আক্বীদাতু আহলিস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আহ ১ম পত্র (Aqidatu Ahlis Sunnah wal Jamaah 1st Paper) – 111017, আল-আক্বীদাতুল ইসলামিয়্যাহ – ফাযিল পাস ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪

StudyBoi StudyBoi
September 27, 2026
৮০ মিনিট পড়ার সময়
২ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়
ফাযিল (স্নাতক) পাস ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪
বিষয়: আল-আক্বীদাতুল ইসলামিয়্যাহ — ১ম পত্র (আক্বীদাতু আহলিস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আহ)
বিষয় কোড: ১১১০১৭ | পূর্ণমান: ১০০ | সময়: ৩ ঘণ্টা

[দ্রষ্টব্য: ক-বিভাগ থেকে যেকোনো ৫টি এবং খ-বিভাগ থেকে যেকোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও।]

ক-বিভাগ (মান: ১৬ × ৫ = ৮০)

১। عرف علم الكلام – ثم بين أهمية تعلم علم الكلام وتعليمه والتصنيف فيه –

[علم الكلام-এর পরিচয় দাও। অতঃপর علم الكلام শিক্ষা গ্রহণ করা, শিক্ষা দেয়া ও কিতাব রচনা করার গুরুত্ব বর্ণনা কর।]

[মান: ১৬]

ভূমিকা ও ইলমুল কালামের শাব্দিক অর্থ

ইসলামি জ্ঞানকাণ্ডের যে শাস্ত্রটি আকিদা ও বিশ্বাসের মৌলিক স্তম্ভগুলোকে যুক্তি ও প্রমাণের সাহায্যে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করে এবং সংশয়বাদীদের আক্রমণ প্রতিহত করে, তাকে ‘ইলমুল কালাম’ (علم الكلام) বলা হয়। আভিধানিক অর্থে ‘কালাম’ (الكلام) হলো কথা, বাক্য বা বাচনভঙ্গি। এ শাস্ত্রকে ‘ইলমুল কালাম’ নামকরণের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে: প্রথমত—এ শাস্ত্রে আল্লাহ তাআলার সিফাতে কালাম (কুরআন কি সৃষ্ট না অসৃষ্ট) নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক হয়েছিল; দ্বিতীয়ত—এ শাস্ত্র অধ্যয়ন করলে দ্বীনের পক্ষে কথা বলার বা বিতর্কে প্রতিপক্ষকে নিরুত্তর করার বাকশক্তি ও যুক্তিপ্রবণতা বৃদ্ধি পায়; এবং তৃতীয়ত—গ্রিক দর্শনের ‘মানতিক্ব’ বা যুক্তিশাস্ত্রের বিপরীতে মুসলিম গবেষকগণ একে বিশুদ্ধ ‘কালাম’ নামে অভিহিত করেছিলেন।

ইলমুল কালামের পারিভাষিক সংজ্ঞা

ইসলামি গবেষক ও কালামশাস্ত্রবিদগণের সংজ্ঞানুযায়ী:

  • ইমাম সা’দউদ্দীন তাফতাযানী (রহ.)-এর মতে:

    «هُوَ الْعِلْمُ بِالْعَقَائِدِ الدِّينِيَّةِ عَنِ الأَدِلَّةِ الْيَقِينِيَّةِ»

    “অকাট্য ও নিশ্চিত প্রমাণের ভিত্তিতে ইসলামি দ্বীনি আকিদা ও বিশ্বাসসমূহ জানার শাস্ত্রকে ইলমুল কালাম বলা হয়।”

  • ইমাম ইবনে খালদুন (রহ.)-এর মতে: ‘ইলমুল কালাম হলো এমন একটি বিজ্ঞান, যাতে যুক্তিভিত্তিক ও যৌক্তিক প্রমাণের মাধ্যমে ঈমানি আকিদাগুলোর পক্ষে বিতর্ক করা হয় এবং সালাফে সালেহীন ও আহলুস সুন্নাহর পথ থেকে বিচ্যুত বিদআতি ও বাতিল ফেরকাগুলোর সংশয় দূর করা হয়।’

ইলমুল কালাম শিক্ষা গ্রহণ ও শিক্ষা দানের অপরিহার্য গুরুত্ব

ইসলামের ইতিহাসে ইলমুল কালাম চর্চার গুরুত্ব অপরিসীম:

  • ১. আকিদার সুরক্ষা ও দৃঢ়তা: কেবল অন্ধ অনুকরণের (তাক্বলীদ) পরিবর্তে বিবেক ও অকাট্য দলিলের সাহায্যে আল্লাহর অস্তিত্ব, একত্ববাদ ও নবুওয়তকে অন্তরে সুপ্রতিষ্ঠিত করা।
  • ২. বাতিল ফেরকা ও সংশয়বাদীদের খণ্ডন: ইসলামি খেলাফতের বিস্তৃতির যুগে গ্রিক দর্শন, পারস্যের দ্বৈতবাদ (মাজুসিয়াত), ইহুদি-খ্রিস্টানদের বিকৃতি এবং মুতাযিলা, খারেজী ও জাহমিয়াদের মতো অভ্যন্তরীণ বিদআতী সম্প্রদায়ের বিভ্রান্তিকর যুক্তির জবাব দিতে কালামশাস্ত্র ছিল প্রধানতম হাতিয়ার।
  • ৩. ফরজে কিফায়ার দায়িত্ব পালন: উম্মতের মধ্যে একদল আলিমের জন্য কালামশাস্ত্রে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করা ফরজে কিফায়া, যাতে তাঁরা ইসলামি আকিদার বিরুদ্ধে উত্থাপিত নাস্তিক্যবাদী বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসন রুখে দিতে পারেন।

কালামশাস্ত্রে কিতাব রচনার ঐতিহাসিক গুরুত্ব

ইমাম আবু হানিফার ‘আল-ফিক্বহুল আকবার’, ইমাম আবুল হাসান আল-আশআরীর ‘আল-ইবানা’ ও ‘মাকালাতুল ইসলামিয়্যীন’, ইমাম আবু মনসুর আল-মাতুরিদীর ‘কিতাবুত তাওহিদ’, এবং পরবর্তীকালে ইমাম গাযালী, ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী ও ইমাম তাফতাযানী প্রমুখ মুতাকাল্লিমীনদের কালজয়ী রচনাবলি ইসলামি আকিদাকে কিয়ামত পর্যন্ত এক দুর্ভেদ্য সুরক্ষাবলয়ে আবদ্ধ করেছে। কিতাব রচনার মাধ্যমেই শরিয়তের আকিদা তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে।

উপসংহার

ইলমুল কালাম হলো ইসলামি আকিদার সুরক্ষাকবচ। বিভ্রান্তিকর দর্শনের সয়লাব থেকে উম্মাহর ঈমান রক্ষা করতে আহলুস সুন্নাহর মূলনীতিভিত্তিক কালামচর্চা এক চিরন্তন অপরিহার্য জিহাদ।

২। أثبت بالأدلة بأن الله واحد لا شريك له – لا يشبه شيئا ولا يشبه شيء وليس له جهة –

[দলিল দ্বারা প্রমাণ কর যে, আল্লাহ এক, তাঁর কোনো শরিক নাই। তিনি কোনো জিনিসের সাথে সাদৃশ্য রাখেন না ও কোনো জিনিস তার সাথে সাদৃশ্য রাখে না এবং তাঁর কোনো جهة নাই।]

[মান: ১৬]

ভূমিকা ও তাওহিদের মূল ভিত্তি

ইসলামি আকিদার কেন্দ্রীয় নিউক্লিয়াস হলো আল্লাহর একত্ববাদ বা তাওহিদ। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের ঐকমত্য হলো: আল্লাহ তাআলা সত্তায়, গুণে ও কাজে একক ও অদ্বিতীয়। তিনি স্থান-কাল, দিক-সীমানা এবং সৃষ্টির সমস্ত সাদৃশ্য থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র ও মুক্ত।

১. আল্লাহ এক ও লা-শারিক হওয়ার প্রমাণ

আল্লাহর একত্ববাদ কুরআন ও বুদ্ধিভিত্তিক দলিল উভয় দ্বারা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত:

  • কুরআনী দলিল: আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন:

    ﴿قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ ۝ اللَّهُ الصَّمَدُ ۝ لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ ۝ وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ﴾

    “বলুন, তিনিই আল্লাহ, একক ও অদ্বিতীয়। আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন, সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি। আর তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই।” (সূরা আল-ইখলাস: ১-৪)।

  • যুক্তিভিত্তিক দলিল (বুরহানুত তামানূ’ – برهان التمانع): পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

    ﴿لَوْ كَانَ فِيهِمَا آلِهَةٌ إِلَّا اللَّهُ لَفَسَدَتَا﴾

    “যদি আকাশ ও পৃথিবীতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ থাকত, তবে উভয়ই নিশ্চিতরূপে ধ্বংস হয়ে যেত।” (সূরা আল-আম্বিয়া: ২২)। যুক্তির দাবি হলো—একাধিক স্রষ্টা থাকলে তাদের ইচ্ছার মধ্যে বিরোধ অনিবার্য হতো। একজন যদি বিশ্ব চালাতে চাইতেন আর অন্যজন থামাতে চাইতেন, তবে হয় উভয়ের ইচ্ছা পূরণ হতো না (যা তাঁদের অক্ষমতা প্রমাণ করে), অথবা একজনের ইচ্ছা কার্যকর হতো, যিনি বিজয়ী তিনিই প্রকৃত একমাত্র একক আল্লাহ।

২. আল্লাহ কোনো সৃষ্টির সদৃশ নন (তাগাইয়্যুর ও তানযীহ)

আল্লাহ তাআলা সমস্ত সৃষ্টি ও বস্তুজগতের সাদৃশ্য থেকে মুক্ত:

  • পবিত্র কুরআনের অকাট্য মূলনীতি:

    ﴿لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ﴾

    “কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়; আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” (সূরা আশ-শূরা: ১১)।

  • ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ‘আল-ফিক্বহুল আকবার’-এ বলেন: “আল্লাহ তাআলা কোনো সৃষ্টির সাথে সদৃশ নন এবং কোনো সৃষ্টিও তাঁর সাথে সাদৃশ্য রাখে না। মানুষের অন্তরে যা কল্পনা আসে, আল্লাহ তাআলা তার বিপরীত।”

৩. আল্লাহর কোনো দিক বা স্থান (জিহাহ ও মাকান) নেই

দিক (উপরে, নিচে, ডানে, বামে, সামনে, পেছনে) এবং স্থান হলো সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ সৃষ্টির পূর্বেও বিরাজমান ছিলেন যখন কোনো দিক বা স্থান ছিল না।

  • ইমাম আবু জাফর আত-তাহাবী (রহ.) ‘আকীদাতুত তাহাবিয়্যাহ’-তে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় লিখেছেন:

    «تَعَالَى عَنِ الْحُدُودِ وَالْغَايَاتِ، وَالأَرْكَانِ وَالأَعْضَاءِ وَالأَدَوَاتِ، لاَ تَحْوِيهِ الْجِهَاتُ السِّتُّ كَسَائِرِ الْمُبْتَدَعَاتِ»

    “আল্লাহ তাআলা যাবতীয় সীমা-পরিসীমা, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও সহায়তাকারী উপায়-উপকরণ থেকে বহু ঊর্ধ্বে। কোনো ছয়টি দিক তাঁকে বেষ্টন করতে পারে না, যেমন অন্যান্য সৃষ্টবস্তুকে বেষ্টন করে থাকে।”

  • হযরত আলী (রা.) বলেছেন: «كَانَ اللَّهُ وَلاَ مَكَانَ، وَهُوَ الآنَ عَلَى مَا عَلَيْهِ كَانَ» (আল্লাহ ছিলেন অথচ কোনো স্থান ছিল না; তিনি এখনও ঠিক তেমনই আছেন যেমন তিনি সৃষ্টির পূর্বে ছিলেন)।

উপসংহার

আল্লাহ তাআলার সত্তাকে কোনো সীমাবদ্ধ দিক বা স্থানে আবদ্ধ করা কুফরি সদৃশ তাশবীহ ও তাজসীম। আহলুস সুন্নাহর বিশুদ্ধ বিশ্বাস হলো—আল্লাহ তাআলা স্থান ও কালের মুখাপেক্ষিতা ছাড়াই নিখিল বিশ্বের চিরন্তন মালিক ও পালনকর্তা।

৩। ما هي أسباب حصول المعرفة؟ ثم بين الآراء المختلفة بالدلائل –

[المعرفة অর্জিত হওয়ার উপায়গুলো কী? এ বিষয়ে বর্ণিত মতামতসমূহ দলিলসহ বর্ণনা কর।]

[মান: ১৬]

ভূমিকা ও ইলম বা মা’রেফাতের স্বরূপ

ইসলামি দর্শনে জ্ঞানতত্ত্ব বা ‘এপিস্টেমোলজি’ (Epistemology) অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়। ‘মা’রেফাত’ বা ইলম অর্জনের মাধ্যম কী এবং মানুষ কীভাবে নিশ্চিত সত্য জ্ঞান লাভ করতে পারে—তা নিয়ে কালামশাস্ত্রবিদ, দার্শনিক ও বস্তুবাদীদের মাঝে গভীর বিশ্লেষণ রয়েছে। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের ইমাম নাজম উদ্দীন নাসাফী (রহ.) তাঁর ‘আক্বাঈদে নাসাফী’-তে মা’রেফাতের মূল উৎসগুলোকে নিখুঁতভাবে সন্নিবেশিত করেছেন।

আহলুস সুন্নাহর নিকট জ্ঞান বা মা’রেফাত অর্জনের তিনটি মূল কারণ

ইমাম নাসাফী (রহ.) ঘোষণা করেন:

«أَسْبَابُ الْعِلْمِ لِلْخَلْقِ ثَلاَثَةٌ: الْحَوَاسُّ السَّلِيمَةُ، وَالْخَبَرُ الصَّادِقُ، وَالْعَقْلُ»

“সৃষ্টির জ্ঞান লাভের মাধ্যম হলো তিনটি: সুস্থ ইন্দ্রিয়নিচয়, সত্য সংবাদ এবং সুস্থ বিবেক।”

  • ১. সুস্থ ইন্দ্রিয়সমূহ (الحواس السليمة): মানুষের পঞ্চেন্দ্রিয়—চক্ষু (দর্শনশক্তি), কর্ণ (শ্রবণশক্তি), নাসিকা (ঘ্রাণশক্তি), জিহ্বা (স্বাদশক্তি), এবং ত্বক (স্পর্শশক্তি)। সুস্থ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে মানুষ বস্তু ও পারিপার্শ্বিকতার প্রত্যক্ষ জ্ঞান অর্জন করে।
  • ২. সত্য সংবাদ (الخبر الصادق): সত্য সংবাদ দুই প্রকার: (ক) খবরে মুতাওয়াতির: যা এমন বিপুল সংখ্যক লোকের বর্ণনায় প্রমাণিত যাতে মিথ্যার কল্পনা অসম্ভব (যেমন দূরবর্তী দেশের ইতিহাস); এবং (খ) খবরুর রাসুল আল-মুআইয়্যাদ বিল মুজিজাহ: মোজেজা দ্বারা প্রমাণিত সত্য নবীর অহি বা বাণী, যা মানুষকে পরকাল, জান্নাত, জাহান্নাম ও গায়েবের নিশ্চিত জ্ঞান দান করে।
  • ৩. সুস্থ বিবেক বা বুদ্ধি (العقل): যা দিয়ে মানুষ চিন্তা-ভাবনা করে এবং প্রমাণের মাধ্যমে অদৃশ্যের সত্যে উপনীত হয়। যেমন বিশ্বজগত পরিবর্তনশীল, অতএব এর একজন সৃষ্টিকর্তা থাকা আবশ্যক।

এ বিষয়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মতামত ও পর্যালোচনা

  • ১. সুফাস্তাঈয়্যাহ (السفسطائية – সংশয়বাদী বা সোফিস্টগণ): এরা জ্ঞানের অস্তিত্ব বা নিশ্চিততাকে অস্বীকার করে। এদের একদল বলে কোনো কিছুর বাস্তব ভিত্তি নেই; আরেকদল বলে সত্য জ্ঞান অর্জন অসম্ভব। ইসলামি কালামবিদগণ এদের মতবাদকে বাতিল ঘোষণা করেছেন; কারণ তারা জ্ঞানকে অস্বীকার করার ক্ষেত্রেও স্ববিরোধী যুক্তি ব্যবহার করে।
  • ২. বাতেনিয়া ও তালিমিয়্যাহ সম্প্রদায়: এদের দাবি হলো বিবেক বা ইন্দ্রিয় দিয়ে মা’রেফাত লাভ সম্ভব নয়; বরং কেবল ‘ইমামে মা’সুম’ (নিষ্পাপ ইমাম)-এর গোপন তালিম দ্বারাই জ্ঞান অর্জন সম্ভব। এটি একটি চরম ভ্রান্ত মতবাদ, যা মানুষের চিন্তাশক্তিকে রুদ্ধ করে দেয়।
  • ৩. বস্তুবাদী দার্শনিকগণ (الحسّيون): এরা কেবল পঞ্চেন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুকে জ্ঞান হিসেবে মানে এবং অহি ও গায়েবকে অস্বীকার করে। অথচ মানুষের ইন্দ্রিয় অত্যন্ত সীমিত (যেমন মরুভূমির মরীচিকা দেখার ভুল), ইন্দ্রিয়ের ভুল সংশোধনের জন্য বুদ্ধি ও অহির প্রয়োজন অপরিহার্য।

উপসংহার

আহলুস সুন্নাহর দৃষ্টিভঙ্গি হলো সর্বাধিক ভারসাম্যপূর্ণ। ইন্দ্রিয়, বুদ্ধি এবং নবীর সত্য সংবাদ (অহি)—এই তিনটির সমন্বিত আলোকেই মানুষ পরম সত্য ও স্রষ্টার প্রকৃত মা’রেফাত লাভ করতে পারে।

৪। ما الكبيرة؟ هل يخلد في النار أهل الكبائر من المسلمين؟ هل اجتناب الكبائر شرط لتكفير الصغائر؟ بين بالأدلة –

[কবিরা কী? মুসলিম কবিরা গুনাহকারী কি চিরদিন জাহান্নামে থাকবে? ছগিরা গুনাহ মাফের জন্য কবিরা থেকে বেঁচে থাকা শর্ত কি? দলিলসহ বর্ণনা কর।]

[মান: ১৬]

ভূমিকা ও কবিরা গুনাহর সংজ্ঞা

গুনাহ বা পাপের ভয়াবহতার বিচারে শরিয়তে একে ছগিরা (ছোট) ও কবিরা (বড়) ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। পরিভাষায় ‘কবিরা গুনাহ’ (الكبيرة) বলা হয়—যে গুনাহর জন্য শরিয়তে দুনিয়াতে নির্দিষ্ট শাস্তি (হদ বা ক্বিসাস) নির্ধারণ করা হয়েছে, কিংবা আখেরাতে জাহান্নামের আগুন, আল্লাহর ক্রোধ, অভিশাপ বা কঠোর আজাবের দ্ব্যর্থহীন হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। যেমন—শিরক, অন্যায়ভাবে হত্যা, যেনা, সুদ খাওয়া, এতিমের মাল আত্মসাৎ ও মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া।

মুসলিম কবিরা গুনাহকারী কি চিরকাল জাহান্নামে থাকবে?

এ বিষয়ে ঐতিহাসিক তিনটি পরস্পরবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে:

  • ১. খারেজীদের মতবাদ: খারেজীরা চরমপন্থায় লিপ্ত হয়ে বলে—কবিরা গুনাহকারী কাফের হয়ে যায় এবং সে চিরকাল কাফেরদের সাথে জাহান্নামে জ্বলবে।
  • ২. মুতাযিলাদের মতবাদ: মুতাযিলারা বলে—কবিরা গুনাহকারী ঈমান থেকেও বের হয়ে যায়, আবার কুফরেও প্রবেশ করে না; সে মধ্যবর্তী এক স্তরে (আল-মানযিলাতু বাইনাল মানযিলাতাইন) অবস্থান করে। তবে তওবা ছাড়া মারা গেলে সেও চিরকাল জাহান্নামে থাকবে।
  • ৩. আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের সিদ্ধান্ত: কবিরা গুনাহের কারণে কোনো মুমিন কাফের হয় না; বরং সে ফাসিক্ব মুমিন। যদি সে তওবা ছাড়া মারা যায়, তবে তার ফয়সালা আল্লাহর মর্জির ওপর নির্ভরশীল—আল্লাহ চাইলে নিজ অনুগ্রহে বা সুপারিশের (শাফাআত) মাধ্যমে তাকে ক্ষমা করতে পারেন, অথবা গুনাহের অনুপাতে জাহান্নামে শাস্তি দিয়ে পরিশেষে অন্তরের অনুপরিমাণ ঈমানের উসিলায় তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। সে কখনো চিরকাল জাহান্নামে থাকবে না।

    ﴿إِنَّ اللَّهَ لاَ يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ﴾

    “নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শিরক করার পাপ ক্ষমা করেন না; এছাড়া অন্যান্য পাপ তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দেন।” (সূরা আন-নিসা: ৪৮)। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন:
    «شَفَاعَتِي لأَهْلِ الْكَبَائِرِ مِنْ أُمَّتِي» (আমার শাফাআত আমার উম্মতের কবিরা গুনাহকারীদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে)।

ছগিরা গুনাহ মাফের জন্য কি কবিরা থেকে বেঁচে থাকা শর্ত?

এ ব্যাপারে জমহুর আলিমগণের অভিমত হলো: কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকাই ছগিরা গুনাহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে মাফ হওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন:

﴿إِنْ تَجْتَنِبُوا كَبَائِرَ مَا تُنْهَوْنَ عَنْهُ نُكَفِّرْ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَنُدْخِلْكُمْ مُدْخَلًا كَرِيمًا﴾

“তোমাদের যা নিষেধ করা হয়েছে তার মধ্যে যা কবিরা (গুরুতর পাপ) তা থেকে যদি তোমরা বেঁচে থাক, তবে আমি তোমাদের ছোটখাটো পাপগুলো (ছগিরা) ক্ষমা করে দেব এবং তোমাদের মর্যাদাপূর্ণ স্থানে প্রবেশ করাব।” (সূরা আন-নিসা: ৩১)। তবে নিয়মিত নেক আমল (যেমন সালাত, ওজু, রোজা) দ্বারাও আল্লাহ তাআলা ছগিরা গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন।

উপসংহার

কবিরা গুনাহকারী মুসলিম কোনোভাবেই ইসলামের গণ্ডির বাইরে নয়। সে আল্লাহর রহমতের ছায়াতলে থাকে, যা মুমিনদের জন্য এক সুমহান সান্ত্বনা ও আশার আলোকবর্তিকা।

৫। ما الإيمان؟ وهل هو يزيد أم ينقص؟ اكتب اختلاف العلماء فيه –

[ঈমান কী? ঈমান হ্রাস বা বৃদ্ধি হয় কি না? এ বিষয়ে আলেমদের মতপার্থক্য লেখ।]

[মান: ১৬]

ভূমিকা ও ঈমানের সংজ্ঞা

ইসলামের আদি ও অন্ত হলো ‘ঈমান’ (الإيمان)। আরবি ভাষায় ঈমানের আভিধানিক অর্থ হলো—তাসদিক্ব (التصديق) বা দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা, অকপটে মেনে নেওয়া ও স্বীকৃতি দেওয়া। শরিয়তের পরিভাষায় ঈমান বলা হয়:

«التَّصْدِيقُ بِالْقَلْبِ، وَالإِقْرَارُ بِاللِّسَانِ، وَالْعَمَلُ بِالأَرْكَانِ»

“রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর পক্ষ থেকে যা কিছু দ্ব্যর্থহীনভাবে নিয়ে এসেছেন, তা অন্তরে মনেপ্রাণে সত্য বলে বিশ্বাস করা, মুখে উচ্চারণ করে স্বীকার করা এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে তার বাস্তব আনুগত্য করা।”

ঈমান কি বাড়ে ও কমে? ওলামায়ে কেরামের ঐতিহাসিক মতপার্থক্য

ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধি (যিয়াদাহ ও নুক্বসান) নিয়ে সালাফ ও ফকীহগণের মধ্যে গভীর পর্যালোচনা রয়েছে:

  • ১. জমহুর মুহাদ্দিসীন, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেঈ ও ইমাম আহমদ (রহ.)-এর মত:

    তাঁদের মতে ঈমান বাড়ে এবং কমে (الإيمان يزيد وينقص)। নেক আমল করলে ঈমান বৃদ্ধি পায় এবং গুনাহের কাজ করলে ঈমান হ্রাস পায়।

    দলিল: কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
    ﴿لِيَزْدَادُوا إِيمَانًا مَعَ إِيمَانِهِمْ﴾ (যাতে তারা তাদের ঈমানের সাথে আরও ঈমান বৃদ্ধি করতে পারে—সূরা আল-ফাতহ: ৪)। আরও ইরশাদ হয়েছে:
    ﴿وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا﴾ (আর যখন তাদের সামনে তাঁর আয়াত তেলাওয়াত করা হয়, তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে—সূরা আল-আনফাল: ২)।

  • ২. ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও হানাফী উসূলবিদগণের বিশ্লেষণ:

    ইমাম আজম আবু হানিফা ও ইমাম মাতুরিদী (রহ.)-এর মতে—মূল বিশ্বাস বা তাসদিক্বের (অন্তরের বিশ্বাসের মূল সত্তা) দিক থেকে ঈমানের কোনো হ্রাস-বৃদ্ধি হয় না (لاَ يَزِيدُ وَلاَ يَنْقُصُ)। কারণ বিশ্বাসের মূল সারমর্ম হলো: হয় অন্তরে শতভাগ বিশ্বাস আছে, নয়তো নেই। ৯৯% বিশ্বাস হলে তা ঈমান নয় বরং সন্দেহ বা কুফর।

    হানাফীদের সমন্বয়: হানাফীগণ কুরআনের আয়াতগুলোর ব্যাখ্যায় বলেন—আয়াতগুলোতে ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধি বলতে মূলত ঈমানের নূর, তাজাল্লি, স্বাদ, পূর্ণতা এবং আমলের আধিক্যকে বোঝানো হয়েছে; মূল সত্তাগত বিশ্বাসকে নয়। সাহাবীদের যুগে যেমন একের পর এক বিধান নাজিল হতো, সে হিসেবে আমলের পরিধি বাড়ত।

উভয় মতের চমৎকার সমন্বয়

প্রকৃতপক্ষে এই মতভেদটি অনেকটাই পারিভাষিক (শাব্দিক)। উভয় পক্ষই একমত যে, একজন মুমিনের অন্তরের ঈমানি অবস্থা, দৃঢ়তা ও তাকওয়া সবসময় একরকম থাকে না; আমল ও জিকিরের মাধ্যমে ঈমানের নূর উজ্জ্বল হয় এবং পাপাচারে তা নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে।

উপসংহার

ঈমানকে আমলের অলঙ্কার দিয়ে সুসজ্জিত রাখা প্রত্যেক মুমিনের ঈমানি দায়িত্ব। আমলহীন ঈমান বিপদের মুখে নিভে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।

৬। الجنة والنار موجودتان الآن أم لا ؟ فصل المسئلة مع ذكر اختلاف العلماء مدللا –

[জান্নাত ও জাহান্নাম বর্তমানে বিদ্যমান আছে কি না? এ মাসয়ালা ওলামাদের মতভেদ দলিলসহ আলোচনা কর।]

[মান: ১৬]

ভূমিকা ও মাসআলার প্রেক্ষাপট

আখেরাতের চূড়ান্ত প্রতিদান ও শাস্তির চিরন্তন আবাসস্থল হলো জান্নাত ও জাহান্নাম। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের অন্যতম মৌলিক আকিদা হলো জান্নাত ও জাহান্নাম আল্লাহর সৃষ্ট অনন্ত অস্তিত্ব। কিন্তু এই দুই সৃষ্টি কি বর্তমানে তৈরি অবস্থায় বিদ্যমান আছে, নাকি কিয়ামতের দিন হিসাব-নিকাশের পর সৃষ্টি করা হবে—তা নিয়ে আহলুস সুন্নাহ ও মুতাযিলাদের মাঝে ঐতিহাসিক বিতর্ক রয়েছে।

১. আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের সর্বসম্মত আকিদা

আহলুস সুন্নাহর সমস্ত ইমাম একমত যে: জান্নাত ও জাহান্নাম বর্তমানে সৃষ্টি অবস্থায় বিদ্যমান রয়েছে এবং তারা কখনোই ধ্বংস হবে না (مخلوقتان موجودتان الآن لا تفنيان أبدا)।

  • কুরআনুল কারিমের দলিল:
    • জান্নাত সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা অতীতকালীন ক্রিয়াপদ (মাযী) ব্যবহার করে বলেছেন:

      ﴿وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ﴾

      “আর তোমরা তোমাদের রবের ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে দ্রুত ধাবিত হও, যার পরিধি আকাশ ও পৃথিবীর সমান; যা মুত্তাক্বীদের জন্য প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে (উ’ইদ্দাত)।” (সূরা আলে ইমরান: ১৩৩)। ‘উইদ্দাত’ শব্দটি অতীতকালের রূপ, যা প্রমাণ করে তা ইতিপূর্বেই তৈরি হয়ে গেছে।

    • জাহান্নাম সম্পর্কেও একইভাবে বলা হয়েছে:
      ﴿أُعِدَّتْ لِلْكَافِرِينَ﴾ (যা কাফেরদের জন্য প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে—সূরা আল-বাক্বারা: ২৪)।
    • মিরাজের রাতে রাসুল (সা.)-এর জান্নাত দর্শন:
      ﴿عِنْدَهَا جَنَّةُ الْمَأْوَى﴾ (তাঁর পাশেই রয়েছে জান্নাতুল মা’ওয়া—সূরা আন-নাজম: ১৫)।
  • হাদিস শরিফের দলিল: মিরাজের রজনীতে রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বচক্ষে জান্নাত ও জাহান্নাম পরিদর্শন করেছেন। এছাড়া সূর্যগ্রহণের সালাতে রাসুল (সা.) জান্নাতের আঙুরের থোকা ধরার জন্য হাত বাড়িয়েছিলেন এবং জাহান্নামে অপরাধীদের শাস্তি চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করেছিলেন (সহিহ বুখারি)।

২. মুতাযিলা ও বাতিল ফেরকার বিভ্রান্তিকর মতবাদ ও তার খণ্ডন

মুতাযিলারা তাদের ভ্রান্ত যুক্তির ভিত্তিতে দাবি করে যে—বর্তমানে জান্নাত ও জাহান্নাম সৃষ্টি করে রাখা অনর্থক ও অপচয় (আবআস); কারণ হিসাবের আগে সেখানে কেউ বসবাস করছে না, অতএব কিয়ামতের দিন তা সৃষ্টি করা হবে।

  • আহলুস সুন্নাহর খণ্ডন: মুতাযিলাদের এই যুক্তি সম্পূর্ণ খোঁড়া। আল্লাহর কোনো কাজকে মানুষের সংকীর্ণ বুদ্ধির ‘অনর্থক’ বা ‘অপচয়’ মাপকাঠিতে বিচার করা চরম অজ্ঞতা। রাজপ্রাসাদ প্রজাদের প্রবেশের অনেক আগেই সুসজ্জিত থাকে, এটিই বাদশাহর শান ও মহত্ত্ব। উপরন্তু শহীদদের আত্মা বর্তমানে জান্নাতের সবুজ পাখির পেটে বিচরণ করছে এবং কবর থেকেই মুমিনরা জান্নাতের হাওয়া উপভোগ করছে।

উপসংহার

জান্নাত ও জাহান্নাম বর্তমানে অস্তিত্বমান—এ বিশ্বাস পোষণ করা ঈমান বিল গায়েব ও সহিহ নصوصের প্রতি আনুগত্যের অপরিহার্য দাবি।

৭। هل يمكن رؤية الله في الدنيا والآخرة؟ وما الاختلاف فيه بين العلماء ؟ بين بالأدلة مع الرد على المخالفين –

[দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহকে দেখা সম্ভব কি না? এ ব্যাপারে ওলামাদের মতভেদ কী? বিরোধীদের জবাবসহ দলিলভিত্তিক বর্ণনা কর।]

[মান: ১৬]

ভূমিকা ও মাসআলার তাৎপর্য

মুমিনদের আখেরাতের জীবনের সবচেয়ে বড় পরম প্রাপ্তি ও আনন্দের মুহূর্ত হলো নিজ চোখে মহান রব আল্লাহ তাআলার দিদার বা দর্শন লাভ করা (রূ’ইয়াতুল্লাহ – رؤية الله تعالى)। কালামশাস্ত্রে দুনিয়া ও আখেরাতে আল্লাহকে চাক্ষুষ দর্শন সম্ভব কি না—তা নিয়ে আহলুস সুন্নাহ ও মুতাযিলাদের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

১. দুনিয়ার জীবনে আল্লাহকে দর্শন করার বিধান

  • সাধারণ মানুষের জন্য: দুনিয়াতে কোনো সাধারণ মানুষ জাগ্রত চোখে চর্মচক্ষু দিয়ে আল্লাহকে দেখতে পারে না। হযরত মুসা (আ.) দেখতে চাইলে পাহাড় ভস্মীভূত হয়ে যায় এবং আল্লাহ বলেন: ﴿لَنْ تَرَانِي﴾ (তুমি আমাকে দেখতে পারবে না—সূরা আল-আ’রাফ: ১৪৩)।
  • মিরাজের রাতে রাসুল (সা.)-এর দর্শন: অধিকাংশ সাহাবী ও ইমামদের মতে রাসুল (সা.) অন্তরের দৃষ্টিতে রবকে দেখেছেন। হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, যে দাবি করে মুহাম্মদ (সা.) চর্মচক্ষু দিয়ে আল্লাহকে সরাসরি দেখেছেন সে বড় অপবাদ দিল। তবে হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) নূরানী চাক্ষুষ দর্শনের পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে স্বপ্নযোগে আল্লাহকে দেখা সম্ভব।

২. আখেরাতে মুমিনদের আল্লাহ দর্শন: আহলুস সুন্নাহর অকাট্য আকিদা

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের সর্বসম্মত ঐকমত্য হলো: কিয়ামতের দিন এবং জান্নাতে মুমিনগণ নিজ চর্মচক্ষু দিয়ে কোনো প্রকার শারীরিক আকার-আকৃতি, দিক বা দূরত্ব ছাড়াই পরম করুণাময় আল্লাহ তাআলাকে সরাসরি দর্শন করবেন।

  • কুরআনী দলিল: আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্ট ঘোষণা দেন:

    ﴿وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ نَاضِرَةٌ ۝ إِلَى رَبِّهَا نَاظِرَةٌ﴾

    “সেদিন কিছু মুখমণ্ডল হবে উজ্জ্বল প্রফুল্ল; তারা তাদের রবের দিকে তাকিয়ে থাকবে।” (সূরা আল-ক্বিয়ামাহ: ২২-২৩)।

  • হাদিস শরিফের দলিল: হযরত জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) পূর্ণিমার রাতে চাঁদের দিকে তাকিয়ে ইরশাদ করেছেন:

    «إِنَّكُمْ سَتَرَوْنَ رَبَّكُمْ كَمَا تَرَوْنَ هَذَا الْقَمَرَ، لاَ تُضَامُونَ فِي رُؤْيَتِهِ»

    “নিশ্চয় তোমরা তোমাদের রবকে এমন স্পষ্ট দেখতে পাবে, যেমন এই পূর্ণিমার চাঁদকে তোমরা দেখছ; তাঁকে দেখতে তোমাদের কোনো ভিড় বা বাধার সম্মুখীন হতে হবে না।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)।

৩. মুতাযিলাদের ভ্রান্ত দাবি ও তার অকাট্য জবাব

মুতাযিলারা আখেরাতেও আল্লাহর দর্শনকে অসম্ভব দাবি করে। তাদের যুক্তি হলো—কাউকে দেখতে হলে তাকে কোনো একটি নির্দিষ্ট দিকে থাকতে হয় এবং তার একটি দেহ বা সীমানা থাকতে হয়; যেহেতু আল্লাহর দেহ বা দিক নেই, তাই তাঁকে দেখা অসম্ভব।

  • আহলুস সুন্নাহর খণ্ডন: দেখা যাওয়ার জন্য দিক বা দেহের শর্ত মানুষের তৈরি পার্থিব নিয়মের সাথে প্রযোজ্য। আল্লাহ তাআলা আখেরাতে মুমিনদের চোখে এমন এক অলৌকিক ক্ষমতা দান করবেন যার মাধ্যমে তাঁরা কোনো দেহ, রূপ বা দিক ছাড়াই আল্লাহর নূরানী দিদার লাভে ধন্য হবেন। ইমাম তাহাবী বলেন: “দর্শন সত্য, কিন্তু তা কোনো সীমাবদ্ধতা বা সাদৃশ্যযুক্ত নয়।”

উপসংহার

আল্লাহর দর্শন হলো জান্নাতের সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত, যা অস্বীকার করা মুতাযিলাদের চরম আত্মবঞ্চনা ও গোমরাহি।

৮। ما هي عصمة الانبياء؟ اذكر اقوال العلماء حول عصمة الانبياء عليهم السلام بالأدلة ثم أجب عن أدلة المخالفين فيه –

[عصمة الانبياء কী? عصمة الانبياء সম্পর্কে আলেমদের অভিমত প্রমাণসহ উপস্থাপন কর। অতঃপর এ ব্যাপারে বিরোধীদের দলিলের জবাব দাও।]

[মান: ১৬]

ভূমিকা ও ইসমাতুল আম্বিয়ার সংজ্ঞা

আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে হেদায়েতের জন্য যুগে যুগে যে সম্মানিত নবী ও রাসুলগণকে প্রেরণ করেছেন, তাঁদের অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো ‘ইসমত’ বা নিষ্পাপত্ব। আরবি ‘ইসমত’ (العصمة) শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো—রক্ষা করা, বাধা দেওয়া, পাপাচার থেকে পবিত্র রাখা। পারিভাষিক অর্থে ‘ইসমাতুল আম্বিয়া’ (عصمة الأنبياء) বলা হয়:

«حِفْظُ اللَّهِ تَعَالَى أَنْبِيَاءَهُ مِنَ الْوُقُوعِ فِي الذُّنُوبِ وَالْمَعَاصِي، قَبْلَ النُّبُوَّةِ وَبَعْدَهَا»

“আল্লাহ তাআলা কর্তৃক তাঁর নবী ও রাসুলগণকে নবুওয়তের পূর্বে ও পরে সর্বপ্রকার কুফর, শিরক, কবিরা গুনাহ এবং মানবমর্যাদাবিরোধী হীন পাপাচার থেকে ঐশ্বরিক সুরক্ষায় সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র রাখা।”

ইসমাতুল আম্বিয়া সম্পর্কে ওলামায়ে কেরামের পর্যালোচনা

আহলুস সুন্নাহর আলিমগণ নবীদের নিষ্পাপত্বের পরিধি নিয়ে কয়েকটি বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছেন:

  • ১. কুফর ও শিরক থেকে ইসমত: সমস্ত নবী নবুওয়ত লাভের পূর্বে ও পরে সর্বসম্মতভাবে কুফর ও শিরক থেকে শতভাগ নিষ্পাপ ও সুরক্ষিত ছিলেন।
  • ২. রিসালাত পৌঁছানো ও শরিয়তের বর্ণনায় ইসমত: ওহি লাভ এবং তা উম্মতের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো প্রকার ভুল, বিস্মৃতি বা পরিবর্তন ঘটা সম্পূর্ণ অসম্ভব। এখানে তাঁরা শতভাগ নিষ্পাপ।
  • ৩. কবিরা গুনাহ থেকে ইসমত: নবুওয়তের পূর্বে ও পরে কোনো নবী কখনো কবিরা গুনাহ বা নীচ চরিত্রে লিপ্ত হননি।
  • ৪. ছগিরা গুনাহ ও অনিচ্ছাকৃত ভুল (যাল্লাত): ইচ্ছাকৃত ছগিরা গুনাহ থেকেও নবীরা মুক্ত। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইজতিহাদী বিচার বা উত্তম কাজের বিপরীতে অনুত্তম কাজ (তারকুল আওলা) বা সামান্য অনিচ্ছাকৃত ভুলত্রুটি (যাল্লাত) সংঘটিত হয়েছে, যা সাথে সাথে আল্লাহর পক্ষ থেকে সংশোধন করে দেওয়া হয়েছে।

বিরোধীদের উত্থাপিত সংশয় ও তার শক্তিশালী খণ্ডন

বিরোধীরা কুরআনের কিছু ঘটনার অপব্যাখ্যা করে নবীদের ইসমত নিয়ে সংশয় তোলে:

  • ১. হযরত আদম (আ.)-এর গন্ধম খাওয়ার ঘটনা: বিরোধীরা বলে আদম (আ.) আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করেছিলেন (﴿وَعَصَى آدَمُ رَبَّهُ﴾)।

    জবাব: আদম (আ.) কোনো উদ্ধত বিদ্রোহ করেননি; বরং তিনি শয়তানের প্ররোচনায় বিস্মৃত (ভুলোমনা) হয়ে পড়েছিলেন। কুরআনে স্বয়ং বলা হয়েছে: ﴿فَنَسِيَ وَلَمْ نَجِدْ لَهُ عَزْمًا﴾ (তিনি ভুলে গিয়েছিলেন, আমি তাঁর মধ্যে কোনো সংকল্প পাইনি—সূরা ত্বাহা: ১১৫)। ভুলে কোনো কাজ করা কবিরা গুনাহ নয়।
  • ২. হযরত মুসা (আ.) কর্তৃক কিবতীকে হত্যা:

    জবাব: মুসা (আ.) কিবতীকে হত্যা করতে চাননি; তিনি মজলুম বনি ইসরাইলকে উদ্ধার করতে কেবল একটি ঘুষি মেরেছিলেন। হঠাৎ তার মৃত্যু ঘটে যায়, যা ছিল অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনা (ক্বাতলে খাতা), কোনো পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড নয়।
  • ৩. রাসুল (সা.)-কে ক্ষমার আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা:

    জবাব: ﴿لِيَغْفِرَ لَكَ اللَّهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِكَ وَمَا تَأَخَّرَ﴾—এখানে ‘যান্ব’ দ্বারা কোনো অপরাধ নয়, বরং নবীর সুউচ্চ মর্যাদার বিচারে অনুত্তম কাজকে রূপকভাবে ক্ষমা বলা হয়েছে এবং তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

উপসংহার

নবীরা যদি নিষ্পাপ না হতেন, তবে তাঁদের আনীত দ্বীন ও শরিয়তের ওপর মানবজাতির আস্থা চিরতরে বিনষ্ট হতো। অতএব নবীদের ইসমত হলো সমগ্র নবুওয়তি ব্যবস্থার অনিবার্য মৌলিক স্তম্ভ।

খ-বিভাগ (মান: ৫ × ৪ = ২০)

৯। بين الآراء المختلفة عن الحواس –

[ইন্দ্রিয় সম্পর্কে বিভিন্ন মতামত বর্ণনা কর।]

[মান: ৫]

ভূমিকা ও ইন্দ্রিয়ের মৌলিক পরিচয়

ইসলামি কালামশাস্ত্র ও জ্ঞানতত্ত্বে (Epistemology) মানুষের বাহ্যিক পঞ্চেন্দ্রিয়কে (الحواس الخمس الظاهرة) জ্ঞান অর্জনের প্রথম, প্রত্যক্ষ ও মৌলিক উপায় হিসেবে গণ্য করা হয়। এই পাঁচটি ইন্দ্রিয় হলো—শ্রবণশক্তি (সাম’), দর্শনশক্তি (বাসার), ঘ্রাণশক্তি (শাম্ম), স্বাদগ্রহণ শক্তি (যাওক্ব) এবং স্পর্শানুভূতি (লাম্স)। প্রতিটি ইন্দ্রিয়কে আল্লাহ তাআলা একটি নির্দিষ্ট জগতের জ্ঞান আহরণের জন্য নিয়োজিত করেছেন। কিন্তু জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রামাণ্যতার বিচারে এই ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞানের সত্যতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দার্শনিক এবং ধর্মতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর মাঝে তীব্র বিতর্ক ও মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে।

ইন্দ্রিয় সম্পর্কে প্রধান প্রধান দার্শনিক ও কালামী দৃষ্টিভঙ্গি

  • ১. সুফাস্তাঈয়্যাহ বা চরম সংশয়বাদী সম্প্রদায় (السفسطائية – Sophists):

    এদের অন্তর্ভুক্ত ‘হিস্সিয়্যাহ’ ও ‘ইনদিয়্যাহ’ দল ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞানের কোনো প্রামাণিক ভিত্তি নেই বলে দাবি করে। তাদের মতে, ইন্দ্রিয় প্রতিনিয়ত মানুষকে বিভ্রান্তিকর তথ্য সরবরাহ করে। যেমন—পানিতে ডুবানো সোজা লাঠিকে প্রতিসরণের কারণে বাঁকা দেখায়, দূরবর্তী সুবিশাল চন্দ্র-সূর্যকে ছোট থালার মতো দেখায়, কিংবা জন্ডিস রোগীর চোখে মিষ্টি জিনিসও তেতো লাগে। অতএব যা মানুষকে বিভ্রান্ত করে, তা কখনো নিশ্চিত জ্ঞানের অকাট্য উৎস হতে পারে না।

  • ২. চরম বস্তুবাদী দার্শনিক দল (الماديون الحسيون – Positivists/Materialists):

    এরা বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে বলে—কেবল পঞ্চেন্দ্রিয় দিয়ে যা সরাসরি দেখা যায়, ছোঁয়া যায় বা পরিমাপ করা যায়, কেবল তা-ই সত্য জ্ঞান। ইন্দ্রিয়ের অতিরিক্ত অহি, ফেরেশতা, রূহ, জান্নাত, জাহান্নাম এবং স্বয়ং আল্লাহ তাআলার মতো অতীন্দ্রিয় বা গায়েবি কোনো বিষয়ের অস্তিত্ব তারা স্বীকার করে না।

  • ৩. আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের সুষম ও মধ্যপন্থী সিদ্ধান্ত:

    ইমাম নাসাফী, ইমাম তাফতাযানী ও জমহুর কালামবিদগণের মতে—সুস্থ ইন্দ্রিয়নিচয় (الحواس السليمة) শর্তসাপেক্ষে দৃশ্যমান ভৌত জগতের সত্য ও নিশ্চিত জ্ঞান দান করে। তবে ইন্দ্রিয় জ্ঞান পরম বা স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়; বরং তা অত্যন্ত সীমাবদ্ধ ও পরনির্ভরশীল। চোখের কার্যকারিতার জন্য আলোর প্রয়োজন, দূরত্বের সীমা রয়েছে। ইন্দ্রিয়ের যাবতীয় ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা দূর করার জন্যই মহান আল্লাহ মানুষকে বিচারবুদ্ধি (আকল) এবং অতীন্দ্রিয় জগতের অকাট্য সত্য উন্মোচনের জন্য নবীদের মাধ্যমে ‘অহি’ (ঐশী বাণী) দান করেছেন।

উপসংহার

ইসলামি আকিদায় ইন্দ্রিয়কে অজ্ঞেয়বাদীদের মতো অস্বীকারও করা হয়নি, আবার বস্তুবাদীদের মতো একমাত্র সত্য মানদণ্ড বানিয়ে অহিকে খারিজও করা হয়নি; বরং ইন্দ্রিয়কে বিবেক ও অহির অনুগত এক সুষম মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।

১০। ما الأخبار؟ بين أنواعها وأوصافها –

[الأخبار কী? এর প্রকার ও গুণাবলি বর্ণনা কর।]

[মান: ৫]

ভূমিকা ও আখবারের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ

কালামশাস্ত্র ও যুক্তিবিদ্যায় ‘আখবার’ (الأخبار) শব্দটি ‘খবর’ (الخبر)-এর বহুবচন। আভিধানিক অর্থে খবর হলো বার্তা, সংবাদ, বিবরণ বা তথ্য। পারিভাষিক সংজ্ঞায় যুক্তিবিদ ও কালামশাস্ত্রবিদগণ বলেন:

«الْخَبَرُ هُوَ الْقَوْلُ الْمُحْتَمِلُ لِلصِّدْقِ وَالْكَذِبِ لِذَاتِهِ»

“এমন বাক্য বা বক্তব্য যা তার নিজস্ব কাঠামোর দিক থেকে সত্য বা মিথ্যা উভয় হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।” অর্থাৎ বক্তা যে বক্তব্যটি পেশ করেছে তা যদি বাস্তব ঘটনার সাথে হুবহু মিলে যায় তবে তা সত্য (সিদক্ব), আর যদি বাস্তবের পরিপন্থী হয় তবে তা মিথ্যা (কিযব)। তবে নবুওয়তের অহি এবং মুতাওয়াতির সংবাদের ক্ষেত্রে নিশ্চিত প্রমাণের ভিত্তিতে তা সন্দেহাতীতভাবে কেবলই চিরন্তন সত্য সাব্যস্ত হয়।

জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম হিসেবে সত্য সংবাদের (الخبر الصادق) মৌলিক প্রকারভেদ ও গুণাবলি

ইমাম নাজম উদ্দীন নাসাফী (রহ.) ‘আক্বাঈদে নাসাফী’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, মানবজাতির নিশ্চিত জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে সত্য সংবাদ দুই ভাগে বিভক্ত:

  • ১. খবরে মুতাওয়াতির (الخبر المتواتر – অবিচ্ছিন্ন বহুধারার সংবাদ):

    সংজ্ঞা: যে সংবাদটি এমন অবিচ্ছিন্ন ধারাবাহিক সনদের মাধ্যমে বর্ণিত হয়, যার প্রতিটি স্তরে এত বিপুল সংখ্যক সত্যবাদী ও ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি বিদ্যমান থাকেন যে, তাঁদের সকলের পক্ষে গোপনে একত্রিত হয়ে মিথ্যার ওপর সমঝোতা করা স্বভাবতই ও যুক্তিতাহ সম্পূর্ণ অসম্ভব।

    গুণাবলি ও প্রভাব: খবরে মুতাওয়াতির মানুষকে ‘ইলমে দরুরী’ (স্বতঃসিদ্ধ নিশ্চিত জ্ঞান) দান করে। যেমন—সুদূর অতীতকালের বাদশাহদের ইতিহাস, অথবা মক্কা-মদিনা বা লন্ডন-প্যারিস নগরীর অস্তিত্ব, যা স্বচক্ষে না দেখেও কেবল অবিচ্ছিন্ন মুতাওয়াতির সংবাদের কারণে মানুষ পরম দৃঢ়তার সাথে বিশ্বাস করে।

  • ২. খবরুর রাসুল (خبر الرسول المؤيد بالمعجزة – মোজেজাপ্রাপ্ত রাসুলের ঐশী বাণী):

    সংজ্ঞা: যিনি স্পষ্ট অলৌকিক মোজেজার অকাট্য প্রমাণের সাহায্যে আল্লাহর প্রেরিত সত্য রাসুল হিসেবে উম্মতের কাছে প্রমাণিত হয়েছেন, তাঁর পবিত্র মুখনিঃসৃত অহিভিত্তিক বাণী।

    গুণাবলি ও প্রভাব: এটি মানুষকে ‘ইলমে ইস্তিদলালী’ (যুক্তি ও প্রমাণের মাধ্যমে অর্জিত অকাট্য জ্ঞান) দান করে। এই খবরের মাধ্যমেই মানবজাতি আল্লাহ তাআলার সত্তা ও গুণাবলি, কিয়ামত, পুলসিরাত, মিজান, জান্নাত, জাহান্নাম এবং অদৃশ্যের যাবতীয় গায়েবি ও শরিয়তের হালাল-হারামের সুনিশ্চিত জ্ঞান লাভ করতে সক্ষম হয়।

উপসংহার

সত্য সংবাদ বা আল-খবরুস সাদিক্ব মানবজাতির সীমিত ইন্দ্রিয়ানুভূতিকে অতিক্রম করে মহাকালের অতীত ও ভবিষ্যতের পরম সত্যের মহাসমুদ্রের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত করে।

১১। عرف العلم الضروري والاختياري بالأمثلة –

[উদাহরণসহ العلم الضروري ও العلم الاختياري-এর সংজ্ঞা দাও।]

[মান: ৫]

ভূমিকা ও ইলমের মৌলিক স্তরভেদ

ইসলামি কালামশাস্ত্রে সৃষ্টির যাবতীয় অর্জিত জ্ঞান বা ধারণাকে তার উৎপত্তি, উদ্ভাবন পদ্ধতি এবং চিন্তা-ভাবনার মুখাপেক্ষিতার নিরিখে প্রধানত দুটি মৌলিক ভাগে বিভক্ত করা হয়: (১) ইলমে দরুরী বা বাদিহী (العلم الضروري أو البديهي), এবং (২) ইলমে ইখতিয়ারী বা ইস্তিদলালী (العلم الاختياري أو الاستدلالي বা الكسبي)।

১. ইলমে দরুরী (العلم الضروري – স্বতঃসিদ্ধ বা অপ্রতিরোধ্য জ্ঞান)

সংজ্ঞা: যে জ্ঞান অর্জন করার জন্য মানুষের নিজস্ব কোনো প্রচেষ্টা, গভীর চিন্তা-ভাবনা বা যুক্তিপ্রমাণের ধারাবাহিক অবতারণার প্রয়োজন পড়ে না; বরং বিষয়ের মুখোমুখি হওয়ামাত্রই তা মানুষের অন্তরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এবং অপ্রতিরোধ্য বাধ্যতামূলকভাবে অর্জিত হয়ে যায়, তাকে ‘ইলমে দরুরী’ বলা হয়।

  • বাস্তব দৃষ্টান্তসমূহ:
    • ইন্দ্রিয়লব্ধ সরাসরি জ্ঞান: চোখ খোলা রাখলে সূর্যের প্রখর আলো ও উজ্জ্বলতা দেখা, কিংবা আগুনে হাত পড়লে উত্তাপ ও দহন অনুভব করা। এটি নিশ্চিত হতে কোনো যুক্তি প্রমাণের প্রয়োজন হয় না।
    • সহজাত বুদ্ধিবৃত্তিক মূলনীতি: যেমন এই সত্য জানা যে—‘একই বস্তু একই সময়ে একই স্থানে একই সাথে বিদ্যমান এবং অনুপস্থিত থাকতে পারে না’ (استحالة اجتماع النقيضين); অথবা ‘একটি সমগ্র বস্তু সর্বদা তার ক্ষুদ্র খণ্ডাংশের চেয়ে বড়’ (الكل أعظم من الجزء)।

২. ইলমে ইখতিয়ারী বা কাসবী (العلم الاختياري বা الاكتسابي – অর্জিত বা চিন্তানির্ভর জ্ঞান)

সংজ্ঞা: যে জ্ঞান স্বতঃস্ফূর্তভাবে অর্জিত হয় না; বরং মানুষ তার স্বাধীন ইচ্ছা, সাধনা, গভীর চিন্তা-গবেষণা এবং যুক্তিপ্রমাণের (নজর ও ইস্তিদলাল) সুবিন্যস্ত ব্যবহারের মাধ্যমে ধাপে ধাপে অর্জন করে, তাকে ‘ইলমে ইখতিয়ারী’ বা ‘ইলমে কাসবী’ বলা হয়।

  • বাস্তব দৃষ্টান্তসমূহ:
    • স্রষ্টার অস্তিত্বের জ্ঞান: ‘এই নিখিল মহাবিশ্ব নিত্য পরিবর্তনশীল ও নশ্বর, আর প্রত্যেক পরিবর্তনশীল বস্তুর একজন অনশ্বর স্রষ্টা প্রয়োজন—অতএব এই মহাবিশ্বের একজন একক সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রয়েছেন।’ এই পরম সত্যে উপনীত হওয়ার জন্য মানুষকে গভীর পর্যবেক্ষণ ও চিন্তাশক্তি প্রয়োগ করতে হয়।
    • শরিয়ত ও বিজ্ঞানের জ্ঞান: পবিত্র কুরআনের সূক্ষ্ম বিধান থেকে ফিক্বহী মাসআলা উদ্ভাবন করা, গণিতের জটিল সমাধান বের করা, কিংবা চিকিৎসা বিজ্ঞানের রোগ নিরাময়ের সূত্র আবিষ্কার করা।

উপসংহার

ইলমে দরুরী হলো মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের অন্তরে স্থাপিত প্রাথমিক ভিত্তিপ্রস্তর, আর ইলমে ইখতিয়ারী হলো সেই ভিত্তির ওপর মানুষের নিরন্তর জ্ঞানসাধনা ও চিন্তাশক্তির অনন্য ফসল।

১২। ما التوبة؟ ومتى تقبل؟ بين مفصلا –

[التوبة কাকে বলে? কখন তাওবা গৃহীত হয়? বিস্তারিত বর্ণনা কর।]

[মান: ৫]

ভূমিকা ও তাওবার পারিভাষিক সংজ্ঞা

ইসলামে গুনাহগার বান্দার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত সর্বশ্রেষ্ঠ ক্ষমার তোহফা হলো ‘তাওবা’ (التوبة)। আরবি ‘তাওব’ শব্দমূলের অর্থ হলো—প্রত্যাবর্তন করা বা ফিরে আসা। শরিয়তের পরিভাষায় তাওবা বলা হয়: আল্লাহর নাফরমানি ও অবাধ্যতার পথ পরিহার করে অনুতপ্ত হৃদয়ে আল্লাহর আনুগত্য ও সন্তুষ্টির পথে ফিরে আসাকে তাওবা বলে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন:
«النَّدَمُ تَوْبَةٌ» (অনুতাপ ও লজ্জাবোধই হলো তাওবার মূল ভিত্তি—ইবনে মাজাহ)।

তাওবা কবুল হওয়ার অপরিহার্য শর্তাবলি

ইমাম নববী (রহ.)-এর মতে তাওবা কবুল হওয়ার জন্য চারটি শর্ত আবশ্যক:

  • ১. তাৎক্ষণিকভাবে গুনাহের কাজ সম্পূর্ণ বর্জন করা।
  • ২. অতীতের কৃত পাপের জন্য অন্তরের অন্তস্তল থেকে গভীর অনুশোচনা ও লজ্জা প্রকাশ করা।
  • ৩. ভবিষ্যতে আর কখনো এই গুনাহে লিপ্ত না হওয়ার জন্য দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা।
  • ৪. যদি পাপটি মানুষের হকের সাথে সংশ্লিষ্ট হয় (হক্বুল ইবাদ—যেমন কারো সম্পদ আত্মসাৎ বা অপবাদ), তবে তার হক ফিরিয়ে দেওয়া বা তার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া।

তাওবা গ্রহণের চূড়ান্ত সময়সীমা

কুরআন ও হাদিসের আলোকে তাওবা কবুল হওয়ার দুটি সুনির্দিষ্ট প্রান্তিক সময়সীমা রয়েছে:

  • ১. ব্যক্তিগত সময়সীমা (গরগরা বা মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত): মানুষের মৃত্যুযন্ত্রণা শুরু হওয়া ও কণ্ঠনালীতে প্রাণ আটকে যাওয়ার (গরগরা) পূর্ব পর্যন্ত তাওবার দরজা খোলা থাকে। রাসুল (সা.) বলেন:
    «إِنَّ اللَّهَ يَقْبَلُ تَوْبَةَ الْعَبْدِ مَا لَمْ يُغَرْغِرْ» (নিশ্চয় আল্লাহ বান্দার তাওবা গ্রহণ করেন যতক্ষণ না তার প্রাণ কণ্ঠনালীতে পৌঁছে যায়)। মৃত্যুর ফেরেশতা দেখে ফেলার পর তাওবা কবুল হয় না (যেমন ফেরাউনের তাওবা প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল)।
  • ২. বৈশ্বিক সময়সীমা (পশ্চিমাকাশে সূর্যোদয়): কিয়ামতের মহাপ্রলয়ের প্রাক্কালে যেদিন পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হবে, সেদিন সমগ্র পৃথিবীর জন্য তাওবার দরজা চিরতরে রুদ্ধ হয়ে যাবে।

উপসংহার

জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে তাওবা করা ওয়াজিব; কারণ মানুষ প্রতিনিয়ত ভুলের শিকার হয় আর আল্লাহ পরম দয়াময় ক্ষমাশীল।

১৩। فمن يرد الله أن يهديه يشرح صدره للإسلام أوضح معنى إرادة الله تعالى في ضوء الآية المذكورة –

[فمن يرد الله أن يهديه يشرح صدره للإسلام-এর অর্থ ও فمن يرد الله-এর অর্থ স্পষ্টভাবে বর্ণনা কর।]

[মান: ৫]

পবিত্র আয়াতের পাঠ ও অনুবাদ

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সূরা আল-আনআমে ইরশাদ করেন:

﴿فَمَنْ يُرِدِ اللَّهُ أَنْ يَهْدِيَهُ يَشْرَحْ صَدْرَهُ لِلْإِسْلَامِ وَمَنْ يُرِدْ أَنْ يُضِلَّهُ يَجْعَلْ صَدْرَهُ ضَيِّقًا حَرَجًا كَأَنَّمَا يَصَّعَّدُ فِي السَّمَاءِ﴾

“অতঃপর আল্লাহ যাকে হেদায়েত করার ইচ্ছা করেন, তার বক্ষকে ইসলামের জন্য উন্মুক্ত ও প্রশস্ত করে দেন; আর যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করার ইচ্ছা করেন, তার বক্ষকে এমন সংকীর্ণ ও অতি সংকুচিত করে দেন, যেন সে অতি কষ্টে আকাশে আরোহণ করছে।” (সূরা আল-আনআম: ১২৫)।

আয়াতের আলোকে ‘আল্লাহর ইরাদা’ (إرادة الله)-এর তাৎপর্য

এ আয়াতে আল্লাহর সার্বভৌম ইচ্ছা বা ‘ইরাদা’ এবং মানুষের ভাগ্যের চূড়ান্ত পরিণতি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে চিত্রিত হয়েছে:

  • ১. বক্ষ প্রশস্তকরণ (শারহুস সাদর): আল্লাহ যখন কোনো বান্দার কল্যাণ ও হেদায়েত চান, তখন তিনি তার অন্তরে ঈমানের নূর প্রবিষ্ট করিয়ে দেন। ফলে ইসলামি জীবনবিধান ও শরিয়তের আমল তার কাছে অত্যন্ত সহজ, আনন্দদায়ক ও প্রিয় মনে হয়। সে ইবাদতের মধ্যে আত্মিক পরম প্রশান্তি লাভ করে।
  • ২. গোমরাহি ও বক্ষ সংকীর্ণতা: পক্ষান্তরে যার অন্তরে অহংকার ও কুফরির জিদ থাকে, আল্লাহ তার অবাধ্যতার পরিণামে তার বক্ষকে এমন শ্বাসরুদ্ধকর সংকীর্ণ করে দেন যে, সে সত্যের বাণী শুনতে নারাজ হয়। যেমন আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে মানুষ আকাশে যতই উঁচুতে ওঠে অক্সিজেনের অভাবে তার বুক সংকুচিত ও শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসে।
  • ৩. কালামশাস্ত্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি: মুতাকাল্লিমীনগণের মতে—আল্লাহর ইরাদা বা ইচ্ছার বাইরে মহাবিশ্বে একটি গাছের পাতাও নড়ে না। তবে আল্লাহ কাউকে জোরপূর্বক পথভ্রষ্ট করেন না; বরং বান্দা যখন স্বেচ্ছায় সত্য বা অসত্যের পথ বেছে নেয়, আল্লাহ তাঁর চিরন্তন ইচ্ছানুযায়ী সেই পথের পথ উন্মুক্ত করে দেন।

উপসংহার

আয়াতটি মুমিনের অন্তরে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও হেদায়েতের ওপর অবিচল থাকার জন্য কায়মনোবাক্যে দোয়ার তীব্র প্রেরণা জাগ্রত করে।

১৪। تحدث عن ثواب الجن وعقابهم بالاختصار –

[জিনের ছাওয়াব ও শাস্তি সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা কর।]

[মান: ৫]

ভূমিকা ও জিন জাতির শারঈ অবস্থান

মানবজাতির মতোই জিন জাতি হলো আল্লাহর এমন এক সৃষ্ট সত্তা, যাদের বিবেক, বোধশক্তি এবং ভালো-মন্দ নির্বাচনের স্বাধীনতা (ইখতিয়ার) দেওয়া হয়েছে। কুরআনুল কারিমে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষিত হয়েছে:

﴿وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالإِنْسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ﴾

“আর আমি জিন ও মানবজাতিকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।” (সূরা আয-যারিয়াত: ৫৬)। যেহেতু তারা মানুষের মতোই শরিয়তের আদেশ ও নিষেধ পালনের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত (মুকাল্লাফ – مكلفون), তাই পরকালে তাদেরও হিসাব-নিকাশ, ছাওয়াব ও শাস্তি নিশ্চিতভাবে অনুষ্ঠিত হবে।

জিনদের শাস্তি (عقاب الجن) সংক্রান্ত সর্বসম্মত আকিদা

ইসলামি উম্মাহর সর্বসম্মত ঐকমত্য হলো: কাফের ও পাপাচারী জিনেরা নিশ্চিতভাবে জাহান্নামের আগুনে শাস্তি ভোগ করবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন:

﴿لَأَمْلَأَنَّ جَهَنَّمَ مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ﴾

“আমি নিশ্চয়ই জিন ও মানবজাতি উভয়কে দিয়ে জাহান্নাম পূর্ণ করব।” (সূরা আস-সাজদাহ: ১৩)। শয়তান (ইবলিস) স্বয়ং জিন জাতির অন্তর্ভুক্ত এবং সে চিরস্থায়ী জাহান্নামী।

মুমিন জিনদের ছাওয়াব ও জান্নাত লাভ (ثواب الجن)

মুমিন জিনদের প্রতিদান নিয়ে ওলামায়ে কেরামের পর্যালোচনা নিম্নরূপ:

  • জমহুর উম্মাহ ও চার মাজহাবের ইমামগণের মত: সৎকর্মশীল মুমিন জিনেরা মানব মুমিনদের মতোই পরকালে জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং জান্নাতের অনন্ত নিয়ামত ভোগ করবে।

    দলিল: সূরা আর-রহমানে আল্লাহ তাআলা জিন ও মানব উভয়কে সম্বোধন করে জান্নাতের বর্ণনায় বলেছেন:
    ﴿وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ جَنَّتَانِ ۝ فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ﴾ (যে ব্যক্তি তার রবের সামনে দাঁড়ানোকে ভয় করে তার জন্য রয়েছে দুটি জান্নাত; অতএব তোমরা উভয়ে তোমাদের রবের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?)। এখানে উভয় জান্নাত জিন ও মানুষ উভয়ের জন্যই ঘোষিত হয়েছে।
  • অন্যান্য মতামত: কেউ কেউ বলেছেন তারা জান্নাতের চারণভূমিতে থাকবে বা আ’রাফে অবস্থান করবে; তবে সর্বাধিক প্রামাণ্য ও বিশুদ্ধ মত হলো তারা জান্নাতের স্থায়ী বাসস্থানে পরম সুখে থাকবে।

উপসংহার

আল্লাহ তাআলা ইনসাফ ও সুবিচারের মালিক। যে জিন ঈমান এনে নেক আমল করেছে, আল্লাহ কখনো তার ছাওয়াব বিনষ্ট করবেন না; আর যে কুফরি করেছে সে জাহান্নামের উপযুক্ত হবে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

ফাযিল ১ম বর্ষ আল-আক্বীদাতুল ইসলামিয়্যাহ ১ম পত্রের বিষয় কোড কত ছিল?

বিষয় কোড ছিল ১১১০১৭ এবং পরীক্ষার পূর্ণমান ছিল ১০০ নম্বর। পরীক্ষার সময় ৩ ঘণ্টা।

ইলমুল কালামের সংজ্ঞায় ইমাম সা’দউদ্দীন তাফতাযানী কী বলেছেন?

অকাট্য ও নিশ্চিত প্রমাণের ভিত্তিতে ইসলামি দ্বীনি আকিদা ও বিশ্বাসসমূহ জানার শাস্ত্রকে ইলমুল কালাম বলা হয়।

আহলুস সুন্নাহর মতে আল্লাহ কি কোনো নির্দিষ্ট স্থান বা দিকে সীমাবদ্ধ?

না, আল্লাহ তাআলা দিক, স্থান ও সমস্ত সৃষ্টির সদৃশতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র।

আহলুস সুন্নাহ অনুযায়ী জ্ঞান বা মা’রেফাত অর্জনের মাধ্যম কয়টি ও কী কী?

তিনটি মাধ্যম: সুস্থ পঞ্চেন্দ্রিয়, অকাট্য সত্য সংবাদ (মুতাওয়াতির ও ওহি), এবং সুস্থ বিবেক।

মুসলিম কবিরা গুনাহকারী কি চিরকাল জাহান্নামে থাকবে?

না, আহলুস সুন্নাহর মতে তওবা ছাড়া মারা গেলেও ঈমানের উসিলায় পরিশেষে জান্নাত লাভ করবে।

জান্নাত ও জাহান্নাম কি বর্তমানে বিদ্যমান রয়েছে?

হ্যাঁ, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের সর্বসম্মত আকিদা হলো জান্নাত ও জাহান্নাম বর্তমানে সৃষ্টি অবস্থায় বিদ্যমান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *