তাফসীরুল কুরআন ১ম পত্র (Tafsirul Quran 1st Paper) – 101, উলূমুল কুরআন ওয়াল হাদীস – ফাযিল পাস ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২১

StudyBoi StudyBoi
September 27, 2026
১০৭ মিনিট পড়ার সময়
৩ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন

ফাযিল (স্নাতক) পাস প্রথম বর্ষ পরীক্ষা – ২০২১
বিষয়: উলূমুল কুরআন ওয়াল হাদীস (প্রথম পত্র) : তাফসীরুল কুরআন (বিষয় কোড: ১০১)
সময় : ৩ ঘণ্টা | পূর্ণমান : ১০০
[الملاحظة : اجب عن اثنين من مجموعة “الف” و”ج” و”د” وعن واحد من مجموعة “ب” -]
[দ্রষ্টব্য : “الف”, “ج” ও “د” অংশ থেকে দুটি করে এবং “ب” অংশ থেকে একটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন অনুষ্ঠিত ফাযিল স্নাতক (পাস) প্রথম বর্ষ পরীক্ষা ২০২১-এর উলূমুল কুরআন ওয়াল হাদীস ১ম পত্র (বিষয় কোড: ১০১ – তাফসীরুল কুরআন) পরীক্ষার মূল প্রশ্নপত্রের সকল প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ, প্রামাণ্য ও গবেষণাধর্মী সমাধান নিচে দেওয়া হলো। তাফসিরে জালালাইন, রওয়ায়েউল বায়ান ফী তাফসিরি আয়াতিল আহকাম ও উলূমুল কুরআনের মূলনীতি অনুসারে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর সমৃদ্ধ ও সুবিন্যস্তভাবে রচিত হয়েছে।

১। قل للمؤمنين يغضوا من أبصارهم عما لا يحل لهم نظره ويحفظوا فروجهم عما لا يحل لهم فعله بها ذلك أزكى خير لهم إن الله خبير بما يصنعون فيجازيهم عليه – وقل للمؤمنات يغضضن من أبصارهن ويحفظن فروجهن ولا يبدين زينتهن إلا ما ظهر منها وهو الوجه والكفان فيجوز نظرهما لأجنبي إن لم يخف فتنة في أحد الوجهين والثاني يحرم لأنه مظنة الفتنة – وليضربن بخمرهن على جيوبهن –

[সূরা আন-নূর: ৩০-৩১ আয়াতদ্বয়ের তাফসীরসহ অনুবাদ এবং দৃষ্টি সংযম ও পাত্রী দেখার বিধান]

[মান: ২০]

ভূমিকা ও পটভূমি

ইসলাম একটি নিষ্কলুষ ও পবিত্র সমাজ গঠনের লক্ষ্যে মানুষের জৈবিক চাহিদাকে সুনির্দিষ্ট শৃঙ্খলায় আবদ্ধ করেছে। চোখের দৃষ্টি হলো অন্তরের প্রবেশদ্বার এবং যাবতীয় অশ্লীলতার প্রথম সূচনা। তাই আল্লাহ তাআলা ব্যভিচারের পথ রুদ্ধ করতে পুরুষ ও নারী উভয়কে স্ব স্ব দৃষ্টি সংযত রাখা এবং পর্দার অলঙ্ঘনীয় বিধান পালনের নির্দেশ দিয়েছেন।

মূল আয়াতাংশের বঙ্গানুবাদ

মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে; এটাই তাদের জন্য অধিকতর পবিত্র। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবহিত। আর মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে; আর তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে, তবে যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ব্যতীত। আর তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশ আবৃত রাখে।

শাব্দিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ

শব্দ রূপ ও ব্যাকরণ আভিধানিক অর্থ তাফসীরি তাৎপর্য
يَغُضُّوا ফে’লে মুদারে (মাজযুম) তারা যেন নিচু ও সংযত রাখে জওয়াবে আমরের কারণে মাজযুম। বেগানা নারীর প্রতি দৃষ্টি ফেরানো।
أَزْكَى ইসমুত তাফদীল অধিকতর পবিত্র ও নির্মল কুপ্রবৃত্তি দমন করে অন্তরের আত্মিক পবিত্রতা বৃদ্ধি পাওয়া।
بِخُمُرِهِنَّ ‘খিমার’ (خمار)-এর বহুবচন তাদের ওড়না বা চাদর দ্বারা মাথা ও গ্রীবা ঢেকে বক্ষদেশ পর্যন্ত ঝুলিয়ে দেওয়ার কাপড়।
جُيُوبِهِنَّ ‘জাইব’ (جيب)-এর বহুবচন বক্ষদেশ ও গলার উন্মুক্ত অংশ পোশাকের যে অংশ দিয়ে বুক বা গলার অংশ দৃশ্যমান হয়।

(الف) আলোচ্য আয়াতের শানে নুযূল

মুফাসসিরগণ এই আয়াতের অবতরণের প্রেক্ষাপটে বর্ণনা করেন যে, মদিনায় এক যুবক পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল, এমন সময় বিপরীত দিক থেকে এক নারী আসছিল। যুবকটি মুগ্ধ দৃষ্টিতে অপলকভাবে নারীর দিকে তাকাতে তাকাতে চলতে লাগল। একপর্যায়ে পথের ধারের একটি দেয়ালে তার মুখ সজোরে আঘাত লেগে নাক কেটে রক্তে রঞ্জিত হয়ে যায়। যুবকটি রক্তমাখা অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে হাজির হয়ে সত্য ঘটনা খুলে বলল। তখন আল্লাহ তাআলা মুমিন নর-নারীদের চোখ সংযত রাখার নির্দেশ দিয়ে এই আয়াত অবতীর্ণ করেন।

(ب) বিয়ের প্রস্তাবের সময় পাত্রী দেখার শারঈ বিধান ও সীমানা

  • মৌলিক বিধান: বিবাহের পূর্বে পাত্র-পাত্রী পরস্পরকে দেখে নেওয়া ইসলামি শরিয়তে মুস্তাহাব ও সুন্নাত। রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত মুগীরা ইবনে শু’বা (রা.)-কে বলেছিলেন: ‘তুমি তাকে দেখে নাও, কেননা এর মাধ্যমে তোমাদের দুজনের দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক ভালোবাসা ও স্থায়িত্ব তৈরি হবে।’ (তিরমিযী ও নাসাঈ)।
  • দেখার গ্রহণযোগ্য সীমানা: ফকীহ ও জমহুর উলামায়ে কেরামের মতে বিবাহের উদ্দেশ্যে পুরুষ কেবল পাত্রীর মুখমণ্ডল ও দুই হাতের কবজি পর্যন্ত দেখতে পারবে। কারণ মুখমণ্ডল দ্বারা শারীরিক রূপ-সৌন্দর্য এবং হাত দ্বারা শারীরিক স্বাস্থ্য ও গঠন বোঝা যায়। তবে কোনো নির্জন কক্ষে একান্তে দেখা নিষিদ্ধ; অভিভাবকের উপস্থিতিতেই তা হতে হবে।

উপসংহার

দৃষ্টি সংযমের এই বিধান মানুষের চরিত্র রক্ষা এবং সমাজে অনাবিল পবিত্রতা ও পারিবারিক সুখ প্রতিষ্ঠার এক অতুলনীয় রক্ষাকবচ।

২। وما علمناه الشعر وما ينبغي له إن هو إلا ذكر وقرآن مبين – لينذر من كان حيا ويحق القول على الكافرين – أولم يروا أنا خلقنا لهم مما عملت أيدينا أنعاما فهم لها مالكون –

[সূরা ইয়াসীন: ৬৯-৭১ আয়াতসমূহের তাফসীরসহ অনুবাদ ও কুরআন বনাম কবিতার বিশ্লেষণ]

[মান: ২০]

ভূমিকা ও পটভূমি

মক্কার মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নবুওয়াতকে হেয় করার জন্য অপপ্রচার চালাত যে, মুহাম্মাদ একজন কবি এবং এই কুরআন হলো তাঁর রচিত এক চমৎকার কাব্য। তাদের এই ঘৃণ্য অপবাদের দাঁতভাঙা জবাব দিয়ে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন যে, নবীজীকে কবিতা শিক্ষা দেওয়া হয়নি এবং কবিতা রচনা তাঁর নবুওয়াতের মর্যাদার সাথে আদৌ শোভনীয় নয়।

মূল আয়াতাংশের বঙ্গানুবাদ

আর আমি তাঁকে কবিতা শিক্ষা দেইনি এবং এটা তাঁর পক্ষে শোভনীয়ও নয়। এ তো কেবল এক উপদেশ এবং সুস্পষ্ট কুরআন; যাতে তিনি সতর্ক করতে পারেন জীবিতদেরকে এবং যাতে কাফেরদের বিরুদ্ধে শাস্তির কথা সত্য প্রমাণিত হয়। তারা কি প্রত্যক্ষ করে না যে, আমার হাত যা তৈরি করেছে তা থেকে আমি তাদের জন্য সৃষ্টি করেছি চতুস্পদ জন্তু, অতঃপর তারা এগুলোর মালিক?

শাব্দিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ

শব্দ রূপ ও ধাতু আভিধানিক অর্থ তাফসীরি তাৎপর্য
الشِّعْرَ ش – ع – ر (ইসম) কবিতা বা কাব্য কল্পনাপ্রসূত ছন্দোবদ্ধ কৃত্রিম বাক্য যা বাস্তবতার সাথে সম্পর্কহীন।
مَا يَنبَغِي لَهُ ب – غ – ي (ইনফি’আল) তাঁর জন্য শোভনীয় বা উপযোগী নয় নবীর পবিত্র ব্যক্তিত্ব ও সত্যবাণীর সাথে কবির চরিত্রের কোনো মিল নেই।
حَيًّا ح – ي – ي (সিফাত) জীবিত ব্যক্তি যার অন্তর ঈমান ও সত্য উপলব্ধির চেতনায় জীবন্ত রয়েছে।
أَنْعَامًا ن – ع – م (জামা) গৃহপালিত চতুস্পদ পশু উট, গরু, মহিষ, ভেড়া ও ছাগল যা মানুষের জীবনযাত্রার সহায়ক।

(الف) নবীজী (সা.)-কে কবিতা শিক্ষা না দেওয়ার ঐশী হিকমত

  • রিসালাতকে সন্দেহের ঊর্ধ্বে রাখা: আরবরা কাব্যরসিক জাতি ছিল। নবীজী যদি কবি হতেন, তবে কাফেররা বলত যে কুরআন তাঁর অসাধারণ কবিত্বশক্তির ফসল। আল্লাহ নবীজীকে ছন্দ ও কবিতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রেখে প্রমাণ করেছেন যে কুরআন মানবীয় সাহিত্য নয়, বরং সরাসরি আল্লাহর অবতীর্ণ ওহী।
  • কবি ও নবীর মৌলিক চরিত্রের বৈপরীত্য: কবিদের স্বভাব হলো তারা কাল্পনিক জগতে বিচরণ করে, অতিরঞ্জন করে এবং যা বলে তা নিজেরা পালন করে না (সূরা আশ-শু’আরা: ২২৪-২২৬)। পক্ষান্তরে নবীর প্রতিটি কথা হলো পরম সত্য, বাস্তব এবং তিনি তাঁর বাণীর ওপর আমলের ক্ষেত্রে সমগ্র সৃষ্টির সেরা নমুনা। তাই নবীর জন্য কবি হওয়া কখনোই শোভনীয় নয়।

(ب) কুরআন কি পদ্য (নযম) নাকি গদ্য (নছর)?

