বাংলা (Bangla) – 204102, আরবি ভাষা ও সাহিত্য – ফাজিল অনার্স ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৩

StudyBoi StudyBoi
September 26, 2026
৬৩ মিনিট পড়ার সময়
৩ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন

পরীক্ষা কোড: ২০১ | প্রশ্নপত্র কোড: ০২৩
ফাজিল স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষ পরীক্ষা, ২০২৩
আরবি ভাষা ও সাহিত্য
বাংলা
বিষয় কোড: ২০৪১০২
সময়—৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান—৮০
ক বিভাগ—ব্যাকরণ (যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও) মান—৫ × ৪ = ২০
খ বিভাগ—সাহিত্য (গদ্য) মান—১০ × ২ = ২০
গ বিভাগ—সাহিত্য (পদ্য) মান—১০ × ২ = ২০
ঘ বিভাগ—বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস মান—১০ × ২ = ২০


ক বিভাগ—ব্যাকরণ (মান—৫ × ৪ = ২০)

১। (ক) ভাষা কাকে বলে? সাধু ও চলিত ভাষারীতির পার্থক্যগুলো লেখ।

১. ভাষার সংজ্ঞা: মানুষের কণ্ঠনিঃসৃত অর্থপূর্ণ ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টির সাহায্যে মনের ভাব বা অনুভূতি অন্যের কাছে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করার মাধ্যমকে ভাষা বলে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, “মনুষ্য জাতি যে সকল অর্থপূর্ণ ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টি দ্বারা মনের ভাব প্রকাশ করে, তাহার নাম ভাষা।” ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের ভাষায়, “মনের ভাব প্রকাশের জন্য বাগ্যন্ত্রের সাহায্যে উচ্চারিত ধ্বনির দ্বারা নিষ্পন্ন, কোনো বিশেষ জনসমাজে ব্যবহৃত, স্বতন্ত্রভাবে অবস্থিত তথা বাক্যে প্রযুক্ত শব্দসমষ্টিকে ভাষা বলে।”

২. সাধু ও চলিত ভাষারীতির পার্থক্য: বাংলা ভাষার লেখ্য রূপের প্রধান দুটি রীতি হলো সাধু ও চলিত রীতি। এদের মধ্যকার প্রধান পার্থক্যসমূহ নিম্নে ছক আকারে উপস্থাপন করা হলো:

তুলনার বিষয় সাধু ভাষারীতি চলিত ভাষারীতি
১. প্রকৃতি ও রূপ সাধু ভাষা মার্জিত, সুনির্দিষ্ট ব্যাকরণের কঠোর নিয়মানুবর্তী ও অপরিবর্তনশীল। চলিত ভাষা জীবন্ত, চটুল, পরিবর্তনশীল ও মানুষের প্রাত্যহিক মুখের কথ্য রূপের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
২. শব্দভাণ্ডার তৎসম বা সংস্কৃত শব্দের প্রাধান্য অত্যন্ত বেশি। তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি শব্দের ব্যবহার প্রচুর এবং সাধারণের বোধগম্য।
৩. সর্বনাম ও ক্রিয়াপদ সর্বনাম ও ক্রিয়াপদের রূপ পূর্ণাঙ্গ ও দীর্ঘ (যেমন: তাহার, তাহারা, করিতেছে, খাইল)। সর্বনাম ও ক্রিয়াপদের রূপ সংক্ষিপ্ত ও সংকুচিত (যেমন: তার, তারা, করছে, খেল)।
৪. অব্যয় ও অনুসর্গ অব্যয় ও অনুসর্গের রূপ দীর্ঘ ও গুরুগম্ভীর (যেমন: দ্বারা, সহিত, হইতে)। অব্যয় ও অনুসর্গের রূপ সংক্ষিপ্ত ও সহজ (যেমন: দিয়ে, সাথে, থেকে/হতে)।
৫. নাট্যসংলাপ ও বক্তৃতা নাটকের সংলাপ ও তেজস্বী বক্তৃতার জন্য একেবারেই অনুপযোগী ও কৃত্রিম। নাট্যসংলাপ, আলাপ-আলোচনা ও সাধারণ বক্তৃতায় অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও উপযোগী।

১। (খ) ব্যাসবাক্যসহ সমাস নির্ণয় কর (যে কোনো পাঁচটি) :

দম্পতি, চৌরাস্তা, রাজপুত্র, যুগান্তর, বিষাদসিন্ধু, কানাকানি, বেহায়া, উপজেলা, আনরা, ত্রিফলা।

প্রদত্ত শব্দ ব্যাসবাক্য সমাসের নাম
দম্পতি জায়া ও পতি দ্বন্দ্ব সমাস
চৌরাস্তা চৌ (চার) রাস্তার সমাহার দ্বিগু সমাস
রাজপুত্র রাজার পুত্র ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস
যুগান্তর অন্য যুগ নিত্য সমাস
বিষাদসিন্ধু বিষাদ রূপ সিন্ধু রূপক কর্মধারয় সমাস
কানাকানি কানে কানে যে কথা ব্যতিহার বহুব্রীহি সমাস
বেহায়া নাই হায়া (লজ্জা) যার নঞর্থক বহুব্রীহি সমাস
উপজেলা জেলার সদৃশ / ক্ষুদ্র জেলা অব্যয়ীভাব সমাস
আনরা নয় রা (নয় রান্না করা / কাঁচা) নঞর্থক তৎপুরুষ সমাস
ত্রিফলা ত্রি (তিন) ফলের সমাহার দ্বিগু সমাস

১। (গ) প্রমিত বাংলা বানানের পাঁচটি নিয়ম উদাহরণসহ লেখ।

ভূমিকা: বাংলা একাডেমি প্রণীত প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম অনুযায়ী বর্তমানে বানানের সমতা ও শৃঙ্খলা রক্ষা করা হয়। নিম্নে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম উদাহরণসহ তুলে ধরা হলো:

  1. অ-তৎসম শব্দে ‘ই’ কারের ব্যবহার: সকল প্রকার অতৎসম শব্দে (তদ্ভব, দেশি, বিদেশি ও মিশ্র শব্দে) কেবল ‘ই’ (ি) এবং এর কারচিহ্ন ব্যবহৃত হবে; কোনোভাবেই দীর্ঘ ‘ঈ’ (ী) হবে না। যেমন: পাখি, শাড়ি, বাড়ি, হাতি, চুনারি, সরকারি, ইংরেজি, ফারসি, চাকরি ইত্যাদি।
  2. রেফের পর ব্যঞ্জনবর্ণের দ্বিত্ব বর্জন: শব্দের মধ্যে রেফ (র্)-এর পরে কোনো ব্যঞ্জনবর্ণের দ্বিত্ব হবে না। যেমন: কর্ম (কর্ম্ম নয়), ধর্ম (ধর্ম্ম নয়), সূর্য (সূর্য্য নয়), কার্যালয় (কার্য্যালয় নয়), অর্জন (অর্জ্জন নয়)।
  3. স্ত্রীবাচক শব্দের বানান: অতৎসম স্ত্রীবাচক শব্দের শেষে সর্বদাই হ্রস্ব ‘ই’ (ি) কার হবে। যেমন: মাসি, পিসি, নানি, দাদি, চাচি, মামি, সুন্দরি, মেথরানি, বাঘিনি।
  4. ‘ক্ষ’ ও ‘খ’-এর প্রয়োগ: অতৎসম ও বিদেশি শব্দের বানানে কখনোই যুক্তব্যঞ্জন ‘ক্ষ’ হবে না, সেখানে ‘খ’ ব্যবহৃত হবে। যেমন: খিদে (ক্ষুধা থেকে), খুর (ক্ষুর নয়), খেত (ক্ষেত্র থেকে)।
  5. আলি প্রত্যয়যুক্ত শব্দ: শব্দের শেষে ‘আলি’ প্রত্যয় যুক্ত হলে সর্বদাই হ্রস্ব ‘ই’ (ি) কার হবে। যেমন: সোনালি, রুপালি, বর্ণালি, মিতালি, গীতালি, খেয়ালি।

১। (ঘ) প্রত্যয়ের নামসহ প্রকৃতি ও প্রত্যয় নির্ণয় কর (যে কোনো পাঁচটি) :

সংবাদ, গায়ক, কান্না, ডাকাত, জেলে, ধার্মিক, লড়াই, কর্তব্য, গন্তব্য, হাসি।

প্রদত্ত শব্দ প্রকৃতি ও প্রত্যয় প্রত্যয়ের নাম
সংবাদ সং – √বদ্ + ঘঞ্ (অ) সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়
গায়ক √গৈ + অক (ণ্বুল্) সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়
কান্না √কাঁদ্ + না বাংলা কৃৎপ্রত্যয়
ডাকাত ডাক + আইত/আত বাংলা তদ্ধিত প্রত্যয়
জেলে জাল + ইয়া > এ বাংলা তদ্ধিত প্রত্যয়
ধার্মিক ধর্ম + ষ্ণিক (ইক) সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয়
লড়াই √লড়্ + আই বাংলা কৃৎপ্রত্যয়
কর্তব্য √কৃ + তব্য সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়
গন্তব্য √গম্ + তব্য সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয়
হাসি √হাস্ + ই বাংলা কৃৎপ্রত্যয়

১। (ঙ) সন্ধি কাকে বলে? সন্ধি ও সমাসের মধ্যে পার্থক্য কী? আলোচনা কর।

১. সন্ধির সংজ্ঞা: পাশাপাশি অবস্থিত দুটি ধ্বনির মিলনকে সন্ধি বলে। ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, “সন্নিহিত দুই ধ্বনির পরস্পর মিলনকে কিংবা এক ধ্বনির প্রভাবে অন্য ধ্বনির পরিবর্তনকে সন্ধি বলে।” যেমন: বিদ্যা + আলয় = বিদ্যালয়, দিক্ + অন্ত = দিগন্ত।

২. সন্ধি ও সমাসের মধ্যে পার্থক্য: সন্ধি ও সমাস উভয়ই শব্দ গঠনের ব্যাকরণিক প্রক্রিয়া হলেও উভয়ের মধ্যে মৌলিক কাঠামোগত পার্থক্য বিদ্যমান:

তুলনার বিষয় সন্ধি সমাস
১. মূল মিলন সন্ধি মূলত পাশাপাশি দুটি ধ্বনি বা বর্ণের মিলন। সমাস মূলত অর্থসম্বন্ধযুক্ত একাধিক পদের একপদীকরণ।
২. প্রক্রিয়া ধ্বনিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন উচ্চারণ সহজ হয়। বাক্যকে সংক্ষেপ করে নতুন অর্থবহ শব্দ গঠিত হয়।
৩. বিভক্তি লোপ সন্ধিতে বিভক্তি লোপের কোনো প্রশ্ন থাকে না। অলোক সমাস ব্যতীত অধিকাংশ সমাসে পূর্বপদের বিভক্তি লোপ পায়।
৪. অবয়ব বিশ্লেষণ সন্ধি ভেঙে আলাদা করাকে ‘সন্ধি বিচ্ছেদ’ বলে। সমাসযুক্ত পদকে ব্যাখ্যা করার বাক্যকে ‘ব্যাসবাক্য’ বা ‘বিগ্রহবাক্য’ বলে।
৫. প্রকারভেদ সন্ধি প্রধানত ৩ প্রকার: স্বরসন্ধি, ব্যঞ্জনসন্ধি ও বিসর্গসন্ধি। সমাস প্রধানত ৬ প্রকার: দ্বন্দ্ব, কর্মধারয়, তৎপুরুষ, বহুব্রীহি, দ্বিগু ও অব্যয়ীভাব।

১। (চ) ভাবসম্প্রসারণ কর : “স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা কঠিন”

মূলভাব: স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার এবং জাতির পরম গৌরব। কিন্তু রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতা অর্জন যতটা কঠিন ও আত্মত্যাগসাপেক্ষ, অর্জিত স্বাধীনতাকে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও বহিঃশত্রুর আগ্রাসন থেকে রক্ষা করে স্থায়ী রূপ দান করা তার চেয়েও বহু গুণে কঠিন ও শ্রমসাধ্য।

সম্প্রসারিত ভাব: পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য একটি জাতি সাময়িকভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে চরম আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ হয়। বীর সেনানীরা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে যেকোনো মূল্যে ভূখণ্ডকে শত্রুমুক্ত করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনে। কিন্তু স্বাধীনতা অর্জনের উল্লাস শেষ হওয়ার পরই শুরু হয় আসল অগ্নিপরীক্ষা। স্বাধীনতার বাস্তব সুফল সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া না গেলে স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে পড়ে। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অনৈক্য, অর্থনৈতিক লুটপাট, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, আইনের শাসনের অভাব এবং সামাজিক বৈষম্য স্বাধীন দেশকে ভেতর থেকে অস্থিতিশীল করে তোলে। এছাড়া পরাশক্তি ও পরাজিত শত্রুরা সর্বদাই সার্বভৌমত্ব নস্যাতের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকে। ফলে অর্জিত স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখতে হলে সার্বক্ষণিক সতর্কতা, অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরশীলতা, সুদৃঢ় জাতীয় সংহতি এবং চারিত্রিক সততার প্রয়োজন হয়। সামান্য অসাবধানতা বা আত্মতুষ্টির কারণে অর্জিত স্বাধীনতার সূর্য পুনরায় অস্তমিত হতে পারে।

মন্তব্য: স্বাধীনতা কেবল একটি পতাকা বা ভৌগোলিক সীমারেখার নাম নয়; এটি মানুষের সার্বিক মুক্তি ও অধিকারের নিশ্চয়তা। তাই স্বাধীনতাকে চিরভাস্বর রাখতে জাতিকে আত্মঘাতী বিভেদ ভুলে অতন্দ্র প্রহরীর মতো দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধে সদা জাগ্রত থাকতে হবে।


১। (ছ) মাদ্রাসা থেকে ছাড়পত্র চেয়ে অধ্যক্ষ বরাবর একটি দরখাস্ত লেখ।

তারিখ: ১৫ অক্টোবর ২০২৩
বরাবর,
অধ্যক্ষ,
দারুননাজাত সিদ্দিকীয়া কামিল মাদ্রাসা,
ডেমরা, ঢাকা।

বিষয়: মাদ্রাসা থেকে ছাড়পত্র (ট্যাক্সি/টিসি) পাওয়ার জন্য আবেদন।

মহোদয়,
যথাবিহিত সম্মান প্রদর্শনপূর্বক বিনীত নিবেদন এই যে, আমি আপনার ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসার ফাজিল স্নাতক (সম্মান) শ্রেণির একজন নিয়মিত ছাত্র। সম্প্রতি সরকারি চাকুরিজীবী আমার পিতার আকস্মিক বদলিজনিত কারণে আমাদের সমগ্র পরিবারকে ঢাকায় স্থায়ী আবাস গুটিয়ে রাজশাহী বিভাগীয় শহরে স্থানান্তরিত হতে হচ্ছে। এমতাবস্থায় রাজশাহীতে অবস্থান করে ঢাকায় এসে নিয়মিত ক্লাস ও মাদ্রাসার কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করা আমার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ফলে রাজশাহীর একটি স্থানীয় ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্ত কামিল মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। এজন্য অত্র মাদ্রাসা থেকে আমার একটি ছাড়পত্র (Transfer Certificate) একান্ত আবশ্যক। উল্লেখ্য যে, অত্র মাদ্রাসার চলতি শিক্ষাবর্ষের যাবতীয় পাওনা ও টিউশন ফি আমি ইতোমধ্যে পরিশোধ করেছি।

অতএব, বিনীত প্রার্থনা এই যে, আমার ভবিষ্যৎ শিক্ষা জীবনের ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে আমাকে অত্র মাদ্রাসা থেকে ছাড়পত্র প্রদান করে বাধিত করবেন।

বিনীত নিবেদক,
আপনার অনুগত ছাত্র,
মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল-মামুন
শ্রেণি: ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ১ম বর্ষ
বিভাগ: আরবি ভাষা ও সাহিত্য
রোল নম্বর: ১২, শিক্ষাবর্ষ: ২০২২-২০২৩


১। (জ) সমাস কাকে বলে? সমাস কত প্রকার ও কী কী? উদাহরণসহ লেখ।

১. সমাসের সংজ্ঞা: অর্থসম্বন্ধযুক্ত একাধিক পদের একত্রিত হয়ে একটি নতুন শব্দে পরিণত হওয়াকে সমাস বলে। সমাস শব্দের আভিধানিক অর্থ সংক্ষেপ, মিলন বা একাধিক পদের একপদীকরণ। যেমন: সিংহ চিহ্নিত আসন = সিংহাসন, বিলাত হইতে ফেরত = বিলাতফেরত।

২. সমাসের শ্রেণিবিভাগ: বাংলা ব্যাকরণে সমাস প্রধানত ৬ প্রকার:

  1. দ্বন্দ্ব সমাস: যে সমাসে প্রত্যেকটি সমস্যমান পদের অর্থের সমান প্রাধান্য থাকে। যেমন: তাল ও তমাল = তালতমাল, মা ও বাবা = মা-বাবা।
  2. কর্মধারয় সমাস: যেখানে বিশেষণ বা বিশেষণভাবাপন্ন পদের সাথে বিশেষ্য বা বিশেষ্যভাবাপন্ন পদের সমাস হয় এবং পরপদের অর্থ প্রধানরূপে প্রতিভাত হয়। যেমন: নীল যে পদ্ম = নীলপদ্ম, মহান যে নবী = মহানবী।
  3. তৎপুরুষ সমাস: যে সমাসে পূর্বপদের বিভক্তি লোপ পায় এবং পরপদের অর্থ প্রাধান্য পায়। যেমন: বিপদকে আপন্ন = বিপদাপন্ন (দ্বিতীয়া তৎপুরুষ), ধান দ্বারা শূন্য = ধানশূন্য (তৃতীয়া তৎপুরুষ)।
  4. বহুব্রীহি সমাস: যে সমাসে পূর্বপদ বা পরপদ কোনোটির অর্থ না বুঝিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো ব্যক্তি বা বস্তুকে বোঝায়। যেমন: দশ আনন (মুখ) যার = দশানন (রাবণ), পীত অম্বর যার = পীতাম্বর (শ্রীকৃষ্ণ)।
  5. দ্বিগু সমাস: সংখ্যাবাচক শব্দ পূর্বে বসে সমাহার বা সমষ্টি বোঝালে তাকে দ্বিগু সমাস বলে। যেমন: তিন কালের সমাহার = ত্রিকাল, শত অব্দের সমাহার = শতাব্দী।
  6. অব্যয়ীভাব সমাস: পূর্বপদে অব্যয়জাতীয় শব্দ বসে এবং অব্যয়ের অর্থই প্রধানরূপে প্রতিভাত হয়। যেমন: কূলের সমীপে = উপকূল, কণ্ঠের সমীপে = উপকণ্ঠ।

খ বিভাগ—সাহিত্য (গদ্য) (মান—১০ × ২ = ২০)

২। ‘আমাদের ভাষা সমস্যা’ প্রবন্ধ অবলম্বনে মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ভাষা চিন্তার পরিচয় দাও।

ভূমিকা: বহুভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৮৮৫-১৯৬৯) ছিলেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অন্যতম প্রধান গবেষক ও জাতীয়তাবাদী মনীষী। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর যখন নবগঠিত পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নিয়ে বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় সংকটে নিপতিত হয়েছিল, তখন তিনি তাঁর সুচিন্তিত প্রবন্ধ ‘আমাদের ভাষা সমস্যা’-তে বাংলা ভাষার ঐতিহাসিক মর্যাদা, কার্যকারিতা ও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে এর অনিবার্য দাবির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি তুলে ধরেন।

১. ভাষার বহুমাত্রিক স্তরভেদ ও মূল্যায়ন: ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ মানবজীবনের প্রেক্ষাপটে ভাষাকে তিনটি স্তরে বিভক্ত করে আলোচনা করেছেন:

  • মাতৃভাষা: শিশুর মায়ের কোল থেকে শেখা ভাষা, যা মানুষের চিন্তা ও ভাব প্রকাশের স্বাভাবিকতম বাহন। বাঙালির ক্ষেত্রে তা একমাত্র বাংলা।
  • রাষ্ট্রভাষা: রাষ্ট্রের শাসনকার্য, বিচারব্যবস্থা ও জাতীয় সংহতি রক্ষার মাধ্যম। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ ৫৫ শতাংশ মানুষের মুখের ভাষা হিসেবে বাংলাকে তিনি রাষ্ট্রভাষা করার যুক্তি উপস্থাপন করেন।
  • আন্তর্জাতিক বা ধর্মীয় ভাষা: বৈশ্বিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের জন্য ইংরেজি এবং ধর্মীয় সংহতির জন্য আরবি ভাষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন তিনি।

২. উর্দু আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যুক্তিপূর্ণ অবস্থান: তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যখন উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছিল, তখন ড. শহীদুল্লাহ দৃঢ়কণ্ঠে প্রমাণ করেন যে, উর্দু কোনো একক অঞ্চলের ভাষা নয় এবং পাকিস্তানের কোনো প্রদেশেরই সাধারণ মাতৃভাষা নয়। তাই সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব পাকিস্তানের ওপর উর্দু চাপিয়ে দেওয়া চরম অগণতান্ত্রিক ও অবৈজ্ঞানিক।

৩. বাংলা ভাষার সমৃদ্ধি ও সমন্বিত রূপ: তিনি খাঁটি বাংলা ও তৎসম শব্দের চমৎকার ভারসাম্যের ওপর জোর দেন। আরবি-ফারসি শব্দকে বাংলা সাহিত্যের স্বাভাবিক ঐতিহ্যের অংশ বলে স্বীকার করলেও তিনি জোরপূর্বক বাংলাকে তথাকথিত ‘ইসলামিকরণ’ বা কৃত্রিম করার ঘোর বিরোধী ছিলেন।

উপসংহার: ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ভাষা চিন্তা কেবল ভাষাতাত্ত্বিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, তা ছিল বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন, বাহান্নর রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলন এবং পরবর্তীকালে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের এক অনন্য দার্শনিক প্রেরণা।

অথবা,

“তৈলের মহিমা অপরূপ; তৈল না হলে জাতের কোনো কার্য সিদ্ধ হয় না”—এই উক্তির আলোকে তৈলের মাহাত্ম্য বর্ণনা কর।

ভূমিকা: মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী (১৮৫৩-১৯৩১) রচিত ‘তৈল’ বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য ব্যঙ্গাত্মক ও সমাজবাস্তবতামূলক প্রবন্ধ। আপাতদৃষ্টিতে প্রাত্যহিক জীবনের ভোজ্য বা প্রসাধন সামগ্রী ‘তেল’ নিয়ে লেখা মনে হলেও লেখক রূপক অর্থে সমাজজীবনের মারাত্মক ব্যাধি ‘তোষামোদ’ বা চাটুকারিতাকে ‘তৈল’ হিসেবে চিত্রিত করেছেন।

১. তৈলের সার্বজনীন ক্ষমতা ও মহিমা: লেখক চমৎকার তীক্ষ্ণ হাস্যরসের মাধ্যমে বলেছেন যে, তৈল এক সর্বশক্তিমান বস্তু। রূপচর্চা, শরীরের স্নিগ্ধতা রক্ষা কিংবা ভোজনের চেয়েও তৈলের আসল শক্তি প্রকাশিত হয় সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে। যাকে কোনো যুক্তি, বুদ্ধি, যোগ্যতা বা বিদ্যা দিয়ে বশ করা যায় না, সেখানে উপযুক্ত পরিমাণে ‘তৈল’ (তোষামোদ) প্রয়োগ করলে অতি সহজেই কার্যসিদ্ধি হয়।

২. চাটুকারিতার রূপক চিত্র: লেখকের মতে, মানবসমাজে টিকে থাকতে হলে তেল দেওয়ার ক্ষমতা অপরিহার্য। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, রাজা-বাদশাহ কিংবা ক্ষমতাবানদের মনোরঞ্জন করার একমাত্র হাতিয়ার হলো তৈলপ্রদান। যারা তৈলদানে পারদর্শী, সমাজে তাদের পদোন্নতি, প্রতিষ্ঠা ও খ্যাতি দ্রুত ঘটে; পক্ষান্তরে প্রকৃত মেধাবী ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিরা তৈল না দেওয়ার কারণে পদে পদে লাঞ্ছিত ও বঞ্চিত হন।

৩. জাতীয় উন্নতির অন্তরায়: হরপ্রসাদ শাস্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করে দেখিয়েছেন যে, আমাদের জাতীয় চরিত্রে তৈলমর্দন এমনভাবে প্রবেশ করেছে যে বিদ্যা ও কর্মদক্ষতা গৌণ হয়ে পড়েছে। সমাজ ও রাষ্ট্রযন্ত্র তোষামোদকারীদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে, যা জাতীয় অবক্ষয়ের মূল কারণ।

উপসংহার: ‘তৈল’ প্রবন্ধে লেখক শ্লেষাত্মক রচনার আশ্রয়ে বাঙালির ভণ্ডামি, পদলেহী মানসিকতা ও তোষামোদের সংস্কৃতিকে তীব্র কশাঘাত করেছেন। উক্তিটি বর্তমান যুগেও ক্ষমতাচর্চার ক্ষেত্রে শতভাগ চিরন্তন সত্য হিসেবে প্রতিভাত হয়।


৩। ‘পাদটীকা’ গল্পে সমকালীন সমাজ ব্যবস্থার শিক্ষক জীবনের যে করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে তার পরিচয় দাও।

ভূমিকা: প্রখ্যাত রম্য ও বাস্তববাদী সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী রচিত ‘পাদটীকা’ গল্পটি সমকালীন পরাধীন ঔপনিবেশিক সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থায় সাধারণ শিক্ষক সম্প্রদায়ের অবমূল্যায়ন, চরম দারিদ্র্য এবং করুণ আত্মমর্যাদাহীন জীবনের এক হৃদয়স্পর্শী দলিল।

১. পণ্ডিত মশায়ের সামাজিক অবস্থান: গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র পণ্ডিত মশায় সংস্কৃত ও বাংলা ভাষার একজন অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী আদর্শবান শিক্ষক। কিন্তু ব্রিটিশ অনুসারী তথাকথিত আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় তাঁর কোনো মর্যাদা ছিল না। একজন সামান্য পিওন বা চাপরাসীর চেয়েও তাঁর বেতন ছিল কম। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও পরিদর্শকদের চোখে তিনি ছিলেন চরম উপেক্ষিত এক জীব।

২. পাদটীকা বা উপেক্ষিত জীবনের প্রতীক: বইয়ের মূল পৃষ্ঠার নিচে ক্ষুদ্র অক্ষরে যেমন অবহেলিত ‘পাদটীকা’ (Footnote) পড়ে থাকে, সমাজের চোখে পণ্ডিত মশাইরাও ছিলেন সেই পাদটীকার মতো। বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরিদর্শন উপলক্ষে উচ্চপদস্থ ব্রিটিশ বা সাহেব ইন্সপেক্টরকে খুশি করার জন্য বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অথচ পণ্ডিত মশায়ের সামান্য ন্যায্য দাবি বা ন্যূনতম বেঁচে থাকার অধিকারের দিকে কারও ভ্রুক্ষেপ ছিল না।

৩. আত্মমর্যাদা ও দারিদ্র্যের অন্তর্দ্বন্দ্ব: পণ্ডিত মশায় শত অভাবের মাঝেও নিজের নৈতিকতা বিসর্জন দেননি। পরিদর্শকের সামনে তিনি বিনম্র অথচ বাস্তব কঠিন সত্যকে উপস্থাপন করেছেন। গল্পটিতে শিক্ষকের নিঃশব্দ কান্না ও সমাজের অকৃতজ্ঞ চরিত্র অত্যন্ত দরদের সাথে উন্মোচিত হয়েছে।

উপসংহার: সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর স্বভাবসুলভ পরিহাসের অন্তরালে তৎকালীন সমাজব্যবস্থার অন্তঃসারশূন্যতা এবং জাতি গড়ার কারিগর শিক্ষকদের প্রতি সমাজের নির্মম অবহেলার চিত্র অঙ্কন করে পাঠকহৃদয়ে গভীর দাগ কেটেছেন।

অথবা,

‘শিউলীমালা’ গল্পে প্রেমের যে স্বরূপ ফুটে উঠেছে তার পরিচয় দাও।

ভূমিকা: জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত অমর ছোটগল্প ‘শিউলীমালা’ প্রেমের এক পবিত্র, নিঃস্বার্থ ও বেদনাবিধুর রূপকে চিত্রিত করেছে। প্রেমের চিরন্তন বিরহ এবং স্মৃতির অতল সমুদ্রে আত্মনিবেদনের মধ্য দিয়ে নজরুল এখানে পার্থিব মিলনের ঊর্ধ্বে আত্মিক ভালোবাসার মহিমাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

১. চরিত্রের প্রেম ও মিলন-আকাঙ্ক্ষা: গল্পের প্রধান চরিত্র রেজাউল এবং শিউলী (পারুল)। সংগীতের সূত্রে দুজনের মাঝে এক অপার্থিব অনুরাগের সৃষ্টি হয়। রেজাউল সংগীতের পরম পূজারী এবং সেই সংগীতের সুরের মূর্ছনায় শিউলী নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দেয়। দুজনের হৃদয় ছিল একে অপরের প্রতি একনিষ্ঠ ও সমর্পিত।

২. সামাজিক বাধা ও নিয়তির নির্মম পরিহাস: কিন্তু তাদের প্রেম পার্থিব পরিণয়ের সোনালী মুখ দেখতে পায়নি। সামাজিক প্রতিকূলতা, জাত্যাভিমান এবং পারিবারিক বিধিনিষেধের কারণে শিউলীকে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে হয় অন্যত্র। নিয়তির এই নিষ্ঠুর আঘাত রেজাউলকে গভীরভাবে স্তব্ধ করে দেয়।

৩. বিরহ ও স্মৃতির অম্লান সৌরভ: শিউলীর বিয়ের পর তাদের ভালোবাসার সমাপ্তি ঘটেনি; বরং তা রূপান্তরিত হয়েছে এক পবিত্র প্রার্থনায়। শিউলী ফুল যেমন রাতে প্রস্ফুটিত হয়ে ভোরের আলো ফুটতেই ঝরে পড়ে এবং তার স্নিগ্ধ সুবাস চারদিকে ছড়িয়ে দেয়, তেমনি রেজাউল ও শিউলীর প্রেমও আত্মত্যাগের সৌরভে চিরভাস্বর হয়ে ওঠে। শিউলীর গেঁথে দেওয়া মালা রেজাউলের জীবনের একমাত্র অবলম্বন হয়ে থাকে।

উপসংহার: ‘শিউলীমালা’ গল্পে নজরুল প্রমাণ করেছেন যে, প্রেম কেবল দৈহিক মিলন নয়; বরং প্রেম হলো পরম ত্যাগ, অনন্ত বিরহ এবং স্মৃতিকে অন্তরে লালন করে বেঁচে থাকার এক অনুপম আত্মিক শক্তি।


গ বিভাগ—সাহিত্য (পদ্য) (মান—১০ × ২ = ২০)

৪। “বলাকা কবিতা যেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্থবিরতার বিরুদ্ধে সচেতন বিদ্রোহ”—উক্তিটির যথার্থতার পরিচয় দাও।

ভূমিকা: বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যসাধনার এক নতুন বাঁক ও গতিবাদের দার্শনিক রূপায়ন হলো তাঁর বিখ্যাত ‘বলাকা’ কাব্যগ্রন্থ ও এর নামকবিতা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে কাশ্মীরের ঝিলম নদীর তীরে বসে রচিত এ কবিতায় কবি জড়তা, ক্লান্তি ও স্থবিরতার বিরুদ্ধে মানবচেতনার চিরন্তন গতির জয়গান গেয়েছেন।

১. ঝিলমের স্থিরতা বনাম বলাকার চঞ্চলতা: সন্ধ্যার স্তব্ধতায় ঝিলম নদী যখন নিশ্চল বাঁকা তলোয়ারের মতো অন্ধকার খাপের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছিল, তখন একঝাঁক শুভ্র বুনো হাঁস ডানার শব্দে সেই স্তব্ধতাকে চূর্ণ করে উড়ে যায়। বলাকার এই উড্ডয়ন কেবল পাখির আকাশে ওড়া নয়; তা ছিল সৃষ্টির বুকের ভেতরের অনন্ত গতির এক মহাবিস্ফোরণ।

২. হেঁয়ালি ও গতিবাদের দর্শন (Bergson-এর প্রভাব): ফরাসি দার্শনিক অঁরি বার্গসোর (Henri Bergson) প্রাণশক্তি বা ‘Élan Vital’ দর্শনের সাথে কবির আত্মিক সংযোগ ঘটে। কবি উপলব্ধি করেন যে, এই মহাবিশ্বের কোনো কিছুই স্থির নয়। পর্বত, অরণ্য, গ্রহ-নক্ষত্র—সবকিছুই অদৃশ্যের পানে অবিরাম ধাবমান। স্থবিরতাই হলো মৃত্যু, আর নিরন্তর গতিই হলো জীবনের সত্য।

৩. স্থবিরতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ: কবি মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, জরাজীর্ণ অতীত ও প্রথাগত সংস্কারের খাঁচায় বন্দি হয়ে থাকা জীবনের ধর্ম নয়। পাখির ডানার মতো আত্মাকে মুক্ত করে উর্ধ্বলোকে পাখা মেলতে হবে—“হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে।”

উপসংহার: তাই বলা যায়, ‘বলাকা’ কবিতাটি সমকালীন মানবজীবনের ক্লান্তি ও স্থবিরতার বুকে এক তীব্র প্রাণস্পন্দন এবং প্রগতির পথে এগিয়ে যাওয়ার সচেতন ও বলিষ্ঠ বিদ্রোহের গান।

অথবা,

‘উমর ফারুক’ কবিতা অবলম্বনে হযরত উমর ফারুক (রা) এর চারিত্রিক মাধুর্য আলোচনা কর।

ভূমিকা: সাম্য ও মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ‘উমর ফারুক’ এক অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক গাথা। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর ফারুক (রা.)-এর ইনসাফ, চারিত্রিক দৃঢ়তা, গভীর কোমলতা ও বিশ্বজনীন সাম্যবাদী শাসনব্যবস্থার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি এই কবিতা।

১. নির্ভীক বীরত্ব ও কঠোর ন্যায়বিচার: ইসলাম গ্রহণের পূর্বে ও পরে হযরত উমর (রা.) ছিলেন সত্যের মূর্ত প্রতীক। বাতিলের সামনে তিনি ছিলেন পাহাড়সম অটল। নিজের পুত্রও যদি কোনো অপরাধ করত, তবে খলিফা হিসেবে তিনি শরিয়তের শাস্তি প্রদানে তিলমাত্র দ্বিধা করতেন না। তাঁর কাছে আমির-ফকির, আপন-পর কোনো ভেদাভেদ ছিল না।

২. প্রজার দুঃখে ক্রন্দনরত কোমল হৃদয়: শাসকরূপে উমর ছিলেন কঠোর, কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য তাঁর হৃদয় ছিল কুসুমকোমল। রাতের আঁধারে প্রজাদের দুঃখ-কষ্ট দেখতে তিনি ছদ্মবেশে মদিনার অলিতে-গলিতে ঘুরে বেড়াতেন। ক্ষুধার্ত শিশুর কান্না শুনে বাইতুল মাল থেকে আটার বস্তা নিজের পিঠে বহন করে নিয়ে নিজে রান্না করে শিশুদের মুখে অন্ন তুলে দিয়েছেন।

৩. বিশ্বজনীন সাম্যবাদ ও ভৃত্যের অধিকার: জেরুজালেম বিজয়ের ঐতিহাসিক যাত্রায় খলিফা উমর (রা.) ও তাঁর ভৃত্য একটিমাত্র উটের পিঠে পালাক্রমে চড়েছিলেন। যখন শহরের প্রবেশদ্বারে পৌঁছালেন, তখন নিয়ম অনুযায়ী ছিল ভৃত্যের উটের পিঠে বসার পালা এবং স্বয়ং রাষ্ট্রপ্রধান খলিফা উটের রশি ধরে হেঁটে প্রবেশ করেছিলেন। এটি ইতিহাসের পাতায় সাম্যের এক অতুলনীয় দৃষ্টান্ত।

উপসংহার: নজরুল উমর ফারুকের চরিত্রের এই বৈপরীত্য—বজ্রের মতো কঠোর এবং কুসুমের মতো কোমল—অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ফুটিয়ে তুলে বর্তমান বিশ্বের স্বার্থান্ধ শাসকদের জন্য এক অনন্য আদর্শ স্থাপন করেছেন।


৫। ‘মুসাফির’ কবিতার মূল বক্তব্য আলোচনা কর।

ভূমিকা: মুসলিম নবজাগরণের চারণকবি ফররুখ আহমদ রচিত ‘মুসাফির’ কবিতাটি এক গভীর আত্মানুসন্ধান ও আধ্যাত্মিক পুনর্জাগরণের কাব্য। এখানে ‘মুসাফির’ রূপকের মাধ্যমে কবি পার্থিব মোহগ্রস্ত মানুষের অনন্ত আখেরাতমুখী চিরন্তন যাত্রার সত্যকে তুলে ধরেছেন।

১. পার্থিব জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব: এই দুনিয়া মানুষের চিরস্থায়ী বাসস্থান নয়; এটি কেবল এক পান্থশালা বা সরাইখানা। মানুষ এখানে নিছক এক পরিব্রাজক বা মুসাফির। কিন্তু জাগতিক ধনসম্পদ, ক্ষমতা ও ভোগের মোহে অন্ধ হয়ে মানুষ তার চিরস্থায়ী আখেরাত ও সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্য ভুলে এক আত্মঘাতী বিভ্রান্তিতে জড়িয়ে পড়েছে।

২. আত্মবিস্মৃত জাতিকে সতর্কবার্তা: কবি ঘুমন্ত মুসলিম সমাজকে উদ্দেশ্য করে তীব্র আহ্বান জানিয়েছেন। অলসতা, আত্মতুষ্টি এবং মোহমায়ার ঘুম ভেঙে মঞ্জিলে মকসুদের দিকে এগিয়ে যাওয়ার তাগিদ দিয়েছেন। মুসাফিরের সামনে অপেক্ষা করছে অনন্ত আখিরাতের কঠিন হিসাব। তাই সময় থাকতে পাথেয় সংগ্রহ করা প্রতিটি জ্ঞানীর প্রধান কর্তব্য।

উপসংহার: ‘মুসাফির’ কবিতায় ফররুখ আহমদ ইসলামী দর্শনের শাশ্বত সত্যকে অনুপম শব্দচয়ন ও ছন্দের দোলায় প্রকাশ করেছেন, যা মানুষকে জাগতিক মোহের মরীচিকা থেকে মুক্ত করে চিরন্তন মুক্তির আলো দেখায়।

অথবা,

‘আমার পূর্ব বাংলা’ কবিতা অবলম্বনে বাংলার রূপময় চিত্র বর্ণনা কর।

ভূমিকা: প্রখ্যাত কবি সৈয়দ আলী আহসান রচিত ‘আমার পূর্ব বাংলা’ কবিতাটি জন্মভূমির প্রতি গভীর ভালোবাসা ও এর শ্যামলিম রূপবৈচিত্র্যের এক অনবদ্য নান্দনিক আলেখ্য। আবহমান গ্রাম-বাংলার নদী, মাঠ, পাখি ও ফসলের সুবাস কবিহৃদয়ে যে পুলক সৃষ্টি করেছে, তা এ কবিতায় নিখুঁতভাবে চিত্রিত হয়েছে।

১. রূপময় প্রকৃতির জীবন্ত চিত্রায়ন: কবি পূর্ব বাংলাকে দেখেছেন এক শ্যামল ও রূপবতী মাতৃরূপে। বর্ষায় প্লাবিত নদী, কাশবনে দোলা লাগা শরৎ, সোনালী ধানের ওপর ভোরের শিশির এবং পাখিদের কলকাকলিতে বাংলার প্রকৃতি এক শান্ত ও স্বর্গীয় রূপ ধারণ করে। কবির ভাষায় বাংলার প্রতিটি বৃক্ষলতা যেন মমতাময়ী মায়ের আঁচল।

২. সাধারণ মানুষের জীবনস্পন্দন: প্রকৃতির সাথে মিশে থাকা মাঝিমাল্লা, কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের সহজ-সরল জীবন কবির দৃষ্টিতে অপরূপ হয়ে উঠেছে। ভাটিয়ালি গানের সুর, রাখালের বাঁশি এবং ফসলের ঘ্রাণ মিলেমিশে জন্মভূমির সাথে কবির আত্মিক সংযোগকে নিবিড় করেছে।

উপসংহার: ‘আমার পূর্ব বাংলা’ কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বন্দনা নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয় ও মাটির সাথে নারীর নাড়ির সম্পর্কের এক গভীর দেশপ্রেমমূলক কাব্যগাথা।


ঘ বিভাগ—বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস (মান—১০ × ২ = ২০)

৬। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যানগুলো কোন অর্থে অনন্য? আলোচনা কর।

ভূমিকা: মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য ছিল মূলত ধর্মকেন্দ্রিক দেব-দেবীর স্তুতিমূলক (যেমন: মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলী, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন)। কিন্তু এই ধর্মীয় আবর্তের বাইরে এসে মধ্যযুগের মুসলিম কবিগণ ফারসি ও হিন্দি সাহিত্যের অনুপ্রেরণায় যে মানবিক প্রেম ও মানব-মানবীর সুখ-দুঃখভিত্তিক সাহিত্য সৃষ্টি করেন, তা বাংলা সাহিত্যে ‘রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান’ নামে পরিচিত।

১. রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যানের অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ:

  • দেবতা নয়, মানুষই প্রধান (মানবিকতার জয়গান): মধ্যযুগের আর কোনো কাব্যে রক্ত-মাংসের মানুষের প্রেম এভাবে স্থান পায়নি। সেখানে নায়ক-নায়িকার প্রেম কোনো দেব-দেবীর আশীর্বাদ বা অভিশাপের অধীন নয়; বরং মানুষের স্বাধীন আবেগ ও বিরহের প্রতিফলন।
  • বাস্তবতা ও রোমান্টিকতার সংমিশ্রণ: এতে প্রেম যেমন গভীর ও আবেগপূর্ণ, তেমনি সামাজিক বাস্তবতা ও মানবিক রূপ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে অঙ্কিত হয়েছে।
  • ধর্মীয় সংকীর্ণতামুক্ত সার্বজনীনতা: শাহ মুহম্মদ সগীর, দৌলত কাজী, সৈয়দ আলাওল প্রমুখ কবির লেখনীতে ধর্মভেদ ভুলে মানবিক প্রেমের শাশ্বত রূপ উদ্ভাসিত হয়েছে।

২. প্রধান প্রণয়োপাখ্যানসমূহ: শাহ মুহম্মদ সগীরের ‘ইউসুফ-জুলেখা’, সাবিরিদ খানের ‘বিদ্যাসুন্দর’, দৌলত কাজীর ‘সতীময়না ও লোরচন্দ্রানী’ এবং মহাকবি আলাওলের ‘পদ্মাবতী’ বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।

উপসংহার: অতএব, দেব-মাহাত্ম্যের বন্দিশালা থেকে বাংলা সাহিত্যকে মুক্ত করে মানুষের জয়গান গাওয়ার কারণেই মধ্যযুগের রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যানগুলো বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সম্পূর্ণ অনন্য ও যুগান্তকারী।

অথবা,

টীকা লেখ: ১। চর্যাপদ, ২। লাইলী মজনু।

১। চর্যাপদ:

পরিচয় ও আবিষ্কার: চর্যাপদ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রাচীনতম প্রামাণ্য নিদর্শন। ১৯০৭ সালে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজদরবারের রাজকীয় পুথিশালা থেকে এটি আবিষ্কার করেন এবং ১৯১৬ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় রচিত বৌদ্ধগান ও দোহা’ নামে প্রকাশ করেন।

রচয়িতা ও বিষয়বস্তু: এটি মূলত সহজিয়া বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের রচিত সাধন-সংগীত। এতে মোট সাড়ে ছেচল্লিশটি পদ পাওয়া গেছে। লুইপা, কাহ্নপা, ভুসুকুপা প্রমুখ ছিলেন প্রধান পদকর্তা।

ভাষাতাত্ত্বিক গুরুত্ব: ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ১৯২৬ সালে তাঁর ‘ODBL’ গ্রন্থে ধ্বনিতত্ত্ব ও ব্যাকরণ বিশ্লেষণ করে অকাট্যভাবে প্রমাণ করেন যে চর্যাপদের ভাষা প্রাচীন বাংলা। এতে তৎকালীন নদীমাতৃক বাংলার সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জীবনচিত্র অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।

২। লাইলী মজনু:

উৎস ও কবি: লাইলী-মজনু মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের এক সুপ্রসিদ্ধ প্রণয়োপাখ্যান। পারস্যের কবি নিজামীর মূল ফারসি কাব্য অবলম্বনে ষোড়শ শতকের কবি দৌলত উজির বাহরাম খান এটি বাংলায় কাব্যাকারে রূপান্তর করেন।

মূল কাহিনী: কায়েস ও লাইলীর বাল্যকালের পবিত্র প্রেম এবং সামাজিক বাধা-বিপত্তির কারণে তাদের বিচ্ছেদ ও পরিণাম এই কাব্যের মূল উপজীব্য। প্রেমের তীব্র বেদনায় কায়েস উন্মাদ হয়ে বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায় এবং সবার কাছে ‘মজনু’ (পাগল) নামে পরিচিত হয়। অবশেষে বিরহজ্বালায় দুজনেরই করুণ মৃত্যু ঘটে।

সাহিত্যিক মূল্যায়ন: বাহরাম খান আরবি-ফারসি কাহিনীর রূপরেখা গ্রহণ করলেও তাতে আবহমান বাংলার আবেগ, বিরহের আর্তি এবং রূপক অর্থে সুফি সাধনার পরম প্রেমের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন।


৭। বাংলা গদ্যের বিকাশে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ভূমিকা আলোচনা কর।

ভূমিকা: বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন ও মধ্যযুগ ছিল সম্পূর্ণ পদ্যনির্ভর। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে আধুনিক বাংলা গদ্যের যে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়, তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ১৮০০ সালের ৪ মে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত ‘ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ’।

১. ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের উদ্দেশ্য ও বাংলা বিভাগ: ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নবীন শ্বেতাঙ্গ সিভিলিয়ান কর্মকর্তাদের এদেশীয় ভাষা, আইন ও সংস্কৃতির সাথে পরিচিত করার লক্ষ্যে লর্ড ওয়েলেসলি এই কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮০১ সালে পাদ্রি উইলিয়াম কেরির নেতৃত্বে বাংলা বিভাগ চালু হয়।

২. পণ্ডিতমণ্ডলী ও পাঠ্যপুস্তক রচনা: পাঠ্যপুস্তকের অভাব দূর করতে উইলিয়াম কেরি দেশীয় পণ্ডিতদের নিয়ে পাঠ্যবই রচনা শুরু করেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য:

  • উইলিয়াম কেরি: ‘কথোপকথন’ (১৮০১) ও ‘ইতিহাসমালা’ (১৮১২)। বিশেষ করে ‘কথোপকথন’ গ্রন্থে তৎকালীন সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কথ্য গদ্যের অসাধারণ রূপ ধরা পড়ে।
  • রামরাম বসু: ‘প্রতাপাদিত্য চরিত্র’ (১৮০১)—বাঙালি রচিত বাংলা সাহিত্যের প্রথম মৌলিক মুদ্রিত গদ্যগ্রন্থ।
  • মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার: ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সর্বশ্রেষ্ঠ পণ্ডিত। তাঁর রচিত ‘বত্রিশ সিংহাসন’, ‘হিতোপদেশ’ এবং ‘প্রবোধ চন্দ্রিকা’-তে সংস্কৃতবহুল অলংকৃত গদ্যের শ্রেষ্ঠ রূপ পরিলক্ষিত হয়।

উপসংহার: যদিও ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের গদ্য ছিল কৃত্রিম এবং কিছুটা আড়ষ্ট, তথাপি বাংলা বাক্যগঠনরীতি তৈরি, ব্যাকরণচর্চা ও মুদ্রিত গ্রন্থের মাধ্যমে বাংলা গদ্যের শৈশবের পথচলা এই কলেজের মাধ্যমেই সূচিত হয়েছিল।

অথবা,

“কাজী নজরুল ইসলাম শুধু বিদ্রোহের কবি নন প্রেমেরও কবি”—মন্তব্যটি বিশ্লেষণ কর।

ভূমিকা: বাংলা সাহিত্যের অবিসংবাদিত প্রতিভা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে সাধারণ দৃষ্টিতে কেবল ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও গভীরভাবে অবলোকন করলে দেখা যায়, তাঁর বিদ্রোহী সত্তার মূল চালিকাশক্তি ছিল গভীর ভালোবাসা ও প্রেম। স্বয়ং কবি বলেছিলেন: “আমি চিরতরে দূরে চলে যাব, তবু আমারে দেব না ভুলিতে…।” তাঁর এক হাতে ছিল বাঁশের বাঁশরী আর অন্য হাতে রণতূর্য।

১. বিদ্রোহের অন্তরালে প্রেমের উৎস: নজরুলের বিদ্রোহ কোনো অন্ধ ধ্বংসলীলা ছিল না; তা ছিল মানবতার প্রতি সুগভীর প্রেম থেকে উৎসারিত। পরাধীন, নির্যাতিত, শোষিত ও অনাহারি মানুষের প্রতি অসীম ভালোবাসাই তাঁকে জালিম শাসক ও সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী করে তুলেছিল। মানুষের প্রতি মমতা না থাকলে এমন জ্বালাময়ী বিদ্রোহ সম্ভব ছিল না।

২. গীতিকবিতা ও গানের ভালোবাসার জগৎ: নজরুল বাংলা সাহিত্যে প্রেমের গানে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। তাঁর ‘দোলন-চাঁপা’, ‘ছায়ানট’, ‘পূবের হাওয়া’ কাব্যগ্রন্থে প্রেমের যে সুর ধ্বনিত হয়েছে তা অতুলনীয়। বিরহ, মান-অভিমান, অনুযোগ ও সমর্পণের এমন নিখুঁত প্রকাশ নজরুলের গজল ও আধুনিক গানে যেভাবে ঘটেছে তা সমগ্র বিশ্বসাহিত্যে বিরল।

উপসংহার: অতএব, নজরুল যেমন অসাম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে আপসহীন বিদ্রোহী, তেমনি রূপ-রস-গন্ধভরা পৃথিবীর চিরপ্রেমিক এক শিল্পী। তিনি প্রেমের টানেই বিদ্রোহী হয়েছিলেন এবং প্রেমের মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিলেন জীবনের পরম সার্থকতা।


সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. ফাজিল ১ম বর্ষের বাংলা (২০৪১০২) বিষয়ের মানবণ্টন কেমন?

বাংলা বিষয়ের মোট পূর্ণমান ৮০ নম্বর এবং সময় ৪ ঘণ্টা। এতে ৪টি বিভাগ রয়েছে: ক বিভাগ (ব্যাকরণ) ২০ নম্বর, খ বিভাগ (গদ্য) ২০ নম্বর, গ বিভাগ (পদ্য) ২০ নম্বর এবং ঘ বিভাগ (বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস) ২০ নম্বর।

২. ব্যাকরণ অংশে পূর্ণ নম্বর নিশ্চিত করার কৌশল কী?

ব্যাকরণ অংশে সমাস নির্ণয়, প্রকৃতি-প্রত্যয়, প্রমিত বানানের নিয়ম ও ভাবসম্প্রসারণের ক্ষেত্রে নিয়মমাফিক ছক তৈরি করে সঠিক উদাহরণসহ লিখলে সর্বোচ্চ বা পূর্ণ নম্বর অর্জন সম্ভব।

৩. সমাস ও সন্ধির প্রধান মৌলিক পার্থক্য কী?

সন্ধি মূলত পাশাপাশি অবস্থিত দুটি ধ্বনির পারস্পরিক মিলন, যেখানে উচ্চারণ সহজ হয়; আর সমাস হলো অর্থসম্বন্ধযুক্ত একাধিক পদের একপদীকরণ, যার মাধ্যমে বক্তব্য সংক্ষেপিত হয়।

৪. ‘আমাদের ভাষা সমস্যা’ প্রবন্ধের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় কী?

প্রবন্ধটিতে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ মাতৃভাষা হিসেবে বাংলার অপরিহার্যতা, রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার যৌক্তিক দাবি এবং শিক্ষাদানের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হিসেবে মাতৃভাষার বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব প্রমাণ করেছেন।

৫. চর্যাপদকে বাংলা ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন কেন বলা হয়?

ভাষাতাত্ত্বিক ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ও ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ চর্যাপদের ধ্বনিতত্ত্ব, রূপতত্ত্ব ও ব্যাকরণ বিশ্লেষণ করে প্রমাণ করেছেন যে এটি প্রাচীন বাংলার আদি নিদর্শন, যা বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের দ্বারা রচিত।

৬. বাংলা গদ্যের ইতিহাসে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের গুরুত্ব কী?

১৮০১ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বাংলা বিভাগ চালুর মাধ্যমে উইলিয়াম কেরি ও বাঙালি পণ্ডিতদের হাতে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ্যবই রচনা ও বাংলা গদ্যরীতি কাঠামোগত রূপ লাভ করে।