কামিল (স্নাতকোত্তর) হাদীস দ্বিতীয় পর্ব পরীক্ষা, ২০২৪
প্রথম পত্র
বিষয়: সহীহুল বুখারী (প্রথম খণ্ড) [নতুন সিলেবাস অনুযায়ী]
বিষয় কোড: 611201 | পূর্ণমান: ১০০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
الملاحظة : اجب عن اربعة من مجموعة (أ) وعن واحد من مجموعة (ب) – والدرجات الكاملة مذكورة فى الهامش-
مجموعة (أ) : الحديث والتحقيق والشرح (الدرجة – ২০ x ৪ = ৮০)
(ترجم الأحاديث التالية مع التوضيح ثم أجب عن ثلاثة من الأسئلة الملحقة بكل حديث)
١- باب حب الرسول صلى الله عليه وسلم من الايمان – حدثنا ابو اليمان قال ثنا شعيب قال ثنا ابو الزناد عن الاعرج عن ابي هريرة (رض) ان رسول الله صلى الله عليه وسلم قال : والذى نفسى بيده لا يؤمن احدكم حتى اكون احب اليه من والده وولده والناس اجمعين –
[১. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ভালোবাসা ঈমানের অংশ—এই অনুচ্ছেদ। ইমাম বুখারী রহ. বলেন, আমাদের নিকট হাদিস বর্ণনা করেছেন আবুল ইয়ামান রহ., তিনি বলেন আমাদের হাদিস বর্ণনা করেছেন শুআইব রহ., তিনি বলেন আমাদের হাদিস বর্ণনা করেছেন আবুয যিনাদ রহ., তিনি আ’রাজ রহ. থেকে, আর তিনি বিশিষ্ট সাহাবি হযরত আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “সেই সত্তার শপথ যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তোমাদের কেউই ততক্ষণ পর্যন্ত পরিপূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা, তার সন্তান-সন্ততি এবং সমগ্র মানবজাতির চেয়েও অধিক প্রিয় পাত্র হব।”]
হাদীসের নির্বাচিত শব্দের তাহকীক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ:
| শব্দ | অর্থ | মূল ধাতু (Root/Madda) | শব্দরূপ/ছীগাহ (Form/Sighah) | ব্যাকরণিক অবস্থান (Grammatical Role) |
|---|---|---|---|---|
| نَفْسِيْ | আমার প্রাণ / সত্তা | ن – ف – س | ইসম মুফরাদ, মুতাকাল্লিম যমীরযুক্ত | মুদাফ ও মুদাফ ইলাইহ মিলে কাসামের মুকসাম বিহী |
| يُؤْمِنُ | সে ঈমান আনয়ন করে | أ – م – ن | মুযারে মা’রূফ, বাবে ইফ’আল | ফি’লে মুযারে মারফূ’, নাফী লা-এর মাদখূল |
| أَحَبَّ | অধিক প্রিয় | ح – ب – ب | ইসমে তাফযীল, ওয়াহেদ মুযাক্কার | কানা ক্রিয়ার খবর হিসেবে মানসূব |
| وَالِدِهِ | তার পিতা / জনক | و – ل – د | ইসমে ফায়িল, মুযাক্কার মুফরাদ | মাজরূর বিল-ইদাফাত, হরফে জার ‘মিন’-এর মাজরূর |
| أَجْمَعِيْنَ | সকল / সমগ্র | ج – م – ع | ইসমু জামা’, তাকীদ | আন-নাস শব্দের তাকীদে মা’নাভী হিসেবে মাজরূর বিল-ইয়া |
(أ) ما معنى الايمان لغة وشرعا؟ وما الفرق بينهما؟ بين مفصلا-
[(ক) ঈমানের শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ কী? এবং উভয়ের মধ্যকার পার্থক্য কী? বিশদভাবে বর্ণনা করুন।]
১. শাব্দিক অর্থ: ‘ঈমান’ (الإيمان) শব্দটি বাবে ইফ’আল-এর মাসদার। এর আভিধানিক অর্থ হলো التصديق বা দৃঢ় অন্তরে সত্য বলে বিশ্বাস করা, প্রশান্তি অর্জন করা এবং স্বীকৃতি প্রদান করা।
২. পারিভাষিক অর্থ: শরীয়তের পরিভাষায় ঈমান হলো, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে দ্বীনের যে সকল বিধিবিধান ও অকাট্য বিষয়াদি (জরূরিয়াতে দ্বীন) নিয়ে এসেছেন, তা অন্তরে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা এবং মুখে স্বীকৃতি প্রদান করা। জমহুর মুহাদ্দিসীন ও সালাফে সালেহীনের মতে ঈমান হলো: ‘অন্তরের বিশ্বাস, মুখের স্বীকৃতি এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমল’ (تصديق بالجنان وإقرار باللسان وعمل بالأركان)।
৩. শাব্দিক ও পারিভাষিক পার্থক্য: শাব্দিক ঈমান যেকোনো অদৃশ্য বা দৃশ্যমান সংবাদকে বিশ্বাস করাকে বোঝায়, যেখানে বিশেষ কোনো ধর্মীয় বিধান পূর্বশর্ত নয়। কিন্তু পারিভাষিক ঈমান কেবল আল্লাহ, তাঁর রাসুল সা., মালাইকা, আসমানি কিতাব, আখিরাত এবং তকদীরের ওপর শরীয়ত নির্ধারিত অকাট্য মূলনীতি অনুযায়ী বিশ্বাসের নাম। শাব্দিক অর্থে আমল অন্তর্ভুক্ত নয়, তবে পারিভাষিক অর্থে আমল ঈমানের অঙ্গ বা পূর্ণতার অবিচ্ছেদ্য শর্ত।
(ب) ما المحبة؟ وكم قسما لها؟ بين موضحا-
[(খ) মুহাব্বাত বা ভালোবাসা কাকে বলে? এবং এর প্রকারভেদ কয়টি? স্পষ্ট করে বর্ণনা করুন।]
১. মুহাব্বাতের সংজ্ঞা: মুহাব্বাত (المحبة) হলো কোনো বস্তু বা ব্যক্তির প্রতি হৃদয়ের এমন আন্তরিক আকর্ষণ ও ভালোবাসা, যা তার প্রতি আত্মোৎসর্গ ও অনুকরণের প্রবল স্পৃহা জাগ্রত করে। আল্লামা কিরমানী ও ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন, অন্তরের এমন এক স্বাভাবিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক প্রণতি যা কোনো সৌন্দর্যের কারণে সৃষ্টি হয়।
২. মুহাব্বাতের প্রকারভেদ: ইসলামী দর্শনে ভালোবাসা প্রধানত তিন প্রকার:
– মুহাব্বাতে তাবাঈ (স্বভাবজাত ভালোবাসা): যেমন পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি, স্ত্রী এবং আত্মীয়-স্বজনের প্রতি মানুষের স্বভাবসুলভ আকর্ষণ।
– মুহাব্বাতে আকলী (বুদ্ধিবৃত্তিক ও যুক্তিসঙ্গত ভালোবাসা): মানুষ চিন্তা-ভাবনা ও কল্যাণ অনুধাবন করে যা ভালোবাসে। যেমন রোগী তিক্ত ওষুধ পান করতে ভালোবাসে আরোগ্য লাভের আশায়। রাসুলুল্লাহ সা.-এর প্রতি ভালোবাসা মূলত মুহাব্বাতে আকলীর সর্বোচ্চ রূপ, যা মানুষের নিজের প্রাণ ও প্রবৃত্তির চাহিদার চেয়েও নবীজির আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দেয়।
– মুহাব্বাতে রূহানী বা শরয়ী (ঐশ্বরিক ভালোবাসা): আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি ও মা’রিফাত অর্জনের উদ্দেশ্যে দ্বীনী ভাই ও সৎকর্মশীলদের প্রতি ভালোবাসা।
(ج) ما الفرق بين “حدثنا” و “انبانا” و”اخبرنا”؟ بين مفصلا-
[(গ) “হাদ্দাসানা”, “আম্বায়ানা” ও “আখবারানা”-এর মধ্যে পরিভাষাগত পার্থক্য কী? বিশদভাবে বর্ণনা করুন।]
উসূলে হাদীসে শায়খের কাছ থেকে হাদিস গ্রহণের বিভিন্ন শব্দ (আলফাযুত তাহাম্মুল ওয়াল আদা) ব্যবহৃত হয়:
১. হাদ্দাসানা (حدثنا): মুহাদ্দিসীনদের সাধারণ রেওয়াজ অনুযায়ী, যখন উস্তায বা শায়খ নিজ মুখে হাদিস পাঠ করেন এবং ছাত্ররা কেবল তা শ্রবণ করে, তখন ‘হাদ্দাসানা’ শব্দ ব্যবহার করা হয়। এটি সর্বাধিক শক্তিশালী পাঠ্যরীতি।
২. আখবারানা (أخبرنا): যখন কোনো ছাত্র শায়খের সামনে কিতাব দেখে বা মুখস্থ পাঠ করে (আরয বা কিরাত আলাশ শায়খ) এবং শায়খ তা শুনেন ও অনুমোদন করেন, তখন ‘আখবারানা’ বলা হয়। ইমাম শাফিয়ী ও মুসলিম রহ.-এর মতে এটি নির্দিষ্ট হলেও ইমাম মালেক ও ইমাম বুখারী রহ.-এর নিকট হাদ্দাসানা ও আখবারানা প্রায় সমার্থক।
৩. আম্বায়ানা (أنبأنا): প্রাথমিক যুগে এটি আখবারানা-এর সমার্থক হলেও পরবর্তী যুগে মুহাদ্দিসদের নিকট এটি ‘ইজাযত’ (অনুমোদনভিত্তিক হাদিস রেওয়ায়েত)-এর ক্ষেত্রে বিশেষভাবে নির্দিষ্ট হয়ে পড়ে।
(د) بين اهمية حب الرسول صلى الله عليه وسلم فى حياة المؤمن مفصلا-
[(ঘ) মুমিনের জীবনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভালোবাসার গুরুত্ব বিশদভাবে বর্ণনা করুন।]
রাসুলুল্লাহ সা.-এর প্রতি ভালোবাসা রাখা কেবল একটি সাধারণ পুণ্যময় কাজ নয়, বরং এটি ঈমানের রুকন ও ঈমান শুদ্ধ হওয়ার অনিবার্য শর্ত। রাসুলপ্রেমহীন কোনো আমলই মহান আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য নয়। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: “বলুন, যদি তোমাদের পিতা, সন্তান, ভাই, স্ত্রী, আত্মীয়-স্বজন এবং ধন-সম্পদ তোমাদের নিকট আল্লাহ ও তাঁর রাসুল অপেক্ষা অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা করো আল্লাহর নির্দেশ আসা পর্যন্ত” (সুরা তাওবাহ: ২৪)। রাসুলপ্রেম মুমিনকে তাঁর সুন্নাহর পরিপূর্ণ অনুসরণে উদ্বুদ্ধ করে এবং পরকালে জান্নাতে নবীজির সান্নিধ্য লাভের নিশ্চয়তা প্রদান করে।
(هـ) لم خص فى الحديث “الوالد والولد”؟ بين موضحا-
[(ঙ) হাদীসে বিশেষভাবে “পিতা ও সন্তান”-এর উল্লেখ করার কারণ কী? স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিন।]
হাদিসে সাধারণ মানুষের উল্লেখের আগে বিশেষভাবে ‘পিতা’ ও ‘সন্তান’-এর কথা উল্লেখ করার কারণ হলো, মানবজীবনে রক্তের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সন্তান তার পিতার প্রতি জন্মগত কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা অনুভব করে, আর পিতা তার সন্তানের প্রতি নিঃস্বার্থ স্নেহ ও আত্মত্যাগের সর্বোচ্চ পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে। মানুষ সাধারণত এই দুই সম্পর্কের জন্য নিজের ধন-সম্পদ ও আরাম-আয়েশ বিসর্জন দেয়। তাই হাদিসে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, পৃথিবীর এই পরম প্রিয়তম দুটি সত্তার চেয়েও ঈমানদারের হৃদয়ে রাসুলুল্লাহ সা.-এর ভালোবাসা কোটি গুণে বেশি হতে হবে।
٢- عن ابن عباس (رض) قال لما اشتد بالنبي صلى الله عليه وسلم وجعه قال ائتوني بكتاب اكتب لكم كتابا لا تضلوا بعده قال عمر ان النبي صلى الله عليه وسلم غلبه الوجع وعندنا كتاب الله حسبنا فاختلفوا وكثر اللغط قال قوموا عنى ولا ينبغى عندى التنازع فخرج ابن عباس يقول ان الرزية كل الرزية ما حال بين رسول الله صلى الله عليه وسلم وبين كتابه –
[২. হযরত ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রোগ-যন্ত্রণা তীব্র আকার ধারণ করল, তখন তিনি বললেন: “তোমরা আমার নিকট লেখার উপকরণ নিয়ে এসো, আমি তোমাদের জন্য এমন একটি নির্দেশনামা লিখে দেব যার পর তোমরা কখনো পথভ্রষ্ট হবে না।” তখন হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “নিশ্চয়ই নবীজি সা.-এর ওপর রোগযন্ত্রণা প্রবল হয়েছে, আর আমাদের কাছে তো আল্লাহর কিতাব কুরআন মাজীদ বিদ্যমান রয়েছে, যা আমাদের জন্য যথেষ্ট।” এ নিয়ে উপস্থিত সাহাবিদের মধ্যে মতভেদ দেখা দিল এবং হট্টগোল বেড়ে গেল। রাসুলুল্লাহ সা. বললেন: “তোমরা আমার নিকট থেকে উঠে যাও, আমার সামনে ঝগড়া-বিবাদ করা সঙ্গত নয়।” এরপর ইবনে আব্বাস রা. এই বলে বের হতেন যে, “সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ও দুর্ভাগ্য হলো তাই, যা রাসুলুল্লাহ সা. ও তাঁর নির্দেশনামা লেখার মধ্যে অন্তরায় সৃষ্টি করেছিল।”]
হাদীসের নির্বাচিত শব্দের তাহকীক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ:
| শব্দ | অর্থ | মূল ধাতু (Root/Madda) | শব্দরূপ/ছীগাহ (Form/Sighah) | ব্যাকরণিক অবস্থান (Grammatical Role) |
|---|---|---|---|---|
| اشْتَدَّ | তীব্র হলো / বৃদ্ধি পেল | ش – د – د | মাযী মা’রূফ, বাবে ইফতি’আল | ফি’লে মাযী, এর ফায়েল হলো ‘ওয়াজা’উহু’ |
| اِئْتُوْنِيْ | আমার নিকট নিয়ে আসো | أ – ت – ي | আমরে হাযির মা’রূফ, জমা মুযাক্কার | ফি’লে আমর, ওয়াও ফায়েল, নূনে বেকায়াহ সহ ইয়া মাফ’উল |
| الْوَجَعُ | বেদনা / রোগযন্ত্রণা | و – ج – ع | ইসম মুফরাদ, মাসদার | ফা’য়িল হিসেবে মারফূ’ বিয-যম্মাহ |
| حَسْبُنَا | আমাদের জন্য যথেষ্ট | ح – س – ب | ইসমুল মাসদার, মুদাফ ইলা না যমীর | মুবতাদা হিসেবে মারফূ’ মাহাল্লান |
| الرَّزِيَّةُ | বিপদ / মহাদুর্ভাগ্য | ر – ز – ي | ইসম মুফরাদ, সিফাত মুশাহহাবা | ইন্না-এর ইসম হিসেবে মানসূব বিল-ফাতহাহ |
(أ) ماذا اراد النبي صلى الله عليه وسلم ان يكتب؟ بين –
[(ক) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কী লিখতে চেয়েছিলেন? বর্ণনা করুন।]
মুহাদ্দিসীনে কিরাম ও ব্যাখ্যাকারগণের মতে, রাসুলুল্লাহ সা. অন্তিম মুহূর্তে এমন কিছু মৌলিক হেদায়েত লিপিবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন, যাতে উম্মত পরবর্তী সময়ে কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্বে না পড়ে। ইমাম কুরতুবী, নববী ও ইবনে হাজার আসকালানী রহ. উল্লেখ করেন, নবীজি সা. মূলত خلافت বা খেলাফতের স্পষ্ট দিকনির্দেশনা (যেমন হযরত আবু বকর রা.-এর মনোনয়ন নিশ্চিতকরণ), শরীয়তের মৌলিক বিধিবিধানের ওপর অটল থাকা এবং কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার চিরন্তন নসীহত লিখে দিতে চেয়েছিলেন। তবে এটি কোনো নতুন ওহী বা শরীয়তের মৌলিক রুকন ছিল না, কেননা ওহীর বিধান পূর্বেই সুরা মায়েদার ৩ নম্বর আয়াত “আল-ইয়াওমা আকমালতু লাকুম দীনাকুম” দ্বারা পরিপূর্ণতা পেয়েছিল।
(ب) متى واين وقعت هذه الواقعة؟ وكم يوما عاش النبي صلى الله عليه وسلم؟ بين –
[(খ) এ ঘটনাটি কখন এবং কোথায় ঘটেছিল? এবং এরপর নবীজি সা. কত দিন জীবিত ছিলেন? বর্ণনা করুন।]
১. সময় ও স্থান: এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি ১১ হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসের প্রথম সপ্তাহে, ওফাতের মাত্র চার দিন আগে বৃহস্পতিবার দিবসে রাসুলুল্লাহ সা.-এর অন্তিম রোগশয্যায় উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রা.-এর পবিত্র হুজরা শরীফে সংঘটিত হয়েছিল। হাদীসের পরিভাষায় একে ‘ইয়াউমুল খামীস’ বা বৃহস্পতিবারের ঘটনা বলা হয়।
২. নবীজি সা.-এর অবশিষ্টাংশ জীবন: বৃহস্পতিবার এই ঘটনার পর রাসুলুল্লাহ সা. আরও চার দিন জীবিত ছিলেন এবং পরবর্তী সোমবার ১২ই রবিউল আউয়াল চাশতের সময় মহান রফীকে আলার সান্নিধ্যে গমন করেন। এই চার দিনে তিনি বারবার সাহাবিদের নামাজ ও ক্রীতদাসদের অধিকার সম্পর্কে অসীয়ত করেছিলেন।
(ج) كيف خالف عمر رضى الله عنه النبى صلى الله عليه وسلم مع ان مخالفة الرسول من سوء الادب؟ بين –
[(গ) রাসুলুল্লাহ সা.-এর নির্দেশের বিরোধিতা করা বেআদবী হওয়া সত্ত্বেও হযরত উমর রা. কেন বিরোধিতা করলেন? বর্ণনা করুন।]
বাহ্যিক দৃষ্টিতে হযরত উমর রা.-এর বক্তব্যকে নবীজির আদেশের বিরোধিতা মনে হলেও তা মূলত রাসুলুল্লাহ সা.-এর প্রতি চরম সহানুভূতি ও গভীর দূরদর্শিতার বহিঃপ্রকাশ ছিল:
১. হযরত উমর রা. লক্ষ্য করেছিলেন যে, তীব্র জ্বরাক্রান্ত অবস্থায় নবীজি সা. চরম শারীরিক কষ্টে আছেন। এমন মুহূর্তে লেখার মতো মানসিক ও শারীরিক চাপ দেওয়া নবীজির জন্য আরও বেশি কষ্টদায়ক হবে বিধায় তিনি স্নেহার্দ্র অন্তরে এ কথা বলেছিলেন।
২. উমর রা. বুঝতে পেরেছিলেন যে, নবীজির এই আদেশ কোনো ওয়াজিব বা অকাট্য শরয়ী আদেশ ছিল না, বরং তা ছিল পরামর্শমূলক বা মুস্তাহাব। যদি এটি উম্মতের জন্য দ্বীনের কোনো অপরিহার্য ওহী হতো, তবে নবীজি সা. সাহাবিদের মতভেদের কারণে তা লেখা স্থগিত রাখতেন না, কারণ তাবলীগ বা দ্বীন পৌঁছানো নবীদের ওপর ফরজ।
৩. আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন যে দ্বীন পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। তাই উমর রা. বলেছিলেন, “আমাদের নিকট আল্লাহর কিতাব রয়েছে, যা পথপ্রদর্শনের জন্য যথেষ্ট।” পরবর্তী সময়ে সাহাবায়ে কিরাম উমর রা.-এর এই প্রজ্ঞাপূর্ণ সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।
(د) متى اشتد وجع النبى صلى الله عليه وسلم؟ بين –
[(ঘ) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রোগযন্ত্রণা কখন তীব্র রূপ ধারণ করেছিল? বর্ণনা করুন।]
রাসুলুল্লাহ সা. বিদায় হজের পর সফর মাসের শেষভাগে অসুস্থ হয়ে পড়েন। জান্নাতুল বাক্বী জিয়ারত থেকে ফিরে আসার পর তাঁর প্রচণ্ড শিরঃপীড়া ও তীব্র জ্বর অনুভূত হয়। বিশেষ করে ওফাতের পাঁচ দিন পূর্বে অর্থাৎ বৃহস্পতিবারের দিন এই রোগযন্ত্রণা মারাত্মক তীব্র আকার ধারণ করে, যার ফলে তিনি বারবার বেহুঁশ হয়ে পড়তেন এবং তাঁর দেহে সাতটি কূপের ঠাণ্ডা পানি ঢালার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
(هـ) الام اشار ابن عباس بقوله “ان الرزية كل الرزية”؟
[(ঙ) হযরত ইবনে আব্বাস রা.-এর “সবচেয়ে বড় দুর্যোগ/ট্র্যাজেডি” (الرزية كل الرزية) বক্তব্যের মর্মার্থ কী?]