উলামায়ে বালাগাত ও উসূলবিদদের সর্বসম্মত বিশ্লেষণ অনুযায়ী:

  • পবিত্র কুরআন প্রচলিত মানবীয় পরিভাষার সাধারণ ‘পদ্য’ (الشعر المنظوم) নয়, আবার কোনো সাধারণ ‘গদ্য’ (النثر)-ও নয়।
  • আরবি কবিতার মূল শর্ত হলো সুনির্দিষ্ট ‘ওযন’ (ছন্দমাত্রা বা মিটার) এবং ‘কাফিয়া’ (অন্ত্যমিল)। কুরআনে অন্ত্যমিলযুক্ত সুরময় ছন্দ থাকলেও তা কোনো মানুষের তৈরি ছন্দের ছকে বাঁধা নয়।
  • কুরআন হলো এক অনন্য অলৌকিক ঐশী বাণীরূপ—যা গদ্য ও পদ্যের সকল মানবীয় সাহিত্যিক সীমাবদ্ধতার বহু ঊর্ধ্বে এক অনুপম ও অপার্থিব কালামুল্লাহ। এর নিজস্ব ধ্বনিমাধুর্য ও ভাবগাম্ভীর্যই এর চিরন্তন স্বাতন্ত্র্য।

উপসংহার

কুরআনের এই অনন্য শৈলী প্রমাণ করে যে, এটি কোনো মানুষের পক্ষে রচনা করা অসম্ভব এবং তা নিশ্চিতভাবেই বিশ্বজাহানের পালনকর্তার অবতীর্ণ বাণী।

৩। يا أيها الذين آمنوا لا ترفعوا أصواتكم فوق صوت النبي ولا تجهروا له بالقول كجهر بعضكم لبعض أن تحبط أعمالكم وأنتم لا تشعرون – إن الذين يغضون أصواتهم عند رسول الله أولئك الذين امتحن الله قلوبهم للتقوى لهم مغفرة وأجر عظيم –

[সূরা আল-হুজুরাত: ২-৩ আয়াতদ্বয়ের তাফসীরসহ অনুবাদ ও নবীর প্রতি আদবের শারঈ গুরুত্ব]

[মান: ২০]

ভূমিকা ও পটভূমি

ঈমানের মূল দাবি হলো রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন। রাসুল (সা.)-এর মর্যাদা সাধারণ মানুষের মতো নয়; বরং তাঁর সামনে কথা বলা, আচরণ করা এবং অবস্থানের ক্ষেত্রে বিশেষ ঐশী শিষ্টাচার বজায় রাখা উম্মতের ওপর ফরজ। এই সুরক্ষায় সূরা হুজুরাতে মুমিনদের কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে।

মূল আয়াতাংশের বঙ্গানুবাদ

হে মুমিনগণ! তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের ওপর তোমাদের কণ্ঠস্বর উঁচু করো না এবং পরস্পরের সাথে যেভাবে উচ্চৈঃস্বরে কথা বলো তাঁর সাথে সেভাবে কথা বলো না; পাছে তোমাদের অজ্ঞাতসারে তোমাদের সমস্ত আমল বরবাদ হয়ে যায়। নিশ্চয় যারা আল্লাহর রাসূলের সান্নিধ্যে নিজেদের কণ্ঠস্বর নিচু রাখে, তারাই তারা যাদের হৃদয়কে আল্লাহ তাকওয়ার জন্য খাঁটি করে পরীক্ষা করেছেন; তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।

শাব্দিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ

শব্দ মূলধাতু ও রূপ আভিধানিক অর্থ তাফসীরি তাৎপর্য
لَا تَرْفَعُوا ر – ف – ع (নাহী) তোমরা উঁচু করো না নবীর উপস্থিতিতে উচ্চ আওয়াজে কথা বলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
أَن تَحْبَطَ ح – ب – ط (মাজদারিয়্যা) আমল ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় বেআদবির কারণে নেক আমল বিনষ্ট হয়ে যাওয়ার কঠোর সতর্কতা।
يَغُضُّونَ غ – ض – ض (মুদারে) তারা নিচু ও সংযত রাখে নবীজীর প্রতি ভীতি ও শ্রদ্ধায় কণ্ঠস্বর অত্যন্ত শান্ত রাখা।
امْتَحَنَ م – ح – ن (ইফতি’আল) তিনি পরীক্ষা ও খাঁটি করেছেন সোনাকে আগুনে গলিয়ে খাঁটি করার মতো তাকওয়া যাচাই করা।

(الف) শানে নুযূল ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

বনু তামীম গোত্রের একটি প্রতিনিধিদল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে আগমন করলে তাদের নেতা কে হবেন—এ নিয়ে হযরত আবু বকর (রা.) এবং হযরত উমর (রা.)-এর মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। আবু বকর (রা.) প্রস্তাব করলেন কা’কা ইবনে মা’বাদের নাম, আর উমর (রা.) প্রস্তাব করলেন আল-আকরা ইবনে হাবিসের নাম। কথার পিঠে কথা বাড়াতে গিয়ে নবীজীর পবিত্র উপস্থিতিতে তাঁদের উভয়ের কণ্ঠস্বর কিছুটা উঁচু হয়ে যায়। তখন তাঁদের সতর্ক করে আল্লাহ তাআলা এই আয়াত নাজিল করেন। এরপর থেকে সাহাবীগণ নবীজীর সামনে এত আস্তে কথা বলতেন যে কান পেতে শুনতে হতো।

(ب) হযরত সাবিত ইবনে কায়স (রা.)-এর ঐতিহাসিক ঘটনা

হযরত সাবিত ইবনে কায়স (রা.) ছিলেন একজন স্বভাবজাত উচ্চকণ্ঠের সাহাবী ও আনসারদের বাগ্মী খতীব। এই আয়াত নাজিল হওয়ার পর তিনি ভয়ে ঘরে দরজা বন্ধ করে কাঁদতে শুরু করলেন এবং বললেন, ‘আমি তো নবীজীর সামনে উচ্চৈঃস্বরে কথা বলতাম, নিশ্চয় আমার আমল বরবাদ হয়ে গেছে এবং আমি জাহান্নামী!’ বেশ কিছুদিন তাঁকে মজলিসে না দেখে নবীজী তাঁর খোঁজ নিলেন। ঘটনা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁকে আশ্বস্ত করে সুসংবাদ দিলেন: ‘না, তুমি জাহান্নামী নও; বরং তুমি কল্যাণের সাথে বেঁচে থাকবে, শহীদী মর্যাদা নিয়ে মৃত্যুবরণ করবে এবং তুমি জান্নাতীদের অন্তর্ভুক্ত।’

উপসংহার

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি যথাযথ তাজিম ও সম্মান প্রদর্শন কেবল বাহ্যিক ভদ্রতা নয়, বরং তা ঈমান সংরক্ষণ ও জান্নাত লাভের অমোঘ চাবিকাঠি।

৪। يا أيها الذين آمنوا لا يسخر قوم من قوم عسى أن يكونوا خيرا منهم ولا نساء من نساء عسى أن يكون خيرا منهن ولا تلمزوا أنفسكم ولا تنابزوا بالألقاب بئس الاسم الفسوق بعد الإيمان ومن لم يتب فأولئك هم الظالمون –

[সূরা আল-হুজুরাত: ১১ আয়াতের তাফসীরসহ অনুবাদ ও সামাজিক শিষ্টাচারের নীতিমালা]

[মান: ২০]

ভূমিকা ও পটভূমি

ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ, মানবিক ও মর্যাদাশীল সমাজ ব্যবস্থার রূপরেখা প্রদান করেছে। সমাজের ঐক্য ও পারস্পরিক সম্প্রীতি বিনষ্টকারী প্রধান ব্যাধি হলো পরনিন্দা, উপহাস এবং মানুষকে হেয় প্রতিপন্ন করা। সূরা হুজুরাতের এই আয়াতে সামাজিক ভ্রাতৃত্বের সুরক্ষায় তিনটি মারাত্মক ব্যাধি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

মূল আয়াতাংশের বঙ্গানুবাদ

হে মুমিনগণ! কোনো পুরুষ দল যেন অপর পুরুষ দলকে উপহাস না করে, কেননা তারা এদের চেয়ে উত্তম হতে পারে; এবং কোনো নারী দলও যেন অপর নারীদের উপহাস না করে, কেননা তারা এদের চেয়ে উত্তম হতে পারে। আর তোমরা একে অপরকে দোষারোপ করো না এবং পরস্পরকে মন্দ উপনামে ডেকো না। ঈমান আনার পর ফাসেকী নাম দেওয়া কতই না নিকৃষ্ট! আর যারা তওবা করে না তারাই তো প্রকৃত যালেম।

শাব্দিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ

শব্দ রূপ ও ধাতু আভিধানিক অর্থ তাফসীরি তাৎপর্য
لَا يَسْخَرْ س – خ – ر (নাহী) উপহাস বা ঠাট্টা না করে কাউকে তুচ্ছ জ্ঞান করে তার শারীরিক বা সামাজিক ত্রুটি নিয়ে বিদ্রূপ।
لَا تَلْمِزُوا ل – م – ز (নাহী) দোষারোপ বা খোঁটা দিও না ইঙ্গিতে, ইশারায় বা মুখের কথায় অন্যের দোষ প্রকাশ করা।
لَا تَنَابَزُوا ن – ب – ز (তাফা’উল) মন্দ উপনামে ডেকো না যে নামে ডাকলে মানুষ কষ্ট পায় এমন উপাধিতে ডাকা।
الْفُسُوقُ ف – س – ق (ইসম) সীমালঙ্ঘন বা পাপাচার ঈমানি শালীনতার বিপরীতে গালিগালাজ বা ফাসেকসুলভ নাম।

(الف) আয়াতে নিষিদ্ধ তিনটি সামাজিক ব্যাধির স্বরূপ

  • ১. উপহাস ও বিদ্রূপ করা (السخرية): কারও দরিদ্রতা, শারীরিক অক্ষমতা, গায়ের রং, বংশমর্যাদা বা পোশাক নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা। আল্লাহ সতর্ক করেছেন যে যাকে উপহাস করা হচ্ছে সে আল্লাহর কাছে উপহাসকারীর চেয়ে বহুগুণ শ্রেষ্ঠ হতে পারে।
  • ২. খোঁটা দেওয়া বা দোষারোপ (اللمز): মানুষের মুখের সামনে বা পরোক্ষে ইশারা-ইঙ্গিতে তার অতীতের ভুল বা পারিবারিক দুর্বলতা তুলে ধরে লজ্জা দেওয়া। কুরআনে বলা হয়েছে ‘নিজেদের ওপর দোষারোপ করো না’—অর্থাৎ মুসলিম উম্মাহ এক দেহের মতো, অপর ভাইকে কষ্ট দেওয়া নিজেকেই কষ্ট দেওয়ার শামিল।
  • ৩. মন্দ উপনামে ডাকা (التنابز بالألقاب): কাউকে এমন খারাপ নামে ডাকা যা সে অপছন্দ করে (যেমন খোঁড়া, কালা, কানা, চোর ইত্যাদি)। তবে ইতিবাচক পরিচিতিমূলক ভালো উপাধি (যেমন আবু বকর ‘সিদ্দীক’, উমর ‘ফারূক’) দেওয়া ইসলামে সম্পূর্ণ জায়েজ ও প্রশংসনীয়।

(ب) সুন্দর সমাজ গঠনে এই আয়াতের শিক্ষা ও প্রাসঙ্গিকতা

  • ব্যক্তির আত্মসম্মান ও মানবাধিকারের সার্বজনীন স্বীকৃতি।
  • সামাজিক সংঘাত, মনস্তাত্ত্বিক বিদ্বেষ ও হিংসার মূল উৎপাটন।
  • পবিত্র ঈমানি ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ্যের এক অনুপম আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠা।

উপসংহার

এই আয়াতের অনুশাসন মেনে চললে সমাজ থেকে যাবতীয় কলহ-বিবাদ দূর হয়ে একটি শান্তির জান্নাতী পরিবেশ গড়ে উঠবে।

৫। يا أيها الذين آمنوا اتقوا الله وذروا ما بقي من الربا إن كنتم مؤمنين – فإن لم تفعلوا فأذنوا بحرب من الله ورسوله وإن تبتم فلكم رؤوس أموالكم لا تظلمون ولا تظلمون –

[রওয়ায়েউল বায়ান : সূরা আল-বাকারা: ২৭৮-২৭৯ আয়াতের আলোকে সুদের বিধান ও ব্যাংকিং বিশ্লেষণ]

[মান: ২০]

ভূমিকা ও পটভূমি

ইসলাম একটি শোষণহীন, ভারসাম্যপূর্ণ ও ইনসাফভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছে। পুঁজিবাদী অর্থনীতির মূল হাতিয়ার হলো সুদ (রিবা), যা ধনীকে আরও ধনী করে এবং দরিদ্রকে চরম নিঃস্বতার অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করে। পবিত্র কুরআনে সুদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়ে আল্লাহ তাআলা সুদের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন।

মূল আয়াতাংশের বঙ্গানুবাদ

হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা অবশিষ্ট আছে তা বর্জন কর, যদি তোমরা প্রকৃত মুমিন হও। আর যদি তোমরা তা না কর, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা জেনে নাও। আর যদি তোমরা তওবা কর, তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই থাকবে; তোমরা কারও ওপর জুলুম করবে না এবং তোমাদের ওপরও জুলুম করা হবে না।

(الف) সুদের পরিচয় ও প্রকারভেদ

  • আভিধানিক অর্থ: ‘রিবা’ (الربا) অর্থ বৃদ্ধি পাওয়া, অতিরিক্ত হওয়া, স্ফীত হওয়া।
  • পারিভাষিক সংজ্ঞা: শরীয়াহর পরিভাষায় ঋণ বা লেনদেনের ক্ষেত্রে শরঈ কোনো বিনিময় ব্যতীত অতিরিক্ত যা কিছু গ্রহণ করা হয় তাকে সুদ বলে।
  • প্রকারভেদ: ফকীহগণের সর্বসম্মত মতে সুদ মূলত দুই প্রকার:
    • ১. রিবা আন-নাসিআহ (ربا النسيئة): মেয়াদের বিপরীতে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা। যেমন: কাউকে ১০ হাজার টাকা ধার দিয়ে এক বছর পর ১২ হাজার টাকা দাবি করা। জাহেলী যুগে এর ব্যাপক প্রচলন ছিল এবং কুরআনে মূলত এই সুদকেই চরমভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে।
    • ২. রিবা আল-ফদল (ربا الفضل): একই জাতীয় সমজাতীয় পণ্য ওজনে বা পরিমাণে কম-বেশি করে নগদ বিনিময় করা। যেমন: ভালো এক কেজি খেজুরের বদলে নিকৃষ্ট দেড় কেজি খেজুর বিনিময় করা। হাদিসের দলীলে এটি নিষিদ্ধ।

(ب) সুদের ধ্বংসাত্মক কুফল ও কুরআনী হুঁশিয়ারি

  • আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ: কুরআনে কোনো পাপের ব্যাপারে সরাসরি যুদ্ধের ঘোষণা আসেনি, কেবল সুদের ব্যাপারেই আল্লাহ বলেছেন: ‘ফাযানূ বিহারবিম মিনাল্লাহি ওয়া রাসূলিহ’।
  • অর্থনৈতিক শোষণ ও বৈষম্য: সুদ সমাজের মেহনতি মানুষের রক্ত চুষে গুটিকয়েক পুঁজিপতির হাতে দেশের যাবতীয় সম্পদ পুঞ্জীভূত করে।
  • আখিরাতে ভয়াবহ শাস্তি: সুদখোর ব্যক্তি হাশরের মাঠে শয়তানের স্পর্শে উন্মাদ ও মাতাল ব্যক্তির মতো দণ্ডায়মান হবে (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)।

(ج) আধুনিক বাণিজ্যিক ব্যাংকিং ও সুদের বিধান

  • বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহের সুদ: প্রচলিত সুদভিত্তিক বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহ আমানত বা ঋণের ওপর যে পূর্বনির্ধারিত অতিরিক্ত সুদ (Interest) লেনদেন করে, তা হুবহু কুরআনে নিষিদ্ধ ‘রিবা আন-নাসিআহ’-এর অন্তর্ভুক্ত। আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, মক্কার রাবেতা এবং ওআইসির ফিকহ একাডেমিসহ বিশ্বের সর্বসম্মত ফকীহগণের ঐকমত্য অনুযায়ী এই সুদ সম্পূর্ণ হারাম ও নাজায়েজ।
  • ইসলামি ব্যাংকিং বিকল্প: লাভ-ক্ষতির অংশীদারিত্ব (মুদারাবা ও মুশারাকা) এবং পণ্য কেনাবেচার (মুরাবাহা) ভিত্তিতে পরিচালিত ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থা শরীয়াহসম্মত বিকল্প হিসেবে পরিচালিত হতে পারে।

উপসংহার

সুদমুক্ত অর্থনীতিই কেবল বিশ্বকে বৈষম্য, শোষণ ও অর্থনৈতিক সংকট থেকে মুক্তি দিয়ে টেকসই সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারে।

৬। والسارق والسارقة فاقطعوا أيديهما جزاء بما كسبا نكالا من الله والله عزيز حكيم – فمن تاب من بعد ظلمه وأصلح فإن الله يتوب عليه إن الله غفور رحيم –

[রওয়ায়েউল বায়ান : সূরা আল-মায়েদাহ: ৩৮-৩৯ আয়াতের আলোকে চুরির হদ ও তওবার প্রভাব]

[মান: ২০]

ভূমিকা ও পটভূমি

মানবজাতির ধনসম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ইসলামি শরিয়তের মৌলিক উদ্দেশ্যসমূহের অন্যতম। চুরি একটি জঘন্য অপরাধ যা মানুষের বহু কষ্টে অর্জিত সম্পদকে অনিরাপদ করে তোলে। সমাজে চুরির মূলোৎপাটন করতে ইসলামে হস্তকর্তনের কঠোর বিধান প্রণীত হয়েছে।

(الف) চুরির সংজ্ঞা, শর্তাবলি ও হস্তকর্তনের পদ্ধতি

  • সংজ্ঞা: বালেগ ও সুস্থ বিবেকবান ব্যক্তি কর্তৃক অন্যের সংরক্ষিত স্থান থেকে গোপনে নিসাব পরিমাণ সম্পদ আত্মসাৎ করা।
  • হস্তকর্তনের শর্তাবলি: চোর বালেগ হতে হবে, মাল সংরক্ষিত (হির্‌য) থাকতে হবে, মালের মূল্য নিসাব (১০ দিরহাম) হতে হবে, মালিকানা সংক্রান্ত কোনো সন্দেহ না থাকা এবং চুরির ঘটনা আদালতে সাক্ষ্য বা স্বীকারোক্তি দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হতে হবে।
  • পদ্ধতি: চোরের ডান হাতের কবজি (মফসিলে কাফ) থেকে হাত কেটে ফেলার পর রক্তপাত বন্ধ করতে তেল গরম করে ক্ষতস্থান দাগিয়ে দেওয়া হতো।

(ب) চুরির হদে হস্তকর্তন বিধানের শারঈ হিকমত

  • কার্যকর সামাজিক প্রতিরোধ: হাত কেটে দিলে চোর সমাজে চিহ্নিত হয়ে যায় এবং অন্য অপরাধীদের হৃদয়ে চরম ভীতি সঞ্চারিত হয়। ফলে গোটা সমাজ চুরির আতঙ্ক থেকে মুক্ত হয়ে যায়।
  • মালের অধিকার রক্ষা: হাজারো মানুষের কোটি কোটি টাকার সম্পদ রক্ষার জন্য একজন অপরাধীর একটি হাত কর্তন করা পরম ইনসাফ ও সুবিচার।

(ج) ‘فمن تاب من بعد ظلمه’-এর তাফসীর ও তওবার প্রভাব

  • আদালতের শাস্তির ক্ষেত্রে: চুরির মামলা ইসলামি আদালতের কাজীর কাছে উত্থাপিত হয়ে প্রমাণিত হওয়ার পর চোর যদি তওবাও করে, তবুও দুনিয়ার শাস্তি (হস্তকর্তন) মওকুফ হবে না।
  • আখিরাতের শাস্তির ক্ষেত্রে: চোর যদি অপরাধের পর আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে তওবা করে, অনুতপ্ত হয় এবং মালিকের সম্পদ ফিরিয়ে দেয়, তবে আখিরাতের জাহান্নামের আজাব থেকে সে মুক্তি পাবে এবং আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেবেন। কারণ আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল ও দয়ালু।

উপসংহার

ইসলামের এই দণ্ডবিধি কঠোর হলেও তা সমাজকে অপরাধমুক্ত করার এক অব্যর্থ মহৌষধ।

৭। عرف التفسير مع بيان موضوعه وغرضه وفائدته – ثم بين الفرق بين التفسير والتأويل –

[তাফসিরের সংজ্ঞা, বিষয়বস্তু, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, সার্বিক উপকারিতা এবং তাফসির ও তাবিলের সূক্ষ্ম পার্থক্য নিরূপণ]

[মান: ১০]

ভূমিকা ও পটভূমি

পবিত্র কালামুল্লাহ হলো সমগ্র মানবজাতির জন্য অবতীর্ণ সর্বশেষ হেদায়েতের সনদ। এই মহাসত্য কিতাবের প্রতিটি শব্দের অন্তর্নিহিত অর্থ, বিধিবিধান এবং প্রজ্ঞাময় নির্দেশনা মানবসমাজের সামনে যথাযথভাবে উন্মোচিত করার জন্য ‘ইলমে তাফসীর’ এবং ‘তাবীল’ হলো ইসলামি জ্ঞানজগতের সর্বপ্রধান ও সর্বাধিক সম্মানিত মাধ্যম। মুফাসসিরীন কেরাম এই শাস্ত্রের মাধ্যমে ঐশী প্রত্যাদেশের মর্মবাণীকে সাধারণ মানুষের বোধগম্য করে তুলেছেন।

التفسير-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা

  • আভিধানিক অর্থ: ‘তাফসীর’ (التفسير) শব্দটি মূলত আরবি ‘ফাসরুন’ (الفسر) ধাতু থেকে ‘তাফঈল’ (تفعيل) ওযনে গঠিত হয়েছে, যার মূল অর্থ হলো উন্মোচন করা, স্পষ্ট করা, আবৃত বস্তুর আবরণ সরিয়ে দৃশ্যমান করা এবং ব্যাখ্যা করা। আল্লামা ইবনে মানযুর তাঁর ‘লিসানুল আরব’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন: الفسر كشف المغطى—অর্থাৎ কোনো আবৃত বা অস্পষ্ট বিষয়ের পর্দা উন্মোচন করে দেওয়াকে ফাসর বা তাফসীর বলা হয়।
  • পারিভাষিক সংজ্ঞা: আল্লামা বদরুদ্দীন যারকাশী (রহ.) স্বীয় বিশ্বকোষ ‘আল-বুরহান ফী উলূমিল কুরআন’-এ সংজ্ঞায়িত করেছেন:

    «علم يفهم به كتاب الله المنزل على نبيه محمد صلى الله عليه وسلم، وبيان معانيه، واستخراج أحكامه وحكمه.»

    অর্থাৎ, ‘ইলমে তাফসির হলো এমন এক সুনির্দিষ্ট শাস্ত্র যার মাধ্যমে আল্লাহর নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর অবতীর্ণ মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের সঠিক মর্ম অনুধাবন করা যায়, এর অভ্যন্তরীণ অর্থাবলি সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা যায় এবং তা থেকে জীবনঘনিষ্ঠ শারঈ আহকাম ও অন্তর্নিহিত হিকমতসমূহ সার্থকভাবে উদ্ঘাটন করা যায়।’ ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.) তাঁর অমর গ্রন্থ ‘আল-ইতকান’-এ লিখেছেন যে, এটি এমন এক বিদ্যা যা মানবীয় বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তির সর্বোচ্চ সীমা প্রয়োগ করে কালামুল্লাহর উদ্দেশ্য ও দাবিকে মানুষের বোধগম্য করে তোলে।

তাফসিরের বিষয়বস্তু, উদ্দেশ্য ও সুদূরপ্রসারী উপকারিতা

  • বিষয়বস্তু (موضوع): তাফসির শাস্ত্রের একক ও মৌলিক বিষয়বস্তু হলো স্বয়ং কালামুল্লাহ বা পবিত্র কুরআনুল কারীম। এতে কুরআনের প্রতিটি শব্দ, বাক্যরীতি, বাক্যালঙ্কার, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, হালাল-হারাম এবং শরিয়তের আকিদাগত ও ব্যবহারিক বিধানাবলী নিয়ে বিশদ গবেষণা পরিচালিত হয়।
  • লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য (غرض): পবিত্র কুরআনের শব্দাবলি ও বাক্যবিন্যাসের বিশুদ্ধ মর্ম অনুধাবন করা, বাতিল ফেরকা ও পথভ্রষ্টদের অপব্যাখ্যা এবং বিভ্রান্তি থেকে মুসলিম উম্মাহকে সুরক্ষিত রাখা এবং কুরআন মাজীদের বাস্তব পথনির্দেশনা অনুযায়ী ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবন পরিচালনা করে মহান রাব্বুল আলামীনের চিরন্তন সন্তুষ্টি ও জান্নাত অর্জন করা।
  • সার্বিক উপকারিতা (فائدة):
    • দুনিয়াতে শরিয়তের বিধানসমূহের পুঙ্খানুপুঙ্খ ও নিখুঁত বাস্তবায়ন, আত্মিক শান্তি এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক ইনসাফপূর্ণ আদর্শ সমাজ বিনির্মাণ।
    • দ্বীনি আকীদা ও আমলকে যাবতীয় বিদআত, কুসংস্কার ও জাহেলী চিন্তার সংমিশ্রণ থেকে মুক্ত ও চির অম্লান রাখা।
    • আখিরাতে জাহান্নামের চিরন্তন আজাব ও আল্লাহর গযব থেকে মুক্তি এবং জান্নাতের চিরস্থায়ী অতুলনীয় নেয়ামত ও সুউচ্চ মর্যাদা লাভ করা।

التفسير ও التأويل-এর মধ্যে তাত্ত্বিক ও প্রয়োগমূলক পার্থক্য

আরবি ভাষা ও উসূল শাস্ত্রের পরিভাষায় তাফসীর ও তাবীল দুটি স্বতন্ত্র অর্থ বহন করে। এ বিষয়ে ইমাম রাগিব ইসফাহানী, ইমাম আবু মনসুর মাতুরিদী ও ইমাম সুয়ূতী (রহ.)-এর বিশ্লেষণের ভিত্তিতে মৌলিক পার্থক্যসমূহ নিচে উপস্থাপন করা হলো:

পার্থক্যমূলক দিক তাফসীর (التفسير) তাবীল (التأويل)
১. শাব্দিক ব্যুৎপত্তি ‘ফাসর’ (فسر) থেকে গৃহীত, যার অর্থ বাহ্যিক আবরণ উন্মোচন ও প্রকাশ করা। ‘আওল’ (أول) থেকে গৃহীত, যার অর্থ আদি উৎস বা চূড়ান্ত পরিণতির দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া।
২. দলীল ও উৎসের ভিত্তি তাফসীর মূলত বর্ণনা ও রেওয়ায়েত নির্ভর (কুরআন, সহীহ সুন্নাহ ও সাহাবা-তাবেঈদের প্রত্যক্ষ প্রামাণ্য আসার)। তাবীল মূলত গভীর বিচারবুদ্ধি, ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, কিয়াস ও মুজতাহিদের সূক্ষ্ম ইজতিহাদ নির্ভর।
৩. অর্থের প্রকৃতি ও গভীরতা আয়াতের বাহ্যিক, স্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত সরাসরি অর্থের ক্ষেত্রে তাফসীর ব্যবহৃত হয়। আয়াতের অন্তর্নিহিত, রূপক, দূরবর্তী ও গভীর মর্মার্থের ক্ষেত্রে তাবীল ব্যবহৃত হয়।
৪. প্রয়োগের নিশ্চিতি মুফাসসিরগণ বলেন: তাফসীর হলো নির্দিষ্ট তথ্যের নিশ্চিত বিবরণ, যাতে সন্দেহের অবকাশ কম। তাবীল হলো একাধিক ব্যাখ্যার সম্ভাবনার মধ্যে থেকে যুক্তি দ্বারা গ্রহণযোগ্য একটিকে প্রাধান্য দেওয়া।
৫. ইমাম মাতুরিদী (রহ.)-এর অভিমত ‘তাফসীর’ হলো সাহাবায়ে কেরামের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট, যা চাক্ষুষ সাক্ষ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ‘তাবীল’ হলো পরবর্তী আলেম ও ফকীহগণের ইজতিহাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত তাত্ত্বিক গবেষণা।

উপসংহার

তাফসীর ও তাবীলের যথাযথ শাস্ত্রীয় সমন্বয় ছাড়া কোনো গবেষকের পক্ষেই কুরআনের সমুদ্রসম গভীরতায় প্রবেশ করা সম্ভব নয়। উভয় শাস্ত্রের ভারসাম্যপূর্ণ প্রয়োগই উম্মাহকে সঠিক হেদায়েতের আলোকোজ্জ্বল পথে অবিচল রাখে।

৮। ما هو القرآن؟ هل هو اسم علم غير مشتق أم هو مشتق؟ بين الاختلاف فيه مع الراجح عندك –

[কুরআন মাজীদের পূর্ণাঙ্গ সংজ্ঞা, এর নামকরণ مشتق নাকি غير مشتق—তার বিস্তারিত ঐতিহাসিক ও ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ]

[মান: ১০]

ভূমিকা ও পটভূমি

পবিত্র কুরআন হলো মানবজাতির চিরন্তন মুক্তির সনদ, যা মহান আল্লাহ তাঁর সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসুল মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর দীর্ঘ তেইশ বছরে মানবজাতির বাস্তব প্রয়োজন ও সামাজিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে অবতীর্ণ করেছেন। এই পবিত্র গ্রন্থের নামকরণ কেন ‘আল-কুরআন’ করা হলো এবং এই শব্দের ভাষাতাত্ত্বিক উৎস কী—তা নিয়ে প্রাচীনকাল থেকেই শীর্ষস্থানীয় ভাষাবিদ, আরুয বিশেষজ্ঞ এবং উসূলী ইমামগণের মধ্যে অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও গভীর তাত্ত্বিক আলোচনা পরিচালিত হয়ে আসছে।

কুরআন মাজীদের প্রামাণ্য পারিভাষিক পরিচয়

উসূলুল ফিকহ ও উলূমুল কুরআনের ইমামগণের সর্বসম্মত সংজ্ঞানুযায়ী:

«هو كلام الله المعجز، المنزل على نبيه محمد صلى الله عليه وسلم، المكتوب في المصاحف، المنقول إلينا بالتواتر، المتعبد بتلاوته.»

অর্থাৎ, ‘কুরআন হলো আল্লাহর সেই চিরন্তন অলৌকিক কালাম, যা তাঁর নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে অবতীর্ণ হয়েছে, যা মুসহাফসমূহে লিপিবদ্ধ রয়েছে, যা কোনো প্রকার সন্দেহ-সংশয় ব্যতীত নিরবচ্ছিন্ন সনদে (তাওয়াতুর সূত্রে) আমাদের কাছে হস্তান্তরিত হয়েছে এবং যার সামান্য তেলাওয়াতও স্বতন্ত্র ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়।’

‘কুরআন’ শব্দটির ব্যুৎপত্তি নিয়ে ভাষাবিদদের মতপার্থক্য

আরবি ব্যাকরণ ও ভাষাতত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে ‘কুরআন’ শব্দটি কি কোনো মূলধাতু থেকে নিষ্পন্ন (মুশতাক), নাকি এটি একটি অবিভাজ্য নিজস্ব মৌলিক নাম (ইসমে আলম গায়ের মুশতাক)—এ বিষয়ে ইমাম ও ভাষাবিদগণের মাঝে প্রধানত চারটি প্রসিদ্ধ মতামত রয়েছে:

  • ১. ইমাম শাফেঈ (রহ.)-এর অভিমত (غير مشتق): মুজতাহিদ ইমাম হযরত মুহাম্মদ ইবনে ইদরীস আশ-শাফেঈ (রহ.) অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে মত প্রকাশ করেছেন যে, ‘কুরআন’ শব্দটি কোনো মূলধাতু বা ক্রিয়ামূল থেকে নিষ্পন্ন নয়। বরং এটি আল্লাহর অবতীর্ণ কিতাবের জন্য নির্ধারিত একটি অনন্য মৌলিক স্বকীয় নাম (اسم علم مرتجل غير مشتق)—যেমন তাওরাত, ইঞ্জিল বা যাবূর আল্লাহর অপরাপর আসমানী কিতাবের মৌলিক নাম। তিনি আরও সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, এই শব্দে কোনো হামযাহ (ء) নেই; এটি তাসহীন বা হামযাহীনভাবে ‘কুরআন’ (قران) রূপেই উচ্চারিত হবে, যা সরাসরি আল্লাহর কিতাবের জন্য সুনির্দিষ্ট সত্তাবাচক নাম।
  • ২. ইমাম ফাররা (রহ.)-এর অভিমত (مشتق من القرائن): বিশিষ্ট কুফী ভাষাতাত্ত্বিক ইমাম ফাররা (রহ.)-এর মতে, ‘কুরআন’ শব্দটি ‘কারীনাহ’ (قرينة)-এর বহুবচন ‘কারায়েন’ (قرائن) থেকে নিষ্পন্ন, যার অর্থ সাদৃশ্যপূর্ণ নিদর্শন, প্রমাণ বা সঙ্গী। এর কারণ হলো কুরআনের এক আয়াত অপর আয়াতের বক্তব্যকে সমর্থন করে, সত্যতা প্রমাণ করে এবং সমগ্র কিতাবের প্রতিটি আয়াত একে অপরের সাথে অপূর্ব মিল ও সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে অবস্থান করে।
  • ৩. ইমাম আশ’আরী (রহ.)-এর অভিমত (مشتق من القرن): কালামশাস্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম আবুল হাসান আল-আশ’আরী (রহ.)-এর মতে, শব্দটি ‘ক্বারনুন’ (قرن) ধাতু থেকে গৃহীত, যার অর্থ হলো সংযুক্ত করা বা একত্রিত করা। যেহেতু এই কিতাবের মধ্যে বহু সূরা, আয়াত, হরফ ও অনুপম সত্য বাণীসমূহ একের সাথে অপরটি সুসংহতভাবে যুক্ত ও গ্রথিত হয়েছে, তাই একে কুরআন নামকরণ করা হয়েছে।
  • ৪. ইমাম যাজ্জাজ ও লহইয়ানী (রহ.)-এর অভিমত (مشتق من القراءة): বসরার শীর্ষস্থানীয় ভাষাবিদ ইমাম যাজ্জাজ এবং বিশিষ্ট ব্যাকরণবিদ ইমাম লহইয়ানীর মতে, শব্দটি ‘ক্বারা-আ’ (قرأ) ধাতু থেকে ‘ফু’লান’ (فُعْلَان) ওযনে গঠিত হয়েছে, যার মূল অর্থ পাঠ করা, একত্রিত করা বা পুনরাবৃত্তি করা। কুরআন হলো সেই মহাগ্রন্থ যা পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষের মুখে অবিরত তেলাওয়াত ও পাঠ করা হয়।

দলীলের আলোকে রাজেহ ও চূড়ান্ত গ্রহণযোগ্য মত

সার্বিক ভাষাতাত্ত্বিক ও কুরআনী দলীলের ভিত্তিতে চতুর্থ মতটিই (ইমাম যাজ্জাজ, লহইয়ানী ও জমহুর উলামায়ে কেরামের মত) সর্বাধিক বিশুদ্ধ ও রাজেহ। এর সপক্ষে অকাট্য দলীলসমূহ হলো:

  • স্বয়ং পবিত্র কুরআনে সূরা আল-কিয়ামাহর ১৭-১৮ আয়াতে এই ধাতুর ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে:

    «إِنَّ عَلَيْنَا جَمْعَهُ وَقُرْآنَهُ – فَإِذَا قَرَأْنَاهُ فَاتَّبِعْ قُرْآنَهُ»

    অর্থাৎ, ‘নিশ্চয় তা সংরক্ষণ ও পাঠ করানো আমারই দায়িত্ব; অতএব যখন আমি তা পাঠ করাই, তখন আপনি সেই পাঠের অনুসরণ করুন।’ এখানে ‘কুরআন’ শব্দটি সরাসরি পাঠ ও তেলাওয়াত অর্থে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা ব্যবহার করেছেন।

  • বিশ্বের ইতিহাসে আল-কুরআনই হলো একমাত্র কিতাব যা প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে লক্ষ লক্ষ মসজিদে, মাদরাসায় এবং তাহাজ্জুদে সর্বাধিক উচ্চারিত ও তেলাওয়াতকৃত হয়। সুতরাং পঠিত হওয়া অর্থে ‘কুরআন’ নামকরণটিই পরম সত্য, যুক্তিসঙ্গত ও ভাষাতাত্ত্বিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত।

উপসংহার

কুরআনের এই অর্থ কেবল একটি শব্দের পরিচয় নয়, বরং এটি সমগ্র মানবজাতিকে নিরন্তর এই ঐশী গ্রন্থ অধ্যয়ন, তিলাওয়াত, হিফজ এবং এর বিধানাবলী সমাজে বাস্তবায়নের চিরন্তন অনুপ্রেরণা যোগায়।

৯। اذكر أقوال العلماء في أول ما نزل وآخر ما نزل من القرآن – وما هو الراجح عندك؟

[কুরআন নাযিলের সূচনা ও সমাপ্তি বিষয়ক আয়াতসমূহের গভীর ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ ও রাজেহ মত]

[মান: ১০]

ভূমিকা ও প্রেক্ষাপট

পবিত্র কুরআন দীর্ঘ তেইশ বছরের সুদীর্ঘ সময়ে মানবজাতির বাস্তব প্রয়োজন, সামাজিক পরিস্থিতি এবং প্রশ্নের প্রেক্ষাপটে ধারাবাহিকভাবে অবতীর্ণ হয়েছে। এই ওহীর সূচনা কোন আয়াতটির মাধ্যমে হয়েছিল এবং ওফাতের প্রাক্কালে কোন আয়াতের মাধ্যমে ওহীর সমাপ্তি ঘটেছিল—তা অনুধাবন করা ওহীর ইতিহাস, নাসিখ-মানসূখ নিরূপণ এবং শরিয়তের ক্রমবিকাশ বোঝার জন্য এক অপরিহার্য বিষয়।

সর্বপ্রথম অবতীর্ণ আয়াত সম্পর্কে আলেমদের মতামত ও বিশদ বিশ্লেষণ

কুরআনের সর্বপ্রথম কোন অংশটি অবতীর্ণ হয়েছিল, এ বিষয়ে মুহাদ্দিস ও মুফাসসিরদের প্রধান মতামতসমূহ নিম্নরূপ:

  • প্রথম মত (জমহুর উলামা ও সর্বসম্মত রাজেহ মত): সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের প্রামাণ্য রেওয়ায়েত অনুযায়ী নবুওয়াতের প্রারম্ভে হেরা গুহায় জিবরাঈল (আ.) কর্তৃক অবতীর্ণ সূরা আল-আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াতই হলো সর্বপ্রথম ওহী:

    «اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ – خَلَقَ الْإِنسَانَ مِنْ عَلَقٍ – اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ – الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ – عَلَّمَ الْإِنسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ»

    উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.)-এর প্রামাণ্য হাদিস দ্বারা এটি অকাট্যভাবে প্রমাণিত যে, হেরা গুহায় এই পাঁচটি আয়াতের মাধ্যমেই নবীজী (সা.)-কে নবুওয়াত প্রদান করা হয়েছিল।

  • দ্বিতীয় মত: হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.)-এর বর্ণনামতে সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়েছে সূরা আল-মুদ্দাসসিরের প্রথমাংশ: ‘ইয়া আইয়ুহাল মুদ্দাসসির, কুম ফাআনযির’ (হে বস্ত্রাবৃত! উঠুন এবং সতর্ক করুন)।
  • তৃতীয় মত: কোনো কোনো রেওয়ায়েতে বলা হয়েছে সম্পূর্ণ সূরা হিসেবে সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়েছে সূরা আল-ফাতিহা।
  • চতুর্থ মত: কারও কারও মতে সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়েছে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’।
  • সমন্বয় ও রাজেহ ফয়সালা: আল্লামা সুয়ূতী (রহ.) চমৎকারভাবে এই মতগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন করে বলেন: মূলত নবুওয়াতের সূচনা হিসেবে হেরা গুহায় সর্বপ্রথম সূরা আলাকের প্রথম ৫টি আয়াত অবতীর্ণ হয়। এরপর কিছুকাল ওহী বন্ধ থাকার পর (ফাতরাতুল ওহী) রিসালাতের প্রকাশ্যে দাওয়াতের নির্দেশ দিয়ে সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয় সূরা মুদ্দাসসির। আর নামাজের জন্য পূর্ণাঙ্গ সূরা হিসেবে সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয় সূরা ফাতিহা। সুতরাং পরম সত্য হলো সূরা আলাকের প্রথমাংশই পরমভাবে সর্বপ্রথম নাযিলকৃত কালাম।

সর্বশেষ অবতীর্ণ আয়াত সম্পর্কে আলেমদের মতামত ও বিশদ বিশ্লেষণ

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পূর্বে কোন আয়াতটি দিয়ে ওহীর সমাপ্তি হয়েছিল, এ বিষয়ে সাহাবা ও তাবেঈদের একাধিক উক্তি রয়েছে:

  • ১. সূরা আল-বাকারার ২৮১ নম্বর আয়াত (রাজেহ মত): হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস ও সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রা.)-এর মতে সর্বশেষ অবতীর্ণ আয়াত হলো:

    «وَاتَّقُوا يَوْمًا تُرْجَعُونَ فِيهِ إِلَى اللَّهِ ثُمَّ تُوَفَّى كُلُّ نَفْسٍ مَّا كَسَبَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ»

    ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, এই আয়াত নাজিল হওয়ার মাত্র ২১ দিন (মতান্তরে ৯ দিন বা ৭ দিন) পর রাসূলুল্লাহ (সা.) এই নশ্বর পৃথিবী ত্যাগ করে রফীকে আলার সান্নিধ্যে চলে যান।

  • ২. সূরা আল-মায়েদাহর ৩ নম্বর আয়াত: বিদায় হজের দিন ঐতিহাসিক আরাফাতের ময়দানে অবতীর্ণ: ‘আল-ইয়াওমা আকমালতু লাকুম দীনাকুম ওয়া আতমামতু আলাইকুম নি’মাতী’ (আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম এবং আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম)।
  • ৩. সুদের আয়াত (সূরা আল-বাকারা: ২৭৮): হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর মতে রিবা নিষিদ্ধকরণের আয়াত সর্বশেষ অবতীর্ণের অন্তর্ভুক্ত।
  • ৪. কালালার আয়াত (সূরা আন-নিসা: ১৭৬): বিশিষ্ট সাহাবী হযরত বারা ইবনে আযিব (রা.)-এর মতে মিরাসের কালালা সংক্রান্ত আয়াত সর্বশেষ নাযিল হয়।
  • ৫. সূরা আত-তাওবার শেষ দুই আয়াত: হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.)-এর মতে ‘লাক্বাদ জাআকুম রাসূলুম মিন আনফুসিকুম…’ হলো সর্বশেষ নাযিলকৃত অংশ।
  • সমন্বয় ও রাজেহ মত: আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.) চমৎকার সমাধান দিয়েছেন: সূরা মায়েদাহর ‘আল-ইয়াওমা আকমালতু’ দ্বারা শরিয়তের আহকাম, হালাল-হারাম ও দ্বীনি বিধানাবলী পরিপূর্ণ হওয়ার সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু জীবনের সমাপ্তি, পরকালের জবাবদিহিতা ও তাকওয়ার চূড়ান্ত স্মারক হিসেবে সময়ের দিক থেকে ওফাতের ঠিক প্রাক্কালে সর্বশেষ অবতীর্ণ আয়াত হলো সূরা বাকারার ২৮১ নম্বর আয়াত। ইমাম বুখারী ও নাসায়ী (রহ.) এই মতটিকেই অকাট্য ও রাজেহ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

উপসংহার

প্রথম ও শেষ আয়াতের এই সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সংরক্ষণ প্রমাণ করে যে, আল্লাহর কিতাবের প্রতিটি অক্ষর ও বাক্য বিশ্বস্ততম সনদে মানবজাতির কাছে অবিকৃতভাবে পৌঁছেছে।

১০। كم قسما للتفسير؟ ثم بين العلوم التي يحتاج إليها المفسر باختصار –

[তাফসিরের প্রধান প্রকারভেদ এবং একজন যোগ্য মুফাসসিরের আবশ্যকীয় শাস্ত্রীয় জ্ঞানভাণ্ডার]

[মান: ১০]

ভূমিকা ও পটভূমি

পবিত্র কুরআনের ব্যাখ্যা করা মানব বুদ্ধির সাধারণ কোনো কাজ নয়; এটি ওহীর গভীর অর্থকে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দেওয়ার এক সুমহান আমানত। তাফসিরের পদ্ধতিগত ভিন্নতার কারণে এই শাস্ত্রের একাধিক ধারা গড়ে উঠেছে এবং এর সঠিক বাস্তবায়নে একজন আলেমের বহুবিধ শাস্ত্রে গভীর পাণ্ডিত্য থাকা অপরিহার্য।

তাফসিরের প্রধান প্রকারভেদ (أقسام التفسير)

পদ্ধতি, উৎস ও দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে তাফসির শাস্ত্রকে প্রধানত তিনটি ধারায় বিভক্ত করা হয়েছে:

  • ১. তাফসীর বিল মা’সুর (التفسير بالمأثور): ওহী ও প্রামাণ্য ঐতিহাসিক বর্ণনার ওপর প্রতিষ্ঠিত তাফসির। অর্থাৎ কুরআনকে কুরআন দিয়ে, রাসূল (সা.)-এর সহীহ সুন্নাহ দিয়ে এবং সাহাবা ও প্রখ্যাত তাবেঈদের প্রামাণ্য আসার দিয়ে ব্যাখ্যা করা। এর প্রধান গ্রন্থসমূহ হলো:
    • ইমাম ইবনে জারীর আত-তাবারীর ‘জামেউল বায়ান ফী তাফসিরিল কুরআন’।
    • হাফেয ইবনে কাসীরের ‘তাফসীরুল কুরআনিল আযীম’।
    • আল্লামা সুয়ূতীর ‘আদ-দুররুল মানসুর ফীত তাফসীরি বিল মা’সুর’।

    এটিই তাফসিরের সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য, অবিতর্কিত ও সর্বসম্মত গ্রহণযোগ্য রূপ।

  • ২. তাফসীর বির-রায় (التفسير بالرأي): শরিয়তের মূলনীতির সীমার ভেতরে থেকে সুস্থ মানবীয় বিচারবুদ্ধি, ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও গভীর ইজতিহাদের ভিত্তিতে তাফসির করা। এটি আবার দুই ভাগে বিভক্ত:
    • রায় মাহমূদ (প্রশংসনীয়): যা কুরআন-সুন্নাহ ও আরবি ভাষার স্বীকৃত ব্যাকরণ ও অলঙ্কারশাস্ত্রের নিয়মের সাথে পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ (যেমন ইমাম ফখরুদ্দীন রাযীর ‘মাফাতিহুল গায়ব’ এবং আল্লামা বায়যাবীর ‘আনওয়ারুত তানযীল’)।
    • রায় মাযমুম (নিন্দনীয়): যা কোনো দলীল ও শাস্ত্রীয় যোগ্যতা ছাড়া নিছক মনগড়া, কুপ্রবৃত্তি ও বাতিল মাযহাবের সমর্থনে করা হয়। হাদিসে এমন তাফসিরকারীকে কঠোরভাবে সতর্ক করে বলা হয়েছে: ‘যে ব্যক্তি ইলম ছাড়া কুরআনের ব্যাখ্যা করে সে যেন জাহান্নামে নিজের ঠিকানা বানিয়ে নেয়।’
  • ৩. তাফসীর বিল ইশারা (التفسير الإشاري): আয়াতের বাহ্যিক ও শরিয়তসম্মত অর্থ সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ রেখে আধ্যাত্মিক সাধক ও আরিফীনদের অন্তরে উদ্ভাসিত সূক্ষ্ম ইশারা ও রুহানী রহস্যের আলোকে ব্যাখ্যা করা (যেমন ইমাম আলূসীর ‘রুহুল মা’আনী’ ও সাহল আত-তুসতারীর তাফসির)। এর গ্রহণযোগ্যতার শর্ত হলো তা যেন কোনোক্রমেই শরিয়তের প্রকাশ্য দলীলের বিরোধী না হয়।

একজন আদর্শ মুফাসসিরের আবশ্যকীয় শাস্ত্রসমূহ (العلوم التي يحتاج إليها المفسر)

ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.) তাঁর বিশ্বখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-ইতকান ফী উলূমিল কুরআন’-এ উল্লেখ করেছেন যে, একজন মুফাসসিরের জন্য প্রধানত নিম্নোক্ত ১৫টি শাস্ত্রে অগাধ ব্যুৎপত্তি থাকা অপরিহার্য:

  • ১. ইলমুল লুগাত (অভিধান বিজ্ঞান): আরবি শব্দের মূল ধাতু, ধাতুগত তাৎপর্য ও আভিধানিক অর্থ জানা।
  • ২. ইলমুন নাহু (বাক্যরীতি ও ব্যাকরণ): হরকত, এরাব ও বাক্যের গঠন বুঝতে ব্যাকরণিক জ্ঞান। কারণ এরাবের সামান্য পরিবর্তনে অর্থের বিশাল পরিবর্তন ঘটে।
  • ৩. ইলমুস সরফ (রূপমূলতত্ত্ব): শব্দের গঠন, রূপান্তর ও তাসরীফের সূক্ষ্ম নিয়মাবলি জানা।
  • ৪-৬. বালাগাত শাস্ত্রের তিন শাখা: ইলমুল মা’আনী (শব্দের বিন্যাস ও বাক্যের বৈশিষ্ট্য), ইলমুল বায়ান (উপমা, রূপক ও ইঙ্গিত) এবং ইলমুল বাদী’ (অলঙ্কারশাস্ত্র ও সৌন্দর্য)।
  • ৭. ইলমুল কিরাআত (তেলাওয়াত রীতি): কেরাতের বিভিন্নতার কারণে অর্থে যে তাত্ত্বিক গভীরতা আসে তা অনুধাবন করা।
  • ৮. ইলমুল আকাইদ (তাওহীদ ও কালাম): আল্লাহর জাত ও সিফাত সম্পর্কে বিশুদ্ধ আকিদা পোষণ করা, যাতে কোনো আয়াতে বিভ্রান্তিকর অর্থ গ্রহণ না করা হয়।
  • ৯. উসূলে ফিকহ (আইনশাস্ত্রের মূলনীতি): আম, খাস, মুজমাল, মুফাসসাল, নাসিখ ও মানসূখ বিধান নির্ধারণের যোগ্যতা অর্জন।
  • ১০. আসবাবে নুযূল (অবতরণের প্রেক্ষাপট): আয়াত নাজিলের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা জানা।
  • ১১. নাসিখ ও মানসূখ: কোন বিধান বহাল রয়েছে আর কোনটি রহিত হয়েছে তা নিখুঁতভাবে নিরূপণ করা।
  • ১২. ইলমুল হাদিস ও উসূলুল হাদিস: নববী ব্যাখ্যার বিশুদ্ধতা, সনদের স্তর এবং সহীহ ও যঈফের পার্থক্য নিরূপণ করা।
  • ১৩. ফিকহ শাস্ত্র: শরিয়তের ব্যবহারিক বিধিবিধান এবং ফকীহগণের ইজতিহাদ ও ফতোয়ার জ্ঞান।
  • ১৪. ইতিহাস ও পূর্ববর্তী জাতিসমূহের কাহিনী: শিক্ষণীয় ঘটনাবলী ও নবীদের ইতিহাস সম্যকভাবে উপলব্ধি করা।
  • ১৫. ইলমে লাদুন্নী বা আল-মাওহিবাহ (العلم الموهوب): তাকওয়া, খোদাভীতি ও সুন্নাহর অনুসরণের বরকতে আল্লাহ প্রদত্ত বিশেষ প্রজ্ঞা ও আত্মিক অন্তর্দৃষ্টি।

উপসংহার

এই শাস্ত্রীয় যোগ্যতাগুলোর সমন্বয় ব্যতীত কুরআনের তাফসিরে প্রবৃত্ত হওয়া উম্মাহর মধ্যে গোমরাহী, চরমপন্থা ও ফিতনা সৃষ্টির নামান্তর।

১১। تحدث عن أهمية الحياة الأسرية في الإسلام –

[ইসলামে পারিবারিক জীবনের অসামান্য গুরুত্ব, অধিকার ও সামাজিক সংহতির ভূমিকা]

[মান: ১০]

ভূমিকা ও পটভূমি

মানবজাতির অস্তিত্ব, নৈতিক পবিত্রতা এবং সামাজিক শৃঙ্খলার মূল চাবিকাঠি হলো একটি সুসংহত পরিবার। ইসলাম কোনো রূপ বৈরাগ্যবাদ, সমাজবিচ্ছিন্নতা বা সন্ন্যাসজীবনকে সমর্থন করে না; বরং পবিত্র দাম্পত্য জীবনের মাধ্যমে একটি সুস্থ ও স্নেহপূর্ণ পারিবারিক বলয় গড়ে তোলাকে দ্বীনের এক অপরিহার্য স্তম্ভ হিসেবে ঘোষণা করেছে। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে পারিবারিক জীবনকে ভালোবাসা, রহমত ও প্রশান্তির কেন্দ্র হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে।

ইসলামে পারিবারিক জীবনের অপরিসীম গুরুত্ব

  • ১. নৈতিক পবিত্রতা ও লজ্জাস্থানের হেফাজত: ইসলাম-পূর্ব যুগে এবং বর্তমান আধুনিক ভোগবাদী সমাজে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক ও যৌন অনাচার সমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। বিবাহ এবং পরিবারের মাধ্যমে মানুষের চরিত্র কলুষমুক্ত থাকে। রাসূলুল্লাহ (সা.) সামর্থ্যবান যুবকদের দ্রুত বিবাহ করার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন:

    «يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ، فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ، وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ»

    অর্থাৎ, ‘হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যে বিবাহের সামর্থ্য রাখে সে যেন বিবাহ করে; কেননা তা দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানের সুরক্ষা নিশ্চিত করে।’ (সহীহ বুখারী)।

