ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়
ফাযিল (স্নাতক) পাস ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪
বিষয়: আল-আক্বীদাতুল ইসলামিয়্যাহ — ২য় পত্র (আক্বাইদুল ফিরাক্বিল বাত্বিলাহ)
বিষয় কোড: ১১১০১৮ | পূর্ণমান: ১০০ | সময়: ৩ ঘণ্টা
[দ্রষ্টব্য: ক-বিভাগ থেকে যেকোনো ৫টি এবং খ-বিভাগ থেকে যেকোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
ক-বিভাগ (মান: ১৬ × ৫ = ৮০)
১। ما الفرق الضالة التي ظهرت في عهد الصحابة رضى الله عنهم؟ اذكر خلفية ظهورها ونشأتها موجزا –
[সাহাবায়ে কেরামের যুগে আত্মপ্রকাশ করা ভ্রান্ত দলগুলো কী কী? তাদের আত্মপ্রকাশের প্রেক্ষাপট ও কার্যক্রম সংক্ষেপে আলোচনা কর।]
[মান: ১৬]
ভূমিকা ও প্রাথমিক ঐক্য
রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং খলিফাতুল মুসলিমীন হযরত আবু বকর সিদ্দিক্ব (রা.) ও হযরত উমর ফারুক (রা.)-এর খেলাফতকাল পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহ একক জামাত ও অভিন্ন বিশুদ্ধ আকিদার ওপর সুসংগঠিত ছিল। কিন্তু তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান (রা.)-এর খেলাফতের শেষভাগে চক্রান্তকারী মুনাফিক ও ইহুদি আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার গোপন তৎপরতায় প্রথম ফিতনার বীজ রোপিত হয়। পরবর্তীতে হযরত উসমান (রা.)-এর মর্মান্তিক শাহাদাত এবং হযরত আলী (রা.)-এর খেলাফতকালে সংঘটিত জঙ্গে জামাল ও সিফফিনের রাজনৈতিক সংঘাতকে কেন্দ্র করে সাহাবায়ে কেরামের যুগেই কয়েকটি ভ্রান্ত ফেরকার আত্মপ্রকাশ ঘটে।
সাহাবায়ে কেরামের যুগে আত্মপ্রকাশকারী প্রধান ভ্রান্ত দলসমূহ
- ১. আল-খাওয়ারিজ (الخوارج – খারেজী সম্প্রদায়):
উত্থানের পটভূমি: ৩৭ হিজরিতে সিফফিনের যুদ্ধে হযরত আলী (রা.) ও হযরত মুআবিয়া (রা.)-এর বাহিনীর মধ্যে রক্তক্ষয় বন্ধের উদ্দেশ্যে যখন সালিশি বা তাহকীম (হযরত আবু মুসা আশআরী ও আমর ইবনুল আস রা.-এর মাধ্যমে) নির্ধারিত হয়, তখন হযরত আলীর সেনাদলের একটি উগ্রপন্থী অংশ বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তারা স্লোগান তোলে:
«إِنِ الْحُكْمُ إِلاَّ لِلَّهِ» (আল্লাহ ছাড়া কারো ফয়সালা দেওয়ার অধিকার নেই)। তারা কুফার নিকটবর্তী ‘হারূরা’ নামক স্থানে সমবেত হয়ে হযরত আলী (রা.), মুআবিয়া (রা.) এবং তাহকীম মেনে নেওয়া সমস্ত সাহাবীকে কাফের আখ্যা দেয়।কার্যক্রম: তারা সাধারণ নিরীহ মুসলমানদের কাফের ঘোষণা করে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে (যেমন হযরত খাব্বাব ইবনুল আরাত রা.-এর পুত্রকে নৃশংসভাবে হত্যা)। কবিরা গুনাহকারীকে চিরস্থায়ী জাহান্নামী দাবি করে তারা উম্মাহর ঐক্যে চরম আঘাত হানে। পরবর্তীতে হযরত আলী (রা.) নাহরাওয়ানের যুদ্ধে তাদের দমন করেন এবং অবশেষে খারেজী আব্দুর রহমান ইবনে মুলজিম হযরত আলী (রা.)-কে শহীদ করে।
- ২. আশ-শিয়া বা সাবাঈয়্যাহ (الشيعة والسبئية – শিয়া সম্প্রদায়):
উত্থানের পটভূমি: ইয়েমেনি ইহুদি আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা বাহ্যিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করে হযরত আলী (রা.)-এর প্রতি অতিভক্তি ও চরমপন্থার বিষবাষ্প ছড়াতে শুরু করে। সে দাবি করে—যেমন প্রত্যেক নবীর একজন ওয়াসী (স্থলাভিষিক্ত) থাকে, তেমনি রাসুল (সা.)-এর একমাত্র ওয়াসী হলেন আলী (রা.)। সে আবু বকর, উমর ও উসমান (রা.)-কে আলীর অধিকার হরণকারী হিসেবে অপবাদ দেয়।
কার্যক্রম: একপর্যায়ে এই সাবাঈরা হযরত আলী (রা.)-কে আল্লাহর অবতার বা উপাস্য বলে দাবি করে বসে। হযরত আলী (রা.) এই চরমপন্থী মুরতাদদের আগুনে পুড়িয়ে শাস্তি দেন এবং ইবনে সাবাকে মাদায়েনে নির্বাসিত করেন। পরবর্তীতে এদের থেকেই শিয়াদের বিভিন্ন চরমপন্থী উপদল তৈরি হয়।
- ৩. আল-ক্বাদারিয়্যাহ (القدرية – তাকদির অস্বীকারকারী):
সাহাবীদের যুগের শেষভাগে বসরার মা’বাদ আল-জুহানী এবং দামেস্কের গায়লান আদ-দিমাশক্বী সর্বপ্রথম তাকদির অস্বীকার করে নতুন ফেতনা ছড়ায়। তারা দাবি করে—আল্লাহ তাআলা মানুষের ভাগ্য পূর্ব থেকে নির্ধারণ করেন না, মানুষ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করে এবং কাজের পরেই কেবল আল্লাহ তা জানতে পারেন («الأمر أُنُفٌ»)।
সাহাবীদের অবস্থান: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) এই কথা শুনে তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করে ঘোষণা করেন: ‘তাদেরকে জানিয়ে দাও যে তাদের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই এবং আমার সাথেও তাদের কোনো সম্পর্ক নেই; ওহুদ পাহাড় সমান স্বর্ণ দান করলেও তাকদিরে বিশ্বাস না করা পর্যন্ত আল্লাহ তা কবুল করবেন না’ (সহিহ মুসলিম)।
- ৪. আল-মুরজিয়া (المرجئة):
খারেজীদের তাকফিরি উগ্রবাদের প্রতিক্রিয়ায় একদল লোক বলে—ঈমানের সাথে কোনো গুনাহই ক্ষতি করে না, যেমন কুফরের সাথে কোনো নেক আমল উপকারে আসে না। তারা আমলকে ঈমান থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
উপসংহার
সাহাবায়ে কেরাম জীবদ্দশায়ই অত্যন্ত কঠোর হাতে এবং অকাট্য কুরআনী দলিলের সাহায্যে এই বাতিল ফেরকাগুলোর যাবতীয় বিভ্রান্তি উন্মোচন করেছিলেন এবং সুন্নাহর পতাকাকে অক্ষুণ্ন রেখেছিলেন।
২। عرف فرقة الروافض مع بيان عقائدهم ورجالهم وفروعهم –
[রাফেজী সম্প্রদায়ের পরিচয়, আকিদা, নেতৃবৃন্দ ও শাখা সম্প্রদায়গুলো সম্পর্কে আলোচনা কর।]
[মান: ১৬]
ভূমিকা ও রাফেজীদের নামকরণের পটভূমি
ইসলামের ইতিহাসে শিয়াদের মধ্যে যারা প্রথম তিন খলিফাসহ জমহুর সাহাবায়ে কেরামকে সরাসরি গালাগাল করে ও পরিত্যাগ করে, তাদেরকে ‘আর-রাওয়াফিদ’ (الروافض) বা রাফেজী বলা হয়। আরবি ‘রাফদ’ (الرفض) শব্দের অর্থ হলো—বর্জন করা, পরিত্যাগ করা বা প্রত্যাখ্যান করা।
নামকরণের ঐতিহাসিক কারণ: হিজরি ১২২ সনে হযরত হুসাইন (রা.)-এর পৌত্র ইমাম যায়েদ ইবনে আলী কুফায় উমাইয়াদের বিরুদ্ধে বিপ্লবের ডাক দিলে কুফার শিয়ারা এসে শর্ত দেয়: ‘আপনাকে হযরত আবু বকর ও উমর (রা.)-কে কাফের ও জালিম বলে ঘোষণা দিতে হবে, তবেই আমরা আপনার পক্ষে তরবারি ধারণ করব।’ ইমাম যায়েদ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জবাব দেন:
«رَحِمَهُمَا اللَّهُ، هُمَا وَزِيرَا جَدِّي رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم، مَا سَمِعْتُ أَحَدًا مِنْ أَهْلِ بَيْتِي يَتَبَرَّأُ مِنْهُمَا» (আল্লাহ তাঁদের দুজনের ওপর রহম করুন, তাঁরা ছিলেন আমার নানাজান রাসুলুল্লাহর দুই সম্মানিত উজির; আমার আহলে বাইতের কাউকে আমি তাঁদের বিরুদ্ধে অপবাদ দিতে শুনিনি)। তখন সেই শিয়ারা ক্ষুব্ধ হয়ে ইমাম যায়েদকে ময়দানে একা ফেলে দলত্যাগ করে চলে যায়। ইমাম যায়েদ ক্ষোভভরে বলেছিলেন: «رَفَضْتُمُونِي» (তোমরা আমাকে ত্যাগ করলে!)। সেই থেকে এদের নাম হয়ে যায় ‘রাফেজী’ বা পরিত্যাগকারী।
রাফেজীদের মৌলিক ভ্রান্ত আকিদাসমূহ
- ১. সাহাবায়ে কেরামকে তাকফির (تكفير الصحابة): রাফেজীদের জঘন্যতম আকিদা হলো—হযরত আলী (রা.)-এর ইমামত সরাসরি না মানার কারণে তিন-চারজন ব্যতীত (সালমান, আবু যার, মিকদাদ রা.) সমস্ত সাহাবায়ে কেরাম মুরতাদ হয়ে গেছেন (নাউযুবিল্লাহ)। বিশেষ করে হযরত আবু বকর, উমর ও আয়েশা (রা.)-এর প্রতি তারা চরম কুৎসা রটায়।
- ২. ইমামতের ঐশী আকিদা ও ইসমত: তাদের মতে ইমামত হলো নবুওয়তের চেয়েও উচ্চ মর্যাদাপূর্ণ। তাদের বারোজন ইমাম হলেন নিষ্পাপ (মা’সুম), তাঁরা গায়েবের সমস্ত খবর জানেন এবং জগতের সৃষ্টির ওপর তাঁদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
- ৩. কুরআন বিকৃতির কুফরি দাবি (تحريف القرآن): তাদের চরমপন্থী উলামা (যেমন নূরী তাবারসী) দাবি করে যে মূল কুরআনের বিরাট অংশ সাহাবীরা লুকিয়ে ফেলেছেন এবং বর্তমান কুরআন অপূর্ণ।
- ৪. ‘তাক্বিয়্যা’ (التقية) বা দ্বিমুখী কপটতা: নিজেদের মূল বিশ্বাস গোপন রেখে মিথ্যা কথা বলা এবং প্রকাশ্যে অন্য রূপ ধারণ করাকে তারা দ্বীনের দশ ভাগের নয় ভাগ সওয়াবের কাজ মনে করে।
- ৫. ‘রাজআ’ (الرجعة – পুনরুত্থান): তাদের বিশ্বাস, কিয়ামতের পূর্বে ইমাম মাহদী প্রকাশ পেয়ে কবর থেকে আবু বকর ও উমর (রা.)-কে তুলে ক্রুশবিদ্ধ করবেন এবং শাস্তি দেবেন।
রাফেজীদের প্রধান নেতৃবৃন্দ
রাফেজীদের তাত্ত্বিক রূপকারদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় ছিল: আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা (মূল প্রতিষ্ঠাতা), হিশাম ইবনুল হাকাম, শায়খ কুলিনী (আল-কাফী কিতাবের প্রণেতা), ইবনে বাবওয়াইহি আল-কুম্মী, এবং আল্লামা মাজলিসী (বিহারুল আনওয়ারের লেখক)।
রাফেজীদের প্রধান প্রধান শাখা সম্প্রদায়
রাফেজী শিয়ারা অভ্যন্তরীণভাবে বহু ভাগে বিভক্ত হয়েছে:
- ক. আল-ইমামিয়্যাহ আল-ইস্না আশারিয়্যাহ (الإمامية الاثنا عشرية): যারা বারো জন ইমামে বিশ্বাস করে। বর্তমানে ইরান ও ইরাকের সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়া এই দলের।
- খ. আল-ইসমাঈলিয়্যাহ (الإسماعيلية – বাতেনিয়্যা): যারা সপ্তম ইমাম হিসেবে ইসমাইল ইবনে জাফর সাদিককে মানে। এরা শরীয়তের যাহেরী বিধান অস্বীকার করে আগাখানি ও বোহরা সম্প্রদায়ে রূপ নিয়েছে।
- গ. আল-গুলাত (الغلاة – চরমপন্থী দলসমূহ): যেমন সাবাঈয়্যাহ (আলীর উপাস্য দাবিদার), নুসাইরিয়া বা আলাভী (সিরিয়ায় যারা আলীকে খোদা মানে) এবং দ্রুজ সম্প্রদায়।
উপসংহার
রাফেজী সম্প্রদায় ইসলামের মূল ভাবমূর্তি বিনষ্টকারী অন্যতম বিপজ্জনক গোষ্ঠী, যাদের আকিদা আহলুস সুন্নাহর অকাট্য তাওহিদ ও রিসালাতের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।
৩। ما الإمامية؟ اكتب فرقها وعقائدها الباطلة مفصلا –
[الإمامية কারা? তাদের দল ও ভ্রান্ত আকিদাসমূহ বিস্তারিত আলোচনা কর।]
[মান: ১৬]
ভূমিকা ও ইমামিয়্যার পরিচয়
শিয়াদের মধ্যে যে সর্ববৃহৎ মূল দলটি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্ব বা ‘ইমামত’ কেবল হযরত আলী (রা.) এবং হযরত ফাতেমা (রা.)-এর বংশধর নির্দিষ্ট বারোজন ইমামের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত ঐশী অধিকার (নাস্সিয়্যা) বলে বিশ্বাস করে, তাদেরকে ‘আল-ইমামিয়্যাহ’ (الإمامية) বলা হয়। বারোজন ইমামের অনুসারী হওয়ার কারণে এদেরকে সাধারণত ‘ইস্না আশারিয়্যাহ’ (اثنا عشرية – দ্বাদশবাদী) বা জাফরিয়া শিয়া বলা হয়।
ইমামিয়াদের বারোজন ইমামের তালিকা
১. আলী ইবনে আবি তালিব (রা.), ২. হাসান ইবনে আলী (রা.), ৩. হুসাইন ইবনে আলী (রা.), ৪. আলী যাইনুল আবেদীন, ৫. মুহাম্মদ আল-বাক্বির, ৬. জাফর আস-সাদিক্ব, ৭. মুসা আল-কাযিম, ৮. আলী আর-রিদা, ৯. মুহাম্মদ আল-জাওয়াদ, ১০. আলী আল-হাদী, ১১. হাসান আল-আসকারী, এবং ১২. মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আল-মাহদী (যিনি ২৬০ হিজরিতে সামাররার গুহায় অদৃশ্য হয়ে গেছেন বলে তাদের দাবি)।
ইমামিয়্যাদের প্রধান প্রধান উপদলসমূহ
ইমামিয়্যা শিয়ারা কালের বিবর্তনে একাধিক উপদলে বিভক্ত হয়েছে:
- ১. আল-উসুলিয়্যাহ (الأصولية): যারা ফিক্বহী মাসআলায় মুজতাহিদ বা ‘মারজায়ে তাক্বলীদ’ (যেমন আয়াতুল্লাহদের) ইজতিহাদ ও ফতোয়া মান্য করা ওয়াজিব মনে করে। সমকালীন ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থা ও খোমেইনীর ‘বেলায়াতে ফক্বীহ’ দর্শন এদেরই চিন্তাপ্রসূত।
- ২. আল-আখবারিয়্যাহ (الإخبارية): এরা ইজতিহাদ ও আকলের ভূমিকা সম্পূর্ণ অস্বীকার করে এবং কেবল তাদের চার কিতাবের (আল-কাফী, মান লা ইয়াহদুরুহুল ফক্বীহ, আত-তাহযীব, আল-ইসতিবসার) রেওয়ায়েত অন্ধভাবে অনুসরণ করে।
- ৩. আল-ওয়াকিফিয়্যাহ (الواقفية): যারা নির্দিষ্ট কোনো এক ইমামের পর আর ইমামত মানেনি এবং সেখানে থমকে দাঁড়িয়েছে। যেমন যারা মুসা কাযিমকেই শেষ ইমাম মনে করে।
- ৪. আল-নাভূসিয়্যাহ ও আফতাহিয়্যাহ: এরা জাফর সাদিক্বের অন্যান্য সন্তানদের ঘিরে বিভিন্ন ভ্রান্ত ধারার সৃষ্টি করেছিল।
ইমামিয়াদের মৌলিক ভ্রান্ত আকিদাসমূহ
- ১. ইমামতের রুকন হওয়া: তাদের মতে ইমামত হলো ঈমানের প্রধানতম স্তম্ভ, যা অস্বীকারকারী কাফের। ইমাম নবুওয়তের সমস্ত দায়িত্ব পালন করেন, শুধু তাঁর ওপর নতুন শরিয়ত নাজিল হয় না।
- ২. ইমামদের ইসমত ও অলৌকিক ক্ষমতা: তাদের বিশ্বাস—ইমামগণ জন্মগতভাবে সর্বপ্রকার পাপ ও ভুল থেকে নিষ্পাপ (মা’সুম)। শায়খ কুলিনী ‘আল-কাফী’-তে অধ্যায় বেঁধেছেন: “ইমামগণ জানেন কখন তাঁরা মৃত্যুবরণ করবেন এবং তাঁদের নিজেদের ইচ্ছা ছাড়া তাঁরা মৃত্যুবরণ করেন না।”
- ৩. সাহাবায়ে কেরামকে মুরতাদ ঘোষণা ও বারাআত: তারা খুলাফায়ে রাশেদীনের প্রথম তিন খলিফাসহ আনসার ও মুহাজির সাহাবীদের প্রতি চরম বিদ্বেষ পোষণ করে এবং তাঁদের ওপর লানত বর্ষণ করাকে সওয়াবের কাজ মনে করে।
- ৪. ‘আল-বাদা’ (البداء) আকিদা: তারা বিশ্বাস করে আল্লাহর কোনো বিষয়ে পূর্বে অজ্ঞতা থাকতে পারে এবং পরবর্তীতে কোনো ঘটনা দেখে আল্লাহর মত পরিবর্তন হতে পারে (নাউযুবিল্লাহ)।
- ৫. মুতআ বিবাহের বৈধতা: তারা নির্দিষ্ট সময়ের চুক্তিতে অর্থের বিনিময়ে নারীকে সাময়িক উপভোগ করাকে (মুতআ) অত্যন্ত সওয়াবের ইবাদত বলে গণ্য করে, যা সহিহ সুন্নাহর আলোকে সর্বসম্মতভাবে হারাম ও ব্যভিচারের শামিল।
উপসংহার
ইমামিয়্যাদের আকিদা কুরআনের শাশ্বত বাণী এবং সাহাবায়ে কেরামের পবিত্র জীবনদর্শনের পরিপন্থী এক কৃত্রিম ও রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট মতবাদ।
৪। متى نشأت فرقة المعتزلة؟ وما تفرع عنها ؟ تحدث عن أصول عقائدهم مفصلا –
[কখন মুতাযিলা সম্প্রদায়ের উৎপত্তি হয়েছে? এর শাখা সম্প্রদায়গুলো কী কী? তাদের আকিদার মূলনীতিসমূহ আলোচনা কর।]
[মান: ১৬]
মুতাযিলা সম্প্রদায়ের উৎপত্তির ইতিহাস ও সময়কাল
হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দীর প্রারম্ভে (১০০–১১০ হিজরির মাঝামাঝি) উমাইয়া খেলাফতের আমলে বসরার ইলমী কেন্দ্র থেকে ‘মুতাযিলা’ (المعتزلة) সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটে। আরবি ‘ই’তিযাল’ (الاعتزال) শব্দের অর্থ হলো—পৃথক হওয়া, সম্পর্ক ছিন্ন করা বা দূরে সরে যাওয়া।
উৎপত্তির ঐতিহাসিক ঘটনা: প্রখ্যাত তাবেঈ ইমাম হাসান বসরি (রহ.)-এর বসরার মসজিদে অনুষ্ঠিত বিখ্যাত ইলমী দরসে একজন ব্যক্তি এসে প্রশ্ন করল: ‘কবিরা গুনাহকারীর হুকুম কী? খারেজীরা বলে সে কাফের, আর মুরজিয়ারা বলে সে পূর্ণ মুমিন।’ ইমাম হাসান বসরি চিন্তা করার পূর্বেই তাঁর অন্যতম ছাত্র ওয়াসিল ইবনে আতা (واصل بن عطاء) উদ্ধত হয়ে বলে উঠল: ‘কবিরা গুনাহকারী মুমিনও নয় কাফেরও নয়, সে মধ্যবর্তী এক স্তরে (আল-মানযিলাতু বাইনাল মানযিলাতাইন) অবস্থান করে।’ এই কথা বলেই সে শিক্ষকের মজলিস ত্যাগ করে মসজিদের এক কোণে পৃথক হালাক্বা তৈরি করল। তখন ইমাম হাসান বসরি আক্ষেপ করে বলেছিলেন:
«اعْتَزَلَ عَنَّا وَاصِلٌ»
“ওয়াসিল আমাদের মজলিস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।” সেই থেকে তাদের নাম হয়ে যায় ‘মুতাযিলা’। ওয়াসিল ইবনে আতা ও আমর ইবনে উবাইদ ছিল এর প্রতিষ্ঠাতা।
মুতাযিলাদের প্রধান প্রধান শাখা সম্প্রদায়
মুতাযিলারা প্রধানত দুটি প্রধান ভৌগোলিক ও তাত্ত্বিক কেন্দ্রে বিভক্ত হয়েছিল: (১) বসরার মুতাযিলা: যার নেতৃত্বে ছিলেন ওয়াসিল ইবনে আতা, আবুল হুযাইল আল-আল্লাফ ও নাজ্জাম; এবং (২) বাগদাদের মুতাযিলা: যার নেতৃত্বে ছিলেন বিশর ইবনুল মু’তামির ও সুমামা ইবনে আশরাস। তাদের উল্লেখযোগ্য উপদলসমূহ হলো: আল-হুযাইলিয়্যাহ, আন-নাজ্জামিয়্যাহ, আল-জাহিযিয়্যাহ এবং আল-মুআম্মারিয়া।
মুতাযিলাদের পাঁচটি মৌলিক মূলনীতি (الأصول الخمسة)
মুতাযিলাদের সমগ্র চিন্তাধারা পাঁচটি মৌলিক আক্বিদাগত স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত:
- ১. আত-তাওহিদ (التوحيد): তাওহিদের নামে তারা মূলত আল্লাহর গুণাবলিকে (সিফাত) সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে (তা’তীল)। তারা বলে আল্লাহর সত্তা ছাড়া কুদরত, ইলম, কালামের মতো কোনো পৃথক সিফাত থাকতে পারে না; থাকলে বহু পুরাতন সত্তা প্রমাণিত হবে। এই যুক্তিতেই তারা ‘কুরআন আল্লাহর সৃষ্টি’ (খালক্বুল কুরআন) দাবি করে রক্তক্ষয়ী ফিতনার সৃষ্টি করেছিল।
- ২. আল-আদল (العدل – ইনসাফ): আদলের নামে তারা তাকদির অস্বীকার করে। তাদের মতে, আল্লাহ মানুষের ভালো বা মন্দ কাজের স্রষ্টা নন; মানুষ নিজেই তার কাজের একমাত্র সৃষ্টিকর্তা (খাল্লিক্ব)। বান্দার জন্য যা সর্বোত্তম (আস-সালাহ ওয়াল আসলাহ) তা করতে আল্লাহ বাধ্য।
- ৩. আল-ওয়াদ ওয়াল ওয়াইদ (الوعد والوعيد – পুরস্কার ও শাস্তি): তাদের মতে আল্লাহ তাআলা নেককারদের জান্নাত দিতে এবং তওবা ছাড়া মারা যাওয়া কবিরা গুনাহকারীকে জাহান্নামে শাস্তি দিতে বাধ্য; তিনি কাউকে ক্ষমা করতে পারেন না এবং আখেরাতে কোনো শাফাআত বা সুপারিশ কার্যকর হবে না।
- ৪. আল-মানযিলাতু বাইনাল মানযিলাতাইন (المنزلة بين المنزلتين): দুনিয়াতে কবিরা গুনাহকারী ঈমান ও কুফরের মধ্যবর্তী স্তরে থাকবে, তবে আখেরাতে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে।
- ৫. আল-আমর বিল মারুফ ওয়ান নাহইউ আনিল মুনকার (الأمر بالمعروف والنهي عن المنكر): তাদের মতে অন্যায় দেখলে অস্ত্রের মুখে তৎকালীন মুসলিম শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করা ওয়াজিব।
উপসংহার
মুতাযিলারা অহির ওপর মানবিক বুদ্ধি ও যুক্তিকে প্রাধান্য দিয়ে বহু চরম বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছিল, যা পরবর্তীতে ইমাম আবুল হাসান আল-আশআরী ও আহলুস সুন্নাহর আলিমগণ চূড়ান্তভাবে খণ্ডন করেন।
৫। عرف فرقة الجبرية والمرجية وما الفرق بين الجبرية والمرجية في الإيمان بالقدر؟ بين موضحا –
[‘জাবারিয়া’ ও ‘মুরজিয়া’ সম্প্রদায়ের পরিচয় দাও। তাকদিরের প্রতি বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ‘জাবারিয়া’ ও ‘মুরজিয়া’ সম্প্রদায়ের মধ্যে পার্থক্য কী? বিশদভাবে বর্ণনা কর।]
[মান: ১৬]
১. জাবারিয়া (الجبرية) সম্প্রদায়ের পরিচয়
আরবি ‘জাবর’ (الجبر) শব্দের অর্থ হলো—বাধ্য করা বা বলপ্রয়োগ করা। কালামশাস্ত্রে জাবারিয়া হলো সেই উগ্রপন্থী ফেরকা, যারা বিশ্বাস করে: মানুষের নিজস্ব কোনো ইচ্ছা, শক্তি বা কর্মক্ষমতা (ইখতিয়ার) নেই; মানুষ সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর ইচ্ছার কাছে বাধ্য ও পুতুল সদৃশ। বাতাসে গাছের পাতা যেভাবে অসহায়ভাবে নড়ে, মানুষও তেমনি তার ভালো-মন্দ সমস্ত কাজে বাধ্য। জাবারিয়া মতবাদের মূল প্রবক্তা ছিল জাহম ইবনে সাফওয়ান এবং জা’দ ইবনে দিরহাম।
২. মুরজিয়া (المرجئة) সম্প্রদায়ের পরিচয়
আরবি ‘ইরজা’ (الإرجاء) শব্দমূল থেকে মুরজিয়া নিষ্পন্ন। এর দুটি অর্থ রয়েছে: বিলম্বিত করা (التأخير) এবং আশা দেওয়া (إعطاء الرجاء)। পরিভাষায় মুরজিয়া হলো সেই সম্প্রদায়, যারা ঈমানের ক্ষেত্রে আমলকে সম্পূর্ণ গৌণ বা অপ্রয়োজনীয় মনে করে আমলকে ঈমান থেকে পিছিয়ে দিয়েছে। তাদের স্লোগান ছিল:
«لاَ يَضُرُّ مَعَ الإِيمَانِ ذَنْبٌ، كَمَا لاَ يَنْفَعُ مَعَ الْكُفْرِ طَاعَةٌ» (ঈমান থাকলে কোনো গুনাহই ক্ষতি করতে পারে না, যেমন কুফরের সাথে কোনো নেক আমল উপকারে আসে না)। এদের প্রতিষ্ঠাতা ছিল ইউনুস আস-সামরি, হাসান ইবনে বিলাল প্রমুখ।
তাকদিরের প্রতি বিশ্বাসের ক্ষেত্রে জাবারিয়া ও মুরজিয়ার মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য
| জাবারিয়া (الجبرية)-এর তাকদির বিশ্বাস | মুরজিয়া (المرجئة)-এর অবস্থান ও পার্থক্য |
|---|---|
| ১. চরমপন্থা তাকদির বিশ্বাস: তারা তাকদিরকে এমন চরম অন্ধ নিয়তিবাদ বানিয়েছে যে মানুষের কোনো স্বাধীন ইচ্ছাই মানে না। তারা বলে মানুষ যা করে—চুরি, যেনা বা নামাজ—সবই আল্লাহ মানুষকে দিয়ে জোর করে করান। | ১. তাকদিরকে আমলমুক্ত করার বাহানা: মুরজিয়ারা মূলত তাকদিরের আলোচনাকে কেন্দ্র না করে বরং আমলের গুরুত্বহীনতাকে প্রাধান্য দেয়। তারা পাপীদের অতিরিক্ত আশা দিয়ে বলে—যেহেতু ঈমান অন্তরে আছে, তাকদিরে যা-ই থাকুক গুনাহের কোনো শাস্তি হবে না। |
| ২. কাযা ও কদরের কাছে আত্মসমর্পণ: জাবারিয়াদের মতে পাপীর কোনো দায় বা দায়িত্ব নেই। চোর চুরি করলে তারা বলে চোর নির্দোষ, কারণ তাকদির তাকে দিয়ে বাধ্য করিয়েছে। | ২. হিসাব-নিকাশ স্থগিতকরণ: মুরজিয়ারা কোনো ব্যক্তির পাপের ফয়সালা আখেরাত পর্যন্ত পিছিয়ে দিয়ে বলে দুনিয়াতে কাউকে ফাসিক্ব বলা যাবে না। তবে তাকদিরের বিষয়ে মুরজিয়াদের একটি বড় দল কাদারিয়্যাদের মতো মানুষের পূর্ণ স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিল। |
| ৩. শরিয়তের আদেশ-নিষেধ অর্থহীন: জাবারিয়াদের দর্শন গ্রহণ করলে জান্নাত-জাহান্নাম, শরিয়তের পুরস্কার ও শাস্তি সম্পূর্ণ অবিচার সাব্যস্ত হয় (নাউযুবিল্লাহ)। | ৩. শরিয়তের আমল শিথিলকরণ: মুরজিয়াদের দর্শন মুসলিম সমাজকে চরম বেপরোয়া ও পাপাচারী হতে উৎসাহ জুগিয়েছিল। |
আহলুস সুন্নাহর ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত
আহলুস সুন্নাহ উভয় চরমপন্থা বর্জন করে বলেন: আল্লাহ তাআলা মানুষের ভালো ও মন্দ কাজের একক স্রষ্টা (খাল্লিক্ব), আর মানুষ তার স্বাধীন ইচ্ছায় সেই কাজ সম্পন্ন করে বা অর্জন করে (কাসিব – كاسب)। অতএব মানুষ তার উপার্জিত কাজের জন্যই পুরস্কৃত বা তিরস্কৃত হবে।
উপসংহার
জাবারিয়া ও মুরজিয়া উভয়ই ইসলামের মূল ভারসাম্যকে নষ্ট করে চরম ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত হয়েছিল।
৬। اكتب الفرق التي خرجت من الأباضية مع ذكر فضائحهم الاعتقادية مفصلا –
[أباضية থেকে যে সকল দল বের হয়েছে, তাদের ভ্রান্ত আকিদাসমূহ বিস্তারিত বর্ণনা কর।]
[মান: ১৬]
ভূমিকা ও ইবাদিয়া সম্প্রদায়ের পরিচয়
ইসলামের ইতিহাসে খারেজী ফেরকার সবচেয়ে পরিমিত ও টিকে থাকা একমাত্র প্রাচীন ধারাটি হলো ‘আল-ইবাদিয়্যাহ’ (الإباضية)। হিজরি প্রথম শতাব্দীর শেষভাগে আব্দুল্লাহ ইবনে ইবাদ আল-মুরী আত-তামীমী (রহ.)-এর অনুসারীদের ইবাদিয়া বলা হয়। তারা আজারিক্বা ও অন্যান্য রক্তপিপাসু খারেজীদের মতো চরমপন্থী ছিল না; তারা সাধারণ মুসলমানদের রক্তপাত ও সম্পদ লুণ্ঠন হারাম মনে করত। বর্তমানে ওমান ও উত্তর আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে এদের উপস্থিতি রয়েছে। তবে মূলধারার আহলুস সুন্নাহর সাথে তাদের বেশ কিছু গুরুতর আক্বিদাগত বিরোধ রয়েছে।
ইবাদিয়া থেকে উদ্ভূত প্রধান প্রধান উপদলসমূহ
ইবাদিয়াদের ভেতর থেকে পরবর্তীকালে বিভিন্ন উগ্রপন্থী ও চরম দল বের হয়ে যায়:
- ১. আল-হাফসিয়্যাহ (الحفصية): হাফস ইবনে আবি মিসদাদ-এর অনুসারী। এরা দাবি করে—শিরক ও ঈমানের মাঝে কেবল একটিমাত্র জ্ঞানই বিদ্যমান, তা হলো আল্লাহকে চেনা। যে আল্লাহকে বিশ্বাস করে সে আর কখনোই মুশরিক হবে না, চাই সে রাসুলকে অস্বীকার করুক কিংবা যাবতীয় হারাম কাজে লিপ্ত হোক।
- ২. আল-হারিছিয়্যাহ (الحارثية): হারেস ইবনে ইয়াযীদ আল-ইবাদীর অনুসারী। এরা মুতাযিলাদের কাদারিয়্যা মতবাদে প্রভাবিত হয়ে মানুষের কাজের পূর্ণ স্বাধীনতায় বিশ্বাস স্থাপন করে এবং আল্লাহর সিফাত অস্বীকার করে।
- ৩. আল-ইয়াযীদিয়্যাহ (اليزيدية): ইয়াযীদ ইবনে উনাইসা-এর অনুসারী। এটি ছিল তাদের সবচেয়ে চরমপন্থী মুরতাদ দল। এরা দাবি করেছিল যে—ভবিষ্যতে পারস্য (আজম) থেকে আল্লাহ একজন নতুন নবী প্রেরণ করবেন, যাঁর ওপর আকাশ থেকে এক কিতাব নাজিল হবে এবং তিনি মুহাম্মদ (সা.)-এর শরিয়ত রহিত করে সাবিয়ীনদের ধর্মে মানবজাতিকে নিয়ে যাবেন। এই কুফরি আকিদার কারণে তারা সর্বসম্মতভাবে কাফের।
- ৪. আশ-শাবীবিয়্যাহ ও আল-ফাদলিয়্যাহ: এরা ইমামত ও বায়আত নিয়ে বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ মতভেদ করে পৃথক দল গঠন করে।
ইবাদিয়াদের মৌলিক আক্বিদাগত ভ্রান্তি ও অপবাদসমূহ (فضائحهم)
- ১. কবিরা গুনাহকারীকে ‘কাফেরে নেয়ামত’ আখ্যা: তারা বলে কবিরা গুনাহকারী মিল্লাতের বাইরে কাফের না হলেও সে ‘কাফেরে নি’আমত’ (কুফরানে নিয়ামতকারী) এবং তওবা ছাড়া মারা গেলে সে চিরকাল জাহান্নামে জ্বলবে।
- ২. আখেরাতে আল্লাহর দিদার (রূ’ইয়াতুল্লাহ) অস্বীকার: তারা মুতাযিলাদের মতো বিশ্বাস করে যে আখেরাতেও মুমিনগণ আল্লাহকে দেখতে পাবে না।
- ৩. কুরআন সৃষ্টি হওয়ার আকিদা (খালক্বুল কুরআন): তারা বিশ্বাস করে কুরআন আল্লাহর কালাম কিন্তু তা সৃষ্ট।
- ৪. শাফাআত অস্বীকার: তাদের দাবি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শাফাআত কেবল জান্নাতীদের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য, কোনো কবিরা গুনাহগারকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করার জন্য কোনো শাফাআত নেই।
- ৫. সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারে অন্যায় মনোভাব: তারা হযরত উসমান (রা.) ও হযরত আলী (রা.)-এর খেলাফতের শেষভাগের কর্মকাণ্ডকে কঠোর সমালোচনা করে এবং তাঁদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে।
উপসংহার
ইবাদিয়ারা অন্যান্য খারেজীদের চেয়ে আচরণে শিথিল হলেও তাদের মৌলিক আকিদা আহলুস সুন্নাহর দ্ব্যর্থহীন দলিলসমূহের সরাসরি পরিপন্থী।
৭। من هم القدرية؟ اكتب نظرياتهم بالتفصيل –
[القدرية কারা? তাদের মতবাদসমূহ বিস্তারিত আলোচনা কর।]
[মান: ১৬]
ভূমিকা ও কাদারিয়্যাদের পরিচয়
ইসলামের শাশ্বত বিশ্বাসের অন্যতম স্তম্ভ হলো ‘তাকদির’ বা আল্লাহর পূর্বনির্ধারিত ভাগ্যলিপির ওপর ঈমান আনা। যে দলটি আল্লাহর তাকদির, পূর্বজ্ঞান এবং মানুষের ভাগ্যের ওপর আল্লাহর সার্বভৌম কর্তৃত্বকে অস্বীকার করে মানুষের নিজস্ব ক্ষমতাকে চরম রূপ দেয়, তাদেরকে কালামশাস্ত্রে ‘আল-ক্বাদারিয়্যাহ’ (القدرية) বলা হয়। হাদিস শরিফে এদের সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করে ইরশাদ করেছেন:
«الْقَدَرِيَّةُ مَجُوسُ هَذِهِ الأُمَّةِ، إِنْ مَرِضُوا فَلاَ تَعُودُوهُمْ، وَإِنْ مَاتُوا فَلاَ تَشْهَدُوهُمْ»
“কাদারিয়্যারা হলো এই উম্মতের মজুসী (অগ্নিপূজক দ্বৈতবাদী); তারা অসুস্থ হলে তাদের দেখতে যেও না, আর তারা মারা গেলে তাদের জানাজায় অংশ নিয়ো না।” (সুনানে আবু দাউদ)। কারণ অগ্নিপূজকরা যেমন আলো ও অন্ধকারের দুই স্রষ্টা মানত, এরাও তেমনি ভালোর স্রষ্টা আল্লাহ আর মন্দের স্রষ্টা মানুষ বানিয়ে বহু স্রষ্টার আকিদা তৈরি করেছিল।
কাদারিয়্যা মতবাদের উৎপত্তি
হিজরি প্রথম শতাব্দীর শেষভাগে বসরার মা’বাদ আল-জুহানী এবং দামেস্কের গায়লান আদ-দিমাশক্বী সর্বপ্রথম এ মতবাদের বিষবাষ্প ছড়ায়। পরবর্তীতে মুতাযিলারা কাদারিয়্যাদের এই চিন্তাধারাকে তাদের ‘আল-আদল’ মূলনীতির ভেতরে গ্রহণ করে নেয়।
কাদারিয়্যাদের প্রধান প্রধান তাত্ত্বিক মতবাদ (نظرياتهم)
- ১. আল্লাহর পূর্বজ্ঞান ও ভাগ্যলিপি অস্বীকার:
চরমপন্থী কাদারিয়্যাদের দাবি ছিল—আল্লাহ তাআলা কোনো বান্দা কোনো কাজ করার আগে তা জানেন না। যখন বান্দা কাজটি সম্পন্ন করে, কেবল তখনই আল্লাহ তা জানতে পারেন («الأَمْرُ أُنُفٌ»)। তারা বলে কোনো কিছু লওহে মাহফুজে আগে থেকে লেখা নেই। এই কুফরি আকিদা আল্লাহর চিরন্তন জ্ঞানকে (ইলমে ইলাহী) সরাসরি অস্বীকার করে।
- ২. মানুষ তার সমস্ত কাজের স্বাধীন ও একমাত্র স্রষ্টা (خلق أفعال العباد):
তাদের মৌলিক তত্ত্ব হলো—মানুষের যাবতীয় ভালো ও মন্দ কাজের একমাত্র সৃষ্টিকর্তা হলো মানুষ নিজেই। মানুষের কাজের সৃষ্টির পেছনে আল্লাহর কোনো কুদরত, ইচ্ছা বা ভূমিকা নেই। এই মতবাদ শিরক ফিত-তাকভীন (সৃষ্টির ক্ষমতায় অংশীদারিত্ব) স্থাপন করে।
- ৩. আল্লাহর ইচ্ছা (মাশিয়্যাত)-কে মানুষের ইচ্ছার অধীনস্থ করা:
তারা দাবি করে, আল্লাহ চান সকল মানুষ ঈমান আনুক কিন্তু কাফের ব্যক্তি আল্লাহর ইচ্ছাকে পরাজিত করে কুফরি করে। এর মাধ্যমে তারা আল্লাহর ইচ্ছাকে দুর্বল ও পরাভূত হিসেবে উপস্থাপন করে।
- ৪. বান্দার কল্যাণ সাধনে আল্লাহ বাধ্য (وجوب الصلاح والأصلح):
তাদের তত্ত্ব অনুযায়ী—আল্লাহ তাআলা ইনসাফের খাতিরে বান্দার যা সর্বাধিক কল্যাণকর তা-ই করতে বাধ্য; এর ব্যত্যয় ঘটানো আল্লাহর পক্ষে অসম্ভব।
আহলুস সুন্নাহর খণ্ডন ও পর্যালোচনা
কুরআনে স্পষ্ট ঘোষিত হয়েছে:
﴿وَاللَّهُ خَلَقَكُمْ وَمَا تَعْمَلُونَ﴾ (অথচ আল্লাহই তোমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং তোমরা যা কর তাও তিনি সৃষ্টি করেছেন—সূরা আস-সাফফাত: ৯৬)। আল্লাহ প্রতিটি অণু-পরমাণুর স্রষ্টা, তবে বান্দাকে তিনি ইচ্ছার স্বাধীনতা দিয়েছেন যার দ্বারা সে কাজটি বেছে নেয়।
উপসংহার
কাদারিয়্যাদের মতবাদ মূলত আল্লাহর অনন্ত সার্বভৌমত্বকে সংকুচিত করে মানুষের অহংকারকে প্রতিষ্ঠিত করার এক চরম বিভ্রান্তিকর দার্শনিক অপপ্রয়াস।
৮। من أهل السنة والجماعة؟ بين عقائدهم وكتبهم المشهورة مع بيان محاسنهم وآثارهم في الدين –
[আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত কারা? দ্বীনের মধ্যে তাদের সৌন্দর্য ও প্রভাব আলোচনপূর্বক তাদের আকিদাহ ও প্রসিদ্ধ গ্রন্থসমূহের বর্ণনা কর।]
[মান: ১৬]
ভূমিকা ও আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের সংজ্ঞা
রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং তাঁর মহান সাহাবায়ে কেরামের বিশুদ্ধ আদর্শ, সুন্নাহ এবং তাঁদের প্রদর্শিত সর্বজনীন বৃহত্তর দলটির ওপর যারা কিয়ামত পর্যন্ত অবিচল রয়েছে, তারাই হলো ‘আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আহ’ (أهل السنة والجماعة)। রাসুলুল্লাহ (সা.) ৭৩ ফেরকার ঐতিহাসিক হাদিসে এদের পরিচয় দিয়ে ইরশাদ করেছেন:
«مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِي»
“যাঁরা সেই পথের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে, যার ওপর আজ আমি এবং আমার সাহাবীগণ রয়েছি।” কালাম ও আকিদার ক্ষেত্রে মূলত ইমাম আবুল হাসান আল-আশআরী ও ইমাম আবু মনসুর আল-মাতুরিদী (রহ.)-এর অনুসারী উম্মতের মূলধারার সংখ্যাগরিষ্ঠ জমহুর মুসলমানই হলেন আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত।
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের মৌলিক আকিদাসমূহ
- ১. তাওহিদ ও সিফাত: আল্লাহর সত্তা ও সিফাত সত্য। তিনি কোনো সৃষ্টির সদৃশ নন, স্থান-কালের ঊর্ধ্বে। কুরআন আল্লাহর কালাম এবং তা অসৃষ্ট (গায়রু মাখলুক্ব)।
- ২. তাকদির: ভালো-মন্দ সমস্ত সৃষ্টির একমাত্র স্রষ্টা আল্লাহ, আর মানুষ তার কাজের স্বাধীন উপার্জনকারী (কাসিব)।
- ৩. সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা: সমস্ত সাহাবীকে ন্যায়পরায়ণ ও শ্রদ্ধাভাজন বিশ্বাস করা, খুলাফায়ে রাশেদীনের মর্যাদা খেলাফতের ক্রম অনুযায়ী মান্য করা এবং তাঁদের পারস্পরিক মতভেদের ব্যাপারে সুধারণা পোষণ করা।
- ৪. আখেরাত ও অদৃশ্যের সত্যতা: কবরের আজাব, মুনকার-নাকিরের সওয়াল-জওয়াব, মিজান, পুলসিরাত, হাউজে কাওসার, রাসুলের শাফাআত এবং জান্নাতে চাক্ষুষ আল্লাহর দর্শন সত্য।
- ৫. ঈমান ও কবিরা গুনাহ: কবিরা গুনাহের কারণে কোনো মুসলিম কাফের হয় না; সে ফাসিক্ব মুমিন। তওবা ছাড়া মারা গেলে আল্লাহর ইচ্ছার অধীনে থাকবে।
আহলুস সুন্নাহর প্রসিদ্ধ আকর গ্রন্থাবলি
- ১. ‘আল-ফিক্বহুল আকবার’: ইমাম আজম আবু হানিফা (রহ.) রচিত ইসলামি আকিদার আদিমতম ও সংক্ষিপ্ত আকর গ্রন্থ।
- ২. ‘আল-আক্বীদাতুত তাহাবিয়্যাহ’: ইমাম আবু জাফর আত-তাহাবী (রহ.) সংকলিত সালাফে সালেহীনের সর্বজনস্বীকৃত মূলনীতি সংবলিত গ্রন্থ।
- ৩. ‘আল-ইবানা আন উসূলিদ দিয়ানাহ’: ইমাম আবুল হাসান আল-আশআরী (রহ.) রচিত মুতাযিলা মতবাদ খণ্ডনকারী যুগান্তকারী কিতাব।
- ৪. ‘কিতাবুত তাওহিদ’: ইমাম আবু মনসুর আল-মাতুরিদী (রহ.) রচিত যুক্তিনির্ভর সুন্নি কালামের অনন্য স্তম্ভ।
- ৫. ‘শারহু আক্বাঈদিন নাসাফিয়্যাহ’: ইমাম নাজম উদ্দীন নাসাফীর মূল মতনে আল্লামা সা’দউদ্দীন তাফতাযানী (রহ.)-এর জগদ্বিখ্যাত ব্যাখ্যাগ্রন্থ।
- ৬. ‘লুমআতুল ইতিসাদ’: ইমাম মুওয়াফফাকুদ্দীন ইবনে কুদামা আল-মাকদিসী (রহ.) রচিত হানবালী ধারার প্রামাণ্য কিতাব।
দ্বীনের মধ্যে আহলুস সুন্নাহর সৌন্দর্য ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব
- ১. সর্বজনীন ভারসাম্য ও মধ্যপন্থা (ওয়াসাত্বিয়্যাত): আহলুস সুন্নাহ খারেজীদের মতো চরম তাকফিরি নয়, আবার মুরজিয়াদের মতো আমলহীন নয়; মুতাযিলাদের মতো সিফাত অস্বীকারকারী নয়, আবার মুজাসসিমাদের মতো আল্লাহর আকার কল্পনা করে না।
- ২. উম্মাহর রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক ঐক্য রক্ষা: শতাব্দী ধরে উম্মাহর বৃহত্তর জামাতকে ধরে রেখে তাঁরা ইসলামের নিরবচ্ছিন্ন সংরক্ষণ নিশ্চিত করেছেন।
উপসংহার
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতই হলো হাশরের ময়দানে মুক্তিপ্রাপ্ত একমাত্র নাজাতপ্রাপ্ত কাফেলা (আল-ফিরক্বাতুন নাজিয়াহ)।
খ-বিভাগ (মান: ৫ × ৪ = ২০)
৯। اكتب ثلاثا من الأيات القرآنية في ذم الافتراق والاختلاف مع ترجمتها باللغة البنغالية –
[বাংলা অনুবাদসহ অনৈক্য ও বিভেদের প্রতি নিন্দাসূচক কুরআনের তিনটি আয়াত লেখ।]
[মান: ৫]
ভূমিকা ও অনৈক্যের শারঈ ক্ষতি
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে ঐক্য ও সংহতির সুদৃঢ় রজ্জু আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দিয়েছেন এবং দলে দলে বিভক্ত হয়ে পরস্পরে মতবিরোধ ও বিদ্বেষ ছড়ানোকে কঠোর ভাষায় নিন্দা ও হারাম ঘোষণা করেছেন। নিম্নে এ সংক্রান্ত তিনটি প্রসিদ্ধ আয়াত উপস্থাপন করা হলো:
অনৈক্য ও বিভেদের নিন্দায় তিনটি যুগান্তকারী কুরআনীয় আয়াত
- ১. সূরা আলে ইমরান: ১০৩:
﴿وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلاَ تَفَرَّقُوا وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنْتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُمْ بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا﴾
অর্থ: “আর তোমরা সকলে মিলে আল্লাহর রজ্জুকে (কুরআন ও দ্বীনকে) শক্তভাবে আঁকড়ে ধর এবং পরস্পরে বিচ্ছিন্ন ও বিভক্ত হয়ো না। আর তোমাদের ওপর আল্লাহর সেই নিয়ামতের কথা স্মরণ কর, যখন তোমরা পরস্পরে শত্রু ছিলে, অতঃপর তিনি তোমাদের অন্তরে প্রীতি সঞ্চার করলেন, ফলে তাঁর অনুগ্রহে তোমরা পরস্পরে ভাই ভাই হয়ে গেলে।”
- ২. সূরা আল-আনআম: ১৫৯:
﴿إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا لَسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ إِنَّمَا أَمْرُهُمْ إِلَى اللَّهِ ثُمَّ يُنَبِّئُهُمْ بِمَا كَانُوا يَفْعَلُونَ﴾
অর্থ: “নিশ্চয় যারা তাদের দ্বীনকে খণ্ড-বিখণ্ড করেছে এবং বিভিন্ন দলে-উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে, তাদের কোনো কাজের সাথেই আপনার (হে নবী) কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের বিষয়টি তো কেবল আল্লাহর ওপর ন্যস্ত; অতঃপর তিনি তাদের জানিয়ে দেবেন যা তারা করত।”
- ৩. সূরা আল-আনফাল: ৪৬:
﴿وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلاَ تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ﴾
অর্থ: “আর তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য কর এবং নিজেদের মধ্যে বিবাদে লিপ্ত হয়ো না; অন্যথায় তোমরা সাহস হারিয়ে ফেলবে এবং তোমাদের শক্তি ও প্রভাব বিলুপ্ত হবে। আর ধৈর্য ধারণ কর, নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন।”
উপসংহার
এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় বিভেদ ও দলাদলি মুসলিম জাতির পতন ডেকে আনে এবং ঐক্যই বিজয়ের একমাত্র সোপান।
১০। بين أهمية العقيدة في حياة المسلم في ضوء القرآن والسنة –
[কুরআন ও হাদিসের আলোকে মুসলমানের জীবনে আকিদার গুরুত্ব বর্ণনা কর।]
[মান: ৫]
ভূমিকা ও আকিদার স্বরূপ
ইসলামি পরিভাষায় ‘আকিদা’ (العقيدة) হলো এমন এক দৃঢ় ও সন্দেহাতীত বিশ্বাস, যা মানুষের অন্তরের গভীরে অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে বাঁধা থাকে। একটি সুবিশাল অট্টালিকার স্থায়িত্ব যেমন নির্ভর করে তার গভীর ও মজবুত ভিত্তির ওপর, তদ্রূপ একজন মুসলমানের সামগ্রিক জীবনের সমস্ত নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত ও নৈতিক চরিত্রের ভিত্তি হলো তার বিশুদ্ধ আকিদা। আকিদায় সামান্যতম ত্রুটি বা শিরক থাকলে সমগ্র আমল বালির বাঁধের মতো ধসে পড়ে।
কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে আকিদার অপরিহার্য গুরুত্বসমূহ
- ১. নেক আমল কবুল হওয়ার একমাত্র মৌলিক পূর্বশর্ত: আকিদা বিশুদ্ধ না হলে কোনো আমলই আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য হয় না। পবিত্র কুরআনে স্বয়ং নবীজীকে সম্বোধন করে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন:
﴿وَلَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ﴾
“আর নিশ্চয় আপনার প্রতি ও আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি এই ওহি পাঠানো হয়েছিল যে, যদি আপনি শিরক করেন তবে আপনার আমল নিশ্চিতরূপে বরবাদ হয়ে যাবে এবং আপনি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।” (সূরা আয-যুমার: ৬৫)।
- ২. জীবনের পরম লক্ষ্য ও সৃষ্টির উদ্দেশ্য নিরূপণ: বিশুদ্ধ আকিদা মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে সে কোনো উদ্দেশ্যহীন প্রাণী নয়; বরং মহান আল্লাহর দাসত্বই তার সৃষ্টির একমাত্র উদ্দেশ্য (﴿وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالإِنْسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ﴾)।
- ৩. দুনিয়াবী ভয়ভীতি ও কুসংস্কার থেকে সার্বিক মুক্তি: তাওহিদের খাঁটি বিশ্বাস মানুষকে জ্যোতিষী, ভাগ্যগণনা, মাজারপূজা ও কুসংস্কারের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে এক অপরাজেয় মানসিক শক্তি দান করে। মুমিন জানে সমস্ত লাভ-ক্ষতির একমাত্র মালিক কেবল আল্লাহ তাআলা।
- ৪. আখেরাতে চিরস্থায়ী জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও শাশ্বত জান্নাত লাভ: রাসুলুল্লাহ (সা.) দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ইরশাদ করেন:
«مَنْ مَاتَ وَهُوَ يَعْلَمُ أَنَّهُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ دَخَلَ الْجَنَّةَ»
“যে ব্যক্তি এই দৃঢ় জ্ঞান ও বিশ্বাস নিয়ে মৃত্যুবরণ করবে যে আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই, সে নিশ্চিত জান্নাতে প্রবেশ করবে।” (সহিহ মুসলিম)।
উপসংহার
সুতরাং আকিদা হলো ঈমানের প্রাণশক্তি। বিশুদ্ধ আকিদাবিহীন আমল আত্মাহীন লাশের মতো নির্জীব। প্রতিটি মুসলমানের কর্তব্য হলো জীবনের প্রথম পাঠ হিসেবে সহিহ আকিদা শিক্ষা করা ও ধারণ করা।
১১। عرف فرقة المشبهة والمجسمة –
[মুশাব্বিহা ও মুজাসসিমা সম্প্রদায়ের পরিচয় দাও।]
[মান: ৫]
ভূমিকা ও উভয় ফেরকার পরিচয়
ইসলামি আকিদার ইতিহাসে আল্লাহর সিফাত বা গুণাবলি প্রমাণের ক্ষেত্রে মুতাযিলারা যেমন তা’তীল বা অস্বীকারের চরমপন্থায় লিপ্ত হয়েছিল, তেমনি বিপরীত মেরুতে অপর এক দল চরম বিভ্রান্তিতে পতিত হয়ে আল্লাহর সাথে সৃষ্টির হুবহু তুলনা করেছিল। এদেরকে ‘মুশাব্বিহা’ ও ‘মুজাসসিমা’ বলা হয়।
১. মুশাব্বিহা সম্প্রদায় (المشبهة)
আরবি ‘তাশবীহ’ (التشبيه) অর্থ সাদৃশ্য স্থাপন করা। যে সকল বিভ্রান্ত ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সত্তা ও পবিত্র গুণাবলিকে সৃষ্টির রূপ, বৈশিষ্ট্য বা অবস্থার সাথে হুবহু সাদৃশ্যযুক্ত মনে করে, তাদেরকে ‘মুশাব্বিহা’ বলা হয়। যেমন এরা দাবি করত—আল্লাহর মুখ মানুষের মুখের মতো, তাঁর হাত মানুষের হাতের মতো, ইত্যাদি (নাউযুবিল্লাহ)। হিশাম ইবনুল হাকাম ও মুকাতিল ইবনে সুলাইমান এদের অগ্রদূত ছিল।
২. মুজাসসিমা সম্প্রদায় (المجسمة)
আরবি ‘তাজসীম’ (التجسيم) অর্থ দেহধারী মনে করা। যারা বিশ্বাস করে আল্লাহ তাআলা একটি নির্দিষ্ট রক্ত-মাংস বা আলোর দেহ (জিসম), যার নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, গভীরতা ও ওজন রয়েছে এবং তিনি একটি নির্দিষ্ট সিংহাসনে বা স্থানে শারীরিক আকারে বসে আছেন—তাদেরকে ‘মুজাসসিমা’ বলা হয়। যেমন দাউদ আল-জাওয়ারিবী দাবি করেছিল: “তোমরা আমাকে আল্লাহর দাঁড়ি ও গুপ্তাঙ্গ ছাড়া যা ইচ্ছা জিজ্ঞেস কর, বাকি সবকিছু মানুষের দেহের মতো।”
আহলুস সুন্নাহর দ্ব্যর্থহীন সিদ্ধান্ত
পবিত্র কুরআনের শাশ্বত মূলনীতি হলো:
﴿لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ﴾
“কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়; আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” (সূরা আশ-শূরা: ১১)। কালামবিদদের সর্বসম্মত ফতোয়া অনুযায়ী—যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য শারীরিক দেহ, স্থান বা মানুষের সদৃশ অঙ্গ কল্পনা করে, সে দ্ব্যর্থহীনভাবে কাফের বা চরম পথভ্রষ্ট বিদআতি।
উপসংহার
মুশাব্বিহা ও মুজাসসিমা পৌত্তলিকতা ও শিরকের এক বিপজ্জনক রূপ, যা থেকে ইসলাম সম্পূর্ণ পবিত্র।
১২। عرف فرقة الجهمية ثم بين فضائحهم –
[জাহমিয়্যা সম্প্রদায়ের পরিচয় দাও। অতঃপর তাদের ত্রুটিসমূহ বর্ণনা কর।]
[মান: ৩]
ভূমিকা ও জাহমিয়্যার পরিচয়
উমাইয়া খেলাফতের শেষভাগে বসরার জাহম ইবনে সাফওয়ান আস-সামারক্বান্দী (রহমতের অযোগ্য, নিহত ১২৮ হি.)-এর নেতৃত্বে যে চরম সর্বনাশা বাতিল ফেরকার উদ্ভব ঘটেছিল, তাকে ‘আল-জাহমিয়্যা’ (الجهمية) বলা হয়। জাহম মূলত জা’দ ইবনে দিরহামের ছাত্র ছিল। ইসলামি আকিদার ইতিহাসে জাহমিয়্যা হলো সর্বকালের অন্যতম সর্বনাশা বিভ্রান্ত দল, যাদের বিরুদ্ধে সালাফে সালেহীনের শত শত ইমাম কুফরির ফতোয়া দিয়েছেন।
জাহমিয়্যাদের প্রধান প্রধান কুফরি ত্রুটি ও বিভ্রান্তি (فضائحهم)
- ১. আল্লাহর সমস্ত সিফাত সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার (تعطيل الصفات):
তারা দাবি করত আল্লাহর কোনো গুণবাচক নাম বা সিফাত থাকতে পারে না। তিনি শোনেন না, দেখেন না, কথা বলেন না। এই চরম انکار-এর কারণে তাদের ‘মুয়াত্তিলা’ বলা হয়।
- ২. কুরআনকে সৃষ্ট বস্তু দাবি করা (القول بخلق القرآن):
জাহমই প্রথম মুসলিম বিশ্বে বিষবাষ্প ছড়ায় যে কুরআন আল্লাহর কালাম নয়, বরং তা আল্লাহর সৃষ্ট এক নশ্বর বস্তু।
- ৩. জান্নাত ও জাহান্নামের বিনাশের কুফরি আকিদা (فناء الجنة والنار):
তারা দাবি করে জান্নাত ও জাহান্নাম চিরস্থায়ী নয়; একসময় সমস্ত জান্নাতী ও জাহান্নামীরা ধ্বংস হয়ে যাবে এবং সেখানে কেউ থাকবে না। এটি কুরআনের ‘খালিদীনা ফীহা আবাদা’ আয়াতের সরাসরি অস্বীকার।
- ৪. চরম জাবরিয়্যা দর্শন (الجبر الخالص):
তারা বিশ্বাস করত মানুষের কোনো শক্তি বা ইচ্ছা নেই, মানুষ জড়বস্তুর মতো বাধ্য।
- ৫. চরম মুরজিয়া বিশ্বাস (الإرجاء الغالي):
তাদের মতে অন্তরে কেবল আল্লাহকে চেনার নামই ঈমান; মুখে স্বীকার বা নেক আমলের কোনো প্রয়োজন নেই। ইবলিসও যেহেতু আল্লাহকে চিনত, তাই এই সংজ্ঞায় ইবলিসও মুমিন সাব্যস্ত হয় (নাউযুবিল্লাহ)।
উপসংহার
জাহমিয়্যাদের এই জঘন্য ভ্রান্তির বিরুদ্ধেই ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল ও ইমাম বুখারি ‘খালকু আফআলিল ইবাদ’ এবং ‘আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ’ রচনা করে সহিহ সুন্নাহকে রক্ষা করেছিলেন।
১৩। علق على الكيسانية –
[الكيسانية-এর উপর টীকা লেখ।]
[মান: ৫]
ভূমিকা ও কায়সানিয়ার পরিচয়
হযরত আলী (রা.)-এর ওফাতের পর কারবালার মর্মান্তিক বিয়োগান্তক ঘটনার প্রেক্ষাপটে শিয়াদের মধ্যে যে প্রথম অতি-চরমপন্থী (আল-গুলাত) দলটির আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল, তাকে ‘আল-কায়সানিয়্যাহ’ (الكيسانية) বলা হয়। এ দলের অনুসারীরা হযরত আলী (রা.)-এর অন্য এক স্ত্রী খাওলা বিনতে জাফরের গর্ভজাত সন্তান মুহাম্মদ ইবনুল হানাফিয়্যাহ (রহ.)-এর ইমামতের দাবিদার ছিল।
নামকরণের রহস্য ও নেতা
এ দলের নামকরণের পেছনে দুটি মত রয়েছে: প্রথমত—হযরত আলী (রা.)-এর মুক্তদাস ‘কায়সান’ (যাঁর উপাধি ছিল কায়সান আবু আমরাহ); অথবা দ্বিতীয়ত—কারবালার প্রতিশোধ গ্রহণকারী কুখ্যাত কুফাবাসী মুখতার ইবনে আবি উবাইদ আস-সাক্বাফী, যার গোপন উপাধি ছিল ‘কায়সান’ (চতুর বা কূটকৌশলী)। মুখতারই মূলত সরলমনা মানুষকে আকৃষ্ট করতে মুহাম্মদ ইবনুল হানাফিয়্যাহর নামে মিথ্যা আন্দোলন শুরু করে।
কায়সানিয়াদের মৌলিক ভ্রান্ত বিশ্বাসসমূহ
- ১. মুহাম্মদ ইবনুল হানাফিয়্যাহর ইমামত ও মাহদী দাবি: তারা ইমাম হাসান ও হুসাইন (রা.)-এর পর মুহাম্মদ ইবনুল হানাফিয়্যাহকে একমাত্র বৈধ ইমাম ও প্রতিশ্রুত ‘আল-মাহদী’ বলে ঘোষণা করে। অথচ তিনি স্বয়ং এই উগ্রবাদ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র ছিলেন।
- ২. গায়বত ও অমরত্ব (الغيبة والخلود): ৮১ হিজরিতে মুহাম্মদ ইবনুল হানাফিয়্যার স্বাভাবিক মৃত্যুর পর তারা দাবি করে যে তিনি মারা যাননি; বরং তিনি মক্কার নিকটবর্তী ‘রিদওয়া’ (رضوى) পাহাড়ে অদৃশ্য অবস্থায় জীবিত আছেন। সেখানে তাঁর ডান পাশে মধুর নহর ও বাম পাশে দুধের নহর প্রবাহিত রয়েছে এবং দুটি সিংহ তাঁকে পাহারা দিচ্ছে; শেষ জামানায় তিনি ফিরে আসবেন।
- ৩. তানাসুখ ও আল-বাদা: তারা এক দেহ থেকে অন্য দেহে আত্মা স্থানান্তরিত হওয়া (পুনর্জন্ম বা তানাসুখ) এবং আল্লাহর কোনো বিষয়ে মত পরিবর্তন হওয়া (আল-বাদা)-তে বিশ্বাস করত।
উপসংহার
কায়সানিয়্যা দলটি কালক্রমে বিলুপ্ত হয়ে গেলেও শিয়াদের পরবর্তী উপদলগুলোর মাঝে ‘গায়বত’ ও ‘ইমাম মাহদী গোপন থাকা’র ভিত্তিহীন ধারণার বীজ এই কায়সানিয়াদের মাধ্যমেই রোপিত হয়েছিল।
১৪। من المختارية –
[المختارية কারা?]
[মান: ৫]
ভূমিকা ও মুখতারিয়্যার পরিচিতি
ইসলামের ইতিহাসে কায়সানিয়া শিয়াদের সবচেয়ে উগ্র ও রাজনৈতিকভাবে সহিংস উপদলটিকে ‘আল-মুখতারিয়্যাহ’ (المختارية) বা ‘আস-সাবাঈয়্যাহ আল-মুখতারিয়্যাহ’ বলা হয়। হিজরি ৬৬ সনে কুফায় কারবালার শহীদানদের প্রতিশোধ গ্রহণের মিথ্যা নাটক সাজিয়ে যে ধূর্ত চক্রান্তকারী ক্ষমতার মসনদ দখল করেছিল, সেই মুখতার ইবনে আবি উবাইদ আস-সাক্বাফী-এর অন্ধ অনুসারীদের মুখতারিয়া বলা হয়।
মুখতারের উত্থান ও রাজনৈতিক ভণ্ডামি
মুখতার প্রথমে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনুল জুবায়ের (রা.)-এর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করলেও পরে কুফায় গিয়ে শিয়াদের আবেগকে পুঁজি করে। সে নিজেকে আহলে বাইতের পক্ষের সেনাপতি ও মুহাম্মদ ইবনুল হানাফিয়্যার প্রধান প্রতিনিধি হিসেবে ঘোষণা করে। কারবালার নির্মম হত্যাকারী উবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদ, শিমার ও উমর ইবনে সা’দকে হত্যা করে সে সাধারণ মানুষের অন্ধ সমর্থন লাভ করে।
মুখতারিয়াদের জঘন্যতম আকিদাগত বিভ্রান্তিসমূহ
- ১. মুখতারের নবুওয়তের ভণ্ড দাবি: ক্ষমতার চূড়ায় পৌঁছে মুখতার দাবি করতে শুরু করে যে তার কাছে জিব্রাইল (আ.) অহি নিয়ে আসেন। সে বলত: «يُنَزَّلُ عَلَيَّ الْوَحْيُ»। রাসুলুল্লাহ (সা.) ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন:
«إِنَّ فِي ثَقِيفٍ كَذَّابًا وَمُبِيرًا»
“নিশ্চয় সাক্বীফ গোত্রে একজন চরম মিথ্যাবাদী (নবুওয়তের দাবিদার) এবং একজন রক্তপিপাসু জালিমের জন্ম হবে।” (সহিহ মুসলিম)। আলিমদের সর্বসম্মত ঐকমত্যে সেই মিথ্যাবাদী হলো এই মুখতার সাক্বাফী এবং রক্তপিপাসু হলো হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ।
- ২. ‘তালূতের সিন্দুক’ সদৃশ চেয়ার পূজা: মুখতার একটি পুরনো ভাঙা কাঠের চেয়ারকে রেশমি কাপড়ে মুড়িয়ে প্রচার করত যে—এটি বনি ইসরাইলের ‘তাবুতুস সাকীনা’র মতো বরকতময়। যুদ্ধে যাওয়ার আগে তারা সেই চেয়ারের চারপাশে তাওয়াফ করত এবং এর উসিলায় বিজয় কামনা করত।
- ৩. আল্লাহর ওপর ‘আল-বাদা’ আরোপ: যুদ্ধে জয়লাভের মিথ্যা ভবিষ্যদ্বাণী করে পরাজিত হলে সে বলত: ‘আল্লাহ প্রথমে বিজয়ের ওয়াদা করেছিলেন, পরে আল্লাহর মত পরিবর্তন হয়েছে (বাদা লিল্লাহ)।’
পতন ও পরিসমাপ্তি
হিজরি ৬৭ সনে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনুল জুবায়ের (রা.)-এর ভাই বীর মুসআব ইবনুল জুবায়ের কুফা আক্রমণ করে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ভণ্ড মুখতারকে হত্যা করেন এবং কুফাকে এই কুফরি ফেতনা থেকে মুক্ত করেন।
উপসংহার
মুখতারিয়া হলো ধর্মীয় আবেগকে রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ ও ভণ্ড নবুওয়তে রূপান্তরের ইতিহাসের এক কলঙ্কিত চরমপন্থী দল।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
ফাযিল ১ম বর্ষ আল-আক্বীদাতুল ইসলামিয়্যাহ ২য় পত্রের বিষয় কোড কত ছিল?
বিষয় কোড ছিল ১১১০১৮ এবং পরীক্ষার পূর্ণমান ছিল ১০০ নম্বর। পরীক্ষার সময় ৩ ঘণ্টা।
সাহাবায়ে কেরামের যুগে আত্মপ্রকাশকারী প্রথম উগ্রপন্থী দলের নাম কী?
৩৭ হিজরিতে সিফফিনের যুদ্ধের তাহকীমকে কেন্দ্র করে আত্মপ্রকাশকারী ‘আল-খাওয়ারিজ’ বা খারেজী সম্প্রদায়।
শিয়াদের ‘রাফেজী’ নামকরণের ঐতিহাসিক কারণ কী ছিল?
ইমাম যায়েদ ইবনে আলী আবু বকর ও উমর (রা.)-কে গালি দিতে অস্বীকৃতি জানালে কুফার শিয়ারা তাঁকে দলত্যাগ (রাফদ) করে।
মুতাযিলা সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?
হাসান বসরির দরস ত্যাগকারী ওয়াসিল ইবনে আতা এবং তার সহযোগী আমর ইবনে উবাইদ।
হাদিসে কোন বাতিল ফেরকাকে ‘এই উম্মতের মজুসী’ (অগ্নিপূজক) বলা হয়েছে?
তাকদির ও আল্লাহর পূর্বজ্ঞান অস্বীকারকারী ‘আল-ক্বাদারিয়্যাহ’ সম্প্রদায়কে।
ভণ্ড নবুওয়তের দাবিদার মুখতার সাক্বাফীর আন্দোলন কী নামে পরিচিত?
কায়সানিয়া শিয়াদের চরমপন্থী শাখা ‘আল-মুখতারিয়্যাহ’ নামে পরিচিত।

