আল-ফিরক্বাতুন নাজিয়াহ ১ম পত্র (Al-Firqatun Najiyah 1st Paper) – 111020, ইলমুল ফিরাক্ব – ফাযিল পাস ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪

StudyBoi StudyBoi
September 27, 2026
৮৪ মিনিট পড়ার সময়
২ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়
ফাযিল (স্নাতক) পাস ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪
বিষয়: ইলমুল ফিরাক্ব — ১ম পত্র (আল-ফিরক্বাতুন নাজিয়াহ)
বিষয় কোড: ১১১০২০ | পূর্ণমান: ১০০ | সময়: ৩ ঘণ্টা

[দ্রষ্টব্য: ক-অংশ হতে যেকোনো ৫টি এবং খ-অংশ হতে যেকোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও।]

ক-অংশ (মান: ১৬ × ৫ = ৮০)

১। عرف الفرقة الناجية؟ ثم بين خصائصهم في ضوء الحديث وأقوال العلماء بالتفصيل –

[আল-ফিরকাতুন নাজিয়াহ এর পরিচয় দাও। হাদিস ও ওলামাদের দৃষ্টিতে তাদের বৈশিষ্ট্যসমূহ বিশদভাবে আলোচনা কর।]

[মান: ১৬]

ভূমিকা ও আল-ফিরক্বাতুন নাজিয়াহর পরিচয়

ইসলামের ইতিহাসে ‘আল-ফিরক্বাতুন নাজিয়াহ’ (الفرقة الناجية) অর্থ হলো—পরকালীন মুক্তিপ্রাপ্ত দল বা কাফেলা। রাসুলুল্লাহ (সা.) মুসলিম উম্মাহর ঐতিহাসিক বিভক্তির ভবিষ্যদ্বাণী করে যে একমাত্র দলটিকে জাহান্নামের আগুন থেকে পরিত্রাণপ্রাপ্ত ও জান্নাতী হিসেবে ঘোষণা করেছেন, তাকে শরিয়তের পরিভাষায় ‘আল-ফিরক্বাতুন নাজিয়াহ’ বা ‘আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আহ’ বলা হয়।

হাদিস শরিফের আলোকে নাজাতপ্রাপ্ত দলের পরিচয়

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:

«وَإِنَّ بَنِي إِسْرَائِيلَ تَفَرَّقَتْ عَلَى ثِنْتَيْنِ وَسَبْعِينَ مِلَّةً، وَتَفْتَرِقُ أُمَّتِي عَلَى ثَلاَثٍ وَسَبْعِينَ مِلَّةً، كُلُّهُمْ فِي النَّارِ إِلاَّ مِلَّةً وَاحِدَةً، قَالُوا: وَمَنْ هِيَ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِي»

“নিশ্চয় বনি ইসরাইল বাহাত্তর দলে বিভক্ত হয়েছিল, আর আমার উম্মত তেহাত্তর দলে বিভক্ত হবে। একটি দল ছাড়া তাদের সমস্ত দলই জাহান্নামে যাবে। সাহাবীগণ আরজ করলেন: হে আল্লাহর রাসুল! সেই মুক্তিপ্রাপ্ত দলটি কারা? তিনি ইরশাদ করলেন: আজ আমি এবং আমার সাহাবীগণ যার ওপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছি, যারা তার ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে।” (জামে আত-তিরমিযী)। অন্য বর্ণনায় এসেছে: «هِيَ الْجَمَاعَةُ» (তা হলো উম্মাহর মূলধারা বা বৃহত্তর জামাত)।

ওলামায়ে কেরামের দৃষ্টিতে আল-ফিরক্বাতুন নাজিয়াহর প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ

ইমাম নববী, হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী এবং ইমাম আবু মনসুর আল-বাগদাদী (রহ.) মুক্তিপ্রাপ্ত দলের মৌলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ অত্যন্ত চমৎকারভাবে বিশ্লেষণ করেছেন:

  • ১. কুরআন ও সুন্নাহর নিষ্ঠাবান আনুগত্য (الاتباع لا الابتداع): তারা মনগড়া যুক্তি বা দর্শনের পেছনে না ছুটে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ এবং সাহাবায়ে কেরামের চাক্ষুষ জীবনাদর্শকে সর্বোচ্চ মাপকাঠি মনে করে।
  • ২. সাহাবায়ে কেরামকে সামগ্রিক শ্রদ্ধা ও মর্যাদা দান: খারেজী ও রাফেজীদের মতো কোনো সাহাবীকে তাকফির বা গালাগাল না করে খুলাফায়ে রাশেদীনসহ সমস্ত সাহাবীকে ন্যায়পরায়ণ ও হেদায়েতের নক্ষত্র বিশ্বাস করা।
  • ৩. চরমপন্থা ও শৈথিল্যের মাঝে সুষম মধ্যপন্থা (الوسطية والاعتدال): তারা তাকদিরের ক্ষেত্রে জাবারিয়া ও কাদারিয়্যার মধ্যবর্তী; ঈমানের ক্ষেত্রে খারেজী ও মুরজিয়ার মধ্যবর্তী; এবং সিফাতের ক্ষেত্রে মুতাযিলা ও মুজাসসিমার মধ্যবর্তী সুবর্ণ মধ্যপন্থা অবলম্বন করে।
  • ৪. মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও জামাত সংরক্ষণ: সামান্য মতভেদের কারণে মুসলমানদের কাফের আখ্যা (তাকফির) দিয়ে রক্তপাত করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা এবং বৃহত্তর জামাতের সংহতি রক্ষা করা।
  • ৫. সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ: হেকমত ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে সমাজের সর্বস্তরে দ্বীনের দাওয়াত প্রচার করা।

উপসংহার

আল-ফিরক্বাতুন নাজিয়াহ কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা ভৌগোলিক দলের নাম নয়; বরং কিয়ামত পর্যন্ত যে ব্যক্তিই সুন্নাহ ও সাহাবায়ে কেরামের পথকে আকড়ে ধরে রাখবে, সে-ই এই মুক্তিপ্রাপ্ত কাফেলার সদস্য হিসেবে গণ্য হবে।

২। ما معنى التوحيد لغة وشرعا ؟ ثم بين أقسامه بالتفصيل –

[তাওহিদের আভিধানিক ও শরয়ি অর্থ কী? এর প্রকারগুলো বিস্তারিত বর্ণনা কর।]

[মান: ১৬]

ভূমিকা ও তাওহিদের আভিধানিক অর্থ

ইসলাম ধর্মের মূল ভিত্তি ও সমস্ত নবীদের দাওয়াতের প্রাণকেন্দ্র হলো ‘তাওহিদ’ (التوحيد)। আরবি ‘ওয়াহহাদা-ইউয়াহহিদ্দু’ (وحّد – يوحّد) শব্দমূল থেকে তাওহিদ নিষ্পন্ন, যার আভিধানিক অর্থ হলো—একক করা, এক সাব্যস্ত করা বা অদ্বিতীয় জানা (جعْلُ الشيء واحدا)।

তাওহিদের শারঈ বা পারিভাষিক সংজ্ঞা

ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় তাওহিদ বলা হয়:

«إِفْرَادُ اللَّهِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى بِمَا يَخْتَصُّ بِهِ مِنْ رُبُوبِيَّتِهِ وَأُلُوهِيَّتِهِ وَأَسْمَائِهِ وَصِفَاتِهِ»

“মহান আল্লাহ তাআলাকে তাঁর রুবুবিয়্যাত (সার্বভৌম প্রতিপালন), উলুহিয়্যাত (একক উপাসনা) এবং আসমা ও সিফাতে (পবিত্র নাম ও গুণাবলিতে) একক ও অদ্বিতীয় বিশ্বাস করা এবং তাঁর সাথে কোনো অংশীদার বা সমকক্ষ স্থাপন না করা।”

তাওহিদের মৌলিক তিন প্রকারের বিশদ বিশ্লেষণ

আল-কুরআনুল কারিমের সামগ্রিক আয়াত বিশ্লেষণ করে ওলামায়ে কেরাম তাওহিদকে প্রধানত তিনটি সুনির্দিষ্ট ভাগে বিন্যস্ত করেছেন:

  • ১. তাওহিদুর রুবুবিয়্যাত (توحيد الربوبية – প্রতিপালনে একত্ববাদ):

    দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা যে—এই নিখিল মহাবিশ্বের একমাত্র স্রষ্টা (খাল্লিক্ব), রিজিকদাতা (রাযযাক্ব), জীবন ও মৃত্যুর মালিক, এবং সমগ্র বিশ্বব্যবস্থার একক পরিচালক কেবল মহান আল্লাহ তাআলা। সৃষ্টির কোনো কাজে তাঁর কোনো শরিক বা সাহায্যকারী নেই।

    কুরআনী দলিল: ﴿الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ﴾ (সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর যিনি সমগ্র জাহানের একমাত্র রব—সূরা আল-ফাতিহা: ২)। মক্কার কাফেররাও এই রুবুবিয়্যাত মানত, কিন্তু এতেই তারা পূর্ণ মুসলিম হতে পারেনি।

  • ২. তাওহিদুল উলুহিয়্যাত বা তাওহিদুর রিয়াযাহ (توحيد الألوهية বা العبادة – উপাসনায় একত্ববাদ):

    যাবতীয় ইবাদত—যেমন নামাজ, রোজা, দোয়া, রুকু, সিজদা, মানত, কুরবানি, তাওয়াক্কুল, আশা ও ভয়—কেবলমাত্র একক আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিবেদন করা। কোনো পীর, মাজার, ফেরেশতা বা দেব-দেবীর সামনে ইবাদতের কোনো অংশ পেশ না করা। সমস্ত নবী মূলত এই তাওহিদ প্রতিষ্ঠার জন্যই প্রেরিত হয়েছিলেন।

    কুরআনী দলিল: ﴿وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ﴾ (আর আপনার রব চূড়ান্ত ফয়সালা দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া আর কারো ইবাদত করবে না—সূরা আল-ইসরা: ২৩)।

  • ৩. তাওহীদুল আসমা ওয়াস সিফাত (توحيد الأسماء والصفات – নাম ও গুণে একত্ববাদ):

    পবিত্র কুরআন ও সহিহ হাদিসে আল্লাহর যে সকল সুন্দর নাম (আসমাউল হুসনা) ও মহিমান্বিত সিফাত বর্ণিত হয়েছে, কোনো প্রকার রূপক ব্যাখ্যা (তা’বীল), অস্বীকার (তা’তীল), সাদৃশ্য (তাশবীহ) বা রূপ কল্পনা (তাকয়ীফ) ছাড়া সেগুলোর ওপর যথাযথ বিশ্বাস স্থাপন করা।

    কুরআনী দলিল: ﴿وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى فَادْعُوهُ بِهَا﴾ (আর আল্লাহর জন্যই রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম, অতএব তোমরা তাঁকে সেই নামেই ডাক—সূরা আল-আ’রাফ: ১৮০)।

উপসংহার

এই তিন প্রকার তাওহিদের কোনো একটিতে সামান্য ত্রুটি থাকলে মানুষের ঈমান অপূর্ণ থেকে যায়। বিশুদ্ধ তাওহিদই হলো পরকালে নাজাতের একমাত্র পাসপোর্ট।

৩। ما معنى المعراج ؟ وما الفرق بين المعراج والإسراء؟ هل المعراج لرسول الله صلى الله عليه وسلم كان في اليقظة أم في المنام؟ بين بالدلائل –

[মিরাজ অর্থ কী? মিরাজ এবং ইসরার মধ্যে পার্থক্য কী? রসুল (স) এর মিরাজ কি জাগ্রত অবস্থায় হয়েছিল না ঘুমন্ত অবস্থায়? দলিলসহ উপস্থাপন কর।]

[মান: ১৬]

ভূমিকা ও মিরাজের আভিধানিক অর্থ

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নবুওয়তি জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অলৌকিক মোজেজা হলো মিরাজুন্নবী। আরবি ‘উরূজ’ (عروج) শব্দমূল থেকে ‘মিরাজ’ (المعراج) নিষ্পন্ন, যার আভিধানিক অর্থ হলো—ঊর্ধ্বে আরোহণের সিঁড়ি, সোপান বা উড্ডয়ন করার মাধ্যম (آلة الصعود)। শরিয়তের পরিভাষায় মিরাজ বলা হয়: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রাতের একাংশে বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে উর্ধ্বাকাশে গমন করে সিদরাতুল মুনতাহা পেরিয়ে মহান আল্লাহর আরশে আজিম ও নৈকট্য লাভের ঐতিহাসিক অলৌকিক সফর।

ইসরো ও মিরাজের মধ্যকার পার্থক্য

  • আল-ইসরা (الإسراء): আরবি ‘সারা’ (سرى) থেকে এসেছে, যার অর্থ নৈশভ্রমণ। এটি ছিল মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে ফিলিস্তিনের মসজিদুল আকসা (বায়তুল মুকাদ্দাস) পর্যন্ত জমিনের অনুভূমিক অলৌকিক সফর। এটি সূরা বনি ইসরাইলের প্রথম আয়াতে বর্ণিত হয়েছে (﴿سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلًا﴾)।
  • আল-মিরাজ (المعراج): এটি ছিল মসজিদুল আকসা থেকে শুরু করে সপ্ত আসমান অতিক্রম করে আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছানোর উলম্ব বা ঊর্ধ্বমুখী আকাশ সফর। এটি সূরা আন-নাজমে ইঙ্গিত করা হয়েছে (﴿عِنْدَ سِدْرَةِ الْمُنْتَهَى﴾)।

মিরাজ কি জাগ্রত অবস্থায় হয়েছিল নাকি স্বপ্নে? দলিলভিত্তিক বিশ্লেষণ

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের সমস্ত সাহাবী, তাবেঈন ও চার মাজহাবের ইমামগণের অকাট্য সিদ্ধান্ত হলো: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইসরা ও মিরাজ সম্পূর্ণ জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে (রূহ ও শরীরের সমন্বয়ে – بالروح والجسد يقظة) সংঘটিত হয়েছিল। এটি কোনো স্বপ্নযোগ বা আত্মিক ভ্রমণ ছিল না।

সশরীরে জাগ্রত অবস্থায় মিরাজ হওয়ার অকাট্য দলিলসমূহ

  • ১. কুরআনে ‘আব্দ’ শব্দের প্রয়োগ: আল্লাহ তাআলা বলেন:

    ﴿سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلًا﴾

    “পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি রাতের বেলা তাঁর বান্দাকে ভ্রমণ করিয়েছেন।” (সূরা বনি ইসরাইল: ১)। আরবি ভাষায় ‘আব্দ’ (বান্দা) শব্দটি কেবল রূহকে বলা হয় না; বরং রূহ ও দেহের সামগ্রিক মিলনকেই ‘আব্দ’ বলা হয়।

  • ২. ‘সুবহানাল্লাজি’ দিয়ে সূচনা: আরবি অলঙ্কারশাস্ত্রে ‘সুবহানা’ শব্দটি কেবল তখনই ব্যবহৃত হয় যখন কোনো পরম বিস্ময়কর ও অলৌকিক ঘটনার বিবরণ দেওয়া হয়। স্বপ্ন দেখা কোনো বিস্ময়কর বিষয় নয়; জাগ্রত চোখে সশরীরে মহাবিশ্ব ভ্রমণই চরম বিস্ময়।
  • ৩. কাফেরদের তীব্র অস্বীকৃতি ও পরীক্ষা: মিরাজ যদি কেবল স্বপ্ন হতো, তবে মক্কার কুরাইশরা কখনোই এর তীব্র বিরোধিতা করত না এবং উপহাস করত না। কারণ যে কেউ স্বপ্নে দূর দেশে যাওয়ার দাবি করতে পারে। কাফেররা বুঝতে পেরেছিল যে মুহাম্মদ (সা.) সশরীরে মক্কা থেকে জেরুজালেম এবং আকাশ ভ্রমণের চাক্ষুষ দাবি করেছেন।
  • ৪. বোরাকে আরোহণ: হাদিসে এসেছে রাসুল (সা.)-কে বোরাক নামক বাহনে আরোহণ করানো হয়েছিল। বাহন কেবল শারীরিক দেহের জন্যই প্রয়োজন হয়, রূহের সফরের জন্য বাহনের কোনো প্রয়োজন পড়ে না।

উপসংহার

জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে মিরাজ সংঘটিত হওয়া আল্লাহর অসীম কুদরত ও রাসুল (সা.)-এর সুউচ্চ মর্যাদার এক অনন্য ঐতিহাসিক নিদর্শন।

৪। تحدث عن جمع القرآن الكريم في عهد أبي بكر وعثمان رضي الله عنهما وما الفرق في جمع القرآن الكريم بينهما ؟ بين –

[হযরত আবু বকর ও উছমান (রা) এর যুগে আল-কুরআন আল-কারীম সংকলন সম্পর্কে আলোচনা কর। আল-কুরআন সংকলনে উভয়ের মধ্যে পার্থক্য কী? বর্ণনা কর।]

[মান: ১৬]

ভূমিকা ও পটভূমি

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় কুরআনুল কারিম সম্পূর্ণ নাজিল হয়েছিল এবং সাহাবীদের স্মৃতিতে মুখস্থ থাকার পাশাপাশি পাথর, চামড়া, হাড় ও খেজুরের ডালে লিপিবদ্ধ ছিল। কিন্তু তখন তা গ্রন্থাকারে এক মলাটে আবদ্ধ ছিল না। পরবর্তীতে উম্মাহর সুরক্ষায় খুলাফায়ে রাশেদীনের দুই মহান খলিফা—হযরত আবু বকর (রা.) ও হযরত উসমান (রা.)-এর যুগে কুরআনের ঐতিহাসিক সংকলন সম্পন্ন হয়।

১. হযরত আবু বকর সিদ্দিক্ব (রা.)-এর যুগে কুরআন সংকলন

  • প্রেক্ষাপট: ১২ হিজরিতে ভণ্ড নবী মুসাইলামা কাযযাবের বিরুদ্ধে ইয়ামামার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে প্রায় ৭০ জন হাফেজে সাহাবী শাহাদাত বরণ করেন। এতে হযরত উমর ফারুক (রা.) অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে খলিফা আবু বকর (রা.)-এর কাছে গিয়ে কুরআনকে এক মলাটে সংকলনের আবেদন জানান। প্রথমে আবু বকর (রা.) দ্বিধাবোধ করলেও পরবর্তীতে আল্লাহ তাঁর বক্ষ উন্মুক্ত করে দেন।
  • সংকলন পদ্ধতি: খলিফা আবু বকর (রা.) রাসুল (সা.)-এর প্রধান ওহী লেখক হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-কে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করেন। যায়েদ (রা.) চরম সতর্কতা অবলম্বন করে দুটি শর্তে প্রতিটি আয়াত গ্রহণ করতেন: (১) বিশিষ্ট হাফেজদের মুখস্থ থাকা এবং (২) রাসুল (সা.)-এর সামনে লিখিত হওয়ার পক্ষে দুজন চাক্ষুষ বিশ্বস্ত সাক্ষীর সাক্ষ্য। এভাবে সমস্ত বিক্ষিপ্ত পাণ্ডুলিপি একত্র করে একটি পূর্ণাঙ্গ মাস্টার কপি তৈরি করা হয়, যা আবু বকর (রা.)-এর কাছে এবং পরবর্তীতে উমর (রা.) ও উম্মুল মুমিনীন হাফসা (রা.)-এর কাছে সংরক্ষিত থাকে।

২. হযরত উসমান গণী (রা.)-এর যুগে কুরআন সংকলন

  • প্রেক্ষাপট: ২৫ হিজরির দিকে আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান বিজয়ের অভিযানে শাম ও ইরাকের মুসলিম সৈন্যদের মধ্যে বিভিন্ন কিরাআতের (উচ্চারণরীতির) কারণে মারাত্মক মতভেদ ও ঝগড়া দেখা দেয়। সেনাপতি হযরত হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান (রা.) মদিনায় ছুটে এসে খলিফা উসমান (রা.)-কে বললেন:

    «يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ، أَدْرِكْ هَذِهِ الأُمَّةَ قَبْلَ أَنْ يَخْتَلِفُوا فِي الْكِتَابِ اخْتِلاَفَ الْيَهُودِ وَالنَّصَارَى»

    “হে আমিরুল মুমিনীন! ইহুদি ও খ্রিস্টানদের মতো কিতাব নিয়ে মতভেদে লিপ্ত হওয়ার আগেই এই উম্মতকে রক্ষা করুন।”

  • সংকলন পদ্ধতি: উসমান (রা.) হাফসা (রা.)-এর কাছ থেকে মূল সহিফা এনে যায়েদ ইবনে সাবিত, আব্দুল্লাহ ইবনুল জুবায়ের, সাঈদ ইবনুল আস ও আব্দুর রহমান ইবনুল হারিস (রা.)-এর সমন্বয়ে গঠিত বোর্ডকে কুরাইশদের কেন্দ্রীয় প্রমিত উচ্চারণে কপি করার নির্দেশ দেন। প্রস্তুতকৃত প্রমিত প্রতিলিপিগুলো (মুসহাফে উসমানী) সাম্রাজ্যের প্রধান প্রধান কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং বাকি সমস্ত ব্যক্তিগত বা বিকৃত পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে বিনষ্ট করা হয়।

উভয় সংকলনের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্যসমূহ

হযরত আবু বকর (রা.)-এর সংকলন হযরত উসমান (রা.)-এর সংকলন
১. উদ্দেশ্য: হাফেজদের শাহাদাতের পর কুরআন সম্পূর্ণ বিলুপ্ত বা হারিয়ে যাওয়া থেকে সংরক্ষণ করা ছিল মূল উদ্দেশ্য। ১. উদ্দেশ্য: বিভিন্ন কিরাআত ও উচ্চারণের বিভ্রান্তি দূর করে সমগ্র উম্মাহকে একটি মাত্র প্রমিত পাঠে ঐক্যবদ্ধ করা ছিল উদ্দেশ্য।
২. ভিত্তি ও রূপ: বিক্ষিপ্ত পাতা ও বস্তু থেকে সংগ্রহ করে একটি মাত্র মূল পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করা হয়েছিল। ২. ভিত্তি ও রূপ: মূল পাণ্ডুলিপি থেকে একাধিক কপি তৈরি করে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন রাজধানীতে প্রেরণ করা হয়েছিল।
৩. কিরাআত ব্যবস্থা: এতে সাতটি অনুমোদিত হরফ ও আঞ্চলিক ভাষার সুযোগ বিদ্যমান ছিল। ৩. কিরাআত ব্যবস্থা: কেবল কুরাইশদের প্রমিত ভাষারূপকে অক্ষুণ্ন রেখে সর্বজনীন রূপ দেওয়া হয়।

উপসংহার

আবু বকর (রা.) কুরআনকে একত্রিত করেছিলেন, আর উসমান (রা.) কুরআনকে কেন্দ্র করে সমগ্র উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। উভয় মহৎ উদ্যোগের ফলেই কুরআন আজ অবিকৃত রয়েছে।

৫। من هم الأنبياء والرسل؟ اذكر اسماء الأنبياء في القرآن هل كان لقمن نبيا أم لا؟ بين بالدلائل –

[নবি ও রসুল কারা? কুরআনে বর্ণিত নবিদের নামসমূহ উল্লেখ কর। হযরত লুকমান (আ) নবি ছিলেন কি না? দলিলসহ বর্ণনা কর।]

[মান: ১৬]

নবী ও রাসুলের সংজ্ঞা ও পার্থক্য

  • নবী (النبي): আরবি ‘নাবা’ (সংবাদ) থেকে নিষ্পন্ন। পরিভাষায় নবী হলেন এমন সম্মানিত পুরুষ, যাঁর প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে অহি অবতীর্ণ হয়েছে; চাই তিনি নতুন কোনো শরিয়ত ও কিতাব পেয়ে থাকুন কিংবা পূর্ববর্তী রাসুলের শরিয়ত প্রচারের নির্দেশপ্রাপ্ত হয়ে থাকুন।
  • রাসুল (الرسول): আরবি ‘রিসালাত’ (বার্তা) থেকে নিষ্পন্ন। পরিভাষায় রাসুল হলেন সেই মহামানব, যাঁর প্রতি আল্লাহ তাআলা নতুন স্বতন্ত্র আসমানী কিতাব ও স্বাধীন শরিয়ত অবতীর্ণ করেছেন এবং তাঁকে অবাধ্য বা কাফের সম্প্রদায়ের কাছে হেদায়েতের পয়গাম নিয়ে পাঠিয়েছেন।
  • পার্থক্য: “প্রত্যেক রাসুলই নবী, কিন্তু প্রত্যেক নবী রাসুল নন।” রাসুলের দায়িত্ব ও মর্যাদা নবীর চেয়ে অধিক ব্যাপক।

কুরআনুল কারিমে নাম উল্লেখ থাকা ২৫ জন নবীর তালিকা

পবিত্র কুরআনে সর্বমোট ২৫ জন সম্মানিত নবীর নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে:

  • ১. হযরত আদম (আ.), ২. হযরত ইদরীস (আ.), ৩. হযরত নূহ (আ.), ৪. হযরত হূদ (আ.), ৫. হযরত সালেহ (আ.),
  • ৬. হযরত ইবরাহিম (আ.), ৭. হযরত লূত (আ.), ৮. হযরত ইসমাইল (আ.), ৯. হযরত ইসহাক্ব (আ.), ১০. হযরত ইয়াক্বুব (আ.),
  • ১১. হযরত ইউসুফ (আ.), ১২. হযরত আইয়ুব (আ.), ১৩. হযরত শুআইব (আ.), ১৪. হযরত মুসা (আ.), ১৫. হযরত হারুন (আ.),
  • ১৬. হযরত দাউদ (আ.), ১৭. হযরত সুলাইমান (আ.), ১৮. হযরত ইলিয়াস (আ.), ১৯. হযরত আল-ইয়াসা’ (আ.), ২০. হযরত ইউনুস (আ.),
  • ২১. হযরত জুল-কিফ্ফ্ল (আ.), ২২. হযরত যাকারিয়া (আ.), ২৩. হযরত ইয়াহইয়া (আ.), ২৪. হযরত ঈসা (আ.), এবং ২৫. সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.)।

হযরত লুকমান (আ.) কি নবী ছিলেন? দলিলভিত্তিক ফয়সালা

পবিত্র কুরআনে ‘সূরা লুকমান’-এ হযরত লুকমানের প্রজ্ঞাপূর্ণ উপদেশের বিশদ বিবরণ এসেছে। তিনি কি নবী ছিলেন নাকি আল্লাহর ওলী ছিলেন—এ নিয়ে ওলামায়ে কেরামের মাঝে দুটি মত রয়েছে:

  • ১. জমহুর সালাফ ও আলিমগণের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত: হযরত লুকমান (আ.) নবী ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন একজন পরম প্রজ্ঞাবান ওলী, বিজ্ঞ প্রাজ্ঞ ব্যক্তি (হাকীম ও সালিহ বান্দা)।

    কুরআনী দলিল: আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
    ﴿وَلَقَدْ آتَيْنَا لُقْمَانَ الْحِكْمَةَ أَنِ اشْكُرْ لِلَّهِ﴾ (আর আমি অবশ্যই লুকমানকে হিকমত ও প্রজ্ঞা দান করেছিলাম এই নির্দেশ দিয়ে যে, আল্লাহর শুকরিয়া আদায় কর—সূরা লুকমান: ১২)। এখানে আল্লাহ তাঁকে ‘হিকমত’ দেওয়ার কথা বলেছেন, নবুওয়ত বা ওহি দেওয়ার কথা বলেননি।

    সাহাবীদের বক্তব্য: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.), মুজাহিদ, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব এবং ইকরিমা (রহ.) স্পষ্টভাবে বলেছেন: ‘লুকমান নবী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত প্রজ্ঞাবান দাস ও আল্লাহর খাঁটি ওলী।’

  • ২. বিচ্ছিন্ন সংখ্যালঘু মত: ইকরিমা থেকে একটি দুর্বল সূত্রে তিনি নবী ছিলেন বলে উদ্ধৃত হয়েছে, যা জমহুর উম্মাহর বিপরীত হওয়ায় অগ্রহণযোগ্য।

উপসংহার

হযরত লুকমান (আ.) আল্লাহর একজন প্রিয় বিজ্ঞ প্রজ্ঞাবান ওলী ছিলেন, যাঁর প্রদত্ত সন্তান প্রতিপালন ও তাওহিদের উপদেশগুলো আল্লাহ কিয়ামত পর্যন্ত কুরআনে চিরস্মরণীয় করে রেখেছেন।

৬। ما معنى المعرفة والتوحيد والإيمان والإسلام والدين؟ وما حكم المناظرة والجدل في الدين؟ بين بالتفصيل –

[المعرفة, التوحيد, الإيمان, الإسلام এবং الدين-এর অর্থ কী? দ্বীনের বিষয়ে المناظرة এবং الجدل-এর হুকুম বিস্তারিত আলোচনা কর।]

[মান: ১৬]

১. পাঁচটি মৌলিক পরিভাষার অর্থ ও স্বরূপ

  • ১. আল-মা’রেফাত (المعرفة): আভিধানিক অর্থ জ্ঞান বা পরিচয় লাভ করা। শরিয়তের পরিভাষায়—সুস্থ বিবেক ও দলিলের সাহায্যে আল্লাহ তাআলার সত্তা, গুণাবলি ও ক্ষমতা সম্পর্কে অন্তরে নিশ্চিত উপলব্ধি ও পরিচয় লাভ করাকে মা’রেফাত বলা হয়।
  • ২. আত-তাওহিদ (التوحيد): আল্লাহর রুবুবিয়্যাত, উলুহিয়্যাত এবং আসমা ও সিফাতে কোনো অংশীদার ছাড়া তাঁকে একক ও অদ্বিতীয় বিশ্বাস করা ও মান্য করা।
  • ৩. আল-ঈমান (الإيمان): রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর পক্ষ থেকে যা কিছু নিয়ে এসেছেন তা অন্তরে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা (তাসদিক্ব বিল ক্বালব) এবং মুখে স্বীকৃতি দেওয়া (ইক্বোরার বিল লিসান)।
  • ৪. আল-ইসলাম (الإسلام): আভিধানিক অর্থ আত্মসমর্পণ করা। পরিভাষায়—আল্লাহর সমস্ত বিধিবিধান ও শরিয়তের সামনে বিনম্র চিত্তে বাহ্যিক আনুগত্য ও আমল প্রকাশ করা।
  • ৫. আদ-দ্বীন (الدين): শরিয়তের সামগ্রিক জীবনব্যবস্থা। অর্থাৎ আকিদা (ঈমান), আমল (ইসলাম) এবং আন্তরিক নিষ্ঠা (ইহসান)—এই তিনটির পূর্ণাঙ্গ ঐশী সমষ্টিকেই ‘দ্বীন’ বলা হয়।

২. দ্বীনের বিষয়ে বিতর্ক (المناظرة) ও ঝগড়ার (الجدل) শারঈ হুকুম

ইসলামি শরিয়তে দ্বীনি বিষয়ে কথা বলা ও বিতর্কের দুটি ভিন্ন রূপ রয়েছে:

  • ক. প্রশংসনীয় মুনাজারা বা বিতর্ক (المناظرة المحمودة):

    সত্য উদ্ঘাটন, বিভ্রান্তদের সংশয় নিরসন এবং বাতিল ফেরকার অপপ্রচার প্রতিহত করার জন্য কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে শালীন ভাষায় বিজ্ঞ আলিমদের বিতর্ক পরিচালনা করা কেবল জায়েজই নয়, বরং তা ফরজে কিফায়া।

    কুরআনী নির্দেশ: আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

    ﴿ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ﴾

    “আপনি আপনার রবের পথের দিকে হিকমত ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে আহ্বান করুন এবং তাদের সাথে উত্তম পন্থায় বিতর্ক করুন।” (সূরা আন-নাহল: ১২৫)। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) খারেজীদের সাথে ঐতিহাসিক মুনাজারা করে হাজার হাজার খারেজীকে সুপথে ফিরিয়ে এনেছিলেন।

  • খ. নিন্দনীয় ঝগড়া ও অহংকারপ্রসূত বিতর্ক (الجدل المذموم):

    সত্যকে জানার উদ্দেশ্য ছাড়া কেবল আত্মঅহংকার প্রদর্শন, প্রতিপক্ষকে অপমান করা, কিংবা সংশয় সৃষ্টি করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য বাদানুবাদে লিপ্ত হওয়া কঠোরভাবে হারাম ও কবিরা গুনাহ।

    হাদিসের হুঁশিয়ারি: রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
    «أَنَا زَعِيمٌ بِبَيْتٍ فِي رَبَضِ الْجَنَّةِ لِمَنْ تَرَكَ الْمِرَاءَ وَإِنْ كَانَ مُحِقًّا» (যে ব্যক্তি সত্যের ওপর থাকা সত্ত্বেও অযথা বিতর্ক ও ঝগড়া পরিহার করবে, আমি তার জন্য জান্নাতের তলদেশে একটি প্রাসাদের জিম্মাদার হলাম—আবু দাউদ)।

উপসংহার

দ্বীনের সত্যকে সমুন্নত রাখতে ‘মুজাদালা বিল আহসান’ কাম্য, কিন্তু ব্যক্তিগত অহংকার ও দলীয় অন্ধত্বের নিরর্থক বাদানুবাদ ঈমানের নূর কেড়ে নেয়।

৭। ما هي العقيدة الصحيحة في إثبات الميزان والحساب والصراط والحوض والشفاعة؟ بين موضحا ومدللا –

[الميزان, الحساب, الصراط, الحوض এবং الشفاعة এইগুলোর বিষয়ে সহিহ আকিদা কী? দলিলসহ বিস্তারিত আলোচনা কর।]

[মান: ১৬]

ভূমিকা ও আখেরাতের সত্যতা

ঈমান বিল আখেরাত বা পরকালের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা ঈমানের অবিচ্ছেদ্য স্তম্ভ। কিয়ামতের দিন সংঘটিত প্রতিটি ঘটনা সম্পর্কে পবিত্র কুরআন ও মুতাওয়াতির হাদিসে সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের বিশুদ্ধ আকিদা নিম্নরূপ:

১. আল-মিজান (الميزان – দাঁড়িপাল্লা)

কিয়ামতের দিন মানুষের ভালো ও মন্দ আমল ওজন করার জন্য আল্লাহ তাআলা একটি বাস্তব সুনির্দিষ্ট দাঁড়িপাল্লা স্থাপন করবেন, যার দুটি পাল্লা ও একটি নির্দেশক কাঁটা থাকবে।

দলিল: ﴿وَنَضَعُ الْمَوَازِينَ الْقِسْطَ لِيَوْمِ الْقِيَامَةِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئًا﴾ (আর আমি কিয়ামতের দিন ন্যায়বিচারের দাঁড়িপাল্লা স্থাপন করব, সুতরাং কারো প্রতি বিন্দুমাত্র জুলুম করা হবে না—সূরা আল-আম্বিয়া: ৪৭)।

২. আল-হিসাব (الحساب – কর্মের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব)

হাশরের ময়দানে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন স্বয়ং প্রতিটি বান্দাকে তার আমলনামা প্রদর্শন করবেন এবং তার জীবনের সমস্ত ছোট-বড় কাজের কৈফিয়ত তলব করবেন।

দলিল: ﴿فَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَابَهُ بِيَمِينِهِ ۝ فَسَوْفَ يُحَاسَبُ حِسَابًا يَسِيرًا﴾ (অতঃপর যার আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে, অতি সহজভাবে তার হিসাব গ্রহণ করা হবে—সূরা আল-ইনশিক্বাক্ব: ৭-৮)।

৩. আস-সিরাত (الصراط – পুলসিরাত)

পুলসিরাত হলো জাহান্নামের পিঠের ওপর স্থাপিত এক বাস্তব সেতু, যা সমস্ত মানবজাতিকে পার হতে হবে। এটি চুলের চেয়েও সূক্ষ্ম এবং তলোয়ারের চেয়েও ধারালো হবে। নেককার মুমিনগণ বিদ্যুতের গতিতে তা পার হয়ে জান্নাতে পৌঁছাবেন, আর পাপাচারী ও কাফেররা হড়কে জাহান্নামের অতল গহ্বরে নিক্ষিপ্ত হবে।

দলিল: ﴿وَإِنْ مِنْكُمْ إِلَّا وَارِدُهَا كَانَ عَلَى رَبِّكَ حَتْمًا مَقْضِيًّا﴾ (তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে তা অতিক্রম করবে না; এটি আপনার রবের এক অবধারিত সিদ্ধান্ত—সূরা মারইয়াম: ৭১)।

৪. আল-হাওদ (الحوض – হাউজে কাওসার)

হাশরের উত্তপ্ত ময়দানে তৃষ্ণার্ত উম্মতকে পান করানোর জন্য আল্লাহ তাআলা রাসুল (সা.)-কে এক সুবিশাল হাউজ দান করবেন, যার পানি দুধের চেয়ে সাদা, মধুর চেয়ে মিষ্টি এবং বরফের চেয়ে শীতল হবে। যে একবার তা পান করবে সে আর কখনো তৃষ্ণার্ত হবে না।

দলিল: রাসুল (সা.) বলেন: «حَوْضِي مَسِيرَةُ شَهْرٍ، مَاؤُهُ أَبْيَضُ مِنَ اللَّبَنِ» (আমার হাউজের পরিধি এক মাসের দূরত্বের সমান…—সহিহ বুখারি)।

৫. আশ-শাফাআত (الشفاعة – সুপারিশ)

কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহর অনুমতিক্রমে নবী-রাসুল, শহীদ ও ওলীগণ গুনাহগার মুমিনদের মাগফিরাতের জন্য সুপারিশ করবেন। রাসুল (সা.)-এর ‘মাক্বামে মাহমুদ’ বা ‘শাফাআতে কুবরা’র মাধ্যমে হাশরের বিচার শুরু হবে।

দলিল: ﴿مَنْ ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ﴾ (কে আছে যে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশ করবে?—সূরা আল-বাক্বারা: ২৫৫)। রাসুল (সা.) বলেন: «شَفَاعَتِي لأَهْلِ الْكَبَائِرِ مِنْ أُمَّتِي»।

উপসংহার

মুতাযিলারা এগুলোর রূপক ব্যাখ্যা করে বা অস্বীকার করে বিভ্রান্ত হয়েছে; কিন্তু আহলুস সুন্নাহর বিশুদ্ধ আকিদা হলো এ সমস্ত কিছুই অক্ষরে অক্ষরে সত্য ও চাক্ষুষ বাস্তব।

৮। ما هي عقيدة أهل السنة والجماعة في الكلام على الكتب المنزلة؟ تحدث عن ختم النبوات والرسالات بسيدنا ونبينا محمد صلى الله عليه وسلم بالأدلة –

[আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের আসমানী কিতাবসমূহের ব্যাপারে আকিদা কী? মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে নবুওয়তের সমাপ্তি বিষয়ে দলিলসহ আলোচনা কর।]

[মান: ১৬]

১. আসমানী কিতাবসমূহের ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহর আকিদা

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের অন্যতম মৌলিক ঈমান হলো আসমানী কিতাবসমূহের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা। এ সংক্রান্ত মূলনীতিসমূহ হলো:

  • ঐশী বাণীর সত্যতা: আল্লাহ তাআলা মানবজাতির হেদায়েতের জন্য যুগে যুগে নবীদের প্রতি যে কিতাব ও সহিফা নাজিল করেছেন, তা সবই আল্লাহর সত্য বাণী ছিল।
  • প্রধান চার কিতাব: তাওরাত (মুসা আ.-এর ওপর), যাবুর (দাউদ আ.-এর ওপর), ইঞ্জিল (ঈসা আ.-এর ওপর) এবং পবিত্র কুরআন (সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ সা.-এর ওপর)।
  • কুরআনের মাধ্যমে পূর্ববর্তী কিতাব রহিতকরণ ও শ্রেষ্ঠত্ব: পবিত্র কুরআন হলো সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ আসমানী কিতাব। কুরআন নাজিলের পর পূর্ববর্তী সমস্ত কিতাবের বিধানাবলি রহিত (মানসূখ) হয়ে গেছে। পূর্ববর্তী কিতাবগুলোতে মানবহস্তে বিকৃতি (তাহরীফ) ঘটলেও পবিত্র কুরআনকে আল্লাহ কিয়ামত পর্যন্ত বিকৃতি থেকে স্বয়ং সুরক্ষার দায়িত্ব নিয়েছেন:
    ﴿إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ﴾।

২. মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে নবুওয়ত ও রিসালাতের সমাপ্তি (খাতমুন নবুওয়ত)

ইসলামি আকিদার চূড়ান্ত ও সর্বাপেক্ষা স্পর্শকাতর ভিত্তি হলো ‘খাতমুন নবুওয়ত’ (ختم النبوة)। অর্থাৎ আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) হলেন মহান আল্লাহর প্রেরিত সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসুল। তাঁর মাধ্যমে নবুওয়তের দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। কিয়ামত পর্যন্ত আর কোনো নতুন নবীর আগমন ঘটবে না। যে ব্যক্তি তাঁর পরে কোনো প্রকার নবুওয়তের দাবি করবে সে কাফের, দাজ্জাল ও চিরস্থায়ী জাহান্নামী; এবং যে তাকে নবী মানবে সেও কাফের।

খাতমুন নবুওয়তের অকাট্য দলিলসমূহ

  • কুরআনুল কারিমের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা:

    ﴿مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِنْ رِجَالِكُمْ وَلَكِنْ رَسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ وَكَانَ اللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا﴾

    “মুহাম্মদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসুল এবং সর্বশেষ নবী (খাতামান নাবিয়্যীন)। আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ।” (সূরা আল-আহযাব: ৪০)।

  • মুতাওয়াতির হাদিস শরিফের অকাট্য প্রমাণ:
    • রাসুলুল্লাহ (সা.) হযরত আলীকে উদ্দেশ করে বলেন:

      «أَنْتَ مِنِّي بِمَنْزِلَةِ هَارُونَ مِنْ مُوسَى، إِلاَّ أَنَّهُ لاَ نَبِيَّ بَعْدِي»

      “মুসার কাছে হারুন যেমন ছিলেন আমার কাছে তুমি তেমনই, তবে পার্থক্য হলো—আমার পরে আর কোনো নবী নেই।” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)।

    • নবীজী (সা.) সুরম্য প্রাসাদের শেষ ইটের উপমা দিয়ে ইরশাদ করেন:
      «فَأَنَا اللَّبِنَةُ، وَأَنَا خَاتَمُ النَّبِيِّينَ» (আমিই সেই প্রাসাদের শেষ ইট এবং আমিই শেষ নবী)।
    • তিনি আরও বলেন: «لاَ نَبِيَّ بَعْدِي وَلاَ أُمَّةَ بَعْدَكُمْ» (আমার পরে কোনো নবী নেই এবং তোমাদের পরে কোনো নতুন উম্মত নেই)।
  • উম্মতের সর্বসম্মত ইজমা: সাহাবায়ে কেরাম ভণ্ড নবুওয়তের দাবিদার মুসাইলামা কাযযাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে সাহাবীদের জীবনের বিনিময়ে খাতমুন নবুওয়তের সুরক্ষা নিশ্চিত করেছিলেন।

উপসংহার

খাতমুন নবুওয়ত হলো ইসলামের পূর্ণতার প্রতীক। দ্বীন যেহেতু পরিপূর্ণ হয়ে গেছে (﴿الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ﴾), তাই নতুন কোনো নবীর আগমনের কোনো প্রয়োজন অবশিষ্ট নেই।

খ-অংশ (মান: ৫ × ৪ = ২০)

৯। فسر “الرحمن على العرش استوى” –

[“দয়াময় (আল্লাহ) আরশে সমাসীন।” ব্যাখ্যা কর।]

[মান: ৫]

পবিত্র আয়াতের পাঠ ও অনুবাদ

পবিত্র কুরআনের সূরা ত্বাহার ৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন স্বীয় মহিমান্বিত মর্যাদার বিবরণ দিয়ে ইরশাদ করেন:

﴿الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى﴾

“পরম দয়াময় আল্লাহ আরশের ওপর সমাসীন (ইসতিওয়া করেছেন)।” (সূরা ত্বাহা: ৫)।

কালামশাস্ত্রে আয়াতের তাৎপর্য ও আহলুস সুন্নাহর অবস্থান

ইসলামি কালামশাস্ত্রে এ আয়াতটি ‘মুতাশাবিহাত’ (সূক্ষ্ম ও অস্পষ্ট অর্থবোধক) আয়াতসমূহের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তাআলার কোনো শারীরিক দেহ, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, ওজন বা সীমা-পরিসীমা নেই। তিনি কোনো সৃষ্টির মতো সিংহাসনে শারীরিকভাবে বসার মুখাপেক্ষী নন; কারণ সৃষ্টির পূর্বে যখন কোনো আরশ বা আকাশ ছিল না, আল্লাহ তখনো পূর্ণরূপে বিরাজমান ছিলেন। এ আয়াতের মর্ম অনুধাবনে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের দুটি প্রামাণ্য শাস্ত্রীয় পদ্ধতি রয়েছে:

  • ১. সালাফে সালেহীনের পদ্ধতি (মানহাজুত তাফবীদ – منهج التفويض):

    সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন এবং ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেঈ ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর অনুসৃত নীতি হলো—আয়াতটির প্রতি কোনো প্রকার রূপ বা সাদৃশ্য কল্পনা না করে নিঃশর্ত ঈমান আনা এবং এর প্রকৃত স্বরূপের জ্ঞান আল্লাহর ওপর সোপর্দ করা। ইমাম মালিক (রহ.)-কে যখন এক ব্যক্তি ‘আল্লাহ কীভাবে আরশে সমাসীন হলেন’ জিজ্ঞেস করেছিল, তখন তিনি ঘর্মাক্ত হয়ে ঐতিহাসিক ফয়সালা দেন:

    «الاسْتِوَاءُ مَعْلُومٌ، وَالْكَيْفُ مَجْهُولٌ، وَالإِيمَانُ بِهِ وَاجِبٌ، وَالسُّؤَالُ عَنْهُ بِدْعَةٌ»

    “ইসতিওয়া শব্দটি আরবি ভাষায় সুপরিচিত ও জানা; কিন্তু মহান আল্লাহর ক্ষেত্রে এর স্বরূপ বা প্রকৃতি (কাইফিয়্যাত) মানববুদ্ধির পক্ষে জানা অসম্ভব; এর ওপর বিনা প্রশ্নে বিশ্বাস স্থাপন করা ওয়াজিব; আর এর স্বরূপ নিয়ে অহেতুক চুলচেরা দার্শনিক বিতর্ক তোলা বিদআত।”

  • ২. খালাফ ও পরবর্তী কালামবিদদের পদ্ধতি (মানহাজুত তা’বীল – منهج التأويل):

    পরবর্তী যুগে যখন মুজাসসিমা ও মুশাব্বিহারা আল্লাহকে রক্ত-মাংস বা আলোর দেহ বানিয়ে আরশের ওপর বসে থাকার মতো কুফরি প্রচারণা শুরু করে, তখন ইমাম আবুল হাসান আল-আশআরী ও ইমাম আবু মনসুর আল-মাতুরিদী (রহ.) সাধারণ মানুষের ঈমান রক্ষার্থে আরবি ভাষার অলঙ্কার অনুযায়ী এর উপযুক্ত ব্যাখ্যা প্রদান করেন। তাঁরা ‘ইসতিওয়া’ শব্দের অর্থ করেছেন: ‘ইসতীলা’ (استيلاء) বা সমগ্র নিখিল মহাবিশ্বের ওপর আল্লাহর অপ্রতিদ্বন্দ্বী সার্বভৌম ক্ষমতা, রাজত্ব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা। যেমন কবি আখতাল বলেছিলেন: «قَدِ اسْتَوَى بِشْرٌ عَلَى الْعِرَاقِ مِنْ غَيْرِ سَيْفٍ وَدَمٍ مُهْرَاقٍ» (বিশর কোনো যুদ্ধ ও রক্তপাত ছাড়াই ইরাকের সিংহাসন বা সার্বভৌম ক্ষমতা দখল করেছে)।

উপসংহার

আল্লাহ তাআলা আরশের ওপর সমাসীন—এ কথা যেমন সত্য, তেমনি আল্লাহ তাআলা কোনো ছয়টি দিক, স্থান বা সীমানার মুখাপেক্ষী নন—এটিও তাওহিদের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।

১০। ما هي آثار الشياطين على بني ادم؟ بين –

[আদম সন্তানের উপর শয়তানের প্রভাবগুলো কী? বর্ণনা কর।]

[মান: ৫]

ভূমিকা ও শয়তানের চিরন্তন শত্রুতা

মানবজাতির আদি পিতা হযরত আদম (আ.)-এর সৃষ্টির লগ্ন থেকেই ইবলিস শয়তান চরম অহংকারবশত সিজদা করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আল্লাহর দরবার থেকে বিতাড়িত হয়। অতঃপর সে কিয়ামত পর্যন্ত আদম সন্তানকে পথভ্রষ্ট করার জন্য অবকাশ গ্রহণ করে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে সতর্ক করে ঘোষণা করেন:
﴿إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمْ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوهُ عَدُوًّا إِنَّمَا يَدْعُو حِزْبَهُ لِيَكُونُوا مِنْ أَصْحَابِ السَّعِيرِ﴾ (নিশ্চয় শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য চিরশত্রু, অতএব তাকে শত্রুরূপেই গ্রহণ কর; সে তো কেবল তার দলকে এই আহ্বান জানায় যেন তারা জাহান্নামী হয়—সূরা ফাতির: ৬)।

আদম সন্তানের ওপর শয়তানের সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ও কূটকৌশলসমূহ

  • ১. অন্তরে সার্বক্ষণিক ওয়াসওয়াসা বা কুমন্ত্রণা দেওয়া: শয়তান মানুষের শিরায় শিরায় রক্তের মতো চলাচল করতে পারে। সে মানুষের অন্তরের গোপন কোণে প্রতিনিয়ত পাপ ও সন্দেহের বীজ বপন করে:
    ﴿الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ﴾।
  • ২. মন্দ ও পাপাচারকে চিত্তাকর্ষক রূপ দান (তাযয়ীন – التزيين): শয়তানের অন্যতম প্রধান কূটকৌশল হলো অশ্লীলতা, পরকীয়া, সুদ, মাদক, জুয়া এবং জুলুমকে ‘ব্যক্তিগত স্বাধীনতা’ বা ‘আধুনিক সংস্কৃতি’র চটকদার মোড়কে মানুষের চোখে লোভনীয় করে উপস্থাপন করা:
    ﴿وَزَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ أَعْمَالَهُمْ فَصَدَّهُمْ عَنِ السَّبِيلِ﴾ (শয়তান তাদের কার্যকলাপকে তাদের চোখে সুশোভিত করেছে এবং তাদের সত্যপথ থেকে নিবৃত্ত করেছে)।
  • ৩. শিরক ও নাস্তিকতার দিকে প্ররোচিত করা: শয়তানের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হলো কোনোভাবে মানুষকে আল্লাহর তাওহিদ থেকে বিচ্যুত করে কবরপূজা, ব্যক্তিপূজা বা নাস্তিক্যবাদের অন্ধকারে নিক্ষেপ করা।
  • ৪. পরিবার ও সমাজে সংঘাত ও পারস্পরিক শত্রুতা সৃষ্টি: স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ ঘটানো শয়তানের সবচেয়ে প্রিয় কাজ। এছাড়া সমাজে হিংসা, বিদ্বেষ, ধর্মান্ধতা ও রক্তপাত ছড়াতে শয়তান মদ ও জুয়ার মতো ধ্বংসাত্মক উপাদানকে ব্যবহার করে:
    ﴿إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ﴾।
  • ৫. সৎকাজে দারিদ্র্যের ভয় ও কৃপণতা সৃষ্টি করা: আল্লাহর পথে দান-সদকা করতে গেলে শয়তান মানুষকে ভবিষ্যতের অভাব ও দারিদ্র্যের ভয় দেখিয়ে দান করা থেকে বিরত রাখে (﴿الشَّيْطَانُ يَعِدُكُمُ الْفَقْرَ﴾)।

উপসংহার

শয়তানের এই ধ্বংসাত্মক প্রভাব থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহ তাআলা মুমিনদের সার্বক্ষণিক জিকির, ইখলাস এবং ‘আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম’ পড়ে আল্লাহর ঐশী দুর্গে আশ্রয় গ্রহণের অমোঘ নির্দেশ দিয়েছেন।

১১। أثبت ختم نبوة لمحمد صلى الله عليه وسلم بالقرآن والسنة –

[কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে মুহাম্মদ (স)-এর খতমে নবুয়ত সাব্যস্ত কর।]

[মান: ৫]

ভূমিকা ও খতমে নবুওয়তের মৌলিক গুরুত্ব

ইসলামি শরিয়তের আকাশচুম্বী মৌলিক আকিদা হলো ‘খাতমুন নবুওয়ত’ (ختم النبوة)। অর্থাৎ সাইয়্যিদুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) হলেন মহান আল্লাহর প্রেরিত সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী। তাঁর আগমনের মাধ্যমে নবুওয়তের সিলসিলা কিয়ামত পর্যন্ত চিরতরে রুদ্ধ হয়ে গেছে। এটি এমন এক সর্বজনস্বীকৃত স্বতঃসিদ্ধ সত্য, যা সামান্যতম অস্বীকারকারীও কাফের ও ইসলামের গণ্ডি থেকে সম্পূর্ণ বহিষ্কৃত।

১. পবিত্র কুরআনুল কারিম থেকে অকাট্য প্রমাণসমূহ

  • দ্ব্যর্থহীন কুরআনী ঘোষণা: আল্লাহ তাআলা সূরা আল-আহযাবে ইরশাদ করেন:

    ﴿مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِنْ رِجَالِكُمْ وَلَكِنْ رَسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ وَكَانَ اللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا﴾

    “মুহাম্মদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসুল এবং সর্বশেষ নবী (খাতামান নাবিয়্যীন)। আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ।” (সূরা আল-আহযাব: ৪০)। আরবি ভাষায় ‘খাতাম’ শব্দের অর্থ হলো চূড়ান্ত সিলমোহর, যা কোনো দলিল বা বস্তুর পরিসমাপ্তি ঘটায়।

  • দ্বীনের পরিপূর্ণতার ঘোষণা: সূরা আল-মায়িদায় ঘোষিত হয়েছে:
    ﴿الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الإِسْلاَمَ دِينًا﴾ (আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম এবং তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম—সূরা আল-মায়িদা: ৩)। দ্বীন যেহেতু স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে গেছে, তাই নতুন নবীর কোনো তাত্ত্বিক বা বাস্তব প্রয়োজনীয়তা অবশিষ্ট নেই।

২. সহিহ ও মুতাওয়াতির হাদিস শরিফের অকাট্য প্রমাণসমূহ

  • রিসালাত সমাপ্তির স্পষ্ট ঘোষণা: রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন:

    «إِنَّ الرِّسَالَةَ وَالنُّبُوَّةَ قَدِ انْقَطَعَتْ، فَلاَ رَسُولَ بَعْدِي وَلاَ نَبِيَّ»

    “নিশ্চয় রিসালাত ও নবুওয়তের ধারাবাহিকতা সম্পূর্ণরূপে সমাপ্ত হয়ে গেছে; অতএব আমার পরে আর কোনো রাসুলও আসবে না এবং কোনো নবীও আসবে না।” (জামে আত-তিরমিযী, সহিহ)।

  • অনুপম প্রাসাদের শেষ ইটের উপমা: রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমার ও পূর্ববর্তী নবীদের উপমা হলো এমন এক ব্যক্তির মতো যে একটি সুরম্য সুরম্য প্রাসাদ নির্মাণ করল কিন্তু তাতে একটিমাত্র ইটের স্থান খালি রেখে দিল। মানুষ তা দেখে মুগ্ধ হয়ে বলত: এই শেষ ইটটি বসালে কতই না সুন্দর হতো! অতঃপর রাসুল (সা.) বললেন:
    «فَأَنَا اللَّبِنَةُ، وَأَنَا خَاتَمُ النَّبِيِّينَ» (আমিই সেই শূন্যস্থানের শেষ ইট এবং আমিই নবুওয়তের ধারার সর্বশেষ নবী—সহিহ বুখারি)।
  • ভণ্ড নবীদের ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি: নবীজী (সা.) ইরশাদ করেছেন: আমার উম্মতের মধ্যে প্রায় ত্রিশজন চরম মিথ্যাবাদী দাজ্জালের জন্ম হবে, যাদের প্রত্যেকে নিজেকে নবী বলে দাবি করবে; অথচ আমিই শেষ নবী, আমার পরে আর কোনো নবী নেই।

উপসংহার

কুরআন ও মুতাওয়াতির হাদিসের আলোকে সুস্পষ্ট যে, কাদিয়ানী মির্যা গোলাম আহমদ বা অন্য যেকোনো নতুন নবুওয়তের দাবিদার হলো অভিশপ্ত কাযযাব ও দাজ্জাল।

১২। ما هي عقيدة أهل السنة والجماعة في بيان حقيقة الكسب والتوكل؟

[الكسب ও التوكل-এর হাকীকাত বর্ণনায় আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আকিদা বর্ণনা কর।]

[মান: ৫]

ভূমিকা ও মাসআলাদ্বয়ের গুরুত্ব

ইসলামি জীবনব্যবস্থায় মানবীয় প্রচেষ্টা ও আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাসের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে দুটি মৌলিক পরিভাষা—‘আল-কাসব’ (উপার্জন) এবং ‘আত-তাওয়াক্কুল’ (নির্ভরতা)। আহলুস সুন্নাহর ইমামগণ অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভারসাম্যের সাথে এ দুটির প্রকৃত হাকীকাত নির্ধারণ করেছেন।

১. ‘আল-কাসব’ (الكسب)-এর হাকীকাত ও সুন্নি আকিদা

কালামশাস্ত্রে জাবারিয়া (মানুষের কোনো ক্ষমতা নেই) এবং কাদারিয়্যা (মানুষ নিজেই তার কাজের একমাত্র স্রষ্টা)—এই দুই চরমপন্থার বিপরীতে আহলুস সুন্নাহর ইমাম আশআরী ও মাতুরিদী (রহ.) ‘কাসব তত্ত্ব’ পেশ করেন:

  • হাকীকাত: বান্দার সমস্ত কাজের একমাত্র সৃষ্টিকর্তা (খাল্লিক্ব) হলেন মহান আল্লাহ তাআলা; তবে আল্লাহ বান্দাকে ইচ্ছা ও বাছাই করার একটি স্বাধীন ক্ষমতা (ইখতিয়ার) দিয়েছেন। বান্দা যখন তার ইচ্ছা প্রয়োগ করে কোনো কাজ সম্পাদন করে, তখন তাকে ‘কাসব’ বা উপার্জন বলা হয়।
  • শারঈ দায়বদ্ধতা: বান্দা যেহেতু স্বাধীন ইচ্ছায় কাজটি নিজের সাথে যুক্ত করে, তাই সে সওয়াব বা শাস্তির সম্পূর্ণ অধিকারী হয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন:
    ﴿لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ﴾ (সে যা ভালো অর্জন করে তার ফল সে ভোগ করবে, আর যা মন্দ অর্জন করে তার দায়ভারও তার ওপর বর্তাবে—সূরা আল-বাক্বারা: ২৮৬)।

২. ‘আত-তাওয়াক্কুল’ (التوكل)-এর হাকীকাত ও সুন্নি আকিদা

ইসলামে তাওয়াক্কুল বলতে উপায়-উপকরণ বর্জন করে কর্মহীন অলস বসে থাকাকে বোঝায় না।

  • হাকীকাত: জীবনের যাবতীয় বৈধ বৈষয়িক উপায়-উপকরণ, শ্রম ও প্রস্তুতি শতভাগ গ্রহণ করার পর, ফলাফলের জন্য উপকরণের ওপর নির্ভর না করে কেবল মহান আল্লাহর কুদরত ও ফয়সালার ওপর অন্তরের চূড়ান্ত নির্ভরতা রাখাকে ‘তাওয়াক্কুল’ বলা হয়।
  • নবীজীর জীবন্ত দৃষ্টান্ত: রাসুলুল্লাহ (সা.) বদরের যুদ্ধে সর্বোচ্চ সামরিক কৌশল অবলম্বন করেছিলেন, বর্ম পরিধান করেছিলেন, কিন্তু ময়দানে সিজদায় পড়ে কেবল আল্লাহর কুদরতের কাছেই সাহায্য চেয়েছিলেন। এক বেদুঈনকে তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন:
    «اعْقِلْهَا وَتَوَكَّلْ» (আগে উটের পা শক্ত করে বাঁধো, অতঃপর আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল কর—তিরমিযী)।

উপসংহার

উপায়-উপকরণ অবলম্বন করা হলো সুন্নাত ও শরিয়তের বিধান, আর অন্তরে আল্লাহর ওপর নির্ভর রাখা হলো তাওহিদ ও ঈমানের প্রাণ। কাসব ও তাওয়াক্কুলের এই যুগল সমন্বয়েই মুসলিমের প্রকৃত আত্মিক বিজয় নিহিত।

১৩। ما هي العقيدة صحيحة في إثبات كرامات الأولياء؟

[আওলিয়াদের কারামাত বিষয়ে বিশুদ্ধ আকিদা কী?]

[মান: ৫]

ভূমিকা ও কারামাতের সংজ্ঞা

ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় ‘কারামত’ (كرامات الأولياء) বলা হয়: নবীদের অনুসারী কোনো খাঁটি মুত্তাক্বী ও পরহেজগার ওলীর মাধ্যমে নবুওয়তের দাবি ছাড়া স্বভাববিরুদ্ধ কোনো অলৌকিক ঘটনা প্রকাশিত হওয়াকে কারামত বলা হয়। নবীদের অলৌকিক ঘটনাকে ‘মোজেজা’ বলা হয়, আর ওলীদের অলৌকিক ঘটনাকে ‘কারামত’ বলা হয়।

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের বিশুদ্ধ আকিদা

আহলুস সুন্নাহর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো: আল্লাহর প্রিয় ওলীদের কারামত সম্পূর্ণ সত্য ও প্রমাণিত (كرامات الأولياء حق)। তবে কারামতের মাধ্যমে ওলীরা স্বয়ং কোনো অলৌকিক শক্তির মালিক হন না; বরং আল্লাহ তাআলাই স্বীয় কুদরতে তাঁদের সম্মানিত করার জন্য তা প্রকাশ করেন।

পবিত্র কুরআন থেকে কারামতের অকাট্য প্রমাণসমূহ

  • ১. হযরত মারইয়াম (আ.)-এর ঘটনা: হযরত মারইয়াম কোনো নবী ছিলেন না; অথচ তিনি যখন নির্জনে মেহরাবে ইবাদত করতেন, তখন বেহেশত থেকে অলৌকিকভাবে গ্রীষ্মকালে শীতের ফল এবং শীতকালে গ্রীষ্মের ফল আসত। কুরআন ইরশাদ করে: ﴿كُلَّمَا دَخَلَ عَلَيْهَا زَكَرِيَّا الْمِحْرَابَ وَجَدَ عِنْدَهَا رِزْقًا﴾ (সূরা আলে ইমরান: ৩৭)।
  • ২. আসহাবে কাহাফের ঘটনা: আসহাবে কাহাফের যুবকেরা কোনো নবী ছিলেন না; অথচ ঈমান রক্ষার তাগিদে গুহায় আশ্রয় নিলে আল্লাহ তাঁদের দীর্ঘ ৩০৯ বছর অক্ষত অবস্থায় জীবিত রেখেছিলেন (সূরা আল-কাহাফ)।
  • ৩. হযরত সুলাইমান (আ.)-এর দরবারের ঘটনা: কিতাবের জ্ঞানধারী আলেম আসাফ ইবনে বারখিয়া চোখের পলক ফেলার আগেই রানি বিলক্বিসের সুবিশাল সিংহাসন ইয়েমেন থেকে ফিলিস্তিনে হাজির করেছিলেন (﴿أَنَا آتِيكَ بِهِ قَبْلَ أَنْ يَرْتَدَّ إِلَيْكَ طَرْفُكَ﴾)।

মুতাযিলাদের ভ্রান্তি ও তার জবাব

মুতাযিলারা কারামত অস্বীকার করে বলেছিল—কারামত মানলে মোজেজার সাথে তালগোল পাকিয়ে যাবে। আহলুস সুন্নাহ জবাব দেন—নবীর ক্ষেত্রে নবুওয়তের প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ থাকে, আর ওলীর ক্ষেত্রে কোনো চ্যালেঞ্জ থাকে না। প্রকৃতপক্ষে ওলীর কারামতও তাঁর নবীর মোজেজারই এক পরোক্ষ প্রতিফলন।

উপসংহার

তবে কোনো ভণ্ড বা শরিয়ত লঙ্ঘনকারী ব্যক্তির অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ড কারামত নয়, তা শয়তানী ইন্দ্রজাল বা ‘ইসতিদরাজ’। শরিয়তের ওপর অবিচল থাকাই হলো সর্বশ্রেষ্ঠ কারামত (الاستقامة فوق الكرامة)।

১৪। علق على اثنين : المناظرة، النفخ، البعث، النشور –

[টীকা লেখ (যেকোনো দুটি): মুনাজারা, ফুৎকার (সিঙ্গায় ফুঁক), পুনরুত্থান, হাশরের ময়দানে একত্রীকরণ।]

[মান: ৫]

(ক) আন-নাফ্খ বা সিঙ্গায় ফুৎকার (النفخ في الصور)

আল্লাহ তাআলার নির্দেশে সম্মানিত ফেরেশতা হযরত ইসরাফিল (আ.) শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়ার মাধ্যমে কিয়ামত সংঘটিত করবেন। কুরআনে দুটি প্রধান ফুৎকারের কথা বর্ণিত হয়েছে:

  • ১. নাফখাতুস সা’ক্ব (نفخة الصعق – মহাপ্রলয়ের ফুৎকার): প্রথম ফুঁক দেওয়ামাত্রই আসমান ও জমিনের সমস্ত সৃষ্টি একযোগে মৃত্যুবরণ করবে এবং গোটা নিখিল বিশ্ব চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে।
  • ২. নাফখাতুল বা’স (نفخة البعث – পুনরুত্থানের ফুৎকার): দীর্ঘ বিরতির পর দ্বিতীয়বার ফুঁক দেওয়ামাত্রই সমস্ত মৃত মানুষ ও জিন প্রাণ ফিরে পেয়ে এক নিমেষে কবর থেকে উত্থিত হয়ে হাশরের ময়দানের দিকে ছুটবে।

    কুরআনী দলিল: ﴿وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَصَعِقَ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَمَنْ فِي الأَرْضِ إِلاَّ مَنْ شَاءَ اللَّهُ ثُمَّ نُفِخَ فِيهِ أُخْرَى فَإِذَا هُمْ قِيَامٌ يَنْظُرُونَ﴾ (সূরা আয-যুমার: ৬৮)।

(খ) আল-বা’সু ওয়ান নুশুর (البعث والنشور – পুনরুত্থান ও হাশরে জমায়েত)

কিয়ামতের মহাপ্রলয়ের পর সমস্ত মানব ও জিন জাতিকে তাদের পার্থিব হিসাব-নিকাশের মুখোমুখি করার জন্য পুনরুজ্জীবিত করাকে ‘আল-বা’স’ এবং হাশরের ময়দানে একত্রিত করাকে ‘আন-নুশুর’ বলা হয়।

  • শারীরিক পুনরুত্থান: কালামশাস্ত্রবিদগণের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো—আল্লাহ তাআলা মানুষের রূহ ও দেহ উভয়ের সমন্বয়ে শারীরিক ও আত্মিক পুনরুত্থান ঘটাবেন। মানুষের লেজ সদৃশ ক্ষুদ্র অস্থি (আজবুয যানাব) থেকে আল্লাহ নতুনভাবে সৃষ্টি করবেন।
  • হাশরের অবস্থান: খালি পায়ে, উলঙ্গ দেহে এবং খতনাহীন অবস্থায় সমগ্র সৃষ্টি এক সমতল প্রান্তরে বিচার দিবসের চূড়ান্ত ফয়সালার জন্য ৫০ হাজার বছরের দীর্ঘ দিনে দণ্ডায়মান থাকবে।

    কুরআনী দলিল: ﴿كَمَا بَدَأْنَا أَوَّلَ خَلْقٍ نُعِيدُهُ وَعْدًا عَلَيْنَا إِنَّا كُنَّا فَاعِلِينَ﴾ (যেভাবে আমি প্রথম সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম, সেভাবেই আমি তার পুনরাবৃত্তি করব; এটি আমার ওয়াদা, নিশ্চয় আমি তা বাস্তবায়ন করব—সূরা আল-আম্বিয়া: ১০৪)।

উপসংহার

সিঙ্গায় ফুৎকার ও পুনরুত্থান প্রতিটি মানুষের জন্য এক পরম অনিবার্য মহাসত্য, যার প্রস্তুতি গ্রহণ করাই মানুষের জীবনের একমাত্র সার্থকতা।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

ফাযিল ১ম বর্ষ ইলমুল ফিরাক্ব ১ম পত্রের বিষয় কোড কত ছিল?

বিষয় কোড ছিল ১১১০২০ এবং পরীক্ষার পূর্ণমান ছিল ১০০ নম্বর। পরীক্ষার সময় ৩ ঘণ্টা।

হাদিসের আলোকে জাহান্নাম থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত একমাত্র দলের নাম কী?

আল-ফিরক্বাতুন নাজিয়াহ বা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আহ (রাসুল ও সাহাবীদের পথানুসারী)।

রাসুল (সা.)-এর পবিত্র মিরাজ কি জাগ্রত অবস্থায় হয়েছিল নাকি স্বপ্নে?

আহলুস সুন্নাহর সর্বসম্মত আকিদা হলো মিরাজ সম্পূর্ণ জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে সংঘটিত হয়েছিল।

কুরআন সংকলনে আবু বকর (রা.) ও উসমান (রা.)-এর মূল পার্থক্য কী ছিল?

আবু বকর (রা.) হারানো রোধে একত্র করেন, আর উসমান (রা.) প্রমিত কুরাইশি ভাষায় একক কিরাআতে আনেন।

পবিত্র কুরআনে হযরত লুকমান (আ.) কি নবী ছিলেন বলে উল্লেখ আছে?

না, জমহুর সাহাবী ও আলিমদের মতে তিনি নবী ছিলেন না; বরং অত্যন্ত প্রজ্ঞাবান ওলী ছিলেন।

খাতমুন নবুওয়তের মূল আকিদা কী?

হযরত মুহাম্মদ (সা.) সর্বশেষ নবী ও রাসুল; তাঁর পর নবুওয়তের দাবিদার ও তার অনুসারী কাফের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *