বাংলা আবশ্যিক (Bengali Compulsory) – 111004, বাংলা – ফাযিল পাস ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪

StudyBoi StudyBoi
September 27, 2026
৮৩ মিনিট পড়ার সময়
৫ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত পরীক্ষা
ফাযিল (স্নাতক) পাস প্রথম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪
বিষয়: বাংলা (আবশ্যিক) [বিষয় কোড: ১১১০০৪ / পরীক্ষা কোড: ৩০১]
সময়: ৩ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ১০০
[দ্রষ্টব্য : ডান পাশে উল্লিখিত সংখ্যা প্রশ্নের পূর্ণমান জ্ঞাপক।]

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন অনুষ্ঠিত ফাযিল স্নাতক (পাস) প্রথম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪-এর আবশ্যিক বাংলা (বিষয় কোড: ১১১০০৪ / ৩০১) পরীক্ষার মূল প্রশ্নপত্রের সকল প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ, প্রামাণ্য ও সাহিত্যরসসমৃদ্ধ সমাধান নিচে দেওয়া হলো। প্রবন্ধ, গল্প, কবিতা, ব্যাকরণ ও নির্মিতি অংশের প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর বিশ্ববিদ্যালয়ের মানদণ্ড অনুযায়ী সুবিন্যস্তভাবে সংকলিত হয়েছে।

১। (ক) ‘বাঙ্গালা ভাষা’ প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যে উৎকৃষ্ট গদ্যরীতির প্রস্তাব করেছেন তা ব্যাখ্যা করো। অথবা, (খ) ‘এক তেলে চাকাও ঘোরে, আর তেলে মন ফেরে।’-‘তৈল’ প্রবন্ধ অনুসারে দুই রকম তেলের পরিচয় দাও।

[বাংলা গদ্যরীতি বিষয়ে বঙ্কিমচন্দ্রের ঐতিহাসিক প্রস্তাবনা এবং হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘তৈল’ প্রবন্ধে বর্ণিত তৈলের দ্বৈত রূপের বিশদ বিশ্লেষণ]

[মান: ১০]

(ক) ‘বাঙ্গালা ভাষা’ প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উৎকৃষ্ট গদ্যরীতির স্বরূপ

বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ঔপন্যাসিক ও আধুনিক গদ্যের স্থপতি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর বিখ্যাত ‘বাঙ্গালা ভাষা’ প্রবন্ধে বাংলা গদ্যের স্বরূপ, ভাষা সংকট এবং ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে এক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন। উনিশ শতকে বাংলা গদ্যের ক্ষেত্রে একদিকে ছিল ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রবর্তিত সংস্কৃতঘেঁষা গুরুগম্ভীর সাধুরীতি, অন্যদিকে ছিল প্যারীচাঁদ মিত্র (টেকচাঁদ ঠাকুর) প্রবর্তিত চলিত আলালী ভাষা। এই দ্বিমুখী সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র এক অনন্য সমন্বিত উৎকৃষ্ট গদ্যরীতির প্রস্তাব করেন।

  • রচনার মূল উদ্দেশ্য পাঠকের বোধগম্যতা: বঙ্কিমচন্দ্রের মতে ভাষার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো মনের ভাব অন্যের হৃদয়ে স্পষ্ট ও সার্থকভাবে পৌঁছে দেওয়া। যে ভাষায় বক্তব্য সহজে হৃদয়ঙ্গম হয়, তা-ই উৎকৃষ্ট ভাষা। তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেন: ‘যে রচনা সকলেই বুঝিতে পারে, এবং পড়িবামাত্র যাহার অর্থ হৃদয়ঙ্গম হয়, তাহাই সর্বোৎকৃষ্ট রচনা।’
  • শব্দ চয়নে উদার দৃষ্টিভঙ্গি: তিনি সাধু বা চলিত কোনো নির্দিষ্ট কাঠামোর অন্ধ অনুসারী ছিলেন না। তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী—যেখানে সংস্কৃত বা তৎসম শব্দ ভাবের উপযুক্ত গাম্ভীর্য প্রকাশে সক্ষম, সেখানে দ্বিধাহীনভাবে সংস্কৃত শব্দ ব্যবহার করতে হবে; আবার যেখানে সহজ দেশি বা তদ্ভব শব্দে ভাব প্রাঞ্জল হয়, সেখানে কৃত্রিম পাণ্ডিত্য পরিহার করে সহজ বাংলা শব্দ গ্রহণ করতে হবে।
  • বিষয়ানুযায়ী ভাষার পরিবর্তনশীলতা: বঙ্কিমচন্দ্রের অন্যতম প্রধান সূত্র হলো বিষয়ের গুরুত্ব অনুযায়ী ভাষা পরিবর্তিত হবে। ধর্মতত্ত্ব, দর্শন বা গুরুগম্ভীর তাত্ত্বিক আলোচনায় ভাষা হবে গম্ভীর ও সংহত; কিন্তু নাটক, কথপোকথন বা লঘু ব্যঙ্গাত্মক রচনায় ভাষা হবে চটুল, প্রাঞ্জল ও সাধারণ মানুষের কথ্যরীতির নিকটবর্তী।

(খ) হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘তৈল’ প্রবন্ধ অনুসারে দুই রকম তেলের পরিচয়

মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তাঁর রসাত্মক ও শ্লেষপ্রধান ‘তৈল’ প্রবন্ধে মানবজীবনের অগ্রগতি ও সামাজিক সাফল্যের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে তেলের অমোঘ প্রভাব তুলে ধরেছেন। প্রবন্ধে লেখক রূপক ও বাস্তবের সমন্বয়ে দুই ধরনের তেলের পরিচয় দিয়েছেন:

তেলের প্রকৃতি কার্যকারিতা ও ব্যবহারক্ষেত্র সামাজিক ও বৈষয়িক তাৎপর্য
১. প্রাকৃতিক / যান্ত্রিক তৈল
(যাহা দ্বারা চাকা ঘোরে)
সরিষা, তিল, বাদাম ও পেট্রোলিয়ামজাত তরল তৈল। এটি মানুষের শরীরের শুষ্কতা দূর করে, মেজাজ শীতল রাখে এবং কলকারখানা ও যানবাহনের চাকা সচল রাখতে পিচ্ছিলকারক (লুব্রিকেন্ট) হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর মাধ্যমে ভৌগোলিক ও বৈষয়িক যান্ত্রিক সভ্যতার গতি সঞ্চারিত হয়। এই তেল দিয়ে যন্ত্র সচল হলেও মানবমন সচল করা যায় না।
২. সামাজিক / মনস্তাত্ত্বিক তৈল
(যাহা দ্বারা মন ফেরে)
চাটুকারিতা, তোষামোদ, স্তুতিবাদ ও মিথ্যা প্রশংসারূপ তৈল। এটি কোনো বস্তুগত পদার্থ নয়; বরং ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিকে তুষ্ট করার এক অব্যর্থ সামাজিক কৌশল। শাস্ত্রী মশাইয়ের মতে এই তেলের ক্ষমতা অসীম। যেখানে বিদ্যা, বুদ্ধি, মেধা ও সততা পরাভূত হয়, সেখানে এক ফোঁটা তোষামোদের তেল অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলে এবং বড় বড় পদোন্নতি ও স্বার্থ হাসিল করে দেয়।

উপসংহার

বঙ্কিমচন্দ্রের প্রস্তাবনা বাংলা গদ্যকে কৃত্রিমতার শেকলমুক্ত করে সার্বজনীন প্রাণের ভাষা করে তুলেছে; আর হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর তৈল তত্ত্ব সমাজের অন্ধ স্বার্থপরতা ও চাটুকারিতার নির্লজ্জ রূপ উন্মোচন করে শাশ্বত সাহিত্যিক মর্যাদা লাভ করেছে।

২। যে-কোনো দুটি প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর দাও: (ক) সভ্যতার সংকটের জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কাদেরকে, কেন দায়ী করেছেন? (খ) ‘আজ আমার বিদায়ের দিনে সে বিশ্বাস একেবারে দেউলিয়া হয়ে গেল।’-লেখকের এমন উক্তির কারণ কী? (গ) ‘যৌবনে দাও রাজটিকা’ প্রবন্ধে প্রমথ চৌধুরী প্রকৃত যৌবন বলতে কী বুঝিয়েছেন? (ঘ) ‘মনুষ্যত্বের বিকাশই সবচেয়ে বড় কথা।’-বুঝিয়ে লেখো।

[রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সভ্যতার সংকট’, প্রমথ চৌধুরীর ‘যৌবনে দাও রাজটিকা’ এবং মোতাহের হোসেন চৌধুরীর ‘মনুষ্যত্ব’ ভাবনার সংক্ষিপ্ত উত্তর]

[মান: ১০ (৫ × ২)]

(ক) সভ্যতার সংকটের জন্য রবীন্দ্রনাথ কাদেরকে এবং কেন দায়ী করেছেন?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর জীবনের অন্তিম ভাষণ ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধে বিশ্বজোড়া সভ্যতার চরম বিপর্যয়ের জন্য ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী ও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের দায়ী করেছেন। তরুণ বয়সে কবি ইউরোপের সাহিত্য, বিজ্ঞান ও মানবিক উদারতাকে শ্রদ্ধা করেছিলেন এবং ভেবেছিলেন ইংরেজরা ভারতবর্ষে মুক্তির আলোকবর্তিকা নিয়ে এসেছে। কিন্তু পরিণত বয়সে তিনি প্রত্যক্ষ করলেন যে, ইংরেজদের এই তথাকথিত ‘সভ্যতা’ আসলে স্বার্থপর শোষণ, কূটকৌশল ও নিষ্ঠুর সামরিক আগ্রাসনের নামান্তর। তারা দীর্ঘ দুইশত বছরে ভারতের কোটি কোটি মানুষকে শিক্ষা, খাদ্য, চিকিৎসা ও আত্মমর্যাদাহীন পঙ্গু জাতিতে পরিণত করেছে এবং ধর্মের নামে ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা উসকে দিয়েছে। মানবতার প্রতি এই বিশ্বাসঘাতকতা এবং সাম্রাজ্যবাদী লোভের কারণেই কবি ইংরেজ শাসকদের সভ্যতার সংকটের মূল অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

(খ) ‘আজ আমার বিদায়ের দিনে সে বিশ্বাস একেবারে দেউলিয়া হয়ে গেল।’-লেখকের এমন উক্তির কারণ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর আশির জন্মজয়ন্তীতে দাঁড়িয়ে বিশ্বরাজনীতি ও ভারতবর্ষের বাস্তব পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করে এই গভীর বেদনাদায়ক উক্তি করেছেন। একদা কবির অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, ইউরোপীয় সভ্যতা মানুষের মানবিক মর্যাদা ও স্বাধীনতাকে সমুন্নত রাখবে। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি দেখলেন ইউরোপের বুকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তাণ্ডবলীলা, মানবতার চরম লাঞ্ছনা এবং ভারতবর্ষে ইংরেজদের বর্বরোচিত শাসন ও নির্মম বিভেদনীতি। কবি দেখলেন ইংরেজদের বাহ্যিক সভ্যতার মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে আছে হিংস্র পাশবিক লোভ। যে ইংরেজদের মানবিকতার প্রতি তিনি যৌবনে আস্থা রেখেছিলেন, তাদের সেই অহংকারী সভ্যতার ধ্বংসস্তূপ দেখে কবির আজীবনের লালিত মানববিশ্বাস চিরতরে চূর্ণ-বিচূর্ণ ও দেউলিয়া হয়ে যায়।

(গ) ‘যৌবনে দাও রাজটিকা’ প্রবন্ধে প্রমথ চৌধুরী প্রকৃত যৌবন বলতে কী বুঝিয়েছেন?

প্রমথ চৌধুরী তাঁর ‘যৌবনে দাও রাজটিকা’ প্রবন্ধে স্পষ্ট করেছেন যে, যৌবন কোনো ক্যালেন্ডারের বয়সের সীমারেখা বা দৈহিক গঠনের বিষয় নয়; বরং যৌবন হলো চিত্তের এক চিরন্তন সজীব, সৃজনশীল ও গতিশীল অবস্থা। যার মনে জড়তা নেই, কুসংস্কার ও অন্ধ প্রথার অন্ধত্ব নেই, যিনি চির নবীন ও সৃষ্টির উন্মাদনায় সর্বদা আত্মনিবেদন করতে প্রস্তুত—তিনিই প্রকৃত যুবাপুরুষ। জরাগ্রস্ত প্রাচীন চিন্তাকে আঁকড়ে ধরে যারা স্বার্থের মোহে অন্ধ থাকে তারা বয়সে তরুণ হলেও মূলত বৃদ্ধ; পক্ষান্তরে বয়োবৃদ্ধ হয়েও যার হৃদয় সত্য, সৌন্দর্য ও নতুনকে বরণ করার সাহসে স্পন্দিত হয়, তিনিই প্রকৃত যৌবনের অধিকারী। প্রমথ চৌধুরী সমাজে এই প্রাণবন্ত, ভয়হীন ও মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন আধ্যাত্মিক যৌবনের জয়গান গেয়ে তাকে রাজটিকা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

(ঘ) ‘মনুষ্যত্বের বিকাশই সবচেয়ে বড় কথা।’-বুঝিয়ে লেখো

মোতাহের হোসেন চৌধুরী তাঁর ভাবনাসমৃদ্ধ চিন্তায় দেখিয়েছেন যে, মানবজীবন মূলত দুই স্তরবিশিষ্ট—জীবসত্তা ও মানবসত্তা। মানুষের জীবসত্তার ক্ষুধা কেবল অন্ন, বস্ত্র ও দৈহিক প্রয়োজন মেটানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ; যা পশুর মধ্যেও সমভাবে বিদ্যমান। কিন্তু কেবল খেয়ে-পরে বেঁচে থাকাই মানুষের জীবনের পরম সার্থকতা নয়। মানুষের ভেতরের অন্তর্নিহিত মনুষ্যত্ববোধ, বিবেক, ন্যায়পরায়ণতা, সৌন্দর্যচেতনা ও মুক্তবুদ্ধির স্ফুরণ ঘটানোই হলো মনুষ্যত্বের প্রকৃত বিকাশ। শিক্ষা হলো সেই মানবসত্তার আলোকবর্তিকা যা মানুষকে জীবসত্তার কারাগার থেকে মুক্ত করে উচ্চতর মানবিক চেতনায় উন্নীত করে। অন্নবস্ত্রের প্রাচুর্য সত্ত্বেও যদি মানুষের অন্তরে মনুষ্যত্ব না থাকে, তবে সে পশুর চেয়েও অধম হয়ে পড়ে। তাই ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনে মনুষ্যত্বের পূর্ণাঙ্গ বিকাশ সাধনই পরম কর্তব্য।

উপসংহার

উক্ত চিন্তাবিদদের এই মৌলিক ভাবনাসমূহ মানুষকে স্বার্থান্ধতা, ঔপনিবেশিক মোহ ও জড়তা থেকে মুক্ত করে এক আলোকিত আত্মমর্যাদাবান সমাজ গঠনের অনুপম প্রেরণা জোগায়।

৩। প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ব্যাখ্যা লেখো (যে-কোনো একটি): (ক) সে তার শক্তিরূপ আমাদের দেখিয়েছে, মুক্তিরূপ দেখাতে পারেনি। (খ) একজন রাজা, হাতে রাজদণ্ড; আরজন সভ্য, হাতে ন্যায়দণ্ড।

[রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধের মর্মস্পর্শী রাজনৈতিক ও দার্শনিক বক্তব্যের সপ্রসঙ্গ তাৎপর্য ব্যাখ্যা]

[মান: ৫]

(ক) “সে তার শক্তিরূপ আমাদের দেখিয়েছে, মুক্তিরূপ দেখাতে পারেনি।”

  • উৎস ও প্রসঙ্গ: আলোচ্য তাৎপর্যপূর্ণ বাক্যটি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত অন্তিম আত্মজৈবনিক ও গভীর ভাবনাসমৃদ্ধ প্রবন্ধ ‘সভ্যতার সংকট’ থেকে চয়ন করা হয়েছে। ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসনের স্বরূপ এবং তাদের তথাকথিত সভ্যতার ব্যর্থতা উন্মোচন করতে গিয়ে লেখক এই মন্তব্য করেছেন।
  • মূলভাব: ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী ভারতবর্ষে তাদের বৈষয়িক শক্তি ও দমন-পীড়নের নিষ্ঠুর প্রদর্শন ঘটাতে পারলেও মানবিক মুক্তি ও নৈতিক কল্যাণের আলো ভারতবাসীর সামনে উন্মোচিত করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
  • বিশদ ব্যাখ্যা: রবীন্দ্রনাথ তরুণ বয়সে বিশ্বাস করেছিলেন যে ইউরোপের সাহিত্য, দর্শন ও বিজ্ঞান ভারতবর্ষের দাসত্বপীড়িত সমাজকে মুক্তির সন্ধান দেবে। কিন্তু দীর্ঘ ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতবাসী যা প্রত্যক্ষ করেছে তা হলো কেবল তোপখানা, সেনাবাহিনী, পুলিশ প্রশাসন এবং নিষ্ঠুর আইনের শাসন—যার দ্বারা দেশের মানুষকে পদানত রাখা হয়েছে। ইংরেজরা দেখিয়েছে তাদের সামরিক শক্তি, শিল্পায়ন ও সাম্রাজ্যবাদী দম্ভের রূপ। কিন্তু যে শিক্ষা মানুষকে অন্তরের দাসত্ব থেকে মুক্তি দেয়, যে স্বাধীনতা মানুষকে অর্থনৈতিক ও আত্মিক সমৃদ্ধি দান করে—সেই ‘মুক্তিরূপ’ ইংরেজরা কখনোই এই উপমহাদেশের মানুষকে দেখতে দেয়নি। তাদের শক্তি ছিল ধ্বংস ও শোষণের, কিন্তু সৃষ্টির কোনো মহান উদার রূপ তারা দেখাতে পারেনি।
  • মন্তব্য: ইংরেজ শাসনের অমানবিক ও প্রতারণামূলক চরিত্রের ওপর কবির এই উক্তি এক ঐতিহাসিক চরম সত্যের দলিল।

(খ) “একজন রাজা, হাতে রাজদণ্ড; আরজন সভ্য, হাতে ন্যায়দণ্ড।”

  • উৎস ও প্রসঙ্গ: উদ্ধৃত অংশটি বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সামাজিক ব্যঙ্গরসাত্মক রচনা ‘তৈল’ প্রবন্ধ থেকে সংগৃহীত হয়েছে। সামাজিক ক্ষমতা ও সম্পর্কের ক্ষেত্রে তৈলের অপরিহার্যতা বোঝাতে গিয়ে লেখক রূপক অর্থে এই বক্তব্য তুলে ধরেছেন।
  • মূলভাব: রাজা ও সমাজপতিরা পার্থিব ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে রাজদণ্ড ও বিচারদণ্ড বহন করলেও, তৈল নামক তোষামোদকারীর অনুকম্পা ও কৃপা ছাড়া সেই দণ্ড অচল ও মূল্যহীন হয়ে পড়ে।
  • বিশদ ব্যাখ্যা: পৃথিবীতে রাজা বা রাষ্ট্রনায়ক রাজদণ্ড ধারণ করে প্রজাদের শাসন করেন, আবার আইনজ্ঞ ও সভ্য সমাজপতিরা ন্যায়দণ্ড হাতে নিয়ে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ভান করেন। কিন্তু হরপ্রসাদ শাস্ত্রী অত্যন্ত সূক্ষ্ম শ্লেষের সাথে দেখিয়েছেন যে, এই রাজদণ্ড ও ন্যায়দণ্ড পরিচালনাকারী উভয় ব্যক্তিই তেলের অনুগত দাস। তাদের হাতে যতই ক্ষমতা বা আইন থাকুক না কেন, উপযুক্ত পরিমাণ তোষামোদের তেল ঢালতে না পারলে তাদের কঠোরতা গলে না। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তেল দিতে ওস্তাদ, সে রাজার রাজদণ্ডকেও নিজের পক্ষে বাঁকিয়ে নিতে পারে এবং সভ্য মানুষের ন্যায়দণ্ডকেও নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে।
  • মন্তব্য: ক্ষমতাশীলদের চাটুকারিতার প্রতি অন্ধ মোহ এবং বিচারব্যবস্থার ভণ্ডামিকে লেখক এই চমৎকার বাক্যাংশের মাধ্যমে তীব্র কষাঘাত করেছেন।

উপসংহার

উভয় উদ্ধৃতিই সমাজ ও রাজনীতির অন্তর্নিহিত ভণ্ডামি ও শোষণের মুখোশ উন্মোচন করে শাশ্বত সাহিত্যিক দ্যুতি ছড়িয়ে দেয়।

৪। (ক) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সমাপ্তি’ গল্পের নামকরণের সার্থকতা আলোচনা করো। অথবা, (খ) শামসুদ্দীন আবুল কালামের ‘পথ জানা নাই’ গল্প অবলম্বনে বণিক সভ্যতা কীভাবে একটি নিস্তরঙ্গ সরল গ্রামকে বিপর্যস্ত করেছে তা আলোচনা করো।

[‘সমাপ্তি’ গল্পের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর ও সমাপ্তির মাহাত্ম্য এবং ‘পথ জানা নাই’ গল্পে গ্রামীণ জীবনের ওপর পুঁজিবাদী আগ্রাসনের রূপ]

[মান: ১০]

(ক) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সমাপ্তি’ গল্পের নামকরণের সার্থকতা

সাহিত্যে একটি সার্থক ছোটগল্পের ক্ষেত্রে নামকরণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ শিল্পগুণ বহন করে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী ছোটগল্প ‘সমাপ্তি’ মৃন্ময়ী নামক এক চঞ্চল, বাঁধনহারা গ্রাম্য কিশোরীর মানসিক রূপান্তর ও পরিণতির এক অনুপম মনস্তাত্ত্বিক উপাখ্যান। গল্পটির নাম কেন ‘সমাপ্তি’ রাখা হলো, তা গল্পের কেন্দ্রীয় ভাববস্তুর আলোকে নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:

  • চপল কৈশোরের সমাপ্তি: গল্পের প্রারম্ভে মৃন্ময়ী হলো প্রকৃতির এক অবাধ্য, বুনো ও মুক্ত বিহঙ্গ। সে গাছে চড়ে, ছেলেদের সাথে ডাংগুলি খেলে এবং সমাজের কোনো প্রথা বা শাসনের তোয়াক্কা করে না। কলেজপড়ুয়া সুশিক্ষিত অপূর্ব তাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে তার স্বাধীন সত্তাকে ভালোবেসে বিবাহ করে। কিন্তু বিবাহের পর শ্বশুরবাড়ির কৃত্রিম আচার-অনুষ্ঠান ও শাশুড়ির কড়া শাসনের মুখে তার দমবন্ধ হয়ে আসে। অপূর্ব যখন তাকে জোরপূর্বক সামাজিক নিয়মে বাঁধতে চাইল, তখন মৃন্ময়ী বিদ্রোহ করল। কিন্তু অপূর্বর কলকাতা চলে যাওয়ার পর একাকী নিঃসঙ্গতায় তার সুপ্ত নারীহৃদয় জাগ্রত হয়ে ওঠে। এই রূপান্তরের মাধ্যমে তার মুক্ত চপল অবাধ্য বাল্যকালের এক চিরন্তন সমাপ্তি ঘটে।
  • কৃত্রিম দাম্পত্যের অবসান ও প্রেমের সূচনা: গল্পের শেষ পর্যায়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে গোপনে গভীর রাতে পায়ে হেঁটে চোরের মতো অপূর্বর কাছে ফিরে আসার মাধ্যমে মৃন্ময়ী তার অহংকারের সমাপ্তি ঘোষণা করে। সে অপূর্বর চরণে নিজেকে সঁপে দিয়ে বলে—’আমি এসেছি’। এখানে কেবল একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি নয়, বরং কিশোরী মৃন্ময়ীর সমাপ্তির মধ্য দিয়ে এক প্রেমময়ী, আত্মনিবেদিতা গৃহবধূর নবজন্ম সূচিত হয়েছে।
  • শিল্পসার্থকতা: রবীন্দ্রনাথ বাল্যের পরিসমাপ্তি এবং প্রেমের মাধুর্যের সূচনাবিন্দুতে দাঁড়িয়ে গল্পটির নাম রেখেছেন ‘সমাপ্তি’। গল্প যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকেই এক অনন্ত নতুন জীবনের প্রারম্ভ। তাই গল্পটির নামকরণ ব্যঞ্জনাময় ও শতভাগ সার্থক।

(খ) ‘পথ জানা নাই’ গল্পে সরল গ্রামীণ জীবনের ওপর বণিক সভ্যতার আগ্রাসন

কথাশিল্পী শামসুদ্দীন আবুল কালাম তাঁর ‘পথ জানা নাই’ গল্পে আবহমান বাংলার এক নিস্তরঙ্গ, শান্ত ও সবুজ নদীমাতৃক পল্লীর ওপর নির্মম পুঁজিবাদী বণিক সভ্যতার বিধ্বংসী থাবা অত্যন্ত দরদ দিয়ে চিত্রিত করেছেন:

  • শাশ্বত শান্ত পল্লীপ্রকৃতির চিত্র: মেঘনা নদীর তীরের গ্রামটি ছিল প্রকৃতির কোলে এক শান্ত নীড়। নদী ছিল তাদের প্রাণ, কৃষিকাজ ও মাছ ধরাই ছিল তাদের জীবিকা। গ্রামবাসীরা দারিদ্র্যের মধ্যেও পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে সুখে দিনাতিপাত করত।
  • বণিক শকুনদের আগমন: এই সরল জীবনে বিষবাষ্প হয়ে প্রবেশ করে শহুরে বণিকদের স্বার্থপর নজর। আধুনিকতার নামে গ্রামে স্টিমার ঘাট, কাঠের গুদাম এবং বাণিজ্য কেন্দ্র গড়ে ওঠে। স্থানীয় জোতদার ও ফড়িয়াদের সহযোগিতায় শহুরে ধনিকশ্রেণী নদীর তীরে কারখানা ও ব্যবসা শুরু করে।
  • পরিবেশ ও জীবিকা ধ্বংস: বড় বড় জাহাজ ও স্টিমারের কালো ধোঁয়া এবং কারখানার বর্জ্যে মেঘনার রূপালী জল কলুষিত হয়ে যায়। নদীর মাছ মরে নিঃশেষ হয়, কৃষকের উর্বর জমি নামমাত্র মূল্যে বণিকরা গ্রাস করে নেয়। বংশপরম্পরায় চলে আসা কৃষকরা নিজেদের ভিটেমাটি হারিয়ে বণিকদের গুদামে সস্তা মজুরে পরিণত হয়।
  • নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অপমৃত্যু: বণিক সভ্যতার সাথে সাথে গ্রামে প্রবেশ করে কৃত্রিম স্বার্থপরতা, কলহ ও মামলা-মোকদ্দমা। গ্রামের তরুণরা শহরমুখী হয়ে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। যে গ্রামে শান্তি ও সংহতি ছিল, সেখানে এখন হাহাকার আর ক্ষুধা। সরল গ্রামবাসীরা বুঝতে পারে না এই ধ্বংসস্তূপ থেকে বাঁচার পথ কোন দিকে—কারণ পুঁজিবাদী শোষণের এই অন্ধ গলিপথ থেকে মুক্তির কোনো ‘পথ জানা নাই’।

উপসংহার

উভয় গল্পই মানুষের অভ্যন্তরীণ ও সামাজিক সংকটের এমন নিখুঁত শৈল্পিক রূপায়ণ, যা পাঠককে জীবনের গভীর দর্শনে আলোড়িত করে।

৫। যে-কোনো দুটি প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর দাও: (ক) পির সাহেবের প্রতি এমদাদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি হয় কখন, কীভাবে? (খ) ‘প্রাগৈতিহাসিক’ গল্প অবলম্বনে ভিখু চরিত্রের জীবনাকাঙ্ক্ষা তুলে ধরো। (গ) পণ্ডিতমশায়ের মুখ লজ্জা, তিক্ততা ও ঘৃণায় বিকৃত হয়ে উঠেছিল কেন? (ঘ) দোকানে ঝুলিয়ে রাখা কলা আমুর কাছে কী মনে হয়েছে? কেন?

[বাঙালি মধ্যবিত্তের মনস্তত্ত্ব, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘প্রাগৈতিহাসিক’ এবং ছোটগল্পের চরিত্রের অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বের সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা]

[মান: ১০ (৫ × ২)]

(ক) পির সাহেবের প্রতি এমদাদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি হওয়ার প্রেক্ষাপট

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর বিখ্যাত ছোটগল্প ‘নয়নচারা’ বা সমধর্মী গ্রামীণ উপাখ্যানে দেখা যায়, এমদাদ ছিল একজন সচেতন আধুনিক শিক্ষিত যুবক। ভণ্ড পির সাহেবের আধ্যাত্মিক কেরামতির গল্প শুনে এলাকার হাজার হাজার সরলপ্রাণ মানুষ যখন অন্ধ ভক্তিতে লুটোপুটি খাচ্ছিল, তখন এমদাদ নিবিড়ভাবে পির সাহেবের প্রতিটি পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। একদিন মধ্যরাতে পির সাহেবের একান্তে বিলাসবহুল ভোজ এবং মুরিদদের দান করা অর্থ সিন্দুকে লুকিয়ে রাখার লোভী তৎপরতা এমদাদ নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করে। পির সাহেবের মুখের মধুর আধ্যাত্মিক বাণী এবং তাঁর ব্যক্তিজীবনের চরম ভোগলিপ্সা ও বৈষয়িক স্বার্থপরতার এই স্পষ্ট বৈপরীত্য দেখেই এমদাদের মনে পির সাহেবের তথাকথিত ধার্মিকতার প্রতি প্রথম গভীর সন্দেহ ও অনাস্থা সৃষ্টি হয়।

(খ) ‘প্রাগৈতিহাসিক’ গল্প অবলম্বনে ভিখু চরিত্রের জীবনাকাঙ্ক্ষা

বাংলা সাহিত্যের অপরাজেয় কথাশিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অমর সৃষ্টি ‘প্রাগৈতিহাসিক’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হলো ভিখু। ভিখু সভ্য মানুষের সুকুমার বৃত্তির কোনো প্রতিনিধি নয়; সে হলো আদিম প্রকৃতির এক হিংস্র, পৈশাচিক ও ক্ষুধা-কামনাময় বুনো সত্তা। পুলিশি নির্যাতন ও ডাকাতদলের হাতে পায়ে মারাত্মক জখম হয়ে পঙ্গু হলেও তার বেঁচে থাকার আদিম জীবনাকাঙ্ক্ষা বিন্দুমাত্র স্তিমিত হয়নি। সমাজে একপা হারানো ভিখুর বেঁচে থাকার একমাত্র মূল প্রেরণা হলো দুটি—পেটের তীব্র ক্ষুধা মেটানো এবং নারীদেহ ভোগ করা। এই অন্ধ আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করতে সে ভিক্ষাবৃত্তির আড়ালে চুরি করে এবং রাতের অন্ধকারে প্রতিদ্বন্দ্বী পঙ্গু ভিখারি বশীরকে বর্বরোচিতভাবে খুন করে সুন্দরী পাঁচীকে কাঁধে তুলে নিয়ে অন্ধকারে বিলীন হয়ে যায়। নীতি-নৈতিকতাহীন টিকে থাকার এই আদিম জৈবিক তাড়নাই ভিখু চরিত্রের মূল জীবনাকাঙ্ক্ষা।

(গ) পণ্ডিতমশায়ের মুখ লজ্জা, তিক্ততা ও ঘৃণায় বিকৃত হয়ে উঠেছিল কেন?

ছোটগল্পে পণ্ডিতমশাই ছিলেন সমাজের এক আদর্শবাদী, সৎ ও বিদ্যানুরাগী শিক্ষক। তিনি নিজের সারা জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন শিক্ষার্থীদের মানুষ করার পেছনে। কিন্তু জীবনের পড়ন্ত বিকেলে এসে তিনি দেখলেন তাঁরই স্নেহে গড়ে ওঠা ছাত্ররা সমাজে বিত্তবান ও বড় কর্তা হয়ে কীভাবে আদর্শহীন দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষে পরিণত হয়েছে। তারা অর্থের দম্ভে অন্ধ হয়ে শিক্ষককে সামান্য অনুকম্পা বা দয়ার পাত্র মনে করে অবহেলা প্রদর্শন করে। সমাজের এই চরম নৈতিক অবক্ষয়, বিদ্যার চেয়ে অর্থের অন্ধ আস্ফালন এবং নিজের আজীবনের ত্যাগের চরম অপমূল্যায়ন প্রত্যক্ষ করে বৃদ্ধ পণ্ডিতমশায়ের মুখমণ্ডল আত্মসম্মানবোধের লজ্জা, অপমানের তিক্ততা এবং ক্ষয়ের প্রতি গভীর ঘৃণায় বিকৃত হয়ে উঠেছিল।

(ঘ) দোকানে ঝুলিয়ে রাখা কলা আমুর কাছে কী মনে হয়েছে? কেন?

শওকত ওসমানের বিখ্যাত গল্পে ক্ষুধার্ত কিশোর আমু যখন তীব্র পেটের জ্বালায় শহরের ফুটপাতে ঘুরছিল, তখন মোড়ের ফলের দোকানে সুন্দর করে ঝুলিয়ে রাখা হলুদ পাকা কলাগুলোর দিকে তার দৃষ্টি আটকে যায়। ক্ষুধার্ত আমুর কাছে সেই কলাগুলোকে নিছক কোনো ফল মনে হয়নি; বরং তার কাছে মনে হয়েছিল ওগুলো যেন এক একটি স্বর্গের অমৃত বা সোনার মতো লোভনীয় জাদুকরী বস্তু, যা তার জীবন বাঁচাতে পারে। সারাদিন অনাহারে থাকা আমুর পরিপাকতন্ত্র যখন ক্ষিধের আগুনে জ্বলছিল, তখন কাঁচের ওপারে বা দড়িতে ঝুলানো কলাগুলো তার কাছে মানুষের চরম বৈষম্য ও নিষ্ঠুরতার প্রতীক হিসেবেও ধরা দেয়—যা চোখের সামনে বিদ্যমান অথচ ক্ষুধার্ত হাত সেখানে পৌঁছাতে গেলেই চোরের তকমা জোটে।

উপসংহার

এই চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যের বাস্তববাদী কথাশিল্পীরা সমাজের ক্ষুধা, শোষণ ও মানবিক অধঃপতনের বাস্তব রূপটি নিপুণভাবে উন্মোচন করেছেন।

৬। প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ব্যাখ্যা লেখো (যে-কোনো একটি): (ক) এখানে পথের শেষ নেই। এখানে ঘরে পৌঁছানো যায় না। (খ) আশ্চর্য, কিন্তু একটা কথা শহরের কুকুরের চোখে বৈরিতা নেই।

[শামসুদ্দীন আবুল কালামের ‘পথ জানা নাই’ এবং বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনদর্শনের সপ্রসঙ্গ সাহিত্যিক ব্যাখ্যা]

[মান: ৫]

(ক) “এখানে পথের শেষ নেই। এখানে ঘরে পৌঁছানো যায় না।”

  • উৎস ও প্রসঙ্গ: আলোচ্য তাৎপর্যপূর্ণ বাক্যটি শামসুদ্দীন আবুল কালামের বিখ্যাত ছোটগল্প ‘পথ জানা নাই’ থেকে চয়ন করা হয়েছে। নদীমাতৃক সরল গ্রাম যখন আধুনিক বণিক সভ্যতার আগ্রাসনে নিঃস্ব হয়ে যায়, তখন ভাগ্যাহত মানুষের অন্তহীন জীবনসংগ্রাম তুলে ধরতে গিয়ে লেখক এই মন্তব্য করেছেন।
  • মূলভাব: শোষিত মেহনতি মানুষের জীবনের ক্লান্তিহীন দুঃখ-বেদনার কোনো পরিসমাপ্তি নেই; তাদের কোনো নিশ্চিত স্থায়ী আশ্রয় বা শান্তির নীড় কোনোদিনই গড়ে ওঠে না।
  • বিশদ ব্যাখ্যা: গ্রামীণ জীবনের একদা যে সহজ ছন্দ ও ঘরের নিশ্চিত প্রশান্তি ছিল, শহুরে পুঁজিবাদের আগ্রাসনে তা চিরতরে বিলীন হয়ে গেছে। কৃষকেরা ভিটেমাটি হারিয়ে আজ মজুর ও যাযাবর। তারা এক ঘাট থেকে আরেক ঘাটে, এক মজুরি থেকে আরেক মজুরির সন্ধানে অনন্তকাল ধরে ছুটে চলেছে। এই অবিরাম ছোটাছুটিতে কেবল পথের পর পথ দীর্ঘায়িত হয়, কিন্তু সেই পথের কোনো শান্তিময় শেষ নেই। যে ঘরের মধ্যে মানুষ দিনশেষে স্বস্তি ও ভালোবাসার আশ্রয় পেত, চরম দারিদ্র্য ও শোষণের নির্মম চাকার তলায় পিষ্ট হয়ে সেই ঘরের স্বপ্ন আজ মরিচীকা হয়ে গেছে।
  • মন্তব্য: আধুনিক পুঁজিবাদে ভাগ্যবিড়ম্বিত বাস্তুহারা সর্বহারা মানুষের চিরন্তন নিয়তি এই বাক্যে হাহাকার হয়ে ফুটে উঠেছে।

(খ) “আশ্চর্য, কিন্তু একটা কথা শহরের কুকুরের চোখে বৈরিতা নেই।”

  • উৎস ও প্রসঙ্গ: উদ্ধৃত মনস্তাত্ত্বিক উক্তিটি প্রখ্যাত কথাশিল্পী বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী রচনা থেকে গৃহীত হয়েছে। গ্রাম থেকে প্রথম শহরে আসা মানুষের চোখে শহুরে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ পর্যবেক্ষণের প্রেক্ষিতে এই কথাটি বলা হয়েছে।
  • মূলভাব: গ্রামের জীবজন্তু অচেনা মানুষকে দেখে ঘেউ ঘেউ করে শত্রুতা প্রকাশ করলেও, শহরের কুকুরগুলো মানুষের মতোই উদাসীন ও সংবেদনহীন হয়ে পড়ে।
  • বিশদ ব্যাখ্যা: গ্রামীণ পরিবেশে পশুপাখির মধ্যেও এক ধরনের সজীবতা, পাহারা দেওয়ার দায়িত্ববোধ এবং অচেনাকে পরখ করার সক্রিয় মানসিকতা থাকে। কিন্তু আধুনিক নগরজীবনের যান্ত্রিক কোলাহল, ভিড় ও স্বার্থপরতার বিষবাষ্প যেন মানুষের পাশাপাশি নিম্নবর্গের প্রাণীদেরও স্পর্শ করেছে। শহরের কুকুরগুলো প্রতিদিন লাখ লাখ অপরিচিত মানুষকে পদদলিত হতে দেখে দেখে এতটাই ক্লান্ত ও অনুভূতিশূন্য হয়ে পড়েছে যে তাদের চোখে কোনো কৌতূহল নেই, কোনো ভালোবাসা নেই, আবার কোনো প্রত্যক্ষ বৈরিতা বা আক্রমণাত্মক মনোভাবও নেই। তারা যেন এক চরম আত্মকেন্দ্রিক উদাসীনতার প্রতীক।
  • মন্তব্য: নগরজীবনের কৃত্রিমতা ও প্রাণের উষ্ণতাহীন নিঃসঙ্গতাকে লেখক এক অবলা প্রাণীর চোখের দৃষ্টি দিয়ে অপূর্ব দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন।

উপসংহার

উভয় উদ্ধৃতিই মানুষের অস্তিত্বের গভীর সংকট ও পারিপার্শ্বিক নির্লিপ্ততার এক অনন্য সমাজতাত্ত্বিক দলিল।

৭। (ক) মধুসূদন দত্তের ‘আত্ম-বিলাপ’ কবিতা অবলম্বনে কবির মর্মবেদনার স্বরূপ উন্মোচন করো। অথবা, (খ) ‘সাত সাগরের মাঝি’ কবিতায় মুসলমানদের পুনর্জাগরণের যে সুর ধ্বনিত হয়েছে তা আলোচনা করো।

[মাইকেল মধুসূদন দত্তের আত্মদহন ও অনুশোচনা এবং ফররুখ আহমদের ‘সাত সাগরের মাঝি’ কাব্যে ইসলামি রেনেসাঁর উদাত্ত আহ্বান]

[মান: ১০]

(ক) মধুসূদন দত্তের ‘আত্ম-বিলাপ’ কবিতায় কবির মর্মবেদনার স্বরূপ

বাংলা সাহিত্যের আধুনিকতার অগ্রদূত মাইকেল মধুসূদন দত্তের কবিজীবন এক মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডির ইতিহাস। পাশ্চাত্য মোহে অন্ধ হয়ে স্বজাতি, স্বধর্ম ও মাতৃভাষাকে অবহেলা করে তিনি ইংরেজি ভাষায় যশ ও অমরত্ব লাভের জন্য ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সে পাড়ি জমিয়েছিলেন। কিন্তু বিদেশে নিদারুণ অবহেলা, দারিদ্র্য ও নিরাশার সম্মুখীন হয়ে তিনি বুঝতে পারলেন যে, তিনি সোনার কাঠি ভেবে মূলত ছাই ভস্ম কুড়িয়েছেন। এই গভীর অনুশোচনা, আত্মপ্রতারণা ও বুকফাটা কান্নার জীবন্ত রূপ হলো তাঁর অমর গীতিকবিতা ‘আত্ম-বিলাপ’।

  • মরীচিকার পেছনে বৃথা ছোটার আত্মদহন: কবি স্বীকার করেছেন তিনি অলীক আশার ছলনায় ভুল পথে ছুটেছিলেন। যেমন তৃষ্ণার্ত হরিণ মরুভূমির মরীচিকায় পানির আশায় ছুটে গিয়ে প্রাণ হারায়, কবিও তেমনি কৃত্রিম খ্যাতির মোহে যৌবনের অমূল্য সময় নষ্ট করেছেন:

    ‘আশার ছলনে ভুলি কি ফল লভিমু হায়,
    তাই ভাবি মনে? জীবন-প্রবাহ বহি কাল-সিন্ধু পানে যায়,
    ফিরাব কেমনে?’

  • স্বজাতির অবহেলা ও পরবাসের যন্ত্রণা: মাতৃভূমি বাংলাকে ত্যাগ করে কবি যে রূপার লোভে পরদেশে দাসত্ব করেছিলেন, তা তাকে কোনো সম্মান দেয়নি; বরং চরম নিঃস্ব, রুগ্ণ ও ঋণে জর্জরিত করেছে। বিজাতীয় সাহিত্যের মন্দিরে তিনি নিজেকে উৎসর্গ করতে গিয়ে কেবল বঞ্চনাই উপহার পেয়েছেন।
  • সময়ের অপচয় ও অন্তিম হাহাকার: কবির মনে হয়েছে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে, যৌবনের প্রদীপ নিভে এসেছে এবং সামনে কেবল অন্ধকার। এখন আর পেছনের ভুল শোধরানোর কোনো সুযোগ নেই। এই নিদারুণ আত্মগ্লানি ও কান্নাই কবিতাটিকে বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ শোককাব্যের মর্যাদা দান করেছে।

(খ) ‘সাত সাগরের মাঝি’ কবিতায় মুসলমানদের পুনর্জাগরণের সুর

মুসলিম রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ রচিত ‘সাত সাগরের মাঝি’ হলো ঘুমন্ত ও পথহারা মুসলিম উম্মাহকে জাগিয়ে তোলার এক ঐতিহাসিক বজ্রকঠিন ইশতেহার। দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসন ও দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানরা যখন নিজেদের অতীত শৌর্যবীর্য, ঈমানি চেতনা ও ঐতিহ্য ভুলে হতাশার ঘুমে অচেতন ছিল, তখন কবি নাবিকের রূপকে এক নবজাগরণের ডাক দিয়েছেন:

  • জাহাজের প্রতীকী আবেদন: কবি মুসলিম জাতিকে একটি সমুদ্রগামী জাহাজের সাথে এবং তাদের নেতাদের ‘মাঝি’ বা নাবিকের সাথে তুলনা করেছেন। যে জাহাজ একদা আটলান্টিক থেকে প্রশান্ত মহাসাগর শাসন করেছিল, আজ তা দিকভ্রান্ত হয়ে অলস বন্দরে নোঙর ফেলে পড়ে আছে:

    ‘কাটিয়া গিয়াছে কুয়াশা রাত্রি, ছিন্নভিন্ন মেঘ,
    পাহাড়ের চূড়া জাগিতেছে ওই, জেগেছে নদীর বেগ;
    সাত সাগরের মাঝি চেয়ে দেখো দুয়ারে ডাকে জাহাজ!’

  • হতাশা ও নির্লিপ্ততা ঝেড়ে ফেলার আহ্বান: কবি আহ্বান জানিয়েছেন পুরানো দুঃখ-কষ্ট ও জড়তার বন্ধন ছিঁড়ে ফেলে নতুন প্রত্যয়ে সাগরে নোঙর তোলার জন্য। তিনি সিন্দাবাদ ও তারিক বিন যিয়াদের মতো নির্ভীক বীরত্বের ঐতিহ্যে ফিরে যাওয়ার তাগিদ দিয়েছেন।
  • নতুন প্রত্যুষের সম্ভাবনা: কবির বিশ্বাস—যদি মুসলিম সমাজ আবার আত্মপরিচয় ফিরে পায়, নিজেদের ঈমানি শক্তিতে বলীয়ান হয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়, তবে তারা আবার দিগ্বিজয়ী হয়ে বিশ্বমঞ্চে সত্য ও ইনসাফের পতাকা উড্ডীন করতে সক্ষম হবে।

উপসংহার

মধুসূদনের আত্ম-বিলাপ মানুষের ব্যক্তিগত ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার করুণ সুর বাজায়, আর ফররুখ আহমদের সাত সাগরের মাঝি একটি পরাধীন জাতিকে আত্মমর্যাদার মহা বিজয়ের দিকে ধাবিত করে।

৮। যে-কোনো দুটি প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর দাও: (ক) ‘আকাঙ্ক্ষার ধন নহে আত্মা মানবের’ বলতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কী বুঝিয়েছেন? (খ) কাজী নজরুল ইসলামের ‘মহররম’ কবিতায় কোন কোন চরিত্রের নাম আছে? (গ) বনলতা সেনের চোখকে কবি পাখির নীড়ের সাথে তুলনা করেছেন কেন? (ঘ) বাংলার অপরূপ সৌন্দর্যকে কবি কীসের সাথে তুলনা করেছেন?

[রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিক দর্শন, নজরুলের ‘মহররম’, জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’ ও রূপসী বাংলার রূপকল্পের সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ]

[মান: ১০ (৫ × ২)]

(ক) ‘আকাঙ্ক্ষার ধন নহে আত্মা মানবের’ বলতে রবীন্দ্রনাথের ব্যাখ্যা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর আধ্যাত্মিক ভাবনাসমৃদ্ধ কবিতায় মানবাত্মার অনন্ত মহিমা তুলে ধরেছেন। মানুষের আত্মা কোনো পার্থিব ধন-সম্পদ, ভোগ-বিলাসিতা বা ক্ষুদ্র জৈবিক লালসা দিয়ে তৃপ্ত হতে পারে না। পার্থিব জগতের যাবতীয় বস্তুগত প্রাপ্তি হলো সীমাবদ্ধ; কিন্তু মানবাত্মা হলো অনন্ত অসীমের অংশ। তাই সোনা-দানা, বাড়ি-গাড়ি বা ইন্দ্রিয়সুখের ক্ষুদ্র গণ্ডিতে আত্মাকে কখনোই তৃপ্ত করা সম্ভব নয়। আত্মা মূলত ভূমার (পরম সত্য ও পরমাত্মার) সাথে মিলনের অনন্ত আকাঙ্ক্ষী। জাগতিক আকাঙ্ক্ষার তুচ্ছ বস্তু দিয়ে যে আত্মাকে বেঁধে রাখা যায় না—রবীন্দ্রনাথ এই গভীর সত্যটিই আলোচ্য চরণে চমৎকারভাবে ব্যক্ত করেছেন।

(খ) কাজী নজরুল ইসলামের ‘মহররম’ কবিতায় উল্লেখিত চরিত্রসমূহ

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত শোক ও সংগ্রামের কালজয়ী কবিতা ‘মহররম’-এ ঐতিহাসিক কারবালার প্রান্তরের বীর শহীদ ও ঘটনার সাথে জড়িত চরিত্রসমূহের নাম গভীর আবেগ ও শ্রদ্ধার সাথে উল্লেখিত হয়েছে। কবিতায় বর্ণিত প্রধান চরিত্রসমূহ হলো:

  • ইমাম হোসাইন (রা.): সত্য ও ইনসাফের প্রতীক, কারবালার মহান প্রধান শহীদ।
  • ইমাম হাসান (রা.): বিষপানে শহীদ নবীজীর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র।
  • হযরত আলী (রা.) ও মা ফাতেমা (রা.): আহলে বাইতের মহান কাণ্ডারী ও জান্নাতী নারী।
  • হযরত কাসেম (রা.): কারবালার বীর কিশোর শহীদ বর।
  • আলী আসগর (রা.): ইমাম হোসাইনের ছয় মাসের কচি শিশু শহীদ।
  • শিমার ও এজিদ: নিষ্ঠুরতা, বিশ্বাসঘাতকতা ও অসত্যের কুখ্যাত খলনায়ক।

(গ) বনলতা সেনের চোখকে কবি পাখির নীড়ের সাথে তুলনা করেছেন কেন?

আধুনিক বাংলা কবিতার বরপুত্র জীবনানন্দ দাশ তাঁর সুবিখ্যাত ‘বনলতা সেন’ কবিতায় বনলতা সেনের চোখকে ‘পাখির নীড়ের মতো চোখ’ বলে এক অনুপম রূপকল্প সৃষ্টি করেছেন। পাখি যেমন সারাদিন উন্মুক্ত আকাশে ঝড়ের মুখে ক্লান্ত হয়ে ডানা ঝাপটিয়ে দিনশেষে স্বস্তির জন্য নিজের আশ্রয়ের নীড়ে ফিরে আসে এবং পরম নিরাপত্তা লাভ করে; তেমনি কবিও হাজার বছর ধরে পৃথিবীর সিংহল সমুদ্র থেকে মালয় সাগরে জীবনের ক্লান্তি ও অন্ধকারময় বিষাদের পথে ঘুরেছেন। জীবনের সেই চরম একাকীত্ব, ক্লান্তি ও অস্থিরতার মধ্যে একমাত্র নাটোরের বনলতা সেনই তাঁর স্নেহময় দুটি চোখ দিয়ে কবিকে এক পরম প্রশান্তি, বিশ্রাম ও ভালোবাসার নিবিড় আশ্রয় দান করেছিলেন। পাখির নীড় যেমন আশ্রয়ের প্রতীক, বনলতার চোখও কবির ক্লান্ত প্রাণের জন্য তেমনই পরম সান্ত্বনার নীড়।

(ঘ) বাংলার অপরূপ সৌন্দর্যকে কবি কীসের সাথে তুলনা করেছেন?

রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ তাঁর কবিতায় বাংলার শ্যামল ও স্নিগ্ধ সৌন্দর্যকে কোনো কৃত্রিম স্বর্গ বা বিজাতীয় আভিজাত্যের সাথে তুলনা করেননি; বরং তিনি তুলনা করেছেন বাংলার চিরন্তন চিরায়ত অনুষঙ্গসমূহের সাথে। তিনি বাংলার রূপকে তুলনা করেছেন লক্ষ্মীপেঁচার ডানা, শঙ্খচিল, ধানসিঁড়ি নদীর নরম স্রোত, ডুমুরের শাখা, কার্তিকের নবান্নের ধান, হিজল-তমালের বন এবং ভোরের রোদে ভেজা ঘাসের শিশিরের স্নিগ্ধতার সাথে। কবি স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন—পৃথিবীর কোথাও এমন রূপ নেই; বাংলার এই স্নিগ্ধ শ্যামলিমার মধ্যেই তিনি বিশ্বসৌন্দর্যের পরম রূপ প্রত্যক্ষ করেছেন।

উপসংহার

এই সংক্ষিপ্ত উত্তরসমূহ বাংলা কবিতার ভাবগাম্ভীর্য, ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি এবং রোমান্টিক রূপকল্পের অনন্য উচ্চতাকে উন্মোচিত করে।

৯। প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ব্যাখ্যা লেখো (যে-কোনো একটি): (ক) আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন। (খ) সাত সাগরের মাঝি চেয়ে দেখো দুয়ারে ডাকে জাহাজ।

[জীবনানন্দ দাশের অস্তিত্ববাদী ক্লান্তি এবং ফররুখ আহমদের রেনেসাঁ চেতনার সপ্রসঙ্গ ব্যাখ্যা]

[মান: ৫]

(ক) “আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন।”

  • উৎস ও প্রসঙ্গ: আলোচ্য চরণটি পরাবাস্তববাদী কবি জীবনানন্দ দাশের অমর প্রেমের কবিতা ‘বনলতা সেন’ থেকে চয়ন করা হয়েছে। কবির হাজার বছরের ঐতিহাসিক পরিভ্রমণ এবং আধুনিক জীবনের অস্তিত্ব সংকট বোঝাতে তিনি এই পঙ্‌ক্তিটি ব্যবহার করেছেন।
  • মূলভাব: পার্থিব জীবনের অবিরাম সংগ্রাম, যুদ্ধ ও অস্থিরতার মহাসমুদ্রে কবি এক নিঃসঙ্গ ও চূড়ান্ত ক্লান্ত পরিব্রাজক।
  • বিশদ ব্যাখ্যা: কবি মানব ইতিহাসের সুদীর্ঘ পথচলায় বিদিশার অন্ধকার থেকে শুরু করে শ্রাবস্তীর ধূসর নগরী পর্যন্ত পরিভ্রমণ করেছেন। কিন্তু এই দীর্ঘ পথচলায় তিনি যা দেখেছেন তা হলো যুদ্ধ, ধ্বংস, মহামারী ও মানুষের স্বার্থের অন্ধ উন্মাদনা। জীবনের চারপাশের এই অস্থিরতাকে তিনি ফেনিল সমুদ্রের (সমুদ্র সফেন) উত্তাল ঢেউয়ের সাথে তুলনা করেছেন—যেখানে প্রতিটি মানুষ বেঁচে থাকার তাগিদে হাবুডুবু খাচ্ছে। এই অবিরাম ঘাত-প্রতিঘাতে কবির আত্মা চরমভাবে পরিশ্রান্ত ও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছে। জীবনের এই তীব্র বিষাদ ও নিঃসঙ্গতার মাঝে তিনি এক ফোঁটা শান্তির জন্য ব্যাকুল।
  • মন্তব্য: আধুনিক মানুষের অন্তহীন মানসিক ক্লান্তি ও আত্মিক শূন্যতার এক চিরন্তন শৈল্পিক প্রতিচ্ছবি এই চরণটি।

(খ) “সাত সাগরের মাঝি চেয়ে দেখো দুয়ারে ডাকে জাহাজ।”

  • উৎস ও প্রসঙ্গ: উদ্ধৃত জাগরণমূলক চরণটি মুসলিম পুনর্জাগরণের কবি ফররুখ আহমদ রচিত বিখ্যাত রূপক কবিতা ‘সাত সাগরের মাঝি’ থেকে সংগৃহীত হয়েছে। ঘুমন্ত ও নির্লিপ্ত মুসলিম সমাজকে তাদের গৌরবময় অতীত ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানাতে কবি এই কথা বলেছেন।
  • মূলভাব: অলসতার নিদ্রা ভেঙে নতুন যুগে সত্য ও ন্যায়ের ঝাণ্ডা নিয়ে সমুদ্র অভিযানে নামার শুভলগ্ন উপস্থিত হয়েছে।
  • বিশদ ব্যাখ্যা: কবি ভারতীয় মুসলিমদের এক ঘুমন্ত মাঝির সাথে তুলনা করেছেন, যে অতীতের ঝড়ের ভয়ে বন্দরে নিজের জাহাজ বেঁধে রেখে আজ অলস সময় কাটাচ্ছে। কবি তাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দিয়ে বলছেন—আকাশের মেঘ ও কুয়াশা কেটে গেছে, সূর্য উঠেছে, নতুন সম্ভাবনার ঢেউ সাগরে আছড়ে পড়ছে। সমুদ্র জয়ের সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করে বিজয়ের জাহাজ আজ তার দরজায় এসে ডাকছে। এখন আর ঘরে বসে থাকার বা অতীতের দুঃখে শোক প্রকাশ করার সময় নেই; বরং নোঙর তুলে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের জন্য এখনই মহাসমুদ্রে পাড়ি জমাতে হবে।
  • মন্তব্য: পরাধীন জাতিকে আত্মপ্রত্যয়ী ও কর্মচঞ্চল করে তোলার এক অপূর্ব উদ্দীপনামূলক ডাক এই বাক্যাংশটি।

উপসংহার

উভয় উদ্ধৃতিই বাংলা কবিতার দুই বিপরীতমুখী শক্তির উজ্জ্বল প্রকাশ—একটি মানুষের অন্তর্লীন ক্লান্তি ও প্রশান্তির সন্ধান, অন্যটি জাতিকে জাগিয়ে তোলার অদম্য বিপ্লবের আহ্বান।

১০। যে-কোনো পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দাও: (ক) বাংলা শব্দগঠনের প্রক্রিয়া, (খ) প্রমিত বানানের নিয়ম, (গ) সন্ধি ও সমাসের পার্থক্য, (ঘ) উপসর্গের অর্থবাচকতা ও অর্থদ্যোতকতা, (ঙ) ব্যাসবাক্যসহ সমাস, (চ) প্রকৃতি-প্রত্যয়, (ছ) ভাব-সম্প্রসারণ, (জ) সহকারী শিক্ষক পদের আবেদনপত্র।

[বাংলা ব্যাকরণ ও প্রায়োগিক নির্মিতি অংশের পূর্ণাঙ্গ ও প্রামাণ্য সমাধান]

[মান: ২৫ (৫ × ৫)]

(ক) বাংলা শব্দগঠনের প্রধান প্রধান প্রক্রিয়া

বাংলা ভাষায় নতুন নতুন শব্দ তৈরি হয়ে ভাষার শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ হওয়ার সুনির্দিষ্ট কিছু ভাষাতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া রয়েছে। প্রধান প্রক্রিয়াগুলো নিম্নরূপ:

  • ১. উপসর্গযোগে: মূল শব্দের পূর্বে উপসর্গ যুক্ত হয়ে নতুন অর্থ তৈরি করে। যেমন: প্র + হার = প্রহার; অপ + মান = অপমান।
  • ২. প্রত্যয়যোগে: ধাতু বা শব্দের শেষে প্রত্যয় যুক্ত হয়ে শব্দ গঠিত হয়। যেমন: কৃ + তব্য = কর্তব্য; ঢাকা + আই = ঢাকাই।
  • ৩. সমাসের সাহায্যে: দুই বা ততোধিক পদ এক পদে মিলিত হয়ে নতুন শব্দ গঠন করে। যেমন: সিংহ চিহ্নিত আসন = সিংহাসন; নীল যে পদ্ম = নীলপদ্ম।
  • ৪. সন্ধির মাধ্যমে: দুটি ধ্বনির মিলনে শব্দ গঠিত হয়। যেমন: বিদ্যা + আলয় = বিদ্যালয়; পরি + ঈক্ষা = পরীক্ষা।
  • ৫. পদ পরিবর্তনের মাধ্যমে: বিশেষ্য থেকে বিশেষণ বা তদ্বিপরীত রূপান্তর। যেমন: দিন > দৈনিক; মানব > মানবিক।

(খ) বাংলা একাডেমির প্রমিত বাংলা বানানের পাঁচটি নিয়ম

  • ১. সকল অতৎসম (তদ্ভব, দেশি, বিদেশি ও মিশ্র) শব্দে কেবল হ্রস্ব ‘ই’ (ি) বা হ্রস্ব ‘উ’ (ু) এবং এদের কারচিহ্ন ব্যবহৃত হবে; দীর্ঘ ‘ঈ’ বা দীর্ঘ ‘ঊ’ হবে না। যেমন: গাড়ি, শাড়ি, বাড়ি, চুন, পুজো।
  • ২. ভাষা ও জাতিবাচক নামে সর্বদা হ্রস্ব ‘ই’-কার হবে। যেমন: জাপানি, ইরানি, আরবি, ইংরেজি, বাঙালি।
  • ৩. যুক্তবর্ণে ক্ষ-এর স্থানে ‘খ’ বা ‘ক্ষ’ হবে না এবং রেফের পর কোনো ব্যঞ্জনবর্ণের দ্বিত্ব হবে না। যেমন: কর্ম (কর্ম্ম নয়), সূর্য (সূর্য্য নয়), ধর্ম (ধর্ম্ম নয়)।
  • ৪. শব্দের শেষে বিসর্গ (ঃ) বর্জন করতে হবে। যেমন: মূলত (মূলতঃ নয়), প্রথমত (প্রথমতঃ নয়), প্রায়শ (প্রায়শঃ নয়)।
  • ৫. ‘আলি’ প্রত্যয়যুক্ত শব্দে সর্বদা হ্রস্ব ‘ই’-কার হবে। যেমন: সোনালি, রুপালি, বর্ণালি, অঞ্জলি, পুবালি।

(গ) সন্ধি ও সমাসের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য

পার্থক্যমূলক দিক সন্ধি সমাস
১. মূল মিলন সন্ধি হলো মূলত দুটি ধ্বনির মিলন (ধ্বন্যাত্মক প্রক্রিয়া)। সমাস হলো মূলত একাধিক পদের একপদীকরণ (পদঘটিত প্রক্রিয়া)।
২. অর্থের প্রাধান্য সন্ধিতে ধ্বনিমাধুর্য ও উচ্চারণের সহজতাই মূল লক্ষ্য। সমাসে অর্থসঙ্গতি ও সংক্ষেপণই মূল উদ্দেশ্য।
৩. বিভক্তির ভূমিকা সন্ধিতে বিভক্তি লোপের কোনো সম্পর্ক নেই। অধিকাংশ সমাসে পূর্বপদের বিভক্তি লোপ পায় (অলোক ব্যতীত)।
৪. পদক্রম সন্ধিতে ধ্বনির স্বাভাবিক ক্রম অক্ষুণ্ণ থাকে। সমাসে ব্যাসবাক্যের পদের অবস্থান মাঝে মাঝে পরিবর্তিত হতে পারে।
দৃষ্টান্ত বিদ্যা + আলয় = বিদ্যালয় বিদ্যার নিমিত্ত আলয় = বিদ্যালয়

(ঘ) “উপসর্গের অর্থবাচকতা নেই কিন্তু অর্থদ্যোতকতা আছে”-ব্যাখ্যা

উপসর্গ হলো এমন কিছু অব্যয়সূচক শব্দাংশ যা স্বাধীনভাবে বাক্যে ব্যবহৃত হতে পারে না এবং এদের নিজস্ব কোনো স্বকীয় অর্থ প্রকাশ করার ক্ষমতা নেই (অর্থাৎ অর্থবাচকতা নেই)। যেমন: ‘প্র’, ‘অপ’, ‘উপ’, ‘নি’—এদের আলাদা কোনো অর্থ নেই। কিন্তু যখন এই উপসর্গগুলো অন্য কোনো অর্থপূর্ণ মূল শব্দের পূর্বে যুক্ত হয়, তখন তারা মূল শব্দের অর্থের সংকোচন, প্রসারণ, পরিবর্তন বা নতুন দ্যোতনা সৃষ্টি করতে পারে (অর্থাৎ অর্থদ্যোতকতা প্রকাশ করে)। যেমন ‘হার’ একটি মূল শব্দ যার অর্থ গলার মালা বা পরাজয়। এর পূর্বে বিভিন্ন উপসর্গ যুক্ত হয়ে সম্পূর্ণ নতুন নতুন অর্থ তৈরি হয়:

  • প্র + হার = প্রহার (মারধর করা)
  • আ + হার = আহার (ভোজন করা)
  • উপ + হার = উপহার (উপঢৌকন)
  • পরি + হার = পরিহার (বর্জন করা)

সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, উপসর্গের নিজস্ব কোনো অর্থবাচকতা না থাকলেও অন্য শব্দের পূর্বে বসে নতুন অর্থ সৃষ্টির অপূর্ব অর্থদ্যোতকতা শক্তি রয়েছে।

(ঙ) ব্যাসবাক্যসহ সমাস নির্ণয় (প্রশ্নোক্ত পদসমূহ)

প্রদত্ত শব্দ ব্যাসবাক্য সমাসের নাম
উপভাষা ভাষার সদৃশ অব্যয়ীভাব সমাস
কুসুমকোমল কুসুমের ন্যায় কোমল উপমান কর্মধারয় সমাস
চৌচির চারিদিকে চির যার বহুব্রীহি সমাস
ডাকঘর ডাকের নিমিত্ত ঘর চতুর্থী তৎপুরুষ সমাস
দেশান্তর অন্য দেশ নিত্য সমাস
হাতাহাতি হাতে হাতে যে যুদ্ধ ব্যতিহার বহুব্রীহি সমাস
নীলাকাশ নীল যে আকাশ সাধারণ কর্মধারয় সমাস
বর্ণচোরা বর্ণ চুরি করে যে উপপদ তৎপুরুষ সমাস

(চ) প্রকৃতি ও প্রত্যয় নির্ণয় (প্রশ্নোক্ত পদসমূহ)

প্রদত্ত শব্দ প্রকৃতি ও প্রত্যয় প্রত্যয়ের নাম
অন্তিম অন্ত + ইম তদ্ধিত প্রত্যয়
ঈশ্বর ঈশ্ + বর (ওর) কৃৎ প্রত্যয়
গ্রামীণ গ্রাম + ঈন তদ্ধিত প্রত্যয়
জেলে জাল + ইয়া > এ তদ্ধিত প্রত্যয়
দর্পণ দৃপ্ + অন কৃৎ প্রত্যয়
দৈনিক দিন + ইক (ষ্ণিক) তদ্ধিত প্রত্যয়
দখিনা দক্ষিণ + আ তদ্ধিত প্রত্যয়
মেধাবী মেধা + বিন্ (বী) তদ্ধিত প্রত্যয়

(ছ) ভাব-সম্প্রসারণ: প্রয়োজনীয়তাই উদ্ভাবনের জনক

মূলভাব: মানুষের অভাববোধ এবং বেঁচে থাকার তাগিদই হলো পৃথিবীর সমস্ত বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, জ্ঞান এবং সভ্যতার নিত্যনতুন আবিষ্কারের মূল উৎস।

ভাব-সম্প্রসারণ: সৃষ্টিজগতের সূচনালগ্ন থেকেই মানুষ বহুবিধ প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছে। মানুষ যখন যা চেয়েছে তা সহজে পায়নি বলেই তাকে ভাবতে হয়েছে এবং বিকল্প পথ খুঁজতে হয়েছে। আদিম যুগে বন্য পশুর আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার তাগিদেই মানুষ পাথর ঘষে আগুন জ্বালাতে শিখেছিল এবং তীর-ধনুক আবিষ্কার করেছিল। রোদে পোড়া ও শীতে কাঁপার অভাববোধ থেকেই কাপড়ের উদ্ভাবন ঘটেছে। দূরপাল্লার পথ সহজে অতিক্রমের প্রয়োজনীয়তা থেকেই চাকা, ঘোড়ার গাড়ি এবং পরবর্তীতে রেলগাড়ি, মোটরগাড়ি ও উড়োজাহাজ আবিষ্কৃত হয়েছে। ঠিক তেমনি অন্ধকার দূর করার তাগিদে বৈদ্যুতিক বাতি এবং দূর-দূরান্তের খবরাখবর দ্রুত পাওয়ার তীব্র তাগিদ থেকেই টেলিফোন, ইন্টারনেট ও কম্পিউটারের অবিস্মরণীয় বিপ্লব ঘটেছে। অভাব বা প্রয়োজন না থাকলে মানুষ কখনো অলস মস্তিষ্কে নতুন কিছু সৃষ্টি করার কঠিন সাধনায় ব্রতী হতো না। সংকটই মানুষকে উদ্ভাবনী শক্তির চূড়ায় নিয়ে যায়।

মন্তব্য: মানব সভ্যতার প্রতিটি অগ্রগতি মানুষের তীব্র প্রয়োজনেরই সার্থক ফসল।

(জ) প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে চাকরির জন্য আবেদনপত্র

তারিখ: ১৫ অক্টোবর ২০২৪
বরাবর,
সভাপতি / জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়, ঢাকা।
বিষয়: প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ‘সহকারী শিক্ষক’ পদে নিয়োগের জন্য আবেদন।

মহোদয়,
বিনীত নিবেদন এই যে, গত ১০ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে দৈনিক ‘ইত্তেফাক’ পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে অবগত হলাম যে, আপনার আওতাধীন প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহে শূন্যপদে কিছুসংখ্যক ‘সহকারী শিক্ষক’ নিয়োগ করা হবে। আমি উক্ত পদের একজন আগ্রহী প্রার্থী হিসেবে আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা ও জীবনবৃত্তান্ত আপনার সদয় বিবেচনার জন্য পেশ করছি:

  • ১. প্রার্থীর নাম: মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ
  • ২. পিতার নাম: মুহাম্মদ আব্দুর রহমান
  • ৩. মাতার নাম: মোসাম্মৎ ফাতেমা বেগম
  • ৪. বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: আনন্দপুর, ডাকঘর: সোনাপুর, উপজেলা ও জেলা: ঢাকা।
  • ৫. জন্মতারিখ ও বয়স: ০১ জানুয়ারি ১৯৯৯ (বয়স ২৫ বছর ৯ মাস)।
  • ৬. জাতীয়তা: বাংলাদেশি (জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর: ১৯১XXXXXXXXXX)।
  • ৭. শিক্ষাগত যোগ্যতা:
    • দাখিল / এসএসসি (বিজ্ঞান) – ২০১৮ – জিপিএ: ৫.০০
    • আলিম / এইচএসসি (সাধারণ) – ২০২০ – জিপিএ: ৫.০০
    • ফাযিল (স্নাতক) পাস – ২০২৩ – প্রথম বিভাগ (সিজিপিএ ৩.৭৫)

অতএব, মহোদয়ের সমীপে বিনীত প্রার্থনা, আমার উল্লেখিত শিক্ষাগত যোগ্যতা ও তথ্যাদি বিবেচনাপূর্বক আমাকে উক্ত পদের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দানে বাধিত করবেন।

নিবেদক,
(মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ)
সংযুক্তি: সকল সনদের সত্যায়িত কপি, নাগরিকত্ব সনদ ও ৩ কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি।

উপসংহার

ব্যাকরণ ও প্রায়োগিক নির্মিতির এই সুবিন্যস্ত চর্চা শিক্ষার্থীদের ভাষাগত দক্ষতা ও কর্মমুখী যোগ্যতাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

ফাযিল ১ম বর্ষ বাংলা আবশ্যিক ২০২৪ পরীক্ষার বিষয় কোড কত ছিল?

বিষয় কোড ছিল ১১১০০৪ (পরীক্ষা কোড: ৩০১) এবং পূর্ণমান ১০০ নম্বর। সময় ৩ ঘণ্টা।

বঙ্কিমচন্দ্রের মতে সর্বোৎকৃষ্ট গদ্যরীতি কোনটি?

যা সকলেই অনায়াসে বুঝতে পারে এবং পড়িবামাত্র যার অর্থ হৃদয়ঙ্গম হয়, তাহাই সর্বোৎকৃষ্ট রচনা।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সমাপ্তি’ গল্পের নায়িকা কে?

চঞ্চল ও স্বাধীনচেতা গ্রাম্য বালিকা ‘মৃন্ময়ী’, যে পরবর্তীতে গভীর ভালোবাসায় রূপান্তর লাভ করে।

‘সাত সাগরের মাঝি’ কবিতাটি কোন কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত?

মুসলিম রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদের বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘সাত সাগরের মাঝি’-এর নাম কবিতা।

উপসর্গের নিজস্ব অর্থ না থাকলেও কী ক্ষমতা রয়েছে?

উপসর্গের নিজস্ব কোনো অর্থবাচকতা নেই, কিন্তু অন্য শব্দের পূর্বে বসে নতুন অর্থ সৃষ্টির চমৎকার অর্থদ্যোতকতা রয়েছে।

‘বনলতা সেন’ কবিতায় বনলতার চোখকে কীসের সাথে তুলনা করা হয়েছে?

ক্লান্ত প্রাণের নিরাপদ আশ্রয় বোঝাতে ‘পাখির নীড়ের মতো চোখ’-এর সাথে তুলনা করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *