কামিল (স্নাতকোত্তর) হাদীস দ্বিতীয় পর্ব পরীক্ষা, ২০২৪
ষষ্ঠ পত্র
বিষয়: উলূমুল হাদীস [নতুন সিলেবাস অনুযায়ী]
বিষয় কোড: 611206 | পূর্ণমান: ১০০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
[الملاحظة : الأعداد بالهامش تدل على الدرجة الكاملة -]
القسم الأول : علوم الحديث (الدرجة – ৬০)
[أجب عن اربعة من الأسئلة التالية (الدرجة – ১৫ x ৪ = ৬০)]
١- ما المقصود بعلم الحديث رواية وعلم الحديث دراية؟ وما موضوعهما وغرضهما؟ اكتب موضحا –
[১. ইলমুল হাদীস রিওয়ায়াত ও ইলমুল হাদীস দিরায়াত বলতে কী বোঝায়? উভয়ের বিষয়বস্তু ও উদ্দেশ্য কী? বিশদভাবে বর্ণনা করুন।]
ভূমিকা ও উৎপত্তি:
হাদীস বিজ্ঞান হলো ইসলামী শরীয়তের দ্বিতীয় মৌলিক উৎস যা পবিত্র কুরআনের বিশদ ব্যাখ্যা এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহকে অবিকৃত অবস্থায় সংরক্ষণ করে। মুহাদ্দিসীন ও উসূলবিদগণ ইলমে হাদীসকে দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত করেছেন: ১. ইলমুল হাদীস রিওয়ায়াত (علم الحديث رواية), এবং ২. ইলমুল হাদীস দিরায়াত (علم الحديث دراية)। এই দুই শাখার সমন্বয়েই হাদিস শাস্ত্রের পূর্ণাঙ্গ সৌধ নির্মিত হয়েছে।
ইলমুল হাদীস রিওয়ায়াত (علم الحديث رواية):
১. সংজ্ঞা: যে শাস্ত্রের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র বাণী (আকওয়াল), কর্ম (আফ’আল), মৌনসম্মতি (তাকবীর) এবং তাঁর সৃষ্টিগত ও চরিত্রগত গুণাবলি (সিফাত) নির্ভরযোগ্য সনদসহ নির্ভুলভাবে বর্ণনা, স্থানান্তর ও লিপিবদ্ধ করার নিয়মাবলি আলোচনা করা হয়, তাকে ‘ইলমুল হাদীস রিওয়ায়াত’ বলা হয়। আল্লামা ইবনে খালদুন ও ইবনে হাজার আসকালানী রহ. এই সংজ্ঞাকে প্রামাণ্য করেছেন।
২. মাওযূ বা বিষয়বস্তু: রাসুলুল্লাহ সা.-এর পবিত্র সত্তা—যা কিছু তাঁর বাণী, কর্ম, সম্মতি ও বৈশিষ্ট্য হিসেবে সাহাবায়ে কিরামের মাধ্যমে উম্মতের নিকট হস্তান্তরিত হয়েছে।
৩. গারাজ বা উদ্দেশ্য: রাসুলুল্লাহ সা.-এর সুন্নাহকে বিকৃতি, সংযোজন ও বিয়োজন থেকে রক্ষা করে পরবর্তী প্রজন্মের নিকট বিশ্বস্তভাবে পৌঁছে দেওয়া।
ইলমুল হাদীস দিরায়াত (علم الحديث دراية বা উসূলে হাদীস):
১. সংজ্ঞা: যে শাস্ত্রের সাহায্যে হাদীসের সনদ (বর্ণনা পরম্পরা) ও মত্ন (মূল পাঠ)-এর অবস্থা ও নিয়মাবলি পর্যালোচনা করা হয়, যার মাধ্যমে কোনো হাদীস গ্রহণযোগ্য (মাকবূল) নাকি বর্জনীয় (মারদূদ) তা নির্ণয় করা সম্ভব হয়, তাকে ‘ইলমুল হাদীস দিরায়াত’ বা ‘মুসতালাহুল হাদীস’ বলা হয়।
২. মাওযূ বা বিষয়বস্তু: হাদীসের সনদ ও মত্ন—গ্রহণযোগ্যতা বা অগ্রহণযোগ্যতার নিরিখে রাবীদের সততা, স্মৃতিশক্তি এবং পাঠ্যের নির্ভুলতা যাচাই করা।
৩. গারাজ বা উদ্দেশ্য: সহীহ ও যয়ীফ হাদীসের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য নিরূপণ করা এবং জাল ও বানোয়াট বর্ণনা থেকে রাসুলুল্লাহ সা.-এর বিশুদ্ধ সুন্নাহকে সম্পূর্ণরূপে সংরক্ষিত রাখা। এর মাধ্যমে দ্বীনের মৌলিক বিধিবিধান আহরণের পথ সুগম হয়।
٢- عرف علم الجرح والتعديل ثم بين أهميته وفوائده لطلاب علم الحديث –
[২. ইলমুল জারহ ওয়াত তা’দীলের পরিচয় দিন এবং হাদীস শাস্ত্রের শিক্ষার্থীদের জন্য এর গুরুত্ব ও উপকারিতা বর্ণনা করুন।]
ইলমুল জারহ ওয়াত তা’দীলের সংজ্ঞা:
১. শাব্দিক অর্থ: ‘জারহ’ (الجرح) শব্দের আভিধানিক অর্থ আহত করা, ক্ষতবিক্ষত করা বা দোষত্রুটি স্পষ্ট করা। আর ‘তা’দীল’ (التعديل) শব্দের অর্থ ন্যায়পরায়ণ, ভারসাম্যপূর্ণ ও বিশ্বস্ত সাব্যস্ত করা।
২. পারিভাষিক অর্থ: হাদীস শাস্ত্রের যে বিশেষ প্রামাণ্য বিজ্ঞানের মাধ্যমে হাদীস বর্ণনাকারী রাবীগণের ন্যায়পরায়ণতা, চারিত্রিক সততা, তাকওয়া, স্মৃতিশক্তি, ধর্মীয় নিষ্ঠা এবং তাঁদের মধ্যে বিদ্যমান কোনো দোষ, দুর্বলতা বা বিচ্যুতির চুলচেরা মূল্যায়ন করা হয়, তাকে ‘ইলমুল জারহ ওয়াত তা’দীল’ বলা হয়। ইমাম তাক্বীউদ্দীন আস-সুবকী রহ. বলেন: “এটি হলো এমন এক অনন্য শাস্ত্র যা রাবীদের গ্রহণযোগ্যতা বা প্রত্যাখ্যানের মানদণ্ড নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করে।”
ইসলামে জারহ ওয়াত তা’দীলের ধর্মীয় গুরুত্ব ও শরয়ী ভিত্তি:
বাহ্যিক দৃষ্টিতে কারও দোষ প্রকাশ করাকে সাধারণ গিবত মনে হতে পারে, কিন্তু দ্বীন ও হাদীসের বিশুদ্ধতা সুরক্ষার বৃহত্তর স্বার্থে রাবীদের ত্রুটি প্রকাশ করাকে উম্মাহর সর্বসম্মত ইজমায় ওয়াজিব ও শ্রেষ্ঠ নেক আমল সাব্যস্ত করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন: “হে মুমিনগণ! কোনো পাপাচারী যদি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে নাও” (সুরা হুজুরাত: ৬)। স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সা. উম্মতের সতর্কতার স্বার্থে কিছু ব্যক্তির কপটতা প্রকাশ করেছিলেন। ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল-কাত্তান, আলী ইবনুল মাদীনী ও ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. ঘোষণা করেছেন: “হাদীসের বানোয়াট বর্ণনাকারী ও মিথ্যাবাদীদের মুখোশ উন্মোচন করা আল্লাহর রাস্তায় তলোয়ার নিয়ে সশস্ত্র জিহাদ করার চেয়েও অধিক সওয়াবের কাজ!”
হাদীস শিক্ষার্থীদের জন্য এর সুদূরপ্রসারী ব্যবহারিক উপকারিতা:
১. সহীহ, হাসান, যয়ীফ ও মাওযূ (জাল) হাদীসের সুস্পষ্ট পার্থক্য নির্ণয় করা যায়।
২. কোনো রাবী ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত পরহেযগার হলেও তিনি বার্ধক্যে স্মৃতিভ্রমে (ইখতিলাত) আক্রান্ত হয়েছিলেন কি না তা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়।
৩. তাদলীসকারী (প্রতারণামূলক সনদ সংক্ষেপণকারী) রাবীদের সহজে শনাক্ত করা যায়।
৪. ফিকহী ইজতিহাদ ও আমলের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য দলিল গ্রহণে শিক্ষার্থী ও মুজতাহিদগণ নিশ্চিত পথনির্দেশ লাভ করেন।
٣- عرف العدالة والضبط ثم اذكر انواع الضبط ومراتب الجرح والتعديل –
[৩. আল-আদালাহ ও আদ-দ্বাবতের পরিচয় দিন, অতঃপর দ্বাবতের প্রকারভেদ এবং জারহ ও তা’দীলের স্তরসমূহ উল্লেখ করুন।]
আল-আদালাহ (العدالة) ও আদ-দ্বাবত (الضبط)-এর সংজ্ঞা:
১. আল-আদালাহ (ন্যায়পরায়ণতা): রাবীর অন্তরের এমন এক মজ্জাগত গুণ ও চারিত্রিক সামর্থ্য (মালাকাহ), যা তাকে সর্বদা তাকওয়া ও মানবীয় শালীনতা (মুরুওয়াত) অবলম্বনে বাধ্য করে এবং প্রকাশ্য কবিরা গুনাহ, সগিরা গুনাহের পুনরাবৃত্তি ও নিকৃষ্ট আচরণ থেকে বিরত রাখে। এর জন্য পাঁচটি শর্ত রয়েছে: ইসলাম, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া, সুস্থ মস্তিষ্ক, তাকওয়া এবং মুরুওয়াত বজায় রাখা।
২. আদ-দ্বাবত (স্মৃতি ও সংরক্ষণ নিষ্ঠা): রাবী কোনো হাদীস শ্রবণ করার মুহূর্ত থেকে অন্যের নিকট বর্ণনা করা পর্যন্ত কোনো প্রকার হ্রাস-বৃদ্ধি বা ভুল ছাড়া তা অবিকল স্মৃতিতে বা গ্রন্থে যথাযথভাবে সংরক্ষিত রাখার পূর্ণ যোগ্যতাকে দ্বাবত বলা হয়।
দ্বাবত (সংরক্ষণ)-এর প্রকারভেদ:
দ্বাবত প্রধানত দুই প্রকার:
১. দ্বাবতুস সাদর (স্মৃতিশক্তির সংরক্ষণ): শায়খের কাছ থেকে শোনার পর তা নিজ মস্তিষ্কে এমনভাবে মুখস্থ রাখা যাতে যেকোনো মুহূর্তে ইচ্ছা করলেই তা নিখুঁতভাবে শুনিয়ে দেওয়া যায়।
২. দ্বাবতুল কিতাব (গ্রন্থের সংরক্ষণ): শায়খের সামনে লিখিত পাণ্ডুলিপিকে যেকোনো পরিবর্তন, সংযোজন বা অন্যের হস্তক্ষেপ থেকে সযত্নে নিজের জিম্মায় সুরক্ষিত রাখা।
জারহ ও তা’দীলের স্তরসমূহ (মারাতীব):
ইমাম ইবনে আবি হাতিম ও হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. জারহ ও তা’দীলকে ছয়টি করে প্রধান স্তরে বিন্যস্ত করেছেন:
– তা’দীলের স্তরসমূহ: ১. সর্বোচ্চ মুবালাগাহ (যেমন: আউসাকুন নাস বা চরম বিশ্বস্ত), ২. গুণবাচক শব্দের দ্বিত্ব (যেমন: ছিক্বাতুন ছিক্বাহ), ৩. একক শব্দে বিশ্বস্ততা (যেমন: ছিক্বাহ বা সাবত), ৪. সামান্য নমনীয়তা (যেমন: সাদূক), ৫. গ্রহণযোগ্যতার কাছাকাছি (যেমন: মাহাল্লুহুস সিদক), ৬. সর্বনিম্ন স্তর (যেমন: স্বালেহুল হাদীস)।
– জারহের স্তরসমূহ: ১. সামান্য শিথিলতা (যেমন: ফীহি মাকাল), ২. দলিল হিসেবে অযোগ্য (যেমন: লা ইয়ুহুতাজ্জু বিহী), ৩. দুর্বলতা স্পষ্ট (যেমন: দ্বাঈফুন জিদ্দান), ৪. পরিত্যক্ত (যেমন: মাতরূকুল হাদীস), ৫. মিথ্যার অপবাদযুক্ত (যেমন: মুত্তাহামুন বিল কিযব), ৬. সরাসরি মিথ্যাবাদী বা চরম জালকারী (যেমন: কাযযাব বা ওয়াদ্বা’)।
٤- ما هى الفاظ الجرح والتعديل؟ وما شروط المعدل والجارح؟
[৪. জারহ ও তা’দীলের শব্দাবলি কী কী? এবং জারহকারী ও তা’দীলকারীর শর্তাবলি কী?]
আলফাযুল জারহ ওয়াত তা’দীল (মূল্যায়নের পরিভাষাসমূহ):
মুহাদ্দিসীনে কিরাম রাবীদের মর্যাদা ও দোষত্রুটি প্রকাশের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিভাষা ব্যবহার করেছেন, যা প্রতিটি স্তরের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ধারণ করে:
১. আলফাযুত তা’দীল (প্রশংসাসূচক শব্দাবলি): ثِقَةٌ (সর্বোচ্চ বিশ্বস্ত ও প্রামাণ্য), ثَبْتٌ (সুদৃঢ় ও অনড়), حُجَّةٌ (শরয়ী দলিলযোগ্য), صَدُوْقٌ (সত্যবাদী), لاَ بَأْسَ بِهِ (বর্ণনায় কোনো ত্রুটি নেই), ضَابِطٌ (প্রখর স্মৃতিধর ও সংগ্রাহক)।
২. আলফাযুল জারহ (ত্রুটিসূচক শব্দাবলি): كَذَّابٌ (মহা মিথ্যাবাদী ও জালকারী), وَضَّاعٌ (মনগড়া হাদিস রচনাকারী), مَتْرُوكٌ (মুহাদ্দিসদের নিকট সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত), مُنْكَرُ الْحَدِيثِ (অগ্রহণযোগ্য হাদীসের একক বর্ণনাকারী), ضَعِيفٌ (স্মৃতিশক্তি বা সনদে দুর্বল), لَيْسَ بِشَيْءٍ (হাদিস শাস্ত্রে যার কোনো ওজন বা মূল্য নেই)।
জারহকারী (জারিহ) ও তা’দীলকারী (মু’য়াদ্দিল)-এর অপরিহার্য শর্তাবলি:
কোনো রাবীর চরিত্র, আমানতদারী ও স্মৃতিশক্তি নিয়ে মন্তব্য করা শরীয়তের এক অত্যন্ত স্পর্শকাতর আমানত। তাই যিনি জারহ বা তা’দীল করবেন, তাঁর মধ্যে নিম্নলিখিত গুণাবলি বিদ্যমান থাকা বাধ্যতামূলক:
১. পরিপূর্ণ তাকওয়া, পরহেযগারী ও ইনসাফ: তাঁকে অবশ্যই চরম আল্লাহভীরু, পক্ষপাতহীন ও নিরপেক্ষ হতে হবে। ব্যক্তিগত শত্রুতা, মাযহাবী বিদ্বেষ বা আঞ্চলিক সংকীর্ণতার বশবর্তী হয়ে কারও ওপর মন্তব্য করা সম্পূর্ণ হারাম।
২. হাদীস ও রিজাল শাস্ত্রের সুগভীর পাণ্ডিত্য: জারহ ও তা’দীলের সূক্ষ্ম কারণ ও মূলনীতি সম্পর্কে তাঁর পূর্ণ ব্যুৎপত্তি থাকতে হবে।
৩. আরবি ভাষা ও পরিভাষার ব্যবহারিক জ্ঞান: আরবের আলংকারিক ভাষা ও মুহাদ্দিসদের বিশেষ পরিভাষার তাৎপর্য গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে।
৪. রাবীদের বাস্তব জীবন সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান: রাবীর সামাজিক মেলামেশা, স্মৃতিশক্তির পরিবর্তন ও সামগ্রিক পরিবেশ সম্পর্কে সরাসরি বা নির্ভরযোগ্য সূত্রে অবগত থাকতে হবে।
৫. জারহের কারণ সুস্পষ্ট করা (বয়ানুস সাবাব): কোনো বিশ্বস্ত রাবীকে অগ্রহণযোগ্য বলতে হলে তার সুনির্দিষ্ট শরয়ী ও ঐতিহাসিক কারণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে; অস্পষ্ট বা প্রমাণহীন জারহ গ্রহণযোগ্য নয়।
জারহ ও তা’দীলের ভারসাম্য রক্ষা ও আধুনিক প্রাসঙ্গিকতা: ইমাম যাহাবী ও হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. উল্লেখ করেছেন যে, জারহ ও তা’দীলের মূল উদ্দেশ্য কোনো মুমিনকে অপমান করা নয়, বরং রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র বাণীর বিশুদ্ধতা সংরক্ষণ করা। তাই মুহাদ্দিসগণের এই শর্ত ও মূলনীতি মেনে হাদিসের সনদ যাচাই-বাছাই করা ফরযে কিফায়ার অন্তর্ভুক্ত।
٥- ما المراد بالعلة فى علم الحديث؟ بين اقسام العلة واسبابها وامثلتها –
[৫. হাদীস শাস্ত্রে ‘ইল্লাত’ বলতে কী বোঝায়? ইল্লাতের প্রকারভেদ, কারণ ও উদাহরণসমূহ বর্ণনা করুন।]
‘ইল্লাহ’ (العلة)-এর সংজ্ঞা ও তাৎপর্য:
১. শাব্দিক অর্থ: ‘ইল্লাহ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো এমন এক অদৃশ্য অন্তর্নিহিত রোগ, ব্যাধি বা অভ্যন্তরীণ ক্ষত যা কোনো আপাতদৃষ্টিতে সুস্থ শরীরে গোপনে প্রবেশ করে তাকে ভেতর থেকে দুর্বল করে ফেলে।
২. পারিভাষিক অর্থ: হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষায় ‘ইল্লাহ’ হলো হাদীসের সনদ বা মূল পাঠ্যের (মত্ন) মধ্যে লুক্কায়িত এমন এক সূক্ষ্ম, গোপন ও অপ্রকাশ্য ত্রুটি, যা বাহ্যিক দৃষ্টিতে হাদীসটিকে সম্পূর্ণ সহীহ, মুত্তাসিল ও ত্রুটিহীন মনে করালেও গভীর ও তুলনামূলক অনুসন্ধানের পর হাদীসের বিশুদ্ধতাকে সমূলে বিনষ্ট ও বাতিল করে দেয়। যে হাদীসে এমন লুক্কায়িত সূক্ষ্ম ব্যাধি থাকে তাকে ‘হাদীসে মু’আল্লাল’ (الحديث المعلل) বলা হয়। ইমাম আলী ইবনুল মাদীনী, আহমাদ ইবনে হাম্বল ও ইমাম দারাকুতনী রহ. এই জটিল শাস্ত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিলেন।
ইল্লাহ সৃষ্টির প্রধান কারণসমূহ:
ইল্লাহ কোনো ইচ্ছাকৃত প্রতারণা নয়, বরং তা রাবীর অনিচ্ছাকৃত স্মৃতিভ্রমের কারণে ঘটে থাকে। এর প্রধান কারণগুলো হলো: ১. কোনো মুরসাল বা মুনকাতি’ (বিচ্ছিন্ন) হাদীসকে ভুলবশত মুত্তাসিল (ধারাবাহিক) সনদ বানিয়ে ফেলা, ২. কোনো সাহাবির বক্তব্য বা মাওকূফ বর্ণনাকে ভুলবশত রাসুলুল্লাহ সা.-এর মারফূ’ হাদীস হিসেবে বর্ণনা করা, ৩. এক সনদের ভেতরে সমনামের অন্য কোনো দুর্বল রাবীর নাম প্রতিস্থাপন করে দেওয়া (তারকীবুল ইসনাদ), এবং ৪. সমজাতীয় দুটি ভিন্ন ভিন্ন হাদীসের পাঠ্যকে একত্রে গুলিয়ে একাকার করে ফেলা।
ইল্লাহর প্রকারভেদ ও প্রামাণ্য উদাহরণ:
১. সনদের মধ্যে ইল্লাহ (علة في الإسناد): যেমন ইয়ালী ইবনে উবাইদের বর্ণিত হাদিস, যেখানে তিনি সুফিয়ান সাওরী থেকে বর্ণনা করতে গিয়ে ‘আমর ইবনে দীনার’-এর স্থলে ভুলবশত ‘আব্দুল্লাহ ইবনে দীনার’ উল্লেখ করেছিলেন। বাহ্যিকভাবে উভয় রাবীই ছিক্বাহ ও নির্ভরযোগ্য হওয়ায় সনদটি সহীহ মনে হলেও সূক্ষ্ম বিচারে তা মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ ছিল।
২. মত্নের মধ্যে ইল্লাহ (علة في المتن): যেমন সহীহ মুসলিমে কিরাতের একটি বর্ণনায় এসেছে যে “রাসুলুল্লাহ সা. বিসমিল্লাহ পড়তেন না”; অথচ অন্য সকল সহীহ সনদে এসেছে যে তিনি বিসমিল্লাহ সশব্দে না পড়ে নিঃশব্দে পড়তেন। এখানে বর্ণনাকারীর স্মৃতিভ্রমের কারণে মত্নে ইল্লাহ সৃষ্টি হয়েছিল।
٦- ما المراد بعلم غريب الحديث؟ تحدث عن نشأة هذا العلم وتطوره –
[৬. ইলমু গারীবিল হাদীস বলতে কী বোঝায়? এ শাস্ত্রের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ আলোচনা করুন।]
ইলমু গারীবিল হাদীস (غريب الحديث)-এর সংজ্ঞা:
হাদীসের মূল পাঠ্যে (মত্ন) এমন কিছু প্রাচীন, বিরল, জটিল ও অপ্রচলিত আরবি শব্দের আগমন ঘটে, যা সাধারণ আরবি ভাষাভাষীদের জন্য সহজবোধ্য নয় এবং যার প্রকৃত অর্থ ও অন্তর্নিহিত ভাব অনুধাবনের জন্য আরবের গভীর ভাষাতত্ত্ব, প্রাচীন সাহিত্য ও জাহেলী যুগের কাব্যের সহযোগিতা নিতে হয়, তাকে ‘গারীবুল হাদীস’ বলা হয়। এটি সনদের স্বল্পতার পারিভাষিক ‘হাদীসে গারীব’ নয়, বরং এটি বিশুদ্ধ মত্নভিত্তিক ভাষাতাত্ত্বিক ও সাহিত্যিক পরিভাষা।
এই শাস্ত্রের উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক পটভূমি:
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন সমগ্র আরব জাহানের সর্বাধিক প্রাঞ্জল, মার্জিত ও সমৃদ্ধ ভাষার অধিকারী (আফসাহুল আরব)। তিনি আরবের বিভিন্ন অঞ্চলের বহু গোত্রের উপভাষা, প্রবাদ ও গভীর বাগধারায় কথা বলতেন। সাহাবায়ে কিরামের যুগে খাঁটি আরবি পরিবেশ বিদ্যমান থাকায় তাঁরা সহজেই সেই শব্দগুলোর মর্ম বুঝতে পারতেন। কিন্তু পরবর্তীতে ইসলামের বিজয়ের ফলে যখন পারস্য, রোম, সিরিয়া, মিশর ও মধ্য এশিয়ার লক্ষ লক্ষ অনারব জাতি দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করল, তখন সাধারণ মুসলমানদের জন্য হাদিসের এই বিরল শব্দাবলি বোঝা অসম্ভব হয়ে পড়ল। ফলে অপব্যাখ্যার হাত থেকে দ্বীনকে বাঁচাতে হিজরী দ্বিতীয় শতকের শেষভাগ থেকে মুহাদ্দিস ও ভাষাতত্ত্ববিদগণ এই স্বতন্ত্র শাস্ত্রের গোড়াপত্তন করেন।
এই শাস্ত্রের বিকাশ ও অমর গ্রন্থাবলি:
১. সর্বপ্রথম ইমাম আবু উবায়দা মা’মার ইবনুল মুছান্না এবং আবু হাসান আন-নদর ইবনে শুমাইল এ বিষয়ে প্রাথমিক পুস্তিকা রচনা করেন।
২. পরবর্তীতে ইমাম আবু উবাইদ আল-কাসিম ইবনে সাল্লাম (ইন্তেকাল ২২৪ হি.) দীর্ঘ চল্লিশ বছর কঠোর সাধনা করে ‘গারীবুল হাদীস’ নামে এক যুগান্তকারী মহাগ্রন্থ সংকলন করেন, যা দেখে তৎকালীন মুহাদ্দিসগণ বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছিলেন।
৩. এরপর ইমাম ইবনু কুতাইবাহ আদ-দীনূরী, ইমাম খাত্তাবী এবং পরবর্তীতে আল্লামা ইবনুল আছীর আল-জাযারী (ইন্তেকাল ৬০৬ হি.) তাঁর কালজয়ী বিশ্বকোষ ‘আন-নিহায়াহ ফী গারীবিল হাদীস ওয়াল আছার’ রচনা করে এই শাস্ত্রকে চিরস্থায়ী পূর্ণতা দান করেন।
٧- عرف مشكل الحديث ثم اذكر أسباب الاشكال مع بيان الفرق بينه وبين مختلف الحديث –
[৭. মুশকিলে হাদীসের পরিচয় দিন, অতঃপর এর জটিলতার কারণসমূহ এবং মুখতালিফে হাদীসের সাথে এর পার্থক্য স্পষ্ট করুন।]
মুশকিলুল হাদীসের সংজ্ঞা:
যে সকল সহীহ ও প্রামাণ্য হাদীসের বাহ্যিক অর্থ বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি, সাধারণ বিবেক, বাস্তব ঐতিহাসিক সত্য অথবা কুরআনের কোনো সুস্পষ্ট আয়াতের সাথে আপাতদৃষ্টিতে সাংঘর্ষিক বা অসঙ্গতিপূর্ণ মনে হয়, যার প্রকৃত মর্মোদ্ধার ও জটিলতা সমাধানের জন্য গভীর গবেষণা, ভাষাজ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রয়োজন হয়, তাকে ‘মুশকিলুল হাদীস’ বলা হয়। ইমাম আবু জাফর আত-তাহাবী রহ.-এর ‘শরহু মুশকিলিল আছার’ এই বিষয়ের সর্বশ্রেষ্ঠ আকর গ্রন্থ।
ইশক্বাল বা অসঙ্গতি সৃষ্টির প্রধান কারণসমূহ:
১. শব্দের একাধিক অর্থ (মুশতারাক) থাকা এবং অসচেতনতার কারণে ভুল অর্থ গ্রহণ করা।
২. হাদীসের বাহ্যিক বর্ণনায় কোনো গভীর রূপক, উপমা বা অলংকারিক ভাষা (মাজায বা ইস্তি’আরা) ব্যবহৃত হওয়া যা আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়।
৩. পরিবেশ, পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপটের ভিন্নতার কারণে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে দেওয়া ভিন্ন আদেশ বুঝতে না পারা।
৪. কুরআনের সাধারণ (আম) নির্দেশের সাথে হাদীসের বিশেষ (খাস) ছাড়ের বাহ্যিক অমিল প্রতীয়মান হওয়া।
মুশকিলুল হাদীস ও মুখতালিফুল হাদীসের পার্থক্য:
১. মুখতালিফুল হাদীস (مختلف الحديث): যখন একটি সহীহ হাদীসের সাথে অপর একটি সহীহ হাদীসের মধ্যে প্রত্যক্ষ পারস্পরিক বৈপরীত্য বা বিরোধ দেখা দেয় (যেমন এক হাদিসে দাঁড়িয়ে পানি পানের নিষেধাজ্ঞা এবং অন্য হাদিসে দাঁড়িয়ে পানি পানের প্রমাণ), তাকে মুখতালিফুল হাদীস বলে। এর সমাধানে মুহাদ্দিসগণ প্রথমে সমন্বয় (আল-জাম’ ওয়াত তাওফীক), ব্যর্থ হলে নাসখ (রহিতকরণ) এবং পরিশেষে অগ্রাধিকার (তারজীহ) নীতি প্রয়োগ করেন।
২. মুশকিলুল হাদীস (مشكل الحديث): এটি দুটি হাদীসের মধ্যকার পারস্পরিক বিরোধ নয়, বরং একক একটি হাদীসের বক্তব্যের সাথে বিবেক, বিজ্ঞান, ঐতিহাসিক বাস্তবতা বা কুরআনের সার্বিক দর্শনের বিরোধ অনুধাবিত হওয়া। গবেষকগণ গভীর ব্যাখ্যা ও ব্যাখ্যার পর্দা উন্মোচনের মাধ্যমে সেই জটিলতার নিখুঁত সমাধান পেশ করেন।
উপসংহার ও ফিকহী গুরুত্ব: সংক্ষেপে বলা যায়, মুখতালিফুল হাদীসে বৈপরীত্য থাকে দুটি পৃথক হাদীসের বক্তব্যের মাঝে, আর মুশকিলুল হাদীসে বাহ্যিক দ্বিধা সৃষ্টি হয় একক হাদীসের মর্ম ও সার্বিক যুক্তির মাঝে। মুহাদ্দিস ও ফকীহগণের ঐকমত্য অনুযায়ী, কোনো সহীহ হাদীসের সাথে প্রকৃত সত্য বা কুরআনের কোনো চিরন্তন নির্দেশের প্রকৃত কোনো বিরোধ থাকতে পারে না; বরং এই বিরোধ হলো পাঠকের প্রাথমিক উপলব্ধির সীমাবদ্ধতা, যা গভীর গবেষণার মাধ্যমে নিরসনযোগ্য।
القسم الثانى : اصول التخريج ودراسة الاسانيد (الدرجة – ২০)
[أجب عن واحد من مجموعة (أ) وعن واحد من مجموعة (ب)]
مجموعة (أ) : (الدرجة – ১৫ x ১ = ১৫)
٨- ما معنى التخريج لغة واصطلاحا؟ اذكر لمحة عن تاريخ التخريج –
[৮. তাখরীজ-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ কী? তাখরীজের ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত রূপরেখা আলোচনা করুন।]
তাখরীজের সংজ্ঞা:
১. শাব্দিক অর্থ: ‘তাখরীজ’ (التخريج) শব্দটি বাবে তাফঈল-এর মাসদার। এর আভিধানিক অর্থ হলো বের করা, উদ্ধার করা, গোপন স্থান থেকে প্রকাশ করা, প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং পরিচ্ছন্ন করা।
২. পারিভাষিক অর্থ: হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষায় কোনো কিতাবে উল্লেখিত সনদহীন বা সাধারণ হাদীসকে তার মূল নির্ভরযোগ্য প্রাথমিক হাদীস সংকলনগ্রন্থসমূহে (যেমন বুখারী, মুসলিম, মুসনাদে আহমাদ, সুনান আরবাআহ) পূর্ণ সনদসহ খুঁজে বের করা, তার রাবীগণের বিশুদ্ধতা ও দোষত্রুটি নিরূপণ করা এবং তার গ্রহণযোগ্যতার চূড়ান্ত মানদণ্ড (সহীহ, হাসান, যয়ীফ বা মাওযূ) বিশ্লেষণ করে প্রামাণ্য সিদ্ধান্ত প্রদান করাকে ‘তাখরীজ’ বলা হয়।
তাখরীজ শাস্ত্রের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ক্রমবিকাশ:
ইসলামের সোনালী যুগে সাহাবা, তাবেঈন ও প্রাথমিক মুহাদ্দিসগণ ছিলেন প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারী। তাঁরা প্রতিটি হাদীসের পূর্ণ সনদ ও মূল উৎস মুখস্থ রাখতেন। ফলে হিজরী চতুর্থ বা পঞ্চম শতক পর্যন্ত তাখরীজের কোনো স্বতন্ত্র কিতাবের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়নি। কিন্তু পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে যখন ফিকহ, তাফসীর, তাসাউউফ ও কালাম শাস্ত্রের কিতাবগুলোতে আলেমগণ কোনো সনদ ছাড়া কেবল “রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন” বলে ঢালাওভাবে হাদীস উদ্ধৃত করতে শুরু করলেন, তখন সাধারণ পাঠকদের জন্য সেই বর্ণনার সত্যতা ও বিশুদ্ধতা যাচাই করা দুরূহ হয়ে পড়ল। এমনকি বহু দুর্বল ও ভিত্তিহীন বর্ণনা সমাজে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। এই মারাত্মক সংকট উত্তরণে হিজরী অষ্টম শতক থেকে প্রখ্যাত মুহাদ্দিসগণ মূল কিতাবসমূহের হাদীস যাচাইয়ে তাখরীজের এক সুসংহত আন্দোলন গড়ে তোলেন।
প্রসিদ্ধ তাখরীজ গ্রন্থাবলি:
১. ইমাম জামালুদ্দীন আয-যায়লাঈ রহ.-এর ‘নাসবুর রায়াহ লি আহাদীসিল হিদায়াহ’।
২. হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ.-এর ‘তালখীসুল হাবীর ফী তাখরীজি আহাদীসির রাফেয়্যিল কাবীর’ এবং ‘আদ-দিরায়াহ’।
৩. ইমাম শামসুদ্দীন আস-সাখাবী রহ.-এর ‘আল-মাকাসিদুল হাসানাহ’।
৪. আধুনিক যুগে শায়খ মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানীর সুবিশাল ‘ইরওয়াউল গালীল ফী তাখরীজি আহাদীসি মানারিস সাবীল’।
٩- ما المقصود بطرق التخريج؟ تحدث عن التخريج عن طريق معرفة راوى الحديث من الصحابة مفصلا –
[৯. তাখরীজের পদ্ধতিসমূহ বলতে কী বোঝায়? সাহাবি বর্ণনাকারীর পরিচয়ের মাধ্যমে হাদিস তাখরীজ করার পদ্ধতি বিস্তারিত আলোচনা করুন।]
তাখরীজের প্রধান পাঁচটি বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি:
হাদীস গবেষক ও শিক্ষার্থীদের মূল সূত্রে পৌঁছানোর জন্য আধুনিক উসূলে হাদীসে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে:
১. হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবির নামের মাধ্যমে তাখরীজ (التخريج عن طريق معرفة راوي الحديث من الصحابة),
২. হাদীসের প্রথম শব্দ বা বাক্যংশের মাধ্যমে বর্ণানুক্রমিক তাখরীজ (যেমন আল-জামি’উস সাগীর ও আতরাফ গ্রন্থের সাহায্যে),
৩. হাদীসের কোনো বিরল ও বিশিষ্ট শব্দের সাহায্যে তাখরীজ (যেমন ‘আল-মু’জামুল মুফাহরাস লি আলফাযিল হাদীসিন নাবাবী’-এর সাহায্যে),
৪. হাদীসের ফিকহী বিষয়বস্তু বা বিষয়ের মাধ্যমে তাখরীজ (বিষয়ভিত্তিক সুনান, মুসান্নাফ ও জামে’ গ্রন্থের সাহায্যে), এবং
৫. হাদীসের বিশেষ অবস্থা বা সনদের বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে তাখরীজ (যেমন আল-আহাদীসুল কুদসিয়্যাহ, মুরসাল বা মুতাওয়াতির বিষয়ক বিশেষ গ্রন্থের মাধ্যমে)।
সাহাবি রাবীর পরিচয়ের মাধ্যমে তাখরীজ পদ্ধতির বিশদ বিবরণ:
যদি কোনো হাদীসের মূল متن-এর শুরুতে সাহাবির নাম উল্লেখ থাকে (যেমন ‘হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত’ বা ‘হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত’), তবে এই পদ্ধতিতে তাখরীজ করা সর্বাধিক সহজ, দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য। এ জন্য গবেষককে নিম্নলিখিত তিন শ্রেণির মৌলিক কিতাবের সাহায্য নিতে হয়:
১. আল-মাসানীদ (মুসনাদ গ্রন্থসমূহ): যেমন ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের ‘মুসনাদে আহমাদ’, মুসনাদে হুমায়দী বা মুসনাদে আবু দাউদ আত-তায়ালিসী। এই গ্রন্থগুলোতে প্রতিটি সাহাবির নামের অধীনে তাঁর বর্ণিত সমস্ত হাদীস একত্রিত থাকে। গবেষক নির্দিষ্ট সাহাবির অধ্যায়ে গিয়ে তাঁর বর্ণিত হাদীসগুলোর মধ্যে অন্বেষিত হাদীসটি সহজেই খুঁজে পান।
২. আল-মা’আজিম (মু’জাম গ্রন্থসমূহ): যেমন ইমাম তাবারানী রহ. সংকলিত ‘আল-মু’জামুল কাবীর’। এটি সাহাবায়ে কিরামের নামের বর্ণানুক্রমিক বিন্যাসে (মু’জাম পদ্ধতিতে) রচিত হওয়ায় যেকোনো সাহাবির বর্ণনা দ্রুত বের করা যায়।
৩. কুতুবুল আতরাফ (আতরাফ গ্রন্থসমূহ): যেমন হাফেয আবুল হাজ্জাজ আল-মিযযী রহ. রচিত ‘তুহফাতুল আশরাফ বি-মা’রিফাতিল আতরাফ’। এখানে নির্দিষ্ট সাহাবির নামের অধীনে হাদীসের প্রথম অংশ এবং সিহাহ সিত্তার কোন কোন কিতাবে কোন কোন সনদে তা বর্ণিত হয়েছে তার পূর্ণ বিবরণ সংক্ষেপে পেশ করা থাকে।
مجموعة (ب) : تعليقات علمية (الدرجة – ৫ x ১ = ৫)
[علق على واحد مما يلى]
١٠- علق على واحد مما يلى :
[১০. নিচের যেকোনো একটি বিষয়ের ওপর টীকা লিখুন:]
(أ) نصب الراية لاحاديث الهداية –
[(ক) ‘নাসবুর রায়াহ লি আহাদীসিল হিদায়াহ’]
হাদীস ও হানাফী ফিকহ শাস্ত্রের ইতিহাসে আল্লামা জামালুদ্দীন আবু মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ ইবনে ইউসুফ আয-যায়লাঈ আল-হানাফী রহ. (ইন্তেকাল ৭৬২ হি.) রচিত ‘নাসবুর রায়াহ’ এক অতুলনীয় ও প্রামাণ্য কালজয়ী মহাগ্রন্থ। ইমাম বুরহানুদ্দীন আবুল হাসান আলী ইবনে আবি বকর আল-মারগীনানী রহ. রচিত হানাফী মাযহাবের সুবিখ্যাত ফিকহ গ্রন্থ ‘আল-হিদায়াহ’-তে যে সমস্ত হাদীস ও সাহাবিদের আসার সনদবিহীনভাবে উদ্ধৃত হয়েছিল, ইমাম যায়লাঈ রহ. সেগুলোর বিস্তারিত তাখরীজ ও সনদতাত্ত্বিক তাহকীক সম্পন্ন করেছেন। এই গ্রন্থের অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, ইমাম যায়লাঈ কেবল হানাফী মাযহাবের সপক্ষের হাদীসই আনেননি, বরং বিরোধী আইম্মায়ে কিরামের দলিলসমূহেরও পূর্ণ সনদ, রাবীদের স্তর এবং মানদণ্ড চরম নিরপেক্ষতার সাথে আলোচনা করেছেন। হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী ও ইমাম ইবনে কাসীর রহ.-এর মতো শীর্ষ মুহাদ্দিসগণ এই গ্রন্থের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। হাদীসের বিশুদ্ধতা যাচাইয়ে এটি এক অমর আলোকবর্তিকা।
(ب) دراسة الاسانيد والحكم على الحديث –
[(খ) দিরাসাতুল আসানীদ ও হাদীসের ওপর হুকুম আরোপ]
‘দিরাসাতুল আসানীদ’ হলো কোনো হাদীসের সনদ বা বর্ণনাকারী পরম্পরাকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ব্যবচ্ছেদ করে রাবীদের জীবনী, সততা, স্মৃতিশক্তি এবং সনদের সংযোগ (ইত্তিসাল) যাচাই করার এক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। একজন গবেষক প্রথমে সনদের প্রতিটি স্তরের রাবীর নির্ভরযোগ্যতা রিজালশাস্ত্রের মৌলিক কিতাব (যেমন তাহযীবুত তাহযীব, মীযানুল ইতিদাল ও তাকরীবুত তাহযীব) থেকে যাচাই করেন। এরপর সনদে কোনো লুক্কায়িত ত্রুটি (ইল্লাহ), বিচ্ছিন্নতা (ইনক্বিতা’) বা প্রতারণা (তাদলীস) আছে কি না তা নিখুঁতভাবে নিরূপণ করেন। সমস্ত শর্ত সফলভাবে পূরণ হলে হাদীসটিকে ‘সহীহ লি-যাতিহী’ বা ‘হাসান’ এবং কোনো রাবীর দুর্বলতা থাকলে ‘যয়ীফ’ বা ‘মুনকার’ হিসেবে শরয়ী হুকুম জারি করা হয়। সমসাময়িক গবেষকদের জন্য এটি এক অপরিহার্য প্রায়োগিক বিদ্যা।
মূল্যায়ন ও একাডেমিক গুরুত্ব: কামিল ও উচ্চতর হাদীস গবেষণায় তাখরীজ ও আসানীদের তাহকীক এক অবিচ্ছেদ্য ভিত্তি। আল্লামা যায়লাঈ রহ.-এর নাসবুর রায়াহ যেমন ফিকহী বর্ণনার প্রামাণিকতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন, তেমনি দিরাসাতুল আসানীদের মাধ্যমে কোনো আধুনিক হাদিস গবেষক সরাসরি প্রাথমিক উৎস থেকে সনদের সক্ষমতা নিরূপণ করতে পারেন। এটি হাদিসের অপব্যাখ্যা রোধে ও দ্বীনের বিশুদ্ধতা সুরক্ষায় সর্বোচ্চ সহায়ক।
القسم الثالث : الوضع فى الحديث (الدرجة – ২০)
[أجب عن واحد من مجموعة (أ) وعن واحد من مجموعة (ب)]
مجموعة (أ) : (الدرجة – ১৫ x ১ = ১৫)
١١- ماذا تفهم بالوضع فى الحديث؟ اذكر اسباب الوضع فى الحديث مفصلا –
[১১. হাদীসে ‘ওয়াদ্ব’ (জালকরণ) বলতে আপনি কী বোঝেন? হাদিস জালকরণের কারণসমূহ বিস্তারিত উল্লেখ করুন।]
হাদীসে ওয়াদ্ব (الوضع)-এর সংজ্ঞা:
১. শাব্দিক অর্থ: ‘ওয়াদ্ব’ (الوضع) শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো কোনো কিছু নিচে ফেলা, মিথ্যা রচনা করা এবং মনগড়া উদ্ভাবন করা।
২. পারিভাষিক অর্থ: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা বলেননি, করেননি বা অনুমোদন করেননি—এমন কোনো মনগড়া মিথ্যা বক্তব্য বা কর্মকে ইচ্ছাকৃতভাবে নবীজি সা.-এর বাণী বলে চালিয়ে দেওয়াকে হাদীসের পরিভাষায় ‘হাদীসে মাওযূ’ (الحديث الموضوع) বা জাল হাদীস বলা হয়। এটি যয়ীফ হাদীসের কোনো প্রকার নয়, বরং এটি সরাসরি প্রত্যাখ্যাত এবং এর বর্ণনা সর্বসম্মতভাবে হারাম।
সমাজে হাদীস জালকরণের প্রধান প্রধান কারণসমূহ (আসবাবুল ওয়াদ্ব’):
মুহাদ্দিসীনে কিরামের সুগভীর গবেষণায় হাদীস জালকরণের পেছনে নিম্নলিখিত ঐতিহাসিক কারণগুলো চিহ্নিত হয়েছে:
১. ইসলাম ধ্বংসের যিনদীক্বী ষড়যন্ত্র: ইসলামের অভ্যন্তরীণ দুশমন ও ধর্মত্যাগী যিন্দীকরা সাধারণ মুসলমানদের বিভ্রান্ত করতে হাজার হাজার মিথ্যা হাদীস বানাত (যেমন আব্দুল করীম ইবনে আবিল আওজা ফাঁসির পূর্বে চার হাজার জাল হাদীস বানানোর স্বীকারোক্তি দিয়েছিল)।
২. রাজনৈতিক ও দলগত সংকীর্ণতা: উমাইয়া, আব্বাসীয় এবং শীয়া-খারেজী দ্বন্দ্বে নিজ নিজ রাজনৈতিক দলের সমর্থনে বা প্রতিপক্ষের নিন্দায় বহু মিথ্যা রেওয়ায়েত তৈরি করা হয়েছিল।
৩. মুতাআচ্ছিব আলেমদের মাযহাবী গোঁড়ামি: নিজ মাযহাব ও ইমামের মর্যাদা বৃদ্ধি এবং অন্য মাযহাবের নিন্দায় কিছু জ্ঞানপাপী মিথ্যা হাদিস বানাত।
৪. অজ্ঞ সুফিদের নেক নিয়তে হাদিস জালকরণ (আল-হিহসবাতু লিল্লাহ): এটি ছিল সবচেয়ে বিপজ্জনক শ্রেণি! কিছু দরবেশ মানুষকে নফল ইবাদত ও কুরআনের সুরার প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য ‘তারগীব ও তারহীব’ (উৎসাহ ও ভীতি)-এর বানোয়াট ফজিলতের হাদীস তৈরি করেছিল (যেমন নূহ ইবনে আবি মারইয়াম)।
৫. বাদশাহ ও শাসকদের তোষামোদি: রাজদরবারে উপহার ও উপঢৌকন লাভের আশায় লোভী আলেমরা শাসকদের খেয়ালখুশির পক্ষে হাদিস বানাত (যেমন গিয়াস ইবনে ইব্রাহিম কবুতর ওড়ানোর পক্ষে জাল হাদীস বলেছিল)।
৬. পেশাদার গল্পকারদের (কুস্সাস) অর্থলিপ্সা: ওয়াজের মজলিসে সাধারণ মানুষকে আবেগাপ্লুত করে অর্থ উপার্জনের জন্য অদ্ভুত কাল্পনিক গল্প হাদীস নামে প্রচার করত।
١٢- اذكر ضوابط وقواعد لمعرفة الوضع فى الحديث –
[১২. হাদীস জাল হওয়ার লক্ষণ ও তা শনাক্তকরণের নীতিমালা ও নিয়মাবলি উল্লেখ করুন।]
ভূমিকা:
মুহাদ্দিসীনে কিরাম মহান আল্লাহর সাহায্যে এমন কিছু সুদৃঢ় ও বৈজ্ঞানিক মূলনীতি প্রণয়ন করেছেন, যার সাহায্যে কোনো বিশেষজ্ঞ মুহাদ্দিস মুহূর্তের মধ্যেই জাল হাদীস শনাক্ত করতে সক্ষম হন। একে দুই ভাগে ভাগ করা হয়: ১. সনদের আলামত, এবং ২. মত্ন বা পাঠ্যের আলামত।
সনদের মধ্যে জাল হাদীস চেনার আলামতসমূহ:
১. জালকারীর স্বীয় স্বীকারোক্তি (ইকরাবুল ওয়াদ্বা’): রাবী নিজেই স্বীকার করা যে সে মানুষকে দ্বীনের দিকে আনতে বা অর্থের লোভে হাদীসটি বানিয়েছে (যেমন আবু ইসমাহর স্বীকারোক্তি)।
২. ঐতিহাসিক অসঙ্গতি: রাবী এমন কোনো শায়খের কাছ থেকে হাদিস শোনার দাবি করা যার মৃত্যুর বহু বছর পর সেই রাবীর জন্ম হয়েছিল, অথবা তাদের দুজনের ভৌগোলিক অবস্থানের দূরত্বে সাক্ষাৎ অসম্ভব ছিল।
৩. রাবীর কুখ্যাতি: সনদে এমন কোনো রাবী থাকা যাকে রিজালশাস্ত্রবিদগণ ‘কাযযাব’ (চরম মিথ্যাবাদী) বা হাদিস চোর হিসেবে নিশ্চিত করেছেন এবং তার কোনো সমার্থক সূত্র না থাকা।
মত্ন বা পাঠ্যের মধ্যে জাল হাদীস চেনার আলামতসমূহ:
১. ভাষাগত দুর্বলতা ও কদর্যতা (রাকাখাতুল লাফজ): রাসুলুল্লাহ সা.-এর ভাষা ছিল সর্বোচ্চ প্রাঞ্জল ও সাহিত্যরসসমৃদ্ধ। জাল হাদিসের শব্দচয়ন অত্যন্ত দুর্বল, হাস্যকর ও ব্যাকরণগত ত্রুটিযুক্ত হয়।
২. কুরআনের সুস্পষ্ট আয়াতের বিপরীত হওয়া: যে বক্তব্য কুরআনের অকাট্য নীতি বা তাওহীদের পরিপন্থী এবং যার কোনো সমন্বয় সম্ভব নয় (যেমন: “ব্যভিচারের সন্তান জান্নাতে যাবে না”)।
৩. সুপ্রতিষ্ঠিত সুন্নাহ ও ঐতিহাসিক সত্যের বিরোধী হওয়া: যা ইসলামের মৌলিক অনুশাসনকে ভেঙে দেয়।
৪. বিবেক ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বাস্তবতার বিপরীত হওয়া: যা সুস্থ বিবেক ও যুক্তি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে।
৫. অসামঞ্জস্যপূর্ণ অতিশয়োক্তি (মুবালাগাহ ফিত ছাওয়াব ওয়াল ইক্বাব): অতি সামান্য কাজের জন্য পাহাড়সম সাওয়াবের দাবি করা, অথবা সামান্য ভুলের জন্য কোটি বছর জাহান্নামের আজাবের ঘোষণা দেওয়া।
জাল হাদীস প্রতিরোধের ঐতিহাসিক ভূমিকা ও উপসংহার: আল্লামা ইবনুল জাওযী রহ.-এর ‘আল-মাওদূ’আত’, ইমাম সুয়ূতী রহ.-এর ‘আল-লাআলী আল-মাসনূ’আহ’ এবং মোল্লা আলী ক্বারী রহ.-এর ‘আল-মাসনূ’ ফী মা’রিফাতিল মাওদূ” ইত্যাদি গ্রন্থসমূহ মুহাদ্দিসদের এই মূলনীতির ভিত্তিতেই রচিত হয়েছে। এই সুদৃঢ় মূলনীতি অনুসরণের মাধ্যমেই উম্মতে মুহাম্মাদী যুগে যুগে রাসুলুল্লাহ সা.-এর পবিত্র সুন্নাহকে সকল প্রকার বিকৃতি, সংযোজন ও মানবীয় হস্তক্ষেপ থেকে সম্পূর্ণ অক্ষত রাখতে সক্ষম হয়েছে।
مجموعة (ب) : تعليقات علمية (الدرجة – ৫ x ১ = ৫)
[علق على واحد مما يلى]
١٣- علق على واحد مما يلى :
[১৩. নিচের যেকোনো একটি বিষয়ের ওপর টীকা লিখুন:]
(أ) حكم الوضع فى الحديث –
[(ক) হাদীসে ওয়াদ্ব বা জালকরণের শরয়ী হুকুম]
ইচ্ছাকৃতভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে মিথ্যা হাদীস তৈরি করা এবং তা সমাজে প্রচার করা ইসলামে অন্যতম নিকৃষ্টতম ধ্বংসাত্মক কবিরা গুনাহ এবং উম্মাহর সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে সম্পূর্ণ হারাম। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মুতাওয়াতির হাদীসে রাসুলুল্লাহ সা. অত্যন্ত কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে ঘোষণা করেছেন: “مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ” (যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার ওপর মিথ্যা আরোপ করল, সে যেন জাহান্নামে তার স্থায়ী ঠিকানা বানিয়ে নেয়)। ইমাম আবু মুহাম্মাদ আল-জুওয়াইনী রহ.-সহ একদল শীর্ষ ফকীহ ও মুহাদ্দিস ফতোয়া দিয়েছেন যে, জেনে-শুনে ইচ্ছাকৃতভাবে শরীয়তের হালালকে হারাম বা হারামকে হালাল করার অসৎ উদ্দেশ্যে হাদীস জালকারী ব্যক্তি কাফের ও মুরতাদ হয়ে যায়। এছাড়া সাধারণ মুসলিমদের জন্য কোনো জাল হাদীসের অসারতা স্পষ্ট না করে ওয়াজের মজলিস, কিতাব বা বয়ানে তা বর্ণনা করা সম্পূর্ণ নাজায়েজ ও হারাম।
(ب) اهم الكتب المؤلفة على الاحاديث الموضوعة –
[(খ) মাওযূ’ ও জাল হাদীস বিষয়ক কালজয়ী গ্রন্থাবলি]
জাল হাদীসের মারাত্মক অনিষ্ট থেকে উম্মতে মুহাম্মাদীকে সতর্ক ও পবিত্র রাখার জন্য শতাব্দীকাল ধরে মুহাদ্দিসগণ নিরলস সাধনায় বহু অনন্য গবেষণামূলক কোষগ্রন্থ সংকলন করেছেন:
১. আল-মাওযূ’আতুল কুবরা: হাফেয আবুল ফারাজ আব্দুর রহমান ইবনুল জাওযী রহ. (ইন্তেকাল ৫৯৭ হি.) রচিত। এটি জাল হাদীস শনাক্তকরণের সর্বপ্রথম সুবিশাল ঐতিহাসিক বিশ্বকোষ।
২. আল-লাআলিল মাসনূ’আহ ফিল আহাদীসিল মাওযূ’আহ: ইমাম জালালুদ্দীন আব্দুর রহমান আস-সুয়ূতী রহ. রচিত। তিনি ইবনুল জাওযীর কিছুটা অতিরিক্ত কঠোরতাকে সংশোধন করে আরও ইনসাফপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন।
৩. তানযীহুশ শারী’আতিল মারফূ’আহ আনিল আহাদীসিস শানী’আতিল মাওযূ’আহ: আল্লামা ইবনে আররাক আল-কিনানী রহ. রচিত অত্যন্ত সুসংহত ও নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ।
৪. আল-আসরারুল মারফূ’আহ ফিল আখবারিল মাওযূ’আহ (আল-মাওযূ’আতুল কাবীর): হানাফী মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস মোল্লা আলী ক্বারী রহ. রচিত।
৫. আল-ফাওয়ায়েদুল মাজমূ’আহ ফিল আহাদীসিল মাওযূ’আহ: আল্লামা ইমাম আশ-শওকানী রহ. রচিত এক প্রামাণ্য সংকলন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: কামিল হাদীস ষষ্ঠ পত্রের বিষয় কোড ও বিষয় কী?
উত্তর: কামিল হাদীস ষষ্ঠ পত্রের বিষয় হলো ‘উলূমুল হাদীস’ এবং এর বিষয় কোড হলো 611206। পূর্ণমান ১০০ নম্বর।
প্রশ্ন ২: ইলমুল হাদীস রিওয়ায়াত ও দিরায়াতের মধ্যে মূল পার্থক্য কী?
উত্তর: রিওয়ায়াত হলো রাসুলুল্লাহ সা.-এর কথা, কাজ ও বৈশিষ্ট্য নির্ভুলভাবে বর্ণনা ও সংরক্ষণ করা; আর দিরায়াত হলো সনদ ও মত্ন যাচাই করে হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা বা বর্জনীয়তা নিরূপণ করা।
প্রশ্ন ৩: হাদীসের পরিভাষায় ‘ইল্লাহ’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ইল্লাহ হলো সনদ বা মত্নের মধ্যে লুক্কায়িত এমন এক সূক্ষ্ম গোপন ত্রুটি, যা বাহ্যিকভাবে হাদিস সহীহ মনে হলেও গভীরভাবে অনুসন্ধানের পর তার বিশুদ্ধতাকে ক্ষুণ্ণ করে।
প্রশ্ন ৪: ‘নাসবুর রায়াহ’ কোন কিতাবের তাখরীজ গ্রন্থ?
উত্তর: আল্লামা যায়লাঈ রহ. রচিত ‘নাসবুর রায়াহ’ হলো হানাফী ফিকহের সুপ্রসিদ্ধ আকর গ্রন্থ ‘আল-হিদায়াহ’-এর হাদীসসমূহের বিশদ প্রামাণ্য তাখরীজ গ্রন্থ।
প্রশ্ন ৫: হাদীস জালকারীদের বিরুদ্ধে রাসুলুল্লাহ সা.-এর ঘোষিত শাস্তি কী?
উত্তর: রাসুলুল্লাহ সা. মুতাওয়াতির হাদীসে ঘোষণা করেছেন: “যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার ওপর মিথ্যা আরোপ করল, সে যেন জাহান্নামে তার স্থায়ী বাসস্থান নির্ধারণ করে নেয়।”
প্রশ্ন ৬: মাওযূ’ বা জাল হাদীস চিহ্নিতকরণের বিখ্যাত কিতাব কোনটি?
উত্তর: ইমাম ইবনুল জাওযী রহ. রচিত ‘আল-মাওযূ’আতুল কুবরা’ এবং ইমাম সুয়ূতী রহ. রচিত ‘আল-লাআলিল মাসনূ’আহ’ এ বিষয়ের সর্বাধিক প্রসিদ্ধ প্রামাণ্য গ্রন্থ।

