কামিল (স্নাতকোত্তর) হাদীস প্রথম পর্ব পরীক্ষা, ২০২৩
হাদীস বিভাগ — সপ্তম পত্র
বিষয়: দিরাসাতুত তাফসীর ওয়া উসূলিহী [নতুন সিলেবাস অনুযায়ী]
বিষয় কোড: ৬১১১০৭ | পূর্ণমান: ১০০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
الملاحظة : أجب عن أربعة من مجموعة (أ) وعن ثلاثة من مجموعة (ب) وعن أربعة من مجموعة (ج) وعن ثلاثة من مجموعة (د) وعن اثنين من مجموعة (هـ) وعن اثنين من مجموعة (و) –
কামিল (মাস্টার্স) হাদীস প্রথম পর্ব পরীক্ষা ২০২৩-এর ‘দিরাসাতুত তাফসীর ওয়া উসূলিহী’ (Dirasatut Tafsir wa Usulihi – বিষয় কোড: ৬১১১০৭) বিষয়ের মূল প্রশ্নপত্র এবং প্রতিটি বিভাগের প্রামাণ্য তাহকীক্বী ও একাডেমিক সমাধান নিচে উপস্থাপন করা হলো। উলূমুল কুরআন ও তাফসীর শাস্ত্রের অন্যতম শীর্ষ প্রামাণ্য গ্রন্থ ‘তাফসীরে কাশশাফ’ (আল্লামা যামাখশারী), গভীর কালামশাস্ত্র ও বালাগাত সমৃদ্ধ ‘তাফসীরে বায়যাবী’ (ইমাম কাযী বায়যাবী) এবং উসূলুত তাফসীরের মূলনীতিসমূহের আলোকে প্রস্তুতকৃত এ সমাধানটি কামিল পরীক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ প্রস্তুতিতে সহায়ক হবে।
প্রশ্নকাঠামো ও নম্বর বণ্টন নির্দেশিকা:
১. ‘ক’ বিভাগ (তাফসীরে কাশশাফ – আয়াত ব্যাখ্যা): ৮টি আয়াতাংশ হতে ৪টির উত্তর দিতে হয় (নম্বর: ৫ × ৪ = ২০)
২. ‘খ’ বিভাগ (তাফসীরে কাশশাফ – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন): ৬টি প্রশ্ন হতে ৩টির উত্তর দিতে হয় (নম্বর: ৫ × ৩ = ১৫)
৩. ‘গ’ বিভাগ (তাফসীরে বায়যাবী – আয়াত ব্যাখ্যা): ৮টি আয়াতাংশ হতে ৪টির উত্তর দিতে হয় (নম্বর: ৫ × ৪ = ২০)
৪. ‘ঘ’ বিভাগ (তাফসীরে বায়যাবী – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন): ৬টি প্রশ্ন হতে ৩টির উত্তর দিতে হয় (নম্বর: ৫ × ৩ = ১৫)
৫. ‘ঙ’ বিভাগ (উসূলুত তাফসীর – বিশদ প্রশ্ন): ৪টি প্রশ্ন হতে ২টির উত্তর দিতে হয় (নম্বর: ১০ × ২ = ২০)
৬. ‘চ’ বিভাগ (উসূলুত তাফসীর – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন): ৪টি প্রশ্ন হতে ২টির উত্তর দিতে হয় (নম্বর: ৫ × ২ = ১০)
(পরীক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতির স্বার্থে প্রতিটি বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলীর সমৃদ্ধ তাহকীক ও সমাধান নিচে সংযুক্ত করা হলো)।
١- مجموعة (أ) – تفسير الكشاف : ترجم الآيات التالية مع التفسير كما جاء في تفسير الكشاف :
(أ) الفاتحة: اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ * صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ –
(ب) آل عمران: الم * اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ * نَزَّلَ عَلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ وَأَنْزَلَ التَّوْرَاةَ وَالْإِنْجِيلَ * مِنْ قَبْلُ هُدًى لِلنَّاسِ وَأَنْزَلَ الْفُرْقَانَ –
(ج) آل عمران: هُوَ الَّذِي أَنْزَلَ عَلَيْكَ الْكِتَابَ مِنْهُ آيَاتٌ مُحْكَمَاتٌ هُنَّ أُمُّ الْكِتَابِ وَأُخَرُ مُتَشَابِهَاتٌ ۖ فَأَمَّا الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ زَيْغٌ فَيَتَّبِعُونَ مَا تَشَابَهَ مِنْهُ ابْتِغَاءَ الْفِتْنَةِ وَابْتِغَاءَ تَأْوِيلِهِ ۗ وَمَا يَعْلَمُ تَأْوِيلَهُ إِلَّا اللَّهُ ۗ وَالرَّاسِخُونَ فِي الْعِلْمِ يَقُولُونَ آمَنَّا بِهِ كُلٌّ مِنْ عِنْدِ رَبِّنَا ۗ وَمَا يَذَّكَّرُ إِلَّا أُولُو الْأَلْبَابِ –
(د) آل عمران: زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّسَاءِ وَالْبَنِينَ وَالْقَنَاطِيرِ الْمُقَنْطَرَةِ مِنَ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَالْخَيْلِ الْمُسَوَّمَةِ وَالْأَنْعَامِ وَالْحَرْثِ ۗ ذَلِكَ مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَاللَّهُ عِنْدَهُ حُسْنُ الْمَآبِ –
(هـ) آل عمران: قُلِ اللَّهُمَّ مَالِكَ الْمُلْكِ تُؤْتِي الْمُلْكَ مَنْ تَشَاءُ وَتَنْزِعُ الْمُلْكَ مِمَّنْ تَشَاءُ وَتُعِزُّ مَنْ تَشَاءُ وَتُذِلُّ مَنْ تَشَاءُ ۖ بِيَدِكَ الْخَيْرُ ۖ إِنَّكَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ –
(و) آل عمران: قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ ۗ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ –
(ز) آل عمران: إِذْ قَالَتِ امْرَأَتُ عِمْرَانَ رَبِّ إِنِّي نَذَرْتُ لَكَ مَا فِي بَطْنِي مُحَرَّرًا فَتَقَبَّلْ مِنِّي ۖ إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ –
(ح) آل عمران: إِنَّ أَوَّلَ بَيْتٍ وُضِعَ لِلنَّاسِ لَلَّذِي بِبَكَّةَ مُبَارَكًا وَهُدًى لِلْعَالَمِينَ * فِيهِ آيَاتٌ بَيِّنَاتٌ مَقَامُ إِبْرَاهِيمَ ۖ وَمَنْ دَخَلَهُ كَانَ آمِنًا ۗ وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا ۚ وَمَنْ كَفَرَ فَإِنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ عَنِ الْعَالَمِينَ –
[‘ক’ বিভাগ – তাফসীরে কাশশাফ: নির্বাচিত আয়াতসমূহের অনুবাদ ও প্রামাণ্য তাফসীর]
(১) আয়াত ১(ক)-এর বঙ্গানুবাদ ও তাফসীরে কাশশাফের তাহকীক্ব:
সরল অনুবাদ: “আমাদেরকে সরল-সঠিক পথ প্রদর্শন করুন। তাদের পথ, যাদের প্রতি আপনি অনুগ্রহ বর্ষণ করেছেন; তাদের পথ নয় যারা আপনার ক্রোধে নিপতিত হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে।” (সূরা আল-ফাতিহা: ৬-৭)
কাশশাফের বালাগাত ও নাহবী বিশ্লেষণ: আল্লামা আবুল কাসিম যামাখশারী (রহ.) বলেন, اهدنا শব্দটি মুমিন বান্দার পক্ষ থেকে দুআ ও মিনতি; যার অর্থ হলো ثبتنا على الهداية وزدنا منها অর্থাৎ “আমাদেরকে হিদায়াতের ওপর অটল রাখুন এবং প্রতিনিয়ত হিদায়াত বৃদ্ধি করে দিন।” একজন মুমিন ঈমান আনার পরও প্রতি ওয়াক্তে হিদায়াত প্রার্থনা করে, কারণ মৃত্যু পর্যন্ত হিদায়াতের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা একান্তভাবেই আল্লাহর তাওফীক্বের ওপর নির্ভরশীল। বাক্যটিতে صراط الذين أنعمت عليهم হলো পূর্ববর্তী الصراط المستقيم-এর জন্য ‘বদলুল কুল্ল’ (بدل الكل) বা ‘আতফে বায়ান’ (عطف بيان), যা বক্তব্যকে অধিকতর স্পষ্ট ও সুদৃঢ় করে। غير المغضوب عليهم ولا الضالين দ্বারা অভিশপ্ত ইয়াহুদী এবং সত্যত্যাগী খ্রিষ্টানদের বোঝানো হয়েছে। যামাখশারী উল্লেখ করেন, ক্রোধ প্রকাশের ক্ষেত্রে কর্তার উল্লেখ উহ্য রেখে কর্মবাচ্যের রূপ (المغضوب) আনা হয়েছে শিষ্টাচারের স্বার্থে, পক্ষান্তরে অনুগ্রহের ক্ষেত্রে সরাসরি আল্লাহকে কর্তা হিসেবে (أنعمت) সম্বোধন করা হয়েছে।
(২) আয়াত ১(গ)-এর বঙ্গানুবাদ ও তাফসীরে কাশশাফের তাহকীক্ব:
সরল অনুবাদ: “তিনিই সেই সত্তা, যিনি আপনার প্রতি এই কিতাব অবতীর্ণ করেছেন; যার মধ্যে কিছু আয়াত হলো ‘মুহকাম’ (সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন), এগুলোই কিতাবের মূল ভিত্তি; আর অন্যগুলো হলো ‘মুতাশাবিহ’ (রূপক বা যার মর্মার্থ অস্পষ্ট)। সুতরাং যাদের অন্তরে বক্রতা রয়েছে, তারা ফিতনা সৃষ্টি এবং মনগড়া ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে মুতাশাবিহ আয়াতের পেছনে ছুটে। অথচ এর প্রকৃত ব্যাখ্যা আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। আর যারা জ্ঞানে সুগভীর, তারা বলে—আমরা এতে বিশ্বাস স্থাপন করেছি, সবই আমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে আগত।” (সূরা আলে ইমরান: ৭)
কাশশাফের বিশ্লেষণ: যামাখশারী বলেন, المحكم হলো সেই সমস্ত আয়াত যার অর্থ সুস্পষ্ট এবং ব্যাকরণিক ও অর্থগত দিক থেকে কোনো ধরনের অস্পষ্টতা বা সংশয়ের অবকাশ থাকে না; এগুলো হলো أصل الكتاب যার ওপর শারঈ আহকাম ও দ্বীনের বুনিয়াদ প্রতিষ্ঠিত। পক্ষান্তরে المتشابه হলো সেই সমস্ত কালাম যার অর্থ একাধিকমুখী হতে পারে কিংবা রূপক অর্থের দাবি রাখে। অন্তরের বক্রতায় আক্রান্ত বিদআতী দলসমূহ মূল মুহকামাতকে উপেক্ষা করে মুতাশাবিহাত নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করে সমাজে বিভ্রান্তি ছড়ায়। وما يعلم تأويله إلا الله-এর পর ওয়াক্ফ করা সালাফদের অভিমত; যার অর্থ রূপক আয়াতের চূড়ান্ত রহস্য একমাত্র আল্লাহই জানেন।
(৩) আয়াত ১(ঙ)-এর বঙ্গানুবাদ ও তাফসীরে কাশশাফের তাহকীক্ব:
সরল অনুবাদ: “বলুন, হে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক আল্লাহ! আপনি যাকে ইচ্ছা রাজত্ব ও ক্ষমতা দান করেন এবং যার নিকট হতে ইচ্ছা ক্ষমতা ছিনিয়ে নেন; আপনি যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করেন এবং যাকে ইচ্ছা অপদস্থ করেন। আপনার হাতেই যাবতীয় কল্যাণ। নিশ্চয় আপনি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।” (সূরা আলে ইমরান: ২৬)
কাশশাফের নযম ও বালাগাত: যামাখশারী উল্লেখ করেন, এ আয়াতটি আল্লাহর পরম সার্বভৌমত্ব ও নিরঙ্কুশ কুদরতের শ্রেষ্ঠ প্রমাণ। আয়াতে বিপরীতধর্মী চারটি বিষয়ের অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে—রাজত্ব দান ও ছিনিয়ে নেওয়া (تؤتي وتنزع) এবং সম্মান ও অপমান (تعز وتذل)। একে অলঙ্কার শাস্ত্রে ‘তিবাক্ব’ (الطباق) বা ‘মুয়াকালাহ’ বলা হয়। بيدك الخير বাক্যে ‘শার’ (অকল্যাণ) উল্লেখ না করে কেবল ‘খাইর’ (কল্যাণ) উল্লেখ করা হয়েছে শিষ্টাচারমূলকভাবে (أدبا مع الله), যদিও বিশ্বজগতের ভালো-মন্দ সবকিছুর স্রষ্টা একমাত্র আল্লাহ তাআলা।
(৪) আয়াত ১(জ)-এর বঙ্গানুবাদ ও তাফসীরে কাশশাফের তাহকীক্ব:
সরল অনুবাদ: “নিশ্চয়ই মানবজাতির ইবাদতের জন্য সর্বপ্রথম যে গৃহটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা মক্কায় (বাক্কায়) অবস্থিত; যা কল্যাণময় এবং সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য হিদায়াতস্বরূপ। তাতে রয়েছে সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ—মাক্বামে ইবরাহীম; আর যে কেউ তাতে প্রবেশ করে সে নিরাপদ হয়ে যায়। আর মানুষের ওপর আল্লাহর পাওনা হলো এ ঘরের হজ্ব করা—যার সেখানে পৌঁছার আর্থিক ও শারীরিক সামর্থ্য রয়েছে।” (সূরা আলে ইমরান: ৯৬-৯৭)
কাশশাফের ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: যামাখশারী স্পষ্ট করেন যে, بكة ও مكة একই শহরের নাম। ভিড়ের কারণে মানুষ পরস্পরের সাথে ধাক্কাধাক্কি করে বলে একে ‘বাক্কা’ (من البك وهو الازدحام) বলা হয়। এটি পৃথিবীর সর্বপ্রথম উপাসনালয়, যা বাইতুল মুকাদ্দাসের ৪০ বছর পূর্বে নির্মিত হয়েছিল। ومن دخله كان آمنا বাক্যে জাহেলী যুগ থেকে আজ পর্যন্ত কাবার হারাম সীমানার অভয়ারণ্যের বৈশিষ্ট্য নির্দেশ করা হয়েছে। من استطاع إليه سبيلا হলো হজ্ব ফরজ হওয়ার অকাট্য শর্ত, যেখানে সাবীল দ্বারা পথখরচ, নিরাপত্তা ও বাহনের সামর্থ্য বোঝানো হয়েছে।
নির্বাচিত কুরআনিক শব্দাবলীর তাহকীক্বী আভিধানিক ছক (Lexical Table):
| শব্দ | অর্থ | মূল ধাতু (Root/Madda) | শব্দরূপ/ছীগাহ (Form/Sighah) | ব্যাকরণিক অবস্থান (Grammatical Role) |
|---|---|---|---|---|
| اهْدِنَا | আমাদের হিদায়াত করুন | ه – د – ي | فعل أمر للمتكلم مع الغير (দোআ) | فعل وفاعل ومفعول به |
| الصِّرَاطَ | সরল পথ | ص – ر – ط | اسم مفرد مذكر | مفعول به ثان منصوب |
| الْمَغْضُوبِ | যাদের ওপর গজব আপতিত | غ – ض – ب | اسم مفعول، مجرور | مضاف إليه مجرور |
| مُحْكَمَاتٌ | সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন আয়াতসমূহ | ح – ك – م | جمع مؤنث سالم، اسم مفعول | نعت لـ (آيات) مرفوع |
| تَنْزِعُ | আপনি ছিনিয়ে নেন | ن – ز – ع | فعل مضارع، واحد مذكر مخاطب | فعل مضارع مرفوع، فاعله مستتر |
٢- مجموعة (ب) – تفسير الكشاف (الأسئلة الموجزة) : أجب عن ثلاثة من الأسئلة التالية :
(أ) اكتب نبذة موجزة عن صاحب الكشاف وعقيدته وخدماته في التفسير –
(ب) بين عدد آيات سورة الفاتحة وهل البسملة آية منها؟ اذكر آراء العلماء –
(ج) اشرح قوله تعالى : “مِنْهُ آيَاتٌ مُحْكَمَاتٌ هُنَّ أُمُّ الْكِتَابِ” في ضوء تفسير الكشاف –
(د) اذكر أسماء سورة الفاتحة وفضائلها في ضوء القرآن والحديث –
(هـ) تحدث عن قصة مريم وابنها عليهما السلام بإيجاز –
(و) ما هو أول بيت وضع للناس في الأرض؟ بين تاريخ بناء الكعبة المشرفة –
[‘খ’ বিভাগ – তাফসীরে কাশশাফ: সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলীর একাডেমিক সমাধান]
(ক) তাফসীরে কাশশাফের রচয়িতা, তাঁর আক্বীদা ও তাফসীর সেবার মূল্যায়ন:
তাফসীরে কাশশাফের রচয়িতা হলেন প্রখ্যাত ভাষাতত্ত্ববিদ ও মুফাসসির আবুল কাসিম জারুল্লাহ মাহমুদ ইবনে উমর আয-যামাখশারী আল-খাওয়ারিজমী (৪৭৬-৫৩৮ হিজরী)। তিনি খোরাসানের যামাখশার নামক জনপদে জন্মগ্রহণ করেন এবং দীর্ঘকাল পবিত্র মক্কায় কা’বা শরীফের সান্নিধ্যে বসবাস করার কারণে ‘জারুল্লাহ’ (আল্লাহর প্রতিবেশী) উপাধিতে ভূষিত হন।
আক্বীদা ও মাযহাব: ফিকহের ক্ষেত্রে তিনি হানাফী মাযহাবের অনুসারী হলেও আক্বীদার ক্ষেত্রে মু’তাযিলা মতবাদের কট্টর সমর্থক ছিলেন। তিনি নিজের কিতাবে মু’তাযিলাদের পঞ্চমূলনীতি (তাওহীদ, আদল, ওয়াদ ও ওয়াইদ, আল-মানযিলাতু বাইনাল মানযিলাতাইন এবং আমর বিল মারুফ) কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে সাব্যস্ত করার প্রয়াস পেয়েছেন। তবে পরবর্তীতে ইমাম আহমদ ইবনুল মুনীর আল-ইসকান্দারী ‘আল-ইনসাফ’ এবং কাজী নাসিরুদ্দীন বায়যাবী তাঁর কিতাবে সুন্নী আক্বীদা দ্বারা এগুলোর নিখুঁত জবাব প্রদান করেছেন।
তাফসীরে কাশশাফের অতুলনীয় খেদমত: ইলমুল মা’আনী ও ইলমুল বায়ান তথা অলঙ্কার শাস্ত্রের সূক্ষ্ম প্রয়োগে কুরআনের অলৌকিক লালিত্য প্রমাণের ক্ষেত্রে ‘আল-কাশশাফ’ সমগ্র মুসলিম বিশ্বে এক অদ্বিতীয় মাইলফলক। ইমাম সুয়ূতী ও ইবনে খালদূন মন্তব্য করেছেন: যামাখশারীর তাফসীর ব্যতীত কুরআনের অলঙ্কার শাস্ত্রীয় সৌন্দর্য উপলব্ধি করা কারও পক্ষে সম্ভব নয়।
(খ) সূরা ফাতিহার আয়াত সংখ্যা ও বিসমিল্লাহর শারঈ মর্যাদা:
পবিত্র কুরআনের সূরা আল-ফাতিহার আয়াত সংখ্যা সর্বসম্মতিক্রমে ৭টি (سبعاً من المثاني)। তবে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম সূরা ফাতিহার স্বতন্ত্র আয়াত কি-না, তা নিয়ে চার মাযহাবের ফকীহ ও কারীগণের মধ্যে বিস্তারিত মতভেদ বিদ্যমান:
১. ইমাম শাফেঈ ও কূফী কারীগণের মত: ইমাম শাফেঈ (রহ.) এবং ইমাম আসিম ও হামযাহর মতে, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম হলো সূরা ফাতিহার প্রথম পূর্ণাঙ্গ স্বতন্ত্র আয়াত। তাঁদের মতে বিসমিল্লাহ ছাড়া ফাতিহার পূর্ণতা আসে না, বিধায় নামাজে সশব্দে বা নিঃশব্দে বিসমিল্লাহ পাঠ করা ফরজ।
২. ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর মত: তাঁদের মতে বিসমিল্লাহ হলো কুরআনের একটি স্বতন্ত্র বরকতপূর্ণ আয়াত, যা দুই সূরার মাঝে পার্থক্য করার জন্য এবং বরকতের উদ্দেশ্যে অবতীর্ণ হয়েছে; কিন্তু এটি সূরা ফাতিহা বা অন্য কোনো সূরার নিজস্ব অংশ নয়। ফলে সালাতে ইমাম ও মুক্তাদী নিঃশব্দে (সিররেন) বিসমিল্লাহ পাঠ করবেন।
৩. ইমাম মালিক (রহ.)-এর মত: ইমাম মালিকের মতে বিসমিল্লাহ সূরা ফাতিহার অন্তর্ভুক্ত নয় এবং ফরজ নামাজে তা পাঠ করা মাকরূহ, তবে নফল নামাজে পড়া জায়েয।
(গ) “مِنْهُ آيَاتٌ مُحْكَمَاتٌ هُنَّ أُمُّ الْكِتَابِ”-এর তাফসীর:
আল্লামা যামাখশারী ‘আল-কাশশাফ’-এ এ বাক্যের ব্যাখ্যায় বলেন: المحكمات হলো সেই সমস্ত দ্ব্যর্থহীন আয়াত যা ধর্মের মূল স্তম্ভ ও বুনিয়াদ নির্দেশ করে; যেমন হালাল-হারাম, তাওহীদ, রিসালাত, নামায, রোযা ও মৌলিক নৈতিক অনুশাসন। এগুলোকে أُمُّ الْكِتَابِ (কিতাবের জননী বা মূল ভিত্তি) বলা হয়েছে রূপক অর্থে; যেমন কোনো দলের নেতা বা কোনো বস্তুর মূল কেন্দ্রবিন্দুকে ‘উম্ম’ বলা হয়। কোনো মুতাশাবিহ বা রূপক আয়াত বুঝতে জটিলতা সৃষ্টি হলে তাকে এই মুহকাম আয়াতের মূলনীতির আলোকে ব্যাখ্যা করতে হবে। যারা মুহকামাতকে ভিত্তি না বানিয়ে মুতাশাবিহাতের পেছনে অন্ধের মতো ছুটে, তাদের অন্তরে রয়েছে সত্যের পথ থেকে বিচ্যুতি ও ফিতনা সৃষ্টির মানসিকতা।
(ঘ) সূরা ফাতিহার নামসমূহ ও ফজিলত:
সূরা ফাতিহার গুরুত্ব ও মর্যাদার কারণে হাদীসে এর বিশটিরও অধিক নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তন্মধ্যে প্রধান কয়েকটি হলো:
১. ফাতিহাতুল কিতাব (فاتحة الكتاب): যার মাধ্যমে কুরআনুল কারীমের তিলাওয়াত ও লিখন শুরু হয়।
২. উম্মুল কুরআন ও উম্মুল কিতাব (أم القرآن): কারণ সমগ্র কুরআনের মূল নির্যাস ও তাওহীদের শিক্ষামালা এতে সংক্ষিপ্তাকারে সন্নিবেশিত।
৩. আস-সাব’উল মাছানী (السبع المثاني): সাতটি আয়াত যা প্রতিটি সালাতের প্রতি রাকাতে বারবার তিলাওয়াত করা হয়।
৪. আশ-শিফা (الشفاء) ও আর-রুক্বইয়াহ: আত্মিক ও দৈহিক রোগব্যাধি নিরাময়ের মহৌষধ। বুখারী শরীফের হাদীসে একে ‘আযমুত সুরত ফিল কুরআন’ (কুরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ সূরা) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
٣- مجموعة (ج) – تفسير البيضاوي : ترجم الآيات التالية مع التفسير كما جاء في تفسير البيضاوي :
(أ) البقرة: الم * ذَلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ ۛ فِيهِ ۛ هُدًى لِلْمُتَّقِينَ * الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ –
(ب) البقرة: وَإِنْ كُنْتُمْ فِي رَيْبٍ مِمَّا نَزَّلْنَا عَلَىٰ عَبْدِنَا فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِنْ مِثْلِهِ وَادْعُوا شُهَدَاءَكُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ –
(ج) البقرة: وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً ۖ قَالُوا أَتَجْعَلُ فِيهَا مَنْ يُفْسِدُ فِيهَا وَيَسْفِكُ الدِّمَاءَ وَنَحْنُ نُسَبِّحُ بِحَمْدِكَ وَنُقَدِّسُ لَكَ ۖ قَالَ إِنِّي أَعْلَمُ مَا لَا تَعْلَمُونَ –
(د) البقرة: وَإِذْ قَالَ مُوسَىٰ لِقَوْمِهِ إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تَذْبَحُوا بَقَرَةً ۖ قَالُوا أَتَتَّخِذُنَا هُزُوًا ۖ قَالَ أَعُوذُ بِاللَّهِ أَنْ أَكُونَ مِنَ الْجَاهِلِينَ –
(هـ) البقرة: وَلَقَدْ آتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ وَقَفَّيْنَا مِنْ بَعْدِهِ بِالرُّسُلِ ۖ وَآتَيْنَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ الْبَيِّنَاتِ وَأَيَّدْنَاهُ بِرُوحِ الْقُدُسِ ۗ أَفَكُلَّمَا جَاءَكُمْ رَسُولٌ بِمَا لَا تَهْوَىٰ أَنْفُسُكُمُ اسْتَكْبَرْتُمْ فَفَرِيقًا كَذَّبْتُمْ وَفَرِيقًا تَقْتُلُونَ –
(و) البقرة: قُلْ مَنْ كَانَ عَدُوًّا لِجِبْرِيلَ فَإِنَّهُ نَزَّلَهُ عَلَىٰ قَلْبِكَ بِإِذْنِ اللَّهِ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ وَهُدًى وَبُشْرَىٰ لِلْمُؤْمِنِينَ –
(ز) البقرة: مَا نَنْسَخْ مِنْ آيَةٍ أَوْ نُنْسِهَا نَأْتِ بِخَيْرٍ مِنْهَا أَوْ مِثْلِهَا ۗ أَلَمْ تَعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ –
(ح) البقرة: رَبَّنَا وَاجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِنْ ذُرِّيَّتِنَا أُمَّةً مُسْلِمَةً لَكَ وَأَرِنَا مَنَاسِكَنَا وَتُبْ عَلَيْنَا ۖ إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ –
[‘গ’ বিভাগ – তাফসীরে বায়যাবী: নির্বাচিত আয়াতসমূহের অনুবাদ ও প্রামাণ্য তাফসীর]
(১) আয়াত ৩(ক)-এর বঙ্গানুবাদ ও তাফসীরে বায়যাবীর দার্শনিক বিশ্লেষণ:
সরল অনুবাদ: “আলিফ-লাম-মীম। এই সেই কিতাব, যাতে কোনো ধরনের সন্দেহ-সংশয়ের অবকাশ নেই; এটি মুত্তাক্বীদের জন্য পথপ্রদর্শক। যারা অদৃশ্যের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে, যথাযথভাবে সালাত কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যে রিযিক্ব দান করেছি তা হতে আল্লাহর সন্তুষ্টিতে ব্যয় করে।” (সূরা আল-বাক্বারা: ১-৩)
বায়যাবীর তাহকীক্ব: কাযী বায়যাবী (রহ.) বলেন, ذلك الكتاب-এ দূরবর্তী ইশারা (اسم إشارة للبعيد) ব্যবহার করা হয়েছে কুরআনের সুউচ্চ মাক্বাম ও মর্যাদার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য; যেন কিতাবটি মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের এমন এক সুউচ্চ শিখরে সমাসীন যার তুলনা মানব ইতিহাসে বিরল। لا ريب فيه দ্বারা সংশয়ের চিরন্তন মূলোৎপাটন করা হয়েছে। এটি কেবল একটি নিছক খবর বা তথ্য নয়, বরং এর মূল উদ্দেশ্য হলো النهي عن الشك অর্থাৎ এই ঐশী বাণীর সত্যতায় কোনো বুদ্ধিমান মানুষের বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ থাকতে পারে না। المتقين হলো সেই সকল আত্মসচেতন সাধক, যারা কুফর ও শিরক বর্জন করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে শরীয়তের বিধিনিষেধ পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসরণ করে।
(২) আয়াত ৩(খ)-এর বঙ্গানুবাদ ও তাফসীরে বায়যাবীর অলঙ্কার শাস্ত্রীয় বিশ্লেষণ:
সরল অনুবাদ: “আর আমি আমার বান্দা (মুহাম্মদ)-এর প্রতি যা নাযিল করেছি, তাতে যদি তোমরা কোনো সন্দেহে নিপতিত থাকো, তবে এর অনুরূপ একটিমাত্র সূরা রচনা করে নিয়ে এসো; এবং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের সমস্ত সাহায্যকারীদের ডেকে নাও, যদি তোমরা তোমাদের দাবিতে সত্যবাদী হয়ে থাকো।” (সূরা আল-বাক্বারা: ২৩)
বায়যাবীর বিশ্লেষণ ও কুরআনের মু’জিযাহ: কাযী বায়যাবী উল্লেখ করেন, এ আয়াতটিকে ‘আয়াতুত তাহাদ্দী’ (চ্যালেঞ্জের আয়াত) বলা হয়। সমগ্র আরবের খ্যাতনামা কবি, সাহিত্যিক ও অলঙ্কারবিদদের তাদের মাতৃভাষায় অবতীর্ণ কুরআন দিয়ে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল। مما نزلنا على عبدنا বাক্যে রাসূল (সা.)-কে ‘বান্দা’ হিসেবে সম্বোধন করার মাঝে তাঁর প্রতি আল্লাহর সর্বোচ্চ নৈকট্য ও ভালোবাসার প্রকাশ ঘটেছে। بِسُورَةٍ مِنْ مِثْلِهِ-তে আরবরা সম্পূর্ণ অক্ষম প্রমাণিত হয়ে চরম পরাজয় বরণ করে, যা প্রমাণ করে যে কুরআন মানুষের রচিত কোনো গ্রন্থ নয়; বরং অসীম কুদরতের মালিক মহান রবের চিরন্তন বাণী।
(৩) আয়াত ৩(গ)-এর বঙ্গানুবাদ ও বায়যাবীর কালামশাস্ত্রীয় পর্যালোচনা:
সরল অনুবাদ: “আর স্মরণ কর, যখন তোমার প্রতিপালক ফেরেশতাদের বললেন—নিশ্চয় আমি জমিনে একজন প্রতিনিধি (খলীফা) সৃষ্টি করতে যাচ্ছি। তারা বলল, আপনি কি সেখানে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন যে فساد (বিপর্যয়) সৃষ্টি করবে এবং রক্তপাত ঘটাবে? অথচ আমরাই তো আপনার প্রশংসাসহ পবিত্রতা ঘোষণা করি এবং আপনার মহিমা কীর্তন করি। তিনি বললেন, নিশ্চয় আমি যা জানি তোমরা তা জানো না।” (সূরা আল-বাক্বারা: ৩০)
বায়যাবীর গভীর তাফসীর: কাযী বায়যাবী স্পষ্ট করেন যে, خَلِيفَةً শব্দের অর্থ হলো আল্লাহর আহকাম ও আইন পৃথিবীতে বাস্তবায়নকারী প্রতিনিধি। ফেরেশতাদের এই উক্তিটি কোনো বিদ্রোহ বা অহংকারবশত ছিল না; বরং তা ছিল তাদের পূর্ববর্তী জিন জাতির ধ্বংসযজ্ঞের অভিজ্ঞতা থেকে উৎপন্ন বিস্ময় ও প্রজ্ঞার অন্বেষণ (استفهام استعلام وحكمة)। আল্লাহ তাআলা হযরত আদম (আ.)-কে বস্তুনিচয়ের নাম ও তত্ত্বজ্ঞান শিক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে প্রমাণ করে দিলেন যে, নিছক তাসবীহ ও যিকিরের চেয়ে বিচারিক প্রজ্ঞা ও দায়িত্বশীলতার বিচারে আদম সন্তানই খিলাফতের প্রকৃত হক্বদার।
(৪) আয়াত ৩(জ)-এর বঙ্গানুবাদ ও বায়যাবীর বিশ্লেষণ:
সরল অনুবাদ: “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের উভয়কে আপনার একান্ত অনুগত বান্দা করুন এবং আমাদের বংশধরদের মধ্য হতে আপনার প্রতি অনুগত একটি উম্মত সৃষ্টি করুন; আর আমাদেরকে হজের বিধিবিধান শিক্ষা দিন এবং আমাদের তওবা কবুল করুন; নিশ্চয় আপনি তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।” (সূরা আল-বাক্বারা: ১২৮)
বায়যাবীর তাফসীর: হযরত ইবরাহীম (আ.) ও ইসমাঈল (আ.) পবিত্র কা’বা গৃহ নির্মাণের পর এই ঐতিহাসিক দুআ করেছিলেন। বায়যাবী উল্লেখ করেন, مَنَاسِكَنَا হলো হজের স্থান ও ইবাদতের নিয়মাবলী (মুজদালিফা, মিনা, আরাফাত ও তাওয়াফ)। চরম আনুগত্য ও পবিত্র দায়িত্ব পালনের পরও আল্লাহর নিকট ‘তওবা’ প্রার্থনা করা শিক্ষা দেয় যে, বান্দার কোনো নেক আমলই আল্লাহর শান অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না; তাই আমল শেষে বিনম্র তওবা ও ইস্তিগফার করাই নবী-রাসূলগণের চিরন্তন আদর্শ।
তাফসীরে বায়যাবীর নির্বাচিত শব্দের তাহকীক্বী আভিধানিক ছক (Lexical Table):
| শব্দ | অর্থ | মূল ধাতু (Root/Madda) | শব্দরূপ/ছীগাহ (Form/Sighah) | ব্যাকরণিক অবস্থান (Grammatical Role) |
|---|---|---|---|---|
| رَيْبَ | সন্দেহ বা সংশয় | ر – ي – ب | اسم مفرد مذكر | اسم لا النافية للجنس مبني على الفتح |
| يُقِيمُونَ | তারা প্রতিষ্ঠা করে | ق – و – م | فعل مضارع، جمع مذكر غائب (إفعال) | صلة الموصول، فعل مرفوع بثبوت النون |
| يَسْفِكُ | রক্তপাত ঘটায় | س – ف – ك | فعل مضارع، واحد مذكر غائب | فعل مضارع معطوف مرفوع |
| خَلِيفَةً | প্রতিনিধি | خ – ل – ف | اسم فاعل (تاء للمبالغة) | مفعول به لاسم الفاعل (جاعل) منصوب |
| مَنَاسِكَنَا | আমাদের হজের নিয়মাবলী | ن – س – ك | جمع منسك، اسم مكان أو مصدر | مفعول به منصوب مضاف إلى ضمير المتكلمين |
٤- مجموعة (د) – تفسير البيضاوي (الأسئلة الموجزة) : أجب عن ثلاثة من الأسئلة التالية :
(أ) ما هي الحروف المقطعات؟ بين حكمها ومعانيها وأقوال العلماء فيها –
(ب) ما الاسم الكامل لتفسير البيضاوي؟ بين مزاياه وخصائصه تفصيلا –
(ج) ما معنى التقوى لغة واصطلاحا؟ بين مراتبه وفضائله في ضوء تفسير البيضاوي –
(د) ما معنى الكفر والنفاق؟ اذكر علامات النفاق في ضوء القرآن والسنة –
(هـ) بين قصة بني إسرائيل وواقعة ذبح البقرة بإيجاز –
(و) اشرح قوله تعالى : “وَإِنْ كُنْتُمْ فِي رَيْبٍ مِمَّا نَزَّلْنَا عَلَىٰ عَبْدِنَا” في ضوء تفسير البيضاوي –
[‘ঘ’ বিভাগ – তাফসীরে বায়যাবী: সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলীর একাডেমিক সমাধান]
(ক) হুরুফে মুকাত্তা’আতের পরিচয়, বিধান ও মুফাসসিরগণের অভিমত:
পবিত্র কুরআনের ২৯টি সূরার প্রারম্ভে বিচ্ছিন্নভাবে যে হরফসমূহ ব্যবহৃত হয়েছে (যেমন: الم, المر, الر, طه, يس, حم, ق, ن), সেগুলোকে উলূমুল কুরআনের পরিভাষায় ‘হুরুফে মুকাত্তা’আত’ (الحروف المقطعات) বলা হয়।
মুফাসসিরগণের অভিমত:
১. সালাফ ও জমহুর উলামায়ে কেরামের মত: এগুলো আল্লাহর কালামের এমন মুতাশাবিহাত যার প্রকৃত জ্ঞান ও ভেদ একমাত্র আল্লাহ তাআলাই জানেন (الله أعلم بمراده به)। বান্দা এতে বিনম্রভাবে ঈমান রাখবে।
২. ভাষাতাত্ত্বিক ও গবেষক মুফাসসিরগণের অভিমত: আরবরা হরফের ছন্দ ও অলঙ্কার নিয়ে গর্ব করত। আল্লাহ তাআলা এই হরফগুলো দিয়ে কুরআন শুরু করে আরবের কবিদের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন যে, এই কিতাব তোমাদের পরিচিত আরবী বর্ণমালা দিয়েই রচিত; তবুও তোমরা এর সমতুল্য একটি সূরা রচনা করতে অক্ষম। কাযী বায়যাবী উল্লেখ করেন, এ হরফগুলো সূরার বিশিষ্ট নাম কিংবা আল্লাহর মহিমান্বিত ইসমে আযমের অংশবিশেষও হতে পারে।
(খ) তাফসীরে বায়যাবীর পূর্ণ নাম ও এর অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ:
তাফসীরে বায়যাবীর পূর্ণ নাম হলো: أنوار التنزيل وأسرار التأويل (আনওয়ারুত তানযীল ওয়া আসরারুত তা’বীল)। এর রচয়িতা হলেন প্রখ্যাত দার্শনিক ও ফকীহ ইমাম নাসিরুদ্দীন আবু সাঈদ আব্দুল্লাহ ইবনে উমর আল-বায়যাবী আশ-শাফেঈ (ওফাত ৬৮৫ বা ৬৯১ হিজরী)।
কিতাবের অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ:
১. মু’তাযিলা মতবাদের নিখুঁত খণ্ডন: আল্লামা যামাখশারীর ‘কাশশাফ’ হতে বালাগাতের নির্যাস গ্রহণ করে তার মধ্যকার মু’তাযিলা আক্বীদা ও ভ্রান্ত তা’বীলসমূহকে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আশ’আরী আক্বীদা অনুযায়ী সংশোধন করা হয়েছে।
২. ইমাম রাযীর তাফসীরের সংক্ষিপ্তকরণ: ইমাম ফখরুদ্দীন রাযীর ‘তাফসীরে কাবীর’-এর গভীর দার্শনিক ও কালামশাস্ত্রীয় যুক্তিমালাকে অত্যন্ত সংক্ষেপে ও সুচারুভাবে সন্নিবেশিত করা হয়েছে।
৩. সংক্ষিপ্ত ও প্রাঞ্জল রচনাশৈলী (الإيجاز والإعجاز): অল্প শব্দে গভীর ভাব প্রকাশে কিতাবটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিশ্বখ্যাত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার সর্বোচ্চ ক্লাসের পাঠ্য হিসেবে সমাদৃত।
(গ) তাকওয়ার পরিচয়, স্তরভেদ ও ফজিলত:
আভিধানিক অর্থ: তাকওয়া (التقوى) শব্দটি ‘ওয়াক্বায়া’ (وقاية) মূল ধাতু হতে উদগত, যার অর্থ কোনো ক্ষতিকর বিষয় হতে নিজেকে রক্ষা করা বা ঢাল গ্রহণ করা।
পারিভাষিক অর্থ: আল্লাহর শাস্তির ভয়ে যাবতীয় নিষিদ্ধ ও পাপকাজ বর্জন করে তাঁর সন্তুষ্টির জন্য আদেশসমূহ পালন করার মাধ্যমে অন্তরে খোদাভীতি জাগ্রত রাখাকে তাকওয়া বলে।
কাযী বায়যাবীর মতে তাকওয়ার তিনটি স্তর:
১. তাকওয়ায়ে আম্মা (সাধারণ স্তর): শিরক ও কুফর বর্জন করে খাঁটি ঈমান গ্রহণ করার মাধ্যমে চিরস্থায়ী জাহান্নামের আগুন হতে নিজেকে রক্ষা করা।
২. তাকওয়ায়ে খাসসা (মধ্যম স্তর): কবিরা গুনাহ পরিত্যাগ করা, সগিরা গুনাহ পরিহার করা এবং শরীয়তের ফরয ও ওয়াজিবসমূহ নিয়মিত পালন করা।
৩. তাকওয়ায়ে খাচ্ছাতুল খাসসাহ (উচ্চতর ও পূর্ণাঙ্গ স্তর): মন ও মস্তিষ্ককে আল্লাহ ব্যতীত অন্য সমস্ত পার্থিব মোহ ও গায়রুল্লাহর খেয়াল হতে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করে একমাত্র আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন থাকা। এটিই সিদ্দিক্বীন ও আওলিয়ায়ে কেরামের স্তর।
(ঘ) কুফর ও নিফাক্বের পরিচয় এবং মুনাফিকদের আলামত:
কুফর (الكفر): আভিধানিক অর্থ ঢেকে রাখা বা অস্বীকার করা; শরীয়তের পরিভাষায় দ্বীনের কোনো অপরিহার্য সত্য বা অকাট্য বিধানকে জেনেশুনে অবিশ্বাস করা।
নিফাক্ব (النفاق): প্রকাশ্যে ইসলাম ও ঈমান প্রকাশ করা কিন্তু অন্তরে কুফর ও শত্রুতা গোপন রাখা।
মুনাফিকের আলামত: পবিত্র কুরআনে মুনাফিকদের চরিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে: তারা নামাজে দাঁড়ায় অত্যন্ত অলসতার সাথে এবং কেবল মানুষকে দেখানোর উদ্দেশ্যে (সূরা আন-নিসা)। আর সহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: “মুনাফিকের লক্ষণ চারটি—যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, অঙ্গীকার করলে তা ভঙ্গ করে, আমানত রাখা হলে তাতে খেয়ানত করে এবং যখন কোনো বিষয়ে বিবাদে লিপ্ত হয় তখন অশ্লীল গালিগালাজ করে।”
٥- مجموعة (هـ) – أصول التفسير (الأسئلة المفصلة) : أجب عن اثنين من الأسئلة التالية :
(أ) ما هي السور المكية والمدنية؟ اذكر ضوابطهما ومقاييسهما وأقوال العلماء فيها تفصيلا –
(ب) اذكر أقوال العلماء في أول ما نزل من القرآن الكريم مع بيان القول الصحيح والراجح مدللا –
(ج) لماذا أنزل القرآن الكريم منجما ومفرقا ولم ينزل جملة واحدة؟ بين الحكم والفوائد في ذلك –
(د) ما معنى جمع القرآن؟ بين المراحل التاريخية لجمع القرآن الكريم وتدوينه بالتفصيل –
[‘ঙ’ বিভাগ – উসূলুত তাফসীর: বিশদ প্রশ্নাবলীর প্রামাণ্য সমাধান]
(ক) মাক্কী ও মাদানী সূরার সংজ্ঞা, মানদণ্ড ও আলেমগণের অভিমত:
উলূমুল কুরআন ও উসূলুত তাফসীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো ‘ইলমুল মাক্কী ওয়াল মাদানী’। মাক্কী ও মাদানী সূরা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ইসলামী পণ্ডিতগণ তিনটি প্রধান মানদণ্ড উল্লেখ করেছেন:
১. হিজরতের সময়ভিত্তিক মানদণ্ড (مقياس الزمان – জমহুর মুহাদ্দিছীনদের মত): রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র হিজরতের পূর্বে নাযিলকৃত সমস্ত আয়াত বা সূরা মাক্কী—তা মক্কায় নাযিল হোক বা মক্কার বাইরে হিজরতের পথে নাযিল হোক। আর হিজরতের পর নাযিলকৃত সমস্ত আয়াত বা সূরা মাদানী—তা মদীনায় নাযিল হোক কিংবা মক্কা বিজয়ের সময় মক্কায় কিংবা কোনো যুদ্ধ সফরে নাযিল হোক। এটিই সর্বাধিক বিশুদ্ধ ও সর্বজনগ্রাহ্য মানদণ্ড।
২. স্থানভিত্তিক মানদণ্ড (مقياس المكان): যা মক্কা ও তার আশেপাশের অঞ্চলে (যেমন মিনা, আরাফাত, হুযাইবিয়া) অবতীর্ণ হয়েছে তা মাক্কী; আর যা মদীনা ও তার পার্শবর্তী অঞ্চলে (বদর, উহুদ, খন্দক) অবতীর্ণ হয়েছে তা মাদানী।
৩. সম্বোধনভিত্তিক মানদণ্ড (مقياس المخاطب): যাতে মক্কার মুশরিকদের সম্বোধন করে يَا أَيُّهَا النَّاسُ বলা হয়েছে তা মাক্কী; আর যাতে মদীনার মুমিনদের সম্বোধন করে يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا বলা হয়েছে তা মাদানী।
মাক্কী ও মাদানী জানার গুরুত্ব: এর মাধ্যমে শরীয়তের বিধানের নাসিখ ও মানসূখ (রহিত ও রহিতকারী) সুস্পষ্টভাবে জানা যায়, ইসলামের ইতিহাসের কালক্রমিক বিকাশ উপলব্ধি করা যায় এবং দাওয়াতি কাজের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা যায়।
(খ) কুরআনের সর্বপ্রথম অবতীর্ণ আয়াত ও সূরার বিষয়ে আলেমগণের অভিমত ও বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত:
কুরআনুল কারীমের সর্বপ্রথম কোন্ অংশটি নাযিল হয়েছিল, এ বিষয়ে মুহাদ্দিছ ও মুফাসসিরগণের মধ্যে চারটি প্রধান উক্তি রয়েছে:
১. প্রথম উক্তি (সর্বাধিক সহীহ ও জমহুরের মত): হেরা গুহায় জিবরাঈল (আ.) কর্তৃক সূরা আল-আলাক্ব-এর প্রথম পাঁচটি আয়াত—اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ সর্বপ্রথম অবতীর্ণ ওহী। হযরত আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত সহীহ বুখারীর দীর্ঘ হাদীস এর অকাট্য দলীল।
২. দ্বিতীয় উক্তি: হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী সূরা আল-মুদ্দাচ্ছির-এর প্রারম্ভিক আয়াত—يَا أَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ * قُمْ فَأَنْذِرْ সর্বপ্রথম নাযিল হয়।
৩. তৃতীয় উক্তি: পূর্ণাঙ্গ সূরা হিসেবে সূরা আল-ফাতিহা সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়।
৪. চতুর্থ উক্তি: সর্বপ্রথম বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম অবতীর্ণ হয়।
সমন্বয় ও রাজেহ সিদ্ধান্ত: ইমাম নববী, ইবনে হাজার আসকালানী ও সুয়ূতী (রহ.) চমৎকার সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, পরম সত্য হলো নবুওয়াতের সূচনায় পরম প্রথম ওহী ছিল সূরা আলাক্বের প্রথম ৫টি আয়াত। আর ওহী সাময়িক স্থগিত থাকার (ফাতরাতুল ওহী) পর রিসালাতের দায়িত্ব ঘোষণার সূচনা হিসেবে সর্বপ্রথম নাযিল হয়েছিল সূরা মুদ্দাচ্ছির। আর পূর্ণাঙ্গ সূরা হিসেবে প্রথম নাযিল হয়েছিল সূরা আল-ফাতিহা।
(গ) কুরআন একবারে নাযিল না হয়ে পর্যায়ক্রমে অবতীর্ণ হওয়ার ঐশী হিকমত:
পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহ (তাওরাত ও ইনজীল) একবারে ফলক বা কিতাব আকারে নাযিল হলেও মহাগ্রন্থ আল-কুরআন সুদীর্ঘ ২৩ বছর ধরে পর্যায়ক্রমে (মুনাজ্জামান ও মুফাররাকান) অবতীর্ণ হয়েছিল। কাফিররা এর ওপর আপত্তি তুলেছিল: لَوْلَا نُزِّلَ عَلَيْهِ الْقُرْآنُ جُمْلَةً وَاحِدَةً। আল্লাহ তাআলা কুরআনেই এর যৌক্তিক হেকমতসমূহ সুস্পষ্ট করেছেন:
১. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হৃদয়কে সুদৃঢ় করা (تثبيت فؤاد النبي): মক্কার কাফিরদের নিত্যনতুন নির্যাতন, ষড়যন্ত্র ও উপহাসের মুখে জিবরাঈল (আ.)-এর বারবার আগমন বিশ্বনবীর অন্তরকে আধ্যাত্মিক সান্ত্বনা ও অটল সাহসিকতা দান করত।
২. আহকামের পর্যায়ক্রমিক প্রবর্তন (التدرج في التشريع): আরবের মানুষ শত বছরের কুসংস্কার, মদপান ও জুয়ায় নিমজ্জিত ছিল। একবারে সমস্ত কঠিন আইন চাপিয়ে দিলে তারা ইসলাম গ্রহণ করতে পারত না। তাই ঈমান ও আখিরাত প্রতিষ্ঠার পর ধীরে ধীরে নামায, রোযা, যাকাত, মদ ও সুদের নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে প্রবর্তন করা হয়।
৩. মুখস্থকরণ ও হিফজের সহজীকরণ (تيسير الحفظ والفهم): আরব জাতি ছিল মূলত নিরক্ষর (উম্মী)। অল্প অল্প করে নাযিল হওয়ার কারণে সাহাবায়ে কেরাম সহজেই আয়াতসমূহ মুখস্থ ও জীবনে ধারণ করতে পেরেছিলেন।
৪. বাস্তব ঘটনার প্রেক্ষাপট ও প্রশ্নের জবাব দান: সাহাবা ও কাফিরদের উদ্ভূত বিভিন্ন সমস্যা ও প্রশ্নের সরাসরি ঐশী সমাধান প্রদানের মাধ্যমে দ্বীনের বাস্তব কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছিল।
(ঘ) কুরআন সংকলন (جمع القرآن) ও এর ঐতিহাসিক তিনটি পর্যায়:
উলূমুল কুরআনের পরিভাষায় ‘জামউল কুরআন’ বলতে কুরআনের সংরক্ষণ ও পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থাকারে সংকলনকে বোঝায়। এর প্রধান তিনটি ঐতিহাসিক পর্যায় রয়েছে:
১. প্রথম পর্যায় (রাসূলুল্লাহ সা.-এর যুগ): এ যুগে মূলত মুখস্থের মাধ্যমে সাহাবীদের বক্ষে এবং খেজুরের ডাল, পাতলা পাথর ও চামড়ায় কাতিবিনে ওহী কর্তৃক তা লিপিবদ্ধ রাখা হতো। জিবরাঈল (আ.) প্রতি রমযানে রাসূলের সাথে পূর্ণ কুরআনের ‘দাওর’ সম্পন্ন করতেন।
২. দ্বিতীয় পর্যায় (হযরত আবু বকর রা.-এর যুগ): ইয়ামামার যুদ্ধে বহু সংখ্যক হাফেযে কুরআন সাহাবী শহীদ হলে হযরত উমর (রা.)-এর পরামর্শে খলীফা আবু বকর (রা.) বিশিষ্ট কাতিবে ওহী যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর নেতৃত্বে একটি রাজকীয় কমিশন গঠন করেন। অত্যন্ত কঠোর বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডে (মুখস্থ ও লিখিত দুই সাক্ষীর প্রমাণ সাপেক্ষে) প্রথম পূর্ণাঙ্গ ‘মুসহাফ’ প্রস্তুত করা হয়।
৩. তৃতীয় পর্যায় (হযরত উসমান রা.-এর যুগ): আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান অভিযানে বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলিমদের কিরাআতের বৈচিত্র্য ও মতভেদের প্রেক্ষিতে খলীফা উসমান (রা.) কুরাইশদের প্রমিত উচ্চারণে একটি একক প্রামাণ্য মাসহাফ প্রস্তুত করে এর অনুলিপি বিশ্বের প্রধান প্রধান রাজধানীতে প্রেরণ করেন এবং অন্য সব ব্যক্তিগত কপি ভস্মীভূত করেন। এজন্য তাঁকে ‘জামেউল কুরআন’ (কুরআনকে এক রূপরেখায় ঐক্যবদ্ধকারী) বলা হয়।
٦- مجموعة (و) – أصول التفسير (الأسئلة الموجزة) : أجب عن اثنين من الأسئلة التالية :
(أ) اذكر أهم خصائص ومميزات السور المكية من حيث الأسلوب والموضوع –
(ب) ما هو آخر ما نزل من القرآن الكريم؟ اذكر أقوال الصحابة في ذلك –
(ج) ما هو المحكم والمتشابه؟ بين موقف السلف والخلف منهما –
(د) ما هي المعجزة؟ اذكر شروطها مع بيان وجوه إعجاز القرآن الكريم –
[‘চ’ বিভাগ – উসূলুত তাফসীর: সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলীর প্রামাণ্য সমাধান]
(ক) মাক্কী সূরার প্রধান বৈশিষ্ট্য ও বৈশিষ্ট্যসূচক আলামত:
মুহাদ্দিছ ও উসূলবিদগণ মাক্কী সূরার বিষয়বস্তু ও শৈলীগত বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য নির্ণয় করেছেন:
১. বিষয়বস্তুগত বৈশিষ্ট্য: তাওহীদের ডাক, রিসালাতের সত্যতা, কিয়ামত, জান্নাত-জাহান্নামের দৃশ্যপট, কাফিরদের সাথে বিতর্ক এবং পূর্ববর্তী নবী ও ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিসমূহের শিক্ষণীয় ইতিহাস আলোচনা।
২. শব্দশৈলীগত বৈশিষ্ট্য: মাক্কী সূরাসমূহের আয়াতগুলো সাধারণত নাতিদীর্ঘ, ছন্দোময় এবং অত্যন্ত তেজোদৃপ্ত ও অলঙ্কারপূর্ণ।
৩. চিহ্নসূচক মূলনীতি: (১) যে সমস্ত সূরায় ‘কাল্লা’ (كلا) শব্দ রয়েছে তা নিশ্চিতভাবে মাক্কী (কুরআনের শেষ অর্ধে এটি ৩৩ বার এসেছে); (২) যে সূরায় সিজদার আয়াত রয়েছে তা মাক্কী; (৩) সূরা বাক্বারা ছাড়া যে সূরায় আদম ও ইবলীসের ঘটনা রয়েছে তা মাক্কী; (৪) যে সূরায় يَا أَيُّهَا النَّاسُ আছে কিন্তু يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا নেই তা মাক্কী।
(খ) কুরআনের সর্বশেষ অবতীর্ণ আয়াত:
কুরআনের সর্বশেষ আয়াত কোনটি, এ বিষয়ে সাহাবা ও তাবেয়ীদের একাধিক উক্তি পাওয়া যায়:
১. সর্বাধিক বিশুদ্ধ ও প্রামাণ্য মত (ইবনে আব্বাস রা.-এর বর্ণনা): সূরা আল-বাক্বারার ২৮১ নম্বর আয়াতটি—وَاتَّقُوا يَوْمًا تُرْجَعُونَ فِيهِ إِلَى اللَّهِ ۖ ثُمَّ تُوَفَّىٰ كُلُّ نَفْسٍ مَا كَسَبَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ হলো সর্বশেষ অবতীর্ণ আয়াত। এ আয়াত নাযিল হওয়ার মাত্র ৯ দিন পর বিশ্বনবী (সা.) ওফাত পান।
২. সুদের আয়াত (ইবনে আব্বাস রা.): সূরা বাকারার সুদের শেষ আয়াতসমূহ—يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا।
৩. ঋণ সংক্রান্ত আয়াত (আয়াতুদ দাইন): সূরা বাকারার ২৮২ নম্বর দীর্ঘতম আয়াত।
৪. উম্মাহর দ্বীন পূর্ণতার আয়াত (হযরত উমর রা.): বিদায় হজের দিন নাযিলকৃত الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ।
সিদ্ধান্ত: ইবনুল আরাবী ও আল্লামা সুয়ূতী স্পষ্ট করেছেন যে, ‘আল-ইয়াওমা আকমালতু’ হলো হালাল-হারামের শারঈ আহকাম সমাপ্তির আয়াত; কিন্তু ওহীর সার্বিক আগমনের বিচারে সর্বশেষ নাযিলকৃত আয়াত হলো ‘ওয়াত্তাকূ ইয়াওমান তুরজাঊনা ফীহি ইলাল্লাহ’।
(গ) মুহকাম ও মুতাশাবিহ এবং সালাফ ও খালাফের দৃষ্টিভঙ্গি:
মুহকাম (المحكم): যার অর্থ স্বয়ংসম্পূর্ণ, স্পষ্ট এবং অন্য কোনো ব্যাখ্যার মুখাপেক্ষী হয় না।
মুতাশাবিহ (المتشابه): যার অর্থ প্রচ্ছন্ন এবং মানব বুদ্ধির সরাসরি উপলব্ধির বাইরে (যেমন: আল্লাহর সিফাত সংক্রান্ত আয়াত—রহমান আরশে সমাসীন, আল্লাহর হাত, ইত্যাদি)।
মুতাশাবিহাত সম্পর্কে উলামায়ে কেরামের দুটি ধারা:
১. সালাফদের পদ্ধতি (মাজহাবুত তাফবীয): কোনো প্রকার তুলনা (তাশবীহ), অঙ্গ নির্ধারণ (তাজসীম) বা নিষ্ক্রিয়করণ (তা’তীল) ব্যতীত আল্লাহর শানের উপযুক্ত অর্থে বিশ্বাস রেখে মূল রহস্য আল্লাহর জ্ঞানে সঁপে দেওয়া। তাঁরা বলতেন: আমিররূহা কামা জাআত বিলা কাইফ (যেমনি এসেছে তেমনি বিশ্বাস কর, কোনো স্বরূপ নির্ধারণ ছাড়াই)। এটিই সর্বাপেক্ষা নিরাপদ পথ।
২. খালাফদের পদ্ধতি (মাজহাবুত তা’বীল): সাধারণ মানুষকে ভ্রান্ত দ্বিমুখী চিন্তা ও জাহিলিয়্যাতের তাজসীম (দেহরূপ) হতে রক্ষা করার জন্য আরবী ভাষার সুবিশাল অলঙ্কারের আলোকে মর্যাদা ও উপযুক্ত রূপক অর্থে ব্যাখ্যা করা। যেমন আল্লাহর হাত দ্বারা কুদরত বা শক্তি এবং আরশে সমাসীন হওয়া দ্বারা সার্বভৌম কর্তৃত্ব বোঝানো।
(ঘ) মু’জিযাহ ও কুরআনের অলৌকিকত্বের (ই’জায) বিভিন্ন দিক:
মু’জিযার সংজ্ঞা ও শর্ত: নবুওয়াতের সত্যতা প্রমাণের স্বার্থে আল্লাহ তাআলা নবীদের মাধ্যমে যে অলৌকিক ঘটনা প্রকাশ করেন এবং যার মোকাবিলা করতে সমকালীন গোটা সৃষ্টিজগৎ অক্ষম প্রমাণিত হয়, তাকে মু’জিযাহ (المعجزة) বলে। এর শর্ত হলো—তা প্রকৃতির সাধারণ নিয়ম ভঙ্গকারী হতে হবে, চ্যালেঞ্জের সাথে যুক্ত হতে হবে এবং শত্রুপক্ষ তার মোকাবিলা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হতে হবে।
পবিত্র কুরআনের অলৌকিকত্বের (وجوه إعجاز القرآن) প্রধান দিকসমূহ:
১. নযম ও ভাষাতাত্ত্বিক বালাগাত: কুরআনের অনুপম ছন্দ, শব্দচয়ন ও অর্থগত গভীরতা যা মানবীয় শক্তির ঊর্ধ্বে। আরবের শ্রেষ্ঠ কবিরা এর একটি সূরার মোকাবিলা করতে পারেনি।
২. অদৃশ্যের নিখুঁত ভবিষ্যদ্বাণী: রোমানদের বিজয়, বদরের কাফিরদের শোচনীয় পরাজয়, মক্কা বিজয় ইত্যাদি অদৃশ্য বিষয়ের ভবিষ্যৎ ঘোষণা যা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হয়েছিল।
৩. অক্ষরজ্ঞানহীন নবীর মুখ দিয়ে মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্ব ও বিজ্ঞানের নিখুঁত বর্ণনা: ভ্রূণতত্ত্ব, মহাবিশ্ব সম্প্রসারণ, সমুদ্রের অন্ধকার ও জীবদেহের সৃষ্টি সম্পর্কিত এমন সব বৈজ্ঞানিক তথ্য যা তৎকালীন কোনো মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না।
৪. চিরন্তন ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনবিধান: মানবজীবনের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিটি সমস্যার এমন শাশ্বত সমাধান যা কিয়ামত পর্যন্ত অপরিবর্তনীয় ও কল্যাণকর।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. কামিল ১ম বর্ষ হাদীস ৭ম পত্রের নাম ও বিষয় কোড কী?
কামিল ১ম বর্ষ হাদীস বিভাগের ৭ম পত্রের নাম ‘দিরাসাতুত তাফসীর ওয়া উসূলিহী’ (Dirasatut Tafsir wa Usulihi) এবং এর প্রাতিষ্ঠানিক বিষয় কোড হলো ৬১১১০৭।
২. এ পত্রে কোন কোন তাফসীর ও শাস্ত্র অন্তর্ভুক্ত রয়েছে?
এ পত্রে মূলত আল্লামা যামাখশারীর ‘তাফসীরে কাশশাফ’, ইমাম কাজী বায়যাবীর ‘তাফসীরে বায়যাবী’ এবং উলূমুল কুরআনের মূলনীতি সম্বলিত ‘উসূলুত তাফসীর’ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
৩. তাফসীরে কাশশাফ পাঠের ক্ষেত্রে কোন্ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হয়?
আল্লামা যামাখশারী বালাগাত ও আরবি অলঙ্কার শাস্ত্রে অদ্বিতীয় পণ্ডিত হলেও আক্বীদার ক্ষেত্রে মু’তাযিলা মতাদর্শী ছিলেন; তাই তাঁর কিতাবে উল্লেখিত মু’তাযিলা ব্যাখ্যাগুলোকে সুন্নী আক্বীদার মানদণ্ডে সতর্কতার সাথে পড়তে হয়।
৪. তাফসীরে বায়যাবীর মূল নাম কী?
তাফসীরে বায়যাবীর মূল এবং পূর্ণাঙ্গ নাম হলো ‘আনওয়ারুত তানযীল ওয়া আসরারুত তা’বীল’ (أنوار التنزيل وأسرار التأويل), যা সংক্ষেপে তাফসীরে বায়যাবী নামে খ্যাত।
৫. মাক্কী ও মাদানী সূরা নির্ধারণের সর্বজনগ্রাহ্য মানদণ্ড কোনটি?
হিজরতের সময়ভিত্তিক মানদণ্ডই সর্বজনগ্রাহ্য। অর্থাৎ হিজরতের পূর্বে নাযিলকৃত সমস্ত অংশ মাক্কী এবং হিজরতের পর নাযিলকৃত সমস্ত অংশ মাদানী হিসেবে গণ্য হয়।
৬. এ বিষয়ে পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর অর্জনের মূল কৌশল কী?
আয়াতের শুদ্ধ অর্থ ও শানে নুযূলের সাথে মুফাসসিরগণের বালাগাত ও নাহবী বিশ্লেষণ উল্লেখ করা, ৫ কলামের শব্দ বিশ্লেষণ ছক প্রদান এবং উসূলের পরিভাষাগুলো প্রামাণ্য আরবী নসসহ সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা।