  • ২. আত্মিক প্রশান্তি ও পারস্পরিক মমত্ববোধ: দাম্পত্য জীবন নিছক কোনো সামাজিক বা জৈবিক চুক্তি নয়; এটি আল্লাহর এক মহা কুদরতি নিদর্শন। সূরা আর-রূমের ২১ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে:

    «وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً»

    অর্থাৎ, ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা তাদের নিকট প্রশান্তি লাভ কর এবং তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক প্রেম-প্রীতি ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।’

  • ৩. ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও পুণ্যবান সন্তান গড়ে তোলা: পরিবার হলো প্রতিটি মানব সন্তানের প্রাথমিক ও সবচেয়ে শক্তিশালী বিদ্যাপীঠ। পিতা-মাতার সস্নেহ পরশে সন্তানরা ঈমান, আদব-কায়দা ও মানবিক মূল্যবোধ শেখে। কুরআন মুমিনদের দোয়া শিখিয়েছে: ‘রাব্বানা হাব লানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা কুররাতা আ’ইয়ুন’—হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের আমাদের জন্য নয়নপ্রীতিকর বানিয়ে দিন।
  • ৪. পারস্পরিক দায়িত্ব ও অধিকারের সুষম বণ্টন: ইসলাম পরিবারে কারও ওপর অবিচার করেনি। স্বামীর দায়িত্ব হলো পরিবারের অর্থনৈতিক ভরণপোষণ (নাফাকাহ), নিরাপত্তা, বাসস্থান ও সম্মান নিশ্চিত করা (الرجال قوامون على النساء); আর স্ত্রীর দায়িত্ব হলো স্বামীর অনুপস্থিতিতে গৃহের পবিত্রতা ও সম্পদ রক্ষা করা এবং সন্তানদের সুশিক্ষায় লালন-পালন করা।
  • ৫. পিতা-মাতা ও আত্মীয়তার হক আদায়: পরিবারের ভেতর পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্বকে আল্লাহর তাওহীদের পরপরই স্থান দেওয়া হয়েছে (সূরা আল-ইসরা: ২৩)। মায়ের খেদমতকে জান্নাত লাভের প্রত্যক্ষ সোপান নির্ধারণ করে বলা হয়েছে: ‘আল-জান্নাতু তাহতা আকদामিল উম্মাহাত’—মায়ের পদতলে সন্তানের জান্নাত।

উপসংহার

একটি স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ, অপরাধমুক্ত ও খোদাভীরু সমাজ গঠনের একমাত্র পূর্বশর্ত হলো ইসলামি মূল্যবোধ ও শরিয়তের অনুশাসনে গড়ে ওঠা পবিত্র পারিবারিক ব্যবস্থা।

১২। ما هي الخلافة في الإسلام؟ وما الفرق بين الخلافة والإمامة؟ بين موضحا –

[ইসলামে খিলাফতের তাৎপর্য এবং খিলাফত ও ইমামতের মধ্যে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক পার্থক্য নিরূপণ]

[মান: ১০]

ভূমিকা ও পটভূমি

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা (দ্বীন ও দাওলাহ), যার মধ্যে ব্যক্তিগত ইবাদতের পাশাপাশি রাজনীতি, অর্থনীতি, বিচারব্যবস্থা ও বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা রয়েছে। ইসলামি রাষ্ট্রকাঠামোর শীর্ষ নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে ইসলামি পরিভাষায় ‘খিলাফত’ এবং ‘ইমামত’ বলা হয়।

الخلافة-এর সংজ্ঞা ও প্রকৃতি

  • আভিধানিক অর্থ: ‘খিলাফত’ (الخلافة) শব্দটি ‘খালফ’ (خلف) ধাতু থেকে নিষ্পন্ন, যার অর্থ স্থলাভিষিক্ত হওয়া, প্রতিনিধিত্ব করা বা কারো অবর্তমানে তার দায়িত্ব গ্রহণ করা।
  • পারিভাষিক সংজ্ঞা: প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ও ফকীহ আল্লামা ইবনে খালদুন (রহ.) স্বীয় মুকাদ্দিমায় সংজ্ঞায়িত করেছেন:

    «حمل الكافة على مقتضى النظر الشرعي في مصالحهم الأخروية والدنيوية الراجعة إليها، إذ أحوال الدنيا ترجع كلها عند الشارع إلى اعتبارها بمصالح الآخرة، فهي في الحقيقة خلافة عن صاحب الشرع في حراسة الدين وسياسة الدنيا به.»

    অর্থাৎ, ‘খিলাফত হলো সমগ্র মানবজাতিকে তাদের পরকালীন ও তদসংশ্লিষ্ট ইহকালীন কল্যাণের স্বার্থে শরিয়তের নির্দেশনার ওপর পরিচালনা করা; সুতরাং এটি মূলত দ্বীন সংরক্ষণ ও দুনিয়ার রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বয়ং শরিয়ত প্রণেতার (রাসূল সা.) প্রতিনিধিত্ব করার নাম।’ ইমাম মাওয়ার্দী তাঁর ‘আল-আহকাম আস-সুলতানিয়্যাহ’ গ্রন্থেও অনুরূপ সংজ্ঞা দিয়েছেন।

  • খিলাফতের মূল স্তম্ভসমূহ:
    • এক আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও শরিয়তের সার্বিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা।
    • শূরার (পরামর্শের) ভিত্তিতে খলীফা নির্বাচন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ (وأمرهم شورى بينهم)।
    • বিচার বিভাগে দল-মত নির্বিশেষে শতভাগ ইনসাফ ও সাম্য কায়েম করা।
    • নাগরিকের জান, মাল, ইজ্জত ও মৌলিক অধিকারের নিরঙ্কুশ নিরাপত্তা বিধান করা।

الخلافة এবং الإمامة-এর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য

ইসলামি রাষ্ট্রদর্শন ও ফিকহ শাস্ত্রে এই দুটি পরিভাষার মধ্যে কিছু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক পার্থক্য বিদ্যমান:

পার্থক্যমূলক ক্ষেত্র খিলাফত (الخلافة) ইমামত (الإمامة)
১. শাব্দিক ভিত্তি ‘প্রতিনিধিত্ব’ অর্থে ব্যবহৃত—রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর তাঁর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্থলাভিষিক্ততা নির্দেশ করে। ‘নেতৃত্ব’ অর্থে ব্যবহৃত—সম্মুখে থেকে কোনো জনসমষ্টি বা কাফেলাকে সঠিক দিকে পরিচালনা করা নির্দেশ করে।
২. ধর্মীয় পরিধি খিলাফত মূলত সর্বোচ্চ বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় শাসন পরিচালনার জন্যই সুনির্দিষ্টভাবে ব্যবহৃত হয়। ইমামতের পরিধি ব্যাপক—রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বকে ‘ইমামতে কুবরা’ বলা হয় এবং সালাতের ইমামতিকে ‘ইমামতে সুগরা’ বলা হয়।
৩. আকিদাগত অবস্থান আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মতে খিলাফত হলো উম্মাহর পরামর্শ (শূরা) ও বায়আতের ভিত্তিতে অর্পিত একটি পবিত্র রাজনৈতিক আমানত। শিয়া মতবাদে ইমামত হলো নবুওয়াতের মতো একটি নিষ্পাপ (মা’সূম) ঐশী পদমর্যাদা, যা কেবল আলী (রা.) ও তাঁর বংশধরদের জন্য নির্ধারিত।
৪. ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা খুলাফায়ে রাশেদীনের শাসনই হলো আদর্শ খিলাফতের স্বর্ণযুগ। নবীজী বলেছেন: ‘আমার পর খিলাফত থাকবে ৩০ বছর।’ ইমামত শরিয়তের জ্ঞানগত ও আধ্যাত্মিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে সর্বযুগের মুজতাহিদ ইমামগণের (যেমন ইমাম আবু হানিফা, শাফেঈ) জন্যও সমভাবে প্রযোজ্য হয়।

উপসংহার

ইসলামি খিলাফতের মূল আত্মা হলো পৃথিবীতে মানুষের ওপর মানুষের প্রভৃত্বের অবসান ঘটিয়ে এক পরাক্রমশালী আল্লাহর সুবিচারপূর্ণ বিধান কায়েম করা।

১৩। ما هي المؤاخاة؟ تحدث عن أهدافها في الإسلام –

[মদিনায় রাসূলুল্লাহ (সা.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক মুআখাত (ভ্রাতৃত্ব বন্ধন) ও এর সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্যসমূহ]

[মান: ১০]

ভূমিকা ও পটভূমি

প্রথম হিজরিতে মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় আসা সর্বস্বান্ত মুহাজির সাহাবীগণ এক চরম অর্থনৈতিক, মানসিক, বাসস্থান ও সামাজিক সংকটের মুখে পড়েছিলেন। এই সংকট দূর করতে এবং নবগঠিত ইসলামি সমাজ ও রাষ্ট্রকে একটি ইস্পাতকঠিন ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনার স্থানীয় আনসার ও মক্কার মুহাজিরদের মধ্যে যে ঐতিহাসিক রক্তের সম্পর্কের চেয়েও গভীর আত্মিক ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করেছিলেন, তাকে ইসলামের ইতিহাসে ‘আল-মুআখাত’ (المؤاخاة) বলা হয়।

المؤاخاة-এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বাস্তবায়ন

হিজরতের মাত্র পাঁচ মাস পর বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা.)-এর বাসভবনে রাসূলুল্লাহ (সা.) মুহাজির ও আনসারদের মধ্য থেকে মোট ৯০ জন (মতান্তরে ১০০ জন) সাহাবীকে একত্রিত করেন। অতঃপর তিনি একজন মুহাজির এবং একজন আনসার সাহাবীকে ডেকে পরস্পরের ভাই-ভাই ঘোষণা করেন। যেমন:

  • হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর সাথে হযরত খারিজা ইবনে যায়দ আনসারী (রা.)।
  • হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর সাথে হযরত ইতবান ইবনে মালেক (রা.)।
  • হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রা.)-এর সাথে মদিনার ধনী সাহাবী হযরত সা’দ ইবনে রাবী (রা.)।
  • হযরত সালমান ফারসী (রা.)-এর সাথে হযরত আবু দারদা (রা.)।

সা’দ ইবনে রাবী (রা.) আব্দুর রহমান ইবনে আওফকে বললেন: ‘মদিনার আনসারদের মধ্যে আমি সবচেয়ে ধনী। আমার ধনসম্পদ অর্ধেক আমি আপনাকে দিয়ে দিচ্ছি এবং আমার দুই স্ত্রীর মধ্যে যাকে আপনার পছন্দ হয় বলুন, আমি তাকে তালাক দেব এবং ইদ্দত শেষে আপনি তাকে বিবাহ করবেন।’ জবাবে আত্মমর্যাদাবান আব্দুর রহমান (রা.) বললেন: ‘আল্লাহ আপনার পরিবার ও সম্পদে বরকত দিন, আপনি কেবল আমাকে বাজারের পথটি দেখিয়ে দিন।’ ত্যাগের এই নজির পৃথিবীর মানব ইতিহাসে সম্পূর্ণ বিরল।

ইসলামে মুআখাত কায়েমের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহ

  • ১. সর্বহারা মুহাজিরদের পুনর্বাসন: ঘরবাড়ি, অর্থকড়ি ও ব্যবসা ফেলে রিক্তহস্তে আসা মুহাজিরদের দ্রুত সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক পুনর্বাসনের পথ সুগম করা।
  • ২. জাহেলী বংশীয় ও গোত্রীয় অহংকার চূর্ণ করা: আরবের শতবর্ষী আউস ও খাজরাজ গোত্রের রক্তক্ষয়ী শত্রুতা এবং কুরাইশদের কৃত্রিম বংশগৌরব মুছে দিয়ে তাওহীদের কালিমার ভিত্তিতে এক অভিন্ন উম্মাহ তৈরি করা। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: ‘ইন্নামাল মু’মিনূনা ইখওয়াতুন’—নিশ্চয় মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই।
  • ৩. রাষ্ট্রীয় ঐক্য ও আত্মরক্ষা নিশ্চিত করা: কুরাইশদের বহিঃআক্রমণ এবং মদিনার মুনাফিক ও ইহুদিদের চক্রান্তের মুখে নবগঠিত মুসলিম সমাজকে সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় সুদৃঢ় করা।
  • ৪. সম্পদের সুষম বণ্টন ও আত্মত্যাগের নমুনা স্থাপন: পুঁজিবাদী স্বার্থপরতা বর্জন করে অপরের প্রয়োজনে নিজের সবটুকু উজাড় করে দেওয়ার বাস্তব শিক্ষাদান। সূরা আল-হাশরের ৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ আনসারদের প্রশংসা করে বলেন:

    «وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ»

    অর্থাৎ, ‘তারা নিজেদের ওপর অন্যদের অগ্রাধিকার দেয়, যদিও তারা নিজেরা অভাবগ্রস্ত ছিল।’

  • ৫. সামাজিক সংহতি ও সংহতি তহবিলের ভিত্তি স্থাপন: রাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা না চাপিয়ে পারস্পরিক ভালোবাসা ও সহানুভূতির মাধ্যমে এক অতুলনীয় সামাজিক নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা।

উপসংহার

মুআখাতের এই বৈপ্লবিক সামাজিক দর্শন প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় বন্ধনই হলো পৃথিবীর যেকোনো সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ বা রক্তের সম্পর্কের চেয়ে বহুগুণ শক্তিশালী ও কল্যাণকর।

১৪। عرف الخمر لغة وشرعا – وما ضرره؟ بين ترتيب تحريم الخمر –

[মদের শাব্দিক ও পারিভাষিক স্বরূপ, এর বহুমুখী ক্ষতিসাধন এবং পর্যায়ক্রমিক নিষেধাজ্ঞার মনস্তাত্ত্বিক রূপরেখা]

[মান: ১০]

ভূমিকা ও পটভূমি

মাদকদ্রব্য হলো মানব সভ্যতার জন্য এক মারাত্মক অভিশাপ যা মানুষের চিন্তা ও বিবেচনাবোধকে ধ্বংস করে তাকে পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্তরে নামিয়ে আনে। ইসলাম মানুষের পাঁচটি মৌলিক অধিকার রক্ষার অঙ্গীকার করে—যার অন্যতম হলো বুদ্ধিমত্তার সুরক্ষা (হিফযুল আকল)। এই উদ্দেশ্যে ইসলাম সকল প্রকার মাদকদ্রব্যকে চূড়ান্তভাবে হারাম ঘোষণা করেছে।

الخمر-এর সংজ্ঞা

  • আভিধানিক অর্থ: ‘খামর’ (الخمر) শব্দটি ‘খামারা’ ধাতু থেকে নিষ্পন্ন, যার অর্থ আবৃত করা, ঢেকে দেওয়া বা আড়াল করা। যেহেতু নেশাগ্রস্ত অবস্থায় মানুষের বুদ্ধি-বিবেক বিলুপ্ত ও আচ্ছন্ন হয়ে যায়, তাই একে খামর বলা হয়।
  • পারিভাষিক সংজ্ঞা: রাসূলুল্লাহ (সা.) এক সার্বজনীন প্রজ্ঞাপূর্ণ সংজ্ঞায় ঘোষণা করেছেন:

    «كُلُّ مُسْكِرٍ خَمْرٌ، وَكُلُّ خَمْرٍ حَرَامٌ»

    অর্থাৎ, ‘প্রতিটি বস্তু যা মানুষের মধ্যে নেশা ও মাদকতা সৃষ্টি করে তাই মদ; আর সকল প্রকার মদই সম্পূর্ণ হারাম।’ (সহীহ মুসলিম)। কাঁচামাল আঙ্গুর, খেজুর, গম, যব বা আধুনিক রাসায়নিক হোক না কেন—নেশা উদ্রেককারী গুণ বিদ্যমান থাকলেই তা শরিয়তের দৃষ্টিতে খামর হিসেবে গণ্য হবে।

মদের বহুমুখী ক্ষতি ও বিধ্বংসী প্রভাব

  • শারীরিক ও স্নায়বিক ক্ষতি: মস্তিষ্কের কোটি কোটি স্নায়ুকোষ ধ্বংস, লিভার সিরোসিস, হৃদরোগ, পাকস্থলীর আলসার, কিডনি বিকল এবং অকাল বার্ধক্য ও মৃত্যু ডেকে আনে।
  • মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিপর্যয়: মানুষের হিতাহিত জ্ঞান, শালীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ লোপ পায়, যার ফলে মানুষ চরম উন্মাদ, আগ্রাসী ও বিবেকহীন আচরণ শুরু করে।
  • পারিবারিক ও সামাজিক ধ্বংসযজ্ঞ: মাদকাসক্তির কারণে পারিবারিক সহিংসতা, বিবাহবিচ্ছেদ, সন্তানের অবহেলা এবং খুন, ধর্ষণ, ডাকাতি ও সড়ক দুর্ঘটনার হার জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পায়। নবীজী একে ‘উম্মুল খাবায়িস’ (সকল অপকর্ম ও পাপাচারের জননী) আখ্যা দিয়েছেন।
  • আর্থিক অপচয় ও দেউলিয়াত্ব: মাদকের পেছনে বিপুল পরিমাণ অর্থ অপচয় করে ব্যক্তি ও পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ে এবং জাতীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
  • আত্মিক ও ধর্মীয় ক্ষতি: মদ পানকারীর ৪০ দিনের সালাত কবুল হয় না এবং মৃত্যুর সময় ঈমান হারানোর চরম ঝুঁকি তৈরি হয়।

কুরআনুল কারীমে মদ হারামকরণের পর্যায়ক্রমিক বিধান (ترتيب تحريم الخمر)

জাহেলী যুগে আরবরা মদ্যপানে গভীরভাবে আসক্ত ছিল। তাই ইসলাম সমাজকে রাতারাতি জোরপূর্বক আঘাত না করে চমৎকার মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতির মাধ্যমে চারটি সুনির্দিষ্ট ধাপে মদ চিরতরে নিষিদ্ধ করে:

  • প্রথম স্তর (সূরা আন-নাহল: ৬৭): ‘তোমরা খেজুর ও আঙ্গুর থেকে প্রস্তুত কর নেশার বস্তু এবং উত্তম খাদ্য।’ এতে নেশার বস্তুকে উত্তম রিজিকের বিপরীতে উল্লেখ করে এর প্রতি প্রথম মৃদু অপছন্দ প্রকাশ করা হয়।
  • দ্বিতীয় স্তর (সূরা আল-বাকারা: ২১৯): সাহাবীদের জিজ্ঞাসার জবাবে আল্লাহ বলেন: ‘লোকে আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলুন, উভয়ের মধ্যে রয়েছে মহাপাপ এবং মানুষের জন্য কিছু পার্থিব উপকারিতাও; কিন্তু এগুলোর পাপ উপকারের চেয়ে অনেক বড়।’ এই আয়াত শুনে সচেতন সাহাবীগণ মদ্যপান বর্জন করতে শুরু করেন।
  • তৃতীয় স্তর (সূরা আন-নিসা: ৪৩): এক সাহাবী মাতাল অবস্থায় নামাজ পড়াতে গিয়ে ভুল কেরাত পড়ার পর কঠোর নির্দেশ আসে:

    «يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَقْرَبُوا الصَّلَاةَ وَأَنتُمْ سُكَارَىٰ حَتَّىٰ تَعْلَمُوا مَا تَقُولُونَ»

    অর্থাৎ, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সালাতের নিকটেও যেয়ো না, যতক্ষণ না তোমরা যা বল তা বুঝতে পার।’ ফলে দিনে পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের বাধ্যবাধকতায় মানুষ দিনের বেলা মদ খাওয়া সম্পূর্ণ ছেড়ে দেয়।

  • চতুর্থ স্তর (সূরা আল-মায়েদাহ: ৯০-৯১): উহুদ যুদ্ধের পর আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে মদ্যপ অবস্থায় রক্তক্ষয়ী ঝগড়ার পর চূড়ান্ত অকাট্য নির্দেশ অবতীর্ণ হয়:

    «يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ»

    এতে মদকে শয়তানের অপবিত্র কাজ বলে চিরতরে পরিহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সাহাবীগণ আয়াতটি শোনামাত্র মুখের পাত্র মাটিতে ফেলে দেন এবং মদিনার অলিতে-গলিতে মদের বন্যা বয়ে যায়।

উপসংহার

মদের এই মনস্তাত্ত্বিক পর্যায়ক্রমিক সংস্কার প্রমাণ করে যে, ইসলাম চরম বাস্তববাদী ও বিজ্ঞানসম্মত নীতিমালার ওপর প্রতিষ্ঠিত এক ভারসাম্যপূর্ণ ঐশী ধর্ম।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

ফাযিল ১ম বর্ষ তাফসীরুল কুরআন ২০২১ পরীক্ষার বিষয় কোড কত ছিল?

বিষয় কোড ছিল ১০১ এবং পূর্ণমান ১০০ নম্বর। সময় ৩ ঘণ্টা।

বিয়ের প্রস্তাবের সময় পাত্রীর কতটুকু অংশ দেখা মুস্তাহাব?

জমহুর উলামাদের মতে কেবল মুখমণ্ডল ও দুই হাতের কবজি পর্যন্ত দেখা জায়েজ।

কুরআন কি মানুষের প্রচলিত কবিতা বা পদ্য?

না, কুরআন কোনো মানবীয় কবিতা বা সাধারণ গদ্য নয়; এটি স্বয়ং আল্লাহর অনন্য অলৌকিক কালাম।

হযরত সাবিত ইবনে কায়স (রা.) কেন ঘরে দরজা বন্ধ করে কেঁদেছিলেন?

সূরা হুজুরাতে নবীর সামনে কণ্ঠস্বর উঁচু করার ভর্ৎসনা শুনে তিনি নিজের আমল বরবাদের ভয়ে কেঁদেছিলেন।

‘রিবা আন-নাসিআহ’ বলতে কী বোঝায়?

ঋণের মেয়াদের বিপরীতে অতিরিক্ত মুনাফা গ্রহণ করা, যা কুরআনের অকাট্য দলীলে হারাম।

মদিনায় ঐতিহাসিক ‘মুআখাত’ কাদের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছিল?

মক্কা থেকে হিজরতকারী মুহাজির এবং মদিনার স্থানীয় আনসার সাহাবীদের মধ্যে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *