اختبار السنة الأولى للفاضل (البكالوريوس) الشرف، لعام ۲۰۲۱م
[ফাজিল (স্নাতক) সম্মান প্রথম বর্ষ পরীক্ষা, ২০২১]
القرآن والدراسات الاسلامية [আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
المدخل إلى علوم القرآن
[আল-মাদখাল ইলা উলূমিল কুরআন]
বিষয় কোড: ২০ ১১ ০১
الوقت – ٤ ساعات [সময়—৪ ঘণ্টা] | الدرجات الكاملة – ٨٠ [পূর্ণমান—৮০]
الملاحظة: أجب عن أربعة من مجموعة (الف) وعن أربعة من مجموعة (ب)-
[দ্রষ্টব্য: (ক) অংশ থেকে চারটি এবং (খ) অংশ থেকে চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
مجموعة (الف) [(ক) অংশ]
الدرجات – ٤ × ١٥ = ٦٠ [মান—১৫ × ৪ = ৬০]
১- عرف علوم القرآن- ثم بين نشأتها وتطورها بالتفصيل-
[‘উলূমুল কুরআন’ এর সংজ্ঞা দাও। অতঃপর এর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ সবিস্তারে বর্ণনা কর।]
১. উলূমুল কুরআনের সংজ্ঞা (تعريف علوم القرآن):
শাব্দিক বিশ্লেষণ: ‘উলূমুল কুরআন’ (علوم القرآن) একটি যৌগিক শব্দমালা। ‘উলূম’ (علوم) শব্দটি ‘ইলম’ (علم)-এর বহুবচন, যার অর্থ জ্ঞান, বিজ্ঞান বা শাস্ত্র। আর ‘কুরআন’ (القرآن) হলো আল্লাহ তাআলার সেই শাশ্বত পবিত্র কালাম, যা জিবরীল (আ.)-এর মাধ্যমে শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ-এর ওপর অবতীর্ণ হয়েছে, মুসহাফে লিপিবদ্ধ হয়েছে এবং যা তিলাওয়াত করা ইবাদত।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: প্রখ্যাত মুফাসসির ও উলূমুল কুরআনের বিশেষজ্ঞ ইমাম বদরুদ্দীন যারকাশী (রহ.) ও আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.)-এর মতে—
«هُوَ عِلْمٌ يَتَنَاوَلُ الْأَبْحَاثَ الْمُتَعَلِّقَةَ بِالْقُرْآنِ الْكَرِيمِ مِنْ حَيْثُ نُزُولُهُ، وَكِتَابَتُهُ، وَجَمْعُهُ، وَتَرْتِيبُهُ، وَمَعْرِفَةُ مَكِّيِّهِ وَمَدَنِيِّهِ، وَنَاسِخِهِ وَمَنْسُوخِهِ، وَإِعْجَازُهُ، وَأَسْبَابُ نُزُولِهِ، وَتَفْسِيرُهُ، وَغَيْرُ ذَٰلِكَ»
অর্থাৎ: উলূমুল কুরআন হলো এমন একটি শাস্ত্র যা কুরআনুল কারীমের নাযিল, সংকলন, বিন্যাস, মাক্কী-মাদানী নির্ণয়, নাসিখ-মানসূখ, ই’জায বা অলৌকিকত্ব, শানে নুযূল, তাফসির এবং কিরাআত সংক্রান্ত যাবতীয় আনুষঙ্গিক গবেষণাধর্মী জ্ঞানকে অন্তর্ভুক্ত করে।
২. উলূমুল কুরআনের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ (نشأة علوم القرآن وتطورها):
উলূমুল কুরআনের বিকাশ মানব ইতিহাসের অন্যতম সুশৃঙ্খল শাস্ত্রীয় রূপান্তর। এর ঐতিহাসিক পর্যায়গুলো নিচে ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হলো:
১. নবুওয়াতের যুগ (عصر النبوة): এ যুগে উলূমুল কুরআন কোনো লিখিত শাস্ত্র ছিল না; বরং সাহাবায়ে কিরাম সরাসরি রাসুলুল্লাহ ﷺ থেকে ওহী নাযিলের প্রেক্ষাপট, আয়াতের অর্থ ও প্রয়োগ প্রত্যক্ষ করতেন। সাহাবাগণ বিশুদ্ধ আরবী ভাষার সহজাত পারদর্শী (আহলে লিসান) হওয়ায় কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন হলে রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজেই তা সমাধান করে দিতেন।
২. খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগ (عصر الخلفاء الراشدين): হযরত আবু বকর (রা.)-এর যুগে ইয়ামামার যুদ্ধে বহু হুফ্ফাজ সাহাবীর শাহাদাতের পর কুরআন একত্রীকরণ করা হয়। হযরত উসমান (রা.)-এর যুগে সাম্রাজ্য বিস্তৃতির প্রেক্ষিতে কিরাআতের বিভ্রান্তি দূর করতে কুরাইশ ভাষারীতিতে মুসহাফের একাধিক অনুলিপি তৈরি করে বিভিন্ন প্রদেশে পাঠানো হয়। এভাবেই رسم العثماني ও সংকলন বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপিত হয়।
৩. তাবেয়ীন ও তাবে-তাবেয়ীনের যুগ (عصر التابعين): বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলামী জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র গড়ে ওঠে। মক্কায় ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মাদরাসা (মুজাহিদ, আতা, ইকরিমা), মদীনায় উবাই ইবনে কাবের মাদরাসা (যায়েদ ইবনে আসলাম) এবং ইরাকে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদের মাদরাসা (হাসান বসরী, কাতাদাহ) তাফসির ও উলূমুল কুরআনের মৌলিক উপাদান সংকলন শুরু করেন।
৪. তৃতীয় ও চতুর্থ হিজরী শতক (শাস্ত্রীয় কিতাব প্রণয়ন): এ যুগে উলূমুল কুরআনের বিভিন্ন শাখা নিয়ে স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচিত হয়। যেমন: আলী ইবনুল মাদীনী রচনা করেন ‘আসবাবুন নুযূল’, আবু উবায়দ কাসিম ইবনে সাল্লাম রচনা করেন ‘নাসিখ ওয়াল মানসূখ’, এবং আবু বকর আল-বাক্বিল্লানী রচনা করেন ‘ই’জাযুল কুরআন’।
৫. স্বর্ণযুগ ও বিশ্বকোষীয় রূপদান: হিজরী সপ্তম ও অষ্টম শতকে উলূমুল কুরআন পূর্ণাঙ্গ সমন্বিত শাস্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ইমাম বদরুদ্দীন যারকাশী (রহ.) (ওফাত: ৭৯৪ হি.) রচনা করেন অমর বিশ্বকোষীয় গ্রন্থ ‘আল-বুরহান ফী উলূমিল কুরআন’। পরবর্তীতে আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.) (ওফাত: ৯১১ হি.) তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘আল-ইতক্বান ফী উলূমিল কুরআন’ রচনার মাধ্যমে এ শাস্ত্রকে গবেষণার শীর্ষ চূড়ায় অধিষ্ঠিত করেন।
২- تحدث عن جمع القرآن الكريم فى عهد أبى بكر (رض) وعثمان (رض)- وما الفرق فى جمع القرآن الكريم بينهما؟
[হযরত আবু বকর (রা) ও হযরত ওসমান (রা) এর যুগে আল-কুরআনুল কারীম একত্রীকরণ সম্পর্কে আলোচনা কর এবং আল-কুরআনুল কারীম একত্রীকরণে উভয়ের মধ্যে পার্থক্য কী?]
১. হযরত আবু বকর (রা.)-এর যুগে কুরআন সংকলন:
রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ওফাতের পর ভণ্ড নবীদের বিরুদ্ধে ১২ হিজরীতে সংঘটিত ঐতিহাসিক ইয়ামামার যুদ্ধে প্রায় ৭০ জন শীর্ষস্থানীয় হাফেজে কুরআন সাহাবী শাহাদাত বরণ করেন। এতে কুরআনের কোনো অংশ বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কায় হযরত উমর (রা.) খলিফা আবু বকর (রা.)-কে সম্পূর্ণ কুরআনকে গ্রন্থাকারে সংকলন করার জোর পরামর্শ দেন। প্রাথমিক দ্বিধার পর খলিফা আবু বকর (রা.) ওহী লেখক সাহাবী হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-কে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করেন।
সংকলন পদ্ধতি: যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) কেবল নিজের স্মৃতিশক্তির ওপর নির্ভর করেননি। তিনি দুটি শর্ত আরোপ করেন—আয়াতটি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সামনে লিখিত হতে হবে এবং অন্তত দুইজন ন্যায়পরায়ণ সাহাবীর মৌখিক সাক্ষ্য থাকতে হবে। এভাবে চামড়া, খেজুরের ডাল ও পাথরের টুকরোয় রক্ষিত লিখিত অংশগুলো যাচাই-বাছাই করে একটি সুসংহত পাণ্ডুলিপিতে (মুসহাফে) আবদ্ধ করা হয়। এ মুসহাফটি খলিফা আবু বকর (রা.), তাঁর ওফাতের পর হযরত উমর (রা.) এবং তাঁর ওফাতের পর উম্মুল মুমিনীন হাফসা (রা.)-এর সংরক্ষণে রাখা হয়।
২. হযরত উসমান (রা.)-এর যুগে কুরআন সংকলন:
হযরত উসমান (রা.)-এর খেলাফতকালে ২৫ হিজরীতে আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান অভিযানে মুসলিম বাহিনীর বিভিন্ন প্রদেশের সৈন্যরা একত্র হয়। সেখানে শামের সৈন্যরা উবাই ইবনে কাবের কিরাআতে এবং ইরাকের সৈন্যরা আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদের কিরাআতে পাঠ করছিল। কিরাআতের বৈচিত্র্যের কারণে তাদের মধ্যে তীব্র বিবাদ দেখা দেয় এবং একে অপরকে কাফের বলার উপক্রম হয়। এ ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখে সেনাপতি হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান (রা.) মদীনায় এসে খলিফা উসমান (রা.)-কে বলেন, “হে আমীরুল মুমিনীন! ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের মতো কিতাব নিয়ে বিভ্রান্ত হওয়ার আগেই এই উম্মতকে রক্ষা করুন।”
পদক্ষেপ: হযরত উসমান (রা.) হযরত হাফসা (রা.)-এর নিকট থেকে মূল মুসহাফটি আনেন এবং যায়েদ ইবনে সাবিত, আব্দুল্লাহ ইবনুয যুবায়ের, সাদ ইবনুল আস এবং আব্দুর রহমান ইবনুল হারিস (রা.)-কে নিয়ে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বোর্ড গঠন করেন। তাঁরা কুরাইশদের মূল ভাষারীতি অনুসারে মূল মুসহাফের হুবহু অনুলিপি তৈরি করেন এবং তা প্রধান প্রধান প্রাদেশিক রাজধানীতে পাঠিয়ে দেন। অবশিষ্ট ব্যক্তিগত বা অসম্পূর্ণ পাণ্ডুলিপিগুলো পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়ে সমগ্র উম্মতকে একটি প্রমিত লিপিতে ঐক্যবদ্ধ করেন।
৩. উভয় সংকলনের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্যসমূহ:
| পার্থক্যের বিষয় | হযরত আবু বকর (রা.)-এর সংকলন | হযরত উসমান (রা.)-এর সংকলন |
|---|---|---|
| ১. মূল কারণ ও প্রেক্ষাপট | ইয়ামামার যুদ্ধে বহু হাফেজ সাহাবীর শাহাদাতের পর কুরআন বিলুপ্তির আশঙ্কা দূর করা। | বিভিন্ন প্রদেশের সৈন্যদের মাঝে কিরাআতের মতভেদ ও পারস্পরিক বিবাদ দূর করা। |
| ২. সংকলনের প্রকৃতি | বিক্ষিপ্ত লিখিত উপকরণসমূহ একত্র করে একটি একক পাণ্ডুলিপিতে লিপিবদ্ধ করা। | আবু বকর (রা.)-এর সংরক্ষিত মূল পাণ্ডুলিপি থেকে একাধিক প্রমিত অনুলিপি প্রস্তুত করা। |
| ৩. হরফের বৈচিত্র্য | সাত হরফের (সবআতু আহরুফ) অবকাশ রেখে সংকলন করা হয়েছিল। | উম্মাহকে বিভ্রান্তি থেকে বাঁচাতে কুরাইশদের প্রমিত হরফ ও লিপিতে সীমাবদ্ধ রাখা হয়। |
| ৪. কপির সংখ্যা | মাত্র একটি মাস্টার কপি প্রস্তুত করা হয়েছিল। | একাধিক অনুলিপি প্রস্তুত করে প্রধান প্রধান মুসলিম সাম্রাজ্যে পাঠানো হয়। |
| ৫. ঐতিহাসিক উপাধি | হযরত আবু বকর (রা.) হলেন ‘জামেউল কুরআন’ (কুরআন একত্রকারী)। | হযরত উসমান (রা.) হলেন ‘জামেউল উম্মাহ আলাল কুরআন’ (উম্মতকে এক কুরআনে ঐক্যবদ্ধকারী)। |
৩- اكتب مراحل نزول القرآن الكريم منجما ومفرّقًا بالتفصيل-
[আল-কুরআনুল কারীম ধীরে ধীরে ও বিচ্ছিন্নভাবে অবতীর্ণ হওয়ার স্তরসমূহ সবিস্তারে লিখ।]
১. কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার স্তরসমূহ (مراحل نزول القرآن):
মুফাসসিরিনে কিরাম ও সাহাবায়ে কিরামের (বিশেষত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.) গবেষণায় প্রমাণিত যে, কুরআনুল কারীম দুটি প্রধান স্তরে অবতীর্ণ হয়েছে:
১. প্রথম স্তর: লাওহে মাহফুয থেকে বাইতুল ইযযাহ (اللَّوْحُ الْمَحْفُوظ إلى بَيْتِ الْعِزَّةِ):
কুরআন প্রথম পর্যায়ে লাওহে মাহফুয থেকে প্রথম আসমানের ‘বাইতুল ইযযাহ’ নামক স্থানে শবে কদরে এক সাথে সামগ্রিকভাবে অবতীর্ণ হয়। কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে— ﴿إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ﴾ (সূরা আল-ক্বদর: ১), এবং ﴿إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُّبَارَكَةٍ﴾ (সূরা আদ-দুখান: ৩)।
২. দ্বিতীয় স্তর: বাইতুল ইযযাহ থেকে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর (من بيت العزة إلى قلب النبي ﷺ):
বাইতুল ইযযাহ থেকে হযরত জিবরীল (আ.)-এর মাধ্যমে দীর্ঘ ২৩ বছরে মানবজাতির বাস্তব প্রেক্ষাপট ও ঘটনার প্রেক্ষিতে ধীরে ধীরে ও পর্যায়ক্রমে অবতীর্ণ হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন: ﴿وَقُرْآنًا فَرَقْنَاهُ لِتَقْرَأَهُ عَلَى النَّاسِ عَلَىٰ مُكْثٍ وَنَزَّلْنَاهُ تَنزِيلًا﴾ (সূরা বনী ইসরাঈল: ১০৬)।
২. ধীরে ধীরে ও বিচ্ছিন্নভাবে (মুনজ্জামান ও মুফাররাকান) নাযিল হওয়ার হিকমত ও তাৎপর্য:
মহান আল্লাহ পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবগুলোর মতো কুরআনকে এক সাথে অবতীর্ণ না করে ২৩ বছরে ধাপে ধাপে নাযিল করার পেছনে বহু সুদূরপ্রসারী হিকমত রয়েছে:
১. রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হৃদয়কে সুদৃঢ় করা (تثبيت فؤاد النبي ﷺ): কাফেরদের নিত্যনতুন উপহাস, মিথ্যা অপবাদ ও অত্যাচারের মুখে রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে সান্ত্বনা ও সাহস দিতে নিয়মিত ওহী নাযিল হতো। আল্লাহ বলেন: ﴿كَذَٰلِكَ لِنُثَبِّتَ بِهِ فُؤَادَكَ ۖ وَرَتَّلْنَاهُ تَرْتِيلًا﴾ (সূরা আল-ফুরকান: ৩২)।
২. সহজে মুখস্থকরণ ও ধারণ (تيسير حفظه وفهمه): সাহাবায়ে কিরাম ছিলেন উম্মী (নিরক্ষর)। এক সাথে পূর্ণ কিতাব নাযিল হলে তা মুখস্থ রাখা ও বিধান হৃদয়ঙ্গম করা অত্যন্ত দুরূহ হতো। ৫/১০ আয়াত করে নাযিল হওয়ায় তাঁরা তা সহজে আত্মস্থ করতেন।
৩. শরিয়তের বিধানাবলি ক্রমান্বয়ে কার্যকর করা (التدرج في التشريع): দীর্ঘদিনের জাহেলিয়াত ও বদভ্যাস (যেমন মদপান, ব্যভিচার, সুদ) এক দিনে দূর করা অসম্ভব ছিল। কুরআন পর্যায়ক্রমে বিধান এনে সমাজকে সংশোধন করেছে (যেমন মদের নিষেধাজ্ঞা চার ধাপে এসেছে)।
৪. সাময়িক ঘটনার সমাধান ও প্রশ্নের উত্তর দান: সাহাবীগণ বা বিরোধীরা যখন কোনো প্রশ্ন করত বা কোনো জটিল সামাজিক সংকট দেখা দিত (যেমন ইফকের ঘটনা, যিহারের মাসআলা), তখন তাৎক্ষণিক ওহী নাযিল হয়ে সমস্যার নির্ভুল সমাধান দিত।
৫. কুরআনের অলৌকিকত্ব প্রমাণ: দীর্ঘ ২৩ বছরের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে খণ্ড খণ্ডভাবে অবতীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও সমগ্র কুরআনের ভাষা, সুর ও বক্তব্যের মাঝে বিন্দুমাত্র বৈপরীত্য সৃষ্টি হয়নি; যা প্রমাণ করে এটি একমাত্র সর্বজ্ঞ আল্লাহরই বাণী।
৪- ماذا تفهم عن إعجاز القرآن الكريم؟ تحدث عن وجوه إعجازه بالإيضاح-
[ই’জাযুল কুরআনিল কারীম বলতে কী বুঝ? এর ই’জাযের বিভিন্ন দিক বিশদভাবে আলোচনা কর।]
১. ই’জাযুল কুরআনের পরিচয় (مفهوم إعجاز القرآن):
আভিধানিক অর্থ: ‘ই’জায’ (إعجاز) শব্দটি عجز ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ অন্যকে অক্ষম বা পরাভূত করা (إثبات العجز للغير)।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: নবুওয়াতের সত্যতা প্রমাণের লক্ষ্যে আল্লাহ তাআলা রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে এমন এক অনন্য কিতাব দান করেছেন, যার সমকক্ষ একটি আয়াত বা সূরা রচনা করতে সমগ্র সৃষ্টিজগত চ্যালেঞ্জের মুখেও চিরতরে ব্যর্থ ও অক্ষম প্রমাণিত হয়েছে। কুরআনের এই অপরাজেয় অলৌকিকত্ব ও মানবীয় শক্তির অতীত রূপকে ‘ই’জাযুল কুরআন’ বলে। কুরআন নিজেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে: ﴿قُل لَّئِنِ اجْتَمَعَتِ الْإِنسُ وَالْجِنُّ عَلَىٰ أَن يَأْتُوا بِمِثْلِ هَٰذَا الْقُرْآنِ لَا يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِيرًا﴾ (সূরা বনী ইসরাঈল: ৮৮)।
২. ই’জাযুল কুরআনের প্রধান দিকসমূহ (وجوه الإعجاز):
ইমাম বাক্বিল্লানী, খাত্তাবী ও সুয়ূতী (রহ.)-এর গবেষণায় কুরআনের ই’জাযের প্রধান দিকগুলো হলো:
১. ভাষাগত ও অলঙ্কারিক শ্রেষ্ঠত্ব (الإعجاز البياني واللغوي): আরবরা যখন তাদের সাহিত্য, গদ্য ও কবিতার অহংকারে শীর্ষ চূড়ায় ছিল, তখন কুরআন তাদের সবচেয়ে প্রাঞ্জল ছন্দ ও অলঙ্কারকে স্তব্ধ করে দেয়। কুরআনের শব্দচয়ন, ধ্বনিমাধুর্য, সংক্ষিপ্ততায় ভাবগাম্ভীর্য মানবীয় সাহিত্যের ধারণাতীত।
২. অদৃশ্যের সংবাদ দান (الإعجاز الإخباري الغيبي):
– অতীতের সঠিক ইতিহাস: পূর্ববর্তী ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিসমূহ (আদ, সামূদ, ফিরাউন) ও নবীদের এমন নিখুঁত বিবরণ দেওয়া হয়েছে যা কোনো নিরক্ষর মানুষের পক্ষে জানা অসম্ভব ছিল।
– ভবিষ্যতের অভ্রান্ত বাণী: রোমানদের পুনর্জয় (সূরা আর-রূম: ২-৪), বদরের যুদ্ধে বিজয়, মক্কা বিজয়ের মতো অসম্ভব ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটার বহু পূর্বেই কুরআনে সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎবাণী করা হয়েছিল এবং তা হুবহু বাস্তবায়িত হয়েছে।
৩. বৈজ্ঞানিক অলৌকিকত্ব (الإعجاز العلمي): আধুনিক যুগে আবিষ্কৃত বহু বৈজ্ঞানিক সত্য চৌদ্দশত বছর পূর্বে কুরআনে বর্ণিত হয়েছে। যেমন: ভ্রূণের ক্রমবিকাশ (সূরা মুমিনূন: ১২-১৪), মহাবিশ্বের সম্প্রসারণশীলতা (সূরা যারিয়াত: ৪৭), আকাশ ও পৃথিবীর আদি একক পিণ্ডাবস্থা ও বিগ ব্যাং (সূরা আম্বিয়া: ৩০), পর্বতমালার পেরেকসদৃশ ভারসাম্য রক্ষা ইত্যাদি।
৪. আইন ও বিধানের পূর্ণাঙ্গতা (الإعجاز التشريعي): কুরআনের বিধিবদ্ধ পারিবারিক, দেওয়ানি, ফৌজদারি ও আন্তর্জাতিক আইন এমন এক ভারসাম্যপূর্ণ ও চিরন্তন ইনসাফ কায়েম করেছে যা কোনো দার্শনিক বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর পক্ষে প্রণয়ন করা অসম্ভব।
৫. মানসিক ও আত্মিক প্রভাব: কুরআন তিলাওয়াত শুনলে মানুষের অন্তর বিগলিত হয় এবং এর প্রভাব মুসলিম-অমুসলিম সকলের আত্মাকে আন্দোলিত করে।
৫- ما معنى الوحى؟ ولم يحتاج إليه الانسان؟ بين شبهات الجاحدين للوحى مع الردّ عليهم-
[ওহি অর্থ কী? মানুষের জন্য কেন ওহির প্রয়োজন? ওহি অস্বীকারকারীদের সন্দেহসমূহ উদাহরণসহ বর্ণনা কর।]
১. ওহির অর্থ ও সংজ্ঞা:
আভিধানিক অর্থ: ‘ওহি’ (الوحي) শব্দের অর্থ الإشارة السريعة والإعلام الخفي অর্থাৎ অতি দ্রুত ও অত্যন্ত গোপনে কোনো সংকেত বা বার্তা পৌঁছে দেওয়া।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে মনোনীত কোনো নবীর ওপর কোনো প্রকার মাধ্যমসহ (জিবরীল আ.) বা মাধ্যম ব্যতীত যে ঐশী বাণী বা দিকনির্দেশনা প্রেরণ করেন, তাকে শরিয়তের পরিভাষায় ওহি বলা হয়।
২. মানুষের কেন ওহির প্রয়োজন? (حاجة الإنسان إلى الوحي):
মানুষের জ্ঞানার্জনের জন্য তিনটি প্রধান মাধ্যম রয়েছে: পঞ্চইন্দ্রিয়, বিবেক-বুদ্ধি এবং আসমানী ওহি।
১. ইন্দ্রিয় ও বুদ্ধির সীমাবদ্ধতা: ইন্দ্রিয় কেবল বাহ্যিক রূপ দেখতে পায়, আর বুদ্ধি কেবল দৃশ্যমান তথ্যের বিশ্লেষণ করতে পারে। কিন্তু পরকাল, রূহ, জান্নাত, জাহান্নাম, পাপ-পুণ্য এবং সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে ইন্দ্রিয় বা বুদ্ধি কোনো নিশ্চিত জ্ঞান দিতে পারে না। যেখানে বুদ্ধির সীমানা শেষ হয়, সেখান থেকেই ওহির যাত্রা শুরু হয়।
২. শাশ্বত জীবনব্যবস্থা ও নির্ভুল বিধান: মানব রচিত মতবাদ সর্বদা স্বার্থপরতা, ভুল ও অসম্পূর্ণতায় আক্রান্ত। মানবজাতিকে সঠিক পথের দিশা দিতে এবং শোষণমুক্ত ইনসাফপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণে ওহির কোনো বিকল্প নেই।
৩. ওহি অস্বীকারকারীদের প্রধান সন্দেহসমূহ ও তার দাঁতভাঙা জবাব:
প্রাচীন ও আধুনিক প্রাচ্যবিদ ও নাস্তিকরা ওহির বিরুদ্ধে মূলত তিনটি ভ্রান্ত দাবি উত্থাপন করে:
১. সন্দেহ ১: “ওহি ছিল রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর মানসিক বিভ্রম বা মৃগীরোগের লক্ষণ।”
জবাব: মৃগীরোগে আক্রান্ত ব্যক্তি অসংলগ্ন, এলোমেলো ও অপ্রকৃতিস্থ প্রলাপ বকে। পক্ষান্তরে ওহী নাযিলের পর রাসুলুল্লাহ ﷺ যে শাশ্বত জ্ঞানগর্ভ বাণী উপহার দিয়েছেন, তা পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ আইন, সাহিত্য ও দর্শনের জন্ম দিয়েছে। কোনো মানসিক রোগীর পক্ষে এমন অতুলনীয় সংবিধান রচনা অসম্ভব।
২. সন্দেহ ২: “তিনি কোনো খ্রিষ্টান বা ইহুদি পণ্ডিত (যেমন বুহাইরা বা ওরাকা ইবনে নওফেল) থেকে এগুলো শিখেছেন।”
জবাব: ওরাকা ইবনে নওফেলের সাথে নবুওয়াত লাভের পর মাত্র একবার দেখা হয়েছিল এবং এর কিছুদিন পরেই তিনি মারা যান। আর বুহাইরার সাথে শৈশবে মাত্র সামান্য সময়ের সাক্ষাৎ ঘটেছিল। মাত্র কয়েক ঘণ্টার আলাপে কোনো নিরক্ষর বালক সমগ্র বিশ্ব ইতিহাসের মহাকাব্যিক ওহী মুখস্থ করতে পারে না। তাছাড়া আরবরা নিজেরাও এর কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি।
৩. সন্দেহ ৩: “কুরআন মুহাম্মদের নিজস্ব প্রতিভাজাত চিন্তার ফসল।”
জবাব: যদি তাই হতো, তবে ওহী স্থগিত থাকার সময় (ফাতরাতুল ওহী) এবং ইফকের মিথ্যা অপবাদের সময় রাসুলুল্লাহ ﷺ এক মাস যাবৎ চরম মানসিক যন্ত্রণায় কাটিয়েছিলেন কেন? ওহি নিজের ক্ষমতাধীন হলে তিনি তাৎক্ষণিক আয়াত বানিয়ে দিতেন। কুরআন স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে: ﴿وَمَا يَنطِقُ عَنِ الْهَوَىٰ إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَىٰ﴾ (সূরা আন-নাজম: ৩-৪)।
৬- كيف تم تسمية سور القرآن الكريم وترتيبه؟ بين مفصلا ومدللا-
[কুরআন কারীমের সূরাসমূহের নামকরণ ও বিন্যাস কীভাবে হলো? দলিলসহ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা কর।]
১. কুরআন কারীমের সূরাসমূহের নামকরণ (تسمية السور):
কুরআনুল কারীমের ১১৪টি সূরার নামকরণ সম্পূর্ণভাবে তাওকীফী (توقيفي) অর্থাৎ স্বয়ং আল্লাহ তাআলার নির্দেশে রাসুলুল্লাহ ﷺ কর্তৃক নির্ধারিত। সাহাবায়ে কিরামের এতে কোনো নিজস্ব রায় ছিল না।
নামকরণের বিভিন্ন পদ্ধতি:
১. আলোচিত মৌলিক বিষয় বা ঘটনার ভিত্তিতে: যেমন সূরা বাক্বারা (গাভীর ঘটনা), সূরা ফীল (হাতিবাহিনীর ঘটনা), সূরা কাহাফ (গুহাবাসীর ঘটনা)।
২. সূরার প্রারম্ভিক শব্দের ভিত্তিতে: যেমন সূরা ইয়াসীন, সূরা আর-রহমান, সূরা আল-ওয়াক্বিআহ, সূরা কাফ।
৩. নবীদের পবিত্র নামের ভিত্তিতে: যেমন সূরা ইউনুস, সূরা হূদ, সূরা ইউসুফ, সূরা ইবরাহীম, সূরা মুহাম্মদ।
৪. একাধিক নাম: কোনো কোনো সূরার মাহাত্ম্যের কারণে একাধিক নাম রয়েছে। যেমন সূরা ফাতিহাকে উম্মুল কিতাব, আস-সাবউল মাছানী, সূরাতুশ শিফা ইত্যাদি বলা হয়।
২. সূরা ও আয়াতসমূহের বিন্যাসক্রম (ترتيب السور والآيات):
কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার সময়কাল এবং বর্তমান মুসহাফের লিখিত বিন্যাসের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে (নাযিল শুরু হয়েছিল সূরা আলাক্ব দিয়ে, কিন্তু মুসহাফ শুরু হয়েছে সূরা ফাতিহা দিয়ে)।
ক. আয়াতসমূহের বিন্যাস (ترتيب الآيات): সকল সাহাবী ও উম্মতের আলেমগণের সর্বসম্মত ঐকমত্যে আয়াতসমূহের পারস্পরিক বিন্যাস ১০০% তাওকীফী ও ওহীভিত্তিক। যখনই কোনো আয়াত নাযিল হতো, জিবরীল (আ.) বলে দিতেন অমুক সূরার অমুক আয়াতের পর এটি স্থাপন করুন।
খ. সূরাসমূহের বিন্যাস (ترتيب السور): অধিকাংশ জমহুর মুফাসসিরীন ও মুহাক্কিকদের (যেমন ইমাম যারকাশী, ইমাম সুয়ূতী ও ইবনুল আম্বারী) মতে— সূরাসমূহের বর্তমান ধারাবাহিক বিন্যাসও তাওকীফী। জিবরীল (আ.) প্রতি রমযানে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সাথে বর্তমান বিন্যাস অনুযায়ী কুরআন দাওর করতেন। ওফাতের বছর তিনি দুবার এ বিন্যাসে পূর্ণ কুরআন দাওর সম্পন্ন করেছিলেন। খলিফা উসমান (রা.) সাহাবায়ে কিরামের ঐকমত্যে সেই ওহীভিত্তিক মূল বিন্যাসেই মুসহাফ প্রস্তুত করেছিলেন।
مجموعة (ب) [(খ) অংশ]
الدرجات – ۲۰ = ٤ × ٥ [মান—৫ × ৪ = ২০]
৭- اكتب شروط المفسر-
[মুফাসসির এর শর্তসমূহ লিখ।]
মহান আল্লাহর কালামের ব্যাখ্যা প্রদান অত্যন্ত দায়িত্বশীল কাজ। ইমাম সুয়ূতী (রহ.) তাঁর ‘আল-ইতক্বান’ গ্রন্থে একজন বিজ্ঞ মুফাসসিরের জন্য ১৫টি প্রধান শর্ত ও যোগ্যতার উল্লেখ করেছেন। তার মধ্যে প্রধান শর্তসমূহ হলো:
১. বিশুদ্ধ আক্বীদা ও তাকওয়া: বিদআত, কুপ্রবৃত্তি ও গোঁড়ামিমুক্ত খাঁটি সহীহ সুন্নাহর অনুসারী হতে হবে।
২. আরবি ভাষা ও ব্যাকরণে পাণ্ডিত্য: ইলমে নাহব (সিনট্যাক্স), ইলমে সরফ (মরফোলজি) এবং লুগাত (অভিধান)-এ অগাধ দখল থাকতে হবে।
৩. অলঙ্কার শাস্ত্রে পারদর্শিতা: বালাগাত ও ফাসাহাত অর্থাৎ ইলমুল মাআনী, বায়ান ও বাদী’-র ওপর গভীর জ্ঞান থাকতে হবে।
৪. উলূমুল কুরআনের মূল শাখাগুলো জানা: আসবাবুন নুযূল, মাক্কী-মাদানী, নাসিখ-মানসূখ ও কিরাআতের জ্ঞান থাকা অপরিহার্য।
৫. হাদীস ও সুন্নাহর জ্ঞান: হাদিসের সনদ, মতন, সহীহ-যঈফ নির্ণয়ের ক্ষমতা থাকতে হবে; কারণ সুন্নাহ হলো কুরআনের প্রথম ব্যাখ্যা।
৬. উসূলে ফিকহ: আম-খাস, মুতলাক-মুকাইয়্যাদ এবং শরিয়তের হুকুম আহকাম উদ্ঘাটনের নীতিমালায় পারদর্শী হতে হবে।
৮- ما معنى السورة والآية وما الفرق بينهما؟
[সূরা ও আয়াতের অর্থ কী? উভয়ের মধ্যে পার্থক্য কী?]
১. সূরা (السورة):
– আভিধানিক অর্থ: প্রাচীর, মর্যাদা বা সুউচ্চ স্তর (سور المدينة)।
– পারিভাষিক অর্থ: কুরআনুল কারীমের এমন একটি স্বতন্ত্র নির্ধারিত অংশ, যার নির্দিষ্ট শুরু ও শেষ রয়েছে এবং যাতে অন্তত তিনটি আয়াত অন্তর্ভুক্ত থাকে। কুরআনে মোট ১১৪টি সূরা রয়েছে।
২. আয়াত (الآية):
– আভিধানিক অর্থ: নিদর্শন, প্রমাণ বা বিস্ময়কর চিহ্ন।
– পারিভাষিক অর্থ: কোনো সূরার অন্তর্ভুক্ত এক বা একাধিক পূর্ণাঙ্গ বাক্য বা শব্দসমষ্টি, যার প্রারম্ভ ও সমাপ্তি ওহী দ্বারা নির্ধারিত। কুরআনে মোট ৬,২৩৬টি আয়াত রয়েছে।
৩. উভয়ের মধ্যে পার্থক্য:
সূরা হলো একটি পূর্ণাঙ্গ অধ্যায় বা বৃহৎ পরিচ্ছেদ; আর আয়াত হলো সেই সূরার অন্তর্গত এক একটি ক্ষুদ্রতম বাক্য বা ইউনিট। একাধিক আয়াতের সমন্বয়ে একটি সূরা গঠিত হয়, কিন্তু কোনো সূরার সমন্বয়ে আয়াত গঠিত হয় না।
৯- ما معنى النسخ وكم قسما له؟ بين كل قسم بالاختصار-
[নাসখ অর্থ কী? তা কত প্রকার? প্রত্যেক প্রকার সংক্ষেপে আলোচনা কর।]
১. নাসখ (النسخ)-এর অর্থ:
– আভিধানিক অর্থ: কোনো কিছু দূর করা (الإزالة) অথবা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তর বা অনুলিপি করা (النقل)।
– পারিভাষিক সংজ্ঞা: শরিয়তের কোনো পূর্ববর্তী হুকুমকে পরবর্তীতে অবতীর্ণ অন্য কোনো শরয়ী দলিলের মাধ্যমে রহিত বা বাতিল করাকে নাসখ বলে।
২. নাসখের প্রকারভেদ:
কুরআনে নাসখ প্রধানত তিন প্রকার:
১. হুকুম মানসূখ কিন্তু তিলাওয়াত বহাল (نسخ الحكم وبقاء التلاوة): কুরআনে এর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। যেমন: স্বামীহারা বিধবার জন্য শুরুতে এক বছর ভরণপোষণের নির্দেশ ছিল (বাক্বারা: ২৪০), যা পরবর্তীতে চার মাস দশ দিনের হুকুম (বাক্বারা: ২৩৪) দ্বারা রহিত হয়েছে, কিন্তু উভয় আয়াতের তিলাওয়াত বহাল আছে।
২. তিলাওয়াত মানসূখ কিন্তু হুকুম বহাল (نسخ التلاوة وبقاء الحكم): যার পাঠ মুসহাফ থেকে রহিত করা হয়েছে কিন্তু বিধান শরিয়তে কার্যকর রয়েছে। যেমন: বিবাহিত ব্যভিচারীর জন্য রজম বা পাথর নিক্ষেপের শাস্তি।
৩. তিলাওয়াত ও হুকুম উভয়ই মানসূখ (نسخ التلاوة والحكم معاً): যার পাঠ এবং বিধান উভয়ই ওহী দ্বারা রহিত হয়েছে। যেমন: হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণিত দশবার দুধপানের মাধ্যমে হুরমত সাব্যস্ত হওয়ার বিধান।
১০- اكتب مميزات الاتقان فى علوم القرآن-
[الاتقان فى علوم القرآن এর বৈশিষ্ট্যগুলো লিখ।]
আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.) রচিত ‘আল-ইতক্বান ফী উলূমিল কুরআন’ হলো উলূমুল কুরআনের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ও প্রামাণ্য বিশ্বকোষ। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ হলো:
১. ৮০টি মৌলিক অধ্যায়ের সমন্বয়: উলূমুল কুরআনের প্রায় প্রতিটি সূক্ষ্ম শাখাকে তিনি ৮০টি সুবিন্যস্ত অধ্যায়ে (নও’ বা প্রকারে) বিন্যস্ত করেছেন।
২. পূর্ববর্তী সকল কিতাবের নির্যাস: ইমাম যারকাশীর ‘বুরহান’সহ সালাফদের রচিত শত শত দুর্লভ কিতাবের উদ্ধৃতি ও গভীর তাহকীক এতে সন্নিবেশিত হয়েছে।
৩. বিশুদ্ধ সনদ ও প্রামাণ্য উদ্ধৃতি: প্রতিটি বর্ণনার ক্ষেত্রে বিশ্বস্ত হাদীস, সাহাবী ও তাবেয়ীদের বক্তব্য নিখুঁতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
৪. ভাষাতাত্ত্বিক ও সাহিত্যিক উৎকর্ষ: আরবি ব্যাকরণ, শব্দার্থ ও বালাগাতের কঠিন মাসআলাগুলো সহজ-সরল ও প্রাঞ্জল ভাষায় সমাধান করা হয়েছে।
৫. পরবর্তী যুগের গবেষকদের একমাত্র নির্ভরতা: সমকালীন ও আধুনিক সকল তাফসির ও উলূমুল কুরআন গবেষকদের জন্য এটি অপরিহার্য মূল রেফারেন্স গ্রন্থ।
১১- تحدث عن اخر ما نزل من القرآن الكريم-
[আল-কুরআনুল কারীমের শেষে অবতীর্ণ সম্পর্কে আলোচনা কর।]
কুরআনুল কারীমের সর্বশেষ অবতীর্ণ আয়াত সম্পর্কে সাহাবায়ে কিরাম ও মুফাসসিরদের মধ্যে কয়েকটি প্রসিদ্ধ মত রয়েছে:
১. সর্বাধিক বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য মত: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী কুরআনের সর্বশেষ অবতীর্ণ আয়াত হলো সূরা আল-বাক্বারার ২৮১ নম্বর আয়াত—
﴿وَاتَّقُوا يَوْمًا تُرْجَعُونَ فِيهِ إِلَى اللَّهِ ۖ ثُمَّ تُوَفَّىٰ كُلُّ نَفْسٍ مَّا كَسَبَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ﴾
“আর তোমরা সেই দিনকে ভয় করো, যেদিন তোমাদেরকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। অতঃপর প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার উপার্জনের পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া হবে এবং তাদের ওপর কোনো জুলুম করা হবে না।” ইমাম বুখারী ও মুসলিম এ মতটিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এ আয়াত নাযিলের মাত্র ৯ বা ২১ দিন পর রাসুলুল্লাহ ﷺ ওফাত লাভ করেন।
২. অন্যান্য অভিমত:
– সূদের আয়াত (সূরা বাক্বারা: ২৭৮)।
– কালালাহ সংক্রান্ত আয়াত (সূরা নিসা: ১৭৬)।
– সূরা আন-নাসর (إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللَّهِ وَالْفَتْحُ)।
– বিদায় হজের দিন আরাফার ময়দানে নাযিলকৃত আয়াত: ﴿الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ﴾। তবে বিজ্ঞ মুফাসসিরদের মতে এটি হালাল-হারামের বিধান পূর্ণতার শেষ আয়াত, আর সম্পূর্ণ ওহীর ধারাবাহিকতার শেষ আয়াত হলো সূরা বাক্বারার ২৮১ নম্বর আয়াত।
১২- تحدث عن خصائص القرآن الكريم والحديث القدسى والحديث النبوى-
[আল-কুরআনুল কারীম, আল-হাদীসুল কুদসি ও আল-হাদীসুন নাবাবীর বৈশিষ্ট্য আলোচনা কর।]
ইসলামী শরিয়তে এই তিনটি মূল উৎসের বৈশিষ্ট্য ও পার্থক্য নিম্নরূপ:
| তুলনার ক্ষেত্র | কুরআনুল কারীম (القرآن الكريم) | হাদীসে কুদসী (الحديث القدسي) | হাদীসে নাবাবী (الحديث النبوي) |
|---|---|---|---|
| ১. শব্দ ও অর্থ | শব্দ ও অর্থ উভয়ই স্বয়ং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ওহী মাতলূ হিসেবে নাযিলকৃত। | অর্থ আল্লাহর পক্ষ থেকে, কিন্তু শব্দ ও ভাষা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নিজস্ব। | শব্দ ও ভাষা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর এবং অর্থ ওহী গায়রে মাতলূ বা ইজতিহাদের ভিত্তিতে। |
| ২. ই’জায বা অলৌকিকত্ব | সম্পূর্ণ মু’জিযাহ এবং এর সমকক্ষ আয়াত রচনায় মানুষ চিরতরে অক্ষম। | এর কোনো চ্যালেঞ্জ বা সরাসরি ভাষাগত মু’জিযাহ নেই। | কোনো মু’জিযাহ বা রচনার চ্যালেঞ্জ নেই। |
| ৩. সালাতে পাঠ ও ইবাদত | তিলাওয়াত করা স্বতন্ত্র ইবাদত এবং সালাতের ভিতর তিলাওয়াত ফরজ। | সালাতে পাঠ করা জায়েজ নয় এবং হরফে দশ নেকির বিধান প্রযোজ্য নয়। | সালাতে তিলাওয়াত করা নিষিদ্ধ। |
| ৪. স্পর্শ ও তাহরাত | অজু ছাড়া স্পর্শ করা সাধারণ অবস্থায় নিষেধ। | অজু ব্যতীত স্পর্শ করা ও বহন করা জায়েজ। | অজু ছাড়া স্পর্শ করা সম্পূর্ণ জায়েজ। |
| ৫. সূত্র ও প্রামাণিকতা | শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি হরফ ‘মুতাওয়াতির’ সূত্রে সন্দেহাতীতভাবে সংরক্ষিত। | সনদের দিক থেকে সহীহ, হাসান কিংবা যঈফ হতে পারে। | সনদের মানের দিক থেকে সহীহ, হাসান বা যঈফ হতে পারে। |
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: ফাজিল ১ম বর্ষের উলূমুল কুরআন পরীক্ষার বিষয় কোড কত?
আল-মাদখাল ইলা উলূমিল কুরআন বিষয়ের নির্ধারিত বিষয় কোড হলো ২০১১০১। এটি ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ১ম বর্ষের প্রথম আবশ্যকীয় পত্র।
প্রশ্ন ২: উলূমুল কুরআনের শ্রেষ্ঠ দুটি প্রামাণ্য কিতাব কী কী?
উলূমুল কুরআনের শীর্ষ দুটি বিশ্বকোষীয় গ্রন্থ হলো ইমাম বদরুদ্দীন যারকাশী রচিত ‘আল-বুরহান ফী উলূমিল কুরআন’ এবং আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী রচিত ‘আল-ইতক্বান ফী উলূমিল কুরআন’।
প্রশ্ন ৩: হযরত উসমান (রা.)-কে কেন ‘জামেউল উম্মাহ’ বলা হয়?
হযরত উসমান (রা.) মুসলিম উম্মাহকে বিভিন্ন প্রদেশের কিরাআতের দ্বন্দ্ব থেকে রক্ষা করে কুরাইশ ভাষারীতি অনুসারে সংকলিত একটি প্রমিত মুসহাফের ওপর ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন।
প্রশ্ন ৪: কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার প্রধান দুটি স্তর কী?
প্রথম স্তর হলো লাওহে মাহফুয থেকে প্রথম আসমানের বাইতুল ইযযাহতে কদরের রাতে এক সাথে নাযিল হওয়া, এবং দ্বিতীয় স্তর হলো বাইতুল ইযযাহ থেকে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর দীর্ঘ ২৩ বছরে পর্যায়ক্রমে নাযিল হওয়া।
প্রশ্ন ৫: কুরআনের সর্বশেষ অবতীর্ণ আয়াত কোনটি?
সর্বাধিক বিশুদ্ধ মতানুযায়ী সূরা আল-বাক্বারার ২৮১ নম্বর আয়াতটি (واتقوا يوما ترجعون فيه إلى الله) রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ওফাতের মাত্র কয়েকদিন পূর্বে সর্বশেষ অবতীর্ণ হয়েছিল।
প্রশ্ন ৬: কুরআন ও হাদীসে কুদসীর মূল পার্থক্য কী?
কুরআনের শব্দ ও অর্থ উভয়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ এবং তা তিলাওয়াত করা ফরজ ইবাদত; আর হাদীসে কুদসীর অর্থ আল্লাহর হলেও শব্দচয়ন রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর এবং তা সালাতে পাঠ্য নয়।