আল-আক্বীদাতুল ইসলামিয়্যাহ (Al-Aqidatul Islamiyyah) – 111003, আল-আক্বীদাতুল ইসলামিয়্যাহ – ফাযিল পাস ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪

StudyBoi StudyBoi
September 27, 2026
৯০ মিনিট পড়ার সময়
২ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত পরীক্ষা
اختبار السنة الأولى للفاضل (البكالوريوس)، لعام ۲۰۲۴م
ফাযিল (স্নাতক) পাস প্রথম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪ [নতুন সিলেবাস অনুযায়ী]
উলূমুল কুরআন ওয়াল হাদীস (তৃতীয় পত্র) : আল-আকীদাতুল ইসলামিয়্যাহ (বিষয় কোড: ১১১০০৩)
সময়: ৩ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ১০০
[الملاحظة : أجب عن اثنين من مجموعة (أ) وعن ستة من مجموعة (ب) -]
[দ্রষ্টব্য : (أ) অংশ থেকে দুটি এবং (ب) অংশ থেকে ছয়টি প্রশ্নের উত্তর দাও।]

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন অনুষ্ঠিত ফাযিল স্নাতক (পাস) প্রথম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪-এর উলূমুল কুরআন ওয়াল হাদীস ৩য় পত্র (বিষয় কোড: ১১১০০৩ – আল-আকীদাতুল ইসলামিয়্যাহ) পরীক্ষার মূল প্রশ্নপত্রের সকল প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ, প্রামাণ্য ও গবেষণাধর্মী সমাধান নিচে দেওয়া হলো। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর ‘আল-ফিকহুল আকবর’, ইমাম ত্বাহাবী (রহ.)-এর ‘আল-আকীদা আত-ত্বাহাবিয়্যাহ’ এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের বিশুদ্ধ আকিদার মূলনীতির আলোকে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর সংকলিত হয়েছে।

১। عرف العقيدة الإسلامية لغة واصطلاحا – ثم بين أهميتها وأهم مصطلحاتها –

[‘আল-আকীদা আল ইসলামিয়্যাহ’-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা, এর মৌলিক গুরুত্ব এবং আকাইদের প্রধান পরিভাষাসমূহের পর্যালোচনা]

[মান: ২০]

ভূমিকা ও পটভূমি

ইসলামের সমগ্র সৌধ যে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত, তা হলো ‘আকীদা’। আকীদা হলো অন্তরের অটল বিশ্বাস, যা মানুষের চিন্তা, চেতনা, চরিত্র ও কর্মকে সঠিক পথের দিশা দেয়। আকীদা বিশুদ্ধ না হলে মানুষের কোনো নেক আমলই আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। তাই ইসলামি জ্ঞানজগতে ইলমুল আকাইদকে ‘আশরাফুল উলূম’ বা সর্বশ্রেষ্ঠ শাস্ত্র হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।

العقيدة الإسلامية-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা

  • আভিধানিক অর্থ: ‘আকীদা’ (العقيدة) শব্দটি আরবি ‘আকদুন’ (العَقْدُ) মূলধাতু থেকে গৃহীত, যার আভিধানিক অর্থ হলো দৃঢ়ভাবে গ্রন্থিবদ্ধ করা, শক্ত গিট দেওয়া, পাকাপোক্ত বন্ধন তৈরি করা এবং কোনো বিষয়ে চূড়ান্ত প্রত্যয় গ্রহণ করা। যেমন বলা হয় ‘আকদান নিকাহ’ (বিবাহ বন্ধন)।
  • পারিভাষিক সংজ্ঞা: প্রখ্যাত আলেম আল্লামা জুরজানী (রহ.) তাঁর ‘আত-তারীফাত’ গ্রন্থে সংজ্ঞায়িত করেছেন:

    «العقيدة هي ما يعقد عليه الإنسان ضميره، ويدين به، بحيث لا يقبل الشك والتردد.»

    অর্থাৎ, ‘আকীদা হলো এমন অকাট্য ও দৃঢ় প্রত্যয় যা মানুষ তার অন্তরে মজবুতভাবে বিশ্বাস হিসেবে ধারণ করে এবং ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করে, যাতে কোনো প্রকার সন্দেহ-সংশয় বা দ্বিধা-দ্বন্দ্বের অবকাশ থাকে না।’

  • আল-আকীদা আল-ইসলামিয়্যাহ: ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় আল্লাহ তাআলার রুবূবিয়াত, উলূহিয়াত, আসমা ও সিফাত, ফেরেশতাগণ, আসমানী কিতাবসমূহ, নবী-রাসূলগণ, পরকাল এবং তাকদীরের ভালো-মন্দের ওপর কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর নির্দেশিত পদ্ধতিতে অন্তরের অবিচল বিশ্বাস স্থাপন করার নামই হলো ইসলামি আকীদা।

ইসলামি জীবনে আকীদার অপরিহার্য গুরুত্ব

  • আমল কবুল হওয়ার মূল শর্ত: আকীদা হলো বৃক্ষের শিকড়ের মতো এবং আমল হলো তার শাখা-প্রশাখা। শিকড় নষ্ট হলে পুরো বৃক্ষ যেমন মরে যায়, তেমনি আকীদাহ নষ্ট বা শিরকমুক্ত না হলে কোটি কোটি টাকার দান-সাদাকা ও নফল ইবাদত মুহূর্তেই ধূলিসাৎ হয়ে যায় (সূরা আল-আন’আম: ৮৮)।
  • মানবজীবনের উদ্দেশ্য নির্ধারণ: সঠিক আকীদা মানুষকে জানিয়ে দেয় সে কোথা থেকে এসেছে, কেন তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং মৃত্যুর পর তাকে কোথায় ফিরে যেতে হবে। ফলে মানুষের জীবন অর্থবহ ও লক্ষ্যনিষ্ঠ হয়।
  • অসীম আত্মিক প্রশান্তি ও ভয়হীনতা: যে মুমিনের আকীদা মজবুত, সে জানে লাভ-ক্ষতি, জীবন-মৃত্যু ও রিজিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ। ফলে দুনিয়ার কোনো জালিম শাসক বা বিপদে সে ভেঙে পড়ে না; বরং তার অন্তরে অনাবিল শান্তি বিরাজ করে।
  • উম্মাহর ঐক্য ও সংহতির সেতুবন্ধন: ইসলামি আকীদা ভৌগোলিক সীমানা, ভাষা ও রক্তের কৃত্রিম প্রাচীর ভেঙে সমগ্র বিশ্বের মুসলিমদেরকে এক অভিন্ন তাওহীদী প্ল্যাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ করে।

আকাইদ শাস্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষাসমূহ (أهم مصطلحات العقيدة)

পরিভাষা আভিধানিক অর্থ পারিভাষিক তাৎপর্য
১. আত-তাওহীদ (التوحيد) একত্ববাদ বা এক জানা আল্লাহকে তাঁর সত্তা, গুণাবলী ও ইবাদতের ক্ষেত্রে একক ও অদ্বিতীয় বিশ্বাস করা (তাওহীদে রুবূবিয়াত, উলূহিয়াত ও আসমা-সিফাত)।
২. আল-ঈমান (الإيمان) স্বীকৃতি ও বিশ্বাস স্থাপন নবীজী (সা.) আল্লাহর পক্ষ থেকে যা কিছু এনেছেন তা অন্তরে সত্য বলে বিশ্বাস করা, মুখে স্বীকার করা এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়ে বাস্তবায়ন করা।
৩. আশ-শিরক (الشرك) অংশীদার স্থাপন করা আল্লাহর কোনো সিফাত, ক্ষমতা বা ইবাদতে অন্য কাউকে অংশীদার সাব্যস্ত করা; এটি ক্ষমার অযোগ্য মহাপাপ (যুলমুন আযীম)।
৪. আল-কুফর (الكفر) ঢেকে রাখা বা অস্বীকার দ্বীনের কোনো অকাট্য ও স্বতঃসিদ্ধ বিধান (যেমন সালাত, পরকাল বা রিসালাত) অমান্য বা অস্বীকার করা।
৫. আন-নিফাক্ব (النفاق) দ্বিমুখী প্রতারণা মুখে ঈমান প্রকাশ করা কিন্তু অন্তরে কুফরি ও ইসলামবিদ্বেষ গোপন রাখা। নিফাক্বকারীরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকবে।

উপসংহার

বিশুদ্ধ ইসলামি আকীদা হলো একজন মুমিনের শ্রেষ্ঠ ধন। জাহেলী চিন্তা, কুসংস্কার ও ভ্রান্ত মতবাদ থেকে নিজের আকীদাকে হেফাযত করাই ইহকাল ও পরকালের সফলতার একমাত্র গ্যারান্টি।

২। ما المعجزة؟ ثم اذكر أهم معجزات الرسول صلى الله عليه وسلم –

[মু’জিযার সংজ্ঞা, শর্তাবলি, অন্যান্য অলৌকিক বিষয়ের সাথে পার্থক্য এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শ্রেষ্ঠ মু’জিযাসমূহ]

[মান: ২০]

ভূমিকা ও পটভূমি

আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে মানবজাতিকে হেদায়েতের জন্য নবী ও রাসূল প্রেরণ করেছেন। নবুওয়াত কোনো মানুষের ব্যক্তিগত সাধনার ফল নয়; এটি একান্তই ঐশী দান। স্বীয় নবীদের সত্যতা ও নবুওয়াতের দাবির সপক্ষে আল্লাহ এমন কিছু অলৌকিক নিদর্শন প্রদর্শন করাতেন যা সাধারণ মানবীয় সাধ্যের অতীত। ইসলামি পরিভাষায় একে ‘মু’জিযা’ বলা হয়।

المعجزة-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক পরিচয়

  • আভিধানিক অর্থ: ‘মু’জিযা’ (المعجزة) শব্দটি ‘আজয’ (العجز) ধাতু থেকে নিষ্পন্ন, যার অর্থ হলো অক্ষম করা, অপারগ করা বা পরাভূত করা। যেহেতু এটি প্রত্যক্ষ করে বিপক্ষ শক্তি সম্পূর্ণ হতবুদ্ধি ও অক্ষম হয়ে পড়ে, তাই একে মু’জিযা বলা হয়।
  • পারিভাষিক সংজ্ঞা: আল্লামা জুরজানী ও শীর্ষ আকাইদবিদদের মতে:

    «أمر خارق للعادة، يظهره الله على يد مدعي النبوة، موافقا لدعواه، مقرونا بالتحدي، مع عدم المعارضة.»

    অর্থাৎ, ‘মু’জিযা হলো প্রকৃতির স্বভাবিক নিয়মের পরিপন্থী এমন এক অলৌকিক ঘটনা, যা আল্লাহ তাআলা নবুওয়াতের দাবিদারের সত্যতা প্রমাণের স্বার্থে তাঁর হাতে প্রকাশ করেন; যা নবীর দাবির সাথে হুবহু সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, বিরোধীদের মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ সম্বলিত হয় এবং বিপক্ষ দল যার সমকক্ষ কিছু তৈরি করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়।’

  • মু’জিযার প্রধান শর্তাবলি: এটি স্বভাববিরুদ্ধ অলৌকিক হতে হবে, আল্লাহর সরাসরি কুদরতে নবীর হাতে ঘটতে হবে, নবুওয়াতের দাবির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে এবং কেউ এর প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবে না। (যদি এমন ঘটনা অলী-বুজুর্গের হাতে ঘটে তবে তা ‘কারামত’, সাধারণ মুমিনের ক্ষেত্রে ‘মাঊনাত’ এবং কাফের-ফাসেকের হাতে ঘটলে তা ‘ইসতিদরাজ’ বলে)।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক মু’জিযাসমূহ

বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনে শত শত মু’জিযা সংঘটিত হয়েছিল। ইমাম নববী ও ইবনুল কায়্যিম (রহ.)-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী তাঁর শ্রেষ্ঠ মু’জিয়াসমূহ নিচে বিশদভাবে তুলে ধরা হলো:

  • ১. মহাগ্রন্থ আল-কুরআন (সর্বশ্রেষ্ঠ চিরন্তন মু’জিযা): পূর্ববর্তী সকল নবীদের মু’জিযা ছিল সাময়িক ও চাক্ষুষ—যা তাঁদের মৃত্যুর সাথে সাথে শেষ হয়ে গেছে (যেমন মূসা আ.-এর লাঠি বা ঈসা আ.-এর মৃতকে জীবিত করা)। কিন্তু কুরআন হলো বুদ্ধিবৃত্তিক এক চিরন্তন অলৌকিক মু’জিযা, যা কিয়ামত পর্যন্ত অম্লান থাকবে। আরবের শীর্ষ বাগ্মী কবি ও সাহিত্যিকদের এই কুরআনের একটি সূরার মতো সূরা রচনার চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়েছিল (সূরা আল-ইসরা: ৮৮), কিন্তু আজ পর্যন্ত সমগ্র মানবজাতি তা তৈরি করতে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
  • ২. চন্দ্র দ্বিখণ্ডিতকরণ (ইনশিক্বাকুল ক্বামার): মক্কার মুশরিকরা যখন নবুওয়াতের সত্যতার চাক্ষুষ প্রমাণ চাইল, তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) পূর্ণিমার চাঁদের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করলেন এবং আল্লাহর হুকুমে চাঁদটি দ্বিখণ্ডিত হয়ে এক খণ্ড হেরা পর্বতের এক পাশে এবং অপর খণ্ড অন্য পাশে দৃশ্যমান হলো (সূরা আল-ক্বামার: ১-২)। কাফেররা নিজেদের চোখে তা প্রত্যক্ষ করেও হঠকারিতাবশত একে জাদু বলে আখ্যা দেয়।
  • ৩. ঐতিহাসিক ইসরা ও মিরাজ: এক রাতের অতি স্বল্প সময়ে মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে বায়তুল মুকাদ্দাসে সান্ধ্যকালীন ভ্রমণ (ইসরা) এবং সেখান থেকে সপ্তাকাশ ও সিদরাতুল মুনতাহা পেরিয়ে স্বয়ং মহান রাব্বুল আলামীনের সান্নিধ্যে আরোহণ (মিরাজ) ছিল স্থান-কালের সীমানা অতিক্রমকারী মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ অলৌকিক পরিভ্রমণ।
  • ৪. অঙ্গুলিসমূহ থেকে পানির ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হওয়া: হুদাইবিয়ার প্রান্তরে এবং তাবুক যুদ্ধে সাহাবায়ে কেরাম যখন চরম পানির সংকটে পড়লেন, তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) একটি ছোট পাত্রে নিজের হাত রাখলেন। সাথে সাথে তাঁর পবিত্র আঙুলগুলোর ফাঁক দিয়ে সুমিষ্ট পানির ঝর্ণা উথলে উঠতে লাগল। সহীহ বুখারীর বর্ণনায় হযরত জাবের (রা.) বলেন: আমরা পনের শত তৃষ্ণার্ত সাহাবী তৃপ্তিভরে পানি পান করলাম এবং সমস্ত পাত্র পূর্ণ করলাম; আমরা এক লক্ষ হলেও সেই পানি যথেষ্ট হতো!
  • ৫. হান্নানাহ গাছের কান্না: মসজিদে নববীতে খেজুর গাছের একটি শুকনো গুঁড়িতে হেলান দিয়ে নবীজী খুতবা দিতেন। পরবর্তীতে যখন কাঠের মিম্বর তৈরি হলো এবং নবীজী গুঁড়িটি ছেড়ে মিম্বরে দাঁড়ালেন, তখন গুঁড়িটি থেকে ছোট বাচ্চার মতো ফুঁপিয়ে কান্নার করুণ আওয়াজ পুরো মসজিদে ছড়িয়ে পড়ল। নবীজী নেমে এসে সস্নেহে হাত বুলিয়ে জড়িয়ে ধরলে তা শান্ত হলো।
  • ৬. স্বল্প খাদ্যে অভাবনীয় বরকত: খন্দকের যুদ্ধে হযরত জাবের (রা.)-এর ঘরে মাত্র একটি ছোট বকরির বাচ্চা ও এক সা’ যবের রুটি দিয়ে নবীজী বরকতের দোয়া করে এক হাজার ক্ষুধার্থ সাহাবীকে তৃপ্তিভরে আহার করালেন, অথচ খাবার যেমন ছিল তেমনই অবশিষ্ট রইল।

উপসংহার

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর এই অকাট্য মু’জিযাসমূহ প্রমাণ করে যে তিনি সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য প্রেরিত সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ সত্য নবী এবং তাঁর আনীত ইসলামই হলো বিশ্বমানবতার একমাত্র সত্য জীবনবিধান।

৩। ما معنى الكفر؟ وكم قسما له؟ بين مفصلا –

[কুফরের আভিধানিক ও শারঈ পরিচয়, এর মৌলিক প্রকারভেদ এবং ঈমান বিনষ্টকারী কারণসমূহের বিশদ রূপরেখা]

[মান: ২০]

ভূমিকা ও পটভূমি

ইসলামের মূল দাবি হলো ঈমান বা আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ আনুগত্য। ঈমানের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরু হলো ‘কুফর’। কুফর হলো এমন এক মারাত্মক আত্মিক ব্যাধি যা মানুষের অনন্ত পরকালীন জীবনকে চিরতরে ধ্বংস করে দেয়। আকাইদ শাস্ত্রে ঈমানের পরিচয় জানার পাশাপাশি কুফরের স্বরূপ উদ্ঘাটন করা অত্যন্ত আবশ্যক, যাতে অজান্তে কুফরের অতল গহ্বরে নিপতিত হওয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করা যায়।

الكفر-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা

  • আভিধানিক অর্থ: ‘কুফর’ (الكفر) শব্দের মূল অর্থ হলো ঢেকে ফেলা, আবৃত করা বা গোপন করা (الستر والتغطية)। রাতে অন্ধকার যখন সমগ্র পৃথিবীকে ঢেকে দেয় তখন রাতকে আরবিতে ‘কাফের’ বলা হয়; আবার কৃষক যখন মাটির নিচে বীজ পুঁতে ঢেকে দেয় তখন কৃষককেও রূপক অর্থে ‘কাফের’ বলা হয় (সূরা আল-হাদীদ: ২০)।
  • পারিভাষিক সংজ্ঞা: শরিয়তের পরিভাষায়:

    «هو إنكار شيء مما جاء به الرسول صلى الله عليه وسلم، وعُلم من الدين بالضرورة.»

    অর্থাৎ, ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর পক্ষ থেকে যা কিছু নিয়ে এসেছেন তার কোনো একটি স্বতঃসিদ্ধ ও অকাট্য দ্বীনি বিষয়কে (যেমন আল্লাহর একত্ববাদ, সালাত, যাকাত, পরকাল বা হারাম বস্তু) অস্বীকার বা প্রত্যাখ্যান করার নামই হলো কুফর।’

কুফরের প্রধান প্রকারভেদ (أقسام الكفر)

আকাইদবিদ ও উসূলী ইমামগণের বিশ্লেষণ অনুযায়ী কুফর প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত: কুফরে আকবার (বড় কুফর) এবং কুফরে আসগার (ছোট কুফর)।

১. কুফরে আকবার (الكفر الأكبر – যা মিল্লাত থেকে বের করে দেয়)

এটি এমন কুফর যার কারণে মানুষ ইসলাম থেকে সম্পূর্ণ খারিজ হয়ে যায় এবং তওবা ছাড়া মৃত্যুবরণ করলে জাহান্নামে চিরস্থায়ী হবে। এটি প্রধানত পাঁচ ভাগে বিভক্ত:

প্রকার আরবি নাম স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য ঐতিহাসিক ও কুরআনী দৃষ্টান্ত
১. অস্বীকারমূলক কুফর كفر التكذيب আল্লাহর কোনো বাণী, নবী বা বিধানকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা। আবু জাহেল ও মক্কার কাফেরদের কুফর (সূরা আল-আনকাবূত: ৬৮)।
২. অহংকারমূলক কুফর كفر الإباء والاستكبار সত্যকে অন্তরে জানা সত্ত্বেও অহংকার ও দাম্ভিকতাবশত মানতে অস্বীকৃতি জানানো। স্বয়ং ইবলিসের কুফর; সে আল্লাহর অস্তিত্ব জানত কিন্তু অহংকারে সেজদা করেনি (সূরা বাকারা: ৩৪)।
৩. সংশয়মূলক কুফর كفر الشك والظن পরকাল, হিসাব-নিকাশ বা কুরআনের সত্যতা নিয়ে মনে সন্দেহ পোষণ করা। সূরা আল-কাহাফের দুই বাগানওয়ালার কাহিনী (আয়াত: ৩৫-৩৬)।
৪. বিমুখতামূলক কুফর كفر الإعراض দ্বীনের দাওয়াত শোনা বা শেখা থেকে সম্পূর্ণ মুখ ফিরিয়ে উদাসীন থাকা। সূরা আল-আহক্বাফের ৩ নম্বর আয়াত: কাফেররা যা নিয়ে সতর্ক করা হয়েছে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
৫. কপটতামূলক কুফর كفر النفاق মুখে ঈমানের নাটক করা কিন্তু অন্তরে কুফর লুকিয়ে রাখা। আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ও মদিনার মুনাফিকদের কুফর (সূরা বাকারা: ১৪)।

২. কুফরে আসগার (الكفر الأصغر – যা মিল্লাত থেকে বের করে না)

একে ‘কুফরুন দূনা কুফর’ বা কর্মগত কুফর বলা হয়। এর দ্বারা মানুষ কাফের বা ইসলামত্যাগী হয় না, তবে চরম কবিরা গুনাহগার ও ফাসেক হিসেবে সাব্যস্ত হয়:

  • আল্লাহর নেয়ামতের অকৃতজ্ঞতা (কুফরানুন নি’মাহ): আল্লাহর দেওয়া সম্পদ, সুস্বাস্থ্য বা নেয়ামত ভোগ করে শুকরিয়া আদায় না করে পাপকাজে ব্যবহার করা।
  • মুসলিম ভাইয়ের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ: হাদীসে ইরশাদ হয়েছে: ‘কোনো মুসলিমকে গালি দেওয়া ফাসেকী এবং তার সাথে যুদ্ধ করা কুফরী।’ (সহীহ বুখারী)। এখানে কুফরী বলতে কবিরা গুনাহ বোঝানো হয়েছে।
  • মৃতের জন্য জাহেলী বিলাপ করা ও বংশমর্যাদা নিয়ে খোঁটা দেওয়া: হাদীসে এগুলোকে কুফরের স্বভাব বলা হয়েছে।

উপসংহার

কুফরের ভয়াবহতা থেকে বেঁচে থাকা প্রতিটি মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় লড়াই। বিশেষত বড় কুফরের কোনো একটি শাখা স্পর্শ করলেই বান্দার সমস্ত আমল বিনষ্ট হয়ে চিরস্থায়ী জাহান্নামের পথ প্রশস্ত হয়।

৪। قارن بين كتاب “الفقه الأكبر” للإمام أبي حنيفة و”العقيدة الطحاوية” للإمام الطحاوي –

[ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর ‘আল-ফিকহুল আকবর’ এবং ইমাম তাহাবী (রহ.)-এর ‘আল-আকীদা আত-ত্বাহাবিয়্যাহ’ গ্রন্থের গভীর তুলনামূলক পর্যালোচনা]

[মান: ২০]

ভূমিকা ও পটভূমি

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদাকে প্রামাণ্যভাবে সংকলন ও সংরক্ষণের ইতিহাসে যে দুজন মহান ইমাম অমর হয়ে আছেন, তাঁরা হলেন ইমামে আযম আবু হানীফা নু’মান ইবনে সাবিত (রহ.) [৮০-১৫০ হি.] এবং ইমাম আবু জাফর আহমাদ ইবনে মুহাম্মদ আত-ত্বাহাবী (রহ.) [২৩৯-৩২১ হি.]। ইমাম আবু হানীফার ‘আল-ফিকহুল আকবর’ হলো মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসের প্রথম প্রামাণ্য আকিদা সংকলন, আর ইমাম ত্বাহাবীর ‘আল-আকীদা আত-ত্বাহাবিয়্যাহ’ হলো সেই মূলভিত্তির ওপর রচিত এক পরিপূর্ণ শাস্ত্রীয় মাস্টারপিস।

গ্রন্থদ্বয়ের ঐতিহাসিক পটভূমি ও রচনাকালীন প্রেক্ষাপট

  • আল-ফিকহুল আকবর (الفقه الأكبر): হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দীর প্রথমার্ধে যখন মুতাযিলা, খারেজী, ক্বাদারিয়া, জাহমিয়া ও শিয়া সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটে মুসলিম সমাজে বুদ্ধিবৃত্তিক বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছিল, তখন ইমাম আবু হানীফা ফিকহের পাশাপাশি আকিদার মূল নীতিমালা রক্ষার জন্য এই অমূল্য গ্রন্থটি প্রণয়ন করেন। তিনি ফিকহকে দুই ভাগে ভাগ করেন—ফিকহে আসগার (আইন ও আমল) এবং ফিকহুল আকবর (আকীদা ও ঈমান)।
  • আল-আকীদা আত-ত্বাহাবিয়্যাহ (العقيدة الطحاوية): হিজরি তৃতীয় শতাব্দীর শেষভাগে ইমাম ত্বাহাবী এই গ্রন্থটি রচনা করেন। তিনি গ্রন্থের প্রারম্ভেই স্পষ্ট ঘোষণা করেন: ‘এটি হলো মিল্লাতের ফকীহ ইমাম আবু হানীফা, ইমাম আবু ইউসুফ এবং ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর অনুসৃত বিশুদ্ধ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদার প্রামাণ্য বিবরণ।’ অর্থাৎ এটি মূলত ইমাম আবু হানীফার আকিদারই এক পূর্ণাঙ্গ, বিস্তারিত ও পরিমার্জিত রূপ।

গ্রন্থদ্বয়ের মধ্যে বিশদ তুলনামূলক বিশ্লেষণ

তুলনামূলক ক্ষেত্র আল-ফিকহুল আকবর (ইমাম আবু হানীফা রহ.) আল-আকীদা আত-ত্বাহাবিয়্যাহ (ইমাম ত্বাহাবী রহ.)
১. বিষয়বস্তুর উপস্থাপন ও বিন্যাস অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, প্রামাণ্য সূত্রাকারে রচিত মৌলিক ঘোষণাপত্র (Aphoristic style)। ১০৫টি সুস্পষ্ট অনুচ্ছেদে সুবিন্যস্ত, পূর্ণাঙ্গ ও প্রাঞ্জল সংকলন।
২. কালামী বিতর্কের প্রভাব তৎকালীন যুগের বিতর্ক—যেমন কুরআন সৃষ্ট নাকি অসৃষ্ট (খালক্বুল কুরআন), আমল ও ঈমানের সম্পর্ক এবং তাকদীরের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কালামশাস্ত্রের জটিল বিতর্ক এড়িয়ে সরাসরি সালাফ ও আহলে সুন্নাহর বিশুদ্ধ আকিদাকে প্রামাণ্যভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
৩. আল্লাহর সিফাত (গুণাবলী) সংক্রান্ত নীতি ইমাম আবু হানীফা বলেন: আল্লাহর জন্য হাত, মুখ ও নফস রয়েছে কোনো প্রকার সাদৃশ্য ও রূপহীনভাবে (بلا تشبيه ولا تعطيل)। ইমাম ত্বাহাবী একই নীতি অবলম্বন করে বলেন: আল্লাহ কোনো দিক, সীমা, অঙ্গ বা সৃষ্ট বস্তুর সীমাবদ্ধতা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র।
৪. কবিরা গুনাহগার ব্যক্তির বিধান খারেজীদের খণ্ডন করে বলেন: কবিরা গুনাহের কারণে কোনো মুমিন কাফের হয় না; সে ফাসেক মুমিন। হুবহু একই আকিদা জোরালো ভাষায় ব্যক্ত করেন: আহলে কিবলার কাউকে কবিরা গুনাহ হালাল না জানা পর্যন্ত কাফের বলা যাবে না।
৫. সাহাবায়ে কেরাম ও খিলাফতের মর্যাদা খুলাফায়ে রাশেদীনের শ্রেষ্ঠত্ব তাঁদের খিলাফতের ধারাবাহিকতা অনুযায়ী নির্ধারণ করেছেন। সাহাবায়ে কেরামকে ভালোবাসা দ্বীনের অংশ এবং তাঁদের কাউকে ঘৃণা করা কুফর ও নিফাক বলে ঘোষণা করেছেন।

উভয় গ্রন্থের অভিন্ন মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি

  • উভয় গ্রন্থই সালাফে সালেহীন ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মধ্যপন্থী ও ভারসাম্যপূর্ণ আকিদার প্রতিনিধিত্ব করে।
  • উভয় গ্রন্থেই মুতাযিলাদের যুক্তিবাদ এবং জাহমিয়াদের নাস্তিক্যবাদী ব্যাখ্যাকে অকাট্য দলীলে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
  • উভয় গ্রন্থ মুসলিম উম্মাহকে তাকফীর (নির্বিচারে কাফের ফতোয়া দেওয়া) ও চরমপন্থা থেকে মুক্ত রাখার মূলনীতি শিক্ষা দেয়।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, ‘আল-ফিকহুল আকবর’ হলো ইসলামি আকিদার ভিত্তিপ্রস্তর, আর ‘আল-আকীদা আত-ত্বাহাবিয়্যাহ’ হলো সেই ভিত্তির ওপর নির্মিত এক সুদৃশ্য সুরম্য প্রাসাদ। উভয় গ্রন্থ আজও বিশ্বের সকল নির্ভরযোগ্য ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদরাসায় আকিদার মূল পাঠ্য হিসেবে সমাদৃত।

৫। ما مفهوم الإيمان بالملائكة؟ أوضح –

[ফেরেশতাদের প্রতি ঈমানের তাৎপর্য, তাঁদের সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্য, দায়িত্ব এবং মুমিনের জীবনে এর প্রভাব]

[মান: ১০]

ভূমিকা ও পটভূমি

আল্লাহ তাআলার অসীম সৃষ্টিজগতের এক বিশাল ও মহিমান্বিত সৃষ্টি হলো ‘মালাইকাহ’ বা ফেরেশতাকুল। ঈমানের ছয়টি মৌলিক রুকনের মধ্যে আল্লাহর প্রতি ঈমানের পরেই ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান আনাকে ফরজ করা হয়েছে (সূরা আল-বাকারা: ২৮৫)। ফেরেশতাদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা কুরআনের অকাট্য আয়াতকে অস্বীকার করার শামিল।

الإيمان بالملائكة-এর মৌলিক অর্থ ও ধারণা

ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান আনার অর্থ হলো অন্তরে দৃঢ়ভাবে এই বিশ্বাস স্থাপন করা যে:

  • ফেরেশতাগণ আল্লাহর এক সম্মানিত ও অদৃশ্য সৃষ্টি, যাদের আল্লাহ স্বীয় নূর বা জ্যোতি থেকে সৃষ্টি করেছেন। নবীজী (সা.) ইরশাদ করেন: ‘ফেরেশতাদের সৃষ্টি করা হয়েছে নূর থেকে, জিনদের সৃষ্টি করা হয়েছে ধোঁয়াযুক্ত অগ্নিশিখা থেকে এবং আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে মাটি থেকে।’ (সহীহ মুসলিম)।
  • তাঁরা পুরুষও নন, নারীও নন; তাঁদের কোনো ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ক্লান্তি, নিদ্রা বা প্রজনন চাহিদা নেই।
  • তাঁরা কখনোই আল্লাহর কোনো আদেশের অবাধ্য হন না; আল্লাহ তাঁদেরকে যা নির্দেশ করেন তাঁরা অবিরাম তা-ই পালন করেন (সূরা আত-তাহরীম: ৬)।
  • তাঁদের সুনির্দিষ্ট নাম, পদমর্যাদা ও দায়িত্ব রয়েছে যা কুরআন ও সহীহ সুন্নাহয় বর্ণিত হয়েছে।

শীর্ষ চার প্রধান ফেরেশতা ও তাঁদের বিশেষ দায়িত্ব

  • ১. হযরত জিবরাঈল (আ.): রুহুল কুদুস ও রুহুল আমীন; নবী-রাসূলগণের কাছে আল্লাহর ওহী পৌঁছানোর সুমহান দায়িত্বে নিয়োজিত।
  • ২. হযরত মীকাঈল (আ.): সৃষ্টিজগতের প্রাকৃতিক শৃঙ্খলা, বৃষ্টিবর্ষণ এবং জীবিকার বণ্টনে নিয়োজিত।
  • ৩. হযরত ইসরাফীল (আ.): শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত; তাঁর প্রথম ফুঁকে সমগ্র মহাবিশ্ব ধ্বংস হবে এবং দ্বিতীয় ফুঁকে পুনরুত্থান ঘটবে।
  • ৪. হযরত মালাকুল মাউত / আযরাঈল (আ.): সৃষ্টির প্রাণ হরণের দায়িত্বে নিয়োজিত।

ফেরেশতাদের প্রতি ঈমানের আধ্যাত্মিক সুফল

  • আল্লাহর অসীম ক্ষমতা ও মহিমা সম্পর্কে অন্তরে গভীর উপলব্ধি তৈরি হওয়া।
  • কিরামান কাতিবীন (আমল লেখক ফেরেশতাগণ) সার্বক্ষণিক সাথে আছেন জেনে গোপনে ও প্রকাশ্যে পাপ কাজ থেকে বিরত থাকা।
  • একাকীত্ব ও বিপদের মুহূর্তে মুমিনের অন্তরে সাহস সঞ্চার হওয়া যে আল্লাহর অগণিত ফেরেশতা মুমিনদের সাহায্য ও দোয়ায় নিয়োজিত রয়েছেন।

উপসংহার

ফেরেশতাদের প্রতি বিশুদ্ধ ঈমান মানুষের নৈতিক চরিত্রকে নিষ্কলুষ করে এবং এক আল্লাহর সার্বক্ষণিক উপস্থিতির জীবন্ত অনুভূতি জাগ্রত রাখে।

৬। تحدث عن الإيمان بالحوض والشفاعة –

[কিয়ামতের ময়দানে ‘হাওযে কাউসার’ এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুমহান ‘শাফাআত’-এর প্রতি ঈমানের বিশদ পর্যালোচনা]

[মান: ১০]

ভূমিকা ও পটভূমি

কিয়ামতের বিভীষিকাময় দিনে যখন সমগ্র মানবজাতি চরম পিপাসা, ক্লান্তি ও আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে পড়বে, তখন মুমিনদের জন্য আল্লাহ তাআলার বিশেষ নিয়ামত ও স্বস্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে ‘হাওযে কাউসার’ এবং বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.)-এর শাফাআত। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো এই দুই মহাসত্যের ওপর অটল বিশ্বাস রাখা।

১. হাওযের প্রতি ঈমান (الإيمان بالحوض)

  • স্বরূপ ও পরিচয়: আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে কিয়ামতের ময়দানে এক সুপ্রশস্ত পানির আধার বা হাওয দান করবেন, যাকে ‘হাওযে কাউসার’ বলা হয়। বহু সাহাবী থেকে বর্ণিত মুতাওয়াতির হাদীস দ্বারা এর অস্তিত্ব অকাট্যভাবে প্রমাণিত।
  • হাওযের অনন্য বৈশিষ্ট্য:
    • এর পানি দুধের চেয়েও সাদা, বরফের চেয়েও শীতল এবং মধুর চেয়েও সুমিষ্ট। এর সুবাস মিশকের চেয়েও মনমাতানো।
    • এর দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ এক মাসের দূরত্বের সমান (যেমন মদিনা থেকে আম্মান বা সান’আ পর্যন্ত বিস্তৃত)।
    • এর পানপাত্রের সংখ্যা আকাশের তারকারাজির মতো অসংখ্য ও উজ্জ্বল।
    • যে ব্যক্তি একবার এর পানি পান করবে, সে আর কখনো তৃষ্ণার্ত হবে না এবং চিরদিনের জন্য তৃপ্ত হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
  • বঞ্চিত শ্রেণি: যারা নবীজীর সুন্নাত পরিবর্তন করেছিল এবং দ্বীনের ভেতর নতুন নতুন বিদআত ও কুসংস্কার সৃষ্টি করেছিল, তাদেরকে ফেরেশতাগণ তাড়িয়ে দেবে এবং নবীজী বলবেন: ‘দূর হয়ে যাও, দূর হয়ে যাও!’

২. শাফাআতের প্রতি ঈমান (الإيمان بالشفاعة)

  • সংজ্ঞা: শাফাআত অর্থ সুপারিশ করা। কিয়ামতের দিন আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে নবী-রাসূল ও নেককার বান্দাগণ পাপীদের মুক্তির জন্য যে সুপারিশ করবেন তাকে শাফাআত বলে।
  • শাফাআতের শর্তাবলি: কুরআন অনুযায়ী দুটি শর্ত আবশ্যক—১. আল্লাহর পূর্বানুমতি (من ذا الذي يشفع عنده إلا بإذنه) এবং ২. যার জন্য সুপারিশ করা হবে তার প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টি (সূরা আল-আম্বিয়া: ২৮)। মুশরিক ও কাফেরদের জন্য কোনো শাফাআত হবে না।
  • শাফাআতের প্রকারভেদ:
    • শাফাআতে কুবরা (সর্বশ্রেষ্ঠ সুপারিশ বা মাক্বামে মাহমুদ): এটি এককভাবে বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্য নির্ধারিত। হাশরের মাঠে চরম দুর্দশায় সমস্ত নবী যখন অপারগতা প্রকাশ করবেন, তখন নবীজী সিজদায় পড়ে হিসাব-নিকাশ শুরু করানোর সুপারিশ করবেন।
    • উম্মতের কবিরা গুনাহগারদের জন্য সুপারিশ: নবীজী বলেন: ‘আমার শাফাআত আমার উম্মতের কবিরা গুনাহগারদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে।’ (আবু দাউদ ও তিরমিযী)। মুতাযিলা ও খারেজীরা এই শাফাআত অস্বীকার করে চরম ভ্রষ্টতায় লিপ্ত হয়েছে।
    • জান্নাতীদের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য সুপারিশ।

উপসংহার

হাওয ও শাফাআতের প্রতি ঈমান মুমিনের অন্তরে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার জোয়ার সৃষ্টি করে এবং সুন্নাহর ওপর অটল থাকার প্রেরণা জোগায়।

৭। ما المراد بنواقض الإيمان؟ بين مع أنواعها –

[‘নাওয়াক্বিদুল ঈমান’ বা ঈমান ভঙ্গকারী বিষয়ের পরিচয় এবং এর প্রধান প্রকারসমূহের বিশদ রূপরেখা]

[মান: ১০]

ভূমিকা ও পটভূমি

যেভাবে ওযু বা সালাতের কিছু নির্দিষ্ট কারণ সংঘটিত হলে তা ভেঙে যায় এবং বাতিল হয়ে যায়, ঠিক তেমনি মানবজীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ ‘ঈমান’-ও কিছু নির্দিষ্ট জঘন্য কর্মকাণ্ডের দ্বারা সমূলে বিনষ্ট হয়ে যায়। এই ঈমান বিনাশী কারণসমূহকে শরিয়তের পরিভাষায় ‘নাওয়াক্বিদুল ঈমান’ (نواقض الإيمان) বলা হয়।

نواقض الإيمان-এর অর্থ ও তাৎপর্য

  • আভিধানিক অর্থ: ‘নাওয়াক্বিদ’ (نواقض) শব্দটি ‘নাক্বদ’ (نقض)-এর বহুবচন, যার অর্থ ভেঙে ফেলা, বাতিল করা, ধ্বংস করা বা চুক্তি ভঙ্গ করা। যেমন ছেঁড়া সুতোকে ‘নাক্বদ’ বলা হয়।
  • পারিভাষিক সংজ্ঞা: যেসব বিশ্বাস, কথা বা কাজের কোনো একটি সংঘটিত হওয়ার সাথে সাথে বান্দার অন্তরের ঈমান বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং সে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের হয়ে মুরতাদ ও কাফেরে পরিণত হয়, তাকে নাওয়াক্বিদুল ঈমান বলে।

নাওয়াক্বিদুল ঈমানের প্রধান প্রধান প্রকার ও দৃষ্টান্তসমূহ

ইমাম মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব (রহ.) এবং আহলে সুন্নাতের ফকীহগণ প্রধান দশটি মৌলিক নাওয়াক্বিদ উল্লেখ করেছেন:

  • ১. আল্লাহর ইবাদতে শিরক করা: মাজার, কবর, মূর্তি বা কোনো সৃষ্টিকে সেজদা করা, তাদের নামে মানত করা কিংবা তাদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা।
  • ২. আল্লাহ ও বান্দার মাঝে মধ্যস্থতাকারী সাব্যস্ত করা: কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ সুপারিশকারী মনে করে তার উপাসনা করা।
  • ৩. মুশরিক ও কাফেরদের কাফের মনে না করা: ইয়াহুদি, খ্রিস্টান, হিন্দু বা সুস্পষ্ট কাফেরদের কুফরে সন্দেহ পোষণ করা বা তাদের পথকে সঠিক মনে করা।
  • ৪. নবীজী (সা.)-এর হেদায়েত ছাড়া অন্য কারও বিধানকে শ্রেষ্ঠ মনে করা: মানব রচিত আইন, পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র বা ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদকে আল্লাহর শরিয়তের আইনের চেয়ে উত্তম বা আধুনিক বলে বিশ্বাস করা।
  • ৫. রাসূলুল্লাহ (সা.) আনীত কোনো বিধানকে ঘৃণা করা: অন্তরে পর্দা, জিহাদ, দাড়ি বা বহুবিবাহের মতো কোনো শরঈ বিধানের প্রতি ঘৃণা পোষণ করা (যদিও বাহ্যিকভাবে তা পালন করে)।
  • ৬. দ্বীনের কোনো বিষয় নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা: আল্লাহ, কুরআন, রাসুল (সা.), দাড়ি, মিসওয়াক বা জান্নাত-জাহান্নাম নিয়ে উপহাস করা (সূরা আত-তাওবাহ: ৬৫-৬৬)। এতে মানুষ সরাসরি কাফের হয়ে যায়।
  • ৭. জাদু করা বা জাদুতে সন্তুষ্ট থাকা: তন্ত্র-মন্ত্র, কুফরি কালাম বা শয়তানের সাহায্য নিয়ে মানুষের ক্ষতি বা বশীকরণ করা।
  • ৮. মুসলমানদের বিরুদ্ধে মুশরিক ও কাফেরদের সহায়তা করা: ইসলাম ও মুসলমানদের ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে অমুসলিম আগ্রাসীদের প্রত্যক্ষ সাহায্য করা।
  • ৯. বিশ্বাস করা যে কারও কারও জন্য শরিয়তের বাইরে চলার অবকাশ আছে: যেমন কোনো কোনো ভণ্ড সুফী দাবি করে যে অমুক ওলীর জন্য সালাত বা রোযা মাফ হয়ে গেছে।
  • ১০. দ্বীন ইসলাম শেখা ও আমল করা থেকে সম্পূর্ণ মুখ ফিরিয়ে উদাসীন থাকা।

উপসংহার

নাওয়াক্বিদুল ঈমান সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রতিটি মুসলিমের আত্মরক্ষার জন্য ফরজ, যেন নিজের অজ্ঞাতসারে ঈমান হারিয়ে চিরস্থায়ী ক্ষতির মুখোমুখি হতে না হয়।

৮। ما معنى البدعة لغة وشرعا؟ ثم اذكر بعض البدع المروجة في المجتمع –

[বিদআতের আভিধানিক ও শারঈ সংজ্ঞা, এর ভয়াবহ ক্ষতি এবং সমাজে প্রচলিত ক্ষতিকর বিদআতের দৃষ্টান্ত]

[মান: ১০]

ভূমিকা ও পটভূমি

দ্বীন ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ, নিখুঁত ও সংরক্ষিত জীবনবিধান। মহান আল্লাহ বিদায় হজে ঘোষণা করেছেন: ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম।’ দ্বীন পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর সওয়াবের নিয়তে শরিয়তে নতুন কিছু সংযোজন বা বিয়োজন করাই হলো ‘বিদআত’। বিদআত হলো সুন্নাতের চরম শত্রু যা ইসলামকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে দেয়।

البدعة-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক স্বরূপ

  • আভিধানিক অর্থ: ‘বিদআত’ (البدعة) শব্দটি ‘বাদাআ’ (بدع) ধাতু থেকে নিষ্পন্ন, যার অর্থ পূর্ব নমুনা ছাড়া সম্পূর্ণ নতুন কোনো বস্তু সৃষ্টি বা আবিষ্কার করা। যেমন আল্লাহকে বলা হয় ‘বাদীউস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ’ (নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের পূর্ব নমুনা ছাড়া সৃষ্টিকর্তা)।
  • পারিভাষিক সংজ্ঞা: প্রখ্যাত ফকীহ ইমাম শাতবী (রহ.) স্বীয় অমর গ্রন্থ ‘আল-ই’তিসাম’-এ সর্বশ্রেষ্ঠ সংজ্ঞায় উল্লেখ করেছেন:

    «البدعة طريقة في الدين مخترعة، تضاهي الشريعة، يقصد بالسلوك عليها المبالغة في التعبد لله سبحانه.»

    অর্থাৎ, ‘বিদআত হলো দ্বীনের মধ্যে নব আবিষ্কৃত এমন এক পদ্ধতি, যা শরিয়তের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ মনে হয় এবং যার ওপর আমল করার উদ্দেশ্য থাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অতিরিক্ত ইবাদতের সওয়াব লাভ করা।’

  • রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: ‘যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের ভেতর নতুন কিছু উদ্ভাবন করল যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়, তা সরাসরি প্রত্যাখ্যাত।’ (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)। অপর হাদীসে তিনি বলেন: ‘প্রতিটি নতুন উদ্ভাবনই বিদআত, আর প্রতিটি বিদআতই গোমরাহী, আর প্রতিটি গোমরাহীর পরিণতি হলো জাহান্নাম।’

বর্তমানে সমাজে প্রচলিত কিছু মারাত্নক বিদআতের দৃষ্টান্ত

  • ১. কবর ও মাজারপূজা কেন্দ্রিক বিদআতসমূহ: মাজারে সিজদা করা, কবরে গিলাফ ও চাদর চড়ানো, মৃত পীর বা বুজুর্গের কাছে সন্তান বা বরকত প্রার্থনা করা এবং সেখানে আলোকসজ্জা ও ওরস উদযাপনের নামে নাচ-গান করা।
  • ২. মিলাদ ও কিয়ামের ক্ষেত্রে অতিরঞ্জন: নবীজী (সা.) সশরীরে মজলিসে হাজির হয়েছেন এই বিশ্বাস পোষণ করে দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে সালাম দেওয়া এবং একে ফরযের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেওয়া।
  • ৩. মৃত্যুর পর নির্ধারিত দিনভিত্তিক শোক পালন ও খানা: কুলখানি, চল্লিশা ও চেহলামের নামে বিপুল অর্থের অপচয় করে অনুষ্ঠান করা এবং সেখানে কোরআন খতমের বিনিময়ে টাকা লেনদেন করা।
  • ৪. বিশেষ দিন বা রাতের মনগড়া নামাজ: যেমন শবে বরাতের সুনির্দিষ্ট ‘হাজারী নামাজ’ বা নির্দিষ্ট নিয়মের মনগড়া সালাতের পদ্ধতি উদ্ভাবন করা যার কোনো সনদ নেই।
  • ৫. সম্মিলিত মোনাজাতকে প্রতিটি সালাতের অলঙ্ঘনীয় অংশ মনে করা: জামাত শেষে সম্মিলিত মোনাজাত না করলে নামাজ হয়নি মনে করে ইমামের বিরুদ্ধে কলহ সৃষ্টি করা।

উপসংহার

একটি বিদআত জীবিত হলে একটি সুন্নাত সমাজ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়। তাই সুন্নাতের একনিষ্ঠ অনুসরণ এবং বিদআতের সর্বাত্মক বর্জনই হলো উম্মাহর নাজাতের একমাত্র পথ।

৯। عرف أهل السنة والجماعة – ثم اكتب مزاياها بالتفصيل –

[আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের প্রামাণ্য পরিচয়, ঐতিহাসিক পটভূমি এবং এর অনুপম মৌলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ]

[মান: ১০]

ভূমিকা ও পটভূমি

উম্মতে মুহাম্মাদী তিয়াত্তর ফেরকায় বিভক্ত হওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী করে রাসূলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট ঘোষণা করেছিলেন যে, তাদের মধ্যে কেবল একটি দলই জান্নাতী হবে—আর তারা হলো ‘আল-জামাআহ’ বা সুন্নাতের অনুসারী দল। ইসলামি ইতিহাসে সালাফে সালেহীন এবং উম্মাহর মূলধারার সেই মহাসত্য পথের অনুসারীদেরকেই ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত’ বলা হয়।

أهل السنة والجماعة-এর পরিচয়

  • শব্দার্থ বিশ্লেষণ: ‘আহল’ অর্থ অনুসারী বা ধারক; ‘আস-সুন্নাহ’ অর্থ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসৃত আদর্শ ও পথ; এবং ‘আল-জামাআহ’ অর্থ সত্যের ওপর সাহাবায়ে কেরামের সম্মিলিত ঐতিহাসিক ঐক্যবদ্ধ জামাআত।
  • পারিভাষিক পরিচয়: রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল সেই মুক্তিপ্রাপ্ত দল কারা? তখন তিনি ইরশাদ করেছিলেন:

    «ما أنا عليه اليوم وأصحابي»

    অর্থাৎ, ‘আজ আমি এবং আমার সাহাবীগণ যে দ্বীনি আদর্শ ও পদ্ধতির ওপর প্রতিষ্ঠিত আছি, যারা তার ওপর অবিচল থাকবে তারাই হলো সেই দল।’ (জামে তিরমিযী)। সংক্ষেপে, আকাইদ, ফিকহ ও তাসাউফে কুরআন, সুন্নাহ এবং খুলাফায়ে রাশেদীন ও সাহাবাদের পথের অনুসারী উম্মাহর সিংহভাগ জামাআতকেই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত বলা হয়।

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অনুপম বৈশিষ্ট্যসমূহ (مزايا أهل السنة)

  • ১. কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর চূড়ান্ত প্রাধান্য: তাঁরা মানুষের ব্যক্তিগত রায়, যুক্তি বা দর্শনের চেয়ে আল্লাহর ওহী ও রাসূল (সা.)-এর সহীহ সুন্নাহকে নিঃশর্তভাবে অগ্রাধিকার দেন।
  • ২. মধ্যপন্থা ও চরমপন্থা বর্জন (আল-ওয়াসাত্বিয়্যাহ): আহলে সুন্নাত হলো যাবতীয় চরমপন্থার মাঝে ভারসাম্যপূর্ণ মধ্যপন্থী দল:
    • মুতাযিলাদের অন্ধ যুক্তিবাদ এবং জাহমিয়াদের নাস্তিক্যবাদের বিপরীতে আল্লাহর সিফাতকে অস্বীকার না করে বিশ্বাস করা।
    • খারেজীদের নির্বিচারে তাকফীর (কাফের ঘোষণা) এবং মুরজিয়াদের চরম শৈথিল্যবাদের মাঝামাঝি অবস্থান গ্রহণ।
    • শিয়াদের আলী (রা.)-কে নিয়ে বাড়াবাড়ি এবং নাওয়াসিবদের বিদ্বেষের বিপরীতে সমস্ত সাহাবীকে সমভাবে শ্রদ্ধা করা।
  • ৩. সাহাবায়ে কেরামের প্রতি সর্বজনীন ভক্তি ও ভালোবাসা: তাঁরা সকল সাহাবীকে ন্যায়পরায়ণ (উদূলে সাহাবা) বিশ্বাস করেন এবং তাঁদের মধ্যকার গৃহযুদ্ধ ও মতপার্থক্য নিয়ে কুৎসা রটনা থেকে বিরত থাকেন।
  • ৪. মুসলিমদের ঐক্যের সুরক্ষক: আহলে কেবলার কাউকে কবিরা গুনাহের কারণে কাফের ঘোষণা করেন না এবং মুসলিম শাসকের বিরুদ্ধে বিশৃঙ্খলা ও অস্ত্রধারণকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেন।
  • ৫. সুস্থ মানবীয় যুক্তির সাথে ওহীর সামঞ্জস্য বিধান: তাঁরা বিবেক বা আকলকে অস্বীকার করেন না; বরং আকলকে ওহীর অনুগামী করে সত্যের পথে পরিচালিত করেন।

উপসংহার

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত কোনো নবগঠিত দল নয়, বরং এটি স্বয়ং বিশ্বনবী (সা.) ও তাঁর সাহাবীগণের প্রদর্শিত ইসলামের অবিকল আদি ও অকৃত্রিম মহাসড়ক।

১০। من الفرقة المعتزلة؟ بين عقائدهم بالتفصيل –

[মু’তাযিলা সম্প্রদায়ের ঐতিহাসিক উৎপত্তি, প্রতিষ্ঠাতা এবং তাদের মৌলিক ‘উসূলে খামসাহ’ বা পঞ্চনীতির তাত্ত্বিক পর্যালোচনা]

[মান: ১০]

ভূমিকা ও পটভূমি

ইসলামের ইতিহাসে বুদ্ধিবৃত্তিক বিভ্রান্তি ও গ্রিক দর্শনের অন্ধ অনুকরণে যে পথভ্রষ্ট সম্প্রদায়ের উৎপত্তি হয়েছিল, তাদের মধ্যে ‘মুতাযিলা’ ছিল সর্বাধিক প্রভাবশালী। তারা ওহীর সুস্পষ্ট বাণীর ওপর দুর্বল মানবীয় বুদ্ধিকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করে বহু অপব্যাখ্যার জন্ম দিয়েছিল।

মুতাযিলা সম্প্রদায়ের উৎপত্তি ও নামকরণ

  • উৎপত্তি: দ্বিতীয় হিজরি শতকের প্রথমার্ধে বসরার প্রখ্যাত তাবেঈ ইমাম হাসান বসরী (রহ.)-এর ইলমী হালাকায় কবিরা গুনাহগার ব্যক্তির বিধান নিয়ে আলোচনা চলছিল। তখন তাঁর এক ছাত্র ওয়াসিল ইবনে আতা (واصل بن عطاء) ও আমর ইবনে উবাইদ দাবি করল যে, কবিরা গুনাহকারী ব্যক্তি মুমিনও নয়, কাফেরও নয়; সে উভয়ের মধ্যবর্তী স্তরে থাকবে।
  • নামকরণ: এই ভুল মত প্রকাশের পর ওয়াসিল হাসান বসরী (রহ.)-এর মজলিস পরিত্যাগ করে মসজিদের এক কোণে পৃথক হালাকা তৈরি করে। তখন ইমাম হাসান বসরী বলেছিলেন: ‘ই’তাযালা আন্না ওয়াসিল’ (ওয়াসিল আমাদের দল থেকে পৃথক হয়ে গেল)। সেই থেকে তাদের ‘মুতাযিলা’ (المعتزلة – পৃথক হয়ে যাওয়া দল) বলা হয়। তারা নিজেদের ‘আহলুত তাওহীদ ওয়াল আদল’ দাবি করত।

মুতাযিলাদের মৌলিক পঞ্চনীতি (الأصول الخمسة)

মুতাযিলাদের সমগ্র ধর্মীয় চিন্তাধারা নিম্নোক্ত পাঁচটি মূলনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত:

  • ১. আত-তাওহীদ (التوحيد – আল্লাহর গুণাবলী অস্বীকার): তারা দাবি করে যে আল্লাহর কোনো প্রাচীন সিফাত (যেমন ইলম, কুদরত, সামা’, বাসর ইত্যাদি) তাঁর সত্তার বাইরে নেই। সিফাত স্বীকার করলে একাধিক প্রাচীন সত্তা মানতে হয়। ফলে তারা আল্লাহর সিফাতকে অস্বীকার করে এবং কুরআনকে ‘মাখলুক্ব’ বা সৃষ্ট বলে চরম বিভ্রান্তিতে পতিত হয় (যার কারণে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. চরম নির্যাতনের শিকার হন)।
  • ২. আল-আদল (العدل – তাকদীর অস্বীকার): তারা দাবি করে যে আল্লাহ বান্দার কাজের স্রষ্টা নন; বরং বান্দা নিজেই নিজের ভালো ও মন্দ কাজের একক স্রষ্টা। ফলে তারা আল্লাহর সর্বময় তাকদীর ও কুদরতকে অস্বীকার করে।
  • ৩. আল-ওয়াদ ওয়াল ওঈদ (الوعد والوعيد – ক্ষমার অস্বীকৃতি): তাদের মতে আল্লাহ নেককারকে জান্নাত দিতে এবং কবিরা গুনাহকারীকে তওবা ছাড়া জাহান্নামে শাস্তি দিতে বাধ্য। ফলে তারা আল্লাহর অসীম করুণা ও শাফাআতকে অস্বীকার করে।
  • ৪. আল-মানযিলাতু বাইনাল মানযিলাতাইন (المنزلة بين المنزلتين): কবিরা গুনাহগার ব্যক্তি দুনিয়াতে মুমিনও নয়, আবার কাফেরও নয়; সে দুই স্তরের মধ্যবর্তী ফাসেক। তবে তওবা ছাড়া মারা গেলে চিরকাল জাহান্নামে জ্বলবে।
  • ৫. আল-আমর বিল মারূফ ওয়ান নাহী আনিল মুনকার (সশস্ত্র বিদ্রোহ): তারা এই নীতির নামে যালেম মুসলিম শাসকের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে সশস্ত্র বিদ্রোহ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে নামার নির্দেশ দিত।

উপসংহার

মুতাযিলাদের এই ভ্রান্ত দর্শন উম্মাহর মধ্যে দীর্ঘকাল ফিতনা ছড়ালেও পরবর্তীতে ইমাম আবুল হাসান আল-আশ’আরী এবং ইমাম আবু মনসুর মাতুরিদী (রহ.) অকাট্য কুরআনী ও যুক্তিনির্ভর দলীলে তাদের যাবতীয় যুক্তি চূর্ণ করে দেন।

১১। اكتب أسماء عشرة كتب تتعلق بالعقيدة الإسلامية مع ذكر مؤلفيها –

[আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদা বিষয়ক দশটি বিশ্বখ্যাত মৌলিক গ্রন্থ ও তাদের মহান গ্রন্থকারগণের প্রামাণ্য তালিকা]

[মান: ১০]

ভূমিকা ও পটভূমি

ইসলামি উম্মাহর সহীহ আকিদা সংরক্ষণ এবং ভ্রান্ত দলগুলোর অপব্যাখ্যা থেকে দ্বীনকে মুক্ত রাখার লক্ষ্যে যুগে যুগে মহান মুহাদ্দিস, ফকীহ ও মুতাকাল্লিম ইমামগণ অসংখ্য প্রামাণ্য আকিদা গ্রন্থ রচনা করেছেন। এই গ্রন্থসমূহ শতাব্দীকাল ধরে মুসলিম বিশ্বের শ্রেষ্ঠ আকিদার পাঠ্যতালিকা হিসেবে স্বীকৃত।

আকিদা বিষয়ক দশটি প্রসিদ্ধ মৌলিক গ্রন্থ ও রচয়িতাদের তালিকা

ক্রম গ্রন্থের নাম (বাংলা ও আরবি) মহান রচয়িতার নাম ওফাত সন গ্রন্থের সংক্ষিপ্ত বৈশিষ্ট্য ও অবদান
১ আল-ফিকহুল আকবর
(الفقه الأكبر)
ইমাম আবু হানীফা নু’মান ইবনে সাবিত (রহ.) ১৫০ হিজরি মুসলিম ইতিহাসের সর্বপ্রথম প্রামাণ্য আকিদা সংকলন; খারেজী ও মুতাযিলাদের খণ্ডনে রচিত মৌলিক ঘোষণাপত্র।
২ আল-আকীদা আত-ত্বাহাবিয়্যাহ
(العقيدة الطحاوية)
ইমাম আবু জাফর আহমাদ ইবনে মুহাম্মদ আত-ত্বাহাবী (রহ.) ৩২১ হিজরি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য, বিতর্কহীন ও সার্বজনীন আকিদা গ্রন্থ।
৩ আল-ইবাবাহ আন উসূলিদ দিয়্যানাহ
(الإبانة عن أصول الديانة)
ইমাম আবুল হাসান আলী ইবনে ইসমাঈল আল-আশ’আরী (রহ.) ৩২৪ হিজরি মুতাযিলা মতবাদ ত্যাগ করার পর ইমাম আশ’আরী সালাফদের আকিদা সমর্থনে এই ঐতিহাসিক গ্রন্থ লেখেন।
৪ কিতাবুত তাওহীদ
(كتاب التوحيد)
ইমাম আবু মনসুর মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ আল-মাতুরিদী (রহ.) ৩৩৩ হিজরি মাতুরিদী আকিদা ধারার প্রধান শাস্ত্রীয় উৎসগ্রন্থ; সুদৃঢ় যৌক্তিক ও কুরআনী দলীলে কালামশাস্ত্রের সংস্কার।
৫ আশ-শারহু ওয়াল ইবানাহ (কিতাবুস সুন্নাহ)
(الشرح والإبانة على أصول السنة)
ইমাম ইবনে বাত্তাহ আল-উয়কুবরী (রহ.) ৩৮৭ হিজরি সালাফদের সনদের ভিত্তিতে সুন্নাহ ও আকিদার সুবিশাল প্রামাণ্য হাদিসভিত্তিক বিশ্বকোষ।
৬ উসূলু ই’তিক্বাদি আহলিস সুন্নাহ
(شرح أصول اعتقاد أهل السنة)
ইমাম হিবাতুল্লাহ আল-লালাকাঈ (রহ.) ৪১৮ হিজরি সাহাবা ও তাবেঈনদের ৯ শতাধিক নিরবচ্ছিন্ন সনদে বর্ণিত আকিদার সবচেয়ে বড় দলিল সংকলন।
৭ কাওয়াইদুল আকাইদ (ইহয়াউ উলূমিদ্দীন)
(قواعد العقائد)
হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম আবু হামিদ আল-গাযালী (রহ.) ৫০৫ হিজরি সাধারণ মুমিন ও শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে আকিদা দৃঢ় করার এক মনস্তাত্ত্বিক ও আত্মিক শাহকার।
৮ আল-আকীদাতুল ওয়াসিতিয়্যাহ
(العقيدة الواسطية)
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) ৭২৮ হিজরি আল্লাহর আসমা ও সিফাতের ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহর সরাসরি পাঠের ওপর অটল থাকার প্রামাণ্য রচনা।
৯ শারহুল আকাইদিন নাসাফিয়্যাহ
(شرح العقائد النسفية)
আল্লামা সা’দুদ্দীন তাফতাযানী (রহ.) ৭৯৩ হিজরি ইমাম ওমর নাসাফীর আকিদা সংকলনের ওপর রচিত সুবিখ্যাত ব্যাখ্যাগ্রন্থ, যা বিশ্বজুড়ে দরসে নেযামীর পাঠ্য।
১০ জাওহারাতুত তাওহীদ
(جوهرة التوحيد)
ইমাম ইব্রাহীম আল-লাকানী (রহ.) ১০৪১ হিজরি আশ’আরী আকিদার সারসংক্ষেপ নিয়ে রচিত ছন্দোবদ্ধ মানযূমাহ যা আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাপকভাবে পাঠ্য।

উপসংহার

এই দশটি গ্রন্থ আহলে সুন্নাতের আকিদাগত ঐতিহ্যের বাতিঘর, যা অধ্যয়নের মাধ্যমে বিভ্রান্তির মহাসমুদ্র থেকে সহীহ ঈমানের দিশা লাভ করা সম্ভব।

১২। اكتب نبذة من حياة الإمام أبي جعفر الطحاوي رحمه الله بالإيجاز –

[মুহাদ্দিস ও ফকীহ ইমাম আবু জাফর আত-ত্বাহাবী (রহ.)-এর জন্ম, শিক্ষা, মাযহাব রূপান্তর এবং অমর ইলমী অবদান]

[মান: ১০]

ভূমিকা ও পটভূমি

হাদীস ও ফিকহ উভয় শাস্ত্রের সমন্বয়ে যে কজন মনীষী হিজরি তৃতীয় শতকে ইসলামি বিশ্বকে আলোকিত করেছিলেন, তাঁদের শীর্ষপুরুষ হলেন ইমামুল মুহাদ্দিসীন ওয়াল ফুক্বাহা আবু জাফর আহমাদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে সালামাহ আল-আযদী আত-ত্বাহাবী (রহ.)। তিনি ছিলেন একাধারে উঁচুমাপের হাফেযে হাদীস এবং হানাফী মাযহাবের অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠ মুজতাহিদ ফকীহ।

জন্ম, বংশ ও প্রারম্ভিক শিক্ষা

  • জন্ম: ইমাম ত্বাহাবী ২৩৯ হিজরিতে মিসরের সাইদ অঞ্চলের ‘ত্বাহা’ (طهطا) নামক গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত ও উচ্চশিক্ষিত কুরাইশ বংশের পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। এই ত্বাহা গ্রামের দিকে সম্বন্ধ করেই তাঁকে ‘আত-ত্বাহাবী’ বলা হয়।
  • পারিবারিক পরিবেশ: তাঁর পিতা ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলেম এবং মাতা ছিলেন ইমাম শাফেঈ (রহ.)-এর বিশিষ্ট শাগরেদ ও মুযানী (রহ.)-এর বোন। শৈশবেই তিনি পারিবারিক তত্ত্বাবধানে পবিত্র কুরআন হিফজ সম্পন্ন করেন এবং শাফেঈ ফিকহের শিক্ষা অর্জন করেন।

উস্তাদ ও শায়খদের সাহচর্য এবং শাফেঈ থেকে হানাফী মাযহাবে রূপান্তর

  • প্রাথমিক উস্তাদ: তিনি তাঁর আপন মামা ইমাম ইসমাঈল ইবনে ইয়াহইয়া আল-মুযানী (রহ.)-এর কাছে দীর্ঘদিন শাফেঈ ফিকহ ও হাদীস অধ্যয়ন করেন।
  • হানাফী মাযহাব গ্রহণের কারণ: একদিন তিনি দেখলেন তাঁর মামা ইমাম মুযানী অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর ফিকহী গ্রন্থাবলী পাঠ ও গবেষণা করছেন। মামাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, হানাফী ফিকহের গভীরতা আমাকে মুগ্ধ করে। এই ঘটনা ত্বাহাবীর অন্তরে নাড়া দেয়। পরবর্তীতে তিনি গভীর গবেষণা করে দেখতে পান যে হানাফী মাযহাবের ফিকহী কিয়াস ও হাদীসের প্রয়োগপদ্ধতি অত্যন্ত সুদৃঢ় ও ইনসাফপূর্ণ। ফলে তিনি হানাফী মাযহাব গ্রহণ করেন এবং কায়রোর হানাফী কাজী আহমাদ ইবনে আবি ইমরান ও সিরিয়ার কাজী আবু খাযিম আল-হানাফীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে শীর্ষ ফকীহ হয়ে ওঠেন।

ইমাম ত্বাহাবীর অমর ইলমী গ্রন্থাবলী

ইমাম ত্বাহাবী বহু কালজয়ী গ্রন্থ রচনা করে ইসলামি ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছেন:

  • ১. শারহু মা’আনিল আসার (شرح معاني الآثار): হাদীসের মতবিরোধ নিরসনে রচিত চার খণ্ডের এক মহাগ্রন্থ, যেখানে তিনি হানাফী মাযহাবের প্রতিটি মাসআলার সপক্ষে শক্তিশালী সহীহ হাদীসের সনদ ও ফিকহী যুক্তি পেশ করেছেন।
  • ২. মুশকিলুল আসার (مشكل الآثار): বাহ্যত পরস্পরবিরোধী হাদীসসমূহের জটিল রহস্য উন্মোচনে রচিত সুবিশাল গ্রন্থ।
  • ৩. আল-আকীদা আত-ত্বাহাবিয়্যাহ (العقيدة الطحاوية): আহলে সুন্নাতের চিরন্তন আকিদার শ্রেষ্ঠ সংকলন।
  • ৪. আহকামুল কুরআন আল-কারীম: কুরআনের আয়াতের আলোকে শরিয়তের বিধানাবলী সংকলন।
  • ৫. মুখতাসারুত ত্বাহাবী: হানাফী ফিকহের প্রামাণ্য সংক্ষিপ্ত সংকলন।

ওফাত

এই মহান ইমাম ৩২১ হিজরির পহেলা যিলকদ রোজ বৃহস্পতিবার মিসরের কায়রোতে ৮২ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তাঁকে কায়রোর কারাফা কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

উপসংহার

ইমাম ত্বাহাবী (রহ.) প্রমাণ করেছিলেন যে হাদীসের সনদের নিখুঁত জ্ঞান এবং ফিকহের গভীর প্রজ্ঞার সমন্বয় ঘটলে একজন আলেম সমগ্র বিশ্বের উম্মাহর জন্য চিরন্তন পথপ্রদর্শক হয়ে উঠতে পারেন।

১৩। اشرح اثنين من المصطلحات التالية: التوحيد، الإيمان، الإسلام، الإسراء، المعراج –

[উলূমুল আকাইদের মৌলিক পরিভাষাসমূহ : তাওহীদ, ঈমান, ইসলাম, ইসরা ও মিরাজের বিশদ শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা]

[মান: ১০]

ভূমিকা ও পটভূমি

ইসলামি শরিয়তের পরিভাষাসমূহ নিছক কোনো সাধারণ আভিধানিক শব্দ নয়; বরং এদের প্রতিটি শব্দ সমগ্র দ্বীনের এক একটি মৌলিক দর্শনকে ধারণ করে। নিম্নে প্রশ্নোক্ত পরিভাষাসমূহ থেকে পরীক্ষার্থীদের সুবিধার্থে গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষাসমূহের পূর্ণাঙ্গ শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা প্রদান করা হলো:

১. আত-তাওহীদ (التوحيد)

  • আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ: ‘তাওহীদ’ শব্দের অর্থ হলো এক ও একক করা বা জানা। শরিয়তের পরিভাষায় মহান আল্লাহকে তাঁর পবিত্র সত্তা, সমস্ত সুন্দর নাম, নিখুঁত গুণাবলী এবং যাবতীয় ইবাদত ও সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রে একক ও অদ্বিতীয় বিশ্বাস করার নাম হলো তাওহীদ।
  • তাওহীদের তিনটি অপরিহার্য শাখা:
    • ১. তাওহীদে রুবূবিয়াত (توحيد الربوبية): বিশ্বাস করা যে নিখিল বিশ্বের একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, রিজিকদাতা এবং জীবন-মৃত্যুর নিয়ন্ত্রক হলেন একমাত্র আল্লাহ।
    • ২. তাওহীদে উলূহিয়াত (توحيد الألوهية): যাবতীয় ইবাদত (যেমন সালাত, রোযা, দোয়া, কুরবানি, সেজদা ও তাওয়াক্কুল) কেবল আল্লাহর জন্যই উৎসর্গ করা এবং কারও সাথে শিরক না করা।
    • ৩. তাওহীদে আসমা ও সিফাত (توحيد الأسماء والصفات): আল্লাহ কুরআনে ও নবীজী সহীহ হাদীসে আল্লাহর যে সমস্ত নাম ও সিফাত উল্লেখ করেছেন তা কোনো বিকৃতি (তাহরীফ), অস্বীকার (তা’তীল), সাদৃশ্য (তাশবীহ) বা রূপ নির্ধারণ ছাড়া অবিকল সত্য বলে বিশ্বাস করা।

২. আল-ঈমান (الإيمان) ও আল-ইসলাম (الإسلام)-এর সম্পর্ক

  • আল-ঈমান: এর শাব্দিক অর্থ তাসদীক বা অন্তরে সত্য বলে বিশ্বাস করা। শরিয়তের পরিভাষায়:

    «الإيمان: تصديق بالجنان، وإقرار باللسان، وعمل بالأركان.»

    অর্থাৎ অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস রাখা, মুখে স্বীকৃতি দেওয়া এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়ে তা পালন করা। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে মূল ঈমান হলো আন্তরিক বিশ্বাস ও মৌখিক স্বীকৃতি, আর আমল হলো ঈমানের পূর্ণতা ও সৌন্দর্য।

  • আল-ইসলাম: এর আভিধানিক অর্থ আনুগত্য করা ও আত্মসমর্পণ করা। পারিভাষিক অর্থে আল্লাহর যাবতীয় আদেশ-নিষেধের সামনে নিজেকে সঁপে দিয়ে বাহ্যিক আমলসমূহ (সালাত, যাকাত, সিয়াম ও হজ) যথাযথভাবে পালন করার নাম হলো ইসলাম। হাদীসে জিবরাঈলে নবীজী (সা.) ঈমানকে অন্তরের বিশ্বাস এবং ইসলামকে বাহ্যিক পঞ্চস্তম্ভের মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করেছেন।

৩. আল-ইসরা (الإسراء) ও আল-মিরাজ (المعراج)

  • আল-ইসরা (الإسراء): এর অর্থ নৈশভ্রমণ। নবুওয়াতের দশম বা একাদশ বছরে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র জাগ্রত শরীরে জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে ‘বুরাক’ নামক বাহনে চড়ে মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে ফিলিস্তিনের বায়তুল মুকাদ্দাস (মসজিদুল আকসা) পর্যন্ত অলৌকিক রাতের ভ্রমণকে ইসরা বলা হয় (সূরা আল-ইসরা: ১)। এটি অস্বীকারকারী ব্যক্তি সরাসরি কাফের হবে, কারণ এটি কুরআনের অকাট্য আয়াতে প্রমাণিত।
  • আল-মিরাজ (المعراج): এর অর্থ ঊর্ধ্বগমন বা সিঁড়ি। বায়তুল মুকাদ্দাসে সমস্ত নবীদের সালাতে ইমামতি করার পর সেখান থেকে রফরফে চড়ে সপ্তাকাশ, সিদরাতুল মুনতাহা পেরিয়ে মহান আল্লাহর আরশের সান্নিধ্যে আরোহণ করাকে মিরাজ বলা হয়। এই মিরাজেই উম্মতের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত সালাত উপহার দেওয়া হয় এবং সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত অবতীর্ণ হয়।

উপসংহার

এই পরিভাষাসমূহ অনুধাবনের মাধ্যমে একজন মুমিনের ঈমানি জ্ঞান পরিপক্কতা লাভ করে এবং দ্বীনের মৌলিক স্তম্ভসমূহের ওপর তার প্রত্যয় সুদৃঢ় হয়।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

ফাযিল ১ম বর্ষ আল-আকীদাতুল ইসলামিয়্যাহ ২০২৪ পরীক্ষার বিষয় কোড কত ছিল?

বিষয় কোড ছিল ১১১০০৩ এবং পূর্ণমান ১০০ নম্বর। সময় ৩ ঘণ্টা।

মুসলিম ইতিহাসের সর্বপ্রথম প্রামাণ্য আকিদা বিষয়ক গ্রন্থের নাম কী?

ইমামে আযম আবু হানীফা (রহ.) রচিত ‘আল-ফিকহুল আকবর’।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সর্বশ্রেষ্ঠ ও চিরন্তন মু’জিযা কোনটি?

মহাগ্রন্থ আল-কুরআন, যা কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র মানবজাতির জন্য এক অলৌকিক চ্যালেঞ্জ।

মুতাযিলা সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতার নাম কী ছিল?

ওয়াসিল ইবনে আতা (واصل بن عطاء), যিনি ইমাম হাসান বসরী (রহ.)-এর হালাকা ত্যাগ করেছিলেন।

হাওযে কাউসারের পানি পান করার সৌভাগ্য থেকে কারা বিতাড়িত হবে?

যারা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাত বিকৃত করে দ্বীনের ভেতর নতুন বিদআত ও কুসংস্কার তৈরি করেছিল।

ইমাম আবু জাফর আত-ত্বাহাবী (রহ.) কোন মাযহাবের শীর্ষ ফকীহ ছিলেন?

তিনি হানাফী মাযহাবের সুবিখ্যাত মুহাদ্দিস ও মুজতাহিদ ফকীহ ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *