কামিল (স্নাতকোত্তর) হাদীস প্রথম পর্ব পরীক্ষা, ২০২৩
হাদীস বিভাগ (ষষ্ঠ পত্র)
বিষয়: আত-তারীখুল ইসলামী ওয়া তারীখু ইলমিল হাদীস [নতুন সিলেবাস অনুযায়ী]
বিষয় কোড: ৬১১১০৬ | পূর্ণমান: ১০০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
[الملاحظة : الأعداد بالهامش تدل على الدرجة الكاملة – দ্রষ্টব্য : বাম পাশে বর্ণিত সংখ্যা প্রশ্নের পূর্ণমান জ্ঞাপক।]
مجموعة (أ) – التاريخ الإسلامي : أجب عن أربعة من الأسئلة التالية (الدرجات : ٦٠ = ٤ × ١٥)
مجموعة (ب) – تاريخ علم الحديث : أجب عن اثنين من السؤال ٥ (الدرجات : ٣٠ = ٢ × ١٥) وعن اثنين من السؤال ٦ (الدرجات : ١٠ = ٢ × ٥)
مجموعة (أ) – التاريخ الإسلامي (মান: ১৫ × ৪ = ৬০)
١- ما هي الأسباب المحتملة للكف عن القتال قبل الهجرة؟ بين في ضوء السيرة النبوية للصلابي.
[১. হিজরতপূর্ব মাক্কী জীবনে মুসলমানদের যুদ্ধ না করার সম্ভাব্য কারণগুলো কী ছিল? ড. আলী মুহাম্মদ আস-সাল্লাবী রচিত ‘আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ’-এর আলোকে বিস্তারিত আলোচনা কর।]
ভূমিকা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় সুদীর্ঘ ১৩ বছর তাওহীদের দাওয়াত প্রদান করেন। এ সময়ে কাফের কুরাইশরা সাহাবায়ে কেরামের ওপর অবর্ণনীয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়েছে; হযরত সুমাইয়া ও ইয়াসির (রা.)-কে নির্মমভাবে শহীদ করেছে। সাহাবাগণ আত্মরক্ষার্থে যুদ্ধের অনুমতি প্রার্থনা করলেও রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের ধৈর্য ধারণের নির্দেশ দিয়ে বলতেন: “اصبروا فإني لم أومر بقتال” (তোমরা ধৈর্য ধর, কারণ আমাকে যুদ্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়নি)। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ড. আলী মুহাম্মদ আস-সাল্লাবী তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: আরদুন ওয়াক্বায়ে’ ওয়া তাহলীলু আহদাছ’-এ হিজরতপূর্ব যুগে যুদ্ধ না করার পেছনে গভীর প্রজ্ঞাময় ও বাস্তবসম্মত কারণ বিশ্লেষণ করেছেন।
ড. আস-সাল্লাবীর আলোকে যুদ্ধ না করার সম্ভাব্য মৌলিক কারণসমূহ:
১. ঈমানী তারবিয়াত ও আত্মিক বিশুদ্ধতা অর্জন (التربية الإيمانية): মাক্কী জীবনের মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের হৃদয় থেকে জাহেলিয়াত ও শিরকের শিকড় উপড়ে ফেলে খাঁটি তাওহীদ ও তাকওয়া প্রতিষ্ঠা করা। আত্মসংযম, বিনয় ও চরম বিপদে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল অর্জনের পূর্বে সামরিক অভিযান শুরু করলে মানুষ বৈষয়িক ক্ষমতা বা প্রতিশোধের মোহে পরিচালিত হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
২. মক্কার ভৌগোলিক ও সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা: মক্কায় মুসলমান ও মুশরিকরা একই পরিবার ও গোত্রের মধ্যে বসবাস করত। সেখানে যুদ্ধ শুরু হলে প্রতিটি ঘরে পিতা-পুত্র ও ভাইয়ে ভাইয়ে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ বেধে যেত; ফলে সাধারণ আরবরা মনে করত যে ইসলাম পারিবারিক বন্ধন ছিন্ন করার এক রক্তক্ষয়ী ফিতনা।
৩. সংখ্যার স্বল্পতা ও সামরিক শক্তির অপর্যাপ্ততা: মক্কায় মুসলমানদের সংখ্যা ছিল অত্যন্ত সীমিত এবং তাঁদের কোনো নির্দিষ্ট সুরক্ষিত ভৌগোলিক ভূখণ্ড (Base) বা নিজস্ব দুর্গ ছিল না। এ অবস্থায় মক্কার শক্তিশালী সম্মিলিত কুরাইশ বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করলে প্রাথমিক মুসলিম জামাআত সমূলে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার বাস্তব আশঙ্কা ছিল।
৪. পবিত্র কা’বার মর্যাদা ও হারামের পবিত্রতা রক্ষা: মক্কা ছিল আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক ঘোষিত নিরাপদ অভয়ারণ্য (حرم آمن)। ইসলাম শুরু থেকেই এই পবিত্র ভূমির রক্তপাতহীনতা ও শান্তি সুরক্ষাকে বিশেষ সম্মান জানিয়েছে।
৫. শান্তিপূর্ণ দাওয়াত ও নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ: কোনো প্রকার অস্ত্র ছাড়া কেবল চারিত্রিক সৌন্দর্য, সত্যবাদিতা ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে যে বিপ্লব সাধিত হয়, তা মানুষের অন্তরে স্থায়ী প্রভাব ফেলে। কুরাইশদের অত্যাচারের বিপরীতে সাহাবাদের নীরব সহনশীলতা নিরপেক্ষ মক্কাবাসীদের অন্তরে ইসলামের প্রতি সহানুভূতি ও শ্রদ্ধাবোধ সৃষ্টি করেছিল।
উপসংহার:
অতএব, মাক্কী জীবনে যুদ্ধ বর্জন কোনো কাপুরুষতা বা দুর্বলতা ছিল না; বরং তা ছিল নবুওয়াতী দূরদর্শিতা ও আল্লাহ তা’আলার মহা প্রজ্ঞাপূর্ণ কৌশল। পরবর্তীতে মদীনায় স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং পূর্ণ শক্তি অর্জনের পর আত্মরক্ষা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আল্লাহ তা’আলা সূরা আল-হজ্জের ৩৯ নম্বর আয়াতে জিহাদের অনুমতি প্রদান করেন—”أذن للذين يقاتلون بأنهم ظلموا وان الله على نصرهم لقدير”।
٢- ما خلفية غزوة الأحزاب؟ تحدث عن البراعة الحربية التي دافع بها رسول الله صلى الله عليه وسلم الأعداء موضحا.
[২. আহযাব (খন্দক) যুদ্ধের ঐতিহাসিক পটভূমি কী ছিল? সম্মিলিত শত্রুবাহিনীকে প্রতিহত করতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে অসাধারণ রণদক্ষতা ও সামরিক কৌশল প্রদর্শন করেছিলেন তা বিশদভাবে আলোচনা কর।]
আহযাব যুদ্ধের ঐতিহাসিক পটভূমি (خلفية غزوة الأحزاب):
হিজরী ৫ম সনের শাওয়াল মাসে খন্দক বা আহযাব যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ‘আহযাব’ শব্দের অর্থ সম্মিলিত দলসমূহ। এ যুদ্ধের মূল রূপকার ছিল মদীনা থেকে বিতাড়িত বিশ্বাসঘাতক ইহুদী গোত্র বনু নাযীর। বনু নাযীরের নেতা হুয়াই ইবনে আখতাব ও সালাম ইবনে আবিল হুক্বাইক মক্কায় গিয়ে কুরাইশদের এবং নজদে গিয়ে গাতফান, বনু আসাদ ও অন্যান্য আরব গোত্রকে মদীনা আক্রমণ করে মুসলমানদের চিরতরে নিশ্চিহ্ন করার জন্য প্ররোচিত করে। তারা বিপুল আর্থিক লোভ দেখিয়ে প্রায় দশ হাজার (১০,০০০) সুসজ্জিত দুর্ধর্ষ সৈন্যের এক বিরাট যৌথবাহিনী গঠন করে মদীনা অভিমুখে যাত্রা করে। মদীনার ইতিহাসে এটিই ছিল তৎকালীন সময়ের সর্ববৃহৎ সামরিক আগ্রাসন।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অসাধারণ রণকৌশল ও সামরিক দক্ষতা:
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্মিলিত শত্রুর বিশালতা উপলব্ধি করে সমকালীন আরবের প্রচলিত যুদ্ধরীতির বাইরে যুগান্তকারী রণকৌশল অবলম্বন করেন:
১. পরামর্শ সভা ও খন্দক খননের সিদ্ধান্ত: নবীজী (সা.) সাহাবাদের নিয়ে জরুরি সামরিক মাশওয়ারা আহ্বান করেন। পারস্যের রণকৌশলে অভিজ্ঞ সাহাবী হযরত সালমান ফারসী (রা.) মদীনার উন্মুক্ত উত্তর সীমান্তে পরিখা (خندق) খননের প্রস্তাব দেন। আরবের ইতিহাসে পরিখা খননের কৌশল ছিল সম্পূর্ণ অভূতপূর্ব ও চমকপ্রদ।
২. স্বয়ং পরিখা খননে নেতৃত্ব ও অনুপ্রেরণা: মদীনার তিন দিক পাহাড়, বাড়িঘর ও খেজুর বাগান দিয়ে প্রাকৃতিকভাবে সুরক্ষিত থাকায় কেবল উত্তর প্রান্ত উন্মুক্ত ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবাদের সাথে স্বহস্তে কোদাল চালিয়ে তীব্র শীত ও ক্ষুধার মধ্যে দীর্ঘ প্রায় সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং গভীর পরিখা মাত্র ২০ দিনে খনন সম্পন্ন করেন। এতে মুসলিম বাহিনীর মনোবল আকাশচুম্বী হয়।
৩. শত্রুর বিস্ময় ও অবরোধ প্রতিহতকরণ: কুরাইশ ও তাদের মিত্ররা মদীনায় এসে পরিখা দেখে হতবাক হয়ে যায়। আরবদের ঘোড়া এই পরিখা পার হতে অক্ষম হওয়ায় সরাসরি যুদ্ধ অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং তা দীর্ঘ এক মাসের দীর্ঘস্থায়ী অবরোধে পর্যবসিত হয়।
৪. মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ও কূটনৈতিক বুদ্ধিমত্তা (الحرب خدعة): যুদ্ধের চরম মুহূর্তে মদীনার ভেতরের ইহুদী গোত্র বনু কুরাইজা চুক্তি ভঙ্গ করে পেছন থেকে আক্রমণের ষড়যন্ত্র করে। রাসূলুল্লাহ (সা.) গোপনে নওমুসলিম সাহাবী হযরত নুআইম ইবনে মাসউদ (রা.)-এর মাধ্যমে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ পরিচালনা করেন। নুআইম (রা.) কুরাইশ ও বনু কুরাইজার মাঝে পারস্পরিক গভীর অবিশ্বাস ও সন্দেহের বীজ বপন করে তাদের ঐক্যে ফাটল ধরিয়ে দেন।
৫. আল্লাহর গায়েবী সাহায্য ও চূড়ান্ত বিজয়: রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিরবচ্ছিন্ন দোয়া এবং চমৎকার রণকৌশলের পর আল্লাহ তা’আলা শত্রুদের ওপর প্রচণ্ড হিমশীতল ঘূর্ণিঝড় ও ফেরেশতাদের সেনাদল প্রেরণ করেন। এতে তাদের তাঁবু উপড়ে যায়, হাঁড়ি-পাতিল উল্টে যায় এবং চরম আতঙ্কিত হয়ে আবু সুফিয়ান রাতের আঁধারে সৈন্য প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।
٣- اكتب نبذة من ترجمة عثمان بن عفان رضي الله عنه ثم بين دوره في تنمية الاقتصاد واستمرار الفتوحات.
[৩. তৃতীয় খলীফা হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর জীবনী সংক্ষেপে লেখ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বিজয়াভিযান অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বর্ণনা কর।]
হযরত উসমান (রা.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী:
হযরত উসমান ইবনে আফফান আল-উমাভী আল-কুরাশী (রা.) ৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে তায়েফে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কুরাইশ বংশের বনু উমাইয়া শাখার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান ছিলেন। ইসলামের প্রথম যুগে হযরত আবু বকর (রা.)-এর আহ্বানে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দুই কন্যা রুকাইয়্যাহ ও উম্মে কুলসুমকে একের পর এক বিবাহ করায় তাঁকে ‘যুন-নুরাইন’ (ذو النورين – দুই জ্যোতির অধিকারী) উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তিনি হাবশা ও মদীনায় দুইবার হিজরত করেন। তাবুক যুদ্ধে তিনি মুসলিম সেনাবাহিনীর এক-তৃতীয়াংশ সৈন্যের যাবতীয় রসদ ও অস্ত্র নিজ খরচে বহন করে ‘জাইশুল উসরাহ’ সজ্জিত করেন। হযরত উমরের শাহাদাতের পর ২৩ হিজরীতে তিনি মুসলমানদের তৃতীয় খলীফা নির্বাচিত হন এবং সুদীর্ঘ ১২ বছর শাসন পরিচালনা করেন। ৩৫ হিজরীর ১৮ই জিলহজ্ব ৮০ বছর বয়সে নিজ বাসভবনে কুরআন তিলাওয়াতরত অবস্থায় বিদ্রোহী সন্ত্রাসীদের হাতে তিনি নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করেন।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জনকল্যাণে অবদান:
হযরত উসমান (রা.) ছিলেন একজন দূরদর্শী ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদ। তাঁর আমলে ইসলামি খেলাফতের অর্থনীতিতে প্রভূত সমৃদ্ধি অর্জিত হয়:
১. বায়তুল মালের সম্প্রসারণ ও ভাতা বৃদ্ধি: মুসলিম নাগরিকদের জন্য নির্ধারিত রাষ্ট্রীয় ভাতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা হয়। সাধারণ জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি বিভিন্ন প্রদেশ থেকে শস্য আমদানির সুষম বণ্টন ব্যবস্থা গড়ে তোলেন।
২. কৃষি উন্নয়ন ও খাল খনন: অনুর্বর জমি আবাদের জন্য তিনি খাল ও সেচ ব্যবস্থা নির্মাণ করেন। মদীনার প্রাকৃতিক পানির অভাব দূর করতে শৈশবেই ‘বিরে রুমা’ ক্রয় করে ওয়াকফ করেছিলেন; খেলাফতকালে তা আরও সম্প্রসারিত করেন।
৩. বাজার তদারকি ও মুদ্রানীতি: তিনি স্বাধীন ব্যবসার প্রসার ঘটান এবং বাজারে সঠিক পরিমাপ ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন।
বিজয়াভিযানের ধারাবাহিকতা ও মুসলিম নৌবাহিনী প্রতিষ্ঠা:
হযরত উসমান (রা.)-এর ১২ বছরের শাসনামলে ইসলামি খেলাফতের সীমানা সর্বকালের রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পায়:
১. এশিয়া ও ককেশাস বিজয়: ইরান ও মধ্য এশিয়ার অবশিষ্ট অঞ্চল যেমন খোরাসান, নিশাপুর, তুর্কিস্তান, মার্ভ, কাবুল, সিজিস্তান এবং ককেশাস অঞ্চলের আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান সম্পূর্ণভাবে মুসলিম সাম্রাজ্যভুক্ত হয়।
২. উত্তর আফ্রিকা বিজয়: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সা’দ ইবনে আবি সারাহর নেতৃত্বে ত্রিপোলি, সাইরেনিকা ও সমগ্র বারকা অঞ্চল বিজিত হয়ে কার্থেজ পর্যন্ত ইসলামি পতাকা উড্ডীন হয়।
৩. প্রথম মুসলিম নৌবাহিনী গঠন: আমীর মুয়াবিয়া ও আব্দুল্লাহ ইবনে সা’দের অনুরোধে তিনি ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম রাজকীয় শক্তিশালী নৌবাহিনী (الأسطول البحري) গড়ে তোলেন। ২৮ হিজরীতে সাইপ্রাস (قبرص) দ্বীপ বিজিত হয় এবং ৩৪ হিজরীতে বিখ্যাত নৌযুদ্ধ ‘যাতুস সাওয়ারী’ (معركة ذات الصواري)-তে রোমান সম্রাট কনস্ট্যান্সের ৫০০ রণতরীর বিশাল নৌবহরকে মুসলিম নৌবাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে ভূমধ্যসাগরে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করে।
٤- ما خلفية غزوة صفين وما صارت إليه الأحوال بعدها؟ بين مفصلا.
[৪. সিফফীনের যুদ্ধের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট কী ছিল এবং যুদ্ধ পরবর্তী অবস্থা ও তাহকীমের পরিণতি কেমন ছিল? বিস্তারিত বর্ণনা কর।]
সিফফীন যুদ্ধের প্রেক্ষাপট (خلفية وقعة صفين):
হযরত উসমান (রা.)-এর মর্মান্তিক শাহাদাতের পর ৩৫ হিজরীতে হযরত আলী (রা.) চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে খেলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। সিরিয়ার গভর্নর হযরত মুয়াবিয়া (রা.) শর্তারোপ করেন যে, খেলাফতের আনুগত্যের পূর্বে খলীফা উসমানের হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার করে কিসাস কার্যকর করতে হবে। অন্যদিকে খলীফা হযরত আলী (রা.) যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, রাষ্ট্রযন্ত্র পুনর্গঠন ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব সুদৃঢ় হওয়ার পূর্বে লক্ষাধিক সৈন্যের বিশৃঙ্খল ভিড়ের মধ্য থেকে উসমান হত্যাকারীদের তাৎক্ষণিক শাস্তি দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। উভয় পক্ষের মধ্যে দীর্ঘ পত্রালাপ ও শান্তিদূত প্রেরণের মাধ্যমে রাজনৈতিক সমঝোতা ব্যর্থ হয়। অবশেষে ৩৭ হিজরীর সফর মাসে ইউফ্রেটিস নদীর পশ্চিম তীরে ‘সিফফীন’ (صفين) নামক প্রান্তরে আলী (রা.)-এর নেতৃত্বাধীন ইরাকী বাহিনী এবং মুয়াবিয়া (রা.)-এর সিরীয় বাহিনীর মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হয়।
যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি ও কুরআনের মাধ্যমে ফয়সালা (رفع المصاحف):
যুদ্ধের একপর্যায়ে মালিক আল-আশতারের নেতৃত্বে আলীর বাহিনী বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। এ সংকটজনক মুহূর্তে হযরত আমর ইবনুল আস (রা.)-এর পরামর্শে সিরীয় সৈন্যরা বর্শার অগ্রভাগে পবিত্র কুরআনের কপি বেঁধে ঘোষণা দেয়: “هذا كتاب الله بيننا وبينكم” (আমাদের ও তোমাদের মাঝে এই কুরআনই ফায়সালাকারী)। কুরআনের সম্মানার্থে আলী (রা.)-এর বাহিনীর অধিকাংশ কুরআন পাঠকারী সৈন্য যুদ্ধ বন্ধের জোর দাবি জানায়। ফলে আলী (রা.) অনিচ্ছা সত্ত্বেও যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করতে বাধ্য হন।
তাহকীম বা সালিশি ব্যবস্থা (التحكيم):
উভয় পক্ষের বিরোধ মীমাংসার জন্য দুজন সম্মানিত সালিশ নিযুক্ত করা হয়: আলী (রা.)-এর পক্ষে হযরত আবু মুসা আল-আশ’আরী (রা.) এবং মুয়াবিয়া (রা.)-এর পক্ষে হযরত আমর ইবনুল আস (রা.)। সিদ্ধান্ত হয় যে, আগামী রমযান মাসে দুমাতুল জান্দালে তারা কুরআন-সুন্নাহর আলোকে রায় ঘোষণা করবেন।
যুদ্ধ পরবর্তী পরিস্থিতি ও ফলাফল:
১. খারেজী সম্প্রদায়ের উদ্ভব: আলীর বাহিনীর প্রায় বারো হাজার সৈন্য সালিশি মেনে নেওয়ার তীব্র বিরোধিতা করে দলত্যাগ করে। তারা স্লোগান দেয়: “لا حكم إلا لله” (আল্লাহ ছাড়া কারও হুকুম চলে না)। পরবর্তীতে এরা ‘খারেজী’ (الخوارج) নামে এক চরমপন্থী সন্ত্রাসী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং মুসলমান সমাজে ব্যাপক ফেতনা ও রক্তপাত সৃষ্টি করে। অবশেষে আলী (রা.) নাহরাওয়ানের যুদ্ধে খারেজীদের দমন করেন।
২. রাজনৈতিক বিভাজন সুদৃঢ়করণ: তাহকীমের বৈঠক আশানুরূপ কার্যকর ফলাফল বয়ে আনতে পারেনি। ফলে কার্যত মুসলিম জাহানে দুটি রাজনৈতিক বলয় প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়—ইরাক ও পূর্বাঞ্চল খলীফা আলীর শাসনে এবং সিরিয়া ও মিশর মুয়াবিয়ার শাসনে থেকে যায়।
৩. হযরত আলীর শাহাদাত: ৪০ হিজরীর ১৭ই রমযান কুফার মসজিদে খারেজী ঘাতক আব্দুর রহমান ইবনে মুলজিমের বিষাক্ত তরবারির আঘাতে হযরত আলী (রা.) শাহাদাত বরণ করেন। এর মাধ্যমে খোলাফায়ে রাশেদীনের পুণ্যময় যুগের সমাপ্তি ঘটে।
٥- تحدث عن الفتوحات التي حازها المسلمون أيام خلافة معاوية رضي الله عنه.
[৫. হযরত আমীর মুয়াবিয়া (রা.)-এর শাসনামলে মুসলমানদের অর্জিত ঐতিহাসিক বিজয়সমূহ বিস্তারিত আলোচনা কর।]
হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর শাসনামলের পরিচয়:
৪১ হিজরীতে হযরত হাসান (রা.) উম্মতের ঐক্য ও রক্তপাত বন্ধের মহান স্বার্থে হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর অনুকূলে খেলাফতের দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। ইতিহাসে এই ঐতিহাসিক বছরকে ‘আমুল জামাআহ’ (عام الجماعة – ঐক্যের বছর) বলা হয়। ৪১ হিজরী থেকে ৬০ হিজরী পর্যন্ত সুদীর্ঘ ২০ বছর হযরত মুয়াবিয়া (রা.) অত্যন্ত বিচক্ষণতা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা (দাহিয়্যাহ) ও সফলতার সাথে ইসলামি সাম্রাজ্য পরিচালনা করেন। তাঁর আমলে গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটে অভ্যন্তরীণ শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বহিঃবিশ্বে ব্যাপক বিজয়াভিযান পরিচালিত হয়।
আমীর মুয়াবিয়া (রা.)-এর শাসনামলে অর্জিত প্রধান প্রধান বিজয়:
১. উত্তর আফ্রিকা বিজয় ও কাইরোয়ান নগরী প্রতিষ্ঠা: প্রখ্যাত বীর সেনাপতি ওকবা ইবনে নাফে’ আল-ফিহরী (রহ.)-এর নেতৃত্বে ৫০ হিজরীতে উত্তর আফ্রিকায় এক অভূতপূর্ব বিজয়াভিযান পরিচালিত হয়। ওকবা ইবনে নাফে’ তিউনিসিয়ায় ঐতিহাসিক ‘কাইরোয়ান’ (القيروان) সামরিক নগরী ও সুবিশাল জামে মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। এর মাধ্যমে উত্তর আফ্রিকায় রোমান আধিপত্য চিরতরে ধূলিসাৎ হয় এবং বারবার উপজাতিদের মাঝে ইসলাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
২. কনস্টান্টিনোপল (কুসতুনতুনিয়া) প্রথম ও দ্বিতীয় অবরোধ: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুসংবাদ হাসিলের উদ্দেশ্যে—”أول جيش من أمتي يغزون مدينة قيصر مغفور لهم”—হযরত মুয়াবিয়া (রা.) রোমান রাজধানী কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের জন্য ৪৯ ও ৫৪ হিজরীতে বিশাল নৌ ও স্থলবাহিনী প্রেরণ করেন। এ অভিযানে হযরত আবু আইয়ুব আনসারী, ইবনে উমর, ইবনে আব্বাস ও ইবনুয যুবাইর (রা.) অংশগ্রহণ করেন। হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রা.) সেখানে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে শহীদ হন এবং কনস্টান্টিনোপলের প্রাচীরের নিচে সমাহিত হন।
৩. খোরাসান ও মধ্য এশিয়া (মা ওরাউন নাহার) বিজয়: পারস্যের সীমান্ত পেরিয়ে সেনাপতি মুহাল্লাব ইবনে আবি সুফরা এবং যুবাইদ ইবনে যিয়াদ জাইহুন (আমু দরিয়া) নদী পার হয়ে বুখারা, সমরকন্দ, বলখ ও কাবুল পর্যন্ত ইসলামি পতাকা উড্ডীন করেন।
৪. সিন্ধু সীমান্তে অভিযান: ৪৪ হিজরীতে সেনাপতি মুহাল্লাব সিন্ধু ও বর্তমান পাকিস্তানের সীমান্ত অঞ্চল লাহোর পর্যন্ত সফল অভিযান পরিচালনা করেন, যা পরবর্তীকালে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের পথ সুগম করে।
৫. রোড্স ও ক্রীট দ্বীপ বিজয়: ৫৩ হিজরীতে মুসলিম শক্তিশালী নৌবাহিনী ভূমধ্যসাগরের কৌশলগত রোড্স (Rhodes) ও ক্রীট দ্বীপসমূহ জয় করে ইসলামি নৌ সাম্রাজ্যকে অপ্রতিরোধ্য করে তোলে।
٦- بين الأمن السياسي والاستقرار الاجتماعي أيام خلافة عمر بن عبد العزيز (رح).
[৬. উমাইয়া খলীফা হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ (রহ.)-এর শাসনামলের রাজনৈতিক নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার বিবরণ দাও।]
হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ (রহ.)-এর পরিচয় ও খেলাফত লাভ:
হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ (রহ.) ৯৯ হিজরীতে সুলাইমান ইবনে আব্দুল মালিকের মনোনয়নে উমাইয়া খেলাফতের মসনদে অধিষ্ঠিত হন। তাঁর মাতা ছিলেন হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর পৌত্রী উম্মে আসিম। তিনি ছিলেন খোলাফায়ে রাশেদীনের আদর্শের মূর্ত প্রতীক। সুদীর্ঘ রাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার মধ্যে তিনি পুনরায় খুলাফায়ে রাশেদীনের আদলে ইনসাফ, শুরা ও তাকওয়ার শাসন ফিরিয়ে আনায় উম্মতের সর্বসম্মত স্বীকৃতিতে তাঁকে ‘পঞ্চম খলীফায়ে রাশেদ’ (خامس الخلفاء الراشدين) হিসেবে গণ্য করা হয়।
রাজনৈতিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা (الأمن السياسي):
১. জুলুম ও স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ: ক্ষমতা গ্রহণের সাথে সাথেই তিনি উমাইয়া রাজপরিবারের অবৈধভাবে দখলকৃত সকল জমিজমা, সুরম্য প্রাসাদ ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে বায়তুল মালে জমা করেন। এমনকি নিজ স্ত্রী ফাতেমার মূল্যবান অলঙ্কারও রাষ্ট্রীয় কোষাগারে সমর্পণ করেন।
২. জালিম গভর্নরদের অপসারণ: হাজ্জাজ বিন ইউসুফের নিযুক্ত সকল অত্যাচারী কর্মকর্তাদের তাৎক্ষণিক বরখাস্ত করে তাদের স্থানে পরহেযগার, সৎ ও যোগ্য মুত্তাকী আলেমদের গভর্নর ও কাজী পদে নিয়োগ দেন।
৩. বিরোধীদের সাথে শান্তিপূর্ণ সংলাপ: খারেজী ও শিয়াদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ না করে তিনি তাদের নেতৃবৃন্দের সাথে গভীর দলীলভিত্তিক খোলামেলা ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংলাপে বসেন। তাঁর যুক্তির সামনে বহু খারেজী অস্ত্র সমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে এবং রাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটে।
৪. আহলে বাইতের মর্যাদা পুনর্বহাল: বনু উমাইয়ার আমলে জুমার খুতবায় হযরত আলী (রা.)-এর প্রতি যে অপবাদমূলক বক্তব্য দেওয়া হতো তা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে খুতবায় কুরআনের এই আয়াত চালু করেন—”إن الله يأمر بالعدل والإحسان وإيتاء ذي القربى”।
সামাজিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক বিপ্লব:
১. যাকাত দেওয়ার মতো দরিদ্র না থাকা: মাত্র দুই বছর পাঁচ মাসের শাসনামলে তাঁর সুষম অর্থনীতি ও ইনসাফের ফলে আরবে এমন এক বিপ্লব সাধিত হয় যে, যাকাতের অর্থ নিয়ে ধনীরা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরলেও যাকাত গ্রহণ করার মতো একজন অভাবী মিসকীনও খুঁজে পাওয়া যেত না।
২. নওমুসলিমদের জিজিয়া রহিতকরণ: কোনো ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করলেই তার ওপর থেকে জিজিয়া সম্পূর্ণ মওকুফ করে দেন। অর্থলোভী গভর্নররা রাজস্ব হ্রাসের অভিযোগ করলে তিনি ঐতিহাসিক বাণী দেন: “إن الله بعث محمدا هاديا ولم يبعثه جابيا” (নিশ্চয় আল্লাহ মুহাম্মদ সা.-কে পথপ্রদর্শক হিসেবে পাঠিয়েছেন, কর আদায়কারী দারোগা বানিয়ে পাঠাননি)।
৩. আইন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: বিচারকদের সর্বোচ্চ স্বাধীনতা প্রদান করেন এবং ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় কোনো আপস করেননি। এভাবে তাঁর সংক্ষিপ্ত শাসনকাল ইসলামি ইতিহাসে এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে আছে।
٧- كيف تم تأسيس الخلافة العباسية؟ بين مفصلا.
[৭. আব্বাসীয় খেলাফত কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল? এর ঐতিহাসিক পটভূমি ও উত্থানের বিস্তারিত বিবরণ দাও।]
আব্বাসীয় খেলাফত প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক পটভূমি:
উমাইয়া খেলাফতের শেষ ভাগে রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ কলহ, আরাম-আয়েশ, অনারব মুসলিমদের (মাওয়ালী) প্রতি চরম জাতিগত বৈষম্য এবং কারবালা পরবর্তী আহলে বাইতের প্রতি সাধারণ মুসলমানদের তীব্র সহানুভূতির কারণে উমাইয়া শাসনের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে। এই সুযোগকে অত্যন্ত সুকৌশলে কাজে লাগান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্মানিত চাচা হযরত আব্বাস (রা.)-এর বংশধরগণ। তাঁরা নিজেদের ‘দাওয়াতুল আব্বাসিয়্যাহ’ বা ‘আহলে বাইতের হকের পুনরুদ্ধারকারী’ (الرضا من آل محمد) হিসেবে পরিচয় দিয়ে উমাইয়াদের বিরুদ্ধে এক গোপন ও বৈপ্লবিক আন্দোলন গড়ে তোলেন।
আব্বাসীয় আন্দোলনের পর্যায়ক্রমিক বাস্তবায়ন:
১. গোপন প্রচার সেল গঠন (হুমাইমা ও খোরাসান): জর্ডানের মরুসীমান্তে অবস্থিত ‘হুমাইমা’ গ্রামকে আব্বাসী ইমাম মুহাম্মদ ইবনে আলী তাঁর আন্দোলনের মূল সদর দফতর বানান। আর প্রচারের উপযুক্ত ক্ষেত্র হিসেবে নির্বাচন করা হয় সুদূর খোরাসানকে; কারণ সেখানকার অনারব পারসিক মাওয়ালীরা উমাইয়াদের বৈষম্যের কারণে ক্ষুব্ধ ছিল।
২. আবু মুসলিম খোরাসানীর নেতৃত্ব ও সশস্ত্র বিপ্লব: ১২৯ হিজরীতে দূরদর্শী ও দুর্ধর্ষ সমরনায়ক আবু মুসলিম খোরাসানী প্রকাশ্যে কালো পতাকা (الرايات السود) উত্তোলন করে উমাইয়াদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তিনি দ্রুত মার্ভ, নিশাপুর ও সমগ্র খোরাসান উমাইয়াদের হাত থেকে দখল করে নেন।
৩. ইরাক অভিযান ও খেলাফত ঘোষণা: আবু মুসলিমের বাহিনী সেনাপতি কাহতাবার নেতৃত্বে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে ইরাকের দিকে ধাবিত হয়। ১৩২ হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসে আব্বাসী বাহিনী কুফা নগরী দখল করে। সেখানে কুফার জামে মসজিদে আবুল আব্বাস আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ (যিনি পরবর্তীতে ‘আস-সাফফাহ’ নামে খ্যাত হন) নিজেকে প্রথম আব্বাসী খলীফা হিসেবে ঘোষণা করেন।
৪. যাবের চূড়ান্ত যুদ্ধ (معركة الزاب الأكبر): ১৩২ হিজরীর জমাদিউল আখের মাসে উত্তর ইরাকের যাব নদীর তীরে উমাইয়াদের শেষ খলীফা দ্বিতীয় মারওয়ান এবং আব্বাসী সেনাপতি আব্দুল্লাহ ইবনে আলীর মধ্যে চূড়ান্ত যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মারওয়ানের বিশাল বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয় এবং মারওয়ান মিশরে পালিয়ে গিয়ে নিহত হন।
৫. উমাইয়া শাসনের অবসান ও নতুন সাম্রাজ্যের সূচনা: এর মাধ্যমে দীর্ঘ ৯০ বছরের উমাইয়া শাসনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে এবং ইসলামি সাম্রাজ্যে ৫২৪ বছরের সুদীর্ঘ আব্বাসীয় খেলাফতের সূচনা হয়। পরবর্তীতে খলীফা আবু জাফর আল-মানসুর بغداد (শান্তির নগরী) প্রতিষ্ঠা করে আব্বাসী খেলাফতকে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেন।
٨- تحدث عن دور السلاجقة في تشييد الخلافة العباسية موضحا.
[৮. আব্বাসীয় খেলাফতকে সুদৃঢ়করণ ও সুরক্ষায় সেলজুক তুর্কিদের ঐতিহাসিক অবদান বিশদভাবে আলোচনা কর।]
সেলজুক তুর্কিদের আগমন ও আব্বাসী খেলাফতের তৎকালীন সংকট:
চতুর্থ ও পঞ্চম হিজরী শতকে আব্বাসী খেলাফত এক মারাত্মক রাজনৈতিক সংকটে নিপতিত হয়েছিল। বাগদাদের আব্বাসী খলীফাগণ নামেমাত্র খলীফায় পরিণত হয়েছিলেন এবং শিয়া মতাদর্শী বুওয়াইহী (آل بويه) আমীররা বাগদাদ দখল করে খলীফাদের হাতের পুতুলে পরিণত করেছিল। সুন্নী খেলাফত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল এবং মিশরের শিয়া ফাতেমীয় খেলাফত বাগদাদ গ্রাস করার চক্রান্ত করছিল। এমন সংকটময় ঐতিহাসিক মুহূর্তে মধ্য এশিয়ার ওঘুজ তুর্কিদের এক সুন্নী যাযাবর বীর জাতি—সেলজুকদের (السلاجقة) ঐতিহাসিক উত্থান ঘটে, যাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তুঘরিল বেগ ও আরসালান।
খেলাফত সুরক্ষায় সেলজুকদের সুমহান অবদান:
১. বাগদাদকে শিয়া বুওয়াইহীদের হাত থেকে মুক্তকরণ: ৪৪৭ হিজরীতে আব্বাসী খলীফা আল-কায়েম বি-আমরিল্লাহর আহবানে সেলজুক সুলতান তুঘরিল বেগ বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে বাগদাদে প্রবেশ করেন। তিনি শিয়া বুওয়াইহী শাসনের অবসান ঘটিয়ে খলীফাকে তাদের বন্দীত্ব থেকে উদ্ধার করেন। খলীফা তাঁকে ‘সুলতানুল মাশরিক ওয়াল মাগরিব’ (পূর্ব ও পশ্চিমের সুলতান) উপাধিতে ভূষিত করেন।
২. মালাযগার্দের ঐতিহাসিক যুদ্ধ ও বাইজান্টাইনদের পতন (معركة ملاذكرد): ৪৬৪ হিজরীতে (১০৭১ খ্রি.) সেলজুক সুলতান আলপ আরসালান মালাযগার্দের রণাঙ্গনে রোমান বাইজান্টাইন সম্রাট রোমানুস ডায়োজিনিসের দুই লক্ষ সেনার বিশাল ক্রুসেডার বাহিনীকে মাত্র ১৫ হাজার মুজাহিদ নিয়ে চূর্ণবিচূর্ণ করেন এবং রোমান সম্রাটকে সশরীরে বন্দী করেন। এ বিজয়ের ফলে আনাতোলিয়া (বর্তমান তুরস্ক) চিরতরে মুসলিম ভূখণ্ডে পরিণত হয়।
৩. ক্রুসেডার ও শিয়া বাতেনী ফিতনা প্রতিহতকরণ: সুলতান মালিক শাহ এবং পরবর্তীতে সেলজুক বংশোদ্ভূত নূরুদ্দীন জঙ্গী ও সালাহুদ্দীন আইয়ূবী চরমপন্থী হাশাশিন বাতেনীদের দমন করেন এবং ক্রুসেডারদের হাত থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস মুক্ত করার শক্ত সামরিক ভিত্তি রচনা করেন।
৪. নিজামিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা ও জ্ঞানচর্চার পুনরুজ্জীবন: সেলজুক সুলতানদের প্রখ্যাত প্রধানমন্ত্রী নিজামুল মুলক তুসী বাগদাদ, নিশাপুর ও ইসফাহানে বিশ্ববিখ্যাত ‘মাদ্রাসায়ে নিজামিয়্যাহ’ প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাযালী (রহ.)-এর মতো মনীষীগণ অধ্যাপনা করে সুন্নী আক্বীদা ও ইলমুল হাদীসের পুনর্জাগরণ ঘটান।
উপসংহার:
সেলজুক তুর্কিদের সামরিক শক্তি ও রাজনৈতিক সমর্থন না থাকলে আব্বাসী সুন্নী খেলাফত পঞ্চম শতকেই মানচিত্র থেকে মুছে যেত। তাঁরা একদিকে সীমান্ত রক্ষা করেছেন, অন্যদিকে খেলাফতের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রতিপত্তিকে দীর্ঘস্থায়ী রূপ দান করেছেন।
مجموعة (ب) – تاريخ علم الحديث (মান: ৩০ + ১০ = ৪০)
٩- أجب عن الأسئلة التفصيلية في تاريخ علم الحديث : (أ) ما هي مكانة السنة في الإسلام؟ وكيف كانت عناية الصحابة والتابعين بها؟ (ب) ما هي مميزات التدوين في القرن الثاني الهجري؟ بين مراتب أحاديث الموطأ للإمام مالك.
[৯. হাদীসের ইতিহাস বিষয়ক বিস্তারিত প্রশ্নাবলী: (ক) ইসলামে সুন্নাহর মর্যাদা এবং সাহাবা ও তাবেয়ীদের সুন্নাহর প্রতি গভীর যত্নশীলতা; (খ) হিজরী দ্বিতীয় শতকে হাদীস সংকলনের বৈশিষ্ট্য এবং ইমাম মালিকের মুয়াত্তার হাদীসসমূহের স্তর।]
(أ) ইসলামে সুন্নাহর মর্যাদা ও সাহাবা-তাবেয়ীদের আমল:
১. সুন্নাহর মর্যাদা: সুন্নাহ হলো ইসলামি শরীয়তের দ্বিতীয় মৌলিক উৎস এবং কুরআনে কারীমের একমাত্র বিশুদ্ধ ঐশী ব্যাখ্যা। আল্লাহ তা’আলা কুরআন মাজীদে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন: “وما آتاكم الرسول فخذوه وما نهاكم عنه فانتهوا” এবং “من يطع الرسول فقد أطاع الله”। সুন্নাহ ছাড়া নামাযের রাকাত, হজের নিয়ম, যাকাতের নেসাব ইত্যাদি কোনো বিধানই বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। ইমাম আওযায়ী বলেন: “الكتاب أحوج إلى السنة من السنة إلى الكتاب”।
২. সাহাবা ও তাবেয়ীদের সুন্নাহ সংরক্ষণ: সাহাবায়ে কেরাম সুন্নাহকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবেসেছেন। হযরত উমর (রা.) হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করে বলেছিলেন: “রাসূলকে চুম্বন করতে না দেখলে আমি তোমাকে চুম্বন করতাম না।” কোনো নতুন মাসআলা এলে সাহাবাগণ সাহাবা সমাবেশে হাদীস অন্বেষণ করতেন। তাবেয়ীগণও সুন্নাহ সংরক্ষণে দীর্ঘ মাসব্যাপী সফর করতেন এবং কোনো সুন্নাহ বর্জনকারীদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতেন।
(ب) দ্বিতীয় হিজরী শতকে হাদীস সংকলনের বৈশিষ্ট্য ও মুয়াত্তার স্তর:
১. দ্বিতীয় শতকের সংকলনের বৈশিষ্ট্য:
(ক) এটি ছিল হাদীস সংকলনের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক যুগ, যা খলীফা ওমর বিন আব্দুল আজীজ ও ইমাম যুহরীর হাত ধরে শুরু হয়।
(খ) এ যুগের সংকলনে মারফূ’ হাদীসের সাথে সাথে সাহাবাদের আছার এবং তাবেয়ীদের ফতোয়া একত্রে স্থান পেত।
(গ) ফিকহী অধ্যায় অনুযায়ী (তারতীবুল আবওয়াব) হাদীস সাজানো শুরু হয়। যেমন: মক্কায় ইবনে জুরাইজ, মদীনায় ইমাম মালিক, বসরায় রবী’ ইবনে সাবীহ ও হাম্মাদ ইবনে সালামাহ, কুফায় সুফিয়ান সাওরী।
২. ইমাম মালিকের মুয়াত্তার হাদীসসমূহের স্তর:
শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভীর মতে, মুয়াত্তার অধিকাংশ হাদীস সহীহাইনের সমমানের উচ্চতম স্তরের। এর মধ্যে রয়েছে:
(ক) আসাহহুল আসানীদ (أصح الأسانيد): যাকে ‘স্বর্ণালী সনদ’ (سلسلة الذهب) বলা হয়, যেমন: মালিক আন নাফে’ আন ইবনে উমর।
(খ) মুরাসীল ও বালাঘাত (المراسيل والبلاغات): ইমাম মালিকের কিছু মুরসাল ও বালাগাত রয়েছে (যেখানে তিনি বলেন بلغني)। পরবর্তীতে ইমাম ইবনে আব্দুল বার ‘আত-তামহীদ’ গ্রন্থে প্রমাণ করেছেন যে, মুয়াত্তার মাত্র ৪টি বাদে সকল বালাগাত অন্য সনদে মুত্তাসিল ও সহীহ।
١٠- أجب عن الأسئلة التفصيلية في تاريخ علم الحديث : (ج) ما المسند؟ وما طريقة ترتيب المسند؟ بين مكانة المسند للإمام أحمد بن حنبل وشروطه وعدد أحاديثه. (د) تحدث عن دور الشاه ولي الله الدهلوي وأسرته في إحياء علم الحديث في شبه القارة الهندية.
[১০. হাদীসের ইতিহাস বিষয়ক বিস্তারিত প্রশ্নাবলী: (গ) মুসনাদ সংকলন ও মুসনাদে আহমদের মর্যাদা, শর্ত ও হাদীস সংখ্যা; (ঘ) ভারত উপমহাদেশে ইলমুল হাদীস চর্চায় শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী ও তাঁর পরিবারের অবদান।]
(গ) মুসনাদ সংকলন ও মুসনাদে আহমদের পর্যালোচনা:
১. মুসনাদের সংজ্ঞা ও বিন্যাস পদ্ধতি: যে কিতাবে প্রতিটি সাহাবীর বর্ণিত সকল হাদীস তাঁর নামের অধীনে একত্রিত করা হয় তাকে মুসনাদ বলে। সংকলন পদ্ধতি সাধারণত সাহাবাদের মর্যাদার ক্রমানুসারে—প্রথমে খোলাফায়ে রাশেদীন, তারপর আশারায়ে মুবাশশারাহ, বদরী সাহাবী, মুহাজির, আনসার ও মহিলা সাহাবীগণ।
২. মুসনাদে আহমদের মর্যাদা ও স্থান: ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (১৬৪-২৪১ হি.)-এর মুসনাদ হলো হাদিস জগতের এক সুবিশাল মহাসমুদ্র। হাফেজ ইবনে হাজার বলেন: “মুসনাদে আহমদের প্রতিটি হাদীসের কোনো না কোনো সুদৃঢ় ভিত্তি রয়েছে।”
৩. ইমাম আহমদের শর্ত: তিনি কোনো প্রকাশ্য মিথ্যাবাদী বা চরম পরিত্যাজ্য রাবীর বর্ণনা গ্রহণ করেননি। তিনি সহীহ ও হাসানের পাশাপাশি ফাযায়েলের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য দুর্বল হাদীস এনেছেন, যা কিয়াসের চেয়ে তাঁর নিকট উত্তম ছিল।
৪. হাদীস সংখ্যা: এতে পুনরাবৃত্তিসহ প্রায় ২৭,০০০ থেকে ৩০,০০০ হাদীস সংকলিত হয়েছে (তাঁর পুত্র আব্দুল্লাহর যিয়াদাতসহ প্রায় ৪০,০০০)।
(د) উপমহাদেশে শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী ও তাঁর পরিবারের অবদান:
১. শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহ.) (১১১৪-১১৭৬ হি.): হিজাযে গিয়ে শায়খ আবু তাহের কুর্দীর নিকট সিহাহ সিত্তাহ ও মুয়াত্তা অধ্যয়ন করে তিনি দিল্লীতে ফিরে আসেন। তিনি উপমহাদেশে ফিকহের পাশাপাশি হাদীসের প্রত্যক্ষ অধ্যয়নকে বাধ্যতামূলক করেন। তিনি মুয়াত্তার দুটি অমর ব্যাখ্যা ‘মুসাফ্ফা’ (ফার্সি) ও ‘মুসাওওয়া’ (আরবি) এবং দর্শনে ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ’ রচনা করেন।
২. তাঁর সুযোগ্য বংশধরদের অবদান:
(ক) শাহ আব্দুল আযীয দেহলভী (রহ.): পিতার পর দিল্লীর ‘মাদ্রাসায়ে রাহীমিয়্যাহ’ থেকে হাজার হাজার মুহাদ্দিছ তৈরি করেন এবং ‘তুহফায়ে ইছনা আশারিয়্যাহ’ ও ‘উজালায়ে নাফেআহ’ রচনা করেন।
(খ) শাহ রফীউদ্দীন ও শাহ আব্দুল কাদের (রহ.): কুরআনের প্রথম প্রামাণ্য উর্দু অনুবাদ ও হাদীস প্রচার করেন।
(গ) শাহ ইসমাঈল শহীদ ও শাহ মুহাম্মদ ইসহাক দেহলভী: শিরক-বিদআত নির্মূল করে সহীহ সুন্নাহর পুনর্জাগরণে জীবন উৎসর্গ করেন। বর্তমান ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের প্রতিটি হাদীসের সনদের সূত্র শাহ ওয়ালিউল্লাহর পরিবারের সাথেই সংযুক্ত।
١١- أجب بالإيجاز عن الأسئلة التالية : (أ) متى نشأت الرحلة في طلب الحديث؟ بين. (ب) ما هي شروط الإمام البخاري في صحيحه؟
[১১. সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী: (ক) ইলমে হাদীসের জন্য সফরের (রিহলাহ) সূচনা কখন থেকে হয়? (খ) ইমাম বুখারী তাঁর সহীহ গ্রন্থে কী কী শর্ত অনুসরণ করেছেন?]
(أ) ইলমে হাদীসে সফরের (الرحلة في طلب الحديث) সূচনা, প্রেক্ষাপট ও বিকাশ:
ইলমে হাদীসের অন্বেষণ ও সত্যতা যাচাইয়ের লক্ষ্যে দূর-দূরান্তে ভ্রমণের (রিহলাহ) সূচনা হয়েছিল স্বয়ং সাহাবায়ে কেরামের স্বর্ণযুগ থেকেই। কুরআনে কারীমে হযরত মূসা (আ.) ও খিযির (আ.)-এর জ্ঞান অন্বেষণের সফরকে এর আধ্যাত্মিক ও তাত্ত্বিক ভিত্তি গণ্য করা হয়। সাহাবায়ে কেরামের যুগে খলীফা হযরত উমর (রা.) ও আলী (রা.) বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থানরত সাহাবীদের নিকট দূত পাঠিয়ে হাদীস যাচাই করতেন। সাহাবী হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) একটিমাত্র হাদীস সরাসরি শোনার জন্য এক মাসের পথ অতিক্রম করে উটের পিঠে চড়ে শাম (সিরিয়ায়) সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে উনাইস (রা.)-এর নিকট গমন করেছিলেন। তেমনিভাবে হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রা.) মদীনা থেকে মিসরে ছুটে গিয়েছিলেন হযরত উকবা ইবনে আমির (রা.)-এর মুখ থেকে সরাসরি একটি হাদীসের শব্দাবলী শ্রবণের উদ্দেশ্যে।
তাবেয়ী যুগে এ ধারা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। সাইদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.) বলতেন, “আমি একটিমাত্র হাদীসের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য দিন-রাত একটানা সফর করতাম।” পরবর্তীতে মক্কা, মদীনা, কুফা, বসরা, বাগদাদ, দামেশক, মিসর, ইয়ামেন ও নিশাপুরের মধ্যে ইলমী সফর মুহাদ্দিছ হওয়ার জন্য অলঙ্ঘনীয় শর্তে পরিণত হয়। খতীব আল-বাগদাদী এ বিষয়ে ‘আর-রিহলাহ ফী তালাবিল হাদীস’ শীর্ষক বিখ্যাত কিতাব প্রণয়ন করে এর কালজয়ী গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
(ب) সহীহ বুখারীতে ইমাম বুখারীর অনুসৃত কঠোর শর্তাবলী (شروط الإمام البخاري في صحيحه):
ইমাম বুখারী (রহ.) তাঁর ‘আল-জামে’ আস-সহীহ’ সংকলনে হাদীস যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা কঠোর ও নির্ভুল মানদণ্ড নির্ধারণ করেছিলেন। হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী ‘হাদয়ুস সারী’ ভূমিকায় তাঁর শর্তাবলী বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেছেন:
১. সনদের নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ (اتصال السند): সনদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক রাবী তাঁর সরাসরি শায়খের মুখ থেকে হাদীস শুনেছেন তা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হতে হবে।
২. সাক্ষাতের ঐতিহাসিক প্রমাণ (ثبوت اللقاء والمعاصرة): ইমাম মুসলিমের মতে বর্ণনাকারী ও শায়খের একই যুগের হওয়া এবং সাক্ষাতের সম্ভাবনা (ইমকানুল লিকা) থাকলেই সনদ সংযুক্ত ধরা হয়; কিন্তু ইমাম বুখারী শর্তারোপ করেছেন যে, উভয়ের মধ্যে জীবনে অন্তত একবার হলেও সরাসরি চাক্ষুষ সাক্ষাত ও শ্রবণ ঐতিহাসিকভাবে নিশ্চিত হতে হবে।
৩. সর্বোচ্চ পর্যায়ের আদালত ও যাব্ত (كمال العدالة والضبط): বর্ণনাকারীকে তাকওয়া, আমানতদারী এবং স্মৃতিশক্তির বিচারে শীর্ষ শ্রেণির (ত্বাবাক্বা-১) হতে হবে, যারা দীর্ঘকাল শায়খের সাহচর্যে থেকেছেন।
৪. ইল্লাত ও শুযূয থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হওয়া (السلامة من العلة والشذوذ): হাদীসের সনদে বা মতনে কোনো গোপন সূক্ষ্ম দোষ (ইলাল) বা নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীর বিপরীতে কোনো অসঙ্গতি (শুযূয) থাকতে পারবে না।
৫. আধ্যাত্মিক পবিত্রতা ও নির্বাচন: তিনি প্রায় ৬ লক্ষ হাদীস থেকে যাচাই করে এই গ্রন্থে হাদীস অন্তর্ভুক্ত করেন এবং প্রতিটি হাদীস লিপিবদ্ধ করার পূর্বে গোসল করে রওজা শরীফে বা মসজিদে দুই রাকাত ইস্তিখারার সালাত আদায় করতেন।
١٢- أجب بالإيجاز عن الأسئلة التالية : (ج) أي منهج اتبعه الإمام أبو داود في كتابه السنن؟ بين. (د) تحدث عن كتاب “كنز العمال في سنن الأقوال والأفعال” موجزا.
[১২. সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী: (গ) ইমাম আবু দাঊদ তাঁর সুনান গ্রন্থে কোন মানহাজ অনুসরণ করেছেন? (ঘ) ‘কানযুল উম্মাল ফী সুনানিল আক্বওয়াল ওয়াল আফ’আল’ কিতাব সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা কর।]
(গ) সুনানু আবি দাঊদে ইমাম আবু দাঊদের অনুসৃত মানহাজ:
ইমাম আবু দাঊদ সিজিস্তানী (রহ.) মক্কাবাসীদের নিকট লিখিত তাঁর বিখ্যাত পত্রে (رسالة أبي داود إلى أهل مكة) নিজের কিতাবের মানহাজ সুস্পষ্ট করেছেন:
১. তিনি কেবল ফিকহী আহকাম (হালাল-হারাম ও আমল) সংক্রান্ত হাদীস সংকলন করেছেন; এতে যুহদ ও আখলাকের অতিরিক্ত দীর্ঘ বর্ণনা বর্জন করেছেন।
২. তিনি সহীহ ও সহীহের সমতুল্য বা নিকটবর্তী (الصحيح وما يشبهه ويقاربه) হাদীস একত্র করেছেন।
৩. কোনো হাদীসের সনদে চরম দুর্বলতা (وهن شديد) থাকলে তিনি তা স্পষ্ট উল্লেখ করে দিয়েছেন।
৪. যে হাদীস উল্লেখ করার পর তিনি কোনো মন্তব্য না করে নীরব থেকেছেন, তা তাঁর দৃষ্টিতে আমল ও দলীলযোগ্য (সালেহ)।
৫. একটি মাসআলায় একাধিক হাদীস থাকলে তিনি সর্বাধিক স্পষ্ট ও সংক্ষিপ্ততম সনদের বর্ণনাটি চয়ন করেছেন।
(ঘ) ‘কানযুল উম্মাল’ কিতাবের সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা:
‘কানযুল উম্মাল ফী সুনানিল আক্বওয়াল ওয়াল আফ’আল’ (كنز العمال في سنن الأقوال والأفعال) হলো হাদীস সংকলনের এক বিশাল সুবিশাল বিশ্বকোষ। এর সংকলক হলেন দশম হিজরী শতকের প্রখ্যাত ভারতীয় মুহাদ্দিছ আল্লামা আলী আল-মুত্তাকী আল-হিন্দী আল-বুরহানপুরী (রহ.) (মৃত ৯৭৫ হি.), যিনি মক্কায় বসবাস করতেন।
গ্রন্থের বৈশিষ্ট্য: ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.) রচিত ‘জামেউল জাওয়ামে’’ (বা আল-জামেউল কাবীর) কিতাবে হাদীসসমূহ বর্ণনানুক্রমিক হরফের ভিত্তিতে সাজানো ছিল, যা থেকে মাসআলা খোঁজা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ছিল। আল্লামা আলী মুত্তাকী সুয়ূতীর সেই বিশাল হাদীসভাণ্ডারকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ফিকহী অধ্যায় অনুযায়ী (কিতাবুত তাহারাত, কিতাবুস সালাত ইত্যাদি আকারে) পুনর্সজ্জিত করেন। এতে প্রায় ৪৬,৬২৪টি হাদীস সংকলিত হয়েছে। মুহাদ্দিছগণ মন্তব্য করেছেন: “আল্লামা সুয়ূতী হাদীস একত্র করে উম্মতের ওপর যে অনুগ্রহ করেছিলেন, আলী মুত্তাকী তা সাজিয়ে সুয়ূতীর ওপরও অনুগ্রহ করেছেন।”
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. কামিল ১ম বর্ষ হাদীস ৬ষ্ঠ পত্রের নাম ও বিষয় কোড কী?
কামিল ১ম বর্ষ হাদীস বিভাগের ৬ষ্ঠ পত্রের নাম ‘আল-তারীখুল ইসলামী ওয়া তারীখু ইলমিল হাদীস’ (Islamic History & History of Hadith) এবং বিষয় কোড হলো ৬১১১০৬।
২. এ পত্রে মোট নম্বর বণ্টন কীভাবে করা হয়েছে?
এ পত্রে মোট ১০০ নম্বরের পরীক্ষা হয়; যার মধ্যে প্রথম অংশ ‘ইসলামের ইতিহাস’ অংশে ৬০ নম্বর এবং দ্বিতীয় অংশ ‘হাদীস সংকলনের ইতিহাস’ অংশে ৪০ নম্বর নির্ধারিত।
৩. ড. আলী মুহাম্মদ আস-সাল্লাবী রচিত সীরাত গ্রন্থের গুরুত্ব কী?
ড. সাল্লাবীর সীরাত গ্রন্থটি আধুনিক যুগে নবুওয়াতী জীবনের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সামরিক ঘটনাবলীর নিরপেক্ষ ও গভীর গবেষণামূলক বিশ্লেষণের জন্য সর্বাধিক প্রামাণ্য।
৪. শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভীকে উপমহাদেশের হাদীস চর্চার জনক বলা হয় কেন?
তিনি অন্ধ তাকলীদের বিপরীতে সহীহ সুন্নাহর ভিত্তিতে ফিকহ ও হাদীসের সমন্বয় সাধন করেন এবং তাঁর পরিবার ও ছাত্রদের মাধ্যমে সমগ্র উপমহাদেশে সিহাহ সিত্তাহর প্রাতিষ্ঠানিক পাঠদান শুরু হয়।
৫. খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল কে প্রস্তাব করেছিলেন?
বিখ্যাত সাহাবী হযরত সালমান ফারসী (রা.) আরবের প্রচলিত যুদ্ধরীতির বাইরে গিয়ে পারস্যের উন্নত সামরিক কৌশল হিসেবে খন্দক খননের প্রস্তাব করেছিলেন।
৬. এ বিষয়ে পরীক্ষায় পূর্ণ নম্বর পাওয়ার উপায় কী?
ঐতিহাসিক সন-তারিখ সঠিকভাবে উল্লেখ করা, ম্যাপ ও রণাঙ্গনের অবস্থান সুস্পষ্ট করা, এবং হাদীসের ইতিহাস অংশে মুহাদ্দিছীনদের কিতাব ও শর্তাবলী আরবী উদ্ধৃতিসহ আলোচনা করা।

