দিরাসাতুত তাফসীর ১ম পত্র (Dirasatut Tafsir 1st Paper) – 111005, উলূমুল কুরআন – ফাযিল পাস ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪

StudyBoi StudyBoi
September 27, 2026
১০৩ মিনিট পড়ার সময়
৫ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত পরীক্ষা
ফাযিল (স্নাতক) পাস প্রথম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪
আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ : দিরাসাতুত তাফসীর (প্রথম পত্র) : দিরাসাতুত তাফসীর-১ (বিষয় কোড: ১১১০০৫)
সময়: ৩ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ১০০
[الملاحظة : أجب عن ستة من مجموعة (أ) وعن واحد من مجموعة (ب) – والاعداد بالهامش تدل على الدرجة الكاملة -]
[দ্রষ্টব্য : (أ) অংশ থেকে ছয়টি এবং (ب) অংশ থেকে একটি প্রশ্নের উত্তর দাও। বামপাশের সংখ্যা প্রশ্নের পূর্ণমান জ্ঞাপক।]

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন অনুষ্ঠিত ফাযিল স্নাতক (পাস) প্রথম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪-এর আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের দিরাসাতুত তাফসীর ১ম পত্র (বিষয় কোড: ১১১০০৫ – দিরাসাতুত তাফসীর-১) পরীক্ষার মূল প্রশ্নপত্রের সকল প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ, প্রামাণ্য ও গবেষণাধর্মী সমাধান নিচে দেওয়া হলো। তাফসিরে জালালাইন, তাফসিরে তাবারী ও ইবনে কাসীরের আলোকে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ অ্যাকাডেমিক মানদণ্ডে সংকলিত হয়েছে।

১। الحمد لله جملة خبرية قصد بها الثناء على الله بمضمونها على أنه تعالى مالك لجميع الحمد من الخلق أو مستحق لأن يحمدوه، والله علم على المعبود بحق رب العالمين أي مالك جميع الخلق من الإنس والجن والملائكة والدواب وغيرهم، وكل منها يطلق عليه “عالم” يقال عالم الإنس وعالم الجن إلى غير ذلك – وغلب في جمعه بالياء والنون “أولي العلم” على غيرهم وهو من العلامة لأنه علامة على موجده – الرحمن الرحيم أي ذي الرحمة وهي إرادة الخير لأهله – مالك يوم الدين أي الجزاء وهو يوم القيامة –

[সূরা আল-ফাতিহা : ১-৪ আয়াতের তাফসীর জালালাইনসহ অনুবাদ এবং নামকরণের হিকমত ও তাৎপর্য]

[মান: ১৫ (অনুবাদ ৫ + ক ৫ + খ ৫)]

ভূমিকা ও পটভূমি

সূরা আল-ফাতিহা হলো পবিত্র কুরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সূচনাপর্বের সূরা। এটি ‘উম্মুল কুরআন’ বা কুরআনের মূল উৎস। এই সূরায় আল্লাহর একত্ববাদ, সার্বভৌমত্ব, অসীম রহমত, পরকালীন বিচার এবং বান্দার সার্বক্ষণিক হেদায়েত কামনার মৌলিক বিষয়সমূহ অপূর্ব সংক্ষেপণে সন্নিবেশিত হয়েছে।

মূল এবারতের প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ

‘আলহামদু লিল্লাহ’ (যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর জন্য)—এটি একটি জুমলায়ে খাবরিয়্যাহ (বিবৃতিমূলক বাক্য), এর অন্তর্নিহিত ভাব দ্বারা আল্লাহর প্রশংসা ও স্তুতি জ্ঞাপন করাই মূল উদ্দেশ্য; কেননা আল্লাহ তাআলা সৃষ্টিজগতের সকল প্রশংসার প্রকৃত মালিক এবং একমাত্র তিনিই যাবতীয় প্রশংসার যোগ্য অধিকারী। ‘আল্লাহ’ শব্দটি হলো হক্ব উপাস্যের সত্তাবাচক নাম। ‘রাব্বিল আলামীন’—অর্থাৎ মানবজাতি, জিনজাতি, ফেরেশতাকুল, জীবজন্তুসহ সমগ্র সৃষ্টিজগতের তিনি একমাত্র পালনকর্তা ও মালিক। এর প্রতিটি প্রজাতিকে স্বতন্ত্রভাবে ‘আলাম’ বলা হয়—যেমন আলমে ইনসান বা মানবজগৎ, আলমে জিন বা জিনজগৎ ইত্যাদি। ‘আলামীন’ বহুবচনে ইয়া ও নুন যোগে বিবেকবান সৃষ্টিকে অন্য সৃষ্টির ওপর প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে; আর ‘আলাম’ শব্দটি মূলত ‘আলামত’ (চিহ্ন বা নিদর্শন) থেকে গৃহীত, কারণ সৃষ্টির প্রতিটি কণা স্বীয় মহান স্রষ্টার অস্তিত্বের জীবন্ত নিদর্শন। ‘আর-রাহমানির রাহীম’—তিনি পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু; রহমত হলো স্বীয় যোগ্য বান্দার জন্য কল্যাণ ও অনুগ্রহের ঐশী ইচ্ছা। ‘মালিকি ইয়াওমিদ্দীন’—তিনি প্রতিদান দিবসের একমাত্র মালিক, আর তা হলো কিয়ামতের দিন।

(الف) ‘আল-ফাতিহা’-এর অর্থ এবং একে ‘উম্মুল কুরআন’ নামকরণের কারণ

  • ‘আল-ফাতিহা’ (الفاتحة)-এর অর্থ: ‘ফাতিহা’ শব্দটি ‘ফাতহুন’ ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার আভিধানিক অর্থ হলো উন্মোচন করা, সূচনা করা বা শুরু করা। যেহেতু মুসহাফে কুরআন সংকলনের শুরুতে এই সূরাটি লিপিবদ্ধ হয়েছে এবং নামাজের প্রতি রাকাতে এই সূরার তেলাওয়াত দিয়ে নামাজ শুরু করা হয়, তাই একে ‘ফাতিহাতুল কিতাব’ বা ‘আল-ফাতিহা’ বলা হয়।
  • ‘উম্মুল কুরআন’ (أم القرآن) নামকরণের কারণ: আরবি ভাষায় কোনো বিষয়ের মূল শিকড়, কেন্দ্রবিন্দু বা আধারকে ‘উম্ম’ (মা বা মূল ভিত্তি) বলা হয়। সমগ্র পবিত্র কুরআনের ৩০ পারা ও ১১৪টি সূরায় তাওহীদ, রিসালাত, আখিরাত, ইবাদত, পূর্ববর্তী জাতিসমূহের ইতিহাস এবং মানবজাতির হেদায়েত সংক্রান্ত যে বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার রয়েছে—তার সমস্ত মৌলিক ভাব ও দর্শন এই সংক্ষিপ্ত সাতটি আয়াতের মধ্যে বীজাকারে নিহিত রয়েছে। তাই একে ‘উম্মুল কুরআন’ ও ‘উম্মুল কিতাব’ বলা হয়।

(খ) ‘মালিকি ইয়াওমিদ্দীন’-এ ‘আদ-দ্বীন’-এর অর্থ এবং এর নামকরণের বিশেষত্ব

  • ‘আদ-দ্বীন’ (الدين)-এর অর্থ: আলোচ্য আয়াতে ‘দ্বীন’ অর্থ হলো প্রতিদান, ফলাফল ও চূড়ান্ত হিসাব-নিকাশ (الجزاء والحساب)। আরবীতে বলা হয়: ‘কামা তাদীনু তুদান’—যেমন কর্ম করবে তেমনই প্রতিদান পাবে। সুতরাং ‘ইয়াওমুদ্দীন’ অর্থ হলো কিয়ামতের প্রতিদান দিবস।
  • বিশেষভাবে কিয়ামতের দিনকে উল্লেখ করার ঐশী হিকমত: মহান আল্লাহ দুনিয়া ও পরকাল উভয় জাহানেরই নিরঙ্কুশ ও একমাত্র মালিক। তবুও বিশেষভাবে কিয়ামতের দিনের মালিকানা উল্লেখ করার কারণ হলো—পার্থিব জীবনে আল্লাহ মানুষকে সাময়িক ক্ষমতা, ধনসম্পদ ও রাজত্ব দিয়েছিলেন এবং অহংকারী শাসকেরা (যেমন নমরূদ, ফেরাউন) নিজেদের প্রভু দাবি করত। কিন্তু কিয়ামতের দিন সমগ্র সৃষ্টির সমস্ত কৃত্রিম ক্ষমতা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। আল্লাহ সেদিন বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করবেন: ‘লিমানিল মুলকুল ইয়াওম?’ (আজ রাজত্ব কার?)। সমগ্র সৃষ্টি স্তব্ধ হয়ে জবাব দেবে: ‘লিল্লাহিল ওয়াহিদিল কাহহার’ (এক পরাক্রমশালী আল্লাহর)। সেদিন আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত কারও কথা বলার বা নড়ারও ক্ষমতা থাকবে না। এই চরম সত্যটি স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্যই বিশেষভাবে ‘ইয়াওমুদ্দীন’-এর উল্লেখ করা হয়েছে।

উপসংহার

সূরা আল-ফাতিহার এই গভীর জ্ঞান বান্দাকে আল্লাহর অসীম কুদরত ও পরকালের জবাবদিহিতার সামনে মস্তক অবনত করার চিরন্তন শিক্ষা দেয়।

২। الم الله اعلم بمراده بذلك – ذلك أى هذا الكتاب الذى يقرؤه محمد صلى الله عليه وسلم لا ريب لا شك فيه انه من عند الله، وجملة النفى خبر مبتدأ ذلك، والاشارة به للتعظيم هدى خبر ثانى، اى، هاد للمتقين الصائرين الى التقوى بامتثال الاوامر واجتناب النواهى، لاتقائهم بذلك النار – الذين يؤمنون يصدقون بالغيب بما غاب عنهم من البعث والجنة والنار ويقيمون الصلاة اى يأتون بها بحقوقها ومما رزقناهم اعطيناهم ينفقون فى طاعة الله –

[সূরা আল-বাকারা : ১-৩ আয়াতের তাফসীর জালালাইনসহ অনুবাদ এবং কিতাবের স্বরূপ ও মুত্তাকীদের হেদায়েত]

[মান: ১৫ (অনুবাদ ৫ + ক ৫ + খ ৫)]

ভূমিকা ও পটভূমি

সূরা আল-বাকারা হলো পবিত্র কুরআনের দীর্ঘতম ও অনন্য সূরা। সূরার প্রারম্ভেই মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের অভ্রান্ততা, অলৌকিকত্ব এবং কারা এই মহাগ্রন্থ থেকে প্রকৃত হেদায়েত ও আলো লাভ করতে পারবে—তাদের গুণাবলী বিশদভাবে চিত্রিত করা হয়েছে।

মূল এবারতের প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ

‘আলিফ-লাম-মীম’—আল্লাহ তাআলাই এর প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে সম্যক অবগত। ‘যালিকাল কিতাবু’—অর্থাৎ এই সেই মহাগ্রন্থ যা মুহাম্মদ (সা.) তেলাওয়াত করছেন; ‘লা রাইবা ফীহি’—এতে কোনো প্রকার সন্দেহ-সংশয় নেই যে এটি নিশ্চিতভাবেই আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। এই না-বোধক বাক্যটি ‘যালিকা’ মুক্তাদার খবর। আর এখানে দূরবর্তী ইঙ্গিতবোধক শব্দ ‘যালিকা’ ব্যবহার করা হয়েছে কিতাবের সুউচ্চ মর্যাদা ও মাহাত্ম্য প্রকাশের জন্য। ‘হুদাল লিলমুত্তাক্বীন’—এটি দ্বিতীয় খবর; অর্থাৎ যা মুত্তাকীদের জন্য পথপ্রদর্শক। মুত্তাকী হলেন তাঁরা যারা আল্লাহর যাবতীয় আদেশ পালন এবং নিষেধাবলী বর্জন করে তাকওয়ার অধিকারী হয়েছেন, যাতে এর মাধ্যমে নিজেদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করতে পারেন। ‘আল্লাযীনা ইউ’মিনূনা বিল-গায়ব’—যারা অদৃশ্যের প্রতি অন্তরে বিশ্বাস স্থাপন করে, অর্থাৎ পুনরুত্থান, জান্নাত, জাহান্নাম প্রভৃতি ইন্দ্রিয়ের আড়ালে থাকা বিষয়সমূহকে সত্য বলে মেনে নেয়; ‘ওয়া ইউক্বীমূনা আস-সালাহ’—এবং যারা সালাতের যাবতীয় হক্ব ও আরকান-আহকাম আদায় করে সালাত কায়েম করে; ‘ওয়া মিম্মা রাযাক্বনাহুম ইউনফিক্বূন’—এবং আমি তাদেরকে যে রিজিক ও ধনসম্পদ দান করেছি তা থেকে তারা আল্লাহর আনুগত্যের পথে ব্যয় করে।

(الف) আয়াতে ‘আল-কিতাব’-এর অর্থ এবং ‘যালিকা’ দ্বারা দূরবর্তী ইঙ্গিতের হিকমত

  • ‘আল-কিতাব’ (الكتاب)-এর অর্থ: এখানে ‘আল-কিতাব’ বলতে স্বয়ং সর্বশেষ আসমানী মহাগ্রন্থ পবিত্র কুরআনুল কারীম-কে বোঝানো হয়েছে, যা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর দীর্ঘ তেইশ বছর ধরে অবতীর্ণ হয়েছিল।
  • ‘যালিকা’ (ذلك) ব্যবহারের ভাষাতাত্ত্বিক রহস্য: আরবি ব্যাকরণে নিকটবর্তী বস্তুকে নির্দেশ করতে ‘হাযা’ (هذا) এবং দূরবর্তী বস্তুকে নির্দেশ করতে ‘যালিকা’ (ذلك) ব্যবহৃত হয়। কুরআন তখন দৃশ্যমান অবতীর্ণ হচ্ছিল, তাই বাহ্যত ‘হাযাল কিতাব’ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আল্লাহ ‘যালিকা’ ব্যবহার করেছেন ‘লি-তা’যীমিল মাক্বাম’ (التعظيم لعلو مرتبته)—অর্থাৎ এই কিতাবের সুউচ্চ সম্মান, আকাশচুম্বী মর্যাদা ও অলৌকিক মাহাত্ম্য প্রকাশ করার জন্য। যেন এই কিতাবের স্থান সাধারণ পার্থিব দূরত্বের বহু ঊর্ধ্বে লাওহে মাহফুজের সুউচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত।

(খ) তাফসিরে জালালাইনের আলোকে ‘হুদাল লিলমুত্তাক্বীন’-এর বিশদ ব্যাখ্যা

  • হেদায়েত কি কেবল মুত্তাকীদের জন্য? পবিত্র কুরআন মূলত সমগ্র মানবজাতির হেদায়েতের জন্য অবতীর্ণ হয়েছে (সূরা বাকারা: ১৮৫—‘হুদাল লিন্নাস’)। তবে এখানে বিশেষভাবে ‘লিলমুত্তাক্বীন’ বলার কারণ হলো—কুরআনের হেদায়েত উন্মুক্ত থাকলেও তা থেকে কেবল খোদাভীরু মুত্তাকী ব্যক্তিরাই প্রকৃত আলো, পথনির্দেশ ও বাস্তব উপকারিতা লাভ করতে পারে। যাদের অন্তরে অহংকার, জিদ ও কুপ্রবৃত্তি রয়েছে, তারা এই কুরআন পড়লেও হেদায়েত পায় না।
  • জালালাইনের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: আল্লামা জালালুদ্দীন মহল্লী (রহ.) স্পষ্ট করেছেন যে, মুত্তাকী হলেন সেই ব্যক্তি যিনি আল্লাহর যাবতীয় ফরজ-ওয়াজিব আদেশ পালন করেন এবং হারাম ও কবীরা গুনাহ থেকে নিজেকে কঠোরভাবে বাঁচিয়ে রাখেন। এই খোদাভীতিই মানুষকে সত্য গ্রহণের মানসিকতা দান করে।

উপসংহার

কুরআনের সত্যতা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এই ঐশী আলোর পরশ পেতে হলে বান্দাকে সর্বপ্রথম অন্তরের অহংকার চূর্ণ করে তাকওয়ার পোশাকে সজ্জিত হতে হবে।

৩। ختم الله على قلوبهم طبع عليها واستوثق فلا يدخلها خير وعلى سمعهم اى مواضعه فلا ينتفعون بما يسمعونه من الحق وعلى ابصارهم غشاوة غطاء فلا يبصرون الحق – ولهم عذاب عظيم قوى دائم –

[সূরা আল-বাকারা : ৬-৭ আয়াতের তাফসীর জালালাইনসহ অনুবাদ এবং কাফেরদের অন্তরে মোহর অঙ্কনের স্বরূপ]

[মান: ১৫ (অনুবাদ ৫ + ক ৫ + খ ৫)]

ভূমিকা ও পটভূমি

পবিত্র কুরআনের সূচনায় ঈমানদার মুত্তাকীদের বর্ণনার পর দ্বিতীয় পর্যায়ে কাফেরদের চরম হঠকারিতা ও তাদের অন্তরের করুণ অন্ধত্বের চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। যারা সত্যকে জেনে-শুনেও অস্বীকার করে, তাদের অন্তর কীভাবে হেদায়েত গ্রহণের অনুপযোগী হয়ে পড়ে—এই আয়াতে তা অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ভাষায় ব্যক্ত হয়েছে।

মূল এবারতের প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ

‘খাতামাল্লাহু আলা ক্বুলূবিহিম’—আল্লাহ তাদের অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছেন, অর্থাৎ অন্তরকে এমন শক্তভাবে সিলগালা ও বন্ধ করে দিয়েছেন যাতে তার ভেতরে কোনো কল্যাণ বা ঈমান প্রবেশ করতে পারে না; ‘ওয়া আলা সাম’ইহিম’—এবং তাদের কর্ণকুহরেও মোহর মেরে দিয়েছেন, ফলে তারা যে সত্য বাণী কান দিয়ে শোনে তা দ্বারা কোনো বাস্তব উপকার লাভ করতে পারে না; ‘ওয়া আলা আবসারিহিম গিশাওয়াহ’—এবং তাদের চোখের ওপর রয়েছে একটি পর্দা বা আবরণ, যার কারণে তারা সত্য ও হেদায়েতের পথ প্রত্যক্ষ করতে পারে না; ‘ওয়া লাহুম আযাবুন আযীম’—আর তাদের জন্য রয়েছে এক শক্তিশালী, চিরস্থায়ী ও অতি ভয়াবহ শাস্তি।

(الف) ‘আল-খাতম’ (الختم)-এর অর্থ এবং আয়াতটি কাদের ক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়েছিল

  • ‘আল-খাতম’ (الختم)-এর স্বরূপ: আভিধানিক অর্থ মোহর অঙ্কন করা, সিলগালা করা বা কোনো পাত্রের মুখ এমনভাবে বন্ধ করা যাতে ভেতরের জিনিস বাইরে না আসে এবং বাইরের কিছু ভেতরে না ঢোকে। শরিয়তের পরিভাষায় কোনো বান্দা যখন চরম অহংকারবশত ক্রমাগত সত্যকে প্রত্যাখ্যান করতে থাকে, তখন শাস্তিস্বরূপ আল্লাহ তার অন্তরের বিবেক ও হেদায়েতের প্রবেশদ্বার চিরতরে সিলগালা করে দেন।
  • শানে নুযূল ও কাদের ব্যাপারে নাযিল: মুফাসসিরীন কেরাম উল্লেখ করেন যে, এই আয়াতটি সুনির্দিষ্ট কিছু চরমপন্থী কাফের ও মুনাফিকদের ক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়েছিল—যাদের মধ্যে ছিল আবু জাহেল, উতবা, শায়বা এবং মদিনার ইহুদি পণ্ডিত কা’ব ইবনুল আশরাফ ও হুয়াই ইবনে আখতাব। এরা শতভাগ নিশ্চিতভাবে জানত যে মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর সত্য রাসুল, তবুও নিছক হিংসা, বংশীয় অহংকার ও পার্থিব স্বার্থে আজীবন ইসলামের চরম শত্রুতা করে গেছে। ফলে আল্লাহ তাদের অন্তরে চিরতরে মোহর মেরে দিয়েছেন।

(খ) “ولهم عذاب عظيم”-এর ব্যাকরণিক তারকীব ও তাফসীরি বিশ্লেষণ

বাক্যাংশ ব্যাকরণিক অবস্থান (তারকীব) তাফসীরি তাৎপর্য ও ব্যঞ্জনা
وَ (ওয়াও) হরফে আতিফাহ / ইস্তিনাফিয়্যাহ পূর্ববর্তী বাক্যের সাথে যুক্ত করে নতুন ফলাফল ঘোষণা।
لَهُمْ (লাহুম) জার ও মাজরুর মিলে ‘খবরে মুকাদ্দাম’ (অগ্রবর্তী খবর) শাস্তি কেবল তাদের জন্যই অবধারিত ও সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে।
عَذَابٌ (আযাবুন) ‘মুবতাদায়ে মুআখখার’ (পশ্চাদ্বর্তী উদ্দেশ্য) নাকেরাহ (অনির্দিষ্ট) হিসেবে এনে শাস্তির অসীমতা ও অকল্পনীয় ভয়াবহতা প্রকাশ করা হয়েছে।
عَظِيمٌ (আযীমুন) ‘আযাব’-এর সিফাত বা বিশেষণ জাহান্নামের শাস্তির তীব্রতা, স্থায়িত্ব ও সর্বগ্রাসী রূপকে তুলে ধরা।

উপসংহার

মানুষ যখন স্বেচ্ছায় সত্যকে অবজ্ঞা করে পাপের সাগরে নিমজ্জিত হয়, তখন আল্লাহর বিধান অনুযায়ী তার হৃদয়ে মোহর পড়ে যায়। এই আয়াত মুমিনদের সর্বদা অহংকার পরিহার করে বিনীত অন্তরে আল্লাহর হেদায়েত প্রার্থনা করার তাগিদ দেয়।

৪। سيقول السفهاء الجهال من الناس اليهود والمشركين ما ولاهم اى شيء صرف النبى صلى الله عليه وسلم والمؤمنين عن قبلتهم التى كانوا عليها فى الصلاة وهى “بيت المقدس” والاتيان بالسين الدالة على الاستقبال من الاخبار بالغيب قل لله المشرق والمغرب اى الجهات كلها فيأمر بالتوجه الى اى جهة شاء لا اعتراض عليه يهدى من يشاء هدايته الى صراط طريق مستقيم دين الاسلام –

[সূরা আল-বাকারা : ১৪২ আয়াতের তাফসীর জালালাইনসহ অনুবাদ এবং ঐতিহাসিক কিবলা পরিবর্তনের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা]

[মান: ১৫ (অনুবাদ ৫ + ক ৫ + খ ৫)]

ভূমিকা ও পটভূমি

ইসলামের ইতিহাসে কিবলা পরিবর্তন (তাহভীলে কিবলা) ছিল এক ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিপ্লব। মদিনায় হিজরতের পর প্রায় ১৬ বা ১৭ মাস মুসলমানরা বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করেছিলেন। এরপর যখন কা’বা শরীফকে চিরন্তন কিবলা ঘোষণা করা হলো, তখন ইহুদি ও কাফেরদের মধ্যে চরম বিভ্রান্তি ও প্রশ্নের ঝড় উঠল। সেই আসন্ন আপত্তির জবাবে আল্লাহ পূর্বাহ্ণেই এই আয়াত নাজিল করেন।

মূল এবারতের প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ

‘সাইয়াক্বূলুস সুফাহাউ’—মানুষের মধ্য থেকে নির্বোধ ও অজ্ঞ ব্যক্তিরা, অর্থাৎ ইহুদি ও মক্কার মুশরিকরা অচিরেই বলবে: ‘মা ওয়াল্লাহুম’—কোন জিনিসটি নবী (সা.) এবং মুমিনদেরকে তাদের পূর্বতন কিবলা থেকে ফিরিয়ে দিল যার ওপর তারা নামাজে প্রতিষ্ঠিত ছিল? (আর সেই পূর্ব কিবলা ছিল ‘বাইতুল মুকাদ্দাস’)। এখানে ভবিষ্যৎ নির্দেশক ‘সীন’ (س) ব্যবহার করা হয়েছে অদৃশ্যের সংবাদ দান করার অলৌকিক নিদর্শন হিসেবে। আপনি তাদের বলুন: ‘কুল লিল্লাহিল মাশরিক্বু ওয়াল মাগরিব’—পূর্ব ও পশ্চিম অর্থাৎ সমগ্র সৃষ্টিজগতের সমস্ত দিক একমাত্র আল্লাহরই কর্তৃত্বাধীন; অতএব তিনি যে কোনো দিকে মুখ করার নির্দেশ দেওয়ার পূর্ণ অধিকার রাখেন, তাঁর আদেশের ওপর কারও কোনো আপত্তি করার অধিকার নেই। ‘ইয়াহদী মাই ইয়াশাউ ইলা সিরাতিম মুস্তাক্বীম’—তিনি যাকে ইচ্ছা স্বীয় হেদায়েতের তাওফিক দিয়ে সরল-সঠিক পথে (দ্বীন ইসলামের ওপর) পরিচালিত করেন।

(الف) ‘আস-সুফাহা’-এর অর্থ এবং আয়াতে কাদেরকে সুফাহা বলা হয়েছে

  • ‘আস-সুফাহা’ (السفهاء)-এর অর্থ: ‘সুফাহা’ হলো ‘সাফীহ’ (سفيه)-এর বহুবচন। এর আভিধানিক অর্থ হলো বিবেকহীন, লঘুচিত্ত, অপরিণামদর্শী, অজ্ঞ ও স্থূলবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ।
  • আয়াতে উদ্দেশ্য কারা: তাফসিরে জালালাইনের ভাষ্য অনুযায়ী এখানে ‘সুফাহা’ দ্বারা প্রধানত দুটি সম্প্রদায়কে বোঝানো হয়েছে:
    • ১. মদিনার ইহুদি পণ্ডিতবর্গ: যারা কুযুক্তি দেখিয়ে বলত যে, মুহাম্মদ এতদিন আমাদের কিবলা বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামাজ পড়ে এখন নিজের পূর্বপুরুষের কা’বার দিকে ফিরে গেল, তাহলে কি তাঁর আগের নামাজগুলো বাতিল হয়ে গেল?
    • ২. মক্কার মুশরিক ও মদিনার মুনাফিকরা: যারা ইসলাম ও মুসলমানদের মধ্যে সন্দেহ ও বিশৃঙ্খলা তৈরির জন্য সর্বদা সুযোগ খুঁজত।

(খ) ঐতিহাসিক কিবলা পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট ও ঘটনাপ্রবাহ (তাহভীলে কিবলা)

  • রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আন্তরিক আকুলতা: মক্কার কা’বা ছিল হযরত ইব্রাহীম ও ইসমাঈল (আ.)-এর নির্মিত আদি কিবলা। মদিনায় হিজরতের পর রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামাজ পড়তেন, তখন তাঁর হৃদয় কা’বা শরীফের দিকে মুখ করার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠত। তিনি আকাশের দিকে বারবার গভীর প্রত্যাশায় তাকাতেন।
  • ঐতিহাসিক নির্দেশ অবতীর্ণ: হিজরি দ্বিতীয় সনের রজব বা শা’বান মাসে মদিনার বনু সালামাহ এলাকার মসজিদে নবীজী (সা.) সাহাবাদের নিয়ে যোহরের (মতান্তরে আসরের) নামাজ আদায় করছিলেন। দুই রাকাত শেষ হতেই জিবরাঈল (আ.) ওহী নিয়ে হাজির হলেন:

    «قَدْ نَرَىٰ تَقَلُّبَ وَجْهِكَ فِي السَّمَاءِ ۖ فَلَنُوَلِّيَنَّكَ قِبْلَةً تَرْضَاهَا ۚ فَوَلِّ وَجْهَكَ شَطْرَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ»

    অর্থাৎ, ‘আমি আকাশে আপনার বারবার মুখমণ্ডল ঘোরানো প্রত্যক্ষ করছি; অতএব আমি অবশ্যই আপনাকে এমন কিবলার দিকে ফিরিয়ে দিচ্ছি যা আপনি পছন্দ করেন। সুতরাং আপনি এখনই মসজিদুল হারামের দিকে মুখ ফেরান।’ (সূরা আল-বাকারা: ১৪৪)।

  • নামাজের ভেতরেই ঐতিহাসিক মোড় পরিবর্তন: রাসূলুল্লাহ (সা.) নামাজের মাঝখানেই সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে বায়তুল মুকাদ্দাসের দিক থেকে কা’বার দিকে মুখ করে বাকি দুই রাকাত পূর্ণ করলেন। সেই মসজিদটি আজও ‘মসজিদে কিবলাতাইন’ (দুই কিবলার মসজিদ) হিসেবে বিশ্বজুড়ে স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

উপসংহার

কিবলা পরিবর্তন কোনো ভৌগোলিক পরিবর্তন ছিল না; বরং এটি ছিল সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে ইয়াহুদিদের অন্ধ অনুকরণ থেকে মুক্ত করে হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর আদি তাওহীদী ঐতিহ্যে ফিরিয়ে এনে এক স্বাধীন বিশ্বজনীন স্বাতন্ত্র্য দান করার ঐশী বিপ্লব।

৫। هو الذي أنزل عليك الكتاب منه آيات محكمات واضحات الدلالة هن أم الكتاب أصله المعتمد عليه في الأحكام وأخر متشابهات لا تفهم معانيها كأوائل السور، وجعله كله محكما في قوله احكمت آيته بمعنى انه ليس فيه عيب ومتشابها في قوله كتابا متشابها بمعنى انه يشبه بعضه في الحسن والصدق فأما الذين في قلوبهم زيغ ميل عن الحق فيتبعون ما تشابه منه ابتغاء طلب الفتنة لجهلهم بوقوعهم في الشبهات واللبس وابتغاء تاويله تفسيره وما يعلم تأويله إلا الله وحده والراسخون في العلم المتمكنون في العلم مبتدأ، خبره يقولون آمنا به أي بالمتشابه أنه من عند الله ولا نعلم معناه كل من المحكم والمتشابه من عند ربنا وما يذكر أي يتعظ إلا أولوا الألباب أصحاب العقول –

[সূরা আলে ইমরান : ৭ আয়াতের তাফসীর জালালাইনসহ অনুবাদ এবং মুহকামাত, মুতাশাবিহাত ও রাসিখুন ফিল ইলমের স্বরূপ]

[মান: ১৫ (অনুবাদ ৫ + ক ৫ + খ ৫)]

ভূমিকা ও পটভূমি

পবিত্র কুরআনের আয়াতসমূহের ভাব ও ব্যাখ্যার গভীরতা অনুযায়ী আল্লাহ তাআলা এই মহাগ্রন্থকে ‘মুহকাম’ এবং ‘মুতাশাবিহ’—এই দুই ভাগে বিভক্ত করেছেন। সত্যনিষ্ঠ মুমিনদের বৈশিষ্ট্য হলো তারা মুহকাম আয়াতের ওপর আমল করে এবং মুতাশাবিহ আয়াতের ওপর অটল ঈমান আনে; পক্ষান্তরে বিপথগামীরা বিভ্রান্তি ছড়াতে মুতাশাবিহাতের পেছনে পড়ে থাকে।

মূল এবারতের প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ

তিনিই সেই সত্তা যিনি আপনার ওপর কিতাব অবতীর্ণ করেছেন; ‘মিনহু আয়াতুম মুহক্বামাতুন’—তার মধ্যে কিছু আয়াত হলো সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন অর্থবোধক; ‘হুন্না উম্মুল কিতাব’—সেগুলোই হলো কিতাবের মূল ভিত্তি এবং শরিয়তের বিধিবিধানের মূল নির্ভরযোগ্য আধার; ‘ওয়া উখারু মুতাশাবিহাত’—এবং অপরাপর কিছু আয়াত হলো রূপক বা গুঢ়ার্থবোধক, যার অর্থ সাধারণ বুদ্ধিতে বোধগম্য নয় (যেমন বিভিন্ন সূরার প্রারম্ভিক হরফে মুক্বাত্তায়াত)। অন্য আয়াতে সমগ্র কুরআনকে ‘মুহকাম’ বলা হয়েছে এই অর্থে যে এতে কোনো ত্রুটি বা অসঙ্গতি নেই; আবার ‘মুতাশাবিহ’ বলা হয়েছে এই অর্থে যে এর প্রতিটি অংশ সৌন্দর্য ও সত্যতায় পরস্পরের সাথে পূর্ণ সাদৃশ্যপূর্ণ। ‘ফা আম্মাল্লাযীনা ফী কুলূবিহিম যাইগুন’—অতঃপর যাদের অন্তরে রয়েছে বক্রতা ও সত্যবিমুখতা, তারা ফিতনা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে মুতাশাবিহ আয়াতের পেছনে লেগে থাকে, যাতে মানুষের মাঝে সংশয় ও বিভ্রান্তি ছড়ানো যায় এবং এর মনগড়া ব্যাখ্যা করা যায়; ‘ওয়া মা ইয়া’লামু তা’বীলাহূ ইল্লাল্লাহ’—অথচ এর প্রকৃত গুঢ়ার্থ একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ অবগত নয়। ‘ওয়ার-রাসিখূনা ফিল ইলম’—আর যারা জ্ঞানে সুগভীর ও মজবুত ভিত্তিসম্পন্ন (এটি মুক্তাদা, যার খবর হলো—) তারা বলে: আমরা এর ওপর অকপট ঈমান এনেছি; এর সবই (মুহকাম ও মুতাশাবিহ উভয়ই) আমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। আর বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা ব্যতীত আর কেউ উপদেশ গ্রহণ করে না।

(الف) ‘মুহকামাত’ কী এবং এদেরকে ‘উম্মুল কিতাব’ বলার কারণ

  • ‘মুহকামাত’ (محكمات)-এর সংজ্ঞা: যে সকল আয়াতের অর্থ অত্যন্ত সুস্পষ্ট, প্রকাশ্য ও দ্ব্যর্থহীন; যাতে কোনো রূপক বা ব্যাখ্যার জটিলতা নেই এবং যা থেকে সরাসরি শরিয়তের হালাল-হারাম, সালাত, সাওম, যাকাত, উত্তরাধিকার ও দণ্ডবিধির অকাট্য বিধানাবলি গৃহীত হয়—তাকে মুহকামাত বলে।
  • ‘উম্মুল কিতাব’ (أم الكتاب) বলার তাৎপর্য: ‘উম্ম’ অর্থ মূল ভিত্তি। যেহেতু এই মুহকাম আয়াতগুলোর ওপরই সমগ্র দ্বীনের ব্যবহারিক জীবন ও আইনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত এবং কোনো মুতাশাবিহ আয়াতের ব্যাখ্যা করতে হলেও এই মুহকাম আয়াতের আলোকেই করতে হয়, তাই মুহকামাতকে কিতাবের মা বা মূল ভিত্তি বলা হয়েছে।

(খ) ‘আর-রাসিখূনা ফিল ইলম’ (الراسخون في العلم)-এর পরিচয় ও গুণাবলী

  • আভিধানিক অর্থ: ‘রুসূখ’ অর্থ কোনো জমিনে শিকড় গভীরভাবে প্রোথিত ও মজবুত হওয়া। পারিভাষিক অর্থে যে সকল আলেম কুরআন ও সুন্নাহর জ্ঞানে এত গভীর প্রজ্ঞা ও স্থিরতা অর্জন করেছেন যে কোনো সংশয় বা বাতিল দর্শন তাঁদের পদস্খলন ঘটাতে পারে না।
  • মুফাসসিরগণের মতে তাঁদের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
    • ১. তাঁরা আল্লাহর কালামের কোনো আয়াতকে নিজের দুর্বল বুদ্ধি বা মনগড়া ব্যাখ্যার অধীন করেন না।
    • ২. মুতাশাবিহ আয়াতের সামনে তাঁরা বিনম্রভাবে নিজেদের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে বলেন: ‘আমান্না বিহী কুল্লুম মিন ইন্দি রাব্বিনা’ (আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি, এর সবকিছুই আমাদের রবের পক্ষ থেকে)।
    • ৩. তাঁরা অহংকার বর্জন করে আল্লাহর কাছে অবিরাম হেদায়েত প্রার্থনা করেন: ‘হে আমাদের রব! সরল পথ দেখানোর পর আমাদের অন্তরকে আপনি বক্র করে দেবেন না।’ (আলে ইমরান: ৮)।

উপসংহার

মুহকামাত হলো আমলের দিশারী, আর মুতাশাবিহাত হলো অন্তরের বিনম্র ঈমানের চূড়ান্ত পরীক্ষা। এই দুইয়ের সমন্বয়েই পূর্ণাঙ্গ ইসলামি জীবন বিকশিত হয়।

৬। لن تنالوا البر اى ثوابه وهو الجنة حتى تنفقوا مما تحبون من اموالكم وما تنفقوا من شيء فان الله به عليم فيجازى عليه – كل الطعام كان حلا لبنى اسرائيل الا ما حرم اسرائيل يعقوب على نفسه وهو الابل لما حصل له عرق النسا بالفتح والقصر فنذر ان شفى لا ياكلها فحرم عليه من قبل ان تنزل التوراة وذلك بعد ابراهيم ولم تكن على عهده حراما كما زعموا قل لهم فاتوا بالتوراة فاتلوها ليتبين صدق قولكم ان كنتم صادقين فيه، فبهتوا ولم يأتوا بها –

[সূরা আলে ইমরান : ৯২-৯৩ আয়াতের তাফসীর জালালাইনসহ অনুবাদ এবং বনি ইসরাঈল ও ইয়াকুব (আ.)-এর আত্মনিষেধাজ্ঞা]

[মান: ১৫ (অনুবাদ ৫ + ক ৫ + খ ৫)]

ভূমিকা ও পটভূমি

আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত লাভের মূল সোপান হলো মানুষের সবচেয়ে প্রিয় ও পছন্দের বস্তু আল্লাহর রাস্তায় কুরবানি করা। পাশাপাশি ইয়াহুদিরা যখন ইসলাম ও নবীজীর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলল যে নবীজী উটের গোশত ও দুধ খেয়ে ইব্রাহীমী মিল্লাতের বিরোধিতা করছেন, তখন আল্লাহ তাআলা তাওরাতের ঐতিহাসিক সত্যতা তুলে ধরে তাদের মুখের ওপর দাঁতভাঙা জবাব দান করেন।

মূল এবারতের প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ

‘লান তানালুল বিররা’—তোমরা কখনোই প্রকৃত পুণ্য (অর্থাৎ তার সওয়াব যা হলো জান্নাত) লাভ করতে পারবে না; ‘হাত্তা তুনফিক্বূ মিম্মা তুহিব্বূন’—যতক্ষণ না তোমরা তোমাদের সর্বাধিক প্রিয় ও পছন্দের ধনসম্পদ থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ব্যয় করবে। আর তোমরা যা কিছুই ব্যয় কর না কেন নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবগত, অতএব তিনি তার পূর্ণ প্রতিদান দান করবেন। ‘কুল্লুত ত্বে’আমি কানা হিল্লাল লিবানী ইসরাঈল’—খাদ্যদ্রব্যের যাবতীয় বস্তুই বনি ইসরাঈলের জন্য হালাল ও বৈধ ছিল; ‘ইল্লা মা হাররামা ইসরাঈলু আলা নাফসিহী’—তবে ইসরাঈল (হযরত ইয়াকুব আ.) স্বয়ং নিজের জন্য যা হারাম করে নিয়েছিলেন তা ব্যতীত; আর তা ছিল উটের গোশত ও দুধ। ঘটনা হলো তাঁর যখন ‘ইরকুন নিসা’ (সায়াটিকা বা বাতরোগ) হয়েছিল, তখন তিনি মানত করেছিলেন যে আল্লাহ যদি তাঁকে রোগমুক্ত করেন তবে তিনি তাঁর সবচেয়ে প্রিয় খাদ্য উটের গোশত খাওয়া ছেড়ে দেবেন। ফলে তাওরাত নাযিল হওয়ার পূর্বেই তাঁর নিজের ওপর তা হারাম হয়ে যায়। আর এই ঘটনা ঘটেছিল হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর অনেক পরে। সুতরাং ইব্রাহীম (আ.)-এর যুগে উটের গোশত হারাম ছিল না—যেমনটি ইহুদিরা মিথ্যা দাবি করত। আপনি তাদের বলুন: ‘ফাতূ বিত্তাওরাতি ফাতলূহু’—অতএব তোমরা তাওরাত কিতাব নিয়ে এসো এবং তা পাঠ করে প্রমাণ কর, যদি তোমরা তোমাদের দাবিতে সত্যবাদী হও। অতঃপর তারা হতভম্ব হয়ে গেল এবং তাওরাত নিয়ে আসতে পারল না।

(الف) ‘বনি ইসরাঈল’ কারা এবং হযরত ইসরাঈল (আ.) নিজের ওপর কী হারাম করেছিলেন?

  • ‘বনি ইসরাঈল’ (بنو إسرائيل)-এর পরিচয়: ‘ইসরাঈল’ হলো আল্লাহর বিশিষ্ট নবী হযরত ইয়াকুব (আ.)-এর উপাধি বা অপর নাম। হিব্রু ভাষায় ‘ইসরা’ অর্থ বান্দা এবং ‘ঈল’ অর্থ আল্লাহ—অর্থাৎ আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দা (আব্দুল্লাহ)। হযরত ইয়াকুব (আ.)-এর বারো পুত্রের মাধ্যমে যে বারোটি ঐতিহাসিক গোত্রের বিস্তার ঘটেছিল, তাদেরকেই ইতিহাসে ‘বনি ইসরাঈল’ বলা হয়।
  • হযরত ইসরাঈল (আ.)-এর নিজের ওপর নিষিদ্ধ বস্তু: তিনি স্বয়ং নিজের ওপর উটের গোশত ও উটের দুধ খাওয়া চিরতরে হারাম করে নিয়েছিলেন। যখন তিনি তীব্র বাতরোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী হয়েছিলেন, তখন আল্লাহর কাছে পূর্ণ সুস্থতা লাভের শুকরিয়াস্বরূপ মানত করেছিলেন যে সুস্থ হলে নিজের সবচেয়ে লোভনীয় ও প্রিয় খাদ্য উট ভক্ষণ ছেড়ে দেবেন।

(খ) “كل الطعام كان حلا لبني إسرائيل”-এর নাযিলের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

  • ইহুদিদের ধূর্ত চক্রান্ত: মদিনার ইহুদিরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বিতর্কিত করার জন্য সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করত এই বলে যে: ‘মুহাম্মদ দাবি করেন তিনি ইব্রাহীম (আ.)-এর মিল্লাতের ওপর প্রতিষ্ঠিত; অথচ তিনি উটের গোশত ও দুধ খান যা ইব্রাহীম (আ.)-এর দ্বীনে হারাম ছিল!’
  • কুরআনী চ্যালেঞ্জ ও সত্যের উন্মোচন: আল্লাহ এই আয়াত অবতীর্ণ করে ইহুদিদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন যে, তাওরাত নাযিল হওয়ার পূর্বে ইব্রাহীম (আ.)-এর শরীয়তে উটের গোশত সম্পূর্ণ হালাল ছিল। ইয়াকুব (আ.) কেবল ব্যক্তিগত মানতের কারণে তা বর্জন করেছিলেন, যা পরবর্তীতে বনি ইসরাঈলের অবাধ্যতার কারণে তাওরাতে তাদের ওপর শাস্তিস্বরূপ হারাম করা হয়েছিল। আল্লাহ বললেন—তোমাদের সৎসাহস থাকলে তাওরাত খুলে প্রমাণ দেখাও! ইহুদিরা জানত তাওরাত খুললে তাদের মিথ্যাচার ধরা পড়ে যাবে, ফলে তারা মাথা নিচু করে লাঞ্ছিত হয়ে পিছু হটল।

উপসংহার

এই আয়াত প্রমাণ করে যে, সত্য ধর্মের শিক্ষা ত্যাগ ও কুরবানিকে উৎসাহিত করে, আর বাতিলপন্থীরা সত্যকে আড়াল করতে মিথ্যা ধর্মীয় অপপ্রচারের আশ্রয় নেয়।

৭। يا ايها الناس اى اهل مكة اتقوا ربكم اى عقابه بان تطيعوه الذى خلقكم من نفس واحدة ادم وخلق منها زوجها حواء بالمد من ضلع من اضلاعه اليسرى وبث فرق ونشر منهما من ادم وحواء رجالا كثيرا ونساء كثيرة واتقوا الله الذى تساءلون فيه ادغام التاء فى الاصل فى السين وفى قراءة بالتخفيف بحذفها اى تساءلون به فيما بينكم حيث يقول بعضكم لبعض اسألك بالله وانشدك بالله واتقوا الارحام ان تقطعوها، وفى قراءة بالجر عطفا على الضمير فى به وكانوا يتناشدون بالرحم ان الله كان عليكم رقيبا حافظا لا عمالكم فيجازيكم بها اى لم يزل متصفا بذلك –

[সূরা আন-নিসা : ১ আয়াতের তাফসীর জালালাইনসহ অনুবাদ এবং মানবসৃষ্টির রহস্য, তাকওয়া ও রক্তীয় আত্মীয়তার হক]

[মান: ১৫ (অনুবাদ ৫ + ক ৫ + খ ৫)]

ভূমিকা ও পটভূমি

সূরা আন-নিসা হলো মানবজাতির পারস্পরিক অধিকার, পারিবারিক সংহতি এবং বিশেষত নারী, এতিম ও আত্মীয়স্বজনের অধিকার সুরক্ষার মহাসনদ। এই সূরার প্রথম আয়াতে সমগ্র মানবজাতিকে এক অভিন্ন পিতা-মাতা থেকে সৃষ্টির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে এক মহামানবিক ভ্রাতৃত্বের ডাক দেওয়া হয়েছে।

মূল এবারতের প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ

‘ইয়া আইয়ুহান নাস’—হে মানবসকল! অর্থাৎ হে মক্কাবাসী ও সমগ্র মানবজাতি; ‘ইত্তাক্বূ রাব্বাকুম’—তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের শাস্তি ও গযবকে ভয় কর তাঁর আনুগত্য করার মাধ্যমে; ‘আল্লাযী খালাক্বাকুম মিন নাফসিন ওয়াহিদাহ’—যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক একক ব্যক্তি অর্থাৎ আদম থেকে; ‘ওয়া খালাক্বা মিনহা যাওজাহা’—এবং তাঁর থেকেই সৃষ্টি করেছেন তাঁর সহধর্মিণী হাওয়াকে (তাঁর বাম পাঁজরের হাড় থেকে); ‘ওয়া বাচ্ছা মিনহুমা রিজালান কাসীরান ওয়া নিসাআ’—এবং তাঁদের দুজনের মাধ্যমে পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছেন অসংখ্য পুরুষ ও অগণিত নারী। ‘ওয়াত্তাক্বুল্লাহাল্লাযী তাসাআলূনা বিহী ওয়াল আরহাম’—আর তোমরা সেই আল্লাহকে ভয় কর যাঁর দোহাই দিয়ে তোমরা পরস্পরের কাছে অধিকার দাবি করে থাক (যেমন তোমরা একে অপরকে বলে থাক: আল্লাহর ওয়াস্তে আমি তোমার কাছে চাই); এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করাকে ভয় কর (অপর কেরাতে ‘আর-আরহামি’ যের দিয়ে পাঠ করা হয়েছে যা ‘বিহী’-এর যমীরের ওপর আতফ হয়েছে, অর্থাৎ তোমরা যেমন আল্লাহর কসম দাও তেমনি রক্তের সম্পর্কের দোহাই দাও)। ‘ইন্নাল্লাহা কানা আলাইকুম রাক্বীবা’—নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের ওপর সার্বক্ষণিক সতর্ক পাহারাদার ও সংরক্ষণকারী, অতএব তিনি এর পূর্ণ প্রতিফল দান করবেন।

(الف) “واتقوا الله الذي تساءلون به والأرحام”-এর তাফসীরি ব্যাখ্যা

  • ‘তাসাআলূনা বিহী’ (تساءلون به)-এর মর্ম: আরবরা তাদের পারস্পরিক লেনদেন, বিপদাপদ ও দাবি আদায়ের ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর পবিত্র নামের দোহাই দিত। আল্লাহ স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন—যাঁর নামের এতো মহিমা ও ক্ষমতা যে তাঁর নাম উচ্চারণ করলেই মানুষ অধিকার পূরণ করে, সেই মহান রবের আদেশ ও তাকওয়া রক্ষা করা তোমাদের ওপর কত বেশি ফরজ!
  • ‘আল-আরহাম’ (الأرحام)-এর তাৎপর্য ও কেরাতের বিশ্লেষণ:
    • ‘আরহাম’ হলো ‘রাহিম’ (রক্তের বন্ধন ও গর্ভাশয়)-এর বহুবচন।
    • যবরযোগে পাঠ (قراءة النصب): জমহুর কেরাত অনুযায়ী ‘ওয়াত্তাক্বুল আরহামা’—অর্থাৎ তোমরা আল্লাহকে যেমন ভয় কর, তেমনি রক্তীয় আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করাকেও সমভাবে ভয় কর। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: ‘আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সহীহ বুখারী)।
    • যেরযোগে পাঠ (قراءة الجر): হামযাহর কেরাত অনুযায়ী ‘ওয়াল আরহামি’—অর্থাৎ যার অর্থ দাঁড়ায় তোমরা পরস্পরের কাছে যেমন আল্লাহর দোহাই দাও, তেমনি রক্তের সম্পর্কের খাতিরেও পারস্পরিক সহযোগিতা কর।

(খ) তাকওয়ার আভিধানিক ও শারঈ পরিচয় এবং মুমিনের জীবনে এর সুদূরপ্রসারী সুফল

  • তাকওয়ার সংজ্ঞা: আভিধানিক অর্থ বেঁচে থাকা, আত্মরক্ষা করা বা অন্তরাল তৈরি করা। শরিয়তের পরিভাষায় আল্লাহর আযাব ও গযব থেকে বাঁচার জন্য তাঁর যাবতীয় আদেশ পালন এবং নিষেধাবলী বর্জনের মাধ্যমে অন্তরে যে সার্বক্ষণিক খোদাভীতি ও সতর্কতার দেয়াল গড়ে তোলা হয়, তাকে তাকওয়া বলে। হযরত উমর (রা.) তাকওয়াকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বলেন: কাঁটাভরা সরু পথে কাপড় গুটিয়ে অতি সাবধানে চলার নামই হলো তাকওয়া।
  • মুমিনের জীবনে তাকওয়ার সুফলসমূহ:
    • ১. সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য নিরূপণের ঐশী প্রজ্ঞা লাভ (সূরা আল-আনফাল: ২৯)।
    • ২. যাবতীয় বিপদাপদ ও জটিল সংকট থেকে অলৌকিক মুক্তি এবং অচিন্তনীয় রিজিকের ব্যবস্থা (সূরা আত-ত্বালাক্ব: ২-৩)।
    • ৩. গোনাহ মাফ হওয়া এবং আল্লাহর দরবারে শ্রেষ্ঠ মর্যাদার অধিকারী হওয়া (إن أكرمكم عند الله أتقاكم)।

উপসংহার

সমগ্র মানবজাতি রক্তে ও মূলে এক। এই বংশীয় ঐক্যের অনুভূতি এবং তাকওয়ার সচেতনতাই পারে পৃথিবীতে বর্ণবাদ, বৈষম্য ও যুদ্ধ বন্ধ করে শান্তির জান্নাত কায়েম করতে।

৮। واتل يا محمد عليهم على قومك نبأ خبر ابنى ادم هابيل وقابيل بالحق متعلق بـ “اتل” اذ قربا قربانا الى الله وهو كبش لهابيل وزرع لقابيل فتقبل من احدهما وهو هابيل بان نزلت نار من السماء فاكلت قربانه ولم يتقبل من الاخر وهو قابيل فغضب واضمر الحسد فى نفسه الى ان حج ادم قال له لاقتلنك قال لم؟ قال لتقبل قربانك دونى قال انما يتقبل الله من المتقين لئن لام قسم بسطت مددت الى يدك لتقتلنى ما انا بباسط يدى اليك لاقتلك انى اخاف الله رب العالمين فى قتلك –

[সূরা আল-মায়েদাহ : ২৭-২৮ আয়াতের তাফসীর জালালাইনসহ অনুবাদ এবং হাবিল-কাবিলের ঐতিহাসিক কাহিনী ও অনুশোচনা]

[মান: ১৫ (অনুবাদ ৫ + ক ৫ + খ ৫)]

ভূমিকা ও পটভূমি

মানব ইতিহাসের সর্বপ্রথম হত্যাকাণ্ড ও ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের মর্মান্তিক ঘটনা হলো হযরত আদম (আ.)-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের দ্বন্দ্ব। হিংসা, অহংকার ও তাকওয়ার অভাব কীভাবে মানুষকে আপন ভাইয়ের হত্যাকারীতে পরিণত করে—পবিত্র কুরআনে এই ঘটনার মাধ্যমে যুগ যুগান্তরের মানুষকে সতর্ক করা হয়েছে।

মূল এবারতের প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ

হে মুহাম্মদ! আপনি আপনার কওমের কাছে পাঠ করে শোনান আদম (আ.)-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের সত্য সংবাদ; ‘ইয ক্বাররাবা কুরবানান’—যখন তারা উভয়ে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কুরবানি পেশ করেছিল; আর তা ছিল হাবিলের পক্ষ থেকে একটি উৎকৃষ্ট দুম্বা এবং কাবিলের পক্ষ থেকে নিকৃষ্ট কিছু শস্যক্ষেতের ফসল। ‘ফাতুক্বুব্বিলা মিন আহাদিহিমা’—অতঃপর তাদের একজনের কুরবানি কবুল হলো (আর সে ছিল হাবিল; আকাশ থেকে শুভ্র অগ্নিশিখা নেমে এসে তার কুরবানি ভস্মীভূত করে কবুলিয়াতের নিদর্শন দেখাল); ‘ওয়া লাম ইউতাক্বাব্বাল মিনাল আখারি’—এবং অপরজনের কুরবানি কবুল হলো না (আর সে ছিল কাবিল; ফলে সে ক্রুদ্ধ হলো এবং অন্তরে চরম হিংসা পোষণ করল)। একপর্যায়ে আদম (আ.) যখন হজে গেলেন, তখন কাবিল হাবিলকে বলল: ‘লা আক্বতুলান্নাকা’—আমি অবশ্যই তোমাকে হত্যা করব! হাবিল বলল: কেন? কাবিল বলল: তোমার কুরবানি কবুল হয়েছে আর আমারটি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। জবাবে হাবিল বলল: ‘ইন্নামা ইয়াতাক্বাব্বালুল্লাহু মিনাল মুত্তাক্বীন’—নিশ্চয়ই আল্লাহ কেবল খোদাভীরু মুত্তাকীদের আমলই কবুল করেন। ‘লা-ইম বাসাত্বতা ইলাইয়্যা ইয়াদাকা লিতাক্বতুলানী’—যদি তুমি আমাকে হত্যা করার জন্য আমার দিকে হাত বাড়াও, তবুও ‘মা আনা বিবাসিত্বিন ইয়াদিয়া ইলাইকা লিআক্বতুলাকা’—আমি তোমাকে হত্যা করার জন্য আমার হাত বাড়াব না; ‘ইন্নী আখাফুল্লাহু রাব্বাল আলামীন’—কেননা আমি বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি।

(الف) আয়াতের সাথে সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক পটভূমি

  • আদম (আ.)-এর পরিবারের বিধান: মানববংশের সূচনালগ্নে হাওয়া (আ.)-এর প্রতি গর্ভ থেকে এক সাথে একটি ছেলে ও একটি মেয়ে (যমজ) জন্মগ্রহণ করত। শরিয়তের আদি নিয়ম অনুযায়ী এক গর্ভের ছেলের সাথে অপর গর্ভের মেয়ের বিবাহ হালাল ছিল; কিন্তু একই গর্ভের সহোদর যমজের বিয়ে নিষিদ্ধ ছিল।
  • দ্বন্দ্বের সূচনা: কাবিলের সাথে যে কন্যা (আকলিমা) জন্মগ্রহণ করেছিল সে ছিল অত্যন্ত রূপবতী, আর হাবিলের সাথে জন্ম নেওয়া কন্যা ছিল সাধারণ চেহারার। শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী আকলিমার বিয়ে হাবিলের সাথে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কাবিল অন্ধ কামনার বশে একগুঁয়েমি করে দাবি করল যে সে নিজেই নিজের রূপসী যমজ বোনকে বিবাহ করবে।
  • কুরবানির মাধ্যমে মীমাংসা: আদম (আ.) ফয়সালার জন্য উভয়কে আল্লাহর নামে কুরবানি পেশ করতে বললেন। হাবিল ছিল পশুপালক, সে তার পালের সবচেয়ে হৃষ্টপুষ্ট ও প্রিয় দুম্বাটি গভীর নিষ্ঠা ও তাকওয়া নিয়ে কুরবানি দিল। আর কৃষক কাবিল অবহেলাভরে তার ক্ষেতের কিছু পচা ও নিকৃষ্ট শস্যদানা রেখে এলো। আসমানী আগুন হাবিলের কুরবানি গ্রহণ করে তার সত্যতা ও তাকওয়া প্রমাণ করে দিল। এই পরাজয় মেনে নিতে না পেরে হিংসায় উন্মাদ হয়ে কাবিল হাবিলকে পাথর মেরে নৃশংসভাবে হত্যা করে।

(খ) কাবিল কি ভাইয়ের হত্যাকাণ্ডে অনুতপ্ত হয়েছিল? “فأصبح من النادمين”-এর অর্থ

  • কুরআনের ঘোষণা: সূরা মায়েদাহর ৩১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: ‘অতঃপর সে অনুতপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হলো’ (فأصبح من النادمين)।
  • এই অনুশোচনা কি তওবা হিসেবে গ্রহণযোগ্য ছিল?
    • মুফাসসিরীন ও উলামাদের সর্বসম্মত মতে কাবিলের এই অনুশোচনা শারঈ তওবা ছিল না। শরিয়তে তওবার শর্ত হলো আল্লাহর ভয়ে পাপের জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং ক্ষমা প্রার্থনা করা। কিন্তু কাবিলের অনুশোচনা ছিল নিছক পার্থিব ও হতাশার।
    • হত্যার পর ভাইয়ের লাশ কাঁধে নিয়ে সে যখন দিশেহারা হয়ে ঘুরছিল এবং এক কাককে অপর মৃত কাক মাটি খুঁড়ে দাফন করতে দেখল, তখন সে নিজের নির্বুদ্ধিতার জন্য লজ্জিত হয়ে বলল—হায়! আমি এই কাকের সমানও হতে পারলাম না! অর্থাৎ লাশ লুকানোর অক্ষমতা এবং পিতার ভীতি থেকেই তার অনুশোচনা জন্মেছিল, আল্লাহর ভয়ে নয়।
    • রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: ‘পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে যত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়, তার পাপের একটি অংশ আদমের প্রথম পুত্র কাবিলের আমলনামায় যুক্ত হয়; কারণ সে-ই পৃথিবীতে প্রথম হত্যার পথ উন্মোচন করেছিল।’ (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)।

উপসংহার

হাবিল ও কাবিলের ইতিহাস প্রমাণ করে যে, আল্লাহর দরবারে আমলের বাহ্যিক রূপ নয়, বরং অন্তরের তাকওয়া ও ইখলাসই হলো চূড়ান্ত বিবেচ্য বিষয়। হিংসুক ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত নিজের ধ্বংস নিজেই ডেকে আনে।

৯। وعنده تعالى مفاتح الغيب خزائنه او الطرق الموصلة الى علمه لا يعلمها الا هو وهى الخمسة التى فى قوله ان الله عنده علم الساعة الاية كما رواه البخارى ويعلم ما يحدث فى البر القفار والبحـر القرى التى على الانهار وما تسقط من ورقة الا يعلمها ولا حبة فى ظلمات الارض ولا رطب ولا يابس الا فى كتاب مبين هو اللوح المحفوظ –

[সূরা আল-আন’আম : ৫৯ আয়াতের তাফসীর জালালাইনসহ অনুবাদ এবং ইলমে গায়েবের পঞ্চকুঞ্জির বিশদ পর্যালোচনা]

[মান: ১৫ (অনুবাদ ৫ + ক ৫ + খ ৫)]

ভূমিকা ও পটভূমি

পবিত্র কালামুল্লাহর এক অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো আল্লাহর সর্বময় জ্ঞান ও ইলমে গায়েবের নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করা। দৃশ্য ও অদৃশ্যের প্রতিটি অণু-পরমাণুর খবর মহান রাব্বুল আলামীনের নখদর্পণে রয়েছে। সূরা আন’আমের এই বিখ্যাত আয়াতটি তাওহীদে আসমা ও সিফাতের এক উজ্জ্বল বাতিঘর।

মূল এবারতের প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ

‘ওয়া ইন্দাহূ মাফাতিহুল গায়ব’—আর একমাত্র আল্লাহর নিকটেই রয়েছে অদৃশ্যের যাবতীয় কুঞ্জি বা ভাণ্ডারসমূহ অথবা তাঁর অসীম জ্ঞান পর্যন্ত পৌঁছানোর সমস্ত গোপন পথ; ‘লা ইয়া’লামুহা ইল্লা হু’—তিনি ব্যতীত আর কেউই তা অবগত নয়। আর সেই চাবিকাঠি হলো পাঁচটি বিষয় যা সূরা লোকমানের শেষ আয়াতে উল্লেখ রয়েছে (নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট রয়েছে কিয়ামতের জ্ঞান…); যেমনটি ইমাম বুখারী তাঁর সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। ‘ওয়া ইয়া’লামু মা ফিল বাররি ওয়াল বাহার’—এবং তিনি জানেন যা কিছু স্থলভাগে অর্থাৎ মরুপ্রান্তরে সংঘটিত হয় এবং যা কিছু জলভাগে অর্থাৎ নদ-নদী ও সমুদ্রের তীরবর্তী জনপদে ঘটে থাকে; ‘ওয়া মা তাসক্বুতু মিন ওয়ারাক্বাতিন ইল্লা ইয়া’লামুহা’—আর এমন কোনো গাছের পাতাও ঝরে পড়ে না যা তিনি জানেন না; ‘ওয়া লা হাব্বাতিন ফী যুলুমাতিল আরদ’—এমনকি মাটির গভীর অন্ধকারের অতল গহ্বরে লুকায়িত কোনো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র শস্যদানাও নেই, ‘ওয়া লা রাতবিন ওয়া লা ইয়াবিসিন’—এবং কোনো আর্দ্র (ভেজা) বা শুষ্ক বস্তুও নেই, ‘ইল্লা ফী কিতাবিম মুবীন’—যা সুস্পষ্ট কিতাবে অর্থাৎ লাওহে মাহফুজে সংরক্ষিত ও লিপিবদ্ধ নেই।

(الف) ‘মাফাতিহুল গায়ব’ (مفاتح الغيب)-এর অর্থ এবং আয়াতাংশের তাফসীর

  • শব্দার্থ ও রূপক অর্থ: ‘মাফাতিহ’ (مفاتح) শব্দটি ‘মিফতাহ’ (চাবি) অথবা ‘মাফতাহ’ (খাজানা বা ভাণ্ডার)-এর বহুবচন। সুতরাং মাফাতিহুল গায়ব অর্থ হলো অদৃশ্যের রহস্যের চাবিকাঠি বা ভাণ্ডারসমূহ।
  • সহীহ বুখারীর বর্ণনায় পাঁচটি কুঞ্জি: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: ‘অদৃশ্যের চাবিকাঠি হলো পাঁচটি, যা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না।’ (সহীহ বুখারী: ৪৬২৭)। সূরা লোকমানের ৩৪ নম্বর আয়াতে বর্ণিত এই পাঁচটি বিষয় হলো:
    • ১. কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে তার সুনির্দিষ্ট সময়।
    • ২. কখন, কোথায় এবং কী পরিমাণ বৃষ্টি বর্ষিত হবে।
    • ৩. মাতৃগর্ভে যা কিছু রয়েছে তার পূর্ণ ভবিষ্যৎ রূপরেখা।
    • ৪. কোনো ব্যক্তি আগামীকাল নিশ্চিতভাবে কী অর্জন করবে।
    • ৫. কোন ব্যক্তি পৃথিবীর কোন মাটিতে মৃত্যুবরণ করবে।
  • তাফসীরি তাৎপর্য: আল্লাহ ছাড়া কোনো নবী, অলী, ফেরেশতা বা জ্যোতিষীর নিজস্ব স্বাধীন কোনো ইলমে গায়েব নেই। নবীদের যতটুকু জানানো হয় তা ওহীর মাধ্যমে আল্লাহর দেওয়া সীমাবদ্ধ তথ্য মাত্র। মৌলিক অসীম ইলমে গায়েব একমাত্র আল্লাহর জন্যই খাস।

(খ) শাব্দিক তাহক্বীক্ব (تحقيق الكلمات)

শব্দ রূপমূল ও ধাতু (মাদাহ) ব্যাকরণিক অবস্থান আভিধানিক ও তাফসীরি অর্থ
مَفَاتِحُ ف – ت – ح (ইসমুল আলা / মাকান) ‘মিফতাহ’-এর বহুবচন, মুবতাদা চাবিকাঠিসমূহ বা গোপন ভাণ্ডারসমূহ।
السَّاعَةُ س – و – ع (ইসম) মুদাফ ইলাইহি (ইলমুস সা’আহ) কিয়ামত দিবস; অতি দ্রুত ও অকস্মাৎ আগমনকারী কাল।
تَسْقُطُ س – ق – ط (ফে’লে মুদারে) সীগাহ ওয়াহেদ মুয়ান্নাস গায়েব ঝরে পড়া, পতিত হওয়া বা নিক্ষিপ্ত হওয়া।
مُبِينٌ ب – ي – ن (ইসমুল ফায়েল) ‘কিতাব’-এর সিফাত সুস্পষ্ট, উন্মোচনকারী—এখানে ‘লাওহে মাহফুজ’ উদ্দিষ্ট।

উপসংহার

গাছের একটি শুষ্ক পাতা ঝরে পড়ার ঘটনাটিও যখন আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে ঘটে না, তখন মানুষের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ও কর্মের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব যে সংরক্ষিত রয়েছে—তা নির্দ্বিধায় প্রমাণিত হয়।

১০। يسألونك يا محمد عن الانفال الغنائم لمن هى؟ قل لهم: الانفال لله والرسول يجعلها حيث شاء والرسول يقسمها بامر الله، فقسمها صلى الله عليه وسلم بينهم على السواء رواه الحاكم فى المستدرك فاتقوا الله واصلحوا ذات بينكم اى حقيقة ما بينكم بالمودة وترك النزاع واطيعوا الله ورسوله ان كنتم مؤمنين حقا – انما المؤمنون الكاملوا الايمان الذين اذا ذكر الله وجلت خافت قلوبهم واذا تليت عليهم ايته زادتهم ايمانا تصديقا وعلى ربهم يتوكلون به يثقون لا بغيره –

[সূরা আল-আনফাল : ১-২ আয়াতের তাফসীর জালালাইনসহ অনুবাদ এবং গনীমতের বিধান ও পূর্ণাঙ্গ মুমিনের বৈশিষ্ট্য]

[মান: ১৫ (অনুবাদ ৫ + ক ৫ + খ ৫)]

ভূমিকা ও পটভূমি

দ্বিতীয় হিজরিতে ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধের অভাবনীয় বিজয়ের পর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ (গনীমত) বণ্টনকে কেন্দ্র করে মুসলিম বাহিনীর তরুণ ও প্রবীণ যোদ্ধাদের মধ্যে কিছু মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল। আল্লাহ তাআলা সেই পার্থিব লোভের ঊর্ধ্বে উঠে উম্মাহর ঐক্য রক্ষা এবং গনীমতের চূড়ান্ত বিধান নির্ধারণ করে সূরা আনফালের প্রারম্ভিক আয়াতসমূহ অবতীর্ণ করেন।

মূল এবারতের প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ

হে মুহাম্মদ! তারা আপনাকে ‘আনফাল’ অর্থাৎ যুদ্ধলব্ধ গনীমতের সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছে যে এটি কার প্রাপ্য? আপনি তাদের বলে দিন: এই আনফাল হলো আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের একক এখতিয়ারাধীন; আল্লাহ ও তাঁর রাসূল একে যেখানে ইচ্ছা নির্ধারণ করবেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী তা বণ্টন করবেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.) বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে তা সমভাবে বণ্টন করে দিলেন (হাকিম স্বীয় মুস্তাদরাকে এটি বর্ণনা করেছেন)। ‘ফাত্তাক্বুল্লাহ’—অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় কর; ‘ওয়া আসলিহূ যাতা বাইনিকুম’—এবং তোমাদের নিজেদের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ককে সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের মাধ্যমে সংশোধন কর এবং বিবাদ পরিহার কর; ‘ওয়া আতী’উল্লাহা ওয়া রাসূলাহূ’—এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পূর্ণ আনুগত্য কর যদি তোমরা প্রকৃত মুমিন হও। ‘ইন্নামাল মু’মিনূনা’—প্রকৃত ও কামেল মুমিন তো কেবল তারাই: ‘আল্লাযীনা ইযা যুকিরল্লাহু ওয়াজিলাত ক্বুলূবুহুম’—আল্লাহর নাম যখন স্মরণ করা হয় তখন তাদের হৃদয় ভয়ে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে; ‘ওয়া ইযা তুলিয়াত আলাইহিম আয়াতুহূ যাদাতহুম ঈমানা’—এবং যখন তাদের সামনে আল্লাহর কালাম তেলাওয়াত করা হয় তখন তা তাদের ঈমানি প্রত্যয় বহুগুণ বৃদ্ধি করে দেয়; ‘ওয়া আলা রাব্বিহিম ইয়াতাওয়াক্কালূন’—এবং তারা অন্য কারও ওপর নয়, কেবল তাদের প্রতিপালকের ওপরই পূর্ণ তাওয়াক্কুল ও অবিচল আস্থা রাখে।

(الف) ‘আল-আনফাল’-এর অর্থ এবং এই সূরার নামকরণের কারণ

  • ‘আল-আনফাল’ (الأنفال)-এর অর্থ: ‘আনফাল’ শব্দটি ‘নাফল’ (نفل)-এর বহুবচন, যার আভিধানিক অর্থ হলো অতিরিক্ত অনুগ্রহ বা বাড়তি দান। শরিয়তের পরিভাষায় কাফেরদের সাথে সম্মুখযুদ্ধে জয়লাভের পর মুসলমানদের হস্তগত যুদ্ধলব্ধ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদকে ‘গনীমত’ বা ‘আনফাল’ বলা হয়। পূর্ববর্তী কোনো উম্মতের জন্য গনীমত ভোগ হালাল ছিল না; উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য এটি আল্লাহর এক বিশেষ বাড়তি অনুগ্রহ ও নেয়ামত বিধায় একে ‘আনফাল’ বলা হয়েছে।
  • সূরার নামকরণের কারণ: সূরার প্রথম শব্দেই ‘আনফাল’ পরিভাষাটি উল্লেখিত হয়েছে এবং সমগ্র সূরায় যুদ্ধলব্ধ সম্পদের বণ্টননীতি, বদর যুদ্ধের বিজয় এবং ইসলামি প্রতিরক্ষার মূলনীতি বিশদভাবে আলোচিত হয়েছে বলে এই সূরার নাম ‘সূরা আল-আনফাল’ রাখা হয়েছে।

(খ) “يسألونك عن الأنفال”-এর শানে নুযূল ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

  • বদর যুদ্ধের মাঠের বিরোধ: বদর যুদ্ধে মুসলিমদের তিনটি দল দায়িত্ব পালন করেছিল—একদল শত্রু সেনার বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধ করে তাদের তাড়িয়ে দিয়েছিল এবং গনীমত পাহারা দিয়েছিল; একদল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিরাপত্তার দায়িত্বে তাঁবু ঘিরে রেখেছিল; আর একদল যুদ্ধ শেষে মাঠ থেকে অস্ত্র ও মালামাল কুড়িয়ে এনেছিল।
  • বিতর্কের সৃষ্টি: যুদ্ধ শেষে তরুণ যোদ্ধারা বলল: আমরা যুদ্ধ করে এই সম্পদ ছিনিয়ে এনেছি, সুতরাং আমরাই এর একক হকদার। প্রবীণরা বললেন: আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুরক্ষা দিয়েছি এবং পেছন থেকে তোমাদের ব্যাকআপ দিয়েছি, সুতরাং আমাদের বাদ দিয়ে তোমরা সব নিতে পার না।
  • ঐশী ফয়সালা: সাহাবীদের এই মনোমালিন্য দূর করতে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করলেন—গনীমত কোনো ব্যক্তির সম্পদ নয়; এর মালিক আল্লাহ ও তাঁর রাসুল। অতএব পার্থিব মালের মোহ ত্যাগ করে নিজেদের পারস্পরিক সম্পর্ক সংশোধন কর। পরবর্তীতে এই সূরার ৪১ নম্বর আয়াতে পাঁচ ভাগের এক ভাগ (খুমুস) রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা রেখে বাকি চার ভাগ সমস্ত মুজাহিদদের মধ্যে সমভাবে বণ্টনের সার্বজনীন আইন জারি করা হয়।

উপসংহার

সূরা আনফালের এই শিক্ষা উম্মাহকে মনে করিয়ে দেয় যে, পার্থিব ধনসম্পদ কখনোই মুমিনের মূল লক্ষ্য হতে পারে না; পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও আল্লাহর সন্তুষ্টিই হলো সর্বোচ্চ বিজয়।

১১। اكتب خلاصة سورة الفاتحة مع ذكر أسمائها وفضائلها موضحا –

[সূরা আল-ফাতিহার সংক্ষিপ্ত মূলভাব, এর বিখ্যাত নামসমূহ এবং হাদীসে বর্ণিত অপরিসীম ফজিলতের বিশদ বিবরণ]

[মান: ১০]

ভূমিকা ও পটভূমি

পবিত্র কুরআনের ১১৪টি সূরার মধ্যে সর্বাধিক পঠিত ও মর্যাদাপূর্ণ সূরা হলো ‘সূরা আল-ফাতিহা’। এটি মক্কী সূরা এবং সাতটি আয়াত নিয়ে গঠিত। সমগ্র কুরআনের মূল নির্যাস ও আত্মা এই সূরায় অপূর্ব প্রাঞ্জলতায় ধারণ করা হয়েছে।

১. সূরা আল-ফাতিহার মূল সারসংক্ষেপ (خلاصة السورة)

সূরা আল-ফাতিহা মূলত সমগ্র মানবজাতির পক্ষ থেকে মহান রাব্বুল আলামীনের দরবারে পেশকৃত এক অনুপম প্রার্থনাপত্র (মোনাজাত)। সূরাটিকে প্রধানত তিনটি অংশে ভাগ করা যায়:

  • প্রথম অংশ (আল্লাহর স্তুতি ও গুণগান): প্রথম তিনটি আয়াতে আল্লাহর রুবূবিয়াত (প্রতিপালকত্ব), রাহমানিয়্যাত (অসীম করুণা) এবং মালিকিয়্যাত (পরকালীন সার্বভৌমত্ব)-এর অবিসংবাদিত প্রশংসা করা হয়েছে।
  • দ্বিতীয় অংশ (দাসত্বের ঘোষণা ও মাধ্যম): চতুর্থ আয়াতে বান্দা ঘোষণা করে: ‘ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তাঈন’—আমরা কেবল আপনারই ইবাদত করি এবং কেবল আপনার কাছেই সাহায্য চাই। অর্থাৎ ইবাদতের মাধ্যমেই কেবল সাহায্য চাওয়া যায়।
  • তৃতীয় অংশ (হেদায়েতের আকুল মিনতি): পঞ্চম থেকে সপ্তম আয়াতে বান্দা সিরাতে মুস্তাক্বীম বা সরল পথের দিশা চায়—যা হলো নবী, সিদ্দীকীন, শুহাদা ও সালেহীনের পথ; এবং অভিশপ্ত ও পথভ্রষ্টদের (ইয়াহুদি ও খ্রিস্টানদের) ভ্রান্ত পথ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে।

২. সূরা আল-ফাতিহার প্রসিদ্ধ নামসমূহ (أسماء سورة الفاتحة)

ইমাম সুয়ূতী (রহ.) উল্লেখ করেছেন যে সূরা ফাতিহার বিশটিরও বেশি নাম রয়েছে, যার মধ্যে শীর্ষ নামসমূহ হলো:

নাম নামকরণের কারণ ও তাৎপর্য
১. ফাতিহাতুল কিতাব (فاتحة الكتاب) কুরআনের তেলাওয়াত ও মুসহাফের সংকলন এই সূরা দিয়ে শুরু হওয়ার কারণে।
২. উম্মুল কুরআন (أم القرآن) সমগ্র কুরআনের যাবতীয় মৌলিক শিক্ষা ও বিধান এই সূরায় নিহিত থাকায়।
৩. আস-সাব’উল মাছানী (السبع المثاني) এটি সাতটি আয়াতবিশিষ্ট সূরা যা নামাজের প্রতি রাকাতে বারবার পুনরাবৃত্তি করে পড়া হয়।
৪. সূরাতুশ শিফা (سورة الشفاء) শারীরিক ও আত্মিক যাবতীয় জটিল রোগের ক্ষেত্রে এটি এক অব্যর্থ আরোগ্য প্রদানকারী রুকইয়াহ।
৫. সূরাতুস সালাহ (سورة الصلاة) হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ বলেন: ‘আমি সালাতকে (অর্থাৎ সূরা ফাতিহাকে) আমার ও বান্দার মাঝে অর্ধেক করে ভাগ করেছি।’ তাছাড়া এই সূরা ছাড়া সালাত হয় না।
৬. সূরাতুল কাফিয়াহ ও ওয়াফিয়াহ নামাজে এই সূরা অন্য সূরার জন্য যথেষ্ট হয়ে যায় এবং এটি ভাঙা যায় না।

৩. হাদীসের আলোকে সূরা আল-ফাতিহার অতুলনীয় ফজিলত

  • কুরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ সূরা: সহীহ বুখারীতে আবু সাঈদ ইবনুল মুআল্লা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁকে বলেন: ‘আমি কি তোমাকে মসজিদে থেকে বের হওয়ার পূর্বে কুরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ সূরাটি শিক্ষা দেব না? অতঃপর তিনি বললেন: তা হলো ‘আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন’—যা আস-সাব’উল মাছানী এবং মহান কুরআন।’
  • আকাশের বিশেষ দরজা খুলে ফেরেশতার আগমন: সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, একদিন জিবরাঈল (আ.) নবীজীর পাশে বসে আসমানে এক অভূতপূর্ব শব্দ শুনলেন। তিনি বললেন: আজ আকাশের এমন একটি দরজা খোলা হয়েছে যা সৃষ্টির পর আজ পর্যন্ত কখনো খোলা হয়নি। সেখান থেকে এক বিশেষ ফেরেশতা নেমে এসে নবীজীকে বললেন: ‘আপনি দুটি নূরের সুসংবাদ গ্রহণ করুন যা আপনার পূর্ববর্তী কোনো নবীকে দেওয়া হয়নি—সূরা ফাতিহা এবং সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত।’
  • রোগমুক্তির মোজেযা: সাহাবী আবু সাঈদ খুদরী (রা.) এক বিষাক্ত সাপে দংশন করা গোত্রপ্রধানকে কেবল সূরা ফাতিহা পড়ে ফুঁ দিয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তুলেছিলেন, এবং নবীজী এই আমলকে অনুমোদন দিয়েছিলেন।

উপসংহার

সূরা আল-ফাতিহা হলো মুমিনের জীবনের প্রতিদিনের অক্সিজেন। এই সূরার মর্ম উপলব্ধি করে সালাতে তেলাওয়াত করলে বান্দা সরাসরি আল্লাহর সান্নিধ্য ও কথোপকথনের পরম স্বাদ লাভ করে।

১২। بين وجه تسمية سورة الأنعام – وما هي خصائص نزولها؟ تحدث عن موضوعها مفصلا –

[সূরা আল-আন’আমের নামকরণের যৌক্তিক কারণ, এর নাযিলের অলৌকিক বৈশিষ্ট্যসমূহ এবং এর মূল বিষয়বস্তুর বিশদ তাত্ত্বিক পর্যালোচনা]

[মান: ১০]

ভূমিকা ও পটভূমি

পবিত্র কুরআনের ষষ্ঠ সূরা হলো ‘সূরা আল-আন’আম’। এটি কুরআনের সাতটি সুবিশাল দীর্ঘ সূরার (আস-সাব’উত তুওয়াল) অন্তর্ভুক্ত। মক্কার চরম সংকটময় মুহূর্তে তাওহীদ, রিসালাত ও পরকালের অকাট্য আকিদাগত ভিত্তি সুদৃঢ় করার জন্য এই সূরাটি অবতীর্ণ হয়েছিল।

১. নামকরণের কারণ (وجه التسمية)

  • ‘আল-আন’আম’ (الأنعام)-এর অর্থ: ‘আন’আম’ হলো ‘না’আম’ (نعم)-এর বহুবচন, যার আভিধানিক অর্থ গৃহপালিত চতুস্পদ জন্তু—যেমন উট, গরু, মহিষ, ভেড়া ও ছাগল।
  • নামকরণের যৌক্তিকতা: জাহেলী যুগে আরবের মুশরিকরা এই গৃহপালিত পশুদের নিয়ে বহু মনগড়া কুসংস্কার, শিরক ও কুপ্রথায় লিপ্ত ছিল। তারা দেব-দেবীর নামে পশু উৎসর্গ করত, পশুর ওপর আরোহণ হারাম করত এবং কোনো কোনো পশুর দুধ ও গোশত কেবল পুরুষদের জন্য হালাল করে নারীদের জন্য হারাম করত (যেমন বাহীরা, সায়েবা, ওসীলা ও হাম)। এই সূরার ১৩৬ থেকে ১৪৬ আয়াতে আল্লাহ মুশরিকদের এই সকল কুসংস্কারকে অকাট্য যুক্তিতে খণ্ডন করে চতুষ্পদ জন্তুর ওপর আল্লাহর একচ্ছত্র বিধান ঘোষণা করেছেন। এই বিশেষ আলোচনার কারণেই সূরার নাম ‘সূরা আল-আন’আম’ রাখা হয়েছে।

২. সূরা আন’আম নাযিলের অনন্য ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্যসমূহ (خصائص نزولها)

মুফাসসিরীন কেরাম উল্লেখ করেছেন যে, সূরা আন’আমের নাযিল হওয়ার পেছনে কিছু অনন্য অলৌকিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা অন্য সূরায় দেখা যায় না:

  • সম্পূর্ণ সূরাটি একসাথে এক রাতে অবতীর্ণ: কুরআনের অধিকাংশ দীর্ঘ সূরা কিস্তিতে কিস্তিতে অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস ও ইবনে উমর (রা.) বর্ণনা করেন যে, ১৬৫টি আয়াতবিশিষ্ট এই সুবিশাল পূর্ণাঙ্গ সূরাটি একসাথে এক রাতে মক্কা মুকাররমায় অবতীর্ণ হয়েছিল।
  • সত্তর হাজার ফেরেশতার পাহারা ও তাসবীহ: তাবারানী ও বাইহাকীর প্রামাণ্য রেওয়ায়েতে এসেছে, এই সূরাটি যখন অবতীর্ণ হচ্ছিল তখন জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে সত্তর হাজার ফেরেশতা মিছিল সহকারে নেমে এসেছিলেন। তাদের সমবেত তাসবীহ ও তাহলীদের গম্ভীর আওয়াজে মক্কার আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠেছিল। রাসূলুল্লাহ (সা.) এই দৃশ্য দেখে সিজদায় লুটিয়ে পড়েছিলেন এবং ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী’ পাঠ করেছিলেন।

৩. সূরা আল-আন’আমের মূল বিষয়বস্তু (موضوع السورة)

সূরা আল-আন’আম হলো বিশুদ্ধ তাওহীদ ও আকিদার এক সুবিশাল দুর্গ। এতে সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় আহকামের চেয়ে আকিদাগত দর্শনকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে:

  • ১. শিরকের মূলোৎপাটন ও তাওহীদে খালেক্বিয়াত: নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সৃষ্টি, রাত ও দিনের আবর্তন এবং প্রাণীকুলের বৈচিত্র্য দিয়ে প্রমাণ করা হয়েছে যে নিখিল বিশ্বের একমাত্র স্রষ্টা ও উপাস্য হলেন আল্লাহ।
  • ২. হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর যুক্তিনির্ভর তাওহীদী বিতর্ক: সূরায় হযরত ইব্রাহীম (আ.) কর্তৃক নক্ষত্র, চাঁদ ও সূর্যের অস্তমিত হওয়া প্রত্যক্ষ করে এক আল্লাহর তাওহীদে পৌঁছানোর অমর বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে (আয়াত: ৭৪-৮২)।
  • ৩. নবুওয়াত ও রিসালাতের সত্যতা প্রমাণ: কাফেরদের অলৌকিক চাক্ষুষ নিদর্শন চাওয়ার হঠকারিতাকে খণ্ডন করে ওহীর মর্যাদা সমুন্নত রাখা হয়েছে।
  • ৪. আঠারো জন নবীর অবিচ্ছেদ্য ধারাবাহিকতা: এই সূরায় ধারাবাহিকভাবে ১৮ জন মহান নবীর নাম উল্লেখ করে প্রমাণ করা হয়েছে যে ইসলামের দাওয়াত হলো সর্বযুগের নবীদের অভিন্ন এক তাওহীদী মিশন।
  • ৫. মানবজীবনের দশটি সার্বজনীন নৈতিক অনুশাসন (وصايا عشر): সূরার ১৫১ থেকে ১৫৩ আয়াতে পিতা-মাতার সেবা, এতিমের মাল রক্ষা, ওজনে কারচুপি না করা, ন্যায়বিচার এবং আল্লাহর পথে অবিচল থাকার দশটি অলঙ্ঘনীয় মূলনীতি ঘোষণা করা হয়েছে।

উপসংহার

সূরা আল-আন’আম মানব মনের সমস্ত সংশয় দূর করে এক আল্লাহর একত্ববাদের ওপর অটল বিশ্বাস স্থাপন করার এক অনন্য দার্শনিক ও ঐশী মহাসনদ।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

ফাযিল ১ম বর্ষ দিরাসাতুত তাফসীর-১ ২০২৪ পরীক্ষার বিষয় কোড কত ছিল?

বিষয় কোড ছিল ১১১০০৫ এবং পূর্ণমান ১০০ নম্বর। সময় ৩ ঘণ্টা।

সূরা আল-ফাতিহাকে কেন ‘উম্মুল কুরআন’ বলা হয়?

সমগ্র কুরআনের যাবতীয় মৌলিক শিক্ষা ও আকিদাগত দর্শন এই সূরায় সংক্ষেপে নিহিত থাকায় একে উম্মুল কুরআন বলা হয়।

ঐতিহাসিক কিবলা পরিবর্তন কোন সনে সংঘটিত হয়েছিল?

দ্বিতীয় হিজরির রজব বা শা’বান মাসে মসজিদে কিবলাতাইনে নামাজরত অবস্থায় কিবলা পরিবর্তিত হয়েছিল।

হযরত ইয়াকুব (আ.) স্বীয় মানতের কারণে নিজের ওপর কী খাবার হারাম করেছিলেন?

তীব্র বাতরোগ থেকে আরোগ্য লাভের শুকরিয়াস্বরূপ তিনি নিজের সবচেয়ে প্রিয় খাদ্য উটের গোশত ও দুধ বর্জন করেছিলেন।

ইলমে গায়েবের চাবিকাঠি কয়টি বিষয়কে বলা হয়?

পাঁচটি বিষয়কে—কিয়ামতের সময়, বৃষ্টির পরিমাণ, মাতৃগর্ভের পরিণতি, আগামীকালের উপার্জন এবং মৃত্যুর স্থান।

সূরা আল-আন’আম নাযিলের সময় কতজন ফেরেশতা অবতরণ করেছিলেন?

হাদীসের বর্ণনামতে সত্তর হাজার ফেরেশতা তাসবীহ ও তাহলীদের মিছিল সহকারে এই সূরার সাথে অবতরণ করেছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *