ফাযিল (স্নাতক) পাস প্রথম বর্ষ পরীক্ষা – ২০২৩
বিষয়: উলূমুল কুরআন ওয়াল হাদীস (প্রথম পত্র) : তাফসীরুল কুরআন (বিষয় কোড: ১০১)
সময় : ৩ ঘণ্টা | পূর্ণমান : ১০০
[الملاحظة : اجب عن اثنين من مجموعة (الف) و (ج) و (د) وعن واحد من مجموعة (ب) -]
[দ্রষ্টব্য : (الف), (ج) ও (د) অংশ থেকে দুটি করে এবং (ب) অংশ থেকে একটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন অনুষ্ঠিত ফাযিল স্নাতক (পাস) প্রথম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৩-এর উলূমুল কুরআন ওয়াল হাদীস ১ম পত্র (বিষয় কোড: ১০১ – তাফসীরুল কুরআন) পরীক্ষার মূল প্রশ্নপত্রের প্রতিটি প্রশ্নের প্রামাণ্য ও বিস্তারিত সমাধান নিচে দেওয়া হলো। তাফসিরে জালালাইন, রওয়ায়েউল বায়ান ফী তাফসিরি আয়াতিল আহকাম ও উলূমুল কুরআনের মূলনীতি অনুসারে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর সমৃদ্ধ ও সুবিন্যস্তভাবে রচিত হয়েছে।
১। يايها الذين آمنوا لا تدخلوا بيوتا غير بيوتكم حتى تستأنسوا أي تستأذنوا وتسلموا على أهلها فيقول الواحد السلام عليكم أأدخل كما ورد في حديث ذلكم خير لكم من الدخول بغير استئذان لعلكم تذكرون بإدغام التاء الثانية في الذال خيريته فتعملون به – فإن لم تجدوا فيها أحدا يأذن لكم فلا تدخلوها حتى يؤذن لكم وإن قيل لكم بعد الاستئذان ارجعوا فارجعوا هو أي الرجوع أزكى أي خير لكم من القعود على الباب والله بما تعملون من الدخول بإذن وغير إذن عليم فيجازيكم عليه – ليس عليكم جناح أن تدخلوا بيوتا غير مسكونة فيها متاع أي منفعة لكم باستكنان وغيره كبيوت الربط والخانات المسبلة والله يعلم ما تبدون تظهرون وما تكتمون تخفون –
[সূরা আন-নূর: ২৭-২৯ আয়াতসমূহের তাফসীরসহ অনুবাদ ও সংশ্লিষ্ট প্রশ্নাবলির সমাধান]
[মান: ২০]
ভূমিকা ও প্রেক্ষাপট
ইসলাম মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও গৃহের পবিত্রতা রক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছে। জাহেলী যুগে আরবরা অনুমতি ব্যতিরেকেই অন্যের গৃহে প্রবেশ করত, যার ফলে বহু পারিবারিক বিপর্যয় ঘটত। আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে কারো গৃহে প্রবেশের পূর্বে অনুমতি নেওয়া (ইস্তিজান) এবং গৃহবাসীকে সালাম দেওয়ার বিধান অলঙ্ঘনীয় অনুশাসন হিসেবে প্রবর্তন করেন।
মূল আয়াতাংশের বঙ্গানুবাদ
হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের গৃহ ব্যতীত অন্যের গৃহে প্রবেশ করো না, যে পর্যন্ত না অনুমতি গ্রহণ কর এবং গৃহবাসীদের সালাম দাও। এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয়, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর। অতঃপর যদি তোমরা সেখানে কাউকে না পাও, তবে অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত তাতে প্রবেশ করো না। আর যদি তোমাদের বলা হয় ‘ফিরে যাও’, তবে ফিরে যাবে; এটাই তোমাদের জন্য অধিকতর পবিত্র। আর তোমরা যা কর আল্লাহ সে বিষয়ে সবিশেষ অবহিত। যে ঘরে কেউ বাস করে না এবং যাতে তোমাদের কোনো সামগ্রী বা উপকার রয়েছে, এমন গৃহে প্রবেশ করায় তোমাদের কোনো পাপ নেই। আর তোমরা যা প্রকাশ কর এবং যা গোপন কর আল্লাহ তা জানেন।
শাব্দিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ
| শব্দ | মূল রূপ ও পদ | আভিধানিক অর্থ | তাফসীরি তাৎপর্য |
|---|---|---|---|
| تَسْتَأْنِسُوا | أ – ن – س (ইস্তिफ’আল) | অনুমতি প্রার্থনা করা, পরিচিত হওয়া | তাফসিরে জালালাইনে এর অর্থ করা হয়েছে ‘তাস্তা’যিনূ’ (অনুমতি চাওয়া)। |
| تُسَلِّمُوا | س – ل – م (তাফঈল) | সালাম প্রদান করা | প্রবেশের পূর্বে গৃহবাসীর জন্য শান্তির দোয়া করা। |
| أَزْكَى | ز – ك – و (তাফদীল) | অধিকতর পবিত্র ও বরকতময় | গৃহকর্তার প্রত্যাখ্যানে মন খারাপ না করে ফিরে যাওয়াই অন্তরের জন্য অধিক পবিত্র। |
| مَتَاعٌ | م – ت – ع (ইসম) | উপকার, সাময়িক আসবাব বা প্রয়োজন | জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত বিশ্রামাগার বা সরাইখানায় প্রবেশের সুযোগ। |
(الف) আলোচ্য আয়াতের শানে নুযূল
মুফাসসিরগণ এই আয়াতের অবতরণের প্রেক্ষাপটে উল্লেখ করেন যে, বনু নাজ্জার গোত্রের এক আনসারী নারী রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে আরজ করলেন: ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমি নিজ গৃহে এমন অবস্থায় থাকি যখন পিতা বা পুত্রের সামনেও আমি সে অবস্থায় থাকা পছন্দ করি না। কিন্তু আমার গৃহের পুরুষগণ আমার কোনো পূর্বানুমতি ব্যতিরেকেই হুট করে ঘরে ঢুকে পড়ে। এমতাবস্থায় আমি কী করব?’ তখন আল্লাহ তাআলা এই আয়াত নাজিল করে অন্যের গৃহে প্রবেশের জন্য অনুমতি গ্রহণ ও সালাম দেওয়াকে বাধ্যতামূলক করে দেন।
(ب) সালামের অর্থ এবং অন্যের গৃহে প্রবেশের ক্ষেত্রে ইস্তিজানের শরয়ী বিধান
- সালামের অর্থ: ‘আস-সালাম’ আল্লাহর অন্যতম গুণবাচক নাম, যার অর্থ পরম শান্তিদাতা। পারিভাষিক অর্থে সালাম হলো কোনো মুসলমানের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের সার্বিক নিরাপত্তা, শান্তি ও রহমতের দোয়া করা।
- ইস্তিজানের পদ্ধতি ও সংখ্যা: কারো গৃহে প্রবেশের পূর্বে সর্বোচ্চ তিনবার অনুমতি চাইতে হবে। রাসূল (সা.) বলেছেন: ‘অনুমতি চাওয়ার সংখ্যা হলো তিনবার; যদি অনুমতি দেওয়া হয় তবে প্রবেশ করবে, অন্যথায় ফিরে যাবে।’ (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)। অনুমতি চাওয়ার সুন্নত নিয়ম হলো দরজার মুখোমুখি না দাঁড়িয়ে ডানে বা বামে দাঁড়ানো এবং বলা: ‘আস-সালামু আলাইকুম, আমি কি ভেতরে আসতে পারি?’
- ফিরে যাওয়ার মানসিকতা: গৃহকর্তা যদি কোনো কারণে সাক্ষাতে অপারগতা প্রকাশ করে এবং ফিরে যেতে বলে, তবে কোনো রাগ বা অসন্তোষ প্রকাশ না করে খুশিমনে ফিরে আসাই কুরআনের বিধান।
উপসংহার
গৃহের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষার এই অনুপম বিধান মানবসমাজের পারস্পরিক সম্মান ও সামাজিক পবিত্রতার এক অতুলনীয় নিশ্চয়তা প্রদান করে।
২। يس والقرآن الحكيم المحكم بعجيب النظم وبديع المعاني – إنك يا محمد لمن المرسلين – على متعلق بما قبله صراط مستقيم أي طريق الأنبياء قبلك التوحيد والهدى والتأكيد بالقسم وغيره رد لقول الكفار له لست مرسلا – تنزيل العزيز في ملكه الرحيم بخلقه خبر مبتدأ مقدر أي القرآن – لتنذر به قوما متعلق بتنزيل ما أنذر آباؤهم أي لم ينذروا في زمن الفترة فهم أي القوم غافلون عن الإيمان والرشد – لقد حق القول وجب على أكثرهم فهم لا يؤمنون أي الأكثر –
[সূরা ইয়াসীন: ১-৭ আয়াতসমূহের তাফসীরসহ অনুবাদ ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ]
[মান: ২০]
ভূমিকা ও পটভূমি
সূরা ইয়াসীন মাক্কী জীবনের মধ্যভাগে অবতীর্ণ এক আলোকোজ্জ্বল সূরা। মক্কার কাফেররা যখন বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুওয়াতকে প্রকাশ্যভাবে অস্বীকার করে অপপ্রচার চালাচ্ছিল, তখন মহান আল্লাহ হিকমতপূর্ণ কুরআনের শপথ করে নবীজীর সত্যতা ও রিসালাতকে অকাট্যভাবে প্রমাণ করার জন্য এই আয়াতসমূহ অবতীর্ণ করেন।
মূল আয়াতাংশের বঙ্গানুবাদ
ইয়াসীন। বিজ্ঞানময় কুরআনের শপথ! নিশ্চয় আপনি রাসুলগণের অন্তর্ভুক্ত। এক সরল ও সঠিক পথের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই কুরআন পরাক্রমশালী পরম দয়ালু আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ; যাতে আপনি এমন এক জাতিকে সতর্ক করতে পারেন, যাদের পিতৃপুরুষদের সতর্ক করা হয়নি, ফলে তারা উদাসীন ও গাফেল রয়ে গেছে। অবশ্যই তাদের অধিকাংশের ওপর এই শাস্তির কথা অবধারিত হয়ে গেছে; ফলে তারা বিশ্বাস স্থাপন করবে না।
শাব্দিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ
| শব্দ | রূপ ও বিশ্লেষণ | আভিধানিক অর্থ | তাফসীরি তাৎপর্য |
|---|---|---|---|
| يس | হুরুফে মুকাত্তা’আত | ইয়াসীন (রহস্যময় অক্ষর) | ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মতে হাবশী ভাষায় এর অর্থ ‘ইয়া ইনসান’ (হে মানুষ/হে মুহাম্মাদ)। |
| الْحَكِيمِ | ফাঈলুন ওযনে সিফাত | সুদৃঢ়, বিজ্ঞানময়, প্রজ্ঞাপূর্ণ | কুরআনের অনুপম অলঙ্কার ও সুবিন্যস্ত বিধিবিধানের পরিচায়ক। |
| تَنزِيلَ | মাসদার (মানসূব) | ধারাবাহিক অবতীর্ণ কালাম | ‘উহারপ’ উহ্য ফে’লের মাফউলে মুতলাক অথবা মুবতাদার খবর। |
| حَقَّ الْقَوْلُ | ফে’ল ও ফায়িল | ফয়সালা সাব্যস্ত হয়ে গেছে | কুফরির ওপর অটল থাকায় তাদের ওপর আজাব অবধারিত হওয়া। |
(الف) সিরাতে মুস্তাকীম (الصراط المستقيم)-এর পরিচয় ও তাফসীর
‘সিরাতে মুস্তাকীম’-এর মূল তাৎপর্য হলো:
- আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ: এমন একটি সরল, সুদৃঢ় ও সঠিক পথ যাতে কোনো বক্রতা, বিভ্রান্তি বা সীমালঙ্ঘন নেই।
- মুফাসসিরদের অভিমত: হযরত আলী ও ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, সিরাতে মুস্তাকীম হলো ‘কিতাবুল্লাহ’ বা পবিত্র কুরআন। হযরত জাবের (রা.) বলেন, এটি হলো ইসলাম ধর্ম। আবার কারো মতে এটি হলো পূর্ববর্তী সকল নবী-রাসূলগণের তাওহীদ ও হেদায়েতের একমাত্র রাজপথ।
- বাস্তব প্রয়োগ: রাসূলুল্লাহ (সা.) মাটিতে একটি সোজা দাগ টেনে বললেন এটি আল্লাহর পথ, আর তার ডানে-বামে বহু বাঁকা রেখা টেনে বললেন এগুলো শয়তানের পথ। অতএব নবীজীর প্রদর্শিত সুন্নাহই হলো সিরাতে মুস্তাকীম।
(ب) ‘জামানাতুল ফাতরাহ’ (زمن الفترة)-এর ব্যাখ্যা
- সংজ্ঞা: দুই পয়গম্বরের মধ্যবর্তী যে দীর্ঘ সময়কালে কোনো নবী বা রাসূলের আগমন ঘটেনি এবং পূর্ববর্তী ওহীর আলো ম্লান হয়ে গিয়েছিল, তাকে ‘জামানাতুল ফাতরাহ’ বা অবকাশকাল বলা হয়।
- ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: হযরত ঈসা (আ.) এবং বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.)-এর মাঝে প্রায় পৌনে ছয়শত বা ছয়শত বছরের ব্যবধান ছিল। এই দীর্ঘ ফাতরাতের যুগে আরব উপদ্বীপের কুরাইশরা ইব্রাহীম (আ.)-এর বিশুদ্ধ তাওহীদ হারিয়ে চরম জাহেলিয়াত, পৌত্তলিকতা ও কুসংস্কারে নিমজ্জিত হয়েছিল।
- দায়বদ্ধতা: যেহেতু তাদের নিকট দীর্ঘকাল কোনো সতর্ককারী নবী আসেননি, তাই তারা সম্পূর্ণ গাফেল ছিল। আল্লাহ তাআলা বিশ্বনবী (সা.)-কে পাঠিয়ে সেই দীর্ঘ অন্ধকার ঘুচিয়ে হেদায়েতের চূড়ান্ত প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত করেন।
উপসংহার
সূরা ইয়াসীনের প্রারম্ভিক আয়াতসমূহ বিশ্বনবী (সা.)-এর রিসালাতের পরম নির্ভরতা এবং ওহীর নির্ভুল সত্যতার এক কালজয়ী ঘোষণা।
৩। الرحمن علم القرآن خلق الإنسان علمه البيان – الشمس والقمر بحسبان – والنجم والشجر يسجدان – والسماء رفعها ووضع الميزان ألا تطغوا في الميزان وأقيموا الوزن بالقسط ولا تخسروا الميزان – والأرض وضعها للأنام فيها فاكهة والنخل ذات الأكمام والحب ذو العصف والريحان – فبأي آلاء ربكما تكذبان –
[সূরা আর-রহমান: ১-১৬ আয়াতসমূহের তাফসীরসহ অনুবাদ ও সংশ্লিষ্ট প্রশ্নাবলির সমাধান]
[মান: ২০]
ভূমিকা ও পটভূমি
সূরা আর-রহমানে আল্লাহ তাআলা মানবজাতি ও জিন জাতির প্রতি তাঁর অনন্ত অনুগ্রহ ও সৃষ্টির রহস্যময় কারিগরির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। কাফেররা যখন তাচ্ছিল্যের সুরে বলত ‘রহমান আবার কে?’, তখন আল্লাহ তাআলা স্বীয় দয়ার মহিমায় এই সূরা অবতীর্ণ করে প্রমাণ করেন যে সমগ্র সৃষ্টির অস্তিত্ব ও লালন-পালন কেবল তাঁরই রহমতের দান।
মূল আয়াতাংশের বঙ্গানুবাদ
পরম দয়াময় আল্লাহ। তিনিই শিক্ষা দিয়েছেন কুরআন। তিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষ। তাকে শিখিয়েছেন ভাব প্রকাশের ভাষা। সূর্য ও চন্দ্র আবর্তন করে সুনির্দিষ্ট হিসাবে। আর তৃণলতা ও বৃক্ষরাজি সেজদারত রয়েছে। আর তিনি আকাশকে করেছেন সমুন্নত এবং স্থাপন করেছেন দাঁড়িপাল্লা (ন্যায়নীতি); যাতে তোমরা ওজনে সীমালঙ্ঘন না কর। আর তোমরা ন্যায়ের সাথে ওজন কায়েম রাখ এবং মাপে কম দিও না। আর তিনি পৃথিবীকে স্থাপন করেছেন সকল সৃষ্টির জন্য; এতে রয়েছে ফলমূল এবং আবরণযুক্ত খেজুর গাছ। আর রয়েছে ভুষিযুক্ত শস্যদানা এবং সুগন্ধি ফুল। অতএব তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?
শাব্দিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ
| শব্দ | ধাতু ও রূপ | আভিধানিক অর্থ | তাফসীরি তাৎপর্য |
|---|---|---|---|
| الْبَيَانَ | ب – ي – ن (ইসম) | ভাব প্রকাশ ও সুস্পষ্ট কথা বলা | মনের ভাব ভাষায় রূপ দেওয়ার অনন্য মানবীয় বৈশিষ্ট্য। |
| بِحُسْبَانٍ | ح – س – ب (মাসদার) | সুনির্দিষ্ট হিসাব ও কক্ষপথ অনুযায়ী | মহাজাগতিক দিন, রাত ও ঋতু পরিবর্তনের নিখুঁত ক্যালেন্ডার। |
| النَّجْمُ | ن – ج – م (ইসম) | তৃণলতা যার কাণ্ড নেই | মুফাসসিরদের মতে কাণ্ডহীন উদ্ভিদ বা আকাশের তারকা। |
| الشَّجَرُ | ش – ج – ر (ইসম) | কাণ্ডযুক্ত বৃক্ষ | যেসব গাছ কাণ্ডের ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে থাকে। |
(الف) ‘فبأي آلاء ربكما تكذبان’ পুনরাবৃত্তির সংখ্যা ও তাৎপর্য
সূরা আর-রহমানে এই বিস্ময়কর আয়াতটি মোট ৩১ বার পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। এর অন্তর্নিহিত হিকমত ও তাৎপর্য নিম্নরূপ:
- সংখ্যার বিভাজন: ৩১ বারের মধ্যে প্রথম ৮ বার দুনিয়ার নিয়ামত ও মানব সৃষ্টি প্রসঙ্গে; পরবর্তী ৭ বার জাহান্নামের ভয়াবহ আজাব প্রসঙ্গে; পরবর্তী ৮ বার মুত্তাকীদের প্রথম দুটি জান্নাত প্রসঙ্গে; এবং শেষ ৮ বার তাদের চেয়ে নিম্নস্তরের অপর দুটি জান্নাতের বিশদ বর্ণনায় পুনরাবৃত্ত হয়েছে।
- মনস্তাত্ত্বিক কারণ: যখন কোনো দাতা ধারাবাহিকভাবে অপরিসীম উপকার করতে থাকেন, তখন প্রতিটি উপকারের পর কৃতজ্ঞতা স্মরণ করানো ভাষার এক চমৎকার অলঙ্কার (আল-ইকরার বিন নিআম)। এটি মানব ও জিন জাতিকে অবাধ্যতার পথ ছেড়ে কৃতজ্ঞ বান্দায় পরিণত হতে বাধ্য করে।
(ب) ‘النجم والشجر’-এর অর্থ এবং এদের সিজদার স্বরূপ
মুফাসসিরগণের সুচিন্তিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী:
- শাব্দিক পরিচয়: হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মতে, ‘নাজম’ (النجم) অর্থ হলো এমন সব উদ্ভিদ বা ঘাস-লতাপাতা যার কোনো শক্ত গুঁড়ি বা কাণ্ড থাকে না এবং যা মাটির সাথে লেপ্টে থাকে। আর ‘শাজার’ (الشجر) হলো এমন বৃক্ষ যা কাণ্ডের ওপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। অপর মতে নাজম দ্বারা আকাশের তারকারাজিকেও বোঝানো হয়েছে।
- সিজদার স্বরূপ: বৃক্ষ ও লতাপাতার সিজদা মানুষের মতো কপাল মাটিতে ঠেকানোর মাধ্যমে নয়; বরং তা হলো মহান আল্লাহর প্রাকৃতিক বিধানের প্রতি তাদের পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ (ইনকিয়াদ ও খুজু)। গাছপালা যেমন ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে আল্লাহর আদেশে মুকুলিত হয়, ছায়া ফেলে ও ফল দেয়—এটাই তাদের তাসবীহ ও বিনম্র সিজদা।
উপসংহার
সূরা আর-রহমানের প্রতিটি বার্তা মানবজাতিকে অহংকার পরিহার করে মহাশক্তিমান স্রষ্টার পরম অনুগত হওয়ার এক আকুল আহ্বান জানায়।
৪। أرأيت الذي يكذب بالدين بالحق والجزاء أي هل عرفته أو لم تعرفه – فذلك بتقدير هو بعد الفاء الذي يدع اليتيم أي يدفعه بعنف عن حقه – ولا يحض نفسه ولا غيره على طعام المسكين أي إطعامه نزلت في العاص بن وائل أو الوليد بن المغيرة – فويل للمصلين – الذين هم عن صلاتهم ساهون غافلون يؤخرونها عن وقتها – الذين هم يراءون في الصلوة وغيرها – ويمنعون الماعون كالإبرة والفأس والقدر والقصعة –
[সূরা আল-মাউন: ১-৭ আয়াতসমূহের তাফসীরসহ অনুবাদ ও মুনাফিকদের চরিত্রের বিশ্লেষণ]
[মান: ২০]
ভূমিকা ও পটভূমি
সূরা আল-মাউন পবিত্র কুরআনের ১০৭তম সূরা। এই সূরায় আল্লাহ তাআলা পরকালে অবিশ্বাসী এবং লোকদেখানো ইবাদতকারী মুনাফিকদের নীচ মানসিকতা ও সামাজিক অসংবেদনশীলতার কঠোর সমালোচনা করেছেন। এতে প্রমাণ করা হয়েছে যে, খাঁটি ঈমানদার হতে হলে ইবাদতের পাশাপাশি আর্তমানবতার সেবা এবং এতিম-মিসকিনের অধিকার আদায় করা অপরিহার্য।
মূল আয়াতাংশের বঙ্গানুবাদ
আপনি কি দেখেছেন তাকে, যে শেষ বিচার দিনকে অস্বীকার করে? সে তো সেই ব্যক্তি, যে এতিমকে রূঢ়ভাবে তাড়িয়ে দেয়; এবং মিসকিনকে অন্নদানে উৎসাহ প্রদান করে না। অতএব দুর্ভোগ সেইসব নামাজীর জন্য, যারা তাদের সালাত সম্পর্কে উদাসীন; যারা কেবল লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে তা করে; এবং গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় ক্ষুদ্র জিনিসপত্র প্রদানেও বিরত থাকে।
শাব্দিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ
| শব্দ | শব্দমূল ও ব্যাকরণ | আভিধানিক অর্থ | তাফসীরি তাৎপর্য |
|---|---|---|---|
| يَدُعُّ | د – ع – ع (মুদারে) | ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া | এতিমের সাথে রূঢ়, নিষ্ঠুর ও অহংকারী আচরণ করা। |
| سَاهُونَ | س – هـ – و (ইসমুল ফায়িল) | উদাসীন, অমনোযোগী | সালাতের ওয়াক্ত পার করে দেওয়া বা সালাতকে গুরুত্বহীন ভাবা। |
| يُرَاءُونَ | ر – أ – ي (মুফাআলাহ) | লোকদেখানো কাজ করে (রিয়া) | আল্লাহর সন্তুষ্টির বদলে মানুষের প্রশংসা অর্জনের হীন মানসিকতা। |
| الْمَاعُونَ | م – ع – ن (ইসম) | নিত্যপ্রয়োজনীয় ক্ষুদ্র বস্তু | প্রতিবেশীর প্রয়োজনীয় কুড়াল, ডেকচি, বালতি, লবণ ইত্যাদি সাহায্য। |
(الف) সূরা আল-মাউনের শানে নুযূল
মুফাসসিরগণ এই সূরার শানে নুযূল সম্পর্কে একাধিক ব্যক্তির উল্লেখ করেছেন:
- আসি ইবনে ওয়াইল ও ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা: কাফের সর্দার আসি ইবনে ওয়াইল বা ওয়ালীদ ইবনে মুগীরার কাছে কোনো অভাবগ্রস্ত এতিম সাহায্য চাইতে এলে তারা তাকে কঠোরভাবে ধাক্কা মেরে তাড়িয়ে দিত এবং ভর্ৎসনা করত। তাদের এই অমানবিক আচরণের প্রেক্ষিতে সূরার প্রথমাংশ নাজিল হয়।
- মদিনার মুনাফিকদের চরিত্র: সূরার শেষাংশ (সালাতে উদাসীনতা ও রিয়া) মদিনার মুনাফিকদের সম্পর্কে নাজিল হয়, যারা মুসলমানদের সামনে সালাত আদায় করত কিন্তু নির্জনে সালাত ছেড়ে দিত এবং মানুষকে দেখানোর জন্য লোকদেখানো নেক কাজের ভান করত।
(ب) ‘فويل للمصلين الذين هم عن صلاتهم ساهون’-এর তাফসীর
পবিত্র কুরআনের এই সতর্কবার্তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ:
- ‘ওয়াইল’ (ويل)-এর অর্থ: জাহান্নামের একটি অতল গহ্বর অথবা চরম ধ্বংস ও দুর্ভোগ।
- ‘عن صلاتهم’ বনাম ‘في صلاتهم’: মুফাসসিরগণ অত্যন্ত সূক্ষ্ম পার্থক্য নির্দেশ করেছেন। আল্লাহ যদি বলতেন ‘ফী সালাতিহিম সাহূন’ (সালাতের ভেতরে যারা ভুল করে), তবে সাধারণ সকল মুমিন ধ্বংস হয়ে যেত; কারণ সালাতের ভেতরে মনের অজান্তে ভুল বা খুশু ছুটে যাওয়া মানবীয় স্বভাব। কিন্তু আল্লাহ বলেছেন ‘আন সালাতিহিম’ (সালাত থেকে যারা উদাসীন)। এর অর্থ হলো:
- সালাতকে মোটেও ফরজ ও গুরুত্বপূর্ণ মনে না করা।
- সালাতের সময় পার করে অলসতাবশত বিলম্বে কাজা করে পড়া।
- সালাতের রুকন ও আরকান যথাযথভাবে আদায় না করে মুরগির ঠোকরের মতো দ্রুত শেষ করা।
উপসংহার
সূরা আল-মাউন শিক্ষা দেয় যে, নামাজ যেমন আল্লাহর হক, এতিম-মিসকিনের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন তেমনি বান্দার হক—উভয়ের সমন্বয় ছাড়া ইসলামি জীবন পূর্ণতা পায় না।
৫। وما كان لمؤمن أن يقتل مؤمنا إلا خطئا ومن قتل مؤمنا خطئا فتحرير رقبة مؤمنة ودية مسلمة إلى أهله إلا أن يصدقوا…
[রওয়ায়েউল বায়ান : সূরা আন-নিসা: ৯২ আয়াতের আলোকে হত্যা ও দিয়ত সংক্রান্ত ফিকহী বিধিবিধান]
[মান: ২০]
ভূমিকা ও পটভূমি
ইসলামে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা (হুরমাতুদ্দিমা) মৌলিক অধিকারসমূহের শীর্ষস্থানীয়। কোনো মুসলিমের পক্ষে অপর কোনো মুমিন ভাইকে হত্যা করা ঈমানের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। কিন্তু অসাবধানতাবশত সংঘটিত ভুলবশত হত্যার (কতলে খাতা) ক্ষেত্রে ইসলাম রক্তপাত বন্ধের উদ্দেশ্যে কাফফারা ও ক্ষতিপূরণের এক ভারসাম্যপূর্ণ মানবিক আইন প্রণয়ন করেছে।
(الف) হত্যার সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ এবং এদের শারঈ বিধান
- আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ: ‘কতল’ (القتل) অর্থ হলো কোনো ব্যক্তির প্রাণ নাশ করা বা তার জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দেওয়া। শরিয়তের পরিভাষায় কোনো মানুষের অবৈধ প্রাণহানি ঘটানোকে হত্যা বলে।
- হত্যার প্রকারভেদ (হানাফী মাযহাব অনুযায়ী):
- কতলে আমদ (ইচ্ছাকৃত হত্যা): ধারালো অস্ত্র বা প্রাণঘাতী বস্তু দ্বারা সুনির্দিষ্টভাবে হত্যা করার নিয়তে হত্যা করা। এর হুকুম হলো: কিসাস (মৃত্যুদণ্ড) প্রযোজ্য হবে অথবা নিহতের অভিভাবকরা ক্ষমা করলে দিয়তে মুগাল্লাজাহ (কঠোর রক্তপণ) প্রযোজ্য হবে। এতে কোনো কাফফারা নেই এবং হত্যাকারী চরম গুনাহগার হবে।
- শিবহে আমদ (ইচ্ছাকৃত হত্যার সাদৃশ্য): এমন ভারী বস্তু (যেমন বড় লাঠি বা পাথর) দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রহার করা যা দিয়ে সচরাচর মানুষ মরে না, কিন্তু আকস্মিকভাবে নিহত হয়। এর হুকুম: কিসাস ওয়াজিব হয় না, তবে কাফফারা এবং নিহতের পরিবারকে তিন বছরে পরিশোধযোগ্য কঠোর দিয়ত দিতে হবে।
- কতলে খাতা (ভুলবশত হত্যা): লক্ষ্য ছিল শিকার বা শত্রুর ওপর, কিন্তু লেগে গেল কোনো নিরাপরাধ মুসলিমের গায়ে; অথবা অজ্ঞতাবশত আঘাত করা। এর হুকুম: কিসাস নেই, তবে একজন দাস মুক্ত করার কাফফারা এবং সহজ দিয়ত (দিয়তে মুখাফফাফাহ) নিহতের পরিবারকে পরিশোধ করা ওয়াজিব।
- জারি মাজরাল খাতা (ভুলের সদৃশ হত্যা): ঘুমের ঘোরে পাশ ফিরে কারো ওপর পড়ে গিয়ে নিষ্পেষিত করে হত্যা করা। এর হুকুম কতলে খাতার অনুরূপ।
- কতল বিস-সাবাব (পরোক্ষ হত্যা): সাধারণ রাস্তায় অবৈধভাবে গর্ত খনন করে রাখা, যাতে পড়ে গিয়ে কোনো মানুষ মারা যায়। এর হুকুম: আকিলার ওপর দিয়ত ওয়াজিব হয়, তবে কাফফারা ওয়াজিব হয় না।
(ب) দিয়তের সংজ্ঞা, প্রকার ও পরিমাণ
- সংজ্ঞা: ‘দিয়াত’ (الدية) শব্দটি ‘ওয়াদিয়ুন’ ধাতু থেকে নিষ্পন্ন, যার অর্থ রক্তপণ বা আর্থিক ক্ষতিপূরণ। শরিয়তের পরিভাষায় নিহতের জীবনের বিনিময়ে হত্যাকারীর পক্ষ থেকে নিহতের উত্তরাধিকারীদের প্রদেয় সুনির্দিষ্ট অর্থ বা সম্পদকে দিয়ত বলা হয়।
- প্রকার ও পরিমাণ:
- দিয়তে মুগাল্লাজাহ (কঠোর দিয়ত): ১০০টি উট, যার মধ্যে বিভিন্ন বয়সী চার ধরনের উট (২৫টি বিনতে মাখায, ২৫টি বিনতে লাবূন, ২৫টি হিক্কাহ এবং ২৫টি জাযআহ) থাকবে।
- দিয়তে মুখাফফাফাহ (সহজ দিয়ত): ১০০টি সাধারণ উট অথবা এর সমমূল্য—১০,০০০ রৌপ্য দিরহাম কিংবা ১,০০০ স্বর্ণ দিনার। আধুনিক মুদ্রার হিসাবে নিহতের পরিবারকে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লক্ষ টাকা সমপরিমাণ অর্থ প্রদান করতে হয়।
(ج) দাসমুক্তির শর্ত এবং কার ওপর তা ওয়াজিব
- শর্তাবলি: কাফফারা হিসেবে যে গোলাম বা বাঁদী মুক্ত করা হবে তাকে অবশ্যই ঈমানদার (মুমিন) হতে হবে (رقبة مؤمنة) এবং সে সকল অঙ্গহানি থেকে মুক্ত কর্মক্ষম হতে হবে। কাফের দাস মুক্ত করলে কাফফারা আদায় হবে না। দাস না পাওয়া গেলে একাধারে দুই মাস রোজা রাখতে হবে।
- কার ওপর ওয়াজিব: এটি সরাসরি স্বয়ং হত্যাকারীর ব্যক্তিগত সম্পদের ওপর ওয়াজিব। আকিলা বা আত্মীয়স্বজন কেবল দিয়ত প্রদানে অংশ নেবে, কিন্তু কাফফারা হত্যাকারীকে একাই আদায় করতে হবে।
উপসংহার
ইসলামের এই বিধান প্রতিশোধের আগুন নিভিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং অবহেলার কারণে প্রাণহানি রোধে এক চিরন্তন ন্যায়ভিত্তিক সমাধান প্রদান করে।
৬। والسارق والسارقة فاقطعوا أيديهما جزاء بما كسبا نكالا من الله والله عزيز حكيم –
[রওয়ায়েউল বায়ান : সূরা আল-মায়েদাহ: ৩৮ আয়াতের আলোকে চুরির হদ ও হস্তকর্তন সংক্রান্ত বিশ্লেষণ]
[মান: ২০]
ভূমিকা ও পটভূমি
মানুষের জান, মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা রক্ষা করা ইসলামি শরিয়তের মৌলিক মাকাসিদসমূহের অন্যতম। চুরি একটি জঘন্য সামাজিক ব্যাধি যা অর্থনৈতিক ভিত্তিকে ধসিয়ে দেয়। আল্লাহ তাআলা সমাজে চুরি প্রতিরোধে হস্তকর্তনের মতো কঠোর দণ্ডবিধি নির্ধারণ করেছেন।
(الف) চুরির সংজ্ঞা ও হস্তকর্তনের শর্তাবলি
- আভিধানিক অর্থ: ‘সারিকাহ’ (السرقة) অর্থ হলো গোপনে কোনো বস্তু গ্রহণ করা।
- পারিভাষিক অর্থ: কোনো বিবেকবান, বালেগ ব্যক্তি কর্তৃক সুরক্ষিত স্থান (হিরয) থেকে কোনো সন্দেহ বা মালিকানা ব্যতিরেকে গোপনে নিসাব পরিমাণ অন্যের মাল আত্মসাৎ করাকে চুরি বলে।
- হস্তকর্তনের শর্তাবলি (شروط حد السرقة):
- চোরকে বালেগ ও সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন হতে হবে (নাবালেগ বা পাগলের হাত কাটা যাবে না)।
- চুরিকৃত মাল সংরক্ষিত স্থানে (হির্য—যেমন সিন্দুক বা তালাবদ্ধ ঘর) থাকতে হবে।
- চুরিকৃত মালের মূল্য নিসাব পরিমাণ হতে হবে (হানাফী মাযহাবে ন্যূনতম ১০ দিরহাম সমমূল্যের সম্পদ)।
- মালের মধ্যে চোরের কোনো মালিকানা বা অংশীদারিত্বের সন্দেহ থাকা চলবে না (যেমন পিতার মাল থেকে সন্তানের চুরি)।
- চুরির ঘটনা দুজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষীর সাক্ষ্য বা চোরের নিজস্ব স্বীকারোক্তি দ্বারা আদালতে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হতে হবে। দুর্ভিক্ষের সময় খাদ্যের চুরিতে হাত কাটা যাবে না।
(ب) কখন এবং কোন স্থান থেকে হাত কাটা হবে
- হস্তকর্তনের স্থান: কুরআনের ‘ফাখতাউ আইদিয়াহুমা’ নির্দেশের আলোকে সুন্নাহ ও ইজমার ফয়সালা হলো—চোরের হাত ডান হাতের কবজি (مفصل الكف) থেকে কর্তন করা হবে। কনুই বা কাঁধ থেকে নয়।
- পুনরাবৃত্তির বিধান: প্রথমবার চুরির অপরাধে ডান হাতের কবজি কাটা হবে। যদি সে পুনরায় চুরি করে তবে বাম পায়ের গোড়ালি থেকে কাটা হবে। তৃতীয়বার চুরি করলে ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে তাকে হাত না কেটে তওবা না করা পর্যন্ত কারারুদ্ধ রাখা হবে।
(ج) আল্লাহর হদ কার্যকরে সুপারিশ করার হুকুম
- কঠোর নিষেধাজ্ঞা: চুরির মামলা বা যেকোনো হদের বিষয় যখন ইসলামি আদালতের বিচারক (কাজী)-এর কাছে উত্থাপিত হয়ে প্রমাণিত হয়ে যায়, তখন কোনো প্রকার সুপারিশ বা ক্ষমা করা সম্পূর্ণ হারাম ও নাজায়েজ।
- নবীজীর ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত: কুরাইশদের মাখযুম গোত্রের এক সম্ভ্রান্ত নারী ফাতিমা যখন চুরির দায়ে ধরা পড়ল, তখন সাহাবীগণ রাসূল (সা.)-এর প্রিয়পাত্র উসামা ইবনে যায়েদ (রা.)-কে দিয়ে সুপারিশ করতে পাঠালেন। নবীজী রাগান্বিত হয়ে বললেন: ‘হে উসামা! তুমি কি আল্লাহর নির্ধারিত হদের ব্যাপারে সুপারিশ করছ? আল্লাহর কসম! মুহাম্মাদের কন্যা ফাতেমাও যদি চুরি করত, তবে আমি স্বহস্তে তার হাত কেটে দিতাম।’ (সহীহ বুখারী)।
উপসংহার
চুরির এই কঠোর আইন কেবল অপরাধীকে শাস্তি দেয় না, বরং সমগ্র জাতির ধন-সম্পদের নিরঙ্কুশ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সমাজে স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনে।
৭। ما هي علوم القرآن؟ بين نشأة علوم القرآن وتطورها –
[উলূমুল কুরআনের সংজ্ঞা, বিষয়বস্তু এবং এর ঐতিহাসিক উদ্ভব ও ক্রমবিকাশের রূপরেখা]
[মান: ১০]
ভূমিকা
উলূমুল কুরআন হলো ইসলামি জ্ঞানভাণ্ডারের এমন এক সুবিশাল শাখা যা স্বয়ং আল্লাহর বাণী কুরআনে কারীমকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। কুরআন মাজীদের নাজিলের পদ্ধতি, সংরক্ষণ, সংকলন, তেলাওয়াত, তাফসীর ও বিধানাবলী অনুধাবনের জন্য উলূমুল কুরআন এক অপরিহার্য নিয়ামক।
علوم القرآن-এর পারিভাষিক পরিচয়
- আভিধানিক অর্থ: ‘উলূম’ (علوم) শব্দটি ‘ইলম’-এর বহুবচন যার অর্থ বহুবিধ জ্ঞান বা বিজ্ঞান। আর কুরআন হলো আল্লাহর কালাম।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: আল্লামা বদরুদ্দীন যারকাশী ও ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.)-এর মতে: ‘উলূমুল কুরআন হলো সেইসব জ্ঞানের সমষ্টি যা কুরআনের অবতরণ, সংকলন, বিন্যাস, মাক্কী ও মাদানী নির্ধারণ, আসবাবে নুযূল, নাসিখ ও মানসূখ, মুহকাম ও মুতাশাবিহ, ই’জায, কেরাত এবং তাফসীর পদ্ধতির সাথে সংশ্লিষ্ট।’
উলূমুল কুরআনের ঐতিহাসিক উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ
উলূমুল কুরআনের বিকাশ ধারাকে তিনটি প্রধান পর্যায়ে ভাগ করা যায়:
- প্রাথমিক যুগ (নবী ও সাহাবী যুগ): এই যুগে উলূমুল কুরআনের প্রতিটি শাখা সাহাবীদের স্মৃতিতে মৌখিকভাবে সংরক্ষিত ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে সাহাবীদের শানে নুযূল ও নাসিখ-মানসূখ শিক্ষা দিতেন। সাহাবীদের মধ্যে হযরত আলী, ইবনে আব্বাস ও ইবনে মাসউদ (রা.) এই জ্ঞানের ধারক ছিলেন।
- তাবেঈ ও সংকলন পূর্ববর্তী যুগ: প্রথম হিজরির শেষভাগে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর একক পুস্তিকা রচিত হতে থাকে। যেমন কাতাদা ও হাসান বসরী (রহ.) নাসিখ-মানসূখের ওপর এবং আবুল আসওয়াদ দুয়ালী ও ইয়াহইয়া ইবনে ইয়ামুর হরকত ও নুকতা সংযোজনের মাধ্যমে ইলমুল কেরাতের ভিত্তি স্থাপন করেন।
- স্বতন্ত্র গ্রন্থাকারে সংকলন যুগ:
- হিজরি চতুর্থ শতকে ইমাম আবু বকর ইবনুল আম্বারী (রহ.) ‘আজায়েবুল কুরআন’ রচনা করেন।
- হিজরি সপ্তম শতকে আল্লামা ইবনুল জাওযী (রহ.) ‘ফুনুনুল আফনান’ রচনা করেন।
- হিজরি অষ্টম শতকে আল্লামা বদরুদ্দীন যারকাশী (রহ.) রচিত ‘আল-বুরহান ফী উলূমিল কুরআন’ এই শাস্ত্রের প্রথম বিশ্বকোষ হিসেবে মর্যাদা পায়।
- হিজরি দশম শতকে ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.) তাঁর অমর শাহকার ‘আল-ইতকান ফী উলূমিল কুরআন’ রচনা করে এই বিজ্ঞানকে পূর্ণতার চূড়ান্ত শিখরে উন্নীত করেন।
উপসংহার
উলূমুল কুরআনের যথাযথ জ্ঞান ছাড়া কোনো আলেমের পক্ষেই পবিত্র কুরআনের গভীরত্ব ও মর্মবাণী অনুধাবন করা সম্ভব নয়।
৮। اذكر أقوال العلماء في أول ما نزل وآخر ما نزل من القرآن – وما هو الراجح عندك؟
[কুরআন মাজীদের সর্বপ্রথম ও সর্বশেষ নাযিলকৃত আয়াত সম্পর্কিত আলেমদের মতামত ও সমাধান]
[মান: ১০]
ভূমিকা
কুরআন মাজীদ ২৩ বছরের সুদীর্ঘ পরিক্রমায় ধারাবাহিকভাবে অবতীর্ণ হয়েছে। এর প্রথম কোন আয়াতটি দিয়ে ওহীর সূচনা হয়েছিল এবং জীবনের শেষ প্রান্তে কোন আয়াতটি দিয়ে ওহীর সমাপ্তি ঘটেছিল—তা জানা ইতিহাসের কালানুক্রম এবং নাসিখ-মানসূখ নির্ধারণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সর্বপ্রথম অবতীর্ণ আয়াত সম্পর্কে আলেমদের মতামত
- প্রথম মত (জমহুর উলামা ও সর্বাধিক বিশুদ্ধ): সহীহ বুখারী ও মুসলিমের প্রামাণ্য রেওয়ায়েত অনুযায়ী সর্বপ্রথম হেরা গুহায় অবতীর্ণ হয়েছে সূরা আল-আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত: ‘ইকরা বিসমি রাব্বিকাল্লাযী খালাক…’। এটিই উম্মাহর সর্বসম্মত ও চূড়ান্ত রাজেহ মত।
- দ্বিতীয় মত: জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.)-এর মতে সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়েছে সূরা আল-মুদ্দাসসিরের প্রথমাংশ: ‘ইয়া আইয়ুহাল মুদ্দাসসির, কুম ফাআনযির’।
- তৃতীয় মত: কোনো কোনো বর্ণনামতে সম্পূর্ণ সূরা হিসেবে সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়েছে সূরা আল-ফাতিহা।
- সমন্বয় ও রাজেহ মত: মূলত নবুওয়াতের সূচনা হিসেবে সর্বপ্রথম সূরা আলাক অবতীর্ণ হয়েছিল। আর ওহী সাময়িক বন্ধ (ফাতরাতুল ওহী) থাকার পর রিসালাতের প্রচারের নির্দেশ দিয়ে সর্বপ্রথম সূরা মুদ্দাসসির অবতীর্ণ হয়। সুতরাং প্রথম মতটিই সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ ও রাজেহ।
সর্বশেষ অবতীর্ণ আয়াত সম্পর্কে আলেমদের মতামত
- প্রথম মত: সূরা আল-বাকারার ২৮১ নম্বর আয়াত: ‘ওয়াততাকূ ইয়াওমান তুরজাঊনা ফীহি ইলাল্লাহ…’। ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মতে এই আয়াত নাজিলের মাত্র ৯ দিন বা ২১ দিন পর নবীজী ইন্তেকাল করেন।
- দ্বিতীয় মত: রিবার নিষিদ্ধতা সম্পর্কিত সূরা বাকারার ২৭৮ নম্বর আয়াত: ‘ইয়া আইয়ুহাল্লাযীনা আমানুত তাকুল্লাহ ওয়া যারূ মা বাকিয়া মিনার রিবা…’।
- তৃতীয় মত: সূরা আল-মায়িদার ৩ নম্বর আয়াত: ‘আল-ইয়াওমা আকমালতু লাকুম দীনাকুম…’ (বিদায় হজের দিন আরাফাতের ময়দানে অবতীর্ণ)।
- চতুর্থ মত: সূরা আন-নাসর: ‘ইযা জা-আ নাসরুল্লাহি ওয়াল ফাতহ’।
- রাজেহ মত: বিদায় হজের দিন ‘আল-ইয়াওমা আকমালতু’ অবতীর্ণ হয়ে দ্বীনের আহকাম ও হালাল-হারাম পরিপূর্ণ হয়েছিল। কিন্তু মৃত্যুর সতর্কবাণী ও তাকওয়ার স্মারক হিসেবে সর্বশেষ অবতীর্ণ আয়াত হলো সূরা বাকারার ২৮১ নম্বর আয়াত। ইমাম বুখারী ও নাসায়ী (রহ.) এই মতটিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন।
উপসংহার
প্রথম ও শেষ আয়াতের এই সুনির্দিষ্ট সংরক্ষণ প্রমাণ করে যে, আল্লাহর কিতাবের প্রতিটি অক্ষর বিশ্বস্ততম ঐতিহাসিক শৃঙ্খলে সুরক্ষিত রয়েছে।
৯। ما هو إعجاز القرآن وما هي أقوال العلماء فيه؟ بين –
[কুরআনের ই’জাযের তাৎপর্য এবং এই বিষয়ে প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদদের দৃষ্টিভঙ্গি]
[মান: ১০]
ভূমিকা
আল্লাহর প্রেরিত সকল নবীর সত্যতার সপক্ষে মুজিজা ছিল। অন্যান্য নবীদের মুজিজা ছিল নির্দিষ্ট সময়ের জন্য চাক্ষুষ, কিন্তু বিশ্বনবীর সর্বশ্রেষ্ঠ চিরন্তন মুজিজা হলো ‘আল-কুরআন’। কিয়ামত পর্যন্ত এই কিতাবের অলৌকিকত্ব অক্ষুণ্ণ থাকবে।
إعجاز القرآن-এর সংজ্ঞা
- আভিধানিক অর্থ: ‘ই’জায’ (إعجاز) শব্দের অর্থ অক্ষম বা নিরুপায় করা।
- পারিভাষিক অর্থ: এমন এক অলৌকিক বৈশিষ্ট্য যার দ্বারা প্রতিপক্ষকে সমকক্ষ কিছু রচনায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ ও অক্ষম করে সত্যের বিজয় প্রতিষ্ঠিত করা হয়। কুরআন কাফেরদের অনুরূপ একটি গ্রন্থ, দশটি সূরা কিংবা একটি ছোট্ট সূরা রচনার প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে তাদের চিরতরে অক্ষম প্রমাণ করেছে।
কুরআনের ই’জাযের স্বরূপ বিষয়ে আলেমদের দৃষ্টিভঙ্গি
কুরআনের কোন দিকটিতে মূলত ই’জায নিহিত—এ বিষয়ে আলেমদের প্রধান মতামতসমূহ নিম্নরূপ:
- ১. অনুপম সাহিত্যিক বালাগাত ও রচনাশৈলী: খাত্তাবী, বাকিল্লানী ও জুরজানী (রহ.)-এর মতে, কুরআনের ভাষা, শব্দচয়ন, ছন্দ, অলঙ্কার ও ভাবগাম্ভীর্য মানবীয় ক্ষমতার বহু ঊর্ধ্বে। জাহেলী যুগের শ্রেষ্ঠ আরব কবি ও বাগ্মীরাও এর সাহিত্যের সামনে মাথা নত করতে বাধ্য হয়েছিল।
- ২. নির্ভুল ভবিষ্যৎবাণী ও গায়েবী সংবাদ: কুরআনে রোমানদের বিজয়, বদর যুদ্ধে বিজয়, মক্কা বিজয় এবং মানব ইতিহাসের অতীত ও ভবিষ্যতের বহু অভ্রান্ত ঘটনা এমন নিখুঁতভাবে বলা হয়েছে যা একজন উম্মী নবীর পক্ষে কোনোভাবেই জানা সম্ভব ছিল না।
- ৩. শাশ্বত আইন ও সমাজবিধান: কুরআনের পারিবারিক, অর্থনৈতিক ও বিচারিক আইনসমূহ এত প্রজ্ঞাপূর্ণ যে চৌদ্দশত বছর পরও মানবজাতির সর্বাঙ্গীন শান্তির একমাত্র সমাধান।
- ৪. বৈজ্ঞানিক সত্যের বিস্ময়কর সাদৃশ্য: ভ্রূণতত্ত্ব, মহাবিশ্ব সৃষ্টি, পর্বতমালার ভূমিকা ও সমুদ্রবিজ্ঞানের যে সূক্ষ্ম তথ্য আধুনিক বিজ্ঞান আবিষ্কার করছে, তা চৌদ্দশত বছর পূর্বে কুরআনে অবিকল বিদ্যমান থাকা কুরআনের ই’জাযের আধুনিক প্রমাণ।
- ৫. সারফার অভিমত (المردود): মুতাযিলা চিন্তাবিদ নাজ্জাম বলেছিল, মানুষ কুরআনের মতো রচনা করতে সক্ষম ছিল কিন্তু আল্লাহ তাদের মেধা ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত এই ভ্রান্ত মত প্রত্যাখ্যান করে ঘোষণা করেছে যে, স্বয়ং কুরআনের সাহিত্যই অলৌকিক।
উপসংহার
কুরআনের ই’জায বহুমুখী—এর ভাষা, ভাব, তথ্য এবং বিধানের প্রতিটি ক্ষেত্রে এটি আল্লাহর সত্য কালাম হিসেবে চিরভাস্বর।
১০। تحدث عن شروط المفسرين موضحا –
[একজন যোগ্য মুফাসসিরের আবশ্যকীয় গুণাবলি ও শর্তাবলির বিশদ রূপরেখা]
[মান: ১০]
ভূমিকা
পবিত্র কালামুল্লাহর ব্যাখ্যা করা কোনো সাধারণ সাহিত্য বিশ্লেষণের মতো নয়; এটি সরাসরি মহান আল্লাহর অভিপ্রায়কে মানুষের সামনে তুলে ধরার মহা আমানত। রাসূল (সা.) সতর্ক করে বলেছেন: ‘যে ব্যক্তি জ্ঞান ছাড়া মনগড়া তাফসীর করবে, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা নির্ধারণ করে।’ তাই আল্লামা সুয়ূতী ও অন্যান্য উসূলবিদগণ মুফাসসিরের জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু শর্ত নির্ধারণ করেছেন।
একজন আদর্শ মুফাসসিরের মৌলিক শর্তাবলি
- বিশুদ্ধ আকীদা ও খোদাভীতি (صحة العقيدة والتقوى): মুফাসসিরকে বিদআত, ভ্রান্ত ফেরকা ও প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে মুক্ত হতে হবে। অন্তরে আল্লাহর ভয় না থাকলে কুরআনের মনগড়া বিকৃতি করার আশঙ্কা থাকে।
- আরবি ভাষা ও ব্যাকরণে গভীর পাণ্ডিত্য (معرفة اللغة والنحو والتصريف): কুরআন বিশুদ্ধ আরবি ভাষায় অবতীর্ণ। একটি শব্দের জবর, যের বা পেশের পরিবর্তনে কিংবা ফেলের রূপান্তরে অর্থের বিশাল পরিবর্তন ঘটে। সুতরাং নাহু ও সরফের সূক্ষ্ম নিয়মাবলি জানা অপরিহার্য।
- বালাগাত শাস্ত্রে অনন্য দখল (معرفة علوم البلاغة): কুরআনের সাহিত্যিক অলঙ্কার বোঝার জন্য তিনটি শাস্ত্র জানা আবশ্যক: ইলমুল মা’আনী (শব্দের বিন্যাস), ইলমুল বায়ান (রূপক ও উপমা) এবং ইলমুল বাদী’ (ভাষার সৌন্দর্য)।
- উসূলে ফিকহ ও ফিকহের জ্ঞান (معرفة أصول الفقه والفقه): হালাল, হারাম, আম (সাধারণ), খাস (বিশেষ), মুতলাক ও মুকাইয়্যাদ বিধান নির্ধারণে উসূলে ফিকহ অপরিহার্য।
- আসবাবে নুযূলের জ্ঞান (معرفة أسباب النزول): আয়াতের ঐতিহাসিক পটভূমি না জানলে বিধানের সঠিক প্রয়োগ উপলব্ধি করা অসম্ভব।
- নাসিখ ও মানসূখের জ্ঞান (معرفة الناسخ والمنسوخ): কোন বিধানটি রহিত হয়েছে এবং কোনটি বহাল রয়েছে তা নির্ধারণে এই জ্ঞান অপরিহার্য।
- হাদিস শাস্ত্রের বিশদ জ্ঞান (معرفة الحديث): রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ হলো কুরআনের প্রথম ও প্রধান ব্যাখ্যা। সহীহ ও যয়ীফ হাদিসের পার্থক্য জানতে হবে।
- ইলমে লাদুন্নী বা আত্মিক প্রজ্ঞা (العلم الموهوب): আমলকারী মুত্তাকী আলেমকে আল্লাহ বিশেষভাবে যে হিকমত ও গভীর বোধশক্তি দান করেন।
উপসংহার
এই যোগ্যতাগুলোর সমন্বয় ব্যতীত কারো পক্ষেই তাফসীর রচনায় হাত দেওয়া সম্পূর্ণ অনুচিত ও নিষিদ্ধ।
১১। تحدث عن أهمية الحياة الأسرية في الإسلام –
[ইসলামে পারিবারিক জীবনের গুরুত্ব, অধিকার এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ভূমিকা]
[মান: ১০]
ভূমিকা
পরিবার হলো মানব সভ্যতার মূল ভিত্তিপ্রস্তর এবং সমাজকাঠামোর প্রাথমিক দুর্গ। একটি সুশৃঙ্খল, পুণ্যবান ও শান্তিময় পরিবার ব্যবস্থার ওপরই একটি মহান জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। ইসলাম বৈরাগ্যবাদকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে বৈধ পারিবারিক জীবন যাপনকে ইবাদতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেছে।
পারিবারিক জীবনের গুরুত্বের প্রধান দিকসমূহ
- ১. নৈতিক পবিত্রতা ও ঈমানের পূর্ণতা: বিবাহ ও পরিবারের মাধ্যমে মানুষ ব্যভিচার ও অশ্লীলতা থেকে বেঁচে থাকে। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: ‘যখন কোনো বান্দা বিবাহ করে, তখন সে তার ঈমানের অর্ধেক পূর্ণ করল; অতএব বাকি অর্ধেকের জন্য সে যেন আল্লাহকে ভয় করে।’ (বায়হাকী)।
- ২. অন্তরের প্রশান্তি ও ভালোবাসার কেন্দ্র: পবিত্র কুরআনে দাম্পত্য জীবনকে আল্লাহর মহা নিদর্শন আখ্যা দিয়ে বলা হয়েছে: ‘আর তাঁর অন্যতম নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের সঙ্গিনীদের, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করতে পার এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও সহানুভূতি সৃষ্টি করেছেন।’ (সূরা আর-রূম: ২১)।
- ৩. আদর্শ বংশধর ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলা: শিশুদের নৈতিক শিক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও উন্নত চরিত্র গঠনের একমাত্র নিরাপদ বিদ্যাপীঠ হলো পরিবার। পিতামাতার মাধ্যমে সন্তানরা ঈমানের পাঠ গ্রহণ করে।
- ৪. পারস্পরিক দায়িত্ব ও অধিকারের ভারসাম্য: ইসলাম পরিবারে স্বামী, স্ত্রী, সন্তান ও পিতামাতার সুনির্দিষ্ট অধিকার নিশ্চিত করেছে। স্বামীর দায়িত্ব অর্থনৈতিক ভরণপোষণ ও নিরাপত্তা দেওয়া, আর স্ত্রীর দায়িত্ব গৃহ পরিচালনা ও সন্তানের প্রতিপালন। পিতামাতার আনুগত্যকে আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যম করা হয়েছে।
- ৫. সামাজিক শান্তি ও সংহতি: পরিবার যদি সুস্থ ও সুসংহত থাকে, তবে গোটা সমাজ অপরাধমুক্ত ও শান্তিপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরিবার ভেঙে পড়লে সমাজ নৈতিক অবক্ষয়ে নিমজ্জিত হয়।
উপসংহার
ইসলামি পারিবারিক দর্শন ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে পারস্পরিক ত্যাগ, ভালোবাসা ও শরিয়তের অনুশাসনের ওপর প্রতিষ্ঠিত, যা মানবজাতিকে ইহলৌকিক সুখ ও পারলৌকিক মুক্তির নিশ্চয়তা দেয়।
১২। عرف الخمر لغة وشرعا – وما ضرره؟ بين ترتيب تحريم الخمر –
[মদের শাব্দিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা, এর শারীরিক ও সামাজিক ক্ষতি এবং পর্যায়ক্রমিক নিষেধাজ্ঞার ইতিহাস]
[মান: ১০]
ভূমিকা
মাদকদ্রব্য মানবজাতির শারীরিক সুস্থতা, মানসিক ভারসাম্য ও নৈতিক ভিত্তিকে ধ্বংসকারী এক মারাত্মক বিষবাষ্প। ইসলামি শরিয়ত মানব বুদ্ধিবৃত্তির হেফাজতের (হিফযুল আকল) লক্ষ্যে সকল প্রকার নেশাজাতীয় দ্রব্যকে চূড়ান্তভাবে হারাম ঘোষণা করেছে।
خمر-এর সংজ্ঞা
- আভিধানিক অর্থ: ‘খামর’ (الخمر) শব্দটি ‘খামারা’ ধাতু থেকে নিষ্পন্ন, যার অর্থ ঢেকে দেওয়া বা আড়াল করা। যেহেতু মাদক মানুষের বিবেক-বুদ্ধিকে আচ্ছন্ন ও ঢেকে ফেলে, তাই একে খামর বলা হয়।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: রাসূলুল্লাহ (সা.) সার্বজনীন সংজ্ঞা দিয়ে বলেছেন: ‘কুল্লু মুসকিরিন খামরুন, ওয়া কুল্লু খামরিন হারাম’—প্রতিটি নেশা সৃষ্টিকারী বস্তুই মদ, আর সকল প্রকার মদই সম্পূর্ণ হারাম। (সহীহ মুসলিম)।
মদের ক্ষতি ও ক্ষতিকর প্রভাব
- শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি: লিভার সিরোসিস, কিডনি বিকল, মস্তিষ্কের কোষ ধ্বংস এবং স্মৃতিশক্তি লোপ পায়।
- পারিবারিক ও সামাজিক ক্ষতি: পরিবারে সহিংসতা, বিবাহবিচ্ছেদ, অপচয় এবং খুন, ধর্ষণ ও দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হলো মাদকাসক্তি। রাসূল (সা.) একে ‘উম্মুল খাবায়িস’ বা সকল পাপের জননী বলেছেন।
মদ হারামকরণের ঐতিহাসিক পর্যায়ক্রম (ترتيب تحريم الخمر)
আরবরা মদ্যপানে গভীরভাবে অভ্যস্ত থাকায় ইসলাম মনস্তাত্ত্বিক বিজ্ঞানের আলোকে চারটি ধাপে মদ নিষিদ্ধ করে:
- প্রথম ধাপ (উদাসীনতা প্রদর্শন): সূরা আন-নাহলের ৬৭ নম্বর আয়াতে মদের বিপরীতে পবিত্র রিজিককে আলাদাভাবে উল্লেখ করে ইঙ্গিত দেওয়া হয় যে মদ কোনো উত্তম খাদ্য নয়।
- দ্বিতীয় ধাপ (লাভের চেয়ে ক্ষতির আধিক্য ঘোষণা): সাহাবীদের প্রশ্নের জবাবে সূরা আল-বাকারার ২১৯ নম্বর আয়াতে বলা হলো: এতে কিছু উপকার থাকলেও এর পাপ ও ক্ষতি উপকারের চেয়ে অনেক বড়। এর ফলে বহু সচেতন সাহাবী মদ্যপান ছেড়ে দেন।
- তৃতীয় ধাপ (সালাতের ওয়াক্তে আংশিক নিষেধাজ্ঞা): এক আনসারী সাহাবীর বাড়িতে মাতাল অবস্থায় ভুল কেরাত পড়ার পর সূরা আন-নিসার ৪৩ নম্বর আয়াত নাজিল হয়: ‘মাতাল অবস্থায় তোমরা সালাতের নিকটবর্তী হয়ো না।’ ফলে দিনে পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের কারণে মদ্যপানের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।
- চতুর্থ ধাপ (চূড়ান্ত ও চিরন্তন নিষেধাজ্ঞা): উহুদ যুদ্ধের পর সাহাবীদের মধ্যে মদ্যপ অবস্থায় অপ্রীতিকর ঘটনার প্রেক্ষিতে সূরা আল-মায়েদাহর ৯০-৯১ নম্বর আয়াত অবতীর্ণ হয়: ‘নিশ্চয় মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য নির্ধারক তীর অপবিত্র শয়তানের কাজ; সুতরাং তোমরা এগুলো থেকে সম্পূর্ণরূপে বেঁচে থাক যাতে সফলকাম হতে পার।’ এই আয়াত নাজিল হওয়ার সাথে সাথে মদিনার অলিগলিতে মদের সকল মটকা ভেঙে প্লাবন বইয়ে দেওয়া হয়।
উপসংহার
পর্যায়ক্রমিক এই নিষেধাজ্ঞা প্রমাণ করে যে, ইসলাম অত্যন্ত বাস্তবিক ও বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে সমাজ সংস্কার সাধন করেছিল।
১৩। تحدث عن أهمية الأخوة الإسلامية في ضوء القرآن والسنة –
[পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামি ভ্রাতৃত্ববোধের গুরুত্ব ও বৈশিষ্ট্য]
[মান: ১০]
ভূমিকা
ইসলাম কোনো ভৌগোলিক সীমা, বর্ণ, ভাষা বা জাতীয়তাবাদের ওপর ভিত্তি করে সমাজ গড়ে তোলেনি; বরং এর ভিত্তি হলো তাওহীদের কালিমা। এই কালিমার বন্ধনে আবদ্ধ প্রতিটি মুমিন পরস্পরের ভাই—যা মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সার্বজনীন সৌভ্রাতৃত্বের প্রতীক।
কুরআনের আলোকে ইসলামি ভ্রাতৃত্ব
- মুমিনদের অভিন্ন সত্তা: সূরা আল-হুজুরাতের ১০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন: ‘ইন্নামাল মুমিনূনা ইখওয়াহ’—নিশ্চয় মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। অতএব তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও।
- আল্লাহর শ্রেষ্ঠ নিয়ামত: সূরা আলে ইমরানের ১০৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: ‘তোমরা আল্লাহর নিয়ামতের কথা স্মরণ কর, যখন তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে, অতঃপর তিনি তোমাদের অন্তরে প্রীতি সঞ্চার করলেন এবং তাঁর অনুগ্রহে তোমরা ভাই ভাই হয়ে গেলে।’
- সীসাহালা প্রাচীর: সূরা আস-সাফে ঐক্যবদ্ধ মুমিনদের সীসাঢালা প্রাচীরের সাথে তুলনা করা হয়েছে।
হাদিস শরীফের আলোকে ভ্রাতৃত্ববোধের রূপরেখা
- এক দেহের মতো অনুভূতি: সহীহ বুখারী ও মুসলিমে রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন: ‘পারস্পরিক দয়া, ভালোবাসা ও সহানুভূতিতে মুমিনদের দৃষ্টান্ত একটি দেহের ন্যায়; দেহের একটি অঙ্গ ব্যথিত হলে সমগ্র দেহ অনিদ্রা ও জ্বরে আক্রান্ত হয়।’
- পরস্পর সহযোগী ইমারত: নবীজী (সা.) স্বীয় এক হাতের আঙুল অন্য হাতের আঙুলে প্রবেশ করিয়ে বললেন: ‘এক মুমিন অন্য মুমিনের জন্য একটি ভবনের মতো, যার এক অংশ অন্য অংশকে সুদৃঢ় রাখে।’
- ঈমানের অন্যতম মাপকাঠি: রাসূল (সা.) বলেছেন: ‘তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তা-ই পছন্দ করে যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।’ (সহীহ বুখারী)।
- মদিনার মুআখাত: হিজরতের পর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে বিশ্বনবী (সা.) যে আত্মত্যাগপূর্ণ ঐতিহাসিক ভ্রাতৃত্ব কায়েম করেছিলেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে এক অতুলনীয় অনন্য নজির।
উপসংহার
ইসলামি ভ্রাতৃত্বের এই চেতনা ফিরিয়ে আনার মাধ্যমেই আজকের খণ্ডবিখণ্ড মুসলিম উম্মাহ পুনরায় তার হারানো গৌরব ও বৈশ্বিক নেতৃত্ব পুনরুদ্ধার করতে পারে।
১৪। ما معنى الجار؟ اكتب حقوق الجيران بضوء القرآن والسنة –
[প্রতিবেশীর সংজ্ঞা এবং কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে প্রতিবেশীর অধিকারসমূহের বিশদ বিবরণ]
[মান: ১০]
ভূমিকা
একটি সুস্থ, নিরাপদ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাজ গঠনে প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করা ইসলামের অন্যতম প্রধান শিক্ষা। ইসলাম কেবল আত্মীয়-স্বজনের অধিকারই নিশ্চিত করেনি, বরং পাশের ঘরে বসবাসকারী মানুষের প্রতি সদাচরণকে ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে নির্ধারণ করেছে।
প্রতিবেশীর সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ
- আভিধানিক অর্থ: ‘জার’ (الجار) শব্দের অর্থ হলো নিকটবর্তী বসবাসকারী ব্যক্তি বা প্রতিবেশী। ফকীহগণের মতে নিজ বাড়ি থেকে চতুর্দিকে চল্লিশ বাড়ি পর্যন্ত বসবাসকারী সকলেই প্রতিবেশীর অন্তর্ভুক্ত।
- কুরআনের আলোকে প্রতিবেশীর প্রকারভেদ: সূরা আন-নিসার ৩৬ নম্বর আয়াতে তিন ধরণের প্রতিবেশীর কথা বলা হয়েছে:
- তিনটি অধিকারসম্পন্ন প্রতিবেশী: যে ব্যক্তি একই সাথে মুসলিম, আত্মীয় এবং প্রতিবেশী। সে প্রতিবেশীর হক, ইসলামের হক এবং আত্মীয়তার হক—এই তিন হকের অধিকারী।
- দুটি অধিকারসম্পন্ন প্রতিবেশী: যে ব্যক্তি মুসলিম কিন্তু আত্মীয় নয়। সে প্রতিবেশীর হক ও ইসলামি ভ্রাতৃত্বের হক লাভ করবে।
- একটি অধিকারসম্পন্ন প্রতিবেশী: যে ব্যক্তি অমুসলিম প্রতিবেশী। সে ধর্মের ভিন্নতা সত্ত্বেও প্রতিবেশীর মানবিক অধিকার লাভ করবে।
কুরআন ও হাদিসের আলোকে প্রতিবেশীর প্রধান অধিকারসমূহ
- জিবরাঈল (আ.)-এর তাগিদ: সহীহ বুখারীতে রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: ‘জিবরাঈল (আ.) আমাকে প্রতিবেশীর হকের ব্যাপারে এত বেশি অসিয়ত ও তাগিদ দিচ্ছিলেন যে, আমার মনে হচ্ছিল অচিরেই তিনি প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেবেন।’
- কষ্ট না দেওয়া ঈমানের শর্ত: রাসূল (সা.) তিনবার শপথ করে বলেছেন: ‘আল্লাহর কসম সে মুমিন নয়, আল্লাহর কসম সে মুমিন নয়! জিজ্ঞেস করা হলো কে হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেন: যার অনিষ্ট ও কষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ থাকে না।’ (সহীহ বুখারী)।
- ক্ষুধার্ত প্রতিবেশীর খবর রাখা: হাদিসে এসেছে: ‘সে ব্যক্তি মুমিন নয় যে নিজে পেট পুরে খায় অথচ তার পাশেই তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে।’
- উপহার বিনিময় ও সদাচরণ: রান্না করার সময় ঝোলের পানি বাড়িয়ে দিয়ে হলেও প্রতিবেশীর বাড়িতে তরকারি পাঠানো এবং তাদের সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়ানো সুন্নত।
উপসংহার
প্রতিবেশীর অধিকার সংরক্ষণের এই ঐশী শিক্ষা বাস্তবায়নের মাধ্যমেই একটি কলহমুক্ত, শান্তিময় ও মানবিক সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
ফাযিল ১ম বর্ষ তাফসীরুল কুরআন বিষয়ের কোড ও পূর্ণমান কত?
বিষয় কোড ১০১ এবং পূর্ণমান ১০০ নম্বর। সময় ৩ ঘণ্টা।
অন্যের গৃহে প্রবেশের পূর্বে কয়বার অনুমতি চাওয়ার বিধান রয়েছে?
সুন্নাহ অনুযায়ী সর্বোচ্চ তিনবার অনুমতি চাইতে হবে; অনুমতি না মিললে ফিরে যেতে হবে।
সূরা আর-রহমানে ‘فبأي آلاء ربكما تكذبان’ কতবার এসেছে?
সূরা আর-রহমানে এই আয়াতটি মোট ৩১ বার পুনরাবৃত্ত হয়েছে।
ইসলামি শরিয়তে ভুলের বশত হত্যার (কতলে খাতা) শাস্তি কী?
নিহতের পরিবারকে দিয়তে মুখাফফাফাহ (রক্তপণ) প্রদান এবং একজন মুমিন দাস মুক্ত করা (বা ৬০টি রোজা রাখা)।
হানাফী মাযহাব অনুযায়ী চুরির হদে হস্তকর্তনের নিসাব কত?
হানাফী মাযহাব অনুযায়ী চুরিকৃত মালের মূল্য ন্যূনতম ১০ দিরহাম সমমূল্যের হতে হবে।
মদ্যপানকে ইসলামে কয়টি পর্যায়ে সম্পূর্ণ হারাম করা হয়েছে?
কুরআনে মানসিক ও সামাজিক প্রস্তুতির সুবিধার্থে মোট চারটি পর্যায়ে মদ চিরতরে হারাম করা হয়েছে।

