দিরাসাতুত তাফসীর ২য় পত্র (Dirasatut Tafsir 2nd Paper) – 111006, উলূমুল কুরআন – ফাযিল পাস ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪

StudyBoi StudyBoi
September 27, 2026
৭৯ মিনিট পড়ার সময়
৫ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত পরীক্ষা
ফাযিল (স্নাতক) পাস প্রথম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪
আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ : দিরাসাতুত তাফসীর (দ্বিতীয় পত্র) : দিরাসাতুত তাফসীর-২ (বিষয় কোড: ১১১০০৬)
সময়: ৩ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ১০০
[الملاحظة : أجب عن ستة من مجموعة (أ) وعن واحد من مجموعة (ب) – والاعداد بالهامش تدل على الدرجة الكاملة -]
[দ্রষ্টব্য : (أ) অংশ হতে ছয়টি এবং (ب) অংশ থেকে একটি প্রশ্নের উত্তর দাও। বাম পাশে উল্লিখিত সংখ্যা প্রশ্নের পূর্ণমান জ্ঞাপক।]

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন অনুষ্ঠিত ফাযিল স্নাতক (পাস) প্রথম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৪-এর আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের দিরাসাতুত তাফসীর ২য় পত্র (বিষয় কোড: ১১১০০৬ – দিরাসাতুত তাফসীর-২) পরীক্ষার মূল প্রশ্নপত্রের সকল প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ, প্রামাণ্য ও গবেষণাধর্মী সমাধান নিচে দেওয়া হলো। তাফসিরে জালালাইন, তাফসিরে ইবনে কাসীর ও সাফওয়াতুত তাফাসীরের আলোকে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর সুবিন্যস্তভাবে সংকলিত হয়েছে।

১। هذه براءة من الله ورسوله واصلة إلى الذين عاهدتم من المشركين عهدا مطلقا او دون اربعة اشهر او فوقها ونقضوا العهد بما يذكر في قوله – فسيحوا سيروا امنين ايها المشركون في الأرض اربعة اشهر اولها شوال بدليل ما سيأتي ولا امان لكم بعدها واعلموا انكم غير معجزي الله اي فائتي عذابه وأن الله مخزي الكافرين مذلهم في الدنيا بالقتل والاخرى بالنار –

[সূরা আত-তাওবাহ : ১-২ আয়াতের তাফসীর জালালাইনসহ অনুবাদ, বিসমিল্লাহ না থাকার হিকমত এবং চার মাসের অবকাশের তাৎপর্য]

[মান: ১৫ (অনুবাদ ৫ + ক ৫ + খ ৫)]

ভূমিকা ও পটভূমি

সূরা আত-তাওবাহ (বা সূরাতুল বারাআহ) হলো পবিত্র কুরআনের নবম সূরা যা নবম হিজরিতে তাবুক যুদ্ধের প্রাক্কালে ও পরবর্তীতে অবতীর্ণ হয়েছিল। মক্কার মুশরিকরা যখন হুদায়বিয়াসহ বিভিন্ন শান্তিচুক্তি বারবার ভঙ্গ করে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করল, তখন আল্লাহ তাআলা তাদের সাথে সমস্ত চুক্তি বাতিলের চূড়ান্ত ঐশী ঘোষণা প্রদান করেন।

মূল এবারতের প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ

এটি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে সম্পর্কচ্ছেদ ও দায়মুক্তির এক সুস্পষ্ট ঘোষণা—যা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে মুশরিকদের মধ্য থেকে যাদের সাথে তোমরা অনির্দিষ্ট মেয়াদী কিংবা চার মাসের কম বা বেশি মেয়াদের চুক্তি করেছিলে এবং যারা পরবর্তীতে চুক্তি ভঙ্গ করেছে। অতএব হে মুশরিকরা! তোমরা পৃথিবীতে চার মাস নিরাপদে ও নির্ভয়ে বিচরণ কর (যার সূচনা হয়েছিল শাওয়াল মাস থেকে—যেমনটি সামনে দলীল দ্বারা প্রমাণিত হবে); তবে জেনে রাখ, এর পর তোমাদের জন্য আর কোনো নিরাপত্তা নেই। আর তোমরা দৃঢ়ভাবে জেনে রাখ যে, তোমরা কখনোই আল্লাহকে অপারগ ও পরাভূত করতে পারবে না; অর্থাৎ তাঁর নির্ধারিত শাস্তি থেকে পালিয়ে বাঁচতে পারবে না। আর নিশ্চয় আল্লাহ কাফেরদের লাঞ্ছিতকারী—দুনিয়াতে হত্যা ও পরাজয়ের মাধ্যমে এবং পরকালে চিরন্তন জাহান্নামের অগ্নির মাধ্যমে।

(الف) সূরা আত-তাওবার শুরুতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ না থাকার ঐশী হিকমত

পবিত্র কুরআনের ১১৪টি সূরার মধ্যে কেবল সূরা আত-তাওবার শুরুতে বিসমিল্লাহ নেই। মুফাসসিরীন ও সাহাবায়ে কেরামের পক্ষ থেকে এর দুটি প্রধান হিকমত বর্ণিত হয়েছে:

  • ১. হযরত আলী (রা.)-এর ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা (শান্তি বনাম তরবারি): হযরত আলী (রা.) বলেন: ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম হলো শান্তি, নিরাপত্তা ও রহমতের প্রতীক; পক্ষান্তরে সূরা আত-তাওবাহ অবতীর্ণ হয়েছে চুক্তিভঙ্গকারী বিশ্বাসঘাতক মুশরিকদের বিরুদ্ধে তরবারি উত্তোলন, যুদ্ধ ও চূড়ান্ত সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা নিয়ে। সুতরাং তরবারি ও যুদ্ধের ঘোষণার সাথে শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতীক বিসমিল্লাহ একত্র করা হয়নি।’
  • ২. হযরত উসমান (রা.)-এর ব্যাখ্যা (সূরা আনফালের সাথে গভীর সংযোগ): হযরত উসমান (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, সূরা আনফাল ও সূরা তাওবার বিষয়বস্তু ছিল অভিন্ন (যুদ্ধ, সন্ধি ও প্রতিরক্ষা) এবং সূরা তাওবাহ অবতীর্ণ হয়েছিল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের শেষভাগে। নবীজী (সা.) ওফাতের পূর্বে এটি সূরা আনফালের অংশ নাকি স্বতন্ত্র সূরা তা স্পষ্ট করেননি; তাই সাহাবায়ে কেরাম বিসমিল্লাহ না লিখে কেবল উভয় সূরার মাঝে বিরতি রেখে মুসহাফে সংকলন করেছেন।

(খ) “فسيحوا في الأرض أربعة أشهر”-এ চার মাসের অবকাশের ব্যাখ্যা

  • কারা এই চার মাসের নিরাপত্তা পেয়েছিল? যেসব মুশরিক গোত্র কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদ ছাড়া সাধারণভাবে মুসলমানদের সাথে চুক্তিবদ্ধ ছিল, কিংবা চুক্তি ভঙ্গ করেছিল—তাদেরকে নিজেদের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য চার মাসের পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়ে চরমপত্র দেওয়া হয়েছিল।
  • চার মাসের গণনা ও সময়কাল:
    • ইমাম যুহরী ও জমহুর মুফাসসিরদের মতে এই চার মাস শুরু হয়েছিল ৯ম হিজরির ৯ই যিলহজ ঐতিহাসিক হজের দিন হযরত আলী (রা.) কর্তৃক এই ঘোষণা পাঠের পর থেকে—অর্থাৎ ১০ই যিলহজ থেকে শুরু হয়ে ১০ই রবিউস সানী পর্যন্ত পূর্ণ চার মাস।
    • তাফসিরে জালালাইনে শাওয়াল থেকে সূচনার একটি মত উল্লেখ করা হলেও ঐতিহাসিক সনদের বিচারে আরাফার দিন (যিলহজ) থেকে চার মাস গণনার মতটিই সর্বাধিক বিশুদ্ধ ও শক্তিশালী। এই চার মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পর কোনো প্রকাশ্য চুক্তিভঙ্গকারী মুশরিকের জন্য আরব উপদ্বীপে নিরাপত্তা অবশিষ্ট ছিল না।

উপসংহার

সূরা তাওবার এই ঘোষণা ইসলামি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক চুক্তির পবিত্রতা রক্ষার এক অনন্য ঐতিহাসিক রূপরেখা।

২। الر الله اعلم بمراده بذلك تلك اي هذه الايات ايت الكتب القران والاضافة بمعنى من الحكيم المحكم – اكان للناس اي اهل مكة استفهام انكار والجار والمجرور حال من قوله عجبا بالنصب خبر كان وبالرفع اسمها والخبر وهو اسمها على الاولى ان اوحينا اى ايحاؤنا الى رجل منهم محمد (ص) ان مفسرة انذر خوف الناس الكافرين بالعذاب وبشر الذين امنوا ان اى بان لهم قدم صدق عند ربهم اى اجرا حسنا بما قدموا من الاعمال قال الكافرون ان هذا القران المشتمل على ذلك لسحر مبين وفى قراءة لساحرا والمشار اليه النبى (ص) –

[সূরা ইউনুস : ১-২ আয়াতের তাফসীর জালালাইনসহ অনুবাদ, আল-মুহকামের স্বরূপ এবং শাব্দিক তাহক্বীক্ব]

[মান: ১৫ (অনুবাদ ৫ + ক ৫ + খ ৫)]

ভূমিকা ও পটভূমি

সূরা ইউনুস হলো মক্কী সূরা। মক্কার কুরাইশরা যখন বিস্ময় প্রকাশ করে বলত যে আল্লাহ কেন কোনো ফেরেশতাকে নবী না বানিয়ে আমাদের মধ্য থেকেই রক্ত-মাংসের একজন মানুষকে নবী বানালেন—তখন তাদের সেই সংকীর্ণ ধারণাকে খণ্ডন করে এই আয়াতাংশ অবতীর্ণ হয়।

মূল এবারতের প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ

‘আলিফ-লাম-রা’—আল্লাহ তাআলাই এর প্রকৃত মর্মার্থ সম্পর্কে সম্যক অবগত। ‘তিলকা আয়াতুল কিতাবিল হাকীম’—এগুলো হলো হিকমতপূর্ণ ও সুদৃঢ় মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের আয়াতসমূহ (এখানে ইযাফত হয়েছে ‘মিন’ অর্থে)। ‘আ-কানা লিন্নাসি’—মানুষের জন্য অর্থাৎ মক্কাবাসীর জন্য এটি কি এক চরম বিস্ময়ের বিষয়? (এটি ইনকারী ইস্তাফহাম বা অস্বীকৃতিসূচক প্রশ্ন); ‘আজাভান’—বিস্ময়কর বিষয় যে, ‘আন আওহাইনা ইলা রাজুলিম মিনহুম’—আমি তাদের মধ্য থেকেই একজন পুরুষের (মুহাম্মদ সা.) প্রতি ওহী অবতীর্ণ করেছি এই মর্মে যে: ‘আন আনযিরিন নাস’—আপনি কাফের মানুষদেরকে পরকালের আজাব সম্পর্কে সতর্ক করুন, ‘ওয়া বাশ্শিরিল্লাযীনা আমানূ’—এবং যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে এই সুসংবাদ দিন যে, ‘আন্না লাহুম ক্বাদামা সিদক্বিন ইন্দা রাব্বিহিম’—তাদের রবের নিকট তাদের জন্য রয়েছে সুউচ্চ স্থায়ী মর্যাদা ও উত্তম প্রতিদান—যা তারা অতীতে নেক আমল হিসেবে অগ্রে প্রেরণ করেছিল। কিন্তু কাফেররা বলল: ‘ইন্না হাযা লাসিহরুম মুবীন’—নিশ্চয়ই এই কুরআন যা এই বার্তা বহন করে তা সুস্পষ্ট জাদু! (অপর কেরাতে ‘লা-সাহিরুন মুবীন’—যার দ্বারা নবীজীকে সুস্পষ্ট জাদুকর বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে)।

(الف) ‘আল-মুহকাম’ (المحكم)-এর বিশদ তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

পবিত্র কুরআনে ‘কিতাবিল হাকীম’ শব্দে কুরআনকে ‘মুহকাম’ বলে বিশেষায়িত করা হয়েছে। উলূমুল কুরআনের পরিভাষায় আল-মুহকামের তিনটি মৌলিক অর্থ রয়েছে:

  • ১. ত্রুটি ও অসঙ্গতিহীন সুদৃঢ় বাণী (احكام الصنعة): কুরআন এমন এক নিখুঁত কিতাব যার বাক্যবিন্যাস, শব্দচয়ন, অর্থ ও অন্তর্নিহিত প্রজ্ঞায় কোনো প্রকার দুর্বলতা, স্ববিরোধিতা বা অসংলগ্নতা নেই। এটি সৃষ্টির যাবতীয় বিকৃতি ও বাতিলের সংমিশ্রণ থেকে সুরক্ষিত।
  • ২. দ্ব্যর্থহীন ও সুস্পষ্ট অর্থবোধক বিধান: যে আয়াতের অর্থ সূর্যের মতো স্পষ্ট, যাতে কোনো জটিল রূপক বা ব্যাখ্যার আবিলতা নেই এবং যা থেকে সরাসরি শরিয়তের হালাল-হারাম সাব্যস্ত হয়।
  • ৩. নাসিখ বা অপরিবর্তনীয় চিরন্তন অনুশাসন: যে বিধান কখনো বাতিল বা রহিত হয় না—যেমন তাওহীদ, ইনসাফ ও সততার চিরন্তন আদেশ।

(খ) শাব্দিক তাহক্বীক্ব (تحقيق الكلمات)

শব্দ রূপমূল ও ব্যাকরণ আভিধানিক অর্থ তাফসীরি তাৎপর্য
آمَنُوا أ – م – ن (ফে’লে মাযী, জমা মুযাক্কার গায়েব) তারা ঈমান এনেছে বা বিশ্বাস স্থাপন করেছে বাবুল ইফ’আল থেকে গঠিত; যারা অন্তরে তাসদীক ও মুখে ইকরার করেছে।
كَافِرُونَ ك – ف – ر (ইসমুল ফা’য়েল, জমা মুযাক্কার) সত্যকে অস্বীকারকারী বা ঢেকে ফেলার দল মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুওয়াত ও কালামুল্লাহকে যারা হঠকারিতাবশত প্রত্যাখ্যান করেছে।

উপসংহার

মানুষের মধ্য থেকেই নবী প্রেরণ আল্লাহর এক মহা অনুগ্রহ। যারা অহংকারবশত এই অনুগ্রহকে প্রত্যাখ্যান করে, তারা মূলত নিজেদের চিরন্তন ধ্বংসই ডেকে আনে।

৩। افمن كان على بينة بيان من ربه وهو النبى صلى الله عليه وسلم او المؤمنين وهى القران ويتلوه شاهد له بصدقه منه اى من الله وهو جبريل ومن قبله اى القران كتاب موسى التوراة شاهد له ايضا اماما ورحمة حال كمن ليس كذلك اى من كان على بينة يؤمنون به اى القران فلهم الجنة ومن يكفر به من الاحزاب جميع الكفار فالنار موعده فلا تك فى مرية شك منه من القران انه الحق من ربك ولكن اكثر الناس اى اهل مكة لا يؤمنون –

[সূরা হূদ : ১৭ আয়াতের তাফসীর জালালাইনসহ অনুবাদ, শানে নুযূল এবং “ইমামান ওয়া রাহমাহ”-এর তাৎপর্য]

[মান: ১৫ (অনুবাদ ৫ + ক ৫ + খ ৫)]

ভূমিকা ও পটভূমি

সূরা হূদের এই আয়াতে সত্যের অনুসারী মুমিনদের সুস্পষ্ট প্রামাণ্য ভিত্তি এবং অন্ধ কুসংস্কারে নিমজ্জিত কাফেরদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থার এক অনুপম তুলনা তুলে ধরা হয়েছে। পূর্ববর্তী আসমানী কিতাব তাওরাত এবং জীবন্ত কুরআন কীভাবে পরস্পরের সত্যতার সাক্ষ্য দেয়—তা এখানে ব্যক্ত হয়েছে।

মূল এবারতের প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ

যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছে (আর তিনি হলেন নবী সা. অথবা মুমিনগণ, আর প্রমাণ হলো কুরআন); এবং যার সত্যতার সপক্ষে তাঁরই পক্ষ থেকে অর্থাৎ আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন সাক্ষী (হযরত জিবরাঈল আ.) এর অনুসরণ করে তেলাওয়াত করে; এবং যার পূর্বে অবতীর্ণ মূসার কিতাব তাওরাতও যার সত্যতার সাক্ষ্য প্রদান করেছে পথপ্রদর্শক ও অনুগ্রহস্বরূপ—সে কি সেই ব্যক্তির মতো হতে পারে যে এমন প্রমাণের ওপর নেই? যারা এই সুস্পষ্ট প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত তারা এই কুরআনের ওপর পূর্ণ ঈমান আনয়ন করে, অতএব তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। আর কুরাইশ ও বিভিন্ন দলের মধ্য থেকে যারা একে অস্বীকার করে, জাহান্নামের আগুনই হলো তাদের নির্ধারিত ঠিকানা। অতএব আপনি এই কুরআনের ব্যাপারে কোনো প্রকার সন্দেহে পতিত হবেন না; নিশ্চয়ই এটি আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ পরম সত্য, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ অর্থাৎ মক্কাবাসী এর ওপর ঈমান আনে না।

(الف) আলোচ্য আয়াতাংশের শানে নুযূল

মুফাসসিরীন কেরাম বর্ণনা করেন যে, মক্কার মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নবুওয়াত নিয়ে কটাক্ষ করে বলত যে, মুহাম্মদ নিজের মনগড়া কথা বানিয়ে আমাদের কাছে বলে। অন্যদিকে মদিনার কিছু সত্যনিষ্ঠ ইহুদি ও আরবের বিবেকবান মানুষ কুরআন শুনে বলত যে, আমাদের পূর্ববর্তী তাওরাতের ভবিষ্যৎবাণীর সাথে মুহাম্মদের প্রতিটি কথার হুবহু মিল রয়েছে। তখন আল্লাহ তাআলা কাফেরদের অভিযোগ খণ্ডন করে এবং মুমিনদের অন্তরে অবিচল প্রত্যয় সৃষ্টির লক্ষ্যে এই আয়াত অবতীর্ণ করেন যে—যে ব্যক্তি স্বয়ং আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ অকাট্য প্রমাণের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সে কখনোই সত্যচ্যুত হতে পারে না।

(খ) “إماما ورحمة” (ইমামান ওয়া রাহমাহ)-এর বিশদ তাৎপর্য

  • ‘ইমাম’ (إماما)-এর অর্থ: পথপ্রদর্শক, আদর্শ নেতা ও অনুসরণীয় মাপকাঠি। হযরত মূসা (আ.)-এর কিতাব তাওরাত ছিল বনি ইসরাঈলের জন্য ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে সত্যের দিকনির্দেশক।
  • ‘রাহমাহ’ (رحمة)-এর অর্থ: আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও বরকত। তাওরাতের বিধান অনুসরণের মাধ্যমে মানুষ পথভ্রষ্টতা থেকে রক্ষা পেত এবং আত্মিক মুক্তি লাভ করত।
  • কুরআনের সাথে তাওরাতের যোগসূত্র: আল্লাহ তাআলা বুঝিয়েছেন যে তাওরাত যেমন তৎকালীন যুগে মানুষের জন্য হেদায়েতের ‘ইমাম’ ও ‘রহমত’ ছিল, পবিত্র কুরআনও তেমনি কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র বিশ্বমানবতার জন্য চূড়ান্ত ইমাম ও সর্বশ্রেষ্ঠ রহমত। উভয় কিতাবের মূল উৎস এক ও অভিন্ন।

উপসংহার

সুস্পষ্ট ঐশী প্রমাণের সামনে মানুষের যুক্তি ও অন্ধ বিদ্বেষ পরাভূত হতে বাধ্য। কুরআন ও পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের এই ঐশী সাক্ষ্যই ইসলামের অকাট্য সত্যতা প্রমাণ করে।

৪। المر الله اعلم بمراده بذلك تلك هذه الايات ايات الكتب القران والاضافة بمعنى “من” – والذى انزل اليك من ربك اى القران مبتدأ خبره الحق لا شك فيه ولكن اكثر الناس اى اهل مكة لا يؤمنون بانه من عنده تعالى –

[সূরা আর-রা’দ : ১ আয়াতের তাফসীর জালালাইনসহ অনুবাদ, ‘আনযালাই’ বনাম ‘নায্‌যালা’-এর ভাষাতাত্ত্বিক পার্থক্য এবং তাহক্বীক্ব]

[মান: ১৫ (অনুবাদ ৫ + ক ৫ + খ ৫)]

ভূমিকা ও পটভূমি

সূরা আর-রা’দ মক্কী ও মাদানীর সমন্বয়ে অবতীর্ণ এক গভীর তাত্বিক সূরা। সূরার প্রথম আয়াতেই কালামুল্লাহর সত্যতা এবং প্রকৃতির বিশাল সৃষ্টির মাঝে আল্লাহর তাওহীদের অকাট্য নিদর্শনাবলী নির্দেশ করা হয়েছে।

মূল এবারতের প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ

‘আলিফ-লাম-মীম-রা’—আল্লাহ তাআলাই এর প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত। ‘তিলকা আয়াতুল কিতাব’—এগুলো হলো সেই আসমানী কিতাব আল-কুরআনের আয়াতসমূহ (এখানে ইযাফত হয়েছে ‘মিন’ অর্থে)। ‘ওয়াল্লাযী উনযিলা ইলাইকা মির রাব্বিকা’—আর যা কিছু আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আপনার ওপর অবতীর্ণ করা হয়েছে (এটি মুবতাদা); যার খবর হলো: ‘আল-হাক্ব’—তা পরম সত্য, যাতে কোনো প্রকার সন্দেহ-সংশয়ের অবকাশ নেই; ‘ওয়া লাকিন্না আকছারান নাসি লা ইউ’মিনূন’—কিন্তু অধিকাংশ মানুষ অর্থাৎ মক্কার মুশরিকরা বিশ্বাস করে না যে এটি নিশ্চিতভাবেই মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।

(الف) আরবি ভাষায় “أنزل” (ইনযাল) এবং “نزل” (তানযীল)-এর মধ্যে সূক্ষ্ম ভাষাতাত্ত্বিক ও শারঈ পার্থক্য

পার্থক্যমূলক দিক أنزل (ইনযাল – বাবুল ইফ’আল) نزّل (তানযীল – বাবাবু তায়ীল)
১. নাযিলের ধরন কোনো বস্তুকে একত্রে বা এককালীন সম্পূর্ণ অবতীর্ণ করা। কোনো বস্তুকে ধাপে ধাপে, কিস্তিতে কিস্তিতে ও পর্যায়ক্রমে অবতীর্ণ করা।
২. কুরআনের ক্ষেত্রে প্রয়োগ লাওহে মাহফুজ থেকে শবে কদরে প্রথম আসমানের ‘বায়তুল ইযযাহ’-তে সম্পূর্ণ কুরআন একত্রে অবতীর্ণ হওয়া (إنا أنزلناه في ليلة القدر)। বায়তুল ইযযাহ থেকে জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে দীর্ঘ তেইশ বছর ধরে পার্থিব প্রয়োজনে কিস্তিতে কিস্তিতে অবতীর্ণ হওয়া (وقرآنا فرقناه لتقرأه على الناس على مكث ونزلناه تنزيلا)।
৩. অন্যান্য আসমানী কিতাব তাওরাত, ইঞ্জিল ও যাবূর সম্পূর্ণ কিতাব একত্রে অবতীর্ণ হয়েছিল বিধায় সেখানে সাধারণত ‘ইনযাল’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। কুরআনের বাস্তবমুখী ক্রমবিকাশ ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ‘তানযীল’ শব্দের ব্যবহার সর্বাধিক তাৎপর্যপূর্ণ।

(খ) শাব্দিক তাহক্বীক্ব (تحقيق الكلمات)

  • آيَاتٌ (আয়াত): রূপমূল: أ – ي – ي / أ – و – ي; একবচনে ‘আয়াহ’ (آية), বহুবচনে ‘আয়াত’। অর্থ: নিদর্শন, অলৌকিক চিহ্ন বা কুরআনের বাক্যবিন্যাস। ব্যাকরণগতভাবে এটি খবরের মুদাফ।
  • لَا يُؤْمِنُونَ (লা ইউ’মিনূন): রূপমূল: أ – م – ن; বাবুল ইফ’আল থেকে ফে’লে মুদারে নাফী (নেতিবাচক বর্তমান/ভবিষ্যৎকাল), সীগাহ জমা মুযাক্কার গায়েব। অর্থ: তারা ঈমান আনে না বা বিশ্বাস স্থাপন করে না।

উপসংহার

কুরআনের প্রতিটি হরফ ও শব্দচয়ন পরম নির্ভুল ঐশী হিকমতের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ওহীর এই দুই স্তরের নাযিল কুরআনের চিরন্তন মাহাত্ম্যকেই প্রমাণ করে।

৫। نحن نقص عليك احسن القصص بما اوحينا بايحائنا اليك هذا القران وان مخففة اي وانه كنت من قبله لمن الغافلين واذكر اذ قال يوسف لابيه يعقوب يا ابت بالكسر دلالة على الف محذوفة قلبت عن الياء اني رايت في المنام احد عشر كوكبا والشمس والقمر رايتهم تاكيد لي ساجدين جمع بالياء والنون للوصف بالسجود الذي هو من صفات العقلاء –

[সূরা ইউসুফ : ৩-৪ আয়াতের তাফসীর জালালাইনসহ অনুবাদ, ‘আহসানুল কাসাস’-এর রহস্য এবং ইউসুফ (আ.)-এর স্বপ্নের ব্যাখ্যা]

[মান: ১৫ (অনুবাদ ৫ + ক ৫ + খ ৫)]

ভূমিকা ও পটভূমি

সূরা ইউসুফ হলো পবিত্র কুরআনের দ্বাদশ সূরা যা সম্পূর্ণ একটি ঐতিহাসিক কাহিনীর ওপর নিবদ্ধ। আল্লাহ তাআলা স্বয়ং এই সূরার ঘটনাকে ‘আহসানুল কাসাস’ বা সর্বশ্রেষ্ঠ কাহিনী হিসেবে অভিহিত করেছেন। পিতা-পুত্রের বিচ্ছেদ, ঈর্ষা, ষড়যন্ত্র, সতীত্বের পরীক্ষা এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষমার মাধ্যমে চূড়ান্ত বিজয়ের এক অনন্য মহাকাব্য এই সূরা।

মূল এবারতের প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ

আমি আপনার নিকট সর্বশ্রেষ্ঠ কাহিনী বর্ণনা করছি—যেহেতু আমি আপনার প্রতি ওহীর মাধ্যমে এই কুরআন অবতীর্ণ করেছি; যদিও এর পূর্বে আপনি এই কাহিনী সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে অনবহিতদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। আর স্মরণ করুন সেই সময়ের কথা যখন ইউসুফ তাঁর পিতা ইয়াকুবকে বললেন: হে আমার সম্মানিত পিতা! নিশ্চয়ই আমি স্বপ্নে এগারোটি নক্ষত্র এবং সূর্য ও চাঁদকে দেখেছি; আমি তাদেরকে আমার উদ্দেশ্যে সেজদারত অবস্থায় প্রত্যক্ষ করেছি। (এখানে ‘রাইতুহুম’ শব্দটি তাকীদ হিসেবে আনা হয়েছে এবং ‘সাজিদীন’ শব্দে ইয়া ও নুন যোগে বহুবচন করা হয়েছে—যেহেতু সেজদা করা বিবেকবান সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য)।

(الف) “أحد عشر كوكبا والشمس والقمر”-এর রূপক ও বাস্তব তাৎপর্য

  • স্বপ্নের রূপক ব্যাখ্যা: হযরত ইউসুফ (আ.) বাল্যকালে যে অলৌকিক স্বপ্ন দেখেছিলেন, তার প্রতিটি অনুষঙ্গ ছিল এক একটি বাস্তব ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের প্রতীক:
    • এগারোটি নক্ষত্র (أحد عشر كوكبا): ইউসুফ (আ.)-এর অপর এগারোজন সহোদর ও বৈমাত্রেয় ভাই।
    • সূর্য (الشمس): তাঁর পরম শ্রদ্ধেয় পিতা আল্লাহর নবী হযরত ইয়াকুব (আ.)।
    • চাঁদ (القمر): তাঁর স্নেহময়ী মাতা (বা বিমাতা খালা লায়াহ)।
  • স্বপ্নের বাস্তব রূপায়ণ: দীর্ঘ চল্লিশ বছর পর বহু পরীক্ষা ও কারাবাস পেরিয়ে হযরত ইউসুফ (আ.) যখন মিসরের পরাক্রমশালী অর্থমন্ত্রী (আযীযে মিসর) হলেন এবং তাঁর পিতা-মাতা ও ভাইয়েরা মিসরে আগমন করলেন, তখন তাঁরা সকলেই রাজদরবারে ইউসুফ (আ.)-এর সম্মানে তাজিমী সেজদায় লুটিয়ে পড়েছিলেন। তখন ইউসুফ (আ.) বলেছিলেন: ‘হে আমার পিতা! এটিই হলো আমার সেই বাল্যকালের স্বপ্নের চূড়ান্ত বাস্তব রূপায়ন, যা আমার প্রতিপালক সত্যে পরিণত করেছেন।’ (সূরা ইউসুফ: ১০০)।

(খ) “نحن نقص عليك أحسن القصص”-এর বিশদ তাফসীর ও নামকরণের হিকমত

কুরআনে বহু নবীর কাহিনী থাকা সত্ত্বেও ইউসুফ (আ.)-এর কাহিনীকে ‘আহসানুল কাসাস’ (সর্বশ্রেষ্ঠ উপাখ্যান) বলার কারণসমূহ নিম্নরূপ:

  • ১. মানবজীবনের সমস্ত বৈচিত্র্যের সমাবেশ: এই একটি মাত্র সূরায় বাদশাহ ও প্রজা, পিতা ও পুত্র, দাসত্ব ও রাজত্ব, ঈর্ষা ও ভ্রাতৃত্ব, সতীত্ব ও ব্যভিচারের প্ররোচনা, কারাগার ও রাজপ্রাসাদ, দুর্ভিক্ষ ও প্রাচুর্য—মানবজীবনের যাবতীয় পরিস্থিতির এক অপূর্ব সমাবেশ ঘটেছে।
  • ২. ক্ষমা ও মহত্ত্বের চরম পরাকাষ্ঠা: যে ভাইয়েরা তাঁকে কূপে ফেলে হত্যা করতে চেয়েছিল, ক্ষমতার চূড়ায় বসে ইউসুফ (আ.) তাদের বিন্দুমাত্র প্রতিশোধ না নিয়ে বলেছিলেন: ‘লা তাসরীবা আলাইকুমুল ইয়াওম, ইয়াগফিরুল্লাহু লাকুম’ (আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন)। বিশ্বনবী (সা.)-ও মক্কা বিজয়ের দিন নিজের রক্তপিপাসু কুরাইশদের এই বাণী শুনিয়েই সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন।
  • ৩. দুঃখের পর নিশ্চিত বিজয়ের শিক্ষা: চরম হতাশার মধ্যেও আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়ার যে অনুপম সবক এই সূরায় দেওয়া হয়েছে, তা অন্য কোথাও বিরল।

উপসংহার

সূরা ইউসুফের কাহিনী কেবল কোনো অতীত রূপকথা নয়, বরং এটি জীবনের চরম সংকটে ধৈর্য ধারণকারী প্রতিটি মুমিনের বিজয়ের চিরন্তন ঐশী গ্যারান্টি।

৬। الر الله اعلم بمراده بذلك – هذا القران كتاب انزلناه اليك يا محمد لتخرج الناس من الظلمات الكفر الى النور الإيمان بإذن بامر ربهم ويبدل من الى النور الى صراط طريق العزيز الغالب الحميد المحمود –

[সূরা ইব্রাহীম : ১ আয়াতের তাফসীর জালালাইনসহ অনুবাদ, শানে নুযূল এবং শাব্দিক তাহক্বীক্ব]

[মান: ১৫ (অনুবাদ ৫ + ক ৫ + খ ৫)]

ভূমিকা ও পটভূমি

সূরা ইব্রাহীম মক্কী সূরা। অন্ধকার থেকে আলোর পথে মানবজাতিকে পরিচালিত করাই আসমানী কিতাব ও নবীদের মূল দায়িত্ব। মানবজাতির আত্মিক মুক্তি ও হেদায়েতের এই মহাজাগতিক রূপরেখা সূরার প্রারম্ভিক আয়াতেই সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত হয়েছে।

মূল এবারতের প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ

‘আলিফ-লাম-রা’—আল্লাহ তাআলাই এর প্রকৃত মর্মার্থ সম্পর্কে সম্যক অবগত। ‘কিতাবুন আনযালনাহু ইলাইকা’—এটি একটি মহাগ্রন্থ যা আমি আপনার প্রতি অবতীর্ণ করেছি হে মুহাম্মদ! ‘লিতুখরিজান নাসা মিনায যুলুমাতি ইলান নূর’—যাতে আপনি সমগ্র মানবজাতিকে কুফরের গভীর অন্ধকার থেকে ঈমানের শুভ্র আলোর দিকে বের করে নিয়ে আসতে পারেন; ‘বিইযনি রাব্বিহিম’—তাদের প্রতিপালকের হুকুম ও অনুমতিক্রমে; (আর ‘নূর’-এর বাদল বা বিকল্প হিসেবে এসেছে—) ‘ইলা সিরাতিল আযীযিল হামীদ’—সেই পরাক্রমশালী ও যাবতীয় প্রশংসার যোগ্য একক সত্তা আল্লাহর সরল-সঠিক পথের দিকে।

(الف) সূরা ইব্রাহীমের এই প্রারম্ভিক আয়াতের শানে নুযূল ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

  • জাহেলী যুগের ঘোর অন্ধকার: নবুওয়াতের প্রাক্কালে সমগ্র পৃথিবী কুফর, শিরক, শোষণ, বর্ণবাদ, কন্যাশিশু জীবন্ত কবর দেওয়া এবং নৈতিক চরম অবক্ষয়ের এক ঘোর অমানিশায় নিমজ্জিত ছিল। মানবতা ছিল আত্মপরিচয়হীন ও দিশেহারা।
  • নাযিলের উদ্দেশ্য: মক্কার কাফেররা যখন কুরআনের অলৌকিক বাণী শুনেও ঈমান না এনে উল্টো অপপ্রচার চালাচ্ছিল, তখন আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে সান্ত্বনা দিয়ে এবং মানবজাতিকে সতর্ক করে এই আয়াত নাজিল করেন। আল্লাহ স্মরণ করিয়ে দেন যে এই কিতাব কোনো সাধারণ কাব্য বা সাহিত্য নয়; বরং এটি হলো মানবজাতির আত্মিক মুক্তির সনদ—যা মানুষকে জাহেলিয়াতের বহুবিধ অন্ধকার থেকে মুক্ত করে তাওহীদের এক আলোকময় রাজপথে তুলে আনার জন্য অবতীর্ণ হয়েছে।

(খ) শাব্দিক তাহক্বীক্ব (تحقيق الكلمات)

শব্দ রূপমূল ও ব্যাকরণ আভিধানিক অর্থ তাফসীরি তাৎপর্য
لِتُخْرِجَ خ – ر – ج (মুদারে মা’রূফ) যাতে আপনি বের করে আনেন লামে কায় (উদ্দেশ্যমূলক লাম) যোগে মাজযুম/মানসুব; নবুওয়াতের মূল মিশন ব্যক্ত হয়েছে।
الظُّلُمَاتِ ظ – ل – م (জামা মুয়ান্নাস সালেম) অন্ধকারসমূহ বহুবচনে আনা হয়েছে—যেহেতু কুফর, শিরক ও গোমরাহীর শাখা-প্রশাখা বহুবিধ ও অন্ধকারাচ্ছন্ন।

উপসংহার

কুরআনের শিক্ষা হলো এক চিরন্তন সূর্য। এই সূর্যের আলো যার অন্তরে প্রবেশ করে, তার জীবনের যাবতীয় দ্বিধা ও পাপের অন্ধকার চিরতরে দূরীভূত হয়ে যায়।

৭। الر الله اعلم بمراده بذلك تلك هذه الايات ايات الكتاب القران والاضافة بمعنى من وقران مبين مظهر للحق من الباطل عطف بزيادة صفة ربما بالتشديد والتخفيف يود يتمنى الذين كفروا يوم القيامة اذا عاينوا حالهم وحال المسلمين لو كانوا مسلمين ورب للتكثير فانه يكثر منهم تمنى ذلك وقيل للتقليل فان الاهوال تدهشهم فلا يفيقون حتى يتمنوا ذلك الا فى احيان قليلة –

[সূরা আল-হিজর : ১-২ আয়াতের তাফসীর জালালাইনসহ অনুবাদ, হরফে মুক্বাত্তায়াতের ব্যাখ্যা এবং কাফেরদের পরকালীন অনুশোচনা]

[মান: ১৫ (অনুবাদ ৫ + ক ৫ + খ ৫)]

ভূমিকা ও পটভূমি

সূরা আল-হিজর হলো মক্কী সূরা। সূরার সূচনায় কুরআনের মাহাত্ম্য তুলে ধরার পর কিয়ামতের ময়দানে কাফেরদের চরম অনুশোচনা ও তাদের মুসলিম হওয়ার ব্যর্থ আকাঙ্ক্ষার এক হৃদয়বিদারক চিত্র আঁকা হয়েছে।

মূল এবারতের প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ

‘আলিফ-লাম-রা’—আল্লাহ তাআলাই এর প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত। ‘তিলকা আয়াতুল কিতাব’—এগুলো হলো আসমানী কিতাবের আয়াতসমূহ; ‘ওয়া কুরআনিম মুবীন’—এবং এমন এক সুস্পষ্ট কুরআনের আয়াত যা সত্যকে মিথ্যা থেকে সুস্পষ্টভাবে পৃথক করে দেয়। ‘রুবামা ইয়ავাদ্দুল্লাযীনা কাফারূ’—কিয়ামতের দিন কাফেররা বারবার আকুল আকাঙ্ক্ষা করবে (যখন তারা নিজেদের করুণ পরিণতি এবং মুমিনদের পরম সৌভাগ্য প্রত্যক্ষ করবে): ‘লাও কানূ মুসলিমীন’—হায়! তারা যদি দুনিয়াতে মুসলমান হতো! এখানে ‘রুব্বা’ শব্দটি আধিক্য (তাকসীর) বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে; অর্থাৎ তারা এই আকাঙ্ক্ষা বারবার বহুবার করবে। আবার কোনো কোনো আলেমের মতে এটি স্বল্পতা (তাকলীল) বোঝাতে এসেছে—যেহেতু হাশরের মাঠের ভয়াবহ ত্রাস ও আতঙ্কে তাদের জ্ঞান এতটুকু লোপ পাবে যে তারা খুব বিরল মুহূর্তেই এমন হুঁশ ফিরে পেয়ে এই আকাঙ্ক্ষা করার অবকাশ পাবে।

(الف) ‘আলিফ-লাম-রা’ (الر)-এর বিশদ শাস্ত্রীয় তাৎপর্য

  • হরফে মুক্বাত্তায়াত (الحروف المقطعة): এগুলো হলো পবিত্র কুরআনের ২৯টি সূরার শুরুতে ব্যবহৃত বিচ্ছিন্ন হরফসমূহ। এর প্রকৃত নিশ্চিত অর্থ আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না বিধায় জালালাইনকারক লিখেছেন: ‘আল্লাহু আ’লামু বিমুরাদিহী বিযালিক’।
  • কুরআনের অলৌকিকত্বের চ্যালেঞ্জ: আরবরা ছিল ভাষার জাদুকর। আল্লাহ এই পরিচিত আরবি হরফগুলো দিয়ে সূরা শুরু করে কাফেরদের জানিয়ে দিয়েছেন—এই কুরআন তোমাদেরই পরিচিত আলিফ, লাম, রা হরফ দিয়ে গঠিত; পারলে তোমরাও এই হরফ দিয়ে এর একটি সূরার মতো কিছু বানিয়ে দেখাও! তারা চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে প্রমাণ করেছে যে কুরআন মানুষের রচনা নয়, বরং এটি আল্লাহর মু’জিযাপূর্ণ ঐশী কালাম।

(খ) শাব্দিক তাহক্বীক্ব (تحقيق الكلمات)

  • مُبِينٌ (মুবীন): রূপমূল: ب – ي – ن; বাবুল ইফ’আল থেকে ইসমুল ফায়েল। অর্থ: সুস্পষ্টকারী, যা সত্য ও মিথ্যার মধ্যবর্তী সীমারেখাকে পরিষ্কারভাবে উন্মোচিত করে দেয়।
  • يَوَدُّ (ইয়াওয়াদ্দু): রূপমূল: و – د – د; বাবে সামি’আ থেকে ফে’লে মুদারে মা’রূফ, ওয়াহেদ মুযাক্কার গায়েব। অর্থ: তীব্র আকাঙ্ক্ষা করা, প্রবলভাবে কামনা করা বা ভালোবাসা। কাফেররা কিয়ামতে মুসলিম হওয়ার তীব্র বাসনা করবে।

উপসংহার

পরকালের অনুশোচনা কোনো কাজে আসবে না। সময় থাকতে দুনিয়াতেই ইসলাম গ্রহণ করে মুসলিম হওয়াই বুদ্ধিমানের একমাত্র পথ।

৮। سبحان اي تنويه الذى اسرى بعبده محمد ليلا نصب على الظرف والإسراء سير الليل وفائدة ذكره لاشارة بتنكيره الى تقليل مدته من المسجد الحرام اي مكة الى المسجد الأقصى بيت المقدس لبعده منه الذي باركنا حوله بالثمار والانهار لنريه من اياتنا عجائب قدرتنا انه هو السميع البصير –

[সূরা আল-ইসরা : ১ আয়াতের তাফসীর জালালাইনসহ অনুবাদ, মসজিদুল আকসার নির্মাণ ইতিহাস এবং ঐতিহাসিক ইসরা ও মিরাজের পটভূমি]

[মান: ১৫ (অনুবাদ ৫ + ক ৫ + খ ৫)]

ভূমিকা ও পটভূমি

পবিত্র কুরআনের সপ্তদশ সূরা হলো ‘সূরা আল-ইসরা’ (বা বনি ইসরাঈল)। নবুওয়াতের দশম বা একাদশ বর্ষে যখন রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বীয় প্রাণপ্রিয় স্ত্রী খাদিজা (রা.) এবং আশ্রয়দাতা চাচা আবু তালিবকে হারিয়ে চরম শোকের মুখোমুখি হয়েছিলেন এবং তায়েফের ময়দানে রক্তাক্ত হয়েছিলেন, তখন আল্লাহ তাআলা স্বীয় হাবীবকে সান্ত্বনা ও রাজকীয় সম্মান দান করতে ঐতিহাসিক ‘ইসরা ও মিরাজ’-এর অনন্য মু’জিযা সংঘটিত করেছিলেন।

মূল এবারতের প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ

‘সুবহানাল্লাযী’—পরম পবিত্র ও মহিমান্বিত সেই সত্তা; ‘আসরা বিআবদিহী’—যিনি স্বীয় বান্দা মুহাম্মদ (সা.)-কে এক রাতে ভ্রমণ করিয়েছিলেন; ‘লায়লান’—রাত্রির অতি স্বল্প সময়ে (এখানে ‘লায়লান’ অনির্দিষ্ট এনে বোঝানো হয়েছে যে সম্পূর্ণ রাত নয়, বরং রাতের এক সামান্য অংশে এই সুদীর্ঘ ভ্রমণ সম্পন্ন হয়েছিল); ‘মিনাল মাসজিদিল হারাম’—মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে; ‘ইলাল মাসজিদিল আক্বসা’—সুদূর ফিলিস্তিনের বায়তুল মুকাদ্দাসের মসজিদুল আকসা পর্যন্ত; ‘আল্লাযী বারাকনা হাওলাহূ’—যার চারপাশকে আমি ফলমূল, নদ-নদী এবং নবীগণের সমাধিস্থল দ্বারা বরকতময় করেছি; ‘লিনুরিয়াহূ মিন আয়াতিনা’—যাতে আমি তাঁকে আমার কুদরতের আশ্চর্যজনক নিদর্শনসমূহ প্রত্যক্ষ করাতে পারি। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।

(الف) মসজিদুল আকসার নির্মাণ ইতিহাস (সংক্ষিপ্ত বিবরণ)

  • পৃথিবীর দ্বিতীয় মসজিদ: সহীহ বুখারীতে হযরত আবু যর গিফারী (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, পৃথিবীতে সর্বপ্রথম কোন মসজিদ নির্মিত হয়েছিল? তিনি বললেন: ‘মসজিদুল হারাম’। আমি বললাম, এরপর কোনটি? তিনি বললেন: ‘মসজিদুল আকসা’। আমি জিজ্ঞেস করলাম, উভয়ের মাঝে কত বছরের ব্যবধান ছিল? তিনি বললেন: ‘চল্লিশ বছর।’
  • পুনর্নির্মাণ: হযরত আদম (আ.) কর্তৃক কাবা গৃহ নির্মাণের ৪০ বছর পর মসজিদুল আকসার ভিত্তি স্থাপিত হয়। পরবর্তীতে হযরত ইব্রাহীম, ইয়াকুব এবং দাউদ (আ.)-এর ধারাবাহিকতায় হযরত সুলাইমান (আ.) জিনদের দ্বারা এই মসজিদের সুবিশাল রাজকীয় পুনঃসংস্কার সম্পন্ন করেন।

(খ) ঐতিহাসিক ইসরা ও মিরাজের সংক্ষিপ্ত ঘটনাবলী

  • রজনীর সূচনা ও বক্ষবিদারণ: উম্মে হানী (রা.)-এর ঘরে বা হাতিমে কাবায় নবীজী বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। জিবরাঈল (আ.) এসে তাঁর বক্ষ মোবারক বিদীর্ণ করে জমজমের পানিতে ধুয়ে হিকমত ও ঈমান দ্বারা পূর্ণ করে দেন।
  • বুরাকে আরোহণ ও বায়তুল মুকাদ্দাসে সালাত: বিদ্যুৎগতির ঐশী বাহন ‘বুরাক’-এ চড়ে মুহূর্তের মধ্যে বায়তুল মুকাদ্দাসে পৌঁছান। সেখানে আদম (আ.) থেকে ঈসা (আ.) পর্যন্ত সমস্ত আম্বিয়ায়ে কেরাম একত্রিত ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইমাম হয়ে দুই রাকাত সালাতে তাঁদের ইমামতি করেন এবং ‘ইমামুল আম্বিয়া’র মর্যাদা লাভ করেন।
  • সপ্তাকাশ ভ্রমণ ও আল্লাহর সান্নিধ্য: সেখান থেকে মিরাজের সিঁড়ি বেয়ে সপ্তাকাশে গমন করেন। প্রতিটি আসমানে শীর্ষ নবীদের সাথে সাক্ষাৎ শেষে সিদরাতুল মুনতাহা পার হয়ে আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছান। সেখানে উম্মতের জন্য উপহারস্বরূপ পাঁচ ওয়াক্ত সালাত নির্ধারিত হয় এবং জান্নাত ও জাহান্নামের দৃশ্য নবীজী নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করেন।

উপসংহার

ইসরা ও মিরাজ হলো রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নবুওয়াতের শ্রেষ্ঠ চাক্ষুষ মু’জিযা—যা স্থান ও কালের সমস্ত জাগতিক নিয়মকে চূর্ণ করে আল্লাহর অনন্ত কুদরতের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছে।

৯। اتى امر الله اى الساعة بصيغة الماضى لتحقق وقوعه اى قرب فلا تستعجلوه تطلبوه قبل حينه فانه واقع لا محالة سبحانه تنزيها له وتعالى عما يشركون به غيره – ينزل الملائكة اى جبريل بالروح بالوحى من امره بارادته على من يشاء من عباده وهم الانبياء – ان مفسرة انذروا خوفوا الكافرين بالعذاب واعلموهم انه لا اله الا انا فاتقون خافون –

[সূরা আন-নাহল : ১-২ আয়াতের তাফসীর জালালাইনসহ অনুবাদ, শানে নুযূল এবং কিয়ামতের প্রামাণ্য আলামতসমূহ]

[মান: ১৫ (অনুবাদ ৫ + ক ৫ + খ ৫)]

ভূমিকা ও পটভূমি

সূরা আন-নাহল হলো পবিত্র কুরআনের ষোড়শ সূরা। একে ‘সূরাতুন নিআম’ বা নেয়ামতের সূরাও বলা হয়। সূরার প্রথম আয়াতেই কিয়ামতের অনিবার্য আগমন এবং কাফেরদের উপহাসের দাঁতভাঙা জবাব দিয়ে আল্লাহ তাআলা সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন।

মূল এবারতের প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ

‘আতা আমরুল্লাহ’—আল্লাহর নির্দেশ অর্থাৎ কিয়ামত সমাগত হয়েছে (এখানে অতীতকালের শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে কিয়ামতের নিশ্চিত وقوع ও নিকটবর্তী হওয়া বোঝাতে); ‘ফালা তাস্তা’জিলূহ’—অতএব তোমরা এর জন্য তাড়াহুড়ো করো না বা নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বে তা দাবি করো না, কেননা তা নিশ্চিতভাবেই ঘটবে। ‘সুবহানাহূ ওয়া তা’আলা আম্মা ইউশরিকূন’—আল্লাহ পরম পবিত্র ও মহিমান্বিত সেই সমস্ত বস্তু থেকে যাদেরকে তারা আল্লাহর অংশীদার বানায়। ‘ইউনাযযিলুল মালাইকাতু বির-রূহ’—তিনি ওহী বা প্রত্যাদেশসহ ফেরেশতাদেরকে (জিবরাঈল আ.-কে) স্বীয় নির্দেশ ও ইচ্ছানুযায়ী তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে যার প্রতি ইচ্ছা (অর্থাৎ নবীগণের ওপর) অবতীর্ণ করেন এই মর্মে যে: ‘আন আনযিরূ’—তোমরা কাফেরদেরকে আমার কঠোর আজাব সম্পর্কে সতর্ক কর এবং জানিয়ে দাও যে: ‘আন্নাহূ লা ইলাহা ইল্লা আনা ফাত্তাক্বূন’—আমি ব্যতীত কোনো সত্য উপাস্য নেই, অতএব তোমরা কেবল আমাকেই ভয় কর।

(الف) সূরা আন-নাহলের এই আয়াতের শানে নুযূল

মক্কার মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বিদ্রূপ করে বলত: ‘মুহাম্মদ! তুমি যে প্রতিদিন আমাদেরকে কিয়ামতের ভয় দেখাও, সেই কিয়ামত আর আল্লাহর আযাব কেন আসছে না? সত্যি হলে তা এখনই নিয়ে আস না কেন!’ তাদের এই উপহাস ও তাড়াহুড়ো করার জবাব দিয়ে আল্লাহ তাআলা অতীতকালের শব্দ ‘আতা’ (এসে গেছে) ব্যবহার করে বললেন—কিয়ামত এতই নিশ্চিত ও নিকটে যে তা যেন এসেই পড়েছে; সুতরাং এর জন্য মূর্খের মতো তাড়াহুড়ো করো না, সময় হলে কেউ এক সেকেন্ডও রক্ষা পাবে না।

(খ) ‘আস-সা’আহ’ (الساعة)-এর পরিচয় এবং কিয়ামতের প্রধান প্রধান আলামত

  • ‘আস-সা’আহ’-এর অর্থ: ‘সা’আহ’ শব্দের অর্থ এক মুহূর্ত বা ঘড়ি। কিয়ামতকে সা’আহ বলার কারণ হলো—তা হঠাৎ করে অতি দ্রুত এক মহাপ্রলয়ঙ্করী মুহূর্তে সংঘটিত হবে।
  • কিয়ামতের ছোট আলামতসমূহ (أشراط الساعة الصغرى):
    • ১. বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমন ও ওফাত।
    • ২. আমানতের খেয়ানত এবং অযোগ্য লোকদের রাষ্ট্রক্ষমতায় বসানো।
    • ৩. নগ্নপদ মেষপালকদের আকাশচুম্বী অট্টালিকা নির্মাণের প্রতিযোগিতা।
    • ৪. সুদ, মদ, যেনা ও নগ্নতার ব্যাপক প্রসার এবং গান-বাজনার জয়জয়কার।
    • ৫. ইলম উঠে যাওয়া এবং মূর্খদের ফতোয়া দান।
  • কিয়ামতের বড় আলামতসমূহ (أشراط الساعة الكبرى):
    • ১. ইমাম মাহদীর আত্মপ্রকাশ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা।
    • ২. কানা দাজ্জালের ভয়াবহ আত্মপ্রকাশ ও ফিতনা।
    • ৩. হযরত ঈসা (আ.)-এর আসমান থেকে দামেস্কের মসজিদে অবতরণ এবং দাজ্জাল নিধন।
    • ৪. ইয়াজুজ ও মাজুজের মহাপ্রলয়ঙ্করী আক্রমণ।
    • ৫. দাব্বাতুল আরদ (ভূগর্ভ থেকে অদ্ভুত প্রাণীর প্রকাশ)।
    • ৬. পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয় (যার পর তওবার দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে)।
    • ৭. ইয়েমেন থেকে অগ্নিকাণ্ড ছড়িয়ে পড়ে মানুষকে হাশরের ময়দানে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া।

উপসংহার

কিয়ামত কোনো অলীক কল্পনা নয়; এর প্রতিটি আলামত আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট হচ্ছে। অতএব কালবিলম্ব না করে তওবার মাধ্যমে আখেরাতের পাথেয় অর্জন করাই মুমিনের একমাত্র করণীয়।

১০। الحمد لله حمد الله تعالى نفسه كما بين فى اول سبا فاطر السموت والارض خالقهما على غير مثال سبق جاعل الملائكة رسلا الى الانبياء اولى اجنحة مثنى وثلاث ورباع يزيد فى الخلق فى الملائكة ما يشاء ان الله على كل شيئ قدير ما يفتح الله للناس من رحمة كرزق ومطر فلا ممسك لها وما يمسك من ذالك فلا مرسل له من بعده اى بعد امساكه وهو العزيز الغالب على امره الحكيم فى فعله –

[সূরা ফাতির : ১-২ আয়াতের তাফসীর জালালাইনসহ অনুবাদ, ‘হামদ’ ও ‘শুকর’-এর পার্থক্য এবং তাহক্বীক্ব]

[মান: ১৫ (অনুবাদ ৫ + ক ৫ + খ ৫)]

ভূমিকা ও পটভূমি

সূরা ফাতির হলো পবিত্র কুরআনের ৩৫তম সূরা। একে ‘সূরাতুল মালাইকাহ’-ও বলা হয়। নিখিল বিশ্বের অনুপম সৃষ্টি, ফেরেশতাদের রাজকীয় রূপ এবং আল্লাহর অসীম দান ও করুণার অবিসংবাদিত সার্বভৌমত্ব এই সূরায় চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।

মূল এবারতের প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ

যাবতীয় প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য—আল্লাহ তাআলা স্বয়ং নিজের প্রশংসা করেছেন যেমনটি সূরা সাবার শুরুতে করেছেন। ‘ফাতিরাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ’—যিনি কোনো পূর্ব নমুনা বা মডেল ছাড়াই আসমানসমূহ ও জমিনকে অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে সৃজন করেছেন; ‘জা’ইলিল মালাইকাতি রুসুলান’—যিনি ফেরেশতাদেরকে নবীগণের কাছে ওহী পৌঁছানোর বার্তাবাহক বানিয়েছেন; ‘উলী আজনিহাতিন মাছনা ওয়া ছুলাছা ওয়া রুবা’আ’—যাঁরা দুই-দুই, তিন-তিন ও চার-চারটি ডানার অধিকারী; ‘ইয়াযীদু ফিল খালক্বি মা ইয়াশা’—তিনি সৃষ্টির মধ্যে (ফেরেশতাদের ডানা ও আকৃতিতে) যা ইচ্ছা বৃদ্ধি করেন; নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ববিষয়ে পূর্ণ ক্ষমতাবান। ‘মা ইয়াফতাহিল্লাহু লিন্নাসি মির রাহমাতিন’—আল্লাহ মানুষের জন্য স্বীয় রহমতের যা কিছু উন্মুক্ত করে দেন (যেমন রিজিক, বৃষ্টি বা হেদায়েত), ‘ফালা মুমসিকা লাহা’—তা রোধ করার মতো কেউ নেই; ‘ওয়া মা ইউমসিক’—আর তিনি যা কিছু রুদ্ধ করে দেন, ‘ফালা মুরসিলা লাহূ মিম বা’দিহ’—তাঁর পরে তা উন্মুক্ত করে দেওয়ার মতো আর কেউ নেই; এবং তিনিই পরাক্রমশালী অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও স্বীয় কর্মে পরম প্রজ্ঞাময়।

(الف) ‘আল-হামদ’ (الحمد) এবং ‘আশ-শুকর’ (الشكر)-এর মধ্যে সূক্ষ্ম শাস্ত্রীয় পার্থক্য

পার্থক্যমূলক দিক আল-হামদ (الحمد) আশ-শুকর (الشكر)
১. প্রয়োগের ক্ষেত্র হামদ করা হয় কারও সত্তা, সুন্দর নাম ও নিখুঁত গুণাবলীর কারণে—তাতে প্রত্যক্ষ কোনো অনুগ্রহ থাকুক বা না থাকুক। যেমন আল্লাহ স্বয়ং প্রশংসিত। শুকর কেবল কারও প্রত্যক্ষ দান, নেয়ামত বা অনুগ্রহ লাভের পরই প্রতিদানস্বরূপ করা হয়।
২. প্রকাশের মাধ্যম হামদ মূলত মুখের কথার (যবানের) মাধ্যমে প্রশংসাসূচক বাক্যে প্রকাশ করা হয়। শুকর প্রকাশ পায় তিনটি মাধ্যমে: অন্তরের স্বীকৃতি, মুখের ধন্যবাদ এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মাধ্যমে আনুগত্য ও সেজদা আদায় করে।
৩. উসূলী সারসংক্ষেপ কারণের দিক থেকে ‘হামদ’ ব্যাপকতর (কারণ নেয়ামত ছাড়াও প্রশংসিত হন); কিন্তু প্রকাশের মাধ্যমের দিক থেকে ‘শুকর’ ব্যাপকতর (কারণ তা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়েও করা হয়)।

(খ) শাব্দিক তাহক্বীক্ব (تحقيق الكلمات)

  • فَاطِرٌ (ফাতির): রূপমূল: ف – ط – ر; বাবে নাসারা থেকে ইসমুল ফায়েল। অর্থ: অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে আনয়নকারী, পূর্ব নমুনা ছাড়া নতুনভাবে সৃষ্টিকর্তা বা বিদীর্ণকারী।
  • مُمْسِكٌ (মুমসিক): রূপমূল: م – س – ك; বাবুল ইফ’আল (আমসাকা-ইউমসিকু) থেকে ইসমুল ফায়েল মুযাক্কার। অর্থ: আটকিয়ে রাখা, রোধকারী বা বন্ধকারী। আল্লাহর রহমতকে কেউ রোধ করতে পারে না।

উপসংহার

আল্লাহই বিশ্বের একমাত্র অধিপতি। তিনি যাকে দিতে চান পৃথিবীর সমস্ত শক্তি মিলেও তাকে বঞ্চিত করতে পারে না; আর তিনি যাকে রুখে দেন সমগ্র বিশ্ব মিলেও তাকে দিতে পারে না।

১১। (الف) اكتب نبذة من حياة الإمام جلال الدين السيوطي رحمه الله – أو، (ب) تحدث عن خصائص تفسير صفوة التفاسير للشيخ محمد علي الصابوني رحمه الله تعالى –

[ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.)-এর জীবন ও অমর অবদান অথবা শায়খ সাবুনী (রহ.)-এর ‘সাফওয়াতুত তাফাসীর’-এর অনন্য বৈশিষ্ট্য]

[মান: ১০]

(الف) ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী ও অবদান

  • নাম, জন্ম ও বংশপরিচয়: পূর্ণ নাম আব্দুর রহমান ইবনুল কামাল আবু বকর ইবনে মুহাম্মদ। উপাধি জালালুদ্দীন এবং বংশীয় পরিচিতি ‘আস-সুয়ূতী’। তিনি ৮৪৯ হিজরির পহেলা রজব মিসরের কায়রোতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষরা আসইউত অঞ্চলের অধিবাসী ছিলেন।
  • শিক্ষা ও অসাধারণ স্মৃতিশক্তি: মাত্র আট বছর বয়সে তিনি পবিত্র কুরআনুল কারীম হিফজ সম্পন্ন করেন। এরপর উমদাতুল আহকাম, মিনহাজুল উসূল, আলফিয়্যাহ ইবনে মালিক প্রভৃতি মৌলিক গ্রন্থ মুখস্থ করেন। তিনি মিসর, সিরিয়া, হেজাজ, ইয়ামেন ও ভারত সফর করে তৎকালীন যুগের শীর্ষস্থানীয় আলেমদের সান্নিধ্য লাভ করেন।
  • ইলমী গভীরতা ও মুজাদ্দিদ হিসেবে স্বীকৃতি: তিনি হাদীস, তাফসির, ফিকহ, ইতিহাস, বালাগাত ও আরবি ব্যাকরণসহ শতাধিক শাস্ত্রে অগাধ ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন। তিনি সমকালীন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাফেযে হাদীস ছিলেন (দুই লক্ষ হাদীস তাঁর মুখস্থ ছিল)। অনেকে তাঁকে হিজরি দশম শতকের মুজাদ্দিদ হিসেবে গণ্য করেন।
  • অমর গ্রন্থাবলী: তিনি প্রায় ছয় শতাধিক মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর মধ্যে শ্রেষ্ঠ গ্রন্থসমূহ হলো:
    • তাফসীরে জালালাইন (تفسير الجلالين): স্বীয় উস্তাদ জালালুদ্দীন মহল্লীর অসমাপ্ত অংশ পূর্ণ করে রচিত বিশ্বখ্যাত তাফসির।
    • আল-ইতকান ফী উলূমিল কুরআন (الإتقان في علوم القرآن): উলূমুল কুরআনের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বিশ্বকোষ।
    • আদ-দুররুল মানসূর (الدر المنثور): রেওয়ায়েতভিত্তিক বিশুদ্ধ তাফসির।
    • তারীখুল খুলাফা ও আল-জামেউস সাগীর।
  • ওফাত: এই মহান মনীষী ৯১১ হিজরির ১৯শে জুমাদাল উলা কায়রোতে ৬২ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

(ب) শায়খ মুহাম্মদ আলী আস-সাবুনী (রহ.) রচিত ‘সাফওয়াতুত তাফাসীর’-এর বৈশিষ্ট্য

আধুনিক যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সিরিয়ান তাফসির গবেষক শায়খ মুহাম্মদ আলী আস-সাবুনী (১৯৩০-২০২১ খ্রি.) রচিত ‘সাফওয়াতুত তাফাসীর’ (صفوة التفاسير) হলো প্রাচীন ও আধুনিক তাফসিরের এক অপূর্ব রাজকীয় মেলবন্ধন। এই গ্রন্থের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপ:

  • ১. প্রাচীন নির্ভরযোগ্য তাফসিরসমূহের নির্যাস: লেখক তাফসিরে তাবারী, কাশশাফ, কুরতুবী, আলুসী, ইবনে কাসীর ও বায়যাবীর মতো শীর্ষ প্রাচীন তাফসিরগুলোর বিশুদ্ধতম নির্যাস একত্রিত করেছেন।
  • ২. প্রাঞ্জল ও সহজবোধ্য আধুনিক ভাষা: প্রাচীন তাফসিরগুলোর মতো ভাষা এখানে জটিল নয়; বরং সমকালীন শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের বোধগম্য আধুনিক প্রাঞ্জল আরবি ভাষায় প্রতিটি আয়াতের ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হয়েছে।
  • ৩. চমৎকার পদ্ধতিগত বিন্যাস: প্রতিটি সূরার শুরুতে—
    • সূরার সাধারণ পরিচিতি ও নামকরণের কারণ।
    • আয়াতের শানে নুযূল।
    • শাব্দিক বিশ্লেষণ ও ভাষাতাত্ত্বিক তাৎপর্য (اللغة)।
    • বিশদ মূল তাফসির (التفسير)।
    • অলঙ্কারশাস্ত্র ও বালাগাত বিষয়ক সৌন্দর্য (البلاغة)।
    • আয়াত থেকে শিক্ষণীয় জীবনঘনিষ্ঠ দিকনির্দেশনা (الفوائد والأحكام)।
  • ৪. ইসরাঈলী রেওয়ায়েত বর্জন: প্রাচীন তাফসিরের কাল্পনিক ও দুর্বল ইসরাঈলী বর্ণনাগুলোকে সম্পূর্ণ পরিহার করে কেবল বিশুদ্ধ সহীহ হাদীসের ওপর নির্ভর করা হয়েছে।

উপসংহার

ইমাম সুয়ূতীর ধ্রুপদী ঐতিহ্য এবং শায়খ সাবুনীর আধুনিক সহজবোধ্য বিন্যাস—উভয়ই কুরআন গবেষকদের জন্য চিরন্তন আলোকবর্তিকা।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

ফাযিল ১ম বর্ষ দিরাসাতুত তাফসীর-২ ২০২৪ পরীক্ষার বিষয় কোড কত ছিল?

বিষয় কোড ছিল ১১১০০৬ এবং পূর্ণমান ১০০ নম্বর। সময় ৩ ঘণ্টা।

সূরা আত-তাওবার শুরুতে কেন বিসমিল্লাহ নেই?

বিসমিল্লাহ হলো শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতীক, আর সূরা তাওবাহ অবতীর্ণ হয়েছিল চুক্তিভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের চূড়ান্ত ঘোষণা নিয়ে।

আরবি ব্যাকরণে ‘ইনযাল’ ও ‘তানযীল’-এর মূল পার্থক্য কী?

‘ইনযাল’ অর্থ কোনো কিছু একত্রে নাযিল হওয়া, আর ‘তানযীল’ অর্থ ধাপে ধাপে কিস্তিতে কিস্তিতে নাযিল হওয়া।

হযরত ইউসুফ (আ.) স্বপ্নে যে সূর্য ও চাঁদ দেখেছিলেন তার রূপক অর্থ কী ছিল?

সূর্য ছিল তাঁর সম্মানিত পিতা হযরত ইয়াকুব (আ.) এবং চাঁদ ছিল তাঁর স্নেহময়ী মাতা।

মসজিদুল হারাম ও মসজিদুল আকসা নির্মাণের মাঝে কত বছরের ব্যবধান ছিল?

সহীহ হাদীসের প্রামাণ্য বর্ণনামতে উভয়ের মাঝে চল্লিশ বছরের ব্যবধান ছিল।

‘সাফওয়াতুত তাফাসীর’ গ্রন্থের রচয়িতা কে?

সিরিয়ার প্রখ্যাত আধুনিক মুফাসসির শায়খ মুহাম্মদ আলী আস-সাবুনী (রহ.)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *