কামিল (স্নাতকোত্তর) হাদীস দ্বিতীয় পর্ব পরীক্ষা, ২০২৪
সপ্তম পত্র
বিষয়: আল ফিকহুল মাযহাবী ওয়া ইলমুত তাসাউউফ [নতুন সিলেবাস অনুযায়ী]
বিষয় কোড: 611207 | পূর্ণমান: ১০০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
[الملاحظة : الأعداد بالهامش تدل على الدرجة الكاملة -]
القسم الأول : مجموعة (أ) – الفقه المذهبى (الدرجة – ৫০)
السؤال الأول : أجب عن ثلاثة من الأسئلة التالية (الدرجة – ১০ x ৩ = ৩০)
١- اجب عن ثلاثة من الاسئلة التالية :
[১. নিচের প্রশ্নগুলো থেকে যেকোনো তিনটির উত্তর দিন:]
(أ) ما الفقه؟ وما اهميته؟ وما الفرق بينه وبين اصول الفقه؟ بين دور الصحابة فى نشر الفقه بعد وفاة الرسول صلى الله عليه وسلم –
[(ক) ফিকহ কাকে বলে? এর গুরুত্ব কী? এবং উসূলে ফিকহের সাথে এর পার্থক্য কী? রাসুলুল্লাহ সা.-এর ওফাতোত্তর ফিকহ প্রসারে সাহাবায়ে কিরামের ভূমিকা বর্ণনা করুন।]
ইলমে ফিকহের শাব্দিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা:
১. শাব্দিক অর্থ: ‘ফিকহ’ (الفقه) শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো কোনো বিষয়ের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও সূক্ষ্ম তত্ত্ব গভীরভাবে উপলব্ধি করা এবং প্রজ্ঞার সাথে অনুধাবন করা। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: “যাতে তারা দ্বীনের গভীর প্রজ্ঞা অর্জন করতে পারে” (সুরা তাওবাহ: ১২২)। আভিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে কেবল বাহ্যিক জ্ঞান নয়, বরং কোনো বিষয়ের গভীর তলদেশে পৌঁছে তার নিহিতার্থ জানাকে ফিকহ বলা হয়।
২. পারিভাষিক অর্থ: শরীয়তের পরিভাষায় বিস্তারিত প্রামাণ্য দলিলসমূহ (কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস) থেকে আহরিত মানবজীবনের ব্যবহারিক ও প্রায়োগিক শরয়ী আহকাম বা বিধিবিধানের পুঙ্খানুপুঙ্খ জ্ঞানকে ‘ইলমে ফিকহ’ বলা হয়। ইমামুল আ’যম আবু হানিফা রহ. বলেন: “ফিকহ হলো নিজের অধিকার ও দায়দায়িত্ব সম্পর্কে পূর্ণ সচেতনতা অর্জন করা” (معرفة النفس ما لها وما عليها)। ইমাম শাফিয়ী রহ.-এর মতে: “বিস্তারিত দলিলের আলোকে শরীয়তের প্রায়োগিক বিধিবিধান জানার নাম ফিকহ।”
ইসলামী জীবনে ফিকহের গুরুত্ব:
মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত দৈনন্দিন ইবাদত (নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত) এবং পারস্পরিক লেনদেন (মু’আমালাত, বিবাহ, তালাক, বিচার, ব্যবসা-বাণিজ্য) বিশুদ্ধভাবে সম্পাদনের জন্য ফিকহের জ্ঞান অপরিহার্য। ফিকহ ছাড়া কুরআন ও সুন্নাহর বিধান বাস্তব জীবনে নির্ভুলভাবে প্রয়োগ করা অসম্ভব। কুরআনুল কারীমে সার্বিক বিধানের মূলনীতি বর্ণিত হয়েছে, কিন্তু সালাতের প্রতি রাকাতের ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নাত এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের বৈধ-অবৈধ শর্তাবলি ফিকহের মাধ্যমেই স্পষ্ট হয়। রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন: “আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে দ্বীনের গভীর ফিকহ (প্রজ্ঞা) দান করেন” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)। ফিকহ হলো উম্মাহর পথনির্দেশক আলোকবর্তিকা।
ফিকহ ও উসূলে ফিকহের মধ্যকার পার্থক্য:
১. উসূলে ফিকহ (আইনশাস্ত্রের মূলনীতি): এটি হলো সেই নিয়মাবলি ও মানদণ্ড যা কুরআন ও হাদিস থেকে শরয়ী হুকুম আহরণের কার্যপদ্ধতি নির্দেশ করে (যেমন: আম, খাস, মুজমাল, মুতলাক, মুকাইয়্যাদ, নাসখ ও তারজীহ সংক্রান্ত ব্যাকরণিক ও তাত্ত্বিক মূলনীতি)। এটি আইনের বীজ, ভিত্তি বা মানদণ্ড।
২. ফিকহ (ফলিত আইন): এটি হলো উসূলে ফিকহের মূলনীতি প্রয়োগ করে কুরআন ও সুন্নাহর নস থেকে অর্জিত বাস্তব ও সুনির্দিষ্ট শাখা-প্রশাখাগত বিধিবিধান (যেমন: নামাজ ফরজ, মদ হারাম, বেচাকেনায় পারস্পরিক সম্মতি শর্ত ইত্যাদি)। এটি আইনের শাখা-প্রশাখা ও সুমিষ্ট ফল। উসূলে ফিকহ হলো পদ্ধতি, আর ফিকহ হলো সেই পদ্ধতির চূড়ান্ত রূপ।
নবীজির ওফাতোত্তর ফিকহ প্রসারে সাহাবায়ে কিরামের ঐতিহাসিক ভূমিকা:
রাসুলুল্লাহ সা.-এর ওফাতের পর যখন নতুন নতুন রাজ্য বিজিত হলো এবং মুসলমানদের সামনে রোম, পারস্য ও সিরিয়ার মতো নতুন ভৌগোলিক পরিবেশে অভূতপূর্ব নতুন সমস্যা ও মাসআলা উদ্ভূত হলো, তখন সাহাবায়ে কিরাম উম্মতের নেতৃত্বের হাল ধরেন। হযরত উমর, আলী, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আয়েশা সিদ্দীকা, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস ও যায়েদ ইবনে সাবিত রা.-এর মতো প্রাজ্ঞ সাহাবিগণ কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে পরামর্শ ও ইজতিহাদ করে নতুন নতুন সমস্যার চমৎকার শরয়ী ফয়সালা প্রদান করেন। হযরত ইবনে মাসউদ কুফায় গিয়ে যে যুক্তিনির্ভর ফিকহী ধারা তৈরি করেছিলেন তা থেকেই পরবর্তীতে হানাফী মাযহাবের সূচনা হয় এবং হযরত ইবনে আব্বাস মক্কায় ও যায়েদ বিন সাবিত মদিনায় ফিকহী পাঠশালার নেতৃত্ব দিয়ে কিয়ামত পর্যন্ত উম্মতের জন্য ফিকহের পথ চির উন্মুক্ত করে দেন।
(ب) ما المذهب؟ وما العناصر الاساسية التى يقوم عليها المذهب الفقهى؟ وما حكم الالتزام بمذهب معين؟ بين مفصلا –
[(খ) মাযহাব কাকে বলে? ফিকহী মাযহাব যে মৌলিক উপাদানগুলোর ওপর প্রতিষ্ঠিত তা কী কী? এবং নির্দিষ্ট মাযহাব অনুসরণের শরয়ী বিধান কী? বিশদ বর্ণনা করুন।]
মাযহাবের শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ:
১. শাব্দিক অর্থ: ‘মাযহাব’ (المذهب) শব্দের আভিধানিক অর্থ চলার পথ, মতাদর্শ, বিশ্বাস বা গন্তব্য। এটি মূলত গমন করা বা চলার স্থানকে নির্দেশ করে।
২. পারিভাষিক অর্থ: কুরআন ও সুন্নাহর সামগ্রিক আলোড়ন ও মূলনীতি গভীরভাবে গবেষণা করে কোনো প্রাজ্ঞ মুজতাহিদ ইমাম যে সুনির্দিষ্ট ইজতিহাদী গবেষণা ও ফিকহী সিদ্ধান্তে উপনীত হন, তাকে ‘মাযহাব’ বলা হয়। যেমন হানাফী, মালেকী, শাফিয়ী ও হাম্বলী মাযহাব। মাযহাব কোনো নতুন ধর্ম বা কুরআন-সুন্নাহর সমান্তরাল কিছু নয়, বরং কুরআন ও সুন্নাহকে সঠিকভাবে বোঝার এক বিজ্ঞানসম্মত ও সুশৃঙ্খল নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।
মাযহাবের প্রধান মৌলিক উপাদানসমূহ (আল-আনাছিরুল আসাসিয়্যাহ):
একটি পূর্ণাঙ্গ ফিকহী মাযহাব মূলত চারটি সুদৃঢ় স্তম্ভ ও কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে:
১. মৌলিক দলিলের বিন্যাস (আদিল্লায়ে আরবাআহ): কিতাবুল্লাহ, সুন্নাতে রাসুলুল্লাহ, ইজমায়ে উম্মত এবং প্রামাণ্য কিয়াস—এই চারটিকে আইনের মূল উৎস হিসেবে গ্রহণ করা এবং এদের পারস্পরিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা।
২. উসূল বা ইস্তিম্বাতী মূলনীতি: শব্দের অর্থ নির্ধারণ, নসসের অগ্রাধিকার, সাধারণ ও বিশেষ বিধানের সমন্বয় এবং খাস-আম ও হাকীকত-মাজাযের ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট নিয়মাবলি প্রণয়ন করা।
৩. মুজতাহিদের সর্বোচ্চ যোগ্যতা: যিনি কুরআন, সুন্নাহ, আরবি সাহিত্য, আসমাউর রিজাল, নাসেখ-মানসূখ ও ইজমার বিষয়ে পূর্ণ পারদর্শী ইমাম হবেন।
৪. শাখা-প্রশাখাগত মাসআলার সুসংহত বিন্যাস: মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র—ইবাদাত, মুআমালাত, মুনাকাহাত ও জিনায়াতকে অধ্যায়ভিত্তিক সুসংহত সংকলনের রূপ দেওয়া।
নির্দিষ্ট মাযহাব অনুসরণের (ইলতিযামে মাযহাব) শরয়ী হুকুম:
সাধারণ মানুষ যারা স্বয়ং সরাসরি কুরআন ও হাদিস থেকে জটিল বিধান উদ্ঘাটন করার (মুজতাহিদ হওয়ার) গভীর জ্ঞান রাখে না, তাদের জন্য বিভ্রান্তি, প্রবৃত্তির দাসত্ব ও দ্বীনের বিকৃতি থেকে আত্মরক্ষার স্বার্থে যে কোনো একজন বিশ্বস্ত মুজতাহিদ ইমামের মাযহাব আঁকড়ে ধরা উম্মতের সর্বসম্মত ফতোয়া অনুযায়ী ওয়াজিব। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা পরিষ্কার নির্দেশ দিয়েছেন: “তোমরা জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করো যদি নিজেরা না জানো” (সুরা নাহল: ৪৩)। যদি নির্দিষ্ট মাযহাবের অনুশাসন ও বাধ্যবাধকতা না থাকত, তবে সাধারণ মানুষ নিজের সুবিধাজনক সুবিধাবাদী ফতোয়া খুঁজে খেয়ালখুশির অনুসরণ করত, যার ফলে দ্বীনের মৌলিক স্তম্ভগুলো দুর্বল হয়ে পড়ত। তাই উম্মতের ঐক্য, শৃঙ্খলা ও শরীয়তের পবিত্রতা রক্ষার স্বার্থে নির্দিষ্ট চার মাযহাবের যে কোনো একটির অনুসরণ সালাফে সালেহীনের অবিচ্ছিন্ন ঐতিহ্য।
(ج) ما المقصود بالتقليد؟ وما الفرق بين التقليد والاتباع والاجتهاد؟ وما حكم تقليد المذاهب الاربعة؟ وهل يجوز تقليد غير الائمة الاربعة؟ بين مفصلا –
[(গ) তাকলীদ বলতে কী বোঝায়? তাকলীদ, ইত্তিবা ও ইজতিহাদের মধ্যে পার্থক্য কী? চার মাযহাবের তাকলীদের হুকুম কী এবং চার ইমাম ব্যতীত অন্যের তাকলীদ কি জায়েজ? বিস্তারিত বর্ণনা করুন।]
তাকলীদের সংজ্ঞা:
১. শাব্দিক অর্থ: ‘তাকলীদ’ (التقليد) শব্দের মূল ধাতু হলো ‘ক্বিলাদাহ’ (قلادة), যার অর্থ গলায় হার বা রশি পরানো, নিঃশর্ত আনুগত্য বা অনুসরণ করা।
২. পারিভাষিক অর্থ: শরীয়তের কোনো বিশেষজ্ঞ মুজতাহিদ ইমামের ফতোয়া বা ইজতিহাদী সিদ্ধান্তকে কোনো অকাট্য প্রমাণের দাবি বা খুঁটিনাটি বিতর্ক ছাড়া কেবল তাঁর গভীর ইলম, খোদাভীতি ও বিশ্বস্ততার ওপর পূর্ণ ভরসা করে আমল করার উদ্দেশ্যে মেনে নেওয়াকে তাকলীদ বলে (العمل بقول الغير بغير حجة)।
তাকলীদ, ইত্তিবা ও ইজতিহাদের মধ্যকার সূক্ষ্ম পার্থক্য:
১. ইজতিহাদ (الاجتهاد): কুরআন ও সুন্নাহর মূল নস থেকে গবেষণা করে কোনো পূর্ণাঙ্গ যোগ্যতাসম্পন্ন মুজতাহিদ কর্তৃক সরাসরি শরয়ী বিধান আহরণ করার চরম বুদ্ধিবৃত্তিক সাধনা। এটি কেবল শীর্ষ মুজতাহিদ ইমামদের জন্য খাস।
২. ইত্তিবা’ (الاتباع): দলিল ও প্রমাণের প্রতি পূর্ণ সচেতনতা বজায় রেখে কুরআন, সুন্নাহ এবং সাহাবা-মুজতাহিদগণের সুদৃঢ় বক্তব্যের সরাসরি অনুসরণ করা। এটি মূলত আলেম ও গবেষক শ্রেণির জন্য প্রযোজ্য।
৩. তাকলীদ (التقليد): সাধারণ মানুষের জন্য কোনো মুজতাহিদের সিদ্ধান্তকে কোনো ব্যক্তিগত দলিল অন্বেষণ ছাড়া অবনত মস্তকে গ্রহণ করা। এটি সাধারণ মুসলিমদের দ্বীন পালনের একমাত্র নিরাপদ উপায়।
চার মাযহাবের তাকলীদের হুকুম এবং এদের বাইরে যাওয়ার বিধান:
১. চার মাযহাবের তাকলীদ: উম্মাহর সর্বস্তরের উলামায়ে কিরাম ও মুহাদ্দিসীন একমত হয়েছেন যে, হানাফী, মালেকী, শাফিয়ী ও হাম্বলী—এই চার মাযহাবের উসূল ও ফুরু’ লিখিত, সংকলিত ও সংরক্ষিত অবস্থায় লক্ষ লক্ষ ফকীহর যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে আমাদের কাছে পৌঁছেছে। ফলে এই চার মাযহাবের কোনো একটির তাকলীদ করা উম্মতের জন্য পরম নিরাপদ ও ওয়াজিব।
২. চার মাযহাবের বাইরে যাওয়ার হুকুম: চার মাযহাব ব্যতীত অন্য কোনো প্রাচীন মুজতাহিদের (যেমন সুফিয়ান সাওরী, লাইস ইবনে সাদ, ইমাম আওযাঈ বা ইবনে জারীর তাবারী) এমন কোনো মাযহাব সংরক্ষিত নেই যা দিয়ে পূর্ণাঙ্গ দ্বীন পালন সম্ভব। এছাড়া নিজের খেয়ালখুশিমতো বিভিন্ন মাযহাবের সহজ সহজ মতগুলোকে একত্র করে আমল করাকে ফিকহের পরিভাষায় ‘তালফীক্ব’ (التلفيق) বলা হয়। সালাফে সালেহীন ও আইম্মায়ে কিরামের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো, এমন তালফীক্বে বাতিল যা কোনো নির্দিষ্ট মাযহাবেই শুদ্ধ নয়, তা সম্পূর্ণ হারাম ও নাজায়েজ। অতএব চার মাযহাবের বাইরে গিয়ে অপ্রচলিত বিচ্ছিন্ন মত গ্রহণ করা এবং নতুন মাযহাব উদ্ভাবন করা উম্মাহর ইজমা অনুযায়ী প্রত্যাখ্যাত ও চরম বিভ্রান্তিকর।
(د) ما المذهب الحنفى؟ وما منهجه فى استنباط الاحكام؟ وما مكانة القياس فيه؟ بين مفصلا –
[(ঘ) হানাফী মাযহাব কাকে বলে? শরয়ী হুকুম ইস্তিম্বাতে এর পদ্ধতি ও মানহাজ কী? এবং এতে কিয়াসের মর্যাদা কী? বিশদভাবে বর্ণনা করুন।]
হানাফী মাযহাবের পরিচয়:
ইমামুল আ’যম হযরত আবু হানিফা নোমান ইবনে সাবিত আল-কুফী রহ. (৮০-১৫০ হি.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ফিকহী ধারাকে হানাফী মাযহাব বলা হয়। তিনি ছিলেন বিখ্যাত তাবেঈ, যিনি আনাস ইবনে মালেক রা.-সহ একাধিক সাহাবির সাক্ষাৎ লাভ করেছিলেন। এটি মুসলিম বিশ্বের সর্বাধিক বিস্তৃত, জনসমাদৃত ও রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যবহৃত প্রথম ও প্রধান ফিকহী মাযহাব। আব্বাসীয় খেলাফত, উসমানীয় খেলাফত এবং ভারতবর্ষের মুঘল সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রভাষা ও প্রধান দেওয়ানি-ফৌজদারি আইন ছিল এই হানাফী ফিকহ।
ইমাম আবু হানিফার হুকুম ইস্তিম্বাতের বৈজ্ঞানিক মানহাজ বা পদ্ধতি:
ইমাম আবু হানিফা রহ. নিজেই তাঁর ইস্তিম্বাতী মূলনীতি ঘোষণা করে বলেছেন:
১. সর্বপ্রথম আমি আল্লাহর কিতাব কুরআনুল কারীম থেকে সুস্পষ্ট হুকুম গ্রহণ করি।
২. কুরআনে সুস্পষ্ট বিধান না পেলে রাসুলুল্লাহ সা.-এর বিশুদ্ধ, মশহুর ও সুপ্রতিষ্ঠিত সুন্নাহর শরণাপন্ন হই।
৩. সুন্নাহতে না পেলে আমি সাহাবায়ে কিরামের সর্বসম্মত বক্তব্য গ্রহণ করি; আর সাহাবিদের মধ্যে মতভেদ থাকলে আমি তাঁদের মধ্য থেকে যার বক্তব্য কুরআন ও সুন্নাহর সার্বিক মূলনীতির সাথে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করি তা গ্রহণ করি, তবে সাহাবিদের মতের বাইরে আমি কখনোই যাই না।
৪. কিন্তু যখন বিষয়টি তাবেঈনদের (যেমন ইব্রাহিম নাখয়ী, শা’বী, হাসান বসরী, ইবনে সীরীন) পর্যায়ে পৌঁছে, তখন তাঁরাও পুরুষ (বিজ্ঞ গবেষক) ছিলেন আর আমরাও পুরুষ (মুজতাহিদ); অতএব সেখানে আমরা নিজস্ব ইজতিহাদ প্রয়োগ করি।
৫. এছাড়া তিনি ‘শুরা’ বা সংসদীয় পদ্ধতিতে আবু ইউসুফ, মুহাম্মাদ আশ-শায়বানী ও জুফারের মতো চল্লিশ জন শীর্ষ ফকীহ ও মুহাদ্দিস ছাত্রদের নিয়ে সম্মিলিত গবেষণার মাধ্যমে প্রতিটি মাসআলার সমাধান লিপিবদ্ধ করতেন।
হানাফী মাযহাবে কিয়াসের (القياس) মর্যাদা ও প্রয়োগ:
কিয়াস হলো কুরআন ও সুন্নাহর কোনো বিদ্যমান হুকুমের অন্তর্নিহিত মূল কারণের (ইল্লাত) উপস্থিতির ভিত্তিতে সমজাতীয় কোনো নতুন বিষয়ের ওপর একই শরয়ী হুকুম প্রয়োগ করা। হানাফী মাযহাবে কিয়াস একটি অতি শক্তিশালী প্রামাণ্য উৎস, তবে তা কুরআন ও সুন্নাহর পরবর্তী স্তরের। কোনো বিষয়ে স্পষ্ট নস (কুরআন বা হাদীস) থাকলে সেখানে কিয়াস সম্পূর্ণ বাতিল বলে গণ্য হয়। ইমাম আবু হানিফা রহ. কেবল তখনই কিয়াসের আশ্রয় নিতেন যখন কোনো স্পষ্ট সহীহ বা হাসান হাদিস পাওয়া যেত না। তাছাড়া কোনো হাদিসের রাবীর ফিকহী প্রজ্ঞা দুর্বল হলে বা হাদিসটি উসূলে শরীয়তের সাধারণ নিয়মের পরিপন্থী হলে হানাফী মাযহাবে সার্বিক মূলনীতির আলোকে কিয়াস ও ইসতিহসানকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।
(هـ) اكتب نبذة عن الصفات العلمية للامامين الشافعى ومالك رحمهما الله – ثم بين مكانة “عمل اهل المدينة” فى المذهب المالكى وموقف الشافعى منه –
[(ঙ) ইমাম শাফিয়ী ও ইমাম মালেক রহ.-এর ইলমী বৈশিষ্ট্যের সংক্ষিপ্ত বিবরণ লিখুন। অতঃপর মালেকী মাযহাবে ‘আমালু আহলিল মাদীনা’-এর মর্যাদা এবং এ বিষয়ে ইমাম শাফিয়ীর অবস্থান স্পষ্ট করুন।]
ইমাম মালেক ও ইমাম শাফিয়ী রহ.-এর ইলমী বৈশিষ্ট্যসমূহ:
১. ইমাম মালেক রহ. (৯৩-১৭৯ হি.): তিনি ছিলেন ‘ইমামু দারিল হিজরাহ’ ও হাদিসের অতন্দ্র প্রহরী। তাঁর প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল সুন্নাহর নিখুঁত অনুসরণ, রাবীদের বিশ্বস্ততার ব্যাপারে চরম সতর্কতা এবং মদিনার সামাজিক ও আমলী ঐতিহ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া। তিনি কল্পনাপ্রসূত অনুমানের চেয়ে সুদৃঢ় আছারের প্রতি বেশি অনুরাগী ছিলেন। তাঁর সংকলিত ‘মুওয়াত্তা’ হাদিস ও ফিকহের প্রাচীনতম নির্ভরযোগ্য ভিত্তিগ্রন্থ।
২. ইমাম শাফিয়ী রহ. (১৫০-২০৪ হি.): তিনি ছিলেন একাধারে ইমাম মালেকের প্রিয় ছাত্র এবং ইমাম আবু হানিফার প্রধান শিষ্য ইমাম মুহাম্মাদ আশ-শায়বানীর শীর্ষ ছাত্র। ফলে তিনি হিজাযের হাদিসবাদী ধারা (আহলুল হাদীস) এবং ইরাকের যুক্তিবাদী ধারার (আহলুর রায়) এক অপূর্ব সমন্বয় সাধন করেন। তিনি উসূলে ফিকহের প্রথম মৌলিক কিতাব ‘আর-রিসালাহ’ রচনা করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেন।
মালেকী মাযহাবে ‘আমালু আহলিল মাদীনা’ (মদিনাবাসীর আমল)-এর মর্যাদা:
ইমাম মালেক রহ.-এর ফিকহের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মৌলিক ভিত্তি হলো মদিনাবাসীর নিরবচ্ছিন্ন আমল। তাঁর যুক্তি হলো, মদিনায় রাসুলুল্লাহ সা. দশ বছর রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনা করেছেন এবং দশ হাজার সাহাবি সেখানে জীবন কাটিয়েছেন। মদিনাবাসীরা পিতা থেকে পুত্রের ধারাবাহিকতায় যে আমলগুলো প্রদর্শন করে আসছেন, তা কোনো একক সূত্রীয় খবরের ওয়াহেদ হাদিসের চেয়েও লক্ষ গুণে শক্তিশালী ও মুতাওয়াতির। তাই মালেকী মাযহাবে সাধারণ খবরে ওয়াহেদের ওপর আমালে আহলে মদিনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
আমালু আহলিল মদিনার ব্যাপারে ইমাম শাফিয়ী রহ.-এর সমালোচনামূলক অবস্থান:
ইমাম শাফিয়ী রহ. তাঁর উস্তায ইমাম মালেকের এই মূলনীতির সাথে জোরালো দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি তাঁর ‘জিমাউল ইলম’ ও ‘ইখতিলাফুল ইরাক্বিয়্যাইন’ গ্রন্থে প্রমাণ করেন যে, মদিনাবাসীর সকল মানুষের আমল সর্বদা এক ছিল না; সাহাবিদের বহু আমল চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। অতএব রাসুলুল্লাহ সা.-এর কোনো বিশুদ্ধ মারফূ’ হাদীস পাওয়া গেলে কেবল মদিনার কতিপয় লোকের আমলের অজুহাতে সেই সহীহ হাদীসকে পরিত্যাগ করা কোনোভাবেই সংগত নয়; সহীহ হাদিসই সর্বদা সকল মানুষের আমলের ওপর অগ্রাধিকার পাবে।
السؤال الثانى : أجب عن اربعة من الأسئلة التالية (الدرجة – ৫ x ৪ = ২০)
٢- اجب عن اربعة من الاسئلة التالية :
[২. নিচের প্রশ্নগুলো থেকে যেকোনো চারটির উত্তর দিন:]
(أ) اين يضع المصلى يديه؟ تحت السرة ام فوقها؟ بين بالدليل –
[(ক) নামাজে মুসল্লি হাত কোথায় বাঁধবে? নাভির নিচে নাকি নাভির ওপরে? দলিলের আলোকে স্পষ্ট করুন।]
ফিকহী পর্যালোচনা ও আইম্মায়ে কিরামের দলিল:
নামাজে তাকবীরে তাহরীমা সমাপ্তির পর কিয়াম অবস্থায় উভয় হাত কোথায় স্থাপন করতে হবে—এ বিষয়ে ফুকাহায়ে কিরামের মধ্যে সুপ্রসিদ্ধ মতভেদ বিদ্যমান রয়েছে। প্রধান প্রধান মাযহাবের দৃষ্টিভঙ্গি ও দলীলসমূহ নিম্নে পর্যালোচনা করা হলো:
১. হানাফী মাযহাব ও ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ.-এর একটি নির্ভরযোগ্য রেওয়ায়েত: পুরুষদের জন্য নামাজে হাত বাঁধার সুন্নাত স্থান হলো নাভির নিচে (তাহতাস সুররাহ)। এর সপক্ষে প্রধান দলীল হলো হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত প্রসিদ্ধ আছার, তিনি বলেন: “সুন্নাত হলো নামাজে এক হাত অপর হাতের ওপর রেখে নাভির নিচে স্থাপন করা” (সুনানে আবু দাউদ, মুসনাদে আহমাদ, মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বাহ)। হযরত ওয়ায়েল ইবনে হুজর রা.-এর এক বর্ণনায় ‘তাহতাস সুররাহ’ শব্দ স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। হানাফী ফকীহগণ আধ্যাত্মিক যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, নাভির নিচে হাত বাঁধায় বান্দার চূড়ান্ত বিনয়, নম্রতা, আত্মসমর্পণ ও পূর্ণাঙ্গ দাসত্বের সর্বোচ্চ প্রতিফলন ঘটে, যা কোনো সম্রাটের সামনে ভৃত্যের বিনম্রভাবে দাঁড়ানোর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। তবে নারীদের শারীরিক সতরের পূর্ণ পর্দা ও সংরক্ষণের স্বার্থে তাদের হাত বুকের ওপর স্থাপন করাই সুন্নাত।
২. ইমাম শাফিয়ী রহ.-এর মাযহাব: নাভির ওপরে এবং বুকের নিচে বাম স্তনের কাছাকাছি হাত রাখা উত্তম। তাঁদের দলীল হলো ওয়ায়েল ইবনে হুজর রা.-এর অপর রেওয়ায়েত, যেখানে বুকের কাছাকাছি হাত রাখার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তাঁদের মতে এটি কলবের কাছাকাছি থাকায় একাগ্রতা বৃদ্ধি করে।
৩. ইমাম মালেক রহ.-এর মাযহাব: মালেকী মাযহাবের মশহুর ফতোয়া অনুযায়ী ফরজ নামাজে উভয় হাত স্বাভাবিকভাবে ঝুলিয়ে দিয়ে (ইরসালুল ইয়াদাইন) নামাজ পড়া পছন্দনীয়, তবে নফল নামাজে হাত বাঁধার অবকাশ রয়েছে।
৪. তাহকীকী সারসংক্ষেপ: সালাফে সালেহীনের হাদিস ও আমলের আলোকেই এই মতভেদ তৈরি হয়েছে। হানাফী মাযহাবের আমলটি বহু সাহাবি ও তাবেঈর আমল এবং সুনানে আবু দাউদের বর্ণনার সাথে সংগতিপূর্ণ হওয়ায় তা অত্যন্ত প্রামাণ্য ও শক্তিশালী।
(ب) هل تنقض الصلاة اذا جهر المأموم بالتأمين؟ وما حكم اخفاءه؟ بين فى ضوء البراهين –
[(খ) মুক্তাদী জোরে আমীন বললে কি সালাত ভেঙে যাবে? এবং নীরবে আমীন বলার বিধান কী? প্রমাণের আলোকে তুলে ধরুন।]
সশব্দে আমীন বনাম নিঃশব্দে আমীন বলার ফিকহী বিশ্লেষণ:
নামাজে সুরা ফাতিহা পাঠের পর ‘আমীন’ বলার পদ্ধতি এবং মুক্তাদী সশব্দে আমীন বললে নামাজ ভেঙে যাবে কি না—এ বিষয়ে বিস্তারিত শরয়ী পর্যালোচনা নিচে তুলে ধরা হলো:
১. নামাজ ভঙ্গের হুকুম: যদি কোনো মুক্তাদী জামাতে কিরাতের পর সশব্দে উচ্চৈঃস্বরে আমীন বলে, তবে কোনো মাযহাব মতেই তার সালাত বা নামাজ বিনষ্ট হবে না। কারণ আমীন কোনো অপ্রাসঙ্গিক কথা নয়, বরং এটি একটি পবিত্র ও বরকতময় দোয়া, যার অর্থ হলো: “হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আমাদের এই প্রার্থনা কবুল করে নিন।” দোয়া পাঠে নামাজ ভঙ্গ হওয়ার কোনো কারণ নেই।
২. আমীন পাঠের পদ্ধতি সংক্রান্ত আইম্মায়ে কিরামের মতভেদ:
– হানাফী ও মালেকী মাযহাব: সুরা ফাতিহা সমাপ্তির পর ইমাম ও মুক্তাদী উভয়ের জন্যই নিঃশব্দে বা অনুচ্চ কণ্ঠে (বিল-ইখফা) আমীন বলা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। এর সপক্ষে কোরআন ও হাদিসের বলিষ্ঠ দলীল রয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা দোয়ার আদব শিক্ষা দিতে গিয়ে ইরশাদ করেছেন: “তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ডাকো কাকূতি-মিনতি করে এবং সংগোপনে বা নিঃশব্দে” (সুরা আল-আরাফ: ৫৫)। আমীন যেহেতু একটি দোয়া, তাই তা নিঃশব্দে বলাই দোয়ার কুরআন নির্দেশিত আদব। এছাড়া হযরত সামুরা ইবনে জুনদুব ও ইমরান ইবনে হুসাইন রা.-এর সহীহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ সা. নামাজের শুরুতে এবং কিরাতের শেষে নিঃশব্দে দোয়া করার দুটি নীরবতা বজায় রাখতেন। আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর, আলী এবং আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. সালাতে বিসমিল্লাহ ও আমীন সর্বদা নিঃশব্দে পাঠ করতেন (মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক ও ত্বহাবী)।
– শাফিয়ী ও হাম্বলী মাযহাব: জাহরী বা সশব্দ কিরাতের নামাজে ইমাম ও মুক্তাদী উভয়ের জন্য সশব্দে আমীন বলা সুন্নাত। তাঁদের দলীল হলো আবু হুরায়রা রা. বর্ণিত রেওয়ায়েত, যেখানে রাসুলুল্লাহ সা.-এর সশব্দে আমীন বলার উল্লেখ রয়েছে। তবে হানাফী ফকীহগণ জবাব দেন যে, নবীজি সা. কেবল সাহাবিদের তালিম বা শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রাথমিক যুগে সশব্দে আমীন বলতেন, পরবর্তীতে স্থায়ীভাবে নিঃশব্দেই পাঠ করতেন।
৩. উপসংহার: নিঃশব্দে আমীন বলার বিধানটি দোয়ার কোরআনিক শিষ্টাচার এবং নামাজের গভীর ভাবগাম্ভীর্য রক্ষার ক্ষেত্রে অধিক উত্তম ও যুক্তিযুক্ত।
(ج) بين اراء الائمة فى الجمع بين الصلاتين فى السفر –
[(গ) সফরে দুই নামাজ একত্রে পড়া (জম’ বাইনাস সালাতাইন) বিষয়ে ইমামগণের মতামত তুলে ধরুন।]
সফরে দুই নামাজ একত্রে আদায়ের আইম্মায়ে কিরামের দৃষ্টিভঙ্গি:
শরয়ী সফরে থাকা অবস্থায় দুই ওয়াক্তের নামাজ একসাথে পড়া জায়েজ কি না—এ নিয়ে মুসলিম উম্মাহর ফকীহদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মতভেদ রয়েছে। নিম্নে এর প্রামাণ্য বিশ্লেষণ দেওয়া হলো:
১. ইমাম শাফিয়ী, মালেক ও আহমাদ রহ.-এর মত: সফরে থাকা অবস্থায় জোহর ও আসর এবং মাগরিব ও এশা—এই দুই ওয়াক্তের নামাজকে ‘জম’য়ে তাক্বদীম’ (প্রথম ওয়াক্তে আসর বা এশাকে এগিয়ে আনা) অথবা ‘জম’য়ে তাখীর’ (দ্বিতীয় ওয়াক্তে জোহর বা মাগরিবকে পিছিয়ে দেওয়া)-এর মাধ্যমে একত্রে আদায় করা জায়েজ। তাঁদের দলীল হলো তাবুক যুদ্ধ ও বিদায় হজের বিভিন্ন সফরে রাসুলুল্লাহ সা. থেকে বর্ণিত সহীহ হাদিসসমূহ, যেখানে সফরে জাম’ করার উল্লেখ রয়েছে।
২. ইমাম আবু হানিফা রহ. ও হানাফী মাযহাবের সুদৃঢ় অবস্থান: হজ্জের মৌসুমে ৯ই যিলহজ আরাফাতের ময়দানে জোহর ও আসরকে জোহরের ওয়াক্তে এবং মুযদালিফায় মাগরিব ও এশাকে এশার ওয়াক্তে একত্রে আদায় করা ছাড়া অন্য কোনো সফরে সাধারণ অবস্থায় দুই ফরজ নামাজকে ওয়াক্ত পরিবর্তন করে একত্রে পড়া বৈধ নয়। এর পক্ষে মৌলিক কোরআনিক দলীল হলো: “নিশ্চয়ই নামাজ মুমিনদের ওপর নির্ধারিত সময়ে ফরজ করা হয়েছে” (সুরা নিসা: ১০৩)। প্রতিটি নামাজের সুনির্দিষ্ট ওয়াক্ত রয়েছে, যা সাধারণ সফরে বাতিল হতে পারে না। হযরত ইবনে মাসউদ রা. স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন: “আমি রাসুলুল্লাহ সা.-কে কখনো তাঁর নির্ধারিত ওয়াক্তের বাইরে নামাজ পড়তে দেখিনি, কেবল আরাফাত ও মুযদালিফা ব্যতীত” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)।
৩. হানাফী মাযহাব কর্তৃক অন্যান্য হাদিসের চমৎকার ব্যাখ্যা (জম’য়ে সূরী): সফরে রাসুলুল্লাহ সা. থেকে বর্ণিত অন্যান্য হাদিসের ক্ষেত্রে হানাফী ফকীহগণ প্রমাণ করেন যে, নবীজি সা. মূলত ‘জম’য়ে সূরী’ বা বাহ্যিক ও রূপক একত্রীকরণ করতেন। অর্থাৎ তিনি জোহরের শেষ ওয়াক্তে জোহর আদায় করতেন এবং নামাজ শেষ হতেই আসরের ওয়াক্ত প্রবেশ করায় সাথে সাথে আসর আদায় করে নিতেন। ফলে দূর থেকে দেখলে মনে হতো দুটি নামাজ একসাথে পড়া হয়েছে, অথচ প্রকৃতপক্ষে প্রতিটি নামাজ তার নিজস্ব শরিয়তসম্মত ওয়াক্তের ভেতরেই সম্পাদিত হয়েছিল। এটি মুসাফিরের কষ্ট লাঘবের এক ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান।
(د) اذا رئي هلال رمضان فى السعودية، فهل يجب علينا نحن اهل بنغلاديش ان نصوم دون رؤيته؟ وما رأى العلماء فيه؟ بين –
[(ঘ) সৌদি আরবে রমজানের চাঁদ দেখা গেলে আমরা বাংলাদেশের অধিবাসীরা কি চাঁদ না দেখেও রোজা রাখা আবশ্যক হবে? এ বিষয়ে উলামাদের অভিমত কী?]
ইখতিলাফুল মাতালি’ ও ভৌগোলিক দূরত্বের নিরিখে শরয়ী সমাধান:
বর্তমান বিশ্বে যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নতির ফলে মধ্যপ্রাচ্য বা সৌদি আরবে রমজান ও শাওয়ালের চাঁদ দেখা যাওয়ার সংবাদ তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশে পৌঁছায়। এমতাবস্থায় সৌদি আরবের চাঁদ দেখার ভিত্তিতে বাংলাদেশে রোজা ও ঈদ পালন করা ওয়াজিব কি না—তা নিয়ে গভীর ফিকহী আলোচনা রয়েছে:
১. হানাফী মাযহাবের প্রাচীন মূলনীতি: হানাফী মাযহাবের মূল কিতাবসমূহে সাধারণ মূলনীতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে: ‘লা ইবরাতা বি-ইখতিলাফিল মাতালি’ (উদয়স্থলের ভিন্নতা ধর্তব্য নয়)। অর্থাৎ পৃথিবীর যে কোনো এক প্রান্তের নির্ভরযোগ্য মুসলিম ভূখণ্ডে শরয়ী সাক্ষ্যের ভিত্তিতে চাঁদ প্রমাণিত হলে এবং সে সংবাদ অপর প্রান্তের মুসলিমদের কাছে অকাট্য সনদে পৌঁছালে সবার ওপর রোজা বা ঈদ প্রযোজ্য হওয়া উচিত। তবে এটি এমন অঞ্চলের জন্য প্রযোজ্য যেখানে রাতের অংশ বা চন্দ্রোদয়ের সময়ের নৈকট্য রয়েছে।
২. ইমাম শাফিয়ী রহ.-এর মত এবং আধুনিক যুগের ফতোয়া: ইমাম শাফিয়ী রহ.-এর মতে প্রতিটি অঞ্চলের জন্য নিজস্ব উদয়স্থল (মাতলা’) স্বতন্ত্র। দূরবর্তী দেশসমূহের ক্ষেত্রে উদয়স্থলের ভিন্নতা অবশ্যই ধর্তব্য। এর সবচেয়ে বড় দলীল হলো সহীহ মুসলিম শরীফে বর্ণিত কুরাইব রহ.-এর প্রসিদ্ধ হাদীস: হযরত কুরাইব সিরিয়া থেকে মদিনায় ফিরে এসে হযরত ইবনে আব্বাস রা.-কে জানালেন যে, সিরিয়াবাসীরা শুক্রবার সন্ধ্যায় চাঁদ দেখে রোজা রেখেছে। তখন ইবনে আব্বাস রা. বললেন: “কিন্তু আমরা মদিনাবাসীরা শনিবার সন্ধ্যায় চাঁদ দেখেছি; অতএব আমরা ত্রিশ দিন পূর্ণ করব অথবা নিজেরা চাঁদ দেখব।” কুরাইব বললেন: “আমীরুল মুমিনীন মুয়াবিয়া রা.-এর চাঁদ দেখা কি আপনার জন্য যথেষ্ট নয়?” ইবনে আব্বাস রা. উত্তরে বললেন: “না, রাসুলুল্লাহ সা. আমাদেরকে এভাবেই নির্দেশ দিয়েছেন।”
৩. বাস্তব প্রেক্ষাপট ও আধুনিক ফকীহদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত: সৌদি আরব ও বাংলাদেশের মধ্যে ভৌগোলিক সময়ের ব্যবধান প্রায় তিন ঘণ্টা এবং দ্রাঘিমাংশ সম্পূর্ণ পৃথক। আধুনিক যুগের শীর্ষস্থানীয় মুফতিগণ (যেমন আল্লামা তাক্বী উসমানী, দারুল উলূম দেওবন্দ ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ)-এর ফতোয়া হলো, বাংলাদেশিদের জন্য সৌদি আরবের চাঁদ দেখা অনুযায়ী আমল করা যাবে না। বরং বাংলাদেশের ভূখণ্ডে চাঁদ দেখা প্রমাণিত হতে হবে অথবা স্থানীয় জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির ঘোষণার আলোকেই রোজা ও ঈদ উদযাপন করা শরিয়তসম্মত ও মুসলিম উম্মাহর ঐক্য রক্ষাকারী সঠিক পথ।
(هـ) بين اراء الائمة فى صبى امتلك من المال ما يبلغ النصاب، فهل تجب عليه الزكاة بعد الحول؟ فصل –
[(ঙ) নাবালেগ শিশু যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়, তবে বছরান্তে তার ওপর যাকাত ওয়াজিব হবে কি না? এ বিষয়ে ইমামদের অভিমত বিস্তারিত লিখুন।]
আইম্মায়ে কিরামের মতভেদ ও দলিলসমূহ:
যদি কোনো নাবালেগ অপ্রাপ্তবয়স্ক এতিম শিশু উত্তরাধিকার সূত্রে বা কারো উপহারের মাধ্যমে নিসাব পরিমাণ নগদ অর্থ বা স্বর্ণ-রৌপ্যের মালিক হয় এবং সেই সম্পদের ওপর এক বছর পূর্ণ অতিক্রান্ত হয়, তবে তার সম্পদে যাকাত প্রদান করা ফরজ কি না—এ বিষয়ে ফকীহদের মধ্যে দুটি প্রধান মাযহাবগত দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে:
১. জমহুর উলামা (ইমাম শাফিয়ী, মালেক ও আহমাদ রহ.): জমহুর ফকীহদের মতে নাবালেগ শিশুর সম্পদের ওপরও যাকাত ফরজ। শিশুর অভিভাবক (ওয়ালী বা অছি) শিশুর সম্পদ থেকে প্রতি বছর হিসাব করে দরিদ্রদের যাকাত প্রদান করতে বাধ্য থাকবেন। তাঁদের প্রধান যুক্তি হলো, যাকাত কোনো শারীরিক ইবাদত নয়, বরং এটি সম্পদের সাথে সরাসরি সংশ্লিষ্ট আর্থিক হক (হাক্কুল মাল)। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: “তাদের ধন-সম্পদ থেকে সদকা গ্রহণ করুন” (সুরা তাওবাহ: ১০৩)। এখানে সম্পদের ওপর হকের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন: “তোমরা এতিমদের সম্পদ ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করো, যাতে যাকাত তা খেয়ে শেষ না করে ফেলে” (সুনানে তিরমিযী)। এই হাদিস প্রমাণ করে এতিমের সম্পদে যাকাত রয়েছে।
২. ইমাম আবু হানিফা রহ. ও হানাফী মাযহাবের অভিমত: হানাফী মাযহাব অনুযায়ী অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু ও পাগলের সম্পদে যাকাত ফরজ নয়। এর সপক্ষে অকাট্য দলীল হলো হযরত আলী ও আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত বিখ্যাত হাদিস, যেখানে রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন: “তিন ব্যক্তির ওপর থেকে কলম তুলে নেওয়া হয়েছে: ঘুমন্ত ব্যক্তি জাগ্রত হওয়া পর্যন্ত, অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু বালেগ হওয়া পর্যন্ত এবং পাগল সুস্থ বিবেকবান হওয়া পর্যন্ত” (সুনানে আবু দাউদ ও তিরমিযী)। হানাফী ফকীহগণ যুক্তি দেন যে, যাকাত হলো ইসলামের অন্যতম মৌলিক ইবাদত। যে কোনো ফরজ ইবাদতের জন্য নিয়ত করা এবং সুস্থ বিবেক ও বালেগ হওয়া আবশ্যক। শিশু যেহেতু শরয়ী হুকুমের আওতাভুক্ত (মুকাল্লাফ) নয়, তাই তার সম্পদে যাকাতের বিধান কার্যকর হবে না। তবে শিশুর কৃষিজমি থাকলে ফসলের ওশর আদায় করতে হবে, কারণ ওশর হলো ভূমির করের সমতুল্য। হানাফী মাযহাবের এই সমাধান এতিম শিশুর পুঁজি ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় অত্যন্ত যৌক্তিক।
(و) متى يجوز الحج عن الحى او الميت؟ وما شروط صحته عند الحنفية والشافعية؟ بين –
[(চ) জীবিত বা মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে বদলি হজ কখন জায়েজ? এবং হানাফী ও শাফিয়ী মাযহাব মতে এর বিশুদ্ধতার শর্তাবলি কী?]
বদলি হজের শর্তাবলি ও হানাফী-শাফিয়ী দৃষ্টিভঙ্গি:
ইসলামে আর্থিক ও শারীরিক সামর্থ্যবান ব্যক্তির ওপর জীবনে একবার হজ ফরজ। কিন্তু কেউ যদি শারীরিকভাবে অক্ষম হয় বা মৃত্যুবরণ করে, তবে অন্যের মাধ্যমে বদলি হজ করানোর শরয়ী বিধান ও শর্তাবলি নিম্নে আলোচনা করা হলো:
১. কখন বদলি হজ জায়েজ?
– মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে: কোনো ব্যক্তির ওপর হজ ফরজ থাকা অবস্থায় যদি সে তা আদায় না করে মারা যায় এবং মৃত্যুর পূর্বে বদলি হজের অসীয়ত করে যায়, তবে তার ত্যাজ্যবিত্তের এক-তৃতীয়াংশ (সুলুস) সম্পদ থেকে ওয়ারিশদের জন্য বদলি হজ করানো ওয়াজিব। আর অসীয়ত না করলেও ওয়ারিশগণ নিজেদের অর্থ দিয়ে বা মৃতের সম্পদ থেকে বদলি হজ করালে মৃত ব্যক্তি দায়মুক্ত হবে।
– জীবিত ব্যক্তির পক্ষ থেকে: জীবিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে কেবল তখনই বদলি হজ জায়েজ যখন সে এমন স্থায়ী রোগে আক্রান্ত হয় যার থেকে আরোগ্য লাভের কোনো সম্ভাবনা নেই (যেমন চরম বার্ধক্য, স্থায়ী পক্ষাঘাত বা অন্ধত্ব) এবং সে বিমানে বা বাহনে চড়তেও শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ অক্ষম। সাময়িক অসুস্থ হলে বদলি হজ জায়েজ নয়, সুস্থ হওয়ার অপেক্ষা করতে হবে।
২. হানাফী মাযহাব মতে বদলি হজের শর্তাবলি:
– যার পক্ষ থেকে হজ করা হচ্ছে তাকে অক্ষম হতে হবে এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেই অক্ষমতা অব্যাহত থাকতে হবে।
– খরচের অর্থ মূলত প্রেরকের সম্পদ থেকেই আসতে হবে।
– ইহরামের সময় প্রেরকের পক্ষ থেকেই হজের নিয়ত করতে হবে এবং প্রেরকের নির্দেশিত পথ ও মীকাত অনুসরণ করতে হবে।
– যিনি বদলি হজ করবেন তিনি একজন বিশ্বস্ত, পরহেযগার এবং হজের আহকাম সম্পর্কে সম্যক অবগত বিজ্ঞ আলেম হওয়া উত্তম।
৩. শাফিয়ী মাযহাবের অতিরিক্ত গুরুত্বপূর্ণ শর্ত: ইমাম শাফিয়ী ও হাম্বলী রহ.-এর মতে যিনি অন্যের বদলি হজ করবেন, তার নিজের ফরজ হজটি অতীতে অবশ্যই আদায় করা থাকতে হবে। যদি সে নিজের ফরজ হজ আদায় না করে অন্যের বদলি হজ করতে যায়, তবে তা প্রেরকের পক্ষ থেকে আদায় হবে না, বরং সেই হজটি স্বয়ং সম্পাদনকারীর নিজের হজ হিসেবে গণ্য হয়ে যাবে। এর দলীল হলো শুবরুমা নামক ব্যক্তির হাদিস, যেখানে রাসুলুল্লাহ সা. এক ব্যক্তিকে শুবরুমার পক্ষ থেকে হজের তালবিয়া পড়তে শুনে বললেন: “আগে তোমার নিজের হজ করো, তারপর শুবরুমার পক্ষ থেকে হজ করো” (সুনানে আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ)। হানাফী মাযহাবে নিজের হজ আদায় না করা ব্যক্তির বদলি হজ মাকরূহ হলেও আদায় হয়ে যায়, তবে শাফিয়ী মতে তা একেবারেই বাতিল।
القسم الثانى : مجموعة (ب) – علم التصوف (الدرجة – ৫০)
السؤال الثالث : أجب عن ثلاثة من الأسئلة التالية (الدرجة – ১০ x ৩ = ৩০)
٣- اجب عن ثلاثة من الاسئلة التالية :
[৩. নিচের প্রশ্নগুলো থেকে যেকোনো তিনটির উত্তর দিন:]
(أ) ما التصوف؟ وما موضوعه وغرضه؟ وما ادلة مشروعيته؟ ولم يحتاج اليه الانسان فى حياته؟ بين مفصلا –
[(ক) তাসাউউফ কাকে বলে? এর বিষয়বস্তু ও উদ্দেশ্য কী? এবং এর শরয়ী বৈধতার দলিল কী? মানবজীবনে এর প্রয়োজন কেন? বিস্তারিত আলোচনা করুন।]
তাসাউউফের শাব্দিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা:
১. শাব্দিক উৎপত্তি: ‘তাসাউউফ’ (التصوف) শব্দের উৎপত্তি নিয়ে ভাষাতাত্ত্বিক ও গবেষকদের মাঝে বিভিন্ন মতামত রয়েছে: কারো মতে এটি ‘সূফ’ (পশম) থেকে উদগত, কারণ প্রাচীন যুগের নবী-রাসুল ও দরবেশগণ অহংকারমুক্তির প্রতীকরূপে মোটা পশমী বস্ত্র পরিধান করতেন; কারো মতে এটি ‘সাফা’ (পবিত্রতা) থেকে এসেছে যার অর্থ অন্তরের কলুষমুক্ত হওয়া; আবার কারো মতে এটি মসজিদে নববীর চত্বরে অবস্থানকারী সর্বত্যাগী সাহাবি ‘আসহাবে সুফফাহ’-এর নামের সাথে সম্পৃক্ত।
২. পারিভাষিক অর্থ: শায়খুল ইসলাম ইমাম জুনাইদ বাগদাদী রহ. বলেন: “তাসাউউফ হলো এমন এক আধ্যাত্মিক পথ যা মানুষের অন্তরকে পাশবিক রিপুর দাসত্ব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে মহান আল্লাহর আনুগত্যে চিরস্থায়ীভাবে নিমগ্ন করে।” আল্লামা ইবনে খালদুনের মতে, এটি হলো পার্থিব মোহের ঊর্ধ্বে উঠে সার্বক্ষণিক আল্লাহর ইবাদত, দুনিয়াবিমুখতা ও তাযকিয়ায়ে নফসে মগ্ন থাকার সুশৃঙ্খল বিদ্যা।
বিষয়বস্তু ও পরম উদ্দেশ্য:
– মাওযূ (বিষয়বস্তু): মানুষের কলব বা অন্তরের অন্তর্নিহিত অবস্থা—কীভাবে আত্মশুদ্ধি লাভ করা যায় এবং আত্মিক ব্যাধিসমূহ (যেমন রিয়া, কিবর, হাসাদ, নিফাক) দূর করা যায়।
– গারাজ (উদ্দেশ্য): আল্লাহর নৈকট্য ও চরম সন্তুষ্টি (রিদ্বা) অর্জন করা এবং আখলাকে হাসানাহ তথা পবিত্র মানবিক চরিত্রের পূর্ণতা সাধন।
কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে তাসাউউফের শরয়ী ভিত্তি:
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ ইরশাদ করেছেন: “নিশ্চয়ই সে ব্যক্তি সফলকাম হয়েছে যে তার আত্মাকে পবিত্র করেছে” (সুরা শামস: ৯)। এছাড়া সুরা শু’আরায় বলা হয়েছে: “সেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোনো উপকারে আসবে না, কেবল সে ব্যতীত যে আল্লাহর কাছে একটি পবিত্র ও সুস্থ অন্তর (কলবে সালীম) নিয়ে উপস্থিত হবে” (সুরা শু’আরা: ৮৮-৮৯)। সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত বিশ্ববিখ্যাত হাদীসে জিবরীলে রাসুলুল্লাহ সা. দ্বীনের তিনটি মৌলিক স্তম্ভ বর্ণনা করেছেন—ঈমান, ইসলাম ও ইহসান। এই ‘ইহসান’ (এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করো যেন তুমি তাঁকে চাক্ষুষ দেখছ, আর যদি দেখতে না পাও তবে বিশ্বাস করো তিনি তোমাকে দেখছেন)—এটিই হলো ইলমুত তাসাউউফের মূল বুনিয়াদ ও আত্মা।
মানবজীবনে তাসাউউফের অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তা:
ফিকহ শাস্ত্র মানুষের বাহ্যিক আমলকে (যেমন নামাজের রুকু-সিজদার অঙ্গভঙ্গি) বিশুদ্ধ করে, আর তাসাউউফ সেই আমলের ভেতরে প্রাণ ও রুহ (যেমন একাগ্রতা, বিনম্রতা ও ইখলাস) ফুঁকে দেয়। তাসাউউফ ছাড়া মানুষের অন্তর হিংসা, অহংকার ও লোকদেখানো রিয়ায় নিমজ্জিত হয়ে বরবাদ হয়ে যায়। আত্মিক পরিশুদ্ধি ছাড়া কেবল বাহ্যিক আমল কিয়ামতের দিন গ্রহণযোগ্য হবে না। তাই খাঁটি কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক তাসাউউফ চর্চা প্রতিটি মুমিনের জন্য অপরিহার্য।
(ب) ما المراد بالتوحيد عند الصوفية؟ وما الفرق بين توحيد العامة وتوحيد الخاصة؟ وما موقف الصوفية من صفات الله؟ بين فى ضوء الرسالة القشيرية –
[(খ) সুফিদের দৃষ্টিতে তাওহীদ বলতে কী বোঝায়? সাধারণ মানুষের তাওহীদ ও খাস বান্দাদের তাওহীদের মধ্যে পার্থক্য কী? এবং আল্লাহর সিফাত সম্পর্কে সুফিদের অবস্থান কী? রিসালায়ে কুশাইরিয়্যার আলোকে বর্ণনা করুন।]
সুফিয়ায়ে কিরামের নিকট তাওহীদের বিশেষ তাৎপর্য:
সাধারণ কালাম শাস্ত্রবিদদের নিকট তাওহীদ হলো বুদ্ধিবৃত্তিক ও যৌক্তিক দলিলের মাধ্যমে মহান আল্লাহর একত্ববাদের সত্যায়ন করা। কিন্তু সুফিয়ায়ে কিরামের নিকট তাওহীদ কেবল একটি তাত্ত্বিক বিশ্বাস বা মৌখিক বচন নয়, বরং তা অন্তরের এক জীবন্ত উপলব্ধি ও ঐশ্বরিক মা’রিফাত। ইমামুল কায়েফাহ জুনাইদ বাগদাদী রহ. তাওহীদের সংজ্ঞায় বলেছেন: “তাওহীদ হলো চিরন্তন অনাদি সত্তা আল্লাহকে সকল নশ্বর ও সৃষ্টিগত সীমাবদ্ধতা থেকে একক ও পবিত্র জানা এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য সব অস্তিত্বকে গৌণ জ্ঞান করা।”
তাওহীদুল আম্মাহ (সাধারণের তাওহীদ) ও তাওহীদুল খাস্সাহ (খাস বান্দাদের তাওহীদ):
ইমাম আবুল কাসিম আল-কুশাইরী রহ. তাঁর সুবিখ্যাত ‘আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যাহ’ গ্রন্থে তাওহীদের স্তরভেদ অত্যন্ত চমৎকারভাবে স্পষ্ট করেছেন:
১. তাওহীদুল আম্মাহ (সাধারণ মুসলিমদের তাওহীদ): এটি হলো সাধারণ মুমিনদের তাওহীদ—যাঁরা মৌখিকভাবে স্বীকৃতি দেয় এবং অন্তরে বিশ্বাস করে যে আল্লাহ এক, তাঁর কোনো অংশীদার নেই এবং তিনি সমস্ত সৃষ্টির স্রষ্টা। তবে কর্মক্ষেত্রে এবং দৈনন্দিন জীবনে তাঁরা অনেক সময় জাগতিক উপায়-উপকরণ (আসবাব), অর্থবিত্ত ও মানুষের শক্তির ওপর অতিরিক্ত মাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং অন্তরে নানা ভীতি পোষণ করে।
২. তাওহীদুল খাস্সাহ (আল্লাহর খাস আউলিয়াদের তাওহীদ): এটি হলো আল্লাহর আউলিয়া, আরিফীন ও মুকাররাবীন বান্দাদের তাওহীদ। এই স্তরে বান্দা কেবল বিশ্বাসের জগতেই নয়, বরং নিজের প্রত্যক্ষ আত্মিক অনুভবে (মুশাহাদাহ ও মুকাশাফাহর মাধ্যমে) চাক্ষুষ দেখতে পায় যে মহাবিশ্বের সমস্ত কল্যাণ-অকল্যাণ, দান-বঞ্চনা, জীবন-মৃত্যু ও গতিবিধির একমাত্র বাস্তব নিয়ামক হলেন স্বয়ং আল্লাহ তাআলা। তাঁদের দৃষ্টি থেকে সমস্ত সৃষ্টির কাল্পনিক প্রভাব সম্পূর্ণ মুছে যায় এবং তাঁরা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টিতেই নিজেদের বিলীন করে দেন।
আল্লাহর সিফাত (গুণাবলি) সম্পর্কে সুফিয়ায়ে কিরামের অবস্থান:
রিসালাতুল কুশাইরিয়্যাহর দ্ব্যর্থহীন বর্ণনা অনুযায়ী, সালাফে সালেহীন ও খাঁটি সুফিগণ আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সালাফী ও আশ’আরী-মাতুরীদী ধারার পূর্ণ অনুসারী। তাঁরা আল্লাহর জাত ও সিফাতের কোনো প্রকার বিকৃতি (তাহরীফ), অস্বীকার (তা’তীল), সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য (তাশবীহ) বা অঙ্গের রূপদান (তাজসীম) না করে কুরআনে বর্ণিত আল্লাহর সমস্ত গুণাবলিকে চিরন্তন, নিখুঁত ও মহান বলে বিশ্বাস করেন। তাঁরা বলেন, সৃষ্টির জ্ঞানের বাইরে আল্লাহর সিফাত এক পরম সত্য।
(ج) عرف بالمصطلحات الاتية كما فى الرسالة القشيرية : الهيبة، التواجد، الفناء، الحضور، الصحو، التجلى، المكاشفة –
[(গ) রিসালায়ে কুশাইরিয়্যার আলোকে নিম্নলিখিত পরিভাষাগুলোর পরিচয় দিন: আল-হাইবাহ, আত-তাওয়াজুদ, আল-ফানা, আল-হুযূর, আস-সাহ্উ, আত-তাজাল্লী, আল-মুকাশাফাহ।]
ইমাম আবুল কাসিম আব্দুল করীম আল-কুশাইরী রহ. (৩৭৬-৪৬৫ হি.) রচিত তাসাউউফের কালজয়ী আকর গ্রন্থ ‘আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যাহ’-তে আধ্যাত্মিক পথের পথযাত্রীদের (সালেকীন) আত্মিক অবস্থার যে সুনির্দিষ্ট পারিভাষিক সংজ্ঞা দিয়েছেন, তার নির্বাচিত বিশ্লেষণ নিম্নে প্রদান করা হলো:
১. আল-হাইবাহ (الهيبة): মহান আল্লাহর জালাল, অসীম ক্ষমতা ও অতুলনীয় মহত্ত্ব প্রত্যক্ষ করার ফলে বান্দার অন্তরে যে গভীর ভয়, কাঁপুনি ও শ্রদ্ধাপূর্ণ সন্ত্রস্ত ভাবের সৃষ্টি হয় তাকে হাইবাহ বলে। এটি মুকাররাবীন আউলিয়াদের সর্বোচ্চ সম্মানজনক বৈশিষ্ট্য যা সাধারণ ভয়ের চেয়ে বহুগুণ উচ্চ স্তরের।
২. আত-তাওয়াজুদ (التواجد): নিজের ইচ্ছাকৃত প্রচেষ্টায় আত্মিক জজবা, কান্না ও আল্লাহর প্রেমের অবস্থা বা ওয়াজদ কৃত্রিমভাবে জাগ্রত করার প্রয়াস পাওয়া। যদি এতে লোকদেখানো রিয়া ও অহংকার না থাকে, তবে আত্মাকে বিগলিত করার উদ্দেশ্যে এটি প্রশংসনীয়।
৩. আল-ফানা (الفناء): বান্দার নিজের নফস ও রিপুর সমস্ত মন্দ গুণাবলি এবং পার্থিব মোহ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়া এবং নিজেকে আল্লাহর ইচ্ছার সামনে পুরোপুরি বিলীন করে দেওয়া। ইমাম কুশাইরী বলেন, যে ব্যক্তি নিজের প্রবৃত্তি থেকে ফানা হয়, সে আল্লাহর আনুগত্যে ‘বাকা’ (চিরস্থায়িত্ব) লাভ করে।
৪. আল-হুদূর (الحضور): নিজের কলব বা অন্তরকে আল্লাহর স্মরণে এমনভাবে সদা জাগ্রত রাখা যেন অন্তরে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো সৃষ্টির প্রভাব বা পার্থিব চিন্তার বিন্দুমাত্র অবকাশ না থাকে।
৫. আস-সাহউ (الصحو): আত্মিক উন্মাদনা (সাকর) ও জজবার তীব্রতা স্তিমিত হওয়ার পর পুনরায় পূর্ণ হুশ ও সচেতনতায় ফিরে এসে শরীয়তের পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুশাসন নিখুঁতভাবে পালন করা। ইমাম জুনাইদ বাগদাদীর মতে সাহউ হলো সাকরের চেয়েও শ্রেষ্ঠ ও পরিপক্ক স্তর, কারণ নবীগণ সর্বদা সাহউয়ের স্তরে থেকেই উম্মতকে পথ দেখিয়েছেন।
৬. আত-তাজাল্লী (التجلي): বান্দার পুতপবিত্র কলবের ওপর মহান আল্লাহর নূর, আসমা-সিফাত ও রূহানী সত্যের প্রত্যক্ষ বিচ্ছুরণ বা ঐশ্বরিক আলোকের উদ্ভাসন।
৭. আল-মুকাশাফাহ (المكاشفة): বান্দার কলবের সামনে থেকে সংশয় ও অজ্ঞতার সমস্ত পর্দা উন্মোচিত হয়ে অকাট্য ঈমানী সত্য চাক্ষুষ দেখার মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠা, যা নিশ্চিত জ্ঞানের (আইনুল ইয়াকীন) ফল।
(د) ما الولاية؟ وما شروط ثبوتها؟ ومن الابدال والاقطاب والاوتاد؟ بين مفصلا –
[(ঘ) বিলায়াত বা বন্ধুত্ব কাকে বলে? এর প্রমাণের শর্তাবলি কী? এবং আবদাল, আক্বতাব ও আওতাদ কারা? বিস্তারিত বর্ণনা করুন।]
বিলায়াত বা ওলী হওয়ার সংজ্ঞা ও শর্তাবলি:
১. সংজ্ঞা: ‘বিলায়াত’ হলো মহান আল্লাহর বিশেষ নৈকট্য, ভালোবাসা ও আন্তরিক বন্ধুত্বের এক অনন্য ঐশ্বরিক সম্মানজনক স্তর। যিনি এই মর্যাদা লাভ করেন তাকে শরিয়তের পরিভাষায় ‘ওলীউল্লাহ’ (আল্লাহর বন্ধু) বলা হয়। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন: “জেনে রাখো! আল্লাহর ওলীদের কোনো ভয় নেই এবং তারা কোনোদিন দুঃখিতও হবে না। তারা হলেন সেই সকল ব্যক্তি যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছে” (সুরা ইউনুস: ৬২-৬৩)।
২. বিলায়াতের সত্যতার অপরিহার্য শর্তাবলি: ওলী হওয়ার জন্য দুটি অবিচ্ছেদ্য সার্বক্ষণিক শর্ত রয়েছে—খাঁটি বিশুদ্ধ ঈমান এবং সুন্নাহসম্মত নিরবচ্ছিন্ন তাকওয়া। শরীয়তের হালাল-হারামের পুঙ্খানুপুঙ্খ আনুগত্য ছাড়া, রাসুলুল্লাহ সা.-এর সুন্নাহর অনুকরণ ব্যতিরেকে কোনো ব্যক্তি যত অলৌকিক কাণ্ডই প্রদর্শন করুক না কেন, সে কখনোই আল্লাহর ওলী হতে পারে না। ইমাম আবু সুলাইমান দারানী রহ. বলেন: “কখনো আমার অন্তরে সুফিদের কোনো সূক্ষ্ম ভাব জাগ্রত হলে আমি কুরআন ও সুন্নাহর দুজন সাক্ষীর সাক্ষ্য ছাড়া তা গ্রহণ করি না।”
আবদাল, আক্বতাব ও আওতাদের রূহানী স্তরসমূহ:
হাদীস ও তাসাউউফ সাহিত্যে পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষায় নিয়োজিত বিশেষ নেককার বান্দাদের কিছু রূহানী মর্যাদাক্রম বর্ণিত হয়েছে:
১. আল-কুতুব বা গাউস (القطب / الغوث): সমসাময়িক যুগের সমস্ত আউলিয়ায়ে কিরামের রূহানী সরদার, আধ্যাত্মিক চক্রের মূল কেন্দ্রবিন্দু, যাঁর উসিলায় ও রুহানিয়াতের মাধ্যমে আল্লাহর বিশেষ ফয়েজ ও রহমত সমগ্র সৃষ্টিতে প্রবাহিত হয়।
২. আল-আওতাদ (الأوتاد): পৃথিবীর চার প্রান্তে পাহাড়ের মতো আধ্যাত্মিক সুদৃঢ় খুঁটি হিসেবে অবস্থানকারী চারজন বিশেষ বুজুর্গ, যাঁদের সার্বক্ষণিক দোয়া ও বরকতে পৃথিবীর শান্তি ও স্থিতিশীলতা সংরক্ষিত থাকে।
৩. আল-আবদাল (الأبدال): এটি একটি মশহুর হাদিস দ্বারা প্রমাণিত মর্যাদাপূর্ণ শ্রেণি। মুসনাদে আহমাদ ও তাবারানীতে বর্ণিত সহীহ সনদের হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন: শাম (সিরিয়া) দেশে সর্বদা চল্লিশ জন আবদাল অবস্থান করেন; তাঁদের মধ্য থেকে কোনো একজন মৃত্যুবরণ করলে আল্লাহ অন্য কোনো নেককার ব্যক্তিকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত বা বদল (বদল থেকে আবদাল) হিসেবে মনোনীত করেন। তাঁদের উদার বদান্যতা, দোয়ার বরকতে বৃষ্টিপাত হয় এবং জাতিকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করা হয়।
(هـ) من هو الشيخ احمد السرهندى؟ ولماذا لقب بمجدد الالف الثانى؟ وما ابرز الاصلاحات الدينية التى دعا اليها؟ بين مفصلا –
[(ঙ) শায়খ আহমাদ সিরহিন্দী কে ছিলেন? তাঁকে কেন ‘মুজাদ্দিদে আলফে সানী’ উপাধি দেওয়া হয়? এবং তাঁর সংস্কার আন্দোলনের প্রধান দিকগুলো কী কী? বিশদভাবে তুলে ধরুন।]
নাম ও জন্মপরিচয়:
ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংস্কারক ও মোজাদ্দেদ হলেন হযরত শায়খ আহমাদ আল-ফারূকী আস-সিরহিন্দী রহ.। তিনি ১৫৬৪ খ্রিস্টাব্দে (৯৭১ হিজরী) ভারতের পাঞ্জাবের সিরহিন্দ নগরীতে আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর ফারুক রা.-এর পবিত্র বংশধারায় এক সম্ভ্রান্ত আলেম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি নকশবন্দিয়া তরিকার মহান আধ্যাত্মিক ইমাম ও মুজাদ্দিদ ছিলেন।
‘মুজাদ্দিদে আলফে সানী’ উপাধির তাৎপর্য:
‘আলফে সানী’ অর্থ ইসলামের দ্বিতীয় সহস্রাব্দ (এক হাজার হিজরী পরবর্তী যুগ)। রাসুলুল্লাহ সা.-এর হিজরতের এক হাজার বছর সমাপ্তির সন্ধিক্ষণে ভারতবর্ষ তথা সমগ্র মুসলিম বিশ্বে যখন ইসলাম চরম রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় সংকটে নিমজ্জিত ছিল, তখন তিনি এক অনন্য ঐতিহাসিক বিপ্লব ঘটিয়ে দ্বীনের পুনরুজ্জীবন ও সংস্কার সাধন করেন। এজন্য তৎকালীন যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ আলেমগণ এবং স্বয়ং শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী রহ. তাঁকে ‘মুজাদ্দিদে আলফে সানী’ (দ্বিতীয় সহস্রাব্দের মহান সংস্কারক) উপাধিতে ভূষিত করেন।
মুজাদ্দিদে আলফে সানীর প্রধান প্রধান ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংস্কারসমূহ:
১. মুঘল সম্রাট আকবরের ‘দ্বীনে এলাহী’ উৎখাত: আকবর ইসলাম, হিন্দুধর্ম ও অন্যান্য ধর্মের সংমিশ্রণে যে কুফরী দ্বীনে এলাহী প্রবর্তন করেছিল এবং সম্রাটের সামনে সিজদায়ে তাযীমী বাধ্যতামূলক করেছিল, শায়খ সিরহিন্দী তার বিরুদ্ধে বীর বিক্রমে সিংহের মতো গর্জে ওঠেন। তিনি গোয়ালিয়র দুর্গে দীর্ঘ কারাবরণ করেন কিন্তু সম্রাটের সামনে মাথা নত করেননি। পরবর্তীতে সম্রাট জাহাঙ্গীর তাঁর নিকট বায়আত গ্রহণ করে শরীয়তবিরোধী আইন বাতিল করতে বাধ্য হয়।
২. ‘ওয়াহদাতুশ শুহূদ’ তত্ত্বের প্রতিষ্ঠা: তিনি তৎকালীন সমাজে প্রচলিত চরমপন্থী ‘ওয়াহদাতুল উজূদ’ (সর্বেশ্বরবাদ)-এর দার্শনিক বিভ্রান্তি দূর করে ‘ওয়াহদাতুশ শুহূদ’ (প্রত্যক্ষবাদী একত্ব) প্রতিষ্ঠা করেন এবং অকাট্য দলিলের মাধ্যমে স্পষ্ট করেন যে স্রষ্টা ও সৃষ্টি কখনোই এক হতে পারে না; ‘সবকিছুই আল্লাহ’ নয়, বরং ‘সবকিছু আল্লাহরই সৃষ্টি’।
৩. মাকতূবাতে ইমামে রব্বানী: তিনি তৎকালীন মুঘল মন্ত্রী, সেনাপতি, সুফি ও আলেমদের নিকট শত শত গবেষণামূলক চিঠি লিখে ভারতবর্ষে ইসলামের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও শরীয়তের অনুশাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি সুন্নাহকে সুফিবাদের একমাত্র মাপকাঠি ঘোষণা করে বিদআত নির্মূল করেন।
السؤال الرابع : أجب عن اربعة من الأسئلة التالية (الدرجة – ৫ x ৪ = ২০)
٤- اجب عن اربعة من الاسئلة التالية :
[৪. নিচের প্রশ্নগুলো থেকে যেকোনো চারটির উত্তর দিন:]
(أ) ما المراد بالطرق الصوفية؟ اكتب اسماء اهمها –
[(ক) সুফি তরিকা বলতে কী বোঝায়? প্রধান প্রধান তরিকাগুলোর নাম লিখুন।]
তরিকতের পরিচয় ও প্রধান চারটি ধারা:
‘তরিকা’ (الطريقة) শব্দের আভিধানিক অর্থ সুনির্দিষ্ট পথ, পদ্ধতি, আদর্শ বা ধারা। ইসলামী আধ্যাত্মিক পরিভাষায় আত্মশুদ্ধি, যিকির, মুরাকাবা ও অন্তরের পুতপবিত্রতা অর্জনের জন্য বিজ্ঞ সুফিয়ায়ে কিরাম কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে যে বিজ্ঞানসম্মত সুশৃঙ্খল অনুশীলন পদ্ধতি প্রণয়ন করেছেন, তাকে ‘তুরুকুস সূফিয়্যাহ’ বা তরিকত বলা হয়। মুসলিম বিশ্বে আত্মশুদ্ধির প্রধান চারটি তরিকা হলো:
১. কাদেরিয়া তরিকা: বড়পীর হযরত শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী রহ. (৪৭০-৫৬১ হি.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। বাগদাদ থেকে বিস্তৃত এই তরিকার মূল বৈশিষ্ট্য হলো সুন্নাহর কঠোর অনুসরণ, প্রকাশ্য যিকির (যিকরে জলী), ইলমের মর্যাদা রক্ষা এবং আর্তমানবতার নিঃস্বার্থ সেবা। এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও প্রাচীন তরিকা যা সারা বিশ্বে ইসলাম প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে।
২. চিশতিয়া তরিকা: খাজা আবু ইসহাক শামী রহ. কর্তৃক সিরিয়ায় সূচিত হলেও সুলতানুল হিন্দ হযরত খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতী আজমীরী রহ. কর্তৃক ভারতীয় উপমহাদেশে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, বিনম্রতা, সুললিত যিকির, সামা (শরয়ী সঙ্গীত) এবং মানবসেবায় এটি সর্বাধিক জনপ্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। ভারত ও বাংলাদেশে লাখ লাখ অমুসলিম এই তরিকার বুজুর্গদের ভালোবাসায় মুগ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।
৩. নকশবন্দিয়া তরিকা: হযরত খাজা বাহাউদ্দীন নকশবন্দ বোখারী রহ. (৭১৭-৭৯১ হি.) কর্তৃক সুবিন্যস্ত। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো নিঃশব্দ আত্মিক যিকির (যিকরে খফী), সুন্নাহর আক্ষরিক অনুকরণ, সমাজ ও রাজনীতির সংশোধন এবং বিদআতমুক্ত পূতপবিত্র জীবন গঠন। শায়খ আহমাদ সিরহিন্দী রহ. ও শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী রহ. এই ধারার মহান সংস্কারক ছিলেন।
৪. সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকা: শায়খ শিহাবুদ্দীন আবু হাফস উমর সোহরাওয়ার্দী রহ. কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। জ্ঞানার্জন, রোজা ও সংযমী কঠোর সাধনার ওপর এটি প্রতিষ্ঠিত। মুলতানে হযরত বাহাউদ্দীন যাকারিয়া এবং বাংলায় হযরত জালালুদ্দীন তাবরেযী ও হযরত শাহ জালাল ইয়েমেনী রহ. এই তরিকার মাধ্যমে দ্বীনের ব্যাপক দাওয়াত ও খেদমত আঞ্জাম দেন।
(ب) ما معنى السلسلة الصوفية؟ وما اهميتها؟ بين –
[(খ) সিলসিলায়ে সুফিয়ার অর্থ কী? এবং এর গুরুত্ব কী? স্পষ্ট করুন।]
সিলসিলার সংজ্ঞা ও তাৎপর্য:
‘সিলসিলা’ (السلسلة) শব্দের আভিধানিক অর্থ শিকল, মালা বা নিরবচ্ছিন্ন শৃঙ্খল। আধ্যাত্মিক পরিভাষায় কোনো যোগ্য শিষ্যের কাছ থেকে শুরু করে বর্তমান কামিল পীর ও মুরশিদ হয়ে নির্ভরযোগ্য উস্তাযগণের ধারাবাহিক সূত্রে স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত পৌঁছানো যে অবিচ্ছিন্ন আত্মিক ও শিক্ষাগত যোগসূত্র বিদ্যমান থাকে, তাকে ‘সিলসিলায়ে তাসাউউফ’ বলা হয়। হাদীস শাস্ত্রের মুত্তাসিল সনদের মতোই তাসাউউফের এই সিলসিলা ও শাজরাহ অত্যন্ত পবিত্র, নির্ভরযোগ্য ও সুদৃঢ়। অধিকাংশ সুফি সিলসিলা আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং সুপ্রসিদ্ধ নকশবন্দিয়া সিলসিলা আমীরুল মুমিনীন হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাযিয়াল্লাহু আনহুর পবিত্র যোগসূত্রে রাসুলুল্লাহ সা.-এর সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে সংযুক্ত হয়েছে। এর মূল ভিত্তি হলো সাহাবিদের থেকে রাসুলুল্লাহ সা.-এর বায়আত গ্রহণের সেই ঐতিহ্য, যেমন হুদাইবিয়ায় ‘বাইয়াতে রিদওয়ান’।
আধ্যাত্মিক জীবনে সিলসিলার গুরুত্ব ও আবশ্যকতা:
১. রূহানী সংযোগ ও ফয়েজের প্রবাহ: একটি বৈদ্যুতিক বাতি যেমন মূল পাওয়ার স্টেশনের নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ ছাড়া আলো ছড়াতে পারে না, তেমনি একজন সাধকের কলব বা অন্তর রাসুলুল্লাহ সা.-এর রূহানী ফয়েজ, নূর ও বরকতের সাথে সরাসরি যুক্ত হওয়ার জন্য এই অবিচ্ছিন্ন সিলসিলা প্রধানতম মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
২. পথভ্রষ্টতা ও শয়তানী বিভ্রান্তি থেকে সুরক্ষা: কোনো সনদ বা সিলসিলাবিহীন স্বঘোষিত সাধক অতি সহজেই শয়তানের সূক্ষ্ম ধোঁকা, কুসংস্কার ও নফসের অহংকারে ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত হতে পারে। কিন্তু সিলসিলার অনুসারী মুরিদ পূর্ববর্তী বুজুর্গগণের নির্ভরযোগ্য তদারকি, দোয়া ও আধ্যাত্মিক পথনির্দেশের নিরাপদ ছায়াতলে সর্বদা সুরক্ষিত থাকে।
৩. সুন্নাহর বিশুদ্ধতা ও আমানত সংরক্ষণ: সিলসিলা বংশপরম্পরায় তরিকতের আমল, যিকিরের পদ্ধতি ও আত্মশুদ্ধির মূল সুরকে কোনো প্রকার বিদআত, শিরক ও কুসংস্কারের অনুপ্রবেশ ছাড়াই শতাব্দীর পর শতাব্দী অবিকৃত ও সুরক্ষিত রাখতে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে আসছে। এর মাধ্যমে অন্তরে খুলূসিয়াত ও তাযকিয়া অর্জিত হয়।
(ج) عرف المصطلحات : المجاهدة – المحاسبة – المراقبة –
[(গ) পরিভাষাগুলোর পরিচয় দিন: আল-মুজাহাদাহ, আল-মুহাসাবাহ, আল-মুরাকাবাহ।]
ইসলামী তাসাউউফে আত্মিক পরিশুদ্ধি ও আল্লাহভীতি অর্জনের প্রধান তিনটি ব্যবহারিক সোপান হলো আল-মুজাহাদাহ, আল-মুহাসাবাহ এবং আল-মুরাকাবাহ। এদের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক বিশ্লেষণ নিম্নে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. আল-মুজাহাদাহ (المجاهدة): নফসে আম্মারাহ তথা কুপ্রবৃত্তি, অলসতা ও শয়তানী কুমন্ত্রণার বিরুদ্ধে নিরবচ্ছিন্ন জিহাদ বা সংগ্রাম করা। অর্থাৎ নফস যা পছন্দ করে (যেমন অতিরিক্ত ভোজন, বিলাসবহুল নিদ্রা, আড্ডাবাজি, অলসতা ও জাগতিক সুনাম অন্বেষণ) তার বিপরীতে গিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কষ্ট সহ্য করে ফরজ-ওয়াজিবের সাথে সাথে নফল ইবাদত, তাহাজ্জুদ ও আত্মত্যাগে নিজেকে বাধ্য করা। আল্লাহ ইরশাদ করেন: “যারা আমার পথে কঠোর সাধনা বা মুজাহাদাহ করে, আমি অবশ্যই তাদের আমার নৈকট্যের পথসমূহে পরিচালিত করব” (সুরা আনকাবুত: ৬৯)। নফসের বিরুদ্ধে এই লড়াইকে হাদিসে ‘জিহাদে আকবর’ (বড় জিহাদ) বলা হয়েছে।
২. আল-মুহাসাবাহ (المحاسبة): আত্মপর্যালোচনা বা প্রতিদিন শোবার পূর্বে নিজের দৈনন্দিন সমস্ত আমল, কথা ও আচরণের চুলচেরা হিসাব গ্রহণ করা। সারাদিনে কী পরিমাণ নেক কাজ হয়েছে তার জন্য মহান রবের দরবারে শোকর আদায় করা এবং কী পরিমাণ ভুলত্রুটি বা গুনাহ হয়েছে তার জন্য একনিষ্ঠ মনে তাওবা ও ইস্তিগফার করা। আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর ফারুক রা. বলেন: “তোমরা কিয়ামতের দিন চূড়ান্ত হিসাব দিবসে জবাবদিহিতার সম্মুখীন হওয়ার পূর্বেই আজ দুনিয়াতে নিজেদের হিসাব নিজেরা গ্রহণ করো” (সুনানে তিরমিযী)। এই আত্মপর্যালোচনা মানুষকে পাপমুক্ত রাখে।
৩. আল-মুরাকাবাহ (المراقبة): অন্তরের চরম ধ্যান, একাগ্রতা ও আধ্যাত্মিক সতর্কতা। অর্থাৎ বান্দা এই দৃঢ় বিশ্বাসে অন্তরকে আচ্ছন্ন রাখা যে মহান আল্লাহ আমার প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস, প্রতিটি পদক্ষেপ এবং অন্তরের গোপনতম সংকল্প সার্বক্ষণিকভাবে সরাসরি প্রত্যক্ষ করছেন। হাদীসে জিবরীলে বর্ণিত ইহসানের স্তর—”এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করো যেন তুমি তাঁকে দেখছ”—এটি অর্জনের জন্য এই মুরাকাবাই প্রধান কার্যকর চাবিকাঠি। সাধকগণ মুরাকাবায়ে মউত ও মুরাকাবায়ে মাঈয়্যাতের মাধ্যমে কলবকে জাগ্রত রাখেন।
(د) عرف معنى الرذائل الاتية : الاسراف – التهاون – الرياثة –
[(ঘ) নিম্নলিখিত আত্মিক ব্যাধিগুলোর অর্থ স্পষ্ট করুন: আল-ইসরাফ (অপচয়), আত-তাহাভুন (উদাসীনতা), আর-রিয়াছাহ (নেতৃত্বের লোভ)।]
সুফিয়ায়ে কিরামের মতে মানুষের আত্মাকে সমূলে বিনষ্টকারী এবং মানুষের সমস্ত নেক আমল বরবাদকারী প্রধান তিনটি মারাত্মক ব্যাধি (রাযাইল) হলো ইসরাফ, তাহাউন ও রিয়া। কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এদের স্বরূপ ও প্রতিকার বিশ্লেষণ করা হলো:
১. আল-ইসরাফ (الإسراف – অপচয় ও সীমালঙ্ঘন): কোনো বৈধ ক্ষেত্রেও শরয়ী সীমার বাইরে গিয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থসম্পদ, মূল্যবান সময়, কথা বা শারীরিক শক্তি অপব্যয় করা। আল্লাহ তাআলা অপচয়কারীকে কোনোভাবেই ভালোবাসেন না এবং পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন: “নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা হলো শয়তানের ভাই” (সুরা বনী ইসরাঈল: ২৭)। আত্মিক সাধকের জন্য অল্পে তুষ্টি (ক্বানাআত) ও যুহদ রক্ষা করতে হলে ইসরাফ থেকে বেঁচে থাকা অপরিহার্য। অহেতুক সময় নষ্ট করাও আধ্যাত্মিক জীবনে এক বিরাট ইসরাফ।
২. আত-তাহাউন (التهاون – অবহেলা ও শৈথিল্য): শরীয়তের ফরজ, ওয়াজিব ও গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাতসমূহের প্রতি উদাসীনতা প্রদর্শন করা, নামাজের ওয়াক্তকে বিনা ওজরে বিলম্বিত করা এবং দ্বীনী আদেশ-নিষেধকে অতি হালকা মনে করে অবজ্ঞা করা। এটি মূলত অন্তরের চরম উদাসীনতা ও কপটতা তথা মোনাফেকির মারাত্মক আলামত। তাহাউনের ফলে অন্তরের ওপর পাপের কালো দাগ পড়ে যায় এবং এক পর্যায়ে কলব শক্ত পাথরের মতো অনুভূতিহীন হয়ে পড়ে।
৩. আর-রিয়া (الرياء – লোকদেখানো ভাব ও প্রদর্শনপ্রিয়তা): একমাত্র মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নির্ধারিত যে কোনো ইবাদতের মাধ্যমে মানুষের প্রশংসা, পার্থিব সম্মান, অনুদান বা সামাজিক প্রতিপত্তি অন্বেষণ করা। রাসুলুল্লাহ সা. একে ‘শিরকে আসগার’ (ছোট শিরক) আখ্যা দিয়ে সতর্ক করেছেন যে, এটি মানুষের সমস্ত নেক আমলকে আগুন যেমন শুকনো কাঠকে জ্বালিয়ে ছারখার করে দেয় তেমনি নিঃশেষ করে দেয় (ইবনে মাজাহ)। হাদীসে এসেছে, কিয়ামতের দিন যে দানবীর, শহীদ ও আলেমকে প্রথম জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে, তারা এই লোকদেখানো রিয়ার কারণেই ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। ইখলাসবিহীন আমল আল্লাহর দরবারে ধূলিকণার মতো প্রত্যাখ্যাত হয়।
(هـ) بين علامات القلب المريض فى ضوء القران والسنة –
[(ঙ) কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে রুগ্ণ বা ব্যাধিগ্রস্ত অন্তরের লক্ষণসমূহ বর্ণনা করুন।]
ব্যাধিগ্রস্ত অন্তরের কোরআন ও হাদিসভিত্তিক লক্ষণসমূহ:
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা মুনাফেক ও পাপাচারীদের আত্মিক বিকৃতি প্রসঙ্গে ইরশাদ করেছেন: “তাদের অন্তরে এক মারাত্মক ব্যাধি রয়েছে, অতঃপর আল্লাহ তাদের সেই ব্যাধিকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছেন” (সুরা বাকারা: ১০)। মানুষের শারীরিক ব্যাধির চেয়েও আত্মিক ব্যাধি বহুগুণে মারাত্মক। কুরআন ও সুন্নাহর নিখুঁত গবেষণার আলোকে অসুস্থ কলবের প্রধান লক্ষণগুলো নিম্নে সবিস্তারে আলোচনা করা হলো:
১. গুনাহে অনুশোচনাহীনতা ও পাপের স্বাভাবিকীকরণ: মারাত্মক কোনো পাপাচারে লিপ্ত হওয়ার পরেও অন্তরে কোনো প্রকার অনুশোচনা, আল্লাহর ভয় বা লজ্জা জাগ্রত না হওয়া এবং গুনাহকে চোখের সামনে দিয়ে মাছি উড়ে যাওয়ার মতো অতি তুচ্ছ ও সাধারণ মনে করা। রাসুলুল্লাহ সা. বলেন: “মুমিন তার পাপকে দেখে যেন সে এক পাহাড়ের নিচে বসে আছে যা যে কোনো সময় তার ওপর ভেঙে পড়তে পারে, আর পাপিষ্ঠ ব্যক্তি পাপকে দেখে নাকের ডগার মাছির মতো” (সহীহ বুখারী)।
২. ইবাদতে স্বাদের অভাব ও অনীহা: কুরআন তিলাওয়াত, জিকির ও সালাতের মতো পরম বরকতময় ইবাদতে অন্তরে কোনো বিনম্রতা, কান্না বা স্বর্গীয় তৃপ্তি না পাওয়া, বরং ইবাদতকে এক ভারী ও ক্লান্তিকর বোঝা মনে করা।
৩. বিদআত ও কুপ্রবৃত্তির প্রতি তীব্র অন্ধ আকর্ষণ: সুন্নাহর সহজ-সরল ও জ্যোতির্ময় পথের চেয়ে বিদআত, কুসংস্কার ও মনগড়া মতবাদের প্রতি অন্ধ আকর্ষণ পোষণ করা এবং সত্য ও হকের প্রামাণ্য নসীহত শুনলে অন্তরে বিরক্তি ও অসন্তোষ তৈরি হওয়া।
৪. হিংসা, অহংকার ও পরনিন্দা: অন্যের পার্থিব বা ধর্মীয় নিয়ামত দেখে অন্তরে প্রচণ্ড হিংসার (হাসাদ) অনল জ্বলা, নিজের ইলম বা বংশমর্যাদা নিয়ে অহংকার (কিবর) করা এবং গীবত-পরচর্চায় লিপ্ত হয়ে পৈশাচিক আনন্দ উপভোগ করা।
৫. দুনিয়ার অন্ধ মোহ ও আখেরাত বিস্মৃতি: আখেরাতের অনন্ত জীবনের জবাবদিহিতার চেয়ে পার্থিব অর্থসম্পদ, ক্ষমতা ও ভোগবিলাসের মোহে দিনরাত নিমগ্ন থাকা। অন্তরের এই ব্যাধি নিরাময়ের একমাত্র পথ হলো খাঁটি তাওবা, কুরআন তিলাওয়াত এবং কামিল আহলুল্লাহদের সংস্পর্শে গিয়ে নিয়মিত আত্মশুদ্ধি অর্জন করা।
(و) ما الفرق بين المعجزة والكرامة والسحر؟
[(চ) মু’জিযা, কারামত ও যাদুর (সিহর) মধ্যকার পার্থক্য কী?]
ইসলামী আকীদা ও তাসাউউফ শাস্ত্রে মানুষের মাধ্যমে প্রকাশিত অতিপ্রাকৃতিক ও অলৌকিক ঘটনাবলির প্রকৃতি ও উৎসের ভিত্তিতে এদের মধ্যে আসমান-জমিন পার্থক্য নিরূপণ করা হয়েছে। নিম্নে এদের সুস্পষ্ট সীমারেখা তুলে ধরা হলো:
১. মু’জিযা (المعجزة): এটি কেবল মহান আল্লাহর নবী ও রাসুলদের মাধ্যমে নবুওয়তের প্রকাশ্য সত্যতা প্রমাণের উদ্দেশ্যে আল্লাহর সরাসরি কুদরতে প্রকাশিত এমন এক অতিপ্রাকৃতিক অলৌকিক নিদর্শন, যা সমগ্র মানবজাতিকে চ্যালেঞ্জ করে এবং যার মোকাবেলা করতে পৃথিবীর কোনো সৃষ্টি কখনোই সক্ষম নয়। যেমন হযরত মুসা আ.-এর হাতের লাঠি অজগর সাপ হওয়া এবং আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ সা.-এর অঙ্গুলির ইশারায় পূর্ণিমার চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়া। মু’জিযা প্রকাশে নবীদের কোনো ব্যক্তিগত ক্ষমতা নেই, বরং তা সরাসরি আল্লাহর কুদরত।
২. কারামত (الكرامة): রাসুলুল্লাহ সা.-এর সুন্নাহর পূর্ণ অনুসারী কোনো খাঁটি মুত্তাকী ওলীউল্লাহ বা বুজুর্গের মাধ্যমে কোনো প্রকার নবুওয়তের দাবি ও প্রতিপক্ষের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছাড়াই স্বতঃস্ফূর্তভাবে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রকাশিত অসাধারণ অলৌকিক নিয়ামত। যেমন হযরত মরিয়ম আ.-এর মেহরাবে অসময়ের ফলমূল উপস্থিত হওয়া এবং হযরত উমর রা. কর্তৃক মদিনার মিম্বর থেকে শত শত মাইল দূরে সেনাপতি সারিয়াহকে পাহাড়ের আড়ালের শত্রুর বিষয়ে সতর্ক করে দেওয়া। কারামত মূলত নবীর মু’জিযারই এক পরোক্ষ বরকত।
৩. সিহর বা যাদু (السحر): কোনো কাফের, ফাসেক, অপবিত্র বা পথভ্রষ্ট ব্যক্তির মাধ্যমে শয়তান ও খবিস জিনদের সন্তুষ্ট করে এবং নাপাকীর আশ্রয়ে সম্পাদিত প্রতারণামূলক দৃশ্য বা ক্ষতিসাধন। এটি সম্পূর্ণ হারাম, শিরক ও কুফরী কাজ, যার কোনো স্থায়ী কল্যাণকর অস্তিত্ব নেই। এদের সাথে আরও রয়েছে ‘ইসতিদরাজ’—পাপী ব্যক্তির অহংকার আরও বৃদ্ধির জন্য সাময়িকভাবে অলৌকিক কিছু দেখানো। মুমিনদের জন্য এদের মধ্যকার পার্থক্য জানা আকীদা রক্ষার অপরিহার্য শর্ত।
আকীদাগত মূল্যায়ন ও উপসংহার: আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের আকীদা অনুসারে, মু’জিযা ও কারামত দুটিই সত্য এবং আল্লাহর কুদরতে সংঘটিত হয়। তবে মু’জিযা দ্বারা নবুওয়তের দাবি প্রমাণিত হয়, যা নবী ছাড়া অন্য কারও জন্য দাবি করা কুফরী। পক্ষান্তরে কারামত ওলীগণের তাকওয়ার পুরস্কার হলেও কোনো ওলী কখনোই তা প্রদর্শনীর উদ্দেশ্যে স্বেচ্ছায় ব্যবহার করেন না। অপরদিকে যাদু হলো শয়তানী চালিকাশক্তি। সুতরাং একজন সচেতন মুমিনের দায়িত্ব হলো কোনো অদ্ভুত ঘটনা দেখেই প্রতারিত না হয়ে ব্যক্তির সার্বিক সুন্নাহর অনুসরণ ও তাকওয়া যাচাই করা।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: কামিল হাদীস ৭ম পত্রের পূর্ণ বিষয় ও বিষয় কোড কী?
উত্তর: কামিল হাদীস ৭ম পত্রের বিষয় হলো ‘আল ফিকহুল মাযহাবী ওয়া ইলমুত তাসাউউফ’ এবং এর বিষয় কোড হলো 611207। পূর্ণমান ১০০ নম্বর।
প্রশ্ন ২: হানাফী মাযহাব মতে নামাজে হাত বাঁধার সুন্নাত স্থান কোনটি?
উত্তর: হানাফী মাযহাব অনুযায়ী পুরুষের জন্য নামাজে তাকবীরে তাহরীমার পর নাভির নিচে হাত বাঁধা সুন্নাত এবং নারীদের জন্য বুকের ওপর হাত বাঁধা সুন্নাত।
প্রশ্ন ৩: ‘আমালু আহলিল মাদীনা’ কোন মাযহাবের অন্যতম প্রধান দলিল?
উত্তর: ‘আমালু আহলিল মাদীনা’ বা মদিনাবাসীর ধারাবাহিক সম্মিলিত আমল হলো ইমাম মালেক রহ. প্রতিষ্ঠিত মালেকী মাযহাবের অন্যতম প্রধান প্রামাণ্য মৌলিক উৎস।
প্রশ্ন ৪: মুজাদ্দিদে আলফে সানী কাকে বলা হয় এবং কেন?
উত্তর: হযরত শায়খ আহমাদ আল-ফারূকী সিরহিন্দী রহ.-কে মুজাদ্দিদে আলফে সানী বলা হয়, কারণ তিনি হিজরী দ্বিতীয় সহস্রাব্দের শুরুতে সম্রাট আকবরের ভ্রান্ত দ্বীনে এলাহী নির্মূল করে ইসলামকে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন।
প্রশ্ন ৫: তাসাউউফের প্রধান চারটি তরীকার নাম কী কী?
উত্তর: বিশ্ববিখ্যাত প্রধান চারটি সুফি তরীকা হলো কাদেরিয়া, চিশতিয়া, নকশবন্দিয়া এবং সোহরাওয়ার্দিয়া তরীকা।
প্রশ্ন ৬: মু’জিযা ও কারামতের মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?
উত্তর: মু’জিযা কেবল নবী ও রাসুলদের নবুওয়তের সত্যতা প্রমাণের চ্যালেঞ্জসহ প্রকাশ পায়; পক্ষান্তরে কারামত কোনো চ্যালেঞ্জ ছাড়া সুন্নাহর অনুসারী আল্লাহর ওলীদের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

