ্য হবে।
  • ইমাম আতা ও মুজাহিদ (রহ.): ন্যূনতম তিনজন মুমিনের উপস্থিতি আবশ্যক।
  • ইমাম জুহরী ও ইমাম মালেক (রহ.): যেনা প্রমাণের জন্য যেহেতু চারজন সাক্ষীর প্রয়োজন হয়, তাই হদ প্রত্যক্ষ করার জন্যও ন্যূনতম চারজন সাক্ষীর উপস্থিতি আবশ্যক।
  • ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর অভিমত: একটি সম্মানজনক জামায়াত—যা অন্য মানুষের অন্তরে ভয় ও সতর্কবার্তা সৃষ্টি করতে পারে—উপস্থিত থাকাই মূল মাকসাদ। প্রকাশ্য জনসমক্ষে এই দণ্ড কার্যকর করার মাধ্যমে সমাজের অন্যদের জন্য চরম সতর্কবার্তা ও নসিহত অর্জিত হয়।

উপসংহার

পবিত্র কুরআনের এই বিধান ব্যক্তি ও সমাজের নৈতিক ভিত্তি সুদৃঢ় করে। অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোরতা এবং প্রমাণের ক্ষেত্রে পরম সতর্কতা ইসলামের বিচার ব্যবস্থার এক অনুপম ভারসাম্য তুলে ধরে।

২। يايها الذين آمنوا اذكروا نعمة الله عليكم إذ جاءتكم جنود من الكفار متحزبون أيام حفر الخندق فأرسلنا عليهم ريحا وجنودا لم تروها من ملائكة وكان الله بما تعملون بالتاء من حفر الخندق وبالياء من تحزيب المشركين بصيرا – إذ جاءوكم من فوقكم ومن أسفل منكم من أعلى الوادى وأسفله من المشرق والمغرب وإذ زاغت الأبصار مالت عن كل شيء إلى عدوها من كل جانب وبلغت القلوب الحناجر جمع حنجرة وهي منتهى الحلقوم من شدة الخوف وتظنون بالله الظنونا المختلفة بالنصر واليأس –

[সূরা আল-আহযাব: ৯-১০ আয়াতদ্বয়ের তাফসীরসহ অনুবাদ ও বিশ্লেষণ]

[মান: ১৪]

ভূমিকা ও খন্দক যুদ্ধের প্রেক্ষাপট

পঞ্চম হিজরিতে মক্কার কুরাইশ, গাফাতান, বনু কুরায়যা ইহুদি এবং বিভিন্ন আরব গোত্র সম্মিলিতভাবে মদিনা রাষ্ট্রকে সমূলে ধ্বংস করার জন্য দশ সহস্রাধিক সৈন্যের বিশাল যৌথবাহিনী নিয়ে আক্রমণ করে। এই সঙ্কটময় মুহূর্তে মুসলিম বাহিনী সালমান ফারসী (রা.)-এর পরামর্শে পরিখা (খন্দক) খনন করে আত্মরক্ষা করে। চরম ক্ষুধা, শীত ও ভীতিপূর্ণ মুহূর্তে মহান আল্লাহ কুদরতিভাবে মুসলিমদের বিজয় দান করেন।

মূল আয়াতাংশের অনুবাদ

হে মুমিনগণ! তোমাদের প্রতি আল্লাহর নিয়ামতের কথা স্মরণ কর, যখন শত্রুসেনাদল তোমাদের বিরুদ্ধে সমবেত হয়েছিল। অতঃপর আমি তাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করলাম প্রবল ঘূর্ণিঝড় এবং এমন এক সেনাদল যা তোমরা দেখতে পাওনি। আর তোমরা যা করছিলে আল্লাহ তা সম্যক দেখছিলেন। যখন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সমাগত হয়েছিল তোমাদের ওপরের দিক থেকে ও নিচের দিক থেকে; এবং যখন তোমাদের চোখগুলো ভয়ে স্থির হয়ে গিয়েছিল, প্রাণ কণ্ঠাগত হয়েছিল এবং তোমরা আল্লাহ সম্বন্ধে নানা প্রকার বিরূপ ধারণা পোষণ করছিলে।

শাব্দিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ

আরবি শব্দ শব্দার্থ ব্যাকরণিক তাহকিক ও রূপ প্রাসঙ্গিক তাৎপর্য
جُنُودٌ সেনাদলসমূহ ‘জুন্দুন’ (جند)-এর বহুবচন আহযাব বা কাফেরদের সম্মিলিত সম্মিলিত বাহিনী।
رِيحًا প্রচণ্ড বাতাস/ঘূর্ণিঝড় ইসম, মুফরাদ আল্লাহর প্রেরিত ‘সারসার’ নামক প্রচণ্ড ঠাণ্ডা পূর্বালী ঝড় হাওয়া (صبا)।
زَاغَتِ الأَبْصَارُ চোখ বাঁকা ও স্থির হয়ে যাওয়া ফে’লে মাদী, মুয়ান্নাস ভয় ও আতঙ্কের চূড়ান্ত অবস্থা প্রকাশে রূপক প্রয়োগ।
الْحَنَاجِرَ কণ্ঠনালীসমূহ ‘হাঞ্জারাহ’ (حنجرة)-এর জামা ভয়ে হৃৎপিণ্ড নিজ স্থান ছেড়ে গলার কাছে উঠে আসার উপমা।

(أ) ‘اذكروا نعمة الله عليكم’ দ্বারা নিয়ামতের পরিচয়

আয়াতে ‘নিয়ামাতুল্লাহ’ দ্বারা খন্দকের প্রান্তরে মুসলিমদের ওপর আল্লাহর প্রদত্ত অলৌকিক সাহায্য ও নিশ্চিত ধ্বংসের মুখ থেকে রক্ষা পাওয়ার মহাঅনুগ্রহকে বোঝানো হয়েছে। এর উপাদানসমূহ হলো:

  • সম্মিলিত শত্রুশিবিরে প্রচণ্ড শীত ও ঝঞ্ঝাবায়ু প্রেরণ করে তাদের তাবু উপড়ে ফেলা এবং হাঁড়িপাতিল উল্টে দেওয়া।
  • ফেরেশতা বাহিনীর মাধ্যমে কাফেরদের অন্তরে গভীর ভীতির সঞ্চার করা।
  • নুয়াইম ইবনে মাসউদ (রা.)-এর মাধ্যমে কৌশলগতভাবে কুরাইশ ও ইহুদিদের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস তৈরি করা।
  • রক্তক্ষয়ী সম্মুখযুদ্ধ ছাড়াই কাফের বাহিনীকে পরাজিত ও পলায়নে বাধ্য করা।

(ب) ‘جنودا لم تروها’ এবং ‘من فوقكم ومن أسفل منكم’-এর গভীর তাৎপর্য

তাফসিরে জালালাইনে উভয় বাক্যাংশের সুস্পষ্ট অর্থ তুলে ধরা হয়েছে:

  • ‘جنودا لم تروها’ (অদৃশ্য বাহিনী): এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো মহান আল্লাহর প্রেরিত ফেরেশতাদের সেনাদল। তাঁরা সশরীরে সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করলেও শত্রুদের মনে চরম ভীতি, ত্রাস ও বিভ্রান্তি ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন।
  • ‘من فوقكم’ (তোমাদের ওপরের দিক থেকে): উপত্যকার পূর্ব ও উচ্চভূমি থেকে আগত নজদের গাফাতান ও বনু আসাদ গোত্রের সেনাদল।
  • ‘من أسفل منكم’ (তোমাদের নিচের দিক থেকে): উপত্যকার পশ্চিম ও নিম্নভূমি থেকে আগত আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বাধীন মক্কার কুরাইশ ও তিহামা অঞ্চলের মুশরিক বাহিনী। চারিদিক থেকে অবরুদ্ধ এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিকেই কুরআন অলৌকিক ভাষায় বর্ণনা করেছে।

উপসংহার

সূরা আহযাবের এই ঐতিহাসিক বিবরণ শিক্ষা দেয় যে, আপাতদৃষ্টিতে চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও মুমিনরা যদি আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে ও ধৈর্য ধারণ করে, তবে আল্লাহর গায়েবী সাহায্য অবধারিতভাবে বিজয় ছিনিয়ে আনে।

৩। واضرب لهم مثلا أصحاب القرية مفعول أول أصحاب مفعول ثان القرية أنطاكية إذ جاءها إلى آخره بدل اشتمال من أصحاب القرية المرسلون أي رسل عيسى – إذ أرسلنا إليهم اثنين فكذبوهما إلى آخره بدل من إذ الأولى الخ فعززنا بالتخفيف والتشديد قوينا الاثنين بثالث فقالوا إنا إليكم مرسلون – قالوا ما أنتم إلا بشر مثلنا وما أنزل الرحمن من شيء إن أنتم إلا تكذبون – قالوا ربنا يعلم جار مجرى القسم وزيد التأكيد به وباللام على ما قبله لزيادة الإنكار في إنا إليكم لمرسلون – وما علينا إلا البلاغ المبين التبليغ البين الظاهر بالأدلة الواضحة وهي إبراء الأكمه والأبرص والمريض وإحياء الميت –

[সূরা ইয়াসীন: ১৩-১৭ আয়াতসমূহের তাফসীরসহ অনুবাদ ও সংশ্লিষ্ট প্রশ্নাবলির উত্তর]

[মান: ১৪]

ভূমিকা ও পটভূমি

সূরা ইয়াসীনকে কুরআনের হৃৎপিণ্ড বলা হয়। মক্কার মুশরিকরা যখন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর রিসালাতকে অস্বীকার করছিল, তখন পূর্ববর্তী যুগের একটি অবাধ্য জনপদের ঐতিহাসিক শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত পেশ করে আল্লাহ তাআলা এই আয়াতসমূহ অবতীর্ণ করেন। এতে সত্যের দাওয়াত, নবীদের প্রতি অবিশ্বাসীদের প্রতিক্রিয়া এবং সত্য প্রচারকের নির্ভীক ভূমিকার চিত্র ফুটে উঠেছে।

মূল আয়াতাংশের বঙ্গানুবাদ

আর আপনি তাদের কাছে একটি দৃষ্টান্ত বর্ণনা করুন সেই জনপদের অধিবাসীদের, যখন তাদের কাছে প্রেরিত হয়েছিল রাসুলগণ। যখন আমি তাদের প্রতি পাঠিয়েছিলাম দুজন রাসুল, অতঃপর তারা উভয়ের প্রতি মিথ্যারোপ করল; তখন আমি তৃতীয় আরেকজন দ্বারা তাদেরকে শক্তিশালী করলাম। তারা বলল, নিশ্চয় আমরা তোমাদের প্রতি প্রেরিত হয়েছি। তারা বলল, তোমরা তো আমাদেরই মতো মানুষ বই কিছু নও, আর দয়াময় আল্লাহ তো কিছুই নাজিল করেননি; তোমরা কেবল মিথ্যাই বলছ। রাসুলগণ বলল, আমাদের প্রতিপালক জানেন যে আমরা অবশ্যই তোমাদের প্রতি প্রেরিত। আর সুস্পষ্টভাবে প্রচার করাই কেবল আমাদের একমাত্র দায়িত্ব।

শাব্দিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ

শব্দ মূল রূপ ও ধাতু আভিধানিক অর্থ ব্যাকরণিক অবস্থান
الْقَرْيَةِ ق – ر – ي (ইসম) জনপদ বা নগরী এখানে ‘আসহাবাল কারইয়াহ’ মুদাফ ও মুদাফ ইলাইহ। তাফসিরে জালালাইন অনুযায়ী এটি ‘আন্তাকিয়া’ নগরী।
فَعَزَّزْنَا ع – ز – ز (বাব তাফঈল) আমি শক্তিশালী করলাম তাকফীফ ও তাশদীদ উভয় কেরাতে পঠিত। শক্তি ও সমর্থন যোগানোর ফে’ল।
لَمُرْسَلُونَ ر – س – ل (ইসমুল মাফউল) অবশ্যই প্রেরিত লামে মুযাহলাকা এবং ইন্না সহযোগে চরম তাকীদ (দৃঢ়তা) জ্ঞাপন করা হয়েছে।
الْبَلاَغُ الْمُبِينُ ب – ل – غ (মাসদার) সুস্পষ্ট প্রচার মুবাশশির ও মুনযির হিসেবে যুক্তিনির্ভর প্রকাশ্য রিসালাতের দায়িত্ব পালন।

(أ) ‘القرية’ দ্বারা উদ্দেশ্য এবং রাসুলগণের পরিচয়

তাফসিরে জালালাইন ও নির্ভরযোগ্য মুফাসসিরদের অভিমত অনুযায়ী:

  • ‘আল-কারইয়াহ’ (القرية): এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো রোমান সাম্রাজ্যের তৎকালীন বিখ্যাত ঐতিহাসিক নগরী ‘আন্তাকিয়া’ (Antioch)। এই শহরের অধিবাসীরা মূর্তিপূজক ও চরম ধর্মদ্রোহী ছিল।
  • প্রেরিত রাসুলগণের পরিচয়: আল্লামা সুয়ূতী ও ইবনে কাসীর (রহ.) উল্লেখ করেছেন যে, তাঁরা ছিলেন হযরত ঈসা (আ.) কর্তৃক প্রেরিত বিশিষ্ট হাওয়ারী বা দূত। প্রথম প্রেরিত দুই শিষ্যের নাম ছিল শামীউন (সেন্ট পিটার) ও ইউহান্না (জন)। পরবর্তীতে তাঁদের সমর্থনে প্রেরিত তৃতীয় ব্যক্তির নাম ছিল বাউলাস (পল) অথবা সাদূক।

(ب) আয়াতে ‘দুইজন’ এবং ‘তৃতীয়জন’ দ্বারা কাদের বোঝানো হয়েছে

আয়াতের বক্তব্য ‘ইয আরসালনা ইলাইহিমুসনায়নি ফাকাযযাবুহুما ফাআযযাযনা বিসালিছ’-এর বিশ্লেষণ:

  • প্রথম পর্যায়ে দুই রাসুল আন্তাকিয়া নগরীতে পৌঁছে তাওহীদের বাণী ও ঈসা (আ.)-এর রিসালাতের দাওয়াত দেন। কিন্তু মূর্তিপূজক সম্প্রদায় তাদের প্রত্যাখ্যান করে এবং লাঞ্ছিত করে।
  • দ্বিতীয় পর্যায়ে তাঁদের সাহায্য ও মনোবল বৃদ্ধির জন্য তৃতীয় রাসুলকে প্রেরণ করা হয়। তিনজনে মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে সত্যের ঘোষণা দেন।
  • মুফাসসিরদের মতে, তাঁদের সত্যতার সপক্ষে তাঁরা অন্ধ ও কুষ্ঠরোগীকে নিরাময় এবং মৃতকে জীবিত করার মতো মুজিজা প্রদর্শন করেছিলেন। তথাপি অবাধ্য জাতি তাদের কথায় কর্ণপাত করেনি।

উপসংহার

এই ঘটনার মাধ্যমে মক্কার কুরাইশদের সতর্ক করা হয়েছে যে, নবীদের অস্বীকার করার পরিণতি ছিল পূর্ববর্তী ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিসমূহের মতো চিরস্থায়ী শাস্তি।

৪। إن الذين يبايعونك بيعة الرضوان بالحديبية إنما يبايعون الله هو نحو من يطع الرسول فقد أطاع الله يد الله فوق أيديهم التي بايعوا بها النبي صلى الله عليه وسلم أي هو تعالى مطلع على مبايعتهم فيجازيهم عليها فمن نكث نقض البيعة فإنما ينكث يرجع وبال نقضه على نفسه ومن أوفى بما عاهد عليه الله فسيؤتيه بالياء والنون أجرا عظيما – سيقول لك المخلفون من الأعراب حول المدينة أي الذين خلفهم الله عن صحبتك لما طلبتهم ليخرجوا معك إلى مكة خوفا من تعرض قريش لك عام الحديبية، إذا رجعت منها شغلتنا أموالنا وأهلونا عن الخروج معك فاستغفر لنا الله من ترك الخروج معك قال تعالى مكذبا لهم يقولون بألسنتهم أي من طلب الاستغفار وما قبله ما ليس في قلوبهم فهم كاذبون في اعتذارهم قل فمن استفهام بمعنى النفي أي لا أحد يملك لكم من الله شيئا إن أراد بكم ضرا بفتح الضاد وضمها أو أراد بكم نفعا بل كان الله بما تعملون خبيرا – أي لم يزل متصفا بذلك –

[সূরা আল-ফাতহ: ১০-১১ আয়াতদ্বয়ের তাফসীরসহ অনুবাদ ও সংশ্লিষ্ট প্রশ্নাবলির সমাধান]

[মান: ১৪]

ভূমিকা ও হুদাইবিয়ার প্রেক্ষাপট

ষষ্ঠ হিজরির যিলকদ মাসে রাসূলুল্লাহ (সা.) চৌদ্দশত সাহাবী নিয়ে উমরার উদ্দেশ্যে মক্কার উপকণ্ঠে হুদাইবিয়া নামক স্থানে পৌঁছেন। সেখানে কুরাইশদের সাথে আলোচনার জন্য হযরত উসমান (রা.)-কে দূত হিসেবে পাঠানো হলে তাঁর শাহাদাতের গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে রাসূল (সা.) সাহাবীদের থেকে কাফেরদের বিরুদ্ধে আমৃত্যু লড়াই করার যে ঐতিহাসিক শপথ গ্রহণ করেন, তা ইসলামের ইতিহাসে ‘বায়য়াতে রিদওয়ান’ নামে পরিচিত।

মূল আয়াতাংশের বঙ্গানুবাদ

নিশ্চয় যারা আপনার কাছে বায়আত গ্রহণ করে, তারা মূলত আল্লাহর কাছেই বায়আত গ্রহণ করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের ওপর রয়েছে। অতঃপর যে ব্যক্তি এই অঙ্গীকার ভঙ্গ করবে, সে নিজের ক্ষতির জন্যই তা ভঙ্গ করবে; আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করবে, অচিরেই আল্লাহ তাকে মহা পুরস্কার দান করবেন। মদিনার চারপাশের যেসব গ্রাম্য বেদুইন পেছনে রয়ে গিয়েছিল, অচিরেই তারা আপনাকে বলবে: আমাদের ধন-সম্পদ ও পরিবার-পরিজন আমাদের ব্যস্ত রেখেছিল, অতএব আপনি আমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। তারা মুখে এমন কথা বলে যা তাদের অন্তরে নেই। বলুন, আল্লাহ যদি তোমাদের কোনো ক্ষতি সাধনের ইচ্ছা করেন অথবা কোনো কল্যাণের ইচ্ছা করেন, তবে কে আছে আল্লাহর বিরুদ্ধে তোমাদের সামান্যতমও সাহায্য করতে পারে? বরং তোমরা যা করছ আল্লাহ সে বিষয়ে পরিপূর্ণ অবহিত।

শাব্দিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ

শব্দ মূলধাতু ও পদ আভিধানিক অর্থ ব্যাখ্যা
يُبَايِعُونَكَ ب – ي – ع (মুফাআলাহ) আপনার হাতে আনুগত্যের শপথ নিচ্ছে ফে’লে মুদারে, জীবন বাজি রেখে আনুগত্যের দ্বিপাক্ষিক চুক্তি।
يَدُ اللَّهِ فَوْقَ أَيْدِيهِمْ ইসম ও যারফ আল্লাহর কুদরতের হাত তাঁদের হাতের ওপর মুতাশাবিহাত আয়াত; আল্লাহর কুদরত, সাহায্য ও সন্তুষ্টির রূপক বহিঃপ্রকাশ।
نَكَثَ ن – ك – ث (মাদী) অঙ্গীকার ভঙ্গ করল চুক্তি বা বায়আত ভঙ্গের পরিণাম আত্মঘাতী।
الْمُخَلَّفُونَ خ – ل – ف (মাফউল) পেছনে ফেলে রাখা বেদুইন মুনাফিকরা মদিনার আশেপাশের দুর্বল ঈমানের বেদুইনরা যারা যুদ্ধে যেতে ভয় পেয়েছিল।

(أ) বায়আতের নাম ‘বায়য়াতে রিদওয়ান’ রাখার কারণ

এই ঐতিহাসিক শপথকে ‘বায়য়াতে রিদওয়ান’ (رضوان অর্থ পরম সন্তুষ্টি) নামকরণের প্রধান কারণসমূহ হলো:

  • মহান আল্লাহ সূরা ফাতহের ১৮ নম্বর আয়াতে নিজেই ঘোষণা করেছেন: ‘লাকাদ রাদিয়াল্লাহু আনিল মুমিনীন ইয ইউবাইউউনাকা তাহতাশ শাজারাহ’—নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের ওপর পরম সন্তুষ্ট হয়েছেন যখন তারা গাছের নিচে আপনার হাতে শপথ করছিল।
  • এই বায়আতে অংশগ্রহণকারী ১,৪০০ সাহাবীকে রাসূল (সা.) পৃথিবীর সর্বোত্তম মানুষ হিসেবে আখ্যা দেন এবং তাঁদের সকলের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করেন।
  • আল্লাহর সন্তুষ্টির সরাসরি সনদ অর্জিত হওয়ার কারণেই এই বায়আতকে ‘বায়য়াতে রিদওয়ান’ বলা হয়।

(ب) হুদাইবিয়ার সন্ধির সংক্ষিপ্ত ঘটনা ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য

হুদাইবিয়ার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ফলাফল সংক্ষেপে নিম্নরূপ:

  • উদ্দেশ্য ও গমনাগমন: ষষ্ঠ হিজরিতে রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবীদের নিয়ে রক্তপাতহীনভাবে উমরা পালনের উদ্দেশ্যে মক্কার দিকে রওয়ানা হন।
  • কুরাইশদের বাধা ও চুক্তি সম্পাদন: মক্কার উপকণ্ঠে হুদাইবিয়া নামক কূপে কাফেররা তাদের পথরোধ করে। দীর্ঘ দূত বিনিময়ের পর সুহাইল ইবনে আমরের মধ্যস্থতায় দশ বছরের যুদ্ধবিরতির চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
  • বাহ্যিক অপছন্দ ও কুরআনের ঘোষণা: চুক্তির কিছু শর্ত বাহ্যিকভাবে মুসলমানদের বিপক্ষে মনে হওয়ায় সাহাবীদের মধ্যে সাময়িক মানসিক অস্থিরতা তৈরি হয় (যেমন: মক্কা থেকে কোনো মুসলিম এলে ফেরত দিতে হবে, কিন্তু মদিনা থেকে কেউ গেলে ফেরত দেওয়া হবে না; এ বছর উমরা না করে ফিরে যেতে হবে)। কিন্তু আল্লাহ তাআলা এই সন্ধিকেই ‘ফাতহুম মুবীন’ বা প্রকাশ্য মহাবিজয় হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
  • ঐতিহাসিক প্রভাব: এই সন্ধির ফলে ইসলাম প্রচারের অবাধ সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং পরবর্তী মাত্র দুই বছরে ইতিপূর্বেকার সমগ্র ইসলামি ইতিহাসের চেয়ে বেশি মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে, যা পরবর্তীতে রক্তপাতহীন মক্কা বিজয়ের পথ সুগম করে।

উপসংহার

হুদাইবিয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে, দূরদর্শী রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, শৃঙ্খলা এবং আল্লাহর নবীর প্রতি অকুণ্ঠ আনুগত্যই ইসলামের চূড়ান্ত বিজয়ের মূল চাবিকাঠি।

৫। يايها الذين آمنوا لا ترفعوا أصواتكم فوق صوت النبي إذا نطقتم وإذا نطق ولا تجهروا له بالقول إذا ناجيتموه كجهر بعضكم لبعض بل دون ذلك إجلالا له إن تحبط أعمالكم أي خشية ذلك بالرفع والجهر المذكورين ونزل فيمن كان يخفض صوته عند النبي صلى الله عليه وسلم كأبي بكر وعمر وغيرهما رضي الله المذكورين – إن الذين يغضون أصواتهم عند رسول الله أولئك الذين امتحن الله قلوبهم للتقوى أي لتظهر منهم لهم مغفرة وأجر عظيم الجنة ونزل في قوم جاؤوا وقت الظهيرة والنبي صلى الله عليه وسلم في منزلة فنادوه –

[সূরা আল-হুজুরাত: ২-৩ আয়াতদ্বয়ের তাফসীরসহ অনুবাদ ও সংশ্লিষ্ট প্রশ্নাবলির সমাধান]

[মান: ১৪]

ভূমিকা ও পটভূমি

সূরা আল-হুজুরাত ইসলামি শিষ্টাচার, সমাজবিজ্ঞান ও পারস্পরিক আদব-কায়দার এক অনুপম সংবিধান। নবম হিজরিতে বিভিন্ন গোত্র ইসলাম গ্রহণের জন্য মদিনায় আগমন করতে শুরু করলে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে সাধারণ মানুষের আচরণ, কণ্ঠস্বরের উচ্চতা এবং নববী দরবারের পরম মর্যাদাপূর্ণ শিষ্টাচার শিক্ষা দিতে এই আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হয়।

মূল আয়াতাংশের বঙ্গানুবাদ

হে মুমিনগণ! তোমরা তোমাদের কণ্ঠস্বরকে নবীর কণ্ঠস্বরের চেয়ে উচ্চ করো না এবং নিজেদের মধ্যে যেভাবে পরস্পর উচ্চস্বরে কথা বল, তাঁর সাথে সেভাবে উচ্চস্বরে কথা বলো না; এ আশঙ্কায় যে তোমাদের অজ্ঞাতেই তোমাদের সমস্ত নেক আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে। নিশ্চয় যারা আল্লাহর রাসূলের সামনে নিজেদের কণ্ঠস্বর নিচু রাখে, আল্লাহ তাদের অন্তরকে তাকওয়ার জন্য নির্বাচিত ও পরিশুদ্ধ করেছেন; তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহা পুরস্কার।

শাব্দিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ

শব্দ মূল রূপ ও পদ আভিধানিক অর্থ তাহকিক ও ব্যাখ্যা
لاَ تَرْفَعُوا ر – ف – ع (নাহী/নিষেধ) তোমরা উচ্চ করো না ফে’লে নাহী, জামা মুযাক্কার হাযির। নবীর সামনে কণ্ঠস্বর উঁচুতে তোলা হারাম।
تَحْبَطَ ح – ب – ط (নাসব) আমল ধ্বংস হওয়া ‘আন’ উহ্য থাকার কারণে ফে’লে মুদারে মানসূব। শিরক ছাড়া বেআদবির কারণেও আমল বিনষ্ট হওয়ার নজির।
يَغُضُّونَ غ – ض – ض (মুদারে) কণ্ঠস্বর নিচু ও অবনমিত রাখা অত্যন্ত সম্মান ও সম্ভ্রম প্রদর্শনপূর্বক ধীরলয়ে কথা বলা।
امْتَحَنَ م – ح – ن (ইফতিয়াল) বাছাই ও পরীক্ষা করে খাঁটি করা স্বর্ণ যেমন আগুনে পুড়িয়ে খাঁটি করা হয়, তাকওয়ার মাধ্যমে অন্তরকে তেমনি খাঁটি করা।

(أ) আলোচ্য আয়াতসমূহের শানে নুযূল

মুফাসসিরগণ এই আয়াতের অবতরণের পেছনে দুটি সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক কারণ উল্লেখ করেছেন:

  • হযরত আবু বকর ও উমর (রা.)-এর ঘটনা: সহীহ বুখারীতে ইবনে আবী মুলাইকা (রহ.) হতে বর্ণিত, বনু তামীম গোত্রের প্রতিনিধি দলের আগমনের পর তাদের নেতা কে হবেন—এ বিষয়ে রাসূল (সা.)-এর সামনে হযরত আবু বকর (রা.) আল-কা’কা ইবনে মা’বাদের নাম প্রস্তাব করেন এবং হযরত উমর (রা.) আকরা ইবনে হাবিসের নাম প্রস্তাব করেন। এ নিয়ে তাঁদের দুজনের মধ্যে বাদানুবাদ হয় এবং উভয়ের কণ্ঠস্বর নবীজীর সামনে কিছুটা উচ্চ হয়ে যায়। তখন তাঁদের সতর্ক করে এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর হযরত উমর (রা.) এত নিচু স্বরে কথা বলতেন যে, রাসূল (সা.)-কে পুনরায় জিজ্ঞেস করে শুনতে হতো।
  • আমল বিনষ্টের সতর্কবাণী: রাসূলের শানে সামান্যতম অসৌজন্য প্রকাশ পেলে সমগ্র জীবনের আমল বরবাদ হয়ে যাওয়ার ভয় সাহাবীদের হৃদয়ে সঞ্চারিত হয়েছিল।

(ب) দুপুরবেলায় আগমনকারী গোত্রের পরিচয়

আয়াতের শেষাংশে ‘ইন্না আল্লাযীনা ইউনাতূনাকা মিন ওয়ারা-ইল হুজুরাত’ প্রসঙ্গে মুফাসসিরগণ স্পষ্ট করেছেন:

  • এই গোত্রটি ছিল ‘বনু তামীম’ (بنو تميم)-এর একটি গ্রাম্য বেদুইন প্রতিনিধি দল, যার মধ্যে আকরা ইবনে হাবিস ও উয়ায়না ইবনে হিসন অন্তর্ভুক্ত ছিল।
  • তারা দুপুরবেলা প্রখর রোদের সময় মদিনায় এসে রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন নিজ ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, তখন গৃহের বাইরে থেকে বেআদবের মতো চিৎকার করে ডাকতে লাগল: ‘ইয়া মুহাম্মাদ, উখরুজ ইলাইনা’ (হে মুহাম্মাদ! আমাদের কাছে বের হয়ে আসুন)।
  • তাদের এই কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়ে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন যে, তাদের অধিকাংশেরই আকল ও বোধশক্তি নেই এবং নবীর বিশ্রাম ও মর্যাদার প্রতি ধৈর্য ধারণ করাই তাদের জন্য উত্তম ছিল।

উপসংহার

সূরা হুজুরাতের এই আয়াতসমূহ প্রমাণ করে যে, দ্বীনের মূল সৌন্দর্য কেবল আনুষ্ঠানিক ইবাদতে নয়, বরং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা ও সামাজিক শিষ্টাচার রক্ষার মধ্যেই নিহিত।

৬। يايها الذين آمنوا اجتنبوا كثيرا من الظن إن بعض الظن إثم أي مؤثم وهو كثير كظن السوء بأهل الخير من المؤمنين وهم كثير بخلافه بالفساق منهم فلا إثم فيه في نحو ما يظهر منهم ولا تجسسوا حذف منه إحدى التائين لا تتبعوا عورات المسلمين ومعائبهم بالبحث عنها ولا يغتب بعضكم بعضا – لا يذكره بشيء يكرهه وإن كان فيه أيحب أحدكم أن يأكل لحم أخيه ميتا بالتخفيف والتشديد لا يحس به لا فكرهتموه أي فاغتيابه في حياته كأكل لحمه بعد مماته وقد عرض عليكم فكرهتموه فاكرهوا الأول واتقوا الله أي عقابه في الاغتياب بأن تتوبوا منه إن الله تواب قابل توبة التائبين رحيم بهم –

[সূরা আল-হুজুরাত: ১২ আয়াতটির তাফসীরসহ বঙ্গানুবাদ ও সামাজিক দিকসমূহের বিশ্লেষণ]

[মান: ১৪]

ভূমিকা ও পটভূমি

একটি সুস্থ, ভারসাম্যপূর্ণ ও শান্তিময় সমাজ বিনির্মাণে পারস্পরিক বিশ্বাস, ভ্রাতৃত্ববোধ ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার রক্ষা করা অপরিহার্য। সূরা হুজুরাতের ১২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা মানুষের সম্পর্কের ফাটল সৃষ্টিকারী তিনটি মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি—অহেতুক কুধারণা, গোয়েন্দাগিরি ও পরনিন্দা (গীবত)—কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন।

মূল আয়াতাংশের বঙ্গানুবাদ

হে মুমিনগণ! তোমরা অধিকাংশ অনুমান ও ধারণা থেকে দূরে থাক; কারণ কোনো কোনো ধারণা তো সুস্পষ্ট পাপ। আর তোমরা একে অপরের গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং একে অপরের পশ্চাতে গীবত (পরনিন্দা) করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা তো একে চরম ঘৃণাই মনে কর! সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর; নিশ্চয় আল্লাহ তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।

শাব্দিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ

শব্দ ধাতু ও রূপ আভিধানিক অর্থ তাফসীরি তাৎপর্য
اجْتَنِبُوا ج – ن – ب (ইফতিয়াল) তোমরা দূরে থাক, পরিহার কর ফে’লে আমর। কোনো নিষিদ্ধ বিষয় থেকে একপাশে দূরে সরে থাকার চূড়ান্ত নির্দেশ।
الظَّنِّ ظ – ن – ن (ইসম) অনুমান, ধারণা প্রমাণ ছাড়া কোনো মুমিনের ব্যাপারে অন্তরে খারাপ ধারণা পোষণ করা যা পাপে রূপ নেয়।
لاَ تَجَسَّسُوا ج – س – س (তাফাউল) গোয়েন্দাগিরি বা দোষ খুঁজো না মানুষের গোপন ত্রুটি বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা উদ্ঘাটনের কুপ্রবৃত্তি।
لاَ يَغْتَب غ – ي – ب (ইফতিয়াল) গীবত বা পরচর্চা করো না কারো অনুপস্থিতিতে এমন কথা বলা যা শুনলে সে কষ্ট পাবে।

(أ) আলোচ্য আয়াতের শানে নুযূল

মুফাসসিরগণ এই আয়াত নাজিলের পেছনে হযরত সালমান ফারসী (রা.)-এর সাথে সম্পর্কিত একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন:

  • রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবীদের সফরে পাঠালে দুই ধনী ব্যক্তির সাথে একজন অভাবী সাহাবীকে খাদেম হিসেবে জুড়ে দিতেন যাতে উভয়ের পারস্পরিক সহযোগিতা হয়। একবার হযরত সালমান ফারসী (রা.)-কে অন্য দুজন সাহাবীর সাথে দেওয়া হলো।
  • একদিন হযরত সালমান (রা.) ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ায় খাবার তৈরিতে বিলম্ব হয়। তখন সঙ্গীরা তাঁকে রাসূল (সা.)-এর নিকট কিছু তরকারি আনার জন্য পাঠায়। তিনি চলে যাওয়ার পর ওই দুজন বলল: ‘সে যদি কোনো কূপেও যায়, তবে কূপের পানিও শুকিয়ে যাবে।’ অর্থাৎ তারা তাঁকে অলস ও অপদার্থ বলে কটূক্তি করল।
  • হযরত সালমান রাসূল (সা.)-এর কাছে পৌঁছলে নবীজী বললেন: ‘তোমাদের সঙ্গীরা তো ইতিপূর্বেই গোশত ভক্ষণ করেছে।’ তাঁরা ফিরে এসে নিবেদন করলেন, আমরা তো কোনো গোশত খাইনি! তখন রাসূল (সা.) বললেন, তোমরা তোমাদের ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে তার কুৎসা রটনা করে তার গোশত খেয়েছ। অতঃপর এই আয়াত অবতীর্ণ হয়।

(ب) নিষিদ্ধ সামাজিক কুপ্রবৃত্তিসমূহ (الخصائل الاجتماعية الممنوعة)

আয়াতে তিনটি প্রধান সামাজিক অপরাধকে পর্যায়ক্রমে নিষিদ্ধ করা হয়েছে:

  • অহেতুক কুধারণা (سوء الظن): স্পষ্ট প্রমাণ ও কার্যকারণ ব্যতীত কোনো নিষ্পাপ মুমিন ভাইয়ের ব্যাপারে অন্তরে মন্দ ধারণা পোষণ করা। রাসূল (সা.) বলেছেন: ‘তোমরা কুধারণা থেকে বেঁচে থাক, কেননা ধারণা হলো সবচেয়ে বড় মিথ্যা।’ (সহীহ বুখারী)।
  • দোষ অনুসন্ধান ও গোয়েন্দাগিরি (التجسس): কারো ব্যক্তিগত জীবন, দুর্বলতা বা গোপন পাপ খুঁজে বের করার অপচেষ্টা চালানো। ইসলাম মানুষের গোপনীয়তার অধিকারকে অলঙ্ঘনীয় করেছে।
  • গীবত বা পরনিন্দা (الغيبة): কারো অনুপস্থিতিতে তার এমন কোনো ত্রুটি আলোচনা করা যা সে অপছন্দ করে। কুরআন একে মৃত ভাইয়ের পচা গোশত খাওয়ার মতো বীভৎস ও জঘন্য উপমায় চিত্রিত করেছে।

উপসংহার

এই তিনটি ব্যাধি থেকে সমাজকে মুক্ত রাখতে পারলে মানুষের মধ্যকার পারস্পরিক ভালোবাসা, বিশ্বাস ও সামাজিক সংহতি চিরস্থায়ী রূপ লাভ করে।

৭। خلق الإنسان من صلصال كالفخار وخلق الجان من مارج من نار – فبأي آلاء ربكما تكذبان – رب المشرقين مشرق الشتاء ومشرق الصيف ورب المغربين كذلك – فبأي آلاء ربكما تكذبان – مرج أرسل البحرين العذب والملح يلتقيان في رأي العين – بينهما برزخ حاجز من قدرته تعالى لا يبغيان لا يبغي واحد منهما على الآخر فيختلط به –

[সূরা আর-রহমান: ১৪-২০ আয়াতসমূহের তাফসীরসহ অনুবাদ ও বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য]

[মান: ১৪]

ভূমিকা ও পটভূমি

সূরা আর-রহমানকে কুরআনের ‘দুলহান’ বা সৌন্দর্য বলা হয়। এতে বিশ্বজগতের নিখুঁত সৃষ্টিরহস্য, মানব ও জিন জাতির উপাদান এবং প্রকৃতির মধ্যে আল্লাহর অপরিসীম কুদরত ও নিয়ামতের বিশদ বিবরণ প্রদান করা হয়েছে। আলোচ্য আয়াতে মানব-জিন সৃষ্টি এবং নদী-সমুদ্রের পানির মিলনস্থলের বিস্ময়কর প্রাকৃতিক বিধান বর্ণিত হয়েছে।

মূল আয়াতাংশের বঙ্গানুবাদ

তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন পোড়ামাটির মতো শুষ্ক ঠনঠনে মাটি থেকে। এবং জিনকে সৃষ্টি করেছেন ধোঁয়াহীন অগ্নিশিখা থেকে। অতএব তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে? তিনি দুই উদয়াচল ও দুই অস্তাচলের অধিপতি। অতএব তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে? তিনি প্রবাহিত করেন দুই সমুদ্রকে, যারা পরস্পরের সাথে মিলিত হয়; কিন্তু উভয়ের মাঝে রয়েছে একটি অন্তরাল, যা তারা অতিক্রম করতে পারে না।

শাব্দিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ

আরবি শব্দ ধাতু ও রূপ আভিধানিক অর্থ প্রাসঙ্গিক তাৎপর্য
صَلْصَالٍ ص – ل – ص – ل (ইসম) শুষ্ক মাটি যা ঠনঠন শব্দ করে মানুষের আদি শারীরিক সৃষ্টির প্রাথমিক মাটির রূপ।
مَارِجٍ م – ر – ج (ইসমুল ফায়িল) বিশুদ্ধ ও ধোঁয়াহীন অগ্নিশিখা জিন জাতির সৃষ্টির উপাদানগত উৎস।
مَرَجَ م – ر – ج (মাদী) ছেড়ে দেওয়া, প্রবাহিত করা দুই ভিন্ন প্রকৃতির সমুদ্রকে পাশাপাশি প্রবাহিত করার কুদরত।
بَرْزَخٌ ইসম (মুফরাদ) অন্তরাল বা অদৃশ্য পর্দা ঘনত্ব ও লবণাক্ততার তারতম্যের কারণে সৃষ্ট অলৌকিক বিভাজন রেখা।

(أ) ‘خلق الإنسان من علق’ এবং ‘من صلصال كالفخار’-এর মধ্যে চমৎকার সমন্বয়

কুরআনের বিভিন্ন স্থানে মানুষের সৃষ্টির উপাদানে বাহ্যিক ভিন্নতা দেখা গেলেও মূলত তা মানব সৃষ্টির বিভিন্ন পর্যায়কে (اطوار الخلق) নির্দেশ করে:

  • আদি মানব আদম (আ.)-এর সৃষ্টি: আদম (আ.)-কে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন মাটি থেকে তৈরি করা হয়েছিল—প্রথমে সাধারণ মাটি (تراب), এরপর তা পানিতে ভিজিয়ে আঠালো কাদা (طين لازب), এরপর তা দুর্গন্ধযুক্ত কালো পচা কাদামাটি (حمإ مسنون), এবং পরিশেষে শুকিয়ে পোড়ামাটির ন্যায় ঠনঠনে রূপ ধারণ করে (صلصال كالفخار), যার মধ্যে আল্লাহ রূহ ফুঁকে দেন।
  • আদম-সন্তান বা সাধারণ মানুষের সৃষ্টি: কুরআনের অন্যত্র বর্ণিত ‘খালাকাল ইনসানা মিন আলাক’ (রক্তপিণ্ড) দ্বারা আদম-সন্তানদের গর্ভকালীন জন্মপ্রক্রিয়া বোঝানো হয়েছে, যা শুক্রবিন্দু (নুৎফা) থেকে রক্তপিণ্ডে রূপান্তরিত হয়ে ভ্রূণ ও পূর্ণাঙ্গ মানবদেহে পরিণত হয়।
  • সমন্বয়: সুতরাং মাটির বিবরণ হলো মানুষের মূল পিতাকে নিয়ে, আর রক্তপিণ্ডের বিবরণ হলো তাঁর বংশধরদের নিয়ে। অতএব উভয় আয়াতের মধ্যে কোনো বৈপরীত্য নেই, বরং পরম সামঞ্জস্য বিদ্যমান।

(ب) মিষ্টি ও লবণাক্ত পানির সুফল ও কুদরতি রহস্য

আয়াতে বর্ণিত দুই ধরণের পানির অসাধারণ পার্থিব ও আধ্যাত্মিক সুফল রয়েছে:

  • মিষ্টি ও সুপেয় পানি (العذب الفرات): নদী-নালা, বৃষ্টির পানি এবং ঝর্ণাধারা মানবজাতি, জীবজন্তু ও গাছপালার জীবনধারণ, তৃষ্ণা নিবারণ এবং কৃষিকাজের জন্য অপরিহার্য।
  • লবণাক্ত ও ক্ষারীয় পানি (الملح الأجاج): সমুদ্রের লবণাক্ত পানি পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষা করে। যদি সমুদ্র মিষ্টি হতো, তবে কোটি কোটি সামুদ্রিক প্রাণীর মৃত্যুর ফলে সৃষ্ট পচনে সারা বিশ্বের বাতাস দূষিত হয়ে মানবজাতির অস্তিত্ব ধ্বংস হয়ে যেত। এছাড়া সামুদ্রিক লবণ আবহাওয়ার আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করে।
  • অদৃশ্য অন্তরাল (البرزخ): আধুনিক সমুদ্রবিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, ভূমধ্যসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগর বা মিষ্টি নদী ও লবণাক্ত সাগরের মিলনস্থলে এমন একটি অদৃশ্য জলীয় ঘনত্ব ও পৃষ্ঠটানের প্রাচীর থাকে, যার ফলে একদিকের পানি অন্যদিকের পানির মৌলিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট করে না। এটি কুরআনের এক অমর বৈজ্ঞানিক মুজিজা।

উপসংহার

প্রকৃতির প্রতিটি সৃষ্টি এবং উপাদানের এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য প্রমাণ করে যে, এই মহাবিশ্বের কোনো কিছুই আকস্মিক নয়, বরং এক পরম কুশলী স্রষ্টার নিখুঁত পরিকল্পনার ফল।

৮। إنا أعطيناك الكوثر فصل لربك وانحر إن شانئك هو الأبتر –

[সূরা আল-কাউসার: ১-৩ আয়াতসমূহের তাফসীরসহ অনুবাদ ও বিশদ ব্যাখ্যা]

[মান: ১৪]

ভূমিকা ও শানে নুযূল

সূরা আল-কাউসার পবিত্র কুরআনের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ততম সূরা, কিন্তু এর ভাবার্থ ও সুসংবাদ অত্যন্ত ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী। মক্কার কুরাইশ কাফেররা যখন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শিশুপুত্র হযরত কাসিম ও আব্দুল্লাহর ইন্তেকালের পর নবীজীকে ‘আবতার’ বা নির্বংশ বলে বিদ্রূপ ও উপহাস করতে লাগল, তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর হাবীবকে সান্ত্বনা ও চিরন্তন মর্যাদার ঘোষণা দিয়ে এই সূরা নাজিল করেন।

মূল আয়াতাংশের বঙ্গানুবাদ

নিশ্চয় আমি আপনাকে ‘কাউসার’ (অবারিত কল্যাণ ও মহাপ্রাচুর্য) দান করেছি। অতএব আপনি আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করুন এবং কুরবানী সম্পন্ন করুন। নিশ্চয় আপনার প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীই তো নির্বংশ ও সমূলে ধ্বংসপ্রাপ্ত।

শাব্দিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ

শব্দ শব্দমূল ও রূপ আভিধানিক অর্থ তাফসীরি তাৎপর্য
أَعْطَيْنَاكَ ع – ط – ي (মাদী) আমি আপনাকে দান করেছি ফে’লে মাদী, যা নিশ্চিত প্রাপ্তি ও সম্মানের পরিচায়ক।
الْكَوْثَرَ ك – ث – ر (ফাও’আলুন ওযন) মহাপ্রাচুর্য, অবারিত কল্যাণ অত্যধিক প্রাচুর্য প্রকাশক সিফাত। এটি জান্নাতের বিশেষ নহর বা হাউজকেও নির্দেশ করে।
انْحَرْ ن – ح – ر (আমর) কুরবানী কর, নহর কর উটের বক্ষস্থলে আঘাত করে কুরবানী করার নির্দেশ।
شَانِئَكَ ش – ن – أ (ইসমুল ফায়িল) আপনার চরম শত্রু বা বিদ্বেষী নবীজীর প্রতি শত্রুভাবাপন্ন কুরাইশ নেতৃবৃন্দ।
الأَبْتَرُ ب – ت – ر (সিফাত) লেজকাটা, নির্বংশ, নিঃস্ব যার বংশধারা ও স্মৃতি পৃথিবী থেকে সমূলে মুছে যায়।

(أ) ‘الكوثر’ দ্বারা কী উদ্দেশ্য—মুফাসসিরদের মতামত

‘কাউসার’ শব্দের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরদের প্রধান দুটি দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে:

  • জান্নাতের বিশেষ নদী ও হাউজে কাউসার: সহীহ মুসলিম ও তিরমিযীতে হযরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন: ‘কাউসার হলো জান্নাতের একটি নহর, যা আমার প্রতিপালক আমাকে দান করেছেন। এর পানি দুধের চেয়ে সাদা, মধুর চেয়ে মিষ্টি এবং এর পানপাত্রের সংখ্যা আকাশের তারকারাজির মতো।’ হাশরের ময়দানে উম্মতে মুহাম্মাদীকে এই হাউজ থেকেই পানি পান করানো হবে।
  • সার্বিক অবারিত মহাপ্রাচুর্য (الخير الكثير): হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-কে যখন জিজ্ঞেস করা হলো, মানুষ তো বলে কাউসার জান্নাতের একটি নহর? তিনি উত্তর দিলেন: জান্নাতের ওই নহরটি হলো আল্লাহ প্রদত্ত অবারিত কল্যাণের (আল-খাইরুল কাসীর) একটি অংশ মাত্র। অর্থাৎ নবুওয়াত, কুরআন মাজীদ, মাকামে মাহমুদ, বিশ্বব্যাপী উম্মতের বিশালতা এবং কিয়ামত পর্যন্ত নবীর স্মরণকে সমুন্নত রাখাই হলো কাউসার।

(ب) ‘الأبتر’ দ্বারা কার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে

আরবি ভাষায় যার কোনো পুত্রসন্তান জীবিত থাকে না এবং যার মৃত্যুর পর নাম নেওয়ার কেউ থাকে না, তাকে ‘আবতার’ বলা হতো। আয়াতে ‘আবতার’ দ্বারা সুনির্দিষ্টভাবে বোঝানো হয়েছে:

  • আসি ইবনে ওয়াইল আস-সাহমী: রাসূল (সা.)-এর শিশুপুত্রদের মৃত্যুর পর কুরাইশ নেতা আসি ইবনে ওয়াইল বলেছিল: ‘মুহাম্মাদের পথ বন্ধ হয়ে গেছে, সে তো নিঃসন্তান ও নির্বংশ হয়ে গেছে; তার মৃত্যুর পর তার কথা বলার মতো আর কেউ থাকবে না।’
  • অন্যান্য কাফেরদের অন্তর্ভুক্তি: কোনো কোনো রেওয়ায়েতে আবু জাহল, আবু লাহাব ও উকবা ইবনে আবী মুয়াইতের কথাও উল্লেখ আছে।
  • ঐতিহাসিক পরিণতি: আল্লাহ তাআলা কাফেরদের ব্যঙ্গোক্তিকে উল্টে দিয়ে ঘোষণা করেন যে, নবীজী নন, বরং শত্রুরাই পৃথিবীর ইতিহাস থেকে সমূলে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। আজ সারা বিশ্বে কোটি কোটি মিনারে নবীর নাম উচ্চারিত হচ্ছে, অথচ আসি ইবনে ওয়াইলের বংশ ও নাম ধিক্কৃত ও নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

উপসংহার

সূরা আল-কাউসার বিশ্বনবী (সা.)-এর চিরন্তন শ্রেষ্ঠত্ব এবং ইসলামের বিরোধিতাকারীদের ঐতিহাসিক অবলুপ্তির এক শাশ্বত ঐশী ইশতেহার।

৯। الأسئلة المفصلة (বড় রচনামূলক প্রশ্নাবলি)

[উসূলুত তাফসীর ও উলূমুল কুরআনের মূলনীতি সম্পর্কিত ৪টি বিষয়ের বিশদ তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ]

[মান: ২০]

(أ) তাফসিরের সংজ্ঞা, বিষয়বস্তু ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য

  • আভিধানিক সংজ্ঞা: ‘তাফসীর’ (تفسير) শব্দটি ‘ফাসরুন’ (فسر) ধাতু থেকে নিষ্পন্ন, যার অর্থ হলো উন্মোচন করা, সুস্পষ্ট করা, ঢাকনা খুলে কোনো বিষয় স্পষ্ট করে তুলে ধরা।
  • পারিভাষিক সংজ্ঞা: আল্লামা বদরুদ্দীন যারকাশী (রহ.)-এর মতে: ‘ইলমে তাফসীর হলো এমন এক বিজ্ঞান যার মাধ্যমে মহামহিমান্বিত আল্লাহর কিতাবের অর্থ, এর বিধিবিধানের মর্মার্থ এবং অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অনুধাবন করা যায়।’
  • বিষয়বস্তু (موضوع): তাফসীর শাস্ত্রের মূল বিষয়বস্তু হলো স্বয়ং কালামুল্লাহ বা পবিত্র কুরআন—মানুষের হিদায়াত ও পথনির্দেশনার প্রেক্ষাপট থেকে এর প্রতিটি শব্দের মর্ম অনুধাবন।
  • লক্ষ্য-উদ্দেশ্য (غرض): মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, মানবজীবনে কুরআনী বিধানের সঠিক বাস্তবায়ন এবং দুনিয়া ও আখিরাতে শাশ্বত মুক্তি লাভ করা।

(ب) তাফসির শাস্ত্রের উদ্ভব ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস

তাফসীর শাস্ত্রের বিকাশ প্রধানত চারটি যুগে সম্পন্ন হয়েছে:

  • নবীযুগ (عصر النبوة): স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন কুরআনের প্রথম ও মূল ব্যাখ্যাকার। সাহাবায়ে কেরাম কোনো আয়াতের মর্ম না বুঝলে সরাসরি নবীজীকে জিজ্ঞেস করে সমাধান নিতেন।
  • সাহাবী যুগ (عصر الصحابة): সাহাবীদের মধ্যে হযরত আলী, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাইসুল মুফাসসিরীন), আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ ও উবাই ইবনে কা’ব (রা.) তাফসীর শাস্ত্রে প্রভূত অবদান রাখেন। তাঁরা কুরআনকে কুরআন দিয়ে এবং হাদিস দিয়ে ব্যাখ্যা করতেন।
  • তাবেঈ যুগ (عصر التابعين): এই যুগে মক্কা, মদিনা ও ইরাকে তিনটি প্রধান তাফসীর কেন্দ্র গড়ে ওঠে। মক্কায় মুজাহিদ, আতা ইবনে আবী রাবাহ ও ইকরামা (রহ.); মদিনায় যায়েদ ইবনে আসলাম; এবং ইরাকে হাসান বসরী ও কাতাদা (রহ.) তাফসীরকে সমৃদ্ধ করেন।
  • সংকলন যুগ (عصر التدوين): আব্বাসীয় যুগে হাদিস থেকে পৃথক হয়ে স্বতন্ত্র বিজ্ঞান হিসেবে তাফসীর সংকলিত হতে থাকে। ইমাম ইবনে জারীর তাবারী (রহ.)-এর ‘জামেউল বায়ান’ রচনার মধ্য দিয়ে তাফসীর শাস্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক পূর্ণতা লাভ করে।

(ج) আসবাবে নুযূলের সংজ্ঞা ও তাফসিরে এর অপরিহার্য গুরুত্ব

  • সংজ্ঞা: যে ঐতিহাসিক ঘটনা, প্রেক্ষাপট বা সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের প্রেক্ষিতে কুরআনের কোনো আয়াত বা সূরা নাজিল হয়েছে, তাকে ‘আসবাবে নুযূল’ (অবতরণের কারণ) বলে। যেমন ইমাম ওয়াহিদী ও সুয়ূতী এ বিষয়ে স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেছেন।
  • তাফসিরে এর গুরুত্ব:
    • আয়াতের সঠিক অর্থ ও উদ্দেশ্য অনুধাবনে সরাসরি সহায়ক। প্রেক্ষাপট না জানলে আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
    • বিধানের অন্তর্নিহিত প্রজ্ঞা ও উপযোগিতা স্পষ্ট হয়।
    • কোনো সাধারণ শব্দের ভেতর সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা ঘটনা আছে কি না তা নির্ধারণ করা যায়।
    • নাসিখ (রহিতকারী) ও মানসূখ (রহিত) বিধান চিহ্নিত করতে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অপরিহার্য ভূমিকা রাখে।

(দ) হযরত আবু বকর ও হযরত উসমান (রা.)-এর যুগে কুরআন সংকলনের পদ্ধতি

কুরআন সংরক্ষণে এই দুই খলীফার পদক্ষেপ ইসলামি ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মাইলফলক:

  • হযরত আবু বকর (রা.)-এর যুগে সংকলন: ইয়ামামার যুদ্ধে বিপুলসংখ্যক হাফেজে কুরআন সাহাবীর শাহাদাতবরণের পর হযরত উমর (রা.)-এর পরামর্শে খলীফা আবু বকর (রা.) যায়দ ইবনে সাবিত (রা.)-এর নেতৃত্বে কুরআন সংকলন বোর্ড গঠন করেন। যায়দ (রা.) কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের পর লিখিত পাণ্ডুলিপি ও ন্যূনতম দুজন চাক্ষুষ সাক্ষীর সমন্বয়ে সম্পূর্ণ কুরআনকে একটি সুসংহত খণ্ডে (মুসহাফ) একত্রিত করেন।
  • হযরত উসমান (রা.)-এর যুগে অনুলিপিকরণ: আজারবাইজান ও আর্মেনিয়া বিজয়ের সময় বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলিমদের মধ্যে কেরাত বা উচ্চারণগত মতপার্থক্য দেখা দিলে হযরত হুযাইফা (রা.) খলীফাকে সতর্ক করেন। খলীফা উসমান (রা.) মূল পাণ্ডুলিপির ভিত্তিতে কুরাইশী ভাষার বিশুদ্ধ নিয়মে কয়েকটি অনুলিপি তৈরি করেন এবং তা বিভিন্ন প্রধান প্রদেশে পাঠিয়ে বাকি ব্যক্তিগত অনির্ভরযোগ্য পাণ্ডুলিপিগুলো পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেন। এর মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ একটি অভিন্ন মুসহাফে ঐক্যবদ্ধ হয়।

উপসংহার

উসূলুত তাফসীর ও সংকলন ইতিহাসের এই প্রামাণ্য পর্যায়গুলো প্রমাণ করে যে, আল্লাহর কিতাব বিগত চৌদ্দশত বছর ধরে অবিকৃত ও অলৌকিকভাবে সংরক্ষিত রয়েছে।

১০। الأسئلة الموجزة (সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি)

[উলূমুল কুরআনের চারটি মৌলিক ধারণার সংক্ষিপ্ত ও তথ্যবহুল উত্তর]

[মান: ১০]

(أ) পবিত্র কুরআন নাযিলের পদ্ধতি ও পর্যায়সমূহ

পবিত্র কুরআন লাওহে মাহফুজ থেকে মানবজাতি পর্যন্ত দুটি প্রধান ধাপে অবতীর্ণ হয়েছে:

  • প্রথম পর্যায় (এককালীন নাযিল): লাইলাতুল কদরে লাওহে মাহফুজ থেকে সম্পূর্ণ কুরআন একত্রে প্রথম আসমানের ‘বাইতুল ইযযাহ’ (বায়তুল মামুর)-এ অবতীর্ণ হয়। ইরশাদ হয়েছে: ‘ইন্না আনযালনাহু ফী লাইলাতিল কাদর’।
  • দ্বিতীয় পর্যায় (ধারাবাহিক নাযিল): বাইতুল ইযযাহ থেকে হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে দীর্ঘ ২৩ বছরে মানবজাতির বাস্তব প্রয়োজন, বিভিন্ন ঘটনা ও প্রেক্ষাপটের প্রেক্ষিতে অল্প অল্প করে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর অবতীর্ণ হয়।

(ب) কুরআনের ই’জায বা অলৌকিকত্বের সংজ্ঞা

  • আভিধানিক অর্থ: ‘ই’জায’ (إعجاز) শব্দের অর্থ অক্ষম বা পরাভূত করা, মানুষের সাধ্যাতীত কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপন করা।
  • পারিভাষিক অর্থ: কুরআন মাজীদের এমন অনন্য অলৌকিক সাহিত্যিক মান, তথ্যগত নির্ভুলতা ও ভাবগাম্ভীর্য—যার অনুরূপ একটি সূরাও রচনা করতে সমগ্র সৃষ্টিজগত অক্ষম প্রমাণিত হয়েছে। কুরআন মানুষকে অনুরূপ কালাম আনার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে তাদের চিরতরে অপদস্থ ও অক্ষম করে রেখেছে।

(গ) তাফসির শাস্ত্রের ৫টি বিখ্যাত গ্রন্থ ও মুফাসসিরদের নাম

ক্রম তাফসীর গ্রন্থের নাম মুফাসসিরের নাম তাফসীরের ধারা
১ জামেউল বায়ান ফী তাফসীরিল কুরআন ইমাম ইবনে জারীর আত-তাবারী (রহ.) তাফসীর বিল মা’সুর
২ তাফসীরুল কুরআনিল আযীম ইমাম হাফিয ইবনে কাসীর (রহ.) তাফসীর বিল মা’সুর
৩ আল-জামে লি আহকামিল কুরআন ইমাম আবু আব্দুল্লাহ আল-কুরতুবী (রহ.) ফিকহী তাফসীর
৪ তাফসীরুল জালালাইন জালালুদ্দীন মহল্লী ও সুয়ূতী (রহ.) সংক্ষিপ্ত প্রামাণ্য তাফসীর
৫ তাফসীরে রূহুল মা’আনী আল্লামা শিহাবুদ্দীন আল-আলূসী (রহ.) তাত্ত্বিক ও ভাষাতাত্ত্বিক তাফসীর

(ঘ) একজন আদর্শ মুফাসসিরের আবশ্যকীয় যোগ্যতাবলী ও শর্তসমূহ

ইমাম সুয়ূতী (রহ.)-এর মতে একজন মুফাসসিরের মধ্যে প্রধানত নিম্নোক্ত শর্ত ও গুণাবলি থাকা আবশ্যক:

  • বিশুদ্ধ আকীদা ও তাকওয়া: প্রবৃত্তির অনুসরণ ও বিদআত থেকে মুক্ত হওয়া।
  • আরবি ভাষা ও ব্যাকরণে পূর্ণ পারদর্শিতা: ইলমে নাহু, সরফ ও লুগাত (অভিধান)-এ অগাধ দখল থাকা।
  • বালাগাত শাস্ত্রের জ্ঞান: ইলমুল মা’আনী, বায়ান ও বাদী’ সম্পর্কে গভীর অন্তর্দৃষ্টি থাকা।
  • উসূল সংক্রান্ত জ্ঞান: উসূলে ফিকহ, আসবাবে নুযূল, নাসিখ-মানসূখ এবং ইলমুল কেরাতে বুৎপত্তি থাকা।
  • হাদিস শাস্ত্রের জ্ঞান: সহীহ, যয়ীফ ও মারফূ হাদিসের পার্থক্য নিরূপণ করার সক্ষমতা।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

ফাযিল ১ম বর্ষ আত তাফসীর ও উসূলুত তাফসীর বিষয়ের কোড ও পূর্ণমান কত?

বিষয় কোড ১১১০০১ এবং পূর্ণমান ১০০ নম্বর। সময় ৩ ঘণ্টা।

সূরা আন-নূরে অবিবাহিত ব্যভিচারীর শাস্তি কত বেত্রাঘাত নির্ধারণ করা হয়েছে?

কুরআনের সূরা আন-নূরের ২ নম্বর আয়াত অনুযায়ী একশত (১০০) বেত্রাঘাত নির্ধারণ করা হয়েছে।

‘বায়য়াতে রিদওয়ান’ কোন ঐতিহাসিক প্রান্তরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল?

ষষ্ঠ হিজরিতে মক্কার উপকণ্ঠে হুদাইবিয়া নামক স্থানে একটি গাছের নিচে এই ঐতিহাসিক শপথ অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

সূরা হুজুরাতে নিষিদ্ধ তিনটি প্রধান সামাজিক ব্যাধি কী কী?

অহেতুক কুধারণা পোষণ করা (سوء الظن), অপরের দোষ ও গোপন বিষয় অনুসন্ধান করা (التجسس), এবং পরনিন্দা বা গীবত করা (الغيبة)।

তাফসীর বিল মা’সুর ধারার সবচেয়ে প্রাচীন ও প্রামাণ্য গ্রন্থের নাম কী?

ইমাম ইবনে জারীর আত-তাবারী (রহ.) রচিত ‘জামেউল বায়ান ফী তাফসীরিল কুরআন’ (তাফসীরে তাবারী)।

হযরত উসমান (রা.)-এর যুগে কুরআন সংকলনের প্রধান উদ্দেশ্য কী ছিল?

বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলিমদের মধ্যে উচ্চারণ ও কেরাতগত বিরোধ নিরসন করে কুরাইশী ভাষার বিশুদ্ধ আদর্শে অভিন্ন মুসহাফে উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *