কামিল (স্নাতকোত্তর) হাদীস প্রথম পর্ব পরীক্ষা, ২০২৩
হাদীস বিভাগ — অষ্টম পত্র
বিষয়: আল-আকীদাহ আল-ইসলামিয়্যাহ [নতুন সিলেবাস অনুযায়ী]
বিষয় কোড: ৬১১১০৮ | পূর্ণমান: ১০০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
الملاحظة : أجب عن ثمانية من مجموعة (أ) وعن أربعة من مجموعة (ب) – [দ্রষ্টব্য : (أ) অংশ থেকে আটটি ও (ب) অংশ থেকে চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
কামিল (মাস্টার্স) হাদীস প্রথম পর্ব পরীক্ষা ২০২৩-এর ‘আল-আকীদাহ আল-ইসলামিয়্যাহ’ (Al-Aqidah Al-Islamiyyah – বিষয় কোড: ৬১১১০৮) বিষয়ের মূল প্রশ্নপত্র এবং আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মাতুরীদী ও আশ’আরী আক্বীদা ভিত্তিক প্রামাণ্য তাহকীক্বী ও একাডেমিক সমাধান নিচে উপস্থাপন করা হলো। ইমাম আবুল মুঈন মাইমুন আন-নাসাফী (রহ.)-এর জগদ্বিখ্যাত কালামশাস্ত্রীয় গ্রন্থ ‘বাহরুল কালাম’ এবং আহলুস সুন্নাহর মৌলিক আক্বীদা গ্রন্থাবলীর আলোকে প্রস্তুতকৃত এ সমাধানটি কামিল পরীক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্তি নিশ্চিত করবে।
প্রশ্নকাঠামো ও নম্বর বণ্টন নির্দেশিকা:
১. ‘ক’ বিভাগ (مجموعة – أ: বিশদ তাত্ত্বিক প্রশ্নাবলী): ১৬টি প্রশ্ন হতে যেকোনো ৮টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় (নম্বর: ১০ × ৮ = ৮০)
২. ‘খ’ বিভাগ (مجموعة – ب: সংক্ষিপ্ত কালামশাস্ত্রীয় প্রশ্নাবলী): ৮টি প্রশ্ন হতে যেকোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় (নম্বর: ৫ × ৪ = ২০)
(পরীক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ শতভাগ প্রস্তুতির সুবিধার্থে প্রশ্নপত্রের সকল ২৪টি প্রশ্নের একাডেমিক ও প্রামাণ্য সমাধান নিচে সুবিন্যস্তভাবে তুলে ধরা হলো)।
١- اكتب نبذة عن حياة العلامة أبي المعين ميمون النسفي رحمة الله عليه
[১. আল্লামা আবুল মুঈন মাইমুন আন-নাসাফী (রহ.)-এর পরিচিতি ও জীবনচরিত বিস্তারিত লিখ।]
১. নাম, বংশ ও জন্মবৃত্তান্ত:
ইমাম আবুল মুঈন মাইমুন আন-নাসাফী (রহ.) হলেন ইলমুল কালাম ও ইসলামী আক্বীদা শাস্ত্রের শীর্ষস্থানীয় প্রবাদপুরুষ। তাঁর পূর্ণ নাম আবুল মুঈন মাইমুন ইবনে মুহাম্মদ ইবনে মু’তামাদ ইবনে মাকহুল আন-নাসাফী আল-মাকহুলী। তিনি ৪৩৮ হিজরী মোতাবেক ১০৪৬ খ্রিষ্টাব্দে মধ্য এশিয়ার প্রাচীন ও সুপ্রসিদ্ধ ইলমী কেন্দ্র সমরকন্দের নাসাফ (বর্তমান উজবেকিস্তানের কারশী অঞ্চল) নামক বিখ্যাত শহরে এক সম্ভ্রান্ত আলেম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষ হযরত আবু মুতী মাকহুল ইবনে ফজল আন-নাসাফী ছিলেন ইমাম আযম আবু হানীফা (রহ.)-এর ফিকহ ও আক্বীদা ধারার অন্যতম বিশিষ্ট ফকীহ ও মুহাদ্দিছ।
২. আক্বীদাগত অবস্থান ও ইলমী অবদান:
ইমাম আবুল মুঈন নাসাফী ছিলেন আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের হানাফী-মাতুরীদী ধারার সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যাকার ও দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা। ইমাম আবুল হাসান আল-আশ’আরীর চিন্তাধারার প্রসারে যেমন কাজী আবু বকর বাক্বিল্লানী অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন, তেমনি ইমাম আবু মানসূর আল-মাতুরীদী (রহ.)-এর আক্বীদাকে সুবিন্যস্ত ও দলীলভিত্তিক কাঠামোর ওপর দাঁড় করাতে ইমাম আবুল মুঈন নাসাফী অনন্য অবদান রাখেন। তৎকালীন সময়ে মু’তাযিলা, জাহমিয়া, কারামিয়া, বাতেনিয়া ও দার্শনিকদের ভ্রান্ত মতবাদ খণ্ডন করে তিনি সহীহ আক্বীদার বিজয় নিশান উড্ডীন করেন। তাঁর বিশিষ্ট ছাত্রদের মধ্যে ইমাম নাজমুদ্দীন উমর আন-নাসাফী (প্রসিদ্ধ ‘আল-আক্বায়েদুন নাসাফিয়্যাহ’র প্রণেতা) অন্যতম।
৩. অমর গ্রন্থাবলী ও ওফাত:
তিনি বহু মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর মধ্যে সর্বাধিক স্মরণীয় হলো: (১) তাবসিরাতুল আদিল্লাহ ফী উসূলিদ দ্বীন (تبصرة الأدلة في أصول الدين)—যা মাতুরীদী কালাম শাস্ত্রের সর্ববৃহৎ মৌলিক বিশ্বকোষ; (২) আত-তামহীদ লি ক্বাওয়ায়েদিত তাওহীদ (التمهيد لقواعد التوحيد); এবং (৩) বাহরুল কালাম ফী ইলমিল কালাম (بحر الكلام في علم الكلام)। এই মহান মনীষী সুদীর্ঘকাল ইলমের আলোকবর্তিকা ছড়িয়ে ৫০৮ হিজরীর জিলহজ মাসে (১১১৫ খ্রিষ্টাব্দ) সমরকন্দে ওফাত লাভ করেন। আল্লামা ইবনে কুদলুবুগা ও কাতিব চেলেবী বলেন, মাওরাউন্নাহরের জমিনে আকিদা শাস্ত্রের তিনিই ছিলেন অবিসংবাদিত নেতা।
٢- اكتب ميزات الكتاب “بحر الكلام” وخصائصه بالتفصيل
[২. ‘বাহরুল কালাম’ গ্রন্থের অনন্য বৈশিষ্ট্য ও স্বকীয়তা বিস্তারিত আলোচনা কর।]
১. ‘বাহরুল কালাম’ কিতাবের সাধারণ পরিচয় ও প্রেক্ষাপট:
‘বাহরুল কালাম ফী ইলমিল কালাম’ (بحر الكلام في علم الكلام) হলো হিজরী পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতকের সন্ধিক্ষণে রচিত আক্বীদা ও ইলমুল কালাম শাস্ত্রের এক কালজয়ী মাস্টারপিস। ইমাম আবুল মুঈন নাসাফী (রহ.) তাঁর সুবিশাল গ্রন্থ ‘তাবসিরাতুল আদিল্লাহ’র সারনির্যাস হিসেবে শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় এই কিতাবটি সংকলন করেন। সমকালীন সময়ে যখন গ্রীক দর্শন ও বিদআতী দলসমূহের বিভ্রান্তি মুসলিম সমাজে ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন সাধারণ তালিবুল ইলমদের ঈমান রক্ষার ঢাল হিসেবে এ গ্রন্থটি অনন্য অবদান রাখে।
২. কিতাবটির প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য ও স্বকীয়তা:
১. প্রশ্নোত্তর ও দ্বান্দ্বিক বিতর্ক শৈলী (الأسلوب الجدلي والمناظرة): কিতাবের প্রতিটি অধ্যায়ে লেখক অত্যন্ত চমৎকারভাবে “فإن قال قائل… قلنا له” (যদি কোনো বিরোধী পক্ষ প্রশ্ন তোলে… তবে উত্তরে আমরা বলব)—এই যুক্তিভিত্তিক শৈলী ব্যবহার করেছেন। এর ফলে প্রতিপক্ষের সংশয়টি প্রথমে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে অতপর অকাট্য দলীল দ্বারা তা ধূলিসাৎ করা হয়েছে।
২. ওহী ও বিবেকের নিখুঁত ভারসাম্য (الجمع بين العقل والنقل): গ্রন্থকার অন্ধ অনুকরণের পরিবর্তে কুরআন ও সুন্নাহর অকাট্য নসকে মূল বুনিয়াদ রেখেছেন এবং তাকে সুস্থ বিবেক ও লজিক্যাল যুক্তি দিয়ে সুদৃঢ় করেছেন।
৩. সংক্ষিপ্ততা সত্ত্বেও অর্থগত পূর্ণতা (الإيجاز مع الإعجاز): অল্প শব্দের মধ্যে গভীর কালামশাস্ত্রীয় জটিল তত্ত্বসমূহ—যেমন আল্লাহর জাত ও সিফাত, রু’ইয়াতুল্লাহ (আখিরাতে আল্লাহ দর্শন), তাকদীরের রহস্য ও বান্দার কর্মের স্বাধীনতা—অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
৪. বাতিল ফির্ক্বাসমূহের যৌক্তিক খণ্ডন: কিতাবটিতে মু’তাযিলাদের পঞ্চমূলনীতি, জাহমিয়াদের সিফাত অস্বীকার, কারামিয়া ও মুজাসসিমাদের দেহতত্ত্ব এবং জাবরিয়াদের ভাগ্যবিপর্যয়কারী দর্শনের নিখুঁত খণ্ডন পেশ করা হয়েছে।
৫. মাতুরীদী আক্বীদার বিশ্বস্ত সারসংক্ষেপ: ইমাম আবু মানসূর মাতুরীদীর গভীর কালামতত্ত্বকে সহজবোধ্য করে উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে এ কিতাবের কোনো বিকল্প নেই। এটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে উচ্চতর ইসলামী শিক্ষার ক্লাসিক পাঠ্যপুস্তক হিসেবে সমাদৃত।
٣- تحدث عن منهج المؤلف في الكتاب “بحر الكلام” ومنزلته بين كتب العقائد وعناية العلماء به
[৩. ‘বাহরুল কালাম’ গ্রন্থে লেখকের অনুসৃত মানহাজ, আক্বীদা সাহিত্যে এর মর্যাদা ও আলেমদের মূল্যায়ন আলোচনা কর।]
১. কিতাবে লেখকের অনুসৃত রচনাপদ্ধতি ও মানহাজ (منهج المؤلف):
ইমাম আবুল মুঈন নাসাফী (রহ.) ‘বাহরুল কালাম’-এ একটি অত্যন্ত সুসংহত বৈজ্ঞানিক মানহাজ অনুসরণ করেছেন:
প্রথমত, তিনি জ্ঞানতত্ত্ব বা এপিস্টেমোলজি (حد العلم وأسباب العلم) দিয়ে কিতাব শুরু করেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন যে সত্য জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম তিনটি: সুস্থ পঞ্চ ইন্দ্রিয় (الحواس السليمة), সত্য সংবাদ বা ওহী (الخبر الصادق), এবং সুস্থ বিবেক (العقل السليم)। এর মাধ্যমে তিনি সোফিস্ট ও সংশয়বাদীদের ভিত্তি ধূলিসাৎ করেন।
দ্বিতীয়ত, তিনি আকিদার মৌলিক বিষয়সমূহকে যুক্তিযুক্ত ক্রমবিন্যাসে সাজিয়েছেন—মহাবিশ্বের নশ্বরতা (حدوث العالم) থেকে একত্ববাদ প্রমাণ, আল্লাহর সিফাত, তাকদীর, নবুওয়াত, রূহ, বরযখ ও কিয়ামত সংক্রান্ত আলোচনা।
তৃতীয়ত, তিনি আহলুস সুন্নাতের আক্বীদা বয়ানের পাশাপাশি সমকালীন বিপথগামী দার্শনিক ও বিদআতী সম্প্রদায়ের উদ্ধৃতি সরাসরি উল্লেখ করেছেন এবং কোনোপ্রকার পক্ষপাতিত্ব ছাড়া নিরপেক্ষ ও যুক্তিগ্রাহ্য দলীল দিয়ে তাদের অসাড়তা প্রমাণ করেছেন। ফিকহে হানাফী এবং আক্বীদায়ে মাতুরীদিয়ার সমন্বিত রূপরেখা তিনি তুলে ধরেছেন।
২. আক্বীদা সাহিত্যের ইতিহাসে কিতাবের মর্যাদা ও আলেমদের পর্যালোচনা:
ইসলামী উলূমের ইতিহাসে ‘বাহরুল কালাম’ একটি অন্যতম মাইলফলক হিসেবে পরিগণিত। আল্লামা হাজী খলীফা তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ কাশফুয যুনূন আন আসমায়িল কুতুবি ওয়াল ফুনূন-এ বলেন: “বাহরুল কালাম হলো আক্বাইদের এমন এক সারগর্ভ সমুদ্র, যা সংক্ষিপ্ত হওয়া সত্ত্বেও কালাম শাস্ত্রের সমস্ত মৌলিক সমস্যার নির্ভরযোগ্য সমাধান ধারণ করে।”
প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের প্রখ্যাত গবেষক ও উলামায়ে কেরাম এই কিতাবের ব্যাপক পর্যালোচনা করেছেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মাওরাউন্নাহর, খোরাসান, অটোমান সাম্রাজ্য এবং ভারত উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসা ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে এটি আক্বীদার মূল সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ইমাম সা’দুদ্দীন তাফতাযানী তাঁর ‘শারহুল আকাইদ’-এ বহু স্থানে ইমাম আবুল মুঈন নাসাফীর এই কিতাব হতে দলীল চয়ন করেছেন, যা এর সর্বজনগ্রাহ্য প্রামাণিকতার উৎকৃষ্ট প্রমাণ।
٤- عرف المعجزة والكرامة والاستدراج لغة وشرعا . اذكر أهم معجزات الرسول صلى الله عليه وسلم
[৪. মু’জিযা, কারামাত ও ইস্তিদরাজের সংজ্ঞা দাও এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রধান প্রধান মু’জিযাসমূহ বর্ণনা কর।]
১. আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা:
– মু’জিযা (المعجزة): আভিধানিক অর্থ অক্ষমকারী বা পরাভূতকারী। শরীয়তের পরিভাষায়, নবুওয়াতের সত্যতা প্রমাণের স্বার্থে আল্লাহর হুকুমে নবীদের মাধ্যমে প্রকৃতির সাধারণ নিয়মের বাইরে (খারেক্বে আদাত) যে অলৌকিক ঘটনা প্রকাশিত হয় এবং যার মোকাবিলা করতে সমস্ত সৃষ্টিজগৎ অক্ষম প্রমাণিত হয়, তাকে মু’জিযা বলে। এর প্রধান শর্ত হলো নবুওয়াতের দাবির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হওয়া এবং চ্যালেঞ্জযুক্ত হওয়া।
– কারামাত (الكرامة): আভিধানিক অর্থ সম্মান বা অনুগ্রহ। শরীয়তের পরিভাষায়, কোনো নবী নন এমন সত্যনিষ্ঠ ও মুত্তাকী ওলী বা নেককার বান্দার মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদর্শিত অসাধারণ অলৌকিক ঘটনাকে কারামাত বলে (যেমন মারইয়াম আ.-এর অমৌসুমী ফল লাভ বা আসহাবে কাহাফের সুদীর্ঘ নিদ্রা)।
– ইস্তিদরাজ (الاستدراج): কোনো পথভ্রষ্ট কাফির বা ফাসিক্ব ব্যক্তির ইচ্ছা অনুযায়ী তাদের বিভ্রান্তি ও অহংকার বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে আপাত কোনো অদ্ভুত বিষয় প্রকাশ পাওয়াকে ইস্তিদরাজ বলে; যেমন দাজ্জালের ভেল্কিবাজি বা ফিরাউনের সাময়িক শক্তি।
২. প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রধান প্রধান মু’জিযাসমূহ:
আল্লাহ তাআলা বিশ্বনবী (সা.)-কে অগণিত প্রকাশ্য ও আধ্যাত্মিক মু’জিযা দান করেছিলেন। তন্মধ্যে প্রধান কয়েকটি হলো:
১. পবিত্র কুরআনুল কারীম: এটি বিশ্বনবীর সর্বশ্রেষ্ঠ, চিরন্তন ও জীবন্ত বুদ্ধিবৃত্তিক মু’জিযা; যার একটি সূরার মতো রচনা করতে সমগ্র জিন ও মানবজাতি কিয়ামত পর্যন্ত অক্ষম।
২. ইনশিক্বাকুল ক্বামার (চন্দ্র দ্বিখণ্ডিতকরণ): মক্কার কাফিরদের দাবির প্রেক্ষিতে রাসূল (সা.)-এর ইশারায় পূর্ণিমা রাতের চাঁদ সুস্পষ্ট দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে হেরা পর্বতের দুই পাশে দৃশ্যমান হয়েছিল (সূরা ক্বামার: ১-২)।
৩. সশরীরে মি’রাজ গমন: এক রাতে মক্কা হতে বাইতুল মুকাদ্দাস এবং সেখান থেকে সপ্তাকাশ পেরিয়ে আরশে আযীমে আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছা ও ফিরে আসা।
৪. আঙুলের ফাঁক থেকে পানির ঝর্ণাধারা: হুদাইবিয়া ও অন্যান্য যুদ্ধ সফরে পানির চরম সংকটে রাসূল (সা.)-এর পবিত্র আঙুলসমূহের মধ্য থেকে পানি উৎসারিত হয়েছিল এবং শত শত সাহাবী তৃষ্ণা নিবারণ করেছিলেন।
৫. শুষ্ক খেজুর কাণ্ডের ক্রন্দন (حنَّانة): মিম্বর তৈরির পর রাসূলের বিরহে মসজিদের পুরোনো কাঠের খণ্ডটি শিশুর মতো কেঁদে উঠেছিল, যা শত শত সাহাবী প্রত্যক্ষ করেছিলেন।
٥- ما معنى الشرك لغة وشرعا؟ ثم اذكر أنواعه مع بيان خطورته في ضوء القرآن والسنة
[৫. শিরকের অর্থ কী? শিরকের প্রকারভেদ ও কুরআন-সুন্নাহর আলোকে এর ভয়াবহতা বিস্তারিত আলোচনা কর।]
১. শিরকের আভিধানিক ও শরয়ী অর্থ:
– আভিধানিক অর্থ: ‘শিরক’ (الشرك) শব্দের অর্থ অংশীদার করা, সমকক্ষ নির্ধারণ করা বা ভাগাভাগি করা।
– শরয়ী সংজ্ঞা: মহান আল্লাহর সত্তা (যাত), গুণাবলী (সিফাত), ক্ষমতা ও ইবাদতের কোনো ক্ষেত্রে অন্য কাউকে সমকক্ষ, অংশীদার বা সদৃশ মনে করাকে ইসলামী শরীয়তে শিরক বলা হয়।
২. শিরকের প্রধান প্রকারভেদসমূহ:
১. শিরক ফির রুবূবিয়্যাহ (الشرك في الربوبية): সৃষ্টি করা, রিযিক্ব দেওয়া, রোগমুক্তি ও বিশ্ব পরিচালনায় আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে স্বাধীন ক্ষমতার অধিকারী মনে করা।
২. শিরক ফিল উলূহিয়্যাহ বা ইবাদত (الشرك في الألوهية): আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো মাজার, প্রতিমা, ব্যক্তি বা শক্তির উদ্দেশ্যে সেজদা করা, দোআ করা, মানত করা বা কুরবানী করা।
৩. শিরক ফিস সিফাত (الشرك في الصفات): আল্লাহর বিশেষ গুণাবলীতে অপরকে অংশীদার সাব্যস্ত করা; যেমন আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ সার্বিক গায়েব জানে বা সব স্থানে সর্বত্র বিরাজমান এমন বিশ্বাস রাখা।
৪. শিরকে আকবর বনাম শিরকে আসগর: শিরকে আকবর মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে চিরস্থায়ী জাহান্নামী করে দেয়; আর শিরকে আসগর হলো রিয়া বা লোকদেখানো ইবাদত ও লোকলজ্জার ভীতি।
৩. কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে শিরকের ভয়াবহতা:
১. ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ: আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শিরক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না; এ ছাড়া অন্য যেকোনো পাপ যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করে দেন” (সূরা আন-নিসা: ৪৮)।
২. সমগ্র আমল বিনষ্টকারী: ইরশাদ হয়েছে: “যদি তুমি শিরক কর, তবে তোমার সমস্ত নেক আমল নিস্ফল হয়ে যাবে এবং তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে” (সূরা আয-যুমার: ৬৫)।
৩. জান্নাত চিরতরে হারাম: আল্লাহ বলেন: “নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শিরক করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত চিরতরে হারাম করে দিয়েছেন এবং তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম” (সূরা আল-মায়িদাহ: ৭২)। সহীহ হাদীসে শিরককে ‘আকবারুল কাবায়ির’ বা সর্বশ্রেষ্ঠ মহাপাপ সাব্যস্ত করা হয়েছে।
٦- عرف العقيدة الإسلامية . ثم بين أصول العقيدة الإسلامية
[৬. ইসলামী আক্বীদার পরিচয় দাও এবং ইসলামী আক্বীদার মৌলিক স্তম্ভসমূহ বিশদভাবে বিশ্লেষণ কর।]
১. ইসলামী আক্বীদার পরিচয় ও সংজ্ঞা:
– আভিধানিক অর্থ: ‘আক্বীদাহ’ (العقيدة) শব্দটি ‘আক্বদ’ (عقد) ধাতু হতে উৎপন্ন, যার অর্থ দৃঢ় গিট দেওয়া, অটুট বন্ধন বা সুদৃঢ় প্রত্যয়। যেমন কোনো রশিকে শক্ত করে বাঁধা হলে তাকে আক্বদ বলে।
– পারিভাষিক সংজ্ঞা: ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায়, মহান আল্লাহর একত্ববাদ, তাঁর নাযিলকৃত ওহী এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আনীত যাবতীয় দ্বীনী সত্যের প্রতি অন্তরের এমন অটল, দ্ব্যর্থহীন ও দ্বিধাহীন বিশ্বাস স্থাপন করা, যাতে কোনোপ্রকার সন্দেহ, সংশয় বা দোদুল্যচিত্ততার অবকাশ থাকে না। আক্বীদা হলো মানুষের আমল ও ফিকহের মূল ভিত্তি; আক্বীদা বিশুদ্ধ না হলে কোনো আমলই আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না।
২. ইসলামী আক্বীদার মৌলিক স্তম্ভসমূহ (أصول العقيدة الإسلامية):
হাদীসে জিবরাঈল ও কুরআনের বর্ণনানুযায়ী ইসলামী আক্বীদার মৌলিক স্তম্ভ প্রধানত ৬টি, যা আরকানুল ঈমান নামে খ্যাত:
১. আল্লাহর প্রতি ঈমান (الإيمان بالله): আল্লাহ তাআলার অস্তিত্ব, তাঁর প্রভুত্ব (রুবূবিয়্যাহ), ইবাদতের এককত্ব (উলূহিয়্যাহ) এবং তাঁর যাবতীয় পবিত্র নাম ও সিফাতের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা। তিনি এক, অদ্বিতীয় এবং যাবতীয় ত্রুটিমুক্ত।
২. ফেরেশতাগণের প্রতি ঈমান (الإيمان بالملائكة): ফেরেশতাগণ আল্লাহর নূরানি মাখলূক্ব, তাঁরা নিষ্পাপ, পানাহারমুক্ত এবং সর্বদা আল্লাহর আদেশের অনুগত—এ বিশ্বাস রাখা। জিবরাঈল, মিকাঈল, ইসরাফীল ও আজরাঈল (আ.) তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয়।
৩. আসমানী কিতাবসমূহে ঈমান (الإيمان بالكتب السماوية): তাওরাত, ইনজীল, যাবূর এবং সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ অপরিবর্তিত ঐশী কিতাব আল-কুরআনের প্রতি পূর্ণ ঈমান পোষণ করা।
৪. নবী ও রাসূলগণের প্রতি ঈমান (الإيمان بالرسل): হযরত আদম (আ.) থেকে বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত সমস্ত প্রেরিত নবী-রাসূলদের সত্যতা স্বীকার করা এবং মুহাম্মদ (সা.)-কে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ বিশ্বনবী হিসেবে বিশ্বাস করা।
৫. আখিরাতের প্রতি ঈমান (الإيمان باليوم الآخر): মৃত্যুর পর কবরের সওয়াল-জওয়াব, পুনরুত্থান, হাশরের ময়দান, আমলনামা, মীযান, পুলসিরাত এবং জান্নাত-জাহান্নামের চিরন্তন জীবনে বিশ্বাস স্থাপন।
৬. তাকদীরের প্রতি ঈমান (الإيمان بالقدر): মহাবিশ্বের ভালো-মন্দ সমস্ত সৃষ্টির পূর্বনির্ধারিত পরিমাণ ও খোদায়ী জ্ঞানের ওপর সন্তুষ্ট থাকা। এই ছয়টি স্তম্ভের যেকোনো একটি অস্বীকার করলে ব্যক্তি ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত হয়ে যায়।
٧- ما معنى الإيمان لغة واصطلاحا؟ هل الإيمان يزيد وينقص؟ بين بالأدلة
[৭. ঈমানের সংজ্ঞা দাও। ঈমান কি বৃদ্ধি পায় ও হ্রাস পায়? দলীলসহ বিস্তারিত আলোচনা কর।]
১. ঈমানের আভিধানিক ও শরয়ী অর্থ:
– আভিধানিক অর্থ: تصديق (তাসদীক্ব) বা অন্তরে সত্য বলে দৃঢ় বিশ্বাস করা ও স্বীকৃতি দেওয়া।
– শরয়ী সংজ্ঞা: রাসূলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর পক্ষ হতে যা কিছু দ্বীন হিসেবে অকাট্যভাবে নিয়ে এসেছেন, অন্তরের গভীরে সেগুলোকে সত্য বলে গ্রহণ করা এবং মৌখিকভাবে তার স্বীকারোক্তি প্রদান করাকে ঈমান বলে। হাদীসে জিবরাঈলে ঈমানের মূলস্তম্ভসমূহ সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
২. ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধি (زيادة الإيمان ونقصانه) বিষয়ক দলীলভিত্তিক মতভেদ:
এ বিষয়ে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের উলামায়ে কেরামের মাঝে দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারা পরিলক্ষিত হয়:
১. ইমাম বুখারী, ইমাম শাফেঈ ও মুহাদ্দিছীনদের অভিমত: তাঁদের মতে ঈমান বৃদ্ধি পায় এবং হ্রাস পায়।
– দলীল: কুরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে: “যাতে তাদের ঈমানের সাথে ঈমান বৃদ্ধি পায়” (সূরা আল-ফাতহ: ৪); এবং “যখন তাদের নিকট তাঁর আয়াত তিলাওয়াত করা হয় তখন তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়” (সূরা আল-আনফাল: ২)। সহীহ মুসলিমের হাদীসে এসেছে: “ঈমানের সত্তরের অধিক শাখা রয়েছে; যার সর্বোচ্চ শাখা হলো লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা এবং সর্বনিম্ন শাখা হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা।” অতএব নেক আমলের দ্বারা ঈমানের নূর ও শক্তি বাড়ে এবং পাপাচারের দ্বারা ঈমান হ্রাস পায়।
২. ইমামুল আযম আবু হানীফা ও ইমাম আবুল মুঈন নাসাফী (হানাফী-মাতুরীদী) অভিমত: মূল ঈমানের সারবত্তা (অস্তিত্ব ও স্বীকৃতি) বাড়েও না, কমেও না। কারণ বিশ্বাস যদি সামান্যও কমে যায়, তবে তা সন্দেহে পরিণত হবে; আর সন্দেহের নাম কুফর, ঈমান নয়। তবে তাঁরা স্বীকার করেন যে, ঈমানের নূর, সৌন্দর্য, পূর্ণতা (কামালিয়্যাত) ও আধ্যাত্মিক শক্তি নেক আমলের মাধ্যমে প্রোজ্জ্বল হয় এবং গুনাহের দ্বারা ম্লান হয়।
উপসংহার: ইমাম নববী, ইবনে হাজার আসকালানী ও তাফতাযানী প্রমাণ করেছেন যে, এই মতভেদটি মূলত বাহ্যিক ও সংজ্ঞাগত (اختلاف لفظي); কেননা মুহাদ্দিছগণ আমলকে ঈমানের বাহ্যিক পূর্ণতার অন্তর্ভুক্ত ধরে হ্রাস-বৃদ্ধির কথা বলেছেন, আর ফকীহগণ অন্তরের মূল তাসদীক্বকে ঈমানের মূল গণ্য করে অপরিবর্তনীয় বলেছেন।
٨- عرف التوحيد . ثم بين أقسامه مفصلا
[৮. তাওহীদের সংজ্ঞা দাও এবং এর প্রকারভেদসমূহ বিস্তারিত বিশ্লেষণ কর।]
১. তাওহীদের পরিচয় ও সংজ্ঞা:
– আভিধানিক অর্থ: ‘তাওহীদ’ (التوحيد) শব্দটি বাবে তাফঈলের মাসদার, যার অর্থ এক করা, একত্ব ঘোষণা করা বা একক গণ্য করা।
– পারিভাষিক সংজ্ঞা: আল্লাহ তাআলাকে তাঁর সত্তা, গুণাবলী ও কার্যাবলীতে অদ্বিতীয়, অংশীদারহীন ও অতুলনীয় সত্তা হিসেবে আন্তরিক বিশ্বাস এবং ইবাদতকে একমাত্র তাঁর জন্যই নির্দিষ্ট রাখাকে তাওহীদ বলে। তাওহীদ হলো সমস্ত দ্বীনের প্রাণভোমরা ও কালিমাতুত তাক্বওয়া।
২. তাওহীদের তিনটি প্রধান শাখা (أقسام التوحيد):
ইসলামী আকিদাবিদ ও মুহাদ্দিছগণ কুরআন ও সুন্নাহর গভীর গবেষণার আলোকে তাওহীদকে তিনটি প্রধান শাখায় বিন্যস্ত করেছেন:
১. তাওহীদুর রুবূবিয়্যাহ (توحيد الربوبية): আল্লাহকে একমাত্র রব, স্রষ্টা, রিযিক্বদাতা, জীবন-মৃত্যু দানকারী এবং নিখিল বিশ্বের একক শাসক ও নিয়ন্ত্রণকারী হিসেবে বিশ্বাস করা। মক্কার মুশরিকরাও এ তাওহীদকে সাধারণভাবে মানত; কুরআনে এসেছে: “যদি আপনি তাদের জিজ্ঞাসা করেন কে আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছে, তবে তারা অবশ্যই বলবে—আল্লাহ” (সূরা যুখরুফ: ৮৭)। কিন্তু কেবল এটুকু বিশ্বাস মানুষকে জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারে না।
২. তাওহীদুল উলূহিয়্যাহ বা ইবাদত (توحيد الألوهية والعبادة): সমস্ত ইবাদত—নামায, সিজদা, রোযা, দোআ, মানত, আশা ও ভয়—একমাত্র আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করা এবং গাইরুল্লাহর ইবাদত সম্পূর্ণ বর্জন করা। যুগে যুগে নবীদের মূল দাওয়াত ছিল এই তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করা: “হে আমার জাতি! তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো সত্য মা’বূদ নেই” (সূরা আল-আ’রাফ: ৫৯)।
৩. তাওহীদুল আসমা ওয়াস সিফাত (توحيد الأسماء والصفات): পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদীসে আল্লাহর যে সকল সুন্দর নাম ও মহান গুণাবলী বর্ণিত হয়েছে, কোনোপ্রকার সাদৃশ্য (তাশবীহ), অঙ্গবিন্যাস (তাজসীম) বা রূপক নিষ্ক্রিয়করণ (তা’তীল) ব্যতীত সেগুলোকে হুবহু সত্য বলে বিশ্বাস করা: “কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়; আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা” (সূরা আশ-শূরা: ১১)।
٩- هل الجنة والنار موجودتان الآن؟ اكتب اختلاف العلماء في هذه المسألة
[৯. জান্নাত ও জাহান্নাম কি বর্তমানে বিদ্যমান রয়েছে? এ বিষয়ে আলেমদের মতানৈক্য বিস্তারিত লিখ।]
১. আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অকাট্য আক্বীদা:
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআত (মাতুরীদী ও আশ’আরী)-এর সর্বসম্মত মৌলিক বিশ্বাস হলো—জান্নাত এবং জাহান্নাম উভয়ই বর্তমানে সৃষ্টি অবস্থায় সুনিশ্চিতভাবে বিদ্যমান রয়েছে (الجنة والنار مخلوقتان موجودتان الآن)। এগুলো কিয়ামতের পর নতুন করে সৃষ্টি করা হবে না, বরং পূর্ব থেকেই অস্তিত্ববান এবং কিয়ামত পর্যন্ত ও তার পরেও অনন্তকাল বহাল থাকবে।
২. কুরআন ও সুন্নাহর প্রামাণ্য দলীলসমূহ:
১. কুরআনে অতীতকালীন ক্রিয়ার ব্যবহার: জান্নাত সম্পর্কে আল্লাহ বলেন: أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ—”যা মুত্তাক্বীদের জন্য প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে” (সূরা আলে ইমরান: ১৩৩); এবং জাহান্নাম সম্পর্কে ইরশাদ করেন: أُعِدَّتْ لِلْكَافِرِينَ—”যা কাফিরদের জন্য প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে” (সূরা আল-বাক্বারা: ২৪)। আরবী ব্যাকরণে ‘উইদ্দাত’ হলো অতীতকালীন কর্মবাচ্য (ماضي مجهول), যা প্রমাণ করে প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন।
২. মি’রাজের চাক্ষুষ প্রত্যক্ষকরণ: সহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদীসে প্রমাণিত যে, মি’রাজের রজনীতে স্বয়ং বিশ্বনবী (সা.) জান্নাতের নিয়ামতসমূহ এবং জাহান্নামের শাস্তিপ্রাপ্তদের সচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছেন।
৩. সূর্যগ্রহণের সালাতে প্রত্যক্ষকরণ: কুসূফের সালাতে রাসূলুল্লাহ (সা.) জান্নাতের এক গুচ্ছ ফল নেওয়ার জন্য হাত বাড়িয়েছিলেন এবং জাহান্নামের লেলিহান শিখা দেখে পেছনে সরে এসেছিলেন।
৩. মু’তাযিলাদের ভ্রান্ত মত ও তার দাঁতভাঙা জবাব:
মু’তাযিলা এবং কিছু দার্শনিক বিভ্রান্ত হয়ে দাবি করেছিল যে, জান্নাত ও জাহান্নাম বর্তমানে অনর্থক সৃষ্টি করে রাখা অযৌক্তিক (عبث); হিসাব-নিকাশের পর এগুলো সৃষ্টি করা হবে।
খণ্ডন: ইমাম আবুল মুঈন নাসাফী ‘বাহরুল কালাম’-এ মু’তাযিলাদের জবাব দিয়ে বলেন: মানুষের ক্ষণস্থায়ী বুদ্ধির মানদণ্ডে আল্লাহর অনন্ত প্রজ্ঞাকে মাপা যায় না। বাদশাহ তাঁর মেহমানদের জন্য প্রাসাদ প্রস্তুত করে রাখেন—একে কেউ অনর্থক বলে না। তদ্রূপ আল্লাহ তাঁর চিরন্তন কুদরতে জান্নাত ও জাহান্নাম সুসজ্জিত রেখেছেন। যারা এর অস্তিত্ব অস্বীকার করে তারা কুরআনের অকাট্য নসকে অস্বীকারকারী।
١٠- عرف المعراج . ثم اثبت بالأدلة أن المعراج لرسول الله صلى الله عليه وسلم كان في اليقظة لا في المنام
[১০. মি’রাজের পরিচয় দাও। মি’রাজ যে জাগ্রত অবস্থায় হয়েছিল স্বপ্নে নয়—তা দলীলসহ প্রমাণ কর।]
১. ইসরা ও মি’রাজের পরিচয়:
– ইসরা (الإسراء): রাতের বেলা পবিত্র কাবা শরীফ (মসজিদুল হারাম) থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস (মসজিদুল আক্বসা) পর্যন্ত প্রিয়নবীর অলৌকিক নৈশ ভ্রমণকে ইসরা বলে।
– মি’রাজ (المعراج): আভিধানিক অর্থ সিঁড়ি বা ঊর্ধ্বগমনের বাহন। শরীয়তের পরিভাষায়, বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে উর্ধ্বাকাশসমূহ পেরিয়ে সিদরাতুল মুনতাহা হয়ে আরশে আযীমে আল্লাহর খাস সান্নিধ্যে সশরীরে বিশ্বনবীর আরোহণকে মি’রাজ বলে। মি’রাজে উম্মতের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত সালাত উপহার দেওয়া হয়েছিল।
২. মি’রাজ জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে সংঘটিত হওয়ার অকাট্য দলীলসমূহ:
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অকাট্য আকিদা হলো—মি’রাজ কোনো স্বপ্নযোগের বিষয় ছিল না, বরং তা পূর্ণ জাগ্রত অবস্থায় দেহ ও আত্মার সমন্বয়ে (روحاً وجسداً في اليقظة) সংঘটিত হয়েছিল। এর অকাট্য প্রমাণাদি নিম্নরূপ:
১. ‘আব্দ’ (عبد) শব্দের তাৎপর্য: কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَىٰ بِعَبْدِهِ لَيْلًا (সূরা বনী ইসরাঈল: ১)। আরবী ভাষা ও শরীয়তের সর্বসম্মত নিয়মানুযায়ী ‘আব্দ’ শব্দটি কেবল রূহকে বলা হয় না, বরং দেহ ও আত্মার সমন্বিত জীবন্ত সত্তাকেই ‘আব্দ’ বলা হয়। রূহের সফরের ক্ষেত্রে ‘বি-আবদিহী’ শব্দ প্রযোজ্য হতো না।
২. কুরাইশ কাফিরদের তুমুল বিরোধিতা: মি’রাজের কথা শুনে মক্কার মুশরিকরা তীব্র উপহাস ও অস্বীকার করেছিল। এটি যদি স্বপ্ন হতো, তবে তারা কখনই আপত্তি তুলত না; কারণ যেকোনো সাধারণ মানুষই স্বপ্নে আকাশ ও দূর-দূরান্ত দেখতে পারে। কাফিরদের হট্টগোল ও অস্বীকারই প্রমাণ করে যে রাসূল (সা.) সশরীরে জাগ্রত অবস্থার শারীরিক আকাশ ভ্রমণের ঘোষণা দিয়েছিলেন।
৩. বুরাক নামক বাহনে আরোহণ: হাদীসে এসেছে রাসূল (সা.) বুরাকে সওয়ার হয়েছিলেন। স্বপ্ন বা নিছক রূহের জন্য কোনো বাহনের আরোহণের প্রয়োজন হয় না; বাহন কেবল শারীরিক ভ্রমণের জন্যই ব্যবহৃত হয়।
৪. ‘সুবহানা’ (سبحان) শব্দের প্রয়োগ: কোনো সাধারণ স্বপ্নের ক্ষেত্রে আরবরা ‘সুবহানাল্লাহ’ বলে বিস্ময় প্রকাশ করে না; অলৌকিক ও মানবীয় শক্তির ঊর্ধ্বে মহাবিস্ময়কর শারীরিক ঘটনা বলেই আল্লাহ ‘সুবহানাল্লাযী’ দিয়ে আয়াত শুরু করেছেন। হযরত আবু বকর (রা.) এই ঘটনা দ্বিধাহীন চিত্তে বিশ্বাস করেই ‘সিদ্দীক্ব’ উপাধিতে ভূষিত হন।
١١- اكتب عشرة كتب تتعلق بالعقيدة الإسلامية مع ذكر مؤلفيها
[১১. ইসলামী আক্বীদা শাস্ত্রের শীর্ষ ১০টি বিখ্যাত মৌলিক কিতাব ও তাদের সম্মানিত রচয়িতাগণের নাম উল্লেখ কর।]
ইসলামী আক্বীদা ও ইলমুল কালামের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য হাজার বছরের সোনালী ইতিহাস ধারণ করে আছে। নিম্নে ইতিহাসের সর্বাধিক প্রামাণ্য ১০টি মৌলিক আক্বীদা গ্রন্থ এবং তাঁদের অমর রচয়িতাগণের তালিকা পেশ করা হলো:
| ক্রম | গ্রন্থের নাম (اسم الكتاب) | সম্মানিত গ্রন্থকারের নাম (المؤلف) | ওফাত সাল | গ্রন্থের প্রধান গুরুত্ব ও বিশেষত্ব |
|---|---|---|---|---|
| ১ | আল-ফিকহুল আকবার (الفقه الأكبر) | ইমামুল আযম আবু হানীফা নু’মান ইবনে সাবিত (রহ.) | ১৫০ হি. | আহলুস সুন্নাহর প্রাচীনতম আক্বীদা সংকলন। |
| ২ | আল-আক্বীদাতুত তাহাবিয়্যাহ (العقيدة الطحاوية) | ইমাম আবু জাফর আহমদ ইবনে মুহাম্মদ আত-তাহাবী (রহ.) | ৩২১ হি. | সালাফ ও সালাফে সালেহীনের সর্বজনগ্রাহ্য আক্বীদা বয়ান। |
| ৩ | কিতাবুত তাওহীদ (كتاب التوحيد) | ইমাম আবু মানসূর মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ আল-মাতুরীদী (রহ.) | ৩৩৩ হি. | মাতুরীদী কালাম শাস্ত্রের মূল মৌলিক বুনিয়াদ। |
| ৪ | আল-ইবানাহ আন উসূলিদ দিয়ানাহ (الإبانة عن أصول الديانة) | ইমাম আবুল হাসান আলী ইবনে ইসমাঈল আল-আশ’আরী (রহ.) | ৩২৪ হি. | আশ’আরী কালামের ভিত্তি ও মু’তাযিলাদের খণ্ডন। |
| ৫ | তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (تبصرة الأدلة في أصول الدين) | ইমাম আবুল মুঈন মাইমুন আন-নাসাফী (রহ.) | ৫০৮ হি. | মাতুরীদী দর্শনের সর্ববৃহৎ প্রামাণ্য বিশ্বকোষ। |
| ৬ | বাহরুল কালাম ফী ইলমিল কালাম (بحر الكلام) | ইমাম আবুল মুঈন মাইমুন আন-নাসাফী (রহ.) | ৫০৮ হি. | প্রশ্নোত্তর শৈলীতে আক্বীদার জটিল সমস্যার সমাধান। |
| ৭ | আল-আক্বায়েদুন নাসাফিয়্যাহ (العقائد النسفية) | ইমাম নাজমুদ্দীন আবু হাফস উমর আন-নাসাফী (রহ.) | ৫৩৭ হি. | ইসলামী বিশ্বের সর্বাধিক পঠিত আক্বীদা পাঠ্যপুস্তক। |
| ৮ | আল-ইক্বতিসাদ ফিল ই’তিক্বাদ (الاقتصاد في الاعتقاد) | হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম আবু হামিদ আল-গাযযালী (রহ.) | ৫০৫ হি. | যুক্তি ও দর্শনের সুষম সমন্বয়ে রচিত আশ’আরী আক্বীদা। |
| ৯ | আল-আক্বীদাতুল ওয়াসিতিয়্যাহ (العقيدة الواسطية) | শাইখুল ইসলাম ইমাম আহমদ ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) | ৭২৮ হি. | সালাফী ধারার আসমা ও সিফাত সংক্রান্ত প্রামাণ্য গ্রন্থ। |
| ১০ | শারহুল আক্বায়েদিন নাসাফিয়্যাহ (شرح العقائد النسفية) | আল্লামা সা’দুদ্দীন মাসউদ ইবনে উমর আত-তাফতাযানী (রহ.) | ৭৯৩ হি. | উচ্চতর কালাম শাস্ত্রের প্রামাণ্য ও কালজয়ী ব্যাখ্যাগ্রন্থ। |
١٢- تحدث عن نواقض الإيمان في ضوء القرآن والسنة
[১২. কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ঈমান ভঙ্গকারী বিষয়সমূহ (নাওয়াক্বিযুল ঈমান) বিস্তারিত আলোচনা কর।]
১. নাওয়াক্বিযুল ঈমানের পরিচয় ও গুরুত্ব:
যে সমস্ত বিশ্বাস, বাক্য বা কর্মের মাধ্যমে একজন ব্যক্তির অন্তরের ঈমান বিনষ্ট হয়ে যায় এবং সে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের হয়ে কুফর ও মুরতাদ অবস্থায় পতিত হয়, শরীয়তের পরিভাষায় সেগুলোকে ‘নাওয়াক্বিযুল ঈমান’ (نواقض الإيمان) বলা হয়। ওযুর যেমন ভঙ্গকারী কারণ রয়েছে, তেমনি ঈমানের সুরক্ষায় এর ভঙ্গকারী বিষয়গুলো জানা প্রতিটি মুসলিমের জন্য অপরিহার্য।
২. কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে প্রধান প্রধান নাওয়াক্বিযুল ঈমান:
১. আল্লাহর সাথে শিরক স্থাপন করা: আল্লাহর ইবাদত, রুবূবিয়্যাহ বা সিফাতে কাউকে অংশীদার করা। আল্লাহ ইরশাদ করেন: “নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শিরক করবে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করেছেন” (সূরা মায়িদাহ: ৭২)।
২. আল্লাহ ও বান্দার মাঝে মাধ্যম সাব্যস্ত করে তাদের নিকট দুআ করা: মুশরিকদের মতো বিশ্বাস করা যে মাধ্যম ব্যতীত আল্লাহ সরাসরি শোনেন না, ফলে তাদের নিকট মুক্তি ও সুপারিশ কামনা করা।
৩. কাফির-মুশরিকদের কাফির মনে না করা: ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান বা কোনো সুস্পষ্ট কুফরী মতবাদের অনুসারীদের কাফির বলতে সংশয় প্রকাশ করা বা তাদের ধর্মকে সত্য মনে করা।
৪. রাসূলের আদর্শের চেয়ে মানব রচিত মতবাদকে উত্তম বা সমকক্ষ মনে করা: ইসলামী শরীয়ত ও হুদূদের আইনকে অচল, বর্বর বা অপ্রয়োজনীয় মনে করা এবং ধর্মনিরপেক্ষ আইনকে দ্বীনের চেয়ে প্রগতিশীল ভাবা।
৫. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আনীত কোনো বিধান বা সুন্নাহকে ঘৃণা করা: এমনকি কোনো ব্যক্তি বাহ্যিকভাবে তা পালন করলেও অন্তরে যদি তার প্রতি বিদ্বেষ থাকে, তবে সে কাফির হয়ে যাবে (সূরা মুহাম্মদ: ৯)।
৬. দ্বীনের কোনো বিষয় নিয়ে উপহাস বা ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করা: দাঁড়ি, টুপি, পর্দা, নামায বা কুরআনের কোনো আয়াত নিয়ে হাসিঠাট্টা করা কুফর। আল্লাহ বলেন: “তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াত ও তাঁর রাসূলকে নিয়ে উপহাস করছিলে? কোনো ওজর পেশ করো না, তোমরা ঈমান আনার পর কাফির হয়ে গেছ” (সূরা আত-তাওবাহ: ৬৫-৬৬)।
৭. যাদুবিদ্যা ও তুকতাক করা বা তাতে সন্তুষ্ট থাকা: কুরআনে যাদুকে কুফর সাব্যস্ত করা হয়েছে (সূরা বাক্বারা: ১০২)।
৮. মুসলিমদের বিরুদ্ধে কাফিরদের সাহায্য-সহযোগিতা করা: ইসলামকে মিটিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে কুফরী শক্তির পক্ষে অস্ত্র ধরা বা মিত্রতা করা।
١٣- ما المراد بالإيمان بالقدر خيره وشره من الله تعالى؟ اوضح عقيدة أهل السنة والجماعة وعقيدة المعتزلة في هذه المسألة
[১৩. তাকদীরের ভালো-মন্দ আল্লাহর পক্ষ থেকে হওয়ার মর্মার্থ কী? এ বিষয়ে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআত ও মু’তাযিলাদের আক্বীদা পরিষ্কার কর।]
১. তাকদীরের পরিচয় ও মর্মার্থ:
‘ক্বদর’ (القدر) অর্থ পরিমাপ, নির্ধারণ বা চূড়ান্ত ফায়সালা। তাকদীরের ওপর ঈমানের অর্থ হলো—আল্লাহ তাআলা অনাদিকাল থেকেই তাঁর অনন্ত ইলম দ্বারা মহাবিশ্বের সৃষ্টির আদোপান্ত সমস্ত অবস্থা, প্রতিটি মানুষের ভালো-মন্দ আমল, রিযিক্ব, হায়াত ও চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে সম্যক অবগত আছেন এবং তাঁর পরম ইচ্ছা ও ফায়সালা অনুযায়ীই সমস্ত বিশ্ব পরিচালিত হচ্ছে।
২. আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের ভারসাম্যপূর্ণ আক্বীদা:
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআত (মাতুরীদী ও আশ’আরী)-এর আক্বীদা অনুযায়ী:
১. ভালো ও মন্দ উভয়ের একক স্রষ্টা আল্লাহ: মহাবিশ্বের ভালো কাজ ও মন্দ কাজ সবকিছুর মূল স্রষ্টা হলেন একমাত্র আল্লাহ তাআলা (خالق الخير والشر)। কারণ আল্লাহর রাজত্বে তাঁর সৃষ্টির বাইরে দ্বিতীয় কোনো স্রষ্টা থাকতে পারে না।
২. বান্দার কাসব (الكسب) ও ইচ্ছাশক্তি: আল্লাহ সমস্ত কাজের স্রষ্টা হলেও বান্দাকে তিনি ইচ্ছাশক্তি (ইখতিয়ার) দান করেছেন। বান্দা যখন ভালো কাজের ইচ্ছা করে আল্লাহ তাকে সওয়াব দেন, আর মন্দ কাজের ইচ্ছা ও উপার্জন (কাসব) করলে সে গুনাহগার হয় এবং শাস্তি ভোগ করে।
৩. ইচ্ছা বনাম সন্তুষ্টি: কুফর ও পাপ আল্লাহর সার্বিক সৃষ্টি ও তাকদীরের ইচ্ছায় (ইরাদায়ে কাউনিয়্যাহ) ঘটলেও এতে আল্লাহর কোনো সন্তুষ্টি ও সম্মতি (রিযা) নেই।
৩. মু’তাযিলাদের বিভ্রান্তিকর দর্শন ও তার খণ্ডন:
মু’তাযিলারা দাবি করেছিল—আল্লাহ কোনো মন্দের বা পাপের স্রষ্টা হতে পারেন না। তাদের মতে মানুষ নিজেই তার ভালো ও মন্দ সমস্ত কর্মের একক স্বাধীন স্রষ্টা (خالق أفعال العباد)।
আহলুস সুন্নাহর খণ্ডন: ইমাম আবুল মুঈন নাসাফী বলেন, মু’তাযিলারা আল্লাহকে মন্দ থেকে পবিত্র করতে গিয়ে মহাবিশ্বে কোটি কোটি স্বাধীন স্রষ্টা বানিয়ে ফেলেছে; যার ফলে তারা ‘ক্বাদরিয়্যাহ’ হিসেবে মাজূসী বা অগ্নিপূজকদের মতো দ্বৈত স্রষ্টাবাদে লিপ্ত হয়েছে। রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন: “ক্বাদরিয়্যাহ সম্প্রদায় হলো এই উম্মতের মাজূস।” আহলুস সুন্নাহ প্রমাণ করেন যে একক প্রভুত্ব একমাত্র আল্লাহরই জন্য নির্দিষ্ট।
١٤- إن الله لما خلق الخلق وأخذ منهم الميثاق في عالم الأرواح هل كانوا مؤمنين أم كافرين؟ بين المسألة مفصلا مع توضيح الفرق بين عقيدة أهل السنة والجماعة وعقيدة الجبرية فيها
[১৪. রূহ জগতে অঙ্গীকার নেওয়ার সময় মানুষ কি মুমিন ছিল না কাফির ছিল? আহলুস সুন্নাত বনাম জাবরিয়াদের আক্বীদার আলোকে বিষয়টি বিস্তারিত ব্যাখ্যা কর।]
১. আলমুল আরওয়াহ ও মীসাক্বের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা হযরত আদম (আ.)-এর পৃষ্ঠদেশ হতে কিয়ামত পর্যন্ত আগমনকারী সমস্ত মানবাত্মাকে বের করে একটি ঐতিহাসিক অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন: “وَإِذْ أَخَذَ رَبُّكَ مِنْ بَنِي آدَمَ مِنْ ظُهُورِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَأَشْهَدَهُمْ عَلَىٰ أَنْفُسِهِمْ أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ ۖ قَالُوا بَلَىٰ”—”আর স্মরণ কর, যখন তোমার রব বনী আদমের পৃষ্ঠদেশ হতে তাদের বংশধরদের বের করলেন এবং তাদের নিজেদের ওপর সাক্ষ্য রেখে বললেন—আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই? তারা সমস্বরে বলল—অবশ্যই! আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি” (সূরা আল-আ’রাফ: ১৭২)।
২. রূহ জগতে তারা কি মুমিন ছিল নাকি কাফির ছিল? (বিশদ ফায়সালা):
ইমাম আবুল মুঈন নাসাফী ‘বাহরুল কালাম’-এ উল্লেখ করেন যে, এ বিষয়ে উলামায়ে কেরামের তাহকীক্বী সিদ্ধান্ত হলো:
১. ফিতরাত ও তাওহীদের স্বীকৃতি: রূহ জগতে সমস্ত মানুষ আল্লাহর রুবূবিয়্যাহর মুখে স্বীকৃতি দিয়েছিল এবং ফিতরাতের মানদণ্ডে তারা সকলে একই তাওহীদের রজ্জুতে আবদ্ধ ছিল। সেখানে কেউ বিদ্রোহী বা কাফির হিসেবে ঘোষণা দেয়নি।
২. আল্লাহর অনাদি ইলমের ভেদ: তবে মহান আল্লাহ তাঁর অনাদি ইলমে সুনিশ্চিতভাবে জানতেন যে, তাদের মধ্যে কে দুনিয়ায় গিয়ে শয়তান ও নফসের প্ররোচনায় কাফির হবে এবং কে মুমিন থাকবে। অতএব তাদের স্বীকৃতি ছিল বাহ্যিক ফিতরাতের প্রকাশ, কিন্তু আন্তরিক নিষ্ঠার ভিন্নতা আল্লাহর জ্ঞানে পূর্বনির্ধারিত ছিল।
৩. আহলুস সুন্নাত বনাম জাবরিয়া সম্প্রদায়ের পার্থক্য:
– জাবরিয়াদের বিভ্রান্তিকর আক্বীদা: জাবরিয়ারা (ইমাম জাহম ইবনে সাফওয়ান প্রমুখ) দাবি করে যে মানুষ রূহ জগতে যেমনি নির্ধারিত ছিল, দুনিয়ায় সে বাতাসতাড়িত শুকনো পাতার মতো সম্পূর্ণ নিরুপায় ও বাধ্য (মাজবূর)। মানুষের নিজস্ব কোনো ইচ্ছা, সংকল্প বা কর্মক্ষমতা নেই; ফলে কাফির তার কুফরের জন্য দায়ী নয়। এটি এক চরম কুফরী মতবাদ যা শরীয়ত ও বিচার দিবসকে অর্থহীন করে দেয়।
– আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের ভারসাম্য: আহলুস সুন্নাহ প্রমাণ করেন যে আল্লাহ মানুষকে বিবেক ও ইচ্ছার স্বাধীনতা (ইখতিয়ার) দিয়েছেন। মানুষ তার সেই ইচ্ছা প্রয়োগ করেই ঈমান অথবা কুফর বেছে নেয়। তাই দুনিয়ার কর্মের ভিত্তিতেই পরকালে জান্নাত ও জাহান্নামের ন্যায়সঙ্গত বিচার বাস্তবায়িত হবে।
١٥- قال الله عز وجل “يد الله فوق أيديهم” . ما عقيدة أهل السنة والجماعة والمعتزلة والمشبهة في إثبات اليد لله تعالى؟
[১৫. “আল্লাহর হাত তাদের হাতের ওপর”—আয়াতের আলোকে আল্লাহর ‘হাত’ সাব্যস্তকরণে আহলুস সুন্নাত, মু’তাযিলা ও মুশাব্বিহাদের আক্বীদা পর্যালোচনা কর।]
১. আয়াতের প্রেক্ষাপট:
ষষ্ঠ হিজরীতে হুদাইবিয়ার প্রান্তরে যখন কাফিরদের ষড়যন্ত্রের মুখে চৌদ্দশত সাহাবী বিশ্বনবীর হাতে জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করার বাইআতুর রিদওয়ান সম্পাদন করেছিলেন, তখন আল্লাহ তাআলা এই সুসংবাদ অবতীর্ণ করেন: “إِنَّ الَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ اللَّهَ يَدُ اللَّهِ فَوْقَ أَيْدِيهِمْ”—”নিশ্চয় যারা আপনার নিকট আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করছে, তারা তো মূলত আল্লাহর নিকটই বাইআত হচ্ছে; আল্লাহর হাত তাদের হাতের ওপর রয়েছে” (সূরা আল-ফাতহ: ১০)।
২. বিভিন্ন সম্প্রদায়ের আক্বীদা পর্যালোচনা:
(ক) আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সুদৃঢ় অবস্থান:
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআত আল্লাহর শান অনুযায়ী ‘হাত’ (সিফাতুল ইয়াদ)-এর সত্যতায় বিশ্বাসী। তবে তাঁদের মাঝে দুটি চমৎকার ও নিরাপদ ধারা রয়েছে:
১. সালাফে সালেহীন ও মুহাদ্দিছীনদের মানহাজ (মাজহাবুত তাফবীয): আমরা আল্লাহর জন্য ‘ইয়াদ’ (হাত) গুণটি সাব্যস্ত করি কোনো প্রকার মানুষের হাতের সাথে তুলনা (তাশবীহ), অঙ্গ বা দেহের ধারণা (তাজসীম) এবং অর্থহীন বা বাতিল করা (তা’তীল) ব্যতীত। আল্লাহর হাত কেমন তা একমাত্র আল্লাহই জানেন। ইমাম মালেক বলেন: “ইয়াদ সাব্যস্ত হওয়া নিশ্চিত, কিন্তু এর স্বরূপ মানুষের কল্পনাতীত এবং এ নিয়ে বাড়াবাড়ি করা বিদআত।”
২. খালাফ ও কালামবিদদের মানহাজ (মাজহাবুত তা’বীল): সাধারণ মানুষকে সৃষ্টির মতো হাত ভাবা থেকে মুক্ত রাখতে আরবী অলঙ্কার শাস্ত্রের নিয়মানুযায়ী ‘ইয়াদ’ অর্থ আল্লাহর মহাশক্তি, সাহায্য, সার্বভৌম কুদরত ও হিফাযত হিসেবে ব্যাখ্যা করা জায়েয।
(খ) মু’তাযিলাদের বিভ্রান্তি:
মু’তাযিলারা আল্লাহর সিফাতকে অস্বীকার করে দাবি করে যে আল্লাহর কোনো হাত নামক সিফাতই নেই। তারা কেবল রূপক শক্তি অর্থে সীমাবদ্ধ রেখে সিফাতকে অস্তিত্বহীন করে দেয়, যা নস অস্বীকারের শামিল।
(গ) মুশাব্বিহা ও মুজাসসিমাদের কুফরী দর্শন:
মুশাব্বিহা ও মুজাসসিমা সম্প্রদায় আল্লাহকে মানুষের মতো গোশত, রক্ত ও অস্থিমজ্জার হাতবিশিষ্ট দেহধারী সত্তা কল্পনা করে চরম শিরক ও কুফরিতে নিপতিত হয়েছে। আহলুস সুন্নাহ দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন: “লাইসা কামিছলিহী শাই”—আল্লাহর সমতুল্য কোনো সৃষ্টিজগতে কিছুই নেই।
١٦- هل القرآن مخلوق أم قديم؟ ما الخلاف فيه؟ بين مفصلا ومدللا
[১৬. কুরআন কি সৃষ্টি (মাখলূক্ব) নাকি অনাদি (ক্বাদীম)? এ বিষয়ে ঐতিহাসিক বিরোধ ও দলীলভিত্তিক ফায়সালা বিস্তারিত লিখ।]
১. কুরআন মাখলূক্ব সমস্যার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও মহাবিপদ (ফিতনাতু খালক্বিল কুরআন):
হিজরী তৃতীয় শতকে আব্বাসীয় খলীফা আল-মামুন, মু’তাসিম ও ওয়াসিক্ব বিল্লাহর শাসনামলে মু’তাযিলা দার্শনিক আহমদ ইবনে আবি দুআদের প্ররোচনায় রাজকীয় ফরমান জারি করা হয় যে—কুরআন আল্লাহর সৃষ্ট (মাখলূক্ব)। তৎকালীন সমস্ত উলামায়ে কেরামকে এই কুফরী আকিদা মেনে নিতে বাধ্য করা হয় এবং যারা অস্বীকার করেন তাদের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালানো হয় (যাকে ইতিহাসে ‘মিহনা’ বলা হয়)। ইমামুল মুহাদ্দিছীন আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) চাবুকের নির্মম আঘাত সহ্য করেও অবিচল থেকে ঘোষণা করেছিলেন—”কুরআন আল্লাহর কালাম, তা কখনই মাখলূক্ব নয়।”
২. আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অকাট্য আক্বীদা ও দলীল:
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআত (মাতুরীদী, আশ’আরী ও সালাফ)-এর সর্বসম্মত মৌলিক আক্বীদা হলো—পবিত্র কুরআন মহান আল্লাহর চিরন্তন ও অনাদি কালাম (كلام الله قديم غير مخلوق); এটি কোনো সৃষ্টি নয়।
– দলীল ১ (কুরআন হতে): আল্লাহ ইরশাদ করেন: “أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ”—”জেনে রেখো! সৃষ্টি যার, নির্দেশ ও বিধানও (আমর) তাঁরই” (সূরা আল-আ’রাফ: ৫৪)। আয়াতে সৃষ্টিজগৎ (আল-খালক্ব) এবং আল্লাহর কালাম ও নির্দেশকে (আল-আমর) সম্পূর্ণ পৃথক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কালাম যদি সৃষ্টির অংশ হতো তবে তাকে পৃথক করা হতো না।
– দলীল ২: আল্লাহ বলেন: “وَإِنْ أَحَدٌ مِنَ الْمُشْرِكِينَ اسْتَجَارَكَ فَأَجِرْهُ حَتَّىٰ يَسْمَعَ كَلَامَ اللَّهِ”—”মুশরিকদের কেউ আশ্রয় চাইলে দাও, যাতে সে আল্লাহর কালাম শুনতে পায়” (সূরা আত-তাওবাহ: ৬)। এখানে কুরআনকে সরাসরি ‘কালামুল্লাহ’ বলা হয়েছে। আল্লাহর সিফাত কখনই নশ্বর বা সৃষ্ট হতে পারে না।
৩. কালামে নাফসী ও কালামে লাফযীর সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ (ইমাম নাসাফীর তাহকীক্ব):
ইমাম আবুল মুঈন নাসাফী ‘বাহরুল কালাম’-এ অত্যন্ত চমৎকারভাবে বিষয়টি সমাধান করেছেন:
১. কালামে নাফসী (الكلام النفسي): আল্লাহর পবিত্র সত্তায় বিরাজমান অনাদি, চিরন্তন অর্থ ও গুণবাচক কালাম—যা শব্দ, ধ্বনি ও হরফের মুখাপেক্ষী নয়। এটি নির্ভেজালভাবে ক্বাদীম বা অসৃষ্ট।
২. কালামে লাফযী বা নাযম (الكلام اللفظي): মানুষের মুখে উচ্চারিত আরবী আওয়াজ, মস্তিষ্কের মুখস্থ স্মৃতি এবং কাগজে লিখিত কালি ও কাগজের পাতা—যা সৃষ্টির নশ্বর মাধ্যম। কিন্তু এই মাধ্যমের দ্বারা যা তিলাওয়াত ও প্রকাশ করা হয়, সেই মূল বক্তব্য ও বাণীটি আল্লাহর অনাদি কালাম। সুতরাং সামগ্রিকভাবে কুরআনকে মাখলূক্ব বলা সুস্পষ্ট গোমরাহী ও বিদআত।
١٧- اكتب ما تعلم عن ختم النبوة
[১৭. খতমে নবুওয়াত (ختم النبوة) সম্পর্কে যা জান সংক্ষেপে গুছিয়ে লিখ।]
১. খতমে নবুওয়াতের অর্থ ও আক্বীদা:
‘খতম’ (ختم) অর্থ সমাপ্ত করা বা মোহরাঙ্কিত করা। ইসলামী পরিভাষায়, হযরত আদম (আ.) হতে শুরু হওয়া নবুওয়াত ও রিসালাতের সুদীর্ঘ পবিত্র ধারার চূড়ান্ত পরিসমাপ্তি বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র আগমনের মাধ্যমে চিরতরে ঘটে যাওয়াকে ‘খতমে নবুওয়াত’ বলা হয়। প্রিয়নবী (সা.) হলেন ‘খাতামুন্নাবিয়্যীন’ বা সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী; তাঁর পরে কিয়ামত পর্যন্ত আর কোনো নতুন নবীর আগমন ঘটবে না।
২. কুরআন ও সুন্নাহর অকাট্য দলীলসমূহ:
১. পবিত্র কুরআনের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা: আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্ট ভাষায় ইরশাদ করেন: “مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِنْ رِجَالِكُمْ وَلَٰكِنْ رَسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ”—”মুহাম্মদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং সর্বশেষ নবী” (সূরা আল-আহযাব: ৪০)। সমগ্র তাফসীর শাস্ত্রের পণ্ডিতগণ একমত যে ‘খাতামুন্নাবিয়্যীন’-এর অর্থ নবীদের সিলমোহর অর্থাৎ পরিসমাপ্তকারী।
২. মুতাওয়াতির হাদীসের প্রমাণ: নবী করীম (সা.) দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ইরশাদ করেছেন: “أَنَا خَاتَمُ النَّبِيِّينَ لَا نَبِيَّ بَعْدِي”—”আমিই সর্বশেষ নবী, আমার পরে কোনো নবী নেই” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)। অপর এক হাদীসে তিনি নবুওয়াতকে একটি সুদৃশ্য প্রাসাদের সাথে তুলনা করে নিজেকে তার শেষ পূর্ণতাদানকারী কোণার ইট হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
৩. সাহাবায়ে কেরামের ঐতিহাসিক ইজমা ও অস্বীকারকারীর শারঈ হুকুম:
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পরপরই যখন মুসাইলামা কাযযাব ও আল-আসওয়াদ আল-আনসী নবুওয়াতের দাবি করেছিল, তখন প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর সিদ্দীক্ব (রা.)-এর নেতৃত্বে সাহাবায়ে কেরাম সর্বসম্মতভাবে তাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক জিহাদ ঘোষণা করেন এবং ইয়ামামার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে তাদের নিশ্চিহ্ন করেন। অতএব খতমে নবুওয়াত হলো ইসলামের এমন এক অকাট্য মৌলিক আক্বীদা (জরূরিয়্যাতে দ্বীন), যা অস্বীকারকারী ব্যক্তি সর্বসম্মতিক্রমে কাফির, মুরতাদ এবং ইসলামের গণ্ডি থেকে সম্পূর্ণ বহিষ্কৃত। আধুনিক যুগের মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীসহ যারা নতুন নবীর দাবি করে, তারা সকলেই চরম ভণ্ড ও দাজ্জাল।
١٨- ما معنى الإيمان بالآخرة؟ اشرح
[১৮. আখিরাতের ওপর ঈমান আনার অর্থ ও তাৎপর্য সংক্ষেপে ব্যাখ্যা কর।]
১. আখিরাতের পরিচয় ও আভিধানিক অর্থ:
‘আখিরাত’ (الآخرة) শব্দটি ‘আওয়াল’ (প্রথম)-এর বিপরীত, যার অর্থ পরকাল বা পরবর্তী চিরস্থায়ী জীবন। ইসলামী আক্বীদার পরিভাষায়, মানুষের পার্থিব ক্ষণস্থায়ী মৃত্যুর পর থেকে শুরু করে বরযখের জীবন, কিয়ামত, কবরের পুনরুত্থান, হাশরের ময়দানে বিচার, আমলনামা ওজন, পুলসিরাত এবং চূড়ান্তভাবে জান্নাত বা জাহান্নামে প্রবেশের শাশ্বত জীবনে অটুট বিশ্বাস স্থাপন করাকে আখিরাতের ওপর ঈমান বলা হয়। এটি ঈমানের অন্যতম অপরিহার্য রুকন, যা অস্বীকার করলে ব্যক্তি তাৎক্ষণিকভাবে কাফির হয়ে যায়।
২. আখিরাতে বিশ্বাসের অপরিহার্য অনুষঙ্গসমূহ:
১. কবরের জীবন ও সওয়াল-জওয়াব: মুনকার ও নাকীর ফেরেশতাদ্বয়ের তিনটি মৌলিক প্রশ্ন (রব, দ্বীন ও নবী সম্পর্কে) এবং কবরের আজাব ও নিয়ামত সত্য। সৎ মুমিনের জন্য কবর হবে জান্নাতের এক সুশীতল উদ্যান, আর কাফির ও ফাসিক্বের জন্য হবে জাহান্নামের অগ্নিগহ্বর।
২. মহাপ্রলয় ও পুনরুত্থান (البعث بعد الموت): হযরত ইসরাফীল (আ.)-এর শিঙ্গার প্রথম ফুঁৎকারে সমগ্র মহাবিশ্ব ধ্বংস হবে এবং দ্বিতীয় ফুঁৎকারে সমস্ত মানুষ সশরীরে পুনরায় জীবিত হয়ে এক মহা প্রান্তরে সমবেত হবে।
৩. হাশরের ময়দান ও আরশের ছায়া: সূর্যালোক মাত্র এক মাইল উপরে থাকবে, মানুষ নিজ নিজ পাপে ঘামে নিমজ্জিত হবে। সেদিন সাত শ্রেণির নেককার বান্দা আল্লাহর আরশের শীতল ছায়াতলে আশ্রয় লাভ করবে।
৪. হিসাব-নিকাশ, আমলনামা ও মীযান: বান্দার পুঙ্খানুপুঙ্খ নেক ও বদ আমলের পরিমাপ দাঁড়িপাল্লায় সত্য ও নিখুঁতভাবে নির্ধারিত হবে। মুমিনের ডান হাতে এবং পাপীর বাম হাতে আমলনামা দেওয়া হবে।
৫. হাওযে কাওসার ও পুলসিরাত: প্রিয়নবীর পবিত্র হাত থেকে হাউজে কাওসারের সুপেয় পানি পান এবং জাহান্নামের ওপর স্থাপিত চুলের চেয়ে সূক্ষ্ম ও তলোয়ারের চেয়ে ধারালো পুলসিরাত ঈমান অনুযায়ী ক্ষিপ্রগতিতে অতিক্রম।
৬. চিরস্থায়ী জান্নাত ও জাহান্নাম: পুণ্যবান মুমিনদের চিরশান্তির জান্নাত এবং কাফিরদের চিরন্তন শাস্তির জাহান্নাম।
৩. মানব জীবনে আখিরাতে বিশ্বাসের বৈপ্লবিক প্রভাব:
আখিরাতের বিশ্বাস মানুষকে পার্থিব জীবনের মোহ, লোভ, অহংকার ও পাপপঙ্কিলতা থেকে মুক্ত করে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে আত্মনিবেদনে উদ্বুদ্ধ করে। পরকালের জবাবদিহিতার অনুভূতিই সমাজে ইনসাফ, সততা, দুর্নীতিমুক্তি ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার একমাত্র সুদৃঢ় বুনিয়াদ।
١٩- تكلم عن الصفات الإلهية
[১৯. মহান আল্লাহর ঐশী গুণাবলী (সিফাতে ইলাহিয়্যাহ) সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা কর।]
১. আল্লাহর সিফাতের পরিচয় ও আহলুস সুন্নাতের আক্বীদা:
মহান আল্লাহ কেবল একটি বিমূর্ত অস্তিত্ব নন; বরং তিনি অনন্ত পূর্ণতা ও সৌন্দর্যের অধিকারী বহু মহিমান্বিত গুণাবলীতে (সিফাত) গুণান্বিত। আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অকাট্য বিশ্বাস হলো—আল্লাহর যাবতীয় সিফাত তাঁর সত্তার মতোই অনাদি (ক্বাদীম) ও চিরন্তন। তাঁর কোনো গুণাবলী সৃষ্টির পর নতুন করে অর্জিত হয়নি। কালামবিদগণ চমৎকার মূলনীতি প্রণয়ন করেছেন: “صفات الله تعالى ليست بعين الذات ولا بغير الذات”—আল্লাহর সিফাতসমূহ তাঁর সত্তা হতে সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো বস্তুও নয়, আবার সত্তা হতে বিচ্ছিন্নও নয়।
২. সিফাতে ইলাহিয়্যাহর প্রধান প্রকারভেদ:
আহলুস সুন্নাহর মাতুরীদী ও আশ’আরী কালামবিদগণ আল্লাহর সিফাতকে প্রধানত দুটি ভাগে বিন্যস্ত করেছেন:
১. সিফাতে যাতিয়্যাহ বা সালবিয়্যাহ (الصفات الذاتية السلبية): যে গুণাবলী আল্লাহর সত্তার জন্য আবশ্যক এবং যার বিপরীত ত্রুটিযুক্ত গুণ কল্পনা করাও অসম্ভব; যেমন—আল-উজূদ (অস্তিত্ব), আল-ক্বিদাম (অনাদিত্ব), আল-বাকা (চিরস্থায়িত্ব), আল-মুখালাফাতু লিল হাওয়াদিস (সৃষ্টির সাথে পূর্ণ অসাদৃশ্যতা), এবং আল-ক্বিয়ামু বিন নাফস (কারও মুখাপেক্ষী না হওয়া)।
২. সিফাতে ছূবূতিয়্যাহ বা মা’আনী (الصفات الثبوتية المعنوية): যে সকল পূর্ণাঙ্গ গুণ আল্লাহর সত্তায় কার্যকরভাবে বিদ্যমান। এগুলো আশ’আরীদের মতে ৭টি এবং মাতুরীদী মাযহাব মতে ৮টি: (১) আল-হায়াত (চিরঞ্জীব হওয়া), (২) আল-ইলম (সর্বজ্ঞ হওয়া), (৩) আল-কুদরত (সর্বশক্তিমান হওয়া), (৪) আল-ইরাদাহ (পরম ইচ্ছাশক্তি), (৫) আস-সামা’ (সর্বশ্রোতা), (৬) আল-বাসার (সর্বদ্রষ্টা), (৭) আল-কালাম (কথা বলা), এবং মাতুরীদী মাযহাব মতে (৮) আত-তাকভীন (سائر التكوين والتخليق বা সৃষ্টি ও লালন-পালনের চিরন্তন কর্তৃত্ব)।
মু’তাযিলারা আল্লাহর সিফাত অস্বীকার করে পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং মুশাব্বিহারা সৃষ্টিকে আল্লাহর সদৃশ বানিয়ে শিরকে লিপ্ত হয়েছে। আহলুস সুন্নাহ পবিত্র তানযীহের সাথে সমস্ত সিফাত সত্য জেনে পরম ঈমান রক্ষা করেন।
সিফাতে ইলাহিয়্যার ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা:
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আক্বীদার মূল সৌন্দর্য হলো তা তা’তীল (গুণ অস্বীকার করা) এবং তাশবীহ (সৃষ্টির সাথে তুলনা করা)—উভয় প্রান্তিকতার ঊর্ধ্বে। তাঁরা পবিত্র কুরআনের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা “لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ” (তাঁর সদৃশ কিছুই নেই, তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা)-এর ওপর পূর্ণ ঈমান রেখে মহান আল্লাহর সমস্ত সিফাতের প্রতি যথার্থ সম্মান প্রদর্শন করেন।
সিফাতে ইলাহিয়্যার ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা:
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আক্বীদার মূল সৌন্দর্য হলো তা তা’তীল (গুণ অস্বীকার করা) এবং তাশবীহ (সৃষ্টির সাথে তুলনা করা)—উভয় প্রান্তিকতার ঊর্ধ্বে। তাঁরা পবিত্র কুরআনের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা “لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ” (তাঁর সদৃশ কিছুই নেই, তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা)-এর ওপর পূর্ণ ঈমান রেখে মহান আল্লাহর সমস্ত সিফাতের প্রতি যথার্থ সম্মান প্রদর্শন করেন।
٢٠- ما هي الحكمة في إنزال الكتب السماوية؟
[২০. আসমানী কিতাবসমূহ নাযিলের পেছনে ঐশী হিকমত ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কী?]
১. আসমানী কিতাব নাযিলের খোদায়ী হিকমত ও তাৎপর্য:
মহান আল্লাহ মানবজাতিকে পৃথিবীতে সৃষ্টি করে নিছক কোনো অন্ধ উদ্দেশ্যহীনতার মধ্যে ছেড়ে দেননি; বরং তাঁর পরম করুণা ও ইনসাফের দাবি অনুযায়ী সঠিক পথপ্রদর্শনের জন্য যুগে যুগে নবী-রাসূলগণের ওপর পবিত্র আসমানী কিতাব ও সহীফাসমূহ অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহ ঘোষণা করেন: “নিশ্চয় আমি আমার রাসূলগণকে স্পষ্ট প্রমাণাদিসহ প্রেরণ করেছি এবং তাঁদের সাথে কিতাব ও ন্যায়নীতি অবতীর্ণ করেছি, যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে” (সূরা আল-হাদীদ: ২৫)।
২. প্রধান প্রধান হিকমত ও লক্ষ্যসমূহ:
১. তাওহীদের পরিচয় ও হিদায়াত দান: সৃষ্টিজগৎ দেখে মানুষ একক সৃষ্টিকর্তার প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারলেও তাঁর সঠিক ইবাদত ও সন্তুষ্টির নিয়ম নিজে নিজে আবিষ্কার করতে অক্ষম। কিতাবসমূহ মানুষকে শিরক ও কুফরের অন্ধকার হতে বের করে এক আল্লাহর তাওহীদের সন্ধান দেয়।
২. ন্যায়বিচার ও ইনসাফপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা: মানব রচিত আইন স্বার্থপরতা ও ত্রুটিমুক্ত হতে পারে না। আসমানী কিতাব মানুষকে সামাজিক সুবিচার, দুর্বল ও এতিমদের অধিকার এবং অপরাধ দমনের নিখুঁত ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনবিধান প্রদান করে।
৩. বিরোধ ও মতভেদের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি: মানব সমাজে সত্য-মিথ্যা ও হালাল-হারাম নিয়ে যুগে যুগে যে বিভ্রান্তি ও মতবিরোধ দেখা দেয়, আসমানী কিতাব তার নিষ্পত্তিকারী অকাট্য মানদণ্ড (আল-ফুরক্বান) হিসেবে কাজ করে।
৪. পরকালের হিসাবের হুজ্জত কায়েম করা: কিয়ামতের ময়দানে মানুষ যেন ওজর পেশ করতে না পারে যে আমরা সত্যের সন্ধান পাইনি—এজন্য আল্লাহ কিতাব পাঠিয়ে বান্দার ওপর তাঁর অকাট্য প্রমাণ (হুজ্জত) কায়েম করেছেন: “رُسُلًا مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ” (সূরা আন-নিসা: ১৬৫)।
৫. আত্মিক পরিশুদ্ধি ও আখলাকের উৎকর্ষ: মানুষের হৃদয়কে নফসের দাসত্ব, হিংসা ও পঙ্কিলতা হতে পবিত্র করে তাকওয়া ও ইহসানের সুউচ্চ মাক্বামে উন্নীত করা।
আসমানী কিতাবের সার্বজনীন কার্যকারিতা:
পরিশেষে, আসমানী কিতাবসমূহ কেবল তাত্ত্বিক নির্দেশিকা নয়, বরং তা মানবজীবনের সার্বিক কল্যাণের এক খোদায়ী সংবিধান। প্রতিটি কিতাব সংশ্লিষ্ট যুগে মানবজাতিকে সঠিক পথ দেখিয়ে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের পথ সুগম করেছে। আর সর্বশেষ মহাগ্রন্থ আল-কুরআন কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র বিশ্বের মানুষের সার্বিক মুক্তি ও পথপ্রদর্শনের শাশ্বত ও অলঙ্ঘনীয় উৎস হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে।
আসমানী কিতাবের সার্বজনীন কার্যকারিতা:
পরিশেষে, আসমানী কিতাবসমূহ কেবল তাত্ত্বিক নির্দেশিকা নয়, বরং তা মানবজীবনের সার্বিক কল্যাণের এক খোদায়ী সংবিধান। প্রতিটি কিতাব সংশ্লিষ্ট যুগে মানবজাতিকে সঠিক পথ দেখিয়ে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের পথ সুগম করেছে। আর সর্বশেষ মহাগ্রন্থ আল-কুরআন কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র বিশ্বের মানুষের সার্বিক মুক্তি ও পথপ্রদর্শনের শাশ্বত ও অলঙ্ঘনীয় উৎস হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে।
٢١- ما الأشراط الصغرى للساعة؟ بين بإيجاز
[২১. কিয়ামতের ছোট ছোট আলামতসমূহ (الأشراط الصغرى) সংক্ষেপে তুলে ধর।]
১. আশরাতুস সা’আহ বা কিয়ামতের আলামতের পরিচয়:
‘আশরাত’ (أشراط) শব্দটি ‘শারাত’-এর বহুবচন, যার অর্থ নিদর্শন বা আলামত। কিয়ামতের প্রলয়ঙ্করী দিবসের পূর্বে বিশ্বে যে সমস্ত সামাজিক, ধর্মীয় ও নৈতিক বিপর্যয় প্রকাশ পাবে, সেগুলোকে কিয়ামতের আলামত বলা হয়। এগুলো দুই ভাগে বিভক্ত—ছোট আলামত (আশরাতে সুগরা) এবং বড় আলামত (আশরাতে কুবরা)। ছোট আলামতগুলো সাধারণত কিয়ামতের অনেক পূর্ব থেকেই ধীরে ধীরে সমাজে প্রকাশ পেতে থাকে।
২. হাদীস অনুযায়ী কিয়ামতের প্রধান প্রধান ছোট আলামত:
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অসংখ্য সহীহ হাদীসের আলোকে প্রধান প্রধান ছোট আলামতগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. বিশ্বনবী (সা.)-এর নবুওয়াত ও ওফাত: রাসূল (সা.) তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল একত্র করে বলেন: “আমার আগমন ও কিয়ামত এই দুই আঙুলের মতো নিকটবর্তী।”
২. বায়তুল মুকাদ্দাস বিজয় ও মহামারীর প্রাদুর্ভাব: সাহাবী হযরত আউফ ইবনে মালিককে রাসূল (সা.) বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয় ও প্লেগের মতো মহামারীর আগাম সংবাদ দিয়েছিলেন।
৩. ইলম বিলুপ্ত হওয়া ও মূর্খতার বিস্তার: বিজ্ঞ হক্কানী আলেমদের মৃত্যুর মাধ্যমে খাঁটি ইলমে দ্বীন উঠে যাওয়া এবং সমাজে অজ্ঞ ব্যক্তিদের মুফতী হিসেবে ফতোয়া প্রদান করা।
৪. অযোগ্য ব্যক্তিদের ক্ষমতায় বসানো: সমাজের নিকৃষ্ট, অযোগ্য ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের জাতীয় নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত করা (আমল বিনষ্টের লক্ষণ)।
৫. জিনা-ব্যভিচার ও মদ্যপানের সয়লাব: প্রকাশ্যে ব্যভিচার ও অশ্লীলতা বৃদ্ধি পাওয়া এবং মদকে ভিন্ন ভিন্ন আকর্ষণীয় নামে হালাল মনে করে পান করা।
৬. উঁচু উঁচু অট্টালিকা নির্মাণের প্রতিযোগিতা: একদা যারা মেষপালক ও নগ্নপদ ছিল, তারা বিশাল আকাশচুম্বী বিলাসবহুল ভবন নির্মাণে একে অপরের সাথে অহংকারে লিপ্ত হবে।
৭. সময়ের দ্রুতগতি ও রক্তপাত বৃদ্ধি: একটি বছর এক মাসের মতো, এক মাস এক সপ্তাহের মতো দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়া এবং সমাজে অনর্থক হত্যাযজ্ঞ (হারাজ) মহামারী আকার ধারণ করা।
٢٢- ما هي مصادر العقيدة الإسلامية؟
[২২. ইসলামী আক্বীদার মূল উৎসসমূহ (মাসাদিরুল আক্বীদাহ) সংক্ষেপে আলোচনা কর।]
১. ইসলামী আক্বীদার উৎসের গুরুত্ব ও মর্যাদা:
ইসলামী আক্বীদা কোনো দার্শনিক জল্পনা-কল্পনা, কবিদের আবেগ বা মানুষের খেয়ালখুশির বিষয় নয়; বরং এটি সম্পূর্ণভাবে ‘তাওক্বীফিয়্যাহ’ (توقيفية)—অর্থাৎ ঐশী ওহীর সুনির্দিষ্ট দলীল-প্রমাণের ওপর নির্ভরশীল। বান্দা নিজে নিজে কল্পনা করে আল্লাহর কোনো গুণ বা দ্বীনের মৌলিক বিশ্বাস উদ্ভাবন করতে পারে না। তাই বিশুদ্ধ উৎস ব্যতীত কোনো আক্বীদাগত বিশ্বাস গ্রহণ করা সম্পূর্ণরূপে হারাম ও প্রত্যাখ্যাত। আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআত আক্বীদা গ্রহণের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট চারটি মূল উৎসকে মানদণ্ড সাব্যস্ত করেছেন।
২. ইসলামী আক্বীদার প্রধান প্রধান মৌলিক উৎস:
১. পবিত্র কুরআনুল কারীম (القرآن الكريم): এটি আক্বীদার প্রথম, সর্বশ্রেষ্ঠ ও চূড়ান্ত অকাট্য উৎস। আল্লাহর অস্তিত্ব, সিফাত, ফেরেশতাকুল, আসমানী কিতাব, নবী-রাসূল, পরকাল ও তাকদীরের সমস্ত মৌলিক বিশ্বাস কুরআনে সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় (ক্বাত’ঈয়ুত ছুবূত ওয়া ক্বাত’ঈয়ুদ দালালাহ) বর্ণিত হয়েছে। কুরআনের একটি অক্ষর অস্বীকার করাও স্পষ্ট কুফর।
২. সুন্নাতে মুতাওয়াতিরাহ ও সহীহ হাদীস (السنة النبوية الصحيحة): রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র সুন্নাহ হলো কুরআনের জীবন্ত তাফসীর এবং আক্বীদার দ্বিতীয় প্রধান উৎস। মুতাওয়াতির হাদীস অকাট্য জ্ঞান দান করে; আর সহীহ আহাদ হাদীস আকিদার বিশদ শাখা-প্রশাখা ও ফাযায়েলে সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণযোগ্য ও আমলযোগ্য। সুন্নাহ ব্যতীত কুরআনের বাস্তব প্রয়োগ উপলব্ধি করা অসম্ভব।
৩. ইজমায়ে উম্মাহ (الإجماع): সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে সালেহীনের যে সকল আকিদাগত বিষয়ে ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে (যেমন খতমে নবুওয়াত, সাহাবাদের আদালত ও মর্যাদা, ইত্যাদি) তা আকিদার অকাট্য উৎস। রাসুল (সা.) বলেন: “আমার উম্মত কখনই কোনো ভ্রষ্টতায় ঐক্যবদ্ধ হবে না।”
৪. সুস্থ বিবেক ও ফিতরাত (العقل السليم التابع للنقل): ইসলামে সুস্থ বিবেককে আকিদা বোঝার মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, তবে তা কখনই ওহীর বিপরীতে শাসক বা বিচারক নয়; বরং বিবেক সর্বদা ওহীর অধীন থেকে দলীল অনুধাবন করে। ওহী হলো সূর্যের আলোর মতো আর বিবেক হলো মানুষের চোখের মতো; সূর্যের আলো ছাড়া চোখ যেমন দেখতে পায় না, ওহী ছাড়া বিবেকও সত্য অনুধাবনে ব্যর্থ হয়।
٢٣- ما عقيدة أهل السنة والجماعة فيما يقال “إن الله نور”؟
[২৩. “নিশ্চয়ই আল্লাহ নূর”—এ উক্তির ব্যাপারে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আক্বীদা পরিষ্কার কর।]
১. আয়াতের উদ্ধৃতি ও প্রেক্ষাপট:
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: “اللَّهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ”—”আল্লাহ আসমান ও জমিনের নূর” (সূরা আন-নূর: ৩৫)। এ আয়াতের অপব্যাখ্যা করে কতিপয় মুশাব্বিহা ও পথভ্রষ্ট দল আল্লাহকে দৃশ্যমান আলোর সাথে তুলনা করে বিপথগামী ভাবনায় লিপ্ত হয়েছিল।
২. আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের বিশুদ্ধ আক্বীদা:
ইমাম আবুল মুঈন নাসাফী ‘বাহরুল কালাম’-এ, ইমাম আবু হানীফা ‘আল-ফিকহুল আবসাত্ব’-এ এবং হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) তাফসীরে স্পষ্ট করেছেন যে:
১. আল্লাহ কোনো উপাদানগত ভৌতিক আলো নন: আল্লাহ তাআলা আগুন, বাতি, মোমবাতি, বিদ্যুৎ, সূর্য বা ফোটন কণার মতো দৃশ্যমান কোনো নশ্বর উপাদানগত আলো (নূরে হাদ্সী বা জিসম) নন। কারণ সমস্ত দৃশ্যমান আলো আল্লাহরই সৃষ্টি করা মাখলূক্ব এবং তা জড়বস্তু, দিক ও সীমানায় আবদ্ধ, পরিবর্তনশীল ও ধ্বংসশীল। আল্লাহ তাআলা যেকোনো প্রকার আকার, জড়বস্তু, উপাদান বা সীমাবদ্ধতার বহু ঊর্ধ্বে চিরঞ্জীব ও চিরস্থায়ী।
২. নূরের প্রকৃত তাফসীর: রইসুল মুফাসসিরীন হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, আয়াতে ‘আল্লাহু নূর’ অর্থ হলো—“هادي أهل السماوات والأرض ومنورهما” অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা আকাশ ও পৃথিবীর সমস্ত সৃষ্টিকে অস্তিত্ব দান করে এবং হিদায়াতের মাধ্যমে আলোকিতকারী মহান সত্তা। যেমন সূর্য সমগ্র ধরাকে দৃশ্যমান আলো দিয়ে অন্ধকার দূর করে, তেমনি আল্লাহর তাওহীদ ও পবিত্র ওহী বান্দার আত্মিক অন্ধকার দূর করে অন্তরকে হিদায়াতের নূরে আলোকিত করে।
৩. হাদীসে নূরের সঠিক ব্যাখ্যা: সহীহ মুসলিমের হাদীসে এসেছে—রাসূল (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: আপনি কি মি’রাজে আপনার রবকে চাক্ষুষ দেখেছেন? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন: “نُورٌ أَنَّى أَرَاهُ”—”তিনি তো এমন মহান নূরানি মহিমাময় সত্তা, যা চর্মচক্ষে কীভাবে দেখা সম্ভব!” অপর হাদীসে এসেছে: “حِجَابُهُ النُّورُ”—তাঁর সত্তার পর্দা হলো নূর; সেই পর্দা উন্মোচিত হলে তাঁর চেহারার তাজাল্লী সমস্ত সৃষ্টিকে ভস্মীভূত করে দিত। অতএব আল্লাহকে চাক্ষুষ কোনো আলো ধারণা করা মুজাসসিমাদের বাতিল মতবাদ; আর আহলুস সুন্নাহ আল্লাহকে যাবতীয় সাদৃশ্যের ঊর্ধ্বে অদ্বিতীয় বিশ্বাস করেন।
٢٤- ما عقيدة أهل السنة والجماعة في الشفاعة؟ بين موجزا
[২৪. কিয়ামতের দিন শাফা’আত (الشفاعة) সম্পর্কে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আক্বীদা সংক্ষেপে লিখ।]
১. শাফা’আতের অর্থ ও পরিচয়:
‘শাফা’আত’ (الشفاعة) অর্থ সুপারিশ করা বা মাধ্যম হওয়া। ইসলামী আক্বীদার পরিভাষায়, কিয়ামতের মহাবিচার দিবসে মহান আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে নবী-রাসূলগণ, ফেরেশতাকুল, শহীদ ও আওলিয়ায়ে কেরাম কর্তৃক অপরাধী মুমিনদের মাগফিরাত ও মুক্তি এবং পুণ্যবানদের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য আল্লাহর দরবারে বিনীত প্রার্থনা পেশ করাকে শাফা’আত বলে।
২. আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অকাট্য আক্বীদা:
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সর্বসম্মত আক্বীদা হলো—কিয়ামতের দিন শাফা’আত সুনিশ্চিতভাবে সত্য এবং তা বাস্তবে কার্যকর হবে।
– শাফা’আতের প্রধান প্রকারভেদসমূহ:
১. শাফা’আতে কুবরা (الشفاعة الكبرى বা মাক্বামে মাহমুদ): হাশরের ময়দানের অসহনীয় উত্তাপ ও অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিচারকার্য শুরু করার জন্য সমগ্র মানবজাতির পক্ষে একমাত্র বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এই সুপারিশ করবেন। আদম (আ.) থেকে ঈসা (আ.) পর্যন্ত সমস্ত নবী যখন অপারগতা প্রকাশ করবেন, তখন বিশ্বনবী বলবেন: “আনা লাহা” (আমিই এ দায়িত্বের জন্য প্রস্তুত)।
২. কবিরা গুনাহগারদের ক্ষমার শাফা’আত: যে সমস্ত মুমিন ঈমান থাকা সত্ত্বেও কবিরা গুনাহের কারণে জাহান্নামের উপযুক্ত হয়েছিল, তাদের মুক্তির জন্য প্রিয়নবী (সা.) শাফা’আত করবেন। হাদীসে এসেছে: “شَفَاعَتِي لِأَهْلِ الْكَبَائِرِ مِنْ أُمَّتِي”—”আমার শাফা’আত আমার উম্মতের কবিরা গুনাহগারদের জন্য সংরক্ষিত” (সুনানু আবি দাঊদ ও তিরমিযী)।
৩. জান্নাতীদের মর্যাদা বৃদ্ধির শাফা’আত: পুণ্যবান বান্দাদের জান্নাতের উচ্চতর স্তর দানের সুপারিশ।
৩. মু’তাযিলা ও খারেজীদের ভ্রান্ত মত খণ্ডন:
মু’তাযিলা ও খারেজীরা দাবি করেছিল যে কবিরা গুনাহগারদের জন্য কোনো শাফা’আত নেই এবং একবার জাহান্নামে গেলে কেউ আর বের হতে পারবে না। আহলুস সুন্নাহ মুতাওয়াতির হাদীসের আলোকে প্রমাণ করেছেন যে অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ ঈমানদার ব্যক্তিও নবীর শাফা’আতে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. কামিল ১ম বর্ষ হাদীস ৮ম পত্রের নাম ও বিষয় কোড কী?
কামিল ১ম বর্ষ হাদীস বিভাগের ৮ম পত্রের নাম ‘আল-আকীদাহ আল-ইসলামিয়্যাহ’ (Al-Aqidah Al-Islamiyyah) এবং এর প্রাতিষ্ঠানিক বিষয় কোড হলো ৬১১১০৮।
২. এ পত্রে মূলত কোন্ বিখ্যাত আক্বীদা গ্রন্থের ওপর পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়?
এ পত্রে মূলত ইমাম আবুল মুঈন মাইমুন আন-নাসাফী (রহ.) রচিত বিশ্ববিখ্যাত কালামশাস্ত্রীয় গ্রন্থ ‘বাহরুল কালাম ফী ইলমিল কালাম’-এর ওপর পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
৩. ইমাম আবুল মুঈন নাসাফী আক্বীদা শাস্ত্রে কোন্ ধারার ইমাম ছিলেন?
তিনি আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের হানাফী-মাতুরীদী ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ গবেষক ও ইমাম ছিলেন, যিনি মু’তাযিলা ও বাতিল দলসমূহের খণ্ডনে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ভূমিকা পালন করেন।
৪. কুরআন কি মাখলূক্ব নাকি ক্বাদীম? আহলুস সুন্নাহর চূড়ান্ত ফায়সালা কী?
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অকাট্য আক্বীদা হলো কুরআন মহান আল্লাহর অনাদি কালাম (ক্বাদীম), তা কখনই সৃষ্ট (মাখলূক্ব) নয়।
৫. মি’রাজ জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে হয়েছিল নাকি স্বপ্নে?
আহলুস সুন্নাহর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র মি’রাজ সম্পূর্ণ জাগ্রত অবস্থায় দেহ ও আত্মার সমন্বয়ে সশরীরে সংঘটিত হয়েছিল।
৬. এ বিষয়ে কামিল পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ার উপায় কী?
আক্বীদার প্রতিটি মাসআলায় কুরআন ও হাদীসের অকাট্য আরবী নস উল্লেখ করা, আহলুস সুন্নাহর সাথে মু’তাযিলা ও বাতিল দলসমূহের পার্থক্য ছক আকারে তুলে ধরা এবং ইমাম নাসাফীর মত সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা।

