অর্থনীতি ও ইসলামি অর্থনীতি (Economics and Islamic Economics) – 201106, আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ১ম বর্ষ পরীক্ষা ২০২২

StudyBoi StudyBoi
2026-09-22
৫৭ মিনিট পড়ার সময়
১ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন

ফাজিল স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষ পরীক্ষা, ২০২২
আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয় কোড: ২০ ১১ ০৬
(অর্থনীতি ও ইসলামি অর্থনীতি)
সময়—৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান—৮০

[দ্রষ্টব্য: ডান পাশে উল্লিখিত সংখ্যা প্রশ্নের পূর্ণমান জ্ঞাপক। প্রত্যেক বিভাগ থেকে চারটি করে প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।]


ক বিভাগ—রচনামূলক প্রশ্ন

মান—১৫ × ৪ = ৬০


১। ইসলামি অর্থনীতির সংজ্ঞা দাও। ইসলামি অর্থনীতির বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনা কর। (৫+১০=১৫)

[Define Islamic Economics. Discuss the characteristics of Islamic Economics.]

১. ইসলামি অর্থনীতির সংজ্ঞা (Definition of Islamic Economics):
ইসলামি অর্থনীতি হলো এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যা কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াসের অমোঘ নির্দেশনার আলোকে মানুষের বৈষয়িক প্রয়োজন পূরণ, সম্পদের ন্যায়সঙ্গত বণ্টন এবং আখিরাতের চূড়ান্ত মুক্তির লক্ষ্যে পরিচালিত হয়।
– ড. এম. এ. মান্নান-এর মতে: “Islamic Economics is a social science which studies the economic problems of a people imbued with the values of Islam.” অর্থাৎ: “ইসলামি অর্থনীতি এমন একটি সামাজিক বিজ্ঞান যা ইসলামের মূল মূল্যবোধে সঞ্জীবিত মানুষের অর্থনৈতিক সমস্যাবলি অধ্যয়ন করে।”
– অধ্যাপক খুরশীদ আহমদ-এর ভাষায়: “ইসলামি অর্থনীতি হলো শরিয়তের আলোকে মানুষের বস্তুগত সম্পদ আহরণ ও ব্যবহারের এমন এক সুশৃঙ্খল প্রয়াস, যার মাধ্যমে ন্যায়বিচার, ইনসাফ ও সামগ্রিক মানবকল্যাণ (ফালাহ) অর্জিত হয়।”
সংক্ষেপে, আল্লাহর সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে যাবতীয় হারাম ও শোষণমূলক কার্যকলাপ (যেমন সুদ, জুয়া, প্রতারণা) বর্জন করে হালাল উপায়ে অর্থোপার্জন ও মানবকল্যাণে ব্যয়ের সামগ্রিক বিজ্ঞানই হলো ইসলামি অর্থনীতি।

২. ইসলামি অর্থনীতির বৈশিষ্ট্যসমূহ (Characteristics of Islamic Economics):
ইসলামি অর্থনীতি মানব রচিত পুঁজিবাদ বা সমাজতন্ত্র থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ নিচে আলোচনা করা হলো:
১. ঐশী উৎস ও মূলভিত্তি (Divine Origin): এর মূল উৎস হলো আসমানী ওহী—আল-কুরআন এবং সুন্নাহ। ফলে এটি কোনো ব্যক্তি বা শ্রেণির সংকীর্ণ স্বার্থে রচিত নয়, বরং সর্বজনীন ও শাশ্বত।
২. সম্পদের প্রকৃত মালিকানা আল্লাহর (Ultimate Ownership of Allah): ইসলামে আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সকল সম্পদের নিরঙ্কুশ ও সার্বভৌম মালিকানা মহান আল্লাহর (﴿لِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ﴾)। মানুষ এখানে কেবল আল্লাহর প্রতিনিধি বা আমানতদার (Trustee) হিসেবে সম্পদ ভোগ ও পরিচালনা করে।
৩. সুদমুক্ত অর্থনৈতিক কাঠামো (Riba-free Economy): ইসলামে সুদ (রিসা) কঠোরভাবে হারাম ও নিষিদ্ধ (﴿وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا﴾)। সুদের পরিবর্তে লাভ-লোকসানের অংশীদারিত্ব (Profit-Loss Sharing) এবং প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের ওপর অর্থনৈতিক গতিশীলতা নির্ভর করে।
৪. যাকাত ও সাদাকাহর বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা (Zakat System): ধনীদের উদ্বৃত্ত সম্পদ থেকে নির্দিষ্ট হারে যাকাত আদায় করে গরিব ও দুস্থদের পুনর্বাসনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যা সমাজের অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে।
৫. হালাল ও হারামের সুস্পষ্ট সীমারেখা (Halal and Haram Framework): কেবল মুনাফা অর্জনই শেষ কথা নয়; উপার্জনের পন্থা ও ভোগের ক্ষেত্র অবশ্যই শরিয়তসম্মত (হালাল) হতে হবে। মদ, জুয়া, মজুতদারি, চোরাচালান, কালোবাজারি ও অনৈতিক ব্যবসা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
৬. সম্পদের সুষম বণ্টন ও ব্যক্তিমালিকানার স্বীকৃতি: ব্যক্তি তার বৈধ উপার্জিত সম্পদের মালিকানা লাভ করতে পারে, তবে সম্পদ যেন কতিপয় ধনীর হাতে কুক্ষিগত না থাকে সে জন্য কঠোর বিধান (উত্তরাধিকার আইন, ওয়াকফ) রয়েছে।
৭. নৈতিকতা ও বস্তুবাদিতার অপূর্ব সমন্বয়: এটি কেবল বৈষয়িক লাভ-লোকসানের বিজ্ঞান নয়; প্রতিটি অর্থনৈতিক কর্মের সাথে আখিরাতের জবাবদিহিতা ও তাকওয়ার সম্পর্ক যুক্ত।


২। ইসলামি ভোক্তা কাকে বলে? একজন ইসলামি ভোক্তা ও সাধারণ ভোক্তার মধ্যে পার্থক্য আলোচনা কর। (৫+১০=১৫)

[What do you mean by Islamic consumer? Distinguish between an Islamic consumer and conventional consumer.]

১. ইসলামি ভোক্তার ধারণা (Concept of Islamic Consumer):
যে ভোক্তা তার ভোগের যাবতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ইসলামী শরিয়তের বিধিবিধান, হালাল-হারামের সীমারেখা, নৈতিক দায়িত্ববোধ এবং পরকালীন জবাবদিহিতাকে প্রাধান্য দেয়, তাকে ‘ইসলামি ভোক্তা’ (Islamic Consumer) বলা হয়। ইসলামি ভোক্তা কেবল বস্তুগত সুখ বা নিজের উপযোগ সর্বোচ্চকরণে (Utility Maximization) মত্ত থাকে না; বরং সে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও সমাজের কল্যাণ সাধনের মাধ্যমে দ্বি-জাগতিক কল্যাণ (ফালাহ) অর্জনের লক্ষ্যে সম্পদ ভোগ করে।

২. ইসলামি ভোক্তা ও গতানুগতিক (সাধারণ) ভোক্তার মধ্যে পার্থক্য:

পার্থক্যের বিষয় ইসলামি ভোক্তা (Islamic Consumer) সাধারণ/গতানুগতিক ভোক্তা (Conventional Consumer)
১. মূল লক্ষ্য ও দর্শন দ্বি-জাগতিক সাফল্য ও আল্লাহর সন্তুষ্টি (Falah) অর্জন মূল লক্ষ্য। কেবলমাত্র পার্থিব সর্বোচ্চ উপযোগ (Utility Maximization) অর্জন মূল লক্ষ্য।
২. দ্রব্যের পছন্দ ও নির্বাচন পছন্দের ক্ষেত্র কঠোরভাবে শরিয়তসম্মত হালাল পণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আনন্দ ও তৃপ্তি থাকলে হালাল-হারাম বিচার না করে যেকোনো পণ্য গ্রহণ করে।
৩. ভোগ সংক্রান্ত নৈতিক সীমা অপব্যয় (ইসরাফ), অপচয় (তাবযীর) ও কৃপণতা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। আয়ের সামর্থ্য থাকলে অবাধ বিলাসিতা বা কৃপণতা ব্যক্তির সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ইচ্ছা।
৪. সামাজিক দায়বদ্ধতা স্বীয় ভোগের পাশাপাশি যাকাত, সাদাকাহ ও প্রতিবেশীর অধিকার আদায় ঈমানী দায়িত্ব। সমাজকল্যাণ বা পরোপকার ঐচ্ছিক, এতে কোনো ধর্মীয় বা আইনগত বাধ্যবাধকতা নেই।
৫. উপযোগের ব্যাপ্তি উপযোগ ইহলৌকিক ভোগ এবং পারলৌকিক প্রতিদান—উভয় জগতের সমষ্টি। উপযোগ কেবল ইহলৌকিক ও তাৎক্ষণিক বস্তুগত তৃপ্তির ওপর নির্ভরশীল।
৬. যুক্তিবাদিতা (Rationality) শরিয়ত ও আখিরাতের জবাবদিহিতার মানদণ্ডে যৌক্তিক আচরণ নির্ধারিত হয়। স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক লাভের ভিত্তিতে যৌক্তিকতা সংজ্ঞায়িত হয়।

৩। চাহিদা সূচি ও চাহিদা রেখার পার্থক্য নির্ণয় কর। একটি কাল্পনিক চাহিদা সূচি থেকে চাহিদা রেখা অঙ্কন কর। (৫+১০=১৫)

[Distinguish between demand schedule and demand curve. Draw a demand curve from an imaginary demand schedule.]

১. চাহিদা সূচি ও চাহিদা রেখার পার্থক্য (Difference between Demand Schedule and Demand Curve):
– চাহিদা সূচি (Demand Schedule): অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে বিভিন্ন দামে কোনো দ্রব্যের যে বিভিন্ন পরিমাণ চাহিদা হয়, তা যখন একটি গাণিতিক বা সংখ্যাসূচক তালিকার মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়, তাকে চাহিদা সূচি বলে। এটি চাহিদাবিধির সংখ্যাগত প্রকাশ।
– চাহিদা রেখা (Demand Curve): বিভিন্ন দামে কোনো দ্রব্যের চাহিদার পরিমাণকে যখন জ্যামিতিক চিত্রের মাধ্যমে রেখায় প্রকাশ করা হয়, তাকে চাহিদা রেখা বলে। এটি চাহিদাবিধির রৈখিক বা জ্যামিতিক রূপ।
– প্রধান পার্থক্য: চাহিদা সূচি হলো ছক বা সারণিভিত্তিক টেবিল, আর চাহিদা রেখা হলো স্থানাঙ্ক ব্যবস্থার (অক্ষদ্বয়ের) ভিত্তিতে অঙ্কিত একটি বাম থেকে ডানে নিম্নগামী জ্যামিতিক রেখা।

২. কাল্পনিক চাহিদা সূচি (An Imaginary Demand Schedule):

প্রতি একক দ্রব্যের দাম (টাকা) [P] চাহিদার পরিমাণ (একক) [Q] বিন্দুসমূহ
১০ ৪০ A
২০ ৩০ B
৩০ ২০ C
৪০ ১০ D

৩. চাহিদা রেখা অঙ্কন ও বিশ্লেষণ (Diagram Description):
ভূমি অক্ষে (OX) চাহিদার পরিমাণ এবং লম্ব অক্ষে (OY) দ্রব্যের দাম নির্দেশ করা হলো।
– যখন দাম ১০ টাকা, তখন চাহিদার পরিমাণ ৪০ একক, যা চিত্রে ‘A’ বিন্দু দ্বারা চিহ্নিত।
– দাম বৃদ্ধি পেয়ে ২০ টাকা হলে চাহিদা কমে ৩০ একক হয় (‘B’ বিন্দু)।
– দাম আরো বেড়ে ৩০ টাকা ও ৪০ টাকা হলে চাহিদা যথাক্রমে ২০ ও ১০ এককে নেমে আসে (‘C’ ও ‘D’ বিন্দু)।
– এখন A, B, C এবং D বিন্দুগুলো যোগ করলে DD’ চাহিদা রেখা পাওয়া যায়।
রেখার ঢাল বিশ্লেষণ: দাম ও চাহিদার পরিমাণের মধ্যে বিপরীতমুখী সম্পর্ক থাকার কারণে DD’ চাহিদা রেখাটি বাম থেকে ডান দিকে নিম্নগামী হয়েছে, যা অর্থনীতিতে চিরন্তন ‘চাহিদাবিধি’ (Law of Demand)-কে নির্ভুলভাবে প্রমাণ করে।


৪। ইসলামি ব্যাংক ও গতানুগতিক ব্যাংকের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ কর। সংক্ষেপে ইসলামি ব্যাংক উদ্ভাবনের ক্রম-ইতিহাস বর্ণনা কর। (৫+১০=১৫)

[Make a distinction between Islamic bank and conventional bank. Briefly discuss the history of foundation of Islamic bank.]

১. ইসলামি ব্যাংক ও গতানুগতিক ব্যাংকের পার্থক্য:

বৈশিষ্ট্য ইসলামি ব্যাংক (Islamic Bank) গতানুগতিক ব্যাংক (Conventional Bank)
১. মূলভিত্তি ও আদর্শ ইসলামী শরিয়াহ এবং কুরআন-সুন্নাহর বিধানের ওপর প্রতিষ্ঠিত। মানব রচিত পুঁজিবাদী ব্যাংকিং আইন ও সেক্যুলার দর্শনে পরিচালিত।
২. সুদের অবস্থান সুদ (Riba) সম্পূর্ণরূপে বর্জনীয় ও নিষিদ্ধ। সুদই ব্যাংকের যাবতীয় লেনদেন, আমানত ও ঋণের প্রাণকেন্দ্র।
৩. বিনিয়োগ পদ্ধতি মুদারাবা, মুশারাকা, মুরাবাহা, ইজারা ইত্যাদি অংশীদারিত্ব ও বিক্রয়ভিত্তিক। নির্দিষ্ট সুদের হারে ঋণ প্রদান এবং বন্ধকী ব্যবস্থা।
৪. লাভ ও লোকসান বণ্টন লাভ ও লোকসান ঝুঁকি গ্রাহক এবং ব্যাংক উভয়ের মধ্যে আনুপাতিক হারে বণ্টিত হয়। ব্যাংক পূর্বে নির্ধারিত হারে নিশ্চিত সুদ গ্রহণ করে; ব্যবসায় লাভ-লোকসানের কোনো ঝুঁকি নেয় না।
৫. শরিয়াহ তদারকি স্বাধীন শরিয়াহ সুপারভাইজরি বোর্ড দ্বারা প্রতিটি লেনদেন নিয়ন্ত্রিত হয়। শরিয়াহ বোর্ডের কোনো অস্তিত্ব বা বাধ্যবাধকতা নেই।
৬. সামাজিক কল্যাণ ও যাকাত যাকাত ফান্ড পরিচালনা ও সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণ বাধ্যতামূলক লক্ষ্য। কেবলমাত্র নিজস্ব বাণিজ্যিক মুনাফা সর্বোচ্চকরণই মূল লক্ষ্য।

২. ইসলামি ব্যাংক উদ্ভাবনের সংক্ষিপ্ত ক্রম-ইতিহাস:
১. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ইসলামের স্বর্ণযুগে বাইতুল মাল ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে কিরাত (মুদারাবা) ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। কিন্তু ঔপনিবেশিক শাসনের ফলে উনবিংশ শতাব্দীতে মুসলিম বিশ্বে পাশ্চাত্য সুদভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া হয়। ফলে মুসলিম সমাজ এক গভীর সংকটে পতিত হয়।
২. মিটগামার প্রকল্প (১৯৬৩): আধুনিক যুগে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের প্রথম সফল প্রায়োগিক রূপ ঘটে ১৯৬৩ সালে মিশরের ‘মিটগামার’ (Mit Ghamr) নামক পল্লী এলাকায় ড. আহমদ আল-নাজ্জারের নেতৃত্বে সঞ্চয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে, যা সুদমুক্ত পদ্ধতিতে কৃষকদের ঋণ ও অংশীদারিত্ব প্রদান করত।
৩. ওআইসি ও আইডিবি প্রতিষ্ঠা (১৯৭৪–১৯৭৫): ১৯৭৪ সালে ওআইসি (OIC) পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্মেলনে সুদমুক্ত আন্তর্জাতিক ব্যাংকের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং ১৯৭৫ সালে সৌদি আরবের জেদ্দায় ‘ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক’ (IDB) আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে।
৪. প্রথম বেসরকারি বাণিজ্যিক ইসলামি ব্যাংক: ১৯৭৫ সালেই সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক ইসলামি ব্যাংক—’দুবাই ইসলামিক ব্যাংক’। এরপর কুয়েত ফাইন্যান্স হাউস (১৯৭৭), ফয়সাল ইসলামিক ব্যাংক ইত্যাদি প্রতিষ্ঠিত হয়।
৫. বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকিং: ১৯৮৩ সালের ৩০ মার্চ বাংলাদেশে এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় প্রথম বেসরকারি পূর্ণাঙ্গ সুদমুক্ত ব্যাংক হিসেবে ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড’ (IBBL) প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পরবর্তীতে বৈশ্বিক মানে সাফল্য লাভ করে।


৫। মূল্য নিয়ন্ত্রণে ইসলামি সরকারের ভূমিকা আলোচনা কর। (১৫)

[Describe the role of an Islamic Government in controlling price.]

ভূমিকা:
ইসলামে স্বাভাবিক অবস্থায় বাজার ব্যবস্থাকে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে, যেখানে পণ্যের চাহিদা ও জোগানের স্বাভাবিক মিথস্ক্রিয়ায় মূল্য নির্ধারিত হয়। রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: “নিশ্চয় আল্লাহই মূল্য নির্ধারণকারী, সংকীর্ণকারী ও প্রশস্তকারী।” তবে যখন বাজারে কৃত্রিম সংকট, মজুতদারি, চোরাচালান বা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে জনসাধারণের ওপর জুলুম করা হয়, তখন সাধারণ নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষার্থে ইসলামি সরকারের জন্য বাজারে হস্তক্ষেপ করা ও মূল্য নিয়ন্ত্রণ (আত-তাস’ঈর / التسعير) করা কেবল জায়েজই নয়, বরং অপরিহার্য দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়।

মূল্য নিয়ন্ত্রণে ইসলামি সরকারের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা:

১. মজুতদারি ও কালোবাজারি প্রতিরোধ (Eradication of Hoarding – احتكار):
মজুতদারি ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “মজুতদার ব্যক্তি পাপী ও অভিশপ্ত” (সহীহ মুসলিম)। ইসলামি সরকার কঠোর নজরদারির মাধ্যমে বাজারে পণ্য আটকে রেখে দাম বাড়ানোর অপচেষ্টা গুঁড়িয়ে দেবে এবং প্রয়োজনে জব্দকৃত পণ্য ন্যায্যমূল্যে বিক্রির নির্দেশ দেবে।

২. ওজন ও পরিমাপে কারচুপি রোধ:
কুরআনে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে: ﴿وَأَوْفُوا الْكَيْلَ إِذَا كِلْتُمْ وَزِنُوا بِالْقِسْطَاسِ الْمُسْتَقِيمِ﴾ (সূরা বনী ইসরাঈল: ৩৫)। ইসলামি প্রশাসন পণ্যের গুণগত মান ও ওজনে কম দেওয়া রোধ করতে নিয়মিত পরিদর্শন চালাবে।

৩. হিসবাহ ব্যবস্থা বা বাজার তদারকি (Al-Hisbah System):
ইসলামি শাসনব্যবস্থায় ‘মুহতাসিব’ (Ombudsman) নামক বিশেষ বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তার নেতৃত্বে বাজার পরিদর্শনের স্থায়ী ব্যবস্থা থাকে। খলিফা হযরত উমর (রা.) নিজে বাজারে গিয়ে ব্যবসায়ীদের পণ্যের মূল্য ও মান তদারকি করতেন।

৪. কৃত্রিম সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ:
গ্রামের কৃষকদের থেকে কম দামে পণ্য কিনতে শহরে আসার আগেই পথিমধ্যে পণ্য কিনে নেওয়ার প্রক্রিয়াকে রাসুলুল্লাহ ﷺ নিষিদ্ধ করেছেন (نهى عن تلقي الركبان)। ইসলামি সরকার মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেট ভেঙে উৎপাদক ও ভোক্তার সরাসরি সংযোগ স্থাপন করবে।

৫. জরুরি অবস্থায় ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ (Price Ceiling – التسعير العادل):
ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) তাঁর বিখ্যাত ‘আল-হিসবাহ ফিল ইসলাম’ গ্রন্থে লিখেছেন, অসাধু ব্যবসায়ীরা যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে অতিরিক্ত মুনাফা লাভের জন্য অতিমূল্য ধার্য করে, তবে শাসক জনসাধারণের ক্ষতি দূর করতে বাধ্যবাধকতামূলকভাবে ‘ন্যায্যমূল্য’ (ثمن المثل) বেঁধে দেবেন।

৬. বিকল্প জোগান বৃদ্ধি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ:
ইসলামি সরকার সরকারি গুদাম থেকে ন্যায্যমূল্যে জরুরি খাদ্য সরবরাহ করবে এবং আমদানির মাধ্যমে বাজারে জোগান বৃদ্ধি করে দ্রব্যমূল্য স্বাভাবিক রাখবে।


৬। পূর্ণ-প্রতিযোগিতামূলক বাজার বলতে কী বুঝ? ইসলামে কেন পূর্ণ-প্রতিযোগিতামূলক বাজার পছন্দ করা হয়? আলোচনা কর। (৫+১০=১৫)

[What do you mean by the perfect competitive market? Why does Islam prefer perfect competitive market? Discuss.]

১. পূর্ণ-প্রতিযোগিতামূলক বাজারের সংজ্ঞা:
যে বাজার ব্যবস্থায় বহুসংখ্যক ক্রেতা ও বহুসংখ্যক বিক্রেতা স্বাধীনভাবে একটি সমজাতীয় পণ্য (Homogeneous product) একটি নির্দিষ্ট ও অভিন্ন মূল্যে ক্রয়-বিক্রয় করে এবং বাজারে কোনো একক ক্রেতা বা বিক্রেতার মূল্যকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা থাকে না, তাকে অর্থনীতিতে ‘পূর্ণ-প্রতিযোগিতামূলক বাজার’ (Perfect Competitive Market) বলে। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো: সমজাতীয় পণ্য, ক্রেতা ও বিক্রেতার পূর্ণ বাজারজ্ঞান, ক্রেতা-বিক্রেতার অবাধ প্রবেশ ও প্রস্থান এবং স্থির একক মূল্য।

২. ইসলামে পূর্ণ-প্রতিযোগিতামূলক বাজার পছন্দ করার কারণসমূহ:
ইসলামী শরিয়ত একচেটিয়া আধিপত্য বা শোষণের তীব্র বিরোধী এবং ইনসাফপূর্ণ অর্থনৈতিক পরিবেশের সমর্থক। ইসলাম পূর্ণ-প্রতিযোগিতামূলক বাজার কাঠামোকে প্রাধান্য দেয় কারণ:
১. ন্যায্যমূল্য প্রতিষ্ঠা (Fair Price): এ বাজারে ক্রেতা বা বিক্রেতা কারও পক্ষে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানো বা কমানো সম্ভব হয় না। ফলে ক্রেতা ন্যায্যমূল্যে পণ্য পায় এবং বিক্রেতা স্বাভাবিক মুনাফা (Normal Profit) অর্জন করে।
২. একচেটিয়া কারবার ও শোষণের অবসান: একচেটিয়া বাজারে (Monopoly) উৎপাদনকারী একচ্ছত্র আধিপত্য খাটিয়ে ভোক্তাদের শোষণ করে। ইসলাম যেকোনো ধরনের একচেটিয়া ক্ষমতা ও অতিরিক্ত মুনাফাখোরি ঘৃণা করে। পূর্ণ প্রতিযোগিতা মনোপলি ধ্বংস করে।
৩. বাজারে অবাধ প্রবেশাধিকার (Free Entry and Exit): রাসুলুল্লাহ ﷺ মদীনায় কোনো প্রকার বৈষম্য বা বাধা ছাড়া উন্মুক্ত বাজার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ইসলামে যে কেউ সততার সাথে বৈধ পণ্য নিয়ে বাজারে প্রবেশ করতে পারে।
৪. স্বচ্ছতা ও পূর্ণ তথ্যপ্রাপ্তি: ইসলামে পণ্যের কোনো খুঁত বা গোপনীয়তা রাখা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ক্রেতা পণ্যের মান ও বাজারদর সম্পর্কে পূর্বাহ্নেই পূর্ণ অবগত থাকে, যা প্রতারণা (গারার) দূর করে।
৫. ভোক্তার সার্বভৌমত্ব ও সামাজিক কল্যাণ: এ বাজারে উৎপাদনের দক্ষতা সর্বোচ্চ হয় এবং অপচয় সর্বনিম্ন থাকে, যা সামগ্রিক সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করে।


৭। ইসলামি বিমা কী? ইসলামি বিমার গুরুত্ব আলোচনা কর। (৫+১০=১৫)

[What is Islamic Insurance? Describe the importance of Islamic Insurance.]

১. ইসলামি বিমা বা তাকাফুল-এর সংজ্ঞা:
ইসলামি বিমাকে শরিয়তের পরিভাষায় ‘তাকাফুল’ (التكافل) বলা হয়, যার আভিধানিক অর্থ পারস্পরিক সহযোগিতা, সংহতি ও যৌথ দায়িত্ব গ্রহণ (Mutual Guarantee)।
শরিয়তের পরিভাষায়, তাকাফুল হলো এমন একটি সুদমুক্ত সমবায়মূলক চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থা, যেখানে একদল অংশগ্রহণকারী নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ‘তাবাররু’ (দান/অনুদান) হিসেবে একটি অভিন্ন তহবিলে জমা রাখে এবং সদস্যদের মধ্যকার কোনো ব্যক্তি আকস্মিক দুর্ঘটনা, ক্ষয়ক্ষতি বা বিপদের সম্মুখীন হলে সেই যৌথ তহবিল থেকে তাকে ক্ষতিপূরণ বা আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। এটি প্রচলিত বিমার তিনটি প্রধান হারাম উপাদান—সুদ (রিবা), জুয়া (ক্বিমার/মাইসির) এবং অনিশ্চয়তা বা প্রতারণা (গারার) থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।

২. ইসলামি বিমার গুরুত্ব (Importance of Islamic Insurance):
১. শরিয়াহসম্মত আর্থিক নিরাপত্তা: মানুষের জীবন ও সম্পদে যে কোনো সময় অগ্নিকাণ্ড, চুরি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা মৃত্যুর মতো আকস্মিক বিপদ আসতে পারে। প্রচলিত বিমা হারাম হওয়ায় তাকাফুল মুসলমানদের জন্য সম্পূর্ণ হালাল ও বিকল্প আর্থিক নিরাপত্তার সুযোগ সৃষ্টি করে।
২. ভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতার বিকাশ: তাকাফুল পুঁজিবাদী লাভের আশায় নয়, বরং কুরআনের মূলনীতি— ﴿وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ﴾ (“তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ায় পরস্পরকে সহযোগিতা কর”)-এর ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।
৩. অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব ও ঝুঁকি বণ্টন: একজন ব্যক্তির একক ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি সমগ্র অংশগ্রহণকারী দলের মধ্যে বণ্টিত হয়ে যায়, ফলে কোনো ব্যবসায়ী বা পরিবার আকস্মিক বিপদে নিঃস্ব হয়ে পড়ে না।
৪. হালাল বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি: তাকাফুল কোম্পানিগুলোর জমাকৃত তহবিল শুধুমাত্র শরিয়াহসম্মত হালাল শিল্প, ইসলামি সুকুক ও উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা হয়, যা জাতীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে।
৫. উদ্বৃত্ত মুনাফা ফেরত: প্রচলিত বিমায় লাভ হলে তার মালিক হয় কোম্পানি। কিন্তু ইসলামি বিমায় বছর শেষে তহবিল থেকে দাবি পরিশোধ ও ব্যয় নির্বাহের পর উদ্বৃত্ত অর্থ (Underwriting Surplus) পুনরায় গ্রাহকদের মধ্যে আনুপাতিক হারে ফেরত দেওয়া হয়।


৮। মুদ্রাস্ফীতি কাকে বলে? মুদ্রাস্ফীতির ফলাফল বর্ণনা কর। (৫+১০=১৫)

[What is inflation? Describe the effects of inflation.]

১. মুদ্রাস্ফীতির সংজ্ঞা (Definition of Inflation):
অর্থনীতিতে যখন বাজারে পণ্যের মোট জোগানের তুলনায় অর্থের সরবরাহ বৃদ্ধি পায় এবং সামগ্রিক দ্রব্যমূল্য ক্রমাগত ও অনবরত ঊর্ধ্বমুখী হতে থাকে, যার ফলশ্রুতিতে অর্থের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পায়, তখন সেই অর্থনৈতিক অবস্থাকে মুদ্রাস্ফীতি (Inflation) বলে।
– অধ্যাপক কুলবোর্ন-এর ভাষায়: “Too much money chasing too few goods is called inflation.” অর্থাৎ: “স্বল্প পরিমাণ দ্রব্যের পেছনে অতিরিক্ত পরিমাণ অর্থের ধাবিত হওয়াকে মুদ্রাস্ফীতি বলে।”
– অধ্যাপক ক্রাউথার-এর মতে: “মুদ্রাস্ফীতি হলো এমন এক অবস্থা যখন অর্থের মূল্য বা ক্রয়ক্ষমতা দিন দিন হ্রাস পায় এবং জিনিসপত্রের দাম অবিরাম বৃদ্ধি পায়।”

২. মুদ্রাস্ফীতির ফলাফল বা প্রভাব (Effects of Inflation):
মুদ্রাস্ফীতির সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব নিচে তুলে ধরা হলো:
১. নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের দুর্ভোগ: সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী, দিনমজুর ও শ্রমিকদের বেতন সহজে বাড়ে না, কিন্তু বাজারদর হু-হু করে বাড়ে। ফলে তাদের প্রকৃত আয় কমে যায় এবং জীবনযাত্রার মান চরমভাবে ব্যাহত হয়।
২. ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতার ওপর প্রভাব: ঋণদাতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়; কারণ সে পূর্বে যে মূল্যের অর্থ ঋণ দিয়েছিল, ফেরত পাওয়ার সময় মুদ্রাস্ফীতির কারণে অর্থের ক্রয়ক্ষমতা অনেক কমে যায়। অপরদিকে ঋণগ্রহীতা লাভবান হয়।
৩. উৎপাদনকারী ও ব্যবসায়ীদের লাভ: ব্যবসায়ীদের উৎপাদিত পণ্যের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় স্বল্পমেয়াদে তাদের মুনাফার পরিমাণ স্ফীত হয়।
৪. সম্পদ ও আয়ের বৈষম্য বৃদ্ধি: ধনী ব্যবসায়ীরা আরও ধনী হয় এবং গরিব ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো চরম দারিদ্র্যের কষাঘাতে নিষ্পিষ্ট হয়। ফলে সমাজে অর্থনৈতিক ব্যবধান বিপজ্জনক রূপ নেয়।
৫. সঞ্চয় হ্রাস ও বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা: অর্থের মান অবমূল্যায়িত হওয়ায় মানুষ ব্যাংকে সঞ্চয় করতে অনুৎসাহিত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় চরম অনিশ্চয়তা দেখা দেয়।
৬. সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়: দ্রব্যমূল্যের চাপে মানুষ অসদুপায় অবলম্বন, ঘুষ, দুর্নীতি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে।


খ বিভাগ—সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্ন

মান—৫ × ৪ = ২০


৯। ইসলামি অর্থনীতিতে সম্পদ বণ্টনের মূলনীতিগুলো লেখ। (৫)

[Write the principles of distribution of wealth in Islamic economics.]

ইসলামি অর্থনীতিতে সম্পদ বণ্টন ব্যবস্থা ন্যায়বিচার ও সাম্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এর প্রধান মূলনীতিগুলো হলো:
১. উৎপাদন উপাদানসমূহের মধ্যে ইনসাফপূর্ণ বণ্টন: জমি, শ্রম ও মূলধনের মধ্যে খাজনা, মজুরি ও মুনাফা হিসেবে সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা, যেখানে কোনো উপাদানকে বঞ্চিত বা শোষণ করা হবে না।
২. সম্পদ কেন্দ্রীভূতকরণ রোধ: সম্পদ যেন কেবল ধনীদের মাঝেই আবর্তিত না হয়— ﴿كَيْ لَا يَكُونَ دُولَةً بَيْنَ الْأَغْنِيَاءِ مِنكُمْ﴾।
৩. অক্ষমদের অধিকার প্রতিষ্ঠা: যারা শারীরিক অক্ষমতা বা বেকারত্বের কারণে উৎপাদনে অংশ নিতে পারে না, তাদের জন্য যাকাত, সাদাকাহ ও রাষ্ট্রীয় কোষাগার (বাইতুল মাল) থেকে মৌলিক প্রয়োজন পূরণের অলঙ্ঘনীয় অধিকার রয়েছে।
৪. উত্তরাধিকার আইনের মাধ্যমে সম্পদের পুনর্বণ্টন: ইসলামী ফারায়েজ আইনের মাধ্যমে ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বহু নিকটাত্মীয়ের মাঝে বণ্টিত হয়ে যায়।


১০। ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধিটি ব্যাখ্যা কর। (৫)

[Explain the law of diminishing marginal utility.]

সংজ্ঞা: অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে কোনো ব্যক্তি কোনো নির্দিষ্ট সময়ে একটি নির্দিষ্ট দ্রব্যের ভোগের পরিমাণ যতই বৃদ্ধি করতে থাকে, সেই দ্রব্যের অতিরিক্ত প্রতি একক থেকে প্রাপ্ত প্রান্তিক উপযোগ (Marginal Utility) ততই ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে থাকে। অর্থনীতিতে একে ‘ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধি’ (Law of Diminishing Marginal Utility) বলে।
ব্যাখ্যা: একজন তৃষ্ণার্ত ব্যক্তি যখন প্রথম গ্লাস পানি পান করে, তখন সে সর্বাধিক তৃপ্তি পায়। কিন্তু যখন সে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ গ্লাস পানি পান করতে থাকে, তখন তার তৃষ্ণার তীব্রতা কমে যাওয়ায় পরবর্তী গ্লাসগুলো থেকে প্রাপ্ত তৃপ্তি বা উপযোগ ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। একপর্যায়ে প্রান্তিক উপযোগ শূন্য এবং পরবর্তীতে ঋণাত্মক হয়ে যায়।


১১। অর্থের কার্যাবলি আলোচনা কর। (৫)

[Discuss the function of money.]

অর্থ মূলত চারটি প্রধান কার্যাবলি সম্পাদন করে থাকে (Money is a matter of functions four: A medium, a measure, a standard, a store):
১. বিনিময়ের মাধ্যম (Medium of Exchange): অর্থ প্রাচীন দ্রব্য বিনিময় প্রথার (Barter System) জটিলতা দূর করে যেকোনো পণ্য ও সেবা সহজে ক্রয়-বিক্রয়ের সর্বজনগ্রাহ্য মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
২. মূল্যের পরিমাপক (Measure of Value): বাজারে সকল পণ্যের আর্থিক মান বা দাম নিরূপণের একক হিসেবে অর্থ ব্যবহৃত হয়।
৩. স্থগিত লেনদেনের মান (Standard of Deferred Payments): ভবিষ্যৎ দেনা-পাওনা, ঋণ গ্রহণ ও পরিশোধের সর্বসম্মত মাধ্যম হিসেবে অর্থ কাজ করে।
৪. মূল্যের সঞ্চয়ের ভাণ্ডার (Store of Value): অন্যান্য পচনশীল দ্রব্যের চেয়ে অর্থ দীর্ঘকাল সহজে সঞ্চয় করে রাখা যায়।


১২। যাকাতের ব্যয়ের খাতসমূহ আলোচনা কর। (৫)

[Discuss the Masaref of Zakat.]

পবিত্র কুরআনের সূরা আত-তাওবার ৬০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ যাকাতের ব্যয়ের আটটি সুনির্দিষ্ট খাত নির্ধারণ করেছেন:
১. ফুকারা (الفقراء): নিঃস্ব ও অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি যার কোনো সম্পদ নেই।
২. মাসাকীন (المساكين): মিসকীন বা দরিদ্র ব্যক্তি যার কিছু সম্পদ থাকলেও মৌলিক প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত।
৩. আমিলীন (العاملين عليها): যাকাত সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বণ্টনকাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ।
৪. মুআল্লাফাতুল কুলুব (المؤلفة قلوبهم): ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য নওমুসলিম বা দুর্বল ঈমানের ব্যক্তি।
৫. দাসমুক্তি (في الرقاب): দাস-দাসী বা বন্দীকে মুক্ত করার খাত।
৬. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি (الغارمين): যে ব্যক্তি বৈধ প্রয়োজনে ঋণগ্রস্ত হয়ে তা পরিশোধে অপারগ।
৭. ফি সাবিলিল্লাহ (في سبيل الله): আল্লাহর পথে দ্বীনের প্রচার ও প্রতিরক্ষামূলক জিহাদের খাত।
৮. ইবনুস সাবীল (ابن السبيل): অসহায় ও নিঃস্ব মুসাফির বা প্রবাসী পথচারী।


১৩। মুনাফা ও সুদের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ কর। (৫)

[Make distinction between profit and interest.]

পার্থক্যের বিষয় মুনাফা (Profit) সুদ (Interest/Riba)
১. শরিয়তের হুকুম সম্পূর্ণ হালাল ও পবিত্র (﴿وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ﴾)। সম্পূর্ণ হারাম, কবিরা গুনাহ ও আল্লাহর সাথে যুদ্ধতুল্য।
২. ঝুঁকির উপস্থিতি মুনাফায় মূলধন হারানোর ব্যবসায়িক ঝুঁকি (Risk) বিদ্যমান থাকে। সুদে কোনো ঝুঁকি থাকে না; মূলধন ও পূর্বনির্ধারিত লাভ শতভাগ নিশ্চিত।
৩. নির্ধারণ পদ্ধতি লাভের হার বা আনুপাতিক অংশ ঠিক হয়, কিন্তু মূল টাকার পরিমাণ পূর্বে নিশ্চিত নয়। মূলধনের ওপর নির্দিষ্ট হারে অতিরিক্ত অর্থ পূর্বেই নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা হয়।
৪. উৎপাদনের সাথে সম্পর্ক প্রকৃত শ্রম, মূলধন ও মেধার সক্রিয় যৌথ ফলাফলে সৃষ্টি হয়। উৎপাদন হোক বা না হোক, কেবল সময়ের আবর্তনে অর্থ বৃদ্ধি পায়।

১৪। ইসলামি ব্যাংকের কাজসমূহ লেখ। (৫)

[Write the mode of operations of an Islamic Bank.]

ইসলামি ব্যাংকের প্রধান কার্যক্রমসমূহ নিম্নরূপ:
১. আমানত সংগ্রহ: সুদমুক্ত পদ্ধতিতে আল-ওয়াদিয়াহ (চলতি হিসাব) এবং মুদারাবা (সঞ্চয়ী ও মেয়াদী হিসাব) ভিত্তিতে আমানত গ্রহণ করা।
২. বিনিয়োগ পরিচালনা: সরাসরি সুদভিত্তিক ঋণের পরিবর্তে মুরাবাহা (ক্রয়-বিক্রয়), মুদারাবা (অংশীদারিত্ব), মুশারাকা (যৌথ মূলধনী কারবার), ইজারা (ভাড়া ও মালিকানা চুক্তি) এবং সালাম ও ইসতিসনা পদ্ধতিতে শিল্প ও ব্যবসায় অর্থায়ন।
৩. বৈদেশিক বাণিজ্য ও রেমিট্যান্স সেবা: হালাল আমদানি-রপ্তানি অর্থায়ন ও প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দ্রুত পৌঁছে দেওয়া।
৪. সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক তহবিল: যাকাত আদায় ও বিতরণ, কর্জে হাসানা প্রদান এবং দরিদ্রদের জন্য প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনমূলক কর্মসূচি পরিচালনা।


১৫। মুশারাকা ধারণাটি ব্যাখ্যা কর। (৫)

[Explain the concept of ‘Musharakah’.]

মুশারাকার পরিচয়:
‘মুশারাকা’ (المشاركة) শব্দটি আরবী ‘শিরকাত’ (شِركة) শব্দ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ যৌথ অংশীদারিত্ব। ইসলামি ব্যাংকিং পরিভাষায়, দুই বা ততোধিক ব্যক্তি বা পক্ষ যৌথভাবে মূলধন বিনিয়োগ করে কোনো বৈধ ব্যবসা পরিচালনা করার যে চুক্তি সম্পাদন করে, তাকে মুশারাকা বলে।
মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ:
১. উভয় পক্ষ চুক্তির শর্তানুযায়ী মূলধন সরবরাহ করে।
২. ব্যবসায়ের অর্জিত মুনাফা তাদের পারস্পরিক পূর্বচুক্তিকৃত অনুপাতে বণ্টিত হয়।
৩. যদি ব্যবসায় কোনো লোকসান হয়, তবে সেই লোকসান উভয় পক্ষকে তাদের মূলধনের অনুপাত অনুযায়ী (In proportion to capital) কঠোরভাবে বহন করতে হয়। এতে কারও ওপর জুলুম হয় না।


১৬। ইসলামে শ্রমনীতির ব্যাখ্যা কর। (৫)

[Explain the labour policy in Islam.]

ইসলাম শ্রম ও শ্রমিকের অধিকারকে সর্বোচ্চ মর্যাদা ও সম্মান দান করেছে। ইসলামি শ্রমনীতির মূল নির্দেশনাসমূহ হলো:
১. শ্রমের পবিত্রতা: রাসুলুল্লাহ ﷺ শ্রমের সম্মান জানিয়েছেন এবং নিজ হাতে কাজ করাকে শ্রেষ্ঠ উপার্জন আখ্যা দিয়েছেন।
২. ঘাম শুকানোর পূর্বেই পারিশ্রমিক পরিশোধ: রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: «أَعْطُوا الأَجِيرَ أَجْرَهُ قَبْلَ أَنْ يَجِفَّ عَرَقُهُ» (“তোমরা শ্রমিকের ঘাম শুকানোর পূর্বেই তার পারিশ্রমিক পরিশোধ কর” – সুনানে ইবনে মাজাহ)।
৩. সামর্থ্যের অতিরিক্ত কাজের বোঝা না চাপানো: শ্রমিকের শারীরিক শক্তির বাইরে কোনো কাজ চাপানো নিষিদ্ধ; কোনো ভারী দায়িত্ব দিলে মালিককেও তাকে সহযোগিতা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
৪. শ্রমিককে ভাইয়ের মর্যাদা দান: রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন, “শ্রমিকরা তোমাদেরই ভাই, আল্লাহ তাদের তোমাদের অধীনস্থ করেছেন; অতএব তোমরা যা খাও তাদেরও তা খাওয়াও এবং যা পরিধান করো তাদেরও তা পরিধান করাও।”


সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন ১: ফাজিল ১ম বর্ষের অর্থনীতি ও ইসলামি অর্থনীতি পরীক্ষার বিষয় কোড কত?

অর্থনীতি ও ইসলামি অর্থনীতি বিষয়ের নির্ধারিত বিষয় কোড হলো ২০১১০৬। এটি ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ১ম বর্ষের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবশ্যকীয় বিষয়।

প্রশ্ন ২: ইসলামি অর্থনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য কী?

ইসলামি অর্থনীতির মূল বৈশিষ্ট্য হলো আল্লাহর নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব ও মালিকানা স্বীকার করা, সুদ, জুয়া ও মজুতদারি সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা এবং যাকাতের মাধ্যমে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা।

প্রশ্ন ৩: ইসলামি বিমা বা তাকাফুল কীভাবে কাজ করে?

তাকাফুল প্রচলিত বিমার সুদ ও জুয়া পরিহার করে সমবায়মূলক দান (তাবাররু) তহবিলের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, যেখান থেকে বিপদে পড়া সদস্যদের ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয় এবং উদ্বৃত্ত অর্থ গ্রাহকদের মাঝে বণ্টিত হয়।

প্রশ্ন ৪: সাধারণ ভোক্তা ও ইসলামি ভোক্তার মূল পার্থক্য কী?

সাধারণ ভোক্তা কেবল বস্তুগত আত্মতৃপ্তি ও পার্থিব উপযোগ সর্বোচ্চকরণে ব্যস্ত থাকে, পক্ষান্তরে ইসলামি ভোক্তা হালাল-হারামের বিধান মেনে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালীন ফালাহ অর্জনের উদ্দেশ্যে সম্পদ ভোগ করে।

প্রশ্ন ৫: ইসলামি সরকার কখন দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারে?

স্বাভাবিক অবস্থায় বাজার উন্মুক্ত থাকলেও ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট, মজুতদারি বা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করলে ইসলামি প্রশাসন জনস্বার্থে বাধ্যতামূলক ন্যায্যমূল্য বেঁধে দিতে পারে।

প্রশ্ন ৬: ইসলামি ব্যাংকগুলোতে মুশারাকা পদ্ধতির নিয়ম কী?

মুশারাকায় ব্যাংক ও উদ্যোক্তা উভয়ই মূলধন বিনিয়োগ করে। মুনাফা পূর্বচুক্তির অনুপাতে বণ্টিত হয়, তবে লোকসান হলে তা কঠোরভাবে মূলধনের অনুপাত অনুসারে উভয় পক্ষ বহন করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *