শরহু মা’য়ানিল আছার ৪র্থ পত্র (Sharh Ma’ani al-Athar 4th Paper) – 611104, হাদীস – কামিল ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৩

StudyBoi StudyBoi
September 27, 2026
৮৯ মিনিট পড়ার সময়
৩ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন

কামিল (স্নাতকোত্তর) হাদীস প্রথম পর্ব পরীক্ষা, ২০২৩
হাদীস বিভাগ (চতুর্থ পত্র)
বিষয়: শরহু মা’য়ানিল আছার [নতুন সিলেবাস অনুযায়ী]
বিষয় কোড: ৬১১১০৪ | পূর্ণমান: ১০০ | সময়: ৪ ঘণ্টা

[الملاحظة : أجب عن اربعة من مجموعة (أ) وعن واحد من مجموعة (ب) – দ্রষ্টব্য : (أ) অংশ হতে চারটি ও (ب) অংশ হতে একটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]

مجموعة (أ) – ক বিভাগ : হাদীস অংশ (মান: ২০ × ৪ = ৮০)

١- عن انس بن مالك رضى الله عنه قال امر بلال ان يشفع الاذان ويوتر الاقامة.
(أ) بين سنن الاذان والاقامة.
(ب) ما الاختلاف فى عدد كلمات الاذان والاقامة بالايجاز؟
(ج) هل يثبت حكم الشريعة بالرؤيا؟ والا كيف شرع الاذان بناء على رؤيا بعض الصحابة؟
(د) هل يتلفظ كلمات الاذان شفعا ام وترا؟ حقق المسئلة.
(هـ) هل يجوز للمؤذن ان يأخذ اجرة على الاذان؟

[১. হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: হযরত বিলাল (রা.)-কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যেন তিনি আযানের বাক্যসমূহ জোড়ায় জোড়ায় (দু-দু’বার করে) এবং ইকামতের বাক্যসমূহ বেজোড়ভাবে (একবার একবার করে) উচ্চারণ করেন।]

তাহক্বীক্বে কালিমাত (শব্দমূল ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ):

শব্দ অর্থ মূল ধাতু (Root/Madda) শব্দরূপ/ছীগাহ (Form/Sighah) ব্যাকরণিক অবস্থান (Grammatical Role)
أُمِرَ আদিষ্ট হলেন / নির্দেশ দেওয়া হলো أ – م – ر فعل ماض مجهول، باب نصر فعل ماض مبني للمجهول مبني على الفتح
يَشْفَعَ জোড় করবেন / দু-দু’বার বলবেন ش – ف – ع فعل مضارع منصوب بأن، باب فتح فعل مضارع منصوب بأن المصدرية وعلامة نصبه الفتحة
يُوتِرَ বেজোড় করবেন / একবার বলবেন و – ت – ر فعل مضارع منصوب، باب إفعال معطوف على يشفع منصوب بالفتحة
الْأَذَانَ নামাযের আযান / ঘোষণা أ – ذ – ن اسم مذكر / مصدر ثلاثي مفعول به للفعل يشفع منصوب بالفتحة
الْإِقَامَةَ নামাযের ইকামত ق – و – م مصدر، باب إفعال مفعول به للفعل يوتر منصوب بالفتحة

সংশ্লিষ্ট উপ-প্রশ্নসমূহের প্রামাণ্য তাহকীক ও ফিকহী পর্যালোচনা:

(أ) আযান ও ইকামতের সুন্নাতসমূহ (سنن الأذان والإقامة):
শরীয়ত অনুযায়ী আযান ও ইকামতের প্রধান সুন্নাতসমূহ নিম্নরূপ:
১. ওজু অবস্থায় পবিত্র হয়ে কিবলামুখী হয়ে দাঁড়ানো। হদসে আসগার অবস্থায় আযান দেওয়া মাকরূহে তানযীহী, আর অপবিত্র অবস্থায় মাকরূহে তাহরীমী।
২. আযান ধীরস্থিরে তারতীলসহ পাঠ করা—প্রতি দুই তাকবীরের পর সামান্য বিরতি দেওয়া; আর ইকামত কিছুটা দ্রুততার সাথে হাদ্বার (حدر) পদ্ধতিতে পাঠ করা।
৩. ‘হাইয়্যা আলাস সালাহ’ বলার সময় ডান দিকে এবং ‘হাইয়্যা আলাল ফালাহ’ বলার সময় বাম দিকে মুখ ফিরানো; তবে পা ও বুক কিবলামুখী থাকবে।
৪. আযানের সময় দুই কানের ছিদ্রে তর্জনী আঙুল রাখা, যাতে কণ্ঠস্বর অধিক বুলন্দ ও স্পষ্ট হয়।
৫. আযান শেষে দরূদ ও আযানের মাসনূন দু’আ পাঠ করা এবং আযানের জবাব দেওয়া শ্রবণকারীদের জন্য মুস্তাহাব।

(ب) আযান ও ইকামতের শব্দসংখ্যার মতানৈক্য (الاختلاف في عدد كلمات الأذان والإقامة):
ফকীহগণের মধ্যে আযান ও ইকামতের শব্দসংখ্যার ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে:
১. হানাফী মাযহাব (ইমাম তহাবীর সমর্থিত অভিমত): হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদ ও আবু মাহযূরা (রা.)-এর হাদীসের ভিত্তিতে আযানের বাক্য মোট ১৫টি (তাকবীর শুরুতে ৪ বার, শাহাদাতদ্বয় ৪ বার, হাইয়ালাত ৪ বার, তাকবীর ২ বার, কালেমা ১ বার) কোনো তারজী’ ছাড়া। আর ইকামতের বাক্য মোট ১৭টি (আযানের মতো সব বাক্য জোড়ায় জোড়ায় এবং ‘ক্বাদ ক্বামাতিস সালাহ’ দু’বার যোগ হয়ে ১৭টি)।
২. ইমাম শাফেঈ (রহ.): আযানে তারজী’সহ মোট ১৯টি বাক্য এবং ইকামত একক বাক্য বিশিষ্ট (إفراد الإقامة) মোট ১১টি বাক্য।
৩. ইমাম মালিক (রহ.): আযানের শুরুতে তাকবীর দু’বার (তারজী’সহ মোট ১৭ বাক্য) এবং ইকামত ‘ক্বাদ ক্বামাতিস সালাহ’ একবারসহ মোট ১০ বাক্য।

(ج) স্বপ্ন দ্বারা শরীয়তের হুকুম সাব্যস্ত হয় কি? এবং আযানের শরয়ী ভিত্তি:
নবী-রাসূল ব্যতীত সাধারণ কোনো মানুষের স্বপ্ন (رؤيا) দ্বারা শরীয়তের কোনো হুকুম বা বিধান সাব্যস্ত হয় না। আযানের বিধান হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদ ও হযরত উমর (রা.)-এর স্বপ্নের মাধ্যমে সূচনা হলেও, তা শরীয়তের বিধান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওহীভিত্তিক সত্যায়ন ও অনুমোদনের (تقرير النبوة) মাধ্যমে। নবী করীম (সা.) সাহাবীর স্বপ্ন শুনে বললেন: “إنها لرؤيا حق إن شاء الله” (নিশ্চয় এটি একটি সত্য স্বপ্ন), এবং হযরত বিলালকে নির্দেশ দিলেন। সুতরাং আযানের মূল শরয়ী দলিল হলো সুন্নাতে তাকরীরিয়্যাহ ও অহিয়ে এলাহী, কোনো একক ব্যক্তির অপ্রকাশ্য স্বপ্ন নয়।

(د) আযানের বাক্যসমূহ জোড় না বেজোড়? ইমাম তহাবীর তাহকীক:
হযরত আনাস (রা.)-এর হাদীসে উল্লেখিত “امر بلال ان يشفع الاذان” দ্বারা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, আযানের বাক্য জোড়ায় জোড়ায় হবে। ইমাম তহাবী (রহ.) ব্যাখ্যা করেছেন যে, আযানের বাক্যসমূহ প্রকৃতপক্ষে শাফ’ (شفعা – জোড়)। হযরত আনাসের হাদীসে ইকামতের ক্ষেত্রে “يوتر الإقامة” দ্বারা উদ্দেশ্য হলো আযানের তুলনায় ইকামতের বাক্য পুনরাবৃত্তি ছাড়া একবার করে পড়া, তবে তা কিছু নির্দিষ্ট বাক্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যেমনটি অন্যান্য সহীহ রিওয়ায়েতে ‘ক্বাদ ক্বামাতিস সালাহ’ দুইবার বলার বর্ণনা রয়েছে। ইমাম তহাবী প্রমাণ করেছেন যে, আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদের বিশদ হাদীস আনাসের সংক্ষিপ্ত বিবরণের মুফাসসির হিসেবে কাজ করে।

(هـ) আযানের বিনিময়ে পারিশ্রমিক বা বেতন গ্রহণের হুকুম:
মুতাআক্বাদ্দিমীন ফকীহগণের মতে সালাত, আযান ও কুরআন শিক্ষার বিনিময়ে উজরতের চুক্তি নাজায়েয ছিল। কিন্তু মুতাআখখিরীন হানাফী ফকীহগণ দ্বীনের শাআয়ের সংরক্ষণ ও মুয়াযযিনদের জীবিকা সুরক্ষায় জরুরতের (ضرورة شرعية) ভিত্তিতে আযান ও ইমামতির জন্য পারিশ্রমিক বা রাষ্ট্রীয়/সামাজিক ভাতা গ্রহণকে সর্বসম্মতিক্রমে ‘জায়িয’ ও মুস্তাহসান ফতোয়া দিয়েছেন। যদি পারিশ্রমিক নিষিদ্ধ রাখা হতো, তবে জামাআত ও আযানের নিয়মিত ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা ছিল।

٢- عن عبادة بن الصامت رضى الله عنه قال صلى بنا رسول الله صلى الله عليه وسلم صلوة الفجر فثقلت عليه القراءة فلما سلم قال اتقرؤون خلفى قلنا نعم يا رسول الله صلى الله عليه وسلم قال فلا تفعلوا الا بفاتحة الكتاب فانه لا صلاة لمن لم يقرأ بها.
(أ) ما حكم قراءة الفاتحة خلف الامام عند العلماء؟ بين بالايجاز.
(ب) تحدث عن النظر الذى ذكره الامام الطحاوى فى سقوط قراءة الفاتحة.
(ج) كم عدد ايات سورة الفاتحة؟ وهل البسملة منها؟ بين.
(د) اكتب بعض اسماء وفضائل سورة الفاتحة.
(هـ) اكتب نبذة من حياة عبادة بن الصامت رضى الله عنه.

[২. হযরত উবাদাহ ইবনুস সামিত (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের নিয়ে ফজরের নামায আদায় করলেন। নামাযে তাঁর জন্য তিলাওয়াত ভারী ও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ল। নামায শেষে সালাম ফিরিয়ে তিনি বললেন: “তোমরা কি তোমাদের ইমামের পেছনে পেছনে কিরাত পাঠ কর?” আমরা বললাম: হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি ইরশাদ করলেন: “তোমরা এরূপ করো না, তবে কেবল সূরায়ে ফাতিহা ব্যতীত; কেননা যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা পাঠ করে না তার কোনো সালাত হয় না।”]

তাহক্বীক্বে কালিমাত (শব্দমূল ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ):

শব্দ অর্থ মূল ধাতু (Root/Madda) শব্দরূপ/ছীগাহ (Form/Sighah) ব্যাকরণিক অবস্থান (Grammatical Role)
ثَقُلَتْ ভারী হয়েছিল / কষ্টকর হলো ث – ق – ل فعل ماض، باب كرم فعل ماض مبني على الفتح، والتاء للتأنيث
أَتَقْرَؤُونَ তোমরা কি পাঠ করছ? ق – ر – أ فعل مضارع مع همزة الاستفهام فعل مضارع مرفوع بثبوت النون، والواو فاعل
خَلْفِي আমার পেছনে خ – ل – ف ظرف مكان مضاف لياء المتكلم ظرف مكان متعلق بالفعل تقرؤون
فَلَا تَفْعَلُوا তোমরা এরূপ করো না ف – ع – ل فعل نهي، باب فتح فعل مضارع مجزوم بلا الناهية وعلامة جزمه حذف النون
فَاتِحَةِ উদ্বোধনী / প্রারম্ভিক সূরা ف – ت – ح اسم فاعل مؤنث، مضاف اسم مجرور بالباء وعلامة جره الكسرة

সংশ্লিষ্ট উপ-প্রশ্নসমূহের প্রামাণ্য তাহকীক ও ফিকহী পর্যালোচনা:

(أ) ইমামের পেছনে সূরা ফাতিহা পাঠের হুকুম (حكم قراءة الفاتحة خلف الإمام):
ইমামের পেছনে মুক্তাদীর কিরাত পড়া নিয়ে ফকীহদের মাঝে তিনটি প্রসিদ্ধ অভিমত রয়েছে:
১. হানাফী মাযহাব (ইমাম আবু হানীফা ও তহাবী): জাহরী ও সিররী উভয় সালাতেই ইমামের পেছনে মুক্তাদীর কোনো কিরাত (সূরা ফাতিহা বা অন্য কোনো সূরা) পাঠ করা বৈধ নয়; বরং তা মাকরূহে তাহরীমী। দলিল: কুরআনের নির্দেশ—”وإذا قرئ القرآن فاستمعوا له وأنصتوا” (যখন কুরআন তিলাওয়াত করা হয় তখন তোমরা তা মনোযোগ দিয়ে শোনো এবং চুপ থাকো), এবং রাসূলুল্লাহর বাণী—”من كان له إمام فقراءة الإمام له قراءة” (যার ইমাম রয়েছে ইমামের কিরাতই তার কিরাত)।
২. ইমাম শাফেঈ (রহ.): সকল সালাতে ইমামের পেছনে সূরা ফাতিহা পাঠ করা মুক্তাদীর জন্য রুকন ও ওয়াজিব। দলিল: “لا صلاة لمن لم يقرأ بفاتحة الكتاب”।
৩. ইমাম মালিক ও আহমদ (রহ.): সিররী সালাতে মুক্তাদী সূরা ফাতিহা পাঠ করবে, কিন্তু জাহরী সালাতে ইমামের কিরাত শুনবে এবং চুপ থাকবে।

(ب) ইমাম তহাবীর ‘নজর’ (যৌক্তিক বিশ্লেষণ) ও কিরাত বাতিলের দলীল:
ইমাম আবু জাফর তহাবী (রহ.) অত্যন্ত সূক্ষ্ম যুক্তির অবতারণা করেছেন। তিনি বলেন: শরীয়তের সর্বসম্মত নীতি হলো—যদি ইমামের পেছনে কিরাত পাঠ কোনো অবস্থাতেই আবশ্যকীয় বা শর্ত হতো, তবে তা নামাযের রুকুতে পাওয়া মুক্তাদীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতো। অথচ উম্মতের ইজমা রয়েছে যে, কোনো ব্যক্তি যদি ইমামকে রুকু অবস্থায় পায় এবং সে ইমামের সাথে রুকুতে শামিল হয়, তবে তার সেই রাকাত পূর্ণাঙ্গ আদায় হয়ে যায়; অথচ সে বিন্দুমাত্র সূরা ফাতিহা পাঠ করেনি। যদি ফাতিহা মুক্তাদীর জন্য রুকন হতো, তবে ফাতিহা ছাড়া ওই রাকাত কখনো শুদ্ধ হতো না। এটি সুদৃঢ় প্রমাণ যে ইমামের কিরাতই মুক্তাদীর জন্য যথেষ্ট। এছাড়া উবাদাহ (রা.)-এর হাদীসটি মনসূখ বা এটি একাকী নামাযীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলে তহাবী (রহ.) বিশদভাবে প্রমাণ করেছেন।

(ج) সূরা ফাতিহার আয়াত সংখ্যা ও বিসমিল্লাহর হুকুম:
সূরা ফাতিহার মোট আয়াত সংখ্যা সর্বসম্মতভাবে ৭টি (সাত)। তবে বিসমিল্লাহ এর অন্তর্ভুক্ত কি-না এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে:
হানাফী মাযহাবের মতে, বিসমিল্লাহ সূরা ফাতিহার বা অন্য কোনো সূরার নিজস্ব অংশ নয়; বরং তা দুই সূরার মাঝে পার্থক্য করার জন্য এবং বরকত হাসিলের জন্য কুরআনের স্বতন্ত্র একটি আয়াত হিসেবে নাযিল হয়েছে। তাই সালাতে বিসমিল্লাহ নিঃশব্দে পাঠ করা সুন্নাত। ইমাম শাফেঈর মতে, বিসমিল্লাহ সূরা ফাতিহার প্রথম আয়াত।

(د) সূরা ফাতিহার নামসমূহ ও فضائل:
সূরা ফাতিহার উল্লেখযোগ্য নামসমূহ: ১. فاتحة الكتاب (কিতাবের উদ্বোধনকারী), ২. أم القرآن (কুরআনের মূল), ৩. السبع المثاني (পুনঃপুন পঠিত সাতটি আয়াত), ৪. سورة الشفاء (রোগমুক্তির সূরা), ৫. سورة الصلاة (নামাযের সূরা), ৬. الوافية ও الكافية।
এর ফযিলত অপরিসীম। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা’আলা সালাতকে নিজের ও বান্দার মাঝে দুই ভাগে বিভক্ত ঘোষণা করেছেন এবং সূরা ফাতিহা তিলাওয়াতকারীর প্রতিটি প্রার্থনার জবাব আল্লাহ সরাসরি দান করেন।

(هـ) হযরত উবাদাহ ইবনুস সামিত (রা.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী:
হযরত উবাদাহ ইবনুস সামিত (রা.) ছিলেন আনসারদের বনু খাওরাজ গোত্রের একজন বিশিষ্ট সাহাবী। তিনি প্রথম ও দ্বিতীয় বাইয়াতে আকাবায় অংশগ্রহণকারী ১২ জন নকীবের অন্যতম ছিলেন। বদর, উহুদ, খন্দকসহ সকল প্রধান যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে বীরত্বের সাথে লড়াই করেছেন। তিনি ছিলেন একজন দক্ষ ফকীহ ও কুরআনের কারী। হযরত উমর (রা.)-এর খেলাফতকালে তিনি সিরিয়া ও ফিলিস্তিনে বিচারক ও শিক্ষক হিসেবে প্রেরিত হন। ৩৪ হিজরীতে ৭২ বছর বয়সে ফিলিস্তিনের রামলা বা বায়তুল মুকাদ্দাসে তিনি ইন্তেকাল করেন।

٣- عن عائشة رضى الله عنها عن رسول الله صلى الله عليه وعلى اله وسلم قال ايما امرأة نكحت بغير اذن وليها فنكاحها باطل فان اصابها فلها مهرها بما استحل من فرجها فان اشتجروا فالسلطان ولى من لا ولى له.
(أ) ما معنى النكاح لغة وشرعا؟ بين بالايجاز.
(ب) ما الالفاظ التى ينعقد بها النكاح؟ اكتب بالايجاز.
(ج) تحدث عن اقل مقدار المهر مع ذكر اراء الائمة فيه.
(د) ما معنى الولى؟ وكم نوعا للولاية؟
(هـ) هل يجوز نكاح المرأة بغير اذن وليها؟ بين اراء الائمة فيه.

[৩. উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “যে কোনো নারী তার অভিভাবকের অনুমতি ব্যতিরেকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়, তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল। যদি স্বামী তার সাথে সহবাস করে থাকে, তবে নারীটি মহর পাবে তার লজ্জাস্থানকে হালাল করার বিনিময়ে। আর যদি তাদের মাঝে অভিভাবকত্ব নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়, তবে যার কোনো অভিভাবক নেই শাসকই তার অভিভাবক।”]

তাহক্বীক্বে কালিমাত (শব্দমূল ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ):

শব্দ অর্থ মূল ধাতু (Root/Madda) শব্দরূপ/ছীগাহ (Form/Sighah) ব্যাকরণিক অবস্থান (Grammatical Role)
أَيُّمَا যে কোনো (শর্তবাচক) أ – ي – ي اسم شرط جازم مع ما الزائدة مبتدأ مبني على الضم في محل رفع
نَكَحَتْ বিবাহ করল ن – ك – ح فعل ماض، واحد مؤنث غائب فعل الشرط مبني على الفتح في محل جزم
وَلِيِّهَا তার অভিভাবক و – ل – ي اسم مذكر مضاف لضمير المؤنث مضاف إليه مجرور بالكسرة الظاهرة
بَاطِلٌ বাতিল / অকার্যকর ب – ط – ل اسم فاعل، مفرد مذكر خبر المبتدأ مرفوع بالضمة الظاهرة
اشْتَجَرُوا তারা বিবাদে লিপ্ত হলো ش – ج – ر فعل ماض، باب افتعال فعل الشرط والواو فاعل مبني على السكون

সংশ্লিষ্ট উপ-প্রশ্নসমূহের প্রামাণ্য তাহকীক ও ফিকহী পর্যালোচনা:

(أ) নিকাহ-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ (معنى النكاح لغة وشرعا):
আভিধানিক অর্থ: النكاح শব্দের মূল আভিধানিক অর্থ হলো الضم والجمع (পরস্পর একত্রিত হওয়া, সংমিশ্রণ) এবং الوطء (সঙ্গম)।
পারিভাষিক অর্থ: শরীয়তের পরিভাষায় নিকাহ হলো এমন একটি আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক ধর্মীয় ও সামাজিক চুক্তি (عقد مخصوص), যার মাধ্যমে একজন পুরুষ ও একজন নারীর পারস্পরিক উপভোগ ও দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপন আইনত ও শরীয়তসম্মতভাবে বৈধ হয় এবং উভয়ের ওপর নির্দিষ্ট কিছু দায়িত্ব ও অধিকার অবধারিত হয়।

(ب) যেসব শব্দ দ্বারা বিবাহ সংঘটিত হয় (الألفاظ التي ينعقد بها النكاح):
হানাফী মাযহাব মতে, এমন যে কোনো স্পষ্ট বা রূপক শব্দ দ্বারা বিবাহ সংঘটিত হয় যা মালিকানা হস্তান্তর বা তাৎক্ষণিক অর্পণ বোঝায়। যথা:
১. সরাসরি নিকাহ বা তাযবীজ শব্দ: إنكاح (বিবাহ দেওয়া) এবং تزويج (বিয়ে দেওয়া)।
২. হিবাহ (দান), তামলীক (মালিকানা প্রদান), বায় (বিক্রয়), সাদাকাহ (দান) শব্দ দ্বারাও মহর উল্লেখ থাকলে হানাফী মতে বিবাহ শুদ্ধ হয়।
ইমাম শাফেঈর মতে, কেবল إنكاح এবং تزويج শব্দ ছাড়া অন্য কোনো শব্দ দিয়ে বিবাহ সংঘটিত হতে পারে না।

(ج) মহরের সর্বনিম্ন পরিমাণ ও আইম্মায়ে কেরামের মতামত:
১. হানাফী মাযহাব: মহরের সর্বনিম্ন পরিমাণ হলো ১০ (দশ) দিরহাম (বর্তমান হিসেবে প্রায় ৩০.৬১৮ গ্রাম খাঁটি রৌপ্য)। এর কম মহর ধার্য করা হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ১০ দিরহামে উন্নীত হবে। দলিল: “لا مهر أقل من عشرة دراهم”।
২. মালিকী মাযহাব: সর্বনিম্ন মহর ৩ দিরহাম বা এক চতুর্থাংশ দীনার।
৩. শাফেঈ ও হাম্বলী মাযহাব: মহরের কোনো সর্বনিম্ন নির্ধারিত পরিমাণ নেই; যেকোনো আর্থিক মূল্যবান বস্তু (এমনকি একটি লোহার আংটি বা কুরআন শিক্ষাদান) মহর হতে পারে। দলিল: “التمس ولو خاتما من حديد”।

(د) অলীর অর্থ ও অভিভাবকত্বের প্রকারভেদ:
‘অলী’ (الولي) শব্দের অর্থ অভিভাবক, তত্ত্বাবধায়ক ও সাহায্যকারী। ফিকহের দৃষ্টিতে অভিভাবকত্ব (ولاية) প্রধানত দুই প্রকার:
১. ولاية الإجبار (বাধ্যতামূলক অভিভাবকত্ব): যা অপ্রাপ্তবয়স্ক বা অপ্রকৃতিস্থ সন্তানের ওপর কার্যকর থাকে, যেখানে পিতা বা দাদা তাদের বিয়ে দিতে পারেন।
২. ولاية الاختيار والاستحباب (ঐচ্ছিক ও পরামর্শমূলক অভিভাবকত্ব): প্রাপ্তবয়স্ক জ্ঞানসম্পন্ন নারীর ক্ষেত্রে, যেখানে অভিভাবকের উপস্থিতি মর্যাদা ও সামাজিক সুরক্ষার জন্য কাম্য।

(هـ) অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া প্রাপ্তবয়স্ক নারীর বিবাহের হুকুম:
১. হানাফী মাযহাব (ইমাম আবু হানীফা ও তহাবী): সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন প্রাপ্তবয়স্ক স্বাধীন নারী অভিভাবকের অনুমতি ছাড়াই যদি কুফু (সমমর্যাদা) বজায় রেখে এবং মহরে মিছল দিয়ে নিজে নিজে বিবাহ সম্পন্ন করে, তবে সে বিবাহ শরীয়তসম্মতভাবে শুদ্ধ ও কার্যকর হবে। দলিল: কুরআনের আয়াত—”فلا تعضلوهن أن ينكحن أزواجهن” (তারা নিজেদের স্বামীদের বিবাহ করতে চাইলে তাদের বাধা দিও না), এবং হাদীস—”الأيم أحق بنفسها من وليها” (অভিভাবকের চেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক নারী নিজ বিষয়ে অধিক হকদার)। আয়েশা (রা.)-এর হাদীসটিকে ইমাম তহাবী অপ্রাপ্তবয়স্ক বা ক্রীতদাসীর ক্ষেত্রে অথবা কুফু ছাড়া অসঙ্গত বিয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলে সমাধান করেছেন। স্বয়ং হযরত আয়েশা (রা.) তাঁর ভাতিজিকে অভিভাবক ছাড়াই বিয়ে দিয়েছিলেন বলে সহীহ সনদে প্রমাণিত।
২. জুমহুর ফকীহ (শাফেঈ, মালিক, আহমদ): অভিভাবকের সম্মতি ও এজাব ছাড়া কোনো নারীর বিবাহ শুদ্ধ হবে না; আয়েশা (রা.)-এর হাদীসকে তারা সাধারণ বিধান হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

٤- عن عبادة بن الصامت رضى الله عنه قال سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول الذهب بالذهب وزنا بوزن والفضة بالفضة وزنا بوزن والبر بالبر مثلا بمثل والشعير بالشعير مثلا بمثل والتمر بالتمر مثلا بمثل والملح بالملح مثلا بمثل فمن زاد اوازداد فقد اربى.
(أ) هل يجوز المعاملة الربوية مع البنك؟ بين بالايجاز.
(ب) ما الفرق بين البيع بالمرابحة والبيع بالربوا؟
(ج) هل يجوز بيع الذهب بالدرهم والدرهم بالذهب نسيئة؟
(د) هل يجوز الاستقراض من البنك بالربوا؟
(هـ) اذكر النتائج القبيحة للاقتصاد الربوية.

[৪. হযরত উবাদাহ ইবনুস সামিত (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি—”স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ ওজনের সমতায়, রৌপ্যের বিনিময়ে রৌপ্য ওজনের সমতায়, গমের বিনিময়ে গম পরিমাপের সমতায়, যবের বিনিময়ে যব পরিমাপের সমতায়, খেজুরের বিনিময়ে খেজুর সমপরিমাণে এবং লবণের বিনিময়ে লবণ সমপরিমাণে এবং হাতে হাতে বিক্রি করতে হবে। যে ব্যক্তি অতিরিক্ত দেবে বা অতিরিক্ত গ্রহণ করবে, সে নিশ্চিতভাবেই সুদের লেনদেন করল।”]

তাহক্বীক্বে কালিমাত (শব্দমূল ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ):

শব্দ অর্থ মূল ধাতু (Root/Madda) শব্দরূপ/ছীগাহ (Form/Sighah) ব্যাকরণিক অবস্থান (Grammatical Role)
وَزْنًا بِوَزْنٍ ওজনে ওজনে সমান و – ز – ن مصدر منصوب على الحالية حال منصوب، والجار والمجرور صفة له
مِثْلًا بِمِثْلٍ হুবহু সমপরিমাণে م – ث – ل اسم منصوب على الحالية حال منصوب، والجار والمجرور متعلق به
زَادَ অতিরিক্ত দিল / বৃদ্ধি করল ز – ي – د فعل ماض، أجوف يائي فعل الشرط مبني على الفتح في محل جزم
اسْتَزَادَ / ازْدَادَ অতিরিক্ত দাবি করল / গ্রহণ করল ز – ي – د فعل ماض، باب افتعال معطوف على زاد مبني على الفتح
أَرْبَى সুদ গ্রহণ করল / সুদে লিপ্ত হলো ر – ب – و فعل ماض، باب إفعال جواب الشرط مقترن بقد، مبني على الفتح المقدر

সংশ্লিষ্ট উপ-প্রশ্নসমূহের প্রামাণ্য তাহকীক ও ফিকহী পর্যালোচনা:

(أ) ব্যাংকের সাথে সুদী লেনদেনের শরয়ী বিধান:
প্রচলিত বাণিজ্যিক ব্যাংকের সকল প্রকার সুদী লেনদেন, স্থায়ী আমানতের ওপর ফিক্সড সুদ গ্রহণ কিংবা সুদী ঋণের আদান-প্রদান ইসলামে অকাট্যভাবে হারাম ও কবীরা গুনাহ। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন: “وأحل الله البيع وحرم الربا” (আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন)। তবে শরীয়াহ-সম্মত ইসলামী ব্যাংকিংয়ের নীতি অনুযায়ী মুদারাবা, মুশারাকা বা মুরাবাহা ভিত্তিক শরিয়াহ অনুমোদিত পদ্ধতিতে লেনদেন করা সম্পূর্ণ বৈধ।

(ب) মুরাবাহা ও সুদের মধ্যকার পার্থক্য (الفرق بين البيع بالمرابحة والبيع بالربا):
১. মুরাবাহা (المرابحة): এটি একটি বৈধ বাণিজ্যিক কেনাবেচা, যেখানে বিক্রেতা পণ্যের প্রকৃত ক্রয়মূল্য ক্রেতাকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে উভয়পক্ষের সম্মতিতে নির্দিষ্ট লাভে পণ্য বিক্রয় করে। এখানে লাভ অর্জিত হয় পণ্যের ঝুঁকি বহন ও মালিকানা হস্তান্তরের মাধ্যমে।
২. সুদ (الربا): এটি অর্থের বিনিময়ে অর্থের অতিরিক্ত গ্রহণ, যেখানে কোনো পণ্যের লেনদেন বা ব্যবসায়িক ঝুঁকি থাকে না; বরং সময়ের বিপরীতে নিছক ঋণের ওপর বাড়তি অর্থ আদায় করা হয়। পণ্য ক্রয়-বিক্রয় ছাড়া শুধু পুঁজির ওপর নিশ্চিত অতিরিক্ত গ্রহণই হলো হারাম সুদ।

(ج) বাকিতে স্বর্ণ ও রূপার কেনাবেচার হুকুম (بيع الذهب بالدرهم نسيئة):
স্বর্ণ ও রৌপ্যের পারস্পরিক লেনদেনকে শরীয়তের পরিভাষায় ‘বায়উস সারফ’ (بيع الصرف) বলা হয়। এ ধরনের লেনদেনে মজলিসেই উভয়পক্ষের মাল তাৎক্ষণিকভাবে হস্তগত (التقابض في المجلس) হওয়া ওয়াজিব ও অপরিহার্য শর্ত। স্বর্ণ দিয়ে রূপা বা মুদ্রা ক্রয় করার ক্ষেত্রে বাকিতে (نسيئة) লেনদেন করা সম্পূর্ণ হারাম এবং তা ‘রিবা আন-নাসীআহ’ (রিবায়ে নাসীআ)-এর অন্তর্ভুক্ত।

(د) ব্যাংক থেকে সুদে ঋণ গ্রহণের হুকুম:
বাধ্যতামূলক জীবন-মরণ সঙ্কট (ضرورة ملجئة) ছাড়া সাধারণ ব্যবসা, বাড়ি নির্মাণ বা বিলাসী জীবনযাপনের জন্য প্রচলিত ব্যাংক থেকে সুদের চুক্তিতে ঋণ গ্রহণ করা সম্পূর্ণ হারাম। রাসূলুল্লাহ (সা.) সুদখোর, সুদদাতা, সুদের লেখক এবং এর দুই সাক্ষীর ওপর অভিসম্পাত করেছেন এবং বলেছেন—”هم سواء” (তারা পাপের দিক দিয়ে সমান অপরাধী)।

(هـ) সুদী অর্থনীতির ভয়াবহ ও কুৎসিত পরিণতি:
সুদভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মানবসমাজে মারাত্মক ধ্বংস ডেকে আনে:
১. সম্পদের কেন্দ্রীভবন ঘটায়—গরীবের রক্তচোষা অর্থ গুটিকয়েক পুঁজিপতির হাতে জমা হয়।
২. সমাজে বেকারত্ব, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে দেয়।
৩. ধনী ও দরিদ্রের মাঝে সামাজিক বৈষম্য ও ঘৃণা সৃষ্টি করে, দয়া ও সহমর্মিতার অনুভূতি ধ্বংস করে।
৪. সর্বোপরি সুদী অর্থনীতিতে নিমগ্ন জাতি আল্লাহর পক্ষ থেকে যুদ্ধ ও লানতের মুখোমুখি হয়—”فأذنوا بحرب من الله ورسوله”।

٥- عن ابى هريرة رضى الله عنه عن النبى صلى الله عليه وسلم قال الظهر يركب بنفقته اذا كان مرهونا ولبن الدر يشرب بنفقته اذا كان مرهونا.
(أ) ما معنى الرهن؟ لغة وما حكمه؟ بين بالايجاز.
(ب) ما حكم التصرف فى الرهن من الراهن قبل التسليم؟
(ج) هل يجوز الركوب على الحيوان المرهون وشرب لبن الدر بنفقته؟
(د) هل يجوز للمرتهن ان يستفيد من الشيئ المرهون؟ بين.
(هـ) بين حكم استعارة المرهون من الراهن والمرتهن ومن الأجنبى.

[৫. হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “বন্ধকী বাহন জন্তুর পিঠে আরোহণ করা যাবে তার খাদ্য ও ভরণপোষণের ব্যয়ের বিনিময়ে এবং বন্ধকী গাভীর দুধ পান করা যাবে তার ঘাস-পানির ব্যয়ের বিনিময়ে। আর যে ব্যক্তি আরোহণ করে ও দুধ পান করে, জন্তুর ভরণপোষণের দায়িত্ব তারই ওপর বর্তাবে।”]

তাহক্বীক্বে কালিমাত (শব্দমূল ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ):

শব্দ অর্থ মূল ধাতু (Root/Madda) শব্দরূপ/ছীগাহ (Form/Sighah) ব্যাকরণিক অবস্থান (Grammatical Role)
الظَّهْرُ পিঠ / আরোহণের জন্তু ظ – هـ – ر اسم ثلاثي مجرد نائب فاعل مرفوع بالضمة الظاهرة
يُرْكَبُ আরোহণ করা হয় ر – ك – ب فعل مضارع مجهول، باب سمع فعل مضارع مبني للمجهول مرفوع بالضمة
بِنَفَقَتِهِ তার ব্যয়ের বিনিময়ে ن – ف – ق اسم مجرور بالباء مضاف للضمير جار ومجرور متعلق بالفعل يركب
مَرْهُونًا বন্ধককৃত অবস্থায় ر – هـ – ن اسم مفعول، مفرد مذكر حال أو خبر كان منصوب بالفتحة
الدَّرِّ প্রচুর দুধেল পশু د – ر – ر مصدر يستعمل وصفا مضاف إليه مجرور بالكسرة الظاهرة

সংশ্লিষ্ট উপ-প্রশ্নসমূহের প্রামাণ্য তাহকীক ও ফিকহী পর্যালোচনা:

(أ) বন্ধক (الرهن)-এর আভিধানিক অর্থ ও শরয়ী বিধান:
আভিধানিক অর্থ: الثبوت والدوام (স্থায়িত্ব ও আবদ্ধ রাখা) এবং الحبس (আটকিয়ে রাখা)।
পারিভাষিক অর্থ: ঋণ পরিশোধের নিশ্চয়তাস্বরূপ কোনো আর্থিক মূল্যবান সম্পত্তি পাওনাদারের নিকট শরীয়তসম্মতভাবে আবদ্ধ রাখাকে ‘রাহন’ বা বন্ধক বলে।
শরয়ী বিধান: রাহন একটি বৈধ ও মুস্তাহাব চুক্তি। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: “فرهان مقبوضة”। নবীজী (সা.) স্বয়ং জনৈক ইহুদীর কাছে নিজের লৌহবর্ম বন্ধক রেখে খাদ্যশস্য ক্রয় করেছিলেন।

(ب) হস্তান্তরের পূর্বে বন্ধকদাতার (রাহেনের) অধিকারের হুকুম:
বন্ধকগ্রহীতা (মুুরতাহিন)-এর নিকট দখল হস্তান্তরের (قبض) পূর্বে বন্ধকদাতা (রাহেন) উক্ত বস্তুটি বিক্রয়, দান বা বিনষ্ট করলে তা তার মালিকানা হিসেবে কার্যকর হবে, তবে সে ঋণদাতার সাথে অঙ্গীকার ভঙ্গের দায়ে গুনাহগার হবে। হানাফী মাযহাব মতে, দখল হস্তান্তরের পূর্বে রাহন চুক্তি পূর্ণাঙ্গ ও বাধ্যতামূলক (لازم) হয় না; দখল পাওয়ার পরই রাহন বাধ্যতামূলক হয়।

(ج) বন্ধকী পশুতে আরোহণ ও দুধ পানের হুকুম:
হাদীসের বাহ্যিক অর্থে আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) মনে করেন, মুরতাহিন যদি বন্ধকী পশুর ঘাস-পানি ও পরিচর্যার খরচ বহন করে, তবে খরচের সমপরিমাণ সেবা হিসেবে সে পশুতে চড়তে ও দুধ পান করতে পারবে। কিন্তু ইমাম আবু হানীফা, মালিক ও শাফেঈ (রহ.)-এর মতে, বন্ধকী পশুর দুধ, সন্তান ও উপকারিতা সবই মূল মালিক রাহেনের প্রাপ্য। তবে মালিক অনুমতি দিলে এবং খরচের বিনিময়ে সমান সমান হলে জায়েয হতে পারে।

(د) মুরতাহিনের জন্য বন্ধকী বস্তু ব্যবহারের হুকুম:
হানাফী মাযহাবের চূড়ান্ত ফতোয়া অনুযায়ী, মুরতাহিন বন্ধক রাখা জমি চাষ করা, বাড়ি ভাড়া খাটিয়ে টাকা ভোগ করা বা বন্ধকী বস্তু ফ্রিতে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নাজায়েয ও হারাম। কারণ ঋণের বিপরীতে কোনো অতিরিক্ত সুবিধা গ্রহণ করাই সুদের অন্তর্ভুক্ত (كل قرض جر نفعا فهو ربا)। বন্ধক হলো কেবল জামানত, উপার্জনের মাধ্যম নয়।

(هـ) বন্ধকী বস্তু ধার (استعارة) নেওয়ার বিধান:
১. যদি রাহনগ্রহীতা (মুরতাহিন) স্বয়ং মালিকের নিকট থেকে ধার হিসেবে নেয়, তবে বন্ধক বাতিল হয় না।
২. যদি মালিক (রাহেন) মুরতাহিনের অনুমতি নিয়ে সাময়িকভাবে ব্যবহারের জন্য ধার নেয়, তবে সাময়িকভাবে তা আমানত গণ্য হবে এবং কাজ শেষে পুনরায় বন্ধক হিসেবে ফিরে আসবে।
৩. তৃতীয় কোনো বহিরাগত ব্যক্তির কাছে উভয়পক্ষের সম্মতিক্রমে ধার দেওয়া বৈধ, তবে উভয়ের অনুমতি ছাড়া দিলে যে পক্ষ অনুমতি ছাড়া দেবে সে ক্ষতিপূরণের দায়ী হবে।

٦- عن ابى هريرة رضى الله عنه قال قضى رسول الله صلى الله عليه وسلم بالشفعة فيما لم يقسم – فاذا وقعت الحدود فلا شفعة.
(أ) عرف الشفعة وكم قسما لها؟ بين.
(ب) هل تثبت الشفعة للجار؟ وما الاختلاف فى هذه المسئلة؟
(ج) اذكر اقوال العلماء فى اشتقاق كلمة الشفعة.
(د) بين حكم الشفعة فى العروض والسفن؟
(هـ) لماذا تجب الشفعة؟ وبماذا تستقر؟ ثم بين مستحقيها على الترتيب.

[৬. হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অবিভক্ত যৌথ সম্পত্তির ক্ষেত্রে শুফ’আহ (অগ্রক্রয়াধিকার)-এর ফায়সালা দিয়েছেন। অতএব যখন সীমানা চিহ্নিত হয়ে যায় এবং পথ আলাদা হয়ে যায়, তখন আর কোনো শুফ’আহ থাকে না।]

তাহক্বীক্বে কালিমাত (শব্দমূল ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ):

শব্দ অর্থ মূল ধাতু (Root/Madda) শব্দরূপ/ছীগাহ (Form/Sighah) ব্যাকরণিক অবস্থান (Grammatical Role)
قَضَى ফায়সালা দিলেন / নির্দেশ জারি করলেন ق – ض – ي فعل ماض، ناقص يائي فعل ماض مبني على الفتح المقدر
الشُّفْعَةِ অগ্রক্রয়াধিকারের বিধান ش – ف – ع اسم ثلاثي مجرد اسم مجرور بالباء وعلامة جره الكسرة
يُقْسَمْ বণ্টন করা হয় ق – س – م فعل مضارع مجهول مجزوم بلم فعل مضارع مبني للمجهول وعلامة جزمه السكون
وَقَعَتِ নির্ধারিত হয়ে গেল / পড়ে গেল و – ق – ع فعل ماض، مثال واوي فعل ماض مبني على الفتح، والتاء للتأنيث
الْحُدُودُ সীমানাসমূহ ح – د – د جمع حد، اسم ثلاثي مضاعف فاعل مرفوع بالضمة الظاهرة

সংশ্লিষ্ট উপ-প্রশ্নসমূহের প্রামাণ্য তাহকীক ও ফিকহী পর্যালোচনা:

(أ) শুফ’আহর সংজ্ঞা ও এর প্রকারভেদ:
আভিধানিক অর্থ: الشفعة শব্দটি الشفع (জোড় করা) থেকে উদ্ভূত; ক্রেতার ক্রিত সম্পত্তিকে নিজের সম্পত্তির সাথে সংযুক্ত করে জোড় করা।
পারিভাষিক অর্থ: কোনো স্থাবর সম্পত্তি বিক্রয় হলে বিক্রিত মূল্যের সমপরিমাণ মূল্য পরিশোধ করে বাধ্যতামূলকভাবে তা নিজের অধিকারে নেওয়ার বিশেষ শরয়ী আইনি অধিকারকে শুফ’আহ বলে।
হানাফী মাযহাব মতে শুফ’আহের হকদার ৩ প্রকার: ১. الشريك في نفس المبيع (অবিভক্ত মূল সম্পত্তির অংশীদার), ২. الشريك في حق المبيع (সম্পত্তির সংশ্লিষ্ট অধিকার যেমন রাস্তা বা পানির অংশীদার), ৩. الجار الملاصق (সংলগ্ন প্রতিবেশী)।

(ب) প্রতিবেশীর জন্য শুফ’আহ সাব্যস্ত হওয়া ও ফকীহদের মতভেদ:
১. হানাফী মাযহাব (ইমাম তহাবীর জোরালো সমর্থন): সংলগ্ন প্রতিবেশীর (الجار الملاصق) জন্য শুফ’আহ শতভাগ সাব্যস্ত হবে। দলিল: হযরত জাবির, সামুরা ও আবু রাফে’ (রা.) সূত্রে রাসূলুল্লাহর স্পষ্ট হাদীস—”الجار أحق بصقبه” (প্রতিবেশী তার সংলগ্নতার কারণে অগ্রক্রয়াধিকারের সর্বাধিক হকদার)। আর আবু হুরায়রার হাদীস দ্বারা যৌথ অংশীদারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রমাণিত হয়, প্রতিবেশীর অধিকার রহিত হয় না।
২. ইমাম শাফেঈ ও মালিক (রহ.): সীমানা নির্ধারিত হয়ে গেলে প্রতিবেশীর কোনো শুফ’আহ থাকে না; শুফ’আহ কেবল অবিভক্ত অংশীদারের জন্য খাস।

(ج) শুফ’আহ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত পর্যালোচনা:
ভাষাতাত্ত্বিক ও ফকীহগণের মতে, জাহেলী যুগে কেউ জমি বা বাড়ি বিক্রি করতে চাইলে প্রতিবেশী এসে বলতো: “اشفعني فيما اشتريت” (তুমি যা কিনেছ তাতে আমাকে শাফী বা অংশীদার বানিয়ে নাও)। অর্থাৎ একক জমিকে সে নিজের জমির সাথে জোড়াতালি দিয়ে নিজের মালিকানাভুক্ত করত। ইসলাম সেই ক্ষতিকর প্রতিবেশীর হাত থেকে নিষ্কৃতি দিয়ে সুরক্ষার জন্য এই অগ্রক্রয়াধিকারকে ‘শুফ’আহ’ নামকরণ করে আইনসিদ্ধ করেছে।

(د) অস্থাবর সম্পদ ও নৌযানে শুফ’আহর বিধান:
জুমহুর ফকীহ এবং হানাফী মাযহাবের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলো—শুফ’আহ কেবল স্থাবর সম্পত্তি (العقار – জমি, বাড়ি, বাগান)-এর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কোনো অস্থাবর মালামাল (عروض التجارة), পোশাক, পশু কিংবা নৌকা-জাহাজে (السفن) শুফ’আহ প্রযোজ্য নয়। তবে জমির সাথে স্থায়ীভাবে যুক্ত গাছপালা বা ঘরবাড়ি জমির তাবেদার হিসেবে শুফ’আহর অন্তর্ভুক্ত হবে।

(هـ) শুফ’আহ ওয়াজিব হওয়ার কারণ, স্থায়িত্ব ও ক্রমধারা:
শুফ’আহ ওয়াজিব হওয়ার মূল কারণ হলো—অপছন্দনীয় ও ক্ষতিকর অচেনা অংশীদার বা প্রতিবেশীর সম্ভাব্য ক্ষতি থেকে আত্মরক্ষা করা (دفع ضرر الدخيل)।
এটি বিক্রয়চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথে সৃষ্টি হয় এবং তিনটি তলবের মাধ্যমে স্থায়ী হয়: ১. طلب المواثبة (বিক্রির খবর শুনেই তাৎক্ষণিক দাবি করা), ২. طلب التقرير والإشهاد (সাক্ষী রেখে পুনর্ব্যক্ত করা), ৩. طلب الخصومة (আদালতে মামলা দায়ের করা)।
হকদারদের অগ্রাধিকারের ক্রম: প্রথমে অবিভক্ত মূল শরিক, এরপর পথ বা ড্রেনের অংশীদার, সবশেষে সংলগ্ন প্রতিবেশী।

٧- عن على رضى الله عنه ان رسول الله صلى الله عليه وسلم قال قال لى جبرئيل عليه السلام انا لا ندخل بيتا فيه كلب ولا صورة ولا تمثال.
(أ) ما حكم التلفاز؟ هل يجوز الاستفادة من برامجه المنشورة؟
(ب) بين حكم التمثال بالايجاز.
(ج) ما حكم التصوير الفتوغرافى اليوم؟
(د) عرف الصورة والتصاوير – ثم بين حكمهما مدللا.
(هـ) هل من فرق بين تصوير ذى روح وبين ما ليس له روح؟ بين.

[৭. হযরত আলী (রা.) হতে বর্ণিত, নিশ্চয়ই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন: জিবরাঈল (আ.) আমাকে বলেছেন—”আমরা (রহমতের ফেরেশতাগণ) এমন কোনো ঘরে প্রবেশ করি না যাতে কুকুর থাকে কিংবা কোনো ছবি বা কোনো মূর্তি বিদ্যমান থাকে।”]

তাহক্বীক্বে কালিমাত (শব্দমূল ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ):

শব্দ অর্থ মূল ধাতু (Root/Madda) শব্দরূপ/ছীগাহ (Form/Sighah) ব্যাকরণিক অবস্থান (Grammatical Role)
لَا نَدْخُلُ আমরা প্রবেশ করি না د – خ – ل فعل مضارع منفي، متكلم مع الغير فعل مضارع مرفوع، والفاعل ضمير مستتر نحن
كَلْبٌ কুকুর ك – ل – ب اسم جنس ثلاثي اسم كان مؤخر أو فاعل لفعل تام مرفوع
صُورَةٌ ছবি বা প্রতিকৃতি ص – و – ر اسم مفرد مؤنث معطوف على كلب مرفوع بالضمة
تِمْثَالٌ মূর্তি / ত্রিমাত্রিক ভাস্কর্য م – ث – ل اسم على وزن مفعال معطوف على كلب مرفوع بالضمة
ذِي رُوحٍ প্রাণী / প্রাণধারী বস্তু ر – و – ح مركب إضافي مجرور مضاف إليه مجرور بالياء لأنه من الأسماء الستة

সংশ্লিষ্ট উপ-প্রশ্নসমূহের প্রামাণ্য তাহকীক ও ফিকহী পর্যালোচনা:

(أ) টেলিভিশনের বিধান ও এর শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানাদি দেখা:
টেলিভিশন স্বয়ং একটি প্রযুক্তিগত প্রচারযন্ত্র (آلة)। ফিকহী মূলনীতি অনুযায়ী—যন্ত্রের হুকুম তার ব্যবহারের উদ্দেশ্যের ওপর নির্ভরশীল (الوسائل لها أحكام المقاصد)। যদি টেলিভিশন অশ্লীলতা, গান-বাজনা ও বেপর্দাগির কাজে ব্যবহৃত হয় তবে তা হারাম। পক্ষান্তরে, দ্বীনি শিক্ষা, কুরআন তিলাওয়াত, ইসলামী দাওয়াহ, স্বাস্থ্যবিষয়ক ও শিক্ষামূলক ইতিবাচক জ্ঞান অর্জনে টেলিভিশন বা ভিডিও স্ক্রিনের সদ্ব্যবহার করা শর্তসাপেক্ষে সম্পূর্ণ বৈধ ও প্রশংসনীয়।

(ب) মূর্তির শরয়ী হুকুম (حكم التمثال):
যেকোনো প্রাণীর ত্রিমাত্রিক ছায়াযুক্ত মূর্তি (تمثال বা ভাস্কর্য) তৈরি করা, ঘরে বা উন্মুক্ত স্থানে স্থাপন করা, বেচাকেনা করা এবং সম্মান প্রদর্শন করা সর্বসম্মত ইজমায়ে উম্মত অনুযায়ী সম্পূর্ণ হারাম ও শিরকের অন্যতম মাধ্যম। রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত আলীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন: “لا تدع تمثالا إلا طمسته” (কোনো মূর্তি দেখলে তা ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ না করে ছাড়বে না)।

(ج) আধুনিক ডিজিটাল ফটোগ্রাফির ফিকহী বিধান:
আধুনিক কালের প্রখ্যাত ফকীহগণের (যেমন মুফতী তকী উসমানী, শায়খ ইবনে উছাইমীন) তাহকীক অনুযায়ী: ডিজিটাল ক্যামেরা বা মোবাইল স্ক্রিনের ছবি মূলত কোনো স্থায়ী অঙ্কন নয়; বরং তা আয়নার প্রতিবিম্বের মতো আলোক তরঙ্গের ডিজিটাল সংরক্ষণ (انحباس الظل)। সুতরাং পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, অপরাধ দমন ও শিক্ষামূলক অনিবার্য প্রয়োজনে ডিজিটাল ছবি তোলা সম্পূর্ণ জায়েয। তবে অহংকার, অবৈধ প্রদর্শনী বা প্রাণীর ছবি প্রিন্ট করে টাঙিয়ে রাখা নিষিদ্ধ।

(د) ছবি ও প্রতিকৃতির সংজ্ঞা ও শরয়ী বিধান:
الصورة হলো কোনো বস্তুর রূপরেখা বা দৃশ্যমান অবয়ব। নিজ হাতে রং-তুলি দিয়ে সজ্ঞানে কোনো প্রাণীর অবয়ব অঙ্কন করা হারাম। হাদীসে এসেছে—কেয়ামতের দিন চিত্রকরদের সর্বাধিক কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে এবং বলা হবে: “أحيوا ما خلقتم” (তোমরা যা সৃষ্টি করেছিলে তাতে প্রাণ সঞ্চার কর)।

(هـ) প্রাণীর ছবি ও অপ্রাণ বস্তুর ছবির পার্থক্য:
প্রাণীর ছবি (ذو روح) এবং নির্জীব অপ্রাণ বস্তু (غير ذي روح)-এর মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। গাছপালা, নদীনালা, পাহাড়-পর্বত, চন্দ্র-সূর্য, মোটরযান, প্রাকৃতিক দৃশ্য ইত্যাদির ছবি আঁকা, সংরক্ষণ ও ঘরে প্রদর্শন করা সকল ফকীহের সর্বসম্মত মতে সম্পূর্ণ হালাল ও মুবাহ। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) জনৈক চিত্রকরকে বলেছিলেন: “إن كنت لا بد فاعلا فاصنع الشجر وما لا نفس له” (যদি তোমাকে ছবি আঁকতেই হয় তবে গাছপালা এবং যেসবে প্রাণ নেই তার ছবি আঁকো)।

٨- عن ابى هريرة رضى الله عنه ان عمر رضى الله عنه ابصر امرأة تبكى على ميت فنهاها – فقال له رسول الله صلى الله عليه وسلم دعها يا ابا حفص فان النفس مصابة والعين باكية والعهد قريب.
(أ) هل الميت يعذب فى قبره ببكاء اهله عليه؟
(ب) كم قسما للكراهة؟ بين اقسامها مع اختلاف الائمة.
(ج) هل تجوز صلاة الجنازة على الغائب؟
(د) هل تجوز صلاة الجنازة فى المسجد؟
(هـ) وصية ترك النوح والبكاء واجب على الميت ام لا؟

[৮. হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, হযরত উমর (রা.) এক নারীকে মাইয়্যেতের জন্য ক্রন্দনরত দেখে তাকে বারণ করলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: “হে আবু হাফস! তাকে কাঁদতে দাও; কেননা হৃদয় ব্যথিত ও বিপদাক্রান্ত, চোখ অশ্রুসজল এবং বিয়োগের মুহূর্ত অত্যন্ত নিকটবর্তী।”]

তাহক্বীক্বে কালিমাত (শব্দমূল ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ):

শব্দ অর্থ মূল ধাতু (Root/Madda) শব্দরূপ/ছীগাহ (Form/Sighah) ব্যাকরণিক অবস্থান (Grammatical Role)
أَبْصَرَ তিনি দেখলেন ب – ص – ر فعل ماض، باب إفعال فعل ماض مبني على الفتح الظاهر
دَعْهَا তাকে ছেড়ে দাও / কাঁদতে দাও و – د – ع فعل أمر، باب فتح مع ضمير المؤنث فعل أمر والفاعل مستتر تقديره أنت، وها مفعول به
مُصَابَةٌ বিপদগ্রস্ত / শোকাতুর ص – و – ب اسم مفعول مؤنث، باب إفعال خبر إن مرفوع بالضمة الظاهرة
بَاكِيَةٌ অশ্রুপাতকারী / ক্রন্দনরত ب – ك – ي اسم فاعل مؤنث، ناقص يائي خبر إن الثاني مرفوع بالضمة
قَرِيبٌ অল্প সময় / নিকটবর্তী ق – ر – ب صفة مشبهة خبر المبتدأ العهد مرفوع بالضمة

সংশ্লিষ্ট উপ-প্রশ্নসমূহের প্রামাণ্য তাহকীক ও ফিকহী পর্যালোচনা:

(أ) পরিবারের কান্নাকাটির কারণে মাইয়্যেত কবরে আযাবপ্রাপ্ত হয় কি?
হাদীসে এসেছে: “إن الميت يعذب ببكاء أهله عليه”। ইমাম তহাবী ও উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.)-এর প্রামাণ্য তাহকীক অনুযায়ী: কুরআনের মূলনীতি হলো—”ولا تزر وازرة وزر أخرى” (কেউ অপরের পাপের বোঝা বহন করবে না)। সুতরাং কেবল সাধারণ চোখের পানির কারণে মৃত ব্যক্তি শাস্তি পায় না। বরং আযাব হবে তখনই—যদি মৃত ব্যক্তি মৃত্যুর পূর্বে জাহেলী প্রথা অনুযায়ী বিলাপ করে মাতম করার ওসিয়ত করে যায়, কিংবা পরিবারের লোকজনের মাতমে অভ্যস্ত থাকা সত্ত্বেও জীবদ্দশায় তাদের নিষেধ না করে যায়। অথবা এখানে আযাব অর্থ কবরে জাহান্নামের শাস্তি নয়; বরং আত্মীয়দের আর্তনাদ শুনে আত্মার কষ্ট পাওয়া।

(ب) মাকরূহ-এর প্রকারভেদ ও আইম্মায়ে কেরামের দৃষ্টিভঙ্গি:
হানাফী উসূলে ফিকহ অনুযায়ী মাকরূহ প্রধানত দুই প্রকার:
১. মাকরূহে তাহরীমী (المكروه تحريما): যা অকাট্য নয় এমন প্রমাণ (দ্বন্নী দলিল) দ্বারা নিষেধ করা হয়েছে। এটি হারামের নিকটবর্তী এবং তা বর্জন করা আবশ্যক, করলে গুনাহগার হবে।
২. মাকরূহে তানযীহী (المكروه تنزيها): যা শরীয়ত পছন্দ করে না, তবে তার মধ্যে শাস্তির কোনো ভয় প্রদর্শন করা হয়নি। তা বর্জন করলে সওয়াব আছে, করলে গুনাহ নেই।
জুমহুর ফকীহগণের (শাফেঈ ইত্যাদি) পরিভাষায় মাকরূহ বলতে মূলত তানযীহী বোঝায়, আর তাহরীমীকে সরাসরি হারাম গণ্য করা হয়।

(ج) গায়েবানা জানাযার নামাযের হুকুম (صلاة الجنازة على الغائب):
১. হানাফী ও মালিকী মাযহাব: গায়েবানা জানাযার নামায সম্পূর্ণ নাজায়েয ও মাকরূহে তাহরীমী। জানাযা শুদ্ধ হওয়ার জন্য লাশ সামনে উপস্থিত থাকা অপরিহার্য শর্ত। রাসূলুল্লাহ (সা.) হাবশার বাদশাহ নাজ্জাশীর যে নামায পড়েছিলেন, তা ছিল তাঁর জন্য বিশেষ মু’জিযাহ—আল্লাহ নাজ্জাশীর লাশ চোখের সামনে পর্দা তুলে উপস্থিত করেছিলেন।
২. শাফেঈ ও হাম্বলী মাযহাব: দূরে অবস্থানরত কোনো বিশিষ্ট মুমিনের গায়েবানা জানাযা পড়া জায়েয, বিশেষত যার জানাযা সেখানে আদায় করা হয়নি।

(د) মসজিদে জানাযার নামায আদায়ের হুকুম:
হানাফী মাযহাব মতে, মসজিদের পবিত্রতা রক্ষা ও ভীড়ের কারণে মসজিদের অভ্যন্তরে জানাযার নামায পড়া মাকরূহে তাহরীমী; তবে লাশ বাইরে রেখে কেবল মুক্তাদীগণ ভেতরে থাকলে তানযীহী। জানাযার জন্য স্বতন্ত্র জানাযাগাহ বা ঈদগাহ ব্যবহার করাই সুন্নাত। তবে ইমাম শাফেঈ ও আহমদের মতে মসজিদে জানাযা জায়েয, কারণ রাসূল (সা.) সুহাইল ইবনে বায়দার জানাযা মসজিদে পড়েছিলেন।

(هـ) মাতম ও বিলাপ বর্জনের অসিয়ত করা কি ওয়াজিব?
যদি কারো পরিবারের লোকদের মাঝে অজ্ঞতা বা জাহেলী নিয়মে জামা-কাপড় ছেঁড়া, চুল ছেঁড়া ও উচ্চৈঃস্বরে বিলাপ (النوح) করার অভ্যাস থাকে, তবে মৃত্যুর পূর্বে তাদের এ থেকে বিরত থাকার কঠোর অসিয়ত করে যাওয়া ঐ ব্যক্তির ওপর শরীয়তসম্মতভাবে ওয়াজিব। যদি সে অসিয়ত না করে মারা যায় তবে সেও তাদের গুনাহ ও কষ্টের অংশীদার হবে।

مجموعة (ب) – খ বিভাগ : তাত্ত্বিক ও ইতিহাস অংশ (মান: ২০ × ১ = ২০)

٩- تحدث عن منزلة كتاب شرح معانى الآثار – بين كتب الحديث مفصلا.

[৯. হাদীস সাহিত্যের ইতিহাসে ইমাম তহাবী রচিত ‘শরহু মা’য়ানিল আছার’ কিতাবের সুমহান মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য বিশদভাবে আলোচনা কর।]

ভূমিকা ও কিতাবের অনন্য পরিচয়:
ইলমে হাদীস ও ফিকহের অনন্য সমন্বয়ে তৃতীয় হিজরী শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাদীস বিশারদ ও ইমামুত তাহাভিয়্যাহ আবু জাফর আহমদ ইবনে মুহাম্মাদ আত-তহাবী (রহ.) (২৩৯-৩২১ হি.) সংকলন করেন কালজয়ী হাদীসগ্রন্থ ‘শরহু মা’য়ানিল আছার’ (شرح معاني الآثار)। এটি কেবল হাদীস বর্ণনার সাধারণ সংকলন নয়; বরং এটি ফিকহুল হাদীসের এমন এক অতুলনীয় বিশ্বকোষ যেখানে আহকামের হাদীসসমূহের জটিল রহস্য উন্মোচন এবং আপাত বিরোধপূর্ণ রিওয়ায়েতের মধ্যে অপূর্ব সমন্বয় ও প্রাধান্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

হাদীস সাহিত্যে কিতাবটির শীর্ষস্থানীয় মর্যাদা:
১. সিহাহ সিত্তাহর সমকক্ষ সানাদ: ইমাম তহাবী (রহ.) ইমাম নাসাঈর সমকালীন এবং ইমাম বুখারী ও মুসলিমের ছাত্রদের প্রজন্মের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস। তাঁর অধিকাংশ বর্ণনায় উঁচুমাপের ‘উঁচু সানাদ’ (العلو في الإسناد) রয়েছে। বহু বর্ণনায় তাঁর ও রাসূলুল্লাহর মাঝে মাত্র তিন বা চারজন নির্ভরযোগ্য রাবী বিদ্যমান।
২. ফিকহী মাযহাবসমূহের দলিল সমৃদ্ধকরণ: আহলে ইলমদের মাঝে বিশেষত হানাফী ফিকহের সুদৃঢ় হাদীসভিত্তিক ভিত্তিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে এ কিতাবের অবদান অতুলনীয়। ইমাম তাহাবী দেখিয়েছেন যে, ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর প্রতিটি ইজতিহাদ ও ফতোয়ার পেছনে সহীহ হাদীসের অকাট্য ভিত্তি বিদ্যমান।
৩. মুহাদ্দিসীনদের স্বীকৃতি: হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী, হাফেজ বদরুদ্দীন আইনী, ইবনে কাসীর এবং শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.) এ কিতাবের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। শাহ ওয়ালিউল্লাহ তাঁর ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ’ গ্রন্থে হাদীস সংকলনের দ্বিতীয় স্তরে মুয়াত্তা ও সহীহাইনের পরই তহাবীর শরহু মা’য়ানিল আছারকে স্থান দিয়েছেন।

গ্রন্থটির মৌলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ (خصائص الكتاب):
১. আপাত বিরোধপূর্ণ হাদীসের সমন্বয় (الجمع بين مختلف الحديث): কোনো মাসআলায় দুই ধরনের পরস্পরবিরোধী হাদীস উপস্থিত হলে ইমাম তহাবী প্রথমে উভয় পক্ষের রিওয়ায়েতগুলো অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে পূর্ণ সানাদসহ সংকলন করেন। এরপর কোনটি নাসিখ (রহিতকারী) এবং কোনটি মানসূখ (রহিত), তা ঐতিহাসিক কালানুক্রম ও সাহাবাদের আমলের আলোকে নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলেন।
২. ‘নজর’ বা যৌক্তিক ফিকহী বিশ্লেষণের প্রয়োগ (طريقة النظر والقياس الصحيح): এটি তহাবীর কিতাবের সর্বাধিক অনন্য বৈশিষ্ট্য। রিওয়ায়েতের দলিল পেশ করার পর তিনি ‘باب النظر’ নামে একটি গভীর যুক্তিসিদ্ধ বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন। তিনি প্রমাণ করেন যে শরীয়তের অন্তর্নিহিত হিকমত ও কিয়াসও সেই অভিমতকেই সমর্থন করে যা তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
৩. রাবীদের বিশ্বস্ততা ও জারহ-তাদীলের পর্যালোচনা: ইমাম তহাবী হাদিসের সনদ পর্যালোচনায় অত্যন্ত সতর্ক ও নিরপেক্ষ ছিলেন। দুর্বল বা ত্রুটিপূর্ণ রাবীর বর্ণনা তিনি চিহ্নিত করে সহীহ সনদকে সমুন্নত করেছেন।
৪. আইম্মায়ে আরবা’আর মতামতের তুলনামূলক পর্যালোচনা: কিতাবটিতে কেবল হানাফী মাযহাব নয়, বরং ইমাম শাফেঈ, মালিক, সাওরী ও আওযায়ীর দলীলসমূহ অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠভাবে উপস্থাপন করে তুলনামূলক ফেকাহর (الفقه المقارن) অপূর্ব নিদর্শন পেশ করা হয়েছে।

উপসংহার:
সংক্ষেপে বলা যায়, ‘শরহু মা’য়ানিল আছার’ এমন একটি কিতাব যা কোনো গবেষক বা উচ্চতর হাদীসের ছাত্র অধ্যয়ন না করলে ফিকহুল হাদীস ও আহকামুল কুরআনের গভীর তত্ত্ব উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে না। হাদীস ও ফেকাহর অপূর্ব মেলবন্ধনে কিতাবটি ইসলামের ইতিহাসে এক অমর জ্ঞানতাত্ত্বিক সৌধ হয়ে আছে।

١٠- اكتب نبذة عن حياة الامام ابى جعفر الطحاوى.

[১০. ইমাম আবু জাফর আহমদ ইবনে মুহাম্মাদ আত-তহাবী (রহ.)-এর জীবনকর্ম, ইলমী সাধনা ও অবদান সংক্ষেপে আলোচনা কর।]

জন্ম ও বংশপরিচয়:
হাদীস ও ফিকাহ শাস্ত্রের যুগশ্রেষ্ঠ ইমাম আবু জাফর আহমদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে সালামাহ আল-আযদী আল-হিজরী আত-তহাবী (রহ.) ২৩৯ হিজরী মোতাবেক ৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে মিশরের উচ্চাঞ্চলের ‘ত্বহা’ (طحا) নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কুরাইশ বংশের সাথে সম্বন্ধযুক্ত বিখ্যাত আযদ গোত্রের এক সম্ভ্রান্ত ও উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন দ্বীনি পরিবারে বেড়ে ওঠেন। তাঁর পিতা ছিলেন একজন প্রথিতযশা কবি ও আলেম, এবং তাঁর মা ছিলেন প্রখ্যাত ইমাম মুযানী (রহ.)-এর বোন।

শিক্ষা ও শিক্ষকবৃন্দ:
ইমাম তহাবী শৈশবে পবিত্র কুরআন মুখস্থ করে ইলমী শিক্ষার সূচনা করেন। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষক ছিলেন তাঁর মামা, ইমাম শাফেঈর শীর্ষ ছাত্র ইমাম ইসমাঈল ইবনে ইয়াহইয়া আল-মুযানী (রহ.)। মামার সান্নিধ্যে তিনি দীর্ঘকাল শাফেঈ ফিকহ ও হাদীস অধ্যয়ন করেন। পরবর্তীতে তিনি তৎকালীন মিশরের প্রধান হানাফী কাজী ও মুহাদ্দিস আবু উবাইদুল্লাহ আহমাদ ইবনে আবি ইমরান হানাফী (রহ.)-এর সান্নিধ্যে আসেন। এছাড়াও তিনি সিরিয়া সফর করে কাজী আবুল হাযিম আব্দুল হামীদসহ বাগদাদ, বসরা ও কুফার শীর্ষ মুহাদ্দিসদের নিকট থেকে হাদীস শ্রবণ ও সংগ্রহ করেন।

শাফেঈ মাযহাব থেকে হানাফী মাযহাব গ্রহণের প্রেক্ষাপট:
ইমাম তহাবী প্রথমে শাফেঈ মাযহাবের একনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন। কিন্তু তাঁর মামা ইমাম মুযানীকে তিনি গোপনে ইমাম আবু হানীফার ফিকহী কিতাবাদি অধ্যয়ন করতে ও তাঁর কিয়াসের ওপর নির্ভর করতে দেখেন। বিষয়টি তহাবীর মনে গভীর অনুসন্ধিৎসা তৈরি করে। তিনি ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর ফিকহী গবেষণা ও হাদীসের গভীরতা নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করে দেখতে পান যে, হানাফী মাযহাবের ইজতিহাদসমূহ যুক্তি, সুন্নাহর সূক্ষ্ম রূপ এবং সাহাবাদের আমলের সাথে সর্বাধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে তিনি হানাফী মাযহাব গ্রহণ করেন এবং পরবর্তী জীবনে হানাফী ফিকাহর সর্বশ্রেষ্ঠ রক্ষক ও ব্যাখ্যাকারীতে পরিণত হন।

ইলমী মর্যাদা ও বুযূর্গী:
ইমাম তহাবী ছিলেন একাধারে ‘মুহাদ্দিসুল কাবীর’ এবং ‘ফকীহুন নাফীস’। তিনি অন্ধ অনুকরণকারী মুকাল্লিদ ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন ‘মুজতাহিদ ফিল মাযহাব’। বহু মাসআলায় তিনি ইমাম আবু হানীফা ও তাঁর ছাত্রদ্বয় (আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ)-এর মতের বাইরেও সহীহ সনদের ভিত্তিতে স্বাধীন রায় পেশ করেছেন। হাফেজ ইবনে আব্দুল বার বলেন: “তহাবী ছিলেন আহলে হাদীস ও আহলে রায় উভয়ের সর্বসম্মত ইমাম।”

অমর গ্রন্থরাজি:
ইমাম তহাবী ইসলামি জ্ঞানভাণ্ডারে বহু মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করে গেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ:
১. শরহু মা’য়ানিল আছার (شرح معاني الآثار): আহকামুল হাদীস ও ফিকহুল হাদীসের কালজয়ী বিশ্বকোষ।
২. মুশকিলুল আছার (مشكل الآثار বা بيان مشكل الآثار): হাদীসের বাহ্যিক অস্পষ্টতা নিরসনে রচিত অনন্য কিতাব।
৩. আল-আক্বীদাহ আত-তহাবিয়্যাহ (العقيدة الطحاوية): আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের বিশুদ্ধ আক্বীদার সর্বজনস্বীকৃত মূলনীতিগ্রন্থ।
৪. আহকামুল কুরআন (أحكام القرآن): কুরআনী বিধানের চমৎকার তাফসীর।
৫. মুখতাসারুত তহাবী (مختصر الطحاوي): হানাফী ফিকহের প্রামাণ্য সংক্ষিপ্ত সংকলন।
৬. কিতাবুশ শুরূত আল-কাবীর ও কিতাবুশ শুফ’আহ।

ইন্তেকাল:
জ্ঞানচর্চা, শিক্ষাদান ও গ্রন্থ রচনায় সারাজীবন অতিবাহিত করে এই মহান ইমাম ৩২১ হিজরীর ১লা যিলকদ রোজ বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে ৮০ বছর বয়সে মিশরের ফুসতাত (কায়রো)-এ ইন্তেকাল করেন। তাঁকে মিশরের কারাফা নামক বিখ্যাত কবরস্থানে তাঁর মামা ইমাম মুযানীর পাশে দাফন করা হয়। আল্লাহ তা’আলা তাঁর ওপর অগাধ রহমত বর্ষণ করুন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. কামিল ১ম বর্ষ হাদীস ৪র্থ পত্রের নাম ও কোড কী?

কামিল ১ম বর্ষ হাদীস বিভাগের ৪র্থ পত্রের নাম ‘শরহু মা’য়ানিল আছার’ (Sharh Ma’ani al-Athar) এবং বিষয় কোড হলো ৬১১১০৪।

২. শরহু মা’য়ানিল আছার কিতাবটির মূল রচয়িতা কে?

এ কিতাবের মহান রচয়িতা হলেন প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকীহ ইমাম আবু জাফর আহমদ ইবনে মুহাম্মাদ আত-তহাবী আল-মিস্ত্রী (রহ.) [২৩৯-৩২১ হিজরী]

৩. এ কিতাবটি পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার প্রধান উদ্দেশ্য কী?

কুরআন-সুন্নাহর বিধানাবলীর বিপরীতমুখী হাদীসসমূহের মধ্যে ফিকহী সমন্বয় সাধন, নাসেখ-মানসূখ নির্ণয় এবং হানাফী ফিকহের সুদৃঢ় হাদীসভিত্তিক দলিল অনুধাবন করার যোগ্যতা অর্জন করা।

৪. পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্য এ বিষয়ে কীভাবে প্রস্তুতি নেওয়া উচিত?

প্রতিটি হাদীসের বিশুদ্ধ বঙ্গানুবাদ, শাব্দিক তাহক্বীক্বে কালিমাত (মূলধাতু, সীগাহ, ব্যাকরণিক অবস্থান) এবং ইমাম তহাবীর ‘নজর’ (ফিকহী যৌক্তিক সমাধান) পয়েন্ট আকারে মুখস্থ করে অনুশীলন করা জরুরি।

৫. ইমাম তহাবীর ‘আল-আকীদাতুত তহাবিয়্যাহ’ কিতাবের সাথে এ কিতাবের সম্পর্ক কী?

আল-আকীদাতুত তহাবিয়্যাহ হলো আহলুস সুন্নাহর মৌলিক ঈমান ও বিশ্বাসের সংক্ষিপ্ত নীতিমালা, আর শরহু মা’য়ানিল আছার হলো ব্যবহারিক ফিকহী আহকামের বিশদ হাদীসভিত্তিক বিশ্লেষণ।

৬. শরহু মা’য়ানিল আছার কিতাবে ‘নজর’ (النظر) বলতে কী বোঝানো হয়েছে?

তহাবীর পরিভাষায় ‘নজর’ হলো হাদীসের বাহ্যিক বর্ণনার পাশাপাশি শরীয়তের সামগ্রিক মূলনীতি, যৌক্তিক কার্যকারণ ও গভীর ফিকহী দূরদৃষ্টির আলোকে সমাধান ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা।