اختبار السنة الأولى للفاضل البكالوريوس (الشرف)، لعام ٢٠٢٤م
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষ পরীক্ষা, ২০২৪]
القسم: القرآن والدراسات الإسلامية [বিভাগ: আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
المادة: المدخل إلى علوم القرآن [বিষয়: আল মাদখালু ইলা উলূমিল কুরআন / Ulumul Quran]
كود المادة [বিষয় কোড]: ২০১১০১ | كود الامتحان [পরীক্ষা কোড]: ২০১ | كود ورقة الأسئلة [প্রশ্নপত্র কোড]: ০০১
الوقت [সময়]: ৪ ঘণ্টা | الدرجة الكاملة [পূর্ণমান]: ৮০
الملاحظة : أجب عن اربعة من مجموعة (أ) وعن اربعة من مجموعة (ب) –
[দ্রষ্টব্য : (ক) অংশ থেকে চারটি এবং (খ) অংশ থেকে চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
مجموعة (أ) – [ক অংশ]
الدرجات : ١٥ × ٤ = ٦٠ | পূর্ণমান : ১৫ × ৪ = ৬০
১. عرف الوحى لغة واصطلاحا – ثم بين كيفيات نزول الوحى إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم-
[১. الوحى শব্দের আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা দাও। নবী-রাসূলগণের ওপর অহী অবতরণের পদ্ধতিসমূহ বর্ণনা কর।]
উত্তর:
ভূমিকা: অহী (الْوَحْيُ) হলো নবুওয়াত ও রিসালাতের মূল ভিত্তি। মহান আল্লাহ যুগে যুগে মানবজাতির হেদায়েতের জন্য নবী ও রাসূলগণের নিকট যে পবিত্র বাণী ও প্রত্যাদেশ প্রেরণ করেছেন, তাকে অহী বলা হয়। ইসলামী শরীয়তের সকল বিধানের মূল উৎস হলো অহী।
১. অহীর আভিধানিক অর্থ (الوَحْيُ لُغَةً):
আরবি ভাষায় ‘অহী’ শব্দটি المصدر (ধাতুমূল), যার আভিধানিক অর্থ হলো:
- الإِعْلَامُ السَّرِيعُ الْخَفِيُّ (গোপন ও দ্রুত গতিতে সংবাদ প্রদান করা)।
- الإِشَارَةُ (ইশারা বা সংকেত দেওয়া)।
- الكِتَابَةُ والرِّسَالَةُ (লেখা বা পত্র প্রেরণ করা)।
- الإِلْهَامُ الفِطْرِيُّ (স্বভাবজাত ইলহাম বা হৃদয়ে নিক্ষেপ করা)। যেমন মৌমাছির প্রতি আল্লাহ তাআলার নির্দেশ: ﴿وَأَوْحَىٰ رَبُّكَ إِلَى النَّحْلِ﴾ (সূরা আন-নাহল: ৬৮)।
২. অহীর পারিভাষিক সংজ্ঞা (الوَحْيُ اصْطِلَاحًا):
ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় ইমাম বদরুদ্দীন যারকাশী ও আল্লামা সুয়ূতী (রহ.) অহীর পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন:
«إِعْلَامُ اللهِ تَعَالَى مَنْ يَصْطَفِيهِ مِنْ عِبَادِهِ كُلَّ مَا أَرَادَ إِطْلَاعَهُ عَلَيْهِ مِنْ أَلْوَانِ الْهِدَايَةِ وَالْعِلْمِ، بِطَرِيقَةٍ خَفِيَّةٍ غَيْرِ مُعْتَادَةٍ لِلْبَشَرِ»
“আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে মনোনীত করেন (নবী বা রাসূল), তাকে মানবজাতির জন্য অস্বাভাবিক এমন এক গোপন উপায়ে হেদায়েত ও জ্ঞানের যে সকল বার্তা জানিয়ে দিতে চান, তা অবহিত করার নামই অহী।”
৩. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর অহী অবতরণের পদ্ধতিসমূহ (كَيْفِيَّاتُ نُزُولِ الْوَحْيِ):
সহীহ বুখারীর প্রথম অধ্যায়ে হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত বিখ্যাত হাদীসে হারেস ইবনে হিশাম (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে অহী অবতরণের অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রধান দুটি পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেন, এছাড়া কুরআনে বর্ণিত অন্যান্য পদ্ধতিও বিদ্যমান:
- ১. ঘণ্টার ধ্বনির ন্যায় আগমন (مِثْلَ صَلْصَلَةِ الْجَرَسِ): রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: «أَحْيَانًا يَأْتِينِي مِثْلَ صَلْصَلَةِ الْجَرَسِ، وَهُوَ أَشَدُّهُ عَلَيَّ» অর্থাৎ, “কখনো কখনো অহী আমার নিকট ঘণ্টার টুংটাং শব্দের ন্যায় আসে, আর এটিই আমার জন্য সর্বাধিক কষ্টদায়ক হয়।” এ অবস্থায় জিবরাঈল (আ.) অদৃশ্য থেকে আল্লাহর বাণী নবীজির অন্তরে ঢেলে দিতেন। এ সময় তীব্র শীতেও নবীজির কপাল থেকে ঘাম ঝরে পড়ত।
- ২. ফেরেশতার মানব রূপ ধারণ (يَتَمَثَّلُ لِيَ الْمَلَكُ رَجُلًا): জিবরাঈল (আ.) কোনো মানুষের সুরত (যেমন সাহাবী হযরত দিহয়া কালবী রা.-এর সুরতে) ধারণ করে আসতেন এবং কথা বলতেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত সহজে তা মুখস্থ করে নিতেন।
- ৩. ফেরেশতার প্রকৃত স্বরূপে আগমন (رُؤْيَةُ الْمَلَكِ عَلَى صُورَتِهِ الحَقِيقِيَّةِ): জিবরাঈল (আ.) তাঁর আসল ফেরেশতার রূপ (ছয়শত ডানা বিশিষ্ট দিগন্ত বিস্তৃত আকার)-এ আগমন করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁকে তাঁর স্বরূপে জীবদ্দশায় দু’বার দেখেছেন—একবার হেরা গুহা থেকে নামার পর দিগন্তজুড়ে এবং আরেকবার মি’রাজের রজনীতে সিদরাতুল মুনতাহার নিকট।
- ৪. সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে অহী (الرُّؤْيَا الصَّادِقَةُ فِي النَّوْمِ): নবুওয়াতের প্রারম্ভে ছয় মাস রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট অহী সত্য স্বপ্নযোগে আসত। তিনি স্বপ্নে যা দেখতেন, তা প্রত্যুষের উজ্জ্বল আলোর মতো সত্য হিসেবে বাস্তবায়িত হতো।
- ৫. অন্তরে অলক্ষ্যে ফুঁকে দেওয়া (النَّفْثُ فِي الرَّوْعِ): কোনো দৃশ্যমান রূপ প্রকাশ ব্যতিরেকে জিবরাঈল (আ.) সরাসরি নবীজির কলবে বাণী স্থাপন করতেন। যেমন হাদীসে এসেছে: «إِنَّ رُوحَ القُدُسِ نَفَثَ فِي رَوْعِي أَنَّ نَفْسًا لَنْ تَمُوتَ حَتَّى تَسْتَكْمِلَ أَجَلَهَا وَتَسْتَوْعِبَ رِزْقَهَا»।
- ৬. পর্দার অন্তরাল থেকে সরাসরি কথোপকথন (التَّكْلِيمُ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ): কোনো মাধ্যম ছাড়া সরাসরি আল্লাহ তাআলার সাথে কথা বলা, যেমনটি হযরত মূসা (আ.) তূর পাহাড়ে বলেছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) মি’রাজের রাতে সরাসরি আল্লাহর সাথে বাক্যালাপ করেছিলেন ও পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের বিধান লাভ করেছিলেন।
উপসংহার: অহী অবতরণের এই অলৌকিক পদ্ধতিসমূহ প্রমাণ করে যে, কুরআন মুহাম্মদ (সা.)-এর মনগড়া কোনো বক্তব্য নয়; বরং তা সরাসরি রব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ নির্ভুল আসমানী কিতাব।
২. عرف القرآن الكريم ثم اكتب أسماءه وأوصافه ممثلا-
[২. আল কুরআনের সংজ্ঞা দাও। আল কুরআনের নাম ও বিশেষণসমূহ উদাহরণসহ বর্ণনা কর।]
উত্তর:
ভূমিকা: আল-কুরআনুল কারীম মহান আল্লাহর কালাম, সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানী কিতাব, যা বিশ্বমানবতার সর্বাঙ্গীন মুক্তি ও হেদায়েতের জন্য শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর নাযিল হয়েছে।
১. আল-কুরআনের পরিচয় ও সংজ্ঞা (تَعْرِيفُ الْقُرْآنِ الْكَرِيمِ):
আভিধানিক অর্থ: ‘কুরআন’ (الْقُرْآنُ) শব্দটি قَرَأَ ধাতু থেকে গৃহীত, যার অর্থ তিলাওয়াত করা বা পাঠ করা। যেহেতু এটি সর্বাধিক পঠিত কিতাব, তাই একে কুরআন বলা হয়। মতান্তরে এটি قَرَنَ (একত্রিত করা) থেকে নির্গত, কারণ এটি সকল জ্ঞান ও পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের মূল নির্যাস একত্র করেছে।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: উসূলে ফিকহ ও উলূমুল কুরআনের বিশেষজ্ঞগণের ঐক্যমতে কুরআনের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা হলো:
«هُوَ كَلَامُ اللهِ تَعَالَى، الْمُنَزَّلُ عَلَى نَبِيِّهِ مُحَمَّدٍ ﷺ، بِاللَّفْظِ الْعَرَبِيِّ، الْمُعْجِزُ بِأَقْصَرِ سُورَةٍ مِنْهُ، الْمَنْقُولُ إِلَيْنَا بِالتَّوَاتُرِ، الْمَكْتُوبُ فِي الْمَصَاحِفِ، الْمُتَعَبَّدُ بِتِلَاوَتِهِ، الْمَبْدُوءُ بِسُورَةِ الْفَاتِحَةِ وَالْمَخْتُومُ بِسُورَةِ النَّاسِ»
“কুরআন হলো আল্লাহ তাআলার বাণী, যা তাঁর শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর বিশুদ্ধ আরবি ভাষায় অবতীর্ণ, যার ক্ষুদ্রতম সূরাও অলৌকিক ও চ্যালেঞ্জযুক্ত, যা মুতাওয়াতির সনদে অবিকৃতভাবে আমাদের নিকট পৌঁছেছে, যা মাসাহিফে লিপিবদ্ধ, যার তিলাওয়াত ইবাদত গণ্য হয়, এবং যা সূরা ফাতিহা দ্বারা শুরু হয়ে সূরা নাস দ্বারা সমাপ্ত হয়েছে।”
২. আল-কুরআনের প্রসিদ্ধ নামসমূহ (أَسْمَاءُ الْقُرْآنِ الْكَرِيمِ):
আল্লামা যারকাশী (রহ.) আল-বুরহান কিতাবে কুরআনের ৫৫টি নামের উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ৫টি মূল নাম নিচে কুরআনী দৃষ্টান্তসহ দেওয়া হলো:
- ১. আল-কুরআন (الْقُرْآنُ): সর্বাধিক প্রচলিত নাম। দলীল: ﴿إِنَّ هَٰذَا الْقُرْآنَ يَهْدِي لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ﴾ (সূরা বনী ইসরাঈল: ৯)।
- ২. আল-কিতাব (الْكِتَابُ): অর্থ লিখিত গ্রন্থ। দলীল: ﴿ذَٰلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ ۛ فِيهِ ۛ هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ﴾ (সূরা আল-বাক্বারাহ: ২)।
- ৩. আল-ফুরকান (الْفُرْقَانُ): অর্থ সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী। দলীল: ﴿تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَىٰ عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَالَمِينَ نَذِيرًا﴾ (সূরা আল-ফুরকান: ১)।
- ৪. আয-যিকর (الذِّكْرُ): অর্থ উপদেশ বা স্মরণিকা। দলীল: ﴿إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ﴾ (সূরা আল-হিজর: ৯)।
- ৫. আত-তানযীল (التَّنْزِيلُ): অর্থ অবতারিত বাণী। দলীল: ﴿وَإِنَّهُ لَتَنزِيلُ رَبِّ الْعَالَمِينَ﴾ (সূরা আশ-শু’আরা: ১৯২)।
৩. আল-কুরআনের গুণবাচক বিশেষণসমূহ (أَوْصَافُ الْقُرْآنِ):
কুরআনে এই পবিত্র কিতাবের নানাবিধ মহিমান্বিত গুণ বা সিফাত বর্ণিত হয়েছে:
- ১. নূর (نُورٌ – জ্যোতি): ﴿وَأَنزَلْنَا إِلَيْكُمْ نُورًا مُّبِينًا﴾ (সূরা আন-নিসা: ১৭৪)। এটি বিভ্রান্তির অন্ধকার দূর করে আলোর পথ দেখায়।
- ২. হুদা (هُدًى – পথপ্রদর্শক): ﴿هُدًى وَرَحْمَةً لِّلْمُحْسِنِينَ﴾ (সূরা লুকমান: ৩)।
- ৩. শিফা (شِفَاءٌ – আরোগ্য): ﴿وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِينَ﴾ (সূরা বনী ইসরাঈল: ৮২)। এটি আত্মিক ও নৈতিক ব্যাধির মহৌষধ।
- ৪. হাকীম (حَكِيمٌ – প্রজ্ঞাময়): ﴿يس وَالْقُرْآنِ الْحَكِيمِ﴾ (সূরা ইয়াসীন: ১-২)।
- ৫. মুবারাক (مُبَارَكٌ – বরকতময়): ﴿كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِّيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ﴾ (সূরা সাদ: ২৯)।
- ৬. বাশীর ও নাযীর (بَشِيرًا وَنَذِيرًا – সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী): ﴿كِتَابٌ فُصِّلَتْ آيَاتُهُ قُرْآنًا عَرَبِيًّا لِّقَوْمٍ يَعْلَمُونَ بَشِيرًا وَنَذِيرًا﴾ (সূরা ফুসসিলাত: ৩-৪)।
উপসংহার: আল-কুরআনের এই নাম ও গুণসমূহ প্রমাণ করে যে, এই কিতাব কেবল একটি সাধারণ গ্রন্থ নয়, বরং মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের জন্য এক আলোকবর্তিকা ও পরিপূর্ণ জীবনবিধান।
৩. هات أقوال العلماء في أول ما نزل من القرآن ثم اكتب فوائد معرفة أوله وآخره بالإيضاح-
[৩. কুরআনের প্রথম অবতীর্ণ সম্পর্কে আলেমগণের বক্তব্য তুলে ধর এবং কুরআনের প্রথম ও শেষ অবতীর্ণ সম্পর্কে জানার উপকারিতা বিশদভাবে লেখ।]
উত্তর:
ভূমিকা: উলূমুল কুরআনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো ‘প্রথম ও শেষ অবতীর্ণ’ (أَوَّلُ مَا نَزَلَ وَآخِرُ مَا نَزَلَ) শাস্ত্র। এটি কুরআনের ক্রমবিকাশ, নবুওয়াতের সূচনা ও শারয়ী হুকুম জারির সময়কাল বুঝতে সহায়ক।
১. কুরআনের সর্বপ্রথম অবতীর্ণ আয়াত বিষয়ে উলামায়ে কেরামের অভিমত:
সর্বপ্রথম অবতীর্ণ আয়াত বা সূরার ব্যাপারে মুফাসসিরগণের মধ্যে চারটি প্রধান মত পাওয়া যায়:
- ১ম মত (জমহুর ও সর্বাধিক বিশুদ্ধ মত): সূরা আল-আলাকের প্রাথমিক পাঁচটি আয়াত: ﴿اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ … عَلَّمَ الْإِنسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ﴾।
দলীল: সহীহ বুখারী ও মুসলিমে হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীস—রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন ছিলেন, তখন জিবরাঈল (আ.) এসে বলেন ‘পড়ুন’। অতঃপর তিনি সূরা আলাকের প্রথম ৫টি আয়াত নিয়ে অবতীর্ণ হন। এটি সর্বসম্মত বিশুদ্ধতম অভিমত। - ২য় মত: সূরা আল-মুদ্দাসসির: ﴿يَا أَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ قُمْ فَأَنذِرْ﴾।
দলীল: জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীস।
সমন্বয়: ইমাম সুয়ূতী বলেন, ওহী বিরতিকাল (فترة الوحي)-এর পর রিসালাতের দায়িত্ব অর্পণের দিক থেকে এটি প্রথম সূরা; কিন্তু নবুওয়াতের সূচনা হিসেবে সূরা আলাকই অবিসংবাদিতভাবে প্রথম। - ৩য় মত: সূরা আল-ফাতিহা: ﴿الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ﴾।
সমন্বয়: উলামাগণ বলেন, পূর্ণাঙ্গ সূরা হিসেবে একবারে অবতীর্ণ হওয়ার দিক থেকে সূরা ফাতিহা সর্বপ্রথম নাযিল হয়েছে। - ৪র্থ মত: বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম (بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ)। কারণ প্রতিটি সূরার প্রারম্ভে এটিই প্রথম নাযিল হতো।
২. কুরআনের প্রথম ও শেষ অবতীর্ণ জানার উপকারিতা (فَوَائِدُ مَعْرِفَةِ أَوَّلِهِ وَآخِرِهِ):
কুরআনের প্রথম ও শেষ নাযিলকৃত অংশ জানার অপরিসীম একাডেমিক ও শারয়ী ফায়েদা রয়েছে:
- নাসিখ ও মানসূখ (নাসেখ বাতিলকারী এবং মানসূখ রহিতকারী) বিধান জানা: যদি দুটি শরীয়তের হুকুম আপাতদৃষ্টিতে পরস্পরবিরোধী মনে হয় এবং একটির হুকুম অপরটির পরিপন্থী হয়, তবে প্রথম অবতীর্ণটি মানসূখ (রহিত) এবং শেষ অবতীর্ণটি নাসিখ (কার্যকর) হিসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়।
- ইসলামী শরীয়তের তাদরীজ বা ক্রমবিকাশের হিকমত উপলব্ধি: আল্লাহ তাআলা উম্মতে মুহাম্মাদীর প্রতি কীভাবে পর্যায়ক্রমে সহজ থেকে পূর্ণাঙ্গতায় বিধান দান করেছেন (যেমন মদের নিষেধাজ্ঞা, সালাত ও জিহাদের বিধানের ধারাবাহিকতা) তা স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা যায়।
- কুরআনের সংরক্ষণ ও প্রামাণিকতার প্রতি অকাট্য বিশ্বাস: সাহাবায়ে কেরাম প্রতিটি আয়াতের প্রেক্ষাপট, অবতীর্ণের সময় ও স্থান নিখুঁতভাবে সংরক্ষণ করেছিলেন, যা প্রমাণ করে কুরআন অবিকৃত অবস্থায় সুরক্ষিত রয়েছে।
- নবীজির দাওয়াতী হিকমত ও কর্মপন্থা অনুধাবন: রাসূলুল্লাহ (সা.) কীভাবে তাওহীদের প্রাথমিক শিক্ষা দিয়ে দাওয়াত শুরু করেছিলেন এবং পরবর্তীতে ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় বিধানাবলী বাস্তবায়ন করেছিলেন, তা জানা যায়।
৪. عرف التفسير والتأويل وما الفرق بينهما؟ ثم بين شروط المفسر وآدابه-
[৪. تفسير ও تأويل এর পরিচয় দাও এবং উভয়ের মধ্যে পার্থক্য কী? অতঃপর মুফাসসিরের শর্তসমূহ ও আদবসমূহ বর্ণনা কর।]
উত্তর:
ভূমিকা: কালামুল্লাহর মর্ম উপলব্ধি করার জন্য তাফসীর ও তাবীল দুটি প্রধান ভিত্তি। আল্লাহর বাণীর প্রকৃত ব্যাখ্যা ও উদ্দেশ্য অনুধাবনে মুফাসসিরের নির্দিষ্ট শর্তাবলী ও আদব থাকা অপরিহার্য।
১. তাফসীরের সংজ্ঞা (تَعْرِيفُ التَّفْسِيرِ):
- আভিধানিক অর্থ: الفَسْرُ ধাতু থেকে গৃহীত, যার অর্থ البيان والإيضاح والكشف (স্পষ্ট করা, উন্মোচন করা ও বিশদ ব্যাখ্যা করা)।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: ইমাম যারকাশীর মতে: «عِلْمٌ يُفْهَمُ بِهِ كِتَابُ اللهِ الْمُنَزَّلُ عَلَى نَبِيِّهِ مُحَمَّدٍ ﷺ، وَبَيَانُ مَعَانِيهِ، وَاسْتِخْرَاجُ أَحْكَامِهِ وَحِكَمِهِ» অর্থাৎ, “যে জ্ঞানের মাধ্যমে আল্লাহর কিতাবকে বোঝা যায়, তার অর্থসমূহ স্পষ্ট করা যায় এবং তা থেকে বিধিবিধান ও হিকমত উদঘাটন করা যায়, তাকে তাফসীর বলে।”
২. তাবীলের সংজ্ঞা (تَعْرِيفُ التَّأْوِيلِ):
- আভিধানিক অর্থ: الأَوْلُ ধাতু থেকে গৃহীত, যার অর্থ الرجوع (প্রত্যাবর্তন করা) বা পরিণতি।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: কোনো শব্দের প্রকাশ্য অর্থকে বাদ দিয়ে দলীল-প্রমাণের ভিত্তিতে সম্ভাব্য অন্তর্নিহিত কোনো অর্থ গ্রহণ করা, যা কুরআন ও সুন্নাহর সাধারণ নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
৩. তাফসীর ও তাবীলের মধ্যকার পার্থক্য (الْفَرْقُ بَيْنَهُمَا):
| তুলনার বিষয় | তাফসীর (التفسير) | তাবীল (التأويل) |
|---|---|---|
| ভিত্তি | রিওয়ায়াত ও স্পষ্ট দলীলভিত্তিক (النقل والرواية)। | দিরারায়াত ও গভীর ইজতিহাদভিত্তিক (الدراية والاستنباط)। |
| ক্ষেত্র | শব্দ ও বাক্যের প্রকাশ্য রূপের সাথে সম্পর্কিত। | অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও রূপক অর্থের সাথে সম্পর্কিত। |
| নিশ্চয়তা | মুফাসসির নিশ্চিতভাবে বলেন যে, আল্লাহর উদ্দেশ্য এটাই। | মুজতাহিদ সম্ভাব্য অর্থ বিবেচনা করে মতামত ব্যক্ত করেন। |
৪. একজন মুফাসসিরের আবশ্যকীয় শর্তসমূহ (شُرُوطُ الْمُفَسِّرِ):
- বিশুদ্ধ আকীদা (صِحَّةُ الْعَقِيدَةِ): ভ্রান্ত মতবাদ ও বিদয়াতমুক্ত সহীহ আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকীদাসম্পন্ন হওয়া।
- প্রবৃত্তি ও কুপ্রবৃত্তিমুক্ত মনন: নিজের মতামতের সমর্থনে জোরপূর্বক আয়াতের ব্যাখ্যা না করা।
- কুরআন দ্বারা কুরআনের তাফসীর করার জ্ঞান: কুরআনের এক আয়াতের ব্যাখ্যা অপর আয়াত দ্বারা করার দক্ষতা।
- হাদীস ও সুন্নাহর গভীর পাণ্ডিত্য: সহীহ ও যয়ীফ হাদীসের পার্থক্য জানা, কারণ রাসূল (সা.) হলেন কুরআনের প্রধান ব্যাখ্যাকার।
- সাহাবা ও তাবিঈনের তাফসীর সম্পর্কিত জ্ঞান: সালাফে সালেহীনের আছারের পূর্ণ দখল থাকা।
- আরবি ভাষা ও ব্যাকরণে পূর্ণ দক্ষতা: নাহু, সরফ, বালাগাত (মা’আনী, বায়ান, বাদী’) এবং আরবি সাহিত্যের গভীর জ্ঞান।
- উলূমুল কুরআন ও উসূলে ফিকহের জ্ঞান: আসবাবুন নুযূল, মাক্কী-মাদানীর পার্থক্য, নাসেখ-মানসূখ, কিয়াস ও ইস্তিন্বাতের নিয়ম জানা।
৫. মুফাসসিরের আদবসমূহ (آدَابُ الْمُفَسِّرِ):
- একনিষ্ঠ নিয়ত ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।
- উত্তম চরিত্র ও তাকওয়া অবলম্বন করা।
- নম্রতা, আত্মমর্যাদাবোধ ও অহংকার পরিহার।
- স্পষ্ট ও চিত্তাকর্ষক বাচনভঙ্গি।
- বিতর্কিত ও প্রমাণহীন ইসরাঈলী রেওয়ায়েত পরিহার করা।
৫. عرف النسخ – ثم بين شروطه وأهميته وأدلة ثبوته مفصلا-
[৫. النسخ এর সংজ্ঞা দাও। নসখের শর্ত, গুরুত্ব ও প্রামাণিক দলিল বিস্তারিতভাবে বর্ণনা কর।]
উত্তর:
ভূমিকা: উলূমুল কুরআনের অন্যতম সর্বাধিক সূক্ষ্ম ও সংবেদনশীল শাখা হলো নসখ (النسخ)। নসখের সঠিক জ্ঞান ছাড়া কুরআনের তাফসীর ও ফিকহী ইজতিহাদ সম্পূর্ণ অসম্ভব।
১. নসখের আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা (تَعْرِيفُ النَّسْخِ):
- আভিধানিক অর্থ: আরবিতে নসখ দুটি অর্থে ব্যবহৃত হয়:
- الإِزَالَةُ وَالإِبْطَالُ (বিলুপ্ত করা, দূর করা বা রহিত করা)। যেমন: نَسَخَتِ الشَّمْسُ الظِّلَّ (সূর্য ছায়াকে বিলুপ্ত করেছে)।
- النَّقْلُ وَالتَّحْوِيلُ (এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তর বা অনুলিপি করা)। যেমন: نَسَخْتُ الْكِتَابَ (আমি বইটি নকল করেছি)।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: উসূলে ফিকহের পরিভাষায় নসখ বলা হয়:
«رَفْعُ الحُكْمِ الشَّرْعِيِّ بِدَلِيلٍ شَرْعِيٍّ مُتَرَاخٍ عَنْهُ»
“পরবর্তী কোনো শারয়ী দলীল দ্বারা পূর্ববর্তী কোনো শারয়ী হুকুম বা বিধান সমাপ্ত বা পরিবর্তন করাকে নসখ বলে।”
২. নসখ সংঘটিত হওয়ার আবশ্যকীয় শর্তসমূহ (شُرُوطُ النَّسْخِ):
- ১. মানসূখ বিধানটি শারয়ী হুকুম হওয়া: আকলী বা বুদ্ধিভিত্তিক কোনো বিষয় নসখ হতে পারে না; বরং শুধুমাত্র হালাল, হারাম, ওয়াজিব ইত্যাদির মতো শারয়ী হুকুমে নসখ হতে পারে।
- ২. নাসিখ দলীলটি অবশ্যই শারয়ী হওয়া: বুদ্ধি বা অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নসখ হয় না; কুরআন বা সুন্নাহর দলীল দ্বারা হতে হবে।
- ৩. নাসিখ দলীলটি পরে অবতীর্ণ হওয়া: বাতিলকারী দলীলটি পূর্ববর্তী দলীলের পরে অবতীর্ণ হওয়া আবশ্যক।
- ৪. বিধান দুটির মাঝে সমন্বয় সাধনের উপায় না থাকা: যদি কোনোভাবে দুটি আয়াতের বিধানের মাঝে সমন্বয় (جمع و توفيق) করা সম্ভব হয়, তবে সেখানে নসখ কার্যকর হবে না।
- ৫. আকীদা ও ঐতিহাসিক সংবাদে নসখ না হওয়া: আল্লাহর সিফাত, তাওহীদ, রিসালাত, আখিরাত বা পূর্ববর্তী নবীদের সত্য ঘটনার সংবাদে কখনো নসখ হতে পারে না। কেবল আদেশ ও নিষেধের বিধানে নসখ ঘটে।
৩. নসখের গুরুত্ব (أَهَمِّيَّةُ النَّسْخِ):
হযরত আলী (রা.) একদা এক ব্যক্তিকে মসজিদে তাফসীর করতে দেখে জিজ্ঞাসা করেছিলেন: “তুমি কি নাসেখ ও মানসূখ জানো?” সে বলল, “না।” আলী (রা.) বললেন: «هَلَكْتَ وَأَهْلَكْتَ» (“তুমি নিজেও ধ্বংস হয়েছ এবং অন্যদেরও ধ্বংস করেছ!”)। নসখ জানার মাধ্যমে শরীয়তের সঠিক আমল, হুকুমের পরিবর্তনশীলতা এবং বান্দার ওপর আল্লাহর রহমতের হিকমত জানা যায়।
৪. নসখ সাব্যস্ত হওয়ার প্রামাণিক দলীলসমূহ (أَدِلَّةُ ثُبُوتِ النَّسْخِ):
- কুরআনুল কারীম থেকে দলীল:
- ﴿مَا نَنسَخْ مِنْ آيَةٍ أَوْ نُنسِهَا نَأْتِ بِخَيْرٍ مِّنْهَا أَوْ مِثْلِهَا﴾ (সূরা আল-বাক্বারাহ: ১০৬)—”আমি কোনো আয়াত রহিত করলে কিংবা তা বিস্মৃত করিয়ে দিলে তদপেক্ষা উত্তম কিংবা তার সদৃশ আয়াত নিয়ে আসি।”
- ﴿وَإِذَا بَدَّلْنَا آيَةً مَّكَانَ آيَةٍ ۙ وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا يُنَزِّلُ قَالُوا إِنَّمَا أَنتَ مُفْتَرٍ﴾ (সূরা আন-নাহল: ১০১)।
- সুন্নাহ থেকে দলীল:
রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: «كُنْتُ نَهَيْتُكُمْ عَنْ زِيَارَةِ الْقُبُورِ، أَلَا فَزُورُوهَا» (সহীহ মুসলিম)—”আমি পূর্বে তোমাদের কবর যিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম, শোন! এখন থেকে তোমরা কবর যিয়ারত করো।” এখানে স্পষ্টতই পূর্বের নিষেধাজ্ঞা পরবর্তী অনুমতি দ্বারা মানসূখ হয়েছে।
- ইজমায়ে উম্মাহ: সাহাবা, তাবিঈন এবং চার মাযহাবের আইম্মায়ে কেরাম সর্বসম্মতভাবে কুরআনে ও সুন্নাহয় নসখের অস্তিত্ব ও যৌক্তিকতা স্বীকার করেছেন। কেবল আবু মুসলিম আল-ইস্পাহানী নামক মুতাযিলা পণ্ডিত কুরআনে নসখ অস্বীকার করার ব্যর্থ অপচেষ্টা চালিয়েছিল, যা উম্মাহ সর্বসম্মতভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
৬. ما معنى الإعجاز؟ وما المراد بالإعجاز العلمي في القرآن الكريم؟ بين بالأمثلة-
[৬. الإعجاز অর্থ কী? الإعجاز العلمي في القرآن الكريم দ্বারা উদ্দেশ্য কী? উদাহরণসহ বর্ণনা কর।]
উত্তর:
ভূমিকা: আল-কুরআন বিশ্বজাহানের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ এক চিরন্তন মোজেযা। এর ভাষা, সাহিত্য, বিধান, ভবিষ্যৎবাণী এবং বৈজ্ঞানিক বাস্তবতাসমূহ মানবজাতিকে চিরকাল অপারগ ও নির্বাক করে রেখেছে।
১. ই’জাযের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ (مَعْنَى الْإِعْجَازِ):
- আভিধানিক অর্থ: العَجْزُ ধাতু থেকে الإِعْجَازُ বাব-এর মাসদার। এর আভিধানিক অর্থ হলো: إِثْبَاتُ العَجْزِ (অপারগতা বা অক্ষমতা প্রমাণ করা), পরাভূত করা বা এমন কিছু করা যা করতে অন্য কেউ সক্ষম নয়।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: পরিভাষায় মোজেযা ও ই’জায বলা হয়:
«أَمْرٌ خَارِقٌ لِلْعَادَةِ، مَقْرُونٌ بِالتَّحَدِّي، سَالِمٌ عَنِ الْمُعَارَضَةِ، يُظْهِرُهُ اللهُ عَلَى يَدِ نَبِيٍّ مِنْ أَنْبِيَائِهِ تَصْدِيقًا لِرِسَالَتِهِ»
“এমন এক স্বভাববিরুদ্ধ অলৌকিক বিষয়, যা চ্যালেঞ্জযুক্ত এবং যার মুকাবিলা বা প্রতিরোধ করা অসম্ভব, যা আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীর সত্যতা প্রমাণের জন্য তাঁর হাতে প্রকাশ করেন।”
২. কুরআনের বৈজ্ঞানিক অলৌকিকতা বা আল-ই’জাযুল ইলমী (الإِعْجَازُ الْعِلْمِيُّ):
ধারণা: আধুনিক বিজ্ঞান শত শত বছর গবেষণা করে অতি সম্প্রতি যে সকল মহাজাগতিক, শারীরবৃত্তীয় ও প্রাকৃতিক সত্য আবিষ্কার করেছে, চৌদ্দশত বছর পূর্বে নিরক্ষর নবীর মুখ দিয়ে পবিত্র কুরআনে সেই তথ্যগুলোর নিখুঁত ও বৈজ্ঞানিক বর্ণনা উপস্থাপন করাকেই আল-ই’জাযুল ইলমী ফিল কুরআনিল কারীম বলা হয়।
৩. উদাহরণসহ কুরআনের বৈজ্ঞানিক অলৌকিকতার প্রমাণ (الْأَمْثِلَةُ):
- মহাবিশ্ব সৃষ্টি ও বিগ ব্যাং তত্ত্ব (Big Bang Theory):
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: ﴿أَوَلَمْ يَرَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنَّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ كَانَتَا رَتْقًا فَفَتَقْنَاهُمَا﴾ (সূরা আল-আম্বিয়া: ৩০)—”কাফেররা কি ভেবে দেখে না যে, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী ওতপ্রোতভাবে মিশে ছিল, অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিয়েছি।” আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, সমগ্র মহাবিশ্ব একটি আদি বিন্দুতে পিণ্ডীভূত ছিল এবং মহা বিস্ফোরণের (Big Bang) মাধ্যমে তা প্রসারিত হতে শুরু করে।
- মহাবিশ্বের ক্রমাগত সম্প্রসারণ (Expanding Universe):
সূরা আয-যারিয়াতে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন: ﴿وَالسَّمَاءَ بَنَيْنَاهَا بِأَيْدٍ وَإِنَّا لَمُوسِعُونَ﴾ (সূরা আয-যারিয়াত: ৪৭)—”আমি স্বীয় ক্ষমতাবলে আকাশ নির্মাণ করেছি এবং নিশ্চয়ই আমি একে ক্রমশ সম্প্রসারিত করছি।” ১৯২৯ সালে এডউইন হাবল কর্তৃক মহাবিশ্ব সম্প্রসারণের সূত্র আবিষ্কারের পূর্বে মানবজাতি এই রহস্য সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিল।
- ভ্রূণতত্ত্ব ও মানব সৃষ্টির পর্যায়ক্রম (Embryology):
সূরা আল-মুমিনূনে মানব ভ্রূণের সূক্ষ্ম ধাপগুলো নিখুঁতভাবে বর্ণিত হয়েছে: ﴿ثُمَّ خَلَقْنَا النُّطْفَةَ عَلَقَةً فَخَلَقْنَا الْعَلَقَةَ مُضْغَةً فَخَلَقْنَا الْمُضْغَةَ عِظَامًا فَكَسَوْنَا الْعِظَامَ لَحْمًا ثُمَّ أَنشَأْنَاهُ خَلْقًا آخَرَ﴾ (সূরা আল-মুমিনূন: ১৪)। বিশ্বখ্যাত ভ্রূণবিজ্ঞানী ড. কিথ মুর (Dr. Keith Moore) কুরআনের এই পর্যায়ক্রমিক বিবরণ দেখে বিস্মিত হয়ে ইসলাম ও কুরআনের ঐশী সত্যতা স্বীকার করেছিলেন।
- দুই সমুদ্রের মিলনস্থলে অদৃশ্য অন্তরাল (Internal Barrier of Seas):
সূরা আর-রহমানে বলা হয়েছে: ﴿مَرَجَ الْبَحْرَيْنِ يَلْتَقِيَانِ بَيْنَهُمَا بَرْزَخٌ لَّا يَبْغِيَانِ﴾ (সূরা আর-রহমান: ১৯-২০)। আধুনিক সমুদ্রবিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, ভূমধ্যসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরের মিলনস্থলে পানির ঘনত্ব, তাপমাত্রা ও লবণাক্ততার তারতম্যের কারণে একটি প্রাকৃতিক অদৃশ্য সীমানা বিদ্যমান, যার ফলে দুই সাগরের পানি নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রাখে।
উপসংহার: আল-কুরআনের এই বৈজ্ঞানিক সত্যসমূহ প্রমাণ করে যে, এটি সর্বজ্ঞানী আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অবতীর্ণ কালাম, যা সর্বযুগের মানুষের জন্য হেদায়েতের আলোকবর্তিকা।
مجموعة (ب) – [খ অংশ]
الدرجات : ٥ × ٤ = ٢٠ | পূর্ণমান : ৫ × ৪ = ২০
৭. عرف الحديث القدسي بالمثال-
[৭. উদাহরণসহ হাদীসে কুদসীর সংজ্ঞা দাও।]
উত্তর:
১. হাদীসে কুদসীর সংজ্ঞা (تَعْرِيفُ الْحَدِيثِ الْقُدْسِيِّ):
القدسي শব্দটি ‘কুদুস’ (পবিত্রতা) থেকে সম্পর্কিত। পরিভাষায় হাদীসে কুদসী বলা হয়:
«هُوَ مَا رَوَاهُ النَّبِيُّ ﷺ عَنْ رَبِّهِ تَبَارَكَ وَتَعَالَى، مَعْنَاهُ مِنْ عِنْدِ اللهِ، وَلَفْظُهُ مِنْ عِنْدِ النَّبِيِّ ﷺ»
“যে হাদীসের অর্থ ও মূল বক্তব্য রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর প্রতিপালক মহান আল্লাহর নিকট থেকে বর্ণনা করেছেন; যার অর্থ আল্লাহর পক্ষ থেকে ইলহাম বা অহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত, তবে তার শব্দাবলী রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিজস্ব।”
২. হাদীসে কুদসীর প্রামাণ্য উদাহরণ (المِثَالُ):
হযরত আবু যার আল-গিফারী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) আল্লাহ তাআলা থেকে বর্ণনা করে বলেন:
«قَالَ اللهُ تَعَالَى: يَا عِبَادِي إِنِّي حَرَّمْتُ الظُّلْمَ عَلَى نَفْسِي، وَجَعَلْتُهُ بَيْنَكُمْ مُحَرَّمًا، فَلَا تَظَالَمُوا» (সহীহ মুসলিম)
“মহান আল্লাহ বলেন: হে আমার বান্দাগণ! আমি নিজের ওপর জুলুম হারাম করেছি এবং তোমাদের পরস্পরের মধ্যেও তা হারাম করেছি; অতএব তোমরা একে অপরের ওপর জুলুম করো না।”
৮. ما معنى السورة والآية وما الفرق بينهما؟
[৮. সূরা ও আয়াতের অর্থ কী? উভয়ের মধ্যে পার্থক্য কী?]
উত্তর:
১. সূরার পরিচয় (مَعْنَى السُّورَةِ):
- আভিধানিক অর্থ: السُّورُ অর্থ প্রাচীর বা শহরের সীমানা দেয়াল, অথবা মর্যাদা ও উচ্চ স্থান।
- পারিভাষিক অর্থ: কুরআনের এমন একটি নির্দিষ্ট অংশ, যার একটি পৃথক সূচনা ও সমাপ্তি রয়েছে এবং যাতে একাধিক আয়াত সন্নিবেশিত থাকে। কুরআনে মোট ১১৪টি সূরা রয়েছে।
২. আয়াতের পরিচয় (مَعْنَى الآيَةِ):
- আভিধানিক অর্থ: নিদর্শন, লক্ষণ, প্রমাণ বা আশ্চর্য বিষয়।
- পারিভাষিক অর্থ: সূরার অন্তর্ভুক্ত কুরআনের এমন একটি বাক্য বা বাক্যাংশ, যা স্বতন্ত্র একক হিসেবে গণ্য হয় এবং যার শুরুতে ও শেষে যতিচিহ্ন বা ওয়াকফ থাকে।
৩. সূরা ও আয়াতের মধ্যকার পার্থক্য (الْفَرْقُ بَيْنَهُمَا):
- সূরা হলো একটি বড় অধ্যায় বা পূর্ণাঙ্গ কাঠামোগত ইউনিট, আর আয়াত হলো সেই সূরার ক্ষুদ্রতম অঙ্গ বা বাক্য।
- কুরআনের ক্ষুদ্রতম সূরাও কমপক্ষে তিনটি আয়াত সমন্বয়ে গঠিত (যেমন: সূরা আল-কাউসার), কিন্তু আয়াত একক বাক্যেই সীমাবদ্ধ।
- সূরা নাম দ্বারা অভিহিত (যেমন: সূরা বাক্বারাহ), পক্ষান্তরে আয়াত সংখ্যা ও ক্রমিক দ্বারা চিহ্নিত।
৯. اكتب فوائد نزول القرآن بالتدريج-
[৯. কুরআন ধীরে ধীরে অবতীর্ণ হওয়ার উপকারিতা লেখ।]
উত্তর:
কুরআন একবারে অবতীর্ণ না হয়ে ২৩ বছর ধরে পর্যায়ক্রমে (نُزُولُ القُرْآنِ مُنَجَّمًا) অবতীর্ণ হওয়ার পেছনে মহান আল্লাহর বহুবিধ ঐশী হিকমত ও ফায়েদা বিদ্যমান:
- রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অন্তরকে সুদৃঢ় করা (تَثْبِيتُ فُؤَادِ النَّبِيِّ ﷺ): কাফেরদের নানাবিধ অত্যাচার ও প্রতিকূলতার মুখে সান্ত্বনা ও শক্তি জোগানোর জন্য বারবার জিবরাঈল (আ.) অহী নিয়ে আগমন করতেন। যেমন আল্লাহ বলেন: ﴿لِنُثَبِّتَ بِهِ فُؤَادَكَ ۖ وَرَتَّلْنَاهُ تَرْتِيلًا﴾ (সূরা আল-ফুরকান: ৩২)।
- সাহাবায়ে কেরামের মুখস্থ ও অনুধাবন সহজ করা: আরবরা নিরক্ষর জাতি ছিল। অল্প অল্প করে নাযিল হওয়ায় তা মুখস্থ করা, অর্থ বোঝা এবং আমল করা তাদের জন্য অত্যন্ত সহজ হয়েছিল।
- বিধান প্রণয়নে পর্যায়ক্রমিক নীতি (التَّدَرُّجُ فِي التَّشْرِيعِ): মদ্যপান নিষিদ্ধকরণ, সুদ বর্জন, সালাত ও জিহাদের বিধানের মতো কঠিন অভ্যাস পরিবর্তন একবারে চাপিয়ে না দিয়ে ধাপে ধাপে কার্যকর করা হয়েছিল।
- সমসাময়িক প্রশ্ন ও ঘটনার তাৎক্ষণিক জবাব প্রদান: কাফের ও মুনাফিকদের আপত্তি ও সাহাবীদের বিভিন্ন জিজ্ঞাসার প্রেক্ষিতে সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে সমাধান নাযিল হতো।
- কুরআনের ই’জায ও অলৌকিকতা প্রমাণ: ২৩ বছর ধরে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে অবতীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও এর ভাষার গাঁথুনি, শৈলী ও ভাবধারায় তিল পরিমাণ অসঙ্গতি নেই, যা এর ঐশী সত্যতার শ্রেষ্ঠ প্রমাণ।
১০. بين أسباب جمع القرآن الكريم في عهد أبي بكر وعثمان رضى الله عنهما-
[১০. আবু বকর ও ওসমান (রা)-এর যুগে কুরআন একত্রীকরণের কারণসমূহ বর্ণনা কর।]
উত্তর:
১. আবু বকর (রা.)-এর যুগে কুরআন সংকলনের কারণ (عهد أبي بكر رضي الله عنه):
- ইয়মুমার যুদ্ধে হাফেজদের শাহাদাত: ১২ হিজরীতে ভণ্ড নবী মুসায়লামা কাযযাবের বিরুদ্ধে সংঘটিত রক্তক্ষয়ী ইয়ামামার যুদ্ধে প্রায় ৭০ জন শীর্ষস্থানীয় হাফেজে কুরআন সাহাবী শাহাদাত বরণ করেন।
- কুরআনের অংশবিশেষ হারানোর আশঙ্কা: এতে দূরদর্শী সাহাবী হযরত উমর (রা.) শঙ্কিত হন যে, এভাবে হাফেজগণ শহীদ হতে থাকলে কুরআনের অনেক অংশ হারিয়ে যেতে পারে। তাই তিনি খলীফা আবু বকর (রা.)-কে গ্রন্থাকারে কুরআন সংকলনের প্রস্তাব দেন। প্রথমে দ্বিধাবোধ করলেও পরবর্তীতে আবু বকর (রা.) এর গুরুত্ব উপলব্ধি করেন এবং যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর নেতৃত্বে সর্বসম্মতভাবে এক খণ্ডে পূর্ণাঙ্গ কুরআন সংকলন করেন।
২. ওসমান (রা.)-এর যুগে কুরআন প্রতিলিপিকরণের কারণ (عهد عثمان رضي الله عنه):
- তিলাওয়াতের উচ্চারণে মতভেদ ও বিশৃঙ্খলা: ওসমান (রা.)-এর খেলাফতকালে ইসলামী সাম্রাজ্য আজারবাইজান, আর্মেনিয়া ও পারস্য পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। অনারব নওমুসলিমগণ এবং বিভিন্ন অঞ্চলের সাহাবীদের থেকে যারা কুরআন শিখেছিলেন, তাদের মধ্যে কিরাআত ও উচ্চারণের পার্থক্য নিয়ে তীব্র বিবাদ শুরু হয়। এক দল অপর দলকে কাফের পর্যন্ত বলার উপক্রম হয়েছিল।
- হুযায়ফা ইবনে ইয়ামান (রা.)-এর উদ্বেগ: তিনি জিহাদের ময়দান থেকে এসে খলীফাকে সতর্ক করে বলেন: «أَدْرِكْ هَذِهِ الأُمَّةَ قَبْلَ أَنْ يَخْتَلِفُوا فِي الكِتَابِ اخْتِلَافَ اليَهُودِ وَالنَّصَارَى» (“ইহুদী ও নাসারাদের মতো কিতাব নিয়ে মতভেদে লিপ্ত হওয়ার আগেই এই উম্মতকে রক্ষা করুন!”)।
- একক কিতাব বা ‘মুসহাফে ইমাম’ প্রণয়ন: খলীফা ওসমান (রা.) কুরাইশদের বিশুদ্ধ ভাষায় মূল কপি থেকে একাধিক অনুলিপি তৈরি করে প্রধান প্রধান প্রাদেশিক কেন্দ্রে প্রেরণ করেন এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত কপিগুলো পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়ে উম্মতকে এক অভিন্ন কিরাআতে ঐক্যবদ্ধ করেন।
১১. تحدث عن أمارات الناسخ-
[১১. ‘নাসেখ’-এর আলামতগুলো আলোচনা কর।]
উত্তর:
উলূমুল কুরআন ও উসূলে ফিকহের শাস্ত্র অনুযায়ী কোনো বিধান যে ‘নাসিখ’ (বাতিলকারী বা কার্যকর বিধান), তা নিশ্চিতভাবে জানার কয়েকটি স্বীকৃত আলামত ও পদ্ধতি রয়েছে:
- স্পষ্ট নস বা টেক্সটের সুস্পষ্ট ঘোষণা: আয়াতে বা সহীহ হাদীসে সরাসরি পূর্ববর্তী বিধান বাতিলের উল্লেখ থাকা। যেমন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর স্পষ্ট ঘোষণা: «كُنْتُ نَهَيْتُكُمْ عَنْ زِيَارَةِ الْقُبُورِ، أَلَا فَزُورُوهَا»।
- সাহাবীর সুস্পষ্ট সাক্ষ্য ও ঐতিহাসিক বিবরণ: কোনো সাহাবীর পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে বর্ণনা থাকা যে, অমুক বিধানটি পূর্বে ছিল এবং পরবর্তীতে অমুক আয়াত দ্বারা তা রহিত হয়েছে। যেমন হযরত আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনা: «كَانَ فِيمَا أُنْزِلَ عَشْرُ رَضَعَاتٍ مَعْلُومَاتٍ يُحَرِّمْنَ، ثُمَّ نُسِخْنَ بِخَمْسٍ مَعْلُومَاتٍ»।
- তারিখ বা অবতীর্ণের ঐতিহাসিক অগ্র-পশ্চাত জানা: ঐতিহাসিক সনদের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যে, দুটি পরস্পরবিরোধী বিধানের মধ্যে একটি মক্কী যুগে এবং অপরটি মদীনায় অবতীর্ণ হয়েছিল (যেমন ক্বিবলা পরিবর্তনের বিধান)। মদীনার পরবর্তী বিধানটি স্বাভাবিকভাবেই মক্কার পূর্ববর্তী বিধানের জন্য নাসিখ।
- ইজমায়ে উম্মাহর ইঙ্গিত: উম্মতের মুজতাহিদ ফকীহগণের ঐক্যমতের মাধ্যমে জানা যায় যে, এই আয়াতের বিধানটি পূর্ববর্তী দলীলের ওপর অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত। তবে মনে রাখতে হবে, ইজমা নিজে নাসিখ নয়, বরং তা নাসিখের অস্তিত্ব নির্দেশক আলামত মাত্র।
১২. ما رأى أهل الصرفة في إعجاز القرآن؟ وما سبب بطلانه؟ بين-
[১২. ই’জাযুল কুরআন বিষয়ে আহলুস সরফাহ-এর বক্তব্য কী এবং সেই বক্তব্য গ্রহণযোগ্য না হওয়ার কারণ কী? বর্ণনা কর।]
উত্তর:
১. সারফাহ (الصرفة) তত্ত্বের প্রবক্তা ও তাদের বক্তব্য:
মুতাযিলা সম্প্রদায়ের নেতা আবু ইসহাক আন-নাজ্জাম এবং মুরজিয়া মতাবলম্বী আল্লামা শরীফ মুরতাজা ‘আসহাবুস সারফাহ’ বা সারফাহ মতবাদের প্রবক্তা।
- তাদের মূল বক্তব্য: আল-কুরআনের নিজস্ব শব্দচয়ন, বাক্যবিন্যাস বা অলঙ্কারশাস্ত্রে কোনো অন্তর্নিহিত অলৌকিকতা বা মোজেযা নেই। কুরআনের মতো বাক্য রচনা করা মানুষের স্বাভাবিক ক্ষমতার মধ্যেই ছিল। কিন্তু আরবরা যখন কুরআনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে তার সমকক্ষ বাক্য রচনা করতে চেয়েছিল, তখন আল্লাহ তাআলা অলৌকিকভাবে তাদের অন্তর ও চিন্তাশক্তিকে কুরআন সদৃশ রচনা তৈরি করা থেকে ‘ফিরিয়ে রেখেছিলেন’ (صَرَفَهُمْ عَنْ ذَلِكَ)। এই বিরত রাখা বা ফিরিয়ে রাখাকেই তারা ‘সারফাহ’ বলে।
২. সারফাহ মতবাদ বাতিল ও অগ্রহণযোগ্য হওয়ার কারণসমূহ:
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের উলামায়ে কেরাম এই মতবাদকে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও বাতিল প্রমাণ করেছেন:
- কুরআনের অলৌকিকতা তার নিজস্ব সত্তায় বিদ্যমান: আল্লাহ তাআলা কুরআনের নিজস্ব ভাষাগত শ্রেষ্ঠত্ব ও সৌন্দর্যকেই মোজেযা হিসেবে পেশ করেছেন। আল্লাহ বলেন: ﴿قُل لَّئِنِ اجْتَمَعَتِ الْإِنسُ وَالْجِنُّ عَلَىٰ أَن يَأْتُوا بِمِثْلِ هَٰذَا الْقُرْآنِ لَا يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ﴾ (সূরা বনী ইসরাঈল: ৮৮)। সারফাহ তত্ত্ব মানলে কুরআনের নিজস্ব সত্তার কোনো মর্যাদা অবশিষ্ট থাকে না।
- চ্যালেঞ্জের প্রকৃতি বিরুদ্ধ: আরবরা আরবী ভাষার সর্বকালের শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত ছিল। তাদের যদি স্বাভাবিক যোগ্যতা কেড়ে নিয়ে প্রতিহত করা হতো, তবে আরবরা নিশ্চয়ই চিৎকার করে বলত: “মুহাম্মদ আমাদের বাকশক্তি বা প্রতিভা রুদ্ধ করে দিয়েছেন!” কিন্তু তারা বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে কেবল বলেছিল: ﴿إِنْ هَٰذَا إِلَّا سِحْرٌ يُؤْثَرُ﴾।
- কুরআনের সুস্পষ্ট ঘোষণা: কুরআন স্পষ্টভাবে চ্যালেঞ্জ করেছে যে, মানুষ ও জ্বিন একত্রিত হলেও এর সমকক্ষ আনতে পারবে না। এতে প্রমাণ হয় যে, কুরআনের গভীরতা ও রূপমাধুর্য স্বয়ং মানুষের মেধার আওতার বাইরে।
অতএব, আহলুস সরফাহ-এর এই অভিমত দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রত্যাখ্যাত ও বাতিল।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: ফাজিল ১ম বর্ষের আল মাদখালু ইলা উলূমিল কুরআন পরীক্ষার পূর্ণমান কত?
উত্তর: আল মাদখালু ইলা উলূমিল কুরআন (বিষয় কোড: 201101) পরীক্ষার মোট পূর্ণমান ৮০ নম্বর এবং সময় ৪ ঘণ্টা। এর মধ্যে ‘ক’ বিভাগ থেকে ৪টি (৪ × ১৫ = ৬০) এবং ‘খ’ বিভাগ থেকে ৪টি (৪ × ৫ = ২০) প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়।
প্রশ্ন ২: উলূমুল কুরআনের প্রধান মৌলিক গ্রন্থসমূহ কী কী?
উত্তর: উলূমুল কুরআনের সর্বাধিক প্রামাণ্য মৌলিক গ্রন্থগুলোর মধ্যে ইমাম বদরুদ্দীন যারকাশী রচিত ‘আল-বুরহান ফী উলূমিল কুরআন’ এবং আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী রচিত ‘আল-ইতকান ফী উলূমিল কুরআন’ সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য।
প্রশ্ন ৩: প্রথম অবতীর্ণ অহী বিষয়ে বিশুদ্ধতম মত কোনটি?
উত্তর: প্রথম অবতীর্ণ অহী হিসেবে জমহুর উলামায়ে কেরামের ঐক্যমতে হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত বুখারী শরীফের হাদীস অনুযায়ী হেরা গুহায় অবতীর্ণ সূরা আলাকের প্রথম ৫টি আয়াতই সর্বাধিক বিশুদ্ধ ও স্বীকৃত।
প্রশ্ন ৪: তাফসীর ও তাবীলের মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?
উত্তর: তাফসীর মূলত প্রকাশ্য শব্দ ও বিশুদ্ধ হাদীস-আছার নির্ভর ব্যাখ্যা, যা নিশ্চিতভাবে উপস্থাপন করা হয়; আর তাবীল হলো গবেষক আলেমের ইজতিহাদ ও গভীর চিন্তাপ্রসূত এমন অন্তর্নিহিত অর্থ, যা রূপক বা একাধিক সম্ভাব্য অর্থ ধারণ করে।
প্রশ্ন ৫: কুরআনের নাসেখ ও মানসূখ জানা কেন বাধ্যতামূলক?
উত্তর: নাসেখ (কার্যকর বিধান) এবং মানসূখ (রহিত বিধান) না জানলে ইসলামী শরীয়তের হালাল-হারামের সঠিক হুকুম নির্ধারণ অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং বাতিল হয়ে যাওয়া বিধান অনুযায়ী ফতোয়া দেওয়ার মারাত্মক ভ্রান্তি দেখা দেয়।
প্রশ্ন ৬: এই প্রশ্নোত্তরে কি ২০২৪ সালের মডেল টেস্টের সকল প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ সমাধান রয়েছে?
উত্তর: হ্যাঁ, এতে ২০২৪ সালের ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ১ম বর্ষ আল মাদখালু ইলা উলূমিল কুরআন পরীক্ষার সকল রচনামূলক ও সংক্ষিপ্ত প্রশ্নের শতভাগ হুবহু প্রশ্ন এবং গভীর বিশ্লেষণধর্মী একাডেমিক উত্তর সন্নিবেশিত রয়েছে।