সুনানু আবি দাউদ ১ম পত্র (Sunan Abi Dawud 1st Paper) – 611101, হাদীস – কামিল ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২৩

StudyBoi StudyBoi
September 27, 2026
১১৩ মিনিট পড়ার সময়
২ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন

কামিল (স্নাতকোত্তর) হাদীস প্রথম পর্ব পরীক্ষা, ২০২৩
হাদীস বিভাগ (প্রথম পত্র)
বিষয়: সুনানু আবি দাউদ [নতুন সিলেবাস অনুযায়ী]
বিষয় কোড: ৬১১১০১ | পূর্ণমান: ১০০ | সময়: ৪ ঘণ্টা

[الملاحظة : أجب عن اربعة من مجموعة (أ) وعن واحد من مجموعة (ب) والأعداد بالهامش تدل على الدرجات الكاملة-]
[দ্রষ্টব্য: (ক) বিভাগ হতে যেকোনো চারটি এবং (খ) বিভাগ হতে একটি প্রশ্নের উত্তর দাও। বাম পাশের সংখ্যা প্রশ্নের পূর্ণমান জ্ঞাপক।]

مجموعة (أ) – ক বিভাগ : হাদীস অংশ (মান: ২০ × ৪ = ৮০)

١- حدثنا قتيبة بن سعيد الثقفى نا الليث عن عقيل عن الزهرى اخبرنى عبيد الله بن عبد الله بن عتبة عن ابى هريرة (رضـ) قال لما توفى رسول الله صلى الله عليه وسلم واستخلف ابو بكر بعده وكفر من كفر من العرب قال عمر بن الخطاب لابي بكر كيف تقاتل الناس وقد قال رسول الله صلى الله عليه وسلم امرت ان اقاتل الناس حتى يقولوا لا اله الا الله، فمن قال لا اله الا الله عصم منى ماله ونفسه الا بحقه وحسابه على الله، فقال ابو بكر والله لاقاتلن من فرق بين الصلوة والزكوة، فان الزكوة حق المال والله لو منعونى عقالا كانوا يؤدونه الى رسول الله صلى الله عليه وسلم لقاتلتهم على منعه. فقال عمر بن الخطاب (رضـ) فوالله ما هو الا ان رأيت الله قد شرح صدر ابي بكر للقتال قال فعرفت انه الحق.

[১. কুতায়বাহ ইবনে সাঈদ আস-সাকাফী (রহ.) … হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: যখন রাসুলুল্লাহ (সা.) ওফাত লাভ করলেন এবং তাঁর পরে আবু বকর (রা.) খলীফা নির্বাচিত হলেন এবং আরবদের মধ্যে যারা কুফরী (স্বধর্মত্যাগ) করার করল (বা যাকাত অস্বীকার করল), তখন হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) আবু বকর (রা.)-কে বললেন: আপনি কীভাবে লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন? অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন— “আমাকে মানুষের বিরুদ্ধে ততক্ষণ পর্যন্ত যুদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যতক্ষণ না তারা বলবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ (আল্লাহ ব্যতীত কোনো সত্য উপাস্য নেই)। যে ব্যক্তি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলল, সে আমার পক্ষ থেকে তার রক্ত ও সম্পদ নিরাপদ করে নিল; তবে ইসলামের হকের কারণে ব্যতিরেকে, আর তার চূড়ান্ত হিসাব আল্লাহর ওপর ন্যস্ত।” তখন হযরত আবু বকর (রা.) বললেন: “আল্লাহর কসম! যে ব্যক্তি সালাত ও যাকাতের মধ্যে পার্থক্য করবে, আমি অবশ্যই তার বিরুদ্ধে লড়াই করব। কেননা যাকাত হলো সম্পদের আর্থিক হক। আল্লাহর কসম! তারা যদি আমাকে একটি উটের রশিও (বা ছাগলের বাচ্চা) দিতে অস্বীকৃতি জানায়, যা তারা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট আদায় করত, তবে তা বন্ধ করার কারণে আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব।” ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেন: “আল্লাহর কসম! আমি কেবল এটুকু প্রত্যক্ষ করলাম যে, মহান আল্লাহ আবু বকর (রা.)-এর বক্ষকে যুদ্ধের জন্য উন্মুক্ত ও প্রশস্ত করে দিয়েছেন, অতঃপর আমি সুনিশ্চিতভাবে অবগত হলাম যে, নিশ্চয়ই এটিই চরম সত্য।”]

তাহক্বীক্বে কালিমাত (শব্দমূল ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ):

শব্দ অর্থ মূল ধাতু (Root/Madda) শব্দরূপ/ছীগাহ (Form/Sighah) ব্যাকরণিক অবস্থান (Grammatical Role)
تُوُفِّيَ তিনি ওফাত পেলেন و – ف – ي (تَفَعُّل) واحد مذكر غائب (فعل ماض مجهول) فعل الشرط বা جملة فعلية (لما-এর পর)
اسْتُخْلِفَ খলীফা নিযুক্ত হলেন خ – ل – ف (استفعال) واحد مذكر غائب (ماض مجهول) معطوف على توفي
يُؤَدُّونَ তারা আদায় করত أ – د – ي (تفعيل) جمع مذكر غائب (مضارع معروف) خبر كان
أُقَاتِلَ আমি যুদ্ধ করব ق – ت – ل (مفاعلة) واحد متكلم (مضارع منصوب بأن) صلة أن المصدرية / مفعول به
عِقَالًا উটের বাঁধার রশি ع – ق – ل اسم مفرد مذكر منصوب مفعول به للفعل “منعوني”

(أ) ما المراد بقوله عليه السلام : “وكفر من كفر من العرب”؟

উদ্ধৃত বাক্যাংশের মর্মার্থ ও প্রেক্ষাপট: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র ওফাতের পর আরব উপদ্বীপে যে অভূতপূর্ব ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিপর্যয় নেমে এসেছিল, আলোচ্য বাক্যে সেদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। ঐতিহাসিক ও মুহাদ্দিসগণের বিশ্লেষণে আরবের এই মুরতাদ বা অবাধ্যদের তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়: প্রথমত, যারা নবুওয়াতের মিথ্যা দাবিদারদের (যেমন মুসাইলামা কাযযাব, আসওয়াদ আনসী, তুলাইহা আসাদী ও সাজাহ) অনুসরণ করে সুস্পষ্টভাবে ইসলাম ত্যাগ করেছিল। দ্বিতীয়ত, যারা নবুওয়াত অস্বীকার না করলেও অজ্ঞতাবশত ইসলামকে কেবল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশার জন্য সীমাবদ্ধ মনে করেছিল। তৃতীয়ত, যারা সালাত কায়েম করলেও বখিলতাবশত বা কেন্দ্রীয় খেলাফতের কর্তৃত্ব অস্বীকার করে যাকাত প্রদান করতে সরাসরি অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছিল এবং বলেছিল— আমরা রাসুলুল্লাহর জীবদ্দশায় তাঁকে যাকাত দিতাম, আবু বকরকে নয়। আবু হুরায়রা (রা.) ব্যাপক অর্থে এদের সবাইকে আরবের কুফর ও বিদ্রোহ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, কারণ দ্বীনের কোনো অকাট্য স্তম্ভকে অস্বীকার করা বা রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করা কুফরী ও চরম রাষ্ট্রদ্রোহিতার সমতুল্য।

(ب) كيف قاتل ابو بكر رضى الله عنه مع مانع الزكوة؟

যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে হযরত আবু বকর (রা.)-এর ঐতিহাসিক যুদ্ধ ও কৌশল: হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) চরম প্রজ্ঞা, ঈমানী দৃঢ়তা এবং অলৌকিক সাহসিকতার সাথে যাকাত অস্বীকারকারীদের মোকাবেলা করেছিলেন। যখন আরবের বহু গোত্র যাকাত দিতে অস্বীকার করে মদীনা অভিমুখে হুমকি সৃষ্টি করল, তখন আবু বকর (রা.) কোনো প্রকার ছাড় না দিয়ে ঘোষণা করলেন: “দ্বীনের বিধানের কি হ্রাস ঘটবে, অথচ আমি জীবিত?” তিনি খালিদ বিন ওয়ালীদ, ইকরিমা বিন আবু জাহল, শুরাহবিল বিন হাসানা, আমর ইবনুল আস (রা.)-সহ বিশিষ্ট ১১ জন বীর সেনাপতির নেতৃত্বে ১১টি আলাদা সেনাদল গঠন করে সমগ্র আরব উপদ্বীপে প্রেরণ করেন। তিনি স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, প্রথমে বিদ্রোহী গোত্রগুলোকে ইসলামের দিকে আহ্বান করা হবে, তারা আজান দিলে এবং যাকাত প্রদানে সম্মত হলে যুদ্ধ থেকে বিরত থাকবে; অন্যথায় দ্বীনের সুরক্ষা ও খেলাফতের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত যুদ্ধ পরিচালনা করা হবে। এই রক্তক্ষয়ী রিদ্দার যুদ্ধের মাধ্যমে সমগ্র আরবে পুনরায় ইসলামের পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠা লাভ করে এবং যাকাত ব্যবস্থা সুরক্ষিত হয়।

(ج) لم خالف عمر (رضـ) ابا بكر (رضـ)؟

হযরত আবু বকর (রা.)-এর সাথে হযরত ওমর (রা.)-এর মতপার্থক্যের কারণ: হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) প্রাথমিকভাবে আবু বকর (রা.)-এর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন বাহ্যিক নসের আক্ষরিক প্রয়োগ এবং মুসলিম উম্মাহর নিরাপত্তার স্বার্থে। ওমর (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদীস পেশ করেছিলেন যেখানে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি তাওহীদের সাক্ষ্য দিবে তার জান ও মাল সুরক্ষিত। ওমর (রা.) যুক্তি দিয়েছিলেন যে, যারা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পাঠ করছে এবং সালাত আদায় করছে, তাদের বিরুদ্ধে কীভাবে তরবারি উত্তোলন করা যায়? তাছাড়া তখন চতুর্দিকে রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের আগ্রাসনের ভয় এবং মদীনার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তবে আবু বকর (রা.) অত্যন্ত সূক্ষ্ম ইলমী জবাবে ওমর (রা.)-কে বুঝিয়ে দেন যে, হাদীসে সুস্পষ্টভাবে ‘ইল্লা বি-হাক্কিহি’ (ইসলামের অধিকারের শর্ত ছাড়া) বলা হয়েছে, আর যাকাত হলো ইসলামের অন্যতম মৌলিক আর্থিক অধিকার। সালাত যেমন শারীরিক ইবাদত, যাকাত তেমনি আর্থিক ইবাদত—উভয়ের মধ্যে পার্থক্য করার কোনো অবকাশ নেই। আবু বকর (রা.)-এর এই সুদৃঢ় প্রজ্ঞা প্রত্যক্ষ করে ওমর (রা.) সানন্দে তাঁর মত প্রত্যাহার করেন এবং আবু বকর (রা.)-এর সিদ্ধান্তের আনুগত্য করেন।

(د) اشرح قوله عليه السلام : “الا بحقه وحسابه على الله”.

“ইসলামের অধিকার ব্যতিরেকে এবং তার হিসাব আল্লাহর ওপর ন্যস্ত”-এর ব্যাখ্যা: এই বাক্যটি ইসলামী ফৌজদারি ও রাষ্ট্রীয় আইনের একটি সুমহান মূলনীতি ঘোষণা করে। ‘ইল্লা বি-হাক্কিহী’ অর্থ হলো—বাহ্যিকভাবে তাওহীদ স্বীকারকারী ব্যক্তির জান ও মাল পবিত্র ও অলঙ্ঘনীয় হলেও শরীয়তের সুনির্দিষ্ট কারণে সে নিরাপত্তা বাতিল হতে পারে। যেমন অন্য হাদীসে রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট করেছেন: ব্যভিচারকারী বিবাহিত ব্যক্তি, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যাকারী এবং দ্বীন ত্যাগ করে মুসলিম জামায়াত থেকে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি—এই তিন কারণে রক্ত হালাল হয়। অনুরূপভাবে যাকাত অস্বীকার করা বা শরীয়তের কোনো সুপ্রতিষ্ঠিত ফরযকে প্রকাশ্যে পদদলিত করাও ‘ইসলামের হকের’ পরিপন্থী, যার দরুন রাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে আইনানুগ শক্তি প্রয়োগ করতে বাধ্য। আর ‘হিসাবুহু আলাল্লাহ’ বাক্যের অর্থ হলো—রাষ্ট্র ও বিচারক মানুষের কেবল বাহ্যিক আমল ও ঘোষণার ওপর বিচার করবে। অন্তরের গোপন কপটতা, মুনাফিকি বা নিয়তের বিশুদ্ধতার হিসাব গ্রহণ করার দায়িত্ব মানুষের নয়; পরকালে মহান আল্লাহ স্বয়ং তার বিচার ও হিসাব সম্পন্ন করবেন।

(هـ) تحقيق الكلمات : توفى – أستخلف – يؤدون – أقاتل

শব্দাবলীর বিস্তারিত তাহক্বীক্ব:
১. تُوُفِّيَ (তুভুফফিয়া): বাবে তাফা’উল (التَّفَعُّل) থেকে মারুফ তাওয়াফফা (تَوَفَّى) ক্রিয়ার মাকহুল রূপ। মূলধাতু (و – ف – ي), সীগাহ ওয়াহিদ মুযাক্কার গায়েব, অর্থ—তিনি ওফাত লাভ করেছেন বা তাঁর প্রাণ সংহার করা হয়েছে।
২. اسْتُخْلِفَ (উসতুখলিফা): বাবে ইসতিফ’আল (الإِسْتِفْعَال) থেকে সীগাহ ওয়াহিদ মুযাক্কার গায়েব, বাহাস মাযী মাজহুল। মূলধাতু (خ – ل – ف), অর্থ—তাঁকে প্রতিনিধি বা খলীফা মনোনীত করা হলো।
৩. يُؤَدُّونَ (ইউয়াদ্দূনা): বাবে তাফঈল (التَّفْعِيل) থেকে সীগাহ জমা মুযাক্কার গায়েব, বাহাস মুযারে মারুফ। মূলধাতু (أ – د – ي), অর্থ—তারা নিয়মিত আদায় করত বা পরিশোধ করত।
৪. أُقَاتِلَ (উকাতিলা): বাবে মুফা’আলাহ (المُفَاعَلَة) থেকে সীগাহ ওয়াহিদ মুতাকাল্লিম, মুযারে মারুফ। নাসেবা ‘আন’ (أَنْ)-এর কারণে যবর হয়েছে। মূলধাতু (ق – ت – ل), অর্থ—আমি যেন লড়াই বা যুদ্ধ পরিচালনা করি।

٢- حدثنا ابراهيم بن موسى الرازى انا عيسى عن جرير عن عبد الرحمن بن ابى عوف عن ابى هند عن معاوية قال سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول : لا تنقطع الهجرة حتى تنقطع التوبة ولا تنقطع التوبة حتى تطلع الشمس من مغربها. حدثنا عثمان بن ابى شيبة نا جرير عن منصور عن مجاهد عن طاؤس عن ابن عباس رضى الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم يوم الفتح فتح مكة لا هجرة ولكن جهاد ونية واذا استنفرتم فانفروا.

[২. ইব্রাহিম ইবনে মুসা আর-রাযী … হযরত মুয়াবিয়া (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে ইরশাদ করতে শুনেছি— “হিজরত ততক্ষণ পর্যন্ত বন্ধ হবে না যতক্ষণ না তাওবা বন্ধ হয়, আর তাওবা ততক্ষণ পর্যন্ত বন্ধ হবে না যতক্ষণ না সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হয়।” ওসমান ইবনে আবু শায়বাহ … হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: মক্কা বিজয়ের দিন রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছিলেন— “মক্কা বিজয়ের পর (মক্কা থেকে মদীনায়) আর কোনো হিজরত অবশিষ্ট নেই; তবে রয়েছে জিহাদ ও নিয়ত। আর যখন তোমাদেরকে বের হওয়ার আহ্বান জানানো হবে, তখন তোমরা অবিলম্বে বের হয়ে পড়বে।”]

তাহক্বীক্বে কালিমাত (শব্দমূল ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ):

শব্দ অর্থ মূল ধাতু (Root/Madda) শব্দরূপ/ছীগাহ (Form/Sighah) ব্যাকরণিক অবস্থান (Grammatical Role)
تَنْقَطِعُ বিচ্ছিন্ন বা বন্ধ হবে ق – ط – ع (انفعال) واحد مؤنث غائب (مضارع) فعل مضارع مرفوع بـ لا النافية
تَطْلُعَ উদিত হবে ط – ل – ع (نصر) واحد مؤنث غائب (مضارع منصوب) فعل مضارع منصوب بأن المضمرة بعد حتى
التَّوْبَةُ প্রত্যাবর্তন / তাওবা ت – و – ب مصدر مفرد مؤنث فاعل للفعل تنقطع الثاني
اسْتُنْفِرْتُمْ তোমাদের অভিযানে ডাকা হয় ن – ف – ر (استفعال) جمع مذكر حاضر (ماض مجهول) فعل الشرط بعد “إذا”
فَانْفِرُوا তোমরা দ্রুত বের হও ن – ف – ر (ضرب) جمع مذكر حاضر (أمر حاضر معروف) جواب الشرط مقترن بالفاء

(أ) ما معنى الجهاد؟ هل الجهاد فرض لكل مسلم؟ فصل.

জিহাদের শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ এবং এর বিধান: ‘জিহাদ’ (الجِهَاد) শব্দটি ‘জুহদ’ (جُهْد) বা ‘জাহদ’ (جَهْد) ধাতু থেকে নিষ্পন্ন, যার আভিধানিক অর্থ চরম প্রচেষ্টা চালানো, পূর্ণ শক্তি নিয়োগ করা এবং কষ্ট সহ্য করা। ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, দ্বীন প্রতিষ্ঠা, সত্যের প্রসার এবং বাতিল ও অন্যায়ের মূলোৎপাটনে জান, মাল ও ইলম দিয়ে পূর্ণ সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোকে জিহাদ বলে। ইমামদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জিহাদ মূলত ‘ফরযে কিফায়া’ (فَرْضُ كِفَايَة)। অর্থাৎ রাষ্ট্রের পর্যাপ্ত সংখ্যক মুসলিম যদি সীমান্ত রক্ষা ও দ্বীনের সুরক্ষার দায়িত্ব পালন করে, তবে অন্যান্য মুসলমানদের পক্ষ থেকে তা আদায় হয়ে যায়। কিন্তু যদি কোনো মুসলিম জনপদ শত্রু দ্বারা সরাসরি আক্রান্ত হয় বা রাষ্ট্রপ্রধান আম-আহ্বান (نفير عام) ঘোষণা করেন, তখন তা আক্রান্ত এলাকার আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সকলের জন্য ‘ফরযে আইন’ (فَرْضُ عَيْن)-এ রূপান্তরিত হয়।

(ب) ما الفرق بين الجهاد والقتال والغزوة والسرية؟

জিহাদ, কিতাল, গাযওয়া ও সারিইয়্যাহ-এর মধ্যকার সূক্ষ্ম পার্থক্য:
১. জিহাদ (الجهاد): এটি একটি ব্যাপক প্রত্যয়। নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম (জিহাদুন নফস), শয়তানের প্ররোচনার বিরুদ্ধে জিহাদ, লেখনী ও বাণীর মাধ্যমে সত্য প্রচার এবং সশস্ত্র প্রতিরোধ—সবই জিহাদের অন্তর্ভুক্ত।
২. কিতাল (القتال): কিতাল হলো জিহাদের একটি নির্দিষ্ট রূপ, যা কেবল অস্ত্র হাতে শত্রুর মুখোমুখি সশস্ত্র রক্তক্ষয়ী যুদ্ধকে বোঝায়।
৩. গাযওয়া (الغزوة): রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং সশরীরে যে সকল সামরিক অভিযানে সেনাপতিত্ব করে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাকে ইসলামী ইতিহাসে ‘গাযওয়া’ বলা হয়। যেমন—বদর, উহুদ, খন্দক ইত্যাদি।
৪. সারিইয়্যাহ (السرية): রাসুলুল্লাহ (সা.) যে সকল অভিযানে কোনো সাহাবীকে সেনাপতি মনোনীত করে পাঠিয়েছিলেন কিন্তু নিজে সশরীরে অংশগ্রহণ করেননি, তাকে ‘সারিইয়্যাহ’ বলা হয়। যেমন—মুতার যুদ্ধ।

(ج) الاعمال الارهابية باسم الجهاد جائز ام لا؟ اوضح حق التوضيح.

জিহাদের নামে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের শরয়ী বিধান: ইসলামে জিহাদের নামে সন্ত্রাসবাদ, নৈরাজ্য, নিরীহ মানুষ হত্যা, আত্মঘাতী বোমা হামলা এবং জনজীবনে ত্রাস সৃষ্টি করা সম্পূর্ণ হারাম ও চরম কবিরা গুনাহ। জিহাদ কেবল একটি বৈধ ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানের সুশৃঙ্খল আদেশ ও নীতিমালার অধীনেই পরিচালিত হতে পারে। কোনো ব্যক্তি বা উগ্র গোষ্ঠী নিজেদের মনগড়া ব্যাখ্যা দিয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারে না। জিহাদে নারী, শিশু, বৃদ্ধ, উপাসনালয়ের পুরোহিত, কৃষক ও নিরস্ত্র অমুসলিম নাগরিকদের হত্যা করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। তাছাড়া বিশ্বাসঘাতকতা ও চুক্তিভঙ্গ করাকে রাসুলুল্লাহ (সা.) কবীরা গুনাহ ঘোষণা করেছেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: “যে ব্যক্তি কোনো নির্দোষ মানুষকে হত্যা করল, সে যেন গোটা মানবজাতিকে হত্যা করল।” অতএব, সন্ত্রাসবাদ কখনো জিহাদ হতে পারে না; বরং তা ইসলামের সুমহান আদর্শের সম্পূর্ণ পরিপন্থী চরমপন্থা।

(د) اوضح قوله عليه السلام : “لا هجرة بعد الفتح ولكن جهاد ونية”.

“মক্কা বিজয়ের পর আর হিজরত নেই, তবে জিহাদ ও নিয়ত অবশিষ্ট”-এর সমন্বিত ব্যাখ্যা: আপাতদৃষ্টিতে হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর হাদীস (হিজরত কিয়ামত পর্যন্ত জারি থাকবে) এবং ইবনে আব্বাস (রা.)-এর হাদীসের (মক্কা বিজয়ের পর হিজরত নেই) মধ্যে বৈপরীত্য প্রতীয়মান হলেও মুহাদ্দিসগণ এর চমৎকার সামঞ্জস্য বিধান করেছেন। মক্কা যখন কাফেরদের দ্বারা শাসিত দারুল হরব ছিল, তখন সেখান থেকে মদীনায় হিজরত করা প্রত্যেক সক্ষম মুসলমানের ওপর ব্যক্তিগতভাবে ফরয ছিল। ৮ম হিজরীতে মক্কা বিজয়ের পর মক্কা স্থায়ীভাবে দারুল ইসলামে পরিণত হয়, ফলে মক্কা থেকে মদীনায় স্থানান্তরের সেই বিশেষ হিজরতের বিধান বিলুপ্ত হয়—এটিই ইবনে আব্বাসের হাদীসের অর্থ। পক্ষান্তরে, পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে যেখানে দ্বীন পালন অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং কুফরির রাজত্ব বিদ্যমান থাকে, সেখান থেকে দারুল ইসলামে হিজরত করার সাধারণ বিধান কিয়ামত পর্যন্ত বলবৎ থাকবে—এটিই মুয়াবিয়া (রা.)-এর হাদীসের তাৎপর্য।

(هـ) تحقيق الكلمات : لا تنقطع – تطلع – التوبة – استنفرتم

বিশ্লেষণ:
১. لَا تَنْقَطِعُ: বাবে ইনফি’আল (الانْفِعَال) থেকে সীগাহ ওয়াহিদ মুয়ান্নাস গায়েব, মুযারে মানফী। মূলধাতু (ق – ط – ع), অর্থ—বিচ্ছিন্ন বা বন্ধ হবে না।
২. تَطْلُعَ: বাবে নাসারা-ইয়ানসুরু (ن – ص – ر) থেকে ওয়াহিদ মুয়ান্নাস গায়েব, মুযারে। হাত্তা-এর কারণে নসব হয়েছে। মূলধাতু (ط – ل – ع), অর্থ—উদিত হওয়া।
৩. التَّوْبَةُ: বাবে নাসারা থেকে মাসদার, মূলধাতু (ت – و – ب), অর্থ—অনুতপ্ত হয়ে মহান আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করা।
৪. اسْتُنْفِرْتُمْ: বাবে ইসতিফ’আল থেকে জমা মুযাক্কার হাযির, মাযী মাজহুল। মূলধাতু (ن – ف – ر), অর্থ—তোমাদেরকে যুদ্ধের ময়দানে যাওয়ার আহ্বান জানানো হবে।

٣- عن ابى حميد الساعدى ان النبى صلى الله عليه وسلم استعمل رجلا من الازد يقال له اللتبية قال ابن السرح ابن اللتبية على الصدقة فجاء فقال هذا لكم وهذا اهدى لى فقام النبى صلى الله عليه وسلم على المنبر فحمد الله واثنى عليه وقال ما بال العامل نبعثه فيجيئ فيقول هذا لكم وهذا اهدى لى الا جلس فى بيت امه او ابيه فينظر ايهدى له ام لا لا يأتى احد منكم بشيء من ذلك الا جاء به يوم القيامة ان كان بعيرا فله رغاء او بقر فلها خوار او شاة تيعر ثم رفع يديه حتى رأينا عفرة ابطيه ثم قال اللهم هل بلغت اللهم هل بلغت.

[৩. হযরত আবু হুমাইদ আস-সায়েদী (রা.) থেকে বর্ণিত: নবী করীম (সা.) আযদ গোত্রের এক ব্যক্তিকে সাদাকাহ (যাকাত) আদায়ের কর্মকর্তা নিযুক্ত করলেন, যাকে ‘লুতবিয়্যাহ’ বা ‘ইবনুল লুতবিয়্যাহ’ বলা হতো। সে কাজ শেষে ফিরে এসে বলল: এগুলো আপনাদের (সরকারি বায়তুলমালের) জন্য, আর এগুলো আমাকে ব্যক্তিগতভাবে উপহার দেওয়া হয়েছে। এ কথা শুনে নবী করীম (সা.) মিম্বারে দাঁড়িয়ে মহান আল্লাহর প্রশংসা ও গুণগান বর্ণনা করলেন। অতঃপর বললেন: “সেই কর্মচারীর কী হলো, যাকে আমি দায়িত্ব দিয়ে পাঠাই, অতঃপর সে ফিরে এসে বলে—এটি আপনাদের জন্য আর এটি আমাকে হাদিয়া দেওয়া হয়েছে! সে তার পিতা বা মাতার ঘরে কেন বসে থাকল না, তখন দেখত তাকে কেউ উপহার দেয় কি না? আল্লাহর কসম! তোমাদের মধ্য থেকে যে কেউ এ জাতীয় সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রহণ করবে, কিয়ামতের দিন সে তা নিজ কাঁধে বহন করে উপস্থিত হবে। যদি তা উট হয়, তবে তা চিৎকার করতে থাকবে; গরু হলে ডাকতে থাকবে, আর বকরী হলে ভ্যাঁ-ভ্যাঁ করতে থাকবে।” অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজ হস্তদ্বয় এত উচ্চে উত্তোলন করলেন যে, আমরা তাঁর বগলের শুভ্রতা দেখতে পেলাম। এরপর তিনি তিনবার বললেন: “হে আল্লাহ! আমি কি (আপনার পয়গাম) পৌঁছে দিয়েছি? হে আল্লাহ! আমি কি পৌঁছে দিয়েছি?”]

তাহক্বীক্বে কালিমাত (শব্দমূল ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ):

শব্দ অর্থ মূল ধাতু (Root/Madda) শব্দরূপ/ছীগাহ (Form/Sighah) ব্যাকরণিক অবস্থান (Grammatical Role)
اسْتَعْمَلَ তিনি কর্মচারী নিযুক্ত করলেন ع – م – ل (استفعال) واحد مذكر غائب (ماض معروف) فعل ماض مبني على الفتح
نَبْعَثُهُ আমরা তাকে প্রেরণ করি ب – ع – ث (فتح) متكلم مع الغير (مضارع مرفوع) صلة الموصول বা جملة نعتية
أُهْدِيَ উপহার দেওয়া হয়েছে ه – د – ي (إفعال) واحد مذكر غائب (ماض مجهول) فعل ماض مبني للمجهول
رُغَاءٌ উটের গর্জন / চিৎকার ر – غ – و اسم مفرد مذكر مرفوع مبتدأ مؤخر (خبره الجار والمجرور)
عُفْرَةَ শুভ্রতা বা ধবধবে আভা ع – ف – ر اسم مفرد منصوب مفعول به للفعل “رأينا”

(أ) ما معنى الهدية؟ هل يجوز للعامل ان يقبل الهدية؟ فصل بحيث ينكشف المرام.

হাদিয়ার অর্থ এবং সরকারি কর্মচারীদের হাদিয়া গ্রহণের হুকুম: ‘হাদিয়া’ (الهَدِيَّة) শব্দের আভিধানিক অর্থ উপঢৌকন বা উপহার। শরীয়তের পরিভাষায় কোনো প্রকার পার্থিব স্বার্থ, চাপ বা প্রতিদান ছাড়া কেবল ভালোবাসা ও আন্তরিকতার বশবর্তী হয়ে কাউকে কোনো বস্তু উপহার দেওয়াকে হাদিয়া বলে। ইসলামে সাধারণ অবস্থায় হাদিয়া আদান-প্রদান অত্যন্ত প্রশংসনীয় সুন্নত। কিন্তু কোনো সরকারি কর্মচারী, বিচারক বা দায়িত্বশীল ব্যক্তি যদি তার পদমর্যাদা ও দাপ্তরিক দায়িত্বের কারণে কোনো ব্যক্তি থেকে হাদিয়া গ্রহণ করে, তবে তা সম্পূর্ণ হারাম এবং আত্মসাতের (গুলুল) অন্তর্ভুক্ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) অন্য হাদীসে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ইরশাদ করেছেন: “কর্মচারীদের গ্রহণকৃত উপহার হলো আত্মসাৎ ও ঘুষের সমতুল্য (هدايا العمال غلول)।” কারণ পদের কারণে প্রাপ্ত উপহার নিরপেক্ষতা নষ্ট করে এবং স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির পথ উন্মুক্ত করে।

(ب) ما الفرق بين الهدية والرشوة؟ وما حكمهما؟ فصل المسئلة.

হাদিয়া ও রিশওয়াত (ঘুষ)-এর মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য ও বিধান:
১. উদ্দেশ্যগত পার্থক্য: হাদিয়া প্রদান করা হয় কেবল হৃদ্যতা, সম্মান ও আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে; এতে কোনো পার্থিব বিনিময়ের প্রত্যাশা থাকে না। পক্ষান্তরে, রিশওয়াত বা ঘুষ দেওয়া হয় কোনো অন্যায় স্বার্থ হাসিল, অধিকার হরণ বা দায়িত্বশীলকে দিয়ে অন্যায্য কাজ করিয়ে নেওয়ার অসৎ উদ্দেশ্যে।
২. শরয়ী বিধান: হাদিয়া দেওয়া-নেওয়া মুস্তাহাব ও সাওয়াবের কাজ। পক্ষান্তরে ঘুষ গ্রহণকারী ও প্রদানকারী উভয়ের ওপর রাসুলুল্লাহ (সা.) লানত করেছেন (“لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الرَّاشِي وَالْمُرْتَشِي”)।
৩. দায়িত্বশীলের ক্ষেত্রে হুকুম: সাধারণ নাগরিকের হাদিয়া বৈধ হলেও দাপ্তরিক দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তার জন্য যেকোনো উপঢৌকন ঘুষ হিসেবে গণ্য হবে, যদি তা তার পদের কারণে অর্জিত হয়।

(ج) اوضح قوله عليه السلام “الا جلس فى بيت امه او ابيه فينظر ايهدى له ام لا”.

নবীজীর বাণীর যৌক্তিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই বাক্যটি দুর্নীতির মূলোৎপাটনে একটি চিরন্তন যৌক্তিক মানদণ্ড স্থাপন করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রশ্ন তুলেছেন: এই কর্মকর্তা যদি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে নিয়োজিত না হয়ে সাধারণ নাগরিক হিসেবে পিতা-মাতার ঘরে অবস্থান করত, তবে কি সমাজ তাকে এই বহুমূল্য উপহার প্রদান করত? উত্তর হলো—কখনোই নয়। সুতরাং স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, এই উপহার তার ব্যক্তিগত যোগ্যতার জন্য নয়, বরং তার সরকারি পদ ও ক্ষমতার প্রভাবের কারণেই দেওয়া হয়েছে। পদাধিকার বলে অর্জিত যেকোনো সুবিধা জনগণের আমানত, তা ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে দাবি করা খেয়ানত। আধুনিক প্রশাসন বিজ্ঞানে ‘Conflict of Interest’ বা স্বার্থের সংঘাতের যে মূলনীতি আলোচনা করা হয়, চৌদ্দশত বছর পূর্বেই রাসুলুল্লাহ (সা.) এই অনন্য বাক্যের মাধ্যমে তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলেন।

(د) هذا الحديث مخالف لقوله عليه السلام “تهادوا تحابوا” فما هو التوفيق؟

“পরস্পর উপহার দাও, ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে” হাদীসের সাথে সমন্বয়: বাহ্যিকভাবে “তাহাদাও তাহাব্বু” (তোমরা পরস্পর হাদিয়া দাও, পারস্পরিক মুহাব্বত বৃদ্ধি পাবে) হাদীসের সাথে আলোচ্য হাদীসের কোনো বিরোধ নেই। মুহাদ্দিসগণ চমৎকার সমন্বয় করেছেন: হাদিয়া প্রদানের সাধারণ উৎসাহটি সাধারণ মুসলমানদের পারস্পরিক সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যেখানে কোনো ক্ষমতার প্রভাব বা সুবিধার লেনদেন থাকে না। কিন্তু বিচারক, রাষ্ট্রপ্রধান, রাজস্ব কর্মকর্তা, পুলিশ এবং সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে হাদিয়া মূলত দুর্নীতির ছদ্মবেশ ধারণ করে। ফিকহের সুপ্রসিদ্ধ কায়েদা হলো—”পাপের পথ রুদ্ধ করা ওয়াজিব (سد الذرائع واجب)”। প্রশাসনিক সুবিধার বিনিময়ে হাদিয়া গ্রহণকে বৈধতা দিলে সমাজে জুলুম ও ঘুষের বৈধতা প্রতিষ্ঠা পাবে। তাই কর্মচারীদের জন্য উপহার নিষিদ্ধ হওয়া সাধারণ হাদিয়ার বিধানের ব্যতিক্রম ও বিশেষ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।

(هـ) تحقيق الكلمات : استعمل – ينظر – بلغت – نبعث

শব্দ বিশ্লেষণ:
১. اسْتَعْمَلَ: বাবে ইসতিফ’আল থেকে মাযী মারুফ, ওয়াহিদ মুযাক্কার গায়েব। মূলধাতু (ع – م – ل), অর্থ—তিনি কর্মকর্তা নিযুক্ত করলেন।
২. يَنْظُرَ: বাবে নাসারা থেকে মুযারে মারুফ, ওয়াহিদ মুযাক্কার গায়েব। মূলধাতু (ن – ظ – ر), অর্থ—সে যেন প্রত্যক্ষ করে বা দেখে।
৩. بَلَّغْتُ: বাবে তাফঈল থেকে মাযী মারুফ, ওয়াহিদ মুতাকাল্লিম। মূলধাতু (ب – ل – غ), অর্থ—আমি সুসংবাদ বা দায়িত্ব পৌঁছে দিয়েছি।
৪. نَبْعَثُ: বাবে ফাতাহ থেকে মুযারে মারুফ, জামা মুতাকাল্লিম। মূলধাতু (ب – ع – ث), অর্থ—আমরা প্রেরণ করি বা নিয়োজিত করি।

٤- عن ابى الدرداء قال انى سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول من سلك طريقا يطلب فيه علما سلك الله به طريقا من طرق الجنة، وان الملائكة لتضع اجنحتها رضا لطالب العلم، وان العالم ليستغفر له من فى السماوات والارض والحيتان فى جوف الماء، وان فضل العالم على العابد كفضل القمر ليلة البدر على سائر الكواكب، وان العلماء ورثة الانبياء، وان الانبياء لم يورثوا دينارا ولا درهما ورثوا العلم فمن اخذه اخذ بحظ وافر.

[৪. হযরত আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি— “যে ব্যক্তি ইলম অন্বেষণের উদ্দেশ্যে কোনো পথে গমন করে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য জান্নাতের একটি পথ সুগম করে দেন। নিশ্চয়ই ফেরেশতাগণ জ্ঞানান্বেষীর সন্তুষ্টির নিমিত্তে নিজেদের ডানা বিছিয়ে দেন। আর নিশ্চয়ই আলেমের জন্য আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে তারা এবং এমনকি গভীর পানির মৎস্যকুলও ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে। আর আবেদ (সাধারণ উপাসক)-এর ওপর আলেমের শ্রেষ্ঠত্ব তদ্রূপ, যেমন পূর্ণিমার রাতে সমস্ত তারকারাজির ওপর চাঁদের শ্রেষ্ঠত্ব। নিশ্চয়ই আলেমগণ হলেন নবীগণের উত্তরাধিকারী। আর নবীগণ কোনো দিনার বা দিরহাম (টাকা-পয়সা) উত্তরাধিকার হিসেবে রেখে যাননি; বরং তাঁরা রেখে গেছেন কেবল ইলমের মিরাস। সুতরাং যে ব্যক্তি তা গ্রহণ করল, সে এক মহা সৌভাগ্যের অংশ লাভ করল।”]

তাহক্বীক্বে কালিমাত (শব্দমূল ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ):

শব্দ অর্থ মূল ধাতু (Root/Madda) শব্দরূপ/ছীগাহ (Form/Sighah) ব্যাকরণিক অবস্থান (Grammatical Role)
يَطْلُبُ সে অন্বেষণ করে ط – ل – ب (نصر) واحد مذكر غائب (مضارع) جملة في محل نصب حال أو نعت
يَسْتَغْفِرُ ক্ষমা প্রার্থনা করে غ – ف – ر (استفعال) واحد مذكر غائب (مضارع) خبر إن مرفوع
سَلَكَ সে পথ অতিক্রম করল س – ل – ك (نصر) واحد مذكر غائب (ماض) فعل الشرط بعد “مَنْ”
وَرَّثُوا তারা মিরাস রেখে গেছেন و – ر – ث (تفعيل) جمع مذكر غائب (ماض) فعل ماض مبني على الضم
وَافِرٍ প্রচুর / মহা প্রাচুর্যময় و – ف – ر اسم فاعل مفرد مذكر مجرور نعت বা صفة مجرورة بالكسرة

(أ) ما معنى العلم؟ وكم قسما له؟ بينوا موضحا.

ইলমের সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ: ‘ইলম’ (العِلْم) শব্দের আভিধানিক অর্থ জানা, অবগত হওয়া এবং কোনো বস্তুর হাকীকত ও বাস্তবতা স্পষ্ট প্রত্যক্ষ করা। শরীয়তের পরিভাষায় কুরআন, সুন্নাহ এবং তার অনুসারী জ্ঞান যা মানুষকে আল্লাহর পরিচয়, হালাল-হারামের বিধান এবং আখেরাতের মুক্তি শিক্ষা দেয়, তাকে ইলমে শরীয়ত বলে। ফকীহগণের দৃষ্টিতে ইলম দুই ভাগে বিভক্ত: ১. ইলমে ফরযে আইন (فرض عين): যে পরিমাণ জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম নর-নারীর ওপর ব্যক্তিগতভাবে ফরয। যেমন ঈমানের মৌলিক আকিদা, দৈনন্দিন তাহরাত, সালাত, সাওম, হালাল-হারামের বিধান। ২. ইলমে ফরযে কিফায়া (فرض كفاية): ইসলামী ফিকহ, উলুমুল হাদীস, তাফসীর এবং উম্মাহর পার্থিব প্রয়োজনে চিকিৎসা, গণিত, প্রকৌশল ইত্যাদি বিষয়ে গভীর দক্ষতা অর্জন করা।

(ب) ما الفرق بين العلم والمعرفة؟

ইলম ও মা’রিফাত-এর পার্থক্য: ইসলামী জ্ঞানতত্ত্ব ও বালাগাত শাস্ত্রে ইলম ও মা’রিফাতের মধ্যে গভীর পার্থক্য রয়েছে:
১. ইলম সাধারণত জটিল ও যৌগিক বিষয়াবলীর সার্বিক উপলব্ধিকে নির্দেশ করে, পক্ষান্তরে মা’রিফাত একক বিষয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণকে বোঝায়।
২. মা’রিফাত অর্জিত হয় পূর্ববর্তী অজ্ঞতার পর নতুন করে জানার মাধ্যমে, এজন্য আল্লাহ তাআলাকে ‘আলীম’ বলা যায় কিন্তু ‘আরিফ’ বলা যায় না; কারণ আল্লাহর জ্ঞানে কোনো অজ্ঞতার অবকাশ নেই।
৩. ইলম মূলত তাত্ত্বিক জ্ঞানকে বোঝায়, আর মা’রিফাত হলো অন্তরের গভীর উপলব্ধি ও আধ্যাত্মিক সত্যের প্রত্যক্ষ অনুভূতি।

(ج) اوضح وجه التشبيه فى قوله صلى الله عليه وسلم : وان فضل العالم على العابد كفضل القمر ليلة البدر على سائر الكواكب.

আলেমের সাথে পূর্ণিমার চাঁদের উপমার তাৎপর্য: রাসুলুল্লাহ (সা.) আবেদ (উপাসক)-এর ওপর আলেমের শ্রেষ্ঠত্ব বোঝাতে নক্ষত্ররাজির ওপর পূর্ণিমার চাঁদের উপমা দিয়েছেন। বালাগাতের দৃষ্টিতে এটি এক অনুপম তাশবীহ। নক্ষত্রের আলো অত্যন্ত সীমিত, যা কেবল নিজেকেই আলোকিত করে এবং অন্ধকারে অন্য কাউকে পথ দেখাতে পারে না; পক্ষান্তরে পূর্ণিমার চাঁদের স্নিগ্ধ আলো সমগ্র পৃথিবীকে আলোকিত করে এবং দিগভ্রান্ত পথিককে মঞ্জিলে মকসুদে পৌঁছাতে সাহায্য করে। অনুরূপে একজন আবেদের ইবাদতের উপকারিতা কেবল তার নিজের সত্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে; কিন্তু একজন আলেমের ইলম ও প্রজ্ঞার আলো দ্বারা পথভ্রষ্ট মানুষ হেদায়াত পায়, সমাজ থেকে অন্যায়ের অন্ধকার দূর হয় এবং উম্মাহ সঠিক পথের দিশা লাভ করে।

(د) اشرح قوله عليه السلام “من سلك طريقا يطلب فيه علما سلك الله به طريقا من طرق الجنة”.

জান্নাতের পথ সুগম হওয়ার ব্যাখ্যা: হাদীসের এই সুসংবাদটি ইহকাল ও পরকাল উভয় জগতের প্রতি প্রযোজ্য। ইহজগতে একজন তালেবে ইলমের জন্য আল্লাহ তাআলা নেক আমল, ইখলাস ও হেদায়াতের পথকে সহজ করে দেন, যা তাকে গুনাহমুক্ত জীবন পরিচালনায় সাহায্য করে। আর পরকালে মহান আল্লাহ তাকে কিয়ামতের ভয়াবহ ময়দানের বিভীষিকা থেকে মুক্ত রেখে সহজে পুলসিরাত পার করিয়ে সোজা জান্নাতে প্রবেশের তাওফিক দান করবেন। দ্বীনী ইলম অর্জনের ক্লান্তি, সফর ও অধ্যবসায়কে আল্লাহ তাআলা আল্লাহর পথের জিহাদের মর্যাদা দান করেন।

(هـ) تحقيق الكلمات : يطلب – يستغفر – سلك – ورثوا

শব্দ তাহক্বীক্ব:
১. يَطْلُبُ: বাবে নাসারা থেকে মুযারে মারুফ, ওয়াহিদ মুযাক্কার গায়েব। মূলধাতু (ط – ل – ب), অর্থ—সে সন্ধান করে।
২. يَسْتَغْفِرُ: বাবে ইসতিফ’আল থেকে মুযারে মারুফ, ওয়াহিদ মুযাক্কার গায়েব। মূলধাতু (غ – ف – ر), অর্থ—সে ক্ষমা প্রার্থনা করে।
৩. سَلَكَ: বাবে নাসারা থেকে মাযী মারুফ, ওয়াহিদ মুযাক্কার গায়েব। মূলধাতু (س – ل – ك), অর্থ—সে পথ চলল।
৪. وَرَّثُوا: বাবে তাফঈল থেকে মাযী মারুফ, জমা মুযাক্কার গায়েব। মূলধাতু (و – ر – ث), অর্থ—তারা উত্তরাধিকার রেখে গেছেন।

٥- عن ابن عمر رضى الله عنهما عن ابيه قال نزل تحريم الخمر يوم نزل وهى من خمسة اشياء من العنب والتمر والعسل والحنطة والشعير والخمر ما خامر العقل وثلاث وددت ان النبى صلى الله عليه وسلم لم يفارقنا حتى يعهد الينا فيهن عهدا ننتهى اليه الجد والكلالة وابواب من ابواب الربا.

[৫. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) তাঁর পিতা হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, ওমর (রা.) মিম্বারে দাঁড়িয়ে বলেন: “যেদিন মদের হারাম হওয়ার বিধান অবতীর্ণ হয়েছিল, সেদিন তা পাঁচটি বস্তু থেকে তৈরি করা হতো—আঙ্গুর, খেজুর, মধু, গম ও যব। আর ‘খামর’ (মদ) হলো এমন প্রতিটি বস্তু যা মানববুদ্ধিকে আচ্ছন্ন ও বিকৃত করে দেয়। আর তিনটি বিষয় এমন ছিল, যা সম্পর্কে আমি মনেপ্রাণে কামনা করেছিলাম যে রাসুলুল্লাহ (সা.) যদি আমাদের থেকে বিদায় নেওয়ার পূর্বে এমন স্পষ্ট ফয়সালা দিয়ে যেতেন যা আমাদের জন্য চূড়ান্ত সমাপ্তি হতো—দাদার মিরাস, কালালাহ্ (পিতামাতা ও সন্তানহীন ব্যক্তির মিরাস) এবং সুদের কিছু জটিল শাখা-প্রশাখা।”]

তাহক্বীক্বে কালিমাত (শব্দমূল ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ):

শব্দ অর্থ মূল ধাতু (Root/Madda) শব্দরূপ/ছীগাহ (Form/Sighah) ব্যাকরণিক অবস্থান (Grammatical Role)
خَامَرَ আচ্ছন্ন বা বিকৃত করে خ – م – ر (مفاعلة) واحد مذكر غائب (ماض) صلة الموصول বা خبر
وَدِدْتُ আমি একান্ত কামনা করেছিলাম و – د – د (سمع) واحد متكلم (ماض معروف) فعل ماض مبني على السكون
لَمْ يُفَارِقْنَا তিনি আমাদের ত্যাগ করেননি ف – ر – ق (مفاعلة) واحد مذكر غائب (مضارع مجزوم) مجزوم بـ لم وعلامته السكون
نَنْتَهِي আমরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাব ن – ه – ي (افتعال) متكلم مع الغير (مضارع مرفوع) جملة نعتية لكلمة “عهداً”
الْكَلَالَةُ পিতামাতা ও সন্তানহীন মৃত ব্যক্তি ك – ل – ل اسم مفرد مرفوع / منصوب بدل من “ثلاث” أو مفعول به

(أ) ما معنى الخمر؟ ولم سمى الخمر خمرا؟ وضح ذلك.

খামর-এর আভিধানিক অর্থ ও নামকরণের কারণ: আরবি ভাষায় ‘খামর’ (الخمر) শব্দের মূল ধাতু হলো ‘খা-মিম-রা’ (خ م ر), যার অর্থ ঢেকে ফেলা, আচ্ছন্ন করা বা আবৃত করা। মেয়েদের ওড়নাকে ‘খিমার’ বলা হয় কারণ তা মাথা ও বক্ষকে ঢেকে রাখে। মাদকদ্রব্য পান করলে তা মানুষের বিবেক-বুদ্ধি, চিন্তা ও হিতাহিত জ্ঞানকে আচ্ছন্ন ও স্থবির করে দেয় বলে একে ‘খামর’ নামকরণ করা হয়েছে। হযরত ওমর (রা.) নিজেই এই ভাষাগত ও শরয়ী হাকীকত স্পষ্ট করে বলেছেন: “وَالْخَمْرُ مَا خَامَرَ الْعَقْلَ” (যা কিছু মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে আবৃত ও বিকৃত করে ফেলে, তা-ই মদ)। সুতরাং তৈরির উপাদান যাই হোক—আঙ্গুর, খেজুর, ধান, মদ বা আধুনিক সিন্থেটিক রাসায়নিক ড্রাগ—নেশা সৃষ্টিকারী সব বস্তুই খামর হিসেবে হারাম।

(ب) ما الأطوار التى مر بها تحريم الخمر؟ اذكر الايات المتعلقة به.

মদ নিষিদ্ধকরণের ধারাবাহিক পর্যায়সমূহ: জাহেলী যুগে আরব সমাজে মদ ছিল তাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই আল্লাহ তাআলা মানুষের মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতি বিবেচনা করে চার পর্যায়ে মদ হারাম করেছেন:
১. প্রথম পর্যায়: সুরা আন-নাহলের ৬৭ নং আয়াত—”তোমরা খেজুর ও আঙ্গুর থেকে প্রস্তুত কর নেশাদ্রব্য এবং উত্তম খাদ্য।” এখানে উত্তম খাদ্যের বিপরীতে নেশাকে পৃথক করে তার প্রতি মৃদু অনীহা প্রকাশ করা হয়।
২. দ্বিতীয় পর্যায়: সুরা আল-বাকারার ২১৯ নং আয়াত—”লোকে আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলুন, উভয়ের মধ্যেই রয়েছে মহাপাপ এবং মানুষের জন্য কিছু উপকারিতাও; কিন্তু তাদের পাপ উপকারের চেয়ে অনেক বড়।”
৩. তৃতীয় পর্যায়: সুরা আন-নিসার ৪৩ নং আয়াত—”হে ঈমানদারগণ! তোমরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সালাতের নিকটবর্তী হয়ো না।” এর ফলে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় মদ বর্জন বাধ্যতামূলক হয়।
৪. চতুর্থ পর্যায় (চূড়ান্ত হারাম ঘোষণা): সুরা আল-মায়েদার ৯০-৯১ নং আয়াত—”নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য নির্ধারক তীরসমূহ শয়তানের অপবিত্র কাজ। সুতরাং তোমরা তা সম্পূর্ণরূপে বর্জন কর, যাতে সফলকাম হতে পার।” এই আয়াত নাযিলের পর মদ চিরতরে অকাট্য হারাম ঘোষিত হয়।

(ج) ما المراد بالكلالة؟ وما الاختلاف فى اشتقاقها؟

কালালাহ-এর মর্মার্থ ও ভাষাতাত্ত্বিক বিতর্ক: ইসলামী মিরাস বিজ্ঞানে ‘কালালাহ’ (الكَلَالَة) অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি পরিভাষা। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এবং জুমহুর ফকীহগণের মতে, কালালাহ বলা হয় এমন মৃত ব্যক্তিকে যার কোনো উর্ধ্বতন পুরুষ (পিতা, দাদা) এবং কোনো অধস্তন ওয়ারিশ (পুত্র, পৌত্র) জীবিত নেই; অর্থাৎ কেবল ভাই-বোন তার ওয়ারিশ হিসেবে বিদ্যমান। এর ব্যুৎপত্তি সম্পর্কে দুটি অভিমত রয়েছে: ১. ‘ইকলীল’ (মুকুট) থেকে উদ্ভূত, যা মাথার উপরিভাগ ও নিচকে স্পর্শ না করে চারপাশ ঘিরে থাকে; তেমনি কালালাহ ব্যক্তির ওয়ারিশরা সরাসরি পিতা ও পুত্রের বংশধারা না হয়ে পার্শ্ববর্তী আত্মীয় (ভাই-বোন) হয়। ২. ‘কাল্লা’ (ক্লান্ত ও দুর্বল হওয়া) থেকে উদ্ভূত, অর্থাৎ যার কোনো সরাসরি শক্তি বা শক্তিশালী বংশধর অবশিষ্ট নেই।

(د) اذكر متى وكيف دخل عمر رضى الله عنه فى الاسلام؟

হযরত ওমর (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণের অবিস্মরণীয় ঘটনা: হযরত ওমর (রা.) নবুওয়াতের ষষ্ঠ বর্ষে জিলহজ মাসে ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং দোয়া করেছিলেন: “হে আল্লাহ! আবু জাহল অথবা ওমর বিন খাত্তাবের মধ্যে যে তোমার নিকট অধিক প্রিয়, তাকে দিয়ে ইসলামকে শক্তিশালী কর।” একদিন ওমর তরবারি কোষমুক্ত করে নবীজীকে হত্যার উদ্দেশ্যে বের হন। পথে নুআইম বিন আব্দুল্লাহর সাথে সাক্ষাত হলে তিনি জানতে পারেন যে ওমরের বোন ফাতিমা ও ভগ্নিপতি সাঈদ বিন যায়দ ইসলাম গ্রহণ করেছেন। ক্রুদ্ধ হয়ে তিনি বোনের বাড়ি গিয়ে তাদের রক্তাক্ত করেন। কিন্তু তাদের অনড় ঈমান দেখে লজ্জিত হয়ে তিনি সুরা ত্বাহার লিখিত অংশ পাঠ করেন: “طه مَا أَنزَلْنَا عَلَيْكَ الْقُرْآنَ لِتَشْقَىٰ…”। কুরআনের ঐশী বাণীর সুর ও অলৌকিক মাধুর্য ওমরের অন্তরকে বিগলিত করে। তিনি তৎক্ষণাৎ দারুল আরকামে উপস্থিত হয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র হাতে হাত রেখে তাওহীদের কালেমা পাঠ করে ইসলাম গ্রহণ করেন।

(هـ) تحقيق الالفاظ الاتية : ننتهى – خامر – وددت – لم يفارق

তাহক্বীক্ব:
১. نَنْتَهِي: বাবে ইফতি’আল থেকে জমা মুতাকাল্লিম, মুযারে। মূলধাতু (ن – ه – ي), অর্থ—আমরা নিবৃত্ত হই বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হই।
২. خَامَرَ: বাবে মুফা’আলাহ থেকে মাযী মারুফ, ওয়াহিদ মুযাক্কার গায়েব। মূলধাতু (خ – م – ر), অর্থ—ঢেকে ফেলে বা আচ্ছন্ন করে।
৩. وَدِدْتُ: বাবে সামিআ-ইয়াসমাউ থেকে মাযী মারুফ, ওয়াহিদ মুতাকাল্লিম। মূলধাতু (و – د – د), অর্থ—আমি তীব্র আকাঙ্ক্ষা করেছিলাম।
৪. لَمْ يُفَارِقْ: বাবে মুফা’আলাহ থেকে মুযারে মাজযূম, ওয়াহিদ মুযাক্কার গায়েব। মূলধাতু (ف – ر – ق), অর্থ—তিনি আমাদের ছেড়ে বিদায় নেননি।

٦- عن ابن شهاب عن الاعرج عن ابى هريرة انه كان يقول شر الطعام طعام الوليمة يدعى لها الاغنياء ويترك المساكين ومن لم يأت الدعوة فقد عصى الله ورسوله.

[৬. ইবনে শিহাব … হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলতেন: “নিকৃষ্টতম খাদ্য হলো সেই ওলিমার খাদ্য, যাতে কেবল ধনীদের আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং দরিদ্র ও মিসকীনদের বর্জন করা হয়। আর যে ব্যক্তি আমন্ত্রণ পাওয়ার পরও তাতে সাড়া দিল না (দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করল), সে নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অবাধ্যতা করল।”]

তাহক্বীক্বে কালিমাত (শব্দমূল ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ):

শব্দ অর্থ মূল ধাতু (Root/Madda) শব্দরূপ/ছীগাহ (Form/Sighah) ব্যাকরণিক অবস্থান (Grammatical Role)
شَرُّ সবচেয়ে নিকৃষ্ট / মন্দ ش – ر – ر اسم تفضيل مفرد مرفوع مبتدأ مرفوع بالضمة الظاهرة
يُدْعَى আমন্ত্রণ জানানো হয় د – ع – و (نصر) واحد مذكر غائب (مضارع مجهول) جملة نعتية في محل جر
الْمَسَاكِينُ দরিদ্র ও নিঃস্ব ব্যক্তিরা س – ك – ن جمع تكسير (نائب فاعل) نائب فاعل للفعل “يُتْرَكُ”
عَصَى সে অবাধ্যতা করল ع – ص – ي (ضرب) واحد مذكر غائب (ماض معروف) فعل ماض مبني على الفتح المقدر
الْوَلِيمَةُ বিবাহোত্তর ভোজসভা و – ل – م اسم مفرد مؤنث مجرور مضاف إليه مجرور بالكسرة

(أ) من دعى الى وليمة او طعام فوجد فيه لعبا او غناء هل يجوز له ان يقعد فيه ويأكل؟ بين اقوال العلماء فى هذه المسئلة.

অশ্লীল গান-বাজনাযুক্ত অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের শরয়ী হুকুম: কোনো ব্যক্তি যদি দাওয়াতে গিয়ে দেখে সেখানে গান-বাজনা, মদ বা অশ্লীল কর্মকাণ্ড চলছে, তবে তার ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের বিস্তারিত ফতোয়া নিম্নরূপ:
১. সাধারণ ব্যক্তির ক্ষেত্রে: যদি সে সেখানে উপস্থিত হওয়ার পূর্বে অবগত না থাকে, তবে সে খাওয়ার সুযোগ থাকলে অবিলম্বে খেয়ে চলে আসবে এবং পাপ কাজে অংশ নেবে না। কিন্তু যদি তার উপস্থিতি অন্যায়ের অনুমোদন হিসেবে দেখা যায় বা সে গুনাহের মুখোমুখি হয়, তবে তার জন্য বসা হারাম এবং অবিলম্বে স্থান ত্যাগ করা ওয়াজিব।
২. মুহতাদাবান আলেম ও পথপ্রদর্শকের ক্ষেত্রে: কোনো প্রখ্যাত আলেম বা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের জন্য এমন আসরে বসে থাকা কোনো অবস্থাতেই জায়েয নেই। তিনি যদি অন্যায় বন্ধ করার সামর্থ্য রাখেন, তবে হাত বা মুখ দিয়ে তা বন্ধ করবেন; আর সামর্থ্য না থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে মজলিস ত্যাগ করে চলে আসবেন, যাতে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত না হয়।

(ب) اشرح قوله “من لم يأت الدعوة فقد عصى الله ورسوله”.

দাওয়াত প্রত্যাখ্যানের নিষেধাজ্ঞা ও তাৎপর্য: রাসুলুল্লাহ (সা.) মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধ সুদৃঢ় করার জন্য ওলিমার দাওয়াত গ্রহণ করাকে অন্যতম সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ বা ওয়াজিব সমতুল্য মর্যাদা দিয়েছেন। কোনো গ্রহণযোগ্য শরয়ী ওজর (যেমন অসুস্থতা, দীর্ঘ সফর, বা অনুষ্ঠানে হারাম কাজের উপস্থিতি) ব্যতীত কেবল অহংকারবশত বা কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করার নিয়তে দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশ অমান্য করার শামিল। ওলিমা হলো বৈধ বৈবাহিক সম্পর্কের সামাজিক ঘোষণা এবং আনন্দ ভাগাভাগির সুন্নাত। দাওয়াত গ্রহণের মাধ্যমে মুসলমানের পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা ও সামাজিক সংহতি দৃঢ় হয়।

(ج) ما اسم ابى هريرة؟ وما اسم ابيه؟

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) ও তাঁর পিতার পরিচয়: হযরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর ইসলাম-পূর্ব এবং পরবর্তী নাম সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও সর্বাধিক বিশুদ্ধ ও প্রসিদ্ধ মতানুসারে তাঁর নাম হলো আব্দুর রহমান ইবনে সাখর আদ-দাওসী (عبد الرحمن بن صخر الدوسي)। জাহেলী যুগে তাঁর নাম ছিল ‘আবদুশ শামস’ (সূর্যের দাস)। ইসলাম গ্রহণের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর নাম পরিবর্তন করে অত্যন্ত বরকতময় নাম রাখেন ‘আব্দুর রহমান’। তাঁর পিতার নাম ছিল সাখর আদ-দাওসী (صخر الدوسي)। তিনি ইয়েমেনের সুপ্রসিদ্ধ দাওস গোত্রের সন্তান ছিলেন।

(د) ما هو سبب تكنية بابى هريرة؟

‘আবু হুরায়রা’ উপনামের ঐতিহাসিক কারণ: ‘হুরায়রা’ (هُرَيْرَة) শব্দটি ‘হিররাতুন’ (বিড়াল)-এর তসগীর বা ক্ষুদ্রার্থক রূপ, যার অর্থ ‘ছোট বিড়ালছানা’। হযরত আব্দুর রহমান বাল্যকাল থেকেই জীবজন্তুর প্রতি অত্যন্ত দয়ালু ছিলেন। তিনি মাঠে বকরী চড়াতেন এবং একটি ছোট বিড়ালছানাকে পরম যত্নে নিজের জামার আস্তিনে বা কোলে নিয়ে লালন-পালন করতেন এবং রাতে গাছে সুরক্ষিত রাখতেন। তাঁর এই অদ্ভুত স্নেহশীল আচরণ প্রত্যক্ষ করে আরবের লোকেরা তাঁকে ‘আবু হুরায়রা’ (বিড়ালছানার পিতা বা বিড়ালপ্রেমী) উপনামে ডাকতে শুরু করে। পরবর্তীতে স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.) একদিন আদর করে তাঁকে “يا أبا هر” বা “يا أبا هريرة” বলে সম্বোধন করেন। রাসুলুল্লাহর মুখে উচ্চারিত এই উপনামটি তাঁর কাছে এত প্রিয় ছিল যে তিনি নিজের মূল নামের চেয়ে এই কুনিয়াত পরিচয় দিতেই গর্ববোধ করতেন।

(هـ) تحقيق الالفاظ الاتية : الاغنياء – المساكين – يدعى – فقد عصى

শব্দ বিশ্লেষণ:
১. الأَغْنِيَاءُ: غَنِيٌّ-এর জমা মুকাস্সার, মূলধাতু (غ – ن – ي), অর্থ—বিত্তশালী ও ধনী ব্যক্তিবর্গ।
২. الْمَسَاكِينُ: مِسْكِينٌ-এর বহুবচন, মূলধাতু (س – ك – ن), অর্থ—চরম নিঃস্ব ও দরিদ্র মানুষ।
৩. يُدْعَى: বাবে নাসারা থেকে মুযারে মাজহুল, ওয়াহিদ মুযাক্কার গায়েব। মূলধাতু (د – ع – و), অর্থ—আহ্বান বা আমন্ত্রণ জানানো হয়।
৪. فَقَدْ عَصَى: ‘ক্বাদ’ সহযোগে মাযী মারুফ, ওয়াহিদ মুযাক্কার গায়েব। মূলধাতু (ع – ص – ي), অর্থ—নিশ্চয়ই সে অমান্য করেছে।

٧- عن حذيفة بن اسيد الغفارى قال كنا قعودا نتحدث فى ظل غرفة لرسول الله صلى الله عليه وسلم فذكرنا الساعة فارتفعت اصواتنا فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم لن تكون او لن تقوم حتى يكون قبلها عشر ايات.

[৭. হযরত হুযায়ফা ইবনে উসাইদ আল-গিফারী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি কক্ষের ছায়ায় বসে আলোচনা করছিলাম। এমন সময় আমরা কিয়ামতের আলোচনা শুরু করলাম এবং আমাদের কণ্ঠস্বর কিছুটা উঁচু হলো। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের নিকট এসে বললেন: “ততক্ষণ পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে না, যতক্ষণ না তোমরা তার পূর্বে দশটি প্রধান নিদর্শন প্রত্যক্ষ করবে।”]

তাহক্বীক্বে কালিমাত (শব্দমূল ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ):

শব্দ অর্থ মূল ধাতু (Root/Madda) শব্দরূপ/ছীগাহ (Form/Sighah) ব্যাকরণিক অবস্থান (Grammatical Role)
نَتَحَدَّثُ আমরা পারস্পরিক আলাপ করছিলাম ح – د – ث (تفعل) متكلم مع الغير (مضارع) خبر كُنَّا বা حال
ذَكَرْنَا আমরা স্মরণ বা আলোচনা করলাম ذ – ك – ر (نصر) متكلم مع الغير (ماض) فعل ماض مبني على السكون
ارْتَفَعَتْ উঁচু হলো / বুলন্দ হলো ر – ف – ع (افتعال) واحد مؤنث غائب (ماض) فعل ماض والتاء للتأنيث
لَنْ تَقُومَ কখনোই কায়েম বা সংঘটিত হবে না ق – و – م (نصر) واحد مؤنث غائب (مضارع منصوب) منصوب بـ لن النافية الناسخة
عَشْرُ দশটি (সংখ্যাবাচক বিশেষ্য) ع – ش – ر اسم عدد مذكر مرفوع فاعل للفعل يكون বা اسم كان

(أ) بين العلامات العشر التى ستكون قبل قيام الساعة.

কিয়ামতের দশটি প্রধান মহা নিদর্শন (আলামাতুল কুবরা): বিশুদ্ধ হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী কিয়ামত কায়েম হওয়ার পূর্বে ধারাবাহিকভাবে যে দশটি মহাজাগতিক ও অলৌকিক নিদর্শন প্রকাশিত হবে, তা হলো:
১. ধোঁয়া (الدخان): এক অভূতপূর্ব ধোঁয়া যা পূর্ব থেকে পশ্চিম দিগন্তকে আচ্ছন্ন করে ফেলবে।
২. দাজ্জালের আবির্ভাব (الدجال): মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ফেতনাকারী কাফের দাজ্জালের বহিঃপ্রকাশ।
৩. দাউব্বাতুল আরদ (دابة الأرض): ভূগর্ভ থেকে এক অদ্ভুত জন্তুর আত্মপ্রকাশ, যা মানুষের ঈমান ও কুফরের মোহর চিহ্নিত করবে।
৪. পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয় (طلوع الشمس من مغربها): যার পর তাওবার দরজা চিরতরে রুদ্ধ হয়ে যাবে।
৫. হযরত ঈসা (আ.)-এর অবতরণ (نزول عيسى بن مريم): যিনি ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে এসে দাজ্জালকে বধ করবেন।
৬. ইয়াজুজ ও মা’জুজের আক্রমণ (خروج يأجوج ومأجوج)।
৭, ৮ ও ৯. তিনটি মহা ভূ-ধস বা ভূমি নিমজ্জন (ثلاثة خسوف): প্রাচ্যে একটি ভূমি নিমজ্জন, প্রতীচ্যে (পশ্চিমে) একটি এবং আরব উপদ্বীপে একটি।
১০. ইয়েমেনের সুদূর এডেন থেকে এক মহা অগ্নিকাণ্ড (نار تخرج من قعر عدن): যা মানুষকে তাড়িয়ে নিয়ে হাশরের ময়দানে একত্রিত করবে।

(ب) اذكر ما تعلم عن صفات الدجال – وهل هو خرج كما يدعى ذلك بعض الناس؟

দাজ্জালের দৈহিক ও আত্মিক বৈশিষ্ট্য এবং তার আবির্ভাবের সত্যতা: দাজ্জাল কোনো রূপক প্রতীক নয়; বরং সে রক্ত-মাংসে গড়া এক রক্তচক্ষু ইহুদী মানবব্যক্তি। রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন: সে একচোখা হবে, তার ডান চোখটি হবে ফোলা আঙ্গুরের মতো অন্ধ ও ত্রুটিযুক্ত, অথচ তোমাদের রব কানা নন। তার কপালে স্পষ্ট হরফে ‘কাফির’ (ك ف ر) লেখা থাকবে, যা কেবল মুমিনরাই পড়তে সক্ষম হবে। সে অলৌকিক ইন্দ্রজাল দ্বারা বৃষ্টি বর্ষণ এবং মাটি থেকে ফসল ফলানোর মিথ্যা দাবি করে নিজেকে খোদা দাবি করবে। কেউ কেউ দাবি করে আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতা বা বিজ্ঞানই দাজ্জাল—এ দাবি সম্পূর্ণ বাতিল ও হাদীসের নসের খেলাফ। দাজ্জাল অদ্যাবধি আবির্ভূত হয়নি; হযরত মাহদীর আত্মপ্রকাশ ও মুসলিম বাহিনীর বিজয়ের পর শেষ জমানায় নির্ধারিত সময়ে সে সশরীরে আবির্ভূত হবে এবং লুদ শহরের ফটকে হযরত ঈসা (আ.)-এর হাতে নিহত হবে।

(ج) من امن او عمل عند الغرغرة هل يفيده الايمان شيئا؟

মৃত্যুর অন্তিম মুহূর্তে ঈমান বা আমলের গ্রহণযোগ্যতা: মৃত্যুর মুখে যখন রুহ কণ্ঠনালীতে এসে পৌঁছে (হালতে গারগারা), তখন মানুষের পার্থিব পরীক্ষা শেষ হয়ে যায় এবং গায়েবী জগত ও আজাবের ফেরেশতা চোখের সামনে উন্মোচিত হয়। শরীয়তের অকাট্য নীতি অনুযায়ী অন্তিম শ্বাস-প্রশ্বাসের সময় কোনো কাফেরের ঈমান আনয়ন কিংবা কোনো ফাসিকের তওবা কোনো উপকারে আসে না। পবিত্র কুরআনে ফিরাউনের ঘটনা উল্লেখ করে ইরশাদ হয়েছে: “এখন বিশ্বাস করছ? অথচ তুমি পূর্বে অবাধ্যতা করেছিলে!” রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: “আল্লাহ তাআলা বান্দার তওবা ততক্ষণ পর্যন্ত কবুল করেন, যতক্ষণ না সে গারগারা (মৃত্যুর চরম গোঙানি)-এর শিকার হয়।” সুতরাং সুস্থ ও সচেতন অবস্থায় তওবা ও ঈমান খাঁটি করা অপরিহার্য।

(د) اذكر علامات الساعة التى بينها رسول الله صلى الله عليه وسلم فى حديث جبرئيل.

হাদীসে জিবরীলে বর্ণিত কিয়ামতের নিদর্শন: প্রখ্যাত হাদীসে জিবরীলে হযরত জিবরীল (আ.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে কিয়ামতের সময়কাল জিজ্ঞাসা করলে তিনি উত্তর দেন: “যাকে প্রশ্ন করা হচ্ছে সে প্রশ্নকারীর চেয়ে অধিক অবগত নয়।” তবে তিনি কিয়ামতের দুটি স্পষ্ট আলামত প্রকাশ করেন:
১. “দাসী তার নিজের মনিবকে প্রসব করবে (أَنْ تَلِدَ الْأَمَةُ رَبَّتَهَا)”—এর অর্থ সমাজে সন্তানের মাঝে পিতা-মাতার চরম অবাধ্যতা জন্ম নেবে, পিতা-মাতার সাথে দাস-দাসীর মতো দুর্ব্যবহার করা হবে।
২. “তুমি দেখতে পাবে নগ্নপদ, বস্ত্রহীন, দরিদ্র মেষপালকেরা সুউচ্চ অট্টালিকা নির্মাণে পরস্পরের সাথে প্রতিযোগিতা করছে (وَأَنْ تَرَى الْحُفَاةَ الْعُرَاةَ الْعَالَةَ رِعَاءَ الشَّاءِ يَتَطَاوَلُونَ فِي الْبُنْيَانِ)”—যা শেষ জমানায় সামাজিক মূল্যবোধের বিপর্যয় এবং অযোগ্য বেদুইনদের সম্পদ ও শক্তির দম্ভের বহিঃপ্রকাশ।

(هـ) تحقيق الالفاظ الاتية : نتحدث – ذكرنا – ارتفعت – لن تقوم

বিশ্লেষণ:
১. نَتَحَدَّثُ: বাবে তাফা’উল থেকে জমা মুতাকাল্লিম, মুযারে মারুফ। মূলধাতু (ح – د – ث), অর্থ—আমরা কথোপকথন করছিলাম।
২. ذَكَرْنَا: বাবে নাসারা থেকে জমা মুতাকাল্লিম, মাযী মারুফ। মূলধাতু (ذ – ك – ر), অর্থ—আমরা আলোচনা করলাম।
৩. ارْتَفَعَتْ: বাবে ইফতি’আল থেকে ওয়াহিদ মুয়ান্নাস গায়েব, মাযী মারুফ। মূলধাতু (ر – ف – ع), অর্থ—উঁচু হলো।
৪. لَنْ تَقُومَ: বাবে নাসারা থেকে মুযারে মানফী, সীগাহ ওয়াহিদ মুয়ান্নাস গায়েব। মূলধাতু (ق – و – م), অর্থ—কখনোই সংঘটিত হবে না।

٨- عن ابى هريرة (رضـ) ان رسول الله صلى الله عليه وسلم قال من دعا الى هدى كان له من الاجر مثل اجور من تبعه لا ينقص ذلك من اجورهم شيئا ومن دعا الى ضلالة كان عليه من الاثم مثل اثام من تبعه لا ينقص ذلك من اثامهم شيئا.

[৮. হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নিশ্চয়ই রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: “যে ব্যক্তি মানুষকে হেদায়াত বা সৎকাজের দিকে আহ্বান জানাবে, তার জন্য সেই পরিমাণ প্রতিদান (সাওয়াব) লিপিবদ্ধ হবে, যে পরিমাণ প্রতিদান লাভ করবে তার অনুসারীগণ; কিন্তু এতে তাদের কারো প্রতিদান থেকে বিন্দুমাত্র হ্রাস করা হবে না। আর যে ব্যক্তি ভ্রষ্টতা ও পাপের দিকে মানুষকে ডাকবে, তার ওপর সেই পরিমাণ পাপের বোঝা বর্তাবে, যে পরিমাণ পাপে লিপ্ত হবে তার অনুসারীরা; এতে তাদের পাপের বোঝাও সামান্যতম কমানো হবে না।”]

তাহক্বীক্বে কালিমাত (শব্দমূল ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ):

শব্দ অর্থ মূল ধাতু (Root/Madda) শব্দরূপ/ছীগাহ (Form/Sighah) ব্যাকরণিক অবস্থান (Grammatical Role)
دَعَا সে আহ্বান করল / ডাকল د – ع – و (نصر) واحد مذكر غائب (ماض) فعل الشرط مبني على الفتح المقدر
هُدًى হেদায়াত / সঠিক পথ ه – د – ي اسم مقصور مجرور بـ إلى مجرور بحرف الجر بكسرة مقدرة
لَا يَنْقُصُ হ্রাস করে না / কমায় না ن – ق – ص (نصر) واحد مذكر غائب (مضارع) فعل مضارع مرفوع لتجرده عن الناصب والجازم
ضَلَالَةٍ পথভ্রষ্টতা / গোমরাহী ض – ل – ل مصدر مفرد مجرور اسم مجرور بالكسرة الظاهرة
تَبِعَهُ তার অনুসরণ করল ت – ب – ع (سمع) واحد مذكر غائب (ماض) صلة الموصول বা نعت

(أ) ما معنى السنة والبدعة لغة واصطلاحا؟

সুন্নত ও বিদআতের আভিধানিক ও পারিভাষিক স্বরূপ:
১. সুন্নত (السنة): আভিধানিক অর্থ রীতি, পথ, স্বভাব বা অনুসৃত আদর্শ, তা ভালো হোক বা মন্দ। শরীয়তের পরিভাষায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র বাণী, কর্ম, সম্মতি (তাকবীর) এবং সাহাবায়ে কেরামের অনুসৃত দ্বীনী জীবনাদর্শকে সুন্নত বলে।
২. বিদআত (البدعة): আভিধানিক অর্থ পূর্ববর্তী কোনো নমুনা ছাড়া নতুন কিছু উদ্ভাবন করা। শরীয়তের পরিভাষায় সাওয়াব বা দ্বীনের নৈকট্য অর্জনের উদ্দেশ্যে এমন কোনো নতুন বিশ্বাস, আচার বা আমল উদ্ভাবন করা, যার কোনো ভিত্তি কুরআন, সুন্নাহ এবং সালাফে সালেহীনের যুগে বিদ্যমান ছিল না। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: “দ্বীনের মধ্যে নবউদ্ভাবিত প্রতিটি বিষয়ই ভ্রষ্টতা।”

(ب) ما معنى الهداية؟ وما الاختلاف فى معنى الهداية؟ بين.

হেদায়াতের পরিচয় ও মতভেদ: ‘হেদায়াত’ (الهداية) শব্দের অর্থ কল্যাণ ও মুক্তির সঠিক পথ প্রদর্শন করা এবং গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া। আকিদা ও তাফসীর শাস্ত্রে হেদায়াতের স্তর নিয়ে আলোচনা রয়েছে: প্রথমত, ‘হিদায়াতুত তালাল্লাহ ওয়াল ইরশাদ’ (পথনির্দেশ ও স্পষ্ট করা)—এটি নবী-রাসুল এবং দাঈদের কাজ। দ্বিতীয়ত, ‘হিদায়াতুত তাওফিক ওয়াল ঈসাল’ (অন্তরকে সত্যে দৃঢ় করা এবং গন্তব্যে পৌঁছানো)—এটি এককভাবে আল্লাহ তাআলার এখতিয়ার। মুতাজিলাদের মতে বান্দা নিজেই নিজের হেদায়াত তৈরি করে; কিন্তু আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের বিশুদ্ধ আকিদা হলো হেদায়াত একান্তই আল্লাহর অনুগ্রহ, বান্দা নিষ্ঠার সাথে অন্বেষণ করলে আল্লাহ তাকে তাওফিক দান করেন।

(ج) ما معنى البدعة؟ وكم قسما لها؟ بين كل قسم مع الحكم.

বিদআতের শ্রেণীবিভাগ ও বিধান: ওলামায়ে কেরাম বিদআতকে মূলত দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত করেছেন:
১. বিদআতে সাইয়িআ বা দালালাহ (بدعة سيئة / ضلالة): যা শরীয়তের কোনো সুপ্রতিষ্ঠিত নস বা সুন্নাহর পরিপন্থী হয়ে দ্বীনের ভেতর নতুন সংযোগ ঘটায়। এটি সম্পূর্ণ হারাম ও পথভ্রষ্টতা; প্রতিটি দ্বীনী বিদআতই এই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত।
২. বিদআতে হাসানা বা লুগাবিয়্যাহ (بدعة حسنة): আভিধানিক অর্থে নতুন ব্যবস্থা, যা শরীয়তের মূল উদ্দেশ্যের অনুকূলে উম্মাহর কল্যাণে সূচিত হয়েছে। যেমন হযরত ওমর (রা.) কর্তৃক জামায়াতে তারাবীর একত্রীকরণ দেখে “নি’মাতিল বিদআতু হাযিহী” বলা, মাদরাসা প্রতিষ্ঠা, কুরআনে নুকতা ও হরকত দেওয়া ইত্যাদি। তবে ইবাদতের সরাসরি পদ্ধতিতে কোনো পরিবর্তন সাধন কখনোই বিদআতে হাসানা হতে পারে না।

(د) ما الفرق بين السنة الشرعية والعادية؟ بين موضحا.

সুন্নতে শরঈয়্যাহ ও सुন্নতে আদিয়্যাহর পার্থক্য:
১. সুন্নতে শরঈয়্যাহ (سنن العبادة والتشريع): রাসুলুল্লাহ (সা.) উম্মাহর জন্য দ্বীনী বিধান হিসেবে যে সকল ইবাদত, বিধি-নিষেধ ও শিষ্টাচার জারি করেছেন। যেমন সালাত, সাওম, দান-সদকাহ এবং আখলাক। এগুলো পালন করা সওয়াবের কাজ এবং ইচ্ছাকৃত বর্জন করা গুনাহ বা তিরস্কারযোগ্য।
২. সুন্নতে আদিয়্যাহ (سنن العادة والجبلة): নবী করীম (সা.) তৎকালীন আরব সংস্কৃতির মানুষ হিসেবে স্বাভাবিকভাবে যে সকল পোশাক পরিধান করতেন, বিশেষ খাবার পছন্দ করতেন (যেমন লাউ, সিরকা), যেভাবে বসতেন বা পথ চলতেন। এগুলো দ্বীনের বাধ্যতামূলক বিধান নয়; তবে কোনো উম্মত যদি রাসুলুল্লাহর প্রতি গভীর ভালোবাসায় এগুলোও অনুকরণ করে, তবে সে মহব্বতের সাওয়াব লাভ করবে।

(هـ) تحقيق الالفاظ الاتية : دعا – رسول – لا ينقص – تبع

তাহক্বীক্ব:
১. دَعَا: বাবে নাসারা থেকে মাযী মারুফ, ওয়াহিদ মুযাক্কার গায়েব। মূলধাতু (د – ع – و), অর্থ—সে আহ্বান করল।
২. رَسُولٌ: ফাউল (فَعُول) ওযনে সিফাতুল মুশাব্বাহা বা ইসমে ফায়েল, মূলধাতু (ر – س – ل), অর্থ—প্রেরিত বার্তাবাহক।
৩. لَا يَنْقُصُ: বাবে নাসারা থেকে মুযারে মানফী, ওয়াহিদ মুযাক্কার গায়েব। মূলধাতু (ن – ق – ص), অর্থ—হ্রাস করে না।
৪. تَبِعَ: বাবে সামিআ থেকে মাযী মারুফ, ওয়াহিদ মুযাক্কার গায়েব। মূলধাতু (ت – ب – ع), অর্থ—সে আনুগত্য করল।

مجموعة (ب) – খ বিভাগ : জীবনী ও গ্রন্থ পর্যালোচনা (মান: ২০ × ১ = ২০)

٩- اكتب ماذا تعلم عن حياة الامام ابى داود السجستانى ورحلاته العلمية مع ذكر مشائخه وتلامذته ومكانة مؤلفه من بين كتب الصحاح الست.

[৯. ইমাম আবু দাউদ আস-সিজিস্তানী (রহ.)-এর জীবনচরিত, ইলমী সফর, উস্তাদ ও ছাত্রবৃন্দ এবং সিহাহ সিত্তাহর মধ্যে তাঁর সুনান গ্রন্থের মর্যাদার বিশদ বিবরণ:]

১. শুভ জন্ম ও বংশপরিচয়: হাদীস শাস্ত্রের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র ইমাম আবু দাউদ (রহ.) ২০২ হিজরীতে খোরাসান ও সিজিস্তানের মধ্যবর্তী ‘সিজিস্তান’ (বা সিজিস্তান অঞ্চল) নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্ণ নাম হলো সুলায়মান ইবনুল আশআস ইবনে ইসহাক ইবনে বাশীর আল-আযদি আস-সিজিস্তানী (سليمان بن الأشعث بن إسحاق الأزدي السجستاني)। কুনিয়াত ‘আবু দাউদ’। তিনি আরব বংশোদ্ভূত বনু আযদ গোত্রের সাথে সম্পর্কিত ছিলেন।

২. ইলমী সফর ও জ্ঞান সাধনা: ইমাম আবু দাউদ (রহ.) শৈশবেই কুরআনে কারীম হিফজ সম্পন্ন করার পর হাদীস সংগ্রহের জন্য তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের প্রধান ইলমী কেন্দ্রগুলোতে দীর্ঘ সফর করেন। তিনি হিজায (মক্কা-মদীনা), বসরা, কুফা, বাগদাদ, দামেশক, মিশর, খোরাসান ও রায় পরিভ্রমণ করেন। তিনি প্রতিটি অঞ্চলের শীর্ষ মুহাদ্দিসদের সান্নিধ্যে থেকে লক্ষ লক্ষ হাদীস সনদের চুলচেরা বিচারসহ সংগ্রহ করেন এবং স্মৃতিতে ধারণ করেন।

৩. প্রখ্যাত উস্তাদ ও শিক্ষকমণ্ডলী: ইমাম আবু দাউদ (রহ.) সমকালীন শ্রেষ্ঠ ইমামদের থেকে হাদীস শ্রবণ করেছেন। তাঁর শীর্ষ শিক্ষকদের মধ্যে অন্যতম হলেন—ইমামুল মুসলিমীন আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.), যার প্রজ্ঞা ও ফিকহ দ্বারা তিনি বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। এছাড়া কুতায়বাহ ইবনে সাঈদ, ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন, আলী ইবনুল মাদীনী, আবু বকর ইবনে আবু শায়বাহ, এবং মুসা ইবনে ইসমাঈল আত-তাবুযাকী প্রমূখ জগদ্বিখ্যাত রিজাল শাস্ত্রবিদ তাঁর উস্তাদ ছিলেন।

৪. বিশিষ্ট ছাত্রবৃন্দ: ইমাম আবু দাউদ (রহ.)-এর ইলমী সাগর থেকে বহু শীর্ষ মুহাদ্দিস ফয়েজ হাসিল করেছেন। তাঁদের মধ্যে প্রখ্যাত হলেন—ইমাম আবু ঈসা আত-তিরমিযী এবং ইমাম নাসায়ী (যাঁরা তাঁর কাছ থেকেও হাদীস গ্রহণ করেছেন), তাঁর আপন পুত্র আবু বকর ইবনে আবি দাউদ, আবু বাশার আদ-দূলাবী, আবু আলী আল-লু’লুয়ী (যাঁর সূত্রে সুনান গ্রন্থ সর্বাধিক সংরক্ষিত হয়েছে), ইবনু দাসাহ এবং আবু সাঈদ ইবনুল আরাবী।

৫. সিহাহ সিত্তাহর মাঝে সুনানু আবি দাউদের মর্যাদা: সিহাহ সিত্তাহর অন্তর্ভুক্ত আহকামুল হাদীস বা ফিকহী হাদীসের সংকলন হিসেবে ‘সুনানু আবি দাউদ’-এর মর্যাদা অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ইমাম আবু দাউদ প্রায় পাঁচ লক্ষ হাদীস থেকে যাচাই-বাছাই করে মাত্র চার হাজার আটশত (৪৮০০) বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য হাদীস নির্বাচন করে এই কিতাব রচনা করেছেন। ফিকহের ইমামগণ মন্তব্য করেছেন—”কোনো মুজতাহিদের নিকট যদি কুরআনে কারীম এবং সুনানু আবি দাউদ থাকে, তবে ফিকহী ইজতিহাদ ও ফতোয়া প্রদানের জন্য তা-ই যথেষ্ট।” ইমাম গাজ্জালী (রহ.) বলেন, আহকামের হাদীস জানার জন্য সুনানু আবি দাউদই মৌলিক নির্ভরস্থল।

৬. ইন্তেকাল: সারাজীবন ইলমে হাদীসের খেদমতে নিয়োজিত রেখে এই মহান ইমাম ২৭৫ হিজরীর ১৬ই শাওয়াল বসরা নগরীতে ৭৩ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন এবং বসরাতেই তাঁকে দাফন করা হয়।

١٠- اذكر خصائص سنن ابى داود من بين السنن وميزاته وعدد مروياته ورواته ومنهجه فى تأليف كتابه.

[১০. অন্যান্য সুনান গ্রন্থের মধ্যে সুনানু আবি দাউদের অনন্য বৈশিষ্ট্য, হাদীস ও রাবী সংখ্যা এবং ইমাম আবু দাউদ (রহ.)-এর সংকলন পদ্ধতির পর্যালোচনা:]

১. গ্রন্থের নামকরণ ও মূল লক্ষ্য: ইমাম আবু দাউদ (রহ.)-এর বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থটির নাম ‘আস-সুনান’ (السنن)। সুনান বলা হয় এমন সংকলনকে, যা বিশুদ্ধ ফিকহী অধ্যায় (যেমন তাহরাত, সালাত, যাকাত, নিকাহ, তলাক্ব, জিহাদ, বুয়ূ ইত্যাদি) অনুসারে বিন্যস্ত থাকে। তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম ফকীহ ও মুজতাহিদগণের জন্য প্রাত্যহিক জীবনের হালাল-হারাম ও আমলের দলীল হিসেবে সহীহ ও গ্রহণযোগ্য হাদীসগুলোকে এক মলাটে সহজলভ্য করে তোলা।

২. সংকলন পদ্ধতি ও মানহাজ (منهج المؤلف): ইমাম আবু দাউদ (রহ.) মক্কার অধিবাসীদের নিকট প্রেরিত তাঁর বিখ্যাত চিঠিতে (رسالة أبي داود إلى أهل مكة) নিজের সংকলন পদ্ধতি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন:
– তিনি কেবল সহীহ হাদীসই উল্লেখ করেননি; বরং যা সহীহ-এর নিকটবর্তী (شبيه به) এবং যা সহীহ লি-গায়রিহী বা হাসান, তাও সংকলন করেছেন।
– কোনো হাদীসে যদি কোনো সনদের মারাত্মক দুর্বলতা বা ত্রুটি (ওয়াহাম) থাকে, তবে তিনি তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে দিয়েছেন। আর যে হাদীস সম্পর্কে তিনি কোনো মন্তব্য না করে নীরব থেকেছেন, তা তাঁর দৃষ্টিতে আমলযোগ্য ও সালেহ (صالحة للاحتجاج)।
– তিনি সাধারণ ফাযায়েল বা কাহিনীর হাদীস বর্জন করে মূলত ‘আহকাম’ সংক্রান্ত হাদীসগুলোকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
– এক অধ্যায়ে একাধিক হাদীস না এনে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ও সবচেয়ে বলিষ্ঠ মতনটি নির্বাচন করেছেন।

৩. হাদীস ও রাবীর সংখ্যা: ইমাম আবু দাউদ (রহ.) স্বয়ং বর্ণনা করেছেন যে, তিনি তাঁর সংগৃহীত পাঁচ লক্ষ হাদীস থেকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে মোট চার হাজার আটশত (৪৮০০) হাদীস এ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন। মুরসাল হাদীস ও বিভিন্ন রেওয়ায়েত যুক্ত করলে এর মোট সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৫,২৭৪টি।

৪. সুনানু আবি দাউদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যসমূহ:
– ফিকহী ধারাক্রমের পূর্ণাঙ্গতা: এটি ইসলামী ফিকহের সকল অধ্যায়কে নিখুঁতভাবে ধারণ করে।
– ইলাল ও সনদের সূক্ষ্ম সমালোচনা: ইমাম আবু দাউদ হাদীসের সাথে সাথে সনদের ইলাল (লুক্কায়িত ত্রুটি) উন্মোচন করেছেন।
– সাহাবা ও তাবেয়ীদের আসারের সমন্বয়: আহকামের প্রেক্ষাপট স্পষ্ট করার জন্য তিনি নির্ভরযোগ্য আসারও সংকলন করেছেন।
– মুজতাহিদগণের নির্ভরতা: ফিকহে হানাফী, শাফেয়ী, মালেকী ও হাম্বলী—সকল মাযহাবের ইমাম ও পণ্ডিতগণ যুগ যুগ ধরে ফিকহী সিদ্ধান্তের দলীল হিসেবে সুনানু আবি দাউদের ওপর পূর্ণ আস্থা জ্ঞাপন করেছেন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন ১: সুনানু আবি দাউদ প্রথম পত্রের বিষয় কোড কত এবং এর পূর্ণমান কত?

উত্তর: সুনানু আবি দাউদ প্রথম পত্রের বিষয় কোড হলো ৬১১১০১। এর লিখিত পরীক্ষার পূর্ণমান ১০০ এবং পরীক্ষার নির্ধারিত সময় ৪ ঘণ্টা।

প্রশ্ন ২: কামিল ১ম বর্ষ হাদীস বিভাগের প্রশ্নপত্রের মানবণ্টন পদ্ধতি কীরূপ?

উত্তর: প্রশ্নপত্র দুটি বিভাগে বিভক্ত থাকে—(ক) বিভাগ হাদীস অংশ থেকে ৮টি প্রশ্ন থাকে যার মধ্য থেকে ৪টির উত্তর দিতে হয় (৪ × ২০ = ৮০) এবং (খ) বিভাগ জীবনী ও গ্রন্থ পর্যালোচনা থেকে ২টি প্রশ্ন থাকে যার মধ্য থেকে ১টির উত্তর দিতে হয় (১ × ২০ = ২০)।

প্রশ্ন ৩: সুনানু আবি দাউদ কিতাবে মোট কতটি হাদীস সংকলিত রয়েছে?

উত্তর: ইমাম আবু দাউদ (রহ.) তাঁর পাঁচ লক্ষ হাদীসের সংকলন থেকে বাছাই করে সুনান গ্রন্থে মূল ৪৮০০টি হাদীস সংকলন করেছেন, যা বিভিন্ন বর্ণনা সূত্রে প্রায় ৫,২৭৪টিতে উন্নীত হয়।

প্রশ্ন ৪: ইমাম আবু দাউদ কোনো হাদীস উল্লেখ করার পর নীরব থাকলে তার হুকুম কী?

উত্তর: ইমাম আবু দাউদ (রহ.) মক্কার অধিবাসীদের নিকট চিঠিতে স্পষ্ট করেছেন যে, তিনি যে হাদীসের কোনো দোষ-ত্রুটি উল্লেখ না করে নীরব থাকেন, তা তাঁর দৃষ্টিতে সহীহ বা হাসান এবং দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য (সালিহ)।

প্রশ্ন ৫: হযরত আবু বকর (রা.) কেন যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন?

উত্তর: সালাত যেমন ইসলামের অপরিহার্য শারীরিক ইবাদত, যাকাত তেমনি অপরিহার্য আর্থিক ইবাদত। উভয়টির মধ্যে কোনো বিভাজন সৃষ্টি করা কুফরী ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হওয়ায় দ্বীনের সুরক্ষা ও খেলাফতের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আবু বকর (রা.) তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন।

প্রশ্ন ৬: সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য হাদিয়া গ্রহণ করার শরয়ী হুকুম কী?

উত্তর: সরকারি কর্মকর্তা বা বিচারকদের জন্য দায়িত্ব পালনের কারণে কোনো উপহার বা উপঢৌকন গ্রহণ করা সম্পূর্ণ হারাম এবং তা খেয়ানত ও ঘুষ হিসেবে গণ্য হয়।