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. অত্যন্ত সংবেদনশীল ও নবীপ্রেমিক সাহাবি ছিলেন। তিনি মনে করতেন, যদি রাসুলুল্লাহ সা. নিজ হাতে একটি লিখিত দলিল রেখে যেতেন, তবে খেলাফত ও অন্যান্য খুটিনাটি বিষয়ে উম্মতের মধ্যে পরবর্তী সময়ে কোনো ইখতিলাফ বা রাজনৈতিক বিভেদের সুযোগ থাকত না। তাই তিনি সাহাবিদের পারস্পরিক বাদানুবাদের কারণে সেই লেখা থেকে বঞ্চিত হওয়াকে একটি হৃদয়বিদারক ক্ষতি বা ‘বড় ধরনের দুঃখের কারণ’ হিসেবে আখ্যায়িত করতেন।
٣- باب اذا شرب الكلب فى الاناء : حدثنا عبد الله بن يوسف قال انا مالك عن ابى الزناد عن الاعرج عن ابى هريرة (رض) ان النبى صلى الله عليه وسلم قال اذا شرب الكلب فى اناء احدكم فليغسله سبعا –
[৩. যদি পাত্রে কুকুর পান করে—এই অনুচ্ছেদ। ইমাম বুখারী রহ. বলেন, আমাদের নিকট হাদিস বর্ণনা করেছেন আব্দুল্লাহ ইবনে ইউসুফ রহ., তিনি বলেন আমাদের সংবাদ দিয়েছেন ইমাম মালিক রহ. আবুয যিনাদ থেকে, তিনি আ’রাজ থেকে, আর তিনি হযরত আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “তোমাদের কারো পাত্রে যখন কুকুর মুখ দেয় (বা পান করে), তখন সে যেন তা সাতবার ধৌত করে।”]
হাদীসের নির্বাচিত শব্দের তাহকীক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ:
| শব্দ | অর্থ | মূল ধাতু (Root/Madda) | শব্দরূপ/ছীগাহ (Form/Sighah) | ব্যাকরণিক অবস্থান (Grammatical Role) |
|---|---|---|---|---|
| شَرِبَ | সে পান করল | ش – ر – ب | মাযী মা’রূফ, ওয়াহেদ মুযাক্কার গায়েব | শর্তীয় জুমলার ফি’লে শর্ত |
| الْكَلْبُ | কুকুর | ك – ل – ب | ইসমু জিন্স, মুযাক্কার | শারীবা ক্রিয়ার ফা’য়িল হিসেবে মারফূ’ |
| إِنَاءِ | পাত্র | أ – ن – ي | ইসম মুফরাদ, মাজরূর | হরফে জার ‘ফী’-এর কারণে মাজরূর বিল-কাসরাহ |
| فَلْيَغْسِلْهُ | অতএব সে যেন তা ধুয়ে ফেলে | غ – س – ل | আমরে গায়েব, লামে আমর সহ | জাযায়ে শর্ত, লামে আমরের কারণে সাকিনযুক্ত |
| سَبْعًا | সাতবার | س – ب – ع | ইসমুল আদাদ, মানসূব | মাফ’উলে মুতলাকের নায়েব হিসেবে মানসূব |
(أ) عرف الكلب المعلم – هل يجوز قتل الكلاب؟ بين مفصلا-
[(ক) প্রশিক্ষিত শিকারী কুকুরের (আল-কালবুল মু’আল্লাম) পরিচয় দিন। কুকুর হত্যা করা কি জায়েয? বিশদভাবে বর্ণনা করুন।]
১. কালবে মুয়াল্লিম-এর পরিচয়: শরীয়তের পরিভাষায় যে শিকারি কুকুরকে সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যা মালিকের নির্দেশে শিকারে যায়, মালিক নিষেধ করলে থেমে যায় এবং শিকারকৃত প্রাণীকে নিজে ভক্ষণ না করে অক্ষত অবস্থায় মালিকের জন্য সংরক্ষণ করে, তাকে ‘কালবে মুয়াল্লিম’ বা প্রশিক্ষিত কুকুর বলা হয়। পবিত্র কুরআনে এদের শিকারকৃত প্রাণী হালাল ঘোষণা করা হয়েছে (সুরা মায়িদা: ৪)।
২. কুকুর হত্যার বিধান: ইসলামের প্রাথমিক যুগে সামগ্রিকভাবে কুকুর নিধনের নির্দেশ থাকলেও পরবর্তীতে তা রহিত করা হয়। বর্তমান শরীয়তের বিধান হলো:
– ক্ষতিকর ও হিংস্র পাগলা কুকুর (আল-কালবুল আকূর) হত্যা করা সর্বসম্মতভাবে জায়েজ, এমনকি হারাম শরীফেও তা হত্যা করা যায়।
– নিরীহ, সাধারণ কুকুর যা মানুষের ক্ষতি করে না, তা অহেতুক হত্যা করা হারাম ও নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ সা. সৃষ্টির প্রতি দয়া প্রদর্শনের তাগিদ দিয়েছেন।
(ب) بين حكم سور الكلب –
[(খ) কুকুরের উচ্ছিষ্টের (সূরুল কালব) শরয়ী হুকুম বর্ণনা করুন।]
আইম্মায়ে আরবাআহর মধ্যে কুকুরের লালা ও এঁটোর হুকুম নিয়ে মতভেদ রয়েছে:
১. ইমাম শাফিয়ী ও ইমাম আহমাদ রহ.: কুকুরের সম্পূর্ণ দেহ, লালা ও এঁটো নাপাকে গালীযা (চরম অপবিত্র)। কুকুর পাত্রে মুখ দিলে তা আবশ্যিকভাবে নাপাক হয়ে যাবে এবং তা পবিত্র করতে সাতবার ধৌত করতে হবে, যার একবার মাটি দ্বারা হতে হবে।
২. ইমাম আবু হানিফা রহ.: কুকুরের লালা, মুখের এঁটো এবং গোশত নাপাক; তবে জীবিত কুকুরের বহিরাঙ্গ বা পশম পবিত্র। পাত্রে মুখ দিলে তা নাপাক হবে এবং সাধারণ নাপাকির মতো তিনবার উত্তমরূপে ধৌত করলেই পাক হয়ে যাবে, সাতবারের নির্দেশ মুস্তাহাব।
৩. ইমাম মালেক রহ.: কুকুরের এঁটো তহারতের দিক থেকে পবিত্র, আর সাতবার ধৌত করার আদেশটি নিছক তা’আববুদী (ইবাদতগত নির্দেশ), নাপাকির কারণে নয়।
(ج) كيف يطهر الاناء اذا ولغ فيه الكلب؟ بين –
[(গ) কুকুরে মুখ দেওয়া পাত্র কীভাবে পবিত্র করতে হয়? বর্ণনা করুন।]
সহীহ বুখারী ও মুসলিমের অন্য রেওয়ায়েতে এসেছে, পাত্রটিকে সাতবার পানি দিয়ে ধৌত করতে হবে এবং তার একবারে (প্রথমবার বা শেষবারে) পবিত্র মাটি দিয়ে মাজতে হবে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, কুকুরের লালায় বিপজ্জনক রেবিস ভাইরাস ও ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া থাকে, যা সাধারণ পানি দিয়ে সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত হয় না; মাটির ক্ষারীয় উপাদান ও জীবাণুনাশক কণা এই বিষাক্ত জীবাণু সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করতে সক্ষম।
(د) ما حكم دخول الكلب فى المساجد؟ ناقش –
[(ঘ) মসজিদে কুকুর প্রবেশের বিধান কী? আলোচনা করুন।]
মসজিদকে সর্বপ্রকার অপবিত্রতা ও নোংরামি থেকে মুক্ত রাখা ওয়াজিব। তাই মসজিদে কুকুর প্রবেশ করতে দেওয়া সম্পূর্ণ নাজায়েজ ও মাকরূহে তাহরীমী। তবে যদি কোনো কুকুর অনিচ্ছাকৃতভাবে মসজিদে প্রবেশ করে কেবল হেঁটে চলে যায় এবং কোনো অপবিত্রতা বা পেশাব না ফেলে, তবে মসজিদের মেঝে নাপাক হবে না। সাহাবায়ে কিরামের যুগে মদিনার মসজিদে কখনো অনিচ্ছাকৃতভাবে কুকুর প্রবেশ করলে সাহাবিগণ পরবর্তীতে তা তাড়িয়ে দিতেন এবং স্থানটিতে পানি ছিটিয়ে দিতেন।
(هـ) اكتب نبذة من حياة ابى هريرة (رض) –
[(ঙ) হযরত আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহুর সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখুন।]
হযরত আবু হুরায়রা রা. ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবি। তাঁর আসল নাম আব্দুর রহমান ইবনে সাখর আদ-দাওসী। তিনি ৭ম হিজরীতে খায়বার বিজয়ের বছর ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসুলুল্লাহ সা. তাঁকে বিড়ালছানা ভালোবাসার কারণে আদর করে ‘আবু হুরায়রা’ (বিড়ালছানার পিতা) উপাধি দেন। তিনি সর্বদা আসহাবে সুফফায় অবস্থান করতেন এবং নবীজি সা.-এর সাথে সার্বক্ষণিক ছায়ার মতো লেগে থাকতেন। তিনি মোট ৫,৩৭৪টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। ৫৭ হিজরীতে তিনি মদিনা মুনাওয়ারায় ইন্তেকাল করেন।
٤- حدثنا زكريا بن يحيى قال ثنا عبد الله بن نمير قال ثنا هشام بن عروة عن أبيه عن عائشة انها استعارت من اسماء قلادة فهلكت فبعث رسول الله صلى الله عليه وسلم رجلا فوجدها فادركتهم الصلوة وليس معهم ماء فصلوا فشكوا ذلك الى رسول الله صلى الله عليه وسلم فانزل الله اية التيمم – فقال اسيد ابن حضير لعائشة (رض) جزاك الله خيرا فوالله ما نزل بك امر تكرهينه الا جعل الله ذلك لك وللمسلمين فيه خيرا –
[৪. হযরত আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি হযরত আসমা রা.-এর নিকট থেকে একটি হার ধার নিয়েছিলেন এবং তা হারিয়ে গেল। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক সাহাবিকে তা সন্ধানের জন্য পাঠালেন এবং তিনি তা খুঁজে পেলেন। ইতিমধ্যে নামাজের সময় উপস্থিত হলো অথচ তাঁদের সাথে কোনো পানি ছিল না। তাই তাঁরা বিনা ওযুতে নামাজ আদায় করলেন এবং রাসুলুল্লাহ সা.-এর নিকট এ বিষয়ে অভিযোগ জানালেন। তখন আল্লাহ তাআলা তায়াম্মুমের আয়াত নাযিল করলেন। এরপর উসাইদ ইবনে হুযাইর রা. হযরত আয়েশা রা.-কে বললেন: “আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন! আল্লাহর শপথ, আপনার ওপর এমন কোনো সংকট আসেনি যা আপনি অপছন্দ করেন, যাতে আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য প্রভূত কল্যাণ নিহিত রাখেননি।”]
হাদীসের নির্বাচিত শব্দের তাহকীক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ:
| শব্দ | অর্থ | মূল ধাতু (Root/Madda) | শব্দরূপ/ছীগাহ (Form/Sighah) | ব্যাকরণিক অবস্থান (Grammatical Role) |
|---|---|---|---|---|
| اسْتَعَارَتْ | সে ধার নিয়েছিল | ع – و – ر | মাযী মা’রূফ, ওয়াহেদ মুয়ান্নাস গায়েব | ফি’লে মাযী, বাবে ইসতিফ’আল |
| قِلَادَةً | কণ্ঠহার / গলার মালা | ق – ل – د | ইসম মুফরাদ, মুয়ান্নাস | ইসতা’আরাত ক্রিয়ার মাফ’উলে বিহী হিসেবে মানসূব |
| فَهَلَكَتْ | অতঃপর তা হারিয়ে গেল | ه – ل – ك | মাযী মা’রূফ, ওয়াহেদ মুয়ান্নাস | ফা আতফিয়াহ সহ ফি’লে মাযী |
| التَّيَمُّمِ | পবিত্র মাটির সংকল্প / তায়াম্মুম | ي – م – م | মাসদার, বাবে তাফা’উল | মুদাফ ইলাইহ হিসেবে মাজরূর বিল-কাসরাহ |
| تَكْرَهِيْنَ | তুমি অপছন্দ করো | ك – ر – ه | মুযারে মা’রূফ, ওয়াহেদ মুয়ান্নাস হাযির | ছিলাতুল মাউসূল, নূন এ’রাবী সহ মারফূ’ |
(أ) ما معنى التيمم لغة وشرعا وكم فرضا له؟ بين –
[(ক) তায়াম্মুমের শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ কী এবং এর ফরজ কয়টি? বর্ণনা করুন।]
১. শাব্দিক অর্থ: ‘তায়াম্মুম’ (التيمم) শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো القصد বা কোনো বিষয়ের দৃঢ় ইচ্ছা ও সংকল্প করা।
২. পারিভাষিক অর্থ: শরীয়তের পরিভাষায় পবিত্রতা অর্জনের নিয়তে পবিত্র মাটির ওপর উভয় হাত মেরে তা দ্বারা সম্পূর্ণ মুখমণ্ডল ও কনুইসহ উভয় হাত মাসেহ করাকে তায়াম্মুম বলা হয়।
৩. তায়াম্মুমের ফরজসমূহ: হানাফী মাযহাব মতে তায়াম্মুমের ফরজ ৩টি:
– অন্তরে পবিত্রতা অর্জনের দৃঢ় নিয়ত করা।
– পবিত্র মাটিতে হাত মেরে সম্পূর্ণ মুখমণ্ডল একবার মাসেহ করা।
– পুনরায় মাটিতে হাত মেরে উভয় হাত কনুইসহ একবার মাসেহ করা।
(ب) ما حكم فاقد الطهورين؟ بين مفصلا-
[(খ) ফাকিদুত তুহূরাইন (পানি ও মাটি ব্যবহারে অক্ষম ব্যক্তি)-এর বিধান কী? বিশদভাবে বর্ণনা করুন।]
যে ব্যক্তি এমন স্থানে বন্দি বা অসুস্থ অবস্থায় আছে যেখানে ওযুর জন্য পানি নেই এবং তায়াম্মুমের জন্য মাটি বা মাটিজাতীয় কোনো উপাদানও নেই, তাকে ‘ফাকিদুত তুহূরাইন’ বলা হয়। এ বিষয়ে ফুকাহাদের মতামত:
১. ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আবু ইউসুফ রহ.: তিনি নামাজের সময় সুরক্ষার খাতিরে ওজু-তায়াম্মুম ছাড়াই নামাজীদের সাদৃশ্য বজায় রেখে রুকু-সেজদা করবেন (তাশাব্বুহ বিল-মুসাল্লীন), তবে পরবর্তীতে পানি বা মাটি পাওয়ার পর উক্ত নামাজ পুনরায় কাজা করবেন।
২. ইমাম শাফিয়ী ও আহমাদ রহ.: তিনি উক্ত অবস্থায়ই ফরজ নামাজ আদায় করে নেবেন, তবে ইমাম শাফিয়ী রহ.-এর মতে পরে কাজা করতে হবে এবং ইমাম আহমাদ রহ.-এর মতে আর কাজা করতে হবে না।
৩. ইমাম মালেক রহ.: তাঁর ওপর সাময়িকভাবে নামাজের বাধ্যবাধকতা রহিত হয়ে যায়, পরবর্তীতে কাজা করতে হবে না।
(ج) ما حكم التيمم فى الحضر؟ بين –
[(গ) মুকিম অবস্থায় (বাসস্থানে থাকা অবস্থায়) তায়াম্মুমের বিধান কী? বর্ণনা করুন।]
সাধারণত তায়াম্মুম সফরের সাথে সম্পর্কিত হলেও মুকীম অবস্থায় যদি কেউ পানি থেকে এক শরয়ী মাইল দূরে অবস্থান করে, অথবা পানি ব্যবহারে প্রাণনাশক রোগ বৃদ্ধির নিশ্চিত আশঙ্কা থাকে, তবে মুকীম ব্যক্তির জন্যও তায়াম্মুম করা সর্বসম্মতভাবে জায়েজ। তবে হানাফী মাযহাব মতে কেবল জানাজার নামাজ বা ঈদের নামাজ ছুটে যাওয়ার আশঙ্কায় মুকীম ব্যক্তি তায়াম্মুম করতে পারে, কিন্তু জুমার নামাজের জন্য মুকীম ব্যক্তির তায়াম্মুম জায়েজ নয়।
(د) كم ضربة للتيمم؟ بين الاختلاف فيه؟
[(ঘ) তায়াম্মুমের জন্য মাটিতে হাত মারার সংখ্যা কয়টি? এ বিষয়ে মতভেদ তুলে ধরুন।]
১. হানাফী ও শাফিয়ী মাযহাব: তায়াম্মুমে মাটিতে দুটি আঘাত (জারবাতাইন) করা ওয়াজিব—একটি মুখমণ্ডলের জন্য এবং অপরটি উভয় হাতের কনুই পর্যন্ত মাসেহের জন্য। দলিল: হযরত ইবনে উমর রা.-এর হাদিস: “তায়াম্মুম হলো দুই আঘাত…”।
২. ইমাম আহমাদ ও জমহুর মুহাদ্দিসীন: তায়াম্মুমে কেবল একটি আঘাতই যথেষ্ট, যা দিয়ে মুখমণ্ডল ও কবজি পর্যন্ত হাত মাসেহ করা হয়। দলিল: আম্মার ইবনে ইয়াসির রা.-এর সহীহ বুখারীর হাদিস।
(هـ) ان التيمم طهارة مطلقة ام خلف للوضوء؟ بين مفصلا –
[(ঙ) তায়াম্মুম কি মূল পবিত্রতা নাকি ওযুর বিকল্প বা বদল? বিশদভাবে বর্ণনা করুন।]
১. ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর মতে: তায়াম্মুম হলো পানির অনুপস্থিতিতে একটি ‘মুতলাক’ বা পূর্ণাঙ্গ পবিত্রতা (طهور مطلق)। যতক্ষণ পর্যন্ত পানি পাওয়া না যাবে বা ওজু ভঙ্গের কারণ না ঘটবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তায়াম্মুম বহাল থাকবে এবং এক তায়াম্মুম দিয়ে একাধিক ফরজ ও নফল নামাজ আদায় করা যাবে।
২. ইমাম শাফিয়ী রহ.-এর মতে: তায়াম্মুম হলো কেবল একটি সাময়িক ছাড় বা জরুরি অবস্থার বিকল্প (طهور ضروري / بدل)। তাই প্রতি ওয়াক্ত ফরজ নামাজের জন্য নতুন করে তায়াম্মুম করা ওয়াজিব।
٥- عن ابى هريرة (رض) عن النبى صلى الله عليه وسلم انه قال اذا اشتد الحر فابردوا بالصلوة فان شدة الحر من فيح جهنم واشتكت النار الى ربها فقالت يا رب اكل بعضى بعضا فاذن لها بنفسين نفس فى الشتاء ونفس فى الصيف وهو اشد ما تجدون من الحر واشد ما تجدون من الزمهرير –
[৫. হযরত আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন: যখন গরম তীব্র আকার ধারণ করে, তখন তা ঠাণ্ডা করে নামাজ আদায় করো। কারণ গ্রীষ্মের প্রচণ্ড উত্তাপ জাহান্নামের নিঃশ্বাস থেকে সৃষ্টি হয়। জাহান্নাম তার রবের নিকট অভিযোগ করে বলেছিল: “হে আমার রব! আমার এক অংশ অন্য অংশকে গ্রাস করে ফেলছে।” তখন আল্লাহ তাআলা তাকে দুটি নিঃশ্বাস ফেলার অনুমতি দিলেন—একটি নিঃশ্বাস শীতকালে এবং আরেকটি নিঃশ্বাস গ্রীষ্মকালে। আর তোমরা যে তীব্র গরম অনুভব করো তা এই নিঃশ্বাসের কারণে এবং তোমরা যে তীব্র হাড়কাঁপানো শীত অনুভব করো তাও এর কারণে।]
হাদীসের নির্বাচিত শব্দের তাহকীক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ:
| শব্দ | অর্থ | মূল ধাতু (Root/Madda) | শব্দরূপ/ছীগাহ (Form/Sighah) | ব্যাকরণিক অবস্থান (Grammatical Role) |
|---|---|---|---|---|
| أَبْرِدُوْا | তোমরা ঠাণ্ডা করো | ب – ر – د | আমরে হাযির মা’রূফ, জমা মুযাক্কার | ফি’লে আমর, বাবে ইফ’আল, ওয়াও ফায়েল |
| فَيْحِ | উত্তাপের স্ফুরণ / বিস্তার | ف – ي – ح | ইসম মুফরাদ, মাসদার | হরফে জার ‘মিন’-এর মাজরূর |
| اشْتَكَتْ | সে অভিযোগ করল | ش – ك – و | মাযী মা’রূফ, ওয়াহেদ মুয়ান্নাস | ফি’লে মাযী, বাবে ইফতি’আল, ফায়েল ‘আন-নার’ |
| نَفَسَيْنِ | দুটি নিশ্বাস | ن – ف – س | ইসমুত তাছনিয়াহ (দ্বিবচন), মাজরূর | হরফে জার বা-এর মাজরূর বিল-ইয়া |
| الزَّمْهَرِيْرِ | তীব্র হাড়কাঁপানো শৈত্য | ز – م – ه – ر | ইসম মুফরাদ, রূবাঈ মুজাররাদ | মুদাফ ইলাইহ হিসেবে মাজরূর বিল-কাসরাহ |
(أ) اثبت اوقات الصلوة بالادلة –
[(ক) নামাজের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা দলিলের আলোকে প্রমাণ করুন।]
মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে নামাজের সময় নির্ধারণ করে ইরশাদ করেছেন: “নিশ্চয়ই নামাজ মুমিনদের ওপর নির্ধারিত সময়ে ফরজ করা হয়েছে” (সুরা নিসা: ১০৩)। এছাড়া সুরা বনী ইসরাঈলে বলা হয়েছে: “সূর্য হেলে পড়ার সময় থেকে রাতের অন্ধকার পর্যন্ত নামাজ কায়েম করুন এবং ফজরের কুরআন তিলাওয়াত করুন।” হাদীসে জিবরীল আ. দুই দিন এসে নবীজি সা.-কে ইমামতি করিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের শুরু ও শেষ সময় নির্ধারণ করে দেন এবং বলেন: “এই দুই সময়ের মধ্যবর্তী সময়ই হলো নামাজের প্রকৃত ওয়াক্ত।”
(ب) ما معنى الصلوة لغة وشرعا؟ وكم ركنا لها؟ بين مفصلا-
[(খ) সালাতের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ কী? এবং এর রুকন কয়টি? বিশদভাবে বর্ণনা করুন।]
১. শাব্দিক অর্থ: ‘সালাত’ (الصلاة) শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো الدعاء বা কল্যাণ ও বরকতের দোয়া করা এবং আনুগত্য প্রদর্শন করা।
২. পারিভাষিক অর্থ: তাকবীরে তাহরীমা দিয়ে শুরু হয়ে নির্দিষ্ট আরকান ও শর্তাবলি পালনের মাধ্যমে তাসলীম (সালাম)-এর মাধ্যমে সমাপ্ত হওয়া বিশেষ ইবাদতকে সালাত বলা হয়।
৩. সালাতের রুকনসমূহ: ফুকাহাদের মতে নামাজের ভেতরে ৬টি ফরজ বা রুকন রয়েছে: তাকবীরে তাহরীমা বলা, কিয়াম করা (দাঁড়ানো), কিরাত পড়া, রুকু করা, দুই সেজদা করা এবং শেষ বৈঠকে তাশাহহুদ পরিমাণ বসা।
(ج) ما هو الفيئ الاصلى؟ بين مقداره –
[(গ) ‘ফাইয়ে আসলী’ (মূল ছায়া) কী? এর পরিমাণ নির্ধারণ করুন।]
ঠিক দ্বিপ্রহরের সময় যখন সূর্য আকাশের ঠিক মধ্যভাগে (দাওলুত তাবাক বা ইস্তিবাহ) অবস্থান করে, তখন খাড়া কোনো বস্তুর পশ্চিমমুখী যে ক্ষুদ্রতম ছায়া অবশিষ্ট থাকে, তাকে ‘ফায়ইয়ে আসলী’ বা আসল ছায়া বলা হয়। সূর্য যখন পশ্চিমাকাশে ঢলতে শুরু করে তখন এই ছায়া বৃদ্ধি পেতে থাকে, যার মাধ্যমেই জোহরের ওয়াক্তের সূচনা ঘটে। জোহরের শেষ ওয়াক্ত নির্ধারণের ক্ষেত্রে হানাফী মাযহাবে ফায়ইয়ে আসলী বাদ দিয়ে বস্তুর ছায়া দ্বিগুণ হওয়া এবং অন্যান্য মাযহাবে একগুণ হওয়া মানদণ্ড ধরা হয়।
(د) اشرح قوله “فان شدة الحر من فيح جهنم” –
[(ঘ) রাসুল সা.-এর বাণী: “গ্রীষ্মের প্রচণ্ড উত্তাপ জাহান্নামের নিঃশ্বাস থেকে”-এর ব্যাখ্যা করুন।]
মুহাদ্দিসীনদের মতে এই হাদিসের দুটি ব্যাখ্যা রয়েছে:
১. হাকীকী বা বাস্তব অর্থ: এটি কোনো রূপক বক্তব্য নয়, বরং আল্লাহ তাআলা জাহান্নামের আগুনকে এমন শক্তি দিয়েছেন যার বাস্তব তেজ ও উষ্ণতা গ্রীষ্মকালে পৃথিবীতে প্রতিফলিত হয়। বিজ্ঞানের তাপমাত্রার নিয়মের বাইরেও এটি মহান আল্লাহর একটি নিদর্শন।
২. মাজাযী বা রূপক অর্থ: তীব্র গরম মানুষকে জাহান্নামের আগুনের ভয়াবহ শাস্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যাতে বান্দা দুনিয়ার সামান্য উত্তাপ সহ্য করতে না পেরে জাহান্নামের চিরস্থায়ী আগুন থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর অনুগত হতে সচেষ্ট হয়।
(هـ) ما هو الوقت المستحب للظهر؟ بين –
[(ঙ) যোহরের নামাজের মুস্তাহাব সময় কোনটি? বর্ণনা করুন।]
গ্রীষ্মকালে যখন প্রচণ্ড রোদ ও তাপদাহ থাকে, তখন জোহরের নামাজ কিছুটা দেরিতে রোদ স্তিমিত হলে ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় (ইবরাদ বিল সালাত) আদায় করা মুস্তাহাব, যাতে মুসল্লিদের মসজিদে উপস্থিত হতে কষ্ট না হয় এবং নামাজে একাগ্রতা বজায় থাকে। তবে শীতকালে কোনো গরম থাকে না বিধায় ওয়াক্তের শুরুতে প্রথমভাগে দ্রুত জোহর আদায় করা মুস্তাহাব।
٦- عن سهل رضى الله عنه عن النبى صلى الله عليه وسلم قال ان فى الجنة بابا يقال له الريان يدخل منه الصائمون يوم القيامة – لا يدخل منه احد غيرهم – يقال اين الصائمون؟ فيقومون – لا يدخل منه احد غيرهم – فاذا دخلوا اغلق فلن يدخل منه احد –
[৬. হযরত সাহল রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন: নিশ্চয়ই জান্নাতে একটি বিশেষ তোরণ রয়েছে যাকে ‘আর-রাইয়ান’ বলা হয়। কিয়ামতের দিন কেবল রোযাদারগণই এই দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে, তাদের ছাড়া অন্য কেউ এ পথে প্রবেশ করতে পারবে না। ঘোষণা দেওয়া হবে: “রোযাদারগণ কোথায়?” তখন তারা উঠে দাঁড়াবে। তারা ছাড়া অন্য কেউ প্রবেশ করবে না। যখন তাদের শেষ ব্যক্তি প্রবেশ করবে, তখন তোরণটি চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হবে; ফলে অন্য কেউ আর এতে প্রবেশ করতে পারবে না।]
হাদীসের নির্বাচিত শব্দের তাহকীক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ:
| শব্দ | অর্থ | মূল ধাতু (Root/Madda) | শব্দরূপ/ছীগাহ (Form/Sighah) | ব্যাকরণিক অবস্থান (Grammatical Role) |
|---|---|---|---|---|
| الرَّيَّانُ | পরিতৃপ্ত / সুপেয় | ر – و – ي | সিফাত মুশাহহাবা, ওজনে ফা’লান | খবরে মুবতাদা বা ইউকালু ক্রিয়ার নায়েবে ফায়েল |
| الصَّائِمُونَ | রোযাদারগণ | ص – و – م | ইসমে ফায়িল, জমা মুযাক্কার সালেম | ইয়াদখুলু ক্রিয়ার ফা’য়িল হিসেবে মারফূ’ বিল-ওয়াও |
| فَيَقُوْمُونَ | অতঃপর তারা দাঁড়াবে | ق – و – م | মুযারে মা’রূফ, জমা মুযাক্কার গায়েব | ফা আতফিয়াহ সহ ফি’লে মুযারে, মারফূ’ বি-সুবূতিন্নূন |
| أُغْلِقَ | তা বন্ধ করে দেওয়া হলো | غ – ل – ق | মাযী মাজহূল, ওয়াহেদ মুযাক্কার | ফি’লে মাযী মাজহূল, বাবে ইফ’আল, নায়েবে ফায়েল মুস্তার |
| بَابًا | একটি দরজা / তোরণ | ب – و – ب | ইসম মুফরাদ, মুযাক্কার | ইন্না-এর ইসম মুয়াখখার হিসেবে মানসূব |
(أ) ما معنى الصوم لغة وشرعا ومتى فرض الصيام؟ بين –
[(ক) রোযার শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ কী এবং রোযা কখন ফরজ হয়? বর্ণনা করুন।]
১. শাব্দিক অর্থ: ‘সাওম’ (الصوم) শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো الإمساك বা কোনো কাজ থেকে বিরত থাকা ও নিবৃত হওয়া।
২. পারিভাষিক অর্থ: সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিয়তসহকারে পানাহার ও যৌনসম্ভোগ থেকে বিরত থাকাকে শরীয়তের পরিভাষায় সাওম বা রোজা বলা হয়।
৩. সিয়াম ফরজের সন: হিজরতের দ্বিতীয় বর্ষের শাবান মাসে পবিত্র কুরআনের সুরা বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াত “ইয়া আইয়্যুহাল্লাযীনা আমানূ কুতিবা আলাইকুমুস সিয়াম” নাযিলের মাধ্যমে মাহে রমজানের রোজা ফরজ করা হয়।
(ب) اكتب فوائد الصوم مفصلا-
[(খ) সিয়ামের আত্মিক, শারীরিক ও সামাজিক ফায়দাসমূহ বিশদভাবে লিখুন।]
সিয়াম সাধনার উপকারিতা অপরিসীম:
১. আত্মিক ফায়দা: রোজা বান্দার অন্তরে তাকওয়া, এখলাস ও আল্লাহর ভয় সৃষ্টি করে। এটি এমন এক গুপ্ত ইবাদত যাতে লোকদেখানো ভাব (রিয়া) থাকে না বিধায় হাদিসে কুদসীতে আল্লাহ বলেন: “রোজা আমারই জন্য এবং আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব।”
২. নৈতিক ও সামাজিক ফায়দা: রোজা মানুষের পাশবিক কামনা দমন করে, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করে এবং অনাহারী দরিদ্র মানুষের দুঃখ-কষ্ট প্রত্যক্ষ উপলব্ধি করায়।
৩. শারীরিক ও বৈজ্ঞানিক ফায়দা: আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, টানা এক মাস সিয়াম পালনের ফলে শরীরের কোষগুলো অটোফেজি (Autophagy) প্রক্রিয়ায় ক্ষতিকর উপাদান ধ্বংস করে এবং পরিপাকতন্ত্র পুনরুজ্জীবিত হয়।
(ج) اكتب اداب الصوم ونواقضه مفصلا-
[(গ) রোযার শিষ্টাচার ও রোযা ভঙ্গকারী কারণসমূহ বিস্তারিতভাবে লিখুন।]
১. আদবসমূহ: শেষ রাতে সেহরি খাওয়া, সূর্যাস্তের সাথে সাথে কালবিলম্ব না করে ইফতার করা, মিথ্যা, গিবত, পরনিন্দা ও অনর্থক বাক্যালাপ বর্জন করা, বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত ও দান-সদকা করা।
২. নওয়াকিদুস সাওম (রোজা ভঙ্গের কারণ): রোজা স্মরণ থাকা অবস্থায় ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো খাদ্য বা পানীয় গ্রহণ করা, সহবাসে লিপ্ত হওয়া, ইচ্ছাকৃতভাবে মুখভরে বমি করা, নারীদের ঋতুস্রাব বা নিফাস শুরু হওয়া এবং স্যালাইন বা ইনজেকশনের মাধ্যমে খাদ্য উপাদান শরীরে প্রবেশ করানো।
(د) ما الحكمة فى فرضية الصوم؟ بين موضحا –
[(ঘ) সিয়াম ফরজ হওয়ার মূল হিকমত ও দর্শন কী? স্পষ্টভাবে বর্ণনা করুন।]
রোজা ফরজ করার মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের পশুপ্রবৃত্তিকে পরাভূত করে তার রূহানী শক্তিকে জাগ্রত করা। মানুষ যাতে পার্থিব মোহের ঊর্ধ্বে উঠে ফেরেশতাসুলভ পবিত্রতা অর্জন করতে পারে এবং আল্লাহর বিধানের সামনে নিজের বৈধ খাবার ও আনন্দকে হাসিমুখে বিসর্জন দেওয়ার মাধ্যমে পূর্ণ আনুগত্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে, সেটাই সিয়ামের মৌলিক হিকমত।
(هـ) حقق الفاظ الآتية : اغلق – باب – فيقومون – الريان –
[(ঙ) নিচের শব্দাবলির তাহকীক করুন: اغلق – باب – فيقومون – الريان।]
– اُغْلِقَ (উগলিকা): বাবে ইফ’আল থেকে মাযী মাজহূল। মূলধাতু غ-ل-ق। অর্থ: বন্ধ করা হলো।
– بَابٌ (বাবুন): ইসমু জামিদ মুফরাদ। মূলধাতু ب-و-ب। জমা আবওয়াব (أبواب)। অর্থ: দরজা বা তোরণ।
– فَيَقُوْمُوْنَ (ফাইয়াকূমূনা): ফি’লে মুযারে মা’রূফ, জমা মুযাক্কার গায়েব, বাবে নাসারা ইয়ানসুরু। মূলধাতু ق-و-م (আজওয়াফে ওয়াবী)। অর্থ: অতঃপর তারা দাঁড়াবে।
– الرَّيَّانُ (আর-রাইয়ান): সিফাত মুশাহহাবা, ওজনে ফা’লান। মূলধাতু ر-و-ي। অর্থ: পানি দ্বারা এমনভাবে পরিতৃপ্ত হওয়া যার পর আর কখনো তৃষ্ণা পায় না।
٧- حدثنا اسحق انا عفان ثنا همام ثنا محمد بن جحادة قال اخبرنى ابو حصين ان ذكوان حدثه ان ابا هريرة حدثه قال جاء رجل الى رسول الله صلى الله عليه وسلم : فقال دلنى على عمل يعدل الجهاد قال لا اجده قال هل تستطيع اذا خرج المجاهد ان تدخل مسجدك فتقوم ولا تفتر وتصوم ولا تفطر قال ومن يستطيع ذلك – قال ابو هريرة (رض) ان فرس المجاهد ليستن فى طوله فيكتب له حسنات –
[৭. হযরত আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হয়ে নিবেদন করল: “আমাকে এমন একটি আমলের কথা নির্দেশ করুন, যা সওয়াবের দিক থেকে জিহাদের সমকক্ষ হতে পারে?” নবীজি সা. বললেন: “আমি এমন কোনো আমল খুঁজে পাচ্ছি না।” অতঃপর তিনি বললেন: “তুমি কি এমন করতে পারো যে, মুজাহিদ যখন জিহাদের উদ্দেশ্যে বের হবে, তখন তুমি তোমার মসজিদে প্রবেশ করে অবিরাম নামাজে দাঁড়িয়ে থাকবে একটুও ক্লান্ত না হয়ে এবং অবিরাম রোযা রাখতে থাকবে একটুও ইফতার না করে?” লোকটি বলল: “এমনটি কার পক্ষে করা সম্ভব?” আবু হুরায়রা রা. বলেন: মুজাহিদের ঘোড়া যখন তার রশির মধ্যে লাফঝাঁপ করে ঘাস খায়, তাতেও মুজাহিদের আমলনামায় নিরবচ্ছিন্নভাবে নেকি লিপিবদ্ধ হতে থাকে।]
হাদীসের নির্বাচিত শব্দের তাহকীক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ:
| শব্দ | অর্থ | মূল ধাতু (Root/Madda) | শব্দরূপ/ছীগাহ (Form/Sighah) | ব্যাকরণিক অবস্থান (Grammatical Role) |
|---|---|---|---|---|
| يَعْدِلُ | সমকক্ষ হয় / সমান হয় | ع – د – ل | মুযারে মা’রূফ, ওয়াহেদ মুযাক্কার | আমালুন শব্দের সিফাত হিসেবে মারফূ’ মাহাল্লান |
| تَفْتُرَ | তুমি ক্লান্ত হবে / ক্ষান্ত হবে | ف – ت – ر | মুযারে মা’রূফ, ওয়াহেদ মুযাক্কার হাযির | মা’তূফ আলা তাকূমু, নাফী লা-এর মাদখূল |
| فَرَسَ | ঘোড়া | ف – ر – س | ইসম মুফরাদ, মুযাক্কার | ইন্না-এর ইসম হিসেবে মানসূব বিল-ফাতহাহ |
| حَسَنَاتٍ | পুণ্যসমূহ / নেকিসমূহ | ح – س – ن | জমা মুয়ান্নাস সালেম | ইউকতাবু ক্রিয়ার নায়েবে ফায়েল হিসেবে মারফূ’ বিল-কাসরাহ |
| طِوَلِهِ | তার রশি / বাধার দড়ি | ط – و – ل | ইসম মুফরাদ, মুদাফ ইলা যমীর | হরফে জার ‘ফী’-এর কারণে মাজরূর বিল-কাসরাহ |
(أ) ما معنى الجهاد لغة وشرعا؟ بين –
[(ক) জিহাদের শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ কী? বর্ণনা করুন।]
১. শাব্দিক অর্থ: ‘জিহাদ’ (الجهاد) শব্দটি বাবে মুফা’আলাহ-এর মাসদার। এর মূলধাতু ج – ه – د (জুহদ বা জাহদ)। এর আভিধানিক অর্থ হলো চরম প্রচেষ্টা চালানো, পূর্ণ শক্তি নিয়োগ করা এবং কষ্ট সহ্য করে লক্ষ্য অর্জনে সচেষ্ট হওয়া।
২. পারিভাষিক অর্থ: শরীয়তের পরিভাষায় মহান আল্লাহর দ্বীনকে সমুন্নত করার উদ্দেশ্যে, সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় এবং জালিমের জুলুম প্রতিহত করতে জান, মাল, ইলম ও মেধা দিয়ে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার ও সংগ্রাম করাকে জিহাদ বলা হয়।
(ب) ما الفرق بين الجهاد والارهاب؟ بين موضحا –
[(খ) জিহাদ ও সন্ত্রাসের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরুন।]
জিহাদ এবং সন্ত্রাসবাদের মধ্যে আসমান-জমিন পার্থক্য বিদ্যমান:
১. লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য: জিহাদের উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর জমিনে শান্তি, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং ফিতনা ও অবিচার নির্মূল করা। পক্ষান্তরে সন্ত্রাসের উদ্দেশ্য হলো আতঙ্ক সৃষ্টি করা, বিশৃঙ্খলা ছড়ানো এবং নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধার করা।
২. কর্তৃত্ব: জিহাদ কোনো বিচ্ছিন্ন উগ্রবাদী গোষ্ঠীর খেয়ালখুশি নয়, বরং তা বৈধ ইসলামী রাষ্ট্রপ্রধানের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। সন্ত্রাসবাদ আইন ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।
৩. যুদ্ধনীতি: জিহাদে নারী, শিশু, বৃদ্ধ, পুরোহিত এবং অমুসলিম নাগরিকদের ওপর আক্রমণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। গাছে আগুন দেওয়া বা পরিবেশ ধ্বংস করাও অপরাধ। সন্ত্রাসবাদে বাছবিচারহীন হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়।
(ج) عرف الجهاد والارهاب وبين حكمهما –
[(গ) শরীয়তের দৃষ্টিতে জিহাদ ও সন্ত্রাসের সংজ্ঞা ও বিধান বর্ণনা করুন।]
– জিহাদের বিধান: দ্বীনের প্রতিরক্ষা ও দাওয়াতের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য জিহাদ একটি পবিত্র ফরজ বিধান (ফরজে কিফায়া, তবে আক্রান্ত হলে ফরজে আইন)।
– সন্ত্রাসবাদের বিধান: ইসলামে সন্ত্রাস, নৈরাজ্য ও নিরপরাধ হত্যা সম্পূর্ণ হারাম এবং কবিরা গুনাহ। পবিত্র কুরআনে একে ‘মুহারাবা’ বা আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা সমতুল্য জঘন্য অপরাধ বলা হয়েছে (সুরা মায়িদা: ৩৩)।
(د) ما معنى الغزوة والسرية لغة واصطلاحا؟ بين –
[(ঘ) ‘গাযওয়া’ ও ‘সারিয়া’-এর শাব্দিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা বর্ণনা করুন।]
১. গাযওয়া (الغزوة): যে সকল সামরিক অভিযানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং সশরীরে সেনাপতি হিসেবে অংশগ্রহণ করেছিলেন, সেগুলোকে ‘গাযওয়া’ বলা হয়। ঐতিহাসিকদের মতে গাযওয়ার সংখ্যা ২৭টি (কারো মতে ১৯টি)।
২. সারিয়্যা (السرية): যে সকল অভিযানে রাসুলুল্লাহ সা. কোনো সাহাবিকে সেনাপতি নিযুক্ত করে প্রেরণ করেছিলেন কিন্তু স্বয়ং অংশগ্রহণ করেননি, সেগুলোকে ‘সারিয়্যা’ বলা হয়। ঐতিহাসিকদের মতে সারিয়ার সংখ্যা প্রায় ৪৭ থেকে ৬০টি।
(هـ) بين فضائل الجهاد مفصلا –
[(ঙ) কুরআন ও হাদিসের আলোকে জিহাদের অনন্য ফজিলতসমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করুন।]
জিহাদ ইসলামের চূড়াসদৃশ এক মহিমান্বিত ইবাদত। রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন: “ইসলামের মূল হলো আনুগত্য, তার স্তম্ভ হলো নামাজ এবং তার সর্বোচ্চ চূড়া হলো জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ।” মুজাহিদের শাহাদাতবরণের সাথে সাথে তার অতীতের সমস্ত গুনাহ মাফ হয়ে যায়, কবরের আজাব মাফ হয় এবং সে বিনা হিসেবে জান্নাতুল ফিরদাউস লাভ করে। আলোচ্য হাদিসে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, একাধারে আজীবন রোজা রাখা ও সারারাত নামাজে দাঁড়িয়ে থাকার সাওয়াবও একজন মুজাহিদের জিহাদের ময়দানের সমকক্ষ হতে পারে না।
مجموعة (ب) : المقالات التاريخية والمناهج العلمية (الدرجة – ২০ x ১ = ২০)
(أجب عن سؤال واحد مما يلى)
٨- اذكر قصة بدء الوحى الى رسول الله صلى الله عليه وسلم مع بيان كيفيات نزول الوحى –
[৮. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর ওহী সূচনার ঐতিহাসিক ঘটনা ও ওহী নাযিলের বিভিন্ন কাইফিয়াত/পদ্ধতি বিশদভাবে উল্লেখ করুন।]
ভূমিকা ও প্রেক্ষাপট:
মানবজাতির হিদায়েতের ইতিহাসে ওহীর সূচনা এক যুগান্তকারী ও অনন্য সাধারণ অধ্যায়। জাহেলিয়াতের ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত মানবজাতিকে মুক্তির আলোর দিশা দিতে মহান আল্লাহ নবুওয়তের মাধ্যমে ওহীর সূচনা করেছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বয়স যখন চল্লিশের কাছাকাছি পৌঁছায়, তখন তাঁর অন্তরে নির্জনতা ও আল্লাহর ইবাদতের প্রতি প্রবল অনুরাগ সৃষ্টি হয়। তিনি মক্কার অদূরে অবস্থিত ঐতিহাসিক হেরা গুহায় খাদ্যসামগ্রী নিয়ে নির্জনে আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকতেন।
ওহী সূচনার ঐতিহাসিক বিবরণ:
সহীহুল বুখারীর কিতাবু বাদইল ওহীতে উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, ওহীর সূচনা হয়েছিল সত্য স্বপ্নের (আর-রুইয়া আস-সালিহা) মাধ্যমে। তিনি স্বপ্নে যা দেখতেন তা ভোরের আলোর মতো সুস্পষ্টভাবে বাস্তবায়িত হতো। অতঃপর রমজান মাসের এক বরকতময় রজনীতে হেরা গুহায় জিবরীল আমীন আ. আগমন করেন এবং বলেন: ‘ইকরা’ (পড়ুন)। রাসুলুল্লাহ সা. উত্তর দিলেন: ‘মা আনা বি-কারি’ (আমি তো পড়া জানি না)। জিবরীল আ. তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে অত্যন্ত শক্তভাবে এমন আলিঙ্গন করলেন যে নবীজির কষ্ট হলো। এভাবে তিনবার আলিঙ্গনের পর জিবরীল আ. সুরা আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত তিলাওয়াত করলেন: “পড়ুন আপনার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন…”। রাসুলুল্লাহ সা. কম্পিত হৃদয়ে ঘরে ফিরে এসে উম্মুল মুমিনীন খাদিজা রা.-কে বললেন: ‘যাম্মিলূনী, যাম্মিলূনী’ (আমাকে চাদর দিয়ে আবৃত করো)। খাদিজা রা. তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন: “কখনোই নয়, আল্লাহর শপথ! আল্লাহ আপনাকে কখনো অপদস্থ করবেন না। কারণ আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন, অভাবীদের বোঝা বহন করেন এবং মেহমানদারি করেন।” পরবর্তীতে খাদিজা রা. তাঁকে নিয়ে ইঞ্জিলের পণ্ডিত ওরাকা ইবনে নওফেলের নিকট যান এবং ওরাকা নবীজির সত্যতার সাক্ষ্য দেন।
ওহী নাযিলের বিভিন্ন কাইফিয়াত বা প্রকারভেদ:
আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম রহ. ও ইমাম বদরুদ্দীন আইনী রহ. ওহী নাযিলের প্রধান পদ্ধতিসমূহ উল্লেখ করেছেন:
১. ঘণ্টাধ্বনির ন্যায় ওহী (মিছলা সালসালাতির জারাস): এটি ছিল ওহীর সবচেয়ে কঠিন ও কষ্টদায়ক রূপ। তীব্র শীতের দিনেও নবীজি সা.-এর ললাট থেকে ঘাম ঝরে পড়ত এবং উটের ওপর থাকা অবস্থায় ওহী আসলে উটটি ভারে মাটিতে বসে পড়ত।
২. জিবরীল আ.-এর মানবাকৃতিতে আগমন: জিবরীল আ. কোনো সুদর্শন মানুষের (যেমন সাহাবি হযরত দিহইয়া কালবী রা.-এর) আকৃতি ধারণ করে নবীজির সামনে এসে আল্লাহর বাণী শুনিয়ে যেতেন।
৩. সত্য স্বপ্নযোগে ওহী: ঘুমের মধ্যে নবীদের স্বপ্ন আল্লাহর অকাট্য ওহী হিসেবে সাব্যস্ত হতো, যেমন হযরত ইব্রাহিম আ.-এর কুরবানির স্বপ্ন।
৪. ফেরেশতার আসল আকৃতিতে দর্শন: জিবরীল আ. তাঁর স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করে ওহী প্রদান করতেন। নবীজি সা. জীবনে দুবার জিবরীল আ.-কে তাঁর মূল আকৃতিতে ছয়শত পাখা বিশিষ্ট অবস্থায় আসমান-জমিন জুড়ে বিস্তৃত দেখেছেন।
৫. অন্তরে সরাসরি সঞ্চালন (ইলকা ফীর রুহ): কোনো দৃশ্যমান মাধ্যম ছাড়া সরাসরি রাসুলুল্লাহ সা.-এর অন্তরে ওহীর জ্ঞান ঢেলে দেওয়া হতো।
৬. পর্দার অন্তরাল থেকে প্রত্যক্ষ বাক্যালাপ: যেমন মিরাজের রজনীতে মহান আল্লাহ রাসুলুল্লাহ সা.-এর সাথে সরাসরি কথা বলে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ উপহার দিয়েছিলেন।
٩- اكتب مكانة الجامع الصحيح للامام البخارى بين كتب الصحاح الستة مع بيان خصائص تراجم ابوابه موضحا –
[৯. সিহাহ সিত্তার কিতাবসমূহের মধ্যে ইমাম বুখারী রহ.-এর জামে আস-সহীহ-এর মর্যাদা এবং তাঁর অধ্যায় শিরোনামের (তারাজিমুল আবওয়াব) অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ বিশদভাবে বিশ্লেষণ করুন।]
সিহাহ সিত্তার মধ্যে সহীহুল বুখারীর অনন্য মর্যাদা:
মুসলিম উম্মাহর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পবিত্র কুরআনুল কারীমের পর আসমানের নিচে জমিনের ওপর সর্বাধিক বিশুদ্ধ কিতাব হলো ‘আল-জামি’উস সহীহ লিল ইমামিল বুখারী’। সিহাহ সিত্তার (বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, আবু দাউদ, নাসাঈ ও ইবনে মাজাহ) মধ্যে সহীহ বুখারী শীর্ষস্থানে অবস্থিত। এর কারণসমূহ হলো:
১. সনদের বিশুদ্ধতার সর্বোচ্চ মানদণ্ড: ইমাম বুখারী রহ. হাদিস সহীহ হওয়ার জন্য রাবীদের সমসাময়িক হওয়া এবং পরস্পরের সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ প্রমাণিত হওয়াকে (সুবূতুল লিক্বা) শর্ত করেছেন।
২. উচ্চতম স্মৃতিশক্তি ও বিশ্বস্ততা: বুখারী শরীফের রাবীগণ তাকওয়া, ন্যায়পরায়ণতা ও স্মৃতিশক্তির দিক থেকে প্রথম স্তরের (মারতাবায়ে উলা)।
৩. উম্মতের ইজমা: ইমাম নববী রহ. উল্লেখ করেছেন, উম্মাহর সর্বস্তরের উলামায়ে কিরাম ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন যে বুখারী ও মুসলিমের সমস্ত হাদীস অকাট্য প্রামাণ্য দলিল।
ইমাম বুখারীর তারাজিমুল আবওয়াবের (অধ্যায় শিরোনামের) বৈশিষ্ট্য:
মুহাদ্দিসদের একটি প্রবাদ রয়েছে: “ফিকহুল বুখারী ফী তারাজিমিহী” (ইমাম বুখারীর ফিকাহ ও গভীর জ্ঞান তাঁর অধ্যায় শিরোনামের মধ্যে নিহিত)। ইমাম বুখারী প্রতিটি অধ্যায়ের নামকরণ করতে গিয়ে যে অনন্য গবেষণামূলক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন, তার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো নিম্নরূপ:
১. ইস্তিম্বাতী ও ফিকহী দৃষ্টিভঙ্গি: ইমাম বুখারী কেবল হাদীস সংকলন করেননি, বরং প্রতিটি শিরোনামে সেই হাদীস থেকে কী কী সূক্ষ্ম শরয়ী হুকুম ও মাসআলা বের হয় তা সন্নিবেশিত করেছেন।
২. কুরআনের আয়াতের সাথে সামঞ্জস্য: অনেক সময় তিনি শিরোনামে কুরআনের আয়াত উল্লেখ করে হাদীস দ্বারা তার তাফসীর ফুটিয়ে তুলেছেন।
৩. ইখতিলাফী বিষয়ের সমাধান: যে সকল মাসআলায় ফুকাহাদের মতভেদ রয়েছে, সেখানে তিনি এমন সূক্ষ্ম শিরোনাম তৈরি করেছেন যা হানাফী বা শাফিয়ী মতের সমর্থনে বা খণ্ডনে শক্তিশালী যুক্তি পেশ করে।
৪. রহস্যময় ও চিন্তাশীল শিরোনাম (তারাজিমে মুগলাকা): কখনো কখনো তিনি শিরোনামে এমন প্রশ্ন রেখে দেন যার উত্তর হাদিসের মর্ম গভীরভাবে অনুধাবন না করলে বোঝা যায় না।
৫. সহীহ সনদের বাইরে আসার বা মুআল্লাক রেওয়ায়েত উপস্থাপন: অধ্যায়ের শিরোনামের অধীনে তিনি তাবেঈ ও মুজতাহিদ ইমামদের ফতোয়া ও আসার উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ফিকহী আবহকে সমৃদ্ধ করেছেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: কামিল ২য় পর্বের হাদীস প্রথম পত্রের বিষয় কোড ও পূর্ণমান কত?
উত্তর: কামিল (স্নাতকোত্তর) হাদীস দ্বিতীয় পর্বের প্রথম পত্র ‘সহীহুল বুখারী (প্রথম খণ্ড)’-এর বিষয় কোড হলো 611201 এবং এর পূর্ণমান ১০০ নম্বর। সময় বরাদ্দ থাকে ৪ ঘণ্টা।
প্রশ্ন ২: হাদীসুল কিরতাস ইসলামের ইতিহাসে কেন গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: এটি রাসুলুল্লাহ সা.-এর ওফাতের চার দিন আগের এক ঐতিহাসিক ঘটনা, যা উম্মতের ঐক্য, সাহাবায়ে কিরামের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং কুরআন-সুন্নাহর পূর্ণাঙ্গতার ক্ষেত্রে একটি পরম শিক্ষণীয় ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
প্রশ্ন ৩: কুকুরের পাত্র পবিত্রকরণে মাটি ব্যবহারের বৈজ্ঞানিক যুক্তি কী?
উত্তর: চিকিৎসাবিজ্ঞান নিশ্চিত করেছে যে, কুকুরের লালায় থাকা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও রেবিস ভাইরাস সাধারণ পানি দিয়ে সম্পূর্ণ দূর হয় না; মাটির প্রাকৃতিক রাসায়নিক উপাদান এই জীবাণুকে পুরোপুরি ধ্বংস করতে সক্ষম।
প্রশ্ন ৪: ফাকিদুত তুহূরাইন বলতে কাদের বোঝানো হয়?
উত্তর: যে ব্যক্তি পানি এবং পবিত্র মাটি উভয়টির ব্যবহার থেকেই সম্পূর্ণ বঞ্চিত (যেমন বন্দি বা অপারগ রোগী), ইসলামী পরিভাষায় তাকে ফাকিদুত তুহূরাইন বলা হয়।
প্রশ্ন ৫: জান্নাতের ‘আর-রাইয়ান’ দরজার বৈশিষ্ট্য কী?
উত্তর: এটি জান্নাতের আটটি দরজার একটি বিশেষ তোরণ, যা দিয়ে কিয়ামতের দিন কেবল একনিষ্ঠ রোযাদারগণই প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রবেশের পর দরজাটি চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হবে।
প্রশ্ন ৬: “ফিকহুল বুখারী ফী তারাজিমিহী” কথাটির তাৎপর্য কী?
উত্তর: এর অর্থ হলো ইমাম বুখারী রহ.-এর গভীর ফিকহী প্রজ্ঞা ও উদ্ভাবনী ইজতিহাদ মূলত তাঁর কিতাবের বিভিন্ন অধ্যায় শিরোনামের (তারাজিমুল আবওয়াব) বিন্যাসে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